ঐতিহাসিক অমলেন্দু দের প্রয়াণলেখ

লেখক:

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

২০১৪ সালের ২৬ মে প্রয়াত হলেন উপমহাদেশের অন্যতম কৃতী ঐতিহাসিক ড. অমলেন্দু দে, ৮০ বছর বয়সে। তিনি ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরু নানক প্রফেসর, পরবর্তীকালে এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। যুক্ত ছিলেন ভারত-চীন মৈত্রী সমিতির সঙ্গেও, যার কাজে একাধিকবার চীনে যান তিনি। তাঁর নিবিড় যোগ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে জনমত-সংগঠনে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মানোর পরপরই শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে তিনি ঢাকা যান। তিনি ছিলেন শেখ মুজিবের জন্মস্থান বৃহত্তর ফরিদপুরেরই ভূমিপুত্র। মাদারীপুরে জন্ম তাঁর, ১৯২৯-এর ১২ মার্চ। তাঁর পিতা গোপালচন্দ্র দে ছিলেন বিখ্যাত আইনজীবী ও বিদ্বজ্জন। তাঁর মায়ের নাম ফুলকুমারী। গোপালচন্দ্র দে-রচিত আত্মজীবনী নানা কারণে তাঁর সময়ের ঐতিহাসিক দলিল। ফরিদপুর জেলা গঠনের ইতিহাস সে-গ্রন্থে বিস্তৃত আকারে স্থান পেয়েছে।

ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে ঐতিহাসিক নামে পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, যে-পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার। এছাড়া ডা. কোটনিস মেমোরিয়াল কমিটির পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি ছিলেন তিনি। এরই সূত্র ধরে তাঁর চীনে ভারতীয় মেডিক্যাল মিশন গ্রন্থ রচনা। বিভিন্ন সময়ে তাঁকে ‘রোড রিনেইমিং কমিটি’ ও ‘হেরিটেজ কমিটি’র দায়িত্বও সামলাতে হয়েছে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর গান্ধিয়ান স্টাডিজে’র অ্যাডভাইজরি কমিটির দায়িত্ব পালন করেছেন, ছিলেন ক্যালকাটা হিস্টরিক্যাল সোসাইিটি, ইন্ডিয়ান হিস্টরিক্যাল স্টাডিজ, ইন্ডিয়ান হিস্টরিক্যাল কংগ্রেসের  সঙ্গেও যুক্ত।

ড. অমলেন্দু দে বরাবর মার্কসীয় আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর স্ত্রী নাসিমা বানু শের-এ-বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সম্পর্কে দৌহিত্রী। নাসিমা নিজেও অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। অবসরপ্রাপ্ত বিদ্যালয়-শিক্ষিকা। তাঁদের পুত্র ড. অমিতকুমার দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক। কন্যা তাপ্তীও অধ্যাপিকা। এক পারিবারিক সারস্বত পরিমন্ডল ছিল ড. অমলেন্দু দের, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দেশি-বিদেশি স্বনামধন্য ঐতিহাসিকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ও নিজের অসংখ্য কৃতী ছাত্রের সঙ্গে মেধাবী সহবাস। আর ছিল নিজের ও পুত্র-কন্যাদের ইসলাম, বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও পরম্পরা নিয়ে সচেতন করে তোলার প্রয়াস। এজন্যেই পুত্র অমিত অক্সফোর্ডে গবেষণা করেন এদেশে ইসলামের যথার্থ অবদান নিয়ে, আর তাপ্তীর গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে বাংলার মুসলিম-মানসে শিখা পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন। বিয়ের জন্য ধর্মান্তর গ্রহণ করেননি ড. দে। তাঁদের বিয়ে হয় Inter-religion Marriage Act অনুযায়ী। রক্ষণশীলতার বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় ছিল না তাঁর জীবনাচরণে, তাই মৃত্যুর পরে দেহদানের অঙ্গীকার করে গিয়েছিলেন।

অর্থনীতিতে অনার্স পাশ করে ইতিহাসে এম এ করেন তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যাদবপুর থেকে ডি-লিট পান। তাঁর স্বরচিত গ্রন্থের তালিকা বিপুল আর সম্পাদিত বইয়ের তালিকা বিপুলতর। এছাড়া অসংখ্য বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন তিনি। তাঁর বিশেষ অধ্যয়ন-অধ্যাপনা ও গ্রন্থ রচনার বিষয় ছিল আধুনিক ভারত-সম্পর্কিত। আর তাঁর প্রধান আলোকপাত হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে। তাছাড়া আধুনিক ভারত ইতিহাসের বহু অনালোচিত দিক সম্পর্কে, যেমন – খাকসার আন্দোলনের ইতিহাস, বা পাকিস্তান প্রস্তাব ও ফজলুল হক।             এ-বইটির আগেই তাঁর সেই তাৎপর্যবাহী বইটি প্রকাশিত হয়েছিল, বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। যে-বইটি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু-মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্ক চিনতে শেখায়, এই দুই সম্প্রদায়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও তারই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় ভারতের মুক্তি আন্দোলন ও বিশেষ করে বাংলায় ব্রিটিশবিরোধিতা ও আনুকূল্যের বিন্যাস ও বিরোধাভাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার ফলে।

এছাড়া তাঁর গ্রন্থের মধ্যে যেগুলোর নাম উল্লেখ না করলেই নয় সেগুলো হলো – ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অনুশীলন সমিতির ইতিহাস, স্বাধীন বঙ্গভূমি গঠনের পরিকল্পনা, প্রয়াস ও পরিণতি, মাও চীনে আছেন প্রভৃতি। খাকসার আন্দোলনের ওপর তাঁর কৃশ বইটি সম্প্রতি বিপুলায়তন হয়ে দুখন্ডে প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে, History of Khaksar Movement নাম দিয়ে। অতিসম্প্রতি সিরাজউদ্দৌলার বংশধর নিয়ে লেখা তাঁর গ্রন্থটি একদিকে যেমন বহুল আলোচিত হয়েছে, তেমনি বিতর্কিতও হয়ে চলেছে।

ইতিহাসবিদরা ভারতে অনেকটাই ব্রাত্য। কোনো বড় পুরস্কার তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট নেই। যদুনাথ সরকারকে যখন ‘ভারতরত্ন’ দেওয়ার প্রস্তাব তোলেন ভারতের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবির, তাঁর সে-প্রস্তাবে জল ঢেলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু ‘পদ্মভূষণ’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদুনাথ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সে-খেতাব।

ইতিহাসকে বলা হয় ‘Science of Man in time’. একটি বিশেষ দেশের বিশেষ সময়ের মানুষের পরিচয় বহন করে ইতিহাস। ড. দে এই সময়কেই তাঁর নিজস্ব পদ্ধতি ও মেধায় সার্থকভাবে ধরার প্রয়াসে ব্রতী ছিলেন।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে-পরিবেশের মধ্যে ড. অমলেন্দু দে অধ্যাপনা করতেন, সে-পরিবেশ এবং তার সহ-অধ্যাপকদের নিয়ে কিছু লেখা যাক। ছয়ের দশক থেকে আটের দশক পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণযুগ, যখন ত্রিগুণা সেনের মতো উপাচার্য (পরবর্তীকালে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী), বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অজিত দত্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, শঙ্খ ঘোষ, নবনীতা দেব সেন, সুকুমারী ভট্টাচার্য, রমারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, দেবীপদ ভট্টাচার্যের মতো এবং আরো বহু গুণীজন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের বিভিন্ন অনুষদে অধ্যাপক হিসেবে তাঁদের নিজ-নিজ বিভা ছড়াচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপকবৃন্দও ছিলেন পান্ডিত্যে, গবেষণায়, অধ্যাপনার প্রাখর্য ও বৈদগ্ধ্যে প্রত্যেকেই স্বনামধন্য। জগদীশ নারায়ণ সরকার, যিনি স্যার যদুনাথ সরকারের ছাত্র এবং বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ একদিকে, অন্যদিকে প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত। ছিলেন বিমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নিমাইসাধন বসু, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস-বিশেষজ্ঞ ড. শচীন্দ্রনাথ মাইতি, ড. বেলা লাহিড়ী প্রমুখ। ছয়ের দশকের শেষের দিকে সেখানকার ইতিহাস বিভাগে যোগ দিলেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল ছাত্র, ছাবিবশ বছরের চিত্তব্রত পালিত। এবং অচিরেই সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা-অন্তে ড. ইন্দ্রাণী রায়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ চমক সৃষ্টি করেছিল ড. সুশোভন সরকার ও তাঁরই বিদুষী কন্যা শিপ্রা সরকার যুগপৎ যখন সেখানে অধ্যাপক পদে আসীন। প্রথমে এঁদের ছাত্রী, পরে মারাঠা ইতিহাস নিয়ে গবেষণাকারী ড. পাপিয়া চক্রবর্তীও এ-সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছেন, যেমন যোগ দিয়েছিলেন প্রাচীন ভারত-গবেষক ড. শুক্লা দাস। পড়াচ্ছেন প্রেসিডেন্সি-যাদবপুরের আর এক প্রোজ্জ্বল প্রাক্তনী ড. অনুরাধা চন্দ। তাঁর বহুবিধ গবেষণাকর্মের মধ্যে সাম্প্রতিককালে সিলেটি নাগরী লিপি নিয়ে তাঁর কাজ বিদ্বজ্জন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। ছিলেন প্রাঞ্জল ভট্টাচার্যের মতো অধ্যাপক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে গ্রেট ব্রিটেনের সাংবিধানিক ইতিহাসবিষয়ক পাঠদানে যিনি ছিলেন একক ও অদ্বিতীয়। বিমলকান্তি ঘোষ, যিনি তাঁর সমগ্র অধ্যাপনা জীবনে সবসময়ে বরিশালের বাঙলভাষা ছাড়া প্রমিত বাংলার ধার ধারেননি, এমন তুমুল জনপ্রিয় ও খাদ্যরসিক অধ্যাপক। (প্রতি বছর ইতিহাস বিভাগের মৌখিক পরীক্ষার দিন ছাত্রছাত্রীরা শঙ্কিতচিত্তে করিডোরে পায়চারিরত। বহিরাগত পরীক্ষক, কখনো ত্রিপুরারি চক্রবর্তী, কখনো নিশীথরঞ্জন রায় কী প্রশ্ন শুধোবেন কোন পেপার থেকে, এই ভয়ে তটস্থ ছাত্রছাত্রীদের তিনি ওইদিনটিতে বার্ষিক ও রসিকতাপূর্ণ উপদেশদানের সুযোগটি হাতছাড়া করতেন না : শোনো, মুখ কাঁচুমাচু ক্যান? গোবোদ পড়ছে নাকি? Viva নিয়া অতো ভাইবা লাভ নাই।) বস্ত্তত পিজি বিল্ডিংয়ের তিনতলায় ইতিহাস বিভাগটি একদিকে প্রজ্ঞার বৈভবে, অন্যদিকে অধ্যাপকদের আন্তরিকতাময় করস্পর্শে নবনালন্দারূপেই বিবেচিত হওয়ার যোগ্য ছিল। প্রায় সকলেই হয় অক্সফোর্ড বা হার্ভার্ড বা অন্য কোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। একমাত্র ব্যতিক্রম শিপ্রা সরকার। বিদেশ যাননি, বিয়ে করেননি, গবেষণা করেননি, কিন্তু পনেরো   বছর বয়সেই রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে খোদ রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখতেন তার্কিক মেজাজে, এবং কী ইউরোপের নবজাগরণ, কী প্লেটো-অ্যারিস্টটল থেকে কাল মার্কস পর্যন্ত মনীষীদের রাজনৈতিক চিন্তার ওপরে তাঁর মতো করে পড়ানো, না, যাদবপুর তো যাদবপুর, গোটা দেশেই আর কেউ ছিলেন কি না সন্দেহ। ড. সুশোভন সরকারের ছাত্র, পরবর্তীকালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তপন রায় চৌধুরী তাঁর শিক্ষককে শুধিয়েছিলেন একবার, ড. সরকারের প্রায় পঞ্চাশ বছরের অধ্যাপনা জীবনে শ্রেষ্ঠ ছাত্ররূপে তিনি কাকে পেয়েছিলেন। ড. সরকারের নির্দ্বিধ উত্তরটি ছিল, নিজ কন্যা শিপ্রা। শিপ্রা সরকার কোনো গ্রন্থও লেখেননি, শেষ বয়সে বাঙালির সাম্যবাদী চিন্তা নামে একটি সংকলন গ্রন্থ সম্পাদনা করেছিলেন মাত্র, অনমিত্র দাশ-সহযোগে।

সব মিলিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সে-সময়কে চার্লস ডিকেনসের ভাষা ধার করে বলা যায়, ‘It was the best of times’। হ্যাঁ, সময়টা আকস্মিক ও সাময়িকভাবে ‘It was the worst of times’ও হয়ে উঠেছিল, নকশালপন্থীদের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ছুরিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলেন যেদিন।

এই পরিবেশে ১৯৬২-তে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে এলেন ড. অমলেন্দু দে। এর আগে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে  দু-দুটি কলেজে পড়ানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে মাত্রাগতভাবে আলাদা। উপরন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের আছে আরো এক বাড়তি দায়িত্ব, – ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা কাজ তত্ত্বাবধান, আর সে গবেষণা তো বিচিত্র বিষয়ে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আরো একটি বাড়তি বিবেচনাযোগ্য বিষয় ছিল পরীক্ষার খাতা দেখা। যেহেতু প্রতিটি খাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিয়ে দেখানো হতো, তাই স্বজনপোষণের উপায় থাকত না যেমন, তেমনি বাইরের অধ্যাপকের হাতে খাতাগুলোর যে-মূল্যায়ন, তার সঙ্গে সমতারক্ষারও প্রয়াস অবচেতনে রাখতে  হতো। দুই পরীক্ষকের কেউই খাতায় নম্বর দিচ্ছেন না, নম্বর লিখে রাখছেন আলাদা করে, আর তা জমা দিচ্ছেন বিভাগীয় প্রধানের হাতে। বহিরাগত পরীক্ষকের কাছে এক ধরনের পরীক্ষাও কিন্তু দিতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে, কেননা ছাত্রছাত্রীদের উত্তরপত্রের মধ্যেই নিহিত থাকত তাঁর অধ্যাপনার প্রকৃত মান।

সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত (কদাচিৎ অন্য রঙের পাঞ্জাবিও পরতেন) ধোপদুরস্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন তিনি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে আধুনিক ভারতের অর্থনীতির ইতিহাস ছিল তাঁর পড়ানোর বিষয়। পাঠদান করতেন ইংরেজিতে, আর অসম্ভব সহজ ইংরেজি বলার দুর্লভ গুণ ছিল তাঁর, যেজন্য ছাত্রছাত্রীদের বুঝতে তিলমাত্র অসুবিধা হতো না। যেহেতু ঘোষিতভাবেই মার্কসবাদী ছিলেন তিনি, স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ইতিহাস দর্শন গড়ে উঠেছিল মার্কসের প্রতিচ্ছায়ায়। একইসঙ্গে জাতীয়তাবাদের অনুষঙ্গও যোগ হয়েছিল তাতে। প্রতিটি অধ্যায়ের ওপর নিবিড় পাঠদান, টিউটোরিয়াল নেওয়া, প্রয়োজনে ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে আহবান করে পাঠ্যবিষয়কে আরো ঋজু, প্রাণবন্ত আর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বোঝানো (বাড়িতে তিনি বাংলাতেই বুঝিয়ে দিতেন), প্রকৃত শিক্ষাগুরুর এ-সমস্ত চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য তো তাঁর ছিলই, এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান বাতলে দেওয়া, তাদের অভিভাবক এবং পরিবারের লোকজনের খোঁজখবর নেওয়া, বিপদে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়ানো। ছাত্রছাত্রী যে যখনই তাঁর বাড়ি যাক, আপ্যায়িত না হয়ে ফিরত না। কত ছাত্রছাত্রীকেই যে সাহায্য করেছেন অধ্যাপনা পেতে। দেশ-বিদেশে আজ তাঁর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী অধ্যাপনায়, গ্রন্থরচনায়, গবেষণায় নিয়োজিত। সে-অর্থে তিনি এক মহীরুহ।

বর্তমান নিবন্ধকারের সৌভাগ্য হয়েছিল অমলেন্দু দের কাছে ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ৭১-৭২ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর  স্তরে তাঁর ছাত্র হওয়ার। সে-সময় থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত সান্নিধ্য পাওয়ার সুবাদে তাঁর মধ্যে একজন নিয়ত সারস্বত সাধক এবং একই সঙ্গে মহৎ মানুষের পরিচয় পেয়েছিলাম।

প্রাথমিকভাবে তিনি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আমি বি এ প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায়, যদিও তিনি আমাদের ক্লাস নিতেন থার্ড ইয়ারে। এক হাতে এক ফোলিও ব্যাগ, অন্য হাতে সাবেক কালের দীর্ঘ ছাতা, তিনি এভাবে কর্মস্থলে আসতেন। যেহেতু যে-বাসে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম, সেই বাসেই তিনিও উঠতেন, তাই প্রায়শই বাসে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। সেখানেই আমার নামধাম, কোথায় থাকি, বাড়িঘরের খবরাখবর জানতে চাইতেন। যাওয়ার পথে আমি আগে বাসে উঠতাম আর ওঁর স্টপেজ বাঘাযতীনে অর্থাৎ অনেক পরে, তাই আমার বাসের টিকিট কাটার সুযোগ পেতেন না। কিন্তু ফিরতাম যখন, একসঙ্গে একই স্টপেজ থেকে ওঠা হতো যেহেতু, অবধারিতভাবে আমার তো বটেই, আমার অন্য দু-একজন সহপাঠীর টিকিটও উনি করতেন। তাঁর নির্দিষ্ট স্টপেজটিতে নামার আগে তিনি প্রত্যেকবারই এই সাবধানবাক্য উচ্চারণ করতে ভুলতেন না, ‘সাবধানে বাড়ি যেয়ো।’

প্রত্যেক বছর বিভাগীয় পিকনিক হতো আমাদের, কখনো চন্দননগর, কখনো আদি সপ্তগ্রাম, কখনোবা ক্যানিংয়ে। সাধারণত ট্রেনে করে যাওয়া হতো, আর ট্রেনের কামরা তিনি মাতিয়ে রাখতেন সিলেবাসবহির্ভূত ইতিহাসের গল্পে। তাঁর কাছেই প্রথম শুনি, সেই ৬৮-৬৯-এ, পূর্ববঙ্গে বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের গল্প। সে-সময় বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে দুজন মানুষের যাতায়াত ছিল, দেবীপদ ভট্টাচার্য আর অমলেন্দু দে-র। তাঁরা ঢাকা থেকে যেসব বইপত্র আনতেন, সেসব অমূল্য গ্রন্থের প্রসাদ পেতাম। দেবীবাবু তাঁর সংগৃহীত সূর্য দীঘল বাড়ী বইটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে দান করায় উপন্যাসটি পাঠের দুর্লভ সুযোগ হয়। অমলেন্দু দের মুখে ঢাকা, ফরিদপুর, তাঁর নিজ বাসভূমি মাদারীপুরের গল্প শুনি। ড. সালাহউদ্দীনের নাম ও লেখার সঙ্গে পরিচয় ঘটে ওঁরই মাধ্যমে। তখন আমি ওঁর সরাসরি ছাত্র।

ওঁর পড়ানো ছিল নিশিছদ্র কোনো অধ্যায় না পড়িয়ে বা দায়সারাভাবে পড়িয়ে তিনি শান্তি পেতেন না। কোনোদিন ছুটি নিতে দেখিনি তাঁকে, বা ক্লাসে দেরি করে আসতে। কেন জানি না, এ-সময়ে তিনি আমাকে ওঁর বাসায় যেতে বলেন, তখন বাঘাযতীনের অজন্তা পল্লিতে এক ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। সে-বাড়ির ম্যাজেনাইন ফ্লোরে পুস্তকসমুদ্রের মধ্যে বসে আছেন তিনি। বিস্ময়কর তাঁর বইসংগ্রহ। ইতিহাস পড়তে কেমন লাগছে, কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হচ্ছে কি না, এসব কথাবার্তা চলছে একদিকে, অন্যদিকে পরিচারিকা এসে আমাদের জন্য চা আর আমার জন্য মিষ্টি দিয়ে গেল। আমি অভিভূত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সুগন্ধি চা খেতেন স্যার। পরে তো বহুবার গিয়ে অপেক্ষা করতাম কতক্ষণে চা আসবে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ে আমাদের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন ড. প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত। তিনি আমাদের মতো অর্বাচীন বালকদেরও ‘আপনি’ সম্বোধন করতেন, বলতেন, এটা বয়সের সম্মান। আর অমলেন্দু দের বাড়িতে এই চা-মিষ্টির আতিথ্য, হ্যাঁ, এ-ও বিরল সম্মান বলেই মনে হয়েছিল।

প্রণাম করে বাড়ি রওনা দেব, স্যার আবার আসতে বলে তাঁর লেখা খাকসার আন্দোলনের ইতিহাস বইটি উপহার দিলেন আমাকে। যেন সেই মুহূর্তে প্রকৃত স্নাতক হলাম। বইটি আজো আছে আমার কাছে। বুঝলাম, স্যার দীপিত করে দিলেন আমাকে।

তাঁর বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ বইটির প্রেস কপি করার জন্য আদিষ্ট হয়েছিলাম। সেই সূত্রে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, ব্যক্তিগত বহু কথা শুনতাম তাঁর কাছে গিয়ে। এ-পর্যন্ত অনালোকিত বহু ইতিহাসের দিক স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, বাঙালি মুসলমানদের  আর্থ-সামাজিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ হয়। বস্ত্তত গ্রন্থটি একান্ত নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা। হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে নিরাবেগ তথ্যের আনুকূল্য ও প্রাচুর্যের সমারোহে দিশারী ভূমিকায় আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দর্শন-প্রেক্ষিতকে অভিনব দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করতে শিখিয়েছে এ-বই।

বইটির বাংলাদেশ-সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে আমার একটি ভূমিকা রয়েছে। বইটির বহু সংস্করণ হলেও বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে পাওয়া যাচ্ছিল না। অথচ কলকাতার কোনো প্রকাশক বইটি নতুন করে প্রকাশের ব্যাপারে উৎসাহ দেখান না বলে স্যার বহুবার আমার কাছে আক্ষেপ করতেন। ২০১০-এ ঢাকার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা জাতীয় সাহিত্য প্রকাশের কর্ণধার আমার অনুজপ্রতিম কমলকান্তি দাশের কাছে বইটি প্রকাশের অনুরোধ জানালে কমল আগ্রহ দেখায়। তখন কলকাতা বইমেলা উপলক্ষে সে কলকাতায়।  পরদিনই স্যারের বাড়ি গিয়ে তাঁর কাছ থেকে অনুমতি আদায় করা গেল। ২০১৩-য় ঢাকা বইমেলায় প্রকাশিত হয় বইটি। এরপরে বইটির কলকাতা-সংস্করণ বেরোয় আবার।

অধুনা-বিস্মৃত কবি মোতাহেরা বানুর কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করার সময়েও স্যার আমাকে তাঁর সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহে ব্রতী করেন।

সবচেয়ে মুগ্ধ হয়েছি আমার দুঃখের দিনে বারে বারে স্যারকে পাশে পেয়ে। ’৯৬-তে আমার স্ত্রী প্রয়াত হলে তিনি আমার বাড়ি এলেন আমাকে সান্ত্বনা দিতে। স্মরণসভায় আবার এলেন পুষ্পস্তবক হাতে। আমার বড় ভাইয়ের মৃত্যুতেও এসেছিলেন। এসব মানবিকতার উষ্ণ অভিজ্ঞায় তাঁকে মহৎ বলে জেনেছি। আবার, এই কয়েক বছর আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষাগুরু আমার, প্রাঞ্জল ভট্টাচার্য প্রয়াত হলে তাঁর মরদেহ আনা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর শবানুগমন করব শ্মশান পর্যন্ত, স্যার বাধা দিলেন। বললেন, খুব গরম আজ, কষ্ট হবে তোমার। নিজে কিন্তু গিয়েছিলেন।

এরকম ব্যক্তিগত স্মৃতি, তাঁর মহানুভবতার বহু উজ্জ্বল পরিচয় আমার জীবনকে ঋদ্ধ করেছে। তাঁর নতুন বাড়ি হয়েছে আগেকার ভাড়াবাড়ির ঠিক পাশেই ফাঁকা জমিটিতে। একদিন গিয়ে দেখি, শ্যামলদা, বিখ্যাত কথাকার, তাঁর ঘরে বসে। সে-সময় শ্যামলদা শাহজাদা দারাশুকো উপন্যাসটি লিখছিলেন, যা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল সাপ্তাহিক বর্তমান পত্রিকায়। দুজনের আলোচনার মধ্যে পড়ে সেদিন যে কী অসামান্য অভিজ্ঞতা হচ্ছিল! ঔরংজীবের চিঠিপত্র নিয়ে স্যার আলোচনা করছিলেন, মুঘল যুগের শেষ পর্বের বেদনাবিধুর ইতিহাসের গলিপথ ধরে নিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ শুধোলেন, ‘মলয়, সম্রাট নেকুশিয়ার কে ছিলেন জানো? ভারতসম্রাট, মুঘল সাম্রাজ্যের, তিন মাসের, দৈনিক বাজার করার পয়সাও ছিল না, হাঃ হাঃ হাঃ।’

হ্যাঁ, অমলিন হাসি দিয়ে চেনা যেত স্যারকে, সঙ্গে চশমার ভেতর দিয়ে হাস্যরত অবস্থায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠত তাঁর চোখদুটো, তাই দিয়েও। একাধিক বিষয়ে মতবিরোধ হয়েছে স্যারের সঙ্গে, বিশেষ করে উনি যখন শ্যামাপ্রসাদকে অসাম্প্রদায়িক বলতেন, আর আমি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর উদাহরণ দিয়ে শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতির সীমাবদ্ধতা দেখাতে চাইতাম তখন।

উপমহাদেশে তাঁর গ্রন্থসমূহ বহু ঐতিহাসিকেরই সম্ভ্রম আদায় করেছে। বস্ত্তত অমলেশ ত্রিপাঠী, মুশিরুল হাসান, ইরফান হাবিব, রোমিলা থাপার, আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ, শিরিন মুসাভি, অনিরুদ্ধ রায় বা সালাহউদ্দীন আহমদের মতো মৌলিক অবদান রয়েছে তাঁর। ঐতিহাসিক নেবুর ঐতিহাসিকদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন এই বলে, ‘We must be able to say in the sight of God, I have not knowingly, nor without earnest in investigation, written anything wrong.’ ড. দে ছিলেন এ-বাণীর একান্ত অনুসারী। সেইসঙ্গে উনিশ শতক থেকে ইতিহাসে যে Positivism-এর দৃষ্টিকোণ তৈরি হয়েছে মমসেন, মেটল্যান্ড প্রমুখ ইতিহাসবিদের হাত ধরে, ড. দের ইতিহাস-অনুসন্ধান তাকে সদর্থে প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং তার সমান্তরালভাবে ইতিহাসের মধ্যে সাধারণ নিয়মের সন্ধান করা পজিটিভিজমের চারিত্র্য-লক্ষণ। সেদিক থেকে বিচার করলে, ‘Strict presentation of facts’-ই ইতিহাসে কাম্য; Bury এ-প্রসঙ্গে তো বলেই গিয়েছেন, ‘History is a science, no less and no more.’ অতএব ‘সে-ই সত্য যা রচিবে তুমি’ সাহিত্যের শর্তও সত্য, ইতিহাসের নয়। কেননা ‘Truth is more interesting and beautiful than the romance,’ র‌্যাঙ্কের এ-বাক্যটি ঐতিহাসিক মাত্রেরই শিরোধার্য। ড. দে তাঁদের ব্যতিক্রম নন।