কানাডিয়ান কবি ও ঔপন্যাসিক মার্গারেট অ্যাটউড

লেখক:

কামরুল ইসলাম

I think the main thing is : Just do it. Plunge in! Being Canadian, I go swimming in icy cold lakes, and there is always that dithering moment. ‘Am I really going to do this? Won’t it hurt?’ And at some point you just have to flop in there and scream. Once you’re in,
keep going. You may have to crumple and toss, but we all do that. Courage! I think that is what’s most required.

Margaret Atwood

কবিতা ও ফিকশন উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ সমান প্রতাপের। কানাডিয়ান এই কবি ও ঔপন্যাসিক বিশ্বসাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি আলোচিত নাম। অনেকবারই নোবেল পুরস্কারের শর্টলিস্টে তাঁর নাম এসেছে, কিন্তু তিনি তা পাননি। ২০০৪ সালের নোবেল পুরস্কারের শর্টলিস্টে তাঁর নাম ছিল এবং অনেকেই মনে করেন, অস্ট্রিয়ার যে মহিলা লেখককে সেবার নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল সাহিত্যে, তাঁর চেয়ে অনেক বড়মাপের লেখক তিনি। যেহেতু নোবেল পুরস্কার দেওয়ার বিষয়টিও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বদোষে দুষ্ট, সেহেতু এই পুরস্কার পাওয়া না-পাওয়ার মাপকাঠিতে আজ আর কোনো লেখককে বড় কিংবা ছোট ভাবার অবকাশ নেই। পৃথিবীতে অনেক বড়মাপের লেখককেই এ-পুরস্কার দেওয়া হয়নি। আবার কেউ-কেউ তা প্রত্যাখ্যানও করেছেন।

অ্যাটউড বহুমাত্রিক বলয়ের কবি ও ঔপন্যাসিক। যা নিয়ে তিনি লিখতে চান, সেই নির্দিষ্ট জগতের ভৌগোলিক কাঠামো-রাজনীতি, তার মাটি ও পোকামাকড়, রস-গন্ধ-সৌকর্য এবং নানাবিধ বৃক্ষ-গুল্ম-ফুল-ফল-পাখির ভেতর-বাইরের আলো-অন্ধকারের ত্রিমাত্রিক চিত্রপ্রবাহের সন্ধানে তিনি নিরলস কাজ করে যান। তিনি অনেক বড়মাপের লেখকই শুধু নন, অনেক বড়মাপের মানুষও বটে। তাঁর লেখা পড়ে বোঝা যায়, তাঁর বিচিত্র মানস-বৈভবের সূত্রগুলো কীভাবে দানা বেঁধে তাঁর সৃষ্টিরহস্যকে বিকশিত করে। অনেক অদেখা প্রান্তরের আলোময় উঠোনের দিকে আমাদের পাঠক-দৃষ্টিকে তিনি এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দেন যে আমরা, পাঠকরা, নিরন্তর এক অভিনব অথচ বাসত্মবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, কিংবা এমন এক জগতের কিনারে এসে দাঁড়িয়ে যাই যে, আমাদের মর্মমূলে বেঁধে যায় এক চিরায়ত সংগীত, যা আমাদের অভিভূত করে, কিছুটা উদ্বাস্ত্তও করে বটে।

একজন নারীবাদী লেখক হিসেবেও তাঁর আলাদা একটি পরিচিতি রয়েছে। তিনি আধুনিক জীবন-যন্ত্রণা ও সমাজ-সভ্যতার নানাবিধ বিষয়-আশয়কে তাঁর লেখার উপকরণ হিসেবে নিয়েছেন। আধুনিক সময় সম্বন্ধে সচেতন এই লেখক আধুনিকতার সেসব প্রপঞ্চ, যা আমাদের গ্রাস করতে চায় মনস্তাত্ত্বিকভাবে কিংবা রাজনৈতিকভাবে, সেসব বিষয়কেই তিনি লেখায় এনেছেন। প্রতিবাদের শাণিত ভাষায়ও কখনো-কখনো তাঁর লেখনী উতরে গেছে। ‘We must resist/ We must refuse to disappear’ অথবা ‘In exile/ survival/ is the first necessary’. নৈঃসঙ্গ্য ও বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি মূলত তাঁর অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু বলা যায়। চিমত্মাশীল মানুষের মনোকষ্ট, যে-মানুষ তার বুদ্ধিবৃত্তিকতায় বাহ্যিক জগতের অনুধাবনের বিষয়বস্ত্ত থেকে পৃথক, অথবা চিরস্থায়ী শেকড়হীনতা অথবা নির্বাসন যা কাম্যু বর্ণনা করেছেন তাঁর দ্য মিথ অব সিসিফাসে, যা অ্যাবসার্ডের উদ্গাতা, সেই মৌলিক অথবা যা মানুষের সব ধরনের কার্যপ্রণালিতে বহমান – যৌন থেকে রাজনৈতিক জীবন পর্যন্ত – এই সবই তাঁর লেখায় এসেছে।

অ্যাটউড প্রথমত কবি এবং তাঁর কবিতা ব্রেখ্টের কবিতা ও নাটকের মতো, যা পাঠকের চেতনাকে উদ্দীপিত করে। ব্রেখ্টের স্মোকিং ম্যান থিয়েটারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, নাটকীয় ঘটনার পেছনে রয়েছে দর্শক। যারা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করছে সমস্যাগুলোকে। তাঁর আইডিয়েল থিয়েটার থেকে বোঝা যায়, শিল্পের রয়েছে একধরনের বৈপস্নবিক অভিঘাত, যেখানে বরং আবেগীয় নিষ্কৃতির চেয়ে অস্ত্রের আবাহনই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ব্রেখ্টের আইডিয়েল থিয়েটারের শিল্পচেতনার সঙ্গে অ্যাটউডের শিল্পচেতনার একটি সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালে তিনি ক্রিস লেভেনসনের সঙ্গে যে-সাক্ষাৎকার দেন তাতে কবিতার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না যে কবিতা মূলত আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কবিতা প্রকৃতপক্ষে পাঠকের আবেগকে জাগিয়ে তোলে এবং এটি একটি ভিন্ন জিনিস। কে একজন বলেছিলেন যে, তুমি যদি আবেগকে প্রকাশ করতে চাও তাহলে চিৎকার দাও। আর যদি তুমি আবেগকে জাগিয়ে তুলতে চাও তাহলে কাজটি কঠিন।’ ব্রেখ্টের মতোই অ্যাটউড পাঠকের আবেগকে উদ্দীপিত এবং পূর্ণ মনোযোগকে ধরে রাখার জন্য তাঁর লেখায় ব্যবহার করেছেন দূরবর্তী বা অন্যের থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন টেকনিক।

অনেকেই তাঁর কবিতা পড়ে তাঁকে একজন ঐন্দ্রজালিকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি তাঁর কবিতায় প্রাকরণিক স্বাতন্ত্র্যকে সমীকৃত করার জন্য তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করে বসেন, যা পাঠককে তার মূল বিষয়বস্ত্ত থেকে ছিটকে দেয় অন্যত্রে অথবা তিনি কবিতার মাঝখানে গিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পালটে দেন। তিনি প্রথাগত রোমান্টিক শব্দাবলি এবং দৃষ্টিভঙ্গিবিরোধী। অবশ্য প্যারোডির ক্ষেত্রে কখনো-কখনো এ-নিয়মের ব্যত্যয় ঘটান। লিরিক্যাল বহিঃপ্রকাশের চেয়ে তাঁর কবিতায় দেখা যায় শ্রাবণিক ও আবেগীয় অপরিমিতি এবং পরিচিত নাম ও চরিত্রের ব্যবহার।

তিনি সম্পূর্ণতই উনোক্তির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে দেখা যায় একধরনের বিকৃত ও গাদ্যিক কণ্ঠস্বর এবং পরাবাসত্মব চিত্রসঙ্গম। তাঁর পূর্বোক্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাপারটি যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন : ‘কবিতার মধ্যে থাকে কিছু সংগুপ্ত ঐন্দ্রজালিক প্রকরণ। এখানে ইন্দ্রজাল বা জাদু বলতে আমি সেই ভাষিক আয়োজনকে বুঝি, যা ইচ্ছাপূরণে সহায়তা দেয়। আপনি যে-কোনো একটি কবিতায়-ই সেটা পারেন অর্থাৎ তাকে প্রার্থনা, অভিশাপ জাদু বা মন্ত্র যেদিকে ইচ্ছা নিয়ে যাওয়া যাবে। আপনি কি আত্মসংবৃত (autistic) শিশুদের সম্বন্ধে কিছু জানেন? এই রোগের একটি লক্ষণ হলো রোগী শব্দকে বস্ত্ত বলে ভুল করে। যদি তারা ‘ঘড়ি’ শব্দটা দেখে কোনো কাগজে তাহলে তারা তা পেড়ে দেখতে চায় তাতে টিক-টিক শব্দ আছে কিনা। কিংবা যদি তুমি দরজা শব্দটা লেখ তাহলে তারা তা

খুলতে চেষ্টা করবে। ঠিক সেই ধরনের ব্যাপার অনেকটা কৌতুকের মতো ভাষার মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং কবিতাও একটি বিশেষ পর্যায়ে এর সঙ্গে সম্পর্কিত।’

কবিতা লেখার কাজটি যে নিতান্তই কঠিন ও কষ্টসাধ্য তা প্রকৃত কবি মাত্রেরই জানা। অনেকে মনে করেন, একটি ছোট কবিতাও একজন কবিকে তছনছ করে ফেলে। কবিকে কাটাতে হয় অনেক নির্ঘুম রাত। চলে শব্দের সঙ্গে রীতিমতো ধস্তাধসিত্ম এবং কবিকে হতে হয় রক্তাক্ত এবং ক্লান্ত। তাই একটি নতুন কবিতা লেখার পর মনে হয় একটি সংকটময় যুগ পার হয়ে গেল। অ্যাটউডের মতে, ‘যদি তুমি ভাষার বিসত্মৃত জগতে অবগাহন করতে না পারো, তাহলে তুমি আর যা-ই হোক কবিতা লিখতে পারবে না। কেবল শব্দের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, তোমাকে আরো জানতে হবে শব্দের শক্তিনৈপুণ্যের খেলা-ও।’

তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমার কবিতা স্বভাবতই শব্দ অথবা ফ্রেজ দিয়ে আরম্ভ হয় এবং যার আবেদন বেশি হয় অর্থের চেয়ে ধ্বনির কারণে। এ ছাড়া কবিতার ‘মুভমেন্ট’ এবং ‘ফ্রেজিং’ আমার কাছে খুবই গুরুত্ববহ। কিন্তু অনেক আধুনিক কবির মতো আমিও আমত্মঃমিলকে গোপন করে পঙ্ক্তির মাঝখানে ব্যবহার করে থাকি। আমার মতে, কবিতার থাকতে হবে ধ্বনির বুনট (texture of sound)। এটা আমার কাছে যুক্তির মতোই গুরুত্ববহ। এর অর্থ কিন্তু এই নয় যে, অর্থকে ছোট করে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু এটা
সত্যি-সত্যি আমাকে বিরক্ত করে যখন আমি ছাত্রদের শিক্ষককে বলতে শুনি ‘কবি আসলে কী অর্থ করতে চাচ্ছেন?’ এটা বোঝায় যে, কবি একধরনের বাচনিক খঞ্জ, তিনি স্পষ্ট করে বলতে জানেন না তিনি যা অর্থ করেন, বরং আশ্রয় নেন মালবেরি জঙ্গলের অজস্র ধ্বনির কাছে এবং ছাত্রদের ফেলে দেন কঠিন বিপাকে, যেখানে তারা মরিয়া হয়ে অর্থ খুঁজে ফেরে।’

তাঁর মতে, কবিতা ধনী হতে সাহায্য করে না ঠিকই, কিন্তু কবিতা হলো ভাষার প্রাণ। ভাষায় যদি কবিতাই না থাকে তাহলে সে-ভাষাকে মৃতই বলতে হবে। এক সময় যখন তিনি উপন্যাস লিখে বেশ সুনাম অর্জন করলেন এবং চারদিকে অনেকটা হইচই পড়ে গেল, সে-সময়ে লোকজন বলা শুরু করল যে, তিনি উপন্যাস লিখে নাম কুড়িয়েছেন, সুতরাং তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দিচ্ছেন। জবাবে তিনি বললেন, ‘এটা যেন এরকম যে একজন কেবল সুনাম কুড়ানোর জন্যই লিখে যাচ্ছেন। কবিতাকে আমি কখনোই ছেড়ে যাব না, কবিতা হয়তো আমাকে ছেড়ে যেতে পারে; কিন্তু সেটা অন্য বিষয়। যদি কেউ ভাষাকে একটি এককেন্দ্রিক বৃত্তের সার্বভৌম পর্যায় হিসেবে ভাবে, তাহলে কবিতা থাকবে তার কেন্দ্রে।’ এভাবে কবিতার সর্বত্রগামী ব্যাপকতার পক্ষে বলেছেন তিনি। কবিতা-ই যে প্রত্যেক লেখন-শিল্পের প্রাণ এবং কবিতা ছাড়া যে ভাষা একটি প্রাণহীন কঙ্কাল মাত্র, সেসব বিষয় তাঁর সাক্ষাৎকার থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কবিতা কেউ আন্তর্জাতিকভাবে লেখে না, তবে তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। একজন কবি যে ভূগোলে এবং জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠেন, মূলত সেই আবহই প্রধানত তার শিল্পকর্মে গাঢ়ীকৃত হয়। তবে শিল্পী বা কবি কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলের হয়েও তার ভেতরে গড়ে তুলতে পারেন কসমোপলিটন বোধ, যা তাকে পৃথিবীর অন্য মানুষের সংস্কৃতি কিংবা সুখ-দুঃখের সাথি করে তোলে, তখন কবি বা শিল্পী হয়ে যান বিশ্বমানবের। তবে কোনো দেশ বা জাতি যখন বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে খোলামেলা হয়ে যায়, তখন সেই দেশ বা জাতির কবিতা বা শিল্প আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া পায় আপনা-আপনিই। ক্রিস্টোফার লেভেনসনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘Poetry is local. It may be appreciated internationally, but one sure does not write it internationally. No poet has. When people say ‘international’ what they are talking about is their way, their nationality rendered international.’

কবিতার গঠন ও হয়ে ওঠা এবং কবিতা ও গদ্যকবিতা ইত্যাদি নিয়ে তিনি (যেমন কালা হ্যামন্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎকার) গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাঁর মতে, কবিতার ইউনিট হলো সিলেবল। ফিকশনের ক্ষেত্রে এই ইউনিট আরো বড় বিষয়কে ধারণ করে। সেটাকে তিনি কোনো বিশেষ চরিত্র বা প্যারাগ্রাফের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি মনে করেন গদ্যকবিতার ক্ষেত্রে এই সিলেবল অধিক গুরুত্ববহ। তাঁর মতে, গদ্যকবিতা এবং ছোটগল্পের মধ্যে পার্থক্য হলো – গদ্যকবিতা সব সময়ই ছন্দময় সিলেবিক আকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি মনে করেন, কবিতা বিষয়ে যে-ছন্দজ্ঞান প্রয়োজন, গদ্যকবিতার ক্ষেত্রেও তা আবশ্যক। যদি সিলেবল ঠিক না থাকে তাহলে পুরো ব্যাপারটিতেই গোল বেধে যাবে। এভাবে তিনি সিলেবলের ওপর যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি গদ্যকবিতার যে ছন্দ থাকতে হবে, সে-ব্যাপারটির ওপরও জোর দিয়েছেন।

এ-প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে হতে পারে আমাদের। গদ্যকবিতারও কি ছন্দ আছে – এরকম প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, গদ্য কবিতারও ছন্দ রয়েছে। তিনি উপমহাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাচিয়ে উদয়শঙ্করের উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, উদয়শঙ্কর হাঁটলে যেমন তাঁর হাঁটার মধ্যে একধরনের ছন্দ থাকে, ঠিক গদ্যকবিতারও সেরকম ছন্দ থাকে।

কবিতার পঙ্ক্তির ছোট-বড় হওয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অ্যাটউড বলেছিলেন, ‘All I can say is that sometimes the lines get longer and sometimes they get shorter. Too rigid a theory results in silence.’ মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন এবং পনেরো বছর বয়স থেকে সিরিয়াসলি লেখালেখির জগতে অন্বিষ্ট হন। পতঙ্গবিশারদ (entomologist) পিতার চাকরির সুবাদে তাঁর পরিবারকে ঘুরতে হয়েছিল কানাডার নানা প্রান্তরে এবং প্রায়ই তাদের উত্তর অঞ্চলের জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় থাকতে হয়েছে, যে-কারণে তাঁর লেখায় সেসব অঞ্চলের মানুষ ও পরিবেশের বর্ণনা পাওয়া যায়।

মার্গারেট অ্যাটউড কানাডার অটোয়ায় ১৯৩৯ সালের ১৮ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি এবং ১৯৬২ সালে র‌্যাডক্লিফ কলেজ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নেন। ১৯৬১ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই Double Persephone প্রকাশিত হয়। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইংরেজি সাহিত্য পড়িয়েছেন এবং ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ-সময়ে তিনি প্রচুর লেখালেখি করেছেন।

তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস The Edible Woman (১৯৬৯) আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। এর পর তিনি লিখেন Surfacing (১৯৭২), Lady Oracle (১৯৭৬) এবং Life Before Man (১৯৭৯) উপন্যাসগুলো। তাঁর কিছু-কিছু লেখাকে ফেমিনিস্ট আখ্যা দেওয়ায় তিনি তাতে আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁর উপন্যাস The Handmaid’s Tale (১৯৮৫; Motion Picture, ১৯৯০) কানাডার সর্বোচ্চ সম্মানিত পুরস্কার ‘গভর্নর জেনারেলস লিটারেরি অ্যাওয়ার্ডে’ ভূষিত হয়। এর পরের উপন্যাসগুলো হলো – Cat’s Eye (১৯৮৮), The Robber Bride (১৯৯৩), Alis Grace (১৯৯৬)। ড্যানিশ কম্পোজার পাউল রুর্ডাস ২০০০ সালে অ্যাটউডের বিখ্যাত উপন্যাস The Handmaid’s
Tale
-কে অপেরায় রূপান্তর করেন। তাঁর উপন্যাসগুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্র নারী, যে-নারী বাহ্যিক জগৎ এবং তার চারপাশের ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে মরিয়া হয়ে ফিরছে। এ-প্রসঙ্গে অ্যাটউড বলেছেন, ১৯৫০-এর যে নারীমুক্তির উত্থানপর্বের একটি চলমান দিক তাদের সামনে ছিল, সেই থিমকেই তিনি মূলত কাজে লাগিয়েছেন।

অ্যাটউডের কবিতার বইগুলোও সারা পৃথিবীতে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাঁর কবিতার বই The Circle Game (১৯৬৬) ১৯৬৬ সালে ‘গভর্নর জেনারেলস লিটারেরি অ্যাওয়ার্ড’ পায়। এ ছাড়া তাঁর অন্যান্য কবিতার বই Power Politics (১৯৭১) এবং You Are Happy (১৯৭৪) সুধীসমাজে সাদরে গৃহীত হয়েছিল। তাঁর প্রথম দিকের কবিতা সংকলন Double Persephone (১৯৬১), The Circle Game এবং The Animals in That Country (১৯৬৮)-তে আমরা দেখি মানুষের আচরণবিষয়ক চিমত্মা এবং
প্রাকৃতিক জগতের রূপবৈচিত্র্যের নানাবিধ বর্ণনা। এসব কবিতায় তাঁর বস্ত্তবাদী ধ্যান-ধারণা বর্জনের প্রত্যয় লক্ষ করা যায়।

তাঁর সমালোচনামূলক কর্মকা–র মধ্যে Survival : A Thematic Guide to Canadian Literature (১৯৭২), Second Words : Selected Critical Prose (১৯৮২) এবং Strange things : The Malevolent North in Canadian Literature (১৯৯৫) উলেস্নখযোগ্য। এ ছাড়া তিনি সম্পাদনা করেছেন The New Oxford Book of Canadian Verse in English (১৯৮২) এবং The Oxford Book of Canadian Short Stories in English (১৯৮৬)। তাঁর ছোটগল্প সংকলন Wilderness Tips (১৯৯১) প্রকাশিত হলে দেশে-বিদেশে পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। Good Bones and Simple Murders (১৯৯৪) একটি উলেস্নখযোগ্য সংকলন। যেখানে দেখা যায় তাঁর নানা রকমের গদ্য, রূপকথার গল্প এবং প্যারোডি। ১৯৯৫ সালে Morning in the Burned House নামে তাঁর বিভিন্ন সময়ে লেখা কবিতার একটি সংকলন বের হয়। অ্যাটউড তাঁর সার্বিক লেখালেখির জন্য ১৯৮২ সালে ‘Welsh Arts Council’s International Writer’s Prize’ লাভ করেন।

২০০০ সালে অ্যাটউড তাঁর উপন্যাস The Blind Assassin (২০০০)-এর জন্য বুকার পুরস্কার পান। এই উপন্যাসে দেখা যায়, একজন মহিলা (আমরা আগেই বলেছি তাঁর প্রায় সব উপন্যাসেরই কেন্দ্রীয় চরিত্র নারী) তার অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো
(তার নিজের জীবন, তার বোনের অকালমৃত্যুর কারণ) ফিরে দেখছেন। অ্যাটউড তাঁর পরবর্তী নভেল Oryx and Crake (২০০৩)-এ ভবিষ্যতের ধূসর পোড়োভূমির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। ষাটের দশক থেকে তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মের ইতিবাচক সমালোচনার মুখোমুখি হতে থাকেন। তাঁর সামগ্রিক শিল্পকর্ম নিয়ে সমালোচকদের মতামত :

Atwood’s writing, in all her chosen genres, has always been clearly connected to global and personal politics; it particularly focuses on themes of environmental degradation, women’s roles in society, and the power dynamics of social organization. All her writing is noted for its careful craftsmanship and precision of language, which give a sense of inevitability and a resonance to her words. In her fiction Atwood has explored the issues of our time, capturing them in the satirical, self-reflexive mode of the contemporary novel.

১৯৮০ সালে মার্গারেট অ্যাটউড কানাডার লেখক ইউনিয়নের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ওই সময়ে তিনি একটি টেলিভিশন নাটক স্নোবার্ড নিয়েও কাজ করেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পি ই এন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাংলো কানাডিয়ান শাখার প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি সাহিত্যকর্মের সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। বর্তমানে তিনি পি ই এন ইন্টারন্যাশনালের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৮৩ সালে তাঁর নিরীক্ষাধর্মী ও পোস্টমডার্ন গদ্যকবিতার সংকলন মার্ডার ইন দ্য ডার্ক প্রকাশিত হলে সমালোচনার জগতে তা নতুনভাবে গৃহীত হয়। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাঁর নতুন চিমত্মার এক আলাদা বিন্যাস পাঠককে শুধু মুগ্ধই করে না, তার (পাঠকের) অভিজ্ঞতার কিনার ঘেঁষে জেগে ওঠে এক নতুন আলোর ঝংকার, যা নতুন ক্রিটিক তৈরির ক্ষেত্রে একটি উলেস্নখযোগ্য মাইলফলক। ১৯৯৭ সালে তিনি তাঁর স্বামী গ্র্যামে গিবসনের সঙ্গে শর্ট ফিকশনের একটি সংকলন সম্পাদনা করেন। তাঁর কবিতা সংকলন দ্য ডোর প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে এবং উপন্যাস দ্য ইয়ার অব দ্য ফ্লাড ২০০৯ সালে। অ্যাটউডের লেখা চলিস্নশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি টরন্টোতে বাস করছেন লেখক গ্র্যামে গিবসনের সঙ্গে। লেখকজীবনে অ্যাটউড অনেক সম্মান ও পুরস্কার লাভ করেছেন। তাঁর পঞ্চাশটিরও অধিক কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। ছোটদের জন্যও তিনি অনেক বই লিখেছেন।

অ্যাটউডের সৃষ্টিচেতনে জড়িয়ে আছে ফেমিনিজম ও ন্যাশনালিজম। তাঁর কবিতা ও ফিকশন আধুনিক-উত্তর সময়ের পাঠকদের পাঠতৃষ্ণা মেটাতে সমর্থ বলেই তিনি এ-কালের সিরিয়াস সাহিত্য-পাঠকদের কাছে অধিক জনপ্রিয়। পৃথিবীতে বহুপ্রজ নারী লেখকদের মধ্যে সম্ভবত তাঁর স্থান সবার ওপরে। তাঁর শিল্পচেতনাকে বুঝতে হলে তাঁর লেখা যেমন পড়তে হবে, তেমনি ই জি ইঙ্গারসল-সম্পাদিত Margaret Atwood : Conversaitons (১৯৯০) গ্রন্থটিও পাঠ আবশ্যক। মার্গারেট অ্যাটউড নোবেল পুরস্কার না পেলেও একজন বড়মাপের লেখক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের পাঠকদের দরবারে চিরকাল সম্মানের আসনেই অধিষ্ঠিত থাকবেন – এরকম মত প্রকাশে কারো কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়।