গৃহযুদ্ধের বিবরণ

লেখক: সৌরভ চক্রবর্তী

হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। দেখা গেল বৃষ্টির বেগ দক্ষিণ থেকে ক্রমশ তেড়ে আসছে। নদীর জলও ভয়ানক কাদাগোলা হয়ে উঠেছিল, আর পারের ওপর আছড়েপড়া ঢেউয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল শ্মশান চত্বর বা আরো দূর থেকে।
সকাল থেকে নদীর চরে কাঁটাঝোপের পাশে ২০-৩০টি কুকুর জড়ো হয়েছে। বৃষ্টি নামলেও ওরা পালিয়ে গেল না। জোয়ারের জল উঠে আসছিল বলে চরেও প্যাচপেচে কাদা, তার ওপর এক-হাঁটু কাদা মেখে মাঝখানে এক মরা কুকুর নিয়ে ওরা বৃষ্টিভর বসে রইল।
বৃষ্টি চলল ৪২ মিনিট। সারা সময় ওই কুকুরেরা ঘনঘন নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে মরাদেহে কোপ লেগে ঘা হওয়া পচে যাওয়া গলাটার দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রবল জলো হাওয়ার সঙ্গে দূর থেকে কোনো কুকুরের কান্না ভেসে আসছিল।
এই সময় শ্মশানে মরা-পোড়ানো কাঠকয়লা বৃষ্টির জলে ভেসে নদীর কাদাগোলা জলের সঙ্গে মিশে যায়। খোলা হাওয়ার দাপটে বাঁশঝাড়গুলো নুয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও সেদিন একটা কুকুরও ওই পচা দেহটা ছেড়ে নড়েনি।
ক্রমশ বিদ্যুচ্চমকের শব্দ আর আগুন বৃষ্টির বেগ কমিয়ে আনল। নদীও জোয়ারের জলে ভরে উঠল। জল উঠে এলো চরে।
কয়েক মুহূর্তে আকাশের মেঘ কেটে গেল। যদিও গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে জল ঝরে পড়ছিল, অথচ আকাশের রোদ্দুরে নদীও ক্রমশ চকচকে হয়ে উঠল।
কিন্তু তিনটে কুকুর বাকিদের সঙ্গে ফিরে যায়নি। ওরা নদীর চর ছেড়ে উঠে নাগের ভেড়িতে সারি সারি তালগাছের গোড়ায় এসে বসল। পাশেই শ্মশানঘরের টিনের চালে রোদ পড়েছে। বাঁশপাতা বিছিয়ে থাকা রাস্তার ওপর দিয়ে নিঃশব্দে একটা দাঁড়াশ ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। নদীতে সারি সারি বালি-কাটা নৌকা ভেসে চলেছে উত্তরে।
মাঝের কুকুরটা হঠাৎই উঠে গা-ঝাড়া দিয়ে পেছনের পায়ে ভিজে মাটি আঁচড়াতে শুরু করল। অন্য কুকুর ঘেউ-ঘেউ করে উঠলে সে থেমে গিয়ে আবার সামনের পা-দুটো বিছিয়ে বসে পড়ল। আর একটি কুকুর লেজ নাড়তে শুরু করল তারপর।
গাছের পাতায় বৃষ্টির জল রোদের তাপে যখন শুকিয়ে গেছে, তখন চারজন লোক রাস্তাভর্তি ভিজে বাঁশপাতার ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে এলো।
কুকুরতিনটি উঠল না। ঘাড় বাঁকিয়ে লোকগুলোর দিকে তাকাল।
দ্বিতীয় ভুঁড়িওয়ালা মোটা লোকটা বলছিল, আজ তার পাঁচ কেজি মাংস বিক্রি হয়নি।
ওরা শ্মশানঘরের ভেতরে ঢুকল না Ñ বাঁদিকে নেমে কুকুর তিনটির পাশ কাটাল Ñ নাগের ভেড়ি ধরে কুলবাগানের দিকে চলে গেল। সেখানেই এক জায়গায় বসল ওরা। কুকুরতিনটি ওদের কথোপকথন শুনতে পাচ্ছিল Ñ এমনকি চোলাইভর্তি পেপার খোলার শব্দ। অতএব ওরা উঠল না।
ভুঁড়িওয়ালা লোকটা আজকেও একটা কুকুরের গায়ে কোপ মেরেছে : ওদের কথোপকথন থেকেই উঠে এলো, কোপটা লেগেছে পেছনের দাবনায় Ñ জিভ দিয়ে চাটতে পারলেই ক্ষত সেরে যাবে, তাই সেটা লক্ষ্যভ্রষ্টই বলা যায়, কারণ এই মাংস-চোর কুকুরগুলোর উচিত শাস্তি গলায় কোপ খাওয়া Ñ এবং নিশ্চিত মৃত্যু।
ওদের কথোপকথন থেকে আরো উঠে এলো : কুকুরগুলোকে ত্রিসীমানায় দেখলেই পেটানো দরকার, গত সপ্তাহে প্রায় আড়াই কেজি ওজনের একটা ছিনার টুকরো ওরা টেনে নিয়ে গেছে এবং ভুঁড়িওয়ালা ওই কসাই হিসাব দিচ্ছিল মোট কটা কুকুরকে সে মাংস-কাটা দা দিয়ে ঘায়েল করেছে।
‘তা সত্ত্বেও কুকুরগুলো শেষ হয় না।’
প্রায় ৯৫ মিনিট লোকগুলো বসে বসে গুলতানি মেরে গেল। অনেকগুলো করে বিড়ি খেল। উঠল যখন, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে।
কুকুরগুলো কিন্তু সেভাবেই বসে ছিল কিংবা ঝিমোতে ঝিমোতে কিঞ্চিৎ ঘুমিয়েই পড়েছিল। লোকগুলো যখন ওদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, একবার ওরা মুখ তুলে তাকালও না। ভুঁড়িওয়ালা কসাই শুধু আড়চোখে দেখল কুকুরগুলোকে।
ওরা চলে গেলে কুকুরগুলো সারাদিন ওখানেই বসে রইল। একসময় ভাটার টানে ওদের বন্ধুর লাশ শ্মশানের পাশ দিয়ে ভেসে চলে গেল Ñ ওরা সেটাও দেখল না, এমনকি বোঝারও চেষ্টা করল না। ঝিমোতে ঝিমোতে যে-ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল সে-ঘুমের প্রভাবে অকাতরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, রাত গভীর হয়ে গেছে Ñ এমন সময় কুকুর তিনটি আচমকা জেগে উঠল। তখন দুনিয়া জুড়ে ভয়ানক নিঃশব্দ আর বহুদূরে ওদেরই দলের কেউ সশব্দে ডেকে চলেছে।
ভুঁড়িওয়ালা লোকটার হঠাৎই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল রাত্রে। একটু আগে সে তার বউয়ের সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছে। কসাইয়ের গায়ের গন্ধে বউ শিহরিত হতে হতে প্রবৃত্তির যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠেছে প্রবলভাবে। সেও আদিম শক্তিবলে বউকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে দিতে অপরিসীম ভালোবেসেছে। তারপর ঘুমিয়ে পড়ার আগে আল্লাহকে স্মরণ করেছিল।
এখন ঘুম ভাঙলে সে কেমন শূন্যতা অনুভব করল বুকে। অতএব উঠে বসে বিড়ি ধরিয়ে বাইরে বেরোতে গিয়ে অনুভব করল, বউয়ের প্রত্যঙ্গে প্রত্যঙ্গে মিশে যাওয়া আদর ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে।
তার বুকের শূন্যতা কেটে গেল। সে বউকে জাগিয়ে তুলতে শুরু করল। এমনিতেই পোশাকের শৈথিল্য ছিল, তাকে মুক্ত করতে করতে বউকে সে জাগিয়ে দিতে থাকল ক্রমশ। বউও অতীব কামনায় কসাইকে গ্রহণ করতে শুরু করল ফের।
হঠাৎই বলল কসাই, দাঁড়াও, একটু আসছি।
বউ শুধু অস্ফুটে বলল, না।
সে বলল, এক্ষুনি আসব।
কসাই ফের একটা বিড়ি ধরাল। বাইরে বেরিয়ে লুঙ্গি উঁচু করে পেচ্ছাপ করতে বসল উঠোনের এক কোণে। আকাশে তখন চাঁদ ডুবে গেছে। বাঁশবাগানে বাতাস বইছে সশব্দে।
তখনই কুকুরতিনটি তাকে আক্রমণ করে। এমনই অতর্কিতে এবং কৌশলে কামড়ায় ওরা যে, লোকটা কোনো আওয়াজই করতে পারে না। খানিকক্ষণ ছটফট করে, তারপর মারা যায়।
দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। সবাই অনুমান করল শিয়ালজাতীয় কোনো বনের পশুই নিশ্চয়। এক-আধজন বলেছিল পোস্টমর্টেমের কথা; কিন্তু ধর্মীয় বাধার জন্য সেটা অচিরেই নাকচ হয়ে গেল।
দুপুর নাগাদ মাটি দেওয়া হয়ে গেলে সেই রাতে কুকুর তিনটি কসাইয়ের কবরের ওপর সারারাত ঘুমিয়েছে, ভোর হওয়ার আগে উঠে কবরের আলগা মাটির ওপর পায়খানা করেছে, তারপর আস্তে আস্তে সরে পড়েছে সেখান থেকে।
একটু পরে নদীর ধারে সূর্য উঠল। ধীরে ধীরে আকাশের রক্তিমতা কেটে গেল। সূর্য জ্বলে উঠল প্রবল তেজে। অন্য তিনটি মাংসের দোকানে তাল-তাল গোমাংস ঝুলিয়ে অথবা নিচে সাজিয়ে রাখল কসাইরা। লাল মাংসের গন্ধে বাতাস ভরে উঠল। কাকেরা কা-কা করতে করতে লোভাতুর উড়ন শুরু করল, আর কসাইদের দায়ের নিচে মাংস টুকরো টুকরো হতে থাকল।
মাংসের ঝুপড়ি দোকানগুলো থেকে দূরে স্বাস্থ্যবতী আম্রপলির নিচে এসে বসল কুকুরেরা।
মুখে সাদা মুসলমানি দাড়ি, লুঙ্গি পাট করে পরা, লম্বা ঝুলের পাঞ্জাবি আর মুসলমানি টুপি পরা এক সাহেব একসঙ্গে অনেকটা মাংসই কিনে নিলেন।
কুকুরগুলো নিশ্চিন্তে ঝিমোচ্ছিল।
মাংসের দোকানে একদল ছেলে এলো ধর্মসভার চাঁদা নিতে। অটোরিকশাগুলোয় লোকেরা বাদুড়ঝোলা হয়ে যেতে যেতে, হিন্দুরা গোমাংসের দিক থেকে ঘৃণাভরে দৃষ্টি সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। আর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদের তাপ বেড়ে ওঠায় কুকুরগুলো গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
ধীরে ধীরে সুনসান হয়ে যেতে থাকল সারা দুনিয়া। হঠাৎই কী একটা পতনের শব্দে জেগে উঠল কুকুরতিনটি।
দুই কসাই দোকান বন্ধ করে চলে গেছে। কেজি আড়াই মাংস নিয়ে বসে আছে শেষ কসাই। আশপাশে কোনো লোক নেই। নাকে নথপরা এক মেয়ে হাত দুলিয়ে দুলিয়ে কসাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিল। আড়াই কেজি মাংসের দাম … টাকা।
কসাই বলল, এই মাংস একা খেলে তুই তো আমারে আস্ত গিলে খাবি। এমনিতে তোর যা খাই।
মেয়েটি বলল, তোমার আবার গোস লাগে কিসে! এখনো তোমার যা জোর, তুমি মেয়েছেলেরে ইচ্ছা করলে কাঁদিয়ে ছাড়তে পারো।
কসাই বলল, সত্যি বল না লাইলু Ñ তোর ভালো লাগে?
লাইলু কটাক্ষ করে হেসে বলল, আসল কাজ তো আরাম দেওয়া …
তুই সবটা নিয়ে যা লাইলু, কসাই বলল, আর থাকিসনে Ñ বেশিক্ষণ নিজেরে ধরে রাখা যাবে না।
না, বলল লাইলু, তুমি আদ্ধেক রাখো। রাত্রেই দেখা যাবে কার কত জোর …।
লাইলুর বুকের কাপড় সরে গিয়েছিল। কসাই সেদিকে তাকিয়ে আছে, সে বুঝতে পারল Ñ কিন্তু বুক ঢেকে নিল না। বলল, অত দেখো না Ñ আমার কি লজ্জা নেই!
কসাই অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নিল। তারপর গোস্ত পিস করে কালো ক্যারিব্যাগে ভরে লাইলুর হাতে তুলে দিলো। লাইলু একবার মিষ্টি হেসে চলে যেতে উদ্যত হলো। কসাই বলল, ঠিক ৮টা। লাইলু মুচকি হাসি হাসতে হাসতে দ্রুতপায়ে এগিয়ে যেতে থাকল। কসাই নিজের মাংসগুলো পিস করল, তারপর ঢকঢক করে জল খেল একটা বোতল থেকে। ঠিক সেই মুহূর্তে কুকুর তিনটি আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, এমনকি চিৎকারও করতে পারল না, কসাই মারা পড়ল।
বেশ কিছুদূর চলে গিয়েছিল লাইলু। গত দিন যখন কসাই লাইলুর কাছে যায়, সে নিরোধ নিতে ভুলে গিয়েছিল। ফলে আবার বাজারে যেতে হয়েছিল ওটা কিনতে।
আজ যাতে ভুল সে দ্বিতীয়বার না করে সেটা বলবে বলে লাইলু ফের মাংসের দোকানে ফিরে এলো।
দূর থেকে কিছুই বুঝতে পারেনি। কাছে আসতেই দেখল, কসাই মরে পড়ে আছে আর কুকুরগুলো গ-র-র গ-র-র আওয়াজ করতে করতে কাঁচা মাংস খেয়ে চলেছে।
এর ফলে গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। গোস্ত বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেল। লাইলুর বিবরণ থেকে অনেকেরই সন্দেহ কুকুরের ওপর গিয়ে পড়েছিল; কিন্তু কেউই নিশ্চিত হতে পারেনি। সেইসঙ্গে লাইলুকে জড়িয়ে একটা গুজব এবং এই মৃত্যু আল্লাহর দেওয়া কিনা তা নিয়েও জল্পনা শুরু হলো।
কুকুরগুলোকে দীর্ঘদিন আর এলাকায় দেখা গেল না Ñ আম্রপলি গাছের গোড়ায়, বোসদের পরিত্যক্ত বাড়ির অন্দরে, মায় শ্মশান-সংলগ্ন নাগের ভেড়িতেও।
দিন কাটতে লাগল। সবকিছু আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসতে আসতে বর্ষাকাল এসে গেল Ñ নদীও ভরে উঠল জলে।
একদিন পূর্ণিমারাতে কুকুরদের প্রতি সন্দেহবশত যে-মৌলভি আল্লাহর কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ওদের শাস্তির জন্য মেহেরবানের কাছে দরবার করেছিলেন, তিনি গোটাকতক আঙুর খেতে খেতে মোবাইল চালিয়ে ভিডিও দেখছিলেন। সন্ধেবেলা বৃষ্টির আগে একটু ঝড়ও হয়েছে Ñ কারেন্ট নেই।
মৌলভি সাহেব কারো ডাকে সাড়া দিয়ে বললেন, আয় …।
সাকিনা ঘরে ঢুকল।
তিনি ভিডিও পস করে সাকিনাকে বললেন, কী বলবি!
সাকিনা বলল, কিছু না। আপনি চা খাবেন?
এখন তো দুধ দেওয়ার কথা। বললেন মৌলভি।
ভাবলাম বৃষ্টি হয়েছে। ঠান্ডা ঠান্ডা …। সাকিনা বলল। মৌলভি সাকিনার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, আজ তুই গায়ে কী মেখেছিস, ফর্সা দেখছি তোকে!
সাকিনা কিঞ্চিৎ গর্বের হাসি হাসল।
আবার গা থেকে খুশবুও বেরোচ্ছে। বললেন মৌলভি।
সাকিনা দাঁড়িয়ে রইল।
মৌলভি বললেন, দাঁড়িয়ে রইলি কেন! বোস এখানে।
সাকিনা ইতস্তত করতে করতে বলল, ভাত চাপাতে হবে।
মৌলভি উঠে গিয়ে সাকিনার হাত ধরে টেনে আনলেন Ñ
বোস এখানে। আঙুর খাবি?
সাকিনা কিছু বলল না।
মৌলভি বললেন, কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে দেখেছিস!
সাকিনা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ঘরে আলো জ্বলছিল, তাই বাইরেটা মিশমিশে অন্ধকার দেখা গেল।
মৌলভি সাকিনার কানে কানে বললেন, ছাদে চল। চাঁদের আলোয় আমরা আগের দিনের মতো …
সাকিনা বাটি থেকে একটা আঙুর তুলে নিল। বলল, আর দুধ! …
সেই মুহূর্তে উঠোন থেকে কারা মৌলভি সাহেব বলে ডাকল।
মৌলভি বললেন, তুই গরম কর। আমি শুনে আসি।
সাকিনা বলল, একেবারে ছাদে নিয়ে যাব?
মৌলভি বললেন, একটু মধুও নিস।
সাকিনা খিলখিল করে হেসে উঠল।
মৌলভি সাহেব বারান্দায় বেরিয়ে গেলেন।
জনাচারেক লোক পুবপাড়ার মসজিদের ছাদ ঢালাই হবে বলে মৌলভিকে নেমন্তন্ন করতে এসেছিল। খুব আন্তরিকতার সঙ্গে ওরা মৌলভি সাহেবকে হাত দুটো ধরে যেতে অনুরোধ করল। তবে খাসির গোস করতে পারেনি, গরুর গোসের আয়োজন করেছে বলে কুণ্ঠা প্রকাশ করায় মৌলভি বললেন, আল্লাহর নামে আয়োজন Ñ ওভাবে বলতে নেই ভাই।
লোকগুলো চলে গেলে ফিনফিনে মেঘ চাঁদটার দখল নিল আর তিনিও একবার উঠোনে নেমে দেখতে গেলেন আবার বৃষ্টি আসবে কিনা। এমন সময় কুকুরতিনটি তাঁকে আক্রমণ করল Ñ অতর্কিতে, অতি দ্রুততার সঙ্গে, সেভাবে ওরা এ-যাবৎ করে এসেছে।
মৌলভি শুধু একবার আওয়াজ করতে পেরেছিলেন।
সাকিনা তখন বাটিতে করে মধু আর এক গ্লাস দুধ নিয়ে ছাদে মাদুরের ওপর রঙিন বিছানার চাদর পেতে মৌলভির জন্য অপেক্ষা করছিল। মধু দিয়ে সাহেব কী করবেন Ñ সেই গা-শিরশিরে ভাবনাটা ভাবতে ভাবতে সে ভারি উদ্গ্রীব হয়ে উঠছিল। এমন সময় মৌলভির সামান্য চিৎকার যেন শুনতে পেল সে। তখন ফিনফিনে মেঘ ক্রমশ মোটা হয়ে চাঁদটাকে ঢেকে ফেলেছে।
মৌলভির গলার খানিকটা মাংস ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছিল। বাঘ বা ওইজাতীয় শ্বাপদই হয়তো ওভাবে কামড়াতে পারে। সবাই ভ্রƒ কুঁচকে ভাবতে লাগল, সেটা কীভাবে সম্ভব! যদিও আরো বিভ্রান্তিকর হলো, কসাইয়ের সঙ্গে মৌলভি সাহেবের সাদৃশ্যের প্রশ্ন। ফলে জটিল ধাঁধার সৃষ্টি হলো। পুলিশের বড়বাবু স্বয়ং এলেন। সবাইকে বোঝালেন, পোস্টমর্টেম করা দরকার। পুরসভার চেয়ারম্যান এবং আরো লোকজন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে এই মৃত্যুর রহস্যময়তার মধ্যে প্রবেশ করতে চাইলেন। যদিও শেষমেশ পোস্টমর্টেম না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং মরদেহ নাপাক হতে না দিয়েই কবর দেওয়া হয়।
কুকুরতিনটি তখন ভূত-পেতিœঠাসা শতাব্দীপ্রাচীন শ্যাওড়া গাছের তলায় আরামসে ঘুমোচ্ছিল।
যে-দুজন কসাই তখনো বেঁচে ছিল, ক্রমশ প্রথম দুই মৃত্যুর আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে উঠতে তৃতীয় মৃত্যুর প্রভাবে ফের আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। রাত্রে তাদের ঘুম হয় না। কেউ ডাকলে সাড়া দেয় না Ñ দিন-রাত প্রবল আতঙ্কে কাটে।
আষাঢ়ের শেষাশেষি সময় ছিল সেটা। কয়েকদিন পর দুজন অন্য তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে যখন নাগদের কুলবাগানে গিয়ে বসল, তখনো কসাইদের মধ্যে একজন কাউকে বলেনি যে, প্রতি মুহূর্তে সে একটি ছোরা সঙ্গে রাখা শুরু করেছে।
প্লাস্টিক পেপার খুলে মদ গলায় ঢালতে ঢালতে একজন বলল, ভেবে দেখেছ, প্রত্যেকে কিন্তু এক ডাকেই বাইরে এসেছিল!
অন্য কসাই বলল, মৌলভি সায়েব ছাড়া আর দুজনকে তো কেউ ডাকেনি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, Ñ ঠিক কথা Ñ বলল পাশের লোকটি।
কুকুরগুলো তখন কত আরামে আড়মোড়া ভাঙছিল। নদীতে জল বেড়ে উঠছে। আকাশে মেঘ করে এলে পাশের বাগানে একটা পাখির ডানা ঝাপটার শব্দ ভেসে এলে কুকুরগুলো ফের পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। আকাশে মেঘ ক্রমশ জমাট বাঁধতে শুরু করল। তখন দ্বিতীয় কসাই প্রথমজনকে বলল, চ, দুদিন কলকাতা থেকে ঘুরে আসি।
না, না। মন সায় দিচ্ছে না। বলল প্রথম কসাই।
এখানে এত ভয়ে ভয়ে কাটাচ্ছি। জানি না কোন জিনের খেলা! ভাবছিলাম শেফালির সঙ্গে দুদিন একটু …। তুই না গেলে আমি একাই যাব।
শেফালির কাছে? সে জিজ্ঞেস করল।
আর পারছি না। দু-তিনদিন ঘুরে না এলে …
চল যাই। বলল প্রথম কসাই।
কবে?
পরশু।
ফাইনাল তো?
শেফালিকে বলিস আমিও যাচ্ছি।
দ্বিতীয় কসাই খিলখিল করে হেসে উঠল।
হঠাৎই দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ল গায়ে। প্রথম কসাই বলল, তুই বাড়ি যা। আমি যাকিরের বাড়ি তাগাদা করে ফিরছি।
বৃষ্টি আসছে তো! অন্য কেউ বলল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ ওঠ তোরা। আর দেরি করা যাবে না।
রাস্তার মোড় থেকে প্রথম কসাই এবং অন্য তিনজন নাগরপুরের দিকে চলে গেলে, দ্বিতীয় কসাই বকুলতলার পাশ দিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াল।
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছিল। কসাই যখন বাজার পার করল, তখন দোকানপাট বন্ধ। দু-চারটি কুকুর অলসভাবে রাস্তার আশপাশে ঘুরঘুর করছে। মিষ্টির ফাঁকা দোকানে গালে হাত দিয়ে দত্তদের বড় ছেলে বসে আছে। সারাবাজারে বন্ধ দোকানের মধ্যে শুধু রমেশের টেলিফোন বুথ খোলা Ñ জেরক্স মেশিনটা তখনো চালু। মাছবাজারে মাছ-ধোয়া জল শুকিয়ে গন্ধে ভরিয়ে রেখেছে এলাকা Ñ মাছিগুলো ভনভন করে সেই শুকোতে থাকা আঁশ-মেশা জলের পাশে পাশে খাবার খুঁজে চলেছে। একটা রুগ্ণ বেড়ালের বাচ্চা বন্ধ মাছবাজারের আনাচে-কানাচে শুঁকে শুঁকে ফিরছে।
কসাই হাঁটতে লাগল। বাজার পার করে সে যখন পাড়ার দিকে চলেছে, সুনসান রাস্তার দুপাশে ধানক্ষেত আর একসারি
খেজুর গাছের পাশ দিয়ে, তখনই আচমকা কুকুর তিনটি তাকে আক্রমণ করল।
হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। ঘাড়ের কাছে কামড় খেল সে। কিন্তু অতি দ্রুততার সঙ্গে ছোরাটা বের করে গেঁথে দিলো কুকুরটার পেছনের দাবনায়। আর একটা কুকুর ধরাশায়ী কসাইয়ের মুখে কামড় বসাতে গেল। ছোরাটা তুলে নিয়ে ওটার গায়ে বসিয়ে দিতে গেলেই ছেড়ে দিলো সেটা। ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল।
কসাই তখন যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে রক্তমাখা ছোরা হাতে ছুটতে শুরু করল। তার গলা দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়তে লাগল। আর এভাবে ছুটতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেল সে। পথের বাঁকে, বন্ধ গমকলটার পাশে পড়ে রইল, যতক্ষণ না, প্রথম কসাই সে-পথে ফিরে এলো।
একটি রহস্যময় প্রশ্নে যবনিকা পড়লেও মনুষ্য সমাজের কাছে এ-কথা মেনে নেওয়া কঠিন যে, কুকুরের কামড়ে মানুষের এমন অবলীলায় মৃত্যু ঘটেছে। তাহলেও ডাক্তারি রিপোর্টে যখন কুকুরই সাব্যস্ত হলো, তখন মানুষের মনে আর সন্দেহের অবকাশ রইল না।
হিন্দুরা ব্যাপারটাকে মুসলমানি আচরণ বলে আখ্যা দিলেও মুসলমানরা কিন্তু জোট বাঁধল। সেদিন থেকে কুকুর নিধন কর্মসূচি শুরু হলো। একের পর এক কুকুর মারা পড়তে লাগল।
যদিও কসাই কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবে কুকুরতিনটির কথা। তার স্পষ্ট মনে আছে কুকুরগুলোর চোখ; তবু পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারে না। কিন্তু ‘ওই কুকুরগুলোকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না’ Ñ এ-কথা মুখে না বললেও খুব জোরের সঙ্গে ভেবে থাকে।
মাসখানেকের মধ্যে মনুষ্য এলাকার সমস্ত কুকুরই প্রায় মেরে ফেলা হলো। কুকুরের মহল্লায় যে-কটা কুকুর বেঁচে ছিল, তারা বাইরে আসত না। তাদের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াল খিদে। শ্মশানের পরিত্যক্ত অংশে বা নদীর ধারে যেসব জায়গায় লোকসমাগম হয় না, ওরা সেখানে জড়ো হতো। নদীতে যত পচা দেহ ভেসে যেত, দৈবাৎ সেগুলো পাড়ে এসে আটকালে ওরা খেতে পারত, না হলে ভেসে যাওয়া পচা দেহের দিকে তাকিয়ে থাকত চার পা জলে ডুবিয়ে।
একদিন গভীর রাত্রে চুপিচুপি ওই তিন কুকুর মহল্লায় ফিরে এলো। মহল্লায় মেয়ে কুকুরের সংখ্যা কমে গিয়েছিল। ওরা দেখল শক্তিশালীরাই অধিকার করে নিয়েছে নারীদের, অন্যরা আশপাশে সুযোগের আশায় লোভাতুর হয়ে প্রতীক্ষা করছে। সবার গায়েই গোষ্ঠীসংগ্রামের ক্ষতচিহ্ন।
কুকুরতিনটি মহল্লায় ফিরে এলে কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে যখন ওদের মধ্যে একজন এক কুকুরীর যৌনাঙ্গ শুঁকতে লাগল, তখন ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই নারীরই অধিকারী স্বাস্থ্যবান একটি কুকুর। অনেকক্ষণ লড়াই চলল দুজনের। কুকুরের দল দিশাহারা হয়ে আক্রমণ করতে লাগল একে অপরকে। অবশেষে স্বাস্থ্যবান কুকুরটিকে ফেরারি কুকুর খুব বাজেভাবে জখম করতে পারল। আর সেই রাতেই ওই কুকুরীর সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হতে পারল সে।
কিন্তু ওই দলেরই দ্বিতীয় কুকুর অন্য নারীকে দখল করতে পারল না। লড়াইয়ে সে বিশ্রীভাবে জখম হলো। তৃতীয় কুকুরটিকে অবশ্য সেই রাত থেকে আর মহল্লায় দেখা যায়নি। এমনকি আর কোনোদিনই তৃতীয় কুকুরটিকে দেখা গেল না।
দ্বিতীয় কুকুরটিও একদিনের জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিল। ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে নদীতে বান আসার আড়াই ঘণ্টা আগে যখন দ্বিতীয় কুকুরটি ফিরে এসেছিল, প্রথম কুকুরটি তখন নদী সাঁতরে ধরে আনতে চলেছে একটা বাছুরের ভেসে-যাওয়া পচা মৃতদেহ।
সেখানে তখন কোনো কুকুর ছিল না। প্রথম কুকুরের দখল করা কুকুরী একটা চারা দেবদারু গাছের গোড়ায় পেচ্ছাপ করলে দ্বিতীয় কুকুরটি এসে তা শুঁকল। তারপর শুঁকল ওই কুকুরীর যৌনাঙ্গ Ñ সে একবার দাঁত খিঁচিয়ে উঠলেও কুকুরটি কিন্তু পিছিয়ে গেল না। তারপর ক্রমে ক্রমে সে আরো ক্ষিপ্র হয়ে উঠতে শুরু করল।
যখন কামনার প্রচ- শক্তিতে সে উন্মাদ হয়ে উঠেছে, তখনই প্রথম কুকুরটি তাকে আক্রমণ করল। যৌনতাতাড়িত শরীরের সবটা শক্তি দিয়ে এবং যে-পদ্ধতি ওরা ব্যবহার করত একমুহূর্তে মানুষ মারতে, দ্বিতীয় কুকুর সেই আক্রমণ শানিয়ে প্রথম কুকুরটিকে মেরে ফেলল।
ওদের লড়াইয়ের সময় ভয়ে মুখ খিঁচাতে খিঁচাতে পেচ্ছাপ করে ফেলেছিল মেয়েকুকুরটি Ñ তারপর ভয় পেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে লাগল। আর যৌনতাতাড়িত বিজয়ী কুকুর ছুটতে লাগল ওর পেছনে।
যখন অবশেষে সে ওই কুকুরীকে ধরতে পারল, তখন ওরা বাজারের বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে। কুকুরীকে আত্মসমর্পণের সুযোগ না দিয়েই কুকুরটি তাকে সঙ্গমে বিদ্ধ করল।
আকাশের গায়ে পেঁজা-তুলো মেঘে একবার সূর্য ঢাকা পড়ল। আকাশে নীলের আধিক্য স্কুলে-যাওয়া ছেলেদের সাদা পোশাকে ঠিকরে পড়ছিল। ওরা আত্মবিস্তৃত দুই কুকুরের খেলা দেখে খুব মজা পেল। শরতের আকাশ ক্রমশ উদাস হয়ে উঠতে থাকল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরতের সাবালকত্ব বেশ গাম্ভীর্য সৃষ্টি করে Ñ এখন দিনটি সে-পথেই এগিয়ে যাচ্ছে।
কুকুর দুটিও সঙ্গমশেষে যখন পরস্পরের সঙ্গে জোড়া লেগে গিয়েছিল, তখন একদল লোক আচমকা কোথা থেকে ছুটে এসে কুকুর দুটির মাথায় বাঁশের বাড়ি মারলে ও দুটো একটু ছটফট করেই মারা পড়ে।
কুকুর নিধনের জন্য যে-দল গঠন করা হয়েছিল, ওরাই নিয়ম করে মরা কুকুর তুলে নিয়ে যেত। দেখা গেল, অন্য চার-পাঁচজন লোক এসে কুকুরদুটোর পা বেঁধে বাঁশে ঝুলিয়ে কাঁধে করে নিয়ে গেল।
যদিও ওরা মরা কুকুরগুলোকে ভাগাড়ে ফেলে দিত, না যতœ করে কবর দিত, তা কোনো দিনই জানা যায়নি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: