কবিতা-প্রবন্ধ-চিত্রসমালোচনা সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করা সত্ত্বেও আবুল হাসনাত সম্পাদক হিসেবে ছিলেন সবার কাছে একটি আদর্শ। দৈনিক সংবাদের সাহিত্যপাতা সম্পাদনা তাঁকে লেখক-পাঠকের ভালোবাসা ও সম্মানের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। পটুয়া কামরুল হাসান সে-কারণেই লিখেছিলেন ‘হাসনাত সংবাদের জন্য একটি রত্ন।’ উজ্জ্বল রত্ন হলেও নিজেকে সবসময় খ্যাতির আড়ালে রাখতে পছন্দ করতেন আবুল হাসনাত। তাঁর কাছের অনেকেই জানতেনই-না যে, তিনিই ‘মাহমুদ আল জামান’ নামে সেই ষাটের দশক থেকে কাব্যচর্চা করে গিয়েছেন। রিলকে (Rainer Maria Rilke) তাঁর The Rodin-Book (First Part : 1903) গ্রন্থে বিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর ওগোস্তা রোদ্যাঁ সম্পর্কে বলতে গিয়ে যশ-খ্যাতি বিষয়ে লিখেছিলেন, ‘Fame, when it came, made him if anything still more solitary. For fame, after all, is but the sum of all misunderstandings which gather about a new name।’ রিলকে নিজেও খ্যাতিকে এড়িয়ে চলতেন, কেননা তিনি বুঝতেন, যশ-খ্যাতি এমন একটা ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে নিয়ে যায় যে, সেটি একজন মানুষকে আরো বেশি নিঃসঙ্গ করে দেয়। একেই বোধহয় বলে ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’ যা আবুল হাসনাতকে কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি। আজকের এই সময়ে একটা বিরল ঘটনা এটি। শম্ভু মিত্র যেমনটি বলেছিলেন, ‘অনেক মোহ ভেঙে যাওয়ার দাম দিয়ে তবেই জীবনে জ্ঞানকে পেতে হয়।’ আবুল হাসনাতকে সেই দাম কীভাবে পরিশোধ করতে হয়েছিল, তার খানিকটা নমুনা পাওয়া যায় ওঁর স্মৃতিকথা হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে (ফেব্রুয়ারি, ২০২০) বইটিতে।

অনেক বছর আগে শম্ভু মিত্রই লিখেছিলেন, ‘আজকে আমাদের চারপাশে যখন চেয়ে দেখি, দেখি প্রত্যেকটা মানুষের চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেছে, ভেঙে গেছে তাদের জীবনবোধের মাপদণ্ডটা। চরম একটা বিশৃঙ্খলা অবস্থায় এসে পড়েছি আমরা। বুঝি না আমরা কী চাই, কী চেয়ে এসেছি এতদিন, শুধু তাই নয়, আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে, আমরা কিছু জানছি না, কিছু বুঝছি না।’ (পৌষ, ১৩৫৪) আজকের দিনেও এ-কথাগুলো দারুণভাবেই সত্যি বলে প্রতিভাত হয়। এর শুরু আজকে নয়, সেই ১৯৭২ থেকেই। যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, স্বাধীনতা নিয়ে গড়ে-ওঠা আমাদের স্বপ্নগুলো ধীরে-ধীরে ভেঙে-ভেঙে যেতে থাকে। তাঁর স্মৃতিকথাতেও আবুল হাসনাত বলেছিলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি, বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন যে মহান পথ সৃষ্টি করেছিল মুক্তিযুদ্ধের, তা প্রত্যক্ষণ ও অংশগ্রহণ জীবনের এক উজ্জ্বল সম্পদ হয়ে আছে। এই মহান সংগ্রামের আমি যে এক অংশী ছিলাম, তা আমার কাছে পরম গৌরবের বিষয়।’ তারপরই বেদনাভারাক্রান্ত মনে জানিয়েছেন, ‘এ গর্বও ম্লান হয়ে যায় আজ যখন দেখি মুক্তিযুদ্ধ সমাজে সিঁড়ি ভাঙার সোপান হয়ে ওঠে। বড় কষ্ট পাই তখন, বেদনায় হৃদয় চূর্ণ হয়।’

অধ্যাপক-প্রাবন্ধিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘যে সময়ে তার সঙ্গে আমার আন্তরিকতা হলো তখন বাংলাদেশের জন্য খুব কঠিন একটা সময় যাচ্ছে। দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। হাসনাত ভাই সে সময় বিচলিত হয়ে বারে বারে আমাকে বলতেন যে, এই মানুষগুলোর দুঃখ কীভাবে লাঘব করা যায়।’ তিনি সেইসঙ্গে এটিও জানিয়েছেন, ‘আমি দেখেছি হাসনাত ভাইয়ের মধ্যে যে রাজনৈতিক সত্তাটা ছিল সেটি জনদরদি, গণমুখী এবং পরিবর্তনকামী। এই পরিবর্তনটা যখন সম্ভব হয়নি, তিনি খুব কষ্ট  পেয়েছিলেন। তিনি আশা করছিলেন স্বাধীনতার পর একটা নীরব বিপ্লব হবে। আমার মনে হয়েছে, তিনি সমাজকে নিয়ে যে স্বপ্নটা  দেখতেন সেটির বাস্তবায়ন না হওয়ায় মনে মনে তিনি খুবই কষ্টে ছিলেন।’ (দৈনিক সমকাল, ৬ নভেম্বর ২০২০) 

এই যে ব্যর্থতার গ্লানিবোধ, কিছু করতে না-পারার কষ্ট এটা শুধু আবুল হাসনাতকে নয়, সেই সময়ের প্রতিটি দেশপ্রেমিক, মননজীবী মানুষকে সহ্য করতে হয়েছে। আবু জাফর শামসুদ্দীন তাঁর আত্মস্মৃতি গ্রন্থে দিনলিপির আকারে লিখেছেন :

অফিসে আসার পর দুটি মিছিল দেখলাম। সম্মুখ সড়ক দিয়ে যাচ্ছে। মিছিল প্রায়ই হচ্ছে। স্বাধীনতার পর মিছিল কমার কথা, কিন্তু কমেনি। বাতাস কোন দিকে বইছে? শান্ত নয় লোকজন। বাংলার মানুষ স্বাধীনতা পেয়ে শ্রেণীগত স্বার্থকে জাতীয়তার বেদীতে বিসর্জন দেয়নি, মিছিল কি তারই ইঙ্গিত নয়? যদি তাই হয় তাহলে আর একটি সংঘাত কত দূরে? (২৮শে মার্চ, মঙ্গলবার, ১৯৭২)

কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান তাঁর স্মৃতিলিপি : ১৯৭২ গ্রন্থে লিখেছেন

গত তিন মাস থেকে গ্রামে-শহরে অরাজকতা বেড়ে গেছে। প্রায়ই রোজ খুনের খবর আসে সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে। … স্কুল-কলেজে পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই নৈরাজ্য আরও প্রকট। যেসব ছেলেরা কদিন আগে মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত ছিল বা যারা তেমন সংগ্রামে যেতে পারেনি, তাদেরও অনুতাপ কম ছিল না। এখন এমন সুস্থতা তাদের মধ্যে থেকে গায়েব হয়ে গেছে। … শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ রীতিমত শঙ্কিত।’ (২৬শে জুলাই, ১৯৭২)

প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক আবদুল হক তাঁর স্মৃতি-সঞ্চয় (দিনলিপি) গ্রন্থে লিখেছেন :

১লা জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত মতিউল-কাদিরের স্মৃতিতে, ইউসিসের পার্শ্ববর্তী রাজপথের মাঝখানে শহীদ মিনার বিরোধী দলীয় ছাত্র-জনতা তৈরি করেছিল। ২২ ফেব্রুয়ারির পরে কারা যেন তা বিলুপ্ত করে দিয়েছে। (২৫শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩)

…..

কয়েকদিন আগে গোপীবাগে কয়েকজন সশস্ত্র তরুণ সদ্য বিবাহিতা এক তরুণীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাদের চারজনকে গ্রেফতার করে। (২১শে মে, ১৯৭৩)

উদাহরণ আর বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। এই যখন পরিস্থিতি তখন আবুল হাসনাতের মতো সংবেদনশীল, রাজনৈতিক সচেতন মানুষ বিমর্ষ হয়ে পড়বেন, এটাই তো স্বাভাবিক। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘মুখ ফুটে তিনি কখনও তার কষ্টের কথাগুলো বলতেন না। তবে তিনি মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা কখনও ছেড়ে দেননি, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হয়তো তিনি মানুষকে নিয়ে স্বপ্নটা দেখেছেন। পরিবর্তনের চিন্তা করে গেছেন। এবং পরিবর্তনের জন্য যে সমস্ত শক্তিকে সক্রিয় করতে হবে, সেগুলোকে সক্রিয় করার জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন।’ আর সেই কারণেই সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মতে আবুল হাসনাত ‘সত্তর দশকের শুরুতে এসে … ভেবেছিলেন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করলে তিনি বহু মেধা ও প্রতিভাকে একটা জায়গায় নিয়ে আসতে পারবেন; এবং সেই মেধা ও মননের সমন্বয়ে তিনি বাংলাদেশে একটা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবেন। যে সংস্কৃতি মানুষকে জাগাবে।’ তাঁর সেই চিন্তারই ফসল গণসাহিত্য

তাঁর নিজের স্মৃতিকথায় আবুল হাসনাত লিখেছেন, ‘১৯৭২ সালের আগস্টে প্রকাশিত হলো মাসিক সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘গণসাহিত্য’। আমি হলাম সম্পাদক। সেই সময়ে একটি সংখ্যা বের হওয়ার পর বছর দশেক বেঁচে ছিল।’ তিনি অকপটে স্বীকার করেছিলেন, ‘এই পত্রিকাটি সে-সময় বেঁচে থাকার এক অবলম্বন হয়ে উঠেছিল।’ এই পত্রিকার প্রকাশ শুধু তাঁর একার নয়, অনেক লেখক-পাঠকের কাছেও তা ছিল জীবনের স্পন্দনকে স্পর্শ করতে পারার মতো একটি ঘটনা।

সাহিত্য পত্রিকার প্রয়োজনীতার কথা তুলে ধরতে গিয়ে প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন, ‘মানুষের চোখ ফোটাবার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাকে চিন্তারাজ্যে নিয়ে যাওয়া। যে-রাজ্যে জাতিভেদ নেই।’ (সবুজপত্র : অগ্রহায়ণ, ১৩৩২) সেইসঙ্গে তিনি এটিও যোগ করে বলেছেন, ‘কেউ একটা নতুন পত্র বার করতে উদ্যত হয়েছেন, একথা শুনলেই আমি খুসি [য] হই। কারণ নিত্যনতুন পত্রিকার জন্ম বঙ্গসাহিত্যের প্রাণের লক্ষণ।’ (সবুজপত্র : পৌষ, ১৩৩৩)। তাঁর খুশি হবার আরো কিছু কারণ রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে জানিয়েছেন, ‘নতুন পত্রের আবির্ভাবের কথা শুনলেই যে আমি খুসি [য] হই, তার কারণ এই সূত্রে পরিচয় পাই যে, আবার জনকতক যুবক লেখক শ্রেণীতে ভুক্ত হচ্ছেন।’ পাঠক-সমালোচকদের মনে নতুন লেখক সম্পর্কে যেসব প্রশ্নের উদয় হয়, সে-বিষয়ে প্রমথ চৌধুরীর একটি পরিষ্কার ধারণা ছিল। সেই ধারণার সূত্র ধরেই তিনি বলেছেন, ‘এই নতুন দলের ভিতর ক’জন কালক্রমে বড় লেখক হয়ে উঠবেন, এ প্রশ্ন মনে মনে জিজ্ঞাসা করাও বৃথা। কেননা সে প্রশ্নের উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ।’ তারপরে এসে তিনি যিশু খ্রিষ্টের বাণীকে সামনে এনে বলেছেন, ‘পৃথিবীর নিয়মই এই যে, সকল ব্যাপারেই many are called but few are chosen। কিন্তু যাতে করে few chosen হতে পারে, তার জন্য many-কে call করা প্রয়োজন। এই কথাটা মনে রাখলেই কেউ আর নতুন পত্রিকার আবির্ভাবকে কু-নজরে দেখবেন না, বরং দেখবেন শুধু আশার চক্ষে।’ (সবুজপত্র : পৌষ, ১৩৩৩)। এ-থেকে আমরা বুঝে নিতে পারি একজন জাত লেখক ও সম্পাদক হিসেবে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যপত্রকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করতেন, ‘যুগ বদলায়, মানুষ বদলায়, এগিয়ে চলে। সাহিত্য পত্রিকা মানুষেরই পরিবর্তনশীল চিন্তাধারার বাহক।’ (বৈশাখ, ১৩৫৩)। তিনি এ-ও বিশ্বাস করতেন যে, সাহিত্য পত্রিকার মূল কাজ হচ্ছে ‘প্রগতিশীল চিন্তাধারার নাগাল ধরা’ (ওই)। অন্যদিকে, বুদ্ধদেব বসু তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছিলেন, ‘আবাল্য দেখেছি, বাংলা মাসিকপত্রে কবিতার সাধারণ স্থান পাদপ্রান্তিক। অর্থাৎ যেখানে কোনো গদ্য রচনা শেষ হলো তারই ঠিক তলায় থাকে কবিতা। … ১৯৩১-৩২-এর কলকাতায় ভালো পত্রিকা অনেক ছিলো, কিন্তু এমন কোনো পত্রিকা ছিলো না, যার মধ্য দিয়ে কবিতা হতে পারে বিশেষভাবে প্রকাশিত ও প্রচারিত ও রসজ্ঞজনের দৃষ্টিগোচর।’ (আমাদের কবিতাভবন, ১৯৭৪)। লেখাই বাহুল্য যে, কবিতাকে এতখানি তুচ্ছ করার ব্যাপারটি তিনি মন থেকে সহজে মেনে নিতে পারেননি। প্রকাশ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য ত্রৈমাসিক পত্রিকা কবিতা (আশ্বিন, ১৩৪২)। নিজের প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু আমাদের জানিয়েছিলেন ‘আমার মধ্যে একটি অংশ আছে প্রচারকের : সাহিত্যে আমাকে যা আনন্দ দেয়, তাতে অন্যেরাও আনন্দিত হোক এই ইচ্ছার বেগ আমি সামলাতে পারি না; তার তাড়নায় এমন অনেক কাজ করে থাকি যাকে চলিত বাংলায় বলে ‘বনের মোষ তাড়ানো’।’ সেইসঙ্গে তিনি এটিও জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমার এই বৃত্তিটি নির্বাধ ছাড়া পেলো ‘কবিতা’ বেরোবার পর, কেননা তখনই একের পর এক দেখা দিচ্ছেন নানা বয়সের নতুন ধরনের কবিরা, দেখা দিচ্ছেন বা প্রাপ্ত হচ্ছেন পরিণতি বাংলাভাষায় কবিতা লেখা কাজটি হয়ে উঠছে শুধু ব্যক্তিগত উচ্চাশা পূরণের উপায় নয়, রীতিমতো একটি ‘আন্দোলন’, যার মুখপাত্ররূপে চিহ্নিত হয়েছে ‘কবিতা’ পত্রিকা।’ না, একটু বাড়িয়ে বলেননি বুদ্ধদেব বসু। তাঁর সম্পাদিত কবিতা শুধু একটি পত্রিকাই ছিল না, সেইসঙ্গে হয়ে উঠতে পেরেছিল একটি সাহিত্য-আন্দোলন।

কবিতা পত্রিকার প্রথম সংখ্যা পাঠ করে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক চিঠিতে বুদ্ধদেব বসুকে জানিয়েছিলেন, ‘তোমাদের “কবিতা” পত্রিকাটি পড়ে বিশেষ আনন্দ পেয়েছি। এর প্রায় প্রত্যেকটি রচনার মধ্যে এক বৈশিষ্ট্য আছে। সাহিত্য বারোয়ারীর দলবাঁধা লেখার মত হয়নি। ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য নিয়ে পাঠকদের সঙ্গে এরা নতুন পরিচয় স্থাপন করেছে।’(চিঠির তারিখ : ৩রা অক্টোবর, ১৯৩৫)। আবার অন্যদিকে হিরণকুমার সান্যাল জানিয়েছিলেন, ‘সরল ভাষায় বলা যেতে পারে, বিদেশ ঘুরে (১৩ ডিসেম্বর, ১৯২৯) আসার কিছুদিন পরে সুধীন দত্তের বাসনা হল একটি পত্রিকা প্রকাশ করার। মননশীল হলেও সুধীন দত্ত কাণ্ডজ্ঞান-বিবর্জিত নন, তাই এ-কথা বিলক্ষণ বুঝতেন যে একক চেষ্টায় স্বর্গ লুণ্ঠন করে মন্দার-মালিকার আহরণ সম্ভব হলেও, প্রমাণ-সই একটি পত্রিকার নিয়মিত প্রকাশ লোকবল ছাড়া অসম্ভব।’ (পরিচয়-এর কুড়ি বছর)। লোকবল হিসেবে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পেয়েছিলেন গিরিজাপতি ভট্টাচার্য, নীরেন্দ্রনাথ রায় প্রমুখকে। অধ্যাপক সুশোভন সরকারও লিখেছেন, ‘১৯৩১ খ্রীস্টাব্দে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, নীরেন্দ্রনাথ রায়, গিরিজাপদি ভট্টাচার্য মিলিত হয়ে ‘পরিচয়’ পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন।’ এঁদের যৌথ সমবায়ে পরিচয় একাধারে অভিজাত আর অভিনব পত্রিকা হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।

এই বিষয়গুলো আবুল হাসনাতেরও জানা ছিল। কেননা, তাঁর পড়াশোনার ব্যাপ্তি ছিল, যাকে বলে, বিস্ময়কর। স্পষ্ট করে যদি বলি, তাহলে বলতেই হয়, বাংলাদেশের যে-কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানবিক বিভাগের অনেক অধ্যাপকও এই ক্ষেত্রে তাঁর ধারেকাছেও ভিড়তে পারবেন না। সাহিত্য-চিত্রকলা-সংগীত এসব শাখায় তাঁর পড়াশোনার বিস্তার ও পরিধি সম্পর্কে যাঁদের জানা আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের সঙ্গে একমত হবেন। এত পড়াশোনা করেও সেই অর্থে তেমন-একটা লেখালেখি করলেন না এই বেদনা যাবার নয়। ঠিক যে-সময়টাতে সবকিছু গুছিয়ে-গাছিয়ে লেখালেখি করবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেই সময়টাতেই চলে গেলেন। আফসোস হয় আর দশটা বছর তিনি যদি বাঁচতেন! এ-প্রসঙ্গে হেমিংওয়ের (Ernest Hemingway) বিখ্যাত ‘The Snows of Kilimanjaro’ গল্পের নায়কের কথা মনে পড়ে যায়, বারবার।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কথায় আবার ফিরে আসা যাক। তাঁর মতে, আবুল হাসনাত ‘সংস্কৃতির শক্তিতে বিশ্বাস করতেন এবং সেটা সেই সংস্কৃতি, যেটা আমাদের ভূমি থেকে উৎসারিত। যাকে আমরা বাঙালিয়ানা বলি সেই গ্রামবাংলার থেকে উঠে আসা সংস্কৃতির তিনি একজন বড়মাপের বিশ্বাসী ছিলেন।  সেজন্য তিনি ‘গণসাহিত্য’ করেছেন।’ পত্রিকার এই নাম সম্পর্কে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম চমৎকার একটি যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যাও দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর মতে ‘“গণসাহিত্য” নামটিতেও সেই দ্যোতনা আছে। মানে গণমানুষের সাহিত্য।’

গণসাহিত্য প্রকাশিত হয় ২২শে শ্রাবণ, ১৩৭৯ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ৭ই আগস্ট, ১৯৭২ সালে। এদিনটি আবার রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবস। পত্রিকাটির উপদেশক হিসেবে ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, কবি শামসুর রাহমান, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, সাংবাদিক মতিউর রহমান, সংস্কৃতিকর্মী মফিদুল হক এবং বেবী মওদুদ। আজ এঁদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। প্রকাশক হিসেবে নাম ছিল হোসনে আরা ইসলামের। ঠিকানা ছিল : ৬৮/২ পুরানা পল্টন। তেতলা। ঢাকা-২। এটা সম্পাদকের কাছে লেখা পাঠানোরও ঠিকানা। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জার দায়িত্বে ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী; আর সম্পাদক ছিলেন আবুল হাসনাত।

কী ছিল প্রথম সেই সংখ্যায়? ছিল প্রবন্ধ, কবিতা, থিয়েটার নিয়ে আলোচনা, গল্প, পুস্তক-সমালোচনা।

৬.২

প্রথম সংখ্যায় প্রবন্ধ লিখেছিলেন আনিসুজ্জামান (‘পৃথিবীর কবি’), রণেশ দাশগুপ্ত (‘কবিতা যেন জীবন্ময়ী নদী’), রঙ্গলাল সেন (‘মার্কুসের সমাজচিন্তা’), সন্তোষ গুপ্ত (‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ ও বিষ্ণু দে’) ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (‘মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ’)। প্রতিটি প্রবন্ধই ছিল সুনির্বাচিত, প্রাঞ্জল; সেইসঙ্গে সময়ের চিহ্ন যেন ধারণ করা। এখানেই আবুল হাসনাতের সম্পাদনার মুনশিয়ানা। আনিসুজ্জামান তাঁর ‘পৃথিবীর কবি’ প্রবন্ধের উপসংহারে বলেছিলেন, ‘সংশয়দীর্ণ আমাদের যুগেও রবীন্দ্রনাথের রচনা সকলের জন্য বহন করে নিয়ে আসে গভীর আশার বাণী, মানুষের অনন্ত সম্ভাবনার প্রত্যয়। বিশ্বমানবের কাছে পৃথিবীর কবির এও এক বড় উপহার।’

রণেশ দাশগুপ্তের মনে হয়েছিল (‘কবিতা যেন জীবন্ময়ী নদী’), ‘কবিতা যেন জীবন্ময়ী নদী। দেশে দেশে বহমানা।’ কেন জীবন্ময়ী নদী? এর উত্তরে তিনি বলেছেন, কবিতা ‘মরুভূমির দেশেও গতি হারায় না। প্রাচীনা হলেও নিত্য নবীনা এই নদী।’ এরপরেই তিনি বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে এনে জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের কবিতার জীবন্ময়ী নদী সম্পর্কেও একই কথা বলতে পারা যায় নিশ্চয় বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে। আমরা এমনসব কবির কাছ থেকেও গণকবিতা পাবো, যাঁরা বাস্তব জীবনে বিপ্লবী হলেও কবিতার রূপের ব্যাপারে অন্তর্মুখীতার কথা বলে এসেছেন, কিংবা বলার পক্ষপাতী।’ সবশেষে এক অনন্য আশাবাদ ব্যক্ত করে রণেশ দাশগুপ্ত বলেছিলেন, ‘যদি রূপকল্প প্রতীকী হয়, তবু বিপ্লবী বাংলাদেশ তাতে খুঁজে পাবে নিজেকে। অভিব্যক্ত দেখবে নিজেকে।’ আজ নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে, রণেশ দাশগুপ্তের সেই স্বপ্ন সর্বাংশে সত্যি হয়নি। সেই বাস্তব পরিস্থিতির খানিকটা তিনি নিজের চোখেও দেখে গিয়েছিলেন। কী দুর্ভাগ্য আমাদের!

অধ্যাপক রঙ্গলাল সেন তাঁর প্রবন্ধে জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন চিন্তাবিদ-সমাজতাত্ত্বিক-দার্শনিক লেখক মার্কুসের (Herbert Marcuse)  ‘সমাজচিন্তা’র একটা ধারণা দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছিলেন। তবে সেটি উপস্থাপন করেছিলেন নেতিবাচকভাবে। তাঁর মতে, ‘মার্কুস পশ্চিমী উন্নত ধনবাদী শিল্পায়িত সমাজের পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবে আর কোন অগ্রণী ভূমিকা থাকবে না। এ কথার তাৎপর্য এই যে বিপ্লবে শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রসমাজের সাফল্যজনক অগ্রণী ভূমিকা থাকবে।’ অবশ্য প্রখ্যাত মার্কিন শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী কেলনার (Douglas Kellner) বলেছিলেন, ‘Marcuse’s critical theory of society was not an overly negetive or pessimistic one. For Marcuse, the concept of utopia presented normative visions of a good life and a good society and hopes for a better world.’ (২০১৪)।

খানিকটা অবাকই লাগে দেশের অন্যতম গুণী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত সন্তোষ গুপ্ত লিখেছিলেন সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ ও বিষ্ণু দে’। এইভাবে লেখক আবিষ্কার করাটাও সম্পাদক আবুল হাসনাতের অন্যতম কৃতিত্বের স্বাক্ষর। বিষ্ণু দে-র অন্যতম সেরা এই কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সন্তোষ গুপ্ত লিখেছিলেন, ‘বিষ্ণু দে মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষা শিল্পলোককে নৈরাজ্যের নিরালোক থেকে সত্তার গভীরে স্থাপন করেছেন। তাই দেশ-কালের প্রতিভাস দেশজ ঐতিহ্যের লোকায়তিক চরিত্র তাঁর সৃষ্টিতে সর্বত্র অনুরণিত। এখানেই ভাববাদী কবির সাথে তাঁর পার্থক্য, জীবনের সাথে এখানে শিল্পের বিরোধ নেই, আছে দ্বান্দ্বিক উত্তরণ শেষে সমন্বয়ের ধারায় উৎসরণ।’ সন্তোষ গুপ্তের এই আলোচনার সুগভীর বোধ আমাদের যেমন আন্দোলিত করে, তেমনি ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’ কাব্যের অভ্যন্তরে পাঠকের প্রবেশকে খানিকটা সহজসাধ্য করে তোলে’ পাঠককে উদ্দীপ্ত করে, বিষ্ণু দে-র কাব্যভুবন পরিক্রমণে পাঠককে উৎসাহ জোগায়।

এই পত্রিকার সর্বশেষ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন আজকের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী-প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত ‘মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ’ প্রবন্ধটির উপসংহারে তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছিলেন, ‘শোষণ ও বঞ্চনা, অভাব ও অনাহার সমানে চলছে। বিতাড়িত প্রেতাত্মারাও ফিরে ফিরে আসছে। তাহলে মৃত্যুর সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই থেকে আমরা শিখলামটা কি? এই প্রশ্ন শুধু লেখকের একার নয়, এই প্রশ্ন আবুল হাসনাতেরও, আমাদের সবারই।

আবুল হাসনাতের মৃত্যুর পরে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে বলেছেন,‘আমি আর যে কারণে হাসনাতকে কোনো দিন ভুলবো না, সেটা হলো, আমি যে “সময় বহিয়া যায়” শিরোনামে ১৪ বছর সংবাদ-এ কলাম লিখেছি “গাছপাথর” নামে, সেই লেখাটি হাসনাতই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে সংগ্রহ করতেন। প্রতি মঙ্গবার এই লেখাটি সংবাদ-এ প্রকাশিত হতো।’ (দৈনিক সংবাদ : ৫/১১/২০২০)। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই বয়ান থেকে লেখকদের সঙ্গে আবুল হাসনাতের সম্পর্কের উষ্ণতা ও গভীরতা টের পাওয়া যায়। আজকের দিনে এটিও ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠেছে।

৬.৩

এডওয়ার্ড টমসন (Edward Thompson) কবিতা পত্রিকা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন : ‘বাংলাদেশ কবিতার দেশ। দ্বৈত তার সরলতা একদিকে গঙ্গা, বিশাল পুরাকীর্তিত, আর-একদিকে শালসমাচ্ছন্ন উচ্চভূমি। সীমাহীন দিগন্তের চেতনা বাঙালির মজ্জাগত, বাংলা কবিতার ‘দিগন্ত’ কথাটি কখনোই দূর পরাহত নয়।’ এর পাশাপাশি তিনি এটিও জানাতে ভোলেননি ‘বাংলা ভাষাও কাব্যপ্রাণ, তার শব্দ-সম্পদ এখনও চ্যুত হয়নি আদিম জীবন থেকে, যে-জীবন তার সৃষ্টির উৎস তার শব্দরাশি প্রায়ই প্রাকৃত ধ্বনির অনুকরণ এবং সর্বদাই গীতধর্মী ও ব্যঞ্জনাময়।’ সে-কারণেই সম্ভবত গণসাহিত্যেও কবিতা উপেক্ষিত থাকেনি।

গণসাহিত্যের প্রথম সংখ্যায় সাতজন কবির কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। এঁরা হলেন বিষ্ণু দে, সানাউল হক, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, মুহম্মদ নূরুল হুদা, মাহমুদ আল জামান ও খান মোহাম্মদ ফারাবী। প্রতিটি কবিতা শিল্পিত মানে উত্তীর্ণ, তিনজন কবির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতেই হয়। বিষ্ণু দে-র যে-কবিতাটি ছাপা হয়েছিল, সেটি হচ্ছে : ‘অসম্পূর্ণ কবিতা বাংলায় বাংলায়’। ষোলোটি অংশে বিভক্ত এই দীর্ঘ কবিতা শুরু হচ্ছে এইভাবে

ক্লান্তি অশেষ, প্রভু তবু পলাতক!

তে হি নো দিবসা গতা! আফশোশে লাভ?

চতুর্দিকেই পাতকী এবং পাতক,

কভু সদ্ভাব কভু-বা অসদ্ভাব,

কাল যে সেবক আজকেই সে যে ঘাতক।

কবিতাটি শেষ হচ্ছে এইভাবে

কী বলব আর? বাঁচাই যে গান বলা,

বাঁচাই কবিতা, প্রতিদিন তুমি শোনো।

মানসে মানসে অনন্ত পথে চলা

বৃথা কত দিন ক’বছর তুমি গোনো।

সে পথের শেষ জীবনের নীল তীরে

তোমার চলারই শেষে,

তোমার আমার একই পথ ঘুরে ঘুরে

পাহাড়ে সাগরে একাকার এক দেশে।

সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় বিষ্ণু দে-র দীর্ঘ কবিতা সম্পর্কে বলেছিলেন, তাঁর ‘দীর্ঘ কবিতার নিজস্ব আধারে মহাকাব্যের তন্ময় বৈশিষ্ট্যের দৃঢ় শৈলীর আভাস পাওয়া যায়।’ সেইসঙ্গে সেখানে ‘সার্বজনীন অভিজ্ঞতার সারাৎসারে’র কথাও তুলেছিলেন। গণসাহিত্যে প্রকাশিত কবিতাটিতেও আমরা সেই অভিজ্ঞতার একটি শৈল্পিক প্রকাশ দেখতে পেয়েছিলাম। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই ‘অসম্পূর্ণ কবিতা বাংলায় বাংলায়’  কবিতাটি পরবর্তী সময়ে বিষ্ণু দে-র ঈশাবাস্য দিবানিশা (১৩৮১ বঙ্গাব্দ) কাব্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

শামসুর রাহমানের যে-কবিতাটি প্রকাশিত হয়, সেটির শিরোনাম ‘ভ্রমণে আমরা’। নাটকীয় কায়দায় কবিতাটির আরম্ভ :

 যাচ্ছেন সজ্জন বৃক্ষময় মাঠে; পাখি

তার কাঁধ ছুঁয়ে

              বুকে ঝাপসা নীল

একটু সকাল নিয়ে কোমল রুপালি

                               ফের কোথায় এখন?

কুকুর গাছের ছায়া শুঁকে শুঁকে দূরে

কেমন সবুজ হয়। হ্রদের অত্যন্ত

                                              কাছে উঁচু

                  লিন্ডেন গাছের

                            পাতার আড়ালে

দ্বাদশ শতকী ক্যাথিড্রাল উদ্ভাসিত।

কোথায় জ্যোতির্বলয় বলো?

……

                          পার্কে

বন্ধু পড়ছেন বই। এখানে আমরা

কেউ কারো পর নই, যদিও ভ্রমণে পরবাসী।

শামসুর রাহমানের কবিতায় যে-শৈল্পিক সচেতনতা ও চিত্ররূপময়তা দেখতে পাওয়া যায়, তা এই কবিতাটিতেও প্রোজ্জ্বল হয়ে আছে। ‘ভ্রমণে আমরা’ কবিতাটি কবির ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা (১৯৭৪) কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

হাসান হাফিজুর রহমানের ‘এখনো জ্যান্ত মানুষের মতো’ কবিতাটি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ স্বজনদের স্মরণের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছে

ভোর আমার সহোদরদের

     শাহাদাতের শোকচিহ্নে নিদারুণ,

দুপুর আমার নিকটতম স্বজনের

 অপঘাত তিরোধানে নিরেট হাহাকার,

সন্ধ্যা ত্রিশ লাখ বিলীন দেশবাসীর

                 ছড়ানো অস্থিতে অন্ধকার

এবং রাত্রি মাতৃহননের, ভগ্নিপীড়নের

                 লজ্জায় নিকষ, স্তব্ধবাক।

আমার দিনরাত্রির চব্বিশ ঘণ্টাই এখন

           শোকচিহ্নে এফোঁড়-ওফোঁড়।

কবিতাটির শেষে এসে কবির প্রশ্ন

হে প্রিয় স্বাধীনতা,

কী পাপ, কোন্ ক্লেদ জড়ায়ে এনেছো

                        ফের তোমার ঠিকানায়?

স্বদেশ-স্বজন হাসানের কাব্যচেতনার একটি বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছে। এখানেও তারই প্রতিচ্ছবি যেন দেখতে পাই আমরা। এই কবিতাটি হাসানের যখন উদ্যত সঙ্গীন (আশ্বিন : ১৩৭৯) কাব্যের অন্তর্ভুক্ত।

আমরা জানি, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের পরিচয় পত্রিকার প্রধান শক্তি নিহিত ছিল তাঁর গ্রন্থ-সমালোচনার অংশে। গণসাহিত্যের বেলায়ও একথা সত্যি। প্রথম সংখ্যাতেই সেটির নমুনা খানিকটা হলেও দেখতে পাই। অকালপ্রয়াত কবি হুমায়ুন কবিরের কুসুমিত ইস্পাত কাব্যের একটি সারবান ও মনোগ্রাহী আলোচনা করেছিলেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। হুমায়ুন কবিরের কৃতিত্ব সম্পর্কে তিনি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের মতে, ‘হুমায়ুন কবিরের অভিজ্ঞতা সরল; ঐ অভিজ্ঞতাকে তিনি মননের সার্বক্ষণিক সক্রিয় একটা অবস্থায় পরিণত করতে পারেননি; তাঁর কৃতিত্ব অস্পষ্টভাবে হলেও, স্ববিরোধীভাবে হলেও, সামাজিক যোগাযোগের জন্য তিনি সমগ্র চৈতন্য দাবী করেছিলেন।’

এছাড়াও গণসাহিত্যের প্রথম সংখ্যায় আলাউদ্দিন আল আজাদ (‘রূপান্তর’) ও আজমিরী ওয়ারেশের গল্প (‘একা একা’) প্রকাশিত হয়। আলী জাকের [য] লিখেছিলেন ‘বিপন্ন থিয়েটার’ শীর্ষক আলোচনা আর জনৈক মুনতাসীর শিল্পী যামিনী রায়কে নিয়ে লিখেছিলেন ‘বাঁকুড়ার সেই রংয়ের যাদুকর’। প্রশ্ন জাগে কে এই মুনতাসীর? আবুল হাসনাত নিজেই কি? কারণ আমরা জানি, একজন অনন্য শিল্পবোদ্ধা ও শিল্প-সমালোচক হিসেবে আবুল হাসনাতের একটি খ্যাতি রয়েছে।

গণসাহিত্যের প্রথম সংখ্যায় একটি দীর্ঘ সম্পাদকীয় রয়েছে। সেখানে সম্পাদক আবুল হাসনাত লিখেছেন ‘পল এলুয়ার তাঁর দু’পংক্তির [য] একটি কবিতায় বলেছিলেন : ‘স্পেনে একটি রক্তাক্ত গাছ আছে, সে স্বাধীনতা।’ আমাদের গত ২৩ বছরের সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে ফরাসি কবির উক্তিকে একটু ঘুরিয়ে আমরাও বলতে পারি। আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিও ছিল রক্তাক্তদেহ। শাসকগোষ্ঠীর ক্রূর ভ্রুকুটি আর অত্যাচারের জগদ্দল পাথর বারবার আমাদের উৎসুক হৃদয়ের উৎসমুখে পাথর চাপা দিতে চেয়েছে।’ এখান থেকেই আমরা বুঝে নিতে পারি এই পত্রিকা প্রকাশের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘মানবমুক্তির এই মহৎ ব্রত নিয়ে “গণসাহিত্য” আত্মপ্রকাশ করছে। … মৃত অতীত, বাস্তব বর্তমান ও আশাময় ভবিষ্যৎকে সামনে রেখেই “গণসাহিত্য” প্রকাশিত হল।’  আমরা আগেই বলেছি, গণসাহিত্য প্রকাশের তারিখটি ছিল রবীন্দ্র-প্রয়াণের দিন, বাইশে শ্রাবণ। সেই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে সম্পাদক বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির সাথে জড়িত একটি দিনের সাথে ‘গণসাহিত্যে’র প্রথম প্রকাশের দিনটি যুক্ত করতে আমাদের আগ্রহ স্বাভাবিক। এক কাল থেকে আমরা কালান্তরে অভিযাত্রী। রবিরশ্মির ঐশ্বর্যে আলোকিত হোক আমাদের যাত্রাপথের প্রথম ক্ষণটি।’ শুধু গণসাহিত্যের পাতায়ই নয়, আমরা জানি আবুল হাসনাতের চেতনার একটা বড়ো অংশে রবীন্দ্রনাথ পরিব্যাপ্ত হয়ে ছিলেন।

আরো অনেক সাহিত্যপত্রের মতো গণসাহিত্যও দীর্ঘকাল টেকেনি। তবে তা-ই বলে তার প্রয়াস একেবারেই ব্যর্থ হয়ে যায়নি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর  সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘এই “বঙ্গদর্শন” কালস্রোতে নিয়মাধীন, জলবুদ্বুদস্বরূপ ভাসিল; নিয়মবলে বিলীন হইবে। অতএব ইহার লয়ে আমরা পরিতাপযুক্ত বা হাস্যাস্পদ হইব না। ইহার জন্ম কখনই নিষ্ফল হইবে না। এ সংসারে জলবুদ্বুদও নিষ্কারণ বা নিষ্ফল নহে।’(বৈশাখ, ১২৭৯)। গণসাহিত্যের জন্মও নিষ্ফল হয়নি। এই পত্রিকার অভিঘাত স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যে যেমন, তেমনই তার গতি-প্রকৃতি নির্ধারণেও একটি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়েছিল। সেইসঙ্গে আরেকটি কথা বলতে হয় : সম্পাদক হিসেবে আবুল হাসনাতের প্রস্তুতিপর্ব ছিল এই গণসাহিত্য সম্পাদনা। সেখানে তিনি সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাবো সংবাদের সাহিত্য পাতায় আর মাসিক কালি ও কলমে

পরিচয় পত্রিকা প্রসঙ্গে হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় যেমনটি বলেছিলেন, ‘শ্যামলবাবুর বিবরণে (শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষ, ‘পরিচয়-এর আড্ডা’: ১৯৯০) ‘নায়ক’ যদি কেউ থাকেন তো তিনি অতি সঙ্গত ও স্বাভাবিকভাবেই হলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। বাংলা কবিতা ও প্রবন্ধক্ষেত্রে সুধীন্দ্রনাথের মনীষা বহুদিন ধরে কীর্তিত হবে সন্দেহ নেই। মানুষ হিসেবেই তাঁর ছবি শ্যামলবাবু ফুটিয়ে তুলেছেন।’ আবুল হাসনাতের বেলায় তেমনটি বলবার কোনো উপায় নেই। তাঁর ব্যক্তিত্বের ধরনটিই ছিল এর বিপরীত। তিনি কখনোই ‘নায়ক’ ছিলেন না না গণসাহিত্যে, না সংবাদে, কি কালি ও কলমে। তিনি ছিলেন নেপথ্যের কারিগর। অন্তরালে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। আমাদের কালের ‘সম্পাদক’ ছিলেন তিনি নায়ক নন। শম্ভু মিত্রের মতো তিনিও মনে করতেন ‘নায়ক’ বা ‘জনপ্রিয়’ হওয়ার চেষ্টার মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

১০

হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে গ্রন্থে আবুল হাসনাত লিখেছিলেন, ‘ন্যায় ও নীতিবোধ আদর্শিক চেতনায় ছাপ ফেলেছে, সেজন্য মূল্যও দিতে হয়েছে পারিবারিক ও সমাজ জীবনে। এই ন্যায় ও ঔচিত্যবোধের কোনো অর্থ পাইনি অনেক সময়। তবুও যে আদর্শিক চেতনা সঞ্চারিত হয়েছিল ধমনিতে, তা থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করিনি। সর্বদা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার যে শিক্ষা পেয়েছিলাম ছাত্রজীবনে, তা থেকে সরে আসিনি কখনও।’ আর তারপরই বলেছিলেন, ‘জীবন প্রবহমান। জীবনের পথে এখনও হেঁটে চলেছি। দেখা যাক, চলতে চলতে কোথায় গিয়ে তা শেষ হয়। পথের শেষ কোথায়? তবু আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ।’ পথ চলার সেই আনন্দ তিনি তাঁর জীবনের গণসাহিত্য-পর্বেও খুঁজে পেয়েছিলেন। সেইসঙ্গে পেয়েছিলেন আলো-অন্ধকারের মিলিত স্পন্দন। সেই স্পন্দন চিরকালের মতো স্তব্ধ হলো ঠিকই, কিন্তু তার অন্তর্ভেদী অভিঘাত রয়ে যাবে আরো বহুদিন

কখনও আর কড়া নাড়া নয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষায়

উল্টো দিকে ছুটে যাচ্ছে স্বপ্নের হাঁস।

বলে যাচ্ছে কোলাহলে।

নদ ডাকে, নদী ডাকে

সহসা চোখের সামনেই ঝরে পড়ে, ঝরে পড়ে

ব্যাকুল নদীর আশ্চর্য মমতা।

আসে না, কেবল ফুলের মত ঝরিয়ে যায়

মোহন বাঁশির সুর

একটি বালকের নাম ধরে ডাকে

সান্দ্র স্বরে

চোখের কোটরে বন্ধ দরোজা; সর্বক্ষণ

বাক্যালাপ করে

রোদ্দুরে বৃষ্টিতে জেনে যায় কীভাবে

মাটি শুষে নেয় জল

কখনও আর কড়া নাড়া নয়। (‘কখনও নয়’, জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক)

Leave a Reply