কায়েম মোল্লার ঘর

লেখক: শৈলেন সরকার

ফরসা সেই ম্যাডামের গায়ে বাবলার ডাল আটকে গিয়েছিল। আর এই শাড়ি বা কাপড়ে আটকে যাওয়া বাবলার ডাল ছাড়ানোর ব্যাপারটা তো আর একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হবে না! আটকে যাওয়া টের পেতেই তুমি ভাবলে, এ আর কী, একটু টানলেই …। তাঁর চারপাশে তখন বডিগার্ড, অফিসার, নেতা এঁরা কেউই নিশ্চিত শুরুতে বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা আর যেমন হয়, কাউকে বুঝতে না দিয়ে ম্যাডাম নিজেই একবারের চেষ্টায় ছাড়াতে গেছেন ডালটাকে। আর তখনই তা চোখে পড়ে থাকবে সেই বডিগার্ড পুলিশ বা অফিসারদের, আর তাঁদের ডাকাডাকিতে মেয়েপুলিশরা ছুটে আসবে। বাবলার কাঁটা একবার জড়িয়ে গেলে, তা ছাড়ানো যে দু-দ-ের কাজ নয়, তা তোমার ম্যাডাম আর জানবে কোত্থেকে? বলা যেতে পারে, তোমার ম্যাডামকে পুবের বাদার সেই নদীবাঁধে যেতে দেওয়াটাই ভুল কাজ হয়েছিল। কিন্তু ম্যাডাম নিজে যেতে চাইলে বাধা দেবে কে? নদীবাঁধ সেখানে ভেঙে গিয়ে এতটাই সরু যে, একজনের পক্ষে হাঁটাই মুশকিলের। বডিগার্ড বলো আর পুলিশ বলো, তোমার পাশে পাশে হেঁটে যে বাবলার ডাল বা অন্য যে-কোনো গাছের ডালপালা পথ থেকে সরিয়ে দেবে তার উপায় কোথায়? হ্যাঁ, একটাই উপায় ছিল, ম্যাডাম যাওয়ার আগে আগে গিয়ে কাটারি দিয়ে ডালগুলিকে ছেঁটে দেওয়া। কিন্তু ম্যাডামের ইচ্ছে এমন লেটে জানা গেল, আর এতটাই শেষ মুহূর্তে যে করার ছিল না কিছুই।
মেয়েপুলিশরা যখন সেই বাবলার কাঁটা জড়ানো শাড়ি নিয়ে নাজেহাল হচ্ছে, বাকি অফিসার বা ছেলেপুলিশ বা সিভিল ভলান্টিয়াররা তখন ডানদিক-বাঁদিকের কিছু দূরত্বে সরে অন্যদিকে তাকিয়ে। এঁদের অনেকেই আগে জঙ্গল দেখেনি। ডিএম ম্যাডামের সঙ্গী হয়ে বারুইপুর বা শহর কলকাতা থেকে এসেছে। জঙ্গলের ঘেরের এই পুবের বাদার বাঁধ-লাগোয়া জঙ্গল একেবারে অনেকটা জায়গা জুড়েই। এই বাঁধের ওপর দাঁড়িয়েও জঙ্গলের শেষ মাথার নদীর জল চোখে পড়ার কথা নয় কারো। আর বাবলা ছাড়া বাদবাকি গাছগুলির নাম জঙ্গলের আশপাশের মানুষ না হলে জানবেটা কে? বড়জোর কাদা ফুঁড়ে মাটির বাইরে বেরিয়ে এসে খাড়া হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা মূল দেখে ছোটবেলার পাঠ্যবইয়ের কথা মনে পড়বে। কী যেন নাম, কী যেন বলা হয় একে?
দিনদুপুরে জঙ্গল নির্জন খুবই। মাঝেমধ্যে কট্কট্ শব্দে ডেকে উঠে কোনো পাখি চুপ করে যায় হঠাৎ। বলা যায় বাঁধের ওপর থেকে গাছপালার মাথায়-মাথায় জঙ্গলটাকে দেখতে গিয়ে ম্যাডামের হয়তো ভালো লেগে গিয়েছিল খুব। মেয়েপুলিশেরা তাঁর শাড়ির গা থেকে বাবলার ডাল ছাড়িয়ে দেওয়ার পরও ম্যাডাম না হলে কেন সেই বাঁধ ধরে আরো কয়েক পা এগিয়ে যাবেন? ম্যাডাম নাকি জানতে চেয়েছিলেন, ‘এখানে থাকে কেউ?’ বা হয়তো এটা বাড়িয়েই বলা, তিনি হয়তো জাস্ট অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। বা হতে পারে তাঁর দাঁড়িয়ে পড়ার ভঙ্গিতেই প্রশ্ন ছিল কোনো। অখিল দাসই নাকি তখন জানিয়েছিলেন, ‘এটা কায়েম মোল্লার ঘর ম্যাডাম, ও ওর বউবাচ্চা নিয়ে থাকে এখানে।’ তাহলে পরের কথাটাও অনুমান করে নিতে হয় অখিল দাসকে, অর্থাৎ ডাকো কায়েম মোল্লাকে। অখিল দাস তখন নাকি ঘাবড়াচ্ছেন মনে মনে। ভাবছেন, পুবের বাদায় নতুন একটা জেটির প্ল্যানের বারোটা বাজল তাহলে। হ্যাঁ, বেআইনি তো বটেই। জঙ্গলের মধ্যে ঘর করে বাস করতে পারো না তো তুমি। গ্রামের এত জায়গা থাকতে জঙ্গলে কেন? অখিল দাস তখন বাঁধের গা বেয়ে একেবারে জঙ্গলেই নেমে গেছেন। লাল কাঁকড়াগুলি তার পা হড়কানোর শব্দ পেয়ে একেবারে সুড়–ৎ সুড়–ৎ করে যার যার গর্তে অদৃশ্য হচ্ছে। ভাটা শুরু হয়ে গেছে, বাঁধের ফাঁক-ফোকরে ঢুকে যাওয়া জোয়ারের জল এখান-ওখান থেকে গড়িয়ে নামছে। সড়সড় শব্দ হচ্ছে। অখিল দাসের পেছনে বাঁধের ওপর ম্যাডামের পাশে তখন বিডিও সাহেব, থানার বড়বাবু। একটা মেয়েপুলিশ ম্যাডামের মাথায় ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে। দূরে মেলার মাঠে বাউলগান বাজছে। আর বৈশাখের বাতাস গানটাকে এলোমেলো কাঁপিয়ে দূরের না-দেখা নদীটাকে পার করে একেবারে জঙ্গল ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। পুজো হবে নদীর ওপারে সেই বনবিবির থানে। লোক আসবে দূরের শহর বারুইপুরই শুধু বলব কেন, আসবে কলকাতা থেকেও। এই একটা মাত্র দিন দূরের মানুষ জঙ্গলের ঘেরের নাম জানবে। একটি দিনেই সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটার মধ্যে কয়েক হাজার কেন, লাখ লোককে নদী পারাপার করাতে হবে। একটি জেটি তাই খুব দরকার এই পুবের বাদায়। অনেক চেষ্টা করে তাই ম্যাডামকে। …
‘কায়েম, কায়েম আছিস নাকি ঘরে?’
বাঁধ থেকে নেমে কায়েমের ঘরে উঁকি দেওয়াটা ঠিক হবে কিনা ভাবছিল অখিল দাস। গরানগাছটা না পেরিয়েই তিনি ফের ডাকলেন, ‘কায়েম, এই কায়েম।’ ঘরের মাথায় রোদ-জলের আড়ালের জন্য প্লাস্টিক পেপার সেলাই করে জুড়ে দেওয়া। প্লাস্টিক পেপার মানে ব্যানার। কোনোটাতে কাস্তে-হাতুড়ি, কোনোটাতে এসইউসির টর্চ আবার কোনোটাতে ঘাসফুল। গত পঞ্চায়েত ইলেকশনের। সাড়া না পেয়ে এবার একটু হতাশ হয়েই পেছন ফিরে বাঁধের দিকে তাকালেন ভদ্রলোক। থানার বড়বাবু উৎসাহ দেখিয়ে তখন প্যান্ট গুটোচ্ছেন। সিভিক পুলিশেরা মোবাইলে ছবি তুলছে তাদের বড়বাবুর। ম্যাডামের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিডিও দেখলেন, সিপিএমের এই দাপুটে নেতা উবু হয়ে মাটিতে দেখছেন কিছু। ‘কী হলো অখিলবাবু, পেলেন কিছু?’
‘পায়ের দাগ, স্যার।’
‘কার পায়ের দাগ?’
‘বাঘের স্যার।’
‘বলোন কী?’
‘হ্যাঁ স্যার, তবে ওই ঘরের চারপাশে ঘুরেছেই শুধু, এরপর নদীর দিকে, দেখুন স্যার, দেখতে পাচ্ছেন?’
ম্যাডামের চোখে কালো চশমা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েপুলিশদের মধ্যে নড়াচড়া দেখে অখিল দাস বললেন, ‘ভয় নেই, এটা অন্তত দুদিন আগের।’ বড়বাবু প্যান্ট গোটানো বন্ধ করে হাঁ করে তাকিয়ে দেখছেন অখিলবাবুকে। ‘আপনারা তো ক্রিমিনাল মশাই, একটা লোকের ঘরের চারপাশে বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর তার একটু জায়গার ব্যবস্থা করতে পারলেন না? তাছাড়া, এই যে জঙ্গলের মধ্যে ঘর তৈরি করে থাকা, এটা বেআইনি নয়?’ কথাটা বলেই বড়বাবু ফরেস্ট অফিসারের দিকে তাকালেন। ভদ্রলোক নতুন এসেছেন, জঙ্গলের মধ্যে যে একটি মেলা হতে পারে, আর সেই মেলায় হাজার হাজার লোক ভিড় করতে পারে জেনে নিজেই তাজ্জব একেবারে। ফিসফিস করে বললেন, ‘আমাকে বলে কী লাভ, কাঠ চুরি আটকাতে পেরেছেন? সিভিক ভলান্টিয়াররা খবর দেয় না কোনো।’
ম্যাডাম এবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিডিওকে বললেন কিছু। আর তা শুনেই বিডিও ডাকলেন অখিলবাবুকে।
‘ছেড়ে দিন মশাই, বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে, আপনি শুধু শুধু আমাদের কথায় … সে আর এক ঝামেলা। ঘরে নেই কেউ, মানে ওর বউ?’
‘ও স্যার এত লোকজন দেখে আর কথা শুনে ভয় পেয়ে গেছে।’
‘ঘরে উঁকি দিয়ে দেখুন না একটু …।’
‘এ স্যার নামেই ঘর, সাপের বাসাও বলতে পারেন, এই যে গরানের ডালটা দেখতে পাচ্ছেন, ঢুকে গেছে ঘাসফুল আর কাস্তে হাতুড়ির ফাঁক গলে, এটাতে বনকেউটে পেঁচিয়ে থাকে একটা, কায়েম মোল্লা ওর বউ-বাচ্চাকে নিয়ে কীভাবে এখানে থাকে তা শুধু ও-ই জানে।’
‘আপনি একজন দায়িত্বশীল নেতা হয়ে কিছু করতে পারলেন না ওর জন্য?’
‘দেব কী, ওর তো দেখা পাওয়াই ভার স্যার। আজ হয়তো মনসুরের নৌকায় খালপাটা জাল করতে গেল, ফিরবে ধরুন
সাত-দশ দিন পরে, এবার ফিরলেই যে ওকে পাবেন তার কি ঠিক আছে কোনো? গ্রামের এত বাইরে এই জঙ্গলে কে এখানে ওকে খুঁজতে আসবে বলুন স্যার।’
‘দুটো মাত্র ভোট তো, তাই মনে রাখতে পারেন না।’
‘তেমন নয় স্যার, ওদের তো ভোটার কার্ডই নেই।’
‘রেশন কার্ড?’
‘তাও নেই, ওদের তো কোনো ডকুমেন্টই নেই।’
‘তার মানে দু-টাকা কেজি চাল বা গম, কিংবা আয়লার চাল Ñ কিছুই না?’
বারুইপুর থেকে সেবার এসডিও ম্যাডাম এসেছিলেন। সেটা অবশ্যই ভাগ্য জঙ্গলের ঘের গ্রামের। মাঝেমধ্যে পুলিশ ঢোকা ছাড়া সরকারি লোক আর আসে কোথায়! মোট ভোটার হাজার ছয়েক। হিন্দু-মুসলিম ওই সেভেন্টি-থার্টি। কিছু আদিবাসী আছে বাঁধের গায়ে Ñ ওই পুবের বাদাতেই। ওরা কাঁকড়া ধরার লোক। ছোট ডিঙি নৌকায় বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়বে। চাষের মধ্যে আমন আর সবজি। সবজি চাষে এখন জোর দিয়েছে সবাই। ঢ্যাঁড়শ, করলা, বিন, শসা। সব বাড়িই পাকা হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। সব বাড়ি, সব রাস্তা। আগে এই পুবের বাদা থেকে বাজারে যেতে গেলে হাঁটতে হতো পাক্কা এক ঘণ্টা, এখন সেখানে মোটরভ্যান। মাত্র পনেরো মিনিটেই সবজি বোঝাই করে চলে যাও। আর পাইকাররাও সব দাঁড়িয়ে থাকবে সেখানে। বড় রাস্তার ট্রাক সেই সবজি নিয়ে যাবে একেবারে জামতলা, বারুইপুর হয়ে শিয়ালদা।
দাবিটা ছিল সবার, কথাটা ছিল অখিলবাবুরই। সবকিছুই হলো, শুধু বাদ থাকল একটা জেটি। পুবের বাদার জেটি। কাঁকড়ার নৌকা, মাছের নৌকা সবাইকে দাঁড়াতে হয় বাঁধের গা বরাবর। আর হ্যাপা পোহাতে হয় জোয়ার-ভাটার। এমনিতে এই খাঁড়ি নিরাপদ খুব। বড় মাতলা থেকে অনেকটা জঙ্গলের আড়াল নিয়ে তবে নদীবাঁধ। একবার কোনোমতে জঙ্গল ফুঁড়ে খাঁড়িতে ঢুকে পড়তে পারলেই কোস্টাল বলো আর ফরেস্টের নৌকা বলো থমকে যাবে বাইরেই। জঙ্গলের ঘেরের গ্রামের লোকজনকে ভয় পায় সবাই। এমনকি বাইরে যে যেখানে পারো খুনখারাবি করে একবার এখানে ঢুকে পড়তে পারলেই স্বস্তি। কে আর খুঁজে পাবে তোমাকে? বাইরে থেকে যত পারো চোরাই মাল এনে ঢুকে পড়ো এখানে, তারপর হাতের মাল ছড়িয়ে দাও চারপাশে। দিল্লি থেকে সেবার মেদিনীপুরের সুবল পঁচিশটা চোরাই মোবাইল এনে বাইশ হাজারের মোবাইল বিক্রি করল জাস্ট আট হাজারে। ওর কথায়, মোবাইলের গায়ে যতই যা নম্বর থাকুক, তোমার ওই কলকাতার লালবাজারের লোক যখনই দেখবে, গ্রামজঙ্গলের ঘের, তক্ষুনি পার্টিকে হাল ছাড়তে বলবে। বলবে, মোবাইল নিয়ে ওরা কেউ অন্তত বারুইপুর এলেও …। কিন্তু এই মোবাইল নিয়ে কেউ বারুইপুর দূরের কথা, জয়নগরই পার হয় না। জঙ্গলের ঘের সুতরাং সব আইনের বাইরে থাকে। আর এর মধ্যেই কী করে কী করে একদিন কায়েম মোল্লা হাজির হয়ে যায়। একেবারে বেঁটেখাটো, কালো আর গাট্টাগোট্টা চেহারার একটা মানুষ। সঙ্গে বউ একটা। অবশ্য মেয়েটা যে ওর বউ তার আলাদা তো প্রমাণ নেই কোনো।
গ্রামে ঢুকল রেজাউলের মোটরভ্যানে। রেজাউলের কথায়, উঠেছিল মাঝের খেয়া থেকে আর পাঁচটা প্যাসেঞ্জারের মতোই। এবার সবাই যখন নেমে যাচ্ছে শনিবারের বাজারে তখনো ওদের বসে থাকতে দেখে রেজা জানতে চেয়েছিল, ‘যাবে কোথায়?’ বেঁটেখাটো লোকটা জানিয়েছিল, ‘জঙ্গলের মেলায়।’
‘জঙ্গলের মেলা তো এখন কী? এটা তো সবে ফাল্গুন।’
রেজা দেখে ব্যাটা সব জানে, বলে কি না, ‘সে তো জানি আমি, বলতে চেয়েছি, ওখানে আমার চেনা মানুষ আছে, যাবো তার বাড়ি।’
অর্থাৎ রেজাকে একেবারে নিজের বাড়িতেই এনে হাজির করতে হলো। গাড়ি থামিয়ে বলল, ‘এই তোমার জঙ্গলের মেলা, এবার কার বাড়ি যাবে বলো?’ রেজার প্রশ্ন শুনে লোকটা নিজের বউয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল কী যেন। এর মধ্যেই ভিড় জমে গেছে বেশ। অখিল দাস এলেন। এলেন বাসু বৈরাগী। রহিমকে ডাক করানো হলো বাড়ি থেকে। অখিল দাসের ডাক শুনে রহিম অবাক খুব। অনেক দিন হলো জাহাজ থেকে তেল নামাতে যায়নি সে, তাহলে হঠাৎ কেন? রহিমকে ডাকার কারণ বোঝা গেল পরে। এরা ঘোড়ামারার। গাঙের দাপটে ঘর পানির তলায়। রহিমের শ্বশুরবাড়িও তো সেখানে। রহিমকে দেখিয়ে জানতে চাওয়া হলো, চেনে কিনা। ডাক করানো হলো ওর বউকেও। না, ওরা কেউই চেনে না কাউকে। তাহলে? এবার রেজার মা-ই বলল, ‘রাতটা কাটাক এখানে, কাল দেখা যাবে। বউটার বাচ্চা আছে পেটে।’
সে-সব বছর তিন-চার আগেকার কথা। কায়েম মোল্লা সম্বন্ধে আর বিশেষ কিছুই আর কারো মনে নেই। আসলে গ্রামের এতটাই বাইরে যদি তুমি থাকো, আর গ্রামের কোনো ব্যাপারে তোমাকে যদি না পায়, তাহলে কেউ আর কীভাবেই বা মনে রাখবে তোমাকে? বড়জোর যার যার মাছের নৌকা আছে তারাই। তাদেরই শুধু মনে রাখতে হয় কায়েম মোল্লাকে। চরপাটা বা খালপাটা যে জালই হোক কায়েম মোল্লাকে ডাকতে হবেই। বলা যায়, কায়েম মোল্লার চাহিদা আছে। খাটতে পারে লোকটা, সাহস খুব। পীরখালির জঙ্গল বা লক্ষ্মীর খাল, যেখানেই হোক সেই গভীর রাতে হাতে একটা মশাল দিয়ে ছেড়ে দাও, ও ঠিক রাক্ষুসে হাঁ করা জঙ্গলের দিকে খালের শেষ মাথা বরাবর মাছ কুড়োতে ছুটবে। সাপ বলো বা বাঘ বা কুমির Ñ কিছুতেই ওর গ্রাহ্য নেই কোনো। গেল পঞ্চায়েতে ওর নাম তোলার কথা উঠেছিল একবার। সিপিএম, এসইউসি বা তৃণমূল কারো এক্ষেত্রে বাধা ছিল না কোনো। বেচারা আছে যখন এখানে একটা অন্তত কাগজও থাকুক। তাছাড়া ঘর অ্যালট হলে তার জন্যও তো কাগজ লাগবে একটা।
‘আগে ভোটে নাম উঠেছিল তোর? ভোট দিয়েছিল কোনো দিন?’
ভোট দিয়েছে বোঝা গেল। কেননা, অখিল দাস একেবারে লাইনে দাঁড়ানো থেকে সিøপ নেওয়া বা বোতাম টেপার সবকটা পর্যায় ধরে ধরে জিজ্ঞেস করে উত্তর নিয়েছেন।
‘ছবিওলা কার্ড ছিল তোর?’ অখিল দাস একেবারে নিজের ভোটার কার্ড দেখিয়েই জিজ্ঞেস করেছেন ওকে। না, ঠিক উত্তর দিতে পারছে না কিছুতেই।
‘বয়স কত তোর, বলতে পারবি? আগে যেখানে ছিলি সেখান থেকে কাগজ আনতে পারবি কোনো?’
ওর কথায়, এক রাতে একেবারে হঠাৎ করেই ওদের ঘর …।
‘ব্যাটা, হাবা নাকি, পুরো বলতে পারিস না?’ পাশ থেকে কেউ একজন ওর বউয়ের কথা তুলে জানতে চেয়েছিল, বউয়ের পেটে তো বাচ্চা নিয়ে এসেছিলি, এ বউ কোথায় পেলি তুই?
বেশ ভালো প্রশ্ন তো! অখিল দাস অবাক হলেন খুব। ঠিকই তো।
‘তুই বললি, হঠাৎ করেই ওই ঘর … সেটা তবে হলো কবে? এখানে যখন এলি, তখন তোর বউয়ের পাঁচ-ছ মাসের পেট, তার মানে অন্তত মাস আটেক আগে বিয়ে হয়েছে তোদের। এবার বল, কবে বিয়ে হলো, বা কে বিয়ে দিলো, মানে বিয়ের ব্যবস্থাটা করল কে?’
কেউই নাকি ব্যবস্থা করে দেয়নি। মানে বিয়েই হয়নি ওদের। কত কথা যে গোপন থাকে মানুষের! কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে দিন সাতেক নাকি ওখানেই মানে ঘোড়ামারার সেই নিজের গ্রামেই কাটিয়েছে কায়েম। এরপর কেউ জঙ্গলের কথা বলায় …। ‘তোর বউ?’ ওর সঙ্গে দেখা ৮ নম্বর লাটের ঘাটে।
লোকটাকে তার মানে যতটা সহজ ভাবা গিয়েছিল ততটা সহজ নয়। তাছাড়া ও আদৌ ঘোড়ামারার লোক কিনা তারই বা ঠিক কি? পুরোটাই তো বানানো গল্প হতে পারে। যা গাট্টাগোট্টা চেহারা আর যা সাহস তাতে তো ওকে খুব সহজ লোক আর মনে হচ্ছে না এখন। শালা কোথাও ডাকাতি-ফাকাতি করে বা পয়সা নিয়ে মার্ডার করে এখানে লুকোতে এসেছে কিনা কে জানে? কায়েম মোল্লাকে ঘাঁটানো হলো না আর। ঠিক হলো, ঘোড়ামারাতে রহিমের শ্বশুরবাড়ি যখন, তখন ওকেই একবার খোঁজ নিতে পাঠানো হবে। একটা লোকের যতই ঘরবাড়ি তলিয়ে যাক, দেশবাড়ির কোনো কাগজ থাকবে না তার কাছে, এটা হয়? পঞ্চায়েতের কাছে চাইলে দিত না কোনো কাগজ? রহিম বলল, ওর শ্বশুরেরাও নাকি এখানে থাকে না আর। ‘তাহলে থাকে কোথায়?’ সে নাকি ওরও জানা নেই ঠিকমতো। ‘তার মানে তুই শ্বশুরবাড়ি যাস না? তোর বউ?’ ‘যাবে কী ভাবে? শেষবার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে পাশের বাড়ির লতিফাকে তুলে আনল না, ওই যে ওর দুই নম্বর বউ, আর যায় ওখানে? তাছাড়া এখান থেকে ঘোড়ামারা যাওয়ার ঝঞ্ঝাট কি কম? এখান থেকে মোটরভ্যানে যাও মাঝের খেয়া, এরপর ভ্যানে রায়দিঘি। ওখান থেকে বাসে হোক কি অটোতে মধুরাপুর স্টেশন, ওখান থেকে নামখানা লোকালে কাকদ্বীপ, ওখান থেকে টোটোতে ৮ নম্বর লাট, এরপর ভটভটি। পুরো এক বেলার ব্যাপার, আর টাকা? খাওয়া নিয়ে এক-একজনের অন্তত দুশো। দুজনের চারশো। কায়েম মোল্লার কথা সুতরাং ভুলেই যেতে হয় সবাইকে। এমনকি ওর ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে আসার জন্য রহিমকে পাঠানোর কথাও আর কারো মনে থাকে না। কিন্তু ওই যে, কিছু মানুষের হঠাৎ হঠাৎ করে একেবারে ভুস করে জেগে ওঠার অভ্যাস থাকে এমন। হয়তো নিজের ইচ্ছায় নয়, তবু …। এই যেমন কায়েম মোল্লা ব্যাটা কীভাবে কীভাবে জেগে উঠল ফের। হঠাৎ করেই একদিন বিডিও সাহেব দেখা করতে বললেন অখিল দাসকে। বললেন, ‘খুব আর্জেন্ট।’ কী ব্যাপার? না, ফোন এসেছিল এসডিও ম্যাডামের কাছ থেকে। একেবারে নিজের গলার। অ্যালটমেন্ট এসে গেছে ঘরের। বিডিও বললেন, ‘আপনাদের লিস্টে তো দেখছি নাম নেই কায়েম মোল্লার, এসইউসি বা তৃণমূলের লিস্টেও নেই, অথচ ম্যাডাম বলেছেন কায়েমের ঘরের ব্যাপারটা সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করতে। হিসাবমতো আপনার গ্রাম পঞ্চায়েতের শ-চারেকের মতো ঘর পাওয়ার কথা, এবার এর মধ্য থেকে যেভাবেই হোক কায়েম মোল্লার জন্য …।’
‘কিন্তু স্যার ওর তো ভিটেমাটিই নেই কোনো গ্রামে, তাছাড়া কাগজ? কোনো ডকুমেন্টই নেই। ভোটার কার্ড-আধার কার্ড কিছু নেই।’
‘সে তো আমি জানি না, আপনি বুদ্ধিমান মানুষ, ম্যাডামের একটা কথা রাখার মূল্য তো আপনি বোঝেন, বোঝেন না?’ অখিল দাস আজ চল্লিশ বছর ধরে রাজনীতি করছেন। সিপিএমের এই খারাপ বাজারেও তিনি জিতেছেন। বাজার খারাপ, তাই এখন আর অযথা ঝামেলায় জড়ান না কোনো। তৃণমূলের দিন এখন। যে কোনোভাবেই তাঁকে এখন শুধু টিকে থাকতে হবে। এতদিন টিকিয়ে রাখা দশজনের দেড়শো বিঘা ভেড়ির জমি এবার আর হাতে রাখা যাবে না। ঝামেলাতে জড়াতে চাইবেন না অখিল দাস। সবাইকে যার যার টাকা হিসাব করে নিয়ে যেতে বলছেন। আর জমিও। গ্রামের মানুষ এককালে তাঁকে ভয় পেলেও এখন তাঁকে ভালোবাসে। তৃণমূল বা এসইউসির লোকেরাও ঘাঁটায় না তাঁকে। শুধু এসডিও কেন, বিডিও সাহেবকেও হাতে রাখলে কী কী সুবিধা হয়, তা তিনি ভালোই জানেন।
‘কী বলেন, উপায় করতে পারবেন না কোনো?’
‘উপায় আছে ঠিকই, তবে প্রধানের সঙ্গে বসে ঠিক করে নিতে হবে। বোঝেন তো, এ তো আমাদের পঞ্চায়েত নয়, আমাদের দিন হলে আমি এক্ষুনি কথা দিয়ে যেতাম, কিছু কাজ যে আইন মেনে সম্ভব নয় তা আমার মতো জানেন আপনিও, হ্যাঁ, আমি ভালো কাজের কথাই বলছি …।’
এসইউসির প্রধানকে নিয়ে একেবারে বিডিওর ঘরেই বসা হলো। প্রধান সজ্জন মানুষ। অখিলবাবুর দীর্ঘদিনের চেনা। কিশোরীমোহনপুরের মানুষ। প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করে এখন রিটায়ার করেছেন। তিনি রাজি হলেন এক কথাতেই। কায়েম মোল্লার কথা শুনেছেন তিনিও। এমন লোক ঘর পাবে না, তা হয়? সমস্যা সেই কাগজের। উপায় তো একটাই …।
উপায় যে একটাই এবং একটাই শুধুমাত্র তা অখিলবাবুও জানেন। অর্থাৎ অন্যের একেবারে আইনি জমির নামে ঘর অ্যালট করতে হবে। সেখানে ঘর ওঠার পর সেই ঘর হস্তান্তর করতে হবে কায়েমকে। ঠিক হলো ঘর অ্যালট হবে অখিল দাসের নামেই। গীতাঞ্জলির এক লাখ চল্লিশ হাজারের এক লাখ দিয়ে ঘর হবে, আর বাকি চল্লিশ হাজার জমির দাম হিসাবে দিয়ে দিতে হবে অখিলবাবুকে। কিন্তু এটা জানাতে হবে না কায়েমকে? জানানোই তো উচিত। যদিও কাগজপত্রে থাকবে না কিছুই, তবু …।
‘কায়েম, এই কায়েম?’
না, আজ আর নিচে নামবেন না অখিল দাস। রবিউলকে নিয়ে এসেছেন সঙ্গে। ওর নৌকাতেও মাঝে মধ্যে জাল করতে যায় কায়েম। সেই ম্যাডামের আসার দিন থেকেই কায়েমের ঘরটাকে দেখলে কেমন গা শিরশির করে অখিলবাবুর। চারপাশে ঘুরঘুর করছে বাঘ, বনকেউটে ছোবল পালটাচ্ছে ঘরে, ভাটার সময় রোদ পোহাচ্ছে কুমির। কীভাবে থাকে লোকটা? দিনের বেলাতেই যেখানে একা কেউ আসবে না, সেখানে রাতবিরেতে জাল সেরে
মাছ বাছাবাছির পর কীভাবে একটা লোক একা …, একটা টর্চ অবধি থাকবে না হাতে। বা ওর বউবাচ্চার কথা ভাবো, কীভাবে সারাটা দিন একা একা এমনকি কায়েম ঘরে না ফিরলে রাতের পর রাত …।
রবিউল বলল, ‘নেমে দেখি আমি।’ নামল রবিউল। ঘরের মাথায় এসইউসি-সিপিএম-তৃণমূল। হাওয়ায় শব্দ উঠেছে বেশ। ফরফর-ফরফর সেলাইগুলি আলগা হয়ে গেছে নির্ঘাৎ। গরানের গোড়ায় গিয়ে হাঁক মারল রবিউল, ‘কায়েম, এই কায়েম।’
‘বউ নেই ওর, বা বাচ্চা?’
‘আছে হয়তো, ভয়ের ঠেলায় কোন কোণে গুঁজে আছে কে জানে? ঘর তো হবে আপনার জমিতে, অ্যালটও হবে আপনার নামে, তবে ওর আর কী দরকার? ঘর হওয়ার পর দেখা যাবে, চলুন তো এখন। এখানে এই জঙ্গলে একা একটা মেয়েছেলে …।’
সবজির চাষ চলছে এখন। মাঘের ঠান্ডা। বেলায় বেলায় ঘুমিয়ে ভোররাতের আগেই জমিতে নামতে হবে। সবজি তোলা, বস্তাবন্দি করা, এরপর ভ্যানে উঠিয়ে সেই শনিবারের বাজার। রবিউল বলল, ‘যার ঘর তার উদ্দেশ নেই, মাথাব্যথা আমাদের।’
‘না রে, এর সঙ্গে জেটির ভাগ্যও জড়িয়ে, ম্যাডাম নিজে খোঁজ নিচ্ছে, বুঝিস কিছু? সবার না হলেও আগে কায়েমের ব্যবস্থা করতে হবে একটা।’
এবার একাই এসেছেন অখিল দাস। ফাস্ট লটের সত্তর হাজার ঢুকে গেছে ব্যাংকে। বিডিও বা এসডিওর এত আগ্রহ যখন বাকি টাকা ঢুকতেও ঝামেলা হবে না তেমন। এই সত্তর হাজারের চল্লিশ হাজার শুধু তাঁরই, বাকি তিরিশ কায়েমের পাওয়ার কথা। এই তিরিশে তো আর মেঝেতে ইট ফেলা সম্ভব নয়, এটা জানে সবাই, অর্থাৎ যে-কোনো তৈরি হতে থাকা বাড়ির ছবি তুলে জমা দিলেই হলো।
‘কায়েম, এই কায়েম?’
ঘরের মাথা থেকে সেই ব্যানারগুলি উড়ে কোথায় কোথায় ছড়িয়ে। অখিল দাস দেখেন তাঁর হয়ে ভোট চাওয়া কাস্তে-হাতুড়ির ব্যানারটা কীভাবে কীভাবে একটা গেওয়াগাছের ডালে আটকে। ঘরের মাথায় এমনকি সেই এসইউসির টর্চ বা তৃণমূলের ঘাসফুল মার্কা ব্যানারগুলির একটাও নেই আর।
‘কায়েম, এই কায়েম?’
ঘরের অবস্থা দেখে এখানে আর কেউ থাকে বলে তো মনে হচ্ছে না। কারো থাকার জন্য ছাদ তো থাকতে হবে একটা, মানে রোদবৃষ্টির হাত থেকে …, মাথার ওপর যে কিছুরই হোক …। বা দেয়াল? একটা ঘেরাটোপ বলে কিছু? সাহস করে একা একাই নিচে নামলেন অখিল দাস। জোয়ার শেষ হলেও জল এখনো নামেনি পুরোপুরি। হড়কাতে গিয়ে একটা বাইনের ডাল ধরে কোনোমতে সামলালেন নিজেকে।
‘কায়েম, এই কায়েম?’
কায়েমের বউটার নাম জানলেও হতো। ঘরের মাথার ব্যানারগুলি উড়ে গেলেও চারপাশের প্লাস্টিক পেপারগুলি কীভাবে রয়ে গেছে এখনো। ‘এই কায়েম?’
গরানের নেমে থাকা একটা ডাল আঁকড়ে ঘরের একেবারে কাছে গিয়ে ডেকে উঠলেন, ‘কায়েম, এই কায়েম?’ ওর বউ কি তবে বাচ্চাটাকে নিয়ে ভয় পেয়ে কোনো প্লাস্টিক পেপারের গায়ে লেপ্টে লুকিয়ে রেখেছে নিজেকে? পর্দার মতো করে ঝুলিয়ে রাখা একটা প্লাস্টিক পেপারকে তুলে ধরতে গিয়ে অখিলবাবু বুঝলেন ওটা আলগাই একেবারে। পুরো প্লাস্টিকটাই ঝুরঝুর করে মাটিতে খসে পড়ল। আর খসে পড়তেই ঘরের ভেতরটা চোখে পড়ল তাঁর।
গরানের একটা চৌকি। তার ওপর ছেঁড়া আর জল পড়ে পচে কাঠের সঙ্গে লেপ্টে যাওয়া একটা চাদরের মতো কিছু।
‘কায়েম? এই কায়েম?’

বিডিও সাহেব শুনে বললেন, ‘তবে আর আপনি কী করবেন, চেপে যান। এটা তো ইললিগ্যালই ছিল, তাই না? ছবি জমা করে দিয়েছেন তো? সেকেন্ড লট সামনের সপ্তাহেই …। সরকারের টাকা তো আর ওইভাবে ফেরত দেওয়া যায় না, দরকারে দিয়ে দেবেন গরিব লোককে, কী বলেন?’
প্রধান এসইউসির হলে কী হবে সম্মান দেন অখিলবাবুকে। কথা শোনেন। পঞ্চায়েত অফিসে দেখা হওয়ায় জানতে চাইলেন, ‘কী খবর কায়েম মোল্লার?’ জিজ্ঞেস করে তিনি অবশ্য আর উত্তর শোনার মতো সময় দিতে পারলেন না। চারপাশে বিস্তর লোক। অখিল দাসেরই বা অত বলার মতো সময় কোথায়, দুটো রাস্তা ঢালাই হবে, আমগাছের টাকা আসছে আর সবচেয়ে বড় কথা, পুবের বাদার জেটিঘাটের ওয়ার্ক অর্ডারটাও …।
‘ভালো, ভালোই আছে কায়েম মোল্লা।’

Leave a Reply

%d bloggers like this: