কতদূর? আর কতদূর?

লেখক: চিত্রা মুখোপাধ্যায়

ঐশী আলমারি খুলল। বিয়ের নীল বেনারসিটার দিকে চোখ গেল। না। বিয়ের কোনো স্মৃতিই সঙ্গে নিয়ে লাভ নেই। ২৩ বছরের খুঁটিনাটি স্মৃতি যদি বইবেই তবে আর মুক্তি কিসে? অবশ্য – ঐশী নিজেই জানে না মুক্তি কাকে বলে। এই ২৩ বছরের মধ্যে আঠারো বছর ধরেই এই দিনটার অপেক্ষায় থেকেছে ঐশী। মুন্নির তখন পাঁচ বছর। তখন থেকেই ঐশী মুক্তি খুঁজছে। অবশেষে নভেম্বর মাসে মুন্নির বিয়ে দিয়ে অষ্টমঙ্গলা, প্রথম জামাইষষ্ঠী সব মিটিয়ে মুক্তির ব্যবস্থা করেছে ঐশী। চাকরি আর দুবছর আছে। এই দুটা বছর একটু অন্যরকম করে বাঁচবে ঐশী। একা এবং একা। শ্রীমন্তকে কিছুই বলেনি ঐশী। বলবে কেন নতুন করে? এ তো অনেকদিন ধরেই বলে আসছে ঐশী। কত যন্ত্রণা, কত চাপাকান্নার একটাই শান্তি ছিল – এই মুক্তি। কতবার তো শ্রীমন্তকে বলেছে একটু সংসারের কথা ভাবতে, ঐশী আর পারছে না। ভাবেনি শ্রীমন্ত, শ্রীমন্ত সাহায্যের হাতটুকুও বাড়িয়ে দেয়নি। আসলে শ্রীমন্তের নিজের বাড়ি, নিজের পছন্দের ঘর, নিজের পছন্দের খাবার, নিরুত্তাপ জীবন – এসব নিয়ে দিব্যি কেটেছে জীবন। সেখানে ঐশীকে সবকিছু মানিয়ে নিয়েই তো চলতে হয়েছে। আশেপাশে বাড়ির বউরা যখন ঘরে নিজের পছন্দের পর্দা লাগিয়েছে, নিজের ভালোলাগা মেন্যু রান্না করেছে, ঘরের আসবাব বদলেছে, ঐশীকে তখনো বাড়ির ঐতিহ্য মেনে পুরনো আসবাব নিয়ে চালাতে হয়েছে। না, শ্বশুরবাড়িতে পরাধীনতা তার কিছু ছিল না। কিন্তু পরাধীনতার বিপরীতে সবসময় স্বাধীনতাও হয় না, অথচ ঐশীর তো বাপের বাড়িও ছিল না সে-অর্থে। গৌহাটিতে বাপের বাড়ি, মেয়ের স্কুল, নাচ এসব ফেলে ছুটে যেতে পারত না বেশি। তার ওপর বাবার মৃত্যুর পর ঐশী আবিষ্কার করল, ও বাড়ির সবাই কেমন যেন নিষ্প্রাণ অথচ হিসেবি হয়ে উঠেছে। বাবার মৃত্যুর এক মাসের মধ্যেই আলোচনা শুরু হলো বাড়ি নিয়ে। সবাই বলল, ঐশীর তো বিশাল শ্বশুরবাড়ি। ওদের অগাধ পয়সা। গৌহাটির বাড়ি নিয়ে ওর কী হবে? বড়দা বলল – ‘তবু। ওর শেয়ার তো আছে। ও আমাদের ছোট বোন।’

মা বললেন, ‘মেয়েদের বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িটাই নিজের বাড়ি হয়। তোরা বরং ওর মেয়ের নামে ঘরের সমান মূল্যে ফিক্সড ডিপোজিট করে দিস।’ সবাই বলল – উত্তম প্রস্তাব। এতে ঐশী না করবে না। মেয়ের ভবিষ্যতের চেয়ে বেশি তো মায়ের কাছে কিছুই হতে পারে না। সত্যিই তাই, মেয়ের ফিক্সড ডিপোজিটের প্রস্তাবটা ঐশী ফেলতে পারেনি। কিন্তু যেদিন গৌহাটি গিয়ে ঐশী ওর পড়ার টেবিল, ঘরের বাঁধানো ছবি, তানপুরা, কমিক্সের বই, ওর ড্রেসিং টেবিল সব বারান্দায় জড়ো করা দেখল তখন ওর বুকের ভেতরটা কেঁদে উঠল ডুকরে। ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখল দরজাটা ভেতর থেকে লক করা। ধাক্কা দিতে বউদি খুলে বলল, ‘আয়, আয়, এসি লাগিয়েছি তো, দ্যাখ তোর ঘরটা কেমন চেঞ্জ করে ফেলেছি, তুই আর চিনতেই পারবি না। আর ওইপাশের ঘরটাকে গেস্টরুম করে সাজিয়েছি। তোরা এলে ওখানেই থাকতে পারবি। ঘরটা বেশ ঠান্ডাও।’ চোখের সামনে ঐশী গৌহাটির গেস্ট হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে বুক শক্ত করল ঐশী। যা তার নয়, তা নিয়ে কিসের দুঃখ, ওর ঘর সেটাই যেখানে ওর মেয়ে আর স্বামী থাকে। সেদিন থেকেই ওদের ভাগে পাওয়া দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরটারই বড় যত্ন করতে লাগল। ওই ঘরে ওর বিয়ের প্রথম রাত, মুন্নির প্রথম আদর, মুন্নির প্রথম কথা বলা – সব; এর মায়া বড় কঠিন মায়া। স্কুলে বেরোবার আগে বিছানাটা টানটান করে গুছিয়ে দিত, ঘরের ছোট্ট ফ্লাওয়ার ভাসে সন্ধ্যাবেলা ফুল এনে লাগাত; কিন্তু মুন্নি যতই বড় হতে লাগল ওই ছোট্ট ঘরটা ততই ছোট হতে লাগল, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগল ছোট্ট ঘরটার, কিন্তু শ্রীমন্ত তাতেই খুশি, ঘর বাড়াবার প্রয়োজন পড়ে না শ্রীমন্তর। শ্রীমন্তর ছোট ঘরে কষ্ট হলে সারা বাড়িটাই তো তার। কিন্তু ঐশীর সে-স্বাধীনতা নেই। শ্রীমন্তর জীবন আড্ডা, গল্প, মজা করেই কেটে গেল। মেয়ের জন্য কোনো শখের জিনিস থেকে শুরু করে ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সবকিছুর দায়িত্বই ক্রমশ ঐশীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে শ্রীমন্ত ঝাড়া হাত-পা হয়ে বসে থাকত। শ্রীমন্তর এমআরের চাকরিতেও ধস নামল, অন্য কোনো চেষ্টাও করল না শ্রীমন্ত। ঐশী স্কুল থেকে ক্লান্ত পায়ে ফেরার পথে রোজই ভাবত, কালকের দিনটা বুঝি বদলাবে, একটু খোলামেলা নিশ্বাস নেওয়া ঘর, একটা সাজানো-গোছানো বারান্দা, তাতে সিল্কের পর্দার আড়াল

থেকে বিকেলের মিষ্টি রোদ্দুর উঁকি দেবে। একটা সুন্দর গোছানো কিচেন, তাতে মনের মতো মেন্যু রান্না করবে। এ-বাড়ির দমবন্ধ করা পুরনো কিচেনে রান্না করতে পুরো গলদঘর্ম অবস্থা হয়। ঐশী এগুলোকে একটু ভালো করার চেষ্টা যে করেনি তা নয়, তবে বাড়ি থেকে বদল না করার স্থির নির্দেশ এসেছে। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখেছে শ্রীমন্ত আড্ডা দিতে গেছে, মুন্নি পড়াশোনা না করে বাড়িময় খেলে বেড়াচ্ছে, সব চেনা ছবি। কিছুই বদল হওয়ার নয়। ইতিমধ্যে ঐশীর হাতে পড়ল আশাপূর্ণা দেবী, সুচিত্রা ভট্টাচার্য। এঁদের লেখা পড়ে আর ভাবে, হয়তোবা ঐশীর মতো স্বপ্ন পূরণ না হওয়া মেয়ে এই ভারতবর্ষের বুকে অনেক আছে। মুক্তি দানা বাঁধতে থাকে বুকের ভেতর; কিন্তু পাশাপাশি ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকে ঐশী। কাজে মন বসে না, শ্রীমন্তকে দেখলে আরো হতাশ লাগে। অ্যাম্বিশনলেস মানুষকে ঐশী বরাবর ঘৃণা করতো। বাবা বলতেন, ‘মৃত্যুর আগের সময় পর্যন্ত একটা চ্যালেঞ্জ থাকা উচিত।’ সত্যি, বাবা যেদিন মারা গেলেন, সেদিনও বাবা রক্তদান শিবিরে কাজ করেছেন। বাবার পাশে শ্রীমন্তকে দাঁড় করাতে লজ্জা লাগে ঐশীর। কী করে এ-মানুষটার প্রেমে পড়েছিল কে জানে।

ট্রলি ব্যাগটা গোছানো প্রায় কমপিস্নট; কিন্তু এখনো কিছুই নেওয়া হয়নি ঐশীর। তবে জুন মাস। এটুকুতেই হাঁপিয়ে উঠল। প্রেসার, সুগার দুটোই আছে তো। ঘামও খুব বেশি হয়। নাইটির হাতায় গলার ঘামটা একটু মুছে খাটে ফ্যানের তলায় বসল, আবার কী মনে করে গন্ধ তেল, সাবান আর শ্যাম্পুর বোতলটা নিয়ে এলো। না। পুরো বোতলটা নিয়ে গেলে ওই লোকটা তো আবার শ্যাম্পুই মাখবে না। বোতলটা আবার বাথরুমে রেখে এলো। এই বাথরুমটা এখন শুধু ওরাই ইউজ করে। আগে বাড়ির অন্যরাও করত। মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ।

– হ্যালো?

– মা, মুন্নি বলছি। নাম্বারটা সেভ করোনি? এটা অনীশের নাম্বার!

– ও হ্যাঁ হ্যাঁ। অনীশের নামই তো শো করছে।

– মা, কী আর বলবো? অনীশের মা-টা না ডিসগাস্টিং।

– কী? এসব কী কথা? কী হয়েছে?

– যতটা সুবিধার ভেবেছিলাম, মোটেই তা না। দিনরাত প্যাটর প্যাটর করেই চলেছে। বিয়ের পরপর ওনার কী কী কষ্ট করতে হয়েছে তার ফিরিস্তি শুনতে শুনতে মাথা খারাপ।

– তাতে তোমার কী অসুবিধা?

– বুঝলে না? ইনডিরেক্টলি আমায় খোটা দিচ্ছে। অনীশ আমার একটু কেয়ার করে বলেই যত হিংসা।

– শোন, ওনাদের লাইফাটা হয়তো কষ্টেরই ছিল।

– তুমি আর সাপোর্ট করো না তো মা। আমি অনীশকে ক্লিয়ারলি বলে দিয়েছি – এইসব নাকিকান্না আমি শুনতে পারব না। অফিস থেকে ফিরে এইসব কেত্তন আমার ভালো লাগে না। অনীশ ফ্ল্যাট দেখছে।

– সে কী রে? এক্ষুনি?

– না তো কী? তোমার মতো? সারাজীবন দশ বাই দশ? আর দিনরাত হা-হুতাশ? মা, বাবা একটু ডিফারেন্ট ছিল, তাই তুমি পারোনি। অনীশ ইজ স্মার্ট অ্যান্ড কেয়ারিং।

– মুন্নি, অনীশের বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়, ওর মায়ের যে তোরা ছাড়া কেউ নেই!

– পিস্নজ মা। আমি পারবো না। পেটি সেন্টিমেন্ট দেখতে গেলে আমার নিজের জীবনটা চলবে না।

– শোন না মুন্নি, এক্ষুনি কিছু ভাবিস না। এই কদিনে কতটুকুই আর মানুষ চেনা যায় বল? তাছাড়া তোরা দুজনেই ওয়ার্কিং। একলা থাকাটা বেশ প্রোবলেমের হবে।

– কিছু প্রোবলেম নয় মা। তেমন হলে তোমাদের কাছেই ফ্ল্যাট দেখব। আচ্ছা রাখি। এবার বেরোতে হবে।

ঐশী কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে গেল ওপার থেকে। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে পাশে রাখল। কত ডেসপারেট মুন্নি। শাশুড়িকে ছ-মাসও সহ্য করতে পারল না। হয়ত ঠিকই ভাবছে। অনীশও ঠিক ভাবছে। সে-ই শুধু সারাজীবন দিন বদলানোর স্বপ্ন দেখে এসেছে। বদলাতে কিছু পারেনি। যাক। এসব কথা আর ভাবছে কেন ঐশী? কিন্তু মুন্নিকে যে আসল কথাটাই বলা হলো না। বলা হলো না যে, সেও কত ডেসপারেট হয়েছে। দশ বাই দশ ঘর সে ছাড়তে চলেছে, সব বাঁধন কেটে আকাশে ডানা মেলতে শিখেছে সেও। ও হো! ভুলেই গেছে ঐশী। গরম জামাকাপড়গুলো ঢোকানো হয়নি তো। খাটের ওপর উঠে আলমারির মাথা থেকে আরেকটা ট্রলিব্যাগ পাড়ল ঐশী। একা একাই। অন্যসময় হলে শ্রীমন্তকে রিকোয়েস্ট করে। যদিও শ্রীমন্ত একবার বলায় পেড়ে দেয় না। বারচারেক ভুলে যাওয়ার পর একসময় ওপরের জিনিস নিচে নামে বটে তবে আজ আর সে ধৈর্য নেই। বাসনকোসন সব নতুন করে কিনে নেবে। স্কুলের কাছে ঘরভাড়াও দেখা হয়ে গেছে। দক্ষিণখোলা একটা বারান্দা আছে তাতে। বাড়িওয়ালাকে বলেছে যে, বয়স হয়ে গেছে। দূরে জার্নি করতে পারছি না। তাই চাকরিজীবনের শেষ কটা বছর এখানেই কাটাব। সরকারি চাকরি করা নির্ঝঞ্ঝাট মহিলা ভাড়াটে পেয়ে বাড়িওয়ালাও বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন। বাড়ি দেখে আসার পর উচ্ছ্বাসে ঘুম না হওয়ার কথা ঐশীর। কিন্তু না। সারারাত একটা চাপাকান্না বুকের কাছে দলা পাকিয়ে রইল তার। কে জানে কেন? ভেবে দেখল, এটা ভালোবাসা নয়। এটা আসলে এক ধরনের ইনসিকিউরিটি ফিলিং। বয়স হয়েছে। একলা পা ফেলতে এখন ভয় করছে বোধহয়।

আলমারির লকারে শ্রীমন্তর আংটিটা তুলে রাখতে গিয়ে আরেকবার চোখের সামনে ধরল ঐশী। আংটির মাপ নিয়েছিল ঐশী নিজেই। এটা নিয়ে বড়বউদি কত কথা বলেছিল, ‘তোর লজ্জাও করে না বল? বাড়িতে কারো যে-ছেলেটাকে পছন্দ নয়, তুই কেমন ড্যাংড্যাং করে তাকে বিয়ে করতে চললি? আবার আংটির মাপ আনা হয়েছে ঢং করে।’ মা-বাবা-দাদা কেউ শ্রীমন্তকে পছন্দ করেনি। এমআরের চাকরিটা ওদের কারো কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ঐশী কপালের চুল সরিয়ে অহংকার করে বলেছিল, ‘দ্যাখো বউদি, তোমরা না হয় চাকরি দেখে প্রেমে পড়েছিলে, আমি পড়িনি। এতে লজ্জা বেশি পাওয়ার তো কোনো কারণ দেখি না। বরং আমার ভালোবাসাটা তোমাদের থেকে খাঁটি।’ হাসি পেল ঐশীর। কী ছেলেমানুষই না ছিল ঐশী। মুন্নি অনীশকে যেদিন প্রথম বাড়িতে নিয়ে এলো, রান্নাঘরে গিয়ে ঐশীকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলল – ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার – চলবে তো?’ ঐশী আংটিটা তুলে রাখল বক্সে। সোনার চেইন আর হাতের দুগাছা চুরি বের করে লকারটা বন্ধ করল। এখন বাড়িটা ভাগ হয়েছে ভাইদের মধ্যে। ঐশীর রান্নাঘরের একটা ছোট্ট পার্ট ভাগে পড়েছে। তাতে গরম আগের থেকে বেড়েছে বই কমেনি। তাতেই ঘামতে ঘামতে দুরকম পদ রান্না করল। দুটোই শ্রীমন্তের পছন্দের। তার হাতের শেষ রান্নাটা এ-বাড়িতে শ্রীমন্তেরই থাক। ক্যাসারোলে তুলে ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখল। শ্রীমন্তর দুসেট জামাকাপড় আয়রন করে সোফার ওপরে গুছিয়ে রাখল। শ্রীমন্তের ওষুধ টেবিলে গুছিয়ে রাখল। সবকিছু যেখানে যেমন থাকে তেমনি রাখল। শ্রীমন্তের কাছে ঐশীর অভাব কোনোদিন ছিল না। ঐশীকে হারনোর ভয় শ্রীমন্ত কোনোদিন করেনি। ঐশী রাগ করেছে, খায়নি, ঘুমায়নি। শ্রীমন্তের কোনোকিছু তাতে থেমে থাকেনি। ডিভোর্সটাকে অবশ্য শ্রীমন্ত প্রচণ্ড ভয় পেত। ভয় পেত ভালোবাসা হারানোর নয়, সম্মান হারানোর। অথচ এই শ্রীমন্ত বিয়ের আগে অন্যরকম ছিল। ঐশীর দেখা করতে আসতে দেরি হলে পাগল পাগল হয়ে যেত। ঐশীর বাড়ির লোকেরা মত না দেওয়ায় শ্রীমন্ত চুপ করে বসেছিল। নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে ঐশী বলেছিল – ‘তেমন হলে পালাবো। আই অ্যাম রেডি।’ আজো ঐশী পালাচ্ছে। কিন্তু সংসার গড়তে নয়। সংসার ভেঙে। শ্রীমন্তকে ফেলে পালাচ্ছে। একটা ছোট টিনের বক্সে শ্রীমন্তের লেখা চিঠিগুলো ঐশী যত্ন করে রেখেছিল। সেগুলো ঢোকাল ব্যাগে। ওগুলো এই নিষ্ঠুর, নিরুত্তাপ, ভালোবাসাহীন শ্রীমন্তের পাহারায় রেখে যাওয়া যায় না। ঐশীর তো শ্রীমন্ত বলতে ওইটুকুই। বাক্সটা ঢোকানোর আগে তবু একটা পুরনো চিঠি খুলে দেখল… ঝুরঝুরে কাগজে অস্পষ্ট হয়ে আসা কালিতে লেখা –

আমার ঐশী,

কোনো কথা বলে শান্তি হয় না। তাই চিঠি লিখি। তোমার মুখটা আমার চিঠি লেখার সময় আয়নার মতো ভেসে ওঠে। তোমার মুখটায় কী আছে বলো তো? কেন বারবার মনে হয় তোমাকে না পেলে আমি বাঁচব না? সেদিন যখন অন্ধকার গলিটায় তোমার হাত ধরেছিলাম, তুমি এক মুহূর্তের জন্য যেন আমার হয়ে গেছিলে। মনে হলো পৃথিবীটা থেমে যাক। ডনের একটা কবিতা আছে না ‘ফর গড সেক, হোল্ড ইওর টাং/ লেট মি লাভ।’ আর কোনো কথা লাগে না ঐশী। তোমার বাড়িতে রাজি হবে কি না জানি না। আমি কিন্তু বাড়িতে হিন্ট দিয়েছি। আমার ঘরটা খুব ছোট্ট। তোমার একটু কষ্ট হবে। কিন্তু ভালোই হলো। ঝগড়া হলেও বেশি দূরে যেতে পারবে না।

চিঠিটা মাঝপথে থামিয়ে দিলো। দুচোখ দিয়ে জল ঝরছে কেন? এতবছর পরেও। কতবার এক হাত দূরে বালিশটায় মুখ গুঁজে সারারাত কেঁদেছে ঐশী। এত কম দূরত্ব সত্ত্বেও যোজন দূরে ছিল শ্রীমন্ত। এই যে আমি সব ফেলে চললাম এই গোধূলিবেলায়। তুমি তো তার বিন্দুমাত্র আভাস পেলে না? আসলে ছেলেরা ভালোবাসার অভিনয় করে। ওটা আসলে ওদের মুখোশ। মেয়ে পটানোর জন্য কাব্যি করা দরকার। তাই করে। কপাল ভালো। আমার মুন্নি অনীশের মতো কেয়ারিং হাজব্যান্ড পেয়েছে। ঠিক বলে মুন্নি। আমি একটা বোকা। চূড়ান্ত বোকা। মনে ভাবতে ভাবতেই ব্যাগের চেইনটা আটকাল। শ্রীমন্ত বাড়ি ফিরছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। প্রসন্ন মুখ। সকাল থেকে বেলা পর্যন্ত চায়ের দোকানে পেপার পড়ে শ্রীমন্ত। বাড়ির ভালোমন্দ দেখা বা শোনার সময় নেই। মেয়ের বিয়েতে সামান্য খাটাখাটনি করেছিল। তাও দায়িত্ব সারার মতো। অন্তরের টান তাতে ছিল কি না কে জানে? কথাটা জানাবে শ্রীমন্তকে। তাতে কিছু হেলদোল কি ওর হবে? ঐশী আর ওর নেই। ঐশী এখন একা। আইনি লেখাপড়ার চেয়ে মনের বিচ্ছেদ অনেক বড়। এত বছর মনের বিচ্ছেদ যন্ত্রণায় ঐশী কাটাল তো। এবার সেটা শারীরিক বিচ্ছেদ। আইনি বোঝাপড়া আর ঐশীর প্রয়োজন নেই। শ্রীমন্তের সম্মান অক্ষুণ্ণ থাক। শ্রীমন্ত বাড়ি এলো। ঝোড়ো কাকের মতো চেহারা করেছে। তিনদিনের কাঁচাপাকা একগাল দাড়ি। হাতমুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকে বলল – মুন্নি ফোন করেছিল?

ঐশীর সংক্ষিপ্ত উত্তর – হ্যাঁ।

– কী বলল? ভালোমন্দ রান্নাবান্না করছে নাকি?

এমন জঘন্য প্রশ্নের কী উত্তর দেবে ঐশী? ও-বাড়িতে গিয়ে মেয়ে কেমন আছে জানার প্রয়োজন নেই। খালি জিভের স্বাদের কথা।

শ্রীমন্ত গালভরা হাসি আর পরিতৃপ্তি নিয়ে ঐশীর কাছে এলো। প্রগলভ প্রশ্ন – কি গো? আজ সব আমার ফেভারিট মেন্যু? কী ব্যাপার? আমার জন্মদিন, নাকি বিবাহবার্ষিকী?

কথাটা বলেই হাসতে লাগল।

ঐশীর মাথায় কেমন যেন আগুন জ্বলে উঠল। তাতে অবশ্য ভালোই হলো। এই একটু আগে যে-দুর্বলতাটা এসেছিল সেটা আবার চলে গেল। ঝংকার দিয়ে বলে উঠল – ‘শেষ খাওয়াটা খেয়ে নাও।’

শ্রীমন্ত সামনে ফিরল চমকে উঠে।

– মানে? কী বলছ?

– বলছি যে গিলে উদ্ধার করো। আমায় মুক্তি দাও। কথা শেষ করার আগেই মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল।

স্ক্রিনে অনীশের নাম। ফোনটা ধরল ঐশী।

– বল, মুন্নি?

– না, মা। আমি অনীশ বলছি।

– ও আচ্ছা। বলো বলো।

– মা, আমি একটু ইভনিংয়ে আপনার সঙ্গে মিট করতে পারি?

– ইভনিংয়ে? ইভনিংয়ে তো আমি থাকছি না। আমতা আমতা করে ঐশী বলল। তারপর আবার বলল –

– কিছু হয়েছে অনীশ? সিরিয়াস কিছু?

– আই নিড টু ডিসকাস সামথিং। কখন যাবো? ইভেনিং ছাড়া তো আমি অফিস থেকে বেরোতে পারব না মা।

– ও। আচ্ছা। এসো তাহলে।

– বেশ, রাখছি। সন্ধ্যায় দেখা হচ্ছে।

ঐশী ফোনটা কান থেকে নামিয়ে চিন্তায় বসে পড়ল। কী আবার হলো? কে জানে? ওই ফ্ল্যাট নিয়ে কিছু হলো?

শ্রীমন্ত দার্জিলিংয়ে কেনা ফুলকরা ছাতাটা হঠাৎ হাতের কাছে রেখে বলল – এটাও নিয়ে যাও। তোমারই কেনা। আসলে এতগুলো বছরে তোমাকে আমি কিছুই দিইনি। ঘরের যা কিছু আছে তোমার  টাকাতেই সব কেনা। খাট আর আলমারি ছাড়া সবই নিতে পারো। ও দুটো আমার থাকলে কাজে লাগে। এই আর কী?

কথাটা শেষ করে সামনের চেয়ারটায় বসল। ঐশী কিছু বুঝে উঠতে পারল না। সকাল থেকে তো কিছুই বলেনি শ্রীমন্তকে। শ্রীমন্ত কী বুঝল?

শ্রীমন্ত আবার বলল – অনীশের ফোন তো? মুন্নি ফ্ল্যাট কেনার জেদ ধরেছে। অনীশ কনফিউজড মাকে একলা রেখে যাবে কী করে? এসব তুমি আর মাথায় নিও না। অনেকদিন তো একাই টানলে এসব। ইভনিংয়ে আমি কথা বলব অনীশের সঙ্গে। তুমি যেখানে যাচ্ছো যাও। পিছন ফিরো না।

ঐশীর প্রতিক্রিয়ার কোনো অপেক্ষা না করে বাথরুমের দিকে চলে গেল। যেন কিছুই হয়নি। ঐশীর এই চলে যাওয়াটা যেন আর পাঁচটা মেয়ের বাপের বাড়ি যাওয়ার মতো। এই বয়সে এতো

লাগেজ নিয়ে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে – এসব ব্যাপারে ওর কোনোই চাঞ্চল্য নেই? ঠিকই তো। এটা তো ঐশীর ভাবা উচিত ছিল। ঐশী শ্রীমন্তের জীবনে কতটাই বা জুড়ে আছে? শ্রীমন্ত তো একা হচ্ছে না। একা হচ্ছে ঐশী। আজকের ভালো মেন্যু পেয়েই শ্রীমন্ত খুশি। আর কিছু লাগে না ওর। তাড়াতাড়ি স্নান করতে চলল। এসে ভালো মেন্যুগুলো গিলবে বলে। উফ! কী অসম্ভব স্বার্থপর এই মানুষটা? কান্না আর খিদে মিলিয়ে বমি উঠে এলো ঐশীর। কিন্তু ঐশী খাবে না কিছুই। গা ঘিনঘিন করে এই লোকটার সঙ্গে বসে খেতে। আগে তবু মুন্নি ছিল। এখন যেন খাবার টেবিলটা একটা জানোয়ারের খানাঘর। শুধু জৈবিক। ভেবেছিল বিকেলে বেরোবে। কিন্তু রাগে-দুঃখে হালকা সুতির শাড়িটা খুঁজতে লাগল। গরমে ভারী শাড়িটা আর পরা যাবে না। এখনই বেরোবে ঐশী। আর এক মুহূর্ত নয়। পুরনো স্মৃতিচারণা আর নয়।

স্কুলে নেওয়ার ব্যাগটা তুলে নিল। চাকরির দরকারি ডকুমেন্টস সব ওর ভেতরেই আছে। মোবাইলে নেট অন করে উবার ট্যাক্সি বুক করল ঐশী। চোয়াল শক্ত করে চুল বাঁধল। হালকা প্রসাধনী করল, যেমন স্কুলে যাওয়ার সময় করে। ট্রলিগুলো একাই টেনে বাইরে রাখল। শ্রীমন্ত চুপ করে বসে দেখল সব। খাওয়ার সময় ঐশী শ্রীমন্তের সামনে গিয়েও একবারের জন্য দাঁড়ালো না। ট্যাক্সি এলো। ঐশী উঠে পড়ল ট্যাক্সিতে। বারুজ্যে বাড়ির কাছ থেকে বিদায়। যে-বাড়িতে নিয়মের বেড়াজালে এত বছর কাটিয়ে এলো, অথচ স্বামীর শেষ সহানুভূতিটুকুও মিলল না, সেখানে যেন মৃত্যুর আগে আর না আসতে হয়। এত রাগের মধ্যেও দুচোখ দিয়ে অঝোরধারায় জল ঝরতে লাগল। সামনের ড্রাইভার অবাঙালি। ভাঙা বাংলায় বলল – ‘জ্যাম নেহি মিলতা ইস্ ব্যক্ত। আপ জলদি চলি জায়েঙ্গে।’

ঐশী মুখ ফেরালো জানালায়। জুন মাসের প্রখর গরম বাইরে। উইন্ডো গ্লাসে ভেপার জমছে। আবছা হয়ে যাচ্ছে বাইরেটা। এসির ঠান্ডা বাইরের উত্তাপকে জানান দিচ্ছে না। ঐশীর চশমাতেও ভেপার। চশমা খুলল ঐশী। শাড়ির আঁচল দিয়ে পরিষ্কার করল, মনে ভাবল – যেখানে যাচ্ছে এটাও কি ওর নিজের ঘর? নাকি সারাজীবন অন্যের ঘরেই মাথা গুঁজে থাকতে হবে? গৌহাটি নিজের ছিল না। তার দাম দাদারা চুকিয়ে দিয়েছে। যা কিছু নিজের ছিল তা বিকিয়ে গেছে। আর যাদবপুরের বারুজ্যে বাড়ি তো কোনোদিনও নিজের ছিল না। পরের ঘরে বাসা বাঁধা, স্বামীও কোনোদিন নিজের হলো না। মুন্নি খালি আমার ছিল। সেও আজ পরের। সত্যি ড্রাইভারটা ঠিক বলেছে,

– এবার তাড়াতাড়ি যেতে পারবো। আর কোনো বাধা নেই।

লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে ড্রাইভার বলল – ম্যাডামজিকা তবিয়েত আচ্ছি নেহি হ্যা মালুম হোতা হ্যায়।

– না না। ঠিক আছে শরীর। মনটা ভালো নেই। আচ্ছা তুমাহারা নাম ক্যায়া হ্যায়, ভাইয়া?

– বহুত খুব হিন্দি আতি হ্যায় আপকো ম্যাডাম! রোশন সিং – মেরা নাম।

– বাঃ! ভালো নাম।

– এক বাত পুছু ম্যাডামজি?

– কী?

– বুরা মত মানো, আপ একেলি কাহা যা রহি হো?

– আপনা ঘর। পেহেলিবার যা রহি হু আপনা ঘর।

– যাদভপুর মে কই রিস্তেদারকে ঘর থা ক্যায়া?

– হ্যাঁ, থা এক রিস্তেদার।

– ও আচ্ছা। ম্যাডামজি।

মোবাইলটা বেজে উঠল। অনীশের নাম্বার কেটে দিলো ঐশী। এই ফোনটাই ওকে খালি পিছনে টানবে। যা পারিস কর তোরা। আমায় আর জ্বালাস না।

ফোনটা আবার বাজছে। অসহ্য লাগছে ঐশীর। না, না। কিছুতেই ধরবে না ফোন, আপনমনে জানালায় মুখ ফেরাল। উত্তর কলকাতায় ঘরভাড়া নিয়েছে ঐশী। পৌঁছেই গ্যাসের চেষ্টা করতে হবে। একটা কাজের লোকও দরকার। এসব সাতপাঁচে মন দিলো ঐশী। ফোনটা কনটিনিউ বেজেই যাচ্ছে। লাইটটা জ্বলছে নিভছে। সাইলেন্ট মোডে আছে। কোনো সাউন্ড আর হচ্ছে না। এবার ফোনটা মুন্নির নাম্বার থেকে। নিশ্চয়ই শ্রীমন্ত মুন্নিকে কিছু জানিয়েছে, বেরোবার সময় একটা কথা বলল না। মুন্নিকে ফোন করে জানিয়ে সাধু সাজছে। দেখাচ্ছে আমি ওকে ছেড়ে যাচ্ছি। ও যে কত বড় অভিনেতা সে কি আর আমি জানি না? রাগের মাথায় ফোনটা ধরেই ফেলল ঐশী।

– বল। ফোন কেন?

– মা, তুমি কোথায়? মুন্নির গলায় তীব্র উৎকণ্ঠা। ঐশী ভাবল – বাঃ। মা সারাজীবন তোদের হাতের নাগালে থাকবে, তাই না? মায়ের নিজস্বতা বলে কি কিছু নেই?

গম্ভীর গলায় বলল – কেন?

– কেন মানে? এতবার ফোন করছি তোমায়!

– বেশ করেছিস। আমি ধরিনি।

– মা, বাবা …

বাকি কটা কথা মুন্নির কান্নার আওয়াজে বুঝতে পারল না ঐশী।

– কী হয়েছে, মুন্নি? কী হয়েছে, কী? উৎকণ্ঠায় ভেঙে পড়ল ঐশী।

– বাবা কথা বলছে না। আমি যাদবপুরের বাড়িতে। অনীশও এখানে। অনীশের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই হঠাৎ বাবা শরীর খারাপ বলে …

ঐশীর মাথা ঘুরছে। গোটা পৃথিবী ঘুরছে। গৌহাটির ঘর, যাদবপুরের ঘর, নতুন ভাড়ার ঘর সব যেন শূন্য হয়ে গিলতে আসছে ঐশীকে। ঐশীর মুখ থেকে গোঙানি হয়ে বেরিয়ে এলো একটাই কথা – ঠাকুর! ঐশীর চোখে ঘুম এলো খুব। কত জনমের না-ঘুমানো ঘুম। কে যেন ঐশীর চিঠির বাক্সটা রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। শ্রীমন্তের চিঠিগুলো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে এদিক-ওদিক। ঐশী ঘুমের ভেতর দেখছে বিনুনি চুলে বাইশ বছরের ঐশী পাগলের মতো চিঠিগুলো কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। ঐশী কাঁদছে … খুব কাঁদছে। ওর চিঠিগুলো কেউ একটু কুড়িয়ে দাও। গোঙাতে থাকে ঐশী। চশমায় ভেপার জমে ওঠে।

রোশন সিংয়ের আবছা গলা – ম্যাডামজি, কেয়া হুয়া আপকো? কিসকা ফোন থা …? আপকা ঘর কিতনা দূর হ্যা? …

Leave a Reply

%d bloggers like this: