এক পরিশীলিত স্থপতি

লেখক:

কাজী আনিস উদ্দিন ইকবাল

৩ পরীবাগ, লোহার গেটের পাশে দেয়ালে লেখা, গেট বন্ধ। কলিংবেল চোখে পড়ল না, গেটের মধ্যে একটু ছিদ্র দিয়ে দেখলাম ভেতরে অনেকটা বড় বাগানের মাঝে একটা বাড়ি, ব্রিটিশ আমলের। গেট থেকে সুরকিঢালা একটা পথ গাড়িবারান্দা পর্যন্ত। এমন বাড়িতে গেটে অন্তত কোনো দারোয়ান থাকার কথা! কাউকেই দেখা যাচ্ছে না, লোহার গেটে একটু জোরদার শব্দই করে ফেললাম, এবার মনে হলো একজন আসছে, গাছের পেছনেই ছিল, পানি দিচ্ছিল, মালি মনে হয়। এই বাড়িতে যিনি থাকেন, তার মেজাজের খ্যাতি আছে, তার বাড়ির মালিও হয়তো কম যাবে না, তাই একটু ভয় ভয়েই রইলাম, লুঙ্গি-গেঞ্জিপরা লোকটি এসেই কিছুই জিজ্ঞেস না করে গেটটি হাট করে খুলে দিলো, হয়তো মনে করেছে আমার পেছনে কোনো গাড়ি আছে, তা আসলে ছিলও একটা, তবে দুই চাকার, একটা মোটরসাইকেল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কি বাস্ত্তকলাবিদের অফিস?’ লোকটি প্রথমে বুঝল না, তারপর বললাম, ‘স্যার আছেন?’ ‘ঘুমাইতেছে মনে হয়, যাইয়া দেখেন।’ মোটরসাইকেল ঠেলে ভেতরে ঢোকালাম, জামার হাতায় মুখ-ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে বারান্দায় হাজির হলাম, কেউ নেই। মালি লোকটাই বাড়ির পেছন দিক থেকে মনে হয় খবর দিতে গেল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলাম, কারো না কারো চোখে তো পড়বই। সামনের ঘরটি খোলা, কয়েকটা ড্রইং টেবিল, এতক্ষণে চোখে পড়ল একজন একমনে ড্রইং করছে। ভাবলাম এর সঙ্গেই কিছুটা আলাপ করি, ঠিক তখনই একজন সৌম্য দর্শন ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন গায়ে সাদা ফতুয়া, সপ্রশ্ন দৃষ্টি নিয়ে, ‘কাকে চাচ্ছেন?’ দূর থেকে আগে একবার দেখেছিলাম কয়েক বছর আগে, ‘স্যার আপনার কাছে এসেছি।’

‘কী ব্যাপার?’

বললাম, ‘আমি একজন আর্কিটেক্ট আমাকে চিনবেন না, আপনার একটু সময় নেব যদি খুব ব্যস্ত না থাকেন।’ দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ  ধূলিধূসরিত ঘর্মাক্ত আমাকে কিছুটা মাপলেন তারপর কিছু না বলেই হেঁটে বারান্দার পশ্চিমের ঘরটাতে গিয়ে ঢুকলেন, আমিও পিছু পিছু।

‘আজকাল এখানে খুব একটা কেউ আসে না, তা আপনার কী ব্যাপার?’

স্থাপত্য নিয়ে একটা পত্রিকা বের করতে চাই, তার নামও ঠিক করে ফেলেছি স্থাপত্য ও নির্মাণ এই তথ্যটা সভয়ে এবং এক নিশ্বাসে বলে ফেললাম, সৌম্যমূর্তিতে এবার স্পষ্ট বিরক্তি প্রকাশ পেল, বুঝলাম উনি এই অচেনা আমার উদ্ভট চিন্তার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না। বললাম, ‘আমি একা নই, সঙ্গে আমার কয়েকজন বন্ধু আছে, আমি এসেছি প্রথম আপনার উপদেশ নিতে, আমাদের বড় আশা আপনি আমাদের বুদ্ধি-পরামর্শ দেবেন।’ তারপর আসল কথাটা পাড়লাম, ‘আপনার একটা সাক্ষাৎকার নেব, আপনাকে নিয়েই শুরু করতে চাই।’

বললেন, ‘বসেন’, তারপর উঠে ঘরের ভেতরে গিয়ে আবার ফিরে এলেন। এবার চেহারাটা একটু সহজ ‘কী করতে চান? স্থাপত্য কোনো সহজ বিষয় নয়, আর সে নিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করা দুরূহ, অনেকেই চেষ্টা করেছে ধরে রাখতে পারেনি।’

অনেক ছোট ছোট প্রশ্ন করলেন, বুঝতে চাইলেন আমার আগ্রহটা কোন পর্যায়ের। শেষ পর্যন্ত হয়তো আমাকে পরখ করতে চাইলেন, প্রশ্নগুলো লিখে ওনাকে আগে দিয়ে যেতে হবে। আমিও তাতেই রাজি। এর মধ্যে কিন্তু চা-বিস্কুট এসেছে এবং তিনিও জেনে নিয়েছেন আমি স্থাপত্য পাশ করে নগর পরিকল্পনায় মাস্টার্স করছি, কোথাও চাকরি করি না এবং বিশেষ করে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। চলে আসার সময়ে বারান্দা পর্যন্ত এলেন এবং আমি মোটরসাইকেলে স্টার্ট দেওয়ার সময়ও লক্ষ করলাম তিনি দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছেন! কয়েকজন সদ্য পাশ করা মেধাবী স্থপতিকে এই সাক্ষাৎকার নিতে প্রস্তাব দিলে তারা রাজি হলেন, একদিন তাদের নিয়ে হাজির হলাম, তারা সঙ্গে রেকর্ডার নিয়েছিল, কিন্তু তিনি নিষেধ করলেন, বললেন আলোচনা হোক, তারা তাদের প্রশ্নগুলো তাঁর সামনে রাখল, তিনি দেখলেন । তারপর নিজের মতো করে বলে চললেন, তারা ক্লাস নোটের মতো টুকে যাচ্ছে, স্থাপত্য শিল্প, পেশা, সমাজ, দেশ সবই আলোচনায় এলো, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা কিছু ছড়িয়ে দিলেন আমাদের মাঝে। শেষ হলে তিনি বললেন, লেখা হয়ে গেলে তাঁকে যেন দেখিয়ে নিই। তারা যখন লেখাটা তৈরি করে দিলো আমি গেলাম তাঁর কাছে, তিনি রেখে দিলেন, আরেকটি দিন ঠিক করে দিলেন নিয়ে আসতে, ঠিক সেই দিনই সেটা পেলাম এবং আশ্চর্য হলাম দুটো কারণে, তিনি ওই তরুণদের নোটভিত্তিক লেখাটি বাদ দিয়ে উত্তরগুলো নিজেই লিখেছেন এবং যেদিন আমাকে যেতে বলেছেন সেদিনই লেখাটি দিয়ে দিলেন। যাঁরা প্রকাশনার কাজে লেখা সংগ্রহ করে থাকেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝবেন কেন আশ্চর্য হয়েছি। সাক্ষাৎকারটির সঙ্গে তাঁর কতগুলো প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে আরো অনেক প্রকাশনাই হয়েছে, কিন্তু তাঁর নিজের লেখা উত্তর আর কোথাও চোখে পড়েনি। স্থাপত্য ও নির্মাণের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি, সেই সুবাদে আমি মাঝে মাঝেই হানা দিতাম। পত্রিকাটির অবয়ব, বিষয়বস্ত্ত সবকিছু নিয়েই তিনি অসন্তুষ্ট থাকতেন, আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, জানতেন অর্থের অভাব, বলতেন ‘ঠিকমতো জিনিসটা গুছিয়ে করুন, দরকার হলে কয়েকটা জায়গায় বলে দেব, তাহলে টাকা-পয়সার ভার অনেকটা কমে আসবে।’ আমার দুর্ভাগ্য তাঁর সেই ধরনের সহযোগিতা গ্রহণ করার মতো  যোগ্য কিছুতেই হয়ে উঠতে পারিনি। স্থাপত্য ও নির্মাণ প্রকাশনা যতই অনিয়মিত হয়ে পড়তে থাকল, তাঁর কাছে যাওয়াটাও কমে গেল।

চারপাশের দুনিয়াটা তো আর থেমে থাকেনি, বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চায় নবীন প্রজন্মের অধিকার ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একসময়ে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সক্রিয় রাজনীতি করার কারণে সরকারি মহলে তাঁকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অনিচ্ছা ছিল হয়তো, স্থপতিদের মধ্যেও একটি মহল শুনেছি তাঁকে কোণঠাসা রাখার জন্যে উৎসাহী ছিলেন, কিন্তু এই নবীনদের যুগে ক্রমশ মাজহারুল ইসলামের জয়গান ধ্বনিত হতে শুরু হলো। তাঁকে সরকার কাজ দিলো না; কিন্তু স্থপতিরা তাঁকে স্থাপত্যের প্রতিযোগিতায় সম্মানিত বিচারক হিসেবে বরণ করলেন।

আমার প্রকৌশলী বন্ধুরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন, কে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্থপতি? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া খুবই কঠিন, তবে আমার হিসাবে মাজহারুল ইসলাম যতগুলো এবং যে-আকারের প্রকল্প ডিজাইন করেছেন তা হয়তো এখনো বাংলাদেশের কোনো স্থপতি অতিক্রম করতে পারেননি। তিনি যখন এই কাজগুলো করেছেন সেই সময়ে এদেশের স্থাপত্য যে-স্তরে ছিল সে-হিসাব করলে বলতে হয়, তিনি অনেক অনেক অগ্রসর ছিলেন। তাঁর কাজগুলো কিন্তু শুধু কতগুলো সুবিন্যস্ত বাড়ি নয়, এর মধ্যে একটা নৈতিকতার ধারা প্রবাহিত। তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি খাঁজে গাঁথা আছে সদ্য নিজেকে চিনতে চেষ্টা করা একটি জাতির উচ্চাভিলাষ, সেই উচ্চতা ছোঁয়া সাধারণের চিন্তার বাইরে। স্বল্পবাক এই মানুষটি নিজের ঢোল পেটাতে একেবারেই অনিচ্ছুক, কিন্তু তাঁর স্থাপনাগুলো মোটেই মুখ লুকিয়ে থাকার নয়, মাথা উঁচু করে তাঁর অন্তরের গর্বিত তেজি মনোভাবকে প্রকাশ করছে। তখনকার বিশ্বে আধুনিক স্থাপত্যের ধারায় সিক্ত হয়ে তিনি আর্ট ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নিপা ভবন ডিজাইন করেছেন, সেখানে ভবনগুলো খোলামেলা, হালকা এবং বাহুল্যবর্জিত। এছাড়া পরিণত বয়সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্প, জাতীয় আর্কাইভস – এসব ভবনে লাল ইটের গাঁথুনির মধ্যে দিয়ে স্থায়িত্বের প্রকাশ ৪৫ ডিগ্রি কোণে মৌলিক আকৃতিকে কেটে আলো প্রবেশ করতে দেওয়ার এক তির্যক আকাঙ্ক্ষা তাঁকে কেন পেয়ে বসেছিল তা ভবিষ্যতের গবেষকরা হয়তো উদ্ধার করবেন, কিন্তু আমরা এর মধ্য দিয়ে শিখেছি কীভাবে কঠোর নিয়মে বাঁধা ফর্মকে ভাঙতে হয়, অথচ ফর্ম নিজে সেই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাবে। রক্ষণশীল সমাজের বাহ্যিক অবয়ব ঠিক রেখে তার ফাঁক-ফোকর দিয়ে নতুনের পথ করে দেওয়ার একটা সংস্কারবাদী মনোভাব হয়তো। সেজন্যেই কি বিপ্লবের আশা ত্যাগ করে একদিন মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন!

যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন তাঁরা অনেকেই বলেছেন, মাজহারুল ইসলাম ছিলেন ‘পারফেকশনিস্ট’। খুটিনাটি বিষয়ও তাঁর দৃষ্টি এড়াত না। ড্রইংয়ে পরিচ্ছন্নতা রাখার জন্য সহকর্মীদের বকাবকি করতেন। এমনকি অবুঝ ক্লায়েন্টদেরও ছেড়ে কথা বলতেন না। তাঁর টেবিলটা থাকত সাদা এবং বড়, অনেকগুলো চেয়ার, একার জন্য নয়, অনেকের সঙ্গে একসঙ্গে দেশের কথা বলার সময়ে ভাবুক বড় বড় চোখ দুটির মধ্যে অদ্ভুত অপরিচিত একটা দৃষ্টি ফুটে উঠত। আমি খুব অবাক হতাম, মনে হতো, তিনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন না। অতিথি আপ্যায়নটা একটা অমোঘ নিয়মের মতো ছিল, সবসময়ই কিছু পাওয়া যেত, দেরি হলে তাঁকে উঠে গিয়ে তাগাদা দিতেও দেখেছি, অথচ আমি তার হিসাবের মাপকাঠিতে কেউ নই।

একদিন বঙ্গবন্ধু জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগে ডাক পেলাম, পাশ করার পর আমার মনে হয়েছিল, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বিখ্যাত বাড়িটিতে একটা মিউজিয়াম হওয়া উচিত, দেখা করলাম বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে, ব্যস্ততার কারণে আরেকদিন যেতে বললেন, গেলাম ঠিক ঠিক মতো, দেখলাম তিনি ভীষণ উৎসাহী, নিজে আমাকে সঙ্গে করে ওপরতলায় নিয়ে গেলেন, প্রতিটি ঘর খুলে দেখালেন, এতবড় নেত্রী অথচ এত সহজ তাঁর ব্যবহার!  তখন তিনি কেবল তাঁর দলের সভানেত্রী। যা হোক আমি বাড়িটি মাপজোখ করে তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী এবং নিজের মেধায় যতটুকু কুলায় একটা পরিকল্পনা তৈরি করলাম, জানলাম এর আগে স্থপতি রবিউল হুসাইনও একটা স্কেচ করেছিলেন, দেখলামও সেটা। সেই কাজ এবং এই ডাকের মাঝে অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে, গিয়ে দেখি তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে অনেক নামকরা ব্যক্তিত্ব, আমিই তাঁর মধ্যে কনিষ্ঠতম। আমি গিয়ে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম স্যারের পেছনে বসলাম। এই মিউজিয়াম কীভাবে হবে, তা নিয়ে জনমত গ্রহণ করা হবে, জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আহবান করা হবে, মিউজিয়ামে কী কী থাকবে, যা আছে সেগুলো সংরক্ষণ করার জন্য বিভিন্ন বিশেষজ্ঞকে কিভাবে জড়ো করা যায় ইত্যাদি। ভাষাসৈনিক গাজীউল হক এবং অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন অনেক কথা বললেন, স্থপতি রবিউল হুসাইনও বললেন, আমি ভাবছিলাম, স্থপতি মাজহারুল ইসলামের বক্তব্যই হবে সত্যিকারের নীতিনির্ধারক, কিন্তু তিনি খুবই অল্প কথায় এই প্রকল্পটি যে ব্যক্তি বা দলের নয় বরং জাতির জন্য সেটাই জানালেন। মিটিংয়ের বিরতির সময়ে নেত্রী আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়ায় ফিরে এসে মনে হলো হঠাৎ আমার একটা বিশেষ গুরুত্ব তৈরি হয়েছে, আসলে নেত্রী আমাকে ডেকে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিলেন, যে আমি যেহেতু একটা ডিজাইন করেছিলাম, এখন প্রতিযোগিতা হবে ইত্যাদি কারণে। নেত্রীর সহপাঠী এবং বান্ধবী বেবী মওদুদ এরই মধ্যে আমার পারিবারিক পরিচয় তাঁদের কাছে প্রকাশ করেছেন এবং স্থপতি রবিউল হুসাইনের (আমি রবিউল ভাই বলি) কাছে পরে শুনেছি, মাজহারুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, ছেলেটি এতদিন ধরে আমার ওখানে যাওয়া-আসা করে, কোনোদিন তার অন্য কোনো পরিচয় দেয়নি। তার আত্মমর্যাদা আছে। গর্ববোধ করেছি এবং তা ধরে রাখার চেষ্টাও করে থাকি। সমাজে স্থপতিদের মর্যাদা ধরে রাখার জন্য তিনি সবসময়ে ছিলেন খুবই সংবেদনশীল। বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের প্রথম পর্বে পরিচালনার জন্য একটি কমিটি করা হলো, আমিও ছিলাম তার মধ্যে, স্যারও ছিলেন, মাঝে মধ্যে তাঁকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়ত আমার ওপর, তখন অনেক কথা হতো। তিনি আমাকে নবীন স্থপতিদের সংগঠিত করার জন্য উৎসাহ দিতেন, দেশটাকে গুছিয়ে দেওয়ার একটা পরিকল্পনা তাঁর ছিল; কিন্তু জোর পাচ্ছেন না। আমাকে একদিন বললেন, আমি কেন তাঁর কাছে প্রায়ই যাই না? আমার উত্তরটা ছিল, ‘কিছু স্থপতি আপনাকে নিয়ে দলাদলি করছেন, শুধু একাডেমিক উদ্দেশ্য থাকছে না, আমি দলাদলি চাই না। অনেক স্থপতি আছেন যাঁরা আপনার ডিজাইন করা কাজ দেখে আপনাকে শ্রদ্ধা করেন, কাছে আসার সুযোগ পান না। আমার মধ্যেও আপনার একটা মূর্তি আছে, আমি সেটা ধরে রেখেছি, সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট, তাছাড়া স্থাপত্য ও নির্মাণ নিয়মিত প্রকাশ না করতে পেরে আপনার কাছে আসতে লজ্জা পাই।’ এরপর তিনি আর কখনও আমাকে এই বিষয়ে আর কিছু বলেননি।

স্থাপত্য ও নির্মাণ যখন প্রথম চার রঙে প্রকাশিত হলো, তখন তাঁর অস্বস্তি আবার দেখেছিলাম, শুধু বলেছিলেন, ‘উদ্যোগটা ভালোই ছিল কিন্তু ক্রমশ বাণিজ্যিক দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, বুঝি, প্রকাশনা করতে অর্থ লাগে, কিন্তু বাণিজ্যিক দিকে ঝুঁকলে পত্রিকার মান থাকবে না, উদ্দেশ্যও পরিষ্কার হবে না।’

ভারতের বিখ্যাত স্থপতি বি. ভি. দোশী ঢাকায় এসে ব্র্যাক সেন্টারে বক্তৃতা দিলেন স্থপতি মাজহারুল ইসলামের কাজের ওপর, আমিও উপস্থিত ছিলাম সেই সভায়। স্যারের কাজের অন্তর্নিহিত সাবলীল সৌন্দর্য নিয়ে কথা বললেন। স্থপতি দোশীর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল স্থাপত্য ও নির্মাণের জন্য, বাংলায় প্রকাশিত তখন পর্যন্ত তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকার, সেখানেও স্যারের প্রশংসা করেছেন। দোশী বিশেষ করে উল্লেখ করলেন আর্ট কলেজের কথা। ওই ভবনটি তাঁকে মুগ্ধ করেছে, স্থাপত্যশিল্প সম্বন্ধে যাঁরা ওয়াকিবহাল তাঁদের বেশিরভাগই প্রশংসা করেন। যে-সময়ে ওই ডিজাইন তৈরি হয়েছে, তখন এ-অঞ্চলের বাড়িঘরে ঔপনিবেশিকতার প্রভাব থাকত প্রকটভাবে, আর্ট কলেজ এদেশে আধুনিক স্থাপত্যের মাইলফলক। এখানে সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য স্পেসগুলো মুক্ত করে দেওয়া, ভারবাহী দেয়ালের ঘেরাটোপের মধ্যে আবদ্ধ থাকত যে সিঁড়ি তাকে মুক্ত করে বসানো হয়েছে উন্মুক্ত পরিসরে। এ-ভবনটির বিভিন্ন অংশের আকৃতিতে ভিন্নতা, মৌলিক ফর্মগুলোর ছন্দময় পুনরাবৃত্তি, অথচ নিরাভরণ। স্থাপত্যিক দেহসৌষ্ঠবের কারণে যে-সৌন্দর্য ছিল তা অবশ্য আজকাল জীর্ণ হয়ে পড়েছে অনেকটাই, রক্ষণাবেক্ষণের বড়ই অভাব।

এরপর বিভিন্ন সভায় দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে অল্প, আমি দূরে সরে গিয়েছিলাম, অনেকদিন পর স্থপতি নূরুর রহমান একদিন আমাকে জানাল, স্যারের বেশিরভাগ ড্রইং সংগ্রহ করে একটা আর্কাইভ করার সঙ্গে সে যুক্ত আছে, তার মধ্যে থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের ড্রইং নিয়ে একটা বই প্রকাশ করার জন্য তৈরি হচ্ছে, আমি সাহায্য করতে পারব কি না। আমি এক বাক্যে রাজি হলাম, স্থাপত্য ও নির্মাণ থেকে প্রকাশিত হবে নূরুর রহমানের বই এবং শর্ত দিলাম আর্কাইভ থেকে অনুমতি, পরিবার থেকে অনুমতি – এসব দায়িত্ব সে-ই নেবে, নূরুর রহমানও রাজি। ২০১১ সালে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের ড্রইং নামে বইটির প্রথম বাঁধাই সংখ্যা নূরুর রহমান এবং আমি স্যারের হাতে পৌঁছে দিতে গেলাম তাঁর জন্মদিনে, ৩নং পরীবাগে নয়, গুলশানে (তখন গুলশানের একটা ফ্ল্যাটে তিনি থাকেন)। তিনি এলেন, অসুস্থ, নিজেই এলেন বসলেন সামনে, শুনলেন, বললেন – ‘আজকাল অসুস্থ থাকছি প্রায়ই।’ তাঁর হাঁটাহাঁটিতে সাহায্য প্রয়োজন, কিন্তু সহজে কারো সাহায্য নিতে রাজি নন, তিনি কাঁপতে কাঁপতেই উঠে চলে গেলেন, আমার মনের মধ্যে এই সৌম্য দর্শন মানুষটির যে প্রতিমূর্তি গড়ে রেখেছিলাম তা যেন প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে কে যেন ভাঙতে উদ্যত আর আমি চেষ্টা করছি সেটাই নিটোল ধরে রাখতে…।

বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানটা ভালোই হলো, পূর্ত সচিব ছিলেন, আমাদের শিক্ষক স্থপতি সামসুল ওয়ারেস, তাঁর সৃষ্টিকর্ম এবং সাধনার বিষয়ে সবাইকে আলোকিত করলেন। প্রকাশনার সঙ্গে তাঁর মূল ড্রইংয়ের প্রদর্শনী হলো তিনদিন। প্রচুর দর্শকসমাগম, স্থপতি, প্রকৌশলী, শিল্পী-সাহিত্যিক, স্থাপত্যের ছাত্রছাত্রী। সে-আমলে পেনসিলে ড্রইং হতো, নিয়মিত ড্রাফটিং কলম ব্যবহার শুরু হয়েছিল মনে হয় আশির দশকে। ডিটেইল ড্রইং, কী আসাধারণ ধৈর্য এবং চিন্তার সূক্ষতা, সবকিছু গুছিয়ে দেওয়ার ঐকান্তিক ইচ্ছাটা যে আজীবন লালিত তা এই পরিপাটি গোছানো ড্রইংগুলো সাক্ষ্য দেয়। অনেক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট করেছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত আরেকজন স্থপতি স্ট্যানলি টাইগারম্যানের সঙ্গে। প্লাস্টারহীন ইটের দেয়াল, তার মধ্যে ইটের নানা ধরনের গাঁথুনি, লুকানোর চেষ্টা নেই, লাইনের সঙ্গে লাইন মিলিয়ে, আবার কখনো মৌলিক আকৃতিগুলোর মধ্যে নানা ফাঁকা, গহবর বা ভরাটের ছন্দ সৃষ্টি করে নতুন সৃষ্টির ঘরানা তৈরি করেছিলেন তিনি, আমরা এখন অনুসরণ করে চলেছি।

বিশ্বখ্যাত স্থপতিদের ডেকে এনেছিলেন এদেশে, অনুভব করেছিলেন, নরম মাটির দেশে হাজার বছর আগের বাড়িঘর টিকে থাকেনি, আমরা ঐতিহ্যহারা। তিনি তখনকার আধুনিকতম প্রযুক্তিকে বরণ করেছেন, আমরা যেন হীনমন্যতায় না ভুগি, আমরা যেন আধুনিক হই, তাঁর এমন চেষ্টার ফল আমাদের জাতীয় সংসদ ভবন। তাঁর এই প্রচেষ্টায় এদেশে লুই আই কান, পল রুডলফ, স্ট্যানলি টাইগারম্যান, কনস্ট্যানটিন ডক্সিয়াডিস – তাঁদের মতো বিশ্ববরেণ্য স্থপতিরা বেশ কিছু বিখ্যাত ভবন ডিজাইন করেছেন। আমাদের কাছে এসব ভবন শিক্ষার এবং চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার আধার।

স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এখন আর নেই, ৩নং পরীবাগ এখন সুউচ্চ অ্যাপার্টমেন্ট ভবন; কিন্তু তাঁর অনবদ্য স্থাপত্য কীর্তিগুলো এখনো আছে, যাঁরা ব্যবহার করছেন তাঁরা হয়তো জানেন না কার কল্পনায় প্রথম ধরা দিয়েছিল এই অট্টালিকা, কে নির্দেশ করে দিয়েছেন এর স্পেসগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হবে। তবু তাঁর সৃষ্টির মধ্যে তাঁর নিশ্বাস ভেসে বেড়াচ্ছে, ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে তিনি এদেশের স্থাপত্যকে মুক্তি দিয়ে যে-প্রবাহ সৃষ্টি করেছেন, সে তো আবদ্ধ থাকতে পারে না, নতুন নতুন রূপ গ্রহণ করে ফিরে ফিরে এসে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেবে, শুরুটা কোথায় হয়েছিল। আমরা বারবার বলতে বাধ্য হবো, ‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ।’