পকেটে শিং মাছ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আর মুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলা একই ব্যাপার। মুনিয়া রাহাত আলমের প্রথম ও একমাত্র স্ত্রী। প্রথমদিকে রাহাতের মনে হতো, মেয়েটা খানিক দুষ্টু, পাজিও কম নয়; সময়ে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। একসময় সে বুঝতে পারে, তার ধারণা ও প্রত্যাশা ভুল ছিল। কিছই ঠিক হয়নি, মুনিয়ার জেদ ও নখরামি কমেনি, বেড়েছে। বউয়ের সব কথায় কান দিতে নেই। বেশিরভাগ সময় বোবা হয়ে থাকতে পারলে ভালো। এতে সবরকম দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এড়ানো যায়। কিন্তু সংসারের কুরুক্ষেত্র কতক্ষণই বা সহ্য করা সম্ভব? একবার রাহাতের মনে হয়, পরেরবার বিয়ে করলে অন্যরকম একটা মেয়ে দেখব, কিংবা নিজেকেই শুধরে নেব। – আবার বিয়ে? কখনোই নয়; এমনও ভাবে সে।

বিয়ের পর থেকে গুমোট কুয়োর ভেতরে যেভাবে সে আর্তনাদ করে ফিরছে, দ্বিতীয় বিয়ের সাহস ও স্বপ্ন তেমন আর আসে না। সকালে রাহাত অফিসে যাবে। কাজের মেয়েটা আসেনি। স্নান করতে যাওয়ার সময় দেখলো, মুনিয়া জেগে আছে। মোবাইল টিপছে। একবার চোরাচোখে সে তাকে দেখলো। রাহাত নাস্তা না করেই অফিসে চলে গেল। মুনিয়া ফিরেও দেখলো না।

পিয়নকে দিয়ে ক্যান্টিন থেকে রাহাত ডিম-পরোটা আনায়। খাওয়ার আধঘণ্টা পর, পেট কামড়ায়। কিছুক্ষণ পরেই মিটিংয়ে ঢুকতে হবে। পেটে হাত দিয়ে সে নিজের জুতার দিকে তাকিয়ে আছে, এমন সময় মোবাইলে ভাইব্রেট হয়। বের করে দেখে, মুনিয়ার টেক্সট : ‘তুমি মানসিকভাবে অসুস্থ।’

গত মাসেই অফিসে রাহাতের প্রমোশন হয়েছে। অসুস্থ লোক কি প্রমোশন পায়? বন্ধু, আত্মীয় এমনকি শত্রুও কোনোদিন তাকে এ-কথা বলেনি। তাহলে?

রাহাত হিসাব মেলাতে পারে না। টেক্সট মুছে সে কাজে মন দেয়।

মুনিয়া মেয়েটা এমনিতে ভালো। রান্নায় হাত আছে। সবজি এতো ভালো রাঁধে, অন্য তরতারি না হলেও খাওয়া শেষ করা যায়। ওর ডিম ভুনা আর মুরগির ঝালফ্রাই তো অমৃত। মুনিয়া গল্প করে। বেড়াতে ও শপিংয়ে গেলে যন্ত্রণা দেয় না। মাথাব্যথা হলে যত্ন করে টিপে দেয়; কিন্তু ওর চরিত্র অদ্ভুত। অদ্ভুত ও অন্যরকম। ওর সঙ্গে কেবল গোখরা সাপেরই তুলনা চলতে পারে।

এক মাঝরাতে রাহাতের ঘুম ভেঙে যায়। কী ঘটেছে, প্রথমে সে বুঝতে পারে না। পরে দেখে, মুনিয়া তার বুকে লেপ্টে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে বিব্রত বোধ করে। আবার কোনো ভুল হলো কি না ভেবে চিন্তিত লাগে।

‘কী হয়েছে সোনা, কাঁদছ কেন?’ কথাটা বলতে যতটুকু সময়, মুনিয়া আরো জোরে রাহাতকে চেপে ধরে কাঁদতে থাকে।

কিছুক্ষণ পর সে হালকা হয়। একবার সে ওয়াশরুমে যায়। এসে শুয়ে পড়ে।

‘কী হয়েছিল, মুনিয়া?’ আবার জিজ্ঞেস করতেই সে কেমন রহস্যময় হাসি হাসে।

রাহাত না দেখার ভান করে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে।

ফেসবুকে কোন মেয়েটা রাহাতের পোস্টে লাইক ও কমেন্ট করলো, তার নাড়িনক্ষত্র ঢুঁড়ে বের করা এবং ইনবক্সে গিয়ে তাকে নক করা; রাহাত কোথায় যায়, ফোনে কার সঙ্গে ও কী টোনে কথা বলে – আড়ি পেতে শোনা; কাকে টেক্সট করলো, পথে যেতে যেতে কোন মেয়ের দিকে তাকালো – সবখানেই মুনিয়া সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে রাখে।

এসব চলতেই থাকে। রাহাত ফেসবুক ডিঅ্যাক্টিভ করলেও মুনিয়ার চোখ ও মনের সন্দেহ যায় না।

এক সন্ধ্যায়, বসুন্ধরা সিটিতে শপিংশেষে দুজনে সিনেমা দেখলো। বেরিয়ে ওরা পিৎজা খাচ্ছে। খেতে খেতে মুনিয়া বলল, ‘তোমার মন ছোট, বুঝলে?’

পিৎজা খাওয়া বন্ধ করে রাহাত বউকে দেখে। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে – ‘কীভাবে বুঝলে, মন ছোট?’ মুনিয়া আর কথা বলে না। রাহাত চেপে ধরে, ‘আমার মন ছোট, তুমি সেটা মাপলে কী করে?’

উত্তর নেই।

রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে রাহাত কিছুক্ষণ টিভি দেখলো। সাড়ে বারোটা বাজে। ঘুমাতে হবে। ব্রাশ করে মাত্র সে বিছানায় এসেছে। মুনিয়া বলল, ‘তোমার সঙ্গে কোনো সুস্থ মানুষ থাকতে পারবে না।’

চিংড়ি মাছের মতো লাফিয়ে রাহাত বিছানা ছেড়ে দাঁড়ায় – ‘কী বললে?’

মুনিয়া কিছু বলে না। টিটকারি মারার ভঙ্গিতে হাসতে থাকে।

রাহাত তেরচা চোখে তাকায়, ‘চমশাটা কোথা থেকে কিনেছ? দাম কত?’

মুনিয়া অবাক হয়ে বলল, ‘চশমা? আমি তো চশমা পরি না।’

‘নিশ্চয়ই পরো। এমন একটা চশমা, যেটা দিয়ে তুমি কেবল আমার খারাপ দিকগুলোই দেখতে পাও?’

সে আর কথা বলে না।

রাহাত বেডরুম ছেড়ে বাইরে আসে। বসার ঘরের সোফায় শুয়ে থাকে। মশার কামড় খেয়ে সারারাত নির্ঘুম কাটে। ভোরে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, এই সম্পর্ক থেকে তাকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে সম্পর্কটা, যে-কোনো সময় ভেঙে পড়বে। একই বাড়িতে থেকেও দুজনের কথা তো তেমন হয়ই না, একজন ঘরে থাকলে আরেকজন অন্য ঘরে চলে যায়। ভালো করে কেউ কাউকে দেখেও না।

অফিস থেকে ফেরার পর, কুকুরের মতো বউ রাহাতের শরীর শুঁকে দেখে, কী যেন খোঁজে। ‘সরো তো’ – বলে রাহাত পাশ কাটায়। টেলিভিশন নাটকের মতো বাস্তবের মেয়েরাও যে স্বামীর সঙ্গে এমন ব্যবহার করে, সে জানতো না।

বিয়ের মাধুর্য রক্ষা করতে সম্পর্ক যেমন বুড়ো হতে দিতে হয় না, যৌনতার শিল্প ও মাধুরীও ধরে রাখতে হয়। সেটা নেই অনেকদিন। যেন রাহাতের ইচ্ছে নেই, বউয়ের তো নেই-ই। জেদের মুখে ফুল দিয়ে অবদমন চলছে দুজনের। এভাবে কি আর চলে?

মুনিয়া কিছুতেই এসব বুঝতে চায় না।

আজকাল এমনও হয়, মুনিয়া কাছে এলে, বুকঘেঁষে দাঁড়ালেও রাহাতের কোনো অনুভূতি হয় না। শরীর কেমন শীতল হয়ে আসে। মুনিয়া দেখতে সুন্দর, সুশ্রী ও লম্বা। নির্মেদ শরীর। নিতম্বিনী। তবু কোথাও কামশীতল বোধ ছড়িয়ে থাকে।

মুনিয়ার সঙ্গে কথা, কথার জের ও সন্দেহ নিয়ে যখন মনকষাকষি চলছে, তখন আকস্মিক একটা দুর্ঘটনা ঘটলো।

অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তায় পড়ে গিয়ে রাহাতের পা ভাঙলো।

রিকশায় সে বাসায় ফিরছিল। আচমকা পেছন থেকে অন্য একটি রিকশা ধাক্কা দেয়। সে অন্যমনস্ক ছিল? ছিটকে পড়ে যায়। রাস্তায় পড়ে সে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো ওই মুহূর্তে একটি হোন্ডা পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। মট করে শব্দ হয়, সঙ্গে সঙ্গে ‘মাগো’ – বলে প্রায় শুয়ে পড়ে। রিকশাচালক ছুটে এসে তাকে বুকে চেপে ধরে। তার চোখভরা জল। আর কী আশ্চর্য, ‘দুঃখিত’ শব্দটাও হোন্ডাওয়ালা বলল না। থামলো বটে, পেছন ফিরে দেখলো, ঝামেলা হতে পারে ভেবে একরকম পালিয়ে গেল। যাওয়ার সময় চোখ রাঙিয়ে নীরবে সে বলে গেল, ‘দেখে চলতে পারেন না?’

রাহাত বুঝতে পারে, পা-টা গেল।

অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার পর, নিজেই নিজেকে বকলো রাহাত – ‘ধুর, এমনও লেখা ছিল আমার কপালে।’

হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা গেল, হাঁটুর নিচের হাড় ফেটে গেছে।

রাহাতের অ্যাক্সিডেন্টের পর, মুনিয়ার প্রেম যেন বেড়ে যায়।

অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সে দুদিন রাহাতের পাশে বসে থাকলো। বাসা থেকে নিজে রেঁধে খাবার নিয়ে আসে।

 যত্ন করে খাইয়ে দেয়। বকে না। ঝগড়া করে না। রাহাত পুরনো মান-অভিমান ভুলে যায়। নরম চোখে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে। মুনিয়াও হাসে।

কপালে ব্যান্ডেজ ও পায়ে প্লাস্টার নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকে রাহাত। তিনদিন চলছে। বন্ধু ও অফিসের কেউ কেউ এসে দেখে গেছে। একটা বন্ধু আসে, প্রায় সারাক্ষণ থাকে। সঙ্গ দেয়। ডাক্তার বললেন, বিপদ কেটে গেছে, ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু ভয়টা ঢুকলো পরদিন দুপুরে।

মুনিয়া সকালে অফিসে বেরিয়ে যায়। তাই আসতে পারে না। দুপুরে লাঞ্চের বিরতির সময় সে এলো। রাহাতকে খাবার ও ওষুধ খাইয়ে সে বাসায় ফিরে যায়।

মুনিয়া চলে যাওয়ার পর, ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় নাকি ভরপেট খাওয়ার কারণে রাহাতের ঘুম ঘুম পায়। চোখ ছোট হয়ে আসে।

এমন সময় কেবিনের পর্দাটা সরে যায়। একটা মুখ উঁকি দেয়।

এ কি স্বপ্ন না বিভ্রম, রাহাত অনুমান করতে পারে না। ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে সে বোঝার চেষ্টা করে, কে এসেছে? প্রথমে সে ঠিক বুঝতে পারে না।

রাহাতের কপালে কেউ আলতো করে হাত রাখে। জ¦র আছে কি না বোঝার চেষ্টা করে। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু কপাল থেকে হাতটা চুলের ভেতর ঢুকে পড়ে। চুল টেনে টেনে দেয়। রাহাতের ঘুমের আবেশটা গাঢ় হয়ে নেমে আসার বদলে পুরোপুরি কেটে যায়। সে চোখ  মেলে তাকায়।

‘কী রে, চিনতে পারছিস?’

রাহাতের চোখের পাতা দ্রুত ওঠানামা করে।

‘কেমন আছিস এখন?’ মেয়েটা আবার বলে।

রাহাত নীরবে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটার কথা ও মুখের ভঙ্গি মেলাতে চেষ্টা করে। বেশিক্ষণ কষ্ট করতে হয় না। মেয়েটাই রহস্য আলগা করে দেয়।

‘আমি নোরা। নৃবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়। মনে পড়ে? অবশ্য বহুদিন আগের কথা। মনে থাকার কথাও নয়।’

রাহাতের চোখের সামনে পুরনো দিনের দরজাগুলো পটপট করে খুলে যায়। সেই নোরা? এতোদিন পর, এখানে? তাকে দেখতে এসেছে? সে অত্যন্ত আপ্লুত বোধ করে।

‘কীভাবে পা ভাঙলি?’ নোরা জিজ্ঞেস করে।

রাহাত কোনো উত্তর দেয় না। মৃদুচোখে তাকায়। নোরাকে দেখে। ছোট করে হাসে। নোরাও মিষ্টি করে হাসে।

নোরা কি দীর্ঘ পথ হেঁটে এসেছে? তার নাক ও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম লেগে আছে।

রাহাত বিছানা ছেড়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসার চেষ্টা করতে করতে বলে, ‘বসো।’

বেডের পাশে দুটো চেয়ার রাখা। নোরা চেয়ারে না বসে বিছানায় বসে। রাহাতের খানিকটা আড়ষ্ট লাগলেও মুহূর্তেই তা কেটে যায়।

‘আমার দুর্ঘটনার কথা কীভাবে জানলে?’

নোরা নিশ্চুপ বসে থাকে।

‘এতোদিন পর তুমি এসেছ, সত্যি আমার খুব ভালো লাগছে।’

এ-কথায়ও নোরা কিছু বলে না। কেবল সে তার বাঁ হাতটা চুলের পেছনদিকে নিয়ে যায়। চুলের ভেতর কী যেন খোঁজে।

নোরা এতো কাছে বসে আছে, সরাসরি তাকানো যায় না। নোরার অবিন্যস্ত চুল লেপ্টে রয়েছে ঘর্মাক্ত কপালে। খাড়া নাক। নাকে শিশিরবিন্দুর মতো ঘাম ফুটে আছে। সে কোন ব্র্যান্ডের পারফিউম ব্যবহার করে, রাহাত জানে না। ফুলের মতো মিষ্টি ঘ্রাণ পায়। হঠাৎ ওর বাহুর নিচে রাহাতের চোখ চলে যায়।

নীলচে সবুজ ধরনের কামিজ পরে আছে নোরা। ওড়নাটা রশির মতো বুকের ওপর দিয়ে নিচে ঝুলে আছে। তীব্র বুক। কামিজের হাতাটা খুব ছোট। তার বগলের নিচটা ঘেমে গেছে। বগলের লোমগুলোতে শিশিরের মতো ঘাম লেগে আছে। রাহাত আড়চোখে তাকায়। আর একবার তাকায়। আরো একবার। নোরার বগলের ভেজা লোম, ঘামের কামোদ্দীপক মৃদু গন্ধ রাহাতের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। বুক কাঁপতে থাকে।

এভাবে কতক্ষণ কেটেছে রাহাত জানে না। সে চোখ বন্ধ করে ফেলে।

কথা খুব একটা এগোয় না। তবু রাহাতের বেশ ভালো লাগে। শারীরিক অসুস্থতা, হাসপাতালের বিষণ্ন পরিবেশ মুহূর্তেই সজীব হয়ে ওঠে।

নোরা বলল, ‘আজ আসি। অন্য একদিন আসব’। বলেই সে তার সাইডব্যাগ থেকে একটা বই বের করে। রাহাতের হাতে দিয়ে বলে, ‘একসময় তো খুব বই পড়তি। এখনো কি পড়িস? তোর জন্য বইটা নিয়ে এলাম।’

রাহাত বইয়ের মলাটে চোখ রেখে দেখে, নির্মলেন্দু গুণের কবিতার বই নির্বাচিতা।

‘আজ আসি, কেমন?’

নোরা আর দাঁড়ায় না। দ্রুত পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।

রাহাত বিছানায় শরীরটা ছেড়ে দেয়। ঘরময় একটা মৃদু সুরভী ভেসে বেড়ায়। অচেনা। দুলতে থাকা কেবিনের পর্দায় একবার তাকিয়ে সে চোখ বন্ধ করে। ভাবে, ভাগ্যিস, মুনিয়া কিছু দেখেনি।

রাহাত একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিকেলটা নরম হয়ে এসেছে, এমন সময় মুনিয়া এলো হাসপাতালে। রাহাতের প্রিয় গুড়ের পায়েস ও নুডলস এনেছে। তোয়ালে ভিজিয়ে রাহাতের সারামুখ মুছিয়ে দিয়ে বলল, ‘একটু পানি খাও। তার আগে ভালো করে কুলি করো।’

রাহাত ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসে। বউকে দেখে। দেখতেই থাকে। মুনিয়া সন্দেহের চোখে তাকায় – ‘কী, জ¦রটর এলো নাকি?’ বলেই কপালে হাত রাখলো।

পরদিন দুপুরে, হাসপাতালের বেডে আধোঘুম ও জাগরণে রাহাত একটা স্বপ্ন দেখছিল। নোরা কখন এসে পাশে বসেছে, জানে না। সে হাত ধরে বলল, ‘আজ কেমন আছো, রাহাত?’

রাহাত চমকে ওঠে। হার্টবিট বেড়ে যায়। হার্টের দ্রিম দ্রিম শব্দ কানে এসে লাগে।

নোরা তাকে বরাবরই ‘তুই’ সম্বোধন করতো। আর শাসন। আজ প্রথমবার সে রাহাতকে মিষ্টি করে ‘তুমি’ ডাকলো। বুকের ভেতর কী যে হয়, রাহাত আকুল হয়ে নোরার হাত ধরে। নোরা মৃদু হেসে তাকায়। রাহাত টের পায়, তার চোখ ভিজে গেছে; গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।

নোরা প্রশ্রয়ের ভঙ্গিতে হাসে – ‘এই, এই’ বলে ওড়নায় অশ্রু মুছিয়ে দেয়। সেই মুহূর্তেই সে ঝুঁকে রাহাতের বুকে নেমে আসে। কপালে ভেজা ঠোঁট রাখে। খুবই অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু রাহাতের সারাদেহ থরথর কেঁপে ওঠে। দুদিন আগেও সে একশ চার জ¦র নিয়ে সটান পড়েছিল, এতোটুকু কাঁপেনি। সে কাঁপতে থাকে। আর তখনই ঘ্রাণটা পায়।

ঘ্রাণটা তার খুব চেনা লাগে। কিন্তু মনে করতে পারে না, কী এর উৎস? সে ভেবে ভেবে দিশেহারা হয়, তবু কিছু মনে পড়ে না।

নোরা শান্ত হয়ে চেয়ারে গিয়ে বসে।

রাহাত আবার সেই ঘ্রাণটা পায়। আবার। আরো একবার।

কিছুক্ষণ থাকার পর নোরা চলে যায়। রাহাত নিজের মধ্যে ফিরে আসে।

একসময় ঘ্রাণের স্মৃতিটা তার মনে পড়ে।

বহু বছর আগের এক সন্ধ্যায়, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের সামনে, প্রেমপিয়াসী ছেলেমেয়েদের হলে ফেরার সময় হয়ে গেছে; বিদায়ের আগে শেষ কথা, চোখাচোখি ও হাসিটুকু বিনিময় চলছে। রোকেয়া ও তাপসী রাবেয়া হলের মাঝখানে যে-পুকুর, তার কিনারায় একটা বেঞ্চ পড়েছিল অনাথের মতো। নোরা ও রাহাত হাঁটতে হাঁটতে বেঞ্চে এসে বসে। ওদিকে খানিকটা অন্ধকার। এপ্রিলের সন্ধ্যায় বেজায় গরম। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কম। তখন দারুণ একটা হাওয়া বয়। রাহাত শার্টের বুকের ওপরের বোতামটা খুলে দেয়।

নোরা পাশ ফিরে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলল, ‘চল, উঠি।’

রাহাত বাধ্য প্রেমিকের মতো বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। যদিও নোরার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক নয়। সে রাহাতের দূরসম্পর্কের আত্মীয় এবং বয়সেও বড়।

মনে পড়ে, সেই মুহূর্তে নোরা সেøা মোশনে সামনে হাঁটছে, রাহাত পেছনে।

আর তখনই মুখ ফিরিয়ে আচমকা নোরা তাকে বুকে টেনে নেয়। মেয়েদের শরীর এতো নরম হয়? সেই প্রথম রাহাত অনুভব করে। সে নোরার কাঁধে মুখ রাখে। একটা অচেনা মিষ্টি ঘ্রাণ তার নাক বেয়ে মাথার ভেতর চলে যায়। নোরার লম্বা চুল জলতরঙ্গের মতো রাহাতের সমস্ত মুখে ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র কিছুক্ষণ। এরপরই নোরা দু-হাতে তার মুখটা তুলে ধরে। ঝড়ের বেগে ঠোঁট চেপে ধরে রাহাতের ঠোঁটে। তৃষ্ণার্তের মতো তীব্র ভঙ্গিতে গভীর চুমু খায়। নিজেকে এতো হালকা ও নির্ভার লাগে রাহাতের, শিমুলের তুলোর মতো তার শরীরটা ভাসতে থাকে।

এভাবে কতক্ষণ কেটেছে, মনে নেই। রাহাতের শ^াস বন্ধ হয়ে আসে। দু-হাতে এমনভাবে জাপটে ধরেছে নোরা, নড়ার উপায় নেই।

কয়েক মুহূর্ত মাত্র। কিন্তু মুহূর্তটা স্বপ্নের মতো। সুন্দর। এক অপার্থিব আবেশে ডুবে যেতে যেতে রাহাত চোখ বন্ধ করে ফেলে।

আরো কিছু সময় কেটে যায়, নীরবে। কথাহীন। রাহাত ভারশূন্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একবার সে আকাশ দেখে, একবার নোরাকে।

‘আয় -’, দীর্ঘ সময় পর নোরা ডেকে ওঠে। রাহাত তবু দিশাহীন দাঁড়িয়ে থাকে। নোরা রাহাতের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে হলের সামনে আসে। রাহাত কাঁপা ঠোঁটে হাসে।

হলের সামনে ছেলেমেয়েদের ভিড় পাতলা হয়ে এসেছে। সময় শেষ বলে দারোয়ান হাঁকছে। গেট বন্ধ করে দেবে। 

নোরা বলল, ‘যাই।’

রাহাত মৃদু হেসে মাথা দোলায়।

‘ভালো থাকিস। যাই।’

নোরা আর দাঁড়ায় না।

রাহাতও ফেরার জন্য পা বাড়ায়। একবার পাশ ফিরে নোরাকে দেখে, আবার হাঁটতে শুরু করে।

পরদিন নোরার সঙ্গে রাহাতের দেখা হয় না। তার পরের দিনও নয়। সে নোরার ডিপার্টমেন্টে যায়। চাতক পাখির মতো তাকে খোঁজে। দেখা পায় না।

কয়েকদিন পর গ্রীষ্মের ছুটিতে বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর অপেক্ষা ও অভিমানে বহু বছর কেটে গেছে, নোরার সঙ্গে রাহাতের আর কখনো দেখা হয়নি।

ডাক্তার হয়তো কড়া কোনো ওষুধ দিয়েছেন। রাহাতের ঘুম ঘুম পায়। চোখদুটো বুজে আসে। কিন্তু সে টের পায়, মাথাটা সজাগ। স্মৃতি দ্রুত কাজ করতে থাকে।

তেরো বছর আগে বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হারিয়ে যাওয়া এ সেই নোরা। ফর্সা তো নয়ই, বরং শ্যামলা। কালোও বলা চলে। কিন্তু শ্যামলা মেয়ের মুখ ও চোখের আদল এতো মায়াবী হয়, সে দেখেনি।

রাহাত পড়তো ইতিহাসে দ্বিতীয় বর্ষ, নোরা ফাইনাল ইয়ার নৃবিজ্ঞান। এমনিতে সে বয়সে বড় আর কড়া মেজাজের। রাহাতকে একদমই পাত্তা দিত না। কিন্তু নোরার চরিত্রে কিছু একটা আকর্ষণ ছিল, অন্য মেয়েদের থেকে যা তাকে আলাদা করতে পেরেছিল। রাহাত ক্রমশ নোরার মায়ায় জড়িয়ে পড়ে।

শহীদুল্লাহ কলাভবনে ক্লাস শেষ হলেই সে ছুটে যায় রবীন্দ্র কলাভবনে। একবার যদি নোরাকে দেখা যায়। কথা না হোক, দূর থেকে চোখের দেখাটুকু তো হবে। দেখা হয়ে গেলে ডেকে চা-শিঙাড়াও খাওয়াতে পারে। মর্জি ভালো থাকলে নোরা রাহাতকে বিজ্ঞানভবনের পেছনে নিয়ে যায়। পাটিতে বসে কালাইয়ের গরম রুটির সঙ্গে শুকনা মরিচ-পেঁয়াজ-সরিষার তেলের ভর্তা খাওয়ায়।

কিন্তু বেশিরভাগ দিনই দেখা হতো না। ওর ক্লাস থাকতো, নয়তো রাহাতের। কিংবা সেদিন হয়তো নোরা ক্যাম্পাসেই আসেনি।

মাস্টার্সে ওঠার পর নোরা হলে থাকতে শুরু করে। আর তখনই ওর কাছে আসার সুযোগ হয় রাহাতের।

নোরার প্রতি রাহাতের অনুরাগ নিশ্চয়ই সে টের পেত। কিন্তু ধরা দিত না। বিকেলের রোদ নরম হয়ে এলে সে হয়তো ফোন করে বলল, ‘হলের সামনে আয়।’

ক্যাম্পাসের ভেতরে সাধারণত রিকশায় চড়তো না রাহাত। হেঁটেই চলাফেরা করতো। কিন্তু নোরা যখন ডাকতো, রিকশায় ছুটে যেতো। যদি দেরি হয়ে যায়। রাহাত হলের সামনে গিয়ে দেখে, নোরা দাঁড়িয়ে আছে। সে হাত নাড়ে। নোরা কাছে আসে। পরে সারা ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ায়।

মন্নুজান হল পেরিয়ে দুজন ইবলিশ চত্বরে এসে দাঁড়ায়। নোরা বলল, ‘চল, প্যারিস রোডে হাঁটি।’

প্যারিস রোডের অদ্ভুত কোনো মায়া আছে। একা একা হাঁটতেও ভালো লাগে। সঙ্গে প্রিয় কেউ থাকলে ভালো লাগাটা বেড়ে যায়। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে ক্ষুধা পায়। ওরা সেন্ট্রাল লাইব্রেরির পেছনে চলে আসে। তখন পাঁচ টাকায় সুস্বাদু চটপটি পাওয়া যেত। রাহাত গপগপ করে খায়।

হাঁটতে হাঁটতে দুজনে কখনো শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায় এসে বসে। আবার হাঁটে। ছিলছিলায় ভালো মিষ্টি ও নিমকি পাওয়া যায়। নোরা অতোটা খেতে চায় না। কোনো কোনোদিন ওরা বিজ্ঞানভবনের সামনে দিয়ে হাঁটে। স্টেডিয়ামের পোস্ট অফিসের সামনে দিয়ে হেঁটে স্টেশনের  ওদিকটায় যায়। চারুকলায় ঘুরে বেড়ায়। কখনো রেললাইন ধরে হাঁটে। ভদ্রার ওদিক থেকে রোকেয়া হলের পেছন দিকে একটা ঢোকার পথ আছে, সন্ধ্যা নেমে গেলে ওইপথে ঢুকে পড়ে। এ-সময় নোরার হাতটা সে নিজের হাতে নেওয়ার সুযোগ পায়।

রিকশায় চেপে কোনো কোনোদিন দুজনে সাহেববাজার আরডিএ মার্কেটে যায়। কখনো নিউমার্কেটে। নোরাই তাকে সঙ্গে নিয়ে যায়। সেই প্রথম কোনো মেয়ের সঙ্গে রাহাতের রিকশায় এতোটা পথ যাওয়া।

নোরার সঙ্গে রাহাতের প্রেম হয়ে গেছে, ব্যাপারটা এমন নয়। প্রেম-ট্রেম নিয়ে নোরার মুখে কোনোদিন সে কোনো কথা শোনেনি। তবু একা নিজের কাছে ফুলগন্ধের মতো, জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলোর মতো একটাই আনন্দ রাহাতের। সেই আনন্দের নাম নোরা।

কী যে সুন্দর দিনগুলো কাটছিল। 

ছুটির দিনের দুপুরবেলায় নোরা ফোন করতো – ‘দুটোর সময় হলের সামনে আসিস। একসঙ্গে খাব।’

পুকুরপাড়ে গাছের ছায়ায় বসে গরম খিচুড়ি, বেগুন ভাজা আর ডিম ভুনা। নোরা কী যে ভালো রাঁধতো। খেতে খেতে ওকে মন ভরে দেখতো রাহাত। নোরা বলতো, ‘এই, কী দেখিস? খা।’

সেই নোরা। তার মুখ রাহাত প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। স্মৃতিও ঝাপসা হয়ে এসেছিল। এতোদিন পর সে উল্কার মতো উদয় হলো।

নোরা প্রায় নিয়মিত হাসপাতালে আসে। অনেকক্ষণ থাকে। গল্প করে। কখনো বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসে। ডাক্তারের সেবা ও পথ্যের চেয়ে নোরার উপস্থিতি রাহাতকে বেশি উপশম দেয়।

কিন্তু একটা দুশ্চিন্তা থেকে যায়। মুনিয়া কি এসবের কিছুই টের পায়নি? সে তো বাতাসেও সন্দেহ করার উপকরণ পায়।

আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিল।

হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে রাহাত হাতিরপুলের বাসায় আসে। আবারো সেই গ্যাঁড়াকল। ভাবতেই বুক ঢিপঢিপ করে। হাতিরপুলে কোনো হাতি নেই। কোনো একসময় হয়তো ছিল। রাহাতের স্ত্রী মুনিয়ার ওজন পঞ্চান্নর বেশি নয় কিছুতেই, কিন্তু মাঝে মাঝে তার কথা ও ব্যবহারে মনে হয়, হাতির চেয়েও ওর ভার বেশি।

দুর্ঘটনার খবর শুনে গ্রাম থেকে রাহাতের মা ও ছোট  বোন এসেছে। ভার ও চাপ কিছুটা হালকা হয়েছে। মা ও বোন সারাক্ষণ পাশে আছে। গল্প করছে। মুনিয়া অফিস করে বলে সময় পায় না। বেচারারই বা কী দোষ। সারাদিন খেটে মরছে। বাসায় ফিরে ক্লান্ত থাকে। ঘরে কোনো সন্তান নেই। সেজন্যই হয়তো মুনিয়ার মেজাজ দিনে দিনে রুক্ষ ও সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠেছে।

রোববার সকালে ঘুম ভাঙার পর শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগে। অসুস্থতার বোধ একদমই নেই। ডাক্তার প্লাস্টার খুলে দিয়েছে। রাহাত মৃদু পায়ে অল্প হাঁটতে পারে। নিজেকে প্রাণবন্ত লাগে। ডাক্তার বলেছেন, বাসায় থেকে কিছুদিন বিশ্রাম নিতে।

মুনিয়া অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর নোরা আসে। এতো সকালেও সে শাড়ি পরেছে। কী যে সুন্দর ও মায়াবতী লাগছে নোরাকে। রাহাত তাকিয়ে থাকে। নোরাকে দেখে। আর একবার দেখে। মনে হয়, এই প্রথম ওকে দেখছে।

নোরা এগিয়ে এসে রাহাতের বুকঘেঁষে দাঁড়ায়।

সাঁতার না-জানা মানুষ গভীর জলে ডুবে যেতে যেতে একটা কথাই ভাবে, কীভাবে বেঁচে ওঠা যায়। রাহাতের কী যে হয়, সে ভাবে, ‘নোরা ছাড়া আমার সামনে আর কিছু নেই।’ থাকলেও সে দেখতে পায় না। ঘরে বিয়ে করা বউ, চাকরি ও গ্লানিভরা জীবন; কিছুই সে ভাবতে চায় না।

সোফায় বসে নোরা বলল, ‘তুমি কি চা খাবে?’

‘তুমি বানাবে?’

সে মাথা দোলায়।

ছোট বোন নোরাকে পায়েস এনে দেয়। জিজ্ঞেস করে, ‘ভালো আছেন?’

নোরা মিষ্টি করে হাসে।

ছোট বোন অন্য ঘরে চলে যায়। চায়ে চুমুক দিয়ে রাহাত লজ্জা পাওয়া ভঙ্গিতে বলে, ‘তোমার একটা জিনিস আছে আমার কাছে।’

‘আমার! কী জিনিস?’ নোরা বিস্ফারিত চোখে তাকায়।

‘অনেক বছর হলো জিনিসটা আগলে রেখেছি।’

‘দাও’ – বলেই নোরা হাত বাড়ায়।

‘রাগ করবে না তো?’

‘একদম না।’

‘একটু অপেক্ষা করো’ বলে রাহাত পাশের ঘরে যায়। পুরনো ট্রাংক থেকে একটা কৌটো বের করে নিয়ে আসে। নোরার হাতে তুলে দেয়।

নোরা বলল, ‘জিনিসটা তো খুব সুন্দর। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে বেশ পুরনো।’

‘তাই তো হওয়ার কথা।’

নোরা অবুঝের মতো বলল, ‘মানে?’

চা শেষ করে কাপটা রেখে দিতে দিতে রাহাত বলে, ‘আমরা যখন অনার্স ফাইনাল ইয়ার শেষ করলাম, বিশ^বিদ্যালয় থেকে ডিপার্টমেন্টের ট্যুরে কক্সবাজারে গিয়েছিলাম। এটা তখন কেনা। তোমাকে দেওয়া সম্ভব হবে কি না, দিলেও তুমি গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধায় ভুগেছি। কিন্তু ইচ্ছেটা ছিল।’

নোরা মিষ্টি করে হাসে – ‘এতোদিন আগের জিনিস তুমি কীভাবে জমিয়ে রাখলে? হারিয়ে যায়নি?’

‘সারাজীবনে আমি যত চিঠি পেয়েছি, কোনোটাই হারায়নি। যত্ন করে রেখে দিয়েছি। চিঠির ওই বাক্সের ভেতরে উপহারটি রাখা ছিল। সত্যি বলতে, জিনিসটার কথা ভুলেও গিয়েছিলাম। তুমি যেদিন প্রথম হাসপাতালে আমাকে দেখতে এলে, ‘হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর মতো’ ওটার কথা মনে পড়লো।’

নোরা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে হাসে। উপহারের কৌটোটি বুকে চেপে ধরে।

নোরার জীবন নিয়ে ঢের কৌতূহল হয় রাহাতের। তবু কী এক আড়ষ্টতায় কিছুই জানতে চায় না। একবার কেবল শুধায়, ‘কোথায় থাকো তুমি?’

‘মায়ের সঙ্গে। ধানমন্ডিতে।’ নোরার সংক্ষিপ্ত উত্তর। 

নোরা কি বিবাহিত? রাহাত জানে না। ওর চোখ, ঠোঁট ও শরীরের বাঁক দেখে কিছু অনুমান করতে পারে না। আবার এ-কথা সত্যি, সে এসব ভাবতেও চায় না।

বাসায় থাকতে থাকতে একঘেয়েমি লাগে রাহাতের। বই পড়ে, টিভি দেখে, ফেসবুকিং করে কতটা সময়ই বা কাটানো যায়। বন্ধু ও সহকর্মীরা ব্যস্ত। ছুটির দিন ছাড়া কেউ অবসর পায় না। আরো কতদিন ঘরে থাকতে হবে, ভেবে অস্থির লাগে।

কোনো কোনোদিন নোরা আসে। রাহাতের জন্য গিফট বা খাবার নিয়ে আসে। সারাদিন থাকে। রাহাতকে সঙ্গ দেয়। গল্প করে। কখনো মা এসে পাশে বসেন। চমৎকার সময় কাটে। কিন্তু কোথাও একটা গোলমাল টের পায় রাহাত। গোলমালটা রাহাতের বুকে নাকি সংসারে, বুঝে উঠতে পারে না। এটা স্পষ্ট বোঝে, নোরা এলে তার সঙ্গে একটা-দুটো কথা বলে বটে, কিন্তু তার উপস্থিতি মুনিয়া সহ্য করতে পারে না।

বিকেলের দিকে নোরার কাঁধে ভর দিয়ে রাহাত বাথরুমে যায়। নোরা এক হাত রাহাতের পিঠে আরেকটি হাত বুকে রেখেছে। অফিস থেকে ফিরে মুনিয়া সেই দৃশ্যটা দেখে। নোরা ও মুনিয়ার চোখাচোখি হয়। রাহাত জানতেও পারে না।

সন্ধ্যায় নোরা চলে যায়।

মুনিয়া ঝড়ের বেগে রাহাতের মুখের সামনে এসে দাঁড়ায়। চিবিয়ে চিবিয়ে কীসব কথা বলে, রাহাত বুঝতে পারে না। একটু পরে সে আবার তেড়ে আসে। আবার। রাগে তার ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠেছে। চোখ রক্তবর্ণ। রাহাত এটুকু বুঝতে পারে, মুনিয়া খুব রাগ করেছে। রাগ ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে সে রাহাতের হাত ধরে। টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে। এবার ভেতর থেকে মুনিয়া দরজা বন্ধ করে দেয়। রাহাত বন্ধ দরজার সামনে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

কিছু একটা আন্দাজ করে মা ও বোন বেরিয়ে আসে। রাহাতকে পাশের ঘরে নিয়ে যায়।

একসময়, তখন রাত দশটা বাজে, মুনিয়া দরজা খোলে। রাহাত স্বস্তির নিশ^াস নিতে নিতেও শ^াস বন্ধ করে ফেলে।

দুটো বড় ব্যাগ গুছিয়ে মুনিয়া বেরিয়ে আসে। রাহাত কাছে এগিয়ে যায়, ‘এতো রাতে কোথায় যাচ্ছ?’

মুনিয়া প্রায় হুংকার ছাড়ে – ‘খবরদার, আমার কাছে আসবে না।’

এরপর কিছু বলার আর সুযোগ দেয় না মুনিয়া। ব্যাগ টানতে টানতে বেরিয়ে যায়। সে কোথায় গেল, কেন গেল, বলেও যায় না।

রাতে একা আরো অসহায় লাগে রাহাতের। ঘুমাতে দেরি হয়। এমনিতে ঘুমের কোনো সমস্যা নেই। সে বই পড়ে। নানা কথা ভাবে। বিশেষ করে মুনিয়ার কথা। এমন অভিমানী মেয়েটা, তাকে কিছু বোঝানো যায় না। এসব ভেবে তার শ^াস ঘন, কখনো মৃদু হয়ে আসে।

মুনিয়া ওর মা-বাবার সঙ্গে আছে। খুব একটা সাড়া দেয় না। ফোন করে না। ফোন করলেও সে ফোন তোলে না।

কী হয়েছে মুনিয়ার? রাহাতের ওপর রাগ? সন্দেহ? ক্ষোভ?

গতরাতে মুনিয়াকে নিয়ে চমৎকার একটা স্বপ্ন দেখেছে রাহাত। সম্পর্কটা আগের মতো থাকলে মুনিয়া কৌতূহলভরে জানতে চাইতো, ‘এই এই, স্বপ্নে তুমি কী দেখলে, বলো না?’

আজ মুনিয়ার কোনো সাড়া নেই। স্বপ্নের কথাও তাই তাকে বলা হয় না।

রাহাতের একবার মনে হয়, মুনিয়াকে নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যাবে। ভরা পূর্ণিমা সামনে রেখে পাহাড়ে, নয়তো সমুদ্রে যাবে। মুনিয়া নিশ্চয়ই খুশি হবে। সে যে-ধরনের মেয়ে, খুশি নাও হতে পারে। ভাবে রাহাত। যদি খুশি হয়, কথা ও ভাবনার মাঝখানে, যখন দুজনেরই মন প্রশান্ত, এমন কোনো মুহূর্তে মুনিয়ার হাত ধরবে রাহাত। মুনিয়াকে গভীর আবেশে দেখবে। বুকে জড়িয়ে নেবে। বোঝাবে, ‘দেখো বউ, আমাকে তুমি যেমন করে ভাবো, আমি তা নই। এসো, আমরা জীবন ও সংসারটা নতুন করে সাজিয়ে তুলি। পুরনো দুঃখ ও অভিমান ভুলে যাই। ভালোবেসে আরো আপন হয়ে উঠি। একজীবন আমি কেবল তোমার সঙ্গেই কাটিয়ে দিতে চাই, মুনিয়া।’

কী হতে পারে মুনিয়ার প্রতিক্রিয়া?

সে একবার রাহাতের চোখে তাকিয়েই তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবে? চোখভরা জল নিয়ে আরো শক্ত করে রাহাতকে বুকে আঁকড়ে ধরবে? আকুল হয়ে কাঁদবে?

সারারাত একা বিছানায় এসব ভেবে ভেবে সারা হয়, কিন্তু কোনো আশা রাহাত খুঁজে পায় না।

সকালে ডোরবেলটা বেজে উঠলো। তখনো ভালো করে ঘুম ভাঙেনি রাহাতের। ছোট বোনটা গ্রামের বাড়িতে গেছে। মা রান্না করছে। এতো সকালে কে আসতে পারে? ঘুমচোখে রাহাতকেই উঠতে হলো।

দরজা খুলে অচেনা লোক দেখে রাহাত চোখ ছোট করে তাকায়। লোকটা মৃদু হাসে – ‘স্যার, আমি সুন্দরবন কুরিয়ার থেকে এসেছি।’ সে রাহাতকে একটা খাম ধরিয়ে দেয়। সই করতে বলে।

চিঠিটা নিয়ে দরজা বন্ধ করে রাহাত আবার বিছানায় এসে বসে। খাম না ছিঁড়েও সে বুঝতে পারে ঠিকানাটা কার হাতের লেখা। মুনিয়া আমাকে চিঠি লিখেছে? ভেবে রাহাত দিশেহারা বোধ করে। কোনো ফোন নয়, টেক্সট নয়, সরাসরি চিঠি?

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সে খামটা খুলে চোখের সামনে মেলে ধরে। ডিভোর্স লেটার।

নতুন করে তর্ক ও ঝগড়ায় আর নামেনি মুনিয়া। সে সরাসরি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ডিভোর্স লেটারটা হাতে নিয়ে রাহাত থম ধরে বিছানায় বসে থাকে। এতো নিঃশব্দে এমন একটা ঘটনা ঘটে যেতে পারলো? আশ্চর্য, কেউ টেরও পেল না।

রান্নাঘরে ঝপাত করে কিছু একটা পতনের শব্দ হলো। রাহাত কান খাড়া করলো ঠিকই, কিন্তু গা করলো না। ঋষির মতো বসে রইলো।

কিছুক্ষণ পর বিছানা ছেড়ে রাহাত জানালার কাছে যায়। এই সকালেও শ্রাবণের আকাশে ধূসর-কালো মেঘ জমেছে। বাতাসে জলের আভাস। হয়তো বৃষ্টি নামবে।

বাসার নিচে রিকশা ও মানুষের স্বাভাবিক ব্যস্ততা। হঠাৎ সে খেয়াল করলো গলির মোড়ে নোরা রিকশা থেকে নামছে। আজো নোরা শাড়ি পরেছে। ওর হাতে রজনীগন্ধার গুচ্ছ। সে কি এই পথে কোথাও যাচ্ছে, নাকি রাহাতের বাসায়ই আসবে?

জানালা থেকে চোখ সরিয়ে রাহাত আলগোছে একবার বুকে হাত রাখে। কেমন ব্যথার মতো লাগে। কিন্তু সারা শরীরে ফাল্গুনের সকালের অনুভূতি। একবার তার মনে হয়, চোখ ও মনের ব্যথাভার ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে খোলামাঠে দৌড়াতে শুরু করে। বৃষ্টিটা নামার আগে এখনই কি সে বেরিয়ে পড়বে? মনের মতিগতি ঠিক কী, নিজেই সে বুঝতে পারে না। আকাশের সিঁড়ি বেয়ে তিরতিরিয়ে বৃষ্টি নামলো।

Leave a Reply