কবি সমর সেন ও কবিতা পত্রিকা

লেখক: প্রভাতকুমার দাস

প্রভাতকুমার দাস

প্রধানত বুদ্ধদেব বসুর আগ্রহে এবং নেতৃত্বে শুধু কবিতার জন্য মুদ্রিত কবিতা নামে ত্রৈমাসিক পত্রিকার জন্মকথা তিনি নানা উপলক্ষে বিবৃত করেছেন। সেকালে মাসিক পত্রিকায় সাধারণভাবে কবিতার স্থান ছিল পদপ্রান্তিক। প্রবাসীর মতো পত্রিকাতেও ইঞ্চি মেপে কবিতা ছাপার বিষয়টি বিবেচিত হতো। ‘ইঞ্চি-কৃপণ পাদপূরণকারী অবস্থা থেকে’ কবিতাকে সম্মানজনকভাবে সর্বসমক্ষে তুলে ধরতেই কবিতার জন্ম। বুদ্ধদেব তখনকার সাময়িক পত্রিকায় কবিতার মুদ্রণ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন : ‘১৯৩১-৩২-এর কলকাতায় ভালো পত্রিকা অনেক ছিল কিন্তু এমন কোনো পত্রিকা ছিল না যার মধ্য দিয়ে কবিতা হ’তে পারে বিশেষভাবে প্রকাশিত ও প্রচারিত ও রসজ্ঞজনের দৃষ্টিগোচর।’ যেজন্য পরবর্তীকালে, বুদ্ধদেব নিতান্ত ‘খেলাচ্ছলেই’ গৃহীত সেদিনের সেই উদ্যোগ বিষয়ে জানিয়েছেন : ‘কোনো সম্বল বা আয়োজন ছিলো না; দেখা যাক না কী হয় – এই গোছের মনের ভাব নিয়ে আরম্ভ হলো।’

সে-পত্রিকার প্রতিষ্ঠা-পর্বে যাঁরা যুক্ত হয়েছিলেন, শুধু বয়সের দিক থেকে নয়, উদীয়মান কবি হিসেবেও সমর সেনের মতো কোনো অর্বাচীন কবির নাম। বরং ছাত্র হিসেবে কৃতী সমর আই.এ. পড়ার সময় স্কটিশ চার্চ কলেজের ম্যাগাজিনে মৌলিক ইংরেজি কবিতা লিখে কিংবা আমত্মঃবিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের শ্রীহর্ষ পত্রিকায় মৌলিক বাংলা কবিতা লিখে বন্ধুদের কাছে কিছু পরিচিতি পেয়েছিলেন। সেটা ১৯৩৩ সালের কথা। পরবর্তী বছরে আবার স্কটিশের ম্যাগাজিনে ইংরেজি কবিতা প্রকাশিত হলেও – পূবর্বাশা পত্রিকার (কার্তিক ১৩৪১) লিখেছিলেন ‘নিঃশব্দতার ছন্দ’ এবং ‘একটি রাত্রির সুর’ (শ্রাবণ ১৩৪২)। এই যৎসামান্য কৃতীর বাইরে উলেস্নখ্য স্কটিশ চার্চ কলেজের চতুর্থ বর্ষের কয়েকজন সহপাঠী বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে টু ডে নামে একটি ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে সম্পাদনাকর্মে নবিশির সূত্রপাত। এরকম একজন সদ্যতনের প্রথমাবধি কবিতার মতো একটি দৃষ্টান্তস্থাপনকারী পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে উলেস্নখযোগ্য।

‘১৯৩৪-এ গ্রীষ্মকালে দারুণ মর্মবেদনা থেকে নিষ্কৃতি’ পেতে আঠারো বছর বয়সের সমর, সে-সময়ের বিতর্কিত কবি বুদ্ধদেবের রমা রোডে গোলাম মহম্মদ ম্যানসনের ফ্ল্যাটে উপস্থিত হয়েছেন, উদ্দেশ্য বন্দীর বন্দনা কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি স্বকৃত ইংরেজি অনুবাদ সম্পর্কে তাঁর অভিমত জানা। সেদিনের সাক্ষাৎকারের বিবরণ দিয়েছেন প্রতিভা বসু : ‘আমি তখন সেখানে একান্ত নতুন মানুষ। নির্বাক দর্শক হিসেবে যা দেখেছি তা হলো বাঙালির তুলনায়, অত্যধিক ফর্সা রং, উজ্জ্বল চোখ, তীক্ষননাসা এক বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার তরুণ; এক নির্বাক শ্রোতা হিসেবে যা শুনেছি তা হলো, তাঁর ইংরেজি তর্জমা ও রচনার উচ্চৈঃস্বরে প্রশংসারত এক গুণগ্রাহী যুবকের অনিন্দিত কণ্ঠস্বর। বুদ্ধদেব তাঁকে বাংলা রচনার জন্য প্ররোচিত করলেন। তার সার্থকতা বিষয়ে যুক্তিতর্কের জাল বিস্তার করলেন।’ তাঁদের এই যুগল-সম্মেলন বিষয়ে তিনি আরো মন্তব্য করেছেন : ‘কবিতা পত্রিকার সহকর্মী হিসেবে বুদ্ধদেব নিজের সঙ্গে যুক্ত হতে যাঁকে যাঁকে নির্বাচন বা আমন্ত্রণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সমর সেনই ছিলেন যোগ্য সহকর্মী। একাত্ম হয়ে যাবার মতো মেজাজ শুধু সমরেরই ছিলো।’ এই সাক্ষাৎকার বিষয়ে সমর সেন জানিয়েছেন, সেদিনের আগন্তুক যুবককে বুদ্ধদেব প্রশ্ন করেছিলেন – কবিতা লেখেন কিনা। পরবর্তী সাক্ষাতের সময় সমরের কয়েকটি লেখা পড়ে সেদিনের সদ্য তরুণকে উপদেশ দিয়েছিলেন, ‘নিয়মিত ছন্দের চেষ্টা ছেড়ে গদ্য ছন্দে যেতে।’

সেই প্রথম দিনের সাক্ষাৎ বিষয়ে বুদ্ধদেব পরে স্মৃতিচারণ করেছেন : ‘এক গ্রীষ্মের সকালে আমার ঘরে এলো একটি ক্ষীণাঙ্গ ছেলে – প্রায় বালক, সবে পা দিয়েছে যৌবনে – গায়ের রং হলদেঘেঁষা ফর্সা, ঠোঁটে গোঁফের ছায়া, চোখে চশমা, গালে একটা ব্রণের উপর এক ফোঁটা চুন লাগানো। কিছুমাত্র ভূমিকা না-ক’রে বললো ‘আমি আপনার ‘শাপভ্রষ্ট’ কবিতার একটা ইংরেজি করেছি – আপনি দেখবেন?’ পা-ুলিপিতে তার নাম দেখলাম সমর সেন, ঠিকানা বেহালায় দীনেশচন্দ্র সেনের বাড়ি। স্কটিশ চার্চে আই.এ. পড়ছে, দীনেশ সেন তাঁর দাদু হন – আমার প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষেপে এই দুটি তথ্য জানিয়ে সে মুহূর্তকাল পরে বিদায় নিলো। তর্জমাটি প’ড়ে চমক লাগলো আমার – এত অল্প বয়স, অথচ ইংরেজি ভাষায় তার দখল অসামান্য, কবিতার দিকে মনের টান আছে বোঝা যায়।’ বুদ্ধদেব এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন, লেখাটা তিনি মুম্বাইয়ের নতুন-বেরোনো ওরিয়েন্ট পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলে সম্পাদক সেটি সমাদরপূর্বক গ্রহণ করেছিলেন।

পরে, তাঁর কয়েকটি মৌলিক বাংলা কবিতা দেখে, তাঁর ছন্দের হাত টলোমলো বুঝে বুদ্ধদেব গদ্যকবিতা লেখার পরামর্শ দেন। এরপর কবিতা পত্রিকা সূচনার সময় নিয়ে এসেছিলেন তাঁর লেখা প্রথম গদ্যকবিতাগুচ্ছ – পুনশ্চর পরে বাংলা ভাষায় গদ্যকবিতা জাতে উঠেছে ততদিনে। বুদ্ধদেবের মতে, ‘রাবীন্দ্রিক রোমান্টিকতার সেই শেষ মধুর সৌরভে-ভরা দীর্ঘশ্বাস, আজকের দিনে অনেকেরই যা অন্তরঙ্গ।’ সমর সেনের সঙ্গে বুদ্ধদেবের সখ্যের সেখানেই শুরু। অথচ বুদ্ধদেবের বন্দীর বন্দনা পড়ে সমর সেনের ধারণা হয়েছিল, সে-কাব্যের কবি হবেন ‘বলিষ্ঠ, দীর্ঘ দৃপ্তকণ্ঠ মানুষ’ – প্রথমবার বুদ্ধদেবকে দেখে সমর বিস্মিত হয়েছিলেন।

এ-ধরনের ‘একটি কবিতাসর্বস্ব’ পত্রিকা প্রকাশের ইচ্ছা বুদ্ধদেব লালন করেছিলেন পরিচয়ের এক বৈঠকে অন্নদাশঙ্করের হাতে হ্যারিয়েট মনরো-স্থাপিত শিকাগো থেকে প্রকাশিত পোয়েট্রি দেখে। প্রায় চার বছর পরে সেটি বাস্তবায়িত হলো, তাঁর সে-সময়কার ঘনিষ্ঠতম সাহিত্যিক বন্ধু প্রেমেন্দ্র মিত্রকে সঙ্গে নিয়ে, প্রধান উৎসাহদাতা বিষ্ণু দে ও সমর সেনের সাহচর্যে। সে-পরিকল্পনা রূপায়ণে প্রাথমিক অবস্থার স্মৃতিচারণ করেছেন বুদ্ধদেব : ‘পাঁচ টাকা ক’রে চাঁদা দিলেন কবিদের মধ্যে দু-তিনজন। আমার অসাহিত্যিক বন্ধু পঙ্কু পাঠালো দিলিস্ন থেকে দু-কিসিত্মতে দশ টাকা; রাণুর প্রতি স্নেহশীলা এক ধনী মহিলা আমাদের ফান্ডে আরো দশ টাকা যোগ করলেন। ছাপানো হ’লো চিঠি লেখার কাগজ লেফাফা ইত্যাদি, ডিকিনসন কোম্পানির উৎকৃষ্ট বিলিতি অ্যান্টিক কেনা হ’লো। আমার অনুরোধের উত্তরে সকলেই লেখা পাঠালেন। অনিল এঁকে দিলো কিউবিস্ট ছাঁদে বিশাল অক্ষরে মলাট-চিত্র, একজন দেখে বললেন, ‘পেবেকের মতো’; ছেপে দিলেন পূর্বাশা প্রেসে সঞ্জয়-সত্যপ্রসন্ন বিনামূল্যে। এমনি ক’রে অনেক ধাত্রীর পরিচর্যায়, হলুদ মলাটে চলিস্নশ পৃষ্ঠায় বিজ্ঞাপনহীন, জন্ম নিয়েছিলো আমাদের ত্রৈমাসিক ‘কবিতা’ – এক আশ্বিনের দিনে ভবানীপুরের গলির মধ্যে সেই একতলায়…।’ বর্তমান উদ্ধৃতিতে অসাহিত্যিক বন্ধু পঙ্কু – তাঁর বন্ধু পঙ্কজ দাশগুপ্ত, অনিল অর্থাৎ অনিল ভট্টাচার্য, ঢাকার বন্ধু, শিল্পী। আর ‘রাণুর প্রতি স্নেহশীলা এক ধনী মহিলা’ সম্পর্কে পরিচয় জানা যায় প্রতিভা বসুর স্মৃতিচারণায় : ‘চাঁদা তুলে টাকা জোগাড়ের বুদ্ধিটা কার সেটা মনে নেই, তবে প্রথম চাঁদাটা যে আমিই তুলেছিলাম সেটা ভুলিনি। সেই দার্জিলিংয়ের মায়ামাসিমাই (মায়া বসু : চিত্তরঞ্জন দাশের ভ্রাতুষ্পুত্রী) দিয়েছিলেন। চাঁদার হার পাঁচ টাকা; পনেরো টাকা তো উঠেই গেল। কী ফূর্তি সকলের। বাড়ি ভেসে গেল সুখের জোয়ারে। সান্ধ্য আড্ডাটা জোরালো হল। শেষ পর্যন্ত পঁয়ত্রিশ টাকা চাঁদা উঠতেই শুরু হয়ে গেল কাজ।’

‘পাঁচ টাকা করে দিয়ে ‘কবিতা’র সূত্রপাত’ – সমর সেনও বলেছেন। পরবর্তীকালে একটি ইংরেজি লেখায় তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন : ‘Twenty-seven years ago, five poets decided to bring not a Bengali poetry quarterly – the first in India – and each, after much deliberation, contributed five rupees to the publication fund. They were : Buddha Dev Bose, Bishnu Dey, Premendra Mitra, Ajit Datta and this writer. Even today it is not – the average per capita monthly income in India is less than that.’

তেত্রিশ পাতা কবিতা এবং সাত পাতার সম্পাদকীয় নিবন্ধ – মোট চলিস্নশ পাতার বিজ্ঞাপনহীন ক্ষীণকায় ত্রৈমাসিকের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় বুদ্ধদেবের তখনকার ভবানীপুরের অস্থায়ী বাসস্থানের ঠিকানা ১২ যোগেশ মিত্র রোড থেকে। সম্পাদক দুজন, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র; সহকারী সম্পাদক – বুদ্ধদেবের থেকে আট বছর বয়োকনিষ্ঠ সমর সেন। সংখ্যাটি প্রকাশের পর বুদ্ধদেব কলকাতার সুধীমহলে – সাহিত্যিক, সাহিত্যরসিক অধ্যাপক ছাড়াও তাঁর ব্যক্তিগতভাবে চেনা, মুখচেনা এরকম জনাকুড়ি নাগরিকের কাছে বাহক মারফত পাঠিয়ে ‘রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা’র ফল কী হয়েছিল তার বিবরণ দিয়ে লিখেছেন : ‘ছেলেটি ফিরে এলো বাড়ি-বাড়ি ঘুরে বিকেলবেলায় তার চেহারা ক্লান্ত, রুমালে বাঁধা টাকা সিকি-আধুলির সত্মূপ। আশ্চর্যের বিষয়, প্রায় সকলকেই বাড়িতে পাওয়া গিয়েছিল, প্রায় সকলেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন হাতে হাতে বার্ষিক চাঁদা দেড় টাকা – তখনকার মাপে সেটাকে খুব তুচ্ছ বলা যায় না।’ সমরের ওপর দায়িত্ব পড়ে ছিল এসপস্নানেড স্টলে দশটি কপি পৌঁছে দেওয়ার – প্রথম দর্শনে স্টলওয়ালা সংশয় প্রকাশ করেছিল – ওটুকু পত্রিকা ছ-আনা দিয়ে কে কিনবে – দু-দিন পরেই তারা আরো দশ কপি চেয়ে নিল। শুধু তাই নয়, প্রথম সংখ্যা দেখে, যে-সকল বন্ধু তখন কলকাতার বাইরে, এমনকি বন্ধুর বন্ধুরা – নানা পরিচিতির সূত্র ধরে যাঁরা গ্রাহক হয়েছিলেন, তাঁদের সর্বমোট সংখ্যা সত্তর। এই সদ্যোদ্ভূত পরিচয়হীন পত্রিকায় যাঁরা প্রথম গ্রাহক হলেন সেই অযাচিত ও অজানিত ব্যক্তিবর্গ প্রায় সকলেই হিজলি বা দেউলি-নিবাসী রাজবন্দি।

এই গ্রাহক-সংগ্রহ অভিযান সর্বৈব সুখকর হয়নি – তারও বর্ণনা দিয়েছেন প্রতিভা বসু : ‘এঁকে ওঁকে খোসামোদ করে দু-চারজনকে গ্রাহক করা, এক একটি সংখ্যা পঞ্চাশ পয়সায় বিক্রি করা, এই সব দুঃখময় অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমার আর বুদ্ধদেবের মতো একমাত্র সমরেরই সংস্রব ছিল। মনে আছে মাত্র তিনজন ক্রেতার মধ্যে আমার বিবাহের পূর্বে পরিচিত একজন ধনী ক্রেতা সমরকে একটি অচল আধুলি দিয়ে ছিলেন। রাত বারোটা পর্যন্ত বসে তিনমাথা একত্র করে ভাবা হলো আধুলিটা তাঁর কাছে গিয়ে বদলে আনা সংগত হবে কিনা। একটা আধুলির দাম তো আমাদের কাছে বড়ো সোজা নয়, অনেক। শেষ পর্যন্ত সমর রায় দিল, ‘না, আর কোনোদিন এর কাছে যাবো না, এঁকে আমরা মন থেকে ছেঁটে ফেললাম।’ বুদ্ধদেব চেঁচিয়ে হাততালি দিয়ে বলে উঠলেন, ‘চমৎকার decision – নাহ্ সমরের মতো হয় না। রাজু আবার রাগ করলে না তো? তোমার বন্ধু।’ আট আনার ক্ষতি সেই সন্ধ্যায় আমাদের সুখের প্রতীক হয়ে রইল।’ আলোচ্য উদ্ধৃতির সামান্য প্রমাদ সংশোধনযোগ্য – প্রথম সংখ্যার মূল্য ছিল আট আনা নয়, ছ-আনা।

 

দুই

কবিতার প্রথম সংখ্যা শুরু হয়েছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রর কবিতা দিয়ে,   – কিন্তু বয়সের তুলনায় অনেকটাই গুরুত্ব পেয়েছিলেন তরুণতম সমর সেন। তাঁর কবিতা চারটির শিরোনাম : Amor stands upon you, মুক্তি, স্মৃতি, প্রেম। প্রেমেন্দ্র, বুদ্ধদেব, বিষ্ণুর পরেই তাঁকে স্থান দিয়ে বুদ্ধদেব হয়তো কিছুটা পক্ষপাত করেছিলেন – কেননা, পরবর্তী কবিরা যথাক্রমে সঞ্জয় ভট্টাচার্য, জীবনানন্দ দাশ, অজিতকুমার দত্ত, প্রণব রায়, স্মৃতিশেখর উপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বাগচী – যাঁরা প্রায় সকলেই এক-একটি পরিচিত নাম।

পত্রিকার সম্পাদনার কাজে বুদ্ধদেব প্রথমেই যুক্ত করেন প্রেমেন্দ্র মিত্রকে। তারপর সমরকে সহকারী হিসেবে নেওয়ার কথা জানান প্রেমেন্দ্রকে। পরবর্তীকালে প্রেমেন্দ্র লিখেছেন : ‘কথাও হল একদিন। শেষ বয়সেও ওঁকে যাঁরা দেখেছেন তাঁরা লক্ষ করেছেন ওর ভিতরে কোথাও একটা তারুণ্য ছিল, দীপ্তি ছিল – সেটা একাত্তর বছরেও হারায়নি। মজার কথা এই, প্রথম যখন ও কবিতা লিখতে শুরু করে তখন বয়স যে ওর অত কম সেটা যেমন বোঝার উপায় ছিল না তেমনি আবার সত্যি অনেক বয়স হয়েছে তখন ওর লেখা পড়ে বোঝা যেত না যে বয়স অত বেশি। ভেতরে ভেতরে এই সতেজ ভাব – যাকে বলা যায় মনের তারুণ্য, সব সময় ওর ছিল।’ উলেস্নখ্য, প্রথম সংখ্যায় একমাত্র গদ্য সম্পাদকীয় রচনার শিরোনাম – ‘কবিতায় দুর্বোধ্যতা’, অস্বাক্ষরিত সেই নিবন্ধটি লিখেছিলেন অন্যতর সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু।

একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করার, তখনকার যে-কোনো পত্রপত্রিকার প্রথম সংখ্যাটির পরিকল্পনায় রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়া যেমন অকল্পনীয় হলেও – বুদ্ধদেব দুঃসাহসিক প্রয়াস দেখিয়ে জগদ্বিখ্যাত কবিগুরুর শরণাপন্ন হননি। তবে বুদ্ধদেব-লিখিত ‘সম্পাদকীয়’ রচনার অষ্টম অনুচ্ছেদে প্রাসঙ্গিকভাবে রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলেন : ‘বাংলাদেশে কবিতা যাঁরা পড়েন, তাঁদের মধ্যে মনে-মনে – কি কখনো-কখনো প্রশংসনীয় প্রকাশ্যতায় – রবীন্দ্রনাথের চাইতে দ্বিজেন্দ্রলাল, সত্যেন্দ্রনাথ কি নজরুল ইসলামকে অনেক বেশি পছন্দ করেন। কেননা শেষোক্ত কবিদের রচনার একটা নির্দিষ্ট ‘বিষয়’ আছে, তা স্পষ্ট ও স্পর্শসহ, তার বোধগম্যতা বুদ্ধিসাপেক্ষ। আমার বক্তব্যের আর-একটা মস্তপ্রমাণ এই যে, রবীন্দ্রনাথের সমস্তকাব্যগ্রন্থের মধ্যে আমাদের দেশে কথা ও কাহিনীর প্রচারই বহুলতম; কেননা সেখানে আছে সুনির্দিষ্ট বিষয়, আছে বোধগম্যতা।’

কিন্তু পত্রিকা প্রকাশের পরে, ঈষৎ ভয়ে-ভয়ে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম সংখ্যা পাঠিয়ে ‘শ্রীচরণেষু’ সম্বোধনে বুদ্ধদেব লিখলেন (৩০.০৯.৩৫) : ‘আমরা একটি কবিতা পত্র বার করেছি – তার প্রথম সংখ্যা আজ আপনাকে পাঠালাম। একটা জিনিস আপনার চোখে পড়বেই – এ-সংখ্যার অধিকাংশ কবিতাই গদ্যে। পুনশ্চতে আপনি যে-গদ্য ছন্দের প্রবর্ত্তন করেছেন, তা বিভিন্ন কবির হাতে বিভিন্ন রকম রূপ নিয়ে বাংলা কবিতায় স্থায়ী হ’তে চলেছে বলে মনে হয়। আমার নিজের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে বাংলা কবিতা পদ্যে যতখানি লেখা হবে গদ্যে তার কম নয়। এর অবাধ মুক্তি – এবং মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে অতি সূক্ষ্ম তাল ও মাত্রা অনেককেই আকর্ষণ করবে।’ এরপর এই সূত্র ধরেই তিনি সদ্যতন সমরের বিষয়ে সপ্রশংস মন্তব্য জানিয়ে লিখলেন : ‘একজন কবির রচনা আমরাই প্রথম প্রকাশ করলাম – সমর সেন। এঁর ছোট-ছোট কবিতাগুলো আমার নিজের খুব ভালো লেগেছে। এঁর বয়েস অল্প, সাহিত্য ক্ষেত্রে ইনি এখন পর্যন্ত অপরিচিত – কিন্তু এঁর রচনার এমন একটি বিশেষ স্বকীয়তা আছে যাতে এঁর সম্বন্ধে মস্তআশা পোষণ করতে পারে না।’

‘কল্যাণীয়েষু’ সম্বোধনে রবীন্দ্রনাথ তিনদিনের মাথায়, ৩ অক্টোবর ১৯৩৫ উত্তর দিলেন, ‘মস্তএকখানা তুলোট কাগজের এপিঠ-ওপিঠ ভর্তি’ অনিন্দ্য-সুন্দর হস্তাক্ষরে। পত্রের প্রথমাংশে তিনি লিখলেন : ‘তোমাদের ‘কবিতা’ পত্রিকাটি পড়ে বিশেষ আনন্দ পেয়েছি। এর প্রায় প্রত্যেক রচনার মধ্যেই বৈশিষ্ট্য আছে।
সাহিত্য-বারোয়ারির দল-বাঁধা লেখার মতো হয়নি। ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য নিয়ে পাঠকের সঙ্গে এরা প্রায় নূতন পরিচয় স্থাপন করেছে। অল্পদিন আগে পর্যন্ত দেখেছি বাংলায় গদ্যছন্দের কবিতা আপন স্বাভাবিক চালটি আয়ত্ত করতে পারেনি। কতকটা ছিল যেন বহুকাল খাঁচায় বন্দী পাখির আড়ষ্ট চেষ্টা। গদ্যছন্দের রাজত্বে আপাতদৃষ্টিতে যে স্বাধীনতা আছে যথার্থভাবে তার মর্যাদা রক্ষা কঠিন। বস্ত্তত সকল ক্ষেত্রেই স্বাধীনতার দায়িত্ব পালন দুরূহ। বাণীর নিপুণ-নিয়ন্ত্রিত ঝঙ্কার যে মোহ সৃষ্টি করে তার সহায়তা অস্বীকার করেও পাঠকের মনে কাব্যরস সঞ্চার করতে বিশেষ কলাবৈভবের প্রয়োজন লাগে। বস্ত্তত গদ্যে পদ্যছন্দের কারুশিল্প কৌশলের বেড়া নেই দেখে কলমকে অনায়াস দৌড় করাবার সাহস অবারিত হবার আশঙ্কা আছে। কাব্যভারতীর অধিকারে সেই স্পর্ধা কখনোই পুরস্কৃত হতে পারে না। অনায়াসের আগাছা ভরা জঙ্গলকে কাব্যগুঞ্জ বলে চালিয়ে দেয়া অসম্ভব। তোমরা ফাঁড়া এড়িয়ে গেছ।’

আলোচ্য পত্রের উত্তর অংশে প্রথম সংখ্যার কয়েকজন বাদে অন্য কবিদের ক্রমানুসারী উলেস্নখে প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য করলেন। সমর সেন সম্পর্কে তিনি জানালেন : ‘কবিতা কয়টিতে গদ্যের রূঢ়তার ভিতর দিয়ে কাব্যের লাবণ্য প্রকাশ পেয়েছে। সাহিত্যে এর লেখা ট্যাকসই হবে বলে মনে হচ্ছে।’ বস্ত্ততপক্ষে, রবীন্দ্রনাথের এই সমালোচনায় আপস্নুত বুদ্ধদেব, পরের পত্রে লিখলেন (১৬.১০.৩৫) : ‘সমর সেনের কবিতা আপনার ভালো লেগেছে জেনে বিশেষ কারণে খুশি হলাম। এর বয়েস অল্প, লিখছেন অল্পদিন ধরে, কিন্তু এঁর কবিতা প্রথম দেখেই আমার মনে হয়েছিলো বাংলা গদ্য ছন্দে সম্পূর্ণ নতুন একটি সুর ইনি ধরেছেন। তাছাড়া যেটা প্রকৃত কাব্য-বস্ত্ত, তারও অভাব নেই। এঁর পরিচয় দিলে আপনি চিনবেন, ইনি ডক্টর দীনেশ সেনের পৌত্র ও শ্রীযুক্ত অরুণ সেনের পুত্র। এখনো এঁর ছাত্রাবস্থা, এবং ছাত্র হিসেবেও ইনি পয়লা নম্বরের।’

প্রথম সংখ্যা কবিতা পত্রিকার একটি সমালোচনা প্রকাশিত হয় ১৯৩৬-এর ৯ ফেব্রম্নয়ারি টাইম পত্রিকার (৩৫ বর্ষ ১৭৭৫ নং) সাহিত্য ক্রোড়পত্রে। অস্বাক্ষরিত সেই সম্পাদকীয় প্রবন্ধটির লেখক সে-সময়কার একমাত্র শ্বেতাঙ্গ, যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা করে থাকেন – নাম এডওয়ার্ড টমসন। তাঁর লেখা রচনার শিরোনাম : ‘A Land Made for Poetry : Now India’s Hopes and Fears’। সমালোচনায় টমসন প্রেমেন্দ্রর পরেই সমর সম্পর্কে যে-মন্তব্য করেন, বুদ্ধদেবের অনুবাদে সেটির অংশ : ‘আর-একটি কবিতা, তার লেখক শ্রীযুক্ত সমর সেন, শিরোনামে ধারণ করছে শ্রীযুক্ত এজরা পাউন্ডের Amor stands upon you : … এজরা পাউন্ড, টি. এস. এলিয়ট, আরো একজনের নাম এই তরুণ হিন্দু কবিদের উপর ছায়া ফেলেছে – ডি.এইচ. লরেন্স। এদের প্রভাব যে সম্পূর্ণই মুক্তি এনেছে, তা কিন্তু নয়।… কখনো কখনো, নবীনের পাশে-পাশেই প্রাচীন ঐতিহ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেখতে পাই, যেমন শ্রীযুক্ত সেনের একটি কবিতায় লরেন্সের আবেগ প্রবল পার্থিব মন আর স্পর্ধিত রূপক রচনার সঙ্গে মিশেছে উষ্ণ তন্দ্রাতুর রাত্রির সৌগন্ধসঞ্চয়।’

বহু বছর পরে, প্রেমেন্দ্র মিত্র টমসনের পূর্বোক্ত সমালোচনা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন : ‘এখনকার কথা জানি না, তখনকার দিনে বিশ্ব-সাহিত্যের ক্ষেত্রে সেই কাগজের মূল্যই ছিল আলাদা। T.L.S.-এ কিছু বের হওয়া মানে – সারা পৃথিবীতে সাহিত্য-রসিকদের মধ্যে তা ছড়িয়ে যাওয়া। টমসন তাঁর প্রবন্ধে ‘কবিতা’ পত্রিকা নিয়ে অনেক কথা লিখলেন, তারপর আমাদের কবিতা বিষয়ে একটু-আধটু উলেস্নখ করলেও গুরুত্ব দিলেন সমরকেই সব চাইতে বেশি, ওর দুটো কবিতার অনুবাদ-সহ আলোচনা করলেন।’ যেহেতু তখনো সমর সেনের কলেজজীবন শেষ হয়নি, সেদিক থেকে এটা যে বড়মাপের সম্মান ও স্বীকৃতি সে-কথা উলেস্নখ করে প্রেমেন্দ্র তাঁর আলোচ্য রচনায় আরো লিখেছিলেন : ‘অন্য কারো হলে ঐ থেকেই হয়তো তার জীবনের পথ নির্দিষ্ট হয়ে যেত। ওখান থেকেই হয়তো সে সংগ্রহ করে নিত বাকি জীবনের রসদ, এমত্মার কবিতা লিখত, নাম করত, বিদেশ যেত – ইত্যাদি। অথচ, সে-সবের কিছু সমর করল না। যারা তাকে চেনে তারা জানে এসব ও গ্রাহ্যই করত না। কোনো লোভই ছিল না ওর স্বভাবে।’

একটি পত্রে (৩.১১.৩৬) বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন : ‘কবিতা’-র আগামী পৌষ সংখ্যার জন্য আপনার একটি কবিতা পেলে খুশি হব। আপনার গদ্যকাব্যে যে বৈচিত্র্য ও বিসত্মৃতি প্রকাশ পাচ্ছে, তার ফসল থেকে ‘কবিতা’কে নিশ্চয়ই বঞ্চিত করবেন না? ‘কবিতা’ পত্রিকাটি গদ্য ছন্দেরই বাহন সাধারণ পাঠকের মনে এই রকম একটা ধারণা জন্মে গেছে। ও কথা সত্য নয়, কিন্তু ‘কবিতা’ গদ্যছন্দকে বিশেষভাবেই অঙ্গীকার করেছে তা সত্য।’ প্রসঙ্গত উলেস্নখ্য, কবিতার প্রথম বছরের দ্বিতীয় সংখ্যায় বীথিকার আলোচনা এবং তৃতীয় সংখ্যায় ‘গদ্যছন্দ’ শীর্ষক একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধে গদ্যকবিতা নির্মাণের এই আদিপর্ব সম্পর্কে সাধারণ পাঠকদের অবহিত করতে চেয়েছেন। যখনই কোনো সুযোগ পেয়েছেন, তখনই সমর সেনের প্রসঙ্গ এনেছেন অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে।

‘বুদ্ধদেববাবুর সঙ্গে আলাপ গভীর হতে সময় লাগেনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর আড্ডার কেন্দ্রস্থল হ’ল কবিতাভবন, ২০২ রাসবিহারী এভেনিউ।’ – সমর সেন-কথিত এই ঠিকানা কীভাবে সংগৃহীত হয়েছিল সে-বিষযে স্বয়ং বুদ্ধদেব জানিয়েছেন, একদিন বিকেলে বেড়াতে বেরিয়ে তিনি, স্ত্রী রাণু এবং সঙ্গী সমর সেন এই ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছিলেন। তারপর ১৯৩৭-এর জুন মাসে তাঁরা ভবানীপুর এলাকা ছেড়ে এই নতুন বাসস্থানে উঠে এসেছিলেন। একাদিক্রমে ঊনত্রিশ বছর কাটানোর স্মৃতি রোমন্থন করে বুদ্ধদেব লিখেছেন : ‘দেখতে-দেখতে কৈশোর থেকে পূর্ণ-যৌবনে উত্তীর্ণ হলো আমাদের রাসবিহারী অ্যাভিন্যু, আর, তারপর, দুটো-একটা ঐতিহাসিক ঘটনার ধাক্কায়, ত্বরান্বিত প্রগতি অথবা পতনের টানে পৌঁছে গেলো কংক্রীট-কঠিন ফুশফুশ রহিত প্রৌঢ়ত্বের প্রামেত্ম, প্রায় বার্ধক্যসীমায়। কিন্তু আমরা আর ঠাঁই নাড়লাম না, কেননা – ক্রমাগত প্রকাশিত নানান অসুবিধে ও মালিন্য সত্ত্বেও – ফ্ল্যাটটি যেন গ্রথিত হয়ে গেছে আমাদের জীবনের মধ্যে : সেই আমাদের কবিতাভবন, দু-শো দুই, টু-ও-টু, যা ছেড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে কষ্টে আমি জেগে উঠেছি অনেকদিন।’

কবিতার দ্বিতীয় বর্ষের চতুর্থ সংখ্যা (আষাঢ় ১৩৪৪) তখন প্রস্ত্তয়মান, সে-অবস্থায় বাসা বদল করে তাঁরা নতুন ঠিকানায় এলেন – সেজন্য আলোচ্য সংখ্যায় আলাদা কাগজ আঠা দিয়ে সেঁটে সেই স্থায়ী কার্যালয়ের কথা ঘোষিত হলো। আলোচ্য বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় (চৈত্র ১৩৪৩) সমর সেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় : ‘কবিতায় এ পর্যন্ত সমর সেনের যত কবিতা প্রকাশিত হয়েছে, সেই সমস্তএবং অন্যান্য পত্রে প্রকাশিত ও ইতিপূর্বে অপ্রকাশিত অনেক কবিতা একত্র ক’রে ‘কয়েকটি কবিতা’ নামে একটি বই আগামী পয়লা বৈশাখের পূর্বেই বের করা হবে। বইখানার দাম হবে পাঁচ সিকা। কিন্তু ১লা বৈশাখের পূর্বে যাঁরা ‘কবিতা’ কার্যালয়ে এক টাকা মানি অর্ডার করে পাঠাবেন, তাঁরা বই প্রকাশিত হওয়া মাত্র বিনা ডাক ব্যয়ে ঘরে বসে একখানা পাবেন। মনি-অর্ডার কুপনে ‘কয়েকটি কবিতার জন্য’ এই কথা লিখে দিতে হবে এবং নাম ও ঠিকানাও স্পষ্ট ক’রে লেখা দরকার।’

কবিতার দ্বিতীয় বর্ষের চতুর্থ সংখ্যায় সমর সেনের কবিতার বইয়ের বিজ্ঞাপনে প্রকাশন হিসেবে কবিতাভবন শব্দবন্ধের প্রথম ব্যবহার দেখা গেল। এছাড়া কার্যালয় বদলের মধ্য দিয়ে আর যেসব বদল পরিলক্ষিত হলো – তার মধ্যে উলেস্নখ্য অন্যতর সম্পাদক প্রেমেন্দ্র মিত্রের পরিবর্তে বুদ্ধদেবের সঙ্গে সমর সেনের নাম মুদ্রিত হলো। সমর সেন এই বদলের কারণ জানিয়েছেন : ‘প্রেমেনবাবু অলস প্রকৃতির লোক, দ্বিতীয় বছরে আমি যুগ্ম সম্পাদক হই, কিন্তু সম্পাদন, প্রকাশন, টাকাকড়ির হিসেব নিকেশ সমস্তকিছু করতেন বুদ্ধদেববাবু।’ এই মন্তব্য সংশোধন করে জানানো দরকার বুদ্ধদেবের সঙ্গে সমর সেন সম্পাদকের যুগ্ম দায়িত্ব পালন করেছেন তৃতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যা, আশ্বিন ১৩৪৪ থেকে। এই ব্যবস্থা চালু ছিল ষষ্ঠ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা পৌষ ১৩৪৭ পর্যন্ত। উলেস্নখ্য, ১৯৪০-এর অক্টোবরে দিলিস্নর রামযশ কমার্শিয়াল কলেজে চাকরি নিয়ে প্রবাসী হওয়ার পর সমর সেন এক তারিখবিহীন পত্রের (অনুমান ১৯৪১-এ লেখা) শেষে বুদ্ধদেবকে লিখেছিলেন : ‘কবিতা’র সম্পাদক হিসেবে আমার নাম আর কতোদিন রাখবেন? ব্যাপারটা হাস্যকর দেখায়।’ প্রতিভা বসু বলেছেন : ‘এই বাড়িতে আসার পরেই প্রেমেনবাবুর আসাটা খুব কমে গেল। দূরত্বই তার একমাত্র কারণ নয়, তিনি ততদিনে ফিল্ম লাইনে ঢুকে গেছেন। সেখানে ঢোকার পরই তাঁর পুরাতন বন্ধুদের আড্ডায় আসার সময়ও হয় না, বোধহয় প্রয়োজনও হয় না।’ বুদ্ধদেবের মন্তব্যে এই অনুমানের সমর্থন আছে : ‘প্রেমেনের আর উৎসাহ নেই – বোধহয় সেই সময়েই তার সিনেমা-সংস্রব শুরু হচ্ছিলো।’

আসলে প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রস্থান-বিষয়ে প্রকৃত কারণ প্রণিধানযোগ্য। প্রথমত, বিনামূল্যে কবিতা ছেপে দিলেও – দ্বিতীয় সংখ্যা প্রস্ত্ততিকালে সঞ্জয় ভট্টাচার্যের কবিতা বুদ্ধদেব কর্তৃক প্রত্যাখ্যান হওয়ায় তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। দ্বিতীয়ত, কবিতায় বিষ্ণু দে-র প্রাধান্য প্রেমেন্দ্র মেনে নিতে পারেননি বলে সম্পাদনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। পরে কবিতার প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকা হিসেবে প্রেমেন্দ্র মিত্র সঞ্জয় ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় নিরুক্ত নামের একটি ত্রৈমাসিক কবিতাপত্রিকা ১৩৪৭-এর আশ্বিনে। কবিতা পত্রিকার মাধ্যমে বুদ্ধদেব বসু আধুনিক বাংলা কবিতার যে-নবতর ধারা হিসেবে গদ্যকবিতার অভিযাত্রাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন – সেটার বিরোধিতা করা অবশ্য কর্তব্য বলে বিবেচনা করেছিলেন নিরুক্তর সম্পাদকদ্বয়। বলা বাহুল্য, কবিতার লেখক যাঁরা তাঁদের অনেকেই নিরুক্ততে লিখেছেন – একমাত্র বুদ্ধদেব, বিষ্ণু দে এবং সমর সেন কোনোদিন সে-পত্রিকায় লেখেননি।

প্রেমেন্দ্র মিত্র কবিতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে         কোথাও কোনো মন্তব্য করেননি – শুধু আভা পত্রিকার প্রেমেন্দ্র মিত্র সংখ্যায় (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৮৭) নির্মলেন্দু ভৌমিক-রচিত ‘প্রেমেন্দ্র মিত্র ও ‘কবিতা’ পত্রিকা’ শীর্ষক নিবন্ধের উপসংহারে প্রেমেন্দ্রর জবানিতে জানিয়েছিলেন, বেঙ্গল ইমিউনিটিতে চাকরি নেওয়ার জন্য তিনি কবিতার সংসর্গ ছেড়েছিলেন। এই তথ্যের যাথার্থ সম্পর্কে বর্তমান লেখক প্রেমেন্দ্রর অভিমত জানতে চাইলে তিনি একটি  পত্রে (২৪.১২.৮৩) জানান : ‘কবিতা পত্রিকার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ক্ষীণ হবার এটা কোনো কারণই নয়।’ এ-কথা ঠিক, প্রেমেন্দ্র বেঙ্গল ইমিউনিটিতে যুক্ত ছিলেন ১৯৩১-৩২, ১৯৩৬-এ দায়িত্ব নেন নবশক্তি পত্রিকার সম্পাদনার। তারপর ১৯৩৮-এ সিনেমার সঙ্গে তাঁর সংযোগ ঘটে। তবে, বর্তমান আলোচকের জিজ্ঞাসার উত্তরে ইতিপূর্বে প্রেমেন্দ্র একটি চিঠিতে (৮.১২.৮৩) লিখেছিলেন : ‘কবিতা’ পত্রিকার সঙ্গে আমার বিরোধের কোনো বিবরণ আমার কোনো লেখায় পাননি লিখেছিলেন। যা মোটেই হয়নি তার বিবরণ কেমন করে পাবেন? সঞ্জয় ভট্টাচার্য ‘কবিতা’র একজন লেখক ছিল মাত্র কিন্তু বুদ্ধদেবের সঙ্গে আমি সমর সেনকে সহকারী হিসেবে নিয়ে ‘কবিতা’ পত্রিকা প্রথম বার করি। বেশ কিছু দিন পরে ‘কবিতা’র সম্পাদনা ছেড়ে দিয়েছিলাম বটে কিন্তু সেটা কোনো বিরোধের জন্যে নয়। সেই সময় আমি ফিল্মজগতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছবি তোলার কাজে ব্যস্তথাকি। ‘কবিতা’ পত্রিকার সম্পাদনায় সময় দিতে না পারার দরুন বুদ্ধদেব ও সমর সেনের ওপর সে ভার সানন্দে ছেড়ে দিই। সম্পাদক হিসেবে নাম দেওয়া বন্ধ করার পরও তাই আমার লেখা ‘কবিতা’ পত্রিকায় বার যে হয়েছে তা পুরোন ফাইল খুঁজলেই জানতে পারবেন।’ এ-বিষয়ে প্রকৃত তথ্য, ছেড়ে দেওয়ার পর কবিতায় চতুর্থ বর্ষের প্রথম সংখ্যায় (আশ্বিন ১৩৪৫) প্রেমেন্দ্রর ‘নীলকণ্ঠ’ এবং চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় ‘সম্রাট’ কবিতা মুদ্রিত হয়েছিল। সম্পাদক হিসেবে যুক্ত থাকা অবস্থায় লিখেছিলেন মাত্র দুটি সংখ্যায় প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যায় একটি এবং প্রথম বর্ষের    তৃতীয় সংখ্যায় তিনটি।

কবিতা পত্রিকার সঙ্গে প্রথমে সঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং পরে প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণ যাই হোক না কেন – কবিতাপন্থীদের সঙ্গে নিরুক্তপন্থীদের বিবাদ যে তিক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তাতে প্রধানত বিষ্ণু দে, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বামপন্থী কবির প্রতি সঞ্জয় ভট্টাচার্যের বিরূপতা স্পষ্ট। পরিণত বয়সের স্মৃতিচারণায় সঞ্জয় লিখেছেন : ‘১৯৩৭ থেকে স্টালিন-মার্কা সমাজতান্ত্রিকরা কবিতায় বাস্তবের পালা গাইবার ওকালতি করেছে। যাঁরা শেষ কবি বলে নিজেদের ইদানীং ঘোষণা করেছেন তাঁরা মার্কিন প্রাগমেস্টিক হুইটম্যানিয়ারই রোগী অথবা বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে বন্দি। কাব্যের এই রাজপথে যাওয়ার সুবিধে অনেক। মিছিলের বা সভাসমিতির নরনারীর হাততালি, উলুধ্বনি পেতে কালবিলম্ব হয় না। তাছাড়া ও পথে যাওয়া যেমনি সহজ, তেমনি বুদ্ধিমানের কাজ। ধূর্জটিদা ত্রিশের দশকে জীবনানন্দকে উপেক্ষা করে শ্রীমান সমরের বুদ্ধিমত্তায় ওকালতি করে আমাকে পত্রও দেন। কবিতায় বুদ্ধির স্থান আছে বলে আমি স্বীকার করিনে।’

বুদ্ধদেব অবশ্য কবিতা পত্রিকার মাধ্যমে যেমন বাংলা কবিতার আধুনিক ধারার পৃষ্ঠপোষণাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তেমনি নতুন যাঁরা পাঠক দলভুক্ত, তাঁদেরও যথেষ্ট প্রশিক্ষণ দিতে চেয়েছিলেন কবিতার পাঠক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে। কবিতার প্রথম বর্ষের চতুর্থ সংখ্যায় যে-সম্পাদকীয় রচনাটি বুদ্ধদেব লিখেছিলেন সেটির শিরোনাম দেওয়া হয় ‘কবিতার পাঠক’ – সেই নিবন্ধের উপসংহারে তিনি আশা ব্যক্ত করেছিলেন : ‘কবি তৈরি করা যায় না, কিন্তু অনুকূল অনুষঙ্গে কবিতার পাঠক তৈরি হতে পারে। ভালো পাঠকের সংখ্যা অল্প, কিন্তু বাড়ানো যেতে পারে এবং ভালো পাঠক যত বেশি হয়, কবির ও কবিতার পক্ষে ততই ভালো।’

 

তিন

কবিতাভবন প্রকাশনার প্রথম বই সমর সেনের কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৩৭-এর মার্চে – বুদ্ধদেব মুদ্রণ তত্ত্বাবধান করলেও প্রকাশক হিসেবে সমর সেনের নাম এবং ঠিকানা সাগরমান্যা রোড, বেহালা উলিস্নখিত হয়।

তবে সমর সেনের কবিতা যাতে পাঠকমহলে গ্রহণযোগ্য হয় সেজন্য বুদ্ধদেব খুবই তৎপর ভূমিকা পালন করেছিলেন, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। কয়েকটি কবিতা প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠিয়ে সমর লিখেছিলেন (১৬ এপ্রিল ১৯৩৭) : ‘আমার কবিতার বই এক কপি আপনার ঠিকানায় পাঠিয়েছি। আপনার কেমন লেগেছে জানতে পারলে বাধিত হব।’ রবীন্দ্রনাথ অবশ্য এ-চিঠির কোনো উত্তর দেননি। কিন্তু বুদ্ধদেব কবিতার দ্বিতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় (আষাঢ় ১৩৪৪) ‘নব যৌবনের কবিতা’ নামে একটি দীর্ঘ সমালোচনা লিখলেন। তাতে তাঁর কাব্যরীতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বুদ্ধদেব জানান : ‘তাঁর কবিতা গদ্যে রচিত, এবং কেবলই গদ্যে। আমার ধারণা ছিলো পদ্য রচনায় ভালো দখল থাকলে তবেই গদ্য কবিতায় স্বাচ্ছন্দ্য আসে, কিন্তু সমর সেনের মধ্যে এর ব্যতিক্রম দেখলুম। তিনি গদ্যে ছাড়া লেখেননি, এবং কখনো লিখবেন এমন আশাও আমার নেই।’ ‘তাঁর গদ্য-ছন্দ বাংলা ভাষায় অভিনব’ এই উলেস্নখের পর তিনি বললেন : ‘রবীন্দ্রনাথের বা অন্য কোনো কবির ছাঁচে ঢালাই করা নয়। আমরা রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলি, অর্থাৎ এটা আমরা ধরেই নিই যে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব আধুনিক বাঙালি কবির প্রচেষ্টায় অনিবার্য। কিন্তু এই যুবক-কবি কেন রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে কখনোই পড়েননি, সেটা আমার আশ্চর্য লাগে। ‘কয়েকটি কবিতা’য় সে-রকম সচেতন ও তির্যক ভঙ্গিতে রবীন্দ্র-কাব্য উদ্ধৃত করা আছে তাতেই বোঝা যায় যে আমাদের যেমন প্রথম যৌবনে বিশ্বাসের বাতাসই ছিলো রবীন্দ্র-কাব্য, এ-কবির সে-রকম নয়। বাংলা কবিতার যে-ঐতিহ্যসম্পদ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি, এই নবীন কবি সেখানে যেন কোনো অবলম্বন খুঁজে পাননি।’

সমর সেনের কবিতায় সমকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন অবচেতনভাবেই তাঁর কাব্যের রক্তমাংসকে গড়ে তুলেছে। বুদ্ধদেব লিখেছেন : ‘বর্তমান সময়ের সংশয়াচ্ছন্ন অন্ধকার যে-তরুণ চিত্তকে আবিষ্ট করেছে, সমর সেন তারই প্রতিনিধি।’ ‘একটি মেয়ে’ শীর্ষক কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে, সামাজিক পরিবেশের মধ্যে তাঁর কবি-স্বভাবে যে উন্মীলমান যৌবনের পীড়ায় আক্রান্ত সেটিকে চিহ্নিত করে বলেছেন : ‘সমর সেনের কবিতায় এই অসুস্থতাবোধ খুব বড়ো একটা লক্ষণ। নাগরিক জীবন আমরা আরম্ভ করেছি অনেকদিন, কিন্তু আমাদের কাব্যে এ-পর্যন্ত বেশিরভাগই পাওয়া গেছে রাখাল-বালকের চোখে পলস্নী-প্রকৃতির ছবি। নাগরিক জীবনের খ–খ- ছবি বা উলেস্নখ কোনো-কোনো আধুনিক কবিতে থাকলেও, সামগ্রিকভাবে আধুনিক নগরজীবন সমর সেনের কবিতাতেই ধরা পড়লো। সমর সেন শহরের কবি, কলকাতার কবি, আমাদের আজকালকার জীবনের সমস্তবিকার, বিক্ষোভ ও ক্লান্তির কবি। ঠিক যেন শহরের সুরটি ধরা পড়েছে তাঁর ছন্দ।’ সেই ছন্দ কোন দিক থেকে স্বতন্ত্র, স্পষ্টত সে-বিষয়ে বুদ্ধদেব জানিয়েছেন : ‘বাংলা গদ্যছন্দকে এই তরুণ কবি যে-রূপ দিয়েছেন, সেটা আর কারোরই নয়; তিনি আবিষ্কার করেছেন এই ছন্দের অভিনব ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি। এ-গদ্য গল্পে বা প্রবন্ধে ঠিক ব্যবহার্য নয়; এ যেন বিশেষভাবে কবিতারই বাহন।’ রবীন্দ্রনাথকে বুদ্ধদেবের উপর্যুপরি সুপারিশ সত্ত্বেও এই বাহনটিকে অভ্যর্থনা জানাননি, সেটা আশ্চর্যের ঘটনা। তবে অনুমান করা যায়, বুদ্ধদেবের সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথ-প্রসঙ্গ ফিরিয়ে এনে যা লেখা হয় তা কবিগুরুকে খুশি করতে পারেনি। কালের পুতুল গ্রন্থে সংকলিত হলে সেই উপসংহার অংশ বুদ্ধদেব বর্জন করেছিলেন, সেটা এই রকম : ‘রবীন্দ্রনাথের প্রভাব চিহ্নমাত্র নেই এমন কবি আজ একজন যখন দেখা গেছে ক্রমে ক্রমে আরো দেখা যাবে নিশ্চয়ই – তাঁদের ভাব ও ভঙ্গি, বিষয়বস্ত্ত ও দৃষ্টি সবই হবে অন্য রকমের। আর এই দিকেই যদি পরিণত হয় (এবং মনে হচ্ছে যে তাই হবে) তা হলে বাঙলা কাব্যে সম্পূর্ণ এক নতুন দিন বেশি দূরে নয়। বাঙলা কবিতার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে খুব বড় আশা হচ্ছে।’

প্রসঙ্গত উলেস্নখ্য, গদ্যকবিতার যাঁরা বিরোধিতা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে মোহিতলাল মজুমদার ঢাকা থেকে বনফুলকে লেখা একটি পত্রে (২০ জুন ১৯৩৭) লিখেছিলেন : ‘ছন্দোহীন কবিতা আর যাই হোক খাঁটি কবিতা নয়, ভাবের যে সুর এবং কল্পনার যে আবেগ ভাষায় প্রকাশ করাকে কাব্য-নির্মাণ বলে – সেই সুর ও সেই আবেগ ছন্দোভিন্ন ভাষায় সংক্রামিত হয় না।… বোলপুর, বালীগঞ্জ ও বেহালা – এই তিন ব-কারের জ্বালায় বাংলার কাব্যসরস্বতীর এখনও কিছুকাল অজ্ঞাতবাস ছাড়া আর অন্য উপায় নাই…।’ পত্রে উলিস্নখিত স্থানগুলো যথাক্রমে রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু ও সমর সেনের বাসস্থানকে বোঝানো হয়েছে।

বঙ্গাব্দ ১৩৪৫-এর শ্রাবণ মাসে (১৯৩৮ আগস্ট) রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় যখন বাংলাকাব্য পরিচয় নামে সংকলনটি প্রকাশিত হলো, তখন কবিতায় আশ্রিত দুই তরুণ বিষ্ণু দে ও সমর সেনের কবিতা গ্রহণ করেননি। সমর সেনকে বর্জন করার কারণ নামোলেস্নখ না করেই ‘ভূমিকা’য় উলেস্নখ করা হয় : ‘এই সংকলনগ্রন্থে আধুনিক বাংলার গদ্যকাব্য থেকে সংগ্রহ করা হয়নি। সে কাব্যের ভা-ার অতি সংকীর্ণ, তার থেকে বাছাই করে নেওয়া সহজ নয়। এ কালের পাক ধরার সময় এখনো আসেনি সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

এই অপেক্ষা করার কথা তিনি সমর সেনকে দুবছর পরে জানিয়েছেন আরো স্পষ্ট ভাষায়। উলেস্নখ্য, কবিতায় (আশ্বিন ১৩৪৫) একটি ক্ষুব্ধ সমালোচনা লিখেছিলেন বুদ্ধদেব বাংলা কাব্য পরিচয় বিষয়ে, তাতে তিনি জানান : ‘গদ্য কবিতা রবীন্দ্রনাথ নেননি; না নেবার অধিকার তাঁর সম্পূর্ণই আছে। সেই জন্য সমর সেন বাদ পড়েছেন। ১৯২৭-২৮-এর পরে, অর্থাৎ কলেস্নালের সময়ের পরে, বাংলা কাব্যসাহিত্যে নতুন শক্তির আবির্ভাব সমর সেনই। খুব কম বাংলা কবিতেই এত অল্প বয়সেই এতখানি বুদ্ধির পরিণতি ও আঙ্গিকের উপর দখল পাওয়া গেছে। বাংলা গদ্যছন্দকে সমর সেন নতুন ক’রে সৃষ্টি করেছেন ও করছেন। তাঁর প্রভাব এর মধ্যেই যথেষ্ট ব্যাপক, আজকের দিনে দেখা যাচ্ছে প্রায় কোন যুবকই তাঁকে অনুকরণ না-ক’রে লিখতে পারেন না।’

এই প্রভাবের উদাহরণ দিতে বুদ্ধদেব সংকলনভুক্ত, নিশিকান্তর কবিতার উলেস্নখ করে প্রশ্ন রাখলেন : ‘সমরের প্রভাব পাওয়া যায়, এমন কবিতা ‘বাংলা কাব্য পরিচয়ে’ও আছে। সমর সেনকে নিতে হবে বলেই গদ্যছন্দকে স্বীকার করা অযৌক্তিক হত না, তাতে রবীন্দ্রনাথ যখন গদ্যকবিতা নেনইনি, তখন ভুলক্রমেও কোনো গদ্যকবিতা যাতে ঢুকে না পড়ে সে-বিষয়ে তাঁর লক্ষ্য নিশ্চয়ই প্রখর ছিল। কিন্তু নিশিকান্তর ‘পন্ডিচেরির ঈশান কোণের প্রান্তর’ কেমন করে ঢুকলো?’ তথ্য হিসেবে এটা জানানো যায়, নিশিকান্তর আলোচ্য কবিতা কবিতারই তৃতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (আশ্বিন ১৩৪৪) মুদ্রিত হয়েছিল।

আলোচ্য সংকলনে সমর সেনের অনুপস্থিতি সম্পর্কে আরেকটি তীব্র সমালোচনা লিখেছিলেন অশোক মিত্র, – চতুরঙ্গ পত্রিকায় (আশ্বিন ১৩৪৫) প্রকাশিত সেই দীর্ঘ রচনায় তিনি জানান : ‘ভূমিকায় আর একটি কথা আমরা পাই, ‘এই সংকলন গ্রন্থে আধুনিক বাংলার গদ্যকাব্য থেকে সংগ্রহ করা হয়নি। সে-কাব্যের ভা-ার অতি সংকীর্ণ, তার থেকে বাছাই করে নেওয়া সহজ নয়।’ দ্বিতীয় বাক্যটি আমাদের হতবুদ্ধি করেছে। সাধারণ বুদ্ধিতে অবশ্য এটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, ভা-ার যতই সংকীর্ণ হবে ততই বাছাই করে নেওয়া সহজ; কারণ বাছাই করবার জিনিসের অপ্রাচুর্য্য। এবং গদ্যকাব্য লেখক বলতে প্রকৃতপক্ষে বোঝায় দুটি কবিকে; রবীন্দ্রনাথ ও সমর সেন। তাছাড়া এই নিকৃষ্ট সংকলনগ্রন্থের সম্পাদনা কাজটি প্রকৃতই খুব দুরূহ ও আয়াসসাধ্য হয়েছে বলে আমাদের মনে হয় না। গদ্যরীতি সম্বন্ধে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বর্তমান যুগের পথপ্রদর্শক, সে সম্বন্ধে তাঁর বিচারই শিরোধার্য্য করে নিতে হবে।… গদ্যরীতির প্রতিষ্ঠাতা সমর সেনের রচনা যে আদ্যন্ত পদ্য ছন্দোময় সে সম্বন্ধে কারুর কোন সন্দেহ থাকাই উচিত নয়। এবং সে যুক্তি অনুসরণ করলে সমর সেন যে কেন ‘কাব্যপরিচয়’-এ স্থান পেলেন না সেটা একটা রহস্য।’

সমর সেনের দ্বিতীয় কবিতার বই গ্রহণ ও অন্যান্য কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৪০-এর মার্চ মাসে – সেটিও প্রকাশ করেন গ্রন্থকার। উৎসর্গপত্রে লেখা হয় : বুদ্ধদেব বসু, রাধারমণ মিত্র ও বিষ্ণু দে। ‘অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে’ সে-বই রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে একটি পত্রে (১১ মার্চ ১৯৪০) সমর লিখেছিলেন : ‘আপনার সময়ের অত্যন্ত অভাব জানি, তবু ‘গ্রহণ’ আপনার কেমন লেগেছে জানতে পারলে বিশেষ উপকৃত হবো।’ ইতিপূর্বে বুদ্ধদেবের সঙ্গী হয়ে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি উত্তরে লিখলেন (১৫ মার্চ ১৯৪০) : ‘তোমার লেখনী কাব্যের যে নতুন সীমানায় যাত্রা করেছে – সে আমার অপরিচিত, শুধু আমার নয়, সাধারণের কাছে এর ম্যাপ এখনো স্পষ্ট রেখায় চিহ্নিত হয়নি সুতরাং এখানে তোমার আসন অল্প লোকের কাছেই স্বীকৃত হতে বাধ্য। এখানকার পরিচয় ক্রমশ হয়তো প্রশস্তহবে কিন্তু যে পর্যন্ত না হয় সে পর্যন্ত তোমার অভ্যর্থনা বিশেষ রসগ্রাহী মহলেই সংকীর্ণ হয়ে থাকবে – এ অনিবার্য। আমাদের রসসম্ভোগের অভ্যাস তোমাদের এ যুগের নয় ক্ষুণ্ণ মনে এই কথা কবুল করে তোমাকে আশীর্বাদ জানাই।’

গ্রহণ ও অন্যান্য কবিতা গ্রন্থের একটি দীর্ঘ আলোচনা লিখেছিলেন অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেবের অনুরোধে। ‘ঝর্ণা-ছন্দের কাব্য’ শিরোনামে সেই লেখাটি মুদ্রিত হয় কবিতার ষষ্ঠ বর্ষের অতিরিক্ত সংখ্যায় (কার্তিক ১৩৪৭)। আর একটি ঘটনার কথা উলেস্নখ্য – পূর্বোক্ত বাংলা কাব্য পরিচয়ের ধাক্কায় মনোক্ষুণ্ণ বুদ্ধদেব উদ্যোগী হয়েছিলেন আধুনিক কবিতার একটি পর্যাপ্ত সংকলন প্রস্ত্তত করতে। কবিতাভবন থেকে প্রকাশিতব্য সেই সংকলন প্রস্ত্ততিতে সবচেয়ে উৎসাহিত বুদ্ধদেব, সম্পাদনা নিরপেক্ষ হবে এই বিবেচনায় এমন দুজনকে সম্পাদনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যারা ‘বৈদগ্ধবান কিন্তু নিজেরা কবি নন’ – আবু সয়ীদ আইয়ুব ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু কাজ শুরু হওয়ার পর তাঁদের মনোমালিন্য ক্রমে তীব্র হয়ে ওঠে – যেজন্য আলোচ্য সংকলনে দুটি পৃথক ভূমিকা লিখেছিলেন। সংকলনটি প্রকাশিত হয় ১৩৪৬ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ, জুলাই ১৯৪০ – সেটির উৎসর্গপত্রে লেখা হয় : শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বরণীয়েষু। রবীন্দ্রনাথের বারোটি কবিতা দিয়ে শুরু করে শেষাংশে সমর সেনকে একটা বড় পরিসর দেওয়া হয়, তাঁর কবিতার সংখ্যা আট। প্রথমোক্ত জনের ভূমিকায় তাঁকে ‘সাম্যবাদী দলে’ ‘নিঃসন্দিগ্ধ কবি’ হিসেবে উলেস্নখ করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সংকলনটি পাঠ করে অভিমত জানান : ‘তোমাদের এই সংকলন দেখে আনন্দিত ও আশ্বস্তহয়েছি। প্রায় সবগুলিই বিশেষভাবে উপভোগ্য।’

বুদ্ধদেব বসুর ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে কলকাতা পত্রিকা যে যুগ্ম সংকলন (সপ্তম-অষ্টম ডিসেম্বর ১৯৬৮-জানুয়ারি ১৯৬৯) প্রকাশিত হয় – তাতে কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ‘কবিতা’র সাত বছর’ নামে একটি প্রবন্ধে বছর ধরে ধরে পর্যালোচনা করে লিখেছিলেন : ‘দ্বিতীয় বছরে ১৩৪৩-৪ ‘কবিতা’য় জীবনানন্দের তেরোটি কবিতা ছাপা হয়, সমর সেনের পাঁচটি, রবীন্দ্রনাথের তিনটি কবিতা এবং ‘গদ্যকাব্য’ নামে প্রবন্ধ এবং সমর সেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কয়েকটি কবিতা’র উপর বুদ্ধদেববাবুর বিখ্যাত সমালোচনা ‘নবযৌবনের কবিতা’। এখানে যদি এই মন্তব্য করি যে বুদ্ধদেব বসু যদি ‘কবিতা’ পত্রিকা প্রকাশ না-করতেন এবং সমর সেনের কবিতা নিয়ে উক্ত দীর্ঘ প্রবন্ধ না-লিখতেন তাহ’লে তখনকার দিনের সমর সেন হয়তো অমন উৎসাহে অত কবিতা লিখতেন না এবং তাঁর কবিতার প্রতি বিদগ্ধ সমাজের দৃষ্টি পড়তো না – তাহ’লে বন্ধুবর সমর সেন হয়তো আমার উপর বিরূপ হতেন না।’

 

চার

এ-কথা ঠিক, সমর সেনের কাব্যচর্চায় প্রধান উৎসাহদাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। কবিতার সঙ্গে একনজরে সমর সেনের সম্পর্কে খতিয়ান হলো : ক্রমিক হিসেবে প্রথমতম থেকে বিয়ালিস্নশ সংখ্যা পর্যন্ত মোট তেত্রিশটি সংখ্যায় তাঁর যেসব লেখা মুদ্রিত হয়েছে সেগুলো – কবিতা ৫৫, সমালোচনা আট এবং প্রবন্ধ মাত্র একটি। কবিতায় প্রথম প্রকাশকালে তাঁর বয়স মাত্র ১৯, তখনো তিনি ছাত্র। ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৪ মাত্র ন-বছর কবিতায় লিখেছেন – একদিক থেকে প্রথমে পূবর্বাশার মতো পত্রিকার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করলেও, কবিতাই তাঁর কবিখ্যাতির প্রধান শুধু নয়, একমাত্র অবলম্বন বলা যায়।

কলকাতায় বাগবাজার বিশ্বকোষ লেনে তাঁর জন্ম ১০ অক্টোবর ১৯১৬ – পিতামহ দীনেশচন্দ্র সেন, পিতা অরুণচন্দ্র সেন, ইতিহাসের অধ্যাপক। বারো বছর বয়সকালে তাঁর মা চন্দ্রমুখী সূতিকা রোগে প্রয়াত হন। স্কুলজীবনের শুরু কাশিমবাজার পলিটেকনিক স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে, সেখান থেকে ১৯৩২ সালে ম্যাস্ট্রিক পাশ করে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। সেই সময় দীনেশচন্দ্র তাঁর বাগবাজারের বাড়ি ভাড়ায় দিয়ে বেহালায় এক বাগানবাড়িতে বাস করতে শুরু করেন। রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক এবং অন্য অনেকের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ঘটতে থাকে। রাধারমণ মিত্র ও বঙ্কিম মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেই সুবাদেই আলাপ। পিতৃবন্ধু রাধারমণ তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন : ‘মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা থেকে ছাড়া পেয়ে এসে আমি তখন উঠেছি অরুণের কাছেই। সমর সে-সময় এম.এ.-র জন্য প্রিপারেশন করছে। একদিন ওঁর একটা লেখা পড়ে আমি অবাক, দেখি অসাধারণ ইংরেজি। এমনিতে তো ও ছিল, বরাবরের মতন কিছুটা বাউ-ুলে। কথা বেশি বলত না কোনো দিন। লেখায় যেমন কথাবার্তাতেও ওর সংযম ছিল তেমনি চোখে পড়বার মতন। অদ্ভুত সেন্স অব হিউমার, কুট্টুস করে কিছু মন্তব্য – সবদিক থেকেই ও ছিল আর পাঁচজনের থেকে আলাদা।’

বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর নিজের কাব্যচর্চা ও কবিতা পত্রিকা নিয়ে মাতামাতি করেও ইংরেজিতে অনার্স এবং এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান পেয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এম.এ. পাশ করার দু-বছর পর তিনি ১৯৪০-এ প্রথমে মাত্র দুমাসের জন্য কাঁথি প্রভাতকুমার কলেজে এবং বছরের শেষের দিকে অক্টোবরে দিলিস্নর রামযশ কমার্শিয়াল কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। কলকাতা থেকে দূরে চলে যাওয়ার জন্য কবিতার সম্পাদনা ও গ্রাহক সংগ্রহের কাজ থেকে নিজে অব্যাহতি নেন। তিনি কবিতা প্রকাশকালে কীরকম তৎপর থাকতেন, সাগর মান্যা রোড বেহালা থেকে বুদ্ধদেবকে লেখা একটি পত্রাংশ উদ্ধার করলে বোঝা যাবে, ৩১ ডিসেম্বর ১৯৩৫-এ লিখছেন : ‘মাঝে আরো দু-তিনজন কবিতার ‘Subscriber’ জোগাড় করেছি। শ্রীহর্ষের সম্পাদক কয়েকটি করেছে; এবং করে দেবে বলেছে, যদি আপনি তাদের একটা ‘ভালো’ লেখা দ্যান। আমি কয়েকদিন Esplanade-এর Stall দেখিনি। তবে মনে হচ্ছে Stall-এ এবার কোনো ‘কবিতা’ দেওয়া হয়নি। অন্তত দিনআষ্টেক আগে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।’

দিলিস্ন বাসকালে তাঁর জীবনের বড় ঘটনা – ১৯৪১-এর ২৮ এপ্রিল হরিপ্রসন্ন সেনের কন্যা সুলেখার সঙ্গে তাঁর বিবাহ। সে সময় তাঁর আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে, একটা ফ্যান কিনতে কী ভাড়া করতে পারেননি। দুটো খসখস কিনেছিলেম, তাতে আরো গরম বেড়েছে। ‘দুপুরগুলো জানোয়ারের মতো অসহায়ভাবে’ কাটাতে হচ্ছে। এসব কথা ১২ বি দরিয়াগঞ্জ দিলিস্নর ঠিকানা থেকে জানাচ্ছেন বিষ্ণু দে-কে, এবং বিয়ের দিনে লেখা পত্রে তিনি খবর দিচ্ছেন : ‘বিয়েটা খুব মজার হচ্ছে। বাড়ির পাশেই আমার ভাবী স্ত্রী থাকেন; বিয়ের সমস্তঅনুষ্ঠান ওদের বাড়ীর মেয়েরা জোগাড়যন্ত্র করে সম্পন্ন করেছেন। এমন কি যে জামাকাপড় পরে বিয়ে করতে যাবো সেটাও বাগিয়েছি। আমার হাতে মাত্র পাঁচ টাকা আছে। এর কাছে কাপড়, ওর কাছে রুমাল, রাধারমণবাবুর কাছে টাকা, কোনোরকম manage করেছি। বাবা শুনলাম মেয়েকে আশীর্বাদ করার সময় শ্বশুরমশায়ের কাছ থেকে গিনি নিয়ে সেটাই দিয়েছেন। মজা মন্দ নয়, আপনারা এলে খুব উপভোগ করতেন। আমিও শেষবার আপনার কাছে সেই ২৫ টাকা উদ্ধার করার চেষ্টা করতাম।’

কবিতায় শেষবারের মতো যখন লিখলেন তখন তাঁর বয়স আটাশ মাত্র। সে-সময় অধ্যাপনা ছেড়ে বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করতে-করতে অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর বেতার সাংবাদিকতায় যোগ দিয়েছেন। পরবর্তী আটত্রিশ বছর তিনি সাংবাদিকতা কিংবা সম্পাদনা ছাড়া মস্কোতে অনুবাদের কাজে বছরচারেক (১৯৫৭-৬১) যুক্ত ছিলেন। রাধারমণ মিত্র তাঁর কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে লিখেছেন : ‘১৯৪৯ নাগাদ সমর চলে এল কলকাতায়। ঢুকল স্টেটসম্যান-এ। সেখান থেকে গেল মস্কোয়। তর্জমার কাজ নিয়ে। বছরচারেক ছিল ওখানে। ফের কলকাতায় এসে হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের চাকরি নিল সে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নের নীতিগত কারণে ঐ চাকরিও সমর ছাড়ল।’ হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার বছর ১৯৬৪-এর অক্টোবরে হুমায়ুন কবিরের আহবানে সম্পাদনার দায়িত্ব নেন নাউ পত্রিকার। ১৯৬৭-তে সে-পত্রিকার সঙ্গে মতবিরোধের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফন্টিয়ার সাপ্তাহিক পত্রিকা তাঁর সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয় ওই বছর ১৪ এপ্রিল। সেই পত্রিকার সম্পাদক থাকাকালে তিনি প্রয়াত হন ১৯৮৭-এর ২৩ আগস্ট বেলা ২-৩০টায়, ক্যালকাটা হসপিটালে – মাত্র একাত্তর বছর বয়সে।

তাঁর প্রথম কবিতার বই কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৭-এর মার্চে, পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলো প্রকাশ পায় যথাক্রমে : গ্রহণ ও অন্যান্য কবিতা (ফেব্রম্নয়ারি ১৯৪০); নানাকথা (মে ১৯৪২); খোলা চিঠি (জুলাই ১৯৪৩) এবং দশ বছরের ব্যবধানে প্রকাশিত হয় সমর সেনের কবিতা (১৯৫৪)।  শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন : ‘অল্পদিনই কবিতা লিখেছিলেন সমর সেন। কিন্তু সেই অল্প কয়েক বছরের লেখা ঠিক একই জায়গায় থেমে থাকেনি। একটি বই থেকে অন্য বইতে পৌঁছবার পথে তাঁর বদলাবার ধরনটাও আমরা টের পাই।’ এরপর তিনি আলোচ্য বিশেস্নষণে ধীরে-ধীরে পরিবর্তনের রূপটিকে অল্প কথায় ধরিয়ে দিয়েছেন : ‘প্রথম দিকের স্মৃতিবিধুর টান অল্পে অল্পে কেটে যায় পরে, তার বদলে জেগে উঠতে থাকে একটা ঝাঁজ। ক্ষয়ের ছবির মধ্য থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠতে থাকে ভাবী সমাজের ইশারা, মহুয়া ফলের আবেশ ছেড়ে দেখা দিতে শুরু করে ‘তামাটে প্রান্তরে’র মানুষেরা, আর চিত্তরঞ্জন সেবাসদনের ক্লান্ত উর্বশী নৃত্যরতা হয়ে ওঠে ‘কালের তপোভঙ্গে’।’

সমর সেনের কবিতায় যে পালাবদল অবধারিত হয়ে উঠেছিল, তাঁর রাজনীতির দিকে যে দায়বদ্ধতার ঝোঁক দেখা দিয়েছিল – তাঁর জীবনের প্রথম পর্বে প্রধানতম পৃষ্ঠপোষক বুদ্ধদেব বসু তা সহজে মানতে পারেননি। মনে পড়ে যায়, জীবনানন্দের কবিতায় সমাজসচেতন এক কবির অনিবার্য ফসল – সেটাও সমর্থনযোগ্য মনে করেননি কবিতার সম্পাদক। কবিতার ১৩৫১ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংখ্যায় জীবনানন্দের মহাপৃথিবী আর সমর সেনের তিনপুরুষ ছাড়াও আরো কয়েকটি বইয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে শেষোক্তটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন : ‘তাঁর রাজনৈতিক ঝোঁক প্রথম থেকেই স্পষ্ট; এ-বইয়ে তিনি প্রায় রাজনৈতিক সাংবাদিকতা করেছেন। উঁচুদরের সাংবাদিকতা সন্দেহ নেই, কিন্তু কবির কাছে আমাদের প্রত্যাশা অন্য-কিছু।’ ‘কবিতার নামে সাংবাদিকতা’ তাঁর কাছে ‘আক্ষেপের বিষয়’ মনে হয়েছিল। সেই আক্ষেপ আরো গভীর হয়েছিল – ‘যখন সমর সেনের মতো শক্তিশালীকে এই সামাজিকতায় অবতীর্ণ হ’তে’ দেখেছিলেন। এই সমালোচনায় তাঁর আপত্তি হলো : ‘কবি যা অনুভব করেছেন তা লেখেননি, যা ভেবেছেন তা-ই লিখেছেন।’ বুদ্ধদেব লক্ষ করেছিলেন, আলোচ্য গ্রন্থে কয়েকটি কবিতাগ্রহণের কবি ‘চকিতে মিলিয়ে যাচ্ছেন।’ তাঁর মতে : ‘কবিতায় চিমত্মার স্থান নিশ্চয় আছে, কিন্তু তাকে অনুভূতির রসে দ্রব হবার সময় দিতে হয় – এ-বইয়ে সমর সেন সর্বত্র তা দেননি।’

বছরখানেক আগে প্রকাশিত তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ খোলা চিঠি, কবিতাতেই সমালোচনা করতে গিয়ে শুরুতেই মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় তাঁর আত্মরোমন্থনের অমোঘ চক্রে ধরা পড়াকে শোচনীয় পরিণতি মনে করেছিলেন, যা তাঁর ভক্তদের বোধহয় অসহনীয় হয়েছিল। তবে আলোচ্য রচনার শেষে সমর সেনের এ-বইয়ের কবিতা কীভাবে তাঁকে আকৃষ্ট করেছে, উদাহরণ-উদ্ধৃতিসহ তুলে ধরে উপসংহারে বলেছেন : ‘সমর সেনের কাছে এখনো অনেক-কিছু আশা করা চলে আর মধ্যবিত্ত মনের দুঃসহ অন্ধকারেও আর একবার নতুন ক’রে জীবনের প্রতি আস্থা রাখি।’

তাঁর কাব্যচর্চায় শেষের দিকে সমর সেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের তদানীন্তন চরিত্রে আস্থাশীল থাকতে পারেননি। বিশেষত কথায় ও কাজে দ্বিচারিতা দেখে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। নিজের লেখালেখি বিষয়ে তিনি উৎসাহ হারিয়ে ফেলার কারণ কেন লেখেন না আর, মহাশ্বেতা দেবীর এ-প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘ভালো লাগে না, জানেন?’ মহাশ্বেতা তাঁর এই নিরাসক্তি বিষয়ে নিজের পর্যালোচনা জানিয়েছিলেন : ‘লিখতেই ভালো লাগে না। ভালো লাগা হারিয়ে যাচ্ছিল। নকশাল রাজনীতির মধ্যে এত দল ভাগ তাঁকে উদ্বিগ্ন করত। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসতে তিনি প্রথমে উৎসাহিত হয়েছিলেন। পরে যখন বোঝেন যে ঘোষণা ও কর্মপন্থায় সাযুজ্য থাকছে না, সেটাও তাঁকে পীড়িত করে। সমর সেন ইতিবাচক ব্যাপার দেখতে চাইতেন। সেজন্যও ছিল অপেক্ষা, কিন্তু তিনি শারীরিক অবস্থানে যেখানে ছিলেন, হয়তো নেতিবাচক ব্যাপারটাই তাঁর গোচরে পৌঁছত।’

ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ-প্রকাশিত সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও গোলাম কুদ্দুস-সংকলিত একসূত্রে নামক সংকলনের সমালোচনা করতে গিয়ে কবিতা পত্রিকায় (৮ : ৪ চৈত্র ১৩৪৯) লিখেছিলেন : ‘একসূত্রে’র অধিকাংশ কবিরাই ‘শূন্যমার্গী আন্তর্জাতিকতায়’ আশ্রয় খুঁজেছেন। জাতীয় সংকটের পটভূমিকায়, দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে হচ্ছে, ‘একসূত্রে’ পড়ে নিতান্ত হতাশ হয়েছি।’ অথচ সমর সেনের কবিতা যে রাজনৈতিক সমসাময়িকতাকে আশ্রয় করে রচিত হচ্ছে বলে বুদ্ধদেব ক্রমশ অসমেত্মাষ প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন – এমনকি সঞ্জয় ভট্টাচার্যও তাঁর বিরোধী শিবিরে থেকেও বুঝেছিলেন ‘রূপকল্পেও তিনি বৈশিষ্ট্য দেখাতে সমর্থ হয়েছেন।’ তা সত্ত্বেও সঞ্জয় স্পষ্টত বলেছিলেন : ‘সমর সেন মধ্যবিত্ত জীবনের নেতিবাচক দিকটিকে এতো বেশি উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন, যার দরুন তিনি শেষ পর্যন্ত ক্লান্তিকর।’ এছাড়া একই মন্তব্যের অন্য অংশে তিনি এও বলেছেন : ‘সমর সেনের কবিতা ক্রমে রুক্ষ হাহাকার দিয়েছে। বিদ্রূপ-বিষ ছড়িয়েছে, মাধুর্য দেয়নি।’ অথচ বুদ্ধদেবের মতে, তাঁর কাব্যচর্চার প্রথম পর্বে ‘সমর সেন রোমান্টিক হবার ভরপুর ইচ্ছে নিয়েও রোমান্টিক হ’তে পারেননি বলে সমর সেন যে-দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন তারই নাম ‘কয়েকটি কবিতা’।’

এত অল্পসংখ্যক কবিতা লিখেও সমর সেন সাহিত্যজগৎ থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন নিলেও – আজো যে আধুনিক কবিতার বিবর্তনবিষয়ক আলোচনায় অবশ্য উচ্চারিত একটি নাম – তার স্থায়ী সিলমোহর দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব, কবিতাকয়েকটি কবিতার আলোচনায়। তাঁর শেষ পর্যায়ের কবিতার দিকবদল নিয়ে বুদ্ধদেব খুশি হননি, কিন্তু সমর সেনকে বাতিলও করে দেননি বরং অসময়োচিত প্রস্থানকে এক বৃহৎ জিজ্ঞাসার সামনে উত্থাপন করে তিনি ১৯৪৫-এ প্রশ্ন তুলেছিলেন : ‘অত্যন্ত তরুণ বয়সে অত্যন্ত পরিণত মনের পরিচয় দিয়ে তিনি কি যৌবনের পরিপূর্ণ ঋতুতেই নিঃশেষিত হয়ে গেলেন?’

১৩৫১-র সেরা কবিতা নামে গোপাল ভৌমিক-সম্পাদিত সংকলনের অস্বাক্ষরিত সমালোচনা করতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু কবিতা পত্রিকায় (আশ্বিন ১৩৫২) লিখেছিলেন : ‘সম্পাদক ভূমিকায় বলেছেন যে বাংলার কবিরা যে আজ ‘সমাজবিমুখতার মারাত্মক পথ ত্যাগ করে সমাজমুখী’ হয়ে উঠেছেন, এটা ‘সুখের কথা’। ‘সমাজবিমুখ’, ‘সমাজমুখী’, এসব কথা অস্পষ্ট। যাই হোক, সম্পাদকের পরিভাষা ব্যবহার করেই জিজ্ঞেস করি যে আমাদের আধুনিক কবিরা যখন ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী দুর্বোধ সমাজবিমুখ’ ছিলেন, তখন তাঁরা যা লিখেছেন তার সঙ্গে কি কোনো তুলনা হয় তাঁদের এখনকার ‘সমাজমুখী’ রচনার? দৃষ্টান্তস্বরূপ এই গ্রন্থেরই অন্তর্গত সমর সেন ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রচনা দুটি পড়ে কি এ-কথা মনেও আসা সম্ভব যে এঁরাই ‘কয়েকটি কবিতা’ ও ‘পদাতিকে’র লেখক?’

 

পাঁচ

বাংলা কাব্যজগতে কবিতার সঙ্গে নিরুক্তর বিরোধিতা সমসাময়িককালে বেশ ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল। নিরুক্তর সম্পাদকীয় রচনায় আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিলেন সমর সেন। কবিতায় বুদ্ধদেব-লিখিত কয়েকটি কবিতার সমালোচনা প্রকাশের সমসাময়িককালে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় অমৃতবাজার পত্রিকায় (জুন ১৩, ১৯৩৭) যে-আলোচনা করেছিলেন, তাতে সঞ্জয় খুশি হতে পারেননি। সেই কথা সঞ্জয়ের কোনো পত্রে জানতে পেরে ধূর্জটিপ্রসাদ তাঁকে জানিয়েছিলেন : ‘একটা কথা তোমাকে খোলাখুলি লিখছি। সত্য উত্তর দেবে? আমার সমর সেনের review-টা তুমি শুনেছ, না পড়েছ? যদি পড়ে থাক তবে আর একবার পড়তে অনুরোধ করছি। আমার মনে হয় সেখানে আমি তাকে রেহাই দেইনি। তবে তার লেখা আমার ভালো লাগে, এবং কেন ভালো লাগে যা বুঝেছি তার ইঙ্গিত দিয়েছি। তার বেশি বলতে অক্ষম, সক্ষমও যদি হতাম তবে স্থানাভাবের জন্য বিশদ করতে পারতাম না।’ যাহোক এই পত্রে তিনি সঞ্জয়কে পরামর্শ দিয়েছিলেন : ‘তুমি দেখছি ভীষণ চটেছ সমরেরও ওপর, তোমার ভাষার ভঙ্গিতে তাই মনে হয়। তাই তোমার সমালোচনা দমেনি, ফুটেছে আক্রোশ। তুমিই লেখ না কেন তোমার ভালো লাগে না, তোমার ভাষা আছে, নিজে কবি, রসবোধ আছে, তাছাড়া ভালো-না-লাগার কারণ দেখান আমার ভালোলাগার কারণ দেখান-র চেয়ে সোজা।’

বুদ্ধদেবের লেখা কয়েকটি কবিতার সমালোচনাটি কবিতায় প্রকাশের সময় সেটির শিরোনাম ছিল ‘নবযৌবনের কবিতা’। সেই আলোচনায় বন্দীর বন্দনার সঙ্গে কয়েকটি কবিতার তুলনা করে তিনি লিখেছিলেন : ‘যে-রকম বয়সে সমর সেন তাঁর ‘কয়েকটি কবিতা’ লিখেছেন, সে-রকম বয়সেই আমি ‘বন্দীর বন্দনা’র কবিতাগুলি লিখেছিলুম; এই দুই নবযৌবনের কাব্য মনে-মনে তুলনা করতে ভালো লাগছে। ইতিমধ্যে আট-দশ বছর কেটে গেছে; দেশের হাওয়া আরো কিছু বদলেছে; তুলনা করলে এইটেই দেখা যাবে যে ‘কয়েকটি কবিতা’ কালপ্রভাবে কিছু বেশি ‘আধুনিক’, এবং লেখকের স্বভাবের প্রভাবে কিছু বেশি সীমাবদ্ধ। ‘বন্দীর বন্দনা’র বিদ্রোহ ছিলো ব্যক্তিগত বা মানবিক, ‘কয়েকটি কবিতা’র বিদ্রোহের উৎস সামাজিক বিরোধ ও শ্রেণী-সংঘর্ষ। নিজের মুক্তির জন্য সমর সেন ব্যস্তনন, আর বিধাতাকে, অভিশাপ দেবার জন্যও, কখনো তাঁর কাব্যে টেনে আনেননি। সৌন্দর্যের উপলব্ধির পথে যে-বাধা সেটা তাঁর পক্ষে ভিতরকার নয়, বাইরের; আত্মবিরোধ নয়, বৃহৎ সমাজ-স্বার্থের সঙ্গে ক্ষুদ্র শ্রেণী-স্বার্থের বিরোধ।’ বর্তমান রচনার তৃতীয় অনুচ্ছেদে, বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ টেনে এনে বলতে দ্বিধা করেননি : ‘এই যুবক-কবি যেন রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে কখনোই পড়েননি, সেটা আমার আশ্চর্য লাগে। ‘কয়েকটি কবিতা’য় যে-রকম সচেতন ও তির্যক ভঙ্গিতে রবীন্দ্র-কাব্য উদ্ধৃত করা আছে, তাতেই বোঝা যায় যে আমাদের যেমন প্রথম যৌবনে নিঃশ্বাসের বাতাসই ছিলো রবীন্দ্র-কাব্য, এ-কবির সে-রকম নয়। বাংলা কবিতার যে-ঐতিহ্যসম্পদ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি, এই নবীন কবি সেখানে যেন কোনো অবলম্বন খুঁজে পাননি।’ সমর সেনের রচনায় স্পর্শকাতর সুন্দর যৌবনকে দেখে অভিভূত বুদ্ধদেব লিখেছিলেন : ‘এই ছোটো বইখানার মধ্যেই আছে পরিণতির আভাস। কাব্যের রূপ দখলে আনার প্রাথমিক চেষ্টার অল্প পরেই দেখা যায়, ভিতরকার কথাটা চাপা আলোর মতো বিচ্ছুরিত। শক্তিশালী তরুণ কবি প্রথম উচ্ছ্বাসের ঝোঁকে যে-আতিশয্য করে থাকেন, এবং যে-আতিশয্য মার্জনীয়, এমনকি শ্রদ্ধেয় হতে পারে – অবাক হয়ে দেখছি এই রচনাগুলিতে তার কোনো চিহ্ন নেই।’

পূর্বোক্ত সমালোচনা প্রকাশের সমসাময়িককালেই পরিচয় পত্রিকায় (ভাদ্র ১৩৪৪) মুদ্রিত হয় বিষ্ণু দে-র একটি নিবন্ধ, তাতে সময় সেনের কবিতা বিষয়ে তাঁর মন্তব্য : ‘তিনি আঙ্গিকের দিক থেকে, আমাদের দুর্ভাগ্যত, কবিতা থেকে গদ্যে, গদ্য থেকে কবিতায় না গেলেও তাঁর ভাষা ব্যবহার কবিতারই, গদ্যের নয়। ভাষা তাঁর অবশ্যই গদ্য ব্যাকরণের, কিন্তু প্রয়োগরীতি কবিতার মতো ঐন্দ্রজালিক, গদ্যের মতো বিতর্কবাহক নয়। প্রত্যয়-প্রতিজ্ঞায় তাঁর মন চলে না, তাই তাঁর গদ্য কাব্যালঙ্কারে ম–ত হয়ে নিজেকে ও পাঠককে স্তম্ভিত করে না; তাঁর কবিতার আধার স্বকীয় জগৎ বানিয়ে প্রজ্ঞাপথে এসে সাক্ষাতে দাঁড়ায়।’ এই আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ এনে বিষ্ণু দে লিখলেন : ‘সমর সেনের কবিতা যে-কোনো লোকোত্তর শূন্যের জীব নয়, সেইটেই তাঁর কীর্তির সূচনা। তাই তাঁর কাব্যে রবীন্দ্রনাথ-লালিত করুণ বিষাদ, শাল-মহুয়া-বনে,
কৃষ্ণচূড়ার ডালে-ডালে, চাঁদের পা-ুর আলোয়, পাহাড়ের দূর নীলে, শহরের এলোমেলো গলিতে, দূর দিগমেত্ম স্থিতি পায়। আর সে স্থিতি স্বকীয় ভারসাম্য পায় কবির নিজের প্রথম যৌবনের স্বাভাবিক দেহবিতৃষ্ণা আর ফিলিস্টাইন শরীর-সর্বস্বতার আতুর ক্লান্ত আবেশে এবং সমাজ-জীবনের মর্মান্তিক ব্যর্থতাবোধে। এই ব্যর্থতাবোধের সম্ভাবনার জন্যই সমর সেনের বর্তমানে ক্ষান্ত না হয়ে পাঠকেরা তাঁর ভবিষ্যতে আশান্বিত।’

বছরদুই পরে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পদাতিকের সঙ্গে গ্রহণ ও অন্যান্য কবিতার আলোচনা করার সময় চতুরঙ্গ পত্রিকায় (চৈত্র ১৩৪৬) দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সমর সেনকে ‘আশ্চর্য সূক্ষ্ম রসানুবোধসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী’ বলে অভিহিত করে লিখেছিলেন : ‘সংগ্রামে, এবং সংগ্রামের পর মুক্তজীবনের ইঙ্গিতে তিনি সাড়া দেন। তবুও বুদ্ধিজীবী মনের পক্ষে ব্যক্তিকেন্দ্র সম্পূর্ণ কাটিয়ে ওঠা হল না। দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব, এবং কখনো কখনো ব্যাহত সূক্ষ্ম মতি, সূক্ষ্ম কল্পনা তাঁর কবিতায় পুনরাবৃত্তির রূপ গ্রহণ করেছে।’

প্রসঙ্গত উলেস্নখ্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পদাতিক কাব্যগ্রন্থ আলোচনা প্রসঙ্গে কবিতায় (পৌষ ১৩৪৭) বুদ্ধদেব বলেছেন : কয়েকটি কবিতা প্রকাশকালে সমর সেন তরুণতম কবি হিসেবে অভিহিত হলেও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের আবির্ভাবে সেই ঈর্ষাযোগ্য আসন সমর সেনের বেদখল হয়েছে। সাম্যবাদী বা সমাজচেতনার যে-নতুন ধারা বাংলা কবিতায় দেখা দিয়েছে, সেই প্রবহমানতা বিষয়ে বুদ্ধদেব সেই রচনায় লিখেছিলেন : ‘বাংলা কবিতায় এই ধরনের সমাজচেতনা সমর সেনের ক্ষুদ্র রচনাগুলিতেই আমরা প্রথম পাই; আমাদের কাব্যজগতে যে আন্দোলন তিনি আনেন তার ফল এতদূর গড়িয়েছে যে এখন শক্তিশালী আধুনিক কবিদের অনেকেই সমাজ বিপস্নবের আগমনী গান গাইছেন। কিন্তু সমর সেন নিজে মোহমুক্ত বুদ্ধিজীবীর ভূমিকাই বরাবর বজায় রেখে আসছেন।’

চতুরঙ্গ পত্রিকায় দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের আলোচনা প্রকাশের প্রায় সাত মাসের ব্যবধানে কবিতায় (কার্তিক ১৩৪৭) একটি সমালোচনা নিবন্ধ লিখেছিলেন অমিয় চক্রবর্তী – শিরোনাম ‘ঝর্ণা-ছন্দের কাব্য’। গ্রহণ ও অন্যান্য কবিতা পড়ে তিনি তাঁর অভিমত জানালেন : ‘সমরবাবুর লেখায় পরিচ্ছন্নতার আদর্শ লক্ষ্য করেছি। অনন্যতার সাধনায় ভাবের মূল সূত্র অদৃশ্যপ্রায় হয়েছে, সংশিস্নষ্ট বাক্যের তির্যকভঙ্গী ইশারায় কথা না বলে জটিলতার সৃষ্টি করেছে তারও প্রমাণ আছে। উগ্র উপমা যেখানে মনকে প্রতিহত করেছে, তাঁর দৃষ্টির সঙ্গে মেলেনি তাকে মান্ব কেন – অবশ্য পাঠকের মনেও ব্যক্তিগত বাধা লুকিয়ে থাকে। কিন্তু বিচারকের আসনে বসে ত্রম্নটির তালিকা বার করবার অধিকার বা শক্তি আমাদের অনেকেরই নেই যেহেতু দেশ এবং কালের দ্রম্নত ধারায় আবর্তিত হয়ে কুলের সন্ধান পাইনি। সমসাময়িক কবিত্বের সন্ধান পেলে সেইটে পরম লাভ। সেই পরম লাভের খোরাক ‘গ্রহণ’-এ ছড়ানো।’ আলোচ্য আলোচনা সম্পর্কে পরিচয় পত্রিকায় (অগ্রহায়ণ ১৩৪৭) ‘২’ আদ্যক্ষরে উলেস্নখে হিরণকুমার সান্যাল পূর্বোক্ত সমালোচনার প্রশংসা করে লিখেছিলেন : ‘গ্রহণ’-এর কবিতাকে অমিয়বাবু ঝর্ণছন্দের কবিতা আখ্যা দিয়েছেন। এই আখ্যা আধুনিক গদ্যকবিতার মধ্যে একমাত্র সমর সেনের কবিতা সম্বন্ধেই খাটে, কেননা একমাত্র তাঁর গদ্যকবিতায় ছন্দের দোল পাওয়া যায়। সমরবাবুর সৌভাগ্য যে অমিয়বাবুর পাকা হাতে তাঁর বই সমালোচনার ভার পড়েছিল। কেননা তাঁর কবিতার উৎকর্ষ বাছাই বাছাই উদ্ধৃতির সাহায্যে যে-ভাবে অমিয়বাবু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন তা খুব কম সমালোচকই পারতেন।’

লক্ষ করার বিষয়, ‘নিরঙ্কুশ কবি’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখে নিরুক্ত পত্রিকায় (১ : ২ পৌষ ১৩৪৭) সঞ্জয় ভট্টাচার্য বাংলা কবিতায় বামপন্থা, দুর্বোধ্যতা ও ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবকে কটাক্ষ করে লিখেছিলেন : ‘ইলিয়টের দুর্বোধ্যতাকেই সম্বল করে বাংলা সাহিত্যের একদল ‘বুদ্ধিজীবী’ কবি দিনের পর দিন বাংলা কবিতাকে পাঠকের কাছে অস্পৃশ্য করে তুলছেন। অডেনে বিংশ শতকীয় য়ুরোপীয় মধ্যবিত্তের মানসিক পরিণতির চিত্র আছে, মধ্যবিত্ত রক্তে উর্বশীর স্পর্শ পাবার জন্য আকুলতা নেই। স্পেন্ডারে কবিতা ভবিষ্যৎ শুভ সমাজব্যবস্থার আশায় উজ্জ্বল – বর্তমান সমাজব্যবস্থার প্রতি মস্নান নিসেত্মজ বিদ্রূপে পঙ্গু নয়। অথচ অনবরত এলিয়ট, অডেন, স্পেন্ডারের দোহাই দিয়ে আমাদের এই ‘বুদ্ধিজীবী’ কবির দল কবি খেতাবের উমেদারী করে বেড়াচ্ছেন; শেষে নিজেদের সম্মতিতেই নিজেরা কবি হয়ে বসেছেন, যেহেতু রবীন্দ্রনাথ এখন আর উচ্চবাচ্য করতে চান না।’

লক্ষণীয় ধূর্জটিপ্রসাদ ১৩৪৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যা পরিচয় পত্রিকায় ‘রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ও আধুনিক সাহিত্য’ শীর্ষক যে-সমালোচনা লিখেছিলেন সেটির অবলম্বন ছিল, অমিয় চক্রবর্তীর একমুঠো, সমর সেনের গ্রহণ ও অন্যান্য কবিতা এবং শিশিকান্তর অলকানন্দা। অমিয় এবং সমরের কাব্য দুটিকে নব্য সাহিত্যের পর্যায়ে উলেস্নখ করার কারণ হিসেবে তাঁর যুক্তি : ‘তারা পুরনো কথা বিস্তর কথায় বলেননি, নিরলংকারে, স্বল্প ও কাটাকাটা ভাষায় যা নতুন মনে করেন তাই বলতে চেষ্টা করেছেন, এবং সেজন্য আঙ্গিকের যতটা পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী ভেবেছেন তাই আনতে সচেষ্ট হয়েছেন।’ বর্তমান আলোচনার শেষাংশে এসে তিনি সমর সেনের কবিতায় মুক্তির আয়াস না দেখতে পাওয়ার প্রসঙ্গ এনে লিখেছিলেন : ‘সমরের কাব্যগ্রন্থ প্রধানত সামাজিক। যার প্রতীক এই কলকাতার জীবনযাত্রা, সেই ব্যর্থতার প্রতিভূ হিসেবে তার কবিতার একত্ব।’ তা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে সমর সেনের কবিতা সম্পর্কে তিনি নিজের বিচার কিছুটা স্পষ্ট করতে উলেস্নখ করেছিলেন : ‘ব্যর্থতাবোধজনিত ভাবের ঐক্য ও সীমাবোধের ঐক্য, দুটিই অতি সহজে নতুনত্বের ও প্রাচুর্য্যের প্রতিকূল হয়ে ওঠে। তাই ঘটেওছে। সমরের প্রথম কবিতা পড়ে উলস্নসিত হই, প্রথম কবিতা-সংগ্রহ পড়ে প্রশ্ন ওঠে এইবার কোন ধার, দ্বিতীয় পুস্তকে সেই প্রশ্নের উত্তর পেলাম না। ‘গ্রহণে’র দু-একটি লাইন ছাড়া এমন কোনো প্রমাণ পেলাম না, বক্তৃতার প্রমাণ, উচ্ছ্বাসের প্রমাণ বলছি না, যাতে আমি জোর গলায় বলতে পারি যে সমরের ব্যর্থতাবোধের অন্তরে একটা নঞর্থক সমাজবোধ থাকলেও তার পিছনে একটা কোনো না কোনো প্রকারের বিশ্বোপলব্ধি আছে।’

আলোচ্য কালপর্বে সমর সেনের কবিতায় ছদ্ম সাম্যবাদ বা বিপস্নবের ছবি ধরা হয়েছে, তার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন সরোজ দত্ত, অগ্রণী পত্রিকায় (এপ্রিল ১৩৪০) ‘অতি আধুনিক বাংলা কবিতা’ শিরোনামে, গ্রহণ অন্যান্য কবিতার আলোচনায়। তাঁর অভিযোগ : ‘যে মধ্যবিত্ত জীবনের সহিত তাঁহার জন্মগত ও ঐতিহ্যগত প্রাত্যহিক পরিচয় তাহার গলিত, স্থাবর ও নপুংসক রূপটিই তাঁহার চোখে পড়িল, অথচ ইস্পাত-কঠিন যে অংশ ব্যক্তিগত ভাবাদর্শে কিংবা নিষ্ঠুর পারিপার্শ্বিকতার আঘাতে বিপস্নব-প্রবাহের সহিত আপনাকে মিশাইয়া দিয়াছে ও দিতেছে তাহার কঠোর সুন্দর রূপ, তাহার শ্রেণীবিচ্যুতির বেদনা-ইতিহাস, তাহার বুদ্ধিবিদগ্ধ আশাবাদের কোনো আভাস শ্রীযুত সেনের কাব্যে মেলে না। শ্রীযুত সেন যে কাব্য আন্দোলনের উত্তর-সাধনা করিতেছেন তাহা অতীতে মধ্যবিত্ত পরিচালিত বিপস্নবী আন্দোলনকে উপেক্ষা করিয়াছে – অসহযোগ, আইন অমান্য ও সন্ত্রাসবাদের সহিত কোনো সম্পর্কই রাখে নাই, তাই আজ সাম্যবাদী আন্দোলনের সহিত তাহার এই ঐতিহ্যহীন একত্ববোধের পশ্চাতে যে বিরাট প্রবঞ্চনা রহিয়াছে তাহাতে আশ্চর্য হইবার কিছুই নাই।’ তিনি এও মনে করেছিলেন তাঁর কবিতা সাধারণের ‘বোধগম্য’ নয়, সেসব ‘Intellectual Clique’-এর জন্য লেখা। তাঁর মত : ‘পাঠক-সম্প্রদায়ের প্রতি এই সানুনাসিক অবহেলা’ আপনার কাব্যকে সর্বসাধারণের উপভোগ হইতে বাঁচাইয়া দুর্বোধ্য করিবার এই গলদঘর্ম প্রয়াস, ইহা আর যাহাই হউক, বিপস্নবী মনোভাবের পরিচায়ক নহে। মসীকৌলীন্যের অভিমানে শ্রীযুত সেন আজ আর্টের প্রচাররূপ ও Communicativeness-কে পরোক্ষভাবে অস্বীকার করিতেছেন।’ এ-অভিমতের বিপক্ষে অগ্রণীতে পরের মাসেই উত্তর লিখেছিলেন সমর সেন, সে-মন্তব্যেরও বিরুদ্ধাচরণ করে একই সংখ্যায় দীর্ঘ প্রত্যুত্তর লিখেছিলেন সরোজকুমার দত্ত।

পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ নানাকথা প্রকাশের পর ধূর্জটিপ্রসাদ পরিচয়ে (ফাল্গুন ১৩৪৯) যে-সমালোচনা লিখেছেন তাতে প্রাসঙ্গিকভাবে তাঁর ছোট আকারের কবিতা বিষয়ে সকলের প্রিয়তার কথা উলেস্নখ করতে গিয়ে বলেছিলেন, নানাকথা পড়ে অনেকে নাকি মন্তব্য করেছেন : ‘খাপ ছাড়া, অন্য ছোট কবিতার মতন ঘন নয়’। ধূর্জটিপ্রসাদও তাঁর সমালোচনায় অবিমিশ্র প্রশংসা না করে জানিয়েছেন : ‘কবিরও কি পরিণতি নেই, তার কাব্যবোধ যদি প্রসারিত হয়ে সমাজবোধের দিকে অগ্রসর হয় তবে কোনো পাঠকের, কোনো সমালোচকেরই অধিকার নেই, ক্ষমতা নেই, বাধা দেবার। সমর সেন এগিয়ে চলেছে ঐ দিকে এটা আমাদের গ্রহণ করতেই হবে – তারপর অন্য কথা। কিন্তু এই অন্য কথার মধ্যে একটা দরকারী কথা এই, অগ্রস্মৃতিটা জোর পায়ে, না খুঁড়িয়ে, তার পিছন-টান আছে কি নেই। যদি জোর কদমে হয়, যদি পিছন-টান না থাকে তবেই সমন্বয় পাওয়া যাবে। কিন্তু খুব মন দিয়ে পড়েও তা পাইনি।’ কিন্তু মণীন্দ্র রায় কবিতাতেই (আশ্বিন ১৩৪৯) আলোচনা করে লিখেছিলেন : ‘কবির কাব্যাদর্শ এখানে আগেকার বই দুইখানির মত কেবলমাত্র মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবক্ষয়ের লক্ষণ চিত্রণেই সাঙ্গ নয়। এখানে কবি চোখ ফিরিয়েছেন প্রথমত নিজের দিকে, তারপর সমাজের দিকে – সাধনা চলেছে ব্যক্তিকে কী করে সমষ্টির মধ্যে বিলীন করা যায়।’ উপসংহারে তিনি এ-ও জানালেন : ‘মোটের ওপর ‘কয়েকটি কবিতা’ ও ‘গ্রহণ’ পেরিয়ে ‘নানাকথা’ বিষয়বস্ত্ত ও আঙ্গিক, এই দুই দিক থেকেই আর একটি বিশিষ্ট ধাপ। এবং বলতে আপত্তি নেই আমরা অনেকে যে আশঙ্কা করেছিলাম – সমর সেন যে ধরনের গদ্য লেখেন তাতে অচিরেই রীতিমত অরুচি শুরু হবে – কবি এই প্রকাশ করে সেটাকে একেবারে অযথা প্রতিপন্ন করে দিয়েছেন।’

তাঁর তিনপুরুষ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় পরিচয় (পৌষ ১৩৫২) পত্রিকায় প্রকাশিত সমালোচনায় তাঁর ‘ব্যক্তিগত সাহিত্যিক ইতিহাস’ স্মরণ করে লিখেছিলেন : ‘সমরবাবু একজন শক্তিমান আধুনিক কবি এবং তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, ১৯৪০-এ প্রকাশিত ‘গ্রহণ ও অন্যান্য কবিতা’র রচনাকাল থেকে ‘রাজনীতি’র (মার্কসীয় রাজনীতির) ও ‘ভাবলোকের’ (মূল দার্শনিক মতবাদের এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্ত্তবাদের বহুমুখী ব্যাখ্যার) ‘প্রেরণা’য় আস্থাও তাঁর অকৃত্রিম, অথচ ১৯৪৪-এ প্রকাশিত তাঁর আধুনিকতম কবিতার বই ‘তিনপুরুষ’ পড়তে গিয়ে এই কথাটাই বারবার মনে হলো যে, ‘রাজনীতি’র ‘ভাবলোকের’ বিশুদ্ধ ‘প্রেরণা’ গত চার-পাঁচ বছরে কবির ব্যক্তিচেতনার সঙ্গে সমষ্টিচেতনার সমীকরণের কাজে তাঁকে একতিলও অগ্রসর হতে সাহায্য করেনি!’ তবু দীর্ঘ আলোচনার শেষে আজকাল তিনি কম লিখছেন বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।

এই আলোচনা প্রকাশের প্রায় দুই দশকের অধিককাল অতিবাহিত হওয়ার পর চতুরঙ্গ (শ্রাবণ ১৩৭৪) পত্রিকায় দীর্ঘতম আলোচনা-নিবন্ধটি লিখেছিলেন অমলেন্দু বসু। মনে রাখা দরকার সেটি লিখিত হয়েছিল প্রায় তেরো বছর আগে প্রকাশিত সমর সেনের কবিতা সংকলনের দ্বিতীয় সংস্করণ অবলম্বন করে। সেই লেখায়, সমর সেনের শেষকাব্যে প্রচুর সম্ভাবনা দেখেও তাঁর ক্ষান্তিতে বিচলিত বোধ করেছিলেন সমালোচক।

ঠিক কোন সময় থেকে সমর সেন প্রকাশ্যভাবে কবিতা লেখায় ক্ষান্তি দিয়েছিলেন, সে-বিষয়ে পুলক চন্দ্র জানিয়েছেন ‘একটি অপ্রকাশিত কবিতা’ নামে সেই কাব্যনমুনাটি পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ মৌলিক কবিতা। তবে তার তেইশ-চবিবশ বছর আগেই তিনি কবিতা লেখা বন্ধ করেছিলেন বলেই অনেকের লেখায় উলেস্নখ আছে। গত শতকের ষাটের দশকের শেষের দিকে সমর সেনের কাব্যজগৎ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে পত্রপত্রিকায় তাঁর উত্তরসূরি কবিদের অনেক বিলাপ শোনা গেছে। মনে হয় পত্রপত্রিকার আসর থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নিলেও আবু সয়ীদ আইয়ুব হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়-সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৪০) প্রকাশের পর থেকেই অধিকাংশ প্রামাণিক সংকলনেই তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। সেই ধারাতেই সর্বশেষ সংযোজন শান্তনু দাস রুদ্রেন্দু সরকার-সম্পাদিত স্বনির্বাচিত (সেপ্টেম্বর ১৯৭০) নামের সংকলনে, নিজের বাছাই করা কবিতা, সেটি প্রথম কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল – ‘একমাত্র তোমাকেই সত্য বলে মানি’ মুদ্রণে সম্মতি দিয়েছিলেন। এর আগে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার প্রথম লং পেস্নয়িং রেকর্ডে প্রেমেন্দ্র-বুদ্ধদেব প্রমুখ কবির সঙ্গে নিজের কণ্ঠ দান করেছিলেন।

এটা লক্ষ করার বিষয়, কবিতার প্রাঙ্গণ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিলেও – উৎসাহীদের কাছ থেকে কেন সরিয়ে নিয়েছিলেন তার কোনো উত্তর দিতে আগ্রহ দেখাননি। একবার জিজ্ঞাসু নির্মলকুমার চন্দ্রকে মৃদু হেসে জানিয়েছিলেন : ‘লেখার তাগিদ কমে গিয়েছিল, চাকরি নিলাম, বিয়ে করলাম, বাজার-সংসার-চাকরির আড্ডা নিয়ে দিনটা ভার যেতো, সমাজ-রাজনীতি এসব ঠিক আগের মতো বুঝতাম না…।’ তবে দশ বছর পরে ১৯৭৪-এ সত্তরের যীশু পত্রিকায় ‘হঠাৎ আপনি কবিতা লেখা ছেড়ে দিলেন কেন?’ – এই প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব হিসেবে বলেছিলেন : ‘ঠিক জানি না। তবে হয়ত মনে হয়েছিল লেখা একটা ছকে পড়ে গিয়েছে, চর্বিত চবর্বণে লাভ নেই।’ এই উত্তরই তাঁকে জানার পক্ষে যথেষ্ট – কেননা তিনি স্বভাবত স্বতন্ত্র। যথেষ্ট যোগ্যতার অধিকারী হয়েও জনপ্রিয়তাকে তাচ্ছিল্য করে কবিতা লেখা ছেড়ে দেওয়ার কারণেই জীবিতাবস্থায় কিংবদন্তি – এ-উদাহরণ আবহমানের বাংলা কবিতায় আর দ্বিতীয় নেই।