কুঞ্জ ও কালনাগ

লেখক:

রাশেদ রহমান

কুঞ্জর গল্প বলবো বলে স্থির করেছি; যদি আপনারা শোনেন…।

শুনতে চান? শুনুন তবে…।

কুঞ্জ নিতান্তই সাধারণ এক মহিলা, যাকে নাকি সাপে খেয়েছে; যখন সে জীবিত ছিল; তখনো সে এমন কোনো মহিলা ছিল না – যাকে নিয়ে কোনো গল্প ফাঁদা যায়। ভরসা এটুকু যে, আপনারা কুঞ্জর গল্প শুনতে রাজি হয়েছেন। … আর, আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি – কুঞ্জর গল্প যদ্দুর আমি জানি, লোকমুখে যা শুনেছি; পুরোটাই বলবো – কুঞ্জর প্রতি বিশ্বস্ত থেকে…। কুঞ্জর চোখের জল থেকে, ধারণা করি; নিশ্চয়ই ভালো একটা গল্পের জন্ম হবে। সেই গল্প পড়ে কুঞ্জর জন্য আপনাদের কারো চোখ থেকে যদি দুফোঁটা জল ঝরে – এই গল্পের কথক হিসেবে সার্থক হবে আমার গল্প বলার ক্ষুদ্র এ-প্রয়াস…।

অঘ্রানের মাঝামাঝি। ধানকাটার ধুম পড়েছে। বরণধান, চামারাধান, দুলাইধান, পাটজাগধানের গন্ধ চারদিকে। সুগন্ধও বেশিক্ষণ সহ্য করা কঠিন। দমবন্ধ হয়ে আসে। তবে ধানের গন্ধ অন্যরকম – সুখজাগানিয়া; অঘ্রানে ধানকাটা শুরু হলে সুনন্দপুর নতুন ধানের গন্ধে জেগে ওঠে – চারদিক থেকে ভেসে আসে ধানের বোঝার ঝমঝম শব্দ। বাড়ির বউ-ঝিদের কানে এ-শব্দ আগে আসে। ঝমঝম শব্দ শুনলেই তারা বুঝতে পারে, বাড়ির কামলারা ধানের বোঝা নিয়ে বাড়িতে আসছে। তাড়াতাড়ি উঠোন ঝাড়ু দিতে হবে…।

কামলারা ধান আনে নদীর ওপার থেকে। ধানিচক নদীর ওপার। পুবে-পশ্চিমে লম্বালম্বি অজগর সাপের মতো শুয়ে থাকা আমাদের গ্রামের উত্তর-গাঘেঁষে নদী। গ্রামের নাম সুনন্দপুর। নদীর নাম সুনন্দা। পৃথিবীতে এত সুন্দর নামের গ্রাম-নদী আর কোথাও আছে কিনা কে জানে! অনুমান করি নেই। নাম যেমন সুন্দর, দেখতেও ঠিক তেমনি সুন্দর। নদীর ধার দিয়ে গাঁয়ের পথে হাঁটলে মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। ওই যে কবিতা আছে না একটা – ছোটবেলায় পড়েছি – ‘আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন – মাটির তলায় এর ছড়ানো রতন’ – ঠিক ওই কবিতার মতোই আমাদের গ্রাম! সুনন্দপুর গ্রামের প্রাচীন কোনো কবি যেন এ-কবিতাটি লিখেছেন! গ্রামের দক্ষিণপাশে ঘোড়ার গাড়ি চলার মতো কাঁচারাস্তা। উত্তরপাশে নদী। রাস্তায়, সব বাড়ির সামনে সারি-সারি সুপারিগাছ, বাড়িতে আম-কাঁঠাল-জাম-জামরুল-ডইয়া-ডেফল-আতা-কামরাঙা-চালতাগাছ। সব বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়; বেতঝোপ। বেতঝোপে সন্ধ্যাতারার মতো ঝলমল করে কাইয়া-কাঁঠাল। বাঁশের ছায়া নুয়ে পড়ে নদীতে। আর নদী! সুনন্দার রূপ বর্ণনা করার মতো ক্ষমতা আমার নাই। মনে হয়, আমাদের নদীটি দেখেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতা লিখেছেন – ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে/ পার হয়ে যায় গরু পার হয় গাড়ি/ দুই ধার উঁচু তার ঢালু তার পাড়ি/ চিকচিক করে বালি কোথা নাই কাদা/ একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।’

না; বিন্দুবিসর্গও বাড়িয়ে বলছি না। যারা ভাবছেন, বাড়িয়ে বলছি; তাদের আমন্ত্রণ জানাই – একটিবার আসুন আমাদের গ্রামে। দেখবেন, আপনাদের ভুল ভেঙে যাবে। সুমিত জহির একবার এসেছিলেন আমাদের গ্রামে। হ্যাঁ, লোকটি কবি, গল্পকার…। অর্ঘ কমলদের বাড়িতে ছিলেন দুদিন। কমলও কবিতা লেখে। তো, আপনারা কেউ হয়তো সুমিত জহিরের গল্প-কবিতা পড়ে থাকবেন। মনে করে দেখুন – তার অনেক গল্পেই নায়িকার নাম সুনন্দা…। সুমিত জহির আমাদের নদীর রূপ দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে, নদীর নামটি – সুনন্দা – তাঁর করোটিতে শালকাঠে পেরেক গেঁথে যাওয়ার মতো গেঁথে যায়; নায়িকার নাম হিসেবে ঢুকে যায় তার গল্পে…।

সুনন্দা, তুমি তো আমাদেরও শৈশবের প্রেমিকা। কত যে সাঁতার কেটেছি তোমার শরীরে…!

আষাঢ় মাসে, একরাতে নদীতে পানি আসে। সকালে ঘুম ভাঙতেই চোখের সামনে নদীভরা পানি। নদীতে সে কী স্রোত! চিতাকাঠ, কলাগাছ, মৃত শেয়াল-কুকুর ভেসে যাচ্ছে। আমাদের বাড়ির ঘাটপাড়ে পাড়ার মানুষের শোরগোল। নদীতে বোয়ালমারা বাঁধ দিতে হবে; প্রতিবছরই বাঁধ দেওয়া হয় – দাদা বাঁধ কমিটির সর্দার…।

নদীর ওপার, ক্ষেতে কামলারা ধান কাটে। কোনো ক্ষেতে বরণধান, কোনো ক্ষেতে চামারা কিংবা পাটজাগ, কোনো ক্ষেতে দুলাইধান। দুলাই, বরণ আর চামারাধানে বড়ো-বড়ো নাড়া। অর্ধেক নাড়া ক্ষেতে রেখেই ধান কাটে কামলারা। ধানকাটা শেষ হলে নাড়ায় আগুন দেওয়া হয়। নাড়া পুড়ে ছাই হয়। ছাই থেকে হয় সার। ছাইগাদার ধোঁয়া সাদা বকের মতো টেপিবিলের দিকে উড়ে যায়। পাটজাগধানে নাড়া কম। সব ক্ষেতে সোনারঙের ধান। ধানক্ষেত দেখলেই মনে পড়ে লোকমান ফকিরের গান – ‘সোনালি ধানের শীষে প্রান্তর ঢাকা-ঢাকা…।’

কদিন পর বিজয় দিবস। স্কুলে অনুষ্ঠান হবে। সকালে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা; বিকেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের রিহার্সেল করাচ্ছেন লক্ষ্মীদি। প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর রিহার্সেল। দোয়েল পাখির মতো নাচে কাকলী। কাকলী লক্ষ্মীদির মেয়ে – আমাদের ক্লাসমেট। কাকলী নাচতে-নাচতে গান ধরে – ‘ধনধান্যপুষ্পভরা – আমাদের এই বসুন্ধরা’, কিংবা ‘রুপালি নদী যেথা বয় অাঁকা-বাঁকা – সোনালি ধানের শীষে প্রান্তর ঢাকা-ঢাকা – এই আমাদের জেলা টাঙ্গাইল …।’

লক্ষ্মীদির মুখেই শুনেছি – ‘রুপালি নদী যেথা’ – গানটি লিখেছেন লোকমান ফকির। তাঁর বাড়ি নিকরাইল; বিখ্যাত গীতিকার…। ‘ধনধান্যপুষ্পভরা’র গীতিকার ডিএল রায়।

কাকলীর মুখে ‘রুপালি নদী যেথা’ গানটি শুনে-শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে আমার। আমাদের সুনন্দা যেমন এঁকেবেঁকে চলেছে, লোকমান ফকিরের গানের নদীও তেমনি এঁকেবেঁকে চলে। আর ধানক্ষেত দেখলেই তো মনে পড়ে – ‘সোনালি ধানের শীষে…।’

ঘরে-ঘরে নতুন ধান। নতুন ধানের গন্ধে মাতাল সুনন্দপুর। প্রতিবছর এই সুগন্ধ ছড়াতে-ছড়াতেই আসে আমাদের বিজয় দিবস…। তখন, সতীশকাকার কথা মনে পড়ে আমাদের।            পাকিস্তানি হানাদাররা সতীশকাকাকে ব্রিজের রেলিংয়ের ওপর দাঁড় করিয়ে গুলি করে…।

অঘ্রানে, ধানকাটা শুরু হলে – গেরস্তবাড়ির বৃদ্ধ-বিশীর্ণ মহিলারাও কলাবতী হয়ে ওঠে। ধানের গন্ধ মনি ডাক্তারের টনিকের মতো কাজ করে। কেউ আর তখন জীর্ণ-শীর্ণ থাকে না। সেরে যায় তাদের রোগ-ব্যাধি। কত যে কাজ বাড়িতে! ধান মলন দেওয়া, ধান উড়ানো, সেদ্ধ করা, শুকানো – দম ফেলার ফুরসত থাকে না কারো। মোল্লাবাড়ি, মন্ডলবাড়ি – সুনন্দপুরের ঘরে-ঘরে যেন উৎসব! উৎসব শুরু হয় মাইঠালবাড়িতেও। দাঁতাল ইঁদুরেরা পাকাধানের ছড়া কেটে গর্তে লুকিয়ে রেখেছে। পুরো শীতকাল আয়েশ করে খাবে। গর্তের ভেতরে থরে-থরে সাজানো ধানের ছড়া। মাইঠালরা গর্ত খুঁড়ে সেই ধান তুলে আনে। কুঞ্জ-দুর্গা, সন্ধ্যা-আরতি; মাইঠালবাড়ির বউ-ঝিরা সকাল-সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। কাপড়ের অাঁচলে দুটো রুটি কিংবা ওটপোড়া বেঁধে নেয়। দুপুরে বাড়িতে খেতে যাওয়ার সময় নেই। ইঁদুরগুলো যা বজ্জাত! টের পেলেই গর্তের ধান কীভাবে যেন সরিয়ে ফেলে! কোথায় যে লুকিয়ে ফেলে, কে জানে! সারাক্ষেতে খোঁড়াখুঁড়ি করেও আর সেই ধানের সন্ধান মেলে না…।

আপনারা হৃদয়বান পাঠক; একটু ভালো করে ভেবে দেখুন – ইঁদুরেরা কেন ধান সরিয়ে ফেলবে না? কে তার মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে দেবে? জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইঁদুরেরা ধানের ছড়া কাটে। গেরস্তের চোখ ফাঁকি দিতে হয়, ফাটকের মুখ ফাঁকি দিতে হয় – তারপরই না ধানছড়া কাটার সুযোগ মেলে। গেরস্তের হাতে কিংবা ফাটকের মুখে পড়লেই কুপোকাত! মহামূল্যবান প্রাণটা বেরিয়ে যাবে। জীবনের সব সুখ-সম্ভোগ শেষ! এত কষ্টের ধান; সেই ধান কেড়ে নেবে মাইঠালরা…!

মাইঠালরা ইঁদুরের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়, তা ঠিক। প্রকৃতির নিয়ম মেনেই তা করে তারা। বড়ো মাছ ছোট মাছকে গিলে খাবে – এটাই তো নিয়ম! তাছাড়া, উপায় থাকলে হয়তো মাইঠালরা ইঁদুরের খাবার কেড়ে নিত না। মাইঠালবাড়ির কারো ধানিজমি নেই; ডুলি বেয়ে, কুলা-ডালা বেচে ক-টাকা আর রোজগার করে? অঘ্রান মাসে ইঁদুরের গর্ত খুঁড়লে দেড়-দুমাসের খোরাক জোটে। মন্দ কী? মূষিক-দেবতার পূজা দিলেই হবে…।

ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ধান তুলে আনে মাইঠালরা; সেই ধান থেকে টিকটিকির ডিমের মতো চাল হয়; বড়ো-বড়ো ভাত হয় – সুস্বাদুভাত; সেই ভাত খেয়ে তারা বেঁচে থাকে কিছুদিন; তাই তো ওরা ইঁদুরের পূজা করে। আর মূষিক তো দেবতাই। সাক্ষাৎ দেবতা! দেখুন না, কীভাবে পাহাড় কেটে ছাতু-ছাতু করে ফেলে…!

ভোরবেলা, বাড়ির সবার আগে ঘুম থেকে ওঠে কুঞ্জ। ওর স্বামী শশীর ডান-পা খোঁড়া। ছোটবেলায় পায়ে বাতাস লেগেছিল। মজাটা দেখুন আপনারা, এখনো কারো-কারো পা খোঁড়া হয়; সেটা কিন্তু বাতাসের দোষে হয় না – পোলিও হয়। খোঁড়া পা নিয়ে ডুলি বাইতে পারে না শশী। বাড়িতে বসে ডালা-কুলা-চালা ইত্যাদি বানায়। হাটে-হাটে বিক্রি করে। শশীর জন্য বাঁশকাটা, বেতকাটা; ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ধান তোলা – ভারী সব কাজ করে কুঞ্জ। ওদের দুটো মেয়ে। বড়োটা পুষ্প – ওর বয়স ছয় কি সাত। ছোটটা তিন বছরের তুষ্ট। মেয়ে আরেকটি ছিল – তুলসী – সবার বড়ো; চার বছর বয়সে কলেরায় মারা যায়। তুলসী বেঁচে থাকলে এখন বিয়ের যোগ্য হয়ে উঠতো। মাইঠালবাড়ির মেয়েদের অল্পবয়সেই বিয়ে হয়। সেই কলেরায় মারা যায় শশীর মা-বাবা, ছোটভাই নিশি। তখন কলেরায় উজাড় হয়ে যেতো গ্রাম। চিকিৎসা ছিলো না…। পুষ্প নদী থেকে জল তোলা, ঘটিবাটি ধোয়া – সংসারের টুকটাক কাজ করে। কুঞ্জ ভোরে উঠে মূষিক-দেবতার পূজা করে, মা-মনসার পূজা করে। তারপর রুটি বেলে তাওয়ায় সেঁকে দুটো শশীকে দেয়, দুটো নিজে খায়। বাচ্চাদের জন্য কড়কড়া ভাত থাকে। ওরা একটু বেলা হলে খাবে। ছোট তুষ্টকে খাওয়াবে পুষ্প। কুঞ্জ দুটো রুটি আঁচলে বেঁধে কাঁচি-পাঁচুন-শাবল আর ডালা-কুলা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে…।

নাতু মোল্লার ক্ষেতে যাবে আজ কুঞ্জ। সবার আগে যেতে হবে। কাল ধান কেটেছে মোল্লাবাড়ির কামলারা। ইঁদুরের মাটির বড়ো-বড়ো স্তূপ দেখে এসেছে কুঞ্জ। নিশ্চয়ই অনেক ধান আছে গর্তে। ইঁদুরের গর্তের কাছে গেলেই কুঞ্জ টের পায় – গর্তে ধান আছে কী নেই! মাটির নিচ থেকে ধানের ঘ্রাণ ভেসে আসে কুঞ্জর নাকে…!

নদীতে সামান্য পানি। একটু ঘুরে গেলে শুকনো পথ। কুঞ্জ ঘোরাপথে যায় না। হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তুলে নদী পার হয়। হাঁটা শুরু করে নাতু মোল্লার ক্ষেতের দিকে। মনে-মনে বলে – ‘ভগমান, নিত্যি দেবতার পূজা দেই, গাতায় য্যান ধান পাই ভগমান…!’

ইঁদুরেরা কুঞ্জদের জন্য গেরস্তের ধান কেটে গর্তে জড়ো করে রাখে; তাই ওরা মূষিক-দেবতার পূজা করে। পূজা না-দিলে দেবতা নাখোশ হবে, ধান কেটে নিয়ে যাবে দূরের কোনো পাহাড়ে; ক্ষেতে গর্ত খোঁড়াই হবে সার; ধান আর মিলবে না – তাই মূষিক-দেবতার পূজা না-করে উপায় নেই। কিন্তু, ইঁদুরের গর্ত খুঁড়তে যাওয়ার আগে কুঞ্জরা মনসাদেবীর পূজা করে কেন? মনসাকে পূজা দেওয়ার কী কারণ – কেউ যদি শুনতে চান, বলি – শুনুন…। এই গল্পটা আমরা শশীর দাদার কাছে শুনেছি…।

চাঁদ সওদাগরের ছয় পুত্রকে বাসরঘরে সাপে-কাটার পর রাগে-দুঃখে লোহারঘর তৈরি করে চাঁদ। বেহুলা-লখিন্দরের বাসর হবে লোহার ঘরে। সওদাগর দেখতে চায় – কত শক্তি, কত বুদ্ধি; কত কৌশল জানা আছে মনসার। সওদাগর নাগদেবীর কাছে কোনোমতেই হার মানবে না – তার পায়ে পূজা দেবে না।  বেহুলা-লখিন্দরের বিয়ে-বাসর আসন্ন। প্রস্ত্তত লোহার ঘর। চাঁদ সওদাগর ঘুরে-ঘুরে ঘর দেখছে। কোথাও কোনো খুঁত নেই তো? কোথাও তিল পরিমাণ ছিদ্র থেকে গেলো না তো! চাঁদের সঙ্গে ছিল তার উপদেষ্টাবৃন্দ। তাদের কেউ একজন বললো, ‘ঘরের মেঝে আর সব দেয়ালে মাটির লেপ দিলে ভালো হয়। কোথাও কোনো ছিদ্র থাকলে বুজে যাবে। মাইঠাল-মহিলারা ঘর খুব ভালো করে লেপতে পারে…।’

দ্যাখো কান্ড! লোকটির কথা শুনে মুচকি হাসে মনসাদেবী। লোহার ঘর লেপবে মাটি দিয়ে! অপেক্ষা করো দাম্ভিক সওদাগর – দেখতে পারবে, তোমার লখিন্দরকে কীভাবে কাটে কালনাগিনী…।

যেখানে যতো মাইঠাল মহিলা ছিল সব জড়ো করা হলো লোহার ঘরের সামনে। তারা কালীদহ সাগর থেকে এঁটেল মাটি এনে লেপে দিলো বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর…!

লোহার ঘরের ছিদ্র খুঁজে পেতে ভীষণ বেগ পেতে হয় কালনাগিনীর। সেই থেকে দেবী মনসা মাইঠালদের প্রতি রুষ্ট। সে জানে, মাইঠালরা ইঁদুরের গর্ত খুঁড়তে যাবে। তাই, আগে থেকেই কালনাগ গর্তের ভেতর কুন্ডলী পাকিয়ে ফণা তুলে বসে থাকে। সুযোগ পেলেই মারে ছোবল…।

এখন বিবেচনা করে দেখুন আপনারা – মাইঠালদের মা-মনসার পূজা না-দিলে কী চলে…? চলে না।

কুঞ্জ বাতর ছেড়ে, ক্ষেতের কোনাকুনি হাঁটছে। পথ সংক্ষিপ্ত হবে। কুয়াশা ভালো করে কাটেনি। দূরে সবকিছু আবছা-আবছা। নাতু মোল্লার ক্ষেতে পালবাড়ির হাঁড়ি-পাতিলের স্তূপের মতো কী যেন দেখা যায়। ক্ষেতের কাছাকাছি যেতেই ভুল ভাঙে কুঞ্জর। ওগুলো হাঁড়ি-পাতিলের স্তূপ নয়; মানুষ – সন্ধ্যা-আরতি-দুর্গা…।

– তরা রাইত থাইকতেই আইছস…?

– আইলাম। তুই নিত্যি-নিত্যি ধামাভরা ধান পাস। আমাগো খালি ডালা ঠনঠন করে…।

– পথে কিছুতে ধইরলে…।

– ধইরলে তরে ধইরবো। তর শরীলভরা রস…।

– এইন্যা কী কও সন্ধ্যাদি! আমি ভালো কতা কইলাম, আর তুমরা পচা প্যাঁচ মারলা? পথে ভূত-পেরেত থাইকতে পারে না…?

– ভূতেও শরীল চিনে। নাতু মোল্লা তর মুহি কেমুন ড্যাবড্যাব কইরা চাইয়া থাকে দেহি না আমরা? আমার মুহি চাইলে ব্যাটার চোখ হুইচা মাইরা গালাইয়া দিমু…।

সন্ধ্যা আর দুর্গা কুঞ্জর খুড়তুতো জা। ওরা তিনজনেই একই বয়সী। আরতি খুড়তুতো ননদ। সন্ধ্যার শরীর পাটকাঠির মতো চিকন। মুখ গোলসা মাছের মতো লম্বা। দুর্গা দেখতে কালীপ্রতিমার মতো কালো। আরতি বিধবা। টেরকি মাইঠালবাড়ির এক ঘাটের মড়ার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের দুমাস যেতে না যেতেই লোকটি আরতিকে ফেলে স্বার্থপরের মতো একা-একা স্বর্গে চলে যায়। আরতির শাশুড়ি আর ভাসঠাকুরেরা মিলে ওকে সিরাইল পতিতালয়ে বিক্রির ফন্দি অাঁটছিল। টের পেয়ে আরতি পালিয়ে আসে…। সন্ধ্যা কেন, কে জানে; কুঞ্জর তো মাথায়ই ধরে না – কুঞ্জকে দেখতে পারে না। নিশ্চয়ই কুঞ্জর শরীরের প্রতি ঈর্ষা…।

হ্যাঁ; এটা মানতেই হবে; কুঞ্জর যত যন্ত্রণা – তা ওর শরীরটা নিয়েই। খেতে পাক বা না-পাক; মেয়ে দুটোর মুখে কিছু দিতে পারুক বা না-পারুক; সংসারে অশান্তি নেই। শশী কোনো কিছু নিয়েই বাড়াবাড়ি করে না – অন্য মাইঠালদের মতো ‘মাইঠাল’ না সে – এতেই কুঞ্জর সুখ। যদি, লোকটার পা-টা খোঁড়া না  হতো…! সন্ধ্যা সুযোগ পেলেই কুঞ্জকে ন্যাংড়ার বউ বলে গালি দেয়। কুঞ্জ প্রতিবাদ করে না। যার মুখের কথা তার মুখেই থাকবে; কিন্তু নিজের শরীরটা? কোথায় লুকিয়ে রাখবে শরীর? মেয়েদের সুশ্রী-সুঠাম শরীর বড়োই বিপজ্জনক। নিজের শরীর, ফেলেও দেওয়া যায় না; রক্ষা করাও কঠিন। কুঞ্জ বিপদে পড়েছে শরীর নিয়ে। মহাবিপদ…।

আপনারা, কুঞ্জকে যারা দেখেছেন; নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন – কুঞ্জ দেখতে মাইঠালবাড়ির মেয়ে বা বউয়ের মতো নয়। গায়ের রং কালোর দিকেই, ঠিক কালোও না; কালচে-খয়েরি; আর গঠন! কলাগাছের মতো সুডৌল শরীর। হঠাৎ কেউ দেখলে মনে করবে – মেয়েটি ঠাকুরবাড়ির কারো বউ! তাই তো, পথে বেরুলেই – কুঞ্জর পদে-পদে বিপদ। কুঞ্জ এসব গায়ে মাখে না। চকে না-গেলে, ইঁদুরের গর্ত না-খুঁড়লে না-খেয়ে থাকতে হবে। ক্ষুধা-তৃষ্ণার কাছে লজ্জা-শরম তুচ্ছ…!

কুঞ্জ ইঁদুরের মাটির বড়ো যে-ঢিবিটি দেখে এসেছিল – সন্ধ্যারা সেখানেই খুঁড়ছে। কুঞ্জর নাকে ধানের ঘ্রাণ আসছে। আহা রে! না-জানি কত ধান আছে গর্তে! কেন সে ওদের আগে আসতে পারলো না? মূষিক-দেবতা মুখ না ফিরিয়ে নেয়…!

ক্ষেতের উত্তর-পশ্চিম কোনার দিকে আরো দু-তিনটি ইঁদুরের গর্ত। সেদিকে পা বাড়ালো কুঞ্জ। পা চলে না। কেমন অবশ-অবশ লাগে। কদিন ভালোই ধান পেয়েছে কুঞ্জ। মূষিক-দেবতা মুখ তুলে চেয়েছে। আজ কি খালি হাতে ফিরতে হবে! আনমনে হাঁটে কুঞ্জ। টেপিবিলের কাছাড়ে সারি-সারি বক দাঁড়ানো। অন্যদিন সাদা বকগুলো দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আজ ভালো লাগছে না কুঞ্জর। হঠাৎ মড়া-শামুকে কুঞ্জর পা কেটে যায়। ‘ও মাগো, মা…!’

নাড়ার নিচে শামুক থাকে। শামুকের ওপর পা পড়লে মচমচ করে ভাঙে। কোনোদিন কুঞ্জর পা কাটে না। আজ কাটলো। বন্বন্ করে মাথা ঘোরে কুঞ্জর। কে জানে, কী আছে আজ কপালে…!

একটার পর একটা গর্ত খোঁড়ে কুঞ্জ। এক ক্ষেত থেকে আরেক ক্ষেতে যায়। বেলা বাড়ে। অঘ্রানের রোদে তাপ কম, তারপরও ঘাম ছোটে কুঞ্জর শরীরে। মাটি আর ঘামে কুঞ্জর খয়েরি রঙের শরীর কালোবর্ণ ধারণ করে। হাঁপিয়ে ওঠে সে; কিন্তু কোনো গর্তেই ধান মেলে না…।

– হায় ভগমান! আইজ কি খাইলা ধামা নিয়া বাড়িত যামু…?

কপালের ঘাম মোছে কুঞ্জ। চিকচিক করে কপাল। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। ক্ষুধা লেগেছে। রুটি আছে অাঁচলে। কিন্তু খাবে কী করে? ঘটির জল আজ আগেই শেষ। রুটি খাওয়ার পর জল ক্ষেতে চাইলে বিলে যেতে হবে। না, থাক। রুটি আজ খাবে না কুঞ্জ। শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক…।

নতুন একটা গর্ত খুঁড়ছে কুঞ্জ। নাকে ধানের গন্ধ আসছে। চোখে-মুখে হাসি ফুটে উঠছে কুঞ্জর। দেবতা তাহলে মুখ তুলে চাইছে! শাবল মেরে গর্তের মুখ বড়ো করার পর কুঞ্জ হাত ঢোকাতে যাবে, তখনই গর্তের ভেতর ফোঁসফোঁস শব্দ। হাত দ্রুত সরিয়ে আনে কুঞ্জ। এ যে সাক্ষাৎ কালসাপ! ফণা তুলে ফোঁসফোঁস করছে। আরেকটু হলেই…!

ভয়ে শরীর কাঁপছে কুঞ্জর।

– মা মনসা, তর পূজা দিয়াই তো আইছি। নিত্যি তরে পূজা দেই…।

ডুকরে-ডুকরে কাঁদে কুঞ্জ। আজ কী হলো তার? কোনো গর্তে ধান পেলো না। এই গর্তে সাপটা। সাপ এখনো কেমন ফোঁসফোঁস করছে! সেই কোনকালে ক্ষেপেছিল মা-মনসা; সেই রাগ এখনো পড়েনি…!

– কী রে শশীর বউ, কী অইছে? কান্দস ক্যা…?

নাতু মোল্লা কখন এসেছে টের পায়নি কুঞ্জ। তার কথা শুনে চমকে ওঠে। কান্না থেমে যায়। বলে – কাহা, হাপ…!

– হাপ!

– হ কাহা, ওই যে গাতায় ফোঁসফোঁস করতাছে…।

নাতু মোল্লা ভয় পাওয়ার ভান করে। ‘গাতায় আত দিছিলি…?’

– না।

– হাপে ফোঁসফোঁসাইতাছে আর তুই গাতার সামনে বইয়া রইছস? সইরা আয়…।

নাতু মোল্লা কুঞ্জকে পাঁজাকোলা করে সরিয়ে আনে। কায়দা করে একহাত রাখে কুঞ্জর স্তনের ওপর। ভীতসন্ত্রস্ত কুঞ্জ নাতু মোল্লার কায়দা ধরতে পারে না।

– ধামা খালি ক্যা তর?

– ধান পাই নাই আইজ।

– কস কী? দিন শ্যাষ, একটা ধানও পাস নাই তুই! আমার লগে নু যাই, বিলের পাড়ে আমাগো বড়ো ক্ষ্যাতে ইন্দুরের গাঁতায় বস্তায়-বস্তায় ধান…।

– ইন্দুরের গাঁতায় বস্তায়-বস্তায় ধান!

– হ, তরে মিছা কতা কমু?

– ক্ষ্যাতের ধান তো কাটো নাই।

– আরে ধুর! তুই গাঁতা খুদবি – ধান কাটনের ঠ্যাকা কী? পাটজাগ ধান। নাড়া নাই। ধান বিলি দিয়া গাতা খুদবি…।

কুঞ্জ জানে, নাতু মোল্লা লোকটা সুবিধার না। গাঁয়ে তার নামে আকথা-কুকথার ছড়াছড়ি। ঘরে দুটো বউ থাকতেও সুযোগ পেলেই নোচ্চামি করে। সব জানে কুঞ্জ, তারপরও সে তার পিছে-পিছে হাঁটে। ধানের লোভ সংবরণ করতে পারে না। সারাদিন খেটে খালি ধামা নিয়ে বাড়ি যাবে; ভাবতেই কুঞ্জর বুকের ভেতর একটা কষ্ট তিরতির করে বাজে। সে হাঁটে; নাতু মোল্লার পেছনে-পেছনে ভূতগ্রস্তের মতো হাঁটে। আহা! ধামা-বোঝাই ধান পাবে…!

দুপুর গড়িয়ে গেলেই যেন শীতের সন্ধ্যা নেমে আসে। কেউ কিছু বোঝার আগেই বিকেল হারিয়ে যায়। চকে সন্ধ্যা নামছে। কেমন একটা গা ছমছম-করা পরিবেশ। আইল-বাতর ঘুরে-ঘুরে বিলের দিকে হাঁটছে নাতু মোল্লা। পেছনে ধান পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর কুঞ্জ…।

– কাহা, কোন ক্ষ্যাত। আর কদ্দুর?

– ওই যে, ওই যে বড়ো-বড়ো ধানগাছ, ওই ক্ষ্যাত…। যা বড়ো-বড়ো হিনজা অইছাল রে কুঞ্জ, ইন্দুরে কাইটা সাবাড় কইরা ফালাইছে…।

কুঞ্জ মনে-মনে মূষিক-দেবতার পায়ে প্রণতি জানায়। ওরা ধানের ছড়া কেটে নিলেই না কুঞ্জরা পেতে পারে…!

মানুষ-সমান লম্বা পাটজাগ ধান। ওরা ক্ষেতের ভেতরে ঢোকে। না; নাতু মোল্লা মিথ্যা কথা বলেনি। একটা গর্তে, হাত-খানেক খুঁড়তেই ধান বাজে কুঞ্জর হাতে। খুশিতে চিকচিক করে ওর চোখ…।

– কাহা, গাঁতায় ধান আছে…।

– কইছি না, গাঁতায় বস্তায়-বস্তায় ধান…।

উবু হয়ে গর্ত খোঁড়ে কুঞ্জ। যত খোঁড়ে ততই ধান। ধানের সুবাসে মাতাল শশীর বউ। কোনোদিকে তার খেয়াল নেই। বুকের কাপড় সরে গেছে। তার বুকে পাকাগাবের মতো স্তন। নাতু মোল্লা হা-করে চেয়ে আছে কুঞ্জর বুকের দিকে। ক্ষুধার্ত সাপের মতো বারবার জিহবা বের করছে। শ্বাস টানছে ফোতফোত করে…।

হঠাৎ নাতু মোল্লা খপ করে কুঞ্জর হাত ধরে। ‘কুঞ্জ রে, তর গাঁতা খুদন লাগবো না…।’

– ক্যান কাহা? কী অইলো…?

– তরে আমি ধামা ভইরে ধানের হিনজা কাইটা দিমু…।

নাতু মোল্লা কুঞ্জকে জড়িয়ে ধরে। ‘আয় কুঞ্জ। কুঞ্জ রে…।’

– আপনে না আমার বাপের নাগাল, কাহা…?

– ধুর মাগি! পুরুষ পোলারা কবে আবার ম্যায়া মাইনষের বাপ আছাল? পুরুষ অইলো নাঙের জাইত। নাঙ…।

ধানভর্তি ধামা কাঁখে নিয়ে কচুপাতার পানির মতো টলোমলো পায়ে দাঁড়িয়ে আছে কুঞ্জ। ওর পা বেয়ে রক্ত ঝরছে। এই বুঝি মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে ও! বাড়ি যাবে কুঞ্জ, কিন্তু বাড়ির পথ খুঁজে পাচ্ছে না। কোনদিকে মাইঠালবাড়ি…? দুর্গা-সন্ধ্যা-আরতিরাই বা কোথায়? শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে চিৎকার দিলো কুঞ্জ – ‘দিদি তুমরা কোনে…? আমারে বাঁচাও। কালনাগে কাইটছে আমারে; ও দিদি…।’

কালনাগে কাটলে; দংশিত মানুষের ডাক শোনার জন্য কেউ আর কোথাও থাকে না…।