কানাডীয় সাহিত্যে বিশ্বসাহিত্যের স্বাদ

লেখক: সুব্রত কুমার দাস

একজন কানাডীয় লেখকের কলমে যে-কোনো দেশের বা সংস্কৃতির কথা নিয়েই সাহিত্য রচনা হোক না কেন, সেটি হবে কানাডীয় সাহিত্য। এমন একটি কথা বলেছিলেন রাইটার্স ইউনিয়ন অব কানাডার নির্বাহী পরিচালক কবি, ঔপন্যাসিক ও কলামিস্ট জন ডেগেন। টরন্টোতে বাঙালিদের সাহিত্য সংগঠন বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টারের (বিএলআরসি) আয়োজনে ‘কানাডীয় লেখকের সঙ্গে আড্ডা’ শিরোনামের এক অনুষ্ঠানে ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর জন ডেগেন টরন্টোর আলবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি মিলনায়তনে এ-কথা বলেন। এ-কথার মধ্যে যে-অদ্ভুত সত্যটি লুকিয়ে আছে, সেটি যে-কোনো সাহিত্যপ্রেমীর জন্য বিশেষ মনোযোগের দাবিদার।

শিরোনামে কেন কানাডীয় সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের আধার বলেছি, সেটির কারণ ব্যাখ্যা করার শুরুতেই জন ডেগেনের নিজের সাহিত্যকর্ম থেকে উদাহরণ দিতে চাই। জনের প্রথম গ্রন্থ হলো একটি কাব্যগ্রন্থ। শিরোনাম অ্যানিম্যাল লাইফ ইন বুখারেস্ট। গ্রন্থের নাম থেকেই স্পষ্ট হয়, তাঁর গ্রন্থের কবিতাগুলোর প্রেক্ষাপট   রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্ট। এই যে ব্যাপারটি অর্থাৎ একজন কানাডীয় কবির কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে অন্য একটি দেশের প্রেক্ষাপট, সেটি ঘটে কারণ সম্ভবত জনের আদিবাড়ি সে-দেশেই। কানাডায় অভিবাসী হওয়া অধিকাংশ নাগরিকের তো এভাবেই থাকে একটি অতীত – যে-অতীতের ভূখ-টি হয়তো কানাডা নয়। হয়তো কখনো কখনো লেখক নিজে জন্মগ্রহণ করেন কানাডাতেই, কিন্তু তাঁর পিতৃ-মাতৃপুরুষের আবাস ছিল ভিন্ন দেশ। তাই প্রায়ই দেখা যায়, কোনো কোনো লেখক অনুসন্ধান চালান তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটেমাটির। তাঁদের রচনায় উঠে আসে সেই ভিটের চিত্র, সেই মাটির গন্ধ এবং এটিই কানাডার ঔদার্য যে, ভিন্ন ভিটের চিত্র, ভিন্ন মাটির গন্ধকে নিজের করে নিতে কানাডা একটুও পিছপা নয়। প্রশাসনিকভাবে নয়, সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণেও নয়।

আর্থিক মূল্যে কানাডার সাহিত্য পুরস্কারগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে গিলার পুরস্কার। ২০১৪ সালে এক লাখ ডলার অর্থমূল্যের পুরস্কারটির জন্য যে বারোটি বইয়ের লং লিস্ট করা হয়েছিল তাতে কিন্তু উঠে এসেছিল এক বাঙালি লেখকের বই। লেখকের নাম অর্জুন বসু। বইয়ের নাম ওয়েটিং ফর দ্য ম্যান। অর্জুনের প্রথম সে-উপন্যাসের আগেও কিন্তু রয়েছে ছোটগল্পের বই স্কুইশি (২০০৮)। বাঙালি আরেক ঔপন্যাসিক কানাডায় ধুমসে লিখে চলেছেন – তিনি হলেন সাম মুখার্জি। এ পর্যন্ত তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সামের। প্রথম এবং শেষটি ছাপা হয়েছে ভারত থেকে। দ্বিতীয়টির নাম ইন দ্য নেম অব লাভ – ছাপা হয়েছে টরন্টো থেকে। সে-উপন্যাসের মানুষগুলোও কিন্তু ভারতীয় বা এশীয়। অথবা সচী (সব্যসাচী) নাগের কবিতার বই (কুড ইউ প্লিজ, প্লিজ স্টপ সিংগিং) ২০১৫ সালে টরন্টো থেকেই প্রকাশিত হয়েছে কানাডা সরকারের আর্থিক সহায়তায়। অথবা বাংলাদেশের মেয়ে দয়ালী ইসলামের কবিতা নিয়ে এখন বেশ কথা চলছে মূলধারার সাহিত্য-পাঠকদের মধ্যে। দয়ালীর একমাত্র বই, যেটি একটি কাব্যসংকলন, সেটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১১ সালে। নাম ছিল ইউসুফ অ্যান্ড দ্য লোটাস ফ্লাওয়ার। দয়ালীর কাব্যপ্রয়াস নিয়ে ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল সিবিসি রেডিওতে একটি সাক্ষাৎকারও প্রচারিত হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে আরিফ আনোয়ারের লেখা স্টর্ম উপন্যাসকেও আনতে চাই। বাংলাদেশের ভোলা জেলায় ১৯৭০ সালে যে বিধ্বংসী সাইক্লোন আঘাত হেনেছিল, সে-ঘটনার প্রেক্ষাপটে আরিফের উপন্যাস স্টর্ম প্রকাশিত হয়েছে এ-বছরের মার্চে। বইটির প্রকাশনার সংবাদ টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে আরো অনেক বইয়ের সঙ্গে বর্তমান লেখকের চোখে পড়ে জানুয়ারিতে। হারপার-কলিন্স, কানাডা থেকে প্রকাশিত এ-গ্রন্থটি নিয়ে লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, ওই উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে শাহরিয়ারকে কেন্দ্র করে, যে কি না একজন পিএইচডি-গবেষক। শাহরিয়ার যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে বাধ্য হয় তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায়। শাহরিয়ার তার নয় বছরের মেয়ে আনাকে বলে তার নিজের দেশের কথা। সে-কথার ফাঁকে উঠে আসে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা ভোলার কথা, সেখানকার মৎস্যজীবী মানুষের কথা এবং অতীত হিসেবে ১৯৭০ সালে সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের কথা।

উদাহরণ টানতে প্রথমেই বাঙালিদের কথা বলে নিলাম, যেহেতু আমি নিজে বাঙালি। আর স্বভাবসুলভভাবেই অনেক বাঙালির মতো আমিও খুঁজে চলি এই বিভুঁইয়ের সাহিত্যাঙ্গনে কোন কোন বাঙালি কেমন করে ভূমিকা রেখে চলেছেন। আরো বলতে চাই, কলকাতার বাঙালি নারী আয়েশা ব্যানার্জির বটলস অ্যান্ড বোনস প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের জুনে। এর আগে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল দ্য ক্লারিটি অব ডিসট্যান্স। বাঙালি এই কবি কিন্তু ‘দ্য লিগ অব কানাডিয়ান পোয়েটসে’র ভূতপূর্ব সভাপতিও বটে। পূর্বপুরুষের কলকাতার স্মৃতি নিয়ে বড় হয়ে-ওঠা আর এক লেখিকার নাম দুর্গা চিউ-বোস। কুইবেক প্রদেশের মন্ট্রিলে জন্ম নেওয়া নিউইয়র্কের বাসিন্দা দুর্গার প্রবন্ধের বই টু মাচ অ্যান্ড নট দ্য মুড প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে এবং বেশ সাড়া জাগিয়েছে বইটি। এঁদের ছাড়াও ভারতী মুখার্জি তো আছেনই। ভারতে জন্মগ্রহণকারী নন্দিত এই কথাসাহিত্যিক জীবনের বেশিরভাগ সময় চাকরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। লেখালেখির বেশিরভাগ সেখানেই করা। তারপরও যেহেতু জীবনের বেশ কবছর কানাডার মন্ট্রিলে ছিলেন, কানাডীয় সাহিত্যধারায় তিনি অন্তর্ভুক্ত।

কানাডার সাহিত্যজগৎ জুড়ে এই যে বহু লেখকের পদচারণা সেখানে কিন্তু দেশ-কাল কিছুই গ্রাহ্য হয় না। হয় না যে, সেটির বড় উদাহরণ ২০১৬ সালে এক লাখ ডলার মূল্যের গিলার পুরস্কার। কথাসাহিত্যে সে-বছর ওই বইটি গভর্নর জেনারেল পুরস্কারও পায়। পুরস্কারটি পান মেডেলিন থিয়েন। ভ্যাঙ্কুভারের বাসিন্দা মেডেলিন মালয়েশিয়ান চায়নিজ অভিবাসীর উত্তরসূরি। তাঁর উপন্যাসটির নাম ডু নট সে উই হ্যাভ নাথিং। গল্পটি কেন্দ্রীভূত হয়েছে চীনের তিয়েন আনমেন স্কয়ারের ১৯৮৯ সালের ঘটনাটি ঘিরে। সঙ্গে উঠে এসেছে ষাট ও সত্তরের দশকের চীনের সাংস্কৃতিক বিস্ময়ের কথা। আনন্দের বিষয় এই যে, গ্রন্থটি কানাডীয় সাহিত্যের বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে একটুও অসুবিধা হয়নি।

অথবা ধরা যাক নোভা স্কোশিয়ার লেখিকা জোহানা স্কিবসরুডের কথা। ২০১০ সালের নভেম্বরে জোহানার উপন্যাস দ্য সেন্টিমেন্টালিস্টার নাম যখন গিলার পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখনকার ঘটনাটি অনেকেরই জানা। দেশের সবচেয়ে দামি পুরস্কার পেল বইটি – অথচ বইটির কোনো কপি বাজারে নেই। কেননা, নোভা স্কোশিয়ার যে ছোট প্রকাশক বইটি প্রকাশ করেন তাঁরা সপ্তাহে এক হাজার কপির বেশি সরবরাহ করতে পারতেন না। সেই যে বই যেটি মাত্র ত্রিশ বছর বয়সী, তখন অবধি সর্বকনিষ্ঠ, এই লেখককে পরিচিত করে তুলল উত্তর আমেরিকাজুড়ে, সেটির বিষয় কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধ-পরবর্তী অভিজ্ঞতা নিয়ে এক পিতার সঙ্গে পুত্রীর ভাবকে আলোকিত করেছে। আবার ধরা যাক কানাডীয়-লেবানিজ লেখক রাউই হেজের কথা। তাঁর উপন্যাস ডি নিরোস গেইম ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। ২০০৬ সালে প্রকাশিত সে-উপন্যাস ওই বছরের গিলার এবং গভর্নর জেনারেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য শর্টলিস্টেড হয়েছিল। লেখকের প্রথম এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট কিন্তু বৈরুত।

এবার আসি কানাডার প্রথম সারির কথাসাহিত্যিক আয়ান মার্টেলের কথায়। আয়ান বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছেন লাইফ অব পাই (২০০১) উপন্যাসটির জন্য। পৃথিবীজুড়ে বইটির এক কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হওয়া উপন্যাসটির বিষয় কী? ‘ম্যানবুকার’ পুরস্কার পাওয়া এ-বইয়ে কিন্তু প্রেক্ষাপট হিসেবে নেওয়া হয়েছে ভারতকে।

ভারতকে আশ্রয় করে রচিত কথাসাহিত্য কানাডীয় সাহিত্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছে। ভেন বেগামুদ্রেও কিন্তু অনেক বেশি ভারতকেন্দ্রিক চিন্তাচেতনায় আচ্ছন্ন। ধরা যাক ভেনের বিষ্ণু ড্রিমস (২০০৮) উপন্যাসের কথা। উপন্যাসটির পরিকাঠামোতে তিনি চিত্রায়ণ করেছেন ভারতীয় মিথোলজির বিষ্ণু ও লক্ষ্মীকে।

আবার ধরা যাক শ্রীলংকান বংশোদ্ভূত শ্যারন বালার কথা। তরুণী এই লেখিকার প্রথম উপন্যাস দ্য বোট পিপল কানাডার বাজারে আসে এই বছরের ২ জানুয়ারি। শ্যারনকে ২০১৭ সালে রাইটার্স ট্রাস্ট অব কানাডার বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে আমি প্রথম দেখি। তখন তিনি পুরস্কার পেলেন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গল্পের জন্য। বয়সে তরুণী বলেই এই লেখিকার কথা আমার মনে ছিল। তাঁর নতুন বইটির বিষয় শ্রীলংকা থেকে ১৯১০ সালে পাঁচশো রিফিউজি কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে আসার গল্প। সে-বই নিয়েও পাঠকের এত আগ্রহ যে, ১১ জানুয়ারি বইটি যখন আমি পাবলিক লাইব্রেরিতে হোল্ড করি, তখন আমার সিরিয়াল হয় ৬৭। অথচ লাইব্রেরিতে তখন বইয়ের কপি মাত্র ৪৩। বছরের শুরুতেই সিবিসি চ্যানেলে যে-বইগুলো আলোচনার জন্য উঠে আসে, দ্য বোট পিপল সেগুলোর একটি।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডীয় লেখকদের তালিকাটি বিশাল। অনিতা রাও বাদামী (জ. ১৯৬১), শওনা সিং বল্ডউইন (জ. ১৯৬২), নীল বিশ্বনাথ (জ. ১৯৬৫), আনোশ ইরানি (জ. ১৯৭৪), এম. জি. ভাসানজি (জ. ১৯৫০) ইতোমধ্যে যথেষ্ট পরিচিতি পেয়েছেন। নীল বিশ্বনাথ এবং এম. জি. ভাসানজি একই সঙ্গে ভারতীয় এবং ত্রিনিদাদীয়-টোবাগোনীয়। তাঁদের পূর্বপুরুষ কানাডায় আসার আগে ভারত থেকে প্রথমে ত্রিনিদাদ-টোবাগোয় যান। ভাসানজির বই দ্য বুক অব সিক্রেটস ১৯৯৪ সালে

প্রথমবারের মতো গিলার পুরস্কার লাভ করে। ২০০৩ সালে কানাডীয় লেখকদের ব্যাপক আগ্রহের এই পুরস্কারটি তিনি দ্বিতীয়বারের মতো লাভ করেন দ্য ইন বিটুইন ওয়ার্ড অব বিক্রম লাল গ্রন্থের জন্য। ২০০৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বহুলপঠিত গ্রন্থ দ্য অ্যাসাসিন’স সংয়ের প্রেক্ষাপটও ভারতীয়। ধর্মীয় গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যাকুল এক শিখ তরুণের কাহিনি সেটি। ত্রিনিদাদীয় লেখকদের মধ্যে অন্য যে আরেকজন ব্যাপক পরিচিতির অধিকারী, তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ মহারাজ (জ. ১৯৫৫)। রবীন্দ্রনাথের বই দ্য অ্যামেজিং অ্যাবজর্ভিং বয় ২০১০ সালে ট্রিলিয়াম বই পুরস্কার পেয়েছিল।

উইনিপেগের লেখিকা ক্যাথি অসলিয়ারও কিন্তু ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে উপন্যাস লিখতে সামান্য দ্বিধা করেননি। ২০১১ সালে প্রকাশিত তাঁর কাব্য-উপন্যাসটির নামই তিনি দিয়েছেন কর্ম। অভারতীয় লেখকের এই যে প্রয়াস, অর্থাৎ ভারতীয় বোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাব ‘কর্ম’কে তাঁর উপন্যাসের বিষয় করা সেটি কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

শ্রীলংকান বংশোদ্ভূত কানাডীয় লেখকধারার প্রথম সারির একজন হলেন মাইকেল ওনদাতজি (জন্ম ১৯৪৩)। কানাডার সাহিত্যাঙ্গনে হেন কোনো পুরস্কার নেই যা তিনি পাননি। তাঁর বহুল পরিচিত উপন্যাস হলো ইন দ্য স্কিন অব অ্যা লায়ন। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত সে-উপন্যাসে টরন্টো শহর বিনির্মাণে অভিবাসীদের অবদান চিহ্নিত করেছেন মাইকেল। ২০০০ সালে প্রকাশিত উপন্যাস অনিল’স ঘোস্ট রচিত হয়েছে অনিল টিসেরা নামে এক শ্রীলংকানকে কেন্দ্র করে, যে প্রথমে যুক্তরাজ্য এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে আসে এবং ফিরে যায় মাতৃভূমি শ্রীলংকায়। উপন্যাসটি গিলার এবং গভর্নর জেনারেল দুটো পুরস্কারই পেয়েছিল।

আবার ধরা যাক বারবারিয়ান লস্ট : ট্রাভেলস ইন দ্য নিউ চায়না বইয়ের কথা। কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ছোটভাই আলেক্সান্দার ট্রুডোর লেখা এই বই কিন্তু চীন দেশ নিয়ে। চীনের ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে লেখক-সাংবাদিক আলেক্সান্দারের বইটি বেস্ট সেলারও হয়েছে। বইটির ফরাসি অনুবাদ গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ করেছে।

এবার আসি বিপুলভাবে প্রশংসিত কানাডীয় কবি ও ঔপন্যাসিক অ্যান মাইকেলসের কথায়। অ্যানের উপন্যাস-দুটির একটি হলো ফিউজিটিভ পিসেস। বর্তমানে টরন্টো শহরের শিল্প-সাহিত্যের বিকাশে নিয়োগপ্রাপ্ত এই প্রতিভাধর লেখকের উপন্যাসটি চলচ্চিত্র হিসেবেও অর্জন করেছে ব্যাপক প্রশংসা। উপন্যাসের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে স্পেনের প্রেক্ষাপট। কোনো একটি একক গ্রন্থ কানাডায় এত বেশি পুরস্কার অতীতে কখনো পেয়েছে বলে মনে হয় না। অথচ বইটির বিষয় কিন্তু অকানাডীয়।

জাপানি বংশোদ্ভূত জয় কগোয়ার জন্ম ভ্যাঙ্কুভারে। প্রবীণ এই লেখকের (জ. ১৯৩৫) সবচেয়ে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত গ্রন্থ হলো ওবাসান (১৯৮১)। কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রদের ওবাসান বা, ঠাকুমার কথা পড়তে হয় পাঠ্যতালিকায়। জয় কিন্তু তাঁর উপন্যাসের বিষয় করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে কানাডীয় জাপানিদের গল্পকে। ভাবলে আনন্দ হয়, ১৯৯৩ সালে আর্নল্ড ই ডেভিডসন ওবাসানের ভূমিকা নিয়ে একশ পৃষ্ঠার একটি বই লিখে ফেলেছিলেন। ১৯৯৭ সালে ম্যাসন হ্যারিস লেখেন জয়ের সাহিত্যকর্মের ওপর একটি সমালোচনাগ্রন্থ। ২০১১ সালে জয় কগোয়ার সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম নিয়ে তিনশো তেষট্টি পৃষ্ঠার বহু লেখকের বিপুল এক গ্রন্থ প্রমাণ করে, জয় কানাডীয় সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য এক শব্দশিল্পী।

আবার ধরা যাক চায়নিজ বংশোদ্ভূত ওয়েসন চয়ের (জ. ১৯৩৯) কথা। ২০০৯ সালে ওয়েসনের স্মৃতিকথা নট ইয়েট : অ্যা মেময়ার অব লিভিং অ্যান্ড অলমোস্ট ডাইং একটি নন্দিত গ্রন্থ হিসেবে সাহিত্যামোদীদের কাছে পরিচিত। এ-গ্রন্থের দশ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর আরেকটি স্মৃতিকথা পেপার শ্যাডোস : অ্যা চায়নাটাউন চাইল্ডহুড (১৯৯৯)। ভ্যাঙ্কুভারের বাসিন্দা ওয়েসনের প্রথম উপন্যাস দ্য জেড পিওনি প্রকাশ পায় ১৯৯৫ সালে। উপন্যাসটির প্রধান চরিত্রগুলোর সবাই কিন্তু চীনা। উপন্যাসের সময়কাল তিরিশের দশক পেরিয়ে চল্লিশের দশকে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান দখল করে চীনকে। কানাডীয়রা, কানাডায় চীনা মানুষেরা সে-বিষয়টিকে কীভাবে দেখেছেন, ওয়েসন সেটিকেই তাঁর উপন্যাসের উপাত্ত করেছেন।

১৯৯০ সালে প্রথম উপন্যাস লাইভস অব দ্য সেইন্টস দিয়ে ইতালীয় পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার নিনো রিচির (জন্ম ১৯৫৯) গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ। ২০০৮ সালে প্রকাশিত দ্য অরিজিন অব স্পেসিস উপন্যাস দিয়ে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য পুরস্কারটি অর্জন করেন। তাঁর পুরো রচনাতেই ইতালির প্রেক্ষাপট বারবার উঠে আসে।

২০০৬ সালে গিলার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ভিনসেন্ট ল্যামের (জন্ম ১৯৭৪) পূর্বপুরুষও চীনা বংশোদ্ভূত। যদিও তাঁরা চীন থেকে প্রথমে ভিয়েতনামে অভিবাসী হন। পরে আসেন কানাডায়। কানাডার অন্টারিও প্রদেশের লন্ডন শহরে ভিনসেন্টের জন্ম। ২০১২ সালে ভিনসেন্টের উপন্যাস দ্য হেডমাস্টার’স ওয়েজার গভর্নর জেনারেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল। যদিও উল্লেখ করা প্রয়োজন, পেশায় চিকিৎসক ভিনসেন্টের যে-বইটি ২০০৬ সালে গিলার পুরস্কার পেয়েছিল সেটি ছিল একটি নন-ফিকশন। সে-অভিজ্ঞতাতেই রচিত হয়েছিল সেটি। নাম ছিল ব্লাডলেটিং অ্যান্ড মিরাকুলাস কিওরস।

কানাডীয় সাহিত্যধারায় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত লেখকদের অবদানও বিশাল। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সারা কানাডার পোয়েট লরিয়েট হিসেবে যিনি কিছুদিন আগেই প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি হলেন জর্জ ইলিয়ট ক্লার্ক (জ. ১৯৬০)। ২০০১ সালে জর্জ তাঁর কাব্যগ্রন্থ এক্সিকিউশন পোয়েমসের জন্য গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ করেন। জর্জের সাহিত্যের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে নোভা স্কোশিয়া প্রদেশের কালো মানুষদের অভিবাসী হওয়ার ইতিহাস। জর্জের উপন্যাস জর্জ অ্যান্ড রু (২০০৫) দুই কালো কানাডীয় ভাইয়ের কথা, যাঁরা ১৯৪৯ সালে নিউ ব্রান্সউইকে এক ট্যাক্সিচালককে খুন করে।

টরন্টোবাসী নন্দিত লেখক এলিসন পিকের কথাও এ-প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন। ২০১০ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ফার টু গো দিয়ে এই লেখক ২০১১ সালে ম্যানবুকার প্রাইজের শর্টলিস্টে উঠে এসেছিলেন। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর স্মৃতিকথা বিটুইন গডস। যে-কারণে এই লেখককে বর্তমান রচনায় আমি উল্লেখ করছি সেটি হলো, তাঁর পূর্বপুরুষ চেকোসেøাভাকিয়ার বাসিন্দা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের আক্রমণে তাঁর ঠাকুরদা চলে আসেন কানাডায়। সেই সময়ের সেসব কথাকে লিপিবদ্ধ করেছেন এলিসন তাঁর উপর্যুক্ত দুটি গ্রন্থে। ব্যাপকভাবে নন্দিতও হয়েছেন তিনি।

এই যে ভিন্নদেশের মানুষ ও তার সংস্কৃতিকে কানাডীয় সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়া, সেটা দিয়েই আসলে তিনশো নব্বই বছর আগে কানাডীয় কবিতার যাত্রা। ১৬২৮ সালে রবার্ট হেইম্যান (১৫৭৫-১৬২৯) লন্ডন থেকে কুয়োডলিবেটস নামে যে-কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেন, সেটিই তো প্রথম কানাডীয় কাব্যপ্রয়াস! অথবা ধরা যাক, ১৭৬৯ সালে প্রকাশিত ফ্রান্সেস মুর ব্রুকের (১৭২৪-৮৯) দ্য হিস্ট্রি অব এমিলি মন্টেগু, সেটিই তো প্রথম কানাডীয় উপন্যাসের উদাহরণ, যেটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শক্তিমান কবি রবার্ট সাভিসও (১৮৭৪-১৯৫৮) কিন্তু ভিন্নদেশে জন্ম নেওয়া এক লেখক। যেমনটি আমরা দেখলাম আধুনিক কানাডীয় কবিতার শক্তিমান কণ্ঠ আর্ভিং লেইটনের (১৯১২-২০০৬) ক্ষেত্রেও – তিনি এসেছিলেন রোমানিয়া থেকে। গত শতাব্দীর শুরুর বছরগুলোতে যে-কথাসাহিত্যিকের কথা ক্যানলিটের প্রবক্তারা এখনো শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, সেই হ্যারল্ড ল্যাডো (১৯৪৫-৭৩) এসেছিলেন ক্যারিবিয়া থেকে এবং সবই লিখেছিলেন ক্যারিবীয় জীবন নিয়ে। কানাডায় জীবনীমূলক উপন্যাসের অগ্রগণ্য যে-লেখক সেই ক্যারল শিল্ড (১৯৩৫-২০০৩) নিজেও এসেছিলেন অন্য দেশ থেকে।

বর্তমান প্রবন্ধ শেষ করার আগে আবারো ‘কানাডীয় লেখকের সঙ্গে আড্ডা’ অনুষ্ঠানের উল্লেখ করতে চাই। গত ৩ ফেব্রুয়ারি উল্লিখিত বিএলআরসি আয়োজিত আড্ডার অতিথি লেখক ছিলেন কবি ও সম্পাদক জিম জনস্টোন। জিমের উদ্দেশে উপস্থিত এক বাঙালি লেখকের প্রশ্ন ছিল – ‘কানাডায় আমাদের লেখার বিষয় কী হওয়া উচিত?’ জিম কালক্ষেপণ না করেই বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার কথা লিখবে। তোমার কথাই হবে কানাডীয় সাহিত্য।’

জিমের কথার প্রতিফলন সারা কানাডীয় সাহিত্যে। প্রত্যেকে

তাঁদের নিজেদের কথা লিখেছেন, নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধের কথা। আর সেসবকে একত্র করে কানাডীয় ভূখ-ে যে-সাহিত্য নির্মিত হয়েছে সেটিই কানাডীয় সাহিত্য। তাই কানাডীয় সাহিত্যে পাওয়া সম্ভব পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীর লেখকের চেতনার প্রতিফলন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: