কোলাজ কৌশলে অণুচিত্র

লেখক: জাহিদ মুস্তাফা 

সময়ের গভীরতার সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক নিয়ে সিরিজ ছাপচিত্র এঁকে শিল্পবোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন শিল্পী হীরা সোবাহান। ঢাকায় তাঁর দুটি একক প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল কয়েক বছর আগে। গত শতকের নববইয়ের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার শিক্ষার্থী থাকাকালে নিজের চিত্রপটে সময়ের বিশাল ব্যাপ্তির পরিপ্রেক্ষক্ষতে জীবনের নানা আকাঙ্ক্ষার চিত্র তুলে ধরে প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। প্রায় তিন দশক পর দেখছি শিল্পী তারই ধারাবাহিকতায় একই ধরনের বিষয় নিয়ে নিজের সৃজন-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন।
‘জীবন ও সময়ের আখ্যান-১’ শিরোনামে ঢাকার ধানম–তে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে শিল্পী হীরা সোবাহানের তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনী সম্প্রতি শেষ হয়েছে। এক্ষেত্রে খবরের কাগজের ছবি কেটে ক্ষুদ্রায়তনের মধ্যে কোলাজ ও সেই পরিসরকে শিল্পের নান্দনিকতায় ভরিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন শিল্পী।
কাগজ কেটে কেটে অন্য কাগজে সেঁটে চিত্র তৈরির কৌশলের নাম ‘কোলাজ’। চিত্রনির্মাণের এমন পদ্ধতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম। সেই পদ্ধতি অনুসরণে নিজের শিল্পপ্রকাশের একটি পথ করে নিয়েছেন শিল্পী হীরা সোবাহান। অণুচিত্র হলেও আমরা লক্ষ করি তাঁর এসব চিত্রে বড় চিত্রের বৈশিষ্ট্য ও সম্ভাবনা পাওয়া যায়।
ড. হীরা একজন ছাপচিত্রশিল্পী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলা ও ছাপচিত্রকলা বিভাগের অধ্যাপক। এবারের প্রদর্শনীতে তাঁর আঁকা-গড়া ১০১টি অণুচিত্র স্থান পেয়েছে। দৈনিক প্রথম আলোসহ নানা সংবাদপত্রে ছাপা হওয়া ছবি নিয়ে শিল্পী তার ওপর জলরং, অ্যাক্রিলিক রং ও প্যাস্টেল রং চাপিয়েছেন; রং ও রেখা নিয়ে খেলতে খেলতে সেসব ছবি নানারকম রূপ পেয়েছে। এসব উপকরণ নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ছবি আঁকার প্রচেষ্টা তাঁর ২০০৭ সাল থেকে। গত এক যুগে এই মাধ্যমে শিল্পী পাঁচ শতাধিক চিত্রকর্ম সম্পন্ন করেছেন। এই প্রদর্শনীতে সেসব থেকে ১০১টি বাছাইকৃত চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছিল।
বেশ কয়েকটি সিরিজে শিল্পী নিজের চিত্রকর্মগুলোকে সাজিয়েছেন। যেমন – অবয়ব, ঐতিহ্য, জীবনের সাক্ষর, সময়ের সাক্ষর, প্রকৃতির ছন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, মানবাধিকার, মুখোমুখি, উৎসব প্রভৃতি শিরোনামের চিত্রগুলোয় নানা সময় ও বিষয়ে শিল্পী আলো ফেলেছেন। তিনি একদিকে প্রকৃতির সৌন্দর্য তুলে এনেছেন, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও তার শিকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্বকে তুলে ধরে তাদের প্রতি রাষ্ট্রের কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
চলমান জীবনধারায় সমাজের নানা সংগতি-অসংগতি, অবক্ষয়, মানুষের সুখ-দুঃখ – এসব উঠে এসেছে তাঁর অণুচিত্রমালায়। ছাপচিত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে শিল্পীর করণকৌশল ও উপকরণ প্রয়োগের দক্ষতা যুক্ত হওয়ায় চিত্রকর্মের গভীরতা বেড়েছে। বিমূর্ত ও আধাবিমূর্ত ফর্ম, উজ্জ্বল ও নমনীয় বহুবর্ণের বিন্যাসে নান্দনিক চিত্রগড়নে শিল্পসত্তার সন্ধান করেছেন শিল্পী। নিজের ধ্যানকে শিল্পী ও শিল্পসমঝদারদের কাছে মেলে ধরেছেন।
তাঁর একটি চিত্রকর্মে দেখতে পাই, চিত্রপটের নিচের দিকে ঊর্ধ্বমুখী অনেক হাতের সমাহার। এর ওপরে রং চাপিয়ে কতক রেখায় ঐক্যের আবহ রচনা করেছেন শিল্পী। সবচেয়ে উঁচু হাতের শীর্ষে লালচে রঙের আভা যেন জনচেতনার স্ফুলিঙ্গকে নির্দেশ করছে। আরেকটি চিত্রকর্মে আলোছায়াময় পরিবেশের ছবির মধ্যে দিগন্ত ও উলস্নম্বরেখার সন্নিবেশে প্রকৃতির ছন্দ প্রতিফলিত হয়েছে।
‘ইমেজ অব লাইফ’ শিরোনামে সিরিজ চিত্রকর্মে আমরা
দেখতে পাই চিত্রপটে নানা অবয়বের ইঙ্গিত। সেসবে আছে
শিশুদল, যৌবনবতী নারী, ফ্যাশনদুরসত্ম নারী-পুরুষ, তোবড়ানো মুখের বয়স্ক মানুষ, বিষণ্ণ নারী। এই সিরিজের ২২-সংখ্যক
চিত্রে অনেক শিশুর প্রেক্ষাপটের দেয়ালে শিল্পী শিশুদের বাঁচার অধিকার বিম্বিত করেছেন। খবরের কাগজে ছাপা ছবির ইমেজ নিয়ে কিছু সৃজন করা আপাত সহজ মনে হলেও সহজ যে নয় সেটি বুঝতে হলে এ-প্রদর্শনী দেখতে হবে। অণু-কোলাজ শিল্পরীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে শিল্পী তাঁর সৃজনশক্তিকে সার্থকতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন। শিল্পভাবনার সঙ্গে সৃজনশীলতার আরেকটি প্রকাশরীতি নতুন করে আমাদের সামনে নিয়ে এলেন শিল্পী হীরা সোবাহান।
শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতার দিক থেকে এ-প্রদর্শনীর শিল্পী হীরা সোবাহান একটি মহৎ উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটি হলো, তাঁর চিত্রকর্ম বিক্রির শতকরা চলিস্নশ ভাগ তিনি ব্যয় করবেন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার জন্য। এই স্বপ্নপূরণে ইতোমধ্যে তিনি খানিকটা অগ্রসরও হয়েছেন।
গত ১২ জুলাই শুক্রবার শুরু হওয়া এ-প্রদর্শনী চলেছে ২৩ জুলাই, মঙ্গলবার পর্যন্ত ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: