শিশিরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছিল ফেসবুকে। যদিও এর দশ বছর আগে আমাদের প্রথম পরিচয়। একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে আমরা দুজন একসঙ্গে পড়তাম। চার বছর পড়ার পর আমি চলে আসি উত্তর ঢাকায়। বাবার নতুন কর্মস্থলের কাছাকাছি। ভর্তি হই নতুন স্কুলে। দক্ষিণ ঢাকার গেন্ডারিয়ায় শিশিরের বাবার নিজের বাড়ি। কিন্ডারগার্টেন ছেড়ে ও ভর্তি হয় পার্শ্ববর্তী মনিজা রহমান গার্লস হাই স্কুলে।

ফেসবুকে ওর পাঠানো বন্ধুত্বের অনুরোধে সাড়া দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই ও আমাকে একটি মেসেজ পাঠায়, ‘তুমি কি সেই গানের পাখি? সেই আর্টিস্ট?’

আমি বললাম, ‘কীরকম?’

‘তুমি তো ব্রাইট স্টারস কিন্ডারগার্টেনে পড়তে, তাই না?’

‘হ্যাঁ।’

‘বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় রবীন্দ্রসংগীত ও উপস্থিত ছবি আঁকা ইভেন্টে নির্ঝর নামে একটি ছেলে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছিল। মনে আছে?’

মনে না থাকার কথা নয়। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া সুকুমার সমগ্র এবং লেবুমামার সপ্তকাণ্ড নামের শিশুতোষ গল্পের বইটি এখনো আমার শেলফে আছে।

বললাম, ‘তুমি দেখছি কিছুই ভোলো না।’

‘সবকিছু কি মনে রাখা যায়! নির্ঝর নামের সেই ছেলেটির কথা কিন্তু খুব মনে আছে। তাছাড়া সে ছিল ফার্স্ট বয়।’

এভাবেই শুরু আমাদের দ্বিতীয় পরিচয়পর্ব। প্রথমপর্বের শিশিরের মুখ অনেকটাই ঝাপসা হয়ে উঠেছিল আমার কাছে। কিন্ডারগার্টেনে যখন পড়তাম, দু-একটি ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল ঠিক, তবে কোনো মেয়ের সঙ্গে কোনোদিন কথা বলেছি বলে মনে পড়ে না। ওদের কারো চেহারাই আমার মনে নেই। শিশিরের মাঝে মাঝে দেরি হতো আসতে। মিস প্রশ্ন করতেন, ‘দেরি করলে কেন?’

‘আম্মুর রেডি হতে দেরি হয়েছে।’

আর একদিন বলত, ‘আম্মু নাশতা বানাতে দেরি করেছে।’ ইত্যাদি।

বুয়েটে স্থাপত্যবিদ্যা দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র আমি তখন। শিশির মাত্র ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার চেয়ে এক বছরের জুনিয়র হয়ে। দোষটা ছিল আমার। আমি ফোর থেকে এক ক্লাস জাম্প করে সরাসরি সিক্সে ভর্তি হয়েছিলাম। বাবার আস্থা ছিল, আমি পারব। তাঁকে নিরাশ করিনি। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম। রবীন্দ্রসংগীত এখন আর গাই না। শুধু শুনি। তবে ছবি আঁকি। ইতোমধ্যে দুটো কমিক্স বই বেরিয়েছে আমার। একটি ছড়াগ্রন্থও। ঢাবি ও বুয়েট পাশাপাশি হওয়ায় আমাদের প্রায়ই দেখা হয়। আড্ডা দিই টিএসসির মোড়ে, মধুর ক্যান্টিনে, পাবলিক লাইব্রেরির মাঠে। কখনো একসঙ্গে দুজন রিকশায় চড়ে ঘুরি। মাঝে মাঝে ওকে বাসায় পৌঁছে দিই রিকশা কি অটোরিকশায়।

একদিন দুজন অটোরিকশায় যাচ্ছি। যেতে যেতে ওকে জিজ্ঞেস করি, ‘তোমার অ্যামবিশন কী?’ ও কেমন রহস্য করে জবাব দেয়, ‘কলম্বাস হওয়া।’

‘তাই? সেটা কীরকম?’

‘কলম্বাসের মতো আমেরিকা আবিষ্কার করা।’

‘কিন্তু আমেরিকা তো একটাই। এবং স্বয়ং কলম্বাস তা আবিষ্কারও করে ফেলেছেন।’

‘আরে! আমেরিকা আবিষ্কার করে কলম্বাস যেমন আনন্দ পেয়েছিল, আমিও তেমন আনন্দ পেতে চাই।’

‘কীভাবে?’

‘আহা! আমার বেবিটা দেখি কিছুই বোঝে না!’

এরপর আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘তোমার বউ হবো। আর এটাই আমার অ্যামবিশন।’ একটা অদ্ভুত অলৌকিক ভালো লাগার ঢেউ জেগে ওঠে আমার ভেতরে। তবু হেসে বলি, ‘বউ হওয়া কি কোনো অ্যামবিশন হলো?’

‘না, হলো না। শুধু বউ হওয়াটা অ্যামবিশন নয়। তবে তোমার বউ হওয়াটা একটা অ্যামবিশন। এবার তোমারটা বলো।’

‘একটাই বলতাম। তোমার জবাব শুনে এখন দুটো হয়েছে।’

‘আচ্ছা বলো।’

‘প্রথমটা হলো তোমার বর হওয়া। দ্বিতীয়টা একজন বিখ্যাত স্থপতি হওয়া।’

এভাবে কথার পিঠে কথা চলত ননস্টপ। খেয়ালই থাকত না কখন ওর বাসার কাছে চলে এসেছি। সম্বিৎ ফিরে পেতাম চালকের কথায়, ‘কই নামবেন আপনারা?’

‘সামনে গিয়ে বাঁয়ে। তিন নম্বর লেন।’

দুই

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসির বারান্দায় বসে শিশিরের একটা ছবি আঁকলাম। ওকে মডেল করে ছবি আঁকব শুনে খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ওর মুখ।

‘ওহ! সত্যি বলছ?’

ওর এই ‘সত্যি বলছ’ কথাটা কেন জানি না খুব ভালো লাগে আমার। বলি, ‘নাহ! মিথ্যে বলছি। লনে গিয়ে বসো। আমার দিকে মুখ করে। দু-পা সামনে নিয়ে এসো। হ্যাঁ, এবার হাঁটু দুটো ভাঁজ করো। পা কিছুটা সামনের দিকে ঠেলে দাও। ওকে। দু-হাত দুদিক থেকে সামনে এনে হাঁটুর কিছু নিচে থেকে দু-পা জড়িয়ে ধরো। এই তো। ব্যস! আর কিছু লাগবে না। ওকে। এবার মুখটা একটুখানি ডানে ফেরাও। ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে। হুম! পারফেক্ট।’

লক্ষ্মী মেয়ের মতো অনেকক্ষণ একই ভঙ্গিতে ঠায় বসে ছিল শিশির। আঁকা শেষ হলে বললাম, ‘এবার ওঠো। বেশ ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছ।’ উঠে এসে ছবিটা দেখে প্রায় চিৎকার করে বলল, ‘উফ্ফ! দারুণ! দারুণ! এটা বাঁধাই করে ড্রয়িংরুমের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখব। বলুন কী দেব আপনাকে হে আমার আর্টিস্ট? ঠিক আছে। এখন নয়। পরে দেব।’

‘আচ্ছা, দিও। এবার হাঁটো।’ বলে ওর হাত ধরে লনে দুজনে হাঁটলাম কিছুক্ষণ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ক্ষুধার্ত ছিলাম। এতোক্ষণ কেউ টের পাইনি। ক্যাফেটেরিয়ায় বসে গল্প করতে করতে চপ-চিকেন ফ্রাই আর চা খেয়ে একটা অটোরিকশা ভাড়া করলাম। ওকে বাসায় পৌঁছে দিতে হবে। টিএসসির মোড় পেরিয়ে শিশু একাডেমির কাছে এসেছি। গল্প করতে করতে শিশির হঠাৎ ঝুঁকে এলো খুব কাছে। কেমন অচিন হাসি চোখে-মুখে। আমার ঠোঁটে চেপে বসল ওর কোমল ঈশ্বর-অঙ্কিত ঠোঁটদুটো। আমি দু-হাতে জড়িয়ে ধরলাম ওকে। অনেকক্ষণ এভাবেই আমাদের দু-জোড়া ঠোঁটের অভ্রকুচি মিশে রইল পরস্পরের সঙ্গে। সময় হঠাৎ যেন স্থির হয়ে গেল। ঘন হয়ে উঠল দুজনের নিশ্বাস। সেই আমাদের প্রথম চুমু খাওয়া।

দু-জোড়া ঠোঁটের স্পর্শ শিথিল হয়ে এলে আমিও ওর দেহের চারপাশে আমার হাতের বাঁধন আলগা করে নিই। শিশির আমার ডান হাতটা ওর কোমরে চেপে ধরে বলে, ‘এভাবেই ধরে থাকো। আমাকে কেন দূরের ভাবো, নিঝু?’ ওর চোখ-মুখ আগের চেয়ে প্রশান্ত, স্নিগ্ধ। আর এই প্রথম আমাকে ‘নিঝু’ বলে ডাকে। আদরের ডাক। ভালোবাসার ডাক। একটা অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে ওঠে আমার মন।

জিজ্ঞেস করি, ‘ছবিটা কি আসলেই ভালো লেগেছে?’

শিশির কেমন মিষ্টি খুনসুটিভরা ধমক দেয়, ‘আবার জিগায়!’ মাঝে মাঝেই এরকম আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে শিশির। তখন আরো বেশি ভালো লাগে ওকে, আরো ঘনিষ্ঠ মনে হয়।

পেছন থেকে সদ্য আঁকা ছবিটা টেনে নিয়ে মুগ্ধদৃষ্টিতে দেখতে থাকে। ‘তুমি আমার লিওনার্দো।’ উচ্ছ্বসিত প্রশংসার সুর ওর কণ্ঠে।

‘লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও?’

‘উহু! দ্য ভিঞ্চি।’

‘ওরেব্বাপ্স!’

‘কিছু একটা বললেই অমনি ‘ওরেব্বাপস’, ‘ওরেব্বাপস’! নিজেকে এতো ছোট করে দেখো কেন তুমি?’

আমি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করি। ‘এস এম সুলতানের নাম শুনেছ?’ জিজ্ঞেস করি ওকে।

ডানে-বাঁয়ে মাথা দোলায় শিশির।

‘আমাদের দেশের একজন বিখ্যাত চিত্রকর। আমেরিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বহু দেশে তাঁর আর্টের একক ও যৌথ প্রদর্শনী হয়েছে।’

‘হুঁ।’

‘আচ্ছা, আমাদের দেশের একজন আর্টিস্টের নাম বলো যাঁর আঁকা তোমার ভালো লাগে।’

‘নির্ঝর।’

আমি সকৌতুক হেসে উঠে বলি, ‘তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কোনো একজনের নাম বলো।’

ও মাথা নিচু করে শান্ত কণ্ঠে জবাব দেয়, ‘নির্ঝর।’

এবার আরো জোরে হেসে উঠি আমি। ‘আচ্ছা, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, র‌্যামব্র্যান্ট, রেনোয়া, পিকাসো, ভ্যান গঁগ, সালভাদর দালি, রাফায়েল, সিজানে – এঁদের কারো আঁকা দেখোনি?’

‘চুপ। বেশি কথা বলে! আমি শুধু একজন শিল্পীকেই চিনি, আর সে হলো নির্ঝর। গোটা পৃথিবীতে ওই একমাত্র শিল্পী আমার। সবচেয়ে সুন্দর ছবি যে আঁকে, তাঁর নাম নির্ঝর।’

মুখ গম্ভীর করে বলি, ‘অন্যের মুখে নিজের মিথ্যা প্রশংসা শুনে সবাই খুশি হয়। কিন্তু এটা কেমন এক নির্জলা স্বজনপ্রীতি হলো। এরকম যুক্তিহীন পক্ষপাতের কোনো তুলনা খুঁজে পাচ্ছি না।’ কিছুটা কৌতুকের সুরে যোগ করি, ‘তুমি সত্যি তুলনাহীন। আমি তো …’

ওর সুন্দর অপার্থিব মুখটা আবার ঝুঁকে এলো আমার দিকে। আবার আমার ঠোঁট চেপে ধরল ওর মখমল-নরম মসৃণ ঠোঁটদুটো। 

চুমুর আদর শেষ করে ফিসফিসিয়ে কাঁপা কাঁপা অধরজোড়া অর্ধস্ফূরিত করে বলতে লাগল, ‘আমি সারাজীবন তোমার জন্য এমন তুলনাহীন থাকতে চাই। ওহ, নির্ঝর! আমি শুধু এটুকুই চাই। কে কেমন, আমার জানার দরকার নেই। শুধু তোমাকে নিয়েই ভাবতে চাই আমি।’ বলেই আমার বুকে আলগোছে মাথা এলিয়ে দিলো। দু-চোখে টলমল করতে লাগল অশ্রুবিন্দু। যেন দূর্বাশীর্ষে জায়মান শিশিরের ফোঁটা। তার শীতল স্পর্শে আমার গোটা শরীর শিরশিরিয়ে উঠল। মনে হলো, ও কেমন ঝরে পড়ার জন্য ব্যাকুল। পরক্ষণেই আবার এও মনে হলো, ও এই সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতির সবচেয়ে অরক্ষিত সত্তা। সুরক্ষার নিবিড় আশ্রয় খুঁজছে আমার বুকে এবং প্রাণের সবটুকু শক্তি দিয়ে ওকে আগলে রাখার দায়িত্ব কেবল আমারই। সেই মুহূর্তে আমি আবিষ্কার করলাম, আমি সদ্য কলেজ পাশ-করা, বিশ^বিদ্যালয়ে ঢোকা কোনো বালখিল্য বালক নই, আমি একজন পুরুষ এবং শিশির একজন নারী।

বিকেল তিনটায় ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে শিশিরের সঙ্গে আমার দেখা করার কথা। তখনো পনেরো মিনিট বাকি। টিএসসির সামনের সড়কদ্বীপের ভেতরে বসে তিন-চারজন বন্ধুসহ আড্ডা দিচ্ছিলাম। এমন সময় শিশির এসে দাঁড়াল – ‘এই যে আমার হুজুরে কেবলা, আপনি এখানে কী করছেন? ব্রিটিশ কাউন্সিলে যাওয়ার কথা ছিল না আপনার?’

‘এখনো তো সময় হয়নি। একটু পরেই রওনা হতাম …’

‘কাঁটায় কাঁটায় ঠিক তিনটার সময়েই যেতে হবে কেন! বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলে সব ভুলে যাও।’

কিছু অভিমান মিশিয়ে বলে শিশির।

আমি বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে একটা রিকশা ভাড়া নিই। ওর পাশে উঠে বসতেই কনুইয়ের হালকা একটা গুঁতো দিয়ে বলে, ‘কী মশাই? সোমত্ত মেয়ের গতর ঘেঁষে বসতে লজ্জা পান না, তাই না? সরে বসুন।’ আমি খানিক চমকে উঠে কিছু সরে বসি।

‘বাহ! আমার বেবি যে সত্যি সত্যি ভয় পেল!’ বলে ডান হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলে আমার নাক টিপে দেয়।

সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে টের পাই, শিশির ওর বিচিত্রবর্ণ হাসি-অশ্রু-দুষ্টুমি-ঠাট্টা-খুনসুটি-রাগ-অভিমানভরা ভালোবাসার বর্ণালিতে আমার ভুবন কেমন রাঙিয়ে দিচ্ছে, আমাকে সম্পূর্ণ দখল করে নিচ্ছে। রাত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করি। মনের পর্দায় একটু পরপর ভেসে ওঠে ওর মুখ।

তিন

স্থাপত্যবিদ্যার শেষ সেমিস্টারের শেষ ক্লাসে যেদিন উপস্থিত হলাম, বিভাগীয় প্রধান আমাকে ও সহপাঠী রোমেলকে ডেকে নিলেন নিজ কক্ষে। বললেন, ‘তোমাদের দুজনের নাম জমা দিয়েছি ‘ক্লাসিডিয়াস’-এ। এক বছরের ইন্টার্নশিপ। তবে আমি বলেছি, ‘ছয় মাসের মাথায় তোমাদের প্রবিশনারি জবের অফার দিতে। এক সপ্তাহের মধ্যে ওরা তোমাদের ই-মেইল করবে। বিশ্বাস করি, আমার সম্মান তোমরা রাখবে।’ ‘ক্লাসিডিয়াস’ দেশের সবচেয়ে নামকরা আর্কিটেক্টস ফার্ম। ইন্টার্নশিপের জন্য এই ফার্মে যোগ দেওয়া সব ছাত্রেরই স্বপ্ন।

‘উই উইল ট্রাই বেস্ট, স্যার।’

‘বেস্ট অফ লাক, মাই বয়েজ।’

স্মিতমুখে সস্নেহ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন বিভাগীয় প্রধান রবিউল হুসাইন।

রোমেলের কথা বলা হয়নি। আমার এই সহপাঠী এক চিড়িয়া বটে। স্বভাববন্ধু। কিন্তু তবু কেমন এক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে সবার কাছ থেকে। আমাকে আর শিশিরকে একসঙ্গে দেখলেই বলে, ‘কী রে! বর-বধূ মিলে কী ফন্দি এঁটেছিস? তোদের দুইটাকে একসঙ্গে দেখলেই ডর লাগে। মনে হয়, গোটা জগৎ উল্টেপাল্টে ভেজে খাবি। আর তোরে কই, শিশির। জিনিস একখান বাগিয়েছিস বটে! খাসা! ছাড়িস না। পস্তাবি তাহলে।’

‘তোর ফুলবানুর খবর কী?’ রোমেলের বান্ধবী এমিলিকে দুষ্টুমি করে ‘ফুলবানু’ বলে শিশির।

‘ও আমারে ডিভোর্স দিয়া দিছে। আমার লগে আর ঘর করব না।’ শিশিরের ঠাট্টার জবাবে মজা করে রোমেল।

বিশ^বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফিরতে সেদিন বেশ রাত হয়ে যায়। অদ্ভুত ব্যাপার এই, ল্যাপটপে জিমেইল ওপেন করেই দেখি, ‘ক্লাসিডিয়াস’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের স্বাক্ষরকৃত একটি ই-মেইল। আগামী মাসের ১ তারিখে অফিসে যোগ দিতে বলা হয়েছে। নবিসীকালীন মাসিক ভাতা কত পাব, তারও উল্লেখ আছে।

ইতোমধ্যে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে আমাকে পাঠানো মেসেজের শেষে শিশির লিখতে শুরু করে ‘ইতি … তোমার বউ’।

আমি বলি, ‘উহু। শুধু ‘বউ’ লিখলে হবে না। লেখো ‘তোমার সোনাবউ’।’

প্রবেশনারি পিরিয়ড পার হয়ে স্থায়ী নিয়োগের এক বছর পূর্ণ হয়েছে আমার। শিশিরের পরিবারের সবার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। আমাকে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করেছেন ওর মা – ‘বাবা, দেশে থেকে কী করবে? কানাডায় আমার ছোট এক ভাই আর বোন থাকে। ওখানেই সেটেল হওয়ার চিন্তা করো। দেশের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।’ শিশিরের মায়ের কথার ইঙ্গিতটি বেশ স্পষ্ট। শুধু ওর বাবার চিন্তাভাবনা আমি এখনো পড়তে পারিনি। যদিও আমার সঙ্গে যথেষ্ট হাসিখুশি বন্ধুর মতোই আচরণ তার।

সেই ধোঁয়াশাও কেটে যায় একদিন। এক ছুটির বিকেলে আমার সঙ্গে গল্প করতে করতে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, ‘তো নিঝু, তুমি কি আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাও?’ আমিও সোজা জবাব দিই, ‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু তুমি একা চাইলেই তো হচ্ছে না। তোমার বাবাকে জানিয়েছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘উনি কি রাজি?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওকে। আগামী শুক্রবার সন্ধ্যায় তোমার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এসো।’

বাসায় ফেরার পথে বুকটা সারাক্ষণ ভারি হয়ে রইল। মাকে খুব ছোটবেলায় হারিয়েছি। হঠাৎ অদৃশ্য এক যবনিকা সরিয়ে আবির্ভূত হলেন মা। টের পেলাম, তাঁর কিছু স্মৃতি এখনো বেশ তাজা।

চার

পরের শুক্রবার। দিনটি ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ। বাবা, ছোট ভাই, মামা, মামী আর দুই বন্ধুসহ শিশিরদের বাসায় যাই। ২৭শে মার্চ আমার আর শিশিরের বিয়ের তারিখ ধার্য করে ফিরে আসি। আমি খুশি। অনেক খুশি। শিশিরকে পাব। আমার মেসেঞ্জারের ‘বউ’কে ঘরের বউ করে আনব। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছুটির অবসরে আমাদের যৌথজীবন নিয়ে নানান ছক কষি। ঘরের মধ্যে নানান ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে ওকে কল্পনা করি। অফিসে যাওয়ার আগে চুমু খাই ওর ঠোঁটে। দরজার কাছে এসে আবার ওকে জড়িয়ে ধরি। আবার চুমু খাই। দীর্ঘ প্রলম্বিত চুম্বন। শিশিরও ওর কোমল দু-বাহুতে জড়িয়ে ধরে আমার গলা। একসময় চুমুর আদর শেষ হয়। শিশির তবু হাত ছাড়িয়ে নেয় না। আরো শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে রাখে।

রান্নাঘরে শিশির ব্যস্ত। আমি পেছন থেকে এসে আলগোছে ওর কাঁধে হাত রাখি। কোমর জড়িয়ে পাশ থেকে ওর গালে চুমু খাই। শিশির চোখ বুজে নিঃশব্দে আমার আদর গ্রহণ করে। আমি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। পেছন থেকে ও আমার হাত টেনে ধরে – ‘উহু! হয়নি।’

‘কী হয়নি?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘বাঁ গালে দিয়েছ। এবার ডান গালে দাও।’

আমি এগিয়ে গিয়ে এবার ডান গালে চুমু খাই – ‘ঠিক আছে?’

‘উহু। ঠোঁটে দাওনি তো।’ মধুর গলায় মিষ্টি অনুযোগ করে শিশির। আমি ওকে আবার অনেকক্ষণ জড়িয়ে রেখে ওর দু-ঠোঁটে চুমু দিই। …

এতোদিন নির্ধারিত সময়ের পরও অফিসে দেড়-দুই ঘণ্টা কাজ করেছি। কিন্তু এখন আর নয়। বাসায় ফিরতে হবে। শিশিরের কাছে। ইতোমধ্যে দুবার ফোন দিয়ে জানতে চেয়েছে, কখন ফিরব। ঠিক পাঁচটার সময় বসের কাছে বিদায় নিতে আসি। উনি মিটিমিটি হাসেন, ‘শিওর, মাই বয়। আমার কাছে বলতে হবে না। পাঁচটা বাজলেই চলে যেও। After all, you are a newly wedded groom and your bride is waiting।’

শিশিরকেন্দ্রিক এরকম নানান দৃশ্য কল্পনায় দেখি। শিশিরও কি ভাবে আমারই মতো? একদিন জিজ্ঞেস করতেই ও উচ্ছ্বসিত জবাব দেয়, ‘ওহ, নিঝু! সত্যি বলছ? আমিও ঠিক এমন কল্পনাই করি। শুধু অফিসে তোমার বসের সঙ্গে কী কথা হলো, সেটা বাদ দিয়ে … ওহ, নিঝু! কবে আসবে ২৭শে মার্চ? আরো তিন মাস! আমার মনে হচ্ছে তিন বছর!’

ইতোমধ্যে চীনের উহান প্রদেশে প্রাদুর্ভাব হওয়া কোভিড-১৯ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর আসতে শুরু করেছে। পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে এ-ভাইরাস। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে আমাদের দেশেও শুরু হলো এর সংক্রমণ। ভাইরাসটি কতটা বিপজ্জনক, এ নিয়ে নানান মত দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। তবে সব পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার বড় বড় শিরোনাম এখন কোভিড-১৯। শিশিরের সঙ্গে এ-বিষয়ে প্রতিদিনই আলোচনা করি। নতুন পাওয়া সব আপডেট শেয়ার করি ওর সঙ্গে।

মার্চের প্রথম সপ্তাহে আমাদের বিয়ে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত হয়। লকডাউন ঘোষণা হয় দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে। শিশিরকে বলি, ‘কোনো চিন্তা করো না। প্যান্ডেমিক শেষ হলেই আমরা বিয়েটা সেরে নেব। তুমি সাবধানে থেকো খুব। ঘর থেকে বেরিয়ো না।’

আমার অফিস বন্ধ। তবে অনলাইনে ঘরে বসে কাজ করছি। ২৭শে মার্চ ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। এরপর এপ্রিল শেষ হয়ে মে মাসের মাঝামাঝি। শিশিরের সঙ্গে ঘনঘন কথা বলি। ওকে সাহস দিই। ওর সঙ্গে রাতে কথা না বললে আমার ঘুম হয় না। একই অবস্থা ওরও। মেসেঞ্জারে অনেকক্ষণ কথা বলে দুজন দুজনকে দূর থেকে চুমু খাই।

২২শে মে। সকাল ৮টা ২০ মিনিট। সেলফোনের শব্দে হঠাৎ ঘুম ভাঙে। শিশিরের ফোন। অবাক হই না। আমাকে দিন-রাতের যে-কোনো সময়ে কল করার অধিকার কেবল ওরই আছে। কিছুটা ঘুমজড়ানো গলায় প্রশ্ন করি, ‘কেমন আছো, ডিউ?’ শিশির ও ডিউ – এ দুই নামেই ওকে ডাকি।

ওপাশ থেকে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। এরপর ওর মায়ের কণ্ঠ, ‘বাবা শিশির অসুস্থ। ওর শ্বাসকষ্ট খুব …’

আমি আর কোনো কথা না শুনেই বলি, ‘আমি আসছি। এক্ষুনি।’

অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন করে গন্তব্য জানিয়ে বলে দিই, ‘যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছে যাও।’

রাস্তা ফাঁকা ছিল। দ্বিগুণ ভাড়ায় একটা অটোরিকশা নিয়ে দশ মিনিটে হাজির হই শিশিরদের বাসায়। কিন্তু কেয়ারটেকার বলল, পাঁচ মিনিট আগেই ওরা রওনা হয়ে গেছে। আমি আবার ছুটি ওদের পিছু। সকাল প্রায় ৯টায় ইউনাইটেড কেয়ার হাসপাতালের কাছে এসে ওদের নাগাল পাই। আইসিইউর কথা আগেই বলা ছিল। সেভাবেই ওকে নির্ধারিত কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।

সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই হাসপাতালেই ছিলাম। সময়টা কীভাবে কেটেছে, বলতে পারব না। বিকেল সাড়ে ৫টায় একজন ডাক্তার শিশিরকে পরীক্ষা করে জানান, ‘সরি। শি ইজ নো মোর।’

সেই মুহূর্তে আমি কিছুই অনুভব করিনি। কেউ যেন একটা হাতুড়ি দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করে। যেন হঠাৎ সমাধিস্থ হয়ে যাই আমি আর আমার দৃষ্টির সামনে একটা কালো পর্দা দ্রুত নেমে আসে …

পরে কোনো এক সময়ে চারপাশের চলমান ছায়া ও শব্দগুলি আমার স্নায়ুর ওপর হামলা চালাতে শুরু করলে আমি আবার জেগে উঠি।

Leave a Reply