চলমান সময়ের চালচিত্র

লেখক:

ইব্রাহিম ফাত্তাহ্

আমাদের চারপাশে নানা অসঙ্গতি। বিবেকহীন রাজনীতির কলুষ ও অপরাধের ভয়াল থাবা সমাজকে দূষিত করছে। তথ্যপ্রযুক্তি সূত্রে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার চিত্র ও বয়ানে উঠে আসছে মানুষের মানবিক বিপর্যয়। সভ্যতার এই চরম উন্নতির কালে কী হচ্ছে এসব! এই অস্থিরতা আমাদের একার নয়, এই ভূ-ভাগের দেশে-দেশে শত কোটি মানুষের।

সর্বগ্রাসী পুঁজির নখর আর ক্ষমতালোভের পাল্লায় আক্রান্ত হচ্ছে মানবতা। জাতীয় প্রবৃদ্ধির উল্টোদিকে বাড়ছে – লক্ষ্যহীন বাণিজ্যিক শিক্ষাব্যবস্থা, মুনাফাসর্বস্ব খাদ্য বিপণন ব্যবস্থা। বিষাক্ত খাবার খেয়ে হাঁসফাঁস করা মানুষের অসহায় মুখ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিপথগামী হচ্ছে তরুণ সমাজ। আক্রান্ত হচ্ছে সংসার, সমাজ, নিসর্গ ও পরিবেশ। তরুণ চিত্রকর হারুন অর রশীদ টুটুলের চিত্রপটজুড়ে সমাজবাস্তবতার এমনসব সাম্প্রতিক বার্তাই পেয়ে যাই আমরা।

ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে ‘কালচিত্রের বাহাস’ শিরোনামে তাঁর এই একক চিত্রপ্রদর্শনী চলেছে। গত ২৭ জুলাই সোমবার থেকে শুরু হয়ে দশ দিনব্যাপী আয়োজিত এ-প্রদর্শনী শেষ হয়েছে ৫ আগস্ট বুধবার। দেশে-বিদেশে আয়োজিত অনেকগুলো দলীয় চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশ নিলেও এটিই তাঁর প্রথম একক। শিল্পী তাঁর এ-প্রদর্শনী উৎসর্গ করেছেন অকালে পরলোকগত মায়ের স্মৃতির উদ্দেশে। প্রদর্শনীতে জায়গা পেয়েছে গত চার বছর (২০১২-১৫) ধরে আঁকা শিল্পীর পঁচিশটি চিত্রকর্ম।

আশার কথা, আমাদের দেশের ক্রিয়াশীল অনেক শিল্পীই সমাজের ভেতর ও বাইরের বাস্তবতা নিয়ে ভাবেন এবং আঁকেন। সেই আশির দশকের সময় শিল্পীদল এ-ধারাটিকে বেগবান করেন। এ দলের বেশিরভাগ শিল্পীই এখন প্রতিষ্ঠিত। ঢালি আল মামুন, নিসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্যরা এখনো সক্রিয় আছেন সমাজের নির্মম চেহারাটা ফুটিয়ে তুলতে। নাজলি লায়লা মনসুর, শিল্পী মোস্তফা জামান, রনি ইসলাম এবং চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বেশ কজন প্রতিষ্ঠিত ও নবীন শিল্পীসমাজ বাস্তবতা ও ফ্যান্টাসি নিয়ে আঁকেন।

শিল্পী হারুন অর রশীদের জন্ম ১৯৭৬ সালে জয়পুরহাটে। তাঁর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ওখানেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগ থেকে ১৯৯৯ সালে স্নাতক সম্মান এবং ২০০১ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে সেখানেই শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে তিনি চারুকলা অনুষদের সহকারী অধ্যাপক।

দূর-শৈশবের গল্প আর কল্পনার রাজ্য থেকে আজকের নগরজীবনের রূঢ় বাস্তবতায় অবগাহন করে শিল্পী হারুন তাঁর চিত্রপটে তুলে এনেছেন চারপাশের মানুষ, পরিস্থিতি ও সমাজের হালচালের টুকরো-টুকরো কাহিনি। তিনি দেখিয়েছেন ক্ষমতালিপ্সুর নির্মমতা, লোভ ও তার হাত ধরে ওঠে আসা পেশিশক্তির দাপটে সংঘাত, হানাহানি। ক্রমবর্ধিত সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের বিপদ নিয়েও টুটুল তাঁর চিত্রপট সাজানোর প্রয়াস পেয়েছেন। বাণিজ্যের করপোরেট চেহারার পেছনে মুনাফার নির্মম নিগড়ে আবদ্ধ জনজীবনের অসহায় আত্মসমর্পণ যেমন চিত্রিত করেছেন শিল্পী, তেমনি এসবের বিরুদ্ধে মানুষের মনে বিষোদ্গার সৃজনের সম্ভাবনাকেও সচেতনভাবে জাগ্রত রেখেছেন তিনি।

করণকৌশলে এই শিল্পীর আঁকার ধরন বাস্তবতার কাছাকাছি। কখনো স্পষ্ট, কখনো অস্পষ্টভাবে বিষয়কে তুলে ধরেন। রেখাঙ্কনের মাধ্যমে অগ্রসর হয়ে বর্ণপ্রলেপে চিত্রচরিত্রে টেক্সচার যুক্ত করে চিত্রকর্মকে আকর্ষণীয় করে তোলেন। ক্যানভাস দেখে বিভ্রান্তি জাগে, এগুলো ডিজিটাল প্রিন্ট কিনা! না – টেকনিকটাই এমন যে, রং প্রয়োগের বিশেষ ধরনে অমন ভাবা অস্বাভাবিক নয়।

বেশিরভাগ চিত্রের পরিপ্রেক্ষিত পাখির চোখে অর্থাৎ ঊর্ধ্ব থেকে দেখা। নগর স্থাপনা, রাজপথ, মানুষ সব যেন ওপর থেকে নিচে ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। এতে পরিস্থিতির ভীতি ও বিষাদ প্রকট হয়ে আরো নাড়া দেয় দর্শককে।

মেধা পাচার তাঁর এমনই একটা কাজ। নবীন একজন মেধাবান মানুষের নিচু লালচে মুখভঙ্গিমা এমন যে, সে বুঝি তন্দ্রায় আচ্ছন্ন। তবে তাঁর উন্মুক্ত মস্তিষ্কের নানা অংশ দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে নানাদিকে ছুটে চলেছে বিমান। দরিদ্র দেশ থেকে উচ্চশিক্ষা, অর্থ আর প্রতিষ্ঠার প্রলোভনে প্রতিবছর যে অসংখ্য মেধা পাচার হয় সেটিই প্রতীকীভাবে তুলে এনেছেন টুটুল।

এ-সময়ের বাস্তব অবস্থা নিয়ে শিল্পী ‘সময় ও বাস্তবতা’ শিরোনামে সিরিজ ছবি এঁকেছেন। এর একটিতে নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনা উঠে এসেছে। পোশাকি অবয়বে হত্যাকারীদের অ্যাকশন, হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া মানুষ, সেলাই করা ইটের বস্তা, টাইমবোমা, কিছু চেনা শব্দের গ্রাফিক এসব নানা উপাদানে সমৃদ্ধ রেখাচিত্র দিয়ে নির্মম এই হত্যাকান্ডের চিত্র তুলে এনেছেন শিল্পী।

একধরনের নাটকীয় মেজাজ ও আবহ মেলে তাঁর চিত্রকর্মে যেগুলো বাস্তব, আবার বাস্তবতার ঊর্ধ্বে পরাবাস্তবতার পথে ডানা মেলেছে। যেমন সময় ও বাস্তবতা সিরিজের ৬ সংখ্যক চিত্রে আমরা অবলোকন করি একটি চেয়ারকে কেন্দ্র করে প্যাঁচা, শকুনি, বেড়াল, ঘোড়ারূপী আবাবিল প্রভৃতির বিচরণ চলছে। এ যেন ক্ষমতার চেয়ারকে বলয় করে ক্ষমতাবান হওয়ার লড়াইয়ের প্রতীক।

চারপাশে আক্রমণোদ্যত কাক ও কুমিররূপী হিংস্র হায়েনার কবলে পড়া শিশুসন্তান-কোলে ভয়ার্ত এক নারীর অবয়ব অনুষঙ্গ নিয়ে শিল্পী রচনা করেছেন ‘ভীত নারী’। সমাজে, পথে-ঘাটে সর্বত্র নারীর নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতার রূঢ় চিত্র এটি। একদিকে ফ্যাশন আর পণ্যে আসক্ত তরুণ-তরুণীর রঙিন জগৎ, অন্যদিকে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় পরাজিত তারুণ্যের পরিণতি উঠে এসেছে ‘সময় ও বাস্তবতা ২’ শীর্ষক চিত্রে।

পলিথিন ব্যবহার প্রবণতা নিয়ে শিল্পী এঁকেছেন ম্যাট্রো পলিথিন সিটি। অন্য কয়েকটি চিত্রকর্মের শিরোনাম হলো – ‘ট্রেইল অ্যান্ড ড্রেসট্রাকশন’, ‘কনজ্যুমার রিয়ালিটি’, ‘এক্সপ্লোডিং সিটি’ প্রভৃতি।

কিছু আশার দিকও আমরা লক্ষ করলাম তাঁর চিত্রকর্মে। শিল্পীর মননের গভীরে চৈতন্যের ভেতর বাড়িতে থাকা প্রাণ ও প্রকৃতির চিরন্তন প্রবাহ, আমাদের ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও  উঠে এসেছে তাঁর কতক চিত্রকর্মে। শিল্পী প্রদর্শনীর ব্রোশিওরে লিখেছেন – কাঙ্ক্ষিত সমাজ আর দৃশ্যমান বাস্তবতার ফারাক এই দুই বিপরীতমুখী ছবির সংঘাতে ক্ষত-বিক্ষত মানুষের মুখচ্ছবি, তাঁর চোখের সামনের ছবিটাই আঁকার চেষ্টা করেছেন তিনি। তিনিও স্বপ্ন দেখেন মানসপটে থাকা দেশের ছবিটা বাস্তবের কোলাজে এসে মিলুক।