কবিতায় জীবনের স্বীকারোক্তি – রবার্ট লওয়েল

লেখক: জাহিদুর রহিম

১৯৩৬ সালে রবার্ট লওয়েল তাঁর ‘অন্যতম গুরু’ এজরা পাউন্ডকে এক চিঠি লিখলেন। এজরা পাউন্ড সে-সময় ইতালিতে ছিলেন এবং তাঁর বিখ্যাত কান্টোজের কবিতাগুলো লিখছিলেন। লওয়েল ছিলেন হার্ভার্ডে ভর্তি হওয়া নব্য তরুণ। সেই চিঠিতে অনেক কিছুই ছিল, যেমন কান্টোজের যেসব কবিতা প্রকাশিত ছিল সেগুলোকে ‘হোমার -এর কাল্পনিক শরীরে নতুন রক্তের সঞ্চালন’ বলে অভিহিত করেছেন। এও লিখেছেন, এজরা পাউন্ডের অনুমতি নিয়ে ইতালিতে এসে ‘বাস্তবতার মিছিলে’ কাজ করবেন। নিজের কবিতা পাউন্ডকে পাঠিয়ে তাঁর মতামতও চেয়েছিলেন। আমাদের কাছে এসবের চেয়ে উনিশ বছরের লওয়েলের নিজের সম্পর্কে বলা কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ – কারণ লওয়েলের কবিতাই ‘তাঁর সম্পূর্ণ জীবন’, – ‘উপমাহীন নিখাদ জীবন’।
‘কোনো কিছু খোঁজার এক ভয়ানক আকুতি আমার মাঝে কাজ করে। যে-কোনো কিছু আমি জমিয়ে রাখতে চাইতাম – আমার কাছে তা সে খেলনা, পাখির নাম বা মার্বেল যাই হোক। আমি প্রজাপতি, সাপ আর কচ্ছপ ধরতাম আর নেপোলিয়ানের ওপর লেখা বই কিনতাম। আমি যা সংগ্রহ করতাম তার পরিচর্যা না করে আমার সংগ্রহশালাকে ক্রমান্বয়ে বড় আর বৈচিত্র্যপূর্ণ করার চেষ্টা করেছি সব সময়। আমি ত্রিশের বেশি কচ্ছপ ধরেছি। সেগুলো খেতে না পেয়ে একসময় মারা গেছে। স্কুলে আমি অজস্র মার্বেল আর খেলনা-সৈন্য জমিয়েছি, যেগুলোকে দাস হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিয়ে আমি ফেলে দিয়েছি। আমি পাখিদের কাগজে চিনেছি প্রথমে, তাই কাগজ আমাকে পাখিদের চিনিয়েছে প্রকৃতি থেকে।’ চিঠি শেষ করেছিলেন এভাবে – ‘আমার এই (সংগ্রহের ম্যানিয়া) রোগ আমি তখনো অতিক্রম করেই গেছি। তবে এ-কথাও মনে রাখি আমি, কোনো জিনিস ভালো লাগলেই ভবিষ্যতে প্রয়োজনে চুরি করে হস্তগত করব।’ তাঁর এই শেষ কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখেছি সারাজীবন লওয়েল নিজের পছন্দের সবকিছু কী করে হস্তগত করেছেন তাঁর কবিতায়। জীবনের আনন্দ-বিষাদ, জীবনের বয়ে চলার কম্পন সবটা জমিয়ে গেছেন আজীবন। আমরা ধীরে ধীরে লওয়েলের জীবনের এক একটা কপাট খুলব, সেইসঙ্গে তাঁর কবিতা আর বইয়ের পৃষ্ঠা উলটে মিলিয়ে নেব। দেখতে চাইব কোন মহালগনে জীবন আর কবিতা এক হয়ে যায়।

দুই
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে আমেরিকায় এক নতুন কবিগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে, যাঁদের নামকরণ করা হয় ‘কনফেশনাল পোয়েট’। যা কিছুই সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ, বা একান্ত ব্যক্তিগত নিবিড়, আবেগ ও আচরণের বিষয় তাকেই তাঁরা কবিতার বিষয়বস্তু করে তুললেন। রবার্ট লওয়েলের Life Studies কাব্যগ্রন্থ আলোচনাকালে সমালোচক আর.এল রোজেন্থাল (R. L Rosenthal) সর্বপ্রথম ‘Confessional poet’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন।
আমেরিকায় এই কনফেশনাল কাব্যধারার সূত্রপাত ঘটে W.D. Snodgrass-এর Heart’s Needle কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এটির জন্য তিনি Pulitzer পুরস্কারও পেয়েছিলেন ১৯৬০ সালে। স্নোডগ্র্যাসের স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদের পর তাঁর একমাত্র কন্যার সঙ্গেও তাঁর বিচ্ছেদের তীব্র অনুভূতি নিয়ে রচিত হয় এই কাব্যগ্রন্থটি। কন্যার প্রতি তাঁর নানা মনোদৈহিক স্নেহ ও স্মৃতির কাব্যিক রূপায়ণ এ-গ্রন্থ। বিষয়টি কাব্যাঙ্গনে আনার ফলে সমালোচকদের বিপুল সমালোচনার মুখোমুখি হন তিনি। তার ‘Heart’s Needle’-কবিতাটি থেকে কয়েক ছত্র উদ্ধৃত করা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না –

No one can tell you why
the season will not wait;
the night I told you I
must leave, you wept a fearful rate
to stay up late.

Now that it’s turning Fall,
we go to take our walk
among municipal
flowers, to steal one off its stalk,
to try and talk.

We huff like windy giants
scattering with our breath
gray-headed dandelions;
Spring is the cold wind’s aftermath.
The poet saith.
রবার্ট লওয়েল ছিলেন স্নোডগ্র্যাসের কাব্যিক পরামর্শদাতা; তিনি নিজেও স্নোডগ্র্যাসের কাব্যের ‘ব্যক্তিগত জীবনের অন্তরঙ্গ অনুভূতি’ প্রকাশের এই শৈলীকে ব্যবহার করা শুরু করেন। রবার্ট লওয়েলের কবিতা, স্বীকারোক্তিমূলক এই কাব্যধারার খ্যাতি ও প্রতিপত্তির কারণ হয়ে উঠেছিল বিশ্বময়। ‘Confessional’ (স্বীকারোক্তিমূলক) কবিতাগুলো বেশিরভাগই আত্মজৈবনিক; তবে এই আত্মজীবনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রবল ‘আত্মকরুণা’ ও ‘আত্মঘৃণা’। এই কবিতাগুলোর মধ্যে চিৎকার করে ওঠে ব্যক্তিগত কলংক ও বিকৃতির কথা, নিজস্ব ক্ষতের কথা। তাঁরা মনে করতেন, ‘আমরা বসবাস করি বিপুল আত্মজৈবনিক বিশ্বে।’ মানবপ্রকৃতি সম্পর্কে সাধারণ সত্যে বিশ্বাসের পরিবর্তে তাঁরা বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন ‘ব্যক্তিগত মন্ময় সত্যে’।
এ-ধারার কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রবল ইডিপীয় চেতনার (Oedipal consciousness) বহিঃপ্রকাশ। এই ধারার দুই কবি সিলভিয়া প্লাথ ও অ্যানি সেক্সটনের কবিতায় আমরা খোঁজ পাই পিতার প্রতি তাঁদের অদ্ভুত ভালোবাসা ও ঘৃণার; পিতার অকালপ্রয়াণে ক্ষোভ ও দুঃখ; পিতার সঙ্গে তাঁদের তরুণীবেলার স্মৃতির কথকতা।
পশ্চিমা নারীর ফাদার-ফিক্সেশনের ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তির উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে সিলভিয়া প্লাথের ‘Daddy’ আর অ্যানি সেক্সটনের ‘How we danced’ কবিতাদ্বয়। মানসিক অসুস্থতাও ঐক্যসূত্র স্থাপন করে এই কবিদের মধ্যে। এই কবিদের প্রায় সবাই মানসিক হাসপাতালে ছিলেন, জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে। প্রবল মানসিক কষ্ট এই কাব্যধারার কমপক্ষে তিনজন কবিকে ঠেলে দিয়েছিল আত্মহত্যার দিকে – সিলভিয়া প্লাথ, অ্যানি সেক্সটন ও জন ব্যারিম্যান। কনফেশনাল কবিতাগুলো যেন নিষ্পেষিত আত্মার হৃদয়চেরা চিৎকার। পৃথিবীকে শেষ বিদায় জানানোর আগে এই কবিতাগুলো যেন নিষ্ঠুর পৃথিবীর প্রতি এই কবিদের শেষ সাক্ষ্য ও প্রণতি। কনফেশনাল কবিগণ যেন তাঁদের কবিতায় প্রবল বেদনায় নতজানু হয়ে দুই হাতের করতলে ধরে আছেন তাঁদের রক্তাক্ত ও বিক্ষত হৃদয়, আর অস্ফুট আত্মমগ্ন ও মন্ত্রতাড়িত স্বরে যেন স্বীকার করে চলেন তাঁদের পাপ-পঙ্কিলতা-অপরাধ আর অন্যায়ের কথা, নিজেরই কাছে। এ-কবিতাগুলোতে যা কিছু ঘৃণ্য, গুপ্ত, প্রকাশ-অযোগ্য বা লজ্জাকর তা-ই চিৎকৃত হয়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ততায়। সত্তরের দশকে আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পোয়েট্রি থেরাপি’ শিরোনামে একটি কোর্স চালু হয়েছিল। কবিতায় ব্যক্তিগত অনুতাপের স্বীকারোক্তির ভেতরে আছে অনুভূতির ‘ক্যাথারসিস’ বা বিমোক্ষণ। মনে করা হয়েছিল, কাব্যের আছে নিরাময়ের শক্তি। কিন্তু জীবনের সুখ আর কাব্যের সুখে তফাৎ থেকে গেছে চিরকাল। (সূত্র : ‘কনফেশনাল কবি ও কবিতা’, জগলুল আসাদ)

তিন
লওয়েলের কবিতা বোঝার জন্য আমাদের তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য আর পূর্বপুরুষদের ছোট এক পরিচিতি দরকার আছে। আরো দরকার আছে তাঁর বেড়ে ওঠা ও জীবনক্রমকে জানা। জানতে হবে তাঁর জীবনের প্রতিটি বাঁকবদল, যেন তাঁর কবিতার বাঁকবদল আমরা বুঝতে পারি। কারণ তাঁর জীবন অনূদিত হয়েছিল তাঁর কবিতায়।
রবার্ট ট্রেইল স্পন্স লওয়েল যাঁকে আমরা রবার্ট লওয়েল নামেই চিনি, তিনি জন্মেছেন ১ মার্চ ১৯১৭ সালে বোস্টনের এক অভিজাত পরিবারে। যে-কয়েকটি পরিবার মার্কিন স্বাধীনতার আগে ক্যারোলাইনা, পেনসিলভানিয়া, নিউ ইংল্যান্ড আর নিউইয়র্কে শিকড় গাড়ে, লওয়েল পরিবার তাদের অন্যতম। তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে মার্কিন স্বাধীনতাসংগ্রামী থেকে শুরু করে মার্কিন সংবিধানপ্রণেতা সদস্য, জাতীয় সংগীতের সুরকারসহ অনেকেই রয়েছেন। আছেন কবি অ্যামি লওয়েল ও রাসেল লওয়েল, যাঁদের প্রভাব রবার্ট লওয়েলের ওপর বেশ দীর্ঘ ছিল। যদিও রবার্ট লওয়েলের ভাষ্যে, অন্য তিনজন কবি তাঁর জীবনে প্রভাব ফেলেছিলেন সরাসরি। তাঁর ভাষ্যে, ‘আমার জীবনকে যেসব কবি সরাসরি প্রভাবিত করেছেন তাঁরা হলেন অ্যালেন টেট, এলিজাবেথ বিশপ এবং উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়াম।’ – কী ভয়ানক বিসদৃশ সমন্বয়। কাব্যধারার দিক থেকে বিশপ ছিলেন অ্যালেনের ‘আনুষ্ঠানিক’ ও উইলিয়ামের ‘অনানুষ্ঠানিক’ শিল্পের এক সংযোগ সেতু।
পরের জীবনেও আমরা দেখতে পাই লওয়েল আনুষ্ঠানিক, সংযমী কাব্য ও মুক্ত-উন্মুক্ত কাব্য উভয় ক্ষেত্রে পূর্ণমাত্রায় ক্রিয়াশীল। তাঁর বিখ্যাত Life studies ও Notebook যেন এই দুইয়ের মাঝে কোথাও দাঁড়ানো। তাঁর জীবনীকার পাউলো হায়েজ লিখছেন যে, লওয়েলের কবিতায় বিশেষত প্রথম জীবনের কবিতায় বোস্টন ও নিউ ইংল্যান্ড নিরেট স্বাভাবিকতায় প্রবেশ করেছে। প্রবেশ করেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের দিনের রঙের ছটা। পারিবারিক ধর্ম, ঐতিহ্য ও নিজ শহর তাঁর কবিতায় অবিরত ও স্বেচ্ছায় এসেছে একের পর এক। বিশেষ করে বোস্টন ও নিউ ইংল্যান্ডের মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশ। যদিও পরবর্তীকালে লওয়েলের পরিবার প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়; কিন্তু পিতা ও মাতা উভয় দিক দিয়েই তাঁর ইহুদি ধর্মের সঙ্গে সংযোগ আছে। তাঁর দাদার দাদা মেজর মরডেকাই মেয়ার – যিনি ১৮১২ সালের যুদ্ধের যোদ্ধা এবং তাঁর মায়ের পূর্বপুরুষ রালেজ মরডেকাই (যাঁরা ছিলেন ক্যারোলাইনার হর্তাকর্তা) ধর্মে ছিলেন ইহুদি।
প্রথম কৈশোরে লওয়েল ছিলেন বেশ দুর্বিনীত। তাঁর ঝোঁক সমবয়সী ও স্কুলমেটদের সঙ্গে অযথা বিবাদ ও মারামারির দিকে। কৈশোরে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে ক্যাল (cal) নামে ডাকত। লওয়েলকে বোঝার জন্য ‘ক্যাল’ শব্দটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। শেক্সপিয়রের উপন্যাসের ভিলেন চরিত্র ‘Caliban’ এবং কুখ্যাত রোমান সম্রাট ‘Caligula’-র নামানুসারে প্রদত্ত ক্যাল নামটি প্রায় সারাজীবন লওয়েলের সঙ্গে সেঁটে ছিল। লওয়েলের প্রথম বই For the Union Dead-এ ‘Caligula’ নামে একটি কবিতা আছে। এছাড়া ‘91 Revere Street’ কবিতায় স্কুলের লওয়েলকে তিনি নিজেই হিংস্র, আত্মসৌন্দর্যকাতর ও দুর্বিনীত বালক হিসেবে দেখছেন।
লওয়েল ম্যাসাচুসেটসের বিখ্যাত ‘সেন্ট মার্ক’ স্কুলে ভর্তি হন। তাঁর স্কুলশিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন কবি রিচার্ড ইবার হার্ট। রিচার্ড দ্বারা প্রভাবিত লওয়েল তখনই কবি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই স্কুলেই লওয়েলের সঙ্গে পরিচয় হয় ফ্রাঙ্ক পার্কারের, যিনি নিজেও পরবর্তী জীবনে খ্যাতিমান শিল্পী ছিলেন। এই বন্ধুত্ব প্রায় সারাজীবন টিকে ছিল। লওয়েলের বইয়ের বেশিরভাগ প্রচ্ছদ তাঁর করা।
লওয়েল দুই বছরের জন্য হার্ভার্ডে ছিলেন। এ-সময় ঘটে তাঁর জীবনে খুব প্রভাববিস্তারী কিছু ঘটনা। তিনি একটা বড় কবিতা লিখে ক্যামব্রিজে রবার্ট ফ্রস্টকে দেখাতে যান। ফ্রস্ট লওয়েলকে আরো সন্নিবেশিত ও সংক্ষেপ কবিতা লেখার পরামর্শ দেন। এই ঘটনার স্মৃতিচারণায় লওয়েল বলেন, ‘আমি ক্রুসেডের দীর্ঘ গদ্যকবিতা নিয়ে রবার্ট ফ্রস্টের সঙ্গে দেখা করতে যাই। আমার লেখা ছিল পেনসিলে আর হাতের লেখাও দুর্বোধ্য। ফ্রস্ট কিছুদূর পড়েই অধৈর্য হয়ে বললেন, ‘বাকিটাও এমন বুঝি।’ এরপর তিনি আমাকে কিটসের ‘হাইপেরিওন’ পড়ে শোনাতে লাগলেন। ওই মুহূর্তে কিটস আমার কাছে খুব মহান কবি হিসেবে ধরা দিচ্ছিল।’
হার্ভার্ডে দুই বছর অবস্থান করেই লওয়েল মারাত্মক অসুখী ও বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সাইকিয়াট্রিস্ট মেরিল মোর (যিনি নিজেও কবি ছিলেন) লওয়েলকে কিছুদিনের জন্য হার্ভার্ড ছাড়তে বলেন। মোর লওয়েলকে ছুটির ব্যবস্থা করে দেন। সেইসঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর বন্ধু কবি ও অধ্যাপক অ্যালেন টেট – যিনি ন্যাশভিলে থাকতেন ও ‘ভ্যান্ডারবিটে’ শিক্ষকতা করতেন। মোর লওয়েলকে ন্যাশভিলে টেটের বাড়িতে নিয়ে যান। লওয়েল টেটকে খুব সহজেই সেখানে তাঁর থাকার আগ্রহের কথা বলেন এবং টেট ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে এক বাড়িতেই থাকার প্রস্তাব করেন। টেট কথা প্রসঙ্গে শুধু মজা করে বলেছিলেন যে, ‘লওয়েল যদি সত্যিই থাকতে চায় তবে যেন তাঁর বাগানে থাকে।’ লওয়েল সঙ্গে সঙ্গে উঠে দোকানে যান, একটি তাঁবু কেনেন ও এর পরবর্তী দুই মাস টটের বাগানে অবস্থান করেন। পরবর্তীকালে লওয়েল এই ঘটনাকে ‘অল্প বয়সের চূড়ান্ত উদ্ভ্রান্তি’ বলে কবিতায় উল্লেখ করেন। টেটের বাড়িতে অবস্থান করে লওয়েল কিছুদিন কলেজেও যাতায়াত করেছিলেন। সেখানে টেটের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ‘ক্রাউয়ি র‌্যানসনে’র ক্লাস করেন। এরপর টেট ও র‌্যানসন ওহাইও রাজ্যের কেনডন কলেজে গেলে লওয়েল তাঁদের অনুসরণ করেন ও হার্ভার্ড ছেড়ে একই কলেজে ভর্তি হন, সেখানে থাকতেন ‘রাইটার্স হাউসে’। সে-সময় কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ লেখক এক ছাত্রাবাসকে আশ্রয় করে ‘লেখক বাড়ি’ বা রাইটার্স হাউস ঘোষণা করে। এমন এক লেখক বাড়িতে লওয়েলের সঙ্গে সেখানে পরিচয় ঘটে পিটার টেইলার, রবি ম্যাকাউলি ও র‌্যানডন জারেলের। এই সময় পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ে তিনি ক্যাথলিক মতবাদে বিশ্বাসী হন এবং চল্লিশের দশকের শেষভাগে তিনি ক্যাথলিক চার্চও ত্যাগ করেন। ১৯৪০ সালে লওয়েল কেনডন কলেজ থেকে ক্ল্যাসিক সাহিত্যে স্নাতক হন। এরপর তিনি লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা অংশগ্রহণের আগে তিনি কেবল ইংরেজি সাহিত্যের প্রাথমিক কোর্সগুলোই সম্পন্ন করেছিলেন।
লওয়েলের ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা না জানলে আমরা জানতে পারব না ‘কনফেশনাল পোয়েট্রি’র রহস্য। কোথায় কীভাবে জন্মায় এই বোধ যা জীবনকে কবিতায় বা কবিতাকে জীবনে তুলে আনে? তাই আমরা জানব কিছু বাড়তি কথা। খুব অদ্ভুতভাবে নাট্যকার ও গল্পকার জেন স্টাফোর্ডের সঙ্গে পরিচয় হয় লওয়েলের, সালটা ছিল ১৯৩৮। তাঁর পরিচয়টা দুর্ঘটনা সূত্রেরই – আর আক্ষরিক ও ভাবগত দুভাবেই তা ছিল দুর্ঘটনা। মার্চের এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে গাড়ি চালাচ্ছিলেন লওয়েল, পাশে বসা জেন স্টাফোর্ড। ঘটে যায় মারাত্মক এক দুর্ঘটনা, অবশ্য এই দুর্ঘটনায় লওয়েলের শরীরে সামান্য আঁচড়ও লাগল না। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পথে জেনকে অনেকগুলো রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারির সম্মুখীন হতে হয়। এই পরিচয় পরিণয়ে পরিণত হয় বছর-দুই পরেই। আর ভেঙে যায় দশ বছর না যেতেই ১৯৪৮ সালে। কবি অ্যান্থনি হেকথ যিনি এই বিবাহের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী – একে অবহিত করেছেন ‘এক পীড়িত ও পীড়ন প্রবাহিত ঘটনা’ বলে।
বিবাহবিচ্ছেদ হতে না হতেই ১৯৪৯ সালে লওয়েল লেখিকা এলিজাবেথ হার্ডরিককে বিয়ে করেন। সেইসঙ্গে লওয়েল এলিজাবেথের তরুণী কন্যা ইভানার সৎপিতা হন। The Dolphin -এর বিখ্যাত সনেট ‘Ivana’-র পরিপ্রেক্ষিত এই কন্যা। ১৯৫৭ সালে তাঁরা একটি কন্যাসন্তান লাভ করেন। ২০০৭ সালে হার্ডরিকের মৃত্যুর পর নিউইয়র্ক টাইম‌স এই বিবাহকে ‘উদ্ভ্রান্ত ও হৃদয়বিদারক’ ঘটনা বলে অবিহিত করে। এই দুই বিয়ের ঘটনা, পরিপ্রেক্ষিত, পীড়ন ও ভাঙন বিবৃত আছে লওয়েলের For Lizzie and Harriet ও The Dolphin বইয়ে। এলিজাবেথের সঙ্গে তেইশ বছরের সংসার-জীবনের ইতি ঘটে ১৯৭০ সালে এবং ১৯৭২ সালে ক্যারোলিন ব্ল্যাকউডকে বিয়ে করে ইংল্যান্ডে স্থায়ী হন। তাঁদের একটি পুত্রসন্তান হয়।

চার
সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনার আগে আমরা রবার্ট লওয়েলের কর্মজীবন সম্পর্কেও একটু জানতে চাই। কর্মজীবনে বেশিরভাগ সময় কেটেছে তাঁর শিক্ষকতায়। রবার্ট লওয়েলের শিক্ষকতা পদ্ধতিতে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য। এক নির্বিকার বয়ানধর্মী রূপ, এক প্রত্যক্ষ উপলব্ধির নৈর্ব্যক্তিক বর্ণনা, এক আবেগময় নিকটতম স্পর্শের বয়ান। ১৯৫০-৫৩ সাল পর্যন্ত রবার্ট লওয়েল ‘লওয়া’ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ‘লওয়া রাইটার্স ওয়ার্কশপে’ শিক্ষকতা করেন। সেখানে তাঁর সহকর্মী ছিলেন পল অ্যাঙ্গেল ও বব ম্যাককাউলি। ডোনাল্ড জেমস উইনলো লওয়েলকে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যান, যেখানে তাঁর ছাত্র ছিলেন সিলভিয়া প্লাথ ও অ্যানি সেক্সটন। ১৯৬৩ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত নিজ বাসা নিউইয়র্ক থেকে বোস্টনের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে যেতেন রবার্ট লওয়েল।
এর পরের বছরগুলোতে তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন – যার মধ্যে সিনসিটেট্রি, ইয়েল, হার্ভার্ড, নিউ স্কুল অব সোশ্যাল রিসার্চ অন্যতম। অসংখ্য কবি, লেখক, সমালোচক ও পণ্ডিত মানুষ লওয়েলের শিক্ষকতার ধরন এবং তাঁদের জীবনের ওপর লওয়েলের প্রভাব নিয়ে পরবর্তীকালে বিস্তর লেখালেখি করেন, যার মধ্যে ক্যাথলিন স্পিভাক, জেমস অ্যাটলাস, হেলেন ভেন্ডলার ও উইলি ইয়াং অন্যতম। ১৯৫৯ সালে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে রবার্ট লওয়েলের সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ করে স্পিভাক ২০১২ সালে With Robert Lowell and His Circle নামে একটি বই প্রকাশ করেন। বিখ্যাত পণ্ডিত হেলেন ভেন্ডলার যিনি লওয়েলের একটি কবিতা কোর্সে অংশগ্রহণ করেছিলেন – লওয়েলের শিক্ষকতার অনুপম ভঙ্গি চমৎকারভাবে লিখেছেন, ‘লওয়েল পড়াতেন লৌকিকতাবর্জিত অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে। তিনি ক্লাসে এমনভাবে পড়াতেন যেন সবাই তাঁর কবিতার সহযাত্রী।’ হ্যামিলটন লিখেছেন যে, ‘লওয়েলের পড়ানোর পদ্ধতি লক্ষ্যহীন, ক্লাসে উপস্থিত সকল কবিকে তিনি আপন মাত্রায় এনে কথা বলতেন। তিনি এমনভাবে কবিতা ভাষ্য বর্ণনা করতেন, যেন সেগুলো কোনো সর্বশেষ সংবাদ।’ পড়ানোর এই ধারণকৃত আত্মস্থ প্রক্রিয়া লওয়েল সারাজীবন কবিতায় অনুসরণ করেছেন।

পাঁচ
৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩, রবার্ট লওয়েল চিঠি লেখেন ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টকে। ‘জনাব প্রেসিডেন্ট, আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, ৬ আগস্ট ১৯৪৩-এ প্রদত্ত চিঠিতে আমাকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করার যে সুযোগ প্রদান করা হয় তা আমি প্রত্যাখ্যান করলাম।’ পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে লওয়েল বলেন যে, ‘পার্ল হারবারে বোমা হামলার ঘটনায় মনঃক্ষুণ্ন ও বিক্ষুব্ধ হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা তিনি ভেবেছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে মার্কিনিদের অন্যায্য শর্তে তিনি যুদ্ধ থেকে আবার মুখ ফিরিয়ে নেন। এই অন্যায্য প্রস্তাবের দরুন জার্মানি ও জাপান চিরতরে শেষ হয়ে যেতে পারে।’ যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তাব ফেরানোর ফলে লওয়েলকে কারাবরণ করতে হয়। প্রথমে নিউইয়র্ক কারাগারে – এর পরে ডানবারির ফেডারেল জেলে। নিউইয়র্ক জেলবাসের স্মৃতি অসাধারণভাবে উঠে এসেছে Life Studies-এর বিখ্যাত কবিতা ‘Memories of West Street and Lepke’ কবিতায়।
প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান তাঁর প্রথম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বলা ভালো, এর শুরু। সারাজীবন যে-কোনো রাজনৈতিক সংগ্রামে ‘নৈতিকতা ও আদর্শে’র প্রশ্নে তিনি উঠে এসেছেন সামনের সারিতে। ১৯৬৫ সালে ভিয়েতনামে মার্কিন বিমান হামলার প্রতিবাদে হোয়াইট হাউসের ‘Festival of the Arts’-এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে প্রেসিডেন্ট জনসনকে তিনি চিঠি দেন। সেই চিঠি পরবর্তীকালে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘We are in danger of imperceptibly becoming an explosive and suddenly chauvinistic nation and may even be drifting on our way to the last nuclear ruin.’
ইয়ান হ্যামিলটন জানাচ্ছেন যে, গোটা ষাটের দশক জুড়ে রবার্ট লওয়েল সমগ্র মার্কিন দেশে যুদ্ধবিরোধী বক্তা হিসেবে অগ্রণী ছিলেন। কিন্তু শান্তি আন্দোলন, যেটা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের প্যারালাল চলছিল, সেখান থেকে লওয়েল নিজেকে আশ্চর্যজনকভাবে গুটিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর স্বভাবের মধ্যে এটা ছিল না যে, ‘যেই আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিতে পারবেন না, সেখানে যোগ দেওয়া।’ ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে ওয়াশিংটন ডিসির পেন্টাগনে বিখ্যাত যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন রবার্ট লওয়েল। নরম্যান মেইলার তাঁর নন-ফিকশনাল নভেল The Armies of the Night-এর প্রথম অধ্যায়গুলোতে এই দিনটির স্মৃতিচারণ করেছেন। এদিন লওয়েলের লেখা ‘A Call to Resist Illegitimate Authority’ গদ্যটি জনতার মধ্যে বিলি করা হয়। ১৯৬৮ সালের মার্কিন সিনেট নির্বাচন থেকে জন এফ কেনেডির মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ঘটনায় লওয়েলের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। কেনেডির মৃত্যু তাঁর হৃদয়কে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে ফেলে।
শৈশব থেকেই লওয়েল মানসিক উদ্ভ্রান্তিতে আক্রান্ত ছিলেন। এজন্য তাঁকে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছে বারবার। হার্ভার্ডে পড়ার সময় থেকে শেষ বয়স পর্যন্ত অনেকবারই ভর্তি ছিলেন বিখ্যাত ‘ম্যাকলেইন মানসিক হাসপাতাল ম্যাসাচুসেটসে’। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘Walking in the Blue’ এই হাসপাতালে বসেই লেখা। লওয়েলের এই মানসিক ডিপ্রেশন তাঁর নিজের ও পরিবারের জন্য সীমাহীন ভোগান্তির কারণ ছিল। কিন্তু এই অবস্থান তাঁকে এনে দিয়েছে বিংশ শতাব্দীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কবিতার উপাদান। বিখ্যাত Life studies-এর অনেক কবিতায় এর সরাসরি প্রভাব আছে।
লওয়েলের বয়স যখন পঞ্চাশ, তখন চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি লিথিয়াম নেওয়া শুরু করেন। LowellÕs letter
notes-এর সম্পাদক মাসকিয়া হ্যামিলটন উল্লেখ করেন, ‘লওয়েল সর্বদা দ্বৈত সংযোগে আক্রান্ত ছিলেন। ভাবতেন, তিনি খুব অদ্ভুতভাবে পালটে যাচ্ছেন। আর তাঁর পরিবর্তিত রূপ, তাঁর পালটে যাওয়া তাঁর পরিবার ও বন্ধুদের জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলছে – এ-কথা ভেবে তিনি আরো বেশি উদ্বিগ্ন থাকতেন। লিথিয়াম এই চিন্তা চক্র থেকে মুক্ত থাকতে তাঁকে কিছুটা সাহায্য করে। কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি।’ ১৯৭৭ সালে প্রাক্তন স্ত্রী এলিজাবেথ হার্ডরিকের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে নিউইয়র্ক শহরে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান লওয়েল। নিউ হ্যাম্পশায়ারের স্টারক সিমেট্রিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

ছয়
এবার আমরা মেলাব লওয়েলের লেখার সঙ্গে তাঁর জীবন। তাঁর প্রথম কাব্য LowellÕs letter
notes প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ সালে। তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস বিশেষত ক্যাথলিজম, প্রতীকবাদিতা, ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনাবহুল ও সংমিশ্রণিক গড়নে কবিতাগুলো ভরপুর। লওয়েলের অবচেতনে পূর্বতন অধ্যাপক ও কবি জন ক্রু রনসন এবং অ্যালেন টেটের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন টেট – যেখানে তিনি লওয়েলকে ‘ক্যাথলিক কবি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বইটি এক ছোট প্রকাশনী থেকে সীমিত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু পোয়েট্রি পার্টিশন রিভিউয়ের মতো পত্রিকায় তা নিয়ে আলোচনা হয়।
দু-বছর পরে ১৯৪৬ সালে Lord WearyÕs Castle প্রকাশিত হয়। সেখানে নতুন তিরিশটিসহ আগের বইয়ের সংস্কারিত পাঁচটি কবিতা স্থান পায়, যার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য ‘Mr. Edwards and The Spider’ এবং ‘The Quaker Graveyard in Nantucket’। Õ| Lord WearyÕs Castle ১৯৪৭ সালে পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করে। সে-বছরই লওয়েল ‘Guggenheim’ ফেলোশিপ পান। প্রখ্যাত সমালোচক র‌্যানডাল জারেল (Randal Jarrell) Lord WearyÕs Castle সম্পর্কে লিখছেন, ‘It is unusually difficult to say which is the best poem in Lord WearyÕs Castle. Several realized past changing, successes that vary only n scope and intensity other are poems that almost any living poets would be pleased to have written … (and) one or two of these poems I think, will be read as long as man remembers English.’
পুরস্কারের সঙ্গে সঙ্গে লওয়েল লাইব্রেরি ও কংগ্রেসে ‘পোয়েট্রি কনসালট্যান্ট’ হিসেবে কাজ করেন ১৯৪৭-৪৮ সালে (যেটি বর্তমানে U. S. Poet Laureate নামে পরিচিত)। ১৯৫১ সালে প্রকাশিত হয় লওয়েলের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ, The Mills of The Kavanaughs – আগের ইয়ের মতো তুমুলভাবে আলোচিত না হলেও The New York Time পত্রিকায় এর রিভিউ বের হয়। র‌্যানডাল জারেল এই বই সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, ‘The people (in The Mills of The Kavanaughs) often seem to be acting in the manners of Robert Lowell, rather than plausibly us real people act … I doubt many readers will think them real.’
কিন্তু এই বই প্রকাশের পর লওয়েল যেন লেখা ভুলে গেলেন। প্রায় ১০ বছর ভুগলেন রাইটার্স ব্লকে। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে তিনি আবার লেখায় ফেরেন আর প্রকাশ করেন Life Studies, যা অনেকের মতে তাঁর সেরা কাজ। তীব্র, অসংকোচ ও মানসিক সংগ্রামের বর্ণনামূলক ও স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার অনুপম দৃষ্টান্ত Life Studies প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে, যা ১৯৬০ সালে ‘ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। Life Studies শুধু রবার্ট লওয়েলের জীবনের শ্রেষ্ঠ বই নয়, বিংশ শতাব্দীর কবিতার ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে লওয়েল বিখ্যাত এক ভাষণ দেন, যেখানে মার্কিন কবিসমাজকে তিনি ‘cooked and raw’ এই দুই ভাগে ভাগ করেন। এটি আসলে তদানীন্তন বিট ধারা, বিশেষত অ্যালেন গিন্সবার্গ প্রমুখের জনপ্রিয়তার উৎস – জীবনের বিভিন্ন সন্নিবিষ্ট আবেশ সাহিত্যে ব্যবহার করার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। যেই আকর লওয়েল নির্দ্বিধায় নিজের কবিতায় ব্যবহার করেছেন। Life Studies-এ সন্নিবিষ্ট কবিতার ভাষা তাঁর পূর্বোক্ত তিন কাব্যগ্রন্থ থেকে ছিল ভিন্ন। এটির নির্মাণ মুক্ত গদ্য ও ছন্দাবিষ্ট ভাষার মিশ্রণে। বইটিকে লওয়েল ও আমেরিকার কবিতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে অবহিত করা হয়েছে।
এই কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতার ভাবনা-উৎস লওয়েলের ব্যক্তিগত সমস্যা ও পারিবারিক জীবন। বিশেষত তাঁর বাবা, দাদা ও মা এবং পূর্বপুরুষের উল্লেখযোগ্য অন্যতম মূল উপজীব্য, বিশেষত ‘ÔSailing Home from Rapallo’, ‘91 Revere Street’ এবং ‘Commander Lowell’-এ। Õ-G| Life Studies-এর সমালোচনায় সমালোচক (M. L. Rosenthal) এম.এল রোজেনথাল The National Magazine-এর আলোচনায় সর্বপ্রথম এর কাব্যঘরানাকে ‘Confessional’ বলে অভিহিত করেন।
লওয়েলের বন্ধু ও সম্পাদক ফ্রাঙ্ক বিদার্ট (Frank Bidart) পরবর্তীকালে Robert Lowell : Collected Poems-এ লেখেন, ‘Lowell is widely perhaps indelibly associated with the term confessional’, যদিও তিনি ওই আলোচনায় ‘confessional’ নামের যৌক্তিকতা তুলে ধরে কড়া সমালোচনা করেন। কিন্তু ভালো-খারাপ যাই হোক এই ‘confessional’ নামের ছায়ায় একসঙ্গে হলেন একঝাঁক প্রতিভাবান কবি – লওয়েলের নেতৃত্বে যাঁরা ইতিহাসে ‘confessional’ ধারার কবি বলে আজ পরিচিত, যাঁর মধ্যে ডব্লিউ. ডি স্নোডগ্র্যাস, সিলভিয়া প্লাথ, আনা সেক্সটন উল্লেখযোগ্য।
Life Studies-এর পরে প্রকাশিত হয় অনুবাদ কবিতার বই Imitation (১৯৬১), যেখানে ইউরোপের ক্ল্যাসিক ও আধুনিক ধারার উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ছিলেন রিলকে, মনটেইল, বোদলেয়ার, পাস্তারনাক ও রেমব্রান্ড। এই বইটির জন্য পরের বছর তিনি ‘Bollingen Poetry Translation Prize’ পান। এই বইয়ের ব্যাপারে সব সমালোচকের অবস্থান এক ছিল না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছিল বিপরীত। অনেকে গালাগাল পর্যন্ত করেছে। কিন্তু কবি মিচেল হফম্যান Robert Lowell : Collected Poems-এর রিভিউ লিখতে গিয়ে জানাচ্ছেন, ‘Life Studies was Lowell’s best book, Imitations was Lowell’s most ‘pivotal book’, arguing that the book marks the entry into his work of what one might term inter nation style; something coolly open to not-quite-English.’
Imitations-এর ভূমিকা লওয়েল ব্যাখ্যা করেছিলেন তাঁর অনুবাদ-কৌশলে, ‘কেউ যেন এই অনুবাদকে মূল অনুবাদ না ভাবে, এটাকে যেন ‘Imitation’ই ভাবে, অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি মূল কবিদের মতোই স্বাধীনতা নিয়ে করেছি – আর এটা কল্পনা করে যে, ওইসব কবি যদি এই সময় আমেরিকায় বসে লিখত তবে তাদের কাব্যভাষা কেমন হতো – সেই কল্পনার স্বাধীনতাটুকু নিয়েছি।’ একই বছর লওয়েল আরেকটি অনুবাদের কাজ করেন। ১৭ শতকের ফরাসি নাট্যকার জেন রোচিনের নাটক পেড্রির (Phidre) ইংলিশ অনুবাদ করেন – নাম দেন পেড্রা (Phaedra) এবং এর ভালোই সাড়া পেয়েছিলেন। বিশেষত দি নিউইয়র্ক টাইমস থেকে। থিয়েটার-সমালোচক হ্যারল্ড ক্লুম্যান লিখেছিলেন, ‘A close paraphrase of Racine with a slightly Elizabethan tiuge, it nevertheless renders a great deal of excitement Ñ if not the beauty Ñ which exists in the original.’
লওয়েলের পরের বই For the Union Dead ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। Life Studies-এর সংকলনে পরিণত কবিতার মতো এই বইয়ে তাঁর কবিতাগুলো আরো শিথিল, আরো আন্তরিক ও আরো ব্যক্তিগত রূপ নিল। ব্যক্তিগত স্মৃতিমূলক কবিতার পাশাপাশি ছিল ঐতিহাসিক চরিত্র বর্ণনামূলক কবিতা, যেমন ‘ÔCaligula’, ‘onathan Edwards in Western Massachusetts’ এবং ‘Lady RalughÕs Lament’। আবার একেবারে কিছু পাবলিক পোয়েট্রিও ছিল, যেমন আণবিক বোমাবিরোধী চেতনামূলক কবিতা ‘Fall 1961’। পাউলো হায়েস লিখেছিলেন, ‘Lowell turned his attention towards ecology, civil rights, and labor rights … often to the effect of combining the three concern.’
১৯৬৪ সালে লওয়েল The Old Glory নামে একটি ট্রিলজি নাটক লেখেন যা নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে মঞ্চায়িত হয়। ১৯৬৫ সালে এই নাটকটি ‘Best American Play’ অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। লওয়েলের পরের কবিতার বই Near The Ocean প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। এই কবিতার মাধ্যমে লওয়েল আবার প্রথাগত কবিতার ধারায় ফিরে আসেন। এই কাব্যের বৈশিষ্ট্য কিছু শব্দ দিয়ে বোঝানো যাবে, যদি গভীরে তাকানো যায়। আমরা দেখি এর ধরন প্রথাগত, বাক্যগুলো ছন্দের, আবহ সব ছকে মাপা আর বর্ণনাভঙ্গি শিথিল। এই বইয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা ‘Walking Early Sunday Morning’।
ইয়ান হ্যামিলটন যেটাকে ষাটের দশকে লেখা সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাজনৈতিক কবিতা বলে অভিহিত করেছেন।
from this sweet volcanic cone;
peace to our children when they fall
in small war on the heels of small
war – until the end of time
to police the earth, a ghost
orbiting forever lost
in our monotonous sublime.

সাত
১৯৬৭-৬৮ সালে লওয়েল নিরীক্ষামূলক কাব্য জার্নাল লেখেন Notebook, এর বেশিরভাগ ছিল ১৪ লাইন সনেট, যদিও প্রথাগত ‘সনেট কাঠামো’ ও ‘ছন্দ’ বেশিরভাগ কবিতায় ছিল অনুপস্থিত। এ যেন ছন্দ-আবৃত সনেট কাঠামোর এক মুক্ত কবিতার প্রতিভা। লওয়েল লিখেছেন নিজেই – ‘My meter, fourteen line unrhymed blank verse sections, is fairly strict at first and elsewhere, but often corrupts in single line to the freedom of prose.’
লওয়েল এই বইয়ে তাঁর পূর্বপ্রকাশিত বইয়েরও কিছু কবিতা রাখেন, যেমন Lord Weary’s Castle-এ প্রকাশিত ‘In the cageÕ, For the Union Dead-এ প্রকাশিত ‘Caligula’ এবং ‘Night Sweat’, Õ, Near the Ocean- -এ প্রকাশিত ‘To Theodore Roethke’। Notebook-এর লেখার পূর্বকথা বা প্রাকচিন্তা সম্পর্কে লওয়েল লিখছেন স্পষ্ট করে – ‘This is not my dairy, my confession, not a puritan’s too literal pornographic honesty, glad to share private embarrassment, and triumph. The time is summer, an autumn, a winter, a spring, another summer here the poem ends, except for turned back bits of fall and winter 1968 … My plot rolls with the seasons. The separate poems and sections are opportunities and inspired by impulse. Accident threw up subjects and the plot swallowed them famished for human chances. I learn heavily to the rational but am devoted to surrealism … I have taken from many books, used the throwaway conversational inspirations of my friends, and much more that I idly spoke to myself.’
স্টিভেন গোল্ড এক্সিলর্ড লিখছেন যে, এসব সনেট লেখার চিন্তার পেছনে ছিল একটা ভারসাম্য রক্ষার চিন্তা। নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার মধ্যে, সংযোগ ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের সংঘাতের মধ্যে – যা মানুষ তাঁর জীবিত কালের স্মৃতি, জ্ঞান ও স্বপ্নের ভিত্তিতে সঞ্চয় করে। লওয়েল Notebook-এর কাব্য ভারসাম্যের এমন প্রেমে পড়েন যে, এর পরে তাঁর প্রকাশিত তিনটি কাব্যের প্রতিটিতে Notebook-এর পুনর্মুদ্রিত কিছু কবিতা রাখেন। ১৯৭৩ সালে লওয়েল তিনটি বই প্রকাশ করেন। এর মধ্যে History, এবং For Lizzie and Harriet-এর কবিতাগুলো মূলত Notebook-এর পরিমার্জিত রূপ। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্য পর্যন্ত সময়ে বিন্যস্ত ইতিহাসের আলোকে লেখা সব কবিতা ঠাঁই পায় History-তে। লওয়েলের দ্বিতীয় স্ত্রী Elizabeth কন্যা Harriet ও তাঁর বিবাহ-বিচ্ছেদের কাহিনি এবং অন্তর্গত জ্বালা আশ্রয় পেয়েছে For Lizzie and Harriet-এর কবিতাগুলোয়।
লওয়েলের নতুন কবিতা ছিল কেবল সর্বশেষ সনেটধর্মী কাব্য Dolphin-এ যেটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৩-এ। পরের বছর আবার লাভ করেন পুলিৎজার। Dolphin তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী, কন্যা ও নতুন স্ত্রী Caroline Blackwood যাকে আদর করে তিনি Dolphin ডাকতেন – তাঁদের উপাখ্যান। Dolphin প্রকাশের পর চারপাশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কথা ওঠে যে, লওয়েল তাঁর সাবেক স্ত্রী এলিজাবেথ হার্ডউইকের ব্যক্তিগত পত্রের কথা Dolphin-এর কবিতায় মিশিয়েছেন। খুব কাছের বন্ধু ডোনাল্ড হল, অ্যাডরিন রিচ এবং এলিজাবেথ বিশপও ছিলেন সমালোচকদের দলে। বিশপ এই ‘ট্রিলজি’ সনেট কাব্যের Dolphin প্রকাশের আগে পাণ্ডুলিপি পড়ে ১৯৭২ সালের ২১ মার্চ এক ব্যক্তিগত পত্রে লওয়েলের সমালোচনা করেন।
বিশপ লিখছেন, ‘Please believe that I think it is wonderful poetry … I am sure my point is only too plain … Lizzie (Hardwick) is not dead, etc … but there is a mixture of that and fiction [in this book] and you have changed [Hardwick’s] letters. That is infinite mischief, I think … One can use one’s life as material one does anyway … but these letters, are not for violating a trust? If you were given permission, if you had not changed them etc but art just worth that much.’
অ্যাডরিন রিচ এই বিতর্কে ঢুকলেন সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। তিনি বিশপের মতো এমন ব্যক্তিগত পত্র না লিখে আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউয়ে সমালোচনা লিখলেন, যেখানে Dolphin আর To Lizzie and Harriet-এর কবিতাগুলোকে ‘cruel and shallow’ বলে অভিহিত করেন। এতেই ভেঙে যায় লওয়েলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। সমকালীন কজন কবি সমালোচনার বদলে প্রশংসা করেন, যেমন ডিরিক ওয়ালকট, উইলিয়াম মেরেডিথ প্রমুখ। মেরেডিথ Notebook-এর আলোচনায় এতে অন্তর্ভুক্ত কবিতাকে ‘beautiful and major work’ বলেছিলেন। কিন্তু Calvin Bedient-এর মতো সমালোচক নিউইয়র্ক টাইমসের রিভিউতে ‘inchoate and desultory’ বলে রীতিমতো গালাগাল করেন। হাডসন রিভিউতে William Pritchard সমধর্মী বক্তব্য পেশ করেন।
লওয়েলের জীবিতকালে প্রকাশিত সর্বশেষ কাব্য ছিল Day by Day, যা ১৯৭৭ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়। ‘Day by Day’ কবিতায় National Book Critics Circle Award লাভ করে। লওয়েলের ওপরে ডকুমেন্টারিতে National Book Critics Circle Award সম্পর্কে বলেন, ‘A very touching, moving book, tinged with a sense of own pain and the pain (he has) given to others.’
নিজের জীবন, নানা সম্পর্ক ও সম্পর্কের ভাঙন ও নৈতিকতা নানা পোড়ন নিয়ে লেখা Day by Day। ‘Epilogue’ ছিল Day by Day-এর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা – যা ‘confessional poetry’ স্কুলের মূল থিমটাই যেন বহন করেছে।

But sometimes everything I write
with the threadbare art of my eye
seems a snapshot,
lurid, rapid, garish, grouped,
heightened from life,
yet paralyzed by fact.
All’s misalliance.
Yet why not say what happened?
(‘Epilogue’, Day by Day )

আট
লওয়েলের ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য অনুভবের সংমিশ্রণময় কবিতা ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ ধারার অন্যতম পথিকৃৎ হলেও তাঁকে একক অবয়বে চিহ্নিত করা যায় না মূলত জীবনভর তাঁর রচিত নানান ধারার লেখনী ও বোধের মাত্রিক বিন্যাসের কারণে। রবার্ট লওয়েল কখনোই একমাত্রিক বা ধারার কবি ছিলেন না। সামগ্রিকভাবে রবার্ট লওয়েল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি বলে বিবেচিত। তাঁর জীবনীকার Paul Mariani তাঁকে ‘he poet historian of our time’ এবং ‘the last of AmericaÕs influential public poet’ বলে অবহিত করেন।
মার্চ ২০০৪ সালে দি অ্যাকাডেমি অব আমেরিকান পোয়েটস Life Studies-কে বিংশ শতাব্দীর যুগান্তকারী (ground breaking) ঘটনা এবং ‘কনফেশনাল পোয়েট্রি’ নামের কবিতার নতুন ধারা যাত্রা শুরুতে এই বইয়ের অবদান উল্লেখ করে। কনটেম্পরারি লিটারেরি ক্রিটিসিজম (Contemporary Literary Criticism) বইয়ের সম্পাদক সমকালীন মার্কিন কবিদের, বিশেষ করে কনফেশনাল পোয়েট্রির প্রথম জেনারেশনের কবি যেমন সিলভিয়া প্লাথ, অ্যানি সেক্সটন প্রমুখের ওপর লওয়েলের গভীর প্রভাবের কথা বিস্তারিত লেখেন। ১৯৬২ সালে এক ইন্টারভিউয়ে সিলভিয়া তাঁর লেখনীর ওপর Life Studies-এর প্রভাবের কথা অকুণ্ঠ স্বীকার করেন। (যে-লেখাগুলো ওই ইন্টারভিউর সময়কালেই অপ্রকাশিত ছিল এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী টেড হিউজ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতে থাকেন। ‘আমি উদ্বেলিত – এক নতুন কবিতা ধারার উত্থান দেখতে পাচ্ছি। বিশেষ করে রবার্ট লওয়লের Life Studies-এর সূত্রে। খুব সিরিয়াস, খুব গভীর, খুব আবেগীয় প্রকাশের এক নতুন ধারা। আমি আগে ভাবতাম, এভাবে প্রকাশ বুঝি নিষিদ্ধ (taboo)। যেমন লওয়েলের হাসপাতাল বাসের অভিজ্ঞতা বর্ণিত কবিতাগুলো আমাকে ভীষণ আগ্রহী করে তুলেছে।’
১৯৮৫ সালে এক প্রবন্ধে কবি স্ট্যানলি কান্ট (Stanley Kunits) Life Studies-কে টি.এস এলিয়টের The Wasteland-এর পর বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিতার বই বলে অবহিত করেন। ষাটের দশকে লওয়েল ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। জুন ১৯৬৭ সালে তিনি টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ঠাঁই পান। ঞরসব তাকে তাঁর প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে অবহিত করে।
রবার্ট লওয়েল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর অস্থির এক ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখেছিলেন। ইংরেজি ভাষায় এমন অনুপম ভঙ্গিমায় লিখতে এসেছিলেন, যা ছিল ওই ভাষায় অচেনা। কল্পনা করে আনা উপমা নয়, হালকা রঙিন মখমল-মাখা জীবনের লাল-নীল শোভা নয় – এক আখ্যান শুধু। শুধু বলে যাওয়া নিজের কথা, নিজের সময়ের কথা, জীবনের অন্তরঙ্গ বিষাদের কথা যেন তাঁর কবিতায় নিজের জীবনের বিবরণী দিয়ে যাচ্ছেন, এক ধারাভাষ্য, যেন সাক্ষ্য দিয়ে গেলেন নিজের বেঁচে থাকার। কবিতায় কবিরা জীবনকে লুকাতে বেছে নেয় কত আড়াল – যাকে আমরা বলি উপমা। সেই উপমাই যদি জীবনের রঙে রঙিন হয়ে তবে তাই ‘স্বীকারোক্তি’। এমন স্বীকারোক্তি নিজের ও নিজের সময়ের প্রতি অবিচল বিশ্বাস না থাকলে করা যায় না।

দোহাই
১। ‘কনফেশনাল কবি ও কবিতা’, জগলুল আসাদ।
২। Confessional poetry & the artifice of honesty by David Yezzi.
৩। ‘THE ILLNESS AND INSIGHT OF ROBERT LOWELL’ by Dan Chiasson.
৪। Robert Lowell, Setting the River on Fire : A Study of Genius, Mania, and Character By Kay Redfield Jamison.

Leave a Reply