কবি রবিউল হুসাইন কিছু অনুভব ও তাঁর কালজ্ঞান নিয়ে কবিতা

লেখক: গোলাম কিবরিয়া পিনু

গত ২৬ নভেম্বর কেন জানি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছিলাম, উঠে ফোনটি হাতে নিয়ে ফেসবুকে চোখ রাখতেই আমাদের প্রিয় মানুষ কবি রবিউল হুসাইনের মৃত্যুসংবাদটা চোখে পড়ল, তখনই শোকবিহ্বলতায় চোখে জলও এসে পড়ল, খানিকটা কান্নারও শব্দ উচ্চকিত হলো, আমার জীবনসঙ্গী এসে বলল, ‘কী হলো তোমার?’ উৎকণ্ঠা প্রকাশ করল সে। এমনটা হয় না সচরাচর, কারো মৃত্যুসংবাদে। এমন হলো কেন, কবি রবিউল হুসাইনের সঙ্গে আমাদের
অনেকের পরিচয় সেই জাতীয় কবিতা পরিষদের সূচনালগ্ন থেকে, জাতীয় কবিতা উৎসবের কর্মকা-ে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকার কারণে। এই সংগঠনটির সঙ্গে তিনি প্রথম থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যুক্ত থেকেছেন গভীরভাবে ও ধারাবাহিকভাবে, এমনটি অনেকে হয়তো থাকেননি। তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতিও ছিলেন দুবার। বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন, সরকার পরিবর্তন ও বিভিন্ন ঘটনার অভিঘাতে জাতীয় কবিতা পরিষদের অবস্থান ও ভূমিকার মধ্য দিয়ে তাঁকে আমরা অনেকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। এর ফলে তাঁর সঙ্গে মেলামেশা হয়েছে বহু বছর! কত সভা হয়েছে তাঁর পেশাগত কার্যালয়ে, তাঁর বাসায় ও অন্যান্য স্থানে। তাঁর কবিতা ও অন্যান্য লেখা এবং আরো অনেক ভূমিকার কারণেও তিনি ছিলেন আমাদের কাছের মানুষ, পরিজ্ঞাত এক পরিজন। মৃত্যুর আগের ক-বছর তাঁর সঙ্গে কম দেখা হলেও সেই আন্তরিকতা ও ভালোবাসা হৃদয়ের ভেতর থেকে উপচে পড়ত, তা আমি তাঁর আচরণেও উপলব্ধি করতে পারতাম। আন্তরিক ও ভালোবাসার এমন মানুষ, কাব্যজগতে আমি কমই পেয়েছি। কত টুকরো টুকরো ঘটনা ও স্মৃতি, যার মধ্যে দিয়ে তিনি আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন প্রিয় মানুষ, কবি,
চিত্র-সমালোচক, স্থপতি ও সংগঠক হিসেবে। আমিও তাঁর সে-সকল অবস্থানের সাক্ষী হয়ে বলতে পারি, তিনি আমারও ছিলেন একজন স্বজন, প্রিয় মানুষ, কবি-লেখক ও সংগঠক।
তাঁর মৃত্যুর কদিন আগেই এক অনুষ্ঠানে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সঙ্গে দেখা, তিনি সেই অনুষ্ঠানে পুরো না থেকে, কবি রবিউল হুসাইন যে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তা জেনে বিচলিত হয়ে তাঁকে দেখতে তিনি ছুটবেন, আমাকে কানে কানে সে-কথা বললেন। আমি আমার এক প্রিয় মানুষ ও কবিকে কবি রবিউল হুসাইনের অসুস্থতার কথাটি জানালাম। পরবর্তীকালে তাঁর অসুস্থতার খবরও নিচ্ছিলাম বিভিন্নভাবে, জেনেছিলাম তিনি ভালোর দিকে! না, শেষমেশ সুস্থ না হয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে গেলেন! তাঁকে নিয়ে কত স্মৃতি ও কত কথা, মনে পড়ছে!
এই তো কিছুদিন আগে শাহবাগ থেকে বাসায় ফেরার সময়, আমার সঙ্গে সেগুনবাগিচা পর্যন্ত এলেন কবি রবিউল হুসাইন, সেই কবিতা ও জীবন নিয়ে তাঁর চিরদিনের দার্শনিক ভাষ্য তুলে টেনে আগের মতন আলাপ করলেন। কেমন আছেন বললেই তিনি তাঁর বোধ থেকে উৎসারিত সেসব গভীর কথা বলতেন, যা থেকে তাঁর জীবনবোধের পরিচয় আমরা পেতাম। আমাকে ভালোবাসতেন বলেই কিছুদিন আগে একটি বিশেষ কবিতাপাঠের আসরে আমাকে ফোন করে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, আমিও সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করে সেই অনুষ্ঠানে কবিতা পড়েছিলাম। তাঁর বহু ধরনের কাজ, বহু ক্ষেত্রে তাঁর অবদান রয়েছে, তিনি ছিলেন এদেশের বিশিষ্ট চিত্র-সমালোচক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণ ও বিকাশের একজন নিবেদিত সংগঠক, একজন বিশিষ্ট স্থপতি, ছিলেন ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। তবে সবচেয়ে নিরলসভাবে তিনি কবিতা লিখতেন, ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লিখেছেন। কত যে কবিতা লিখেছেন, তার হিসাব আমাদের কাছে নেই! বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ কমই দেখেছি, বিশেষত তাঁর বই ধারবাহিকভাবে প্রকাশ হয়নি, বেশিরভাগ কবিতাই তাঁর গ্রন্থভুক্ত হয়নি।
কবি রবিউল হুসাইন জন্মেছিলেন ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার রতিডাঙ্গায় ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা কুষ্টিয়ার শশীভূষণ রোড, থানাপাড়া। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ১৯৬৮ সালে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহু বছর একনাগাড়ে ঢাকায়, আবাসস্থল ধানম-িতে। প্রকৌশলী হিসেবেও তাঁর পেশাজীবন ছিল কর্মমুখর। তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালে, সুন্দরী ফণা। তারপর বহু বছরের ব্যবধানে ১৯৯৬ সালে কোথায় আমার অভিযান ও কেন্দ্রধ্বনিতে বেজে ওঠ। এরপর আরো কটি কাব্যগ্রন্থ। বাংলাদেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি নামে তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। কুয়াশার ঘরে ফেরা একটি কিশোর উপন্যাসসহ আরো কটি গ্রন্থ রয়েছে তাঁর। কবিতায় ঢাকা একটি ভিন্নধারার গ্রন্থ, যা তিনি সম্পাদনা করেছিলেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেনধ।
কবি রবিউল হুসাইন, ষাটের দশকের কবি হিসেবে চিহ্নিত হলেও তাঁর কাব্যচর্চা সত্তর দশক হয়ে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রবহমান ছিল। যার ফলে কবি হিসেবে তিনিও পর্যবেক্ষণ করেছেন Ñ পাকিস্তান শাসনামলে এই ভূখ-ের মানুষেরা কীভাবে বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার হয়, তা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক এক ভয়াবহ ব্যভিচার তৈরি করেছিল, এই ভূখ-ের মানুষেরা শুধু তা উপলব্ধি করেনি, বিভিন্ন সময়ে এর প্রতিবাদে-সংগ্রামে হয়েছে প্রতিবাদী, রক্ত দিয়ে হয়েছে উচ্চকিত। অবশেষে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে স্বদেশের ভিন্ন এক চেহারা, বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী আরেক দেশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চোরাগোপ্তা পথে দূরে ঠেলে দেওয়ার ত্রাস ও শাসকদের ষড়যন্ত্রমূলক ভূমিকা। এমন সময়ের কবি হিসেবে কবি রবিউল হুসাইন মূলধারার কবিদের মতোই কালজ্ঞান নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তাই তিনি তীব্র দেশপ্রেম থেকে বিবেকতাড়িত উচ্চারণ করেন :

প্রতিটি বাঙালি মেয়েকে গর্ভবতী করে
খাঁটি পাকিস্তানি সন্তানের জন্ম দেব’ শুয়োরের বাচ্চাদের
সেই রক্তে আগুন জ্বালানো সব কথা ভুলতে বসেছি
আমরা মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা ভুলে গেছি
আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা ভুলে গেছি
আসলে এত ভুলো মন নিয়ে
স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না
(‘এক সেকেন্ডে মাত্র চার ফুট’)
কবি রবিউল হুসাইনের কবিতার জগৎ একরৈখিক থাকেনি; বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, জীবনজিজ্ঞাসা, দার্শনিকবোধ ও আধুনিক জীবনদৃষ্টির বিভিন্ন ভূগোল নিয়ে তিনি তাঁর কবিতায় উপস্থিত, তা থেকে একজন পাঠক বিভিন্ন বোধের সাযুজ্যে এক ভিন্নধারার কবিকে খুঁজে পাবেন। যেমন :
আজকাল মানুষের আয়ুষ্কাল বেড়েছে ঠিকই
কিন্তু জীবনের পরিধি বাড়েনি
আজকাল জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই
কিন্তু চোখের জ্যোতি বাড়েনি
আজকাল চোখের স্বাস্থ্য তুলনীয়ভাবে উন্নত হয়েছে ঠিকই
কিন্তু দূরদৃষ্টি বাড়েনি
আজকাল দূরদৃষ্টির দৃষ্টি দূরে গিয়েছে ঠিকই
কিন্তু সীমানা পেরোতে পারেনি
আজকাল সীমানা বহুদূরে প্রসারিত ঠিকই
কিন্তু কাছের কোনো কিছুতে মনোনিবেশ করতে পারেনি।
(‘একই জায়গা’)
কবি রবিউল হুসাইন খ- খ- অনুভাবনাকে গভীর ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত করেন, তেমন একটি কবিতা :
গোপন হ্রদের জলে ভাসে গুপ্ত-মোহন, হাঁস
মিষ্টি-বিরল প্রেমের ভাগ্যে মৌল-সর্বনাশ

ছাইদানীতে জমে আছে মেঘের মতন ছাই
আকাশ ঘিরে বিষ্টি এসে হঠাৎ বলে যাই
(‘ব্যস্ত-ব্যাকুল নষ্ট মানুষ’)
তাঁর কবিতার মধ্যে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিজাত চেতনাবাহিত ব্যঞ্জনার অনুরণন অনুভব করা যায়, যার ফলে কবিতার পাঠক এক গভীর বোধের মুখোমুখি হয়ে পড়েন, যেমন Ñ
প্রতিটি আঁধারের ভেতর আলোর শেকড়
প্রতিটি আলো আর রোদের মধ্যে
শত শত সূর্যের বাস
তেমনি প্রতিটি জোসনা রাতে
কত কত চাঁদের নিবাস
(‘আরও ঊনতিরিশটি চাঁদ’)
জীবন আর কতদূর যেতে পারে, তার সীমানা কতটুকু, নাকি তারও নির্দিষ্ট বৃত্ত রয়েছে, এমন প্রশ্ন ও দার্শনিক জিজ্ঞাসা তাঁর বিভিন্ন কবিতায় আমরা খুঁজে পাই, এমন পর্যবেক্ষণ একজন আধুনিক মানুষের মননের পরিচয় মেলে ধরে, তিনি লিখেছেন Ñ
ঘুরছি আমি ঘুরছি আমি জীবন নিয়ে
আমিই আমার লাটিম হয়ে নিরবধি
ঘুরছি আমি বৃত্তের ভেতর ঘুরছি আমি
ঘুরছি আমি ঘুরবো আমি
মধ্যবৃত্তে মৃত্যু-অব্দি ঘুরছি আমি অবিরত
ঘুরছি আমি ঘুরছি আমি
ঘুরছি আমি ক্রমাগত
(‘লাটিম’)
অশ্রুলোচন ও শোকবিহ্বলতার মাঝে থেকে প্রিয় মানুষ ও কবি রবিউল হুসাইনের প্রতি সীমাবদ্ধ শব্দে এই আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি। কবি রবিউল হুসাইন আমাদের এই সময়ে, এই ভূখ-ের মূলধারার একজন বিশিষ্ট কবি, কর্মপাগল সংস্কৃতিচর্চাকারী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সংহত করার বিশিষ্টজন, আমাদের প্রিয় এক হৃদয়বান মানুষ। তাঁর কর্মকা-ের বিভিন্ন দিকের অনুসন্ধানে আরো আলো ফেলে দেখা দরকার, আরো মনোযোগ দেওয়া দরকার, এইটুকু দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: