চাপাপড়া ভালোবাসা

লেখক:

জুলফিকার মতিন
আছে বটে একটা, কিন্তু সেটাকে বিছানা না বললেই ভালো হয়। একটা চাটাই, আর একটা বালিশ নামের বস্ত্ত। দেখেই বোঝা যায়,
বহু ব্যবহার্য। ফেলে দেওয়ার বয়স এসে গেছে। কিন্তু চাকর-বাকর? তাদের হক কি মারা যায়! একসময় নিশ্চয়ই ওটা ভরা ছিল শিমুলের তুলা দিয়ে। ‘ভুল না আমায়’ লেখা ওয়াড় মাথায় দিয়ে তাতে কেউ কখনো ঘুমিয়েছে কি না, তা অবশ্য দেলখোশ জানে না, কিন্তু টেলিভিশনে জলেপড়া ছবির মতো এসে-এসে ভেঙে-ভেঙে যায়, এরকম লোভনীয় মেয়েদের কারো-না-কারো স্পর্শ লেগে আছে, সেটা সে দেখতেও পারত কল্পনা করে।
ভাবতে তো ভালোই লাগে…
সুন্দরী।
টোববা গাল।
টিকালো নাক।
স্ফুরিত অধর।
ডান কাত হলেও যা – বাঁ-কাত হলেও তাই। সবই লেপটে থাকত বালিশের সঙ্গে। সেসব ভেবে-ভেবে নিজেরও উত্তেজিত হয়ে পড়তে সময় লাগত না। সত্মন-নিতম্ব – এগুলো তো পরের ব্যাপার। রাতের বিনিদ্র প্রহর ভরে তুলতে আর কী লাগে?
তবে সেসব কিছুই হয়নি দেলখোশের।
গৃহকর্ত্রী ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন – এটা মাথায় দিবি।
দেলখোশ জিনিসটা হাতে নিয়ে দেখে বালিশ বটে! দলা পাকিয়ে জায়গায়-জায়গায় তুলা কিছু জমাট বেঁধে আছে। আর বাকি যা আছে, তা বিচি। শিমুলতুলার বিচির ডাগরত্ব আবার বেশ দৃশ্যমান। কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ঝাঁকালে বাজনার আওয়াজও শোনা যাবে। শুতে গিয়ে দেখা গেল, তুলা আর বিচিগুলো দুই ভাগ হয়ে এমন একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যাতে মাথাটা সরাসরি গিয়ে মেঝেতে ঠেকে।
দেলখোশের মনে হয়েছিল, ঘুম আসুক না আসুক, চাটাই-বালিশের আর কি দরকার? ঝকঝকে মেঝে। টাইলস বিছানো। তা আবার রোজ-রোজ দুবার – সকাল-বিকাল পানিতে পরিষ্কার ন্যাকড়া ভিজিয়ে অতিযত্নে মুছে রাখে রাহেলা। একদিন তো ওকে দেলখোশের জন্য বিছানা পাততেই হবে! এখন থেকেই, বুঝি, সেই কাজটি শুরম্ন করেছে সে। কেবল বাকি ছিল তার শুয়েপড়া। এই সুযোগে সে-কাজটিও হয়ে যাচ্ছে অনায়াসে। সুতরাং রাহেলার হাতের পরশমাখা টাইলসের ওপরে গা বিছিয়ে রাত কাটাতে কোনো অনুযোগ ছিল না দেলখোশের। সে-মতো রাত্রিযাপন চলছিলও একরকম। গৃহকর্ত্রীরও কোনো দৃষ্টি ছিল না সেদিকে ।
কিন্তু…
মাঝখানে তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে করলেন ফেল। একটি বড় সমাজসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার দহরম-মহরম। এ-দেশের
গরিব-দুঃখীদের প্রতি বিদেশিদের তো মায়া-মহববতের কোনো শেষ নেই! আবার মানুষকে ফকির-মিসকিন বানিয়ে না রাখতে পারলে তাদের মহত্ত্ব দেখানোর সুযোগই বা কোথায়? তাই তারা পা খোঁড়া করে রেখে হাতে লাঠি ধরিয়ে দেয় ভিক্ষা করার জন্য। আর এই ভিক্ষার কাজটি করতে হয় প্রাতিষ্ঠানিক সিল-ছাপ্পর মেরে। কাজেই দেশে সমাজসেবা প্রতিষ্ঠানেরও কোনো অভাব নেই। দেলখোশের গৃহকর্ত্রীদেরও আছে এরকম একটি। তারই ছিল কর্তাব্যক্তি হওয়ার নির্বাচন। তিনি ছিলেন তার একজন প্রার্থী। জেতাও ছিল তার প্রায় নিশ্চিত! কিন্তু ভোটের দিন কে বা কারা রটিয়ে দিলো, তার বাড়িতে গৃহকর্মীদের শুইয়ে রাখা হয় খালি মেঝেতে। সুতরাং যিনি বাড়ির কাজের লোকদের সঙ্গে এহেন নিষ্ঠুর আচরণ করে থাকেন – বাকি কথাগুলো কী হতে পারে, তা তো নেওয়াই যায় অনুমান করে।
হার-জিৎ ছাড়া কি নির্বাচন হয়? একজন জিতবে, আর অন্যরা হারবে, নিয়ম তো এটাই। কিন্তু তারও তো একটা রকম আছে? কিন্তু এখানে? এমন অপমান? থমথমে মুখে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। তারপর শুরম্ন হয় তর্জন-গর্জন…
নারী-পুরম্নষ মিলিয়ে চাকর-বাকর তো আর একটা নয়? সবাইকে ডেকে দাঁড় করান।
পুরম্নষগুলোর প্রতি তাকিয়ে বলেন – কে, তোরা মেঝেতে শুয়ে থাকিস, হারামজাদার দল!
মেয়েগুলোকে তো মনে হয় ভস্মই করে ফেলবেন!
বলেন – বান্দির বেটি, বান্দি। মেঝেতে শুয়ে না থাকলে শরীর ঠান্ডা হয় না? কোথাকার সব বেজন্মা!
গৃহকর্ত্রী মুখ ঝাড়েন।
দেলখোশের মাথায় তো রক্ত চড়েই থাকে। সে তো রাহেলা যেদিন গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে তখন থেকে।
তাই তো, রাহেলা কেন চলে এলো? পেটভরে ভাত আর কজন খেতে পায়? খেতে তো দেলখোশও পেত না। তাই বলে গ্রাম ছেড়ে চলে আসার কথা কি আগে কখনো সে ভেবেছে। শালি! চলে এলো। দিন-দুনিয়া সব যেন অন্ধকার হয়ে গেল দেলখোশের। খিদে মরে গেল। ঘুম চলে গেল রাতের। পাটক্ষেতের আল ধরে কতবার যে রেলস্টেশনে এলো আর গেল। লেডিস ওয়েটিং রম্নমের চামচিকারা পর্যমত্ম দেখল, একজন কেউ দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে – ভাঙা জানালা দিয়ে বারবার উঁকি দিচ্ছে। রাহেলা যেন বসে আছে, তাকে দেখছে। তারপর একদিন সেই রেলস্টেশন থেকেই ট্রেনে চড়ে এসে পড়ল আসত্ম এই নরকে।
নরকই তো এটা।
সাহেব-বিবিরা সব গাড়িতে চড়ে ঘোরাঘুরি করে।
শপিংমল। দুনিয়াতেই যেন আসত্ম বেহেশত। দিনের বেলাতেই আলো। লাল-নীল-বেগুনি-বাদামি…। রঙের যেন শেষ নেই। সুবাসেরও কোনো অমত্ম নেই। নারীর পাশে দাঁড়ালে সুগন্ধে ম-ম। পুরম্নষের পাশে দাঁড়ালে ভুরভুর। নিজেরও পালটে যায় রং। হওয়া যায় নতুন মানুষ। আর যায় না পাওয়া কী সেখানে? সাহেবরা ঢোকে গটগট করে। বিবিরা খটখট। বেরোয়ও তেমনই করে। ভর্তি শপিংব্যাগের সত্মূপে তৈরি হয়ে থাকে হিমালয়। কেউ কারো দিকে চেয়েও দেখে না। বিবর্ণ-মুখ ভিখারিরা কখনো কারো কাছ থেকে একটা টাকা পেলেও হাত তোলে আকাশের দিকে – হে পরোয়ারদেগার, তোমার এই নেক বান্দার যেন বেহেশত নসিব হয়।
গালাগালি শুনে মুখটা দেলখোশের বন্ধই থাকে। তবে ভেতরে-ভেতরে সেও ঝাড়তে থাকে অনেক কিছু।

– মাগি, পার্টিতে যায়া দুধ খুলে দ্যাস, নাচানাচি করে রাত কাবার। এখন আবার বড়-বড় কথা! নিজেরা জন্ম দিস হারামজাদাদের। আর গাল দিস আমাদের।
রাহেলাকে বলে – চল, আমরা চলে যাই। আর থাকব না এখানে।
পা রাখার পরই বাড়ির কাজের মেয়েদের প্রথম কাজই হলো বেগম সাহেবাকে বাপের শ্যালিকা বানিয়ে দেওয়া। গৃহকর্ত্রীকে তারা ডাকে, খালাম্মা। আর খালাম্মার ছেলেরা তো সম্পর্কে ভাই-ই হয়। এখানেও রাহেলার সে রকম জোয়ান ভাইরা রয়েছে। দেলখোশের কথা যেন শুনতেই পায় না। তাদেরই একজনের নাম করে দেলখোশকে শুনিয়ে-শুনিয়েই বলে – ঘরটা আবার ময়লা করে ফেলেছে। যাই, সাফ করে দিয়ে আসি।
কী করবে আর দেলখোশ? দিনে-রাতে এরকম কবার ঘর সাফ করতে যায় রাহেলা, সেটা ভেবে ব্রহ্মচাঁদি জ্বলতে থাকে তার।
এরকম গালাগালি আগেও যে শুনতে হয়নি, তা তো নয়। প্রত্যেকবারেই ঠিক করেছে, আর এখানে থাকবে না। কিন্তু যাবেই বা কোথায়? রাহেলা! মাগি! কোনো কথাই শুনতে চায় না। এক হয় – অন্য কোনো বাড়িতে গিয়ে কাজে লেগে পড়া। তবু তো চোখের দেখা বাদ পড়বে না। কিন্তু কে তাকে কাজে লাগাতে বসে আছে?
আজকাল মেয়েদের পা ভারী হয়ে গেছে। তারা গার্মেন্টসে কাজ পাচ্ছে। এনজিওরা টাকা দিচ্ছে। গভর্নমেন্টও কোটা বেঁধে দিয়েছে। তারপর দুবাই-কাতার-সৌদি আরব চালান তো আছেই। কে আর এসে থালা-বাসন মাজবে – কাপড়চোপড় ধোবে – ঘর মুছবে? যাহোক, নুর সাহেব রাহেলার বাবা-মাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে – বিয়ের সময় খরচাপাতি দেওয়ার কড়ারে নিয়ে তো এলেন।
চোখ তো দেলখোশের অনেক দিন ধরেই ছিল। চিকন শরীর। যৌবন কেবল লাবণ্য ছড়িয়ে দিয়েছে। এত আকর্ষণ হাসির! এত মায়া চোখের তারায়! তখন থেকেই ঘর বাঁধার স্বপ্ন তার। তাই এই হঠাৎ দুর্ঘট তাকে বিকল করে দিলো।
সে রাহেলাকে বলে – কেন যাবি?
রাহেলা এমনিতেই তাকে পাত্তা দিত না।
আজকেও দেয় না।
সে বলে – কেন যাব না?
তার উত্তর কী হতে পারে, দেলখোশ সহসা খুঁজে পায় না।
সে কি বলতে পারে –
– আমি তোকে সিল্কের শাড়ি পরাব…
– আমি তোকে সোনার গহনা-হিরা-মুক্তা-মাণিক্য দিয়ে গা ভরিয়ে দেব…
– আমি তোকে তুলব নিয়ে গিয়ে রাজপ্রাসাদে…
– আমি তোকে চন্দনকাঠের পালঙ্কে শুইয়ে রাখব…
– আমি তোকে রোজ-রোজ পোলাও-কোরমা খাওয়াব…
– আমি তোকে গাড়িতে চড়িয়ে ঘোরাব…
– আমি তোকে – আমি তোকে অ্যারোপেস্ননে করে আকাশে ওড়াব…
অবশেষে বলে – আমি তোরে মন দিছি।
একথা শুনে খিলখিল করে হাসে রাহেলা।
বলে – ঠিক আছে, আরো দিতে থাক। আমি ততদিনে শহরে যায়া একটু ভালো-মন্দ খাই, কাপড়-চোপড়ও দিব, পরি। আর টেলিভিশন আছে না? তা-ও দেখতে দিবে, দেখি।

এসব যতই ভাবে, দেলখোশের মাথাটা যেন খারাপ হয়ে যায়! প্রচ- ঘৃণা এসে জন্ম নিতে থাকে তার মনে। এই বেজন্মার জাত বড়লোকেরা টাকা দিয়ে – হাড়-হাড্ডি ছুড়ে দিয়ে সব কিনে নিতে চায়। প্রেমিকাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন তাদের থালা-বাসন মাজার কাছে এভাবেই জিম্মি করে রাখে। কিন্তু সে ছেড়ে দেবে না। একটা হেসত্মনেসত্ম করেই ছাড়বে।
রাস্তায় বেরিয়ে দেখে ঝাঁঝাঁ রোদ। তার মাথাটাও ঝাঁঝাঁ করতে থাকে। কোথায় যাবে সে জানে না। কিন্তু ঈশবর? তিনি তো সর্বজ্ঞ। নিশ্চয়ই তিনি জানেন। সে হাঁটতে শুরম্ন করে। কিন্তু তারও কি উপায় আছে? এপাশে গাড়ি। ওপাশে গাড়ি। সামনে গাড়ি। পেছনে গাড়ি। ছুটছে। ছুটছে। ছুটছে। দ্রম্নতগতির এই যন্ত্রদানবগুলোও ভেতরে বসা মানুষগুলোর মতোই চকচক করছে। থেকে-থেকে ঝিলিক মারছে।
প্রাসাদোপম সব বাড়ি। তা দেখে-দেখে ভেতরে আগুন ধরে যায় দেলখোশের। এত বড় বাড়ি বানায়? কত খরচ? আর তার একটা শার্ট। ধুয়ে দিয়ে শুকানোর জন্য বসে থাকতে হয় খালি গায়ে। আরেকটা কেনার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, না ছেঁড়া পর্যমত্ম। আর এই শালা বড়লোকেরা? কোথায় পায় এত টাকা? কে তাদের দিয়েছে তা? নিশ্চয়ই ওরা চুরি করে। সব শালা চোর। তাদের শায়েস্তা করার কোনো পথ না পেয়ে দেলখোশ পেচ্ছাব করতে শুরম্ন করে একটা বাড়ির দেয়াল তাক করে। ঠ্যাং তুলে। কুকুরের মতো। ঠিক করে, সারাদিন ধরেই সে এই কাজ করবে। যখনই পেচ্ছাব আসবে, তখনই…

তাই তো, সে কেন এলো?
হুড়া সাগর। তরতর করে বইছে নদী।
খামার উলস্নাপাড়া দাঁড়িয়ে আছে তার তীরে।
তারই এক কড়ইগাছের গোবদা শিকড়ে বসে আছে দেলখোশ।
মাথা তুলে নাচছে ধানগাছগুলো। বাতাসে। বাতাসে।
রাহেলাই যেন নেচে-নেচে খেলা করছে প্রামত্মরজুড়ে।
নৌকার পালে উড়ছে তার চুল।
রোদেরাও অলস হয়ে বিছিয়ে দিয়ে আছে সারাশরীর।
সে সব ছেড়ে একদিন…
নুর সাহেব ভূত দেখার মতো না-হলেও তাকে দেখে চমকে ওঠেন।
বলেন – তুমি?
যেন চেনেন। আবার চেনেন না। নিজের গাঁও-গেরামের লোকজনকে চিনলেও বিপদ। না চিনলেও বিপদ। অনেকটা যেতে শাল, আসতে শালের মতো। চিনলে কিছু খসার সম্ভাবনা। ফুর্তি-ফার্তি করার জন্য তাদের আসার কোনো সময় নেই। কিন্তু সমস্যা হলে না এসে কোনো উপায়ও নেই। যদি তাদের চেনেন, কিছু একটা করাটা তখন ঐচ্ছিক থাকে না। যদি না চেনেন, তবে তো নিন্দার আর শেষ থাকে না। – ব্যাটা, চৌকিদারের পোলা, না-হয় দুটো পয়সাই হয়েছে, তারই গরমে চিনতে পর্যমত্ম চায় না।
নুর সাহেবের মনের মধ্যে কিছু প্রচ্ছন্ন ইচ্ছার আলোছায়া লুকোচুরি খেলে। টাকা-পয়সা হলে যা হয়। নিদেনপক্ষে এলাকার মানুষের প্রতিনিধি তো হওয়াই যায়। সে-কারণে তিনি বাড়ি যাওয়া বন্ধও করতে চান না। নিন্দার ভাগী হলে সে-পথটাও যে হয়ে পড়ে সর্পিল।
– তা, তোমার নামটা যেন কী ছিল? – একটু থেমে জিজ্ঞেস করেন তিনি।
একথা শুনে ঘাবড়ে যায় দেলখোশও। ছিল মানে কী? এখনো তো আছে। মরে গেলেও এই নামই থাকবে। এই নামেই খতম কোরআন শরিফ বখশিয়ে দেওয়া হবে তাকে। আবার ভাবে, মরে তো সে গেছেই। রাহেলা যখন চলে এসেছে, তখন থেকে সে কি আর বেঁচে আছে? যা তার নিঃশ্বাস – হৃৎস্পন্দন – তা যদি না থাকে, তবে তারই বা আর থাকে কী?
নাম বলে দেলখোশ।
– তুমি কি আলীমুদ্দির ছাওয়াল?
দেলখোশ বলে – না, আমার বাবার নাম খোশালুদ্দিন।
এবার কৃত্রিম হাসিতে মুখটা ভরিয়ে তোলেন নুর সাহেব।
বলেন – তাই বলো, তোমার বাপ খোশালুদ্দি। গায়ে-গতরে বেশ তো সাবালক হয়ে গেছো? তা কী মনে করে? – বলেই তার মনে হয়, ভুল জায়গায় ক্লিক করলেন। এখনই তো একগাদা দরকারের লিস্ট বলে যাবে গড়গড় করে। কামালের অসুখ। অস্ত্র করতে হবে। না-হয় পিলে বেড়েছে। তাতেও কাটা-ছেঁড়ার ব্যাপার। কিংবা বেদনার ব্যারাম। সেও ওই একই কেস। আর সর্বশেষ তো – টাকা-পয়সা এই জোগাড় করবার পারছি, আপনি না-দিলে বাঁচব কী করে? আবার হয়তো অসুখ-বিসুখও কিছু না। চান্স হয়েছে মালয়েশিয়া যাওয়ার। অনেক লাগবে, অত টাকা কি আর আমাদের আছে? কামাই-কাজি তো হবেই। কার কাছে আর যাব? ধারই দেন। ছোট মুখে বড় কথা, মাফ করে দিয়েন, শোধ করে দেব। সোনার হরিণের পেছনে ছোটা এই মানুষদের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের দুর্দশার কথা নুর সাহেব জানেন ভালো করে। কাজেই, এসবের কোনো সুযোগ তিনি দিতে রাজি নন। তাই বলেন – আসছো, ভালো করেছো। দু-চারদিন থাকো। খাও-দাও। ঘোরো-ফেরো। কত কী আছে দেখার। দেখে যাও। গল্প করতে পারবে বাড়ি ফিরে। হিরো হয়ে যাবে হে, হিরো, সবার কাছে। – বলেই পাঁচশো টাকার একটি নোট ধরিয়ে দেন। ভাবেন, আপদ যা কিছু, তা এর ওপর দিয়েই চলে যাবে।
একথা দেলখোশ এক কান দিয়ে শোনে আর আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়। মিটিমিটি হাসিটা চোখের কোণেও ফুটে ওঠে। মাথা খারাপ! আমি কি যাওয়ার জন্য এসেছি? এই বাড়ি, – আলিশান দর্শনদারি বালাখানাতে আটকা পড়ে আছে আমার ভালোবাসা। আমার ভালোবাসাকে বন্দি করে রেখেছে প্রাচুর্যের দাপট। আর কয়েকটা টাকা ধরিয়ে দিয়ে আমাকে বলছে, চলে যাও। আমি আর কোথাও যাব না। যেতে হয়, আমার ভালোবাসাকে নিয়েই যাব।
গ্রামের মানুষ এসেছে। রাহেলাও আসে। মুখে তার হাসি ধরে না।
বলে – মা কেমন আছে? বাবা কেমন? দুলু, আম্বিয়া, রইস, বেলস্নাল – ছোট ভাইবোন- ওরা কেমন? দাদি-চাচা-চাচিরা?
পাড়া-প্রতিবেশী – বাদ যায় না কারো খবর। আশ্বিন মাসে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সুফিয়ার, – হয়ে গেছে? একটা বাঁদর এসে গাছের কলা খেয়ে যেত, ওটি এখনো আসে কি না?
একবারও জিজ্ঞেস করে না সামনে থাকা মানুষটা কেমন আছে!
দেলখোশও তাকায় রাহেলার দিকে। চেয়ে থাকে ভালো করে। এই কদিনেই কী হয়েছে রাহেলা! কাপড়-চোপড় গায়ে যা আছে, তা তো সাহেবের মেয়েদের বাতিল করা। বাতিল হলেও সেগুলোর জৌলুস নেহাত কম নয়। বড়লোকের মেয়েরা তো আবার আরেক কাঠি সরেস। দু-চারদিন পরপরই রম্নচি বদল করতে হয় তাদের। পালটে যায় ম্যাচিংয়ের ধরনও। কাজেই গায়ে ওঠে না ওগুলো। সেসব তাই প্রাপ্য হয়ে যায় রাহেলাদের। সেসব পরে নিজেদের চেহারাটাই যেন পালটে ফেলে তারা।
আর! আর! আর কী? তার না খেতে পাওয়া শরীরটাও দেলখোশকে রেখে দিত ঘোরের মধ্যে। অপুষ্টির ছোবলও কমাতে পারেনি তার সতেজতা। সেখানে এখন স্বাস্থ্যের প্রকোপ। রোদ-বৃষ্টি-কাদামাখা ত্বকে লাবণ্যের নতুন মহড়া। বড়লোকদের এঁটোরও এত মাহাত্ম্য? আগেরটা, না পরেরটা, কোনটাকে সে চায়? তার কোনো মীমাংসায় যেতে পারে না দেলখোশ। কেবলই তার মনে হয়, এভাবে তার ভালোবাসাকে সে পারে না বিক্রি করে দিতে।
সে বলে – একবারও জানতে চাইলি না, আমি কেমন আছি?
রাহেলা বলে – ভালোই তো আছিস! না হলে আসতে পারতিস এতদূর?
তাও তো কথা! খারাপ থেকেও যে মানুষ কত দূর-দূর যায় আর কেন যে যায়, রাহেলাকে তা কেমন করে বোঝাবে সে?
আমি ভালো নেই রে রাহেলা, আমি ভালো নেই। আগে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকে আমি তোকে দেখতে পেতাম। এখন আর তোকে দেখি না। বটবৃক্ষে কুঠুরি বানিয়ে শুয়ে থাকতাম, তুই এসে পাশে বসতিস। এখন আর আসিস না। হুড়া সাগরে নৌকা ভাসাতাম, তুই পাল হয়ে উড়তি। এখন আর সে-পাল লাগাতে পারি না। আগে স্বপ্নে তোকে দেখতাম। এখন আর স্বপ্নই দেখি না। তু-ই বল, স্বপ্ন না দেখতে পারলে মানুষ ভালো থাকে? তুই আমাকে খারাপ বানিয়ে দিয়ে চলে এলি। আমি কী করব বল? ভালো হতে তাই আমি তোর কাছে এসেছি।
আবিষ্কৃত হতে দেরি হয়নি যে, মেঝেতে শুয়ে থাকা সেই ক্রিমিনাল হলো দেলখোশ।
রম্নদ্রমূর্তিতে ফেটে পড়েন গৃহকর্ত্রী – বদমাশ, বিছানা-বালিশ দেওয়া হয়নি তোকে?
রাহেলার হাতের পরশমাখা মেঝেতে সে কেন শুয়ে থাকে, একথা কি জনসমক্ষে বলা যায়? তার ভালোবাসার খবর আবার গৃহকর্ত্রী জানতে পারলে তো বিদায় নিতে হবে পত্রপাঠ। বাড়ির কাজের মেয়ে ভেগে গেলে মহাবিপদ! সেখানে কি দাম আছে তুচ্ছ ভালোবাসার!
কারণে-অকারণে দেলখোশ রাহেলার আশপাশে ঘুরঘুর করে। এটা-ওটা বলে। গৃহকর্ত্রীর তা নজর না এড়ালেও, খুব বেশি চিমত্মার হয়নি। এক জায়গাতেই বাড়ি। হতেই পারে এমন। কিন্তু এখন ভালোবাসার কথাটা জানতে পারলে দায় হয়ে যাবে থাকাই।
চুপ করে থাকে দেলখোশ।
তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেন না গৃহকর্ত্রী।
ক্রুদ্ধস্বরে বলতেই থাকেন – বল, বল, কেন শুয়ে থাকিস মেঝেতে?
এরপর তো আর কিছু না বলে থাকা যায় না।
দেলখোশ বলে – আমরা তো মেঝেতেই শুয়ে থাকি। বাপ-দাদার কালের অভ্যাস।
গৃহকর্ত্রীর উচ্চস্বর কমে না।
বলেন – এখানে কোনো বাপ-দাদা নেই, যেমন বলব, তেমন থাকবি।
এরপর তো আর কোনো কথা চলে না। কিন্তু যত রাগ গিয়ে জড়ো হয় রাহেলার ওপর। ওর জন্যই তো থাকতে হচ্ছে এখানে। হজম করতে হচ্ছে যত সব নাহক বয়ান। না হলে কার সাধ্য ওকে বকাবকি করে? মানসম্মান জ্ঞান কি তার নেই? এলাকায় হলে দেখিয়ে দিত। দুপাটি দাঁতই নিত তুলে। তাকে ধরে কে? নদীর খাঁড়ির মধ্যে এমনভাবে সেঁধিয়ে থাকত, স্বয়ং ঈশ্বরও পেত না খুঁজে। আর পাবেই বা কী করে? তার কি আর চোখ আছে! করতেও পারত না কিছু। হাত-পা থাকলে তো করবে!
রাহেলা চোখ রাঙায়।
বলে – বেশি জ্বালাবি না।
আস্পর্ধা কত! নিজের মনেই গজরায় দেলখোশ। হাতি কাদায় পড়লে চামচিকাও লাথি মারে। ভালোবাসি – তাই ভাবছিস সবকিছু তো সহ্য করবই। সবসময় তা কি হওয়ার?
দেলখোশ বলে – জ্বালাচিছস তো তুই? এত করে বলছি, চল, চলে যাই।
রাহেলা বলে – কোথায়?
দেলখোশ বলে – কেন, যেখান থেকে এসেছি।
রাহেলা বলে – আবার না খেয়ে থাকতে?
এ কী কথা বলে রাহেলা! একটুখানি তেল-নুন পেয়ে এ কী মতিগতি হয়েছে তার? ও তো নিজেও কিছু বুঝতে পারছে না। বড়লোকের বাড়ি, বাতিল পোশাক, এঁটো খাবার – এত ভালো লাগছে ওর?
এভাবে নিজেকে বিক্রি করে দেবে রাহেলা? না, ওকে বোঝাতে হবে।
উদ্দীপ্ত স্বরে দেলখোশ বলে – কেন, আমার হাত নাই? নতুন চর উঠবে নদীতে। ফসল ফলাব।
রাহেলা বলে – তোর মুরোদ তো জানি।
একথা শুনে নতুন করে ক্ষেপে যায় দেলখোশ।
বলে – মুরোদের কী দেখেছিস? আমার মুরোদ নাই? তাই আমাকে ভালোবাসিস না? এখন বুঝি বড়লোকের ছেলেরা তোর পছন্দ? রেগে যায় রাহেলাও।
বলে – যা-তা বলবি না।
দেলখোশ বলে – বলব না, মানে? হক কথা বলব না? ভালোবাসার তুই কী বুঝবি? তুই সাফ করবি ওদের ঘর, আর ওরা সাফ করবে ওদের নুনু। ভালোবাসা বলে কোনো বস্ত্ত আছে ওদের কাছে?
এরকম আরো কী-কী সব বলতে থাকে দেলখোশ। ক্রমাগত। এবং ক্রমাগত…
একই সঙ্গে রাহেলাও চিৎকার করতে থাকে – আম্মাজান, খালাজান, বুজান, আপনারা কে কোথায় আছেন, আসেন। পাগল হয়ে গেছে দেলখোশ… পাগল…

দেলখোশ আসলেই পাগল হয়ে গেছে। বড়লোকেরাই হলো তার এক নম্বর শত্রম্ন। কিন্তু কী করে তাদের নিকেশ করবে, তা তার জানা নেই। সে এখন শহরের রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। রক্তাভ চোখে ভস্মীভূত করে দিতে চায় বড়লোকদের আস্তানা – সুদৃশ্য অট্টালিকা-ইমারতরাজি-বিলাস বিতান। তার বন্দি হয়ে থাকা ভালোবাসাকে মুক্ত করতে চায় এসব কিছু ধ্বংস করে দিয়ে। বিড়বিড় করে। অনবরত। – শালার বড়লোক… 