এগারো
চৈত্রসংক্রান্তির দিন বিশাল মেলা বসে কালীর মাঠে।
কত আনন্দের উপকরণ সেই মেলায়। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, বায়োস্কোপের বাক্স আর মাটির তৈরি হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ভালুক সাজিয়ে মাঠে বসে থাকত বিক্রেতারা। গ্রাম এলাকার কুমোরেরা নিয়ে আসত হাঁড়িকুড়ি আর নিত্যদিনের গৃহস্থ নারীর প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। কামাররা আনতো দা-কাস্তে, কোদাল-কুড়াল, গরু কোরবানি দেওয়ার ছুরি এসব। ময়রারা আনত নানা রকমের মিষ্টি। রসগোল্লা, লালমোহন, চিনির বালুসাই আর আমৃত্তি। গরম গরম আমৃত্তি ভাজাও হতো ওই মেলাতেই। ইসবগুল আর তোকমাদানার নানা রঙের শরবত বিক্রি হতো। বিন্নি ধানের খই আর গুড়ের বাতাসা, মুড়ি-মুড়কি, নিমকি আর কত রকমের তেলে ভাজা! গরুদৌড়ের প্রতিযোগিতা হচ্ছে পদ্মতীরের বালিয়াড়িতে। ঘুড়ির কাটাকুটি খেলা হচ্ছে।
এই মেলাকে গ্রামের ভাষায় বলে ‘গলুইয়া’। কেন বলে তার একটা ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। নদীমাতৃক গ্রামবাংলায় দীর্ঘ বর্ষার কালে গ্রাম গৃহস্থের প্রয়োজনীয় তৈজসপত্রের জন্য তেল-নুন আর গুড়-চিনির জন্য নৌকা বোঝাই করে ব্যাপারীরা একত্রিত হতো কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায়। সেই সব নৌকার এক গলুইয়ের সঙ্গে আরেক গলুই ঠেকিয়ে মেলা বা বাজারের মতো আবহ তৈরি করা হতো। গ্রামগৃহস্থেরা ডিঙি নাও, কোষা নাও নিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় মালসামান কিনতে আসতো। হয়তো ওই ‘গলুই’ থেকে শব্দটি ‘গলুইয়া’ হয়েছে।
দরবেশ খাঁ কালীর মাঠে গিয়ে উদাস ভঙ্গিতে সিগ্রেট টানতে টানতে গলুইয়া দেখতেন। মানুষ দেখতেন। লক্ষ করতেন মানুষের আচার-আচরণ।
নিজের আধ্যাত্মিক জীবন নিয়ে দরবেশ খাঁ কখনো মুখ ফুটে কিছু বলতেন না। তবে তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন যে অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল তা বোঝা যাবে পরবর্তী জীবনে। যখন তিনি প্রতি শুক্রবার বিকেলে, জুমার নামাজ শেষে আসরের নামাজের আগে আগে, উঠোনের আমগাছটির তলায় নিজের চেয়ারে এসে বসবেন। আর তাঁর সামনে এসে বসবে চারদিককার গ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষ। যখন তিনি আল্লাহর রাসুলের প্রিয়তম নবীজী (সা.)-এর জীবনের নানা বিষয় নিয়ে ভক্তদের বলবেন। সপ্তাহের ওই একটি দিন তিনি এক-দেড় ঘণ্টা আল্লাহর রাসূলের (সা.) কথা বয়ান করে যাবেন। ধর্মপ্রাণ মানুষেরা মুগ্ধ হয়ে তাঁর কথা শুনবে। কেউ কেউ গভীর আবেগে কাঁদতে থাকবে। দরবেশ খাঁয়ের নিজের চোখেও পানি আসবে প্রায়ই। শরীরে জড়ানো নীল মার্কিন কাপড়ের কোনা দিয়ে তিনি চোখের পানি মুছবেন আর কথা বলবেন মধুর স্বরে। ভাষায় বিক্রমপুরের আঞ্চলিকতা থাকবে না। তাঁর বয়ানে মনে হবে যেন, মূল কোনো ধর্মগ্রন্থে লিখিত থাকা অংশ মধুর স্বর আর উচ্চারণে পাঠ করে যাচ্ছেন এক মহাপুরুষ।
ছেলেবেলা থেকেই তিনি সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। বড় হতে হতে এ-রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। নৈকট্যলাভের চেষ্টা করেছেন মহান সৃষ্টিকর্তার। লেখাপড়া শেষ করে পরম করুণাময়ের সান্নিধ্য লাভের আশায় বেরিয়ে পড়েছিলেন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আর বছরের পর বছর আপনমনে ঘুরে বেরিয়েছেন বনজঙ্গল, পাহাড়-পর্বত আর নির্জনে। জনমানবশূন্য হিমালয়ের গুহায় গভীর ধ্যানে মগ্ন থেকেছেন।
একটানা বারোটি বছর হিমালয়ে কাটিয়েছেন এই মহাপুরুষ। নিশ্চয়ই তখন তাঁর সঙ্গী ছিল সেই অশরীরী সহচর। নয়তো তাঁর বেঁচে থাকার উপকরণ, ক্ষুধাতৃষ্ণা নিবারণের ব্যবস্থা কেমন করে হয়েছিল? সেই নির্জনবাসের দিনগুলোতে নিশ্চয়ই বহু অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে তাঁর জীবনে। সেইসব ঘটনার কথা তিনি কখনোই কাউকে জানতে দেননি। ওসব বিষয়ে একটি শব্দও প্রকাশ করেননি।
দরবেশ খাঁ গান-কবিতা রচনা করতেন। সেইসব রচনা ধর্মভিত্তিক। আধ্যাত্মিক ভাবনায় ভরে থাকতো। আধ্যাত্মিক তথ্য, ধর্মীয় রীতিনীতি, মানবপ্রেম, স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য প্রকাশই ছিল তাঁর রচনার মূলমন্ত্র। এসব রচনা সাধারণ মানুষের চিত্তবিনোদনের জন্য নয়। তিনি তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে মানুষের চিত্তশুদ্ধির কাজ করেছেন। মানুষকে শুদ্ধ পথে চলার, পরম করুণাময়ের নির্দেশিত পথে চলার, নবীজী (সা.)-এর জীবনকে অনুসরণ করার পথ নির্দেশ করেছেন। তাঁর রচনার সংখ্যা কম, তবে ওইটুকু সাহিত্যকর্মের মধ্যে আছে বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের ইঙ্গিত। তাঁর রচনাশৈলী, শব্দপ্রয়োগ, বাক্যবিন্যাস ইত্যাদি ব্যাপক অর্থবহ।
দরবেশ খাঁয়ের জীবন অবসান হবে তাঁর বয়স যখন নব্বইয়ের কোঠায়। দিনটি পহেলা বৈশাখ, ১৩৯০ সন, শুক্রবার। তখন শেষ রজনী। সুবেহ সাদেক। ইংরেজি ১৯৮৩ সাল। হিজরি পহেলা রজব। তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবেন ভোর চারটা একুশ মিনিটে। এই মনীষী ঠিকই দেহত্যাগ করবেন, কিন্তু রয়ে যাবেন অগণিত ভক্তের হৃদয়ে। তিনি বলতেন, ‘যতক্ষণ মানুষের দেহে প্রাণ থাকে ততক্ষণ তার উচিত অস্ফুটস্বরে আল্লাহর জিকির করা।’ আল্লাহপাকের জিকির করতে করতেই তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করবেন।
দরবেশ খাঁয়ের শেষ রচনায় ছিল মৃত্যুর ইঙ্গিত।
দিন যাবে
কেটে যাবে
সন্ধ্যা সমাগম;
আয়ুর সূর্য
অস্ত যাবে
ডাকবে এসে যম।
দরবেশ খাঁয়ের প্রচুর ভক্ত ছিল কলিকাতায়। ওরকম এক ভক্তের বাড়িতে তাঁর জন্য সংরক্ষিত আসন ছিল। সেই আসনের পাশে তাঁর ব্যক্তিগত লাঠিখানি থাকত। দেয়ালে টাঙানো থাকত জনৈক শিল্পীর হাতে আঁকা দরবেশ খাঁয়ের প্রতিকৃতি। পরনে সেই নীল মার্কিন। বুক ছাড়িয়ে নেমেছে পাকা দাড়ি। মাথার ঘনচুল তখনো বেশ কালো। তাঁর পায়ে বইলাঅলা খড়ম। ওই ছবিতে তাঁর উজ্জ্বল চোখ দুখানা লক্ষ করার মতো। যেন ওই চোখ দিয়ে তিনি চলমান জগৎ দেখছেন না, দেখছেন এক অলৌকিক জগৎ।
জীবন অবসানের পর দরবেশ খাঁয়ের কবর হবে বাড়ির আঙিনায়। মায়ের কবরের পাশে। তিনি পিতলের একটি বদনা ব্যবহার করতেন অজুর জন্য।
শেষজীবনে আর কাঠের খড়ম ব্যবহার করবেন না। ষাটের দশকেই পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিল স্পঞ্জের স্যান্ডেল। তিনি সেই স্যান্ডেল ব্যবহার করবেন। তাঁর ব্যবহৃত চশমা, লেখার দোয়াত-কলম-কাগজ, চা পান করতেন মাঝে মাঝে, সেই চায়ের কাপ-পিরিচ সবই সংরক্ষণ করা হবে। সব সময় তাঁর হাতের কাছে থাকত মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআন শরিফ। সেই কোরআন শরিফটিও সংরক্ষণ করা হবে। তাঁর ইট-সিমেন্টে বাঁধানো রওজা শরিফ হবে। সুন্দর গিলাফ হবে রওজা শরিফের। দিনমান সেখানে জ্বলবে আগরবাতি। গোলাপপানি ছিটিয়ে দেবে ভক্তরা। আগরবাতি আর গোলাপপানির পবিত্র গন্ধে দরবেশ খাঁয়ের বাড়ির হাওয়া মগ্ন হয়ে থাকবে। তাঁর পবিত্র রওজা শরিফে লেখা থাকবে ‘অলিয়ে কামেল, মোর্শেদ মোকাম্মেল, মুশকিল কোশা, ফানাফিল্লাহ্ বাকাবিল্লাহ্ আলহাজ শাহ্ সুফি হজরত দরবেশ মোস্তফা খাঁ আল্-কাদেরী (র.)।’
মানুষ সম্পর্কে তিনি লিখে যাবেন – ‘মানুষের মাথা হইতে পা পর্য্যন্ত যতখানি লম্বা দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুলীর অগ্রভাগ হইতে বাঁ হস্তের অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্য্যন্ত ততখানি পাশ। সুতরাং মানুষের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান সমান। অর্থাৎ মানুষ দৈর্ঘ্যওে যতটুকু প্রস্থেও ততটুকু।
দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যাহার সমান সেই বস্তু গোলাকার। সুতরাং সেই বস্তুই বিন্দু। বিন্দু যত সূক্ষ্ম হয় ততই ভালো। কাজেই যেখানে কিছুই নাই, সেখানে বিন্দু আছে। অর্থাৎ শূন্য আছে।
অতএব মানুষই বিন্দু রূপে সর্বত্র বিদ্যমান। অর্থাৎ বিন্দুই মানব রূপ, সন্দেহ নাই।
নারী ও নর উভয়ই মানুষ। এখন দেখিতে হইবে যে, নারী হইতেই নর, না নর হইতেই নারী উৎপন্ন হইয়াছে।
যদি নর হইতে নারীর উৎপত্তি হইত তবে নরের মধ্যে নারীর চিহ্ন অঙ্কিত থাকিত। কিন্তু নরের মধ্যে নারীর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। কিন্তু নারী হইতে যে নর বহির্গত হইয়া আসিয়াছে তাহার চিহ্ন স্পষ্টভাবেই নারীর মধ্যে বিদ্যমান রহিয়াছে। নারীর সেই চিহ্ন যোনি।
নারীর এই যোনিদ্বার হইতে পুংলিঙ্গ রূপ ছুঁত হওয়াতেই স্ত্রী যোনির সৃষ্টি হইয়াছে।
সুতরাং নারী হইতেই নরের উৎপত্তি হইয়াছে সন্দেহ নাই। নর হইতে নারী কখনোই নহে। তাই আর্য্যগণ দেবতা পূজার প্রথমেই লিঙ্গ পূজা করিতেন এবং অদ্যাবধি হিন্দুগণ পুংলিঙ্গকেই শিব বলিয়া পূজা করিতেছেন।
* মাতৃগর্ভেও বিন্দুই নিপতিত হয়। সেই বিন্দু ক্রমশ বৃহত্তর হইয়া মানব রূপ ধারণ করিয়া থাকে।
ভৌতিক বলিয়া এই বিন্দু চক্ষে দৃষ্ট হয় না। কিন্তু জ্যোর্তিময় বিন্দু সর্বত্র বিরাজমান, তাহা জ্ঞান চক্ষু ব্যতীত ভৌতিক চক্ষে দেখা যায় না।
বিন্দু হইতে বায়ুর সৃষ্টি; বায়ু হইতে অনলের উৎপত্তি; অনল জলের ব্যুৎপত্তি; জল হইতে ক্ষিতি স্থিতি; পঞ্চ ভূতের সমষ্টি জীবদেহের সৃষ্টি।’
আষাঢ় মাসের শেষ শুক্রবার। সকালবেলা ঝকঝকে রোদ ছিল। তারপরই তুমুল বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল জুমার নামাজের আগে আগে। দুপুরবেলার প্রখর রোদে ভরে গেল চারদিক। বেশ গরম লাগছিল। খাঁ সাহেব গোসল করে জুমা আদায় করতে গেলেন মসজিদে। পাড়ার মসজিদঘর একটু দূরে। যেতে হয় নৌকায়। আবু নৌকায় করে নিয়ে গিয়েছিল।
খাঁ বাড়ির বহু পুরনো লোক আবু। তার বউয়ের নাম রাহিমা। কালো কুচকুচে গায়ের রং। স্বাস্থ্যবতী, শক্তপোক্ত মহিলা। একা তিন মানুষের কাজ করে। একাই সামলায় খাঁ বাড়ি। আবু একটু নরম নিরীহ ধরনের মানুষ। তবে সেও খুব কর্মঠ। খাঁ সাহেবের দেখাশোনা থেকে শুরু করে তাঁর টাকা-পয়সার হিসাব আর তাঁর খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে সিগ্রেট কিনে আনা ইত্যাদি সবই আবু করে।
একটা মাত্র মেয়ে তাদের। নাম পরিবানু। আশ্চর্যজনকভাবে মেয়েটি তার মা-বাবার কারো গায়ের রংই পায়নি। সে হয়েছে অনেকটা তার নামের মতো। পরি। দরবেশ বাড়িতে জন্মেছে বলে চিঠিপত্র লিখতে শিখেছে। কোরআন শরিফ পড়তে শিখেছে। কিশোরী বয়স থেকেই নামাজ-রোজা শুরু করেছে এই বাড়ির ছেলেমেয়েদের মতোই।
ষোলো বছর বয়সে পরির বিয়ে হয়ে গেল দয়হাটা গ্রামে। স্বামী কফিলউদ্দিন নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। চাষের জায়গাজমি আছে কিছু। ওই থেকে মোটামুটি আয় হয়। ক্ষেতের ধানেই তাদের সারা বছরের চালের ব্যবস্থা হয়। মা-বাবা আর দুই ভাই দুই বোনের সংসারে সে বড়। মজিদপুর বাজারে তার একটা মুদিদোকান আছে। সেই দোকানের আয়ও ভালো।
পরি খুবই ভাগ্যবতী মেয়ে। পরির সঙ্গে কফিলের বিয়ের পরপরই তার উন্নতি হতে লাগল। ছোট দুই ভাইকে দুটো মুদিদোকান করে দিলো সে। একটা নিমতলি বাজারে আর একটা ষোলঘর বাজারে। বোন দুটোর বিয়ে দিলো প্রথমে। তারপর দু-ভাইকেও বিয়ে করালো। জমজমাট সংসার হয়ে উঠল।
সুখ-শান্তির কমতি নেই সেই সংসারে।
পরির নিজেরও পরপর দুটো ছেলে হলো। একজনের নাম টুকু, আরেকজনের নাম টেপু। স্বামী আর দুই ছেলে নিয়ে প্রতি বর্ষায় মা-বাবার বাড়িতে নাইয়র আসে পরি। বড় বড় ফজলি আম আনে অনেক। বড় বড় কাঁঠাল আনে তিন-চারটা। আনারস আনে। সাত-দশদিন এই বাড়িতে থেকে তারপর ফিরে যায় নিজের সংসারে।
খাঁ বাড়িকেই নিজের বাড়ি মনে করে আবু আর রাহিমা। এই বাড়িতে জন্মেছে বলে পরিও মনে করে খাঁ বাড়িই তাদের বাড়ি। যদিও তারা বিক্রমপুরের লোকই নয়। বাড়ি ছিল ফরিদপুরের ভাঙ্গায়। পদ্মায় ভাঙন লাগে প্রতিবছরই। এপারে ভাঙে বিক্রমপুর, ওপারে ভাঙে ফরিদপুর, গোয়ালন্দ এইসব এলাকা। আবুদের পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছিল বহু বছর আগে। নদীভাঙনে মানুষ একেবারেই নিঃস্ব হয়ে যায়। কিছুই থাকে না তাদের। জায়গাজমি বাড়িঘর সবই যায়। কেউ কেউ খুব চেষ্টা করে রাতারাতি ঘর সরানোর। কেউ কেউ পারে, কেউ কেউ পারে না। যারা পারে না তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও থাকে না।
এই অবস্থা হয়েছিল আবুদের সংসারে। তিন ভাইয়ের সংসার ছিল। বাবা ছিল না, ছিল শুধু মা। ঘর-দুয়ার ছিল, গরু-বাছুর ছিল। চাষের জমিও ছিল ভালোই। সব গেল পদ্মায়। আবু ছিল মেজো। মাত্র বিয়ে করেছে। এক পাড়াতেই শ^শুরবাড়ি। তারাও নিঃস্ব হয়ে গেল। নদীভাঙা মানুষের আর একত্রে থাকা হয় না। বেঁচে থাকার আশায় একেকজন চলে যায় একেক দিকে। আবুরা তিন ভাইও চলে গিয়েছিল তিনদিকে। আবু চলে এলো বিক্রমপুরের সোনাদিঘি গ্রামে। বড় ভাই চলে গেল ফরিদপুরের দিকে। ছোটটা গিয়ে কাজ নিল গোয়ালন্দের স্টিমার ঘাটে।
আবু তার মাকে খুব ভালোবাসতো। মা আর বউয়ের হাত ধরে সে এসে উঠেছিল সোনাদিঘি গ্রামের খাঁ বাড়িতে। সেই বাড়িতেই আশ্রয় হয়েছিল। মা মারা গেল বছর দুয়েক পর। যে-বছর মা গেল, সে-বছরই আরেকজন এলো সংসারে। তার নাম পরিবানু। আবু আর রাহিমার মেয়ে।
এই বাড়িতে আসার পর থেকেই বাড়ির ছোট ছেলেটি গোলাম মোস্তফা খাঁকে খুবই ভালো লেগেছিল আবুর। তার চেয়ে বছর সাত-আটেকের বড় হবেন। মানুষটি সংসারের অন্য দশজন মানুষের মতো নয়। বিশাল বাড়িটিতে তার আরো তিনজন ভাই আছেন। মা-বাবা আছেন। চার বোনের সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। বোনদের মধ্যে বড়টি বিধবা। তিনি তাঁর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়িতেই থাকেন। বাড়িভর্তি মানুষজন। খাঁ সাহেব তখন কলিকাতায় পড়াশোনা করেন। ছুটিছাটায় গ্রামের বাড়িতে আসেন। তাঁর দেখভালের দায়িত্ব আবুর ওপর।
এভাবেই দিনে দিনে আবু হয়ে উঠল খাঁ সাহেবের একান্ত লোক। নিয়ামত খাঁ বেঁচে থাকা অবস্থাতেই জায়গাজমি বাড়িঘর সবই ছেলেমেয়ের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়েছিলেন। গোলাম মোস্তফা খাঁও কম জায়গা-সম্পত্তির মালিক হলেন না। তাঁর ভাগে দুটো ঘর পড়ল। পড়ল বিশাল বাড়িটির অনেকখানি অংশ। সেই অংশটি বাড়ির বাইরের দিককার। বাড়িতে এলেই তিনি তাঁর বড় ঘরটিতে থাকেন। ছোট ঘরটিতে থাকে আবু আর রাহিমা।
পাকাপাকিভাবে গ্রামে চলে আসার পর বারবাড়ির দিকে লম্বা মতোন একটা বসার ঘর তোলা হলো। ঘরের পাশে বড় একটা আমগাছ আর অনেকখানি খোলা জায়গা। বৃষ্টি-বাদলার দিনে লম্বা ঘরটায় শুক্রবার আসরের নামাজের আগে এসে বসেন দরবেশ খাঁ। তাঁর ভক্তরা এসে বসে। দরবেশ খাঁ তাঁর মনোমুগ্ধকর ভাষাভঙ্গিতে আল্লাহ রাসুলের (সা.) কথা বয়ান করেন ভক্তদের কাছে। আবু তাদের গুড়মুড়ি খাওয়ায়, ঘন দুধের চা খাওয়ায়। জমিজমা সবই বছরওয়ারি নগদ টাকায় লাগানো। সেই আয় থেকে অতি স্বচ্ছন্দে চলে দরবেশ খাঁয়ের জীবন আর আবুদের
স্বামী-স্ত্রীর জীবন। টাকা-পয়সার হিসাবকিতাব সবই থাকে আবুর কাছে। ওসব নিয়ে খাঁ সাহেব কখনোই মাথা ঘামান না। তিনি তাঁর মতো জীবনযাপন করেন।
আজ দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর আবুকে তিনি বললেন,
‘কোথায় বসবো রে আবু? বাইরে ভীষণ রোদ। বাইরে বসবো?’
আবু বিনীত গলায় বলল, ‘সেইটা হুজুর বসতেই পারেন। তয় আষাঢ় মাইসা দিন! এই রোদ্র এই বিষ্টি।’
দরবেশ খাঁ বাইরের আমগাছটির দিকে তাকালেন।
বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে আমের পাতা। এখন দুপুর শেষের ঝলমলে রোদে সেই পাতা চকচক করছে। বাড়ির পুবদিককার বর্ষার পানিতে পাট জাগ দেওয়া হয়েছে। পচা পাটের গন্ধ আসছে থেকে থেকে। কদিন পর পাট তোলা শুরু হবে। অন্যদিকে চকে পাকতে শুরু করবে আউশ ধান। একদিকে লাগবে আউশ কাটা, অন্যদিকে ‘পাট লওয়া’ অর্থাৎ পচা পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়ে পাটকাঠি আলাদা করা হবে। পাটকাঠিকে এ-অঞ্চলে বলে ‘হরমাইল’। গৃহস্থবাড়ির লোকজনের কাজের অন্ত থাকবে না।
মুশকিল করে শ্রাবণের আকাশ। হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। সে এমন বৃষ্টি, মুহূর্তে শুকনা মাটি কাদা হয়ে যাবে। গৃহস্থ রমণীরা হয়তো তখন মাড়াই করা আউশ ধান উঠোনে ‘মেলে’ দিয়েছে শুকানোর জন্য। কথা নেই বার্তা নেই তখনই ঝমঝম বৃষ্টি। হাছর-পাছর করে শুকাতে দেওয়া ধান ঘরে নিতে নিতে অর্ধেক ভিজে শেষ। অন্যদিকে পাট শুকানোর জন্য বাড়ির উঠান পালানে বাঁশ বাঁধা হয়েছে। বাঁশের ওপর শুকাচ্ছিল পাট। পাটও ভিজে একসা।
খাঁ বাড়ির অন্য পরিবারগুলোতে এই সমস্ত ঝামেলা আছে। শুধু গোলাম মোস্তফা খাঁয়ের অংশে গৃহস্থালি কাজের তেমন কোনো সমস্যা নেই। পুবপাড়ার কৃষক মোবারক দেওয়ান দরবেশ খাঁয়ের বেশিরভাগ জমি চাষ করে। ওই করে সে অবস্থাপন্ন হচ্ছে দিন দিন। খাঁ সাহেবের মহাভক্ত। তাঁর বছর চলার চাল মোবারক দেওয়ান একবারেই পৌঁছে দেয় এ-বাড়িতে। ওই চালের সঙ্গে জমি লাগানোর টাকার কোনো সম্পর্ক নেই। চালটা সে দেয় খাঁ সাহেবকে সম্মান করে। উপহার হিসেবে।
দক্ষিণদিককার চকের ওপারে একলা একটি বাড়ি আউয়ালদের। বাড়িটি হাটবাড়ি অর্থাৎ বাড়িটিতে বহু শরিকের বাস। গায়ে গা লাগানো ঘর। কৃষিজীবী পরিবার। কেউ কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করে। কেউ কেউ ঢাকা কলিকাতায়
চাকরি-বাকরিও করে। এই বাড়ির মাতাব্বর হচ্ছে আউয়াল। তাদের পদবি ‘হালদার’।
আউয়াল হালদার খুবই ধর্মপ্রাণ মানুষ। দরবেশ খাঁ গ্রামে ফেরার পর থেকেই ধীরে ধীরে সে তাঁর মুরিদ হয়ে উঠেছে। প্রতি শুক্রবার আসরের নামাজের আগে আগে সে গিয়ে উপস্থিত হয় খাঁ সাহেবের বাড়িতে। কিছুদিন হলো তার সঙ্গে বাড়ির আরো চারজন জুটেছে। হাশেম, রমিজ, হযরত আর মতলেব। প্রত্যেকের বয়সই চল্লিশ পেরিয়েছে। মৃত্যুচিন্তা ঢুকেছে মাথায়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে শুরু করেছে। অন্যদিকে সংসারও সামলাচ্ছে সুন্দরভাবে। আউয়ালের সঙ্গে তারাও যাতায়াত শুরু করেছে খাঁ সাহেবের শুক্রবারের মজলিসে।
এক নৌকায় আউয়ালরা পাঁচজন আজ একটু আগে আগেই এসেছে। খাওয়াদাওয়ার পর আধঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়েছেন খাঁ সাহেব। উঠে অজু করে আসরের নামাজ আদায় করেছেন। নামাজ শেষ করে তসবি হাতে ঢুকেছেন আমগাছ তলার বসার ঘরটিতে। তার কিছুক্ষণ পরই এলো আউয়ালরা পাঁচজন। খাঁ সাহেব বসার ঘরে এসে ঢুকলেই দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে আবু। প্রকৃত অর্থে খাঁ সাহেবের ভক্তদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্যই এসে দাঁড়িয়ে থাকে। তার পরনে ধোয়া ডোরাকাটা লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি। মাথায় সাদা টুপি। খাঁ সাহেব এসে গ্রামে স্থায়ী হওয়ার পর থেকেই দাড়ি রাখতে শুরু করেছে আবু। মুখখানা প্রশান্তিময়। এই মুখ দেখে যে কেউ বুঝবে আবু মানুষটি ভালো।
সব মিলিয়ে আজ লোক হলো একুশজন।
বসার ঘরে খড়নাড়ার ওপর পাটি বিছানো। সেই পাটিতেই আসনপিঁড়ি করে বসে সবাই। আসরের নামাজ আদায় করতে যাদের দেরি হয় তারা ওখানে দাঁড়িয়েই নামাজ আদায় করে নেয়। আজো কেউ কেউ নিয়েছে।
নিজের চেয়ারে বসে খাঁ সাহেব তসবি জপছেন। তাঁর পায়ের কাছে আধশোয়া হয়ে আছে প্রিয় বিড়ালটি। খাঁ সাহেবের সঙ্গে সারাক্ষণই আছে এই বিড়াল। শিমুল তুলোর মতো গায়ের রং। ওই তুলোর মতোই নরম কোমল শরীর। নীল চোখ দুটো প্রায়ই ঝিলিক দিয়ে ওঠে।
বিড়ালটি মেনি বিড়াল। বছর দেড়েক হলো খাঁ সাহেবের সঙ্গে আছে। সারাক্ষণই খাঁ সাহেবের পায়ে পায়ে। রাতে তাঁর পায়ের কাছে শুয়ে ঘুমায়। স্বভাবমতো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে চলে যায়। সপ্তাহে একদিন খাঁ সাহেব তাকে খুব ভালোভাবে গোসল করান। বিড়ালটি বন্ধ্যা বিড়াল। প্রজননক্ষমতা নেই। খাঁ সাহেবের পিছু পিছু এই ঘরে এসে ঢুকেছে সে। প্রথমে তাঁর পায়ের কাছে এসে স্বভাব অনুযায়ী একবার শরীর টানা দিয়েছে। তারপর নিজস্ব কায়দায় বসে সামনের থাবা চেটেছে। এখন রাজকীয় ভঙ্গিতে আধশোয়া হয়ে আছে খাঁ সাহেবের স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরা পায়ের কাছে।
এখন আর কাঠের খড়ম পরেন না খাঁ সাহেব। বইলাঅলা খড়ম কিংবা রাবারের ‘দোয়াল’ দেওয়া অর্থাৎ বেল্ট দেওয়া খড়ম পরে বৃষ্টি-বাদলার দিনে হাঁটাচলায় অসুবিধা। গত চার-পাঁচ বছর আগে থেকে খড়মের জায়গা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছিল স্পঞ্জের স্যান্ডেল। রোদ-বৃষ্টিতে স্পঞ্জের কোনো ক্ষতি হয় না। ব্যবহারে আরাম। মুহূর্তে ধুয়ে পরিষ্কার করা যায়। খাঁ সাহেব আজকাল ওই স্পঞ্জের স্যান্ডেল ব্যবহার করেন। পিতলের একখানা বদনা আছে অজু করার জন্য। চা খাওয়ার কাপ-পিরিচ আছে আলাদা। আলাদা প্লেট আছে। কলিকাতা থেকে আনা চামড়ার বাঁধাই করা পবিত্র কোরআন শরিফ থাকে হাতের কাছে। আবু ছাড়া খাঁ সাহেবের ব্যবহারের জিনিসপত্র ভুলেও কেউ স্পর্শ করে না।
খাঁ সাহেব কী বিষয়ে আজ কথা বলবেন তা ভাবেনইনি। চোখের চশমা খুলে পরনের কাপড়ে একবার কাচ মুছে নিলেন। সেই ফাঁকে বিড়ালটি দুবার তাঁর পায়ে মুখ ঘষে দিলো। খাঁ সাহেব বিড়ালের দিকে তাকালেন। তাঁর মনে পড়ল কেমন করে এই বিড়াল তিনি পেয়েছিলেন।
গত ফাল্গুনের আগের ফাল্গুনের কথা। আসরের নামাজ শেষ করে সিগারেট ধরাতে গিয়ে খাঁ সাহেব দেখেন প্যাকেটে একটা মাত্র সিগারেট আছে। সেই সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে রওনা দিলেন বাজারের দিকে। আমীর খাঁয়ের দোকান থেকে তিন প্যাকেট সিগারেট কিনে বাজার থেকে বেরোচ্ছেন। চোখে পড়ল বাজারের দক্ষিণ দিককার কোনায় ডুমুর ঝোপটার কাছে ছোট্ট একটা বিড়ালছানা মিউমিউ করছে। ছানাটি মিউমিউ করছিল তাঁর দিকে তাকিয়েই। চার-পাঁচ সপ্তাহ বয়স হবে। তিনি ওদিকটায় যেতেই ধীরপায়ে এগিয়ে এলো তাঁর কাছে। পায়ের কাছে এসে মুখ ঘষতে লাগল। খাঁ সাহেব কোলে তোলার জন্য হাত বাড়ালেন, যেন মায়ের কোলে ফিরছে শিশু তেমন ভঙ্গিতে বিড়ালছানাটি তাঁর কোলে এসে উঠল। ছানাটি তিনি বাড়িতে নিয়ে এলেন। তার দেখভালের দায়িত্ব পড়ল আবু ও তার স্ত্রীর ওপর। ছানাটির খাবার হলো দুধ। বাটিতে করে দুধ দিলেই সে চুকচুক করে খায়। অন্য কোনো কিছুই মুখে দেয় না। দিনে দিনে এই বিড়ালই হয়ে উঠল খাঁ সাহেবের সর্বক্ষণের সঙ্গী। আর জন্মের পর থেকে তাঁর সঙ্গে থাকা অশরীরী সহচর বা জিনটি তো আছেই।
আজকের মজলিস শুরু হলো দেবু ঠাকুরের ঘটনা থেকে। রতনপুরের মনজিল ব্যাপারী খাঁ সাহেবের নতুন শিষ্য। সে সবিস্তারে দেবু ঠাকুরের ঘটনা বলল। চোখের সামনে বীরেন চৌধুরীর সঙ্গে ঠাকুরের গলাকাটা লাশও তারা দেখেছে। সেই মানুষ এক বছর পর কী করে ফিরে এলো? এই রহস্যময় ঘটনা কিংবা অলৌকিকত্বের বিষয়ে খাঁ সাহেব কী বলেন সেটা জানার আগ্রহ হলো প্রত্যেকেরই।
স্বভাব অনুযায়ী চুপচাপ মনজিল ব্যাপারীর কথা শুনলেন খাঁ সাহেব। বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘ঘটনা সত্যিই অদ্ভুত। তবে এই বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাইছি না। শুধুমাত্র আল্লাহপাকই জানেন ঘটনা কী ঘটেছে। আমরা ওসব নিয়ে না ভাবি।’
তারপর তাৎক্ষণিকভাবে তিনি বলতে শুরু করলেন মহানবী (সা.)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু অলৌকিক ঘটনা। শুরু করলেন নবীজি (সা.)-এর দাদা আবদুল মোত্তালিব (রা.) ও তাঁর প্রিয়তম পুত্র, নবীজি (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ (রা.)-এর ঘটনা থেকে।
আজ তিনি দীর্ঘক্ষণ কথা বলবেন। [চলবে]


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.