গ্যালারি কায়ায় ১৭ জন শিল্পীর দলীয় প্রদর্শনী শিল্পের সতেরো

লেখক: মোবাশ্বির আলম মজুমদার

ষাটের ঝলকানো চমক
অচল মুদ্রার মতো পড়ে থাকে
প্রথাবৃত্তে ঘুরপাক প্রাক-আশি
যেন মধ্যমাঠে পড়ে থাকা পিনদ্ধ যন্ত্রণা।
… এইখানে, মধ্যআশি বাঁক নিয়ে বাড়ালো পা
শিল্পের কাঠি হাতে স্বাগত নববই বলে হাঃ হাঃ
– শামীমুল হক শামীম, ‘নববই দশক’

গত শতকের মধ্যপঞ্চাশের দশকে শিল্পকলার প্রদীপ নিয়ে জেগে উঠেছিলেন যাঁরা, সেই অগ্রজ শিল্পী আমিনুল ইসলাম (১৯৩১-২০১১), মুর্তজা বশীর (১৯৩২), কাইয়ুম চৌধুরী (১৯৩২-২০১৪), সমরজিৎ রায় চৌধুরী (১৯৩৭), হাশেম খান (১৯৪১), রফিকুন নবী (১৯৪৩) ও হামিদুজ্জামান খানের (১৯৪৬) কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার পরের প্রজন্মের শিল্পীদের কাজ। এ-প্রদর্শনী আমাদের যুক্ত করে তিন প্রজন্মের শিল্পীদের কাজের মাধ্যমে। প্রদর্শনীতে মোট শিল্পকর্ম আটচল্লিশটি। সতেরোজন শিল্পী। গ্যালারির দেয়ালজুড়ে নানামাত্রিক কাজের সমাবেশ। বলা যায়, এ-প্রদর্শনী বাংলাদেশের শিল্পকলাচর্চার ধারাবাহিকতার খোঁজ দেয়।
অগ্রজ, অনুজ মিলে তিন প্রজন্মের শিল্পীদের কাজ পাঠ
করার সুযোগ পাই এ-প্রদর্শনীতে। শিল্পীদের কাজের ধরন, করণকৌশল, মাধ্যমের বৈচিত্র‍¨ ও নিরীক্ষাচর্চার খোঁজ মেলে এ-প্রদর্শনীর কাজে।
গতানুগতিক ধারার দলীয় প্রদর্শনীর বাইরে এ-প্রদর্শনী আলাদা গুরুতব রাখে। কারণ হলো, এটি একটি বারতা আমাদের জন্য দেয়, যা থেকে শিল্পের অনুরাগীরা পরম্পরাগত ধারণা অর্জন করতে সমর্থ হবেন।
এ-প্রদর্শনীর জ্যেষ্ঠ শিল্পী আমিনুল ইসলাম। তাঁর প্রদর্শিত শিল্পকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাজের নাম – ‘ভুলে যাওয়া সংগীতের ছন্দ’ বা, ‘রিদম অব ফরগটেন মিউজিক’। ছবিটি ১৯৬২ সালে তেলরঙে আঁকা। ছবিতে আমিনুল ইসলাম বেছে নিয়েছেন ছন্দোবদ্ধ জ্যামিতিক আকার। কালো রঙের জমিনে আকৃতিগুলো গতি পেয়েছে রেখা ও রঙের ব্যবহারে।
এ-প্রদর্শনীর গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী মুর্তজা বশীর। তাঁর পুরনো কাজের ধরনে এ-বছরই করা নারী সিরিজের দুটি কাজ রেখেছেন। কাজগুলো জ্যামিতিক আকারে গড়া। উজ্জ্বল রঙে, চৌকো
আকৃতির নারীমুখ। এ-মুখগুলোকে উজ্জীবিত মুখের জ্যামিতিক বিন্যাস বলা যায়।
কাইয়ুম চৌধুরীর প্রদর্শিত কাজের শিরোনাম ‘শিরোনামহীন’। আলট্রামেরিন নীল রঙের জমিনে কালো আর মেটে হলুদরঙা মাছ, নদী, নৌকা আর গাছের আকৃতি সাজিয়েছেন ধারাবাহিকভাবে। ছবির আবহমান বাংলার প্রতীকী রূপায়ণ আমাদের প্রকৃতিলগ্ন করে।
সমরজিৎ রায় চৌধুরীর কাজের শিরোনাম ‘অপেরা স্টার’ ও ‘সিম্ফনি ইন পেইন্টিং’। প্রতীক, রেখা আর অল্প রঙে সমরজিৎ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধন নির্মাণ করেন।
হাশেম খানের ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা ‘বাউল’ ছবিতে ক্যানভাসের এক কোণে বাউল ও অন্যান্য মানুষের সমাবেশ দেখা যায়। ছবির ওপরভাগে চড়া ব্রাশে রং লেপনের গতিতে অতিচেনা শিল্পকর্মকেই দেখতে পাই।
হামিদুজ্জামান খানের আঁকা ছবির শিরোনাম ‘চিটাগাং হিলট্র‍¨vক্টস এরিয়া’। ছবিটি ১৯৬৩ সালে জলরং মাধ্যমে এঁকেছেন। অ্যাকাডেমিক নিয়মরীতি মেনে আঁকা হামিদুজ্জামানের জলরং ছবি।
কালিদাস কর্মকারের দুটি কাজ দু-ধরনের। ‘শিরোনামহীন’ কাজটি দ্রুতলয়ে চলতে থাকা তুলির আঁচড়ে করা। অন্যটি ‘দ্য লেডি অ্যান্ড দ্য বার্ড’। এতে দ্বিমাত্রিক তলে ত্রিমাত্রিকতা দেখানোর প্রবণতা দেখা যায়। একরকম কিউবিস্ট বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে এ-কাজে।
চন্দ্রশেখর দে (১৯৫২) এ-প্রদর্শনীতে পাঁচটি কাজ রেখেছেন। একটি নিসর্গচিত্র, অন্যটির কাজে বাস্তবরীতি ভেঙে রং-রেখার ফোড়ন যুক্ত করেছেন। চন্দ্রশেখর দে ছবিতে বিষয়-আশয়ের সঙ্গে তার ভেতরের অবস্থা জ্যামিতিক আকারে প্রকাশ করেন।
মোহাম্মদ ইউনুস (১৯৫৪) এ-প্রদর্শনীতে দেখিয়েছেন ‘শেওলার গল্প’ শিরোনামে তেধলরঙের ছবি। দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে অংশের দৃশ্যমান রূপ নিয়ে তিনি ক্যানভাস গড়েন। এ-কাজে তাঁর নিজস্ব রীতির প্রকাশ দেখা যায়।
জামাল আহমেদ (১৯৫৫) বাস্তবরীতি মেনে ক্যানভাস গড়েন। প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষের মুহূর্তকে ছবির বিষয় করেন তিনি। এ-প্রদর্শনীতে রাখা তিনটি কাজের শিরোনাম যথাক্রমে ‘জিপ্সি’ ,‘রিভার ব্যাংক’ ও ‘বিফোর দ্য স্ট্রম’।
রফিকুন নবী গণমানুষের শিল্পী। তাঁর ছবির বিষয় সমাজের নিম্নবর্গের সাধারণ মানুষ ও তাদের জীবনযাপন। নগরকেন্দ্রিক ছিন্নমূল মানুষের জীবনযাপনের মুহূর্ত ঘিরে শিল্পীর সৃষ্টি। প্রদর্শনীতে রাখা ‘টোকাই’ ছবিটি নগরের যাপিত রঙিন জীবন নিয়ে আঁকা। কেমন করে অতিসাধারণ গাছের পাতা দিয়ে বাঁশি বানিয়ে পরম আনন্দে মেতে থাকে পথশিশুরা, সেটি প্রকাশ করেছেন শিল্পী।
কাজী রকিব (১৯৫৫) ছবির ক্যানভাসের সঙ্গে আলাদা বস্ত্ত জুড়ে দিয়ে শিল্পকর্ম নির্মাণ করেন। প্রদর্শনীতে তাঁর কাজের শিরোনাম ‘স্টিল লাইফ উইথ আলিফ’।
এছাড়া এ-প্রদর্শনীর অন্য উল্লেখযোগ্য শিল্পীরা হলেন – রণজিৎ দাস (১৯৫৬), আহমেদ শামছুদ্দোহা (১৯৫৮), শেখ আফজাল (১৯৬০), শিশির ভট্টাচার্য্য (১৯৬০) ও মোহাম্মদ ইকবাল (১৯৬৭)।
এ-প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য শিল্পীদের কাজে বাস্তব ধ্রম্নপদীর প্রকাশ যেমন রয়েছে, সেইসঙ্গে রয়েছে মাধ্যম ও বিষয়ে বিমূর্ত রূপের প্রকাশ। আটচল্লিশটি কাজের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে তেলরং, জলরং, অ্যাক্রিলিক, কালি-কলম, চারকোল, প্যাস্টেল ও পেনসিল।
বিষয়ে প্রকৃতিভাবনা থেকে শুরু করে মানুষ, সমাজ, রাজনীতি, গণমানুষ পর্যন্ত গড়িয়েছে। তাতে আমরা বুঝে নিই গত ছয় দশকের বাংলাদেশের শিল্পকলার পঠন-গঠন। গ্যালারি কায়ায় গত ২০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ-প্রদর্শনী শেষ হয় ৫ অক্টোবর।

Leave a Reply

%d bloggers like this: