চামড়া

লেখক: টি এম মনোয়ার হোসেন

‘বাবা,আমার বিস্কুট এনো।’ মায়ের এক পাশে শোয়া ছোট্ট মেয়েটি মাথা তুলে বলে। অপর পাশ থেকে বড় ছেলেটা চোখ কচলাতে কচলাতে জিজ্ঞেস করে,

বাবা, পরীক্ষার ফি দিতে হবে, টাকা আছে?

স্ত্রীও ক্ষীণস্বরে কাছে ডেকে বলে, ওষুধ তো ফুরিয়ে গেছে গো!

সবার আবদারে শুধু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে জগা। মুখে কোনো কথা নেই, দুচোখ জুড়ে দুনিয়ার দুশ্চিন্তা এসে ভিড় করে। বিছানায় শুয়ে থাকা বউয়ের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকায়, তাকাতেই আষাঢ়ের বৃষ্টির মতো পানি ঝরতে থাকে জগার দুচোখ থেকে। জুতা পলিসের বাক্সটা এক হাত থেকে অপর হাতে নেয়। ফাঁকা হাত দিয়ে ঘাড়ের গামছাটা টানে, চোখের পানি মোছে আর সামনে এগোয়। ঘরের বাইরে গিয়ে আর একবার তাকায় স্ত্রী-সন্তানের দিকে। টিপটিপ করে পড়া বৃষ্টির পানি আর জগার চোখের পানি এক হয়ে গড়িয়ে পড়ে গ- বেয়ে।

আষাঢ় মাস। বৃষ্টি নামলে আর থামার কোনো নাম-গন্ধ নেই, অবিরাম ঝরতে থাকে। রাস্তাঘাট তো কাদায় একাকার। অনেকেই জুতা খুলে হাতে নিয়ে টিপেটিপে পথ চলে। পেছন থেকে ছিটকে ওঠা কাদার  হাত থেকে বাঁচার জন্যই এ-ব্যবস্থা, কাপড়ে আর কাদা ভরে না। জুতা ছেঁড়ারও ভয় থাকে না।

আজ একেবারে বিকেলে বৃষ্টি থামে। যেদিন বৃষ্টি হয় না সেদিন বিকেলে সরদার হাটে বাজার বসে, খোলা আকাশের নিচে। স্কুলমাঠে আজ পানি জমে থাকায় রাস্তার দুধারে দোকান খুলে বসেছে সবাই। বাজারের পূর্বপ্রান্তে চারপাশ খোলা টিনের একটা ছাপড়া। এ-ঘরে বসেই জগা জুতা মেরামত করে, জুতায় কালি করে। ডাক এলে কখনো কখনো ভাঙা টিন ডিঙিয়ে বাজারের মানুষের কাছে খবর পৌঁছায়। দু-একটা মরা গরু-ছাগলের খবর পেলে ছুটে যায় – চামড়া ছিলে, বাকি মরা দেহটা মাটিতে পুঁতে দেয়। সেই কাকডাকা ভোরে আসে, বাড়ি ফেরে গভীর রাতে। কাজ পেলে করে, না পেলে পথে হাঁটা পথিকের পায়ের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দিন পার করে। চোখ জোড়া ব্যথা হয়। হঠাৎ ফিতা-ছেঁড়া দু-এক জোড়া জুতা আসে
কখনো-সখনো। বিনিময়ে পায় একটা বা দুটো সিকি কিংবা আধুলি। হাতের তালুতে নিয়ে তিন-চারবার চুমা খায় আর লক্ষ্মীর নাম নেয়। বাক্সের ফোকর দিয়ে পয়সা রাখতে রাখতে ভগবানের নামও নেয় বেশ কবার। আজো ব্যতিক্রম ঘটেনি তার। তেমন ভালো উপার্জন হয়নি, মোটে এক টাকা দশ পয়সা। কোনো কাজ না থাকায় গালে হাত দিয়ে স্ত্রী, কন্যা আর পুত্রের আবদারের কথা ভাবে। কোনো ব্যবস্থা তো হয়নি এখনো! উপায় না পেয়ে আধা কেজি গমের আটা কেনে, দু-এক পা করে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। বাজারটা পার না হতেই নুরুকে সামনে পায়। থমকে দাঁড়ায়, এক হাত উঁচু করে নমস্কার জানায়। নুরুও ধড়ফড় করে সাইকেল থেকে নামে। জগার মুখটা মলিন দেখে বলে,

কী রে, আজ বুঝি কোনো উপার্জন হয়নি!

জগা মাথা নিচু করে নুরুর পাশে এসে দাঁড়ায়, চোখজোড়া জলে ছলছল। কাঁধের গামছাটা হাতে নেয়, পরক্ষণেই কাঁধে রাখে। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,

না রে, আজ একদম কাজ হয়নি। সেই সকাল থেকে মানুষের পায়ের দিকে তাকিয়েইছিনু, কারো পায়ের জুতা ছেঁড়েওনি আজ। আর ছিঁড়লেও হয়তো বৃষ্টি ভেবে বাইরে বেরোয়নি। এখন আর কোনো গরু-ছাগলও মরে না যে তাদের চামড়া ছিলে সংসার চালাবো। এদিকে উলটো আমার পরিবারের সবার চামড়া আপনা-আপনিই জড়োসড়ো হতে শুরু করেছে। দেশে এমন আকাল পড়েছে, বাঁচার কোনো উপায়ই খুঁজে পাচ্ছি না। ভাবছি, বাপ-দাদার পেশাটা পালটাবো কি না!

আরে … রিজিকের মালিক তো ওপরওয়ালা। মুখ যেহেতু দিয়েছেন, অন্নও জোটাবেন তিনি। এ নিয়ে অত ভাবছিস কেন, ঘাবড়াচ্ছিস বা কেন, বল তো? আর শোন, ওই যে কুমারপাড়ার জমির আছে না, ওর গরুটার অবস্থা তেমন ভালো ঠেকল না আমার কাছে। হয়তো রাতে রাতেই মারা পড়বে। তুই একবার সকালে গিয়ে খোঁজ নিস তো! মরলে তো হয়েই গেল, তোর কয়েকটা টাকা হবে। খুব ভোরে ভোরেই যাস, দেরি করলে ফের তোর স্বজাতির কেউ দেখে ফেলবে, চামড়ায় ভাগ বসাবে।

জগা নমস্কার জানিয়ে পথ চলতে শুরু করে। বাজার থেকে জগার বাড়ি বেশি দূরে নয়, পায়ে হাঁটলে মাত্র ১০ মিনিটের পথ। কয়েকটা হিন্দু পরিবার আর দু-তিন ঘর মেথর ও মুচি নিয়ে ছোট্ট একটা পাড়া। মুচিদের মধ্যে জগার পরিবারও একটি।

দূর থেকে ভেসে আসা ফজরের আজান কানে পড়তেই ঘুম থেকে ওঠে জগা। বদনাটা ধরে দূরের কোনো এক জঙ্গলে যায়, বেশি সময় নেয়নি, তাড়া করেই বাড়ি ফেরে। আসে আর মনে মনে বলে, গরুটা মরলেও তো ফেলতে সময় লাগবে, এতো তাড়াতাড়ি গেলে কে যে কী বলে, কী যে ভাবে!

 

বিছানার তলা থেকে চামড়া ছেলার ধারালো চাকুটা বের করে, বালু দিয়ে ইটের সঙ্গে ডানে-বাঁয়ে টেনে টেনে ধার দেয়। মাঝেমধ্যে বুড়ো আঙুল দিয়ে পরখ করে, ধার হয়েছে কি না।

সকালে আকাশটা মেঘে ঢাকা থাকলেও বৃষ্টির নাম নেই। তবে রাত্রেই এক পশলা হয়ে গেছে। ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢোকায় তারা কেউই ঘুমাতে পারেনি। বিছানার এক কোনায় প্রায় জড়োসড়ো হয়ে বসেছিল। তাই চোখজোড়া লাল টসটসে। বেশ কয়েকবার চোখে পানি দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। যে-কেউ দেখে আঁচ করতে পারবে যে, জগা আজ নেশা করেছে। কিন্তু … না। সে নিম্নশ্রেণির হলেও অন্যের মতো জগা যখন-তখন নেশা করে না। সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী সে। অনেক সময় তাকে দুহাত তুলে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতেও দেখা গেছে। লোভ-লালসা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে সে। ভিনগ্রহের মানুষ বলেই মনে হয় তাকে।

পুব আকাশ লাল হতে দেখে জগা বেরিয়ে পড়ে, দ্রুত পা চালায়। ভাবে, অন্য কেউ ফের টের পেয়েছে কি না। না, সুযোগ পায়নি কেউ। জগা ফাঁকা মাঠের দিকে চোখ ফেলে, কেউ কোথাও নেই। শুধু দিগন্তজোড়া মাঠ। সামনে চোখ ফেলতেই দেখে চারজন লোক বাঁশে করে কী যেন বহন করে নিয়ে আসছে। জগা আর এগোয় না, থমকে দাঁড়ায়। ওরাই এগিয়ে আসে। ফাঁকা এক জমিতে একটা মরা গরু ফেলে চলে যায়। জগাও আর দেরি না করে এগিয়ে যায়। অনেক দিনের দক্ষতা কাজে লাগায়। ছিলতে বেশিক্ষণ লাগে না, বিদ্যুতের মতো হাত চালায়। দূরে বসা কয়েকটা শকুন জগার হাত চালানো দেখে।

চামড়া বেচতে গোবিন্দগঞ্জেই বেশ দেরি হয়। দু-তিন জায়গা দেখে, যার কাছে একটু বেশি দাম পায় তাকে দেয়। তারপরও পাঁচ টাকার বেশি হয় না। তা থেকে ওষুধ কেনে, মেয়ের বিস্কুট কেনে আর আসার সময় গরম গরম গুড়ের জিলাপি নেয়। বাড়ি ফিরে ছেলেকে ডাকে। হাতে পঁচিশ পয়সা ধরিয়ে দিয়ে বলে,

নে, কাল পরীক্ষার ফি দিস।

নুরু অবশ্য বলেছিল পরীক্ষার ফির চিন্তা না করতে। সে নিজে গিয়েই দিয়ে আসতে চেয়েছিল। তা আর লাগল না।

আজো নুরু জগার দোকানে গিয়ে অন্য একটা মরা গরুর খবর দেয়, পশ্চিমপাড়ায় যেতে বলে।

এ কদিন থেকে জগা প্রায় প্রতিদিনই চামড়া ছেলার খবর পায়, নুরুই দেয়। এ-পাড়ায়, ও-পাড়ায়, এমনকি দূরের কোনো গ্রামেও ছুটে যায়। সেইসঙ্গে বাড়ে আয়-উপার্জনও। ফুরফুরা মেজাজে দোকানে বসে, মুখে জর্দাওয়ালা পান গুঁজে দিয়ে গান ধরে। কাজবাজ না থাকায় অলসতায় দিন কাটায় জগা। নুরু তো প্রায়ই খোঁজ  নেয়। সময় পেলে জগার দোকানে এসে টুলে বসে, সময় কাটায়। হাসি-ঠাট্টায় মন ভরে দুজনেরই। জগার সবচেয়ে কাছের বন্ধু নুরু। একসঙ্গে পড়েছেও দু-তিন ক্লাস। সংসারের অভাবে জগা টিকে থাকতে পারেনি। বাবার পেশাটাই শেষে ধরে নিয়েছিল। সেই থেকেই তারা একে অপরের।

কদিন বেশ ভালোই কাটে।  কয়েক সপ্তাহ পর একদিন ইউনিয়ন পরিষদের এক দফাদার রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় জগার দোকানে হাসি শুনতে পায়। সামনে না গিয়ে আবার পেছন ফেরে। দু-পা, এক পা করে জগার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। লাঠিটা বাঁ-হাতে নিয়ে ডান হাতটা প্যান্টের পকেটে ঢোকায়, রুমাল বের করে মুখে লেগে থাকা পানের পিক মোছে। আবার হাত ঢুকিয়ে যথাস্থানে রেখে দেয় রুমালটা। দফাদারকে উদ্দেশ করে জগা বলে, এ-সময়ে … কী মনে করে!

এই … দেখতে এলাম, আজকাল তোর পরিবারে নাকি সুখের স্রোত বইছে! ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ, বউয়ের ওষুধপথ্য, ভালো ভালো খাবার, দোকানে বসে হাসি-তামাশা! বাহ্! ভারি চমৎকার তো। আমাকে ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে ক তো, এ সবকিছুর উৎস কোথায়! জিনের টাকা-পয়সা পেয়েছিস, নাকি কোনো ধনী মানুষের টাকাভর্তি ব্যাগ কুড়িয়ে পেয়েছিস! একেবারে আঙুল ফুলে কলাগাছ, ভাবতেই অবাক লাগে, তাই না? দেখ, আমি সারাদিন ইউনিয়ন পরিষদে পড়ে থাকি, এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিই। যে-পয়সা পাই তা দিয়ে সংসার চলে না, ধাক্কা-ধুক্কা দিয়ে কোনোমতে চালিয়ে নিই। আর তুই …

দফাদারের কথায় জগার মুখটা একেবারে চুপসে যায়, চোখে-মুখে একটা আতঙ্ক খেলা করে, ভাষা হারিয়ে ফেলে। কিছুই আর বলতে পারে না সে। শুধু নুরুর মুখের দিকে একপলক তাকায়। নুরুই দফাদারকে বলে, এ বিধু, কী যা-তা বলছিস, পরিশ্রম করে সংসারের সুখ ফিরিয়ে আনাও কি দোষ? আর এ-সুখ তোদের চোখে কাঁটা হয়ে ফোটে। জগা তো তোরই চাচাতো ভাই, নিজের আত্মীয় সুখে থাকলে তো তোদেরই লাভ। বিপদে-আপদে এগিয়ে আসতে পারবে। আর তা না করলেও তোদের কাছে কোনো কিছুর জন্য হাত পাততে যাবে না কখনো।

নুরু, তুই যাই বলিস না কেন, জগার হাবভাব ইদানীং কিন্তু ভালো ঠেকছে না! দেখি, চেয়ারম্যান সাহেবকে একটু বলে রাখি।

জগা দুচোখ পাকিয়ে বিধুর দিকে চায়। বিধু আর দেরি না করে সোজা পথ ধরে, লাঠিটা ঘোরাতে ঘোরাতেই চোখের আড়াল হয়।

নুরু সান্তবনার স্বরে জগাকে বলে, বিধুর কথায় তুই ভয় পেয়েছিস, জগা?  ভয়ের কিছুই নেই। সমাজে এ-ধরনের লোক থাকতেই হয়, নইলে নিজের ভালোমন্দ, উত্থান-পতন সম্পর্কে বোঝা যে যায় না। আলো ছাড়া যেমন অন্ধকার বোঝা যায় না, ঠিক অন্ধকার ছাড়া আলোর কোনো মূল্যই থাকে না। তাই বিধুর মতো মানুষ ছাড়া এ-জগতে
চলা ভার হয়ে যায়। তুই মনে কিছু নিস না, আমিই সামলে নেব। বিপদ-টিপদ হলে আমাকে শুধু একটু স্মরণ করিস। তুই থাক; কাজ কর। আর কাজ না থাকলে প্রাণ খুলে গান গা। শোন, আজেবাজে চিন্তা করে মদ-টদ গিলিস না ফের। বাজে জিনিসে দু-চার পয়সা নষ্ট করে লাভ কী! তার চেয়ে বউ-বাচ্চার দিকে একটু নজর দে।

ইউনিয়ন পরিষদে সকাল থেকে রিলিফের গম দেওয়া চলছে। দফাদার, চৌকিদার মহাব্যস্ত এখন। লোকদের লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া, ফর্দ ধরে জোরে জোরে নাম ডাকা। বিধুর বগলে রাখা লাঠিটা এর কপাল ওর কপালে মাঝে মাঝে গুঁতা লাগে, কখনো কখনো আবার মাটিতে পড়ে যায়। সামনে যাকে পায় তাকে দিয়েই লাঠিটা
উঠিয়ে নেয়। এতে বৃদ্ধ কিংবা ময়-মুরুবিবও বাদ পড়ে না তার কাছে। গম-চাল দেওয়া শেষ হয়, চেয়ারম্যান সাহেব তার কক্ষে গিয়ে বসেন। চেয়ার থেকেই বিধুকে হাঁকেন। বিধু পড়িমড়ি করে ছুটে আসে, গুটিসুটি হয়ে দরজার এক পাশে দাঁড়ায়। মরিচা ধরার মতো দাঁত দুপাটি বের করে বলে,

স্যার, আমাকে ডাকলেন কী?

বিধু, শোন, তোর জন্যে এক বস্তা গম আছে, যাওয়ার সময় নিয়ে যাস। তার আগে বিশ্বস্ত একটা ভ্যান ডেকে আমার চালের বস্তাগুলো বাসায় পৌঁছাস। কি, পারবি না?

বিধু হাতদুটো কচলাতে কচলাতে, মুখটা কাচুমাচু করে বলে, কেন পারবো না, স্যার? দেখবেন, সময়মতো ঠিকই পৌঁছে গেছে।

চেয়ারম্যান সাহেব মাথা নিচু করে আপন কাজে ডুবে যান। বেশ কিছুক্ষণ কাটে। একসময় মাথা তুলতেই বিধুর অস্তিত্ব টের পান। ডেকে বলেন, কী রে, যাসনি এখনো? আর কিছু বলতে চাস তো বলে ফেল।

কী আর বলব স্যার! ওই যে … জগা আছে না …

কোন জগা রে?

আমারই চাচাতো ভাই, স্যার, সরদারহাটে যে জুতা-টুতা সেলাই করে।

ও … হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। তার কি কিছু হয়েছে?

কদিন থেকে কেমন যেন সন্দেহ সন্দেহ লাগছে। এই তো দু-তিন সপ্তাহ আগে, তার সংসারে দুবেলা অন্ন জুটত না, অসুখ হলে মিলত না তিন টাকার ওষুধ, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতো, আর আজ … তার কী যে হলো, সংসারে আর অভাব নেই বললেই চলে!

তাতে তোর কোনো সমস্যা? অবৈধভাবে তো আর কিছু করছে না!

এখানেই তো একটু সন্দেহ, স্যার …। তাই বলে আঙুল ফুলে কলাগাছ, পাচ্ছে কোথায় টাকাগুলো! খাবার নিয়ে ছেলেমেয়ের কান্নাকাটি নেই, ওষুধের অভাবে বউয়ের আর চেঁচামেচি নেই, নেই ঝগড়াঝাটিও। এখন জগার মুখে গান আর গান। কিসের কি জুতা সেলাই কিংবা জুতা পলিস, সারা মুখজুড়ে তার প্রশান্তি আর প্রশান্তি!

বিধুকে থামিয়ে দিয়ে বলেন,

কী বলতে চাচ্ছিস, তা খোলাসা করেই বল তো, শুনি।

হাঁ, তাই তো বলতে চাচ্ছি।

কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার বলে, পশু চিকিৎসক, নুরু মিয়ার সঙ্গে জগার গলায় গলায় ভাব। দুজনে দোকানে বসে কী হাসি আর ফুসুর-ফাসুর গল্প! ব্যাপারটা তেমন ভালো ঠেকেনি আমার কাছে। তাই আপনার কাছে অনুরোধ, তাদের গতিবিধি একটু মাথায় রাখবেন।

আচ্ছা, তুইও চোখ-কান খোলা রাখ, আরো তথ্য জোগাড় কর। কোনো কিছু পেলে আমাকে জানিয়ে দিস। বিষয়টা তাহলে তো দেখতেই হয়।

আসি স্যার, আদাব।

সন্ধ্যা হয়নি, তবে ঘনিয়ে আসার তেমন আর বাকি নেই। লাল আভা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে মাত্র। নুরু ডাক্তার তার চেম্বারের সামনে দিয়ে হাঁটাচলা করছে ধিরস্থিরভাবে। বাজারে তেমন লোক নেই, দু-একটা দোকানে মিটমিট করে কেরোসিনের বাতি জ্বলছে। জগা তার দোকান থেকে মাঠে নামতেই নুরু হাঁক ছাড়ে, হাত উঁচিয়ে কাছে ডাকে। জগার সারা মুখজুড়ে মলিনতা, কালো মানুষটা ভয়ে কেমন যেন আরো কালো আকার ধারণ করেছে। নুরু হতভম্ব হয়ে জগার হেলেদুলে আসা দেখে। হাঁটা দেখেই বুঝতে পারে যে, সে আজ অনেকদিন পর মদ গিলেছে, চোখ জোড়া ঘুমে ঢুলুঢুলু। নুরু ভাবছে, জগার বউয়ের অসুখ কি বেড়ে গেছে, নাকি অন্য কোনো ঝামেলা!

জগা কাছে আসতেই দাঁত বের করে সালাম দেয় ঠিক মুসলমানের মতো শুদ্ধ উচ্চারণে। নুরু জগার কাঁধে হাত রেখে বলে,

কী রে, আজ আবার মদ খেয়েছিস! তুই না আমাকে কথা দিয়েছিলি, হাজার কষ্টেও মদ ধরবি না আর!

জগা না না করে আর হাত দুটো মোচড়ায়। মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলে, মনে কিছু করিস না ভাই, একটু খেয়েছি। বুকের ব্যথাটা দুদিন থেকে কেমন যেন গ্যাস্ট্রিকের মতো চাড়া দিয়েছে। সইতে না পেরেই … খেয়েছি। তবে বউই অনুমতি দিয়েছিল। যখন দুচোখ বন্ধ করে গিলছিলাম বউ কাছে এসে মাথায় হাত দিয়ে বলে, খাও, মাঝে মাঝে খেতে হয়, নইলে যে এ ভাঙা সংসারটা চালাতে পারবে না গো! এতে তুমিই ভালো থাকবে।

আচ্ছা খেয়েছিস, ভালো করেছিস। দোকানে যা, একটা কাস্টমার আসবে এক জোড়া নতুন জুতার অর্ডার দিতে। আমিই তোর কাছে আসতে বলেছি। ভালো চামড়া আছে তো?

হ্যাঁ, আছে।

বাড়ি যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যাস, কথা আছে।

রাত ১০টা পর্যন্ত এক জোড়া অস্বাভাবিক মাপের জুতা বানায়, মালিকও বসে বসে জগার হাতের কাজ দেখে। মুগ্ধ হয়, প্রশংসাও কম করে না তার।

৩২ টাকা পেয়ে দুচোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। ঝটপট দোকান বন্ধ করে নুরুর চেম্বারে আসে। নুরুও জগার অপেক্ষায় ছিল। মাথা তুলে নুরু বলে, কি, ইনকাম হয়েছে, আজ?

হ্যাঁ ভাই, এটা তো তোর জন্যই হলো। এক সপ্তাহ অনায়াসে চলে যাবে।

আরে … কারো রিজিক কেউ দেয় না, একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই দেয়।

তা ঠিক আছে। কিন্তু … ওসিলা তো আছে একটা, নাকি? এই ওসিলা তুই।

দুজনই হেসে ওঠে। নুরু বলে, জগা, তুই কাল হিন্দুপাড়ায় যাস তো একবার। গরুটার মরামরা অবস্থা, বাঁচানোর অনেক চেষ্টাই তো করলাম, বাঁচবে না। রাতেই মরে পড়ে থাকবে। আমিও কথা কেটে দিয়েছি। বলেছি, যদি বাঁচে ওই আল্লাহর ইচ্ছায়, নইলে না।

জগা বাধা দিয়ে বলে, আহা! ওভাবে বলতে নেই, নিরীহ প্রাণী, ভালো হলে তো তোরই সুনাম। সুনাম এলে তোরই উপার্জন বেড়ে যাবে।

অনেক উপার্জনই তো করলাম রে, আছে কটা, বল তো? আরে বাপু, সৎ উপায়ে উপার্জন দিয়ে কিছুই হয় না। শুধু মনের প্রশান্তিই বাড়ে আর বাড়ে মিথ্যা হয়রানি। সমাজের সবাই শুধু ট্যাড়া চোখে তাকায়, হিংসেয় জ্বলে। এতদিন তো অনেক সুনাম কুড়িয়েছি, কই কেউ তো আমার বিপদের দিনে পাশে এসে দাঁড়ায়নি কখনো! বাকি যে কটা দিন আছে, ব্যতিক্রমী মানুষের মতো করে বাঁচার চেষ্টায় আছি। সততাকে আপাতত একটু দূরে রেখেই চলছি। কদিন দেখি, চলা যায় কি না! চলতে না পারলে পথ পালটাবো।

কী যে বলিস, নুরু! যারা সৎ তারা তাদের পথ থেকে এক পাও নড়ে না, নড়বেও না কখনো। সততা যাদের রক্তকণিকায়, তারা অসৎ হতে পারে না, পারবেও না হয়তো কোনোকালে। তুই তো আরো পারবি না পালটে যেতে।

গল্প করতে করতে রাত প্রায় ১০টা। জগা উঠতে যাবে এমন সময় নুরু আবারো স্মরণ করে দেয় হিন্দুপাড়ায় যাওয়ার কথা। জগা মাথা নেড়ে ভিন্ন পথ ধরে আর সেইসঙ্গে ওদের ভাষায় গান গাইতে গাইতে সামনে এগোয়।

গভীর রাতে জববার মিয়া চেয়ারম্যান সাহেবের বাসায় আসে। চেম্বারে দু-চারজন লোক বসেই আছে। ঘরের বাইরে বিধু টুলে বসে ঘুমে ঢুলছে। একবার পড়ে যায়, চারপাশে তাকিয়ে ফের ওঠে, টুলে ঠিক হয়ে বসে। বারকয়েক চেয়ারম্যান সাহেবকে দেখে, দরবার এখনো শেষ হয়নি। জববারকে দেখে বিধুই উঠে আসে, বলে,

জববার ভাই, কী মনে করে এতো রাতে!

একটা সমস্যায় পড়েছি রে, তাই আসতে হলো। একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করব।

বিধু অভিযোগের কথা শুনে তাড়াতাড়ি জববারকে ভেতরে নিয়ে যায়। চেয়ারম্যানকে সালাম করে জববার একটা ফাঁকা চেয়ার দেখে বসে পড়ে।

‘জববার মিয়া, তোমার অভিযোগটা শোনাও।’ চেয়ারম্যান একটা ফাইল ওলটাতে ওলটাতে জানতে চান। সেইসঙ্গে ঘরের সবাই জববারের দিকে একদৃষ্টিতে তাকায়।

আমার অভিযোগটা এক মুখোশপরা ভালো মানুষের বিরুদ্ধে। নাম বললে আপনি বিশ্বাসই করবেন না, আর কেউই করবে না। কিন্তু … আমি যে একজন ভুক্তভোগী!

সবাই একটু নড়েচড়ে বসে। এর মুখের দিকে ও তাকায়, ওর মুখের দিকে এ তাকায়। কিছুক্ষণ মুখ চাওয়া-চাওয়ি চলে। ভাবছে সবাই, কার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ওঠে!

জববার মিয়া মুখটা আরো গোমরা করে বলে, এই তো কদিন হলো একটা বাছুর মরল, আজ আবার গাভিন ছাগলটা আমার নুরু ডাক্তার মেরে ফেলল। আগে এ-ডাক্তারের হাতটা বেশ ভালোই ছিল, এখন যে কী ভূত ঢুকেছে তার মাথায়! কেমন যেন এখন কসাইয়ের মতো আচরণ করছে সে। টাকাও নেয় ঠিক ঠিক, আর দেখবেন পরের দিন তা ঠিকই মরে সোজা হয়ে আছে। আপনিই বলেন, তার দ্বারা আমরা এলাকার মানুষ আর কী আশা করবো!

বিধু তো অবাক। মাথা ঝুঁকিয়ে মনে মনে বলে, তাহলে জগার কারসাজিতেই এ-ঘটনাগুলো ঘটছে! তাই তো বলি, ব্যাপারটা কী। ঘুঘু তুমি বারেবারে খেয়ে যাও ধান, এবার তোর বধিব পরান। যাক এতক্ষণে একটু শান্তি পেলাম, মহাশান্তি।

সভার আরো একজন অভিযোগের সুরে বলে, হ্যাঁ চেয়ারম্যান সাব, আমারও একটা গরু নুরুর হাতেই মরেছে। বিষয়টা একটু খেয়াল করলে এলাকাবাসীর উপকার হবে। গরিব মানুষগুলো কষ্ট পাবে না, সেইসঙ্গে নিরীহ প্রাণীও অপচিকিৎসায় মারা পড়বে না আর।

চেয়ারম্যান প্রতিশ্রম্নতি দিয়ে বলেন, আপনারা যে-অভিযোগ করলেন তা আগে আমাকে নিজ চোখে দেখতে হবে, প্রমাণ করতে হবে। অভিযোগ করলেই তো আর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না। আপনারা চুপচাপ থাকেন, আমি দেখছি।

জববার মিয়া আর একটু বলার অনুমতি চেয়ে নেয়। বলে, চেয়ারম্যান সাব, আগামীকাল হিন্দুপাড়ার মোহনের বাড়ি গেলেই প্রমাণটা হাতে হাতে পেয়ে যাবেন। ওর গরুটা দেখতে নুরু ডাক্তারকে ডেকে এনেছিল। ডাক্তার কথা কেটে দিয়েছে। বলেছে, এটা হয়তো বাঁচবে না, রোগটা ধরতে পারলাম না।

বিধু জববারের কথা কেড়ে নিয়ে বলে, স্যার, দেখবেন ওই গরুর চামড়া ছিলতে জগাই আগে এসে বসে থাকবে। এ-এলাকায় কী আর মুচি নেই, তারা খবর পায় না? জগাই বা এ-খবর কোথায় পায়, বলেন তো?

আচ্ছা, তাহলে এক কাজ করো জববার মিয়া, মোহনকে গিয়ে বলো, গরুটা মরলে যেন দূরে কোথাও না ফেলে, কাছাকাছিই রাখে। জগা এলেই তাকে ধরতে হবে, দু-একটা প্রশ্ন করলেই সব তথ্য পাওয়া যাবে। আজ তোমরা সবাই বাড়ি যাও। শোনো, এ-কথা যেন কোনোক্রমেই ফাঁস না হয়।

পুব আকাশে আলো ছড়াতে না ছড়াতে জগা বেরিয়ে পড়ে। মনটা বেশ ফুরফুরা আজ তার। বউয়ের অসুখ কিছুটা কম মনে হলো। অঘোরে ঘুমাতে দেখে বেরিয়ে আসে। ডাকার কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি সে। রাতেও কোনো টুঁ-শব্দ পর্যন্ত করেনি। হিন্দুপাড়ার দিকে এখন দ্রুতপায়ে হাঁটছে আর কী-যেন ভাবছে মনে মনে। কাঁধে গামছাটা নিতে ভোলেনি, বাঁ-হাতে ধারালো চাকুটাও। জগা ভগবানের নাম জপতে জপতে এগোচ্ছে। তাকে বেশিদূর যেতে হয়নি, চেয়ারম্যানের বাড়ি পার হতেই দেখে, বিধু লুঙ্গিটা আঁটোসাঁটো করে হিন্দুপাড়ার দিক থেকে ছুটে আসছে। মনে মনে ভাবছে, ব্যপারটা কী, বিধু এতো সকালে!

চেয়ারম্যানের বাড়ি পার হতেই জববারের বাড়ির উঠানে বেশ কজন লোক চেয়ার পেতে বসা। মাঝখানে চেয়ারম্যানও। জগাকে হিন্দুপাড়ার দিতে যেতে দেখে পেছন থেকে ডাক ছাড়ে জববার। জগা মাথা ঘুরিয়ে ফিরে আসে দু-পা এক-পা করে। তবে আগের গতিতে নয়, আসেত্ম আসেত্ম। কাছে আসতেই চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করে, কী রে, ওদিক কোথায় যাওয়া হচ্ছে?

কেন, এতো সকালে এ-পথে যাওয়া বুঝি নিষেধ, কাজ থাকতে পারে না! আপনারাও তো কোনো-না-কোনো কাজে সমবেত হয়েছেন, আমার বের হতে অপরাধটা কোথায়?

আছে, আছে, অপরাধ তো আছেই। তাই তো তোকে ডাকা।

ঠিক আছে, বলেন, কী দোষ!

চেয়ারম্যান বলেন, তুই যে মোহনের গরুর চামড়া ছিলতে যাচ্ছিস, তা কার কাছে থেকে খবর পেলি, এতো সকালে কে জানাল?

আমি যে চামড়া ছিলতে যাচ্ছি তা আপনারা নিশ্চিত হলেন কী করে, আমার অন্য কাজও তো থাকতে পারে!

শোন, মুখে মুখে তর্ক করিস না, ফল কিন্তু ভালো হবে না, বলে দিলাম। সোজাসাপ্টা উত্তর দে, সত্যটা লুকানোর কোনো দরকার আছে! বল, কে তোকে খবর দিয়েছে?

নুরু ভাই। সে-ই বলল, গরুটার মরোমরো অবস্থা রে, হয় তো রাত পার হবে না, কাল ওপাড়ায় যাস তো। তাই দেখতে এলাম।

জগার কথায় তো সবাই অবাক! যা সন্দেহ তাই। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চেয়ারম্যান জগাকে সামনে এগোতে বলে। নিজেও উঠে বাড়ির পথ ধরে।

দুদিন যায়, তিনদিন যায় এমনকি এক সপ্তাহ পার হয় জগার  কোনো দেখা নেই। নুরুও তেমন খোঁজখবর রাখতে পারেনি তার। আজ মঙ্গলবার, হাটবার। আকাশটা ভালো থাকায় বিকেল হতে না হতেই স্কুলমাঠ অস্থায়ী দোকানে ভরে ওঠে। জগাও মাথা নিচু করে একটা ছেঁড়া জুতা মেরামত নিয়ে মেতে আছে। মাথা তোলার কোনো নাম নেই তার। গেঞ্জিটা খুলেই বসেছে আজ। ভ্যাপসা গরম, হয়তো বৃষ্টি হবে।

হাটের মধ্য থেকে টিন বাজানোর শব্দ ভেসে আসে জগার কানে। কান খাড়া করে সে, বাজারের দিকে চোখ ফেলে। বিধুই ভাঙা টিনে শব্দ করছে আর বলছে, ঢোল, ঢোল, ঢোল, সর্বসাধারণকে জানানো যাচ্ছে যে, আজ সন্ধ্যায় সমবায় সমিতির সামনে এক জরুরিভিত্তিতে বিচার বসবে। উপস্থিত থাকবেন অত্র ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, আলহাজ মোহাম্মদ জফির উদ্দীন। ওই বিচার কার্যে আপনারা আমন্ত্রিত।

প্রতিটি গলি দিয়ে ঢুকে ঢুকে বিধু তার মুখস্থ করা কথাগুলো বলে চলেছে। অনেকে জানতে চায়, কার বিচার রে, বিধু!

কিছুই বলে না, তার আওড়ানো কথাগুলোই বলে, এছাড়া কারো কথায় আর কান দেয় না।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, অপরাধীদের বুক কাঁপতে থাকে। জগার মনেও কেমন যেন এক দুশ্চিন্তা এসে বাসা বেঁধেছে। কিন্তু … অপরাধী ভাবছে না নিজেকে। তাই সান্তবনা খোঁজে নিজে নিজেই।

স্কুল মসজিদে মাগরিবের আজান পড়ে। অনেকে দোকানপাট খোলা রেখেই নামাজের জন্য ছুটে আসে। একটা টিউবওয়েলের পাড়ে ভিড় করে সবাই। মোটে তিনটা বদনা, তাই ধীরে ধীরেই অজুর কাজ চলে। তাড়াহুড়া করার কোনো উপায় নেই। চেয়ারম্যানকে এ-মসজিদে নামাজ পড়তে আসতে দেখে মুয়াজ্জিন, ইমাম আর মুসুলিস্নরা কিছুটা গর্ববোধ করে। সামনের কাতার থেকে একজন পিছিয়ে এসে চেয়ারম্যানকে জায়গা করে দেয়। এতে তৃপ্তি পায় সে, নিজেকে ধন্যও মনে করে।

মসজিদে নামাজ শেষ হতে না হতেই বিধু জগার দোকানে যায়। চোখ জোড়া রাগে জ্বলজ্বল করছে আর হিংসেয় ফুঁসছে বিধু। হাতে মোটা নাইলনের দড়ি, জগাকে রাগতস্বরে বলে,

এ জগা, এখন কাজ রাখ, চেয়ারম্যান সাহেব তোকে ডাকছে। স্কুলমাঠে সবাই বসে আছে।

কেন, আমাকে ডাকছে কেন, কী দোষ আমার!

কী করেছিস তা বিচারকের সামনে গেলে আপনা-আপনিই বের হবে। ঠেলায় পড়লে বাঘে ধান খায়, বুঝলি জগা? আরো বুজবি। এদিকে আয়, তোকে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যেতে বলেছে।

জগা আর কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। গেঞ্জিটা নিতেও ভুলে গেছে। উদোম গায়েই সামনে এগোয়। দড়ির এক প্রান্ত ধরে বিধু আগে আগে যায়, জগা পিছে পিছে। তবে জগার চোখে-মুখে কোনো কষ্টের ছাপ নেই, স্বাভাবিকভাবেই হাঁটছে। সে জানে, কোনো অপরাধ নেই তার। বিনা দোষে, বিনা অপরাধে তাকে আজ বিচারের কাঠগড়ায় উঠতে হচ্ছে।

বিধু হাঁটছে আর বিড়বিড় করছে, আপনা-আপনিই বলছে,

নুরু আর জগাকে আজ কষাবে চেয়ারম্যান সাহেব। অন্যের ক্ষতি করে পেটপূজা করা কেমন মজা তা হাড়ে হাড়ে টের পাবে এ বুড়ো হাড্ডিতে মার পড়লে। মুখোশ পরে সমাজে ভালো মানুষ সাজার অভিনয় করে, ইস! যেন মগের মুলস্নুক পেয়ে বসেছিল। মুখোশ আজ খসে পড়বে, সবাই জানবে …।

বেশি সময় লাগলো না, তিন-চার মিনিটের মধ্যেই ক্লাবের সামনে এসে হাজির জগা আর বিধু। চারদিকে থইথই করা মানুষ, গোল হয়ে বসেছে সবাই। মাঝখানে বৃত্তের মতো ফাঁকা। কেন্দ্রবিন্দুতে নুরু,  পেছন মোড়া করে হাতদুটো বাঁধা। জগাকেও নুরুর কাছে নিয়ে বসায় বিধু। নুরু মুখ তুলে জগাকে দেখে। বলে, বস।

চেয়ারে বসা বেশ কজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, মেম্বার-চেয়ারম্যানসহ আর কিছু বহিরাগত। হাটুরে মানুষের মধ্যে অনেকে ফাসুর-ফুসুর করে বলছে,

নুরুভাইকে এভাবে বাঁধা কি ঠিক হয়েছে? সে কি এমন অপরাধে অপরাধী! তাকে তো আমাদের এলাকার ক্ষুধার্ত মানুষের পাশেই দেখেছি আজীবন, আজ আবার কী হলো তার!

অন্যরা বলছে, আজ আর রক্ষা নেই বাছাধন, বুড়ো বয়সে ভিমরতি ধরেছে, বোঝো ঠেলা। বেশিদিন অন্যায় চলতে পারে না, প্রকাশ পাবেই পাবে। সৃষ্টিকর্তা তো একজন আছেন, নাকি? অন্যায়ের কাছে একদিন না একদিন মাথা নত করতেই হবে।

চেয়ারম্যানের পাশে বসা তালুকদার মোজাম্মেল সাহেব। তিনি এলাকার একজন বিচক্ষণ লোক, বয়সে এখানকার সবার চেয়ে বড়। নুরুর চেয়েও দুবছরের বড়। এখনো মেরুদ- সোজা করে হাঁটাচলা করেন চশমা ছাড়াই। দূরের মানুষকে অনায়াসেই চেনেন, মানুষের ফাসুর-ফুসুরও শুনতে পান, কান দুটো বেশ খাড়া। বিচারকের চেয়ারে বসে কিছুটা বিষণ্ণ তালুকদার সাহেব। ভাবছেন নুরুর কথা। শেষ বয়সে এ-অপবাদটা কেন গায়ে মাখতে গেল! এটা কি সত্যি, নাকি কোনো কুচক্রীদের ষড়যন্ত্র!

দুবছরের বড় হলেও তালুকদার সাহেব নুরুকে আগে থেকে ভাই বলেন। তাই আজো জিজ্ঞেস করেন, নুরুভাই, বলো তো তোমার ওপর যে-অভিযোগটা আনা হয়েছে তা কি সত্যি? আর যদি সত্যি হয় তবে কেন এ-বয়সে করতে গেলে? তোমার তো সংসারে কোনো অভাব নেই! আর নিরীহ একটা মানুষ, জগাকে এ-অপরাধে জড়াতে গেছ কেন?

নুরু এতক্ষণ কিছুই বলেনি, কী যেন ভাবছিল। তবে চিন্তান্বিত মনে হচ্ছে না তাকে। স্বাভাবিক একজন মানুষের মতো বলতে থাকে, –

আপনারা যে-দোষে আমাকে ধরে এনেছেন, তা সবই ঠিক আছে। আমি সত্যিই অপরাধী। আমার এতদিনের নাম-যশ সবই মিথ্যা অভিনয়ের ফল। শেষ বয়সে যা করছি বা করব তাই আপনারা আমার আসল রূপ হিসেবে ধরে নেবেন, এর শাস্তি যা হয় আমাকে মাথা পেতে নিতে হবে। তবে জগাকে আমার এ-অপরাধের সঙ্গে জড়াবেন না, তার কোনো দোষ নেই। সে একজন নিরীহ, গরিব মানুষ। তাকে ধরে আনার তো কোনো যুক্তি দেখি না, সে তো আর কারো গোয়ালঘরে ঢুকে গরু-ছাগল মেরে তাদের চামড়া ছিলে আনে না! আমার কাছে মরা পশুর খবর পেলেই তো সেখানে ছুটে যায়, দুটো পয়সা উপার্জন করে। তবে সৎভাবে, অসৎ উপায়ে নয়। আমি তাকে খবর দিই, তাকে বলি – জগা, অমুক পাড়ায় গরু মরেছে, তমুক পাড়ায় ছাগল মরবে, তুই তাড়াতাড়ি গিয়ে চামড়াটা ছিলে আনিস। এতে তার যে দু-চার পয়সা আসে তা দিয়ে ক্যান্সারের রোগী বউয়ের চিকিৎসা, ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ চালায়। সারাদিন পথিকদের পায়ের জুতার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যখন চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে আসে, তখন মদ গেলে। মাতাল হয়ে বাড়ি ফেরে, সপরিবারে না খেয়ে রাত কাটায়। বউ কিছু বললেই রোগীটাকে বেদম পেটায়, ছেলেমেয়েরা ভয়ে আর কিছু বলে না। তার এ-অভাব মেটাতেই আমি আমার আয় থেকেই অনেকদিন তাকে চাল-আটা কিনে দিয়েছি। সেদিন আর মদ না খেয়ে প্রশান্তিমাখা হাসি হেসে বাড়ি ফিরত। তার এ-দুরবস্থা দেখে আমি নিজেই ধ্বংসের পথ বেছে নিই। কিছু সামর্থ্যবান ব্যক্তির, ক্ষমতাবান লোকের ক্ষতি করেই জগার মুখে হাসি ফোটাতে এ-প্রয়াস। আমি জানি, এটা একটা ভ্রান্ত পথ। ভুল ওষুধ দিয়ে পশুপাখিকে মেরে ফেলা পাপ। আমার মনের কথা তো আর জগা জানত না, এতে তার দোষ কোথায়?

জগা নুরুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

বাবুজি, আপনারা যত শাস্তি দেওয়ার আমাকেই দিন, আমার পরিবারের কটা প্রাণীর মুখে হাসি ফোটাতেই নুরুর কাছে ঘনঘন আসতাম। কোনোদিন দু-টাকা, কোনোদিন এক টাকা কিংবা তার বেশি দিতেন। নুরুর মতো লোক সমাজে আছে বলেই তো আমি আমার অভাব বুঝিনি কখনো। সে আমাকে বাঁচাতে, বউকে বাঁচাতেই তো এ-কাজ করেছেন, দোষ তো আমার, আমার কপালের, দাদা! তাকে দোষী করেছেন কেন? সৃষ্টিকর্তা আমায় গরিব করে, একেবারে নিম্নশ্রেণিতে সৃষ্টি করেছেন। এ নোংরা জীবন নিয়ে আর বাঁচতে চাই না, নুরুকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে শাস্তি দিন, ফাঁসি দিন, এতে আমার কোনোই আফসোস থাকবে না। দয়া করে দেবতাতুল্য মানুষটাকে আপনারা আর অপমান করবেন না।

জগা কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে, পেছনে হাত বাঁধা থাকায় নাকেমুখে ধুলা ঢোকে তার। ওঠার কোনো আর উপায় পায় না। হাউমাউ করে কাঁদছে আর মা, মা করে ডাকছে। কে শোনে কার ডাক! নুরু চিৎকার করে বিধুকে বলে, ওই হারামজাদা, দেখতে পারছিস না, তোরই চাচাতো ভাই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, তুলতে পারিস না একটু!

বলেই নুরুও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। এ-দৃশ্য মাঠের সবাইকে দমিয়ে দেয়, চারদিকে গুঞ্জন ওঠে। একজন আর একজনকে বলে, বিচার তো নয়, শুধু শুধু নিষ্পাপ লোকদুটোকে কষ্ট দেওয়া, অপমান করা।

জগার দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে টপটপ করে, তা মাঠের সবুজ ঘাসকে আরো সবুজ করে তুলছে। নুরু জগাকে ধমকের সুরে বলে, আরে থাম তো, কাঁদছিস কেন! কাঁদলেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে? ধৈর্য ধর, তোর কিছুই হবে না। যে আসল অপরাধী সে-ই শাস্তি পাবে। চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে নুরু বলে,

আমি লালনের আদর্শে মানুষ, তাঁর রেখে যাওয়া অসংখ্য জ্ঞানমূলক গানের ফাঁকে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। সে-অনুযায়ী চলতে গিয়েই মানুষের উপকার না করে থাকতে পারি না। হাত বাড়াই অন্যের প্রতি সাহায্যের জন্য। আপনারা সবাই বিচক্ষণ তাই ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি (\)’ লাইনদুটোর মর্মার্থ বুঝতে পেরেছেন। মানুষকে মানুষের জন্যই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, এর ব্যতিক্রম হলেই তার ইহকাল-পরকাল বলতে কিছুই থাকবে না। শুধু লালন কেন, অনেক মনীষীও সৃষ্টিকর্তাকে পেতেই মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। খলিফা ওমরকে কে না চেনে, তিনিও তো আল্লাহর নৈকট্যলাভের আশায় ছদ্মবেশ ধারণ করে অনাহারির খোঁজ নিতে রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেরিয়েছেন, সারা জাহানের খলিফা হয়েও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করেছেন।

ইসলাম ধর্মে তো স্পষ্ট বলা আছে, পেটপুরে খেয়ে কেউ যদি সারারাত ইবাদত করে আর প্রতিবেশী কেউ না খেয়ে ছটফট করে রাত কাটায়, তার সারারাতের ইবাদত বিফলে যায়।

আচ্ছা, চেয়ারম্যান সাহেব, বলেন তো আল্ল­vহর ঘর (কাবা শরিফ), নবীর (সা.) মাজার শরিফ জিয়ারত করে কী শিক্ষা অর্জন করে এসেছেন? জনপ্রতিনিধি হয়ে কি রাতের অন্ধকারে কারো দ্বারে গিয়ে ভালো-মন্দ খোঁজ নিয়েছেন কখনো? জগাও তো আপনার নির্বাচনী এলাকার একজন ভোটার, তাছাড়া বিধু আপনার ইউনিয়ন পরিষদের একজন কর্মচারী, তার জন্য আপনি কতটুকুই বা করেছেন! ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে, এলাকার একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তো জগার খোঁজখবর নেওয়ার দরকার ছিল, তাই না? কিন্তু না, একবারও জানার চেষ্টা করেননি। বলেন তো, আপনার ইবাদত কি শুধু নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? মানবসেবা কী ইবাদতের মধ্যে পড়ে না? যাক, আমার প্রশ্নের উত্তর একটাও দেওয়ার দরকার নেই, এখন আমাদের কী বিচার করবেন, করেন। অপরাধীদের বিচার দেখতে কত লোক সমবেত হয়েছে, আপনার বিচারের রায় দেখবে বলেই তো শত লোকের ভিড়!

জগা অঝোরধারায় কেঁদেই চলেছে, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে টপটপ করে। মাথাটাও রেখেছে নিচু করে। চারপাশের কানাকানি বন্ধ এখন, জগা আর নুরুর বিচার মোড় নেয় বিপরীত দিকে। এখন সবার নজর শুধু বিচারকদের ওপর। তাদের নিয়ে খারাপ কথাও কম বলছে না, সমালোচনা হচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

তালুকদার সাহেব একসময় উঠে দাঁড়ায়, চলে যাবে বলে। চেয়ারম্যান সাহেব তার ওঠা দেখে বলেন, চাচা, যাচ্ছেন যে, বিচারটা শেষ করেন।

তোমরাই করো, এ-পাপের ভাগ আমি নিতে রাজি নই। তোমরা যা ইচ্ছে নুরু আর জগাকে তাই করো, বাবা। আমি আর এর মধ্যে নেই, আমি চললাম। অপরাধ করে কে আর শাস্তি হয় কার!

তালুকদার সাহেব বাড়ির দিকে পথ ধরেন, তার সঙ্গে সঙ্গে গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও আর বসে থাকেন না, উঠে পড়েন। চেয়ারম্যান একবার ডানে তাকান, একবার বাঁয়ে। অবস্থা তো ভালো নয়! আগপাছ ভেবে সবার উদ্দেশে বলেন, এ-বিচার আর ওদের হবে না, আমার বিচারটাই না-হয় করে যান আপনারা! তালুকদার চাচা, আমার শেষ কথাটা তো শুনবেন।

সবাই মাথা ঘুরিয়ে দাঁড়ায়, এক পা দু-পা করে আবার আগের অবস্থানে আসে। এক মিনিটের মধ্যে নীরবতা নামে। তালুদারসহ বাকিরাও পুনরায় আসন গ্রহণ করেন। চারপাশে আর পিনপতনের শব্দও নেই, একবারে নীরব-নিস্তব্ধ। চেয়ারম্যান বিধুকে ডেকে বলে, এই বিধু, জগা আর নুরুভাইয়ের হাতের বাঁধন খুলে দে। আর ওই দড়ি দিয়েই আমার হাতদুটো শক্ত করে বাঁধ, ফেরেশতার মতো মানুষদুটোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, তারা তো আমারও গুরুজন। আসলে বুঝতে পারিনি, ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে বিরাট একটা ভুলের মধ্যে ডুবে ছিলাম। কারো ভালোমন্দের খোঁজখবর না নিয়ে চরম ভুল করেছি।

ছুটে এসে নুরুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন চেয়ারম্যান। জগাকেও কাছে টেনে নেন। বলেন, ভাই আমার, আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া যায় না! তোমরাই তো আমার পথপ্রদর্শক, প্রিয়জন। আমার অন্ধত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার জন্য নুরুভাই আর জগাভাইয়ের কাছে আমি চিরঋণী হয়ে থাকলাম।

হাটের মানুষ ছুটে এসে মুখ তুলে চেয়ারম্যানকে দেখে আর নুরু-জগাকে দেখে। দূরে দাঁড়িয়ে তালুকদার সাহেব পাঞ্জাবির এক কোনা দিয়ে বারবার চোখ মোছেন। চেয়ারম্যানের দুচোখ জুড়ে টলটলে পানি। নুরুকে জড়িয়ে ধরেই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। অমনিই প্রশান্তি এসে ঘিরে ধরে চেয়ারম্যানকে আর উদাস হয়ে ভাবেন কী যেন!

Leave a Reply

%d bloggers like this: