বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের নানা পর্যায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ-জীবন কেবল একজন আজন্ম সংগ্রামী রাজনীতিকের জীবন নয়, এ জীবন শিল্প-সাহিত্যের রসে পরিপুষ্ট এক জীবন। বঙ্গবন্ধুর অন্তর্লোক সবসময় সমৃদ্ধ হয়েছে বই ও সংবাদপত্র পাঠ, গণমাধ্যম ও শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মানুষের সঙ্গে অনবরত মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। সংগত কারণেই ধারণা করা যায়, এই রূপ-রস থেকে সৃষ্ট চেতনা বঙ্গবন্ধুকে বিভিন্ন সময়ে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

এই নিবন্ধে আমরা লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আশৈশব যোগসূত্র এবং পরবর্তী সময়ে গ্রন্থাগারের প্রতি ভালোবাসা, এর গঠন ও উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু সরকারের অবদানসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো উন্মোচন করার চেষ্টা করব। এর মধ্য দিয়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর ভিন্ন এক স্বরূপকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করব। এ-লেখার শিরোনাম নিয়েছি স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর একটি উক্তি থেকে। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটি ধ্বংস করে দিলে দীর্ঘদিনের জমানো দিনলিপি হারিয়ে খেদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমার একটি সুন্দর লাইব্রেরি ছিল।’

দুই

বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি বই অসমাপ্ত আত্মজীবনী (২০১২), কারাগারের রোজনামচা (২০১৭) এবং আমার দেখা নয়াচীন (২০২০), তাঁর চিঠিপত্র, ডায়েরি, বক্তৃতার সূত্রে তাঁর গ্রন্থাগার, বইপ্রীতি, পাঠস্পৃহা সম্পর্কে জানা যায়। ছাত্রজীবন, রাজনৈতিক জীবন ও রাষ্ট্রনায়ক জীবনে তিনি পড়েছেন অসংখ্য গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকা। ব্যক্তিগত-পারিবারিক ও দলীয় পর্যায়ে স্থাপন করেছেন গ্রন্থাগারও।

১৯৪০-এর দশকের শুরুতে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে (এখনকার নাম মৌলানা আজাদ কলেজ) ভর্তি হওয়ার পর কলকাতায় অবস্থানকালে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিমের স্নেহধন্য হন। আবুল হাশিম ছিলেন উদারপন্থী এবং প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। আবুল হাশিম বঙ্গবন্ধুকে লাইব্রেরি গড়া এবং লেখাপড়া-পঠনপাঠন সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘হাশিম সাহেব আমাদের বললেন, একটা লাইব্রেরি করতে হবে, তোমাদের লেখাপড়া করতে হবে।’ অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা প্রায়ই লীগ অফিসে কাটাতাম। রাতে একটু লেখাপড়া করতাম।’

১৯৫২ সালের ২ থেকে ১২ অক্টোবর চীনের পিকিংয়ে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে এ-সম্মেলনে যোগ দেন। ২৫ দিনের সফরের ওই কাহিনি নিয়ে লেখা আমার দেখা নয়াচীন বইয়ের একাধিক জায়গায় লাইব্রেরির প্রসঙ্গ এসেছে। চীনের বিভিন্ন স্থানে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি দেখে তিনি আপ্লুত হয়েছেন। ৭৫ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘আমরা লাইব্রেরি দেখতে যাই। শুনলাম সাংহাই শহরের মধ্যে সকলের চেয়ে বড় পাবলিক লাইব্রেরি। খুবই বড় লাইব্রেরি, সন্দেহ নাই, ব্যবস্থাও খুব ভালো। রিডিং রুমগুলি ভাগ ভাগ করা রয়েছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়ার জন্যও একটা রুম আছে। সেখানে দেখলাম ছোটদের পড়বার উপযুক্ত বইও আছে বহু, ইংরেজি বইও দেখলাম। লাইব্রেরির সাথে ছোট একটা মাঠ আছে, যেখানে বসবার বন্দোবস্ত রয়েছে। মাঠে বসে পড়াশোনা করার মতো ব্যবস্থা রয়েছে। আমার মনে হলো কলকাতার ইমপেরিয়াল লাইব্রেরির মতোই হবে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, লাইব্রেরিটা বহু পুরানা। চিয়াং কাইশেক সরকারও এর কিছুটা উন্নতি করেছিল।’

পিকিং শহরে বঙ্গবন্ধু সাক্ষাৎ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনাব হালিমের সঙ্গে, যিনি শহরের অন্যতম বড় লাইব্রেরিটির মালিক। জনাব হালিম ছিলেন একজন চীনা মুসলিম। কীভাবে তিনি এ-রকম একটি লাইব্রেরির মালিক হলেন সে-গল্প তিনি বলেছেন লেখক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে। তখন বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। পিকিং শহর কমিউনিস্টরা দখল করেছে। চিয়াং কাইশেকপন্থীরা পালাচ্ছেন। ৬১ নম্বর পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘প্রফেসর বললেন, রাস্তায় বের হলাম। দেখি সস্তায় জিনিসপত্র বিক্রি করছেন ধনী লোকেরা। … আমি বইয়ের দোকানের কাছে গেলাম। দেখি সকলের চেয়ে বড় যে দোকান তার বই বিক্রি করবে বলে ঘোষণা করছে। খদ্দের কোথায়। সকলেরই তো ইয়া নফছি ইয়া নফছি। … বই বাছতে আরম্ভ করলাম। দোকানদার বললেন, বেছে লাভ নেই। সমস্ত বই কত টাকা দেবেন বলেন। … সামান্য অর্থে বইগুলো পেলাম। আজ সমস্ত পিকিংয়ের মধ্যে আমার লাইব্রেরিটি বড়। আমি বই বিক্রি করি না। ওটা আমার নিজস্ব পড়বার লাইব্রেরি। এখন পাবলিক আমার লাইব্রেরিতে এসে লেখাপড়া করতে পারে। … বিপ্লবে আমার জীবনের একটা আশা পূর্ণ হয়েছে। সে হলো লাইব্রেরি। বহুদিন থেকে ভাবতাম, আমার একটা নিজস্ব বড় লাইব্রেরি চাই। সে আশা পূর্ণ হলো।’

লক্ষ করুন, বঙ্গবন্ধু গ্রন্থাগারপ্রেমী মানুষ না হলে তাঁর সঙ্গে প্রফেসর হালিমের দেখা হলেও গ্রন্থাগার বা বইয়ের এতসব প্রসঙ্গ হয়তো আসতো না। আর এলেও নিজের লেখায় এতসব উল্লেখ করতেন না বঙ্গবন্ধু। তিনি গ্রন্থাগারপ্রেমী মানুষ ছিলেন বলেই এত আন্তরিকতার সঙ্গে অধ্যাপক হালিমের বড় লাইব্রেরির মালিক হওয়ার গল্প তুলে ধরেছেন।

বই, পত্রপত্রিকা পাঠ ও লাইব্রেরির প্রতি বঙ্গবন্ধুর এই আগ্রহ গড়ে উঠেছিল পরিবার থেকে। বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জ দেওয়ানি আদালতের একজন সেরেস্তাদার হয়েও চিন্তায়-মননে ছিলেন প্রগতিশীল। তাঁদের গোপালগঞ্জের বাড়িতে নিয়মিতভাবে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক ও মাসিক পত্রিকা রাখা হতো। এ-সম্পর্কে জানা যায় তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমার আব্বা খবরের কাগজ রাখতেন। আনন্দবাজার, বসুমতী, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাত। ছোটকাল থেকে আমি সকল কাগজই পড়তাম।’

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারটি ছিল তাঁর শয়নকক্ষ। ১৯৬৬ সালে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির দ্বিতীয়তলার নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নিচতলার এই কক্ষেই শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু দম্পতি বাস করতেন। দ্বিতীয়তলায় বসবাস শুরু হলে বঙ্গবন্ধু এই কক্ষটিকে ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই গ্রন্থাগারে রবীন্দ্র রচনাবলী, নজরুল রচনাবলী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বার্নার্ড শ, বার্ট্রাল্ড রাসেল, শেলি, কিটসসহ অসংখ্য লেখকের বই ছিল। বঙ্গবন্ধু নিবিষ্টমনে গ্রন্থাগারে বসে পড়তেন এবং নতুন নতুন বই সংগ্রহ করে এই লাইব্রেরিতে রাখতেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই বাড়িতে হঠাৎ আক্রমণ চালালে গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর এই ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারটিও। বঙ্গবন্ধু রাত ১২টা ৩০ মিনিটে এই গ্রন্থাগার থেকেই বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেই হিসেবে এই গ্রন্থাগারটিও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

১৯৭১ সালের পর আবার এই লাইব্রেরিটি শত্রুর নিশানায় পড়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ওই রাতে হিংস্র ঘাতকের গুলির আক্রমণে তছনছ হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর এই ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারটি ও সংরক্ষিত বইসমূহ। গ্রন্থাগারের কয়েকটা বইয়ের ভেতরে এখনো গুলি রয়েছে। গুলিবিদ্ধ বইগুলোর মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবি সংবলিত শ্রদ্ধাঞ্জলি বইটিও আছে। গ্রন্থাগারে জাতির পিতার শিশুপুত্র শেখ রাসেলের স্কুলের বাড়ির কাজের লেখা দুটো খাতা। এই গ্রন্থাগারের টেবিলের ওপরে আজো প্রদর্শিত হচ্ছে গণপ্রজাতন্ত্রী  বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল কপি। আরো আছে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের কাছ থেকে উপহার পাওয়া বড় একটা কুরআন শরিফ। পুনরায় বলা, এই গ্রন্থাগারটি ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। (তথ্যসূত্র : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর ওয়েবসাইট) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারটিকে কতটা ভালোবাসতেন তা জানা যায় ১৯৭২ সালে নিউইয়র্ক টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার থেকে। ধানমণ্ডির ৩২নং বাড়িতে গৃহীত ওই সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানি ফৌজ আমার সবকিছু লুণ্ঠন করেছে। কিন্তু এই বর্বর বাহিনী আমার আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, আমার সন্তানদের দ্রব্যসামগ্রী লুণ্ঠন করেছে তাতে আমার দুঃখ নাই। আমার দুঃখ, ওরা আমার জীবনের ইতিহাসকে লুণ্ঠন করেছে। আমার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনের দিনলিপি ছিল। আমার একটি সুন্দর লাইব্রেরি ছিল। বর্বররা আমার প্রত্যেকটি বই আর মূল্যবান দলিলপত্র লুণ্ঠন করেছে। সবকিছুই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিয়ে গেছে।’ (সালিম, ১৯৯৮, পৃ ১০৪) ২০১৪ সালে আগামী প্রকাশনী প্রকাশিত শেখ মুজিব আমার পিতা গ্রন্থে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘এ বাড়িটি যখন ১৯৮১ সালের ১২ জুন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাত্তার সাহেবের নির্দেশে খুলে দেওয়া হলো, তখন বাড়িটির গাছপালা বেড়ে জঙ্গল হয়ে আছে। মাকড়সার জাল, ঝুল, ধুলোবালি, পোকামাকড়ে ভরা। ঘরগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন। গুলির আঘাতে লাইব্রেরি ঘরের দরজা ভাঙা, বইয়ের আলমারিতে গুলি-কাচ ভাঙা, বইগুলো বুলেটবিদ্ধ, কয়েকটা বইয়ের ভেতরে এখনো বুলেট রয়েছে। একটা বইয়ের নাম ছিল ‘শ্রদ্ধাঞ্জলী’, বইটির উপরে কবি নজরুলের ছবি। বইটির ভেতরে একখানা আলগা ছবি একজন মুক্তিযোদ্ধার, বুলেটের আঘাতে বইটি ক্ষত-বিক্ষত। মুক্তিযোদ্ধার ছবিটির বুকের ওপর গুলি। ঠিক ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে এ বাড়িতে যে আক্রমণ হয় তা হলো ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ। এ বইটির দিকে তাকালে যেন সব পরিষ্কার হয়ে যায়।’ (পৃ ৭০-৭১)

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন লেখক-সাংবাদিক রবার্ট পেইনের লেখায়ও রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত লাইব্রেরির প্রসঙ্গ। তাঁর লেখায় পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর গ্রন্থাগারে জর্জ বার্নার্ড শ, বার্ট্রান্ড রাসেলের রচনাবলি,  বুকসেলফে  বাঁধাই  মাও সে তুং-স্বাক্ষরিত ছবির উল্লেখ।

শুধু ব্যক্তিগত লাইব্রেরি নয়, বঙ্গবন্ধুর পাঠস্পৃহা এবং বইপ্রীতির নিদর্শন ছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিস পর্যন্ত। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছিল কয়েক হাজার বইসমৃদ্ধ পাঠাগার। এই পাঠাগারে দেশীয় গ্রন্থ ছাড়াও ছিল জার্মানি, বুলগেরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া বই। এই পাঠাগার খোলা থাকত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। দলীয় কার্যালয়ে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল দলীয় কর্মীদের পাঠমনস্কের মাধ্যমে রাজনীতি-ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষিত ও সচেতন করে তোলা।

কারাজীবনে খুঁজেছেন কেবল বই

বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য লড়াইয়ে নেমে বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়েছিল বারবার। কারাকক্ষেও তিনি খুঁজেছেন বাংলা বই ও পত্রিকা। জেলবন্দি নিঃসঙ্গ জীবনেও বই ছিল বঙ্গবন্ধুর একমাত্র অবলম্বন। কারাগারের রোজনামচায় এর বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে।

‘প্রাণটা আমার হাঁপাইয়া উঠছিল, সহ্য করা কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। বাংলা বই পাওয়ার উপায় নাই। অফিসার মেসের যে ছোট লাইব্রেরি আছে তাতে কোনো বাংলা বই নাই, সমস্তই প্রায় ইংরেজি ও উর্দুতে। হেডকোয়ার্টার লাইব্রেরি থেকে মেজর গোলাম হোসেন চৌধুরী আমাকে দু-একখানা এনে দিতেন। ভদ্রলোকও খুব লেখাপড়া করতেন। কোনো বাংলা বই বোধ হয় সেখানে নাই। খবরের কাগজ পড়া নিষেধ, তাই বাংলা কাগজ পড়ার প্রশ্ন আসে না।’

২১ ডিসেম্বর, ১৯৫০ সালে ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট জেল থেকে বঙ্গবন্ধু একটি চিঠি লিখেছিলেন গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। সেই চিঠিটি তৎকালীন সরকার বাজেয়াপ্ত করলেও গবেষকরা পরবর্তী সময় উদ্ধার করেন। সেই চিঠিটিতে লেখা আছে – ÔLast October when we met in the Dacca Central Jail gate, you kindly promised to send some books for me. I have not yet received any book. You should not forget that I am alone and books are the only companion of mineÕ| (নিরীক্ষা, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০১২, প্রেস ইনস্টিটিউট, ঢাকা) ১৯৫১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেনের (মানিক মিয়া) কাছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এক চিঠিতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,

মানিক ভাই                  ১২-০৯-৫১

আমার সালাম নেবেন। আমার মনে হয় আপনারা সকলে আমার জন্য একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমি জেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। চিকিৎসার চেষ্টা খুবই হইতেছে …। আমার জন্যে কিছুই পাঠাবেন না। আমার কোনো কিছুরই দরকার নাই। নতুন চীনের কিছু বই পত্রিকা যদি পাওয়া যায় তবে আমাকে পাঠাবেন। …। আপনার ছোট ভাই মুজিব

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘১৯৪৯ থেকে আব্বা যতবার জেলে গেছেন কয়েকখানা নির্দিষ্ট বই ছিল, যা সব সময় আব্বার সঙ্গে থাকত। জেলখানার বই বেশিরভাগই জেল লাইব্রেরিতে দান করে দিতেন, কিন্তু আমার মা’র অনুরোধে এই বই কয়টা আব্বা কখনো দিতেন না, সঙ্গে নিয়ে আসতেন। তার মধ্যে রবীন্দ্র-রচনাবলী, শরৎচন্দ্র, নজরুলের রচনা, বার্নার্ড শর কয়েকটা বইতে সেন্সর করার সিল দেওয়া ছিল। … মা প্রচুর বই কিনতেন আর জেলে পাঠাতেন। নিউ মার্কেটে মা’র সঙ্গে আমরাও যেতাম। বই পছন্দ করতাম, নিজেরাও কিনতাম। সব সময়ই বই কেনা ও পড়ার একটা রেওয়াজ আমাদের বাসায় ছিল। প্রচুর বই ছিল। সেই বইগুলো ওরা (পাকিস্তানিরা) নষ্ট করে। বইয়ের প্রতি ওদের আক্রোশও কম না। আমার খুবই কষ্ট হয় ওই বইগুলোর জন্য যা ঐতিহাসিক দলিল হয়ে ছিল, কিন্তু ১৯৭১ সালে সবই হারালাম।’ (শেখ মুজিব আমার পিতা, শেখ হাসিনা,  আগামী  প্রকাশনী,  ২০১৪,  পৃ ৭০-৭১)

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে গ্রন্থাগারের জন্য বরাদ্দ ও উন্নয়ন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের শিক্ষা ও গ্রন্থাগার উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রেখেছিলেন, যার প্রতিফলন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে দেখতে পাই। তিনি স্পষ্টত অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, জাতির মেধা ও মনন গঠনের জন্য গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে শিক্ষা খাতে ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা বেশি বরাদ্দ করেছিলেন। কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় গ্রন্থাগার ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। (দৈনিক সংবাদ, ১৯ জুলাই, ১৯৭২)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির হাজার  বছরের  ইতিহাস-ঐতিহ্য  ও সাহিত্য-সংস্কৃতির মূল্যবান উপাদান সংগ্রহ ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতর প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্য দিয়ে চারদিকে যেন বইকেন্দ্রিক উৎসাহের বান ডাকে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বই প্রকাশ, প্রচার, বিপণন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণে এগিয়ে আসে নতুন উদ্যম নিয়ে। আয়োজন করে ঢাকায় আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলা (১৯৭২), জাতীয় গ্রন্থমেলা (১৯৭৪) এবং চট্টগ্রামে জাতীয় গ্রন্থমেলার (১৯৭৫)। গ্রন্থকেন্দ্রের মাসিক পত্রিকা বই নতুন আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশে বই-এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে (সপ্তম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা)। এ-সংখ্যায় সর্বমোট লেখার সংখ্যা ছিল ৪২টি। এর মধ্যে কবিতা ছিল ৩৬টি। অন্নদাশঙ্কর রায়ের বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা সেই বিখ্যাত কবিতা ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান’ও ছিল এ-সংখ্যায়।

১৯৭২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী গ্রন্থ-প্রদর্শনী। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ-উপলক্ষে এক বাণী দেন। তিনি আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ উৎসব ও গ্রন্থ-প্রদর্শনীর সাফল্য কামনা করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর বাণীতে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ পালন উপলক্ষে গভীর আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এর ফলে বাংলাদেশের জনগণ বিশ্বের শান্তিকামী ও জ্ঞানপিপাসু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।

ইতিহাসের পথ ধরে গ্রন্থাগার দিবস

বর্তমানে বাংলাদেশে যে-গ্রন্থাগার দিবস পালন করা হয় সে কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রতিবছর ৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটা ছিল এদেশে গ্রন্থাগার-আন্দোলন এবং এর কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি। গ্রন্থাগার দিবস পালনের ঘোষণা এদেশের অগণিত গ্রন্থাগার পেশাজীবী, গ্রন্থপ্রেমী এবং গ্রন্থাগারিকতার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়, যা গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের মধ্যে নবজাগরণের জন্ম দেয়।

৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসে গণগ্রন্থাগার অধিদফতর-আয়োজিত বিশেষ ক্রোড়পত্রে মহাপরিচালক মো. আব্দুল মান্নান ইলিয়াস লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবনে বই ছিল এক অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত পারিবারিক লাইব্রেরিতে ছিল বিভিন্ন বিষয়ের বইয়ের এক অতুলনীয় সমাহার। জেলখানায় বই পড়ার সাথে সাথে তিনি লিখতেন রোজনামচা। তাঁর লেখনীসমৃদ্ধ দুটি বই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ আজ সারা বিশ্বে সমাদৃত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর বইপ্রেম চরিত্রটি তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যেও প্রকাশিত।’

বঙ্গবন্ধুর সেই লাইব্রেরি

ধানমন্ডির বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সেই লাইব্রেরি যেন আবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে বর্তমান প্রজন্মের জন্য। ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু ভবনের পেছনে সম্প্রসারিত ভবনের পঞ্চমতলায় লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০১১ সালের ২০ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা আনুষ্ঠানিকভাবে সম্প্রসারিত জাদুঘর এবং লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মজীবনের রেফারেন্সসেবা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠালাভ করে। এই গ্রন্থাগারে বর্তমানে দশ হাজারের বেশি বই সংগৃহীত আছে। বেশির ভাগ বই বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণআন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবদান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক, বাংলাদেশের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর দর্শনের ওপরে। এছাড়া বিভিন্ন ভাষার বই লাইব্রেরিতে সংগৃহীত আছে। প্রতিদিন গড়ে দুশো পাঠক লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতে আসেন।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাগ্যবিড়ম্বিত এই জাতিকে একটি দেশ উপহার দিয়েছেন। একজন রাজনীতিবিদ ও একজন ব্যক্তি মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে; কিন্তু একজন বই ও গ্রন্থাগার প্রেমী বঙ্গবন্ধুকে জাতির সামনে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। এই গবেষণাকাজে বিলম্ব করার বোধ করি আর অবকাশ নেই। এ-কাজ যিনি শুরু করবেন, তিনি ব্যক্তি হোন বা প্রতিষ্ঠান, ঢাকার প্রধান প্রধান বেসরকারি পাঠাগার সব সময় সর্বতোভাবে তাঁর পাশে থাকবে, এটুকু আশ্বাস আমি দিতে পারি।

তথ্যসূত্র

১. দৈনিক সংবাদ, ১৯ জুলাই ১৯৭২।

২. জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর ওয়েবসাইট।

৩. বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি বই অসমাপ্ত আত্মজীবনী (২০১২), কারাগারের রোজনামচা (২০১৭) এবং আমার দেখা নয়াচীন (২০২০)।

৪. নিরীক্ষা, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০১২, প্রেস ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

৫. শেখ মুজিব আমার পিতা, শেখ হাসিনা,  আগামী প্রকাশনী, ২০১৪।

৬. সালিম, ১৯৯৮, পৃ ১০৪।

Leave a Reply