চিত্রাঙ্গদা নয় কেউ

লেখক: পূরবী বসু

এই যে দুটি ছোট্ট বলের মতো মাংসপি- দেখছো, এগুলোই তোমার ওভারি। তোমার শরীরে মেয়েদের হরমোন এস্ট্রোজেন আর প্রজেস্টারোন বানাতো এগুলো। অর্থাৎ এই ছোট্ট বল দুটিই প্রধানত তোমাকে এতো বছর ধরে মেয়ে করে রেখেছিল। সন্তান তৈরির জন্যে মেয়েদের যে ডিম্বাণুর দরকার হয়, সেটাও আসে এই ওভারি থেকেই।’

ডাক্তার এই কঠিন কঠিন শব্দগুলো যতটা সম্ভব ধীরে ধীরে উচ্চারণ করার চেষ্টা করে। তবে এগুলো সবই তো আমার কাছে অতিপরিচিত এখন। কিছুই নতুন মনে হয় না।

একটু থেমে ডাক্তার আবার বলে, ‘গত কিছুকাল ধরে যে তোমাকে নানারকম ওষুধ খাওয়াচ্ছিলাম, ইনজেকশন দিচ্ছিলাম, তা আসলে এই বলদুটোকে নিষ্ক্রিয় করে দেবার জন্যেই; মানে মেয়ে হরমোনের কাজকর্ম চেপে রাখার জন্যে।’

ডাক্তারের নির্দেশমতো বিছানার সামনের দেয়ালে যে বিশাল আয়না রয়েছে, সেদিকে তাকায় মুকুল। দেখতে পায়, তার শায়িত শরীর থেকে কয়েক ফুট সামনে স্টেইনলেস স্টিলের এক ঝুলমত্ম ট্রে। ট্রের ওপর টানটান করে পাতা রয়েছে কয়েক প্রস্থের সাদা টিস্যু পেপার। সেখানে, সেই টিস্যু পেপারের ওপরেই রাখা হয়েছে সদ্য পেট থেকে বের করে আনা তাজা রক্তে ভেজা লাল টুকটুকে দুটো বল। প্রতিটি বলের সঙ্গে লাগানো রয়েছে একটি করে লম্বা মিহি দড়ির মতো সরু, মাংসালো গ্রন্থি।

মুকুলের খুব ইচ্ছা হয় আলগোছে বলদুটোকে নিজের হাতে তুলে নেয়। কিন্তু তা সম্ভব নয়।

ভাবতে অবাক লাগে মুকুলের, এই বস্তুগুলো তার পেটের ভেতর ছিল এতকাল। এই ছোট্ট ছোট্ট প্রত্যঙ্গগুলো রেখেছিল তাকে, সে যা নয়, কখনো নিজেকে যা ভাবে না, তাই করে। আজন্ম। ওগুলোকে নিজের হাতে ধরার-স্পর্শ করার দুর্নিবার এক স্পৃহা অনেক কষ্টে দমন করে সে।

ওভারিদুটোকে শরীরের বাইরে দেখে ভালো লাগে মুকুলের। নিশ্চিমত্ম হয়। আঃ! কী শামিত্ম! কী ভীষণ তৃপ্তির দিন আজ! এ যে কত বড় পাওয়া। কী সাধের অর্জন! আজকে জীবনে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর কাছে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারবে মুকুল সেই রূপে, যেভাবে নিজেকে সবসময় ভেবে এসেছে সে, যেভাবে বোধ করেছে, যেভাবে নিজেকে দেখতে চেয়েছে। সে সত্যি সত্যি অবশেষে মুক্তি পাবে নিজের শরীরের এই অবাঞ্ছিত বেড়াজাল থেকে। এখনো বিশ্বাস হয় না যেন।

আর কী অদ্ভুত! এই মুহূর্তে সবাইকে ডিঙিয়ে, সবকিছু ছাপিয়ে শুধু একটি মুখই চোখের সামনে ভেসে উঠছে, যে-মুখ মার নয়, বাবার নয়, বড় দুই বোনের নয়, এমনকি শীলা নামে তার যে প্রিয় সহপাঠী, যাকে দেখলে সব না-পাওয়া মুহূর্তে ভুলে যাওয়া যায়, তারও নয়। সে-মুখ রতন চৌধুরীর।

মুকুলের খুব ইচ্ছা হয় রতন চৌধুরীকে ডেকে এনে তার হাতে তুলে দেয় এই রক্তাক্ত ওভারিদুটো।

রতন চৌধুরী, দেখো, কেমন হেরে গেলে তুমি আমার কাছে। প্রায় বাপের বয়সী হয়েও কত লোভ ছিল তোমার এই শরীরটার ওপর। সবার চোখের আড়ালে যখনি একমুহূর্তের জন্য কাছে পেতে আমাকে, তক্ষুনি তোমার হাত চলে যেত আমার বুকের ওপর, তারপর সুযোগ পেলে ঢোলা হাফপ্যান্টের ভেতরও। তুমি বলতে, কোথাও আমার বিয়ে হবে না। আমার মতো পুরুষালি মেয়েকে কেউ নাকি বিয়ে করবে না। তবে তুমি করবে। কারণ মামা হলেও তোমার সঙ্গে আমার রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি বলতে, আমাকে বিয়ে করার জন্য দরকার হলে জোর করে তুমি আমায় পেট বাঁধিয়ে দেবে।

মুকুলের খুব সখ হয় ওভারিদুটো দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে শূন্যে তুলে ধরে ওপরের দিকে। ইচ্ছা হয়, দূরবর্তী রতন চৌধুরীর উদ্দেশে টোস্ট করে বলে, ‘এই নাও আমার ওভারি। এই নাও তোমার সন্তানের দুরাশা।’

‘আগাছার মতো এ-দুটোকে আজ উপড়ে তুলে আনা হয়েছে অরক্ষিত পৃথিবী – এই হাটখোলা সমাজ! মুকুল পদে পদে ধাক্কা খায়। তার বয়সী যুবকদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে প্রচণ্ড হতাশ হয় মুকুল। দেখে, তারা প্রায় সকলেই নারী-সংক্রান্ত ব্যাপারে পুরোপুরি অবসেসড। যৌনপ্রতীক ছাড়া মেয়েদের আর কিছুই যেন ভাবতে পারে না তারা। মেয়েরা আড়াল হলেই বা দু-তিনজন যুবক একত্রিত হলেই ভয়ানক অশ্লীল মন্তব্য করে তারা মেয়েদের নিয়ে। এ কেবল নারীসঙ্গবিহীন হতাশ যুবকদের খেদোক্তি নয়, মেয়েদের সম্পর্কে একধরনের নিচু ও ভুল ধারণার অসিত্মত্ব আগাগোড়া সর্বত্রই টের পায় মুকুল। সে লক্ষ করে, অধিকাংশ লোকেরই বদ্ধমূল ধারণা, মেয়েদের বুদ্ধি, চিন্তা, যুক্তি বলে তেমন কিছুই নেই। শুধু পুরুষদের আনন্দ দেবার জন্যই তাদের জন্ম। সেই আনন্দদানও মূলত দেহজ। এসব ব্যাপারে কোনো আপত্তি করলে বা বাধা দিতে গেলে নানারকম কটু কথা ও মন্তব্য শুনতে হয়। মুকুল তখন আস্তে সেই স্থান পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়।

কোনো আসর বা আড্ডা থেকে মুকুলের এই নিঃশব্দ ও অকস্মাৎ প্রস্থান এত ঘন ঘন হতে থাকে যে, আজ আর তাই কেউ অবাক হয় না হঠাৎ তার উধাও হয়ে যাওয়া টের পেলে। বন্ধুমহলে তার নামই হয়ে গেছে, ‘এই আছে এই নেই’।

এসবের বাইরে সে আরো কিছু কারণে নিজেকে নিয়ে কিছুটা চিমিত্মত ও বিচলিত হয়ে পড়ে। কিছু লোক তার সমতল বুক আর মুখের একগাদা কালো দাঁড়ির বাইরে গিয়ে তার নরম, পেলব হাত-পা, আঙুল, হালকা মসৃণ ঠোঁট, হাসি, কণ্ঠ, কথাবার্তার মধ্যে কোথায় যেন নারীসুলভ গন্ধ পায়। এসব নিয়ে তির্যক মমত্মব্য করে কেউ কেউ। কেউ কেউ যৌন সংকেত বা যৌন ইঙ্গিতও দেয়। বিরক্ত হয়ে আড্ডা থেকে উঠে যায় মুকুল। সেখানে গিয়েও নতুন কিছু খোঁজে। পায় না। বিরক্ত লাগে তখন।

বাড়িতেও কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। আগে এ-বাড়ির তিন সন্তান – পিঠাপিঠি তিন কন্যা একটি বড় খাটে একসঙ্গেই ঘুমাতো। এখন মুকুলের জন্য ভিন্ন সিঙ্গল খাট পাতা হয়েছে। একই ঘরের দুই পাশে দুটো খাট। অন্য পাশের ডাবলখাটে এখনো একসঙ্গে ঘুমোয় দুই বোন। আগের বাসাতেও ছিল দুটি বাথরুম। একটা ব্যবহার করত মা-বাবা। অন্যটা বাড়ির তিন সন্তান। দুটো বাথরুম আছে এই বাড়িতেও। কিন্তু একটিকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বাবা আর মুকুলের জন্য। অন্যটা মা ও দুই কন্যা ব্যবহার করে। বাবা কম কথা বলে, ঘরে কম থাকে। বরাবরই। আগে মা ও তিন কন্যা বসে অনেকরকম কথা, গল্প করতো। এখন বাড়ির মেয়েদের আড্ডায় মুকুলের ডাক পড়ে না। আর বাবা তো আরো কম কথা বলে আজকাল। বিশেষ করে মুকুলের সঙ্গে বলার যেন আর কিছুই নেই তার। সার্জারির পর থেকে ভালো করে মুকুলের দিকে তাকায় না পর্যন্ত বাবা। আরো যেন গম্ভীর ও নিশ্চুপ হয়ে পড়েছে।

সেদিন শুক্রবার। সন্ধ্যায় একটি রেস্টুরেন্ট কাম বারে নিয়ে গেল মুকুলকে তার দুই বন্ধু। গত বুধবার মুকুলের জন্মদিন ছিল। অফিসের কাজের চাপে সেদিন কিছু করতে পারেনি। তাই আজ মুকুলকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়াতে চায় ওরা।

সবকিছু ঠিকমতোই চলছিল। কিন্তু গোল বাধলো ডিনার শেষে আবার বারে গিয়ে বসার কিছুক্ষণ পরেই। মুকুলের বাঁ-পাশে বসেছিল এক অপরিচিত পুরম্নষ। তিরিশের ঘরে হবে বয়স। মোটা গোঁফ। গাট্টাগোট্টা চেহারা। বসে বসে বোতল থেকে সরাসরি বিয়ার খাচ্ছিল সে। মুকুলের দিকে বারবার তাকাচ্ছিল লোকটা। একসময় মুকুল উঠে পেছনের দিকে বাথরম্নমে গেলে লোকটাও মুকুলের পিছু পিছু যায়। তারপর সে মুকুলকে পেছন থেকে ‘হ্যালো’ বলে ডেকে থামিয়ে কাছে এসে মুখোমুখি দাঁড়ায়।

মুকুল কিছু বুঝতে না পেরে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে অপরিচিতের দিকে তাকাতেই হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই মুকুলের মুখমণ্ডলটি নিজের দুই হৃষ্টপুষ্ট হাতের মধ্যে তুলে ধরে সামনের দিকে টেনে তাকে খোলা মুখে চুমো খেতে চেষ্টা করে লোকটা। এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিয়ে কিছুটা পিছু হটতেই রাগে-অপমানে রক্তাভ হয়ে ওঠে লোকটির ফর্সা মুখ। চোখদুটো খানিকটা বিস্ফারিত। জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে সে। তারপর আবার সামনে এগিয়ে এসে দুই হাতে মুকুলের মাথাটা ধরে বাথরম্নমের বাইরের দেয়ালে প্রচণ্ড জোরে ঠুকে দিয়ে সে সোজা সামনের দিকে হেঁটে চলে যায়।

মুকুলের সমসত্ম পৃথিবীটা চক্কর দিয়ে ওঠে। এ-সময় এখানে কেউ নেই। চিৎকার করতে গিয়ে গলা থেকে স্বর বেরোয় না মুকুলের। মনে হয় তার শরীরে কোনো শক্তি যেন অবশিষ্ট নেই। মাথায় প্রচণ্ড আঘাতে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল মুকুল। মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে সে। পারে না। মেঝেতেই আবার শুয়ে পড়ে। জ্ঞান সম্পূর্ণ হারায়নি হয়তো। হয়তো কিছুক্ষণের জন্য হারিয়েছিলও। কিন্তু চারদিকের সকল শব্দ যে থেমে গিয়েছিল, সমসত্ম আলো নিভে গিয়েছিল, সেটা মুকুল টের পায়। নৈঃশব্দ্যে, ঠান্ডা মেঝেতে, টয়লেটের বাইরে এককোণে মরার মতো পড়ে থাকে মুকুল। কতক্ষণ কে জানে!

মুকুল যখন সম্বিত ফিরে পায়, উঠে দাঁড়িয়ে আসেত্ম আসেত্ম হেঁটে সামনের দিকে এসে দেখে ততক্ষণে খদ্দেররা সবাই চলে গেছে।  বারের ক্যাশিয়ার বার বন্ধ করার আগে শেষ হিসাব করছে। মুকুল মাথায় হাত দিয়ে টের পায়, মাথার পেছনের ডান দিকটা ফুলে গেছে পিংপং বলের সাইজের একটা গুটলি পাকিয়ে।

রাস্তায় বেরিয়ে আসতে আসতে মুকুল মনে মনে হাসে। এতদিন সে ভাবতো, এ-ধরনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বুঝি শুধু মেয়েদেরই যেতে হয়। কিন্তু নিজের কথা – বারের আড়ালে আগন্তুকের হাতে নিশ্চুপে এই মার খাবার কথা কাউকে বলা যাবে না। শুনলে হাসবে সকলে। মুকুল যাদের সঙ্গে এখানে এসেছিল, তারা চলে গেছে তাকে ছাড়াই। অপেক্ষা করতে করতে হয়তো ভেবেছে, পাগলা মুকুল কে জানে কী কারণে আবার বুঝি রাগ করে আগেই সটকে পড়েছে। সে যে ‘এই আছে, এই নেই’।

রাত বারোটা বেজে গেছে। বাড়ি থেকে অনেক দূরে শহরের অন্য প্রামেত্ম দাঁড়িয়ে মুকুলের হঠাৎ মনে হলো, আজ থেকে বছরখানেক আগেও তার মা-বাবা শুধু নয়, বড় দুই বোনও সমান ব্যতিব্যস্ত ও চিন্তিত হয়ে পড়তো মুকুলের ঘরে ফিরতে সামান্য দেরি হলে। রাত সাড়ে আট বা নয়টার কাছাকাছি হলে তো কথাই নেই। বাবা ছুটতো রিকশা নিয়ে মেয়ের খোঁজে সম্ভাব্য জায়গার আশেপাশে। বোনেরা টেলিফোন নিয়ে সব জায়গায় ফোন করতে লেগে যেত। মা রাঁধা ডাল পুনরায় জ্বাল দিতে শুরু করতো নিজেকে শান্তা ও ব্যসত্ম রাখার চেষ্টায়।

কিন্তু আজ রাত সাড়ে বারোটা হয়ে গেলেও তাদের একজনও তাকে এখনো ফোন করেনি। মুকুলের মুখভরা দাড়ি, পরনে গলফ
শার্ট-কডোরয়েড প্যান্ট আর পায়ে গাঢ় বাদামি মোজার সঙ্গে সররুলেসে বাঁধা কালো চকচকে চামড়ার জুতো বুঝি তাদের এই নিশ্চয়তা, নির্ভয়তা দিয়েছে। মুকুলের নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা আর আগের মতো চিন্তিত নয়। বিশেষ করে বিকেলে তার দুই বন্ধুর সঙ্গে যখন বেরিয়ে এসেছে সে।

এদিকটার সব দোকানপাট আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। রিকশা চলাচলও কমে গেছে এখন রাস্তায়। বাস চলছে ঘণ্টায় হয়তো একটা বা দুটো।

হাড়-লিকলিকে একটা বাদামি কুকুর সঙ্গে দুটি বাচ্চাসহ রাস্তার ওপাশে ডাস্টবিনের চারপাশে শুঁকে শুঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সম্ভবত খাদ্যের খোঁজে।

রেস্টুরেন্টের সামনে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মুকুল ঘরে ফেরার জন্য বাহনের অপেক্ষা করে। বারবার হাতের সেলুলার ফোনের দিকে তাকায়। কেউ, যে কেউ, যদি ফোন বা টেক্সট করে জানতে চায়, তুমি কোথায়? ঠিক আছো তো? কিন্তু না। কোনো ফোন আসে না। কোনো মেসেজও নেই।

আজ  –  এই মুহূর্তে  –  অন্ধকারে  –  নির্জন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ঘরে ফেরার জন্য রিকশা কিংবা সিএনজির অপেক্ষা করতে করতে জীবনে প্রথমবারের মতো মুকুলের মনে হঠাৎ প্রশ্ন জাগে, আসলেই কি তার শৈশব, কৈশোর, নবযৌবনকাল সর্বাংশেই অসুখী আর অর্থহীন ছিল?

Leave a Reply

%d bloggers like this: