শিল্পী নাজনীন

পাশের ঘরে রেবু কাঁদছে। ফ‍্যানের আওয়াজ ছাপিয়ে ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে কানে। তীরের মতো বিঁধছে। প্রতিদিনের এই অভ‍্যস্ততা হাঁপ ধরিয়ে দেয় মাঝে মাঝেই। দম বন্ধ লাগে তখন। রেবু তবু কাঁদে। রেবুকে অসহ‍্য লাগে আজকাল। প্রকাশ করি না। করতে পারি না। করা যায় না আদতে। অভিনয়ের এই ঘৃণ‍্য পারঙ্গমতা ধীরে ধীরে আমার ভেতরে কেমন এক অপরাধবোধের সলতেকে উস্কে দিতে চায়। ইচ্ছে করে রেবুকে ডেকে বলি, তোমাকে অসহ‍্য লাগে। বিদেয় হও। ইচ্ছে হয় তার চুলের মুঠি ধরে বলি, নাঁকিকান্না বন্ধ কর হারামজাদি। সামনে থেকে দূর হ। ইচ্ছে করে লাথি দিয়ে বের করে দিই বাড়ি থেকে। বলি, বাড়ির ত্রিসীমানায় যেন তোর ছায়াও না দেখি আর। 

বাস্তবে বলা হয় না সেসব। বরং কণ্ঠে সহানুভূতির তীব্র আকুলতা জাগিয়ে বলি, কাঁদে না সোনা। কাঁদে না। সহজ হও। জীবনকে যাপন করো আনন্দের পরতে ঢেকে।

রেবু তবু কাঁদে। প্রতিদিন নিয়ম করে এই সময়টায় সে কাঁদে। ঘড়ি ধরে পাক্কা এক ঘণ্টা। সুর করে, ইনিয়ে-বিনিয়ে, ফুঁপিয়ে, পুরো এক ঘণ্টা সময় নিয়ে সে কাঁদে। তারপর চোখ-মুখ ধুয়ে, ফোলা ফোলা মুখ, লাল লাল চোখে টিভির সামনে বসে। সিরিয়াল দেখে। সিরিয়ালের চরিত্রগুলোর দুঃখ-সুখে একাত্ম হয়ে সে কাঁদে, হাসে। রেবু সম্ভবত পাগল হয়ে যাচ্ছে। কিংবা গেছে। আহা! রেবু বড় সুখে আছে। ইচ্ছে হলেই হাসতে পারে, কাঁদতে পারে। আমি পারি না। ইচ্ছে মতোন কিছুই করতে পারি না আজকাল। আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে, হাপুস নয়নে কাঁদতে ইচ্ছে করে, সব ছেড়েছুড়ে যেদিকে দু-চোখ যায় চলে যেতে ইচ্ছে করে। যেতে পারি না। রেবুর সঙ্গেই সেঁটে থাকি। চোখের  সামনে রেবুর ক্রমাগত বাড়তে থাকা পাগলামি দেখি। প্রবল আফসোসে মরে যেতে ইচ্ছে করে আমার। মনে হয়, ইস্! যদি রেবুর মতো একটু একটু করে পাগল হয়ে যেতে পারতাম আমিও!

বাঁধন আজ সকালেও এসেছিল। শুকনো মুখে খানিকক্ষণ এ-ঘর ও-ঘর শেষে রেবুর পাশে গিয়ে বসে ছিল চুপচাপ। বাঁধনের দেড় বছরের ছেলেটা আধো আধো বুলিতে সারাঘরে ছুটে বেড়াচ্ছিল। লাল টুকটুকে ঠোঁট সরু করে রেবুকে ডাকছিল, বুবু! বুবু!

রেবু গলে পড়ছিল স্নেহে। বাঁধনের ছেলেটাকে বুকের ভেতর চেপে চুমুতে ভরিয়ে দিচ্ছিল তার কচি মুখ। হাঁসফাঁস করতে করতে ভ‍্যাঁ করে কেঁদে বাঁধনের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শেষে বাচ্চাটা। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বাঁধনের আহ্লাদী কথায় বুকের ভেতরটা কেমন জ্বলছিল আমার। ইচ্ছে হচ্ছিল তাকে ধমক দিই। বলি, চলে যা বাঁধন। অনেক দূরে চলে যা। আর কোনোদিন আসিস না এখানে।

বলতে পারিনি। উল্টো বাঁধনের ছেলেটাকে কোলে নিয়ে, নানুভাই! নানুভাই! বলে আদর করেছি। মোড়ের দোকান থেকে চিপস আর চকলেট কিনে দিয়েছি। যেমন বাঁধনকেও দিতাম। মেয়ের মতোই আদরে আর যত্নে তাকে বড় করেছিলাম আমরা। আমি আর রেবু। 

বুকের ভেতর তবু জেগে ছিল অতৃপ্তির চোরাবালি। কী যে ভীষণভাবে ছিল! এখনো আছে। যখন-তখন পা হড়কে যেত তাতে। এখনো যায়। এই চোরাবালিতে ডুবে দম বন্ধ হয়ে আসতে চায় আমার। মনে হয় কে যেন গলা টিপে ধরে। কী যেন এক অচেনা অমৃতের আকণ্ঠ অতৃপ্তি আমাকে জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে। তৃষ্ণার্ত করে তোলে। তখন ইচ্ছে করে রেবুকে খুন করে ফেলি। ইচ্ছে হয় গলা টিপে মেরে ফেলি তার সব নখরামি। পরক্ষণেই নিজেকে সামলাই। মনে হয়, রেবুও তো আকণ্ঠ ডুবে আছে একই চোরাবালির অতলে। ডুবে আছে সীমাহীন হতাশা আর শোচনার তীব্রতর তাপে। হয়তো আরো বেশি। হয়তো পুড়ছে সে আরো বেশি তীব্র কোনো নাম-না-জানা বোধে। মন তবু বিদ্রোহ করে হঠাৎ হঠাৎ। সবকিছুর জন্য রেবুকেই দায়ী করে রেবুকে সে তুলে দেয় অপরাধীর কাঠগড়ায়। বিচার করে বিচারকের আসনে বসে। রায় দেয়। কখনো ফাঁসি, কখনো যাবজ্জীবন। কখনো  আবার অশ্রাব‍্য গালি, কিল-চড়-লাথি অথবা চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে দেওয়া। মনে মনে সব শাস্তি নিশ্চিত করে হাসিমুখে রেবুর সামনে গিয়ে দাঁড়াই আমি। রেবুর চোখ থেকে জল মুছে দিই। সাহায্য করি ঘরের কাজে। রেবু অসুস্থ। ডায়াবেটিস। হাই ব্লাড প্রেশার। কোলেস্টেরল। কিডনি সমস্যা। বাতের ব‍্যথা। হার্টের অসুখ। দুনিয়ার তাবৎ বাঘা বাঘা সব অসুখ একাই বগলদাবা করে বসে আছে রেবু। বছরদুয়েক আগে তার হার্টে রিং পরানো হয়েছে দুটি। রেবু তখন ভয় পেয়েছিল ভীষণ। উৎকণ্ঠায় ছিল খুব। আমি উড়িয়ে দিয়েছিলাম হেসে। অভয় দিয়ে বলেছিলাম, আরে ছাড়ো তো! লোকে শখ করে কানে রিং পরে, আঙুলে পরে। আর তুমি পরছো একেবারে তোমার হার্টে! রাজকপাল তোমার, বুঝেছ? একেবারে রাজকপাল! 

রেবু রেগে টং হয়েছিল তখন। ব‍্যাপারটাকে অতো হালকা ভেবে উড়িয়ে দেওয়ায় ভয়ানক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, অভিমানে আমার সঙ্গে কথা বন্ধ রেখেছিল অনেকদিন। আমাকে অমানবিক, নিষ্ঠুরসহ আরো আরো বহুল উপমায় বিভূষিত করেছিল রেবু। তবে আমার নির্লিপ্ততায় ভেতরে ভেতরে সে-ও ব‍্যাপারটাকে সহজভাবে মেনে নিতে শুরু করেছিল নিজের অজান্তেই। ফলে, রিং পরানোর খুব অল্পদিন পরেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিল সে।

রেবু কাজের মানুষ রাখতে পারে না। কোনো কাজের মানুষই তার কাছে এক মাসের বেশি টিকতে পারে না। ভয়ানক শুচিবায়ুগ্রস্ত রেবু, মারাত্মক খিটখিটে। বাধ্য হয়ে আমাকেই হাত লাগাতে হয় ঘরের কাজে। অবসর জীবনে আমার অবশ‍্য বই পড়া আর আকাশ-পাতাল চিন্তা করা ছাড়া বিশেষ কিছু করারও নেই তেমন। তবু ঘরের কাজ করতে ভালো লাগে না একদম। রেবুরও মন ওঠে না। নানান খুঁত খুঁজে বের করে সে, অবিরাম বকে যায়। অতিষ্ঠ লাগে। দমবন্ধ লাগে। জীবনটাকে এক অসহ‍্য খাঁচা মন হয়। ফুকো, লাকা, দেরিদা বা কনফুসিয়াসেও মুক্তি মেলে না। শান্তি মেলে না বুদ্ধ বা যিশু বা অন্য কারুতে। ইচ্ছে করে একছুটে পালিয়ে যাই দূরে কোথাও। হারিয়ে যাই কোনো অজানায়। মাকে মনে পড়ে। বাবাকেও। শৈশব হানা দেয় ভাবনায়। মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় মায়ের আঁচলঘেঁষা ছিলাম ভীষণ। বাবাকে মায়ের আশেপাশে দেখলে কেঁদে-কেটে বাড়ি মাথায় করতাম। আঁচড়ে, কামড়ে অতিষ্ঠ করে তুলতাম বাবাকে। মা হাসতো। হেসে বলতো, এখন আমার আঁচল ধরে ঘুরছিস, বড় হয়ে বউয়ের আঁচল ধরে ঘুরবি! আঁচলধরা ছেলে কোথাকার!

শুনে মেজাজ খারাপ হতো আমার। চোখ পাকিয়ে বলতাম, আমি বিয়ে করলে তো! বিয়েই করব না কোনোদিন! আমি তোমার সঙ্গে থাকব সারাজীবন।

মা হেসে জড়িয়ে ধরত আমাকে। বলত, বোকা ছেলে!

পরে, অনেক পরে, যত দিন গেছে, ততই বুঝেছি, সত্যিই কতটা বোকা ছিলাম আমি। শৈশব থেকে যত দূরত্ব বাড়ছিল আমার, ক্রমশ তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দূরত্ব বাড়ছিল মায়ের থেকেও। নইলে মাকে না জানিয়ে, পরিবারের কাউকে না জানিয়ে, কী করে রেবুর সঙ্গে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেছিলাম আমি! লাল শাড়ি পরে রেবু যেদিন বাড়িতে গিয়ে আচমকা মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে বলল, আমি রেবতী। আমি আর কাঞ্চন বিয়ে করেছি – মায়ের মুখটা কী ভীষণ ফ‍্যাকাসে হয়ে গেছিল মুহূর্তেই! অপমানে, নাকি কষ্টে? জানা হয়নি আমার কোনোদিন। মা শুধু আমার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল কিছুক্ষণ। অবাক হয়ে বলেছিল, মেয়েটা কী বলে রে, কাঞ্চন? কে ও?

ও রেবতী, মা। আমরা আজ বিয়ে করেছি।

আচ্ছা। – শব্দটা মা উচ্চারণ করেছিল ফিসফিস করে, প্রায় শোনা যায় না এমনভাবে। সেদিন সারাদিন মা ঘর থেকে বের হয়নি আর, সারারাত আলো জ্বলেনি মায়ের ঘরে। রেবু মায়ের ব‍্যবহারে বিরক্ত হয়ে বলেছিল, আমি আসায় তোমার মা তো দেখছি পাথর হয়ে গেছে শোকে। ঘরদোর অন্ধকার করে বসে আছে সেই থেকে।

কিছু বলিনি আর। তারপর থেকে কিছু বলার ছিলও না আমার। মায়ের সঙ্গে রেবুর শীতল যুদ্ধটা নীরবে তৃতীয় বিশ্ব হয়ে দেখে গেছি শুধু। বেশিদিন দেখতে হয়নি অবশ‍্য। মা আমাকে মুক্তি দিয়েছিল অচিরেই।

রাতে  ঘুমের ভেতর কখন মরে গিয়ে আমাকে মুক্তি দিয়ে গিয়েছিল মা, টের পাইনি। পরদিন অনেক বেলায় কাজের বুয়া এসে আবিষ্কার করেছিল আমার মুক্তির সেই মহান বার্তা।

ইদানীং মাকে ভীষণ মনে পড়ে। বাবাকেও। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সেই একলার লড়াইটা, আমাকে নিয়ে মায়ের সেই প্রাণান্তকর যুদ্ধটা চোখে ভাসে। হুট করে বাবার মৃত্যুর পর আমাকে নিয়ে মায়ের দৌড়টা সহজ ছিল না। দৌড়শেষে মা যখন একটু জিরোনোর স্বপ্ন দেখেছে, যখন স্বপ্ন দেখেছে একটু স্বস্তিতে শ্বাস নেওয়ার, তখনই আমি রেবুকে নিয়ে হাজির হয়েছি মায়ের সামনে। ধাক্কাটা মা সামলাতে পারেনি। মুখে কোনোদিন কোনো অভিযোগ করেনি; কিন্তু মায়ের মুখে হাসি দেখিনি আর। মা আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি কোনোভাবেই।

আজকাল মা এসে ভাবনায় হানা দেয় যখন-তখন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তোদের বংশের আর কোনো বাতি থাকল না রে কাঞ্চন! কদিন পর ঘুঘু চরবে তোর বাপের ভিটেয়!

শুনে পিত্তি জ্বলে আমার। কী যে সব সেকেলে ভাবনা মায়ের! বংশের বাতি আবার কী! যতসব ফালতু ধ‍্যান-ধারণা! মাকে ভাবনা থেকে ধমকে বিদায় করে আমি হাতের নাগালে থাকা দর্শনের কঠিন তত্ত্বে ডুবতে চেষ্টা করি। মনকে খুব করে শাসন করি, বোঝানোর চেষ্টা করি যে, সংসারের এইসব ছোটখাটো চোরাবালি, না পাওয়ার গলি-ঘুপচি, অতৃপ্তির গোপন চোরাকাঁটা, খুবই তুচ্ছ আসলে। তুচ্ছ আর অর্থহীন। যেখানে সংসার নিজেই এক ভয়ংকর প্রপঞ্চ। মায়া। সে নিয়ে এত উতলা হওয়ার কিছু নেই। শান্ত হও, শান্তি মিলবে। কিন্তু মন ব‍্যাটা মারাত্মক বেতমিজ। হুট করে চোরাবালিতে ডুবে যায়। গলি-ঘুপচিতে পথ হারায় তালকানা হয়ে। নরম, কোমল হৃৎজমিনে ফুটিয়ে নেয় যন্ত্রণার চোরাকাঁটা। তারপর ছটফট করে। মুক্তির পথ খুঁজে মরে। পোড়ে। আর অনিবার্যভাবেই রেবুকে তুলে দেয় আসামির কাঠগড়ায়। তার বিচার করে। ফাঁসি দেয়। একবার। বারবার। কেন রেবু সময়মতো সন্তান ধারণ করল না!  কেন সে গর্ভধারণের পরেও অতবার অ‍্যাবরশন করতে গেল আমার অত অনুরোধ সত্ত্বেও! নারীবাদ! রেবু বলতো, সে তখন মা হওয়ার জন্য একদম প্রস্তুত নয়। তার নারীবাদী মন তখন ক‍্যারিয়ারের স্বপ্নে বিভোর। সন্তান মানে পায়ে বেড়ি পরা। স্বেচ্ছায় স্বাধীনতা নামক প্রজাপ্রতির ডানা ছিঁড়ে নেওয়া। রেবু তাই নিজের অনাকাক্সিক্ষত সন্তানদের অনায়াসে হত্যা করেছে গর্ভেই। আমি নীরব দর্শক, বলিনি কিছুই। বললেই ‘পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার এক বর্বর পুরুষ’ তকমা জুটেছে তৎক্ষণাৎ। ‘বোবার শত্রু নেই’ মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে আমি তখন মিতালি করেছি দর্শনের সঙ্গে। একসময় হুঁশ ফিরেছে রেবুর। সন্তান-কামনায় তখন সে পাগলপ্রায়। আমাকে ছুটতে হয়েছে

সম্ভব-অসম্ভব সব জায়গায়। ডাক্তার, কবিরাজ, বদি‍্য, কিছুই বাদ রাখিনি। অবশেষে রেবুর সে কী উচ্ছ্বাস! মা হবে সে! আমারও তখন মনের ভেতর আনন্দের চোরাস্রোত। রেবু চাকরি ছেড়ে দিলো। এ-সময় বিশ্রাম দরকার, কোনো রিস্ক নিতে চায়নি সে। অপেক্ষা। সময় যেন কাটতেই চায় না আর। আমি রেবুর পেটে কান পেতে আমার সন্তানের নড়াচড়া গুনি, তার আগমনের বার্তা শুনি, তার সঙ্গে কথা বলি, ছড়া শোনাই তাকে। রেবু হাসে। আমরা হাসি। এতো সুখ আগে কখনো আসেনি আমাদের ছোট্ট জীবনের ছকে। আমার চোখে জল এসে যায় আনন্দে। আনন্দে রেবুরও চোখের কোণে চিকচিক করে নোনা সমুদ্দুর। আমার তাতে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। ভেসে যেতে ইচ্ছে করে রেবুর মনের আনন্দধারায়। আমি তাকে ফিসফিস করে বলি, রেবু! আমি বাবা হবো, না?

পেটের স্ফীত অংশে আলতো হাত বুলোতে বুলোতে রেবু বলে, হু।

রেবুর কণ্ঠে আনন্দ ডিগবাজি খায়। খুশি উপচে পড়ে। জীবন সুন্দর, রেবু! বেঁচে থাকা আরো! – আমি বলি। আমার আর তর সয় না। রেবুর মধ্যে বেড়ে ওঠা অন‍্য ‘আমি’র তৃষ্ণা আমাকে দারুণ অস্থির করে তোলে। রেবুর শারীরিক জটিলতাও বাড়তে থাকে দিন দিন। আলট্রাসনো রিপোর্টে দেখা যায় রেবুর পেটে একাধিক সন্তান। ডাক্তার সিজারিয়ান অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেয় নির্ধারিত সময়ের মাসখানেক আগেই। তিন-তিনটে জীবন্ত পুতুলের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়, আহা! এরা আমারই অংশ তবে! অন‍্য আমি!

রেবু দিশাহারা হয়ে যায়। টুন কাঁদলে মুন হাসে। মুন হাসে তো গুন কাঁদে। কখনো আবার তিনজনই সমস্বরে কান্নার প্রতিযোগিতায় মাতে। সদ‍্য মা হওয়া রেবু একসঙ্গে তিন ছেলে সামলাতে হিমশিম খায়। আমারও রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তবু কী যে আনন্দ ঘিরে থাকে আমাদের। শুষ্ক মরুভূমিতে একপশলা শীতল বৃষ্টি হয়ে তিনটে শিশু ছেয়ে থাকে আমাদের মন।

প্রথমে অসুস্থ হলো টুন। একসঙ্গে তিনটে শিশু গর্ভে থাকায় অপুষ্টিতে ভুগছিল তারা। রেবুর নানান রকম গর্ভকালীন জটিলতাও প্রভাব ফেলেছিল তাদের ওপর। পনেরো দিনের মাথায় টুন ছেড়ে গেল আমাদের। এক সপ্তাহের ব‍্যবধানে মুন আর গুন। আবার ফাঁকা হয়ে গেল আমাদের ঘর। আবার শূন্যতা ছেয়ে ফেলল চরাচর। রেবু হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো হয়ে গেল। আবার ডাক্তার। আবার কবিরাজ। আবার বদি‍্য। কিছুতেই কিছু হলো না আর। শুধু রেবুর মধ্যে পাগলামি বাড়তে লাগল একটু একটু করে। তার পাগলামি কমাতে বাঁধনকে কুড়িয়ে আনলাম। সন্তানস্নেহে বড় করলাম তাকে। ততদিনে রেবুর মা হবার বয়স শেষ। 

বাঁধনকে পেয়ে কিছুটা ভুলেছিল রেবু। এখন আবার বাড়ছে তার পাগলামি। বাঁধনের বিয়ের পর থেকে আবার সে হতাশায় ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। পাগল হয়ে যাচ্ছে রেবু। ভুলে যাচ্ছে সব অতৃপ্তির গরল। অসহ‍্য। অসহ‍্য সব। রেবু কেন ভুলে যাবে সব! কেন সে কাঁদবে যখন-তখন! সব মনে রাখুক সে। সব মনে রেখে আমারই মতো মুখে হাসি নিয়ে সে ঘুরে বেড়াক সারাবাড়ি! বুকের মধ্যে আমারই মতো আগুন নিয়ে মুখে সে লেপে রাখুক শান্তির শীতল পরত। জ্বলুক সে আমার মতো। হতাশার গহ্বরে তলিয়ে যাক সে। নইলে বড় দমবন্ধ লাগে আজকাল। বড় একা লাগে। মনে হয়, রেবু সব ভুলে বেশ আছে। সুখে আছে। ওই তো, আবার কান্নার শব্দ আসছে তার। রেবু কাঁদছে। অসহ‍্য। আর তেমনই হয়েছে মা। সারাক্ষণ কানের কাছে ঘ‍্যানঘ‍্যান করে এসে, তোর ঘরে বাতি দেওয়ার কেউ থাকল না রে কাঞ্চন!

ইচ্ছে করে পালিয়ে যাই দূরে। যেখানে মায়ের ফালতু ঘ‍্যানঘ‍্যান নে‍ই, রেবুর নখরামি নেই, জীবনের এতোসব চোরাবালি, গলি-ঘুপচি, চোরাকাঁটা কিচ্ছু নেই। মনের মধে‍্য আমূল গেঁথে যাওয়া চোরাকাঁটাটা উপড়ে ফেলার চেষ্টায় উঠে বসি। রেবুর ঘরের দিকে এগোতে এগোতে বলি, আলোগুলো নিভিয়ে দাও, চোখে লাগছে খুব …

Leave a Reply