কবিতা-গান-শিল্পের ঝরনাধারায়

লেখক: মতিউর রহমান

মানুষ হলো নদীর মতো
দুজনই তরুণ। একজন সুমনকুমার দাশ, অন্যজন নর্মদা দাশ – আমাদের সঙ্গে কাজ করে, পড়াশোনা-লেখালেখিতে আগ্রহ। তারা আমাকে বলল, ‘আপনি তো সিলেটে যাবেন। এক ঘণ্টা সময়ের জন্য যদি আপনার পুরোনো বন্ধুবান্ধবকে ডাকি, কথা বলেন, তাহলে কেমন হয়?’ বললাম, ভালোই হয়। রফিকুর রহমান আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। এমাদ উল্লাহ্ শহীদুল ইসলাম, কবি তুষার করও আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু। তাদের সঙ্গে যদি দেখা হয়, কথা হয়, তাহলে ভালোই লাগবে, খুব আনন্দ হবে।
এটা যে এত বড় আয়োজন; এত কথা, এত বিষয় আগে ভাবিনি। সুমন বললেন আমাকে কত সব বিষয় নিয়ে বলতে হবে। বললাম, যদি সাড়ে ১১ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়, তাহলে হয়তো আমি কিছু কিছু কথা আপনাদের সামনে বলতে পারব …। আসলে আমি কিছুটা বিব্রত, আপনাদের সবাইকে এখানে ডেকে আনার জন্য। তারপরও আপনারা এসেছেন। এখন ভালো লাগা, খারাপ লাগা, মন্দ লাগা – এটা আপনাদের ওপরে। আমি আমার মতো কিছু কথা আপনাদের জন্য বলতে থাকব। আপত্তি হলে বা বিরক্ত হলে, চলে যেতে চাইলে আপনারা চলে যাবেন। তারপরও আমি বলতে থাকব। দেখি কোথায় গিয়ে শেষ হয়।
আমার লেখা একটি কবিতা পাঠ করলেন তরুণ বন্ধু – ‘মানুষ হলো নদীর মতো’। আসলে এক ভীষণ শীতের সময় – আমি তখন মস্কো হাসপাতালে। সেটা ’৮১ সাল হবে। ইংরেজি তেমন জানি না। কিন্তু লাইব্রেরি থেকে লিও টলস্টয়ের রিসারেকশন নামে একটা বড় উপন্যাস পড়ে ফেলি, বাংলায় অনুবাদ হয়েছে পুনরুজ্জীবন। আপনারা অনেকেই হয়তো পড়েছেন। নাম তো অনেকেই জানেন। এটা টলস্টয়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস কি না জানি না। সবাই বলবে যুদ্ধ এবং শান্তি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। আমার বিবেচনায়, টলস্টয়ের এই পুনরুজ্জীবন বা রিসারেকশন আমার জীবনে পঠিত বইয়ের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই। ওই বইয়ে একটা অনুচ্ছেদ ছিল, যেখানে টলস্টয় বলেছেন, মানুষ হলো নদীর মতো। আমরা সাধারণত মানুষকে বিচার করি ভালো বা খারাপ। অর্থাৎ সরাসরি ‘না’ বা ‘হ্যাঁ’ বলে দিই। নদী যেমন বিশাল, গভীর, হয় সরু, নয়তো চওড়া থাকে, নদীর জল হয় কালো বা ঘন নীল অথবা খুব স্বচ্ছ, মানুষ তেমনই। মানুষ কখনো ভালো, কখনো খারাপ; কখনো উদার, কখনো অনুদার। তাঁর উপদেশ ছিল, এই নদীর মতো করেই মানুষকে দেখতে হবে। সব মানুষের মধ্যেই ভালো থাকতে পারে, খারাপও থাকতে পারে। আমাদের দায়িত্ব হলো মানুষের সেই ভালো দিকগুলোকে, ভালো বিষয়গুলোকে এবং আমাদের যা সফলতা এনে দেবে, যা জীবনকে নতুন করে গড়ে দিতে সাহায্য করবে – আমরা যখন মানুষকে বিবেচনায় নেব – সেভাবে যেন দেখি। অর্থাৎ মানুষ হলো নদীর মতো। নদী যেমন পানির রং বদলায়, রূপ বদলায় – কখনো স্বচ্ছ, কখনো অস্বচ্ছ, কখনো নীল, কখনো গভীর কালো, সে রকম। পুনরুজ্জীবন উপন্যাসের ওই কথাগুলো দারুণ ভালো লেগেছিল আমার। আর সেটাই হয়ে উঠেছিল জীবনের বড় একটা অনুধাবন। এই ভাবনা থেকেই লেখা ‘মানুষ হলো নদীর মতো’ কবিতা। আমি একসময় কবি হতে চেয়েছিলাম। এটিই আমার লেখা শেষ কবিতা। ছাপা হয়েছিল দৈনিক সংবাদ-এ – ১৯৮১ সালে।

সময়ের সেরা
১৯৬১ সালে স্কুল থেকে পাস করে সেই বছরই আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হই এবং ১৯৬৩ সালে কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকি। বাংলাদেশের জন্য সেই সময়টা তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনবিরোধী প্রথম ধর্মঘট হয়, মিছিল হয়। পুলিশের হামলা হয় তাতে। সেই আন্দোলন অব্যাহত থাকে। ’৬২, ’৬৩ এবং ’৬৯ সালে গিয়ে সেই সব আন্দোলন একটা মহান গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্তি পান। সেই ধারাবাহিকতায় ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে সারা পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে কথাগুলো সহজে বলে ফেললাম।
কিন্তু আমরা এটাও যদি উপলব্ধি করি, ’৬২, ’৬৪-এর আগের এক দশক, অর্থাৎ ’৫২ সাল থেকে ’৬২ সাল পর্যন্ত আমাদের বাংলা ভাষা এবং স্বাধিকার অর্জনের লড়াইয়ের মধ্যে ’৫৪-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয় হয়। যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয় হয়। তারপরও বাঙালিদের অভিযাত্রা অব্যাহত থাকে। বাঙালিদের মধ্যে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মানুষদের মধ্যে নতুন একটা জাগরণ তৈরি হয়।
১৯৬২-তে আবার নতুন যাত্রা শুরু হয়। তাহলে কি শুধু ছাত্র-আন্দোলন, রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছে গেলাম? বিষয়টা এত সহজ-সরল ছিল না।
সেই ’৬২ থেকে ’৭১ পর্যন্ত লড়াই-সংগ্রামে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবি, শ্রেষ্ঠ লেখক, শ্রেষ্ঠ গায়ক, শ্রেষ্ঠ শিল্পী, শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী, শ্রেষ্ঠ অধ্যাপকেরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। হয়তো অত সুনাম ছিল না বা অত সেরা নন, সারা বাংলাদেশের প্রতিটি শহরে ছাত্র, তরুণ, স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক যাঁরা ছিলেন, সবাই এক কাতারে, এক ভাবনা-চেতনায় বাংলাদেশের রাজনীতির সকল আন্দোলনের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। কেউ সাংবাদিকতা করেছেন, কেউ গান করেছেন, কেউ কবিতা লিখেছেন, কেউ গল্প লিখেছেন বা ছবি এঁকেছেন। সেই উত্তাল দিনগুলোতে সেই রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে প্রতিটি সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল কর্মকা-ের ধারা যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের মহান একটা গতিধারা তৈরি হয়েছিল, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।
১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে তো বটেই, তার দুই বছর আগে আমরা যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলাম, আসলে পুরো দশকজুড়েই সে-সময়ের প্রায় প্রতিটি ছাত্র আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সাহিত্য আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলন প্রকাশ করতাম। তখন ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তার সব অনুষ্ঠানে অংশ নিতাম, বিভিন্ন পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন, সাহিত্যিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন, রাজনীতির আন্দোলন – সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
১৯৬২ সাল থেকে আমরা সে-সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলাম। ভেতরে-ভেতরে গোপনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গেও সংযুক্ত ছিলাম। সেই সময়ের আন্দোলনের শুরুর দিক থেকে একদিকে যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একটা বড় আন্দোলন গড়ে তুলছিল, তেমনি বামপন্থী সংগঠনগুলোও গোপনে বা প্রকাশ্যে সেই আন্দোলনকে অব্যাহতভাবে শক্তিশালী করেছে। স্বাধিকারের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সেই আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের অনেককে নির্যাতিতও হতে হয়েছে। নেতা-কর্মীদের কারাবরণও করতে হয়েছে। তবু তাঁরা একইভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রমও চালিয়ে গেছেন।
১৯৬২ সাল থেকে ’৭০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সারা দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় বড় কলেজে সারা দেশের সকল নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন বিজয়ী হয়েছে, কখনো ছাত্রলীগ বিজয়ী হয়েছে। একই রকম বা একটু বেশি সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের বিপুল সদস্য সেই সব আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন। আবার বলা যায়, সেই সময় যে সাংস্কৃতিক কর্মকা-, সংগীত নিয়ে যে-কাজ, গানের অনুষ্ঠান, কবিতার অনুষ্ঠান আয়োজন ও সংকলন প্রকাশ – সব বিষয়ে আমাদের ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ, বামপন্থীদের পরিচালিত সংগঠনগুলো অনেক বেশি সক্রিয় ছিল।
সেই সময় উৎসাহের সঙ্গে আমরা যেমন মিছিল-মিটিংয়ে হাজির থেকেছি, তেমনি আমরা পোস্টার করেছি, দেয়ালে-দেয়ালে সেøাগান লিখেছি, মিছিলে মিছিলে সেøাগান দিয়েছি। ঠিক একইভাবে আমরা কবিতা লেখার চেষ্টা করেছি। একইভাবে গানের অনুষ্ঠানের সফল আয়োজন সম্পন্ন করেছি। কখনো শহীদ মিনার, কখনো বাংলা একাডেমির বটতলার বিশাল ময়দানজুড়ে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সেই অনুষ্ঠানগুলো হতো।

গান আর নাটকের স্রোতোধারা
ছাত্র ইউনিয়ন প্রকাশ্যভাবে প্রথম সম্মেলন করে ১৯৬৩ সালে কাপ্তানবাজারের রেলওয়ে ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে। সেখানে সম্মেলন হয়েছিল। ইত্তেফাক-এর সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) প্রধান অতিথির বক্তৃতা দিয়েছিলেন। দুদিনের সম্মেলন শেষে বাংলা একাডেমির বটতলায় দেশাত্মবোধক গানের একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল। সে-অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন শেখ লুতফর রহমান, আবদুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ, সুখেন্দু চক্রবর্তী, জাহেদুর রহীম, ফাহমিদা খাতুন, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী প্রমুখ শিল্পী। তাঁরা ছিলেন সে-সময়ের সেরা সংগীতশিল্পী।
এখানে আমি একটা কথা বলে ফেলি, সেই ’৬২-৬৩ থেকে ১৯৭০-৭১ সাল পর্যন্ত ছাত্র ইউনিয়নের হোক বা সাংস্কৃতিক সংসদের হোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কোনো অনুষ্ঠানেই গণসংগীত ও দেশাত্মবোধক গানের বাইরে অন্য কোনো গান আমরা করিনি। আমাদের দেশের সেরা গণসংগীতশিল্পীরা এসব অনুষ্ঠানে গান গেয়েছেন। যদি আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম বা অন্য কারো গানও করে থাকি, সেখানেও দেশের গান গেয়েছেন আমাদের প্রিয় শিল্পীরা। অর্থাৎ ’৬২ থেকে ’৭০-৭১ সাল পর্যন্ত আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সংগীতের ধারাতে দেশের গান এবং গণসংগীতই ছিল প্রধান। এ প্রসঙ্গে সলিল চৌধুরীর কথা আমাদের মনে পড়ে যায়। আপনারা জানেন, তিনি ছিলেন কলকাতা ও মুম্বাইয়ের সেই সময়ের দারুণ গান রচয়িতা, সুরকার ও গায়ক। সেই চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতবর্ষজুড়ে সেরা গানগুলো তাঁর লেখা, তাঁর সুরে গাওয়া। সেই গানগুলো এখনো বাংলাদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়। গণসংগীতের পাশাপাশি সেই দশকেই কিন্তু আমাদের সেই সংস্কৃতি সংসদ থেকে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাসের দেশ নাটক করেছিলাম ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটে। রক্তকরবী করেছিলাম ১৯৭০ সালে। এখনো আমি মনে করি, সেটি ছিল সেরা অনুষ্ঠান। রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন গোলাম মুস্তাফা। নন্দিনী করেছিলেন কাজী তামান্না। লায়লা হাসান ও আসাদুজ্জামান নূর ছিলেন সেই অভিনয় দলের সদস্য। সংগীত পরিচালনা করেছিলেন ওয়াহিদুল হক। আপনারা জানেন কি না – ‘বিদ্রোহী’ কবিতার একটা নতুন সুর করেছিলেন আলতাফ মাহমুদ। তাঁর সুরে গাওয়া সেটা একদম ভিন্ন রকম ছিল। আমাদের সুযোগ হয়েছিল সে-গানটাকে নৃত্যরূপ দিয়ে সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থাপন করার। আলতামাস আহমেদ সে-সময়ের সেরা নৃত্যশিল্পী ও পরিচালক, তাঁর নেতৃত্বে সেই নৃত্য-অনুষ্ঠানটি হয়েছিল।
ধরুন গান, নাটক, অভিনয়, সংকলন ও প্রকাশনা – এই কাজগুলো আমাদের ছাত্র ইউনিয়ন ও সংস্কৃতি সংসদের কর্মীরা মিলে করতাম। তাঁদের মধ্যে আমিও ছিলাম একজন। এসব কাজের সুবাদে সে-সময়কার বাংলাদেশের সেরা মানুষগুলোর সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত পরিচয়, যোগাযোগ তৈরির সুযোগ হয়। গানের মানুষদের মধ্যে শেখ লুতফর রহমান, আলতাফ মাহমুদ, সুখেন্দু চক্রবর্তী, সন্জীদা খাতুন, জাহেদুর রহীম, ফাহমিদা খাতুন, অজিত রায়, মাহমুদুন্নবী, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী প্রমুখের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। প্রত্যেকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তাঁদের জীবন শেষ হওয়া পর্যন্ত টিকে ছিল। এখনো যারা বেঁচে আছেন, তাঁদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, যোগাযোগ, সেই বন্ধুত্ব অব্যাহত আছে। আমরা কেউ সেই দিনগুলোর কথা ভুলে যাইনি।

সেরা সব সংকলন
এখনো মনে আছে, ১৯৬৩ সালে প্রথম ছাত্র ইউনিয়নের একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল পদক্ষেপ নামে। তারপর ধারাবাহিকভাবে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে প্রতিধ্বনি (১৯৬৪), বিক্ষোভ (১৯৬৫), ঝড়ের খেয়া (১৯৬৬), সূর্যজ্বালা (১৯৬৭), অরণি (১৯৬৮), নিনাদ (১৯৬৯) ইত্যাদি নামে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে একুশে সংকলন প্রকাশ করেছি। সে-সময় এগুলো শ্রেষ্ঠ সংকলন বলে স্বীকৃত ছিল। প্রায় প্রতিটি সংকলন প্রকাশের সঙ্গে আমার ছিল সক্রিয় সম্পৃক্ততা।
আমাদের সেই সময়ের সংকলন প্রকাশ করতে গিয়ে সেরা লেখকদের লেখা ছেপেছি। ছাত্র ইউনিয়নের সংকলনের লেখা সংগ্রহ করতে গিয়ে কবি শামসুর রাহমান, চিত্রপরিচালক ও ঔপন্যাসিক জহির রায়হানের সঙ্গে পরিচয় হয়। আরও অনেক কবি, অনেক লেখক। নাম বললে তালিকাটা দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাঁদের সঙ্গে আমাদের পরিচয়, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়েছিল। এখনো কিন্তু তাঁদের পরিবারগুলোর সঙ্গে, তাঁদের সন্তানদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রয়ে গেছে। তাঁদের সঙ্গে এখনো কিছু না কিছু কাজ করার চেষ্টা করি। সাংবাদিক হিসেবে তখন খ্যাতনামা ছিলেন (যাঁদের আমরা খুবই ভক্ত ছিলাম) জহুর হোসেন চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত, আহমেদুর রহমান, আলী আকসাদ, মইদুল হাসান, তোয়াব খান প্রমুখ। আরও অনেক নাম বলা যায়, যাঁদের সঙ্গে একটা আদর্শিক সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল, যা এখনো আমরা বুকের মধ্যে লালন করি। তাঁদের কথা আমাদের মনে পড়ে। মনে পড়ে, ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাস অবলম্বনে নাটক হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান-সোভিয়েত মৈত্রীর উদ্যোগে। সেটার পরিচালক ছিলেন হাসান ইমাম। নায়ক পাভেল হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন। মা হয়েছিলেন রওশন জামিল। সেরা সব অভিনয়শিল্পী –
তখনো সেরা, এখনো সেরা। ১৯৬৭ সালে পল্টন ময়দানে দুদিন ধরে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ৫০তম বার্ষিকীর বিরাট অনুষ্ঠান হয়েছিল। শহীদুল্লা কায়সার ও আলতাফ মাহমুদ এই অনুষ্ঠানের সবকিছু করেছিলেন। বন্ধু আবুল হাসনাতের বড় ভূমিকা ছিল।
খ্যাতনামা অভিনেতা আবুল হায়াতের ৭৫তম জন্মবার্ষিকী পালিত হবে, সে উপলক্ষে একটা বই বেরোবে। আমি সে-সময়ের কথা লিখতে পারি কি না, তিনি অনুরোধ করেছেন। আমি তো অবশ্যই লিখব। হায়াত ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় ১৯৬৮ সালে। ১৯৬৯ ও ৭০ সালে আমাদের ছাত্র ইউনিয়ন ও সংস্কৃতি সংসদের বেশ কয়েকটি নাটকে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। এখনো তিনি সে-স্মৃতিগুলো মনের গভীরে লালন করেন।
সে-সময় আমাদের সংকলন প্রকাশনা, মঞ্চ সাজানো, আমাদের কার্ড তৈরি করা বা আমন্ত্রণপত্র তৈরি করা ইত্যাদি কাজের জন্য আমরা যেতাম শিল্পী কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী, আবদুল মুকতাদির, নিতুন কুন্ডু, দেবদাস চক্রবর্তী, প্রাণেশ কুমার ম-ল প্রমুখের কাছে। আমরা আন্দোলনের একটা বড় পর্যায়ে ১৯৬৯ ও ৭০ সালে শহীদ মিনারের সামনে বড় বড় দেয়ালজুড়ে ১৪টি বা ১৬টি চিত্রকর্মের প্রদর্শনী করতাম। সেখানে থাকত বায়ান্ন থেকে উনসত্তর পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের আন্দোলনের ঘটনাবলিকে অবলম্বন করে চিত্রকর্ম। এ-আয়োজনে পোস্টার কালার দিয়ে বড় বড় ছবি আঁকতেন শিল্পী ইমদাদ হোসেন, কাইয়ুম চৌধুরী, নিতুন কুন্ডু, মুস্তাফা মনোয়ার, রফিকুন নবীসহ আরও অনেক তরুণ শিল্পী। ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে শহীদ মিনারের উল্টো দিকে সত্তর সালের প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেছিলেন শহীদ মতিউরের পিতা আজাহার আলী মল্লিক। আপনারা দেখুন, কী বৃহত্তর পরিসরে সে-সময়ের আমাদের ছাত্র-আন্দোলন, সাংস্কৃতিক-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সারা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ লেখক, শিল্পী, কবি, গায়ক ও অভিনেতাদের আমরা যুক্ত করতে পেরেছিলাম। বহুজনের মিলিত প্রচেষ্টাতেই কিন্তু এই বিশাল এবং বড় বড় আন্দোলন ও সংগ্রাম হয়েছে। এখনো পেছন ফিরে তাকালে আমরা উত্তাল তরঙ্গমালার সময়কে পরিষ্কার দেখতে পাই। একদিকে সরাসরি রাজনৈতিক আন্দোলন, তার পাশাপাশি সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, গান, সিনেমা সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটা মহামিলনের স্রোতোধারা গিয়ে মিলেছিল মুক্তিযুদ্ধে – একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে। এটা একটা ঐতিহাসিক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা যে, দেশের সকল ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষ স্বাধীনতাসংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলেন। এই বিপুল স্রোতোধারার সঙ্গে, তার পেছনে, তার সামনে আমরাও ছিলাম। এসব মহা কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে আমার জীবনের, আমার পছন্দের, ভালো লাগার, ভালোবাসার, আমার সবচেয়ে অনুপ্রেরণাকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তাঁদের প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
আমার জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত যদি কেউ করে থাকেন, তিনি আমাদের রণেশদা – রণেশ দাশগুপ্ত। তাঁকে আমার জীবনের প্রথম ও একজন প্রধান আদর্শ বলে মনে করি। আমার আকাশভরা সূর্যতারা নামে একটি বই আছে। সেখানে আমাদের সময়ের সেই মহান মানুষগুলো সম্পর্কে আমার লেখা আছে। রণেশ দাশগুপ্ত সম্পর্কেও লেখা আছে। সেই বইয়ে আরও যাঁদের নিয়ে লেখা রয়েছে, তাঁরা হলেন কামরুল হাসান, শহীদুল্লা কায়সার, আলতাফ মাহমুদ, জহির রায়হান, মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, ভারতের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শিল্পী পরিতোষ সেন, কবি অরুণ মিত্র, শিল্পী ও লেখক পূর্ণেন্দু পত্রী প্রমুখ।

কবিদের কাছাকাছি
কবি শামসুর রাহমানের কাছে কবিতা চাইতে গিয়েছিলাম ১৯৬৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। তিনি চার দিন পর তাঁর বাসায় যেতে বললেন। সেই আওলাদ হোসেন লেনের পুরান ঢাকার বাসা। আমি গেলাম। ‘আমার স্বরের ডালে’ কবিতাটা তিনি লিখেছিলেন আমাদের একুশে সংকলনের জন্য। সেই কবিতাটির মধ্যে ফরাসি দেশের প্রতিরোধযুদ্ধের প্রখ্যাত কবি লুই আরাগঁকে উল্লেখ করেছেন বারবার। গভীর কণ্ঠে তিনি কবিতাটি পাঠ করে শোনালেন। সেদিন সকালের সেই আবেগঘন মুহূর্তের কথা ভুলব না কোনো দিন। আরও বললেন, ‘আমি কিন্তু রাহমান লিখি, রহমান না। এটা অনেকেই ভুল করেন।’ আমি জীবনে আর এটা ভুল করিনি, সব সময়ে মনে রেখেছি শামসুর রাহমান। একইভাবে সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং অনেক দুর্লভ সময় কাটানোর কথাও মনে পড়ে। সে-সময়ের মানুষগুলো এবং দিনগুলোকে আমাদের পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।
ওই যে বললাম শুরুতে, বামপন্থী ছিলাম, বামপন্থী শিল্পী ও লেখকদের পছন্দ করতাম।
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে। আর সেই ঘনিষ্ঠতা তাঁর মৃত্যুর আগপর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তাঁর সঙ্গে আসলে আরও বেশি করে ঘনিষ্ঠতার শুরু ১৯৮৭ সাল থেকে। তার আগেও ঢাকা ও মস্কোতে দেখা হয়েছে দু-তিনবার। তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সেই জিন্দাবাহার-এর লেখক-শিল্পী পরিতোষ সেনের সঙ্গে। ঢাকার জিন্দাবাহারের মানুষ। তাঁকে জিন্দাবাহারের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাঁর মুন্সিগঞ্জের গ্রামের বাড়িতেও নিয়ে গিয়েছিলাম।
অরুণ মিত্রের সঙ্গেও পরিচয় হয়। অরুণ মিত্রের নাম শুনেছেন আপনারা? অরুণ মিত্র কবি, ফরাসি ভাষায় পিএইচ.ডি করেছিলেন প্যারিসের সরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বামপন্থী ছিলেন। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, তাঁর লেখা ভালো লেগেছে। তো, ভারতের আরও শিল্পী গণেশ পাইন, বিকাশ ভট্টাচার্য, যোগেন চৌধুরী আর পূর্ণেন্দু পত্রীর নাম নিশ্চয়ই অনেকে জানেন। তাঁদের সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁদের সম্পর্কে আমার ওই বইয়ে লেখা আছে। বলতে পারেন সম্পর্কের স্মৃতিকাতরতা আছে। অরুণ মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও পূর্ণেন্দু পত্রীর প্রায় সব বই আমার সংগ্রহে আছে। সেই মানুষগুলো, তাঁদের সৃষ্টিকর্মগুলো এখনো আমাকে গভীরভাবে উৎসাহিত, আনন্দিত ও প্রভাবিত করে চলেছে। আজ জীবনের এই প্রান্তে এসে, মানে যখন মৃত্যুর সামান্যই সময় হয়তো বাকি আছে, সেই লেখকদের কথা মনে করি। তাঁদের স্মৃতিই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এর চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না এক জীবনে।
এই বাংলাদেশের কিংবা বাংলা ভাষার সেরা মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়া, ঘনিষ্ঠ হওয়া এবং তাঁদের সঙ্গে মানবিকতার এবং আদর্শের একটা মিল ছিল। আবার ভারতবর্ষে আমি যাঁদের সঙ্গে মিশেছি, সকলেই বামপন্থী ছিলেন না। কিন্তু উদার, মানবিকতার প্রতীক ছিলেন তাঁরা।

ছবি কথা বলে
এভাবেই আমাদের সেই পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশি ও নব্বই পেরিয়ে আমরা বর্তমানে নতুন শতাব্দীর ২০১৯ সালে আপনাদের সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছি। তো এটা আমি যদি বলি, দেখেন কী রকম একটা জীবন হয়ে যায়। এই বাংলাদেশের সেরা শিল্পীদের সঙ্গে নানা কাজের মধ্য দিয়ে আমাদের যোগাযোগ হয়েছিল। তাঁরা অনেকেই কিন্তু প্রথম আলোর সঙ্গে কাজ করেছেন। হঠাৎ কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যু হলো বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মঞ্চে – বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান উচ্চাঙ্গসংগীতের আসরে। তিনি আমাদের সঙ্গে প্রথম আলোর প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন। সব কাজে আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তাঁর পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজ করিনি। এখন তাঁর হাতের লেখা থেকে একটা টাইপোগ্রাফি আমরা তৈরি করছি ‘কাইয়ুম হরফ’ নামে। কিছুটা ব্যয়বহুল হলেও এটা আমরা করছি তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য। তাঁর হস্তাক্ষরের অবিকল হরফ ব্যবহার করে মাঝেমধ্যে আমাদের পত্রিকার শিরোনামগুলো করা হয়। আমাদের ইচ্ছে ছিল তাঁর হাতের লেখা থেকে কম্পোজ ও ছাপার যোগ্য টাইফোগ্রাফি তৈরি করার। সেটা করা গেল না। কিন্তু তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে বলেন, আমাদের ভালো লাগা থেকে বলেন, কাইয়ুম চৌধুরীর হস্তাক্ষর থেকে বড় হরফে একটা টাইপোগ্রাফি তৈরি করছি।
শিল্পকলার কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ল, আমরা পড়তাম নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। পরপর আমরা তিন ভাই ওই স্কুলে পড়েছি।
তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম এবং সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের ড্রয়িং শিক্ষক ছিলেন মোহাম্মদ কিবরিয়া। মোহাম্মদ কিবরিয়ার নাম হয়তো আপনারা অনেকেই জানেন। ১৯৫৭ বা ৫৮ সালে তিনি পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ শিল্পীর স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। দেশের একজন প্রধান শিল্পী ছিলেন। আজ ভাবতে অবাক লাগে, তাঁর মতো খ্যাতিমান শিল্পী ছিলেন আমাদের স্কুলের ড্রয়িং টিচার। তিনি যাওয়ার পর আমাদের ড্রয়িং টিচার হয়ে আসেন মুর্তজা বশীর – ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে। নাম ছিল বশীরুল্লাহ্। বাবার পরিচয় থেকে আলাদা হওয়ার জন্য নিজের নাম বদলে ফেলেন, হয়ে যান মুর্তজা বশীর। এই সেরা শিল্পী এখনো বেঁচে আছেন। তারপর আসেন আরেকজন শিল্পী – কাজী আবদুল বাসেত। তিনি ১৯৬২ বা ’৬৩ সালে সারা পাকিস্তানের সেরা শিল্পীর সম্মান পেয়েছিলেন।
বন্ধু সুমনকুমার দাশ বললেন, আমি ছবি সংগ্রহ করি। হ্যাঁ, আমি ছবি সংগ্রহ করি। তাঁদেরই ছবি আমি সংগ্রহ করি, যাঁদের সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় ছিল বা ঘনিষ্ঠতা ছিল। যাঁদের জীবন থেকে তাঁদের ছবিগুলোকে বুঝতে পারি। যাঁদের আমি জানি-বুঝি, যাঁদের আমি ভালোবাসি, তাঁদের স্মৃতি আমি রক্ষা করতে চাই।
আমার সংগ্রহের মধ্যে আছে কামরুল হাসানের চিত্রকর্ম। বাংলাদেশের একজন শিল্পী, আমি মনে করি যিনি বিশ্বমানের শিল্পী ছিলেন। কিন্তু আমাদের অবহেলার কারণে তিনি সে জায়গায় পৌঁছাতে পারেননি। আমার সংগ্রহে কামরুল হাসানের শিল্পকর্মের সঙ্গে আছে মোহাম্মদ কিবরিয়া, সফিউদ্দীন আহমেদ, রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী, কাজী আবদুল বাসেত, রফিকুন নবী প্রমুখের শিল্পকর্ম। পরের প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে শহীদ কবির ও কাজী গিয়াস উদ্দিনের শিল্পকর্ম সংগ্রহ করেছি। ভারতে আমার যাওয়া-আসা ছিল বলে সেখানকার অনেক শিল্পীর সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাঁরা আমাকে তাঁদের ছবি উপহার দিয়েছেন। অল্প অর্থেও কিছু ছবি সংগ্রহ করেছি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, পরিতোষ সেন, কে জি সুব্রামানিয়ান, গণেশ পাইন, বিকাশ ভট্টাচার্য, যোগেন চৌধুরী – তাঁরা ভারতের শ্রেষ্ঠ শিল্পী, তাঁদের ছবি আছে।

গানের গগনতলে
এ তো গেল শিল্পকলা। যদি বলেন গানের কথা, সেই শৈশব থেকে শুনছি, এখনো শুনি। এখনো আমার প্রিয় গান গণসংগীত। ষাটের দশকের গান ও গণসংগীত-পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃত হয়েছে। ঢাকায় যাঁরা গণসংগীত করেছেন, দেশের গান করেছেন, কলকাতায় যাঁরা গণসংগীত করেছেন, দেশের গান করেছেন, তাঁদের মধ্যে এখনো সলিল চৌধুরীর গানই শ্রেষ্ঠ। এরপর দলীয় কণ্ঠে গান করতেন রুমা গুহঠাকুরতা। আপনারা জানেন, কিশোর কুমারের প্রথম স্ত্রী ছিলেন রুমা গুহঠাকুরতা। কিশোর কুমার ছিলেন অভিনেতা, গায়ক, পরিচালক, আরও অনেক কিছু। রুমা গুহঠাকুরতা সব সময় বামপন্থার সমর্থক ছিলেন। বেশ কয়েক মাস আগে তিনি মারা গিয়েছেন। রুমা গুহঠাকুরতার ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের বৃন্দ গানগুলো শ্রেষ্ঠ। তো গান শুনি, এখনো গণসংগীত শুনি। ভালো লাগে রবীন্দ্রসংগীত। দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, রেজওয়ানা চৌধুরীসহ আরও অনেকের গান। আধুনিক গান শুনি না বা প্রেমের গান শুনি না, তা তো হতে পারে না। ইংরেজি গানও শুনি। যৌবনে নাট কিং কোলের বড় ভক্ত ছিলাম – এখনো মাঝেমধ্যে শুনি। জোয়ান বায়েজ, সেই প্রতিবাদী প্রতিষ্ঠিত গায়িকা একাত্তরে গেয়েছিলেন ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ – সে গানটা শুনি। অনেক গান শুনি। পুরোনো বা নতুন আরও অনেকের গান। গ্রিক সুরকার ইয়ানির অনেক কনসার্ট শুনি ইউটিউবে।
কবিতা পড়ি, গল্প-উপন্যাস পড়ি, আত্মজীবনী বা জীবনীগ্রন্থ পড়ি, রাজনীতির বই পড়ি। সবচেয়ে কম পড়ি হলো সাংবাদিকতার বই। সাংবাদিক হয়ে গেলাম দৈবক্রমে, হঠাৎ করেই। অন্য কিছু পারি না। এটার মধ্যে ঢুকে গিয়ে টিকে থাকতে হয়, চেষ্টা করতে হয়। বাধ্য হয়েই কিন্তু সাংবাদিক হওয়া। সেটা আরও অনেক বড় কাহিনি।

খাপড়া ওয়ার্ডের মানুষগুলো
রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম প্রায় তিন দশক। আমি রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছি ১৯৯১ সালে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কেন? এ নিয়ে অনেক বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু মনের ভেতর থেকে সেই প্রথম ভালোবাসা যায় না। পরে বিভক্তি, বিচ্ছেদ বা যত দুঃখ-বেদনার মধ্য দিয়ে আমাদের এই অবস্থানের পরিবর্তন হোক না কেন, একটা ভালোবাসা থেকেই যায়। আমি দল ছেড়ে দেওয়ার পর আমার সেই পার্টি অনেকভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আমি কোনো বিভক্তি বা কোনো গ্রুপ-পাল্টা গ্রুপ কিংবা নব্য দলে যোগ দিইনি। আমি সবাইকে বলি, মাই ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট পার্টি ইজ সিপিবি। এখনো আমি চর্চা করি সবচেয়ে বেশি, হোয়াই গর্বাচেভ হ্যাপেন্ড – কেন সমাজতন্ত্র ভেঙে গেল? কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটল? কেন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র টিকে থাকতে পারল না? কেন আরও অন্য দেশগুলো এই পথে অগ্রসর হয়ে, ব্যর্থ হয়ে চুরমার হয়ে গেল? আফগানিস্তান বলি, ইথিওপিয়া বলি, সোমালিয়া বলি – নানা দেশের কথা বলতে পারি। চীন ও ভিয়েতনামে সমাজতন্ত্র আছে। কতটুকু সমাজতন্ত্র, কতটুকু ধনতন্ত্র – এই নিয়ে বিতর্কের তো কোনো শেষ নেই। কিউবার চেষ্টা অব্যাহত আছে। দেখি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। সেটা হলো আরেকটা দিক।
সমাজতন্ত্রের আন্দোলন, সমাজতন্ত্রের সাহিত্য পড়াশোনা করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরের শেষে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হলাম। আমার নেতা অধ্যাপক আবদুল হালিম আমাকে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র শিখার একটি সংখ্যা পড়তে দিয়েছিলেন। খাপড়া ওয়ার্ডের শহীদদের স্মৃতি নিয়ে শহীদ স্মৃতি সংখ্যা। উইপোকায় খাওয়া সেই সংখ্যাটা এখনো আমার কাছে আছে। ২৪ এপ্রিল ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের উন্মত্ত গুলিবর্ষণে সাতজন রাজবন্দির মৃত্যু হয়েছিল। আরও ১৮-২০ জন গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনাটি আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। এসব ভাবতে ভাবতে আমি কিছু কাজ শুরু করলাম আশির দশকে। ’৮২ থেকে ৯০, ৯০ থেকে ৯১-৯২ পর্যন্ত। তার মধ্যে ভোরের কাগজ (১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি) শুরু করলাম, প্রথম আলো শুরু করলাম ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর। আমার সকল সময় এই দুই পত্রিকার পেছনে চলে গেল। কিন্তু আমি আমার এই চেষ্টার মধ্য দিয়ে কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে যাঁরা ছিলেন – আসামে, জলপাইগুড়িতে অথবা ঢাকায়, পাবনায়, ফরিদপুরে – তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। করতে করতে একপর্যায়ে গিয়ে উদ্যোগটা প্রায় থেমে গেল।
একে একে সেই সময়ের রাজশাহী জেলের বন্দিদের সবাই মৃত্যুবরণ করলেন। নানা ক্ষেত্রে, নানা জায়গায়, নানা সময়ে এই রাজবন্দিদের আত্মত্যাগ নিয়ে ভেবেছি। শেষ পর্যন্ত সেই শহীদ, সেই আহত, সেই বন্দি – যাঁরা বেঁচে ছিলেন এবং তারপরও তাঁদের সারা জীবন দুঃখ-বেদনাগুলো বহন করে চলেছেন, সেই মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না খাপড়া ওয়ার্ডের ঘটনা। সেই স্মৃতি মনে রেখে অনেক কষ্ট করে শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে আমি খাপড়া ওয়ার্ডের সেই নৃশংস, নির্মম হত্যাকা- নিয়ে – আমার যতটুকু তথ্য সংগ্রহ করা ছিল, সেসব কিছু মিলিয়ে একটি বই প্রকাশ করেছি – নাম খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকা- ১৯৫০। তাঁদের কথা মনে করে বইটা প্রকাশ করতে পেরে মনে একটু তৃপ্তি পাই। কিন্তু দুঃখ এই, এক সত্যরঞ্জন ভট্টাচার্য্য (১৯৩৩-২০১৬) ছাড়া অন্যরা কেউ সেই বইটা দেখে যেতে পারলেন না। তাঁরা খুব করে চেয়েছিলেন, অন্ততপক্ষে বইয়ের মধ্য দিয়ে তাঁদের কথা বাংলাদেশের মানুষের কাছে থেকে যাবে, তাঁদের কথা নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে।

একজন নুরুন্নবীর কথা
খাপড়া ওয়ার্ডের আহতদের মধ্যে একজন ছিলেন নুরুন্নবী চৌধুরী। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ছিলেন। দেশভাগের পর কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্তে নুরুন্নবী চৌধুরী এই বঙ্গে চলে আসেন কমিউনিস্ট রাজনীতি করতে। পরে তিনি গ্রেপ্তার হন। খাপড়া ওয়ার্ডে তিনিও ছিলেন। ওই দিনের গুলিতে আহত হন। তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়। তাঁর সঙ্গে যখন আমি ’৮৮ সালে দেখা করি, তখন তিনি একটা ক্রাচে ভর করে হেঁটে এসে আমার সঙ্গে হাত মেলালেন। সে দিনের কথা মনে পড়লে এখনো আমার গায়ে শিহরণ তৈরি হয়। তাঁকে নিয়ে আমি একটি লেখা লিখেছিলাম ১৯৮৮ সালে – ‘স্টোরি অব আ রিয়েল ম্যান’ শিরোনামে। এই নামে একটা বিখ্যাত উপন্যাস ছিল দুই খ-ের। রাশিয়ান লেখক বরিস পলেভয়ের লেখা।
মনে পড়ছে, আমি ’৮৮ সালের কোনো একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কলকাতাজুড়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ফেরার সময়ে অফিসফেরত মানুষের দারুণ ভিড়। তখন আমি সার্কুলার রোডের ক্রসিংয়ে। ট্রাম, বাস, ট্যাক্সি ও মানুষের গাদাগাদির মধ্যে আমি দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তা পার হব। আমার বুকের ভেতরে তখন ঈষৎ কম্পন। আমি একা নই। আমার সঙ্গে একজন, যাঁর সঙ্গে সেদিন বিকেলে আমার সরাসরি পরিচয়। তিনি দুই ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনিও কলকাতার সন্ধ্যার এই ভিড় অগ্রাহ্য করে রাস্তা পার হবেন আমার সঙ্গে। আমরা যাচ্ছি রাস্তার ওপারে এক স্টুডিওতে তাঁর ছবি তুলতে। তাঁর একটা ছবি আমি রাখতে চাই। তিনি নুরুন্নবী চৌধুরী, বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়েছে ঊরু থেকে – ৩৮ বছর আগে। আর এই ৩৮ বছর ধরে তিনি দুই ক্রাচে ভর দিয়ে চলেছেন। তখন তাঁর বয়স ৬০। কিন্তু দেখলে বোঝা যায় না। সুন্দর সৌম্য চেহারা। যুবা বয়সের সুঠাম দৈহিক গড়ন আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না।
আমি সেই লেখা থেকে কিছুটা পড়ছি : ‘সব কথা শেষ করে সেদিন নুরুন্নবীর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য যখন উঠে দাঁড়ালাম, তখন আমার ভেতরে আবার সেই কম্পন। বেদনাহত মনে শক্ত হাতে তাঁর হাত ধরে যখন বিদায় নিচ্ছি, তখন দুই ক্রাচে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, “আমৃত্যু আদর্শের প্রতি অবিচল থাকব। বাংলাদেশের মানুষের সকল প্রয়াসের প্রতি আমার অফুরান শ্রদ্ধা।”’
নুরুন্নবীকে সেদিন সন্ধ্যায় শেষ কথা কী বলেছিলাম, সেটা এখন মনে নেই। হয়তো তাৎপর্যপূর্ণ কিছুই বলতে পারিনি। ট্রামের জন্য হাঁটতে হাঁটতে পেছনে ফিরেও তাকাতে পারিনি। কেন পারিনি? এমন সত্য, এমন বাস্তবের ‘স্টোরি অব রিয়েল ম্যান’-এর সামনে দাঁড়িয়ে কী বলতে পারি আমি?
এই ঘটনা সত্য, এই মৃত্যু সত্য, আমাদের জীবনের দুঃখ-বেদনাও সত্য। কিন্তু আর একটি সত্য হলো : ১৯৫০ সালের সেই ২৪ এপ্রিল রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডের ভেতর এই বামপন্থী রাজনীতিবিদদের, এই বন্দি রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতিরোধ বা অভ্যুত্থানের চেষ্টা ভুল ছিল। দুঃখজনক হলো, ১৯৪৮ সালে ভারত-বিভক্তির পর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’। এটাকে ভেঙে ফেলতে হবে। শ্রমিক আর কৃষকের লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সদ্য পাকিস্তান হয়েছে, সদ্য ভারত হয়েছে। এই সেø­াগান মানুষের মনে দাগ কাটেনি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে সে-সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিও এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে এই বাংলাদেশজুড়ে, ভারতবর্ষজুড়ে বামপন্থী কমিউনিস্টরা নানা ক্ষেত্রে নানাভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধের চেষ্টা করে। সকল ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়। সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপগুলো ভুল না হলে ভারতের বিভিন্ন জেলের ভেতরে প্রায় ৮৪ জন কর্মীকে এভাবে করুণ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হতো না। এখন বলতে পারেন, তারপরও আপনার এত সহানুভূতি কেন? ওই যে বললাম, মানুষ তো মানুষই। প্রবল বিশ্বাস থেকে, অকৃত্রিম আদর্শ থেকে, সিদ্ধান্ত নেওয়া লক্ষ্য থেকে তাঁরা মৃত্যুকে পর্যন্ত আলিঙ্গন করেছেন। এই আত্মত্যাগের প্রতি তো আমাদের নিন্দা ও সমালোচনা করার জায়গা নেই।

মানুষ পারে
এই প্রসঙ্গেই আপনাদের বলি, আমার জীবনে বামপন্থী লেখক রণেশ দাশগুপ্ত এক বড় প্রেরণা, আরেক অনুপ্রেরণা চে গুয়েভারা। চে গুয়েভারা সমাজ পরিবর্তনের জন্য সম্মুখ গেরিলা যুদ্ধে বলিভিয়ার জঙ্গলে ১৯৬৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তখন বাংলাদেশে আমাদের ছাত্র-আন্দোলন চলছে দুর্দান্ত বেগে। আমরা তো জানি, কিউবার বিপ্লবে ফিদেল কাস্ত্রোর পাশে চে গুয়েভারা ছিলেন। চে গুয়েভারাই কবি পাবলো নেরুদাকে বলেছিলেন, একবার যদি আমরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি, যুদ্ধ ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না। নেরুদা সে-কথা শুনে চমকে উঠেছিলেন।
কিউবায় বিপ্লবের পর তিনি ষাটের দশকের শুরুতে কঙ্গোতে গিয়েছিলেন সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করতে। কঙ্গোর অভিযান চেষ্টায় চে গুয়েভারা ব্যর্থ হন। ফিরে আসেন তানজিনিয়ায়। দেশে ফিরতে চাননি। কাস্ত্রো তাঁর স্ত্রীকে পাঠিয়ে তাঁকে বুঝিয়ে চেকোসেø­াভাকিয়ার রাজধানী প্রাগে নিয়ে আসেন। তবু তিনি কিউবাতে ফিরে যেতে চাননি। তিনি আবারও কোনো নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে চান, যেখানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি সশস্ত্র লড়াই করবেন। একপর্যায়ে তিনি কিউবায় ফিরে এলেন। স্থির করলেন বলিভিয়ায় যাবেন বিপ্লবী লড়াই করতে। কাস্ত্রো তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, বলিভিয়া লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। বলিভিয়ার রাজনৈতিক সংগঠন প্রস্তুত নয়, বলিভিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি প্রস্তুত নয়। কিন্তু তিনি যাবেনই। শেষ পর্যন্ত কাস্ত্রো রাজি হন এবং চে বলিভিয়ায় যান। ১১ মাসের মধ্যে কঠিন অবস্থায় করুণ মৃত্যু হয়
চে-র। করুণ কিন্তু সাহসী, দুঃখজনক কিন্তু একটা প্রচ- উদ্দীপনাময় চে বিদায় নেন এ-বিশ্ব থেকে। আপনারা কেউ যদি চে-র গুলিবিদ্ধ নিথর শুয়ে থাকা মরদেহের ছবি দেখেন, দেখবেন স্মিত হাসি, চোখ আংশিক খোলা, কী রকম একটা দুর্দান্ত রূপ – অনেকে বলেন, যিশুখ্রিষ্টের মতো। বলিভিয়ায় তাঁর সশস্ত্র সংগ্রামের সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ তো শত, সহস্র, লক্ষ, কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত, উৎসাহিত করে এখনো। আমি চে গুয়েভারা দ্বারা খুবই অনুপ্রাণিত। চে গুয়েভারার কবিতা অনুবাদ করেছি। থাকলে আপনাদের একটু পাঠ করে শোনাতে পারতাম। তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন – ‘কাস্ত্রোর জন্য’। চে গুয়েভারা ব্যাপক পড়াশোনা করেছেন। অসংখ্য বিষয়ে পড়াশোনা ছিল তাঁর। সারা জীবন হাঁপানিতে অসুস্থ ছিলেন। এই শত বছরের পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ, সুন্দর মানুষ; চেহারায়, দেহ-বৈশিষ্ট্যে, আচরণ ও কথাবার্তায় সুন্দর, দারুণ দুর্দান্ত এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের নাম চে গুয়েভারা। চে-র ওপরে আমি এবং আমার বন্ধু মঞ্জুরুল হক মিলে একটা বই করেছি। বইটির নাম চে : বন্দুকের পাশে কবিতা। তিনি ভীষণ কবিতা ভালোবাসতেন। চে-র মৃত্যুর পর তাঁর ব্যাগে নিজের হাতে লেখা তাঁর প্রিয় কবিদের কবিতার একটা নোটবুক পাওয়া গিয়েছিল। তার মধ্যে চিলির পাবলো নেরুদার কবিতা, পেরুর কবি সিজার ভালেজোর কবিতা, কিউবার কবি নিকোলাস গিয়েন এবং স্পেনের কবি লেওন ফেলিপোর কবিতাও ছিল। দেখুন, যুদ্ধক্ষেত্রে, লড়াইয়ের ময়দানে, মৃত্যুর সময় চে গুয়েভারার ব্যাগে ছিল কবিতা!
এই সশস্ত্র লড়াই, জীবন, আদর্শ, কবিতা, সাহিত্য, গল্প-উপন্যাস – সবকিছুই কিন্তু আমাদের আলোড়িত করে। আমাদের উৎসাহিত করে, উদ্বুদ্ধ করে। এ থেকে আমরা আমাদের জীবনে সাহস, উদ্দীপনা, ভরসা, স্বপ্ন খুঁজে ফিরি। আমাদের জীবন থেকে, আমাদের পাশের বন্ধুর জীবন থেকে, আমাদের সামনে অনুকরণীয় যে ব্যক্তি-মানুষেরা আছেন, তাঁদের জীবন থেকে, তাঁদের লেখালেখি থেকে, তাঁদের গান থেকে, তাঁদের বই থেকে, তাঁদের সিনেমা থেকেও অনুপ্রেরণা পাই। এভাবেই আমাদের এই জীবনে এই দশকে-শতকে, বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোর, শ্রেষ্ঠ চিন্তাগুলোর সঙ্গে যদি বই-পুস্তকের সেতুবন্ধন থাকে, তবে সবার কাছে আমরা বারবার ফিরে যেতে পারি। তাই আমাদের কবিতা পড়া, আমাদের বই পড়া, আমাদের গান শোনা, আমাদের সিনেমা দেখা – সবকিছুই হয়ে উঠেছিল তাৎপর্যপূর্ণ।

সেই সময়ের কথা
আমরা যেন এটা ভুলে না যাই যে আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, শ্রেষ্ঠ দিনগুলো সামনে পড়ে আছে। সে জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। আমাদের নতুন নতুন বিষয় জানতে, বুঝতে হবে এবং শিখতেও হবে। এটিই তো পথ। এভাবেই তো মানুষ পারে এগিয়ে যেতে।
আগেই বলেছি, আসলে আমি সাংবাদিকতার জীবনে হঠাৎ করে, বলতে গেলে দৈবক্রমেই সাংবাদিক হয়েছি। আমি রাজনীতি করব। রাজনীতি করেছি। রাজনৈতিক জীবন হবে আমার। এটাই ছিল সিদ্ধান্ত। তবে কীভাবে করব, সেটা পরিষ্কার ছিল না। হঠাৎ ১৯৭০ সালে, আমাদের কমিউনিস্ট পার্টি তখন গোপন পার্টি, গোপন পরিচয়ে পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি পেয়ে গেল। সাপ্তাহিক একতা – অনেকেই নাম জানেন। আমি একতার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হয়ে গেলাম। আমি কিছুই জানি না। পরে সম্পাদক হয়ে ’৭০, ৮০, ৯০ দশকের শুরুতেও – ১৯৯১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আমি সেই পত্রিকার সঙ্গে ছিলাম। আমি সরাসরি রাজনীতি করেছি ২৮ বছর। ২০ বছর সাপ্তাহিক একতার সম্পাদক ছিলাম। কমিউনিস্ট পার্টির কাগজ একতার সাংবাদিক – সাংবাদিকতাতে তেমন একটা স্বীকৃতি ছিল না। আশির দশকের শেষের দিক থেকে অনেক পরিশ্রম করে দৈনিক সংবাদ-এ প্রতিবেদন লিখতাম, উপসম্পাদকীয় লিখতাম। আরও একাধিক সাপ্তাহিক কাগজে লিখেছি। বড় বড় সাক্ষাৎকার নিতাম। আমার সাক্ষাৎকার নেওয়ার খুব আগ্রহ।
আমি শেষবার মস্কোয় গিয়েছিলাম ১৯৮৮ সালে। মিখাইল গর্বাচেভের সময়। তখন সেই বিশাল ওলটপালট তর্ক-বিতর্ক সোভিয়েত ইউনিয়নজুড়ে। ‘গ্লাসনন্ত’ ও ‘পেরেস্ত্রাইকার’ বিশাল প্রভাব ও প্রচার। সে-সময়ের পরিবর্তন নিয়ে বই লিখেছিলাম, খোলা হাওয়া খোলা মন। সেবার মস্কো গিয়েই আমি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় ‘বাঁধাধরা’ এই ব্যবস্থা টিকতে পারে না। টিকছে না। তাই নিজের ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প পথের সন্ধানের জন্য শেষ
তিন-চার বছর অনেক পরিশ্রম করেছি। একতা করেছি ও সংবাদ-এ কাজ করেছি। আরও অন্য অনেক কিছু করেছি নিজের কাজের স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য। সেই ধারাবাহিকতার প্রচেষ্টারই ফল দৈনিক ভোরের কাগজ এবং পরে প্রথম আলো। বিশ্বাস করুন, প্রথম আলো যখন শুরু করি, তখনো একটা ভালো বড় দৈনিক কাগজ করার কোনো অভিজ্ঞতা বা ধারণা আমার ছিল না। প্রথম আলো শুরু করতে গিয়ে আমার ডায়াবেটিস বেড়ে গিয়েছিল। রক্তচাপও বেড়ে যায়। আমার ওজন কমে গিয়েছিল। ভয়ে কথা বলতে পারতাম না। মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারতাম না। হাসতে পারতাম না ভয়ে-আতঙ্কে। কী হবে, কী হবে!
আমাদের সেই সময়ের বন্ধুদের নিয়ে প্রথম আলোতে কাজ করেছি। এখনো চলছে অব্যাহতভাবে। কীভাবে আরও ভালো করা যায়, আরও ভালো করা সম্ভব, সেটা আমরা বোঝার চেষ্টা করি। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। আরও চেষ্টা করতে থাকব। ১৯৯২ সাল থেকে ২০১৯ সালের আজ পর্যন্ত দিনে ১৪ ঘণ্টা বা ১৬ ঘণ্টা করে সাংবাদিকতা করি। পত্রিকাকে জীবনের সঙ্গে জড়াজড়ি করে আমরা বেঁচে আছি, টিকে আছি। আমাদের যুদ্ধ আছে, লড়াই আছে, চাপ আছে, ভয় আছে,
ভুল আছে, ভালো আছে, অনেক সুনামও হয়েছে। আমার এক বন্ধু বলেছেন, ‘নিন্দিত সম্পাদক – আবার নন্দিতও বটে।’ একটা সময় ছিল, পত্রিকার জন্য আমি রিপোর্ট লিখছি, কিন্তু আমি জানতাম না কীভাবে রিপোর্ট লিখতে হয়। এভাবেই উপসম্পাদকীয় বা অনেক মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছি – সরাসরি শক্তভাবে, দলনিরপেক্ষভাবে। কেউ পছন্দ করুন না করুন, আমরা মত প্রকাশ করেছি। আমার এই সব কাজের মধ্য দিয়ে বিরাট আগ্রহ তৈরি হয়েছিল মানুষের সঙ্গে কথা বলার। তাঁদের অনেকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগও পেয়েছি। সব সময় আমি অপেক্ষায় থাকি, কখন কার সাক্ষাৎকার নেওয়া যায়। যাঁদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, তাঁরা হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া, জোহরা তাজউদ্দীন, রেহমান সোবহান, ফজলে হাসান আবেদ, সন্তু লারমা, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব জে এন দীক্ষিত, জ্যেষ্ঠ আইসিএস পুলিশ কর্মকর্তা ভেদ মারওয়া, যিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেই ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে ঢাকায় একই বিমানে বাংলাদেশে এসেছিলেন; ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিল – সামরিক বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট তাঁর অবস্থান ছিল সবচেয়ে বলিষ্ঠ, পাকিস্তানের মানবাধিকার নেত্রী আসমা জাহাঙ্গীর, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, বামপন্থী লেখক রণেশ দাশগুপ্ত, ভারতের অভিনয়শিল্পী সাইফ আলী খানের বাবা ক্রিকেটার নবাব মনসুর আলী খান পতৌদি, রুনা লায়লা, নন্দিতা দাসসহ আরও অনেকের। সাক্ষাৎকার নেওয়ার এই কাজগুলো করেছি ভালোবাসা থেকে, আগ্রহ থেকে। নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশিষ্ট এই ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারগুলো নিয়ে ইতিহাসের সত্যসন্ধানে : বিশিষ্টজনদের মুখোমুখি নামে বই প্রকাশিত হয়েছে। আমি মনে করি, মানুষের সঙ্গে কথা বললে, আলোচনা করলে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়। ওহ, আমি আরেকটি সাক্ষাৎকার নিলাম চিত্রনায়িকা কবরীর। আমাদের খুব ভালো বন্ধু। তাঁর বন্ধুদের নিয়ে, তাঁর বন্ধুত্ব নিয়ে, তিনি কী মনে করেন, তিনি কী চান, কী রকম বন্ধু চান, কে তাঁর বন্ধু হতে পারে – এসব নিয়ে।
এতক্ষণ ধরে আসলে আমি যা বলার চেষ্টা করলাম, তা আমার কথা নয় – আমাদের সময়ের কথা, আমাদের রাজনীতির কথা, ষাটের দশকের আমাদের বহুমুখী কর্মতৎপরতার কথা। আবার এটাও ঠিক, ব্যক্তিগত কথাও বললাম অনেক।

শেষ বলে কিছু নেই
আসলে পত্রিকার চেয়ে বেশি ভালোবাসি গানের মানুষকে; যাঁরা কবিতা লেখেন তাঁদেরও। যাঁরা বই লেখেন তাঁদেরও ভালোবাসি। যাঁরা ছবি আঁকেন, তাঁদেরও বাসি। যাঁরা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন, তাঁদেরও ভালোবাসি। তাঁরাই শ্রেষ্ঠ মানুষ, যাঁরা আমাদের ‘ভালোর সাথে, আলোর পথে’ যেতে পথ দেখান, সামনে যেতে সাহস জোগান। আর আমি একটি কথা সবাইকে বলি, যাঁরা একটি নোটবই বা একটা খাতা এগিয়ে দেন, বলেন, কিছু লিখে দিন, আমি লিখি – সেই যে সক্রেটিস বলেছিলেন – ‘নিজেকে জানো’ (কহড়ি ঞযুংবষভ)। আসুন আমরা নিজেকে জানি, নিজেকে বুঝি। সেই জানা-বোঝার মধ্য দিয়ে আমরা আগামী দিনের নতুন পথ সন্ধান করি। আমরা প্রত্যেকে চাই আমাদের জীবন ভালো হোক, সুন্দর হোক। আমার পরিবারের জীবন সুন্দর হোক, ভালো হোক। পাশাপাশি আমাদের সমাজের চারপাশে যা দেখি, সেটাও ভালো হোক। আমাদের রাষ্ট্র যেন আরও ভালো করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রের কথা এলে অনেক প্রশ্ন জাগে। আমার জীবনেরই তো ৭৪ বছর পার হয়ে গেল গত এপ্রিলে। প্রায় ৫৭ বছর ধরে তো সংস্কৃতি, সাহিত্য, গান, সাংবাদিকতা, রাজনীতির মধ্য দিয়ে জীবন চলে গেল। কী দেখলাম, কী হলো, কী হলো না …?
আমরা বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতি, অনেক সফলতা দেখলাম – তা যেমন ঠিক, তেমনি কেউ কেউ আছে যারা সফল এই বাংলাদেশকে পেছনে টেনে নিয়ে যেতে চায়। আমরা বলি, আমাদের সামনে দুই বাংলাদেশ – এক. যে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। দুই. আরেক বাংলাদেশ, যাকে পেছনে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রাজনীতিবিদ আছেন, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আছে, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ আছে, প্রশাসনের ভেতরে তাদের সমর্থক আছে, সাংবাদিকদের ভেতরেও তাদের মানুষ আছে। স্কুল-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়েও তেমন গোষ্ঠী বা মানুষ আছে। আমরা এসব মানুষ থেকে মুক্তি পেতে চাই। আমরা সত্যিকার অর্থে একটা অগ্রসরমান এবং মানবিক রাষ্ট্র দেখতে চাই। যদি বলেন সাংবাদিকতা – এখানে সাংবাদিকতার কাজ আছে, সে কাজটাই আমরা করার চেষ্টা করে চলেছি। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
আপনাদের আমরা বলতে পারি, অনেক চাপ, অনেক ভয়, অনেক অসুবিধার মধ্যে থাকতে হয়। তারপরও আমাদের চেষ্টা অব্যাহত
থাকবে। ছাপা কাগজ হিসেবে এখনো আমরা বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় কাগজ। অনলাইনে সারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাংলা পোর্টাল প্রথম আলো। বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ থেকে প্রথম আলো পাঠ করা হয়। আমাদের বাঙালি ভাইবোন যাঁরা যেখানে যেভাবে আছেন, তাঁরা প্রথম আলো পড়েন। আমাদের ফেসবুক পেজে ১ কোটি ৪৪ লাখ মানুষ আমাদের সঙ্গে থাকেন। ইউটিউবে আমাদের সঙ্গে প্রতিদিন ১৪ লাখ দর্শক-শ্রোতা থাকেন। আজকে এই বাংলাদেশে এখন এ সাংবাদিকতা, প্রথমা প্রকাশন, কিশোর আলো, বিজ্ঞানচিন্তা, প্রতিচিন্তা – এত কিছু তো আমাদের করার দরকার ছিল না। আমরা গণিত অলিম্পিয়াড, বাংলা ভাষা প্রতিযোগ, ফিজিক্স অলিম্পিয়াড করি। আমরা বই ও ক্রীড়াবিদ পুরস্কার দিই, সেরা কৃষক পুরস্কার দিই। সেরা শিক্ষক পুরস্কার দিই। আমরা কম্পিউটার, আইটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। আমরা প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করি। আমরা আরও অনেক কিছু করার চেষ্টা করি। কিন্তু কেন করি? একটাই লক্ষ্য। আমরা সত্যিকার অর্থে একটা সুন্দর বাংলাদেশ চাই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, জীবনযাত্রায়,
সংস্কৃতিজগতে আমরা সত্যিকার অর্থে ভালো কিছু দেখতে চাই। সে জন্যই এ কথাটা আমি বারবার বলি, আসুন, আমরা সবাই ‘ভালোর
সাথে, আলোর পথে’ সামনে এগিয়ে যাই। আর শেষ কথা, আমাদের একটাই লক্ষ্য, আমরা সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের জয় দেখতে চাই।

২৯ আগস্ট ২০১৯-এ সিলেট শুভানুধ্যায়ীদের আয়োজনে 
 প্রদত্ত বক্তৃতার শ্রুতলিখন, কিছু পরিমার্জনাসহ।

Leave a Reply