জাদুকরের সিন্দুক

লেখক:

ভগীরথ মিশ্র

পঞ্চমীর বিকেলে লোকজন ও মালপত্তরের বিশাল সম্ভার নিয়ে পাঁচবিবির গড়ে পা রাখে জাদুকর হৃদয়নাথ।

তখন গড়ের সদর মহলের টানা বারান্দার থাম ও পিলপাগুলোর শরীরের দিনের আলো ফিকে হতে শুরু করেছে। আর কিছুক্ষণ বাদেই ওই ফিকে জায়গাগুলোতে অাঁধারের ছোপ পড়তে শুরু করবে। আর সূর্যাস্তের পর ওই অাঁধার আরো নাছোড় হয়ে লেপ্টে যাবে থামগুলোর গায়ে। বাস্তবিক, ওই মুহূর্তে ভারি রহস্যময় হয়ে উঠবে থামগুলো। বিশেষ করে কিশোর শিবকুমার তো দিনান্তের ওই সময়টায় বারান্দার থামগুলোর শরীরে আটকে থাকা রহস্যময় আলো-অাঁধারিটুকু দেখতে দেখতে রোজদিনই শিহরিত বোধ করে। কেন জানি তার খুব দৃঢ়ভাবে মনে হয়, থামগুলোর শরীরের আলো-অাঁধারির সুযোগ নিয়ে কোনো অশরীরী খেলা চলে গোটা বারান্দাজুড়ে। ওই মুহূর্তে বারান্দায় লুটিয়ে-পড়া থামের দীর্ঘ ছায়াগুলোকেও বড় নির্দোষ বলে মনে হয় না শিবকুমারের।

দেউড়ির ফটকটি পেরোলেই বিশাল পাঁচিলবন্দি উঠোন। তারপর সদরমহল। তিন ভাঁজের লম্বা উঁচু বারান্দা। দক্ষিণমুখো বারান্দার লাগোয়া বৈঠকখানা, গোমস্তাখানা, কাছারিঘর। লম্বা বারান্দার পুব ভাঁজে সারবন্দি পাঁচ-ছখানা ঘর। তারই দুখানা বড় বড় ঘরে জনাছয়েক চেলাসমেত ঠাঁই হলো হৃদয়নাথের।

হৃদয়নাথের সঙ্গে মালপত্রের বিশাল সম্ভার ছিল। জাদু দেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় টেবিল, টুল, কৌশলযুক্ত বাক্স, ফ্রেম, ফেক, এসব তো ছিলই, ওইসঙ্গে ছিল স্টেজ ও অডিটোরিয়াম তৈরির জন্য তাঁবু, পর্দা, উইংস, নিজেদের থাকবার জন্য পৃথক তাঁবু, – সবমিলিয়ে সে এক গন্ধমাদন। পাঁচখানা গরুর গাড়ি একেবারে ঠাসবোঝাই হয়ে গিয়েছিল। আর ওই  গাড়িগুলোকে টানতে গিয়ে পাঁচবিবির গড়ের পাহাড়িয়া বলদগুলো একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছিল।

মালপত্রের গন্ধমাদনটি নিয়ে যখন গড়ে ঢুকেছিল হৃদয়নাথ, ওদের সঙ্গে একটা বিশাল সিন্দুকও ছিল। পাঁচ-ছজনে মিলে বহুকষ্টে বয়ে নিয়ে আসে ওটা। রাখে হৃদয়নাথের জন্য বরাদ্দ ঘরটির সামনের বারান্দায়। উৎকৃষ্ট মেহগনি কাঠের তৈরি, ঝিমকালো রঙের সিন্দুকটার গায়ে সাদা রং দিয়ে অাঁকা একটি নরমুন্ডের খুলি ও তার তলায় আড়াআড়ি দুটি হাড়ের ছবি। প্রথমদিনেই, ওই পড়ন্ত বিকেলের আলো-অাঁধারিতে, সিন্দুকটাকে দেখামাত্র শিবকুমারের চোখ আটকে গিয়েছিল ওটার ওপর। ওই মুহূর্তে শিবকুমারের মনের মধ্যে ভাসছিল মেজোকাকা শ্রুতিকুমারের ঘরে বহুকাল যাবৎ পড়ে থাকা অনুরূপ একটি সিন্দুকের স্মৃতি। আকারে-প্রকারে হুবহু একরকমের সিন্দুক ওটা। কিন্তু ওটার গায়ে কোনো নরমুন্ড অাঁকা নেই, এই যা।

সেই পড়ন্ত বিকেলের কনেদেখা রহস্যময় আলোয় হৃদয়নাথের সিন্দুকটার দিকে খুব রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল কিশোর শিবকুমার। ঘরের মধ্যে তখন অনুচরদের নিয়ে সমস্ত মালপত্র গুছিয়ে রাখছিল হৃদয়নাথ।

ইতিমধ্যেই বহু সূত্রে জাদুকর হৃদয়নাথের নাম শোনা হয়ে গেছে শিবকুমারের। সেই কারণেই, সিন্দুক থেকে চোখ সরিয়ে একসময় তার দৃষ্টি চোরের মতো ঢুকে পড়তে চায় ঘরের মধ্যে। আশৈশব লোকটার সম্পর্কে এত কথা শুনে আসছে সে, জাদুর বাইরেও তার রহস্যময় জীবনের এত-এত কাহিনি-উপকাহিনি ভেসে বেড়ায় চারপাশের হাওয়ায়, শিবকুমারের চোখ দুটো আকুলিবিকুলি করছিল লোকটাকে একটিবার সচক্ষে দেখবার জন্য। কিন্তু ওই মুহূর্তে নরমুন্ডের দিকে দ্বিতীয়বার দৃষ্টি নিক্ষেপ করামাত্র অজান্তে গায়ের তাবৎ রোম খাড়া হয়ে উঠেছিল।

আসলে, নরমুন্ডর চোখদুটোর মধ্যে কিছু একটা ছিল, তাকানো মাত্র গা শিরশির করে উঠছিল শিবকুমারের। আস্ত নরমুন্ড নয়, নরমুন্ডের খুলির চিত্ররূপ মাত্র, কিন্তু শিবকুমারের স্পষ্ট মনে হয়েছিল, চোখদুটো একেবারে নিষ্প্রাণ নয়। মনে হয়েছিল, সিন্দুকটার গায়ে শুয়ে থাকা অবস্থায়ও চতুর্দিকের সবকিছুই লক্ষ করছে চোখদুটো। এবং আরো ভয়ের ব্যাপার হলো, শুয়ে-শুয়েই ডাইনে-বাঁয়ে, ওপরে-নিচে, সবদিকেই দৃষ্টি ঘোরাতে সমর্থ ওই চোখদুটি!

ব্যাপারটা পয়লা-চটকায় নজরে পড়েনি শিবকুমারের। একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নরমুন্ডটার চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল সে। নরমুন্ডটাও স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল শিবকুমারের মুখের দিকে। কিন্তু মুন্ডটার গায়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে সামান্য তফাতে সরে যাওয়ার মুহূর্তেই শিবকুমারের চোখের সামনে ভোঁজবাজিটা ঘটে যায়। অকস্মাৎ সে লক্ষ করে, বাঁদিকে সামান্য সরে যাওয়া মাত্রই নরমুন্ডের অক্ষিকোটরের অন্তর্গত দৃষ্টিটাও সহসা তির্যক হয়ে গিয়েছে শিবকুমারের দিকেই। নরমুন্ডের চোখদুটি আড়াআড়ি দৃষ্টিতে শিবকুমারকেই দেখছে।

দৃশ্যটা দেখামাত্র বেজায় চমকে উঠেছিল শিবকুমার। ইতিমধ্যে সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে ফেলেছে জাদুপাগল মেজোকাকা শ্রুতিকুমারের স্বহস্তে লেখা জাদু-বিষয়ক ডায়েরিটি। ওই ডায়েরিতে দৃষ্টি-বিভ্রম নিয়ে পাতার পর পাতা লেখা রয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে দৃষ্টি কোন জাতের প্রতারণা করে, একাধিক উদাহরণ সহযোগে তা লিখে রেখে গিয়েছেন শ্রুতিকুমার। সবশেষে প্রায় দুপাতা জুড়ে যা লিখেছেন, তা তো এক কথায় অবিশ্বাস্য। বিশেষ কোনো মানুষ, প্রাণী কিংবা সামগ্রীই নয়, এদেশীয় দর্শন অনুসারে, আমাদের চোখের সামনে এই সমগ্র জগৎটা, জগতের অন্তর্গত বাড়িঘর, গাছপালা, পুকুর-দিঘি, লোকজন, পশুপ্রাণী, পাখি-পাখাল, সবকিছু যে ঘুরে বেড়াচ্ছে অবিরত, বাস্তবে নাকি ওগুলো নেই।

আমাদের চোখের সামনে নাকি আসলে সবকিছুই ঘষা স্লেটের মতো ফাঁকা, খাঁ-খাঁ। তাও যে আমরা সবকিছু দেখতে পাচ্ছি, এটা নেহাতই দেখবার ভুল। খাঁটি নির্ভেজাল দৃষ্টিবিভ্রম। দর্শনেন্দ্রিয়ের ধূর্ত ছলনা।

বাস্তবিক, ডায়েরিটা পড়বার পর থেকে নিজের দৃষ্টির প্রতিই চরম অবিশ্বাস জন্মে গিয়েছে শিবকুমারের। কোনো ব্যক্তি বা বস্ত্তকে একবারমাত্র দেখে যেন প্রত্যয় হয় না তার। বারংবার খুঁটিয়ে দেখেও অবিশ্বাস ঘোচে না কিছুতেই। কাজেই, নরমুন্ডটার বাঁকা চাউনি একঝলক দেখামাত্র ওইখানেই থমকে থেমে যায় শিবকুমার। ওই তির্যক অবস্থানে দাঁড়িয়েই নরমুন্ডর চোখের পানে স্থিরদৃষ্টিতে তাকায়। আর, তখনই ওর ভেতরের বিস্ময়বোধটা যারপরনাই আহত হয় এই কারণে যে, কোনো দৃষ্টিবিভ্রম নয়, নরমুন্ডর চোখদুটো, মানে, অক্ষিকোটরের ভেতর থেকে এক ধরনের দৃষ্টি, তেরচা হয়ে তাকিয়েই রয়েছে ওর মুখের দিকে।

স্রেফ দৃষ্টির বিভ্রমটা কাটিয়ে ওঠার জন্যই শিবকুমার আরো একটুখানি সরে যায়, আরো তির্যক অবস্থানে গিয়ে দাঁড়ায় সে। এবং অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করে, নরমুন্ডর কোটরের থেকে দৃষ্টিটা আরো তেরচা হয়ে দেখছে ওকে। একসময় নরমুন্ডর কোটর-দুটির ওপর দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রেখে পায়ে পায়ে ডানদিকে হাঁটতে থাকে শিবকুমার। এবং সবিস্ময়ে লক্ষ করে, কোটরাগত ওই দৃষ্টি শিবকুমারকে অনুসরণ করছে সমানে। ধীরপায়ে একসময় নরমুন্ডর ডানদিকে এসে পৌঁছয় শিবকুমার। কী আশ্চর্য, ততক্ষণে নরমুন্ডর দৃষ্টিও পৌঁছে গিয়েছে ডানদিকে। স্থির তির্যক দৃষ্টিতে অপলক দেখছে শিবকুমারকে। এবং সেই দৃষ্টিতে স্পষ্টতই হিংস্রতা ও ক্রূরতা থিকথিক করছে।

ততক্ষণে বেশ দমে গিয়েছে শিবকুমার। পাশাপাশি নিদারুণ ধন্ধে পড়ে গিয়েছে, কিনা, নরমুন্ডের কোটরস্থ এই যে চলমান দৃষ্টি, দৃষ্টিতে এই যে হিংস্রতা, ক্রূরতা, সবটাই কি মেজোকাকা-বর্ণিত দৃষ্টির বিভ্রম! এও কি সম্ভব।

দেখতে দেখতে পড়ন্ত বিকেলের ওই কনেদেখা রহস্যময় আলোয় নরমুন্ডসহ গোটা সিন্দুকটাকেই ভারী দুর্জ্ঞেয় লাগে শিবকুমারের। আশেপাশে গড়ের লোকজন এবং হৃদয়নাথদের সরব উপস্থিতিতেও তার কেমন জানি মনে হয়, ওই মুহূর্তে বারান্দার ওই এলাকায় একটা জীবন্ত নরমুন্ডর মুখোমুখি সে একাই। টিকটিকি যেমন করে দৃষ্টির জাদুতে সম্মোহিত করে সামনের শিকার পোকাটিকে নির্জীব করে ফেলে, যেমন করে চুম্বকের মতো একটু একটু করে আকর্ষণ করতে থাকে নিজের দিকে, ঠিক তেমনি করেই যেন একলাটি পেয়ে নরমুন্ডটা স্রেফ দৃষ্টির মাধ্যমে চুম্বকের মতো টানছে শিবকুমারকে। যেন গূঢ় কিছু বলতে চাইছে।

নরমুন্ডটার দিকে অধিকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারছিল না শিবকুমার। একসময় পায়ে পায়ে পিছিয়ে যায় সে। ওখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস হয় না তার। কাজেই, জাদুকর হৃদয়নাথকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখবার প্রলোভনকে সংযত করে সে দ্রুত পায়ে পালিয়ে যায় অন্দরমহলের দিকে। কিন্তু অনেকক্ষণ বাদেও টের পায়, অন্দরমহলের এত-এত মানুষজন, দাসদাসীর মধ্যেও ওই হিংস্র, ক্রূর দৃষ্টি ওকে অনুসরণ করে চলেছে নিঃশব্দে। আর, সারাক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে শিবকুমারকেই দেখছে। সবচেয়ে আশঙ্কায় বিষয়, এই গোটা ব্যাপারটাকে অবিশ্বাস্য  ও দৃষ্টির বিভ্রম বলে কিছুতেই ভাবতে পারছে না শিবকুমার।

সেদিন সারাসন্ধে নরমুন্ডটাকে কিছুতেই মন থেকে হটাতে পারেনি শিবকুমার। আর, রাতের বেলায় গড়ের পুরনো চাকর প্রহ্লাদ দেয় একটি হাড়হিম করা তথ্য, কিনা, সিন্দুকটার মধ্যে রয়েছে হৃদয়নাথের তন্ত্রমতে তৈরি একটি ‘বীর’। হৃদয়নাথের আজ্ঞায় ওই ‘বীর’ই জাদুর আসরে যাবতীয় অলৌকিক কান্ডগুলো ঘটায়। জাদু-আসরের বাইরেও সে সারাক্ষণ হৃদয়নাথের তাবৎ আদেশ পালন করতে একপায়ে খাড়া থাকে। হৃদয়নাথের প্রয়োজনে এবং আজ্ঞায় সে নাকি সূক্ষ্ম ও স্থূল দুদেহই ধারণে সমর্থ। দিনভর সিন্দুকের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে ওই ‘বীর’। সন্ধের মুখে প্রবল ক্ষিদের জ্বালা চাগাড় দিলেই ঘুমটা ভাঙে তার। তখন ওকে দিতে হয় আধ ডজন মুরগি, আর ঘড়া-ঘড়া মদ। তার আগে তাকে ক্ষণিকের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতিও দেয় হৃদয়নাথ। খোলা হাওয়ায় খানিক ঘুরে বেড়িয়ে সে পুনরায় ফিরে এসে সিন্দুকে ঢুকে পড়ে। হৃদয়নাথের প্রধান চেলা ভুজঙ্গ নাকি প্রহ্লাদকে নিজের মুখেই দিয়েছে এসব গুহ্য তথ্য।

ততদিনে মেজোকাকার ডায়েরির কল্যাণে ‘বীর’ বস্ত্তটির সঙ্গে সম্যক পরিচয় ঘটেছে শিবকুমারের। তালুকেরই কোনো তান্ত্রিকের থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ‘বীরসাধনা’র যাবতীয় পদ্ধতি ও গুণাগুণ খুব বিস্তৃতভাবে লিখে গিয়েছেন শ্রুতিকুমার তাঁর ডায়েরির পাতায়। পড়তে পড়তে ওই বয়েসে শিবকুমারের মতো সাহসী ও ডাকাবুকো কিশোরও শিউরে উঠছিল বারবার।

একটি সর্ব-সুলক্ষণযুক্ত নরশিশুকে অমাবস্যার রাতে যথাবিহিত উপচার সহযোগে তান্ত্রিকমতে জীবন্ত সমাধিস্থ করে তান্ত্রিক। ওই শিশুই নাকি পরবর্তীকালে তান্ত্রিকের আজ্ঞাবহ ‘বীরে’ পরিণত হয়। অতুল দৈবশক্তির অধিকারী সেই ‘বীর’ তখন প্রভুর আজ্ঞায় অসাধ্য সাধন করে। মেজোকাকার ওই ডায়েরি থেকেই জানা গেছে তন্ত্রমতে ‘বীর’ তৈরির সংক্ষিপ্ত কৌশলও।

‘বীর’ তৈরির জন্য একটি সর্ব-সুলক্ষণযুক্ত শিশু হলেই হবে না। ওইসঙ্গে লাগবে আরো অনেক রকমের সামগ্রীও। বাজার থেকে আগাম কিনে রাখতে হবে কালোপাড় ধুতি, রক্তবর্ণ পাড়ওয়ালা শাড়ি, লাল রঙের গামছা, মালা-ঘুন্সি, সিঁদুর, ধূপ-ধুনো, শুঁট, গুগ্গুল ইন্দ্রযব, সর্পগন্ধা, মেথি ও রকমারি বেনে-মশলা। তৎসহ সংগ্রহ করতে হবে মাদি শুয়োরের হাড়, পেচকের বিষ্ঠা, টিকটিকির জিভ, কালো বেড়ালের পায়ের নখ, মাদি ভালুকের কোলের দাঁত…। মাটির মালসায় মজুদ রাখতে হবে মৈথুন করেনি এমন পাঁঠার রক্ত। হাবিজাবি আরো অনেক চিজ।

সমস্ত সামগ্রী ও তৎসহ অবশ্যই শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে ঘোর অমাবস্যার মধ্যরাতে সবার নজর এড়িয়ে নিজ ভদ্রাসনের ঈশান কোণে চলে যাবে তান্ত্রিক। সেখানে কাঠকয়লা দিয়ে একটি চতুষ্কোণ বর্গক্ষেত্র অাঁকবে বাস্ত্ততন্ত্রের নিয়ম মেনে। সন্ধে ঘন হলে পর ওই বর্গক্ষেত্র-বরাবর স্বহস্তে একটি গভীর গর্ত খুঁড়বে তান্ত্রিক। তারপর তিল-ইন্দ্রযব, মাষকলাই, পাঁঠার রক্ত, পেচকের বিষ্ঠা ইত্যাদি উপকরণকে ভালো করে মাখবে। ওই মন্ডটিকে অবশেষে গর্ত থেকে তোলা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে। তারপর পার্শ্ববর্তী জলাশয়ের জলে অবগাহন স্নান করবে সে। শিশুটির সর্বাঙ্গে নিম ও হলুদ মাখিয়ে চান করাবে। তারপর রক্তবর্ণ কাপড় পরে তন্ত্রাসনে বসবে। ‘বীর-সাধনা’য় ব্যবহৃত হবে, এমন সমস্ত জড় সামগ্রীকে তন্ত্র-প্রক্রিয়ামতে মন্ত্রপূত করবে। প্রাণ প্রতিষ্ঠা করবে সমস্ত জড় সামগ্রীর কোষে কোষে। গর্তটিকেও বাস্ত্ততন্ত্রের নিদান অনুসারে শুদ্ধ করবে। কেন কি, ভবিষ্যতে ওই গর্তটাই হবে ‘বীরে’র ভদ্রাসন। ওই ভদ্রাসনে চার যুগ বসবাস করতে করতেই সে পালন করবে তান্ত্রিক ও তার বংশধর কিংবা উত্তরসূরিদের যাবতীয় আজ্ঞা। কাজেই, ভদ্রাসনে কোনো খুঁত থেকে গেলে সেই স্থানে ‘বীরে’র বসবাস অসহনীয় হয়ে উঠবে। ফলত সে ক্রমশ রূঢ়, অস্থিরমতি, অবাধ্য হয়ে উঠবে। কালক্রমে প্রভুর শত্রুপক্ষেও পরিণত হতে পারে। হিতে বিপরীত হবে তখন।

অতঃপর ধ্যানে বসবে তান্ত্রিক। ধ্যানযোগে যজ্ঞস্থলে ডাকিনী- যোগিনী, যক্ষ-পিশাচ, আদি অপদেবতাদের আহবান করবে একে-একে। তারা তান্ত্রিকের চতুষ্পার্শ্বে এসে অধিষ্ঠিত হবে। সারাক্ষণ উপস্থিত থেকে প্রত্যক্ষ করবে গোটা প্রক্রিয়াটি। নচেৎ যজ্ঞ সম্পূর্ণ হবে না। উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না।

একসময় গর্তের তলায় একটি লাল রঙের গামছা পাতবে তান্ত্রিক। তার ওপর পঞ্চপল্লব দিয়ে শয্যা বানাবে শিশুর। মন্ত্র পড়তে পড়তে শয্যার ওপর ছড়িয়ে দেবে ধান্য, তিল, ইন্দ্রযব, মাষকলাই আদি শস্য। গর্তের এককোণে মাটির মালসায় রাখবে ভোজ্য, পানীয়। অঙ্গবস্ত্র হিসেবে পাশটিতে রাখবে পঞ্চবল্কল। তারপর গর্তের ঠিক মধ্যিখানে শুইয়ে দেবে শিশুটিকে। বিকেল থেকেই দুধের সঙ্গে স্বল্পমাত্রায় আফিম মিশিয়ে খাওয়ানো হয়েছে ওকে। সেই ঘোরে এতক্ষণ গর্তের পাশটিতে কাঁথার ওপর আধোতন্দ্রায় শায়িত ছিল শিশুটি। অকস্মাৎ গভীর গর্তের শীতলতায় পিঠে কনকনে মাটির স্পর্শ পেয়ে সামান্য বিচলিত বোধ করে সে। আধো তন্দ্রাটুকু হয়তো-বা ভেঙে যায়। কণ্ঠ দিয়ে সামান্য রোদন জাতীয় শব্দ বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু পরমুহূর্তে আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে। তান্ত্রিক ততক্ষণে মন্ত্র পড়তে পড়তে গর্তের মধ্যে ছুড়ে মারছে রক্তজবার পাপড়ি, জল এবং মন্ত্রপূত শস্যাদি। সেই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে বহুক্ষণ। একসময় যাবতীয় প্রক্রিয়া সমাপ্ত হলে পর, ওপরে ডাঁই করে রাখা মাটিগুলোকে মন্ত্র পড়তে পড়তে মুঠো মুঠো ফেলতে থাকবে গর্তের মধ্যে। অকস্মাৎ কচি শরীরে কনকনে মাটির স্পর্শ পেয়ে শিশুটি হয়তো-বা চোখ খুলে তাকাবে। কচি হাতদুটিকে ওপরের দিকে তুলে ধরবে মায়ের কোলের প্রত্যাশায়। কিন্তু অমাবস্যার নিশীথে গভীর গর্তের নিকষ অাঁধারে তার সমস্ত প্রতিক্রিয়াই ঢাকা পড়ে যাবে। একসময় ওপরের সমস্ত মাটি গর্তের মধ্যে পড়ে গেলে পর জীবন্ত সমাধিস্থ শিশুটির জন্য আকাশের সমুদয় দেবতা, অপদেবতা, তাবৎ পরা ও অপরাশক্তির ওপর শিশুটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করে ফিরে আসবে তান্ত্রিক। এবং তখন আর তার মনে তিলমাত্র সংশয় থাকবে না যে, পরবর্তী অমাবস্যার মধ্যেই শিশুটি তান্ত্রিকের অনুগত ‘বীর’ হয়ে উঠবে। জগতের তাবৎ আধিভৌতিক শক্তির অধিকারী হবে সে। এবং সেই শক্তি কেবল তার প্রভুর স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হবে।

মেজাকাকার ডায়েরি তো ছিলই, তার ওপর প্রহ্লাদ দিয়েছিল ‘বীরসাধনা’ সম্পর্কে আরো কিছু গুহ্য তথ্য, যা শুনে বিস্ময়ে আতঙ্কে কেঁপে উঠেছিল শিবকুমারের কিশোর বুক।

এমনকি, সেদিন রাতভর ঘুমের মধ্যেও নরমুন্ডের চোখদুটি একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল শিবকুমারের মুখের দিকে।

 

দুই

শিবকুমারের জন্মের অনেক আগেই মেজোকাকা শ্রুতিকুমার মারা গিয়েছেন। শিবকুমারের বাবারা ছিলেন তিন ভাই। শ্রুতিকুমার ছিলেন মেজো। অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিলেন মানুষটি। রাজশাহী হাইস্কুল থেকে এন্ট্রান্সে প্রথম হয়েছিলেন। ইংরেজিতে নাকি তুখোড় ছিলেন। পাঁচবিবি এলাকায় কোনো সাহেব এলে সকলের হয়ে শ্রুতিকুমারই তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। আর, সেই কথোপকথন হতো নাকি একেবারে সমানে সমানে। সেই যুগের অনেক সাহেবের সঙ্গে তাঁর ছিল পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা। তাঁরা কখনো-সখনো আসতেন গড়ে। থাকতেনও। এমনিতে খুবই খামখেয়ালি মানুষ ছিলেন শ্রুতিকুমার। খুবই একরোখা। ওই কারণেই শেষ অবধি কলেজের পড়াটা আর শেষ করেননি। বাবা, মা, আত্মীয়স্বজন, কারোর কোনো পরামর্শই কানে তোলেননি শ্রুতিকুমার।

একবার এক সাহেব এসে কদিন ছিলেন গড়ে। তিনি তাঁর ক্যামেরা দিয়ে শ্রুতিকুমারদের পুরো পরিবারের অনেক ছবি তুলেছিলেন। তখনো অবধি ছবি তোলার ক্যামেরা চোখে দেখেনি কেউ। সবাই ভেবেছিল, ওটা নির্ঘাত একটা ভুতুড়ে বাক্স। তারপর দেশে ফিরে গিয়ে যখন কয়েক মাস বাদে সাহেব ওইসব ছবি  পাঠালেন, দেখে তো সবাই তাজ্জব। সাহেবের তোলা কয়েকটা পারিবারিক  ছবি গড়ের সদর মহলের দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছিলেন বাবা জ্যোতিকুমার। ওইসব পারিবারিক গ্রুপ-ছবিতে শ্রুতিকুমারও ছিলেন, কিন্তু সকলের মধ্যে তিনি ছিলেন অস্পষ্ট। ওই ছবিগুলোতে শিবকুমার তার বহুশ্রুত মেজোকাকাকে ঠিক ঠিক খুঁজে পায়নি।

আজীবন অকৃতদার ছিলেন শ্রুতিকুমার। তিনি মারা যাবার পর পাঁচবিবির গড়ের অন্দরমহলের দোতলার একেবারে কোণের দিকের বড় ঘরটা চবিবশ ঘণ্টা তালাবন্ধ থাকত। ওইদিকটায় বাড়ির লোকজন তো নয়ই, ঝি-চাকরেরা অবধি বড় একটা যেত না। ঘরখানাকে খোলার কথা কেউ মুখেও আনত না। ওই সময়ে গড়ের পুরনো দাসী-চাকরদের মুখে শিবকুমার স্পষ্টতই দেখত  চাপা ভয়ের রেশ। ঘরটার মধ্যে ঠিক কী রয়েছে, সে বিষয়ে উচ্চবাচ্য করত না কেউ। শিবকুমার খুব চেপে ধরলে পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে এড়িয়ে যেত প্রসঙ্গটা। বড়জোর ফিসফিস করে বলত, ওই ঘরে ভূত আছে দা-বাবু। সবমিলিয়ে ঘরটার সম্পর্কে সেই শিশুকাল থেকে শিবকুমারের বুকের মধ্যে জমেছিল সীমাহীন কৌতূহল। আর, তার কাছে মেজোকাকা শ্রুতিকুমার হয়ে উঠেছিলেন এক দুর্জ্ঞেয় রহস্য।

শেষ অবধি শিবকুমারের জেদের কাছে হার মানতে হয়েছিল গড়ের সবাইকে। জ্যোতিকুমারের হুকুমে শ্রুতিকুমারের ঘরটা একদিন খোলা হয়েছিল। দীর্ঘকাল না খোলার দরুন ঘরটাতে চামচিকে, আরশোলার ডিপো হয়েছিল, মাকড়সার জালে ভরে গিয়েছিল ছাদ। মেঝের ওপর পুরু ধুলো, আর সারাঘরজুড়ে এক ধরনের বিকট ভ্যাপসা গন্ধ, যা শিবকুমারের মতে, দীর্ঘকাল আলো-হাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকবার ফল হলেও, বাড়ির অন্যদের মতে, এ কোনো অশরীরী গন্ধ।

কয়েকটা দাসী-চাকরে মিলে দিনভর সাফসুতরো করবার পর ঘরের মধ্যে ঢোকা গিয়েছিল। এরপরই শিবকুমার পেয়েছিল ওই ঘরে একলাটি ঢোকার ইজাজৎ। আর প্রথম দিনেই মাত্র কিছুক্ষণ ওই ঘরের মধ্যে থাকবার সুবাদে শিবকুমারের চোখের সামনে খুলে গিয়েছিল একেবারে আলাদিনের গুহার দরজা।

সারাঘরজুড়ে ঠাসা ছিল রাশি রাশি জাদুবিদ্যার বই, তার অধিকাংশই বিলিতি। ছিল দেশি-বিলিতি জাদুবিদ্যার ম্যাগাজিন। দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশ থেকে ওগুলো ডাকযোগে আনিয়েছিলেন শ্রুতিকুমার। তাতে ছিল দেশ-বিদেশের অনেক নামিদামি জাদুকরের কথা, ওদের জীবনী, প্রদর্শিত খেলাগুলি, তাদের গোপন কৌশলাদি…। ঘরময় র‌্যাকে-র‌্যাকে সাজানো ছিল অজস্র তাসের প্যাকেট, কাঠের ছোটো ছোটো বাক্স, জাদুকাঠি, এবং অর্ধসমাপ্ত কিছ জাদুসামগ্রী। আর, ঘরের এক কোণে ছিল একটা বিশাল সিন্দুক। ভারী ওজনের তালা লাগানো ছিল সিন্দুকটার গায়ে, এবং দীর্ঘদিন না খোলার দরুন ওই তালার শরীরে পুরু মরচে ধরেছিল। সিন্দুকের গায়ে খোদাই করে ইংরেজিতে লেখা ছিল ‘প্যান্ডোরা’জ বক্স’।

ওই ঘরের দেয়ালেই ছিল শ্রুতিকুমারের একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি। ঘরটা খোলার পর মেজোকাকাকে সেই প্রথম পরিপূর্ণভাবে দেখেছিল কিশোর শিবকুমার। গৌরবর্ণ, সুঠাম, একজন ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষ। চোখদুটি হিরের মতো উজ্জ্বল। নাকের তলায় বাঁকানো তলোয়ারের মতো গোঁফ। মুখমন্ডলের অভিব্যক্তির থেকে ব্যক্তিত্ব একেবারে উপচে পড়ছিল। মানুষটিকে দেখতে দেখতে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল শিবকুমার।

সেই মুগ্ধতা কেবল মেজোকাকার এমন দেবদুর্লভ রূপ দেখেই নয়। আসলে, ওই ছবিটির সঙ্গে সাহেবের পাঠানো অন্য ছবিগুলোর ছিল দুস্তর ফারাক। মহলের অন্য ছবিগুলো জমিদারের প্রচলিত বেশে তোলালেও, মেজোকাকা কেবল ওই ছবিটা তুলিয়েছিলেন জাদুকরের বেশে। আর তা কোট-প্যান্ট-হ্যাট পরা সাহেবি বেশ নয়, মেজোকাকার পরনে ছিল এদেশীয় রাজার মতো পোশাক। গায়ে ছিল ঝলমলে কুর্তা-শেরোয়ানি। মাথায় ছিল শিখিপাখাযুক্ত রাজকীয় পাগড়িমুকুট। অথচ, তখনো অবধি এদেশে ওই বেশে জাদু দেখানোর রেওয়াজটাই শুরু হয়নি। কেন মেজোকাকা এমন বিচিত্র বেশে তুলিয়েছিলেন ওই ছবি, কেন হঠাৎ রাজার বেশ ধরে জাদু দেখাবার কথাটা মনে হয়েছিল, তার কোনো সদুত্তর কোনোকালেই পায়নি শিবকুমার।

ওই ঘরেই শিবকুমার যে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি পেয়েছিল, তা হলো শ্রুতিকুমারের লেখা ওই ডায়েরিটা। ওই ডায়েরির মধ্যেও গোঁজা ছিল মেজোকাকার একটা ছোট সাইজের ছবি। জাদুকরবেশী যে-ছবিটা ঝোলানো ছিল তাঁর খাস-কামরার দেয়ালে, এই ছবিটা ছিল তারই ক্ষুদ্র সংস্করণ।

শ্রুতিকুমার বেশ পোশাকি বাংলায় লিখেছিলেন ডায়েরিটা। জাদুসংক্রান্ত অজস্র তথ্যে ঠাসা ছিল তার প্রতিটি পাতা। সময় পেলেই ওটা পড়ত শিবকুমার। দেশ-বিদেশের জাদু ও জাদুকরদের সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানা যেত ওর থেকেই। শ্রুতিকুমারের বারবার সাহেব-জাদুকরের টানে কলকাতায় চলে যাবার ঘটনাগুলোও লেখা ছিল তাতে।

ওই ডায়েরি অনুসারে, শ্রুতিকুমারের প্রথম যৌবনে নাকি রয়-দ্য-মিস্টিক নামে এক জাদুকর এসেছিলেন রংপুর শহরে। রংপুর টাউন-হলে খেলা দেখিয়েছিলেন তিনি। একেবারে সাহেবি পোশাক পরে খেলা দেখিয়েছিলেন। বাড়ি থেকে পালিয়ে শ্রুতিকুমার দেখতে গিয়েছিলেন সেই জাদু। সেই ঘটনার বিস্তারিত লেখা রয়েছে তাঁর ডায়েরির পাতায়। এমনকি, সেই সন্ধেয় রয়-দ্য-মিস্টিক যেসব খেলা দেখিয়েছিলেন ওগুলোর নাম ও বিবরণও তিনি পরম যত্নে লিখে রেখেছেন ডায়েরির পাতায়। বিশেষ করে বিলিয়ার্ড বলে খেলা, চায়নিজ লিংকিং রিংস, শূন্যে ভাসমান বল, রাইজিং কার্ড, একটি মেয়েকে কেবলমাত্র একটা খাড়া লাঠির ডগায় শুইয়ে শূন্যে ভাসিয়ে রাখা, চোখবাঁধা অবস্থায় টেলিপ্যাথির মাধ্যমে চারপাশের লোকজন ও জিনিসপত্র সম্পর্কে নির্ভুলভাবে বলে দেওয়া গোছের খেলাগুলো ওই বয়েসেই শিবকুমারকে একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।

ওই রয়-দ্য-মিস্টিক নামক জাদুকরই সম্ভবত শ্রুতিকুমারের মাথায় জাদুর ভূতটাকে ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই ভূত আর ইহজীবনেও নামেনি শ্রুতিকুমারের ঘাড় থেকে।

রয়-দ্য-মিস্টিকের খেলাগুলো দেখবার পর থেকেই নাকি জাদুর প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খেতে থাকেন শ্রুতিকুমার। তারপর থেকে সারাটা জীবন জাদুই তাঁর একমাত্র চর্চার বিষয় ছিল। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে জাদুই হয়ে উঠেছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। ওই নিয়েই কাটাতেন সারাক্ষণ। সেই টানে তাঁর সংসারটাই করা হলো না।

শ্রুতিকুমার যে-ঘরটায় থাকতেন, ওই ঘরেই দিনভর জাদুর চর্চা করতেন তিনি। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে প্র্যাকটিস করতেন। মাঝে মাঝে চাকরদের ডেকে উলটোপালটা কিছু জিনিসপত্তর জোগাড় করে এনে দিতে বলতেন। সেগুলো এলে পর নিজের ঘরে ঢুকিয়ে নিতেন। তারপর জিনিসগুলোর যে কী গতি হতো, তা আর বাড়ির কেউই জানতে পেত না। তবে মাঝে মাঝে ঘরে উঁকিঝুঁকি মারতে গিয়ে যা-সব পিলে-চমকানো দৃশ্য দেখেছে বাড়ির দু-একজন পুরনো ঝি-চাকর, এখনো অবধি তা বলতে গেলে তাদের বুক কাঁপে।

বাংলায় লেখা ডায়েরিটা পড়তে পড়তে  শিবকুমার বিস্ময়ে থ হয়ে যেত।

মহলের দাসদাসীরা শ্রুতিকুমারকে একজন অলৌকিক  ক্ষমতাধর সাধক গোছের কিছু ভেবে নিয়েছিল। কথায় কথায় তারা শ্রুতিকুমারের কোনো এক অলৌকিক ক্রিয়াকান্ডের প্রসঙ্গে চলে যেত, কিনা, চোখের সামনে শূন্যে নাচছে টাকা, পাতিলে রুটি কাটবার সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতর থেকে ঝরে পড়ছে তাজা রক্ত, প্যাকেটের ভেতর থেকে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে বিশেষ তাসটি…। সেইসব দুঃস্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ওদের বুক শিউরে উঠত, দুচোখ কপালে উঠে যেত বারবার।

ছেলেবেলা থেকে এমনটা শুনতে শুনতে শিবকুমার বুঝি কল্পনায় দেখতে পেত শ্রুতিকুমারকে। এমনকি, মনশ্চক্ষে প্রত্যক্ষ করত তাঁর অলৌকিক কান্ডগুলোকেও। দেখতে দেখতে কবে মানুষটার প্রতি এক ধরনের তীব্র আকর্ষণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল শিবকুমারের মনে।

যতদিন পাঁচবিবির গড়ে ছিল শিবকুমার, পড়াশোনার পর বাকি সবটুকু সময় শ্রুতিকুমারের ঘরটাতেই কাটাত। শ্রুতিকুমারের সংগ্রহ করা বই-পত্রিকাগুলোর পাতা ওলটাত। পাতায় পাতায় ছাপা ছবিগুলোকে বিভোর হয়ে দেখত। লেখাগুলোকে পড়ে পড়ে বোঝার চেষ্টা করত। আর দেয়ালে টাঙানো মেজোকাকার ছবিটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত বহুক্ষণ। মেজোকাকাকে দেখে দেখে বুঝি আশ মিটত না শিবকুমারের। আর তখনই, কখনো-কখনো শিবকুমারের মনে হয়েছে, মাত্র এক পলকের জন্য মেজোকাকার চোখের তারা দুটো বুঝি কেঁপে উঠল। কখনো এমনটাও মনে হয়েছে, মাত্র এক ঝলকের জন্য শিবকুমারের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন মেজোকাকা, শিবকুমারের মনে হয়েছিল, কিছু বুঝি বলতে চাইছেন ওকে। এবং, দৃষ্টির ভ্রম নয়, বাস্তবিক শিবকুমারের দৃষ্টির সমুখে নাকি ঘটে গিয়েছিল এমন কান্ড।

 

 

তিন

পঞ্চমীর ওই পড়ন্ত বিকেলে হৃদয়নাথের সিন্দুকের শরীরে অাঁকা বিদ্ঘুটে নরমুন্ডটির থেকে সাততাড়াতাড়ি পালাতে গিয়ে খোদ হৃদয়নাথকে কাছ থেকে চাক্ষুষ করা যায়নি বটে, তবে জমিদারবাবুর ছেলে হওয়ার সুবাদে পরের দিনই হৃদয়নাথকে খুব কাছ থেকে দেখবার সুযোগ হয় শিবকুমারের।

জমিদারবাবুর ছেলেজ্ঞানে প্রথম দর্শনেই খুব গদগদ হেসেছিল হৃদয়নাথ। দু-চারটে কথাও বলেছে শিবকুমারের সঙ্গে। কোথায়, কোন ইশ্কুলে, কোন ক্লাসে পড়ে, জাদু দেখতে ভালো লাগে কিনা, এইসব মামুলি প্রশ্ন। কিন্তু এমন হামলে পড়ে শুধিয়েছিল হৃদয়নাথ, যেন প্রশ্নগুলোর জবাবের ওপর ওর মরা-বাঁচা নির্ভর করছে। আরো অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হলো, মানুষটার কণ্ঠস্বর এত মিনমিনে, আড়াল থেকে শুনলে মনে হবে, মেয়েমানুষ কথা বলছে। জবাব দেবার ফাঁকে শিবকুমার সারাক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল লোকটাকে। বলা যায়, আগাপাশতলা জরিপই করছিল।

লোকটার বয়েস আন্দাজ ষাটের ওপর। পিঙ্গলবর্ণ শরীর। পাকা তল্লাবাঁশের মতো দীর্ঘকায়। ছিপছিপে বটে, তবে শরীরের খাঁচাটি বেশ মজবুত। কেঠো শরীরটাতে সামান্যতমও মেদ ছিল না। মাথায়  অর্ধেকখানি জুড়ে নিটোল টাক। কেবল চোখদুটি ছিল, বাজপাখির মতো শৌর্যমন্ডিত নয়, বলা যায় কাকের মতো তীক্ষ্ণ, সদা-সতর্ক ও ধূর্ত। একজোড়া হিরের কুঁচি বুঝি বসানো ছিল চোখের তারায়। হিরের শরীর থেকে ঝিলিক মারতে থাকা সেই দৃষ্টিতে এমনকিছু ছিল, বেশিক্ষণ চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা যাচ্ছিল না। সারা শরীর শিরশিরিয়ে উঠছিল। সম্ভবত, ওই চোখদুটির কারণেই প্রথম দর্শনে লোকটার প্রতি তেমন ভক্তি জাগেনি শিবকুমারের। তাবাদে, তার মধ্যে এমন কিছু উঞ্ছবৃত্তি লক্ষ করেছিল শিবকুমার, যা অন্তত ওর মাপের একজন তুখোড় জাদুকরের বেলায় মোটেই শোভা পায় না। বিশেষ করে, গড় থেকে সিধের সঙ্গে মাছ দেওয়া হলে পর, সে যখন স্বয়ং উঠোনে বসে মাছ কুটতে বসে গেল, তার ওপর মানুষটি যখন সারাটা দিন ধরে নায়েব, গোমস্তা, এমনকি, গড়ের পুরনো চাকর প্রহ্লাদের কাছে সামান্য-সব জিনিসপত্রের জন্য মিনমিনে গলায় দরকষাকষি, তোষামোদি করতে লাগল, দেখতে দেখতে খুবই হতাশ হয়েছিল শিবকুমার। মানুষটিকে একজন জাদুকর বলে ভাবতে কেমন জানি রাজি হচ্ছিল না মন। শিবকুমারের মনের গভীরে জাদুকর বলতে যে সর্বশক্তিমান, রহস্যময়, আধিভৌতিক পুরুষটির নিরন্তর বসবাস, হৃদয়নাথের মধ্যে তার তিলমাত্র দেখতে পায়নি শিবকুমার। তাও লোকটাকে দূর থেকে সারাক্ষণ নজরে রেখেছিল সে। ওর প্রতিটি কাজকর্ম, কথাবার্তাকে একেবারে গোয়েন্দার দৃষ্টিতে লক্ষ রাখছিল।

গড়ের অন্য বাচ্চারা কেউ হৃদয়নাথের পাশ ভিড়ত না। শিবকুমার কিন্তু এক অপরিসীম বিস্ময়ে ওর আশেপাশে ঘুরে বেড়াত দিনভর। আসলে, হৃদয়নাথকে নিয়ে তার মনে যত না কৌতূহল, তার চেয়ে ঢের বেশি কৌতূহল সিন্দুকের মধ্যেকার ওই ‘বীর’টাকে নিয়ে। না-মানুষ, না-দৈত্য, না-পিশাচ, না-আত্মা ওই শরীরী কিংবা অশরীরী প্রাণীটি, বুকের মধ্যে আটকেপড়া বায়ুর মতো, জমাট বেঁধে ছিল ওর মনে।

গোটা ষষ্ঠীর দিনটা সদর উঠোনে হৃদয়নাথের নির্দেশমতো স্টেজ বানায় গড়ের লোকজন। সারাদিন শিবকুমারও জায়গাটা থেকে নড়ে না। সারাক্ষণ এটা-ওটা গল্প করতে থাকে হৃদয়নাথের সঙ্গে।

জমিদারের ছেলে জ্ঞানে হৃদয়নাথও বেশ কৃতার্থ বোধ করছিল বুঝি। খুব গদগদ গলায় জবাব দিচ্ছিল শিবকুমারের যাবতীয় প্রশ্নের।

অযাচিত প্রশ্রয় পেয়ে শিবকুমার একসময় দাবিটা পেশ করে বসে, কিনা, আমাকে জাদু শেখাবে তুমি?

– তুমি জাদু শিখবে খোকাবাবু? রিনরিনে গলায় হেসে ওঠে হৃদয়নাথ, তাহলে লিখাপড়া শিখে জজ-ব্যারিস্টার হবে কেডা? এই বিশাল জমিদারি সামলাবে কেডা?

– আহ্, যত্তোসব আলগা কথা! নিমেষের মধ্যে অন্তর্গত জমিদারি রক্তের প্রকাশ ঘটিয়ে ফেলে শিবকুমার, তুমি শেখাবে কিনা তাই বলো?

শিবকুমারের ধমকে নয়, ওর প্রস্তাবটাতেই বেজায় ভয় পেয়ে যায় হৃদয়নাথ। কেবল চোখের তারায় নয়, সারামুখমন্ডলে ফুটে ওঠে সেই ভয়ের রেশ। চাপা গলায় বলে, তোমাকে জাদু শেখাতে চাইলে চাবুক মাইরা আমার পিঠের তাবৎ চামড়া তুলে নেবেন কর্তাবাবু। জমিদারি গদিতে বইস্যা যাঁর রোজদিন হাজার হাজার টাকা কামানোর কথা, তিনি কিনা, একটা খেটো লাঠির ডগায় শূন্যে টাকা ধইরা বেড়াবেন আসরে আসরে। এরপর আমার প্রাণটা আর আস্ত থাকব?

ততক্ষণে হৃদয়নাথের চোখেমুখে ফুটে ওঠা ভয়ের উৎসটিকে বুঝি চিনতে পেরেছে শিবকুমার। বলে, যদি বাবার অনুমতি আদায় করে দিই?

এমন কথায় হৃদয়নাথ খুব দোটানায় পড়ে যায় বুঝি। আমতা আমতা করে বলে, তিনি আপনাকে অনুমতি দেবেনই না। কত বিবেচক তিনি।

ওইসময় আর ওই নিয়ে কথা বাড়ায়নি শিবকুমার। কেবল বলেছিল, আমি কিন্তু রোজ যাব তোমার ঘরে।

হৃদয়নাথ ঢোক গিলে বলেছিল, আসবেন বইকি। আপনার যখন খুশি…।

কিন্তু ওর কথা বলবার ধরনেই শিবকুমার বুঝে ফেলেছিল, নিতান্তই অনিচ্ছাসহকারে কথাগুলো উচ্চারণ করল হৃদয়নাথ।            বাস্তবিক এই মুহূর্তে সাপের ছুঁচো-গেলা অবস্থা লোকটার।

তখন পাঁচবিবির গড়জুড়ে নেমে আসছে সন্ধের অাঁধার। মঞ্চ তৈরির কাজকর্ম সাঙ্গ করে হৃদয়নাথ পায়ে পায়ে হাঁটা দেয় সদর দিঘিতে চান করতে। আর, ঠিক সেই মুহূর্তে শিবকুমার লক্ষ করে, উঁচু বারান্দার আলো-অাঁধারিতে বারান্দার এককোণে রাখা জাদুদলের বিশাল সিন্দুকটা খুলে ফেলেছে হৃদয়নাথের একনম্বর সহকারী ভুজঙ্গভূষণ। সিন্দুকটার ভেতর অবধি মুখ ঢুকিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করছে সমানে।

দূর থেকে দৃশ্যটা দেখতে দেখতে শিবকুমারের মনে হয়, সিন্দুকটার ভেতরের বাসিন্দাটির সঙ্গেই চাপা গলায় কথা বলছে ভুজঙ্গ। ভুজঙ্গর সঙ্গে সিন্দুকের ভেতরের প্রাণীটার সম্পর্ক নিয়ে বুকের মধ্যে একরাশ সন্দেহ জমিয়ে একসময় হৃদয়নাথকে অনুসরণ করে সদর দিঘির দিকে পা বাড়িয়েছিল শিবকুমার।

সদর-দেউড়ি পেরিয়ে হনহনিয়ে হাঁটছিল হৃদয়নাথ। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে শিবকুমার ওকে অনুসরণ করছিল। কেবল গড়ের দিকটা ছাড়া সদরদিঘির বাকি তিনটি পাড় আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, সফেদার ঠাসবুনোট গাছগাছালে ভর্তি। গাছের তলায় বুনো ঝোপঝাড়ও প্রচুর। দিনমানেও সূর্যের আলো পুরোপুরি প্রবেশ করবার ছাড়পত্র পায় না সেখানে। আর সন্ধে ঘনিয়ে এলে ওই এলাকায় তো অাঁধার নেমে আসে আগাম।

একসময় শিবকুমার দূর থেকে দেখতে পায়, চানের ঘাটের দিকে না গিয়ে হৃদয়নাথ দিঘির উত্তরপাড়ের দিকে হাঁটছে। তার পায়ের গতিতে এক জাতের অস্থিরতা লক্ষ করছিল শিবকুমার। বারংবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে যেন খুব ব্যাকুল দৃষ্টিতে খুঁজছিল সে। তান্ত্রিক মানুষ, বনজ লতাপাতা, কন্দমূল বিভিন্ন কারণে হরবখত প্রয়োজন হয় তার। ওই সামগ্রীগুলি সংগ্রহ করবার সময় এবং প্রক্রিয়াও স্বতন্ত্র। সাধারণত দিন ও রাতের সন্ধিক্ষণটি সাধুসন্ত-তান্ত্রিক-কাপালিকদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে কি এই সন্ধ্যার প্রাক্কালে তেমনই কোনো বনজ সামগ্রীর প্রয়োজনেই গাছগাছাল, ঝোপঝাড়কে নিশানা করে এগিয়ে চলেছে মানুষটা। শিবকুমারের মনে ধন্ধ জাগে। অন্য কেউ হলে, অমন ভরসন্ধেয় ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঢুকত না কিছুতেই, কিন্তু একে তো শিবকুমার চিরকালই দুঃসাহসী, সামনের বছর ম্যাট্রিক দেবে সে, তার ওপর সদরদিঘির সবগুলো পাড়েই, হরেক জাতের সুমিষ্ট ফল-ফলারির টানে, তার আশৈশব আনাগোনা। সবচেয়ে বড় কথা, হৃদয়নাথ যেন ওই মুহূর্তে প্রবল আকর্ষণে টানছিল তাকে। এমন অচেনা জায়গায় ভরসন্ধেয় কীসের টানে এমন ব্যাকুল হয়ে চলেছে লোকটা এমন ঠাসবুনোট গাছগাছালির দুর্গম রাজ্যে, সেটা জানার জন্য বুঝি হাঁকুপাঁকু করছিল শিবকুমারের মনটা।

একসময় দিঘির উত্তরপাড়ের গাছগাছালির নিবিড়তায় অদৃশ্য হয়ে যায় হৃদয়নাথ। একটু বাদে শিবকুমারও পৌঁছে যায় ওখানে। কেমন জানি তার মনে হচ্ছিল, জাদু অথবা তন্ত্রসংক্রান্ত কোনো ক্রিয়াকর্মের টানেই দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণে এমন গাছগাছালির নির্জনতায় প্রবেশ করেছে হৃদয়নাথ। আর, শিবকুমারের আন্দাজটা ঠিক হলে, আজ হয়তো তেমনই কোনো আধিভৌতিক ক্রিয়াকলাপ প্রত্যক্ষ করবার বিরল সুযোগ এসে যাবে শিবকুমারের কপালে।

নিবিড় গাছগাছালির ভেতর সন্ধের আগেই অন্ধকার নেমে এসেছে। গোটা বাগানটা জুড়ে এক জাতের অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা। ওই বয়েসে যারপরনাই ডাকাবুকো হওয়া সত্ত্বেও শিবকুমারের বুকটা ঢিপঢিপ করছিল। হৃদয়নাথের থেকে প্রায় তিরিশ হাত দূরত্বে একটা আমগাছের আড়ালে দম আটকে দাঁড়িয়ে থাকে সে। আড়াল থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বিঁধিয়ে রাখে হৃদয়নাথের ওপর।

বাগানের মধ্যে ঢুকে কিছুই করছিল না হৃদয়নাথ। কেবল ব্যাকুল দৃষ্টিতে চারপাশে কাউকে বুঝি খুঁজছিল। মাঝে মাঝে এমন সন্তর্পণে গলাখাঁকারি দিচ্ছিল, শিবকুমারের মনে হচ্ছিল, স্রেফ শ্লেষ্মাজনিত কারণে একেবারে নির্দোষ গলা-ছাড়ানো নয় এটা, বরং এতদ্বারা নির্ঘাত নিজের উপস্থিতির কথাটা কাউকে জানান দিচ্ছে ধূর্ত হৃদয়নাথ।

শিবকুমারের আন্দাজটাই সত্যি হয়। একটু বাদেই, শিবকুমারের বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে এসে হাজির হয় একজন দৈত্যাকার পুরুষ। হৃদয়নাথের এক্কেবারে গা ঘেঁষে যেন অকস্মাৎ মাটি ফুঁড়ে ওঠে সে।

আসন্ন সন্ধ্যার আলো-অাঁধারিতে ওর চোখমুখ, অবয়ব, সবকিছু অস্পষ্ট, অস্বচ্ছ লাগছিল শিবকুমারের। তার বিকট কালো রঙের বপুটি আবছা অন্ধকারে একেবারে ভুষোকালির মতো লাগছিল। দৈত্যটার গোটা অবয়বটি যত-না রক্তমাংসের, তার চেয়েও ঢের বেশি ছায়া-ছায়া লাগছিল। আর, গায়ের রংটি সম্ভবত নিকষ কালো, নচেৎ এমন আলো-অাঁধারিতেও ছায়াটাকে অতখানি গাঢ় লাগত না। সবমিলিয়ে শিবকুমারের চোখের সামনে এক ভীষণদর্শন ছায়ামূর্তি যেন। মূর্তিটা হৃদয়নাথের শরীরের সঙ্গে এমনভাবে লেপ্টে রয়েছে, শিবকুমারের মনে হয়, কোনো স্বতন্ত্র মানুষ কিংবা দত্যিদানো নয়, হৃদয়নাথের শরীরের ছায়াই বুঝি ওটা।

অকস্মাৎ শিবকুমারের ঝাঁ করে মনে পড়ে যায়, একটু আগে গড়ের বারান্দায় ঘটে যাওয়া ওই দৃশ্যটা। সিন্দুকের ডালাটি খুলে ধরে ভেতরে কার সঙ্গে যেন কথা বলছিল হৃদয়নাথের সহকারী ভুজঙ্গভূষণ। একসময় সে পরিপূর্ণভাবে মেলে ধরেছিল সিন্দুকের ডালা, পরমুহূর্তে তার দৃষ্টি ঘুরে গিয়েছিল বারান্দার ছাদের দিকে। ওপরের দিকে চোখ তুলে চারপাশটা এমনভাবে দেখছিল, যেন হাওয়ায় ভেসে যাওয়া কিছুকে অনুসরণ করছে ওর চোখদুটি। তবে কি… তবে কি… ওটাই ছিল দিনান্তে সিন্দুকবন্দি ‘বীর’টাকে সাময়িকভাবে মুক্তি দেবার সময়? সিন্দুকের ডালাটিকে মেলে ধরে একটু আগে সেটাই কি করল ভুজঙ্গ? আর, ছাড়া পেয়ে তৎক্ষণাৎ কি প্রভুর কাছে চলে এসেছে দৈত্যটা। কোনো বিশেষ ‘আজ্ঞা’ দেবার জন্য হৃদয়নাথই কি স্মরণ করেছে তার পোষা ‘বীর’কে! তবে কি সত্যি সত্যিই ওর চোখের সমুখে হৃদয়নাথের গা ঘেঁষে ছায়া-ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওর সেই বহুকথিত ‘বীর’টাই।

ভাবতে ভাবতে আশৈশব ডাকাবুকো শিবকুমারেরও অকস্মাৎ কেমন ভয় করতে থাকে। ভারি অচেনা জাতের ভয় সেটা। অকস্মাৎ শরীরটা কেন ফুলে ফুলে ওঠে। শরীরের তাবৎ রোম সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে ওঠে। সারা শরীর ঘামে ভিজে যায় নিঃশব্দে।

হৃদয়নাথ ফিসফিস করে কিছু বলছিল ছায়ামূর্তিকে। স্বাভাবিক ঢঙে কথা নয়, খানিকটা মন্ত্রোচ্চারণের মতো মাথা নেড়ে নেড়ে দৈত্যটাকে কিছু বোঝাচ্ছিল হৃদয়নাথ। এতদূর থেকে কথাগুলো ঠিকঠাক শুনতে পাচ্ছিল না বটে, তবে শিবকুমারের মনে হচ্ছিল, হৃদয়নাথ কিছু একটা ‘আজ্ঞা’ দিচ্ছিল দৈত্যটাকে। দৈত্যটা একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল হৃদয়নাথের দিকে। গলা থেকে একটি শব্দও বেরোচ্ছিল না ওর। তারপর, একসময় শিবকুমারের  চোখের সামনেই যেন গাছগাছালির আড়ালে অকস্মাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল ওটা।

হৃদয়নাথ আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না ওখানে। দ্রুত পায়ে রওনা দেয় স্নানের ঘাটের দিকে।

ততক্ষণে সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। সদরদিঘির তিনপাড়ের গাছ-গাছালিতে অন্ধকারটা আরো গাঢ় হয়েছে। সদরদিঘির কালো জল আরো ঝিমকালো হয়েছে। সারা গায়ে অন্ধকার মেখে দুরুদুরু বুকে শিবকুমারও একসময় পা বাড়ায় গড়ের দিকে। ফেরার পথে দেখতে পায়, দিঘির ঝিমকালো জলে একটা ছায়ামূর্তি ঘনঘন ডুব মারছে।

শিবকুমার আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি ওখানে। একদৌড়ে ফিরে এসেছিল গড়ে। আর, উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় পা রেখেই দেখতে পেয়েছিল, ভুজঙ্গ সবে সিন্দুকটা ডালাবন্ধ করে তালা লাগাচ্ছে ওতে।

আশৈশব প্রখর বুদ্ধির অধিকারী শিবকুমারের কেমন জানি মনে হচ্ছিল, একটু আগে ভুজঙ্গই সিন্দুকটি খুলে যে ‘বীর’টাকে মুক্তি দিয়েছিল, দিঘির উত্তরপাড়ে প্রভু হৃদয়নাথের সঙ্গে দেখা করে তার থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ নিয়ে এইমাত্র সে ঢুকে পড়ল সিন্দুকে।

সেই রাতে সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে পুনরায় সদরমহলে আসে শিবকুমার। পা টিপে টিপে হাজির হয় পুবদিকের বারান্দায়। নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল অন্ধকার বারান্দার এককোণে রাখা সিন্দুকটার কাছে।

বারান্দার নিকষ অন্ধকারে কালো রঙের সিন্দুকটা একেবারে মিশে গিয়েছিল। শিবকুমার ওটাকে চর্মচক্ষে দেখতে পাচ্ছিল না। তবে চোখের আন্দাজে সে নিশ্চিত হয়, সিন্দুকটার একেবারে গা ঘেঁষেই দাঁড়িয়েছে। বারেকের তরে আলতো হাত ঠেকায় হিমশীতল সিন্দুকটায় গায়ে।

টিমটিমে আলো জ্বলছিল হৃদয়নাথের ঘরের মধ্যে। নিজেদের মধ্যে বিড়বিড়িয়ে কথা বলছিল ওরা। শিবকুমার ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সিন্দুকটার পাশে। তার মনে কোনো সন্দেহই নেই যে, ওই মুহূর্তে সিন্দুকের মধ্যে শুয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছে হৃদয়নাথের পোষা ‘বীর’। একফাঁকে ওকে হয়তো-বা খেতে দেওয়া হয়েছে খাদ্য ও পানীয় হিসেবে তাল তাল মাংস আর ঘড়া ঘড়া মদ।

একসময় স্রেফ কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে সামান্য ঝুঁকে পড়ে সিন্দুকটার গায়ে কান ঠেকায় শিবকুমার। এতদ্বারা পরখ করতে চায় ভেতরে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব।

একটুক্ষণ কান পাততেই শিবকুমারের মনে হয়, একটা মৃদু নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ যেন ভেসে আসছে সিন্দুকের ভেতর থেকে। এতটাই অস্পষ্ট যে, শিবকুমারের মনে সংশয় জাগে, বাস্তবিক ওটা কোনো নিঃশ্বাসের শব্দ কিনা। একসময় তার মনে হয়, নিঃশ্বাসের শব্দটা সিন্দুকের ভেতর থেকে নয়, সম্ভবত আসছে ওর নিজের বুকের ভেতর থেকে।

আর অধিকক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস হয় না শিবকুমারের। দ্রুত পায়ে অন্দরমহলের দিকে পা বাড়ায় সে।

কিন্তু সারাক্ষণ তাঁর বুকের মধ্যে বিঁধে থাকে, সিন্দুকের ভেতর থেকে ভেসে আসা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটা।

 

চার

গতকাল ভরসন্ধেয় সদরদিঘির উত্তরপাড়ের ঠাসবুনোট বাগানের আধো-অন্ধকার ঘেরাটোপে যখন হৃদয়নাথের সঙ্গে ছায়া-ছায়া হয়ে লেপ্টে ছিল ওরই পোষা বীরটা, দৃশ্যটা অল্প দূরে দাঁড়িয়ে স্বচক্ষে দেখেছিল কিশোর শিবকুমার। সারাটা সন্ধেজুড়ে ঢিপঢিপ করছিল বুক। নেহাতই অসমসাহসী আর ডাকাবুকো বলেই সামলে নিয়েছিল কোনো গতিকে।

কিন্তু শরীরের মধ্যে ভয়জনিত উত্তেজনাটা ছিলই। ফলে, রাতের বেলায় ভালো করে ঘুমটাই হলো না। বিছানায় শুয়ে চোখদুটি বোজামাত্র চোখের সমুখে সারাক্ষণ কেবলই ভাসতে লাগল ওই দৃশ্যটা। কিনা, সদরদিঘির উত্তরপাড়ে মানুষের মতোই দেখতে ভীষণকায় প্রাণীটা হৃদয়নাথের ছায়ার সঙ্গে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার দুচোখে প্রচ্ছন্ন জিঘাংসা।

তারপরই ঘটল সেই রোমহর্ষক ঘটনা।

বাইরে শনশনিয়ে হাওয়া বইছিল। আকাশে চাঁদের আলোর রংটা ছিল হাঁসের ডিমের কুসুমের মতো লালচে। ওই রহস্যময় আলোর ভেতর ভাসতে ভাসতে কদাকার দৈত্যটা জানালা গলে ঢুকে পড়ল শিবকুমারের শোবার ঘরে। পা টিপে টিপে দাঁড়াল বিছানার পাশটিতে। ভাটার মতো গনগনে চক্ষুদুটি মেলে পলকহীন তাকিয়ে রইল শিবকুমারের দিকে।

একসময় ফিসফিস করে বলল, তোকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।

কথাটা শোনামাত্র বেজায় চমকে ওঠে শিবকুমার! একেবারে হৃদয়নাথের গলায় কথা বলছে দৈত্যটা!

তেমনই মিনমিনে মেয়েলি গলা!

ততক্ষণে বেজায় ভয় পেয়ে গিয়েছে শিবকুমার। তাও এমনই ডাকাবুকো সে, সাহসে ভর করে দানবটার উদ্দেশে বলে ওঠে, পছন্দ হয়েছে তো সরাসরি দেখা দাও না কেন?

– দেখা দেবো। মিনমিনে গলায় যতখানি দৃঢ়তা ফোটানো যায়, ততখানি ফুটিয়ে বলে ওঠে হৃদয়নাথের পোষা ‘বীর’, কাল সন্ধেবেলায় অবশ্যই দেখা পাবি আমার। আর, এবার থেকে আমি তোর কাছেই থাকব। সিন্দুকের নিকষ অন্ধকারে, একরাশ  গুমোটের মধ্যে থাকতে একেবারেই ভালো লাগে না আমার। প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে। এবার থেকে, যে কটা দিন এই গড়ে থাকব, ফি-রাতে তোর কাছেই শোব আমি। বলেই, চকিতে সে এক কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। বিশাল কদাকার শরীরটাকে পলকের মধ্যে একচিলতে ছায়ার মতো হালকাটি বানিয়ে নিয়ে নেতিয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়, শিবকুমারের পাশটিতে।

বেজায় ত্রস্ত শিবকুমারের ঘুমটা ভেঙে খানখান হয়ে যায়। ধড়মড়িয়ে বিছানার ওপর উঠে বসে সে। আর, ঠিক সেই মুহূর্তে দেখতে পায়, ওর বিছানার অর্ধেকটা জুড়ে ছায়া-ছায়া হয়ে শুয়ে রয়েছে ওই বিকট প্রাণীটা।

নিমেষের মধ্যে বিছানা থেকে ধনুকের ছিলার মতো সপাং করে ছিটকে সরে যায় শিবকুমার। বিছানার থেকে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে। আর, তখনই শিবকুমার দেখতে পায় জানালা গলে লম্বাটে এক ফালি চাঁদের আলো তেরচা হয়ে পড়েছে ওর বিছানায়। এমনই আকৃতি সেই আলোর, মনে হয় বিছানার একদিক জুড়ে এলিয়ে শুয়ে রয়েছে ছায়া-ছায়া এক ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মানুষ।

ছুটে গিয়ে জানালাটা এক ঝটকায় বন্ধ করে দেয় শিবকুমার। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, ততক্ষণে ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে গিয়েছে ওই অশরীরী। কেবল ঘরজুড়ে এক জাতের অাঁশটে গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে হাওয়ায়।

সেই রাতে, ঘুমের মধ্যে আরো অনেক এলোমেলো স্বপ্ন দেখে শিবকুমার।

রাত পোহাতেই একদৌড়ে হৃদয়নাথের ডেরায় চলে গিয়েছিল শিবকুমার। বারান্দা দিয়ে যাবার বেলায় কালো কুচকুচে সিন্দুকটাকে সন্তর্পণে পেরিয়ে গিয়ে সটান ঢুকে পড়েছিল হৃদয়নাথের ঘরে।

কিন্তু ওই মুহূর্তে ঘরে ছিল না হৃদয়নাথ। বারান্দার এক্কেবারে শেষপ্রান্তে চামচিকের মতো কুঁজোপনা বসে একমনে কুটনো কুটছিল সে। পরনে একটা চেক-চেক লুঙ্গি। ছিপছিপে খাঁচাসার উদোম শরীরটা মাটির দিকে কুঁজো হয়ে ঝুঁকে পড়েছিল। বাস্তবিক, ওই মুহূর্তে একটা প্রমাণ সাইজের চামচিকের মতোই লাগছিল হৃদয়নাথকে।

দুমদাম পা ফেলে ওর পাশটিতে গিয়ে দাঁড়ায় শিবকুমার। সরাসরি বলে ওঠে, সিন্দুকটা খুলে ওর ভেতরের বীরটাকে দেখাবে একটুখানি?

বেশ মগ্ন হয়ে কুটনো কুটছিল হৃদয়নাথ। শিবকুমারের কথায় চমকে মুখ তোলে। পলকের তরে ধক্ করে ওঠে চোখদুটি। বঁটির গায়ে হাত দুটি আপসেই থেমে যায়। একেবারে স্থিরপলকে শিবকুমারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে হৃদয়নাথ। তাকিয়েই থাকে। হৃদয়নাথের ওই দৃষ্টির সমুখে অস্বস্তি বোধ করে শিবকুমার।

একসময় ধীরে ধীরে বদলে যায় হৃদয়নাথের চোখদুটো। মাখনের মতো নরম হয়ে আসে দৃষ্টি। মৃদু হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলে, এখন কী করে খুলব খোকাবাবু, এখন তো ও ঘুমোচ্ছে।

– তাতে কি? শিবকুমার সবজান্তার ভাব করে, ঘুম ভাঙলেই ও খেতে চাইবে তো? ওই নিয়ে ভেবো না। গোমস্তা-কাকাকে বলে ওর খাবারের বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি।

– কথাটা ওখানে নয় খোকাবাবু। হৃদয়নাথ কণ্ঠস্বরটিকে আরো মোলায়েম করে তোলে, দত্যিদানোদের কাঁচা ঘুম ভাঙাতে নাই। অনর্থ হয় তাতে। বলতে বলতে শিবকুমারের মুখের দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় হৃদয়নাথ। সারামুখের রেখায় উথলে ওঠে প্রশংসা। গদগদ গলায় বলে, আপনি তো বিদ্বান মনিষ্যি খোকাবাবু, জানেনই তো, স্বাভাবিক নিদ্রাভঙ্গে অপরাজেয় ছিল কুম্ভকর্ণ। কিন্তু রাবণের আর তর সইছিল না। রাম-লক্ষ্মণের দাপটে তার বাহিনীর সেরা-সেরা যোদ্ধারা মারা পড়েছে। গোটা লঙ্কাপুরী জুড়ে কান্নার রোল উঠেছে। কাজেই, বাধ্য হয়ে কুম্ভকর্ণের কাঁচা ঘুম ভাঙাতে হয়েছিল রাবণকে।

বলতে বলতে নিপাট ভালোমানুষের মতো মুখ করে শিবকুমারের দিকে তাকায় হৃদয়নাথ। মিষ্টি হেসে বলে, এতক্ষণে বুঝলেন তো, স্রেফ কাঁচাঘুম থেকে জাগানোর জন্যই কুম্ভকর্ণ মরছিল।

বলতে বলতে শিবকুমারকে আরেক প্রস্থ মিষ্টি হাসি উপহার দেয় হৃদয়নাথ। বলে, যান, অন্দরমহলে গিয়ে পড়াশুনা করুন। বলতে বলতে কণ্ঠস্বর বেমালুম বদলে যেতে থাকে তার। চাপা গলায় বলে, সইন্ধাব্যালায় অর ঘুম ভাঙব, তখন আসেন, দেখামু।

সেদিন সারাটা দিনমান কী এক অসহ্য অস্থিরতায় কাটে শিবকুমারের।

দুপুর নাগাদ গড়ের অন্দরমহল থেকে ডাক পড়েছিল হৃদয়নাথের। একসময় সসংকোচে অন্দরমহলের মুখটাতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে। দরজার মুখটা চিক দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল অন্দরমহলের খাস দাসী ননীবালা। একসময় চিকের ও-প্রান্তে এসে হাজির হয়েছিলেন শিবকুমারের মা কাত্যায়নী। হৃদয়নাথ সসম্ভ্রমে প্রণাম জানিয়েছিল গড়ের কর্ত্রীকে।

একসময় কাত্যায়নী মৃদু গলায় বলেন, একটা গুরুতর কারণে তোমায় ডেকেছি জাদুকর।

হৃদয়নাথ গদগদ কণ্ঠে বলে ওঠে, আদেশ করুন মা-জননী।

কাত্যায়নী বিষণ্ণ কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলেটা বড়ই জাদু-পাগল। তুমি হয়তো-বা শুনেছ, এ-বংশে এককালে আর একজন জাদু-পাগল ছিল।

– শুনেছি মা-জননী।

– ছোঁয়াচে রোগটা আমার শিবকুমারের মনেও চারিয়েছে। একটু থেমে কাত্যায়নী বলেন, তোমার আশেপাশে তো সমানে ঘুরঘুর করছে। দেখো, যেন ওই করে ওর মগজের মধ্যেকার পোকাটা আরো চাগিয়ে না ওঠে। বলতে বলতে গলা কেমন জানি কেঁপে কেঁপে ওঠে কাত্যায়নীর।

চিকের এ-প্রান্তে দুরুদুরু বুকে দাঁড়িয়েছিল হৃদয়নাথ। কাত্যায়নীর কথার জবাবে  তার শীর্ণকায় কুঁজোপনা শরীরটা আরো নুয়ে আসে বুঝি।

কাঁপা-কাঁপা গলায় বলে, ওই নিয়ে আপনি একটুও ভাববেন না মা-জননী। আমার দিক থেকে খোকাবাবুর তিলমাত্র ক্ষতি হবে না।

হৃদয়নাথের কথায় কাত্যায়নীর মনটা কিঞ্চিৎ শান্ত হয় বুঝি। নরম গলায় বলেন, খোকার মনটা যেন সারাক্ষণ উড়ুউড়ু। বাইরেটা সারাক্ষণ যেন টানছে ওকে। এমন একটা কিছু বানিয়ে দিতে পারো, যা ধারণ করলে ওর উড়ুউড়ু মনটা শান্ত হবে?

একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে হৃদয়নাথ। একসময় বলে, ভাববেন না মা-জননী, এমন একটা মহাশান্তি কবচ বানিয়ে দেব, খোকাবাবুর মনটা একেবারে দিঘির জলের মতো শান্ত হয়ে যাবে।

– গড়  ছাড়বার আগে ওটা যেন দিয়ে যাবে আমায়। কাত্যায়নী খুব তৃপ্ত কণ্ঠে বলেন। এতক্ষণে বুঝি হালকা লাগছে নিজেকে।… আর একটা কথা। এসব যেন শিবকুমার জানতে না পারে। ভয়ানক জেদি আর অভিমানী ও। ওকে ঠেকানোর চেষ্টা হচ্ছে, জানতে পারলে, আরো জেদি হয়ে উঠবে।

বলতে বলতে কাত্যায়নীর মুখখানি পাথরের মতো শক্ত হয়ে আসে। প্রায় হুকুম দেবার ঢঙে বলেন, দেখো, কেবল খোকাই নয়, একথা যেন কাকপক্ষীতেও জানতে না পারে। তাহলে কিন্তু বিপদে পড়ে যাবে তুমি। মনে রেখো, খোকা যদি এই কারণে বিগড়ে যায়, এই গড়ের কেউই ক্ষমা করবে না তোমায়।

একসময় চিকের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যান কাত্যায়নী। হৃদয়নাথ সারামুখে একরাশ দুর্ভাবনা জমিয়ে ফিরে আসে নিজের ঘরে।

নিজের শোবার ঘরে বিছানায় শুয়ে ছিল শিবকুমার। হৃদয়নাথ কখন এলো, মায়ের সঙ্গে তার কী কথা হলো, কিছুই অজানা রইল না ওর। বিকেল নাগাদ পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টটা ধমক দিয়ে জেনে নিল ননীবালার কাছ থেকে।

একসময় বিকেল গড়িয়ে আসে। পাঁচবিবির গড়ের পাঁচিলঘেরা বিশাল উঠোনের তিনপ্রান্তে টানা বারান্দার থাম-পিলপাগুলোর  শরীর থেকে দ্রুত মুছে যাচ্ছে আলো। থামগুলো শরীরের কারুকার্যের খাঁজে ভাঁজে অাঁধারের হালকা ছোপ পড়তে শুরু করেছে।

দিনভর কী এক অস্থিরতায় কেটেছে শিবকুমারের। পড়ন্ত বিকেলে সে দ্রুত পায়ে রওনা দেয় সদরমহলের দিকে।

কিন্তু হৃদয়নাথের কাছে গিয়ে কথাটা পাড়বে কি, ততক্ষণে তো পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। তখনো আবছা নেমে এসেছে গড়ের টানা বারান্দায়। লম্বা লম্বা পা ফেলে পূর্বদিকের বারান্দার কাছাকাছি পৌঁছে যায় শিবকুমার। হৃদয়নাথের ঘরের সামনে রাখা সিন্দুকের কাছটিতে গিয়ে মুহূর্তের তরে থামে। দম আটকে দাঁড়িয়ে থাকে অল্পক্ষণ। মুহূর্তের তরে তার মনে হয়, সিন্দুকের ভেতর থেকে ভেসে আসছে ভারী নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।

দ্রুতপায়ে জায়গাটা পেরিয়ে যায় শিবকুমার। হৃদয়নাথের ঘরে পৌঁছে দেখে, ঘরে নেই হৃদয়নাথ। দলের অন্য চেলাদের নিয়ে ভুজঙ্গভূষণ ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে জাদুর সরঞ্জামগুলোকে একে একে সাজিয়ে রাখছে ঘরের মেঝেতে।

খুব বীরদর্পে শিবকুমার শুধোয়, জাদুকর কোথায়? তার জবাবে ভুজঙ্গভূষণ ইঙ্গিতে মঞ্চের পেছনটা দেখিয়ে দেয়।

হৃদয়নাথদের জন্য বরাদ্দ যে-ঘরদুটি, তার ঠিক সামনেই বানানো হয়েছে জাদুর মঞ্চ। মঞ্চের পেছন আর উঁচু বারান্দার মধ্যিখানে একফালি লম্বাটে গলিমতো। ওই গলির নিরিবিলিতে পৌঁছে শিবকুমার দেখতে পায়, আসন্ন সন্ধ্যার আলো-অাঁধারিতে জ্বলন্ত হোমাগ্নির সামনে বসে রয়েছে, হৃদয়নাথের কলেবরে একজন পুরোপুরি অন্য মানুষ।

খোলা আকাশের তলায় বসে একমনে দেবী চামুন্ডার পুজো করছে রক্তাম্বর পরিহিত মানুষটি।

চামচিকের মতো কুঁজোপনা শরীরটা ওই মুহূর্তে একখন্ড পোক্ত লাঠির মতো ঋজু হয়ে আকাশের দিকে উঠে গিয়েছে।

ওর সামনে কাঁচা শালকাঠের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। আগুনের লাল আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সারামুখমন্ডল। হাতে রয়েছে নরমুন্ডের করোটি-ভর্তি উগ্র মদ। উচ্চৈঃস্বরে মন্ত্র জপ করতে করতে জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে মুহুর্মুহু মদ ঢালছে হৃদয়নাথ। লেলিহান আগুনের আভায় তার মুখমন্ডলটিকে আগের চেয়ে ঢের বেশি শানিত লাগছে শিবকুমারের।

একসময় সে মন্ত্রপূত সিঁদুর দিয়ে লম্বা করে তিলক এঁকে নেয় কপালে। তারপর দেবীর কাছে উৎসর্গ করা কারণবারির অবশিষ্টটুকু প্রসাদজ্ঞানে পান করতে থাকে শিবকুমারের সামনেই।

দেবীর কারণ-প্রসাদ পান করতে করতে, শিবকুমারের চোখের সমুখে একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল হৃদয়নাথ। দেখতে দেখতে তার ভাঙা ভাঙা চোয়াল দুটো আরো প্রকট হয়ে ওঠে। সারা মুখমন্ডলে একজাতের গরিমা তৈরি হয়। আর কাকের মতো চোখ দুটি একজোড়া শানিত ছোরার মতো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।

একসময় আসন ছাড়ে হৃদয়নাথ। শিবকুমারের দিকে তিলমাত্র দৃকপাত না করে পায়ে পায়ে রওনা দেয় নিজের ঘরের দিকে। ওই মুহূর্তে হৃদয়নাথের সামনেটিতে গিয়ে ওকে কিছু বলে, কিংবা সকালের প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তেমন সাহস ডাকাবুকো শিবকুমারেরও হয় না। হৃদয়নাথ চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে নন্দু নামের চেলাটি তৎক্ষণাৎ পূজার উপকরণগুলো গুছিয়ে তুলে নিয়ে যায়। অগ্নিকুন্ডে জল ঢেলে দেয়।

ঘরের মধ্যে ঢুকে মেঝের ওপর পদ্মাসনে বসে হৃদয়নাথ। প্রসাধনের ছোট্ট বাক্সটি টেনে নেয় কাছে।

তারপর পরিপাটি করে রং মাখতে থাকে মুখে। দুচোখে গাঢ় করে কাজলের রেখা অাঁকে। কানে পরে কুন্ডল। প্রসাধন শেষ করে, প্রশস্ত ললাটের প্রসাদী-তিলকটিকে সিঁদুরের মন্ড দিয়ে আরো গাঢ় করে এঁকে নেয়। তারপর… গায়ে জমকালো পোশাক চড়িয়ে, পায়ে রুপোলি নাগরা পরে, মাথায় শিখিপাখাযুক্ত রাজকীয় পাগড়িটি চড়িয়ে যখন তৈরি হয় হৃদয়নাথ, শিবকুমার অবাক বিস্ময়ে দেখে, তার চোখের সমুখে এক্কেবারে অন্য এক দীপ্যমান পুরুষ। বাস্তবিক, এই মুহূর্তে একেবারেই বদলে গিয়েছে মানুষটি। ওর অস্থিচর্মসার কেঠো অবয়ব ফাটিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে এক জ্যোতির্ময় পুরুষ। প্রখর দুটি চোখের তারা থেকে ঘনঘন ঠিকরে বেরোচ্ছে বিদ্যুৎ। আর, টানটান প্রশস্ত ললাটজুড়ে এক জাতের জ্যোতির আভাস।

কেবল শরীরী ভাষাই নয়, শিবকুমার লক্ষ করে, হৃদয়নাথের কণ্ঠস্বরও বেমালুম বদলে গিয়েছে।

মেয়েদের মতো মিনমিনে কণ্ঠস্বরটি এই মুহূর্তে গভীর ও গম্ভীর হয়ে উঠেছে। আর ওই কণ্ঠস্বর এতটাই কর্তৃত্বব্যঞ্জক যে, শিবকুমারের মনে হয়, তার বাবা, এই গড়ের রাশভারী জমিদার জ্যোতিকুমারও বুঝি অগ্রাহ্য করতে পারবেন না তা।

বাস্তবিক, সব মিলিয়ে ওই মুহূর্তে লোকটাকে ইতিহাসের বইতে ছাপা মারাঠা কুলতিলক ছত্রপতি শিবাজীর ছবির মতোই লাগছিল।

লোকটাকে দেখতে দেখতে শিবকুমারের মনে তিলমাত্র সংশয় থাকে না, এই মুহূর্তে যে-মানুষটা জমকালো পোশাক পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওর সামনে, সে আর যা-ই হোক, হৃদয়নাথ নয়। হৃদয়নাথের আটপৌরে খাঁচাসার শরীরটাকে আধার করে এই মুহূর্তে অন্য কারো অধিষ্ঠান ঘটেছে নির্ঘাত।

ভাবতে ভাবতে সহসা নিদারুণ চমক খায় শিবকুমার, কিনা, এই মুহূর্তে হৃদয়নাথের পোষা বীরটাই ওর ওপর ভর করে নেই তো! কে জানে – কে জানে।

কাজেই সিন্দুক খোলার কথাটা উত্থাপন করা তো দূরের কথা, শিবকুমার ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে ওই জ্যোতির্ময় পুরুষটির দিকে।

ঠিক সেই মুহূর্তে শিবকুমারের মুখের দিকে একঝলক তাকায় হৃদয়নাথ। পরমুহূর্তে সরিয়ে নেয় দৃষ্টি। এবং শিবকুমারের কোনো সন্দেহই থাকে না, ওঁকে চিনতেই পারল না হৃদয়নাথ।

আর, ওই দৃষ্টিতে এমন-কিছু ছিল, শিবকুমারের সারা শরীর শিরশিরিয়ে ওঠে।

একসময় হৃদয়নাথের প্রধান চেলা ভুজঙ্গভূষণ চাপা গলায় বলে ওঠে, এখানে আর থাকবেন না খোকাবাবু। এই মুহূর্তে জাদুকর আর নিজের মধ্যে নেই। যা বলবার, কাল সকালে বলবেন।

অন্য সময় হলে জমিদার-নন্দন শিবকুমার এক ধমকে থামিয়ে দিত ভুজঙ্গকে। কিন্তু ওই মুহূর্তে ভুজঙ্গর গলার স্বরে এমন কিছু ছিল, শিবকুমার আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস পায় না। পায়ে পায়ে চলে আসে মঞ্চের সামনে।

গোটা উঠোনজুড়ে ততক্ষণে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। গড়ের মানুষজন ছাড়াও আমন্ত্রিত বিশিষ্টজনে থইথই করছে উঠোন। একটু বাদেই শুরু হবে শো।

মনের যাবতীয় কৌতূহল তখনকার মতো চেপে রেখে শিবকুমার আসরের একেবারে সামনের সারিতে গিয়ে বসে পড়ে।

 

 

পাঁচ

কালো পর্দা দিয়ে ঢাকা রয়েছে পুরো মঞ্চ। পর্দার মধ্যিখানে আঁকা রয়েছে একটি সাদা রঙের মড়ার খুলি ও তার তলায় আড়াআড়ি দুটি হাড়। মড়ার খুলির চোখদুটো যেন নিষ্ঠুর জিঘাংসা নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে দর্শকদের দিকে।

একসময় সকলের চোখের সামনে মঞ্চের পর্দা সরে যায়। আলোকিত মঞ্চের ঝিমকালো ব্যাকসিনের মধ্যিখানে অনুরূপভাবে অাঁকা একটি মড়ার খুলি ও তার তলায় আড়াআড়ি একজোড়া হাড়। কালো রঙের পর্দার ওপর একেবারে প্রকট হয়ে ফুটে রয়েছে।              বাস্তবিক, নরমুন্ডটা যেন গিলতে চাইছে সবাইকে।

মঞ্চের মধ্যিখানে একটি কাঠের টেবিল। ওই টেবিলের ওপর ভুজঙ্গভূষণ আগে থেকেই সাজিয়ে রেখেছে একটা রং-বেরঙের ফুলের তোড়া। সারা মঞ্চজুড়ে এক ধরনের ভুতুড়ে পরিবেশ।

পর্দা ওঠার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মঞ্চে ঢোকে হৃদয়নাথ। কিন্তু এমনই জমকালো আর রাজকীয় সেই প্রবেশ, এমনই জৌলুসময় আর নাটকীয়, শিবকুমারের মনে হয় আলো-ঝলমল মঞ্চে বুঝি সহসা আবির্ভাব ঘটল এক জ্যোতির্ময় রাজপুরুষের। বাস্তবিক, হৃদয়নাথের মঞ্চে ঢোকাটাকে আবির্ভাব ছাড়া অন্য কোনো অভিধায়ই ভূষিত করতে পারে না কিশোর শিবকুমার। আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে যেন গোটা মঞ্চটা আলোয় ভরে গেল।

মঞ্চে উঠেই হৃদয়নাথ ফুলের তোড়াটাকে ডানহাতে তুলে নিয়ে সজোরে ছুড়ে দেয় শূন্যে। সকলের চোখের সামনে তোড়াটা শূন্যেই মিলিয়ে যায়, আর, সেই ফাঁকে শূন্য থেকেই তার ডানহাতে এসে যায় একটি জাদুদন্ড। জাদুদন্ডটাকে বারকয় হাওয়ায় ঘুরিয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে মাখা নুইয়ে পরপর তিনবার অভিবাদন জানায় হৃদয়নাথ। আর, তৎক্ষণাৎ সারা আসর করতালিতে ফেটে পড়ে।

ফুলের তোড়াটা কেমন করে অদৃশ্য হয়ে গেল, জাদুদন্ডটাই বা কেমন করে শূন্য থেকে চলে এলো হৃদয়নাথের হাতে, তাই নিয়ে যখন গোটা আসর বিস্মিত আলোচনায় মেতেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে হৃদয়নাথ জাদুদন্ডটিকে হাওয়ায় ঘোরাতে লাগল। বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে একসময় একটা লালরঙের রুমালে পরিণত হলো ওটা। লাল রুমালটিকে পুনরায় বনবন করে ঘোরাতে থাকে হৃদয়নাথ। একটু বাদে প্রথমে তা নীল এবং পরমুহূর্তে ধবধবে সাদা হয়ে যায়।

সাদা রুমালটিকে পুঁটলি বানিয়ে হাতের তেলোর মধ্যে ঘষতে থাকে হৃদয়নাথ। একসময় মুঠোর ভেতর থেকে যখন টেনে বের করে আনে রুমালটি, যখন মেলে ধরে শূন্যে, সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখে, রুমাল নয়, ওটা তখন ইংল্যান্ডের জাতীয় পতাকা, একটি আস্তো ইউনিয়ন-জ্যাক।

একটা লাঠির ডগায় পতাকাটিকে বেঁধে নিয়ে বারকয় হাওয়ায় দোলায় হৃদয়নাথ। ওই মুহূর্তে তার সারামুখে উপচে পড়ে বিশ্বজয়ীর হাসি।

একসময় পতাকাসহ লাঠিটাকে পেছনের কালো পর্দার গায়ে সেঁটে দেয় হৃদয়নাথ। মাথার খুলির পাশটিতে পতপতিয়ে উড়তে থাকে পতাকাটি।

পাঁচবিবির গড়ের জমিদাররা চিরকালই ব্রিটিশ-ভক্ত হিসেবে পরিচিত। সেই শ্রুতিকুমারের আমল থেকেই ওই গড়ে ব্রিটিশ রাজপুরুষদের আনাগোনা। সারা পুববাংলাজুড়ে স্বদেশি আন্দোলন ঠেকাতে যেসব জমিদার ব্রিটিশ শাসকদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদের মধ্যে পাঁচবিবির জমিদারদের স্থান সর্বাগ্রে। চতুর হৃদয়নাথ সেটা জানে বলেই বোধ করি আসরের প্রথম খেলাটাকে এভাবেই সাজিয়েছে।

ব্রিটিশ-ভক্তদের সমুখে ইউনিয়ন-জ্যাকের বন্দনা দিয়ে শুরু করলে যে শুরুতেই আসর মাত, সেটা বিলক্ষণ জানে ধুরন্ধর লোকটা।

কাজেই, খেলাটা শেষ হওয়ামাত্রই গোটা উঠোন তুমুল করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। তার জবাবে মাথাটাকে ঈষৎ নুইয়ে অভিবাদন জানায় হৃদয়নাথ। সামান্য একটা খেলায় করতালির বহর দেখে তিলমাত্র বিস্মিত নয় সে। কেন কি, এমনটাই যে ঘটবে, এই গড়ে এই খেলা দেখাবার পর, এমনটাই যে প্রত্যাশিত, সেটা বুঝি ভালোভাবেই জানত ধুরন্ধর লোকটা।

খেলাটি দেখে জ্যোতিকুমার ও রতিকুমার তো স্পষ্টতই রোমাঞ্চিত বোধ করেন, কিনা, ইস্, ঢাকার ডগলাস সাহেবকে যদি দেখানো যেত আজকের খেলাটা। যুগপৎ পাঁচবিবির চৌধুরী পরিবার ও জাদুকর হৃদয়নাথ, দুপক্ষেরই বরাত খুলে যেত তবে।

খেলাটা তো ভালো লেগেছেই, কিন্তু নবকলেবর হৃদয়নাথকে দেখতে দেখতে শিবকুমার তার চেয়েও ঢের বেশি রোমাঞ্চিত বোধ করছিল। বাস্তবিক, মঞ্চে পদচারণারত হৃদয়নাথকে দেখতে দেখতে শিবকুমারের বুকের মধ্যেকার ঘোরটা যেন কাটছিল না কিছুতেই। চিমসেমতো যে-লোকটা  গতকাল সকালে উঠোনের এককোণে বসে মাছের অাঁশ ছাড়াচ্ছিল, কিংবা আজ সকালে বারান্দার এক প্রান্তে বসে নিপুণ হাতে কুটনো কাটছিল, ওই মুহূর্তে যাকে একটা দশাসই চামচিকের মতো লাগছিল, সেই লোকটাই যে এই মুহূর্তে কয়েকশো মানুষের সামনে রাজাধিরাজের মতো স্বমহিমায় বিরাজ করছে, এটা যেন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না তার। সত্যি কথা বলতে কী, এই যে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে ষোলো আনা বদলে ফেলা, চিমসেপনা আনাজ-কুটনি থেকে চোখের পলকে ছত্রপতি শিবাজী, এটাকেই হৃদয়নাথের দেখানো সবচেয়ে অবিশ্বাস্য জাদু বলে মনে হয় শিবকুমারের।

ততক্ষণে অন্য জাদুতে চলে গেছে হৃদয়নাথ। পরিবেশটাকে কিঞ্চিৎ হালকা করতে একটা মজাদার খেলা শুরু করেছে সে। হাতের জাদুদন্ডটি দিয়ে শূন্য থেকে পটাপট টাকা ধরছে আর একটা কৌটোর মধ্যে ঝনাৎ করে ফেলে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে কৌটোটাকে ঝাঁকিয়ে পরখ করছে, কতগুলো টাকা জমল কৌটোয়। ওই ঝনঝনানির আওয়াজেই দর্শক বুঝে ফেলছে, অনেক টাকা জমেছে ওতে।

কেবল শূন্য থেকেই নয়, জাদুটাকে আরো মজাদার করে তোলার জন্য আসর থেকে বাচ্চাদের এক এক ডাকছে সে, ওদের নাকে, কানে, এমনকি পশ্চাদদেশেও জাদুদন্ড ঠেকিয়ে বের করে আনছে টাকা।

দর্শকরা হেসে কুটিপাটি। খেলাটা জমে উঠেছে।

মজার খেলাটি শেষ করে একসময় হৃদয়নাথ বেশ গুরুগম্ভীর  কণ্ঠে শুরু করে বক্তৃতা : ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহোদয়াগণ, আজ আমি আপনাদের এমন একটি জাদু দেখাব, যা এদেশে আর কোনো জাদুকরই দেখাতে পারে না। কারণ, এটা কোনো কৌশল বা হাতসাফাইয়ের খেলা নয়। এটা আমি কামরূপ-কামাখ্যার এক সিদ্ধপুরুষের কাছ থেকে অনেক সাধ্যসাধনায় সংগ্রহ করেছি। সেই সিদ্ধপুরুষটি যখন হিমালয়ে তপস্যা করতেন, তখন বিনা উপকরণে, কেবল ঐশ্বরিক শক্তির দ্বারা অন্ন রন্ধন করে তাঁর ইষ্টদেবতাকে ভোগ দিতেন। আমি দীর্ঘ পাঁচ বছর ওই সিদ্ধপুরুষের পায়ের তলায় বসে সেই  বিদ্যা আয়ত্ত করেছি। আজ আপনাদের তার একটি নমুনামাত্র দেখাব। আমি জাদুবলে একটা খালি তাওয়ায় বিনা উপকরণে পিঠে ভাজব।

হৃদয়নাথের বক্তৃতার মধ্যেই ওর সহকারীরা টেবিলের ওপর একটা খালি তাওয়া রেখে যায়।

একসময় হৃদয়নাথ শুরু করে দ্বিতীয় কিস্তির বক্তৃতা : ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহোদয়াগণ, আপনাদের সামনে যে-তাওয়াটি এইমাত্র আমার সহকারীরা রেখে গেল, তাতে কোনো কৌশল নেই। আমি আজই এই গড়ের গিন্নিমার কাছ থেকে ওটা চেয়ে এনেছি। চিকের আড়ালে গিন্নিমা বসে বসে আমার কথা শুনছেন, যদি মিথ্যে বলি, তবে তিনিই তা জানিয়ে দেবেন। বলতে বলতে হৃদয়নাথ টেবিলের ওপর তাওয়াটিকে তেমনভাবে বসায়, যেমন করে উনুনের ওপর তাওয়া চাপায় লোকে।

ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহোদয়াগণ, আপনাদের চোখের সামনেই একটি খালি তাওয়া রয়েছে। এই তাওয়ায় আমি এক্ষুনি জাদুবলে পিঠে ভাজব।

বলতে বলতে হৃদয়নাথ তার লম্বা জাদুদন্ডটিকে মাথার ওপর তুলে ধরে বিড়বিড় করে বেশ কিছুক্ষণ মন্ত্র পড়তে থাকে। অবশেষে জাদুদন্ডটিকে ঠিক খুন্তির মতো বাগিয়ে ধরে তরকারি নাড়ানোর মতো করে তাওয়াময় ঘষতে থাকে।  আর, চোখের সামনে তাওয়ার ওপর একতাল পিটুলির মন্ড জমতে জমতে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে থাকে তাওয়াময়। মন্ডগুলো একটু একটু করে জমাট বাঁধতে বাঁধতে এক সময় সারা তাওয়াজুড়ে তৈরি হয়ে যায় একটি মাঝারি আকারের সরু চাকলি পিঠে।

পিঠেটি যখন পুরোপুরি ভাজা হয়ে গেল। হৃদয়নাথ তাওয়াটাকে টেবিল থেকে তুলে এনে মেলে ধরল দর্শকদের দিকে। তারপর শুরু করল পরের কিস্তির বক্তৃতা।

ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহোদয়াগণ, আপনাদের চোখের সামনে এইমাত্র কোনো উপকরণ ছাড়াই আমি পিঠে ভেজে দেখালাম। এখন আপনাদের ভেতর থেকে দু-চারজনকে পিঠেটি খেয়ে দেখবার জন্য আহবান জানাচ্ছি। নিশ্চিত করে বলতে পারি, এই পিঠেটি শুদ্ধ আতপ চালের মন্ড দিয়েই তৈরি করা হয়েছে। কাজেই, যে-কেউ এটা নিঃসংশয়ে খেতে পারেন।

দর্শকদের মধ্যে থেকে কয়েকজন মঞ্চে যেতেই হৃদয়নাথ পিঠেটিকে টুকরো টুকরো করে ওদের মধ্যে ভাগ করে দিলো। একটুখানি ইতস্তত করে ওরা পিঠের টুকরোগুলো খেল। এবং আকারে-ইঙ্গিতে জানিয়ে দিলো, মন্দ হয়নি খেতে।

ততক্ষণে হৃদয়নাথ শুরু করেছে তার চতুর্থ কিস্তির বক্তৃতা।

ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলাগণ, আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন, বিনা উপকরণে যদি এভাবে খাবার তৈরি করা যায়, তবে আমি মন্ত্রটা কেন দেশের সমস্ত গরিব অভুক্ত মানুষদের শিখিয়ে দিচ্ছি না? তাহলে তো দেশের খাদ্যসমস্যা বলে আর কিছুই থাকে না। আপনারা ঠিকই ভেবেছেন। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে গুরুর সেবা করে আমি যে-বিদ্যাটা অর্জন করেছি, সেটা তো রাতারাতি কাউকে শেখানো যাবে না। অত সহজে রপ্তই করতে পারবে না কেউ। আপনাদের মধ্যে কেউ যদি আমার কাছে পাঁচ বছর থেকে তা রপ্ত করতে রাজি থাকেন, যদি ওই ক্ষমতা লাভের জন্য যথাযথ নিয়ম পালন করতে রাজি থাকেন, যদি মাঘ মাসের রাতে পুকুরে শরীর ডুবিয়ে সারারাত বসে থাকতে কিংবা কাঠফাটা গ্রীষ্মের বালির ওপর সারাদিন শুয়ে থাকতে রাজি থাকেন, তবে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি আমার গুরুর অনুমতি নিয়ে এই বিদ্যেটা তাঁকে শিখিয়ে দেব।

পুরো খেলাটা দেখে ওই বয়েসে একেবারে তাক লেগে যায় শিবকুমারের। এরপর একে একে উড়ন্ত তাস, ঢাকনার মধ্যে ভুতুড়ে বোতলের স্থান পরিবর্তন, জগের সবটুকু দুধ কাগজের ঠোঙায় ঢেলে দিয়ে অবশেষে অদৃশ্য করে দেওয়া গোছের প্রচলিত খেলাগুলো ছাড়াও হৃদয়নাথ দেখায় আরো কয়েকটি শক্ত শক্ত খেলা। ভৃগুরাম নামে দলেরই এক সহকারীকে কেবলমাত্র একটি দন্ডের ওপর ভর করে শূন্যে ভাসিয়ে রাখে অনেকক্ষণ। নন্দু নামে এক কমবয়েসি সহকারীর গলায় এফোঁড়-ওফোঁড় করে ঢুকিয়ে দেয় ছোরা। গলাগলিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে সমানে। সকলের সামনে প্রাণতোষ নামে একজন সহকারীর জিভখানা কেটে ফেলে। কাটা জিভের থেকে অঝোরে রক্ত ঝরতে থাকে।

বাস্তবিক, সারা সন্ধ্যায় প্রায় দুঘণ্টা ধরে এমন কিছু জাদু দেখায় হৃদয়নাথ, যা দেখে শিবকুমারের মনে হয় কেবল হাতসাফাইয়ের দ্বারা নয়, আরো কোনো অলৌকিক শক্তি অলক্ষে ক্রিয়া করেছে নির্ঘাত।

আর, গোটা মঞ্চজুড়ে হৃদয়নাথের শরীরের ছায়া হিসেবে কালোপনা যে সচল মূর্তিটি ওর পেছন পেছন ঘুরছিল সারাক্ষণ, মূর্তিটার আচরণ কখনো কখনো বেশ অস্বাভাবিক ঠেকছিল শিবকুমারের চোখে। শিবকুমার লক্ষ করছিল, ছায়াটা কখনো লম্বায় বেশ বেড়ে যাচ্ছিল, এমনকি মঞ্চের সীমানা অতিক্রম করে তা বেরিয়ে যাচ্ছিল বাইরে, কখনো-বা হয়ে উঠছিল অতিশয় খর্বকায়। কখনো-বা এতটাই হ্রস্ব যে, যে-কারো মনে হতে পারে, কোনো ছায়াই নেই হৃদয়নাথের শরীরে। আর, শিবকুমার তো ওই বয়েসে জেনে গিয়েছে, কোনো স্বাভাবিক জীবন্ত মানুষ ছায়াহীন হতে পারে না। দেখতে দেখতে শিবকুমারের মনের মধ্যে ধন্ধটা বেড়ে যায়, কিনা, যে-মুহূর্তে হৃদয়নাথ ছায়াহীন হয়ে যাচ্ছে, ওই মুহূর্তে কি অন্য কেউ, অন্য কিছু পুরোপুরি ভর করছে ওর শরীরে।

শোয়ের শেষে ধন্য ধন্য করছিল সবাই। একধরনের ঘোরের মধ্যে ছিল শিবকুমারও। কিন্তু তাও এক জাতের অতৃপ্তিবোধে কেমন জানি বঞ্চিত লাগছিল নিজেকে। এত আশা নিয়ে এসেছিল, কিন্তু ওর পোষা ‘বীর’টাকে প্রত্যক্ষ করবার আশাটুকু মিটল না। অথচ হৃদয়নাথ ওকে কথা দিয়েছিল, সন্ধে হলেই সে সিন্দুকটা খুলে ভেতরের প্রাণীটিকে দেখাবে আজ।

শোয়ের পর সবাই যখন ফিরে যাচ্ছে যে-যার ঘরে, অন্দরমহলের বদলে শিবকুমার সটান চলে যায় হৃদয়নাথের ঘরের দিকে।

বারান্দায় নিকষ অন্ধকারের মধ্যে কালোপনা সিন্দুকটা একখন্ড কালো প্রাগৈতিহাসিক পাথরের মতো শুয়ে রয়েছে। শিবকুমার কল্পনা করে, ওই সিন্দুকের মধ্যে হৃদয়নাথের পোষা ‘বীর’টা এই মুহূর্তে শুয়ে শুয়ে গাঢ় ঘুমে অচেতন।

সিন্দুকটার সংস্পর্শ থেকে পায়ে পায়ে সরে আসে শিবকুমার। হৃদয়নাথের ঘরের দরজার মুখটিতে গিয়ে দাঁড়ায়। উঁকি মেরে দেখতে থাকে ভেতরটা।

ঘরের ভেতর ভুজঙ্গভূষণের নেতৃত্বে হৃদয়নাথের সহকারীরা তখন পুরোদমে গোছাচ্ছে সবকিছু। একটু আগে যে-ছোরাটি নন্দুর গলায় এফোঁড়-ওফোঁড় বিঁধে ছিল, স্বয়ং নন্দুই ন্যাকড়া দিয়ে ঘষে ঘষে সাফ করছে ওই ছোরাটা। আর, পাশটিতে বসে কলকলিয়ে কথা বলে চলেছে জিহবাহীন প্রাণতোষ, কিনা, আজ খেসারির ডাইলটা এমন পাক করসি না, হক্কলরে পাত চাইট্যা খাইতে হোইবো। তার মানে, শিবকুমার বুঝে ফেলে প্রাণতোষ  নামের ছোকরাটা দলের রাঁধুনিও বটে!

ততক্ষণে গায়ের জমকালো পোশাক খুলে ফেলেছে হৃদয়নাথ। তার বদলে পরে নিয়েছে চেককাটা লুঙ্গিটা। মুখের থেকে ঘষে ঘষে তুলে ফেলছে রং। আর, যতই মুছে যাচ্ছে মুখের যাবতীয় প্রসাধন, ততই আগের সেই সাধারণ, আটপৌরে হৃদয়নাথ একটু একটু করে প্রকট হচ্ছে। একসময় হৃদয়নাথের শরীর থেকে যাবতীয় গরিমা খসে পড়ে। শিবকুমারের চোখের সমুখে, পুনরায় সেই চিমসে মানুষটি, বিনয়ে, বার্ধক্যে, নুয়ে-পড়া সেই পুরনো কুঁজোপনা শরীর। তেমনি মিনমিনে মেয়েলি কণ্ঠস্বর। শিবকুমারের কোনো সন্দেহই থাকে না, ওই মুহূর্তে গড়ের ভৃত্য প্রহ্লাদ এসে পড়লে লোকটা নির্ঘাত ওর কাছে অকিঞ্চিৎকর কোনো জিনিসের জন্য কাকুতি-মিনতি জুড়ে দেবে।

একসময় হৃদয়নাথের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় শিবকুমার। চোখের সমুখে সহসা খোদ জমিদার-তনয়কে দেখে চমকে ওঠে হৃদয়নাথ। সারামুখে জেগে ওঠে যারপরনাই সম্ভ্রম। মিনমিনে গলায় বলে ওঠে, খোকাবাবু, তুমি মহলে যাও নাই? মা-জননী তোমারে হয়তো-বা খোঁজাখুঁজি জুড়েছেন।

হৃদয়নাথের উৎকণ্ঠাকে তিলমাত্র পাত্তা দেয় না শিবকুমার। সরাসরি চার্জ করে ওকে, কই, সকালে কথা দিলে, দেখাবে ওকে, দেখালে না তো? এই তোমার কথার দাম?

শিবকুমারের কথায় বুঝি সামান্য থতমত খায় হৃদয়নাথ। পরমুহূর্তে অপরিসীম দক্ষতায় সামলে নেয় নিজেকে। যারপরনাই বিস্মিত হওয়ার ভান করে বলে, সে কি! আপনি অরে দেখতে পাননি খোকাবাবু?

তার জবাবে ক্ষেপে উঠতে গিয়েও থমকে থামে শিবকুমার। সহসা নিদারুণ ধন্ধ জাগে মনে। ‘বীর’টাকে না দেখিয়েই এমন কথা কেন বলল হৃদয়নাথ? ঠিক সেই মুহূর্তে ঝাঁ করে মনে হয়, তবে কি – তবে কি – শোয়ের আগে সুসজ্জিত হৃদয়নাথকে দেখতে দেখতে যে-কথাটা বারংবার উঁকি মারছিল ওর মনে, সেটাই সত্যি? তবে কি-খাঁচাসার হৃদয়নাথের অবয়বের মধ্যেই সে ছিল সারাটা সন্ধে।

একসময় মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে হৃদয়নাথ বলে, ঠিক আছে, কাল নির্ঘাত দেখামু। এক্কেরে মঞ্চে তুইল্যা সর্বসমক্ষে হাজির করুম অকে। জবান।

 

ছয়

ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহোদয়াগণ। আমার পরের রোমহর্ষক খেলা কুম্ভকর্ণের… নিদ্রাভঙ্গ…।

আপনারা নিশ্চয়ই রামায়ণের গল্প পড়েছেন। শুনেছেন নিশ্চয়ই, রাবণের মেজোভাই কুম্ভকর্ণের কথা। মহাবীর কুম্ভকর্ণ ছ-মাস একনাগাড়ে ঘুমোত। তারপর একটি মাত্র দিনের জন্য তার ঘুম ভাঙত।

ঘুম ভাঙবার পর সে খাবারের জন্য গর্জন তুলত। তখন রাক্ষস-সৈন্যরা তার সামনে হাজির করত রাশি রাশি ভাত-ডাল, মন্ডামেঠাই, শয়ে শয়ে গরু-ছাগল-ভেড়া…। কুম্ভকর্ণ সেসব চোখের পলকে গিলে ফেলত। এইভাবে রাশি রাশি খাবার খাওয়ার পর যদি সে যুদ্ধে বেরোত, তবে তাকে হারাবার ক্ষমতা ত্রিভুবনে কারোরই ছিল না।

ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহোদয়াগণ, ত্রেতাযুগের সেই কুম্ভকর্ণ আর বেঁচে নেই। স্বয়ং প্রভু রামচন্দ্র তাঁকে নিধন করেছেন। কিন্তু তাঁর নাতিপুতির নাতিপুতির নাতিপুতিরা আজো বেঁচে রয়েছে এই পৃথিবীর বিভিন্ন কোণে। আমি সেই মহাবীর কুম্ভকর্ণের তেমনই এক পুতির পুতির পুতিকে বহু সাধনায় অর্জন করেছি। আজ বহু বছর সে আমার কাছেই রয়েছে। তাকে রাশি রাশি মুরগি-ছাগল আর ঘড়া ঘড়া মদ জোগাতে জোগাতে আমি ফতুর হয়ে গেলাম। সারা শরীরে মোটা মোটা রশি দিয়ে বেঁধে তাকে একটা বিশাল সিন্দুকের মধ্যে ভরে রাখতে হয়। সারাদিন সে পড়ে পড়ে ঘুমোয়। রাতটি হলেই তার ঘুম ভাঙে।

তখন সে খিদের জ্বালায় শুরু করে চিৎকার। তখন তাকে সামলানো দায় হয়।

কাল শোয়ের পর হৃদয়নাথ বরং গভীর রাতে খোদ ‘বীর’টা যেভাবে জবান দিয়ে গেছে, তাতে করে শিবকুমার মনে মনে প্রস্ত্তত ছিলই, কিনা, আজকের আসরে হাজির সে হবেই। তবুও একের পর এক অন্য খেলা দেখতে দেখতে মনটা একটু একটু করে অস্থির হয়ে উঠছিল, কিনা, সময় তো বয়ে যাচ্ছে শেষ অবধি ‘বীর’টাকে মঞ্চে হাজির করবে তো হৃদয়নাথ? নাকি, শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যাবে সে।

লোকটা তো আবার কথারও জাদুকর। গতকাল চাপে পড়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বটে, কিন্তু যা ধুরন্ধর ও, কোনো একটা ছলছুতোয় এড়িয়ে যেতে কতক্ষণ? শিবকুমারের দৃঢ় বিশ্বাস সেটা ও পারেই। কথার জাদুতে সহজেই ভুলিয়ে দিতে পারে যে-কাউকে, যখন-তখন। সেই কারণেই তখন থেকে আশা-নিরাশায় দুলছিল শিবকুমার। হৃদয়নাথের ঘোষণায় তার নিরসন তো ঘটলই, বরং ওর শেষ কথাগুলো শোনামাত্র শিবকুমারের নেতিয়ে থাকা শরীরটা সহসা প্রবল উত্তেজনায় টানটান হয়ে উঠল। শিরায় ধমনীতে প্রবাহিত রক্তের মধ্যে সহসা প্রবল জোয়ার শুরু হয়। সিন্দুকের ভেতর বন্দি হৃদয়নাথের পোষা বীরটা তবে সত্যি সত্যিই দেখা দিতে চলেছে আর একটু বাদেই! বাস্তবিক, আবছা অন্ধকারে দূর থেকে নয়, এত-এত আলোবাতির মধ্যে একেবারে চোখের সামনে যদি সত্যি সত্যি স্থুল শরীরে দেখা দেয় ‘বীর’টা, তবে শিবকুমার তখনই মিলিয়ে নেবে, ওটা গেল-পরশু সদরদিঘির উত্তরপাড়ে দেখা ছায়া-ছায়া ওই দৈত্যটাই কিনা।

ভাবতে ভাবতে শিবকুমারের সারা শরীর মুহুর্মুহু রোমাঞ্চিত হতে থাকে। পাশাপাশি হৃদয়নাথকে নিয়ে তার মনে একজাতের সন্তোষ জাগে, কিনা, লোকটা আজ অন্তত ওর সঙ্গে প্রতারণা করবে না। কাল রাতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সত্যি সত্যি আর একটু বাদেই পালন করতে চলেছে হৃদয়নাথ।

ততক্ষণে মঞ্চের পেছনে শুরু হয়েছে কুম্ভকর্ণের প্রলয় গর্জন।

শিবকুমারের বুঝতে তিলমাত্র কষ্ট হয় না, হৃদয়নাথের ঘরের সামনের বারান্দায় রাখা সিন্দুকটার থেকেই ভেসে আসছে শয়তানটার ক্ষুধার্ত গর্জন। বারান্দার পরপরই তো বলতে গেলে শুরু হয়েছে মঞ্চটা। মধ্যিখানে মাত্র একচিলতে সরুমতো লম্বাটে জমি।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কুম্ভকর্ণের গর্জনটা খানিক কান পেতে শোনে হৃদয়নাথ। একসময় চাপা ভয়চকিত গলায় বলে, ওই শুনুন স্যার, দানবটা একেবারে উন্মাদ হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে ওর চেয়ে হিংস্র ভয়ংকর প্রাণী বুঝি এই দুনিয়ায় আর দুটি নেই।

বলতে বলতে তার চোখের তারায় এতখানি ভয় ও আতঙ্ক জমে ওঠে, উপস্থিত দর্শককুলের চোখের তারায় তাৎক্ষণিকভাবে সংক্রামিত হয় তা। কচিকাঁচারা তো স্পষ্টতই বিপন্ন বোধ করে ক্রমশ বড়দের গায়ে লেপ্টে যেতে থাকে। মায়ের অাঁচল কিংবা বাবার কোঁচার খুঁটটি জাপটে ধরে শক্ত করে। আর, মঞ্চের পেছন থেকে ভেসে-আসা কুম্ভকর্ণের গর্জনের দমকে চমকে-চমকে ওঠে।

ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহোদয়াগণ, আমি এবার কুম্ভকর্ণকে আপনাদের সামনে এনে হাজির করব। কিন্তু সাবধান, যতক্ষণ সে মঞ্চে থাকবে, কেউ আসন থেকে নড়বেন না, জোরে জোরে কথাবার্তা বলবেন না, বিড়ি-সিগারেট খাবেন না, আর কুম্ভকর্ণের উদ্দেশে কোনোরূপ মন্তব্য ভুলেও করবেন না। আর, কুম্ভকর্ণের খোরাকিস্বরূপ কেউ যদি কোনো অর্থ দান করতে চান তবে সে-মঞ্চ থেকে চলে যাবার পর এক এক করে এসে মঞ্চের কোণে রাখা থালাটাতে ফেলে দিয়ে যাবেন। এখন… আপনাদের… সামনে… আসছে… কলিযুগের… কুম্ভ…ক… র্ণ…।

দর্শকদের আসনে একেবারে প্রথম সারিতে বসেছে শিবকুমার। পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মঞ্চের দিকে। মঞ্চের পেছন থেকে ক্রমাগত ভেসে আসছে হৃদয়নাথের সিন্দুকবন্দি ‘বীর’টার  অবিরাম গর্জন।

একসময় গড়েরই জনা-আটেক ভৃত্য গোছের লোক সিন্দুকটাকে বয়ে এনে নামিয়ে রাখে মঞ্চের এককোণে। সিন্দুকটার গায়ে অনেকগুলো লোহার আংটা লাগানো। ওই আংটাগুলোর মধ্যে মোটা মোটা বাঁশ ঢুকিয়ে দিয়ে বাঁশের দুদিকে চারজন করে কাঁধ লাগিয়ে বয়ে নিয়ে আসে সিন্দুকটাকে। নামিয়ে দেয় মঞ্চের একপাশে।

সিন্দুকটার ভেতর থেকে সমানে ভেসে আসছিল দৈত্যটার ক্ষুধার্ত গর্জন। এমনকি, ভেতরের দৈত্যটার দাপাদাপিতে ওই বিশাল সিন্দুকটা মঞ্চের ওপর দুলে উঠছিল বারবার।

দেখতে দেখতে হৃদয়নাথ বলে, এমন বিপজ্জনক খেলা আমি সাধারণত দেখাই না। কিন্তু একে তো পাঁচবিবির জমিদারবাড়ি এটা, তার ওপর শুনেছি, এই গড়ে নাকি এককালে একজন বড়মাপের জাদুকর থাকতেন। সেই কারণেই জাদুটা দেখাবার ঝুঁকি নিয়েছি আমি। তবে, দৈত্যটাকে সিন্দুক থেকে বের করতে হলে অন্তত জনা বিশেক ষন্ডাগোছের মানুষ লাগবে। তারা দুদিক থেকে প্রাণপণে ধরে থাকবে দৈত্যের কোমরে বাঁধা রশিগাছার দুইপ্রান্ত। আপনাদের মধ্যে থেকে বিশজন জোয়ান উঠে এলেই আমি খেলাটা দেখাতে পারি।

একসময় জ্যোতিকুমারের নির্দেশে জনা-বিশেক ষন্ডা লোক উঠে আসে মঞ্চে। হৃদয়নাথ ওদের দুটি দলে ভাগ করে। তারপর সিন্দুকটার সামনে গিয়ে বেশ  কিছুক্ষণ মন্ত্র পড়তে থাকে জোরে জোরে। তাতে করে  দৈত্যটার গর্জন যেন আরো বেড়ে যায়।

একসময় অতি সাবধানে সিন্দুকের তালাটা খোলে হৃদয়নাথ। যে রশিগাছা দিয়ে বাঁধা রয়েছে দৈত্যটা, তার দুটি প্রান্তকে অতি সাবধানে বের করে এনে ধরিয়ে দেয় দুদল লোকের হাতে। ভালো করে বুঝিয়ে দেয়  দৈত্যটাকে বাগে রাখবার প্রক্রিয়া। কিনা, দুদিক থেকে প্রাণপণে টেনে রাখতে হবে রশিটা। তাহলেই দৈত্যটা কোনোদিকে যেতে পারবে না। কিন্তু সাবধান, কোনোদিকে টান কম হলেই ও কিন্তু উলটোদিকের মানুষগুলোকে ঘায়েল করে দেবে চক্ষের পলকে। মনে রাখবেন এই মুহূর্তে জনাদশেক ষন্ডা মানুষকে ঘায়েল করে দেওয়াটা ওর বাঁ হাতের খেল।

দুদলের মোট বিশজন ষন্ডা মানুষ যখন দুদিকে সমান শক্তিতে টেনে রেখেছে রশিটাকে, হৃদয়নাথ ধীরে ধীরে সিন্দুকের ডালাটাকে খুলে দেয়। পরমুহূর্তে বিশালকায় দৈত্যটা সিন্দুকের ভেতর থেকে লম্ফ দিয়ে বেরিয়ে এসেই মঞ্চের ওপর দাপাদাপি শুরু করে দেয়।

শিবকুমার দেখতে পায়, কুচকুচে কালো রঙের বিশালাকায় একটি লোক। সারা শরীরজুড়ে ময়াল সাপের মতো পেশিগুলো পাকিয়ে পাকিয়ে উঠেছে। চোখদুটি ভাটার মতো জ্বলছে। দানবটাকে দেখতে দেখতে ওই মুহূর্তে শিবকুমার নিশ্চিত হয়, গত পরশু সন্ধের আলো-অাঁধারিতে সদরদিঘির উত্তরপাড়ে অস্পষ্টভাবে হলেও এই দানবটাকেই দেখেছিল সে।

দানবটার দাপাদাপির চোটে বিশটা ষন্ডা জোয়ান ততক্ষণে ঘেমে-নেয়ে উঠেছে। বাস্তবিক, অতগুলো লোক দুদিকে প্রাণপণে টেনে রেখেও কিছুতেই সামলাতে পারছে না ওকে। মোটা রশি বাঁধা অবস্থায়ও সে যখন অবলীলায় ঝাঁকি মারছে একদিকে, উলটোদিকের দশটা ষন্ডা জোয়ান ওই টানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মঞ্চের ওপর। পড়ি-কি-মরি করে ওরা উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই দানবটার ঝাঁকিতে মঞ্চের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে উলটোদিকের দশজন মানুষ। সবমিলিয়ে সে বিশটা মানুষকে নিয়ে একেবারে পাটকাঠির মতো খেলছে।

দৃশ্যটা দেখতে দেখতে উপস্থিত জমায়েতের চোখে পলক পড়ে না বুঝি। যতই বলবান হোক, একটা মাত্র মানুষ একসঙ্গে বিশটা তাগড়া জোয়ানকে অবলীলায় ফেলে দিচ্ছে মাটিতে, দৃশ্যটা কেবল বিস্ময়করই নয়, অবিশ্বাস্যও বটে। দেখতে দেখতে গোটা জমায়েতের মনে প্রত্যয়টা দৃঢ় হয়, কিনা কোনো রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে এমনটা করা সম্ভব নয়। নির্ঘাত এই দানবটা কোনো আধিভৌতিক প্রাণী।

একসময় হৃদয়নাথের সহকারী ভুজঙ্গ একটা জ্যান্ত মুরগি ছুড়ে দেয় দানবটার দিকে। শূন্য থেকে মুরগিটাকে লুফে নিয়ে শতজনের সমুখে ওটাকে নখে-দাঁতে নিমেষের মধ্যে ছিঁড়ে ফালাফালা করে ফেলে দানবটা। তারপর শতজনের সমুখে ওটাকে কচমচিয়ে খেতে থাকে। তার দুটি হাত ও সারা মুখ তাজা রক্তে ভরে যায়। কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে তাজা রক্তের ধারা।

দৃশ্যটা বাস্তবিক এতটাই ভয়ংকর যে, সামনের সারিতে বসা বাচ্চাগুলো চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। একটা আস্ত মুরগি পেয়ে ততক্ষণে সামান্য শান্ত হয়েছে দানবটা। হৃদয়নাথ মন্ত্র পড়ে ওকে শান্ত রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

হৃদয়নাথের মন্ত্রের গুণেই হোক, অথবা খাদ্য-প্রাপ্তির সুবাদেই হোক, মুরগিটাকে আধাআধি খেয়ে দানবটাকে বেশ তুষ্ট মনে হয়। হৃদয়নাথের ক্রমাগত ধমকে একসময় সে আধখাওয়া মুরগিটা নিয়েই সিন্দুকটার মধ্যে লাফ মেরে ঢুকে যায়। হৃদয়নাথ বুঝি তৈরি ছিল, সঙ্গে সঙ্গে সিন্দুকের ডালাটা ঝপ করে বন্ধ করে দেয়। আর সঙ্গে সঙ্গে ভুজঙ্গভূষণ তাতে ডবল তালা লাগিয়ে দেয়।

মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে বিশটা জোয়ান তখন দরদরিয়ে ঘামছে।

এতক্ষণে বুঝি হাঁপ ছেড়ে বাঁচে হৃদয়নাথ। ঘনঘন দম নিতে থাকে সে।

দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বলে, এই ধরনের খতরনাক খেলা আমি বড় একটা দেখাই না। তবে, ওই যে বললাম, এটা হলো বিখ্যাত পাঁচবিবির গড়। এই গড়ে নাকি একজন বিরাট মাপের জাদুকরের বসবাস ছিল। তিনি নাকি সাহেবদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাদু দেখাতেন। তো, ভাবলাম, আসল জাদুর ঝাঁপিটি যদি খুলতেই হয়, তবে এর চেয়ে উত্তম স্থান আর নেই। কিন্তু কথাটা কি জানেন বাবুমশাইরা, এই ধরনের খেলা দেখাতে গেলে যখন-তখন বিপদ ঘটে যেতে পারে। বিশটা জোয়ানকে নিয়ে যেভাবে তুর্কি-নাচ নাচাচ্ছিল শয়তানটা, কোনো গতিকে ওরা রশিটা ছেড়ে দিলে একেবারে সর্বনাশ হয়ে যেত।

বলতে বলতে সিন্দুকটার দিকে একঝলক তাকিয়ে হৃদয়নাথের ভুরুতে সামান্য ভাঁজ পড়ে। দেখতে দেখেতে ভাঁজগুলি আরো প্রকট হয়ে ওঠে। বলে, ব্যাটার কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না কেন হে ভুজঙ্গভূষণ? বলতে বলতে কাঠের সিন্দুকটার গায়ে কান পাতে হৃদয়নাথ। ধীরে ধীরে তার চোখেমুখে ফুটে ওঠে ত্রাস। ভুজঙ্গভূষণের দিকে তাকিয়ে বলে, সিন্দুকের মধ্যে শয়তানটা রয়েছে তো? দম দেওয়া-নেওয়ার আওয়াজও তো পাচ্ছি না। দ্যাখ, দ্যাখ, কান পেতে শোন।

হৃদয়নাথের কথায় ভুজঙ্গভূষণও সিন্দুকের গায়ে কান পাতে। দেখতে দেখতে ওর মুখখানা শুকিয়ে যায়। কাঁপা-কাঁপা গলায় বলে, মনে তো হচ্ছে, সিন্দুকের মধ্যে শালা নেই।

…অ্যাঁ! হৃদয়নাথের চোখমুখ দ্রুত বদলে যেতে থাকে। গৌরবর্ণ মুখখানা তার নিমেষের মধ্যে ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, সিন্দুকটা খোলো তো। সাবধান, খুব সাবধান, ভেতরে যদি ঘাপটি মেরে বসে থাকে শালা, যদি সিন্দুকটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসে, তবে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

হৃদয়নাথের কথাগুলো ততক্ষণে ক্রিয়া করতে শুরু করেছে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে। একটা বিপদের গন্ধ টের পেয়ে সবার মধ্যে শিরশিরানি ভয়। সামনের বাচ্চাগুলো হুড়োহুড়ি জুড়ে দেয়। বড়রাও বিপদের অাঁচ পেলে পালাবার জন্য মনে মনে প্রস্ত্তত। অনেকে জমিনের ওপর উবু হয়ে বসে, যাতে বেগতিক বুঝলেই টেনে দৌড় লাগাতে পারে।

হৃদয়নাথ পুনরায় মঞ্চে ডেকে নেয় ওই বিশজন জোয়ানকে। বলে, তৈরি থাকিস বাপ। যদি লাফ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে তো তৎক্ষণাৎ একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়বি শয়তানটার ওপর।

একসময় তালা খুলে সিন্দুকের ডালাটিকে অতি সাবধানে খুলতে শুরু করে ভুজঙ্গভূষণ। জমায়েত ততক্ষণে দম আটকে বসে রয়েছে। স্থির পলকে তাকিয়ে রয়েছে সিন্দুকটার দিকে। আর, বেগতিক বুঝলে দৌড় মারবার মুদ্রাটি বানিয়ে ফেলেছে যে-যার মতো।

একসময় সিন্দুকের ডালাটি পুরোপুরি খুলে ফেলে  ভুজঙ্গভূষণ। ভেতরপানে চোখ চারিয়ে ওর সারামুখে ফুটে ওঠে জমাট আতঙ্ক। হৃদয়নাথের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলে, সর্বনাশ হয়ে গেছে কর্তা, সিন্দুকের মধ্যে শয়তানটা নেই।

ভুজঙ্গভূষণের মুখমন্ডলের যাবতীয় ত্রাস এবার জমাট বাঁধে হৃদয়নাথের চোখেমুখে।

বলে, সর্বনাশ। কী হবে এখন? এই মুহূর্তে ব্যাটা তো একেবারে পিশাচ। কোথায় গিয়ে কার যে কী ক্ষতি করবে, তার তো কোনো ঠিকঠিকানা নেই।

…আমি আপনারে কতদিন বলেছি কর্তা, এমন খতরনাক বস্ত্তকে পুষে কাজ নেই। ভুজঙ্গভূষণ হৃদয়নাথের দিকে তাকিয়ে ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলে ওঠে, কতদিন বলেছি, একটা শান্তি-স্বস্ত্যয়ণ করে ওটাকে চিরদিনের মতো ছেড়ে দিন। আপনি আমার কথা শুনলে তো।

…আরে, এসব কথা বলবার সময় পরেও পাবে। হৃদয়নাথ ততক্ষণে যারপরনাই উতলা হয়ে উঠেছে, এখন কীভাবে ওটাকে ধরে আবার বাক্সবন্দি করা যায়, সেটা ভাবো। বেশি দেরি হলে তো যেকোনো সর্বনাশ ঘটে যেতে পারে।

গোটা জমায়েত ততক্ষণে নিজেদের চরম বিপদের আশঙ্কায় একেবারে সিঁটিয়ে গিয়েছে। এমন বিপজ্জনক জাদুর খেলা পাঁচবিবির মানুষ সম্ভবত আগে দেখেনি। ভয়ে-আতঙ্কে একেবারে বাক্যহারা হয়ে গেছে সবাই। বুকের মধ্যে ঢেঁকির প্রহার পড়ছে ঘন ঘন।              যে-যার নিজেদের বাচ্চাগুলোকে প্রাণপণে জাপটে ধরে ইষ্টনাম জপ  করছে মনে মনে। তারই মধ্যে কেউ কেউ চেরা গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, এসব ফালতু কথাবার্তা থামিয়ে আসল কাজটা এবার শুরু কর না হে। তোমাদের যে ওষুধ ঘুঁটতে ঘুঁটতে রোগী সাবাড় হওয়ার জোগাড়।

…আসল কাজ বলতে এক্ষুনি শয়তানটাকে খুঁজতে বেরোতে হবে বাবুমশাই। কোনো সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলবার আগেই ওকে ধরে ফের সিন্দুকের মধ্যে পুরে ফেলতে হবে। হৃদয়নাথ ভাঙা ভাঙা গলায় বলে, তবে তার জন্য ঢের লোকবল চাই। এই গাঁয়ের বাছা বাছা সাহসী আর বলবান মানুষেরা আমার সঙ্গে যেতে প্রস্ত্তত আছেন কিনা বলুন। ভয় নেই, আমার অবর্তমানে ও যা-খুশি শয়তানি করতে পারে, কিন্তু আমি উপস্থিত থাকতে ও আপনাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমার মন্ত্রের একটি কলিতেই জোঁকের মুখে নুন পড়বে।

হৃদয়নাথ বারংবার সাহস দেওয়ায় কিছু সাহসী মানুষ ওর সঙ্গে যেতে রাজি হয়। একটা বড়সড় দল তৈরি করে মাঝরাতে হৃদয়নাথ রওনা হয়ে যায়। কাউকে না জানিয়ে শিবকুমারও গোটা দলটির সঙ্গ ধরে নিঃশব্দে।

রওনা দেবার আগে হৃদয়নাথ ভুজঙ্গকে নির্দেশ দিয়ে যায়, যতক্ষণ না ও ফিরছে, ততক্ষণ দলের অন্যরা যেন মঞ্চের আশেপাশেই থাকে। মঞ্চ ও সাজঘর ছেড়ে যেন কোথাও না যায়।

গ্রামের বসতি-এলাকাটি ছাড়ালেই দিগন্তব্যাপী বিশাল-ডাঙা। মাঝে মাঝে গাঁ-ছাড়া দিঘি। গাছগাছালে ভর্তি। কোনদিকে যাবে যখন ভাবছে হৃদয়নাথ, ঠিক সেই মুহূর্তে ডাঙার উত্তরদিক থেকে ভেসে আসে হুপ-হুপ গোছের বিজাতীয় চিৎকার।

…ওই তো। চাপা গলায় বলে ওঠে হৃদয়নাথ, এইটুকুন সময়ের মধ্যে ব্যাটা কতদূর পালিয়েছে! বলেই আওয়াজটাকে নিশানা করে হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে হৃদয়নাথ। পিছু পিছু একদল ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ।

গ্রাম থেকে বেরিয়ে পুরো দলটি ফাঁকা মাঠের মধ্যে পৌঁছায়। ফটফটে জ্যোৎস্নায় যতদূর চোখ যায়, একেবারে খাঁ-খাঁ ফাঁকা। কেবল দিগন্তছোঁয়া মাঠের মধ্যে এখানে-ওখানে বড়সড় গাছ, গাঁ-ছাড়া পুকুর, তার পাড়ে অনেক গাছগাছালি। রাতের আলো-অাঁধারিতে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে।

হৃদয়নাথ হাঁটছিল, আর মাঝে মাঝে কান পেতে শুনছিল। উত্তরের ডাঙায় ততক্ষণে থেমে গিয়েছে ওই অশরীরী চিৎকার।

ডাঙার মাঝামাঝি অবধি যখন পৌঁছেছে দলটা ঠিক সেই মুহূর্তে ডাঙার দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ভেসে আসে অবিরাম হুপ-হুপ আওয়াজ। কানের আন্দাজে বোঝা গেল, আওয়াজটা আসছে না হলেও প্রায় আধ ক্রোশটাক দূর থেকে।

…উত্তর থেকে একেবারে দক্ষিণ! হৃদয়নাথ ক্ষুব্ধ গলায় বলে, এ-শালা তো দেখছি আজ তুরকি-নাচ নাচাচ্ছে!

বলেই আবার পিছু ফেরে সে। হাঁটা দেয় দক্ষিণমুখো। হুপ-হুপ আওয়াজকে নিশান করে এগোতে থাকে জোর কদমে। যতই এগোচ্ছিল, হুপ-হুপ আওয়াজটা আরো স্পষ্ট হচ্ছিল।

কিন্তু প্রায় আধ ক্রোশমতো হেঁটে যখন ডাঙার দক্ষিণপ্রান্তের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে পুরো দলটা, অকস্মাৎ সেই আওয়াজটা থেমে যায়। তার বদলে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একই রকম আওয়াজ ভেসে আসে পূর্বদিক থেকে। কানের আন্দাজে বোঝা যায়, আওয়াজটা ভেসে আসছে প্রায় এক ক্রোশ দূর থেকে।

দেখতে দেখতে হৃদয়নাথের সারামুখে দুশ্চিন্তা জমে। শয়তানটা আজ গোটা রাত এভাবে দৌড়ে বেড়াবে নাকি!

কিন্তু তখন আর অধিক ভাবাভাবির সময় নেই। কাজেই হৃদয়নাথের পুরো দলটি নিমেষের মধ্যে ঘুরে যায় পুবপানে। আওয়াজটাকে নিশানা করে জোরকদমে হাঁটতে থাকে সবাই।

সবে পৌনে এক ক্রোশ পথ হেঁটেছে, এমনি সময় সামনের আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেল। তার বদলে, পশ্চিমদিকের একটা গাঁ-ছাড়া পুকুরের দিক থেকে ভেসে এলো হুপ-হুপ আওয়াজ।

হৃদয়নাথের সঙ্গীরা ততক্ষণে বেজায় ভয় পেয়েছে। মুখে কুলুপ এঁটেছে প্রায় সবাই। আর, তাজ্জব হয়ে ভাবছে, কেমন করে একটা মানুষ এত অল্প সময়ের মধ্যে বিশাল ডাঙার একপ্রান্তে আওয়াজ তুলছে আবার পরমুহূর্তে অন্যপ্রান্তে! এত জলদি এতটা পথ পার হওয়া তো কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে? পরবর্তীকালে তারা বুঝতে পারে, ডাঙাময় দৌড়ে বেড়ানো প্রাণীটি তো আর সত্যি সত্যি কোনো রক্তমাংসের মানুষই নয়। একটা মন্ত্রপূত আত্মা বই নয়। হৃদয়নাথের ইচ্ছায় এবং মন্ত্রের গুণে মঞ্চে খানিক সময়ের জন্য মানুষের রূপ ধরেছিল মাত্র।

প্রায় আধঘণ্টা মতো হেঁটে সবাই একসময় ওই পুকুরের পাড়ে এসে হাজির হয়। গাছের মগডালে হুপ-হুপ আওয়াজটা তখন অবধি চলছে।

আওয়াজটাকে নিশানা করে হৃদয়নাথের পিছু পিছু সবাই গাছটার তলায় গিয়ে পৌঁছায়। আর সেই মুহূর্তে অবাক বিস্ময়ে দেখে, গাছের মগডালে চড়ে কেউ একজন খুব জোরে জোরে গাছের ডাল ধরে ঝাঁকাচ্ছে।

হৃদয়নাথ গাছটার এক্কেবারে তলায় গিয়ে দাঁড়ায়। বজ্রকণ্ঠে হুকুম দেয়, গাছ থেকে নেমে আয়। তার জবাবে নররাক্ষসটা আরো জোরে জোরে ডাল ঝাঁকাতে থাকে। হৃদয়নাথ তার জাদুকাঠিটিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে শুরু করে। সম্ভবত সেই মন্ত্রের জোরেই নররাক্ষসটা একটু একটু করে নেমে আসতে থাকে গাছ থেকে। একেবারে পাগলের মতো আচরণ করছিল সে। তাই দেখে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে খুব উত্তেজিত গলায় মন্ত্র পড়তে থাকে হৃদয়নাথ। হাতের জাদুকাঠিটা জোরে জোরে নাড়াতে থাকে।

ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে রাক্ষসটা। একসময় ঝুপ করে নেমে পড়ে মাটিতে। পড়েই অজ্ঞান হয়ে যায়।

হৃদয়নাথ তার মাথায় জাদুকাঠিটি ছুঁইয়ে অনেকক্ষণ ধরে মন্ত্র পড়তে থাকে। তাতে করে একেবারে নেতিয়ে পড়ে ও।

সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে হৃদয়নাথ চাপা গলায় বলে, এর এখন নিজের থেকে হেঁটে যাবার ক্ষমতা নেই। ওকে মঞ্চ অবধি বয়ে নিয়ে যেতে হবে।

সেইমতো রাক্ষসটাকে কাঁধে করে বয়ে আনে গোটাকয় তাগড়া জোয়ান। সাবধানে শুইয়ে দেয় সিন্দুকের মধ্যে। ভুজঙ্গভূষণ তৎক্ষণাৎ সিন্দুকের ডালা বন্ধ করে ডবল তালা লাগিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে গড়ের আটজন চাকর সিন্দুকটাকে বয়ে নিয়ে চলে যায় মঞ্চের পেছনে। ভৃগুরাম, নন্দু, প্রাণতোষরা এসে মঞ্চের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পালক ও রক্তের ফোঁটাগুলোকে সাফ করে দেয়।

অনেক রাতে গড়ে ফিরে আসে শিবকুমার। কিন্তু বিছানায় শুয়েও সারারাত তিলমাত্র ঘুমোতে পারে না। সারারাত তন্দ্রার মধ্যে কেবল কানের কাছে ওই হুপ-হুপ শব্দটা ভেসে বেড়াতে তাকে। আর চোখের সামনে সমানে নাচতে থাকে নররাক্ষসটা।

ততক্ষণে অবশ্য সে বুঝে ফেলেছে, দেখতে নররাক্ষসের মতো হলেও সত্যিকারের কোনো রক্তমাংসের দানব নয় ওটা। হৃদয়নাথের পোষা আত্মাটিই ওর নির্দেশে স্থুল দেহ ধারণ করেছিল মাত্র।

শ্রুতিকুমার তাঁর ডায়েরির পাতায় স্পষ্ট লিখে গিয়েছেন, আত্মা অবশ্যই রহিয়াছে। কেবল এদেশেই নহে, গোটা পৃথিবীর সমস্ত দেশের মানুষ আত্মার অস্তিত্বে যুগ যুগ ধরিয়া বিশ্বাস করিয়া আসিতেছে।

কোনোও জাতি বলে আত্মা, কেহ বলে শোল্, কেহ বা জিন…। আমি স্বয়ং উহার একাধিক প্রমাণ পাইয়াছি। উহারা বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করিয়া মনুষ্য সমাজের আশেপাশেই ঘুরিয়া বেড়ায়।

ভাবতে ভাবতে একসময় বিছানা থেকে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায় শিবকুমার।

সবার নজর এড়িয়ে অসম সাহসে পায়ে পায়ে হাজির হয় মঞ্চের পেছনে।

আর তখনি দেখতে পায়, পুবদিকের বারান্দায় যথাস্থানে তালাবন্ধ অবস্থায় সিন্দুকটা রয়েছে।

আধো-অন্ধকারে সিন্দুকটার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়  শিবকুমার। হাত দিয়ে সিন্দুকের শরীরটাকে আলতো ছোঁয়।

এর আগে কোনো দিন সিন্দুকটাকে স্পর্শ করেনি শিবকুমার। আজ প্রথম সিন্দুকের গায়ে হাত ঠেকিয়েই সে বুঝতে পারে, কী পরিমাণ শীতল ওটার শরীর! কেবল তাই নয়, একটুক্ষণ ছুঁয়ে থেকেই শিবকুমার অনুভব করে, ওই শীতলতায় এক জাতের চৌম্বকত্বও রয়েছে। কেন কি, হাতটা তুলে নিতে গিয়েই শিবকুমারের মনে হয়, হাতটাকে যেন নিজের দিকে সামান্য টানছে সিন্দুকটা। খুব জমাট আঠা-লাগানো কিছুর ওপর থেকে হাত তুলে নিতে গেলে যেমন অবলীলায় তা করা যায় না, ঠিক তেমনি, সিন্দুকটার শরীর যেন চটচটে হয়ে শিবকুমারের হাতের তেলোটাকে  আটকে রাখতে চাইছে।

এমন ঘটনায় সহসা বেজায় ভয় পেয়ে যায় শিবকুমার। মঞ্চের পেছনের ওই অন্ধকার নির্জনতায় কেমন জানি শিরশির করে ওঠে সারা শরীর।

দ্রুত পা চালিয়ে ওখান থেকে চলে আসে। সরাসরি পৌঁছে যায় নিজের শোবার ঘরে। সটান বিছানায় শুয়ে পড়ে সে। কিন্তু মনের মধ্যেকার বিস্ময়টা জমাট বেঁধেই থাকে।

 

 

সাত

গতকাল সন্ধ্যায় প্রকাশ্য মঞ্চে হৃদয়নাথের পোষা বীরটাকে রক্তমাংসের শরীরে দাপাদাপি করতে দেখবার পর রাতভর কী এক অস্থিরতায় কেটেছে শিবকুমারের। রাতভর এলোমেলো স্বপ্ন দেখেছে সারাক্ষণ। সেই স্বপ্নের সিংহভাগ জুড়ে ছিল হৃদয়নাথের ওই ‘বীর’। মুলোর মতো দাঁতগুলোকে উন্মুক্ত করে হাসছিল সে। বারংবার বলছিল, কী…, কথাটা রাখলাম তো? হাজির হলাম তো তোমার সামনে? ওর কথাগুলো শুনতে শুনতে ঘুমের মধ্যেই বারংবার শিউরে উঠেছে শিবকুমার।

রাত পোহাতেই, সেই কারণেই, হৃদয়নাথের ডেরার দিকে হাঁটা দেয় শিবকুমার। কাছটিতে পৌঁছে দেখে, টানা বারান্দার একেবারে শেষপ্রান্তে বসে বসে একটা মরা মুরগিকে বেশ মনোযোগ সহকারে ছাড়াচ্ছে হৃদয়নাথ।

মুরগিটাকে খুব চেনা-চেনা লাগছিল শিবকুমারের। গত সন্ধেয় মঞ্চে নররাক্ষসটা যখন মুরগিটাকে দুহাতে পাকড়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল, ওইদিকে থিরপলকে তাকিয়েছিল শিবকুমার। লাল-কালোয় মেশামেশি পালকের রংওয়ালা মোরগটা, লেজের দিকটা ময়ূরকণ্ঠী, মাথায় তিনভাঁজের লাল ফুল…। ওই  মোরগটার সঙ্গে যেন হুবহু মিলে যাচ্ছে। তবে, একই রঙের, একই ধরনের মোরগ দুটো হতেই পারে। শিবকুমার বলে ওঠে, মুরগিটা কিনে এনেছ?

সে-কথায় চমকে তাকায় হৃদয়নাথ। পরমুহূর্তে হতচকিত ভাবটা সামলে নেয়। বলে, খোকাবাবু যে! কাল আমার জাদু কেমন লাগল?

শিবকুমার বুঝতে পারে, এতদ্বারা মুরগিটার প্রসঙ্গ কৌশলে এড়িয়ে গেল হৃদয়নাথ।

ওই নিয়ে আর কথা বাড়ায় না শিবকুমার। দ্রুত অন্য প্রসঙ্গে  চলে যায় সে। খুব ব্যস্ততার ভান করে বলে, যেজন্যে সাতসকালে আসা, মা জানতে চাইল, মাদুলিটা তৈরি হয়েছে?

হৃদয়নাথ এবার সত্যি সত্যি বিদ্যুতের শক খায় বুঝি। খুব ভয় ভয় চোখে তাকায় শিবকুমারের দিকে, ক্-ক্-কোন্ মাদুলি?

– সে কি! মাত্র গত পরশুই নাকি কথা দিয়ে এসেছ মাকে, এর মধ্যেই ভুলে গেলে?

শিবকুমারের সারামুখে ফুটে ওঠে ক্ষোভ।

– কথা দিয়েছি? মা-জননীরে? আমি? হৃদয়নাথকে বুঝি এতক্ষণে সত্যি সত্যি বিপন্ন দেখায়, কী কথা দিয়েছি বলো তো?

– সে কি! শিবকুমার বুঝি আকাশ থেকে পড়ে, তুমি মাকে বলোনি, আমার জন্য খুব জলদি একটা মাদুলি বানিয়ে দেবে।

ততক্ষণে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে হৃদয়নাথের কপালে। এমন উভয় সংকটে বুঝি বেচারা বহুকাল পড়েনি। একদিকে গড়ের            মা-জননীকে কথা দিয়ে এসেছে মাদুলি বানাবার কথাটা কাকেপক্ষীতে জানবে না, কেন কি, তাতে করে জেদি পুত্রটি আরো বিগড়ে যেতে পারে, অন্যদিকে, শিবকুমার ওকে এমন জমিদারি কায়দায় জেরা জুড়েছেন, একেবারে অন্নপ্রাশনের ভাত অবধি উঠে আসার জোগাড়।

বাস্তবিক এমনই আটঘাট বেঁধে আসরে নেমেছে শিবকুমার, হৃদয়নাথের মতো চিরকেলে ধড়িবাজ আর ধূর্ত লোকেরও একেবারে কাছাখোলা অবস্থা! ওইটুকু বাচ্চার জেরায় একেবারে ঘেমেনেয়ে একসা। তাও লুঙ্গির খুঁট দিয়ে মুখের ঘামটাকে মুছতে মুছতে হৃদয়নাথ ওই সঙ্গে মুখমন্ডলের যাবতীয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাগুলোকেও দ্রুত মুছে ফেলবার ব্যর্থ প্রয়াস চালায়। চোখেমুখে যারপরনাই বিস্ময় ফুটিয়ে বলে, আপনার জন্য মাদুলি? কেন বলুন তো?

– তা আমি কেমন করে জানব? শিবকুমার বুঝি এতক্ষণে কিঞ্চিৎ বিরক্ত, সেটা তুমি জানো আর মা জানে। মায়ের সঙ্গে তোমার কথাবার্তার সময় আমি ছিলাম নাকি সেখানে?

শিবকুমারের শেষ কথাগুলো হৃদয়নাথের মনে তিলমাত্র হলেও স্বস্তি এনে দেয়। দিনভর অসহ্য গুমোটের পর সন্ধেয় ফুরফুরে হাওয়া বইলে যেমনটা হয়। সত্যিই তো, গড়ের মা-জননীর সঙ্গে যখন ঠায়-দুপুরে বাক্যালাপ চলছিল হৃদয়নাথের, তখন তো অন্দরমহল সুনসান করে ঘুমোচ্ছিল সবাই। আশেপাশে শিবকুমার কেন, কাউকেই তো দেখতে পায়নি হৃদয়নাথ। যাক্ বাবা, কেবল মাদুলির কথাটা জানলেও, ওই নিয়ে খুব বেশি কিছু জানেন না খোকাবাবু।

এই তথ্যটুকু হৃদয়ঙ্গম করবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন কিঞ্চিৎ জোস ফিরে আসে হৃদয়নাথের মনে। সহসা হইহই করে বলে ওঠে, ও… হো-হো-হো, মনে পড়ছে। যাতে কইরা পরীক্ষায় ফাস্টো হও তুমি, মা-জননী সেজন্য একটা মহাবিদ্যা কবচ বানায়ে দিতে বলছিলেন আমায়।

– মহাবিদ্যা কবচ? পরীক্ষায় ফাস্ট হওয়ার জন্য? শিবকুমার বুঝি মহাধন্ধে পড়ে যায় হৃদয়নাথের কথায়, আমি তো চিরকালই পরীক্ষায় ফাস্ট হই। সেকেন্ড তো এযাবৎ কখনো হইনি। তবে?

সন্ধের মুখে সামান্যক্ষণ ফুরফুরে হওয়া বইলেও কয়েক মুহূর্ত বাদে বুঝি দ্বিগুণ গুমোট শুরু হয়, নইলে হৃদয়নাথ এমন দরদরিয়ে ঘামতে শুরু করবে কেন? কেবল ঘামছে, তাই নয়, এতক্ষণে বুঝি বেজায় ভয় করছে ওর। চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তা। ভয় অবশ্য পাওয়ার কথাই। কাত্যায়নী যখন কথাটা বলছিলেন হৃদয়নাথকে, কিনা, খবরদার, মাদুলি বানানোর কথাটা যেন কাকেপক্ষীতেও জানতে না পারে। আর, শিবকুমার তো কিছুতেই নয়। জেদি ছেলে সে, জানতে পারলে অনর্থ করবে, কিনা, আমার মগজ থেকে পোকা তাড়ানোর মাদুলি বানাতে দেওয়া হয়েছে। কাজেই, ওই নিয়ে হৃদয়নাথকে সতর্ক করে দেবার মুহূর্তে কাত্যায়নীর চোখেমুখে কী পরিমাণ কঠোরতা ছিল, হৃদয়নাথ তো দেখেছেই। এই মুহূর্তে সেই অতিশয় গুপ্ত কথাটি হৃদয়নাথের দ্বারাই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে কিনা, হলেও কতটুকু ফাঁস হচ্ছে, এইসব ভাবতে ভাবতে প্রায় ফাঁসির  আসামির মতো উদ্বেগে মরে যাচ্ছিল হৃদয়নাথ। কেন কি, এই দীর্ঘ পোড়খাওয়া জীবনে সে তো হাড়ে হাড়ে বুঝেছে, এইসব বড় মানুষের ক্ষেত্রে পান থেকে চুন সরলে কী মহাঅনর্থ ঘটে যেতে পারে। কথায় আছে, বড়র পিরিতি বালির বাঁধ, ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণেকে চাঁদ। এই ভরদুপুরে তলব করে মিঠে মিঠে কথা কইলেন, পরমুহূর্তে, হৃদয়নাথের বিধি বাম হলে, পেয়াদা-বরকন্দাজ দিয়ে থামে বেঁধে চাবকাতেও পারেন।

ভাবতে ভাবতে এতকাল আসরে-আসরে পাবলিককে            তুর্কি-নাচ নাচানো হৃদয়নাথ, ওই মুহূর্তে ঠিক ফাঁদে পড়া ইঁদুরের শ্রমে ও নিষ্ঠায় স্বরচিত ফাঁদটি কেটে বেরিয়ে আসতে চায়। ধাঁ করে বলে ওঠে, সেইজন্যেই তো, সেই কারণেই তো। আপনার ফাস্টো হওয়াটা যাতে অব্যাহত থাকে, কোনো পরীক্ষেতে কোনোমতে ফসকাইয়া না যায়, সেইতরেই একটা মহাবিদ্যা কবচ…।

– তাই? বলেই হৃদয়নাথের মুখের ওপর চোখদুটি সমানে ঘষতে থাকে শিবকুমার। আর, ওই দৃষ্টির সমুখে হৃদয়নাথের মতো সম্মোহক দৃষ্টিসম্পন্ন চোখদুটিও যারপরনাই ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। বুকের ভেতরটা কেন জানি ঢিপঢিপ করতে থাকে।

স্থিরপলকে হৃদয়নাথকে দেখতে দেখতে এতক্ষণে তূণ থেকে ব্রহ্মাস্ত্রটি তুলে নেয় শিবকুমার।

হৃদয়নাথকে নিশানা করে চালিয়ে দেয় তীর। সারামুখে যৎপরোনাস্তি শ্লেষ ফুটিয়ে বলে, তাহলে মহাশান্তি কবচটি কী বস্ত্ত? ওটা কার জন্য বানাবে বলে কাকে কথা দিয়েছ তুমি?

ততক্ষণে থরথরিয়ে কাঁপতে শুরু করেছে হৃদয়নাথের সর্বাঙ্গ। একেবারে ধনেপ্রাণে নিকেশ হতে চলেছে সে। সাক্ষাৎ পাতালসমাধি ঘটতে চলেছে তার। খোকাবাবুর পরবর্তী প্রশ্নবাণটি খেয়ে প্রত্যুত্তরে আরো বেফাঁস জবাব দিতে গিয়ে আরো প্যাঁচে পড়ে যাবার আগে  সে একেবারে মাথার ওপর হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ে।

কাঁপা-কাঁপা গলায় তোতলাতে তোতলাতে বলে, এসব গুহ্য কথা আপনে জানলেন কী কইরা খোকাবাবু?

সে-কথায় এতক্ষণে শিবকুমারের সারামুখে বিশ্বজয়ী আলোকজান্দারের হাসি, আমার লোক ফিট করা রয়েছে সর্বত্র। হৃদয়নাথের আরো ভয় পেয়ে যাওয়া মুখখানা দেখতে দেখতে আরো তরল হয় সেই শ্লেষ, আরে বুঝতে পারছো না কেন, জমিদারের ছেলে আমি, আর দুদিন বাদে একটা জমিদারি চালাতে হবে আমায়, সবদিকে নজর রাখতে না জানলে চলবে? শত্রুপক্ষ কেন, আমার নিজের লোকেরাই তো তবে ঢিট করে দেবে আমায়।

আর এগোতে চায় না হৃদয়নাথ। বড়মানুষদের মধ্যিখানে পড়ে আর নিজের হাতে নিজের কবরের গভীরতা বাড়াতে রাজি নয় সে। কাজেই, শিবকুমারের পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়বার কায়দায় গত পরশুর  দুপুরের গোটা পর্বটাই আনুপূর্বিক খুলে বলে। অবশেষে অসহায় কণ্ঠে বলে, মা-জননী কথাটা পাঁচ কান না করবার হুকুম দিসিলেন আমারে। সেই কারণেই…। বলতে বলতে হৃদয়নাথ ছলোছলো চোখে বলে ওঠে, আপনে আমারে বাঁসান খোকাবাবু। আপনে না বাঁসালে আমি গেসি।

বাস্তবিক, কারোর পায়ে লুটিয়ে পড়বার মতোই আত্মসমর্পণ এটা।

মৃদুমৃদু হাসছিল শিবকুমার। খুব দরাজ কণ্ঠে বলে, আরে বাঁচাবই তো। তোমায় না বাঁচালে আমায় জাদু শেখাবে কে? সেই জন্যেই তোমার সঙ্গে একটা ভদ্রলোকের চুক্তি করতে এলাম।

ওইটুকু বাচ্চার মুখে কথার বাঁধুনি দেখে হৃদয়নাথ তখন বাক্যহারা। পরমুহূর্তে তার মনে হয়, হবেই তো, জমিদারি রক্ত বইছে যে শিরায় শিরায়। রক্তের গুণ যাবে কোথায়? তুলসীপাতার তো ছোট-বড় নাই। জাতটা তো একই। নইলে মায়ের পেটে থাকা অবস্থায়ও ব্যুহভেদের কৌশল শিখে নেয় ক্ষত্রিয়-কুলশিরোমণি অর্জুনপুত্র অভিমন্যু!

তোতলাতে তোতলাতে হৃদয়নাথ বলে, কী চুক্তি খোকাবাবু?

– খুবই সরল চুক্তি। অবলীলায় বলে ওঠে শিবকুমার, আমি কথাটা মায়ের কাছে ফাঁস করব না, বিনিময়ে তুমি আমাকে গোপনে জাদু শেখাবে। আর, যাবার বেলায় আমাকে তোমার দলের সঙ্গে নিয়ে যাবে।

বুকের মধ্যে ততক্ষণে ঢেঁকির প্রহার পড়ছে হৃদয়নাথের। দরদরিয়ে ঘামতে লেগেছে সে।

হৃদয়নাথের মনোবৈকল্যকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে শিবকুমার বলতে থাকে, তুমি মাকে মহাশান্তি কবচ বানিয়ে দিয়ে মোটা টাকা ইনাম আদায় করে নাও। আমিও আমার নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাই। পরিষ্কার কথা।

এমন ঘোর বিপদে বুঝি এর আগে কখনোই পড়েনি হৃদয়নাথ। একেবারে শাঁখের করাতের তলায় মাথাটি রয়েছে তার। তাও একবার শেষ চেষ্টা চালায় সে। গদগদ গলায় বলে, আপনি জাদু শিখে কী করবেন খোকাবাবু? আমার মতো গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে ঘুরে জাদু দেখাবেন? তাহলে বড় হয়ে জমিদারি দেখবে কে?

– ওই নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। হৃদয়নাথের কথাটাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয় শিবকুমার, জমিদারি দেখবার লোক রয়েছে ঢের। ভাতের ডাঁইতে মুখ ঠেকাবার জন্য কাকের অভাব হবে না।

একেবারে হাল ছেড়ে দেয় হৃদয়নাথ। নিঃশব্দে মেনে নেয় শিবকুমারের সব শর্ত।

একদিন হৃদয়নাথের বানানো মহাশান্তি কবচটি মায়ের থেকে নিয়ে বিনা প্রতিবাদে পরে নেয় শিবকুমার। পাশাপাশি বাড়ির সবার চোখ এড়িয়ে সারা দুপুর বিকেল হৃদয়নাথের ঘরের দরজা বন্ধ রেখে জাদুর খেলা শিখতে থাকে। দিনভর সবার আড়ালে নিষ্ঠাভরে অভ্যেস করতে থাকে খেলাগুলো।

হৃদয়নাথকে পুরোপুরি হাতের মুঠোয় পাওয়ার পর, পোষা ‘বীর’টাকে নিয়ে শিবকুমারের যাবতীয় কৌতূহল আরো উথলে ওঠে বুঝি। বলে, এবার তবে সিন্দুকের মধ্যেকার ‘বীর’টাকে কাছে থেকে দেখাও।

এতক্ষণে খুব দোটানায় পড়ে যায় হৃদয়নাথ। একটুক্ষণ ভাবে সে। একসময় বলে, আসলে, কথাটা কি জানেন খোকাবাবু, আমার পোষা হলে কী হবে, বিশ্বাস করুন, বড় খতরনাক জিনিস ওটা। সাক্ষাৎ কালকেউটে। আসলে, অতৃপ্ত কুপিত আত্মা তো, কেবল মন্ত্রের শক্তিতে জব্দ হয়ে রয়েছে। যাকে বলে, উড়তে না পারিয়া পোষ মানা। কিন্তু অরক্ষিত শরীর পেলে ব্যাটার লোভটা বুঝি লকলকিয়ে ওঠে। আপনার অরক্ষিত শরীর। সেই কারণেই অত সংকোচ করছি আমি। নইলে আপনার সঙ্গে চুক্তি তো হয়েই গেছে। আপনার সব শর্তই তো মেনে নিয়েছি। কাজেই, ‘বীর’টাকেও দেখাবই একদিন। তবে তার আগে আপনার শরীরটাকে সুরক্ষিত করতে হবে। অনেকগুলো পর্যায় রয়েছে তার। দু-একদিনের মধ্যেই শুরু করব তা। ততদিন আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে খোকাবাবু। দয়া করে ওই নিয়ে আর জেদ করবেন না।

শিবকুমার ওই নিয়ে আর জেদ করে না এই কারণে যে, আর দুদিন বাদে তো পাকাপাকিভাবেই হৃদয়নাথের সঙ্গ ধরতে চলেছে সে। কাজেই কাল হোক পরশু হোক, ওই অশরীরী প্রাণীটাকে সে কাছ থেকে দেখবার সুযোগ পাবেই। চাই কী, খোদ বীরসাধনাটাই শিখে নিতে পারে কালে কালে।

ফিসফিস করে হৃদয়নাথ বলে, আমার সঙ্গে সঙ্গে আপনিও বাড়ি ছাড়লে, কত্তাবাবুর ঘোর সন্দেহ হবে আমার ওপর। গোটা রোষটা আমার উপরই পড়বে। আমি অতি গরিব জাদুকর, খোকাবাবু। আসরে আসরে খেলা দেখিয়ে পেটের ভাত জোগাড় করি। ঘরে আমার পরিবার ও সন্তানেরা রয়েছে। একেবারে না খাইয়া মরব অরা। আমার দিকটাও একটুখানি ভাবুন।

একটুক্ষণ কী যেন ভাবে শিবকুমার। একসময় বলে ওঠে, এখান থেকে কোথায় যেন যাচ্ছো তোমরা?

অন্যকিছু ভাবনায় বুঝি মগ্ন ছিল হৃদয়নাথ। শিবকুমারের প্রশ্নটা শুনে খানিক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। একসময় ঢোক গিলতে গিলতে বলে, লালমনিরহাট। ওখানে পরপর দুহপ্তার বায়না আমাদের।

– ঠিক আছে। হৃদয়নাথকে ফুরফুরে গলায় আশ্বস্ত করে শিবকুমার, তোমরা গড় ছাড়বার ক-দিন বাদেই রওনা দেব আমি। তোমার কোনো বিপদ না হয়, সেদিকটা অবশ্যই দেখবো আমি।

ততদিন একটা গভীর স্বপ্নের মধ্যে একটু একটু করে ডুব দিচ্ছে শিবকুমার, কিনা, আর দিনকয় বাদেই একটা নতুন জীবন শুরু হতে চলেছে তার! হৃদয়নাথের সান্নিধ্যে ও শিষ্যত্বে সে হয়ে উঠতে চলেছে একজন সত্যিকারের জাদুকর! আর, সেই মুহূর্তে শিবকুমার মনে মনে সংকল্প নিয়ে বসে, কালে কালে বিরাট মাপের জাদুকর হয়ে উঠবেই সে। মেজোকাকার বই-পত্রিকা-ডায়েরি এবং হৃদয়নাথের কাছে হাতেনাতে শিক্ষা, দুয়ে মিলে একদিন রয়-দ্য-মিস্টিক, থার্স্টটন, পিসি-সরকার, গণপতি চক্রবর্তীকেও ছাড়িয়ে যাবে। স্বপ্নটায় ডুবতে ডুবতে ওইমুহূর্তে পাঁচবিবির জমিদারিকে তার নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর বলে মনে হয়। সে যেন দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পায়, জাদুর বিশাল সম্ভার নিয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা-আসামের গ্রামেগঞ্জে, শহরে-নগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে জাদুকর এস-কুমার! তার জাদু দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ধেয়ে আসছে মানুষ! জাদু দেখে ধন্য ধন্য করছে আপামর জনতা। স্বপ্নটাকে কিছুতেই উবে যেতে দেয় না শিবকুমার। ঠিক হাঁড়ির মধ্যে জিয়লমাছ রাখবার কৌশলে প্রাণপণে জিইয়ে রাখে ওটা।

স্বপ্নটা হয়তো-বা ছিল মেজোকাকা শ্রুতিকুমারের মনের অতলেও। বিশাল মাপের জাদুকর হয়ে ওঠার স্বপ্ন। অকালে চলে যাওয়ায় স্বপ্নটা সফল হয়নি তাঁর। কিন্তু পরোক্ষে তিনি শিবকুমারের মধ্যে চারিয়ে দিয়েছেন স্বপ্নটা। কেবল চারিয়ে গিয়েছেনই বা কেন, রাশি রাশি বই-পত্রিকা-ডায়েরি এবং সারাঘরজুড়ে রাশিরাশি জাদুর সরঞ্জামের জোগান দিয়ে তিনি পরোক্ষে শিবকুমারের গুরুর পদে অভিষিক্ত হয়েছেন বাস্তবিক, হৃদয়নাথের সান্নিধ্যে আসার ঢের আগে থেকেই তো একলব্যর মতো জাদুর পাঠটা মেজোকাকার থেকেই নিয়েছে শিবকুমার।

একদিন হৃদয়নাথের দলটি গড় ছাড়ল। ঠিক তার পাঁচদিন বাদে নিরুদ্দেশ হলো শিবকুমারও। শিবকুমারের বাবা জ্যোতিকুমার লোক পাঠালেন চতুর্দিকে। আত্মীয়দের বাড়ি, স্কুলের হোস্টেল…। হৃদয়নাথের খোঁজ করে ওখানেও গেল জমিদারের লোকেরা। কিন্তু কোত্থাও শিবকুমারের কোনো খোঁজই পাওয়া গেল না।

 

 

আট

হৃদয়নাথ যেদিন পাঁচবিবির গড় ছেড়েছিল, সেইদিনই গড় ছাড়তে পারত শিবকুমার। কিন্তু সে তা করেনি। কারণ, যেভাবে কদিন সারাক্ষণ লেপ্টে ছিল জাদুকরটার সঙ্গে, জাদুদলটার একেবারে পিছুপিছু গড় ছাড়লে বাড়ির সবার সন্দেহ হতো। দুয়ে দুয়ে চার করে নিতে কারোর কোনো অসুবিধেই হতো না। তার ফলে একদিকে যেমন সহজেই ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল শিবকুমারের, পাশাপাশি হৃদয়নাথেরও দুর্দশার অন্ত থাকত না। দুনিয়া ঢুঁড়ে ওকে ধরে আনত জ্যোতিকুমারের লোকজন। জমিদারবাবুর নয়নের মণিটিকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিজের দলে শামিল করে নেবার অপরাধে কঠোরতম শাস্তি প্রাপ্য হতো ওর। তাবাদে, অত তাড়াহুড়োর ছিলই বা কি! শিবকুমার তো নিশ্চিতভাবে জানতই, পাঁচবিবি থেকে লালমনিরহাটেই যাবে দলটি। সেখানে দু-হপ্তা শো করবে। কাজেই, দিনকয় পরে গড় ছাড়লেও শিবকুমারের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, সে হৃদয়নাথের কাছে সহজেই পৌঁছে যেতে পারবে। অথচ তার ফলে হৃদয়নাথের ওপর সন্দেহ হবে না কারোর। সেই কারণেই শিবকুমার ভেবেচিন্তে গড় ছেড়েছিল ঠিক পাঁচদিন বাদে।

পাঁচবিবি থেকে লালমনিরহাট বহুৎ দূর। দুদিন ধরে হেঁটেদৌড়ে, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী হয়ে গাইবান্ধা। সেখান থেকে  রেলে চড়ে লালমনিরহাট।

কিন্তু লালমনিরহাটে পৌঁছে মাথার ওপর গোটা আকাশখানা ভেঙে পড়ে শিবকুমারের। প্রায় জনে জনে জিজ্ঞাসা করেও হৃদয়নাথের দলের কোনো খবরই পেল না। না, এদিকটায় আসেনি ওই জাতের কোনো দল। গ্রামবাংলার বৈচিত্র্যহীন নিরুত্তাপ জীবনে এমন একটা জাদুদল, লালমনিরহাটে কেন, এলাকার দু-দশ ক্রোশের মধ্যে এলেও হাওয়ায় খবর হয়ে যেত তা। শুনতে শুনতে শিবকুমারের রঙিন স্বপ্নের ফানুসটি ততক্ষণে আকাশের বুকে মিলিয়ে যেতে বসেছে।

তখন লালমনিরহাটের দিগন্তে নারকোল-সুপুরি বনের আড়ালে ডুব মারছে সূর্য। সন্ধে হয়ে আসছে। ষোলো বছরের শিবকুমার এমন একটা অচেনা জায়গায় এসে বিপন্ন বোধ করে।

ছোট্ট গঞ্জমতো জায়গা। বাসস্ট্যান্ডের পাশাপাশি গুটিকয় ছোটো ছোটো খাবারের দোকান।

প্রথমেই সামান্য কিছু খাবার কিনে খায় শিবকুমার। তারপর চুপচাপ বসে থাকে দোকানের বেঞ্চিতে।

এমন একটি ফুটফুটে রূপবান ছেলেকে ওই সন্ধেপ্রহরে বসে থাকতে দেখে খাবারের দোকানের মালিক রসময় ঘোষের ভুরুতে ভাঁজ পড়েছে ততক্ষণে। শিবকুমারের নামধাম শুধোন তিনি। ততক্ষণে শিবকুমার সতর্ক হয়ে গিয়েছে। কোনোমতেই নিজের সঠিক পরিচয় দেওয়া চলবে না। পাঁচবিবির জমিদারদের কথা লালমনিরহাটের মানুষজন শোনেনি, এ তো  আর হয় না। তাবাদে পাশের গাঁয়েই শিবকুমারের বড়দির শ্বশুরবাড়ি। কোনোগতিকে তাঁর পরিচয় জানাজানি হয়ে গেলেই সেই খবর নিমিষের মধ্যে চলে যাবে বড়দির কানে। লোকলস্কর এসে ধরে নিয়ে যাবে ওঁকে। শিবকুমারের পুরো প্ল্যানটাই মাটি হয়ে যাবে তাহলে।

কাজেই, নিজের আসল পরিচয় গোপন রেখে শিবকুমার চটপট জবাব দেয় বানিয়ে বানিয়ে। তার নাম কার্তিক। নাটোর এলাকার অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে সে। মা মারা গিয়েছেন শৈশবে। বাবা আবার বিয়ে করেছেন। সৎমায়ের সংসারে লাথিঝাঁটা খাচ্ছিল, এখন হৃদয়নাথের জাদুর দলে চাকরি করে। নেত্রকোনায় শেষ শো করে, তাঁবু গোটাচ্ছিল হৃদয়নাথ। পরবর্তী শো লালমনিরহাটে হওয়ার কথা। ওই ফাঁকে দিন কয়েকের জন্য ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েছিল কার্তিক। বাড়িতে দুটো দিন কাটিয়ে আজই লালমনিরহাটে পৌঁছেছে সে। অথচ এখানে এসে জানত পারল, হৃদয়নাথের দল এখানে আসেইনি।

এতগুলো কথা মুহূর্তের  মধ্যে বানিয়ে বানিয়ে বলে দেয় ষোল বছরের ছেলে। কথাগুলো এমন বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে রসময়ের কাছে যে, ওইরাতে শিবকুমারকে নিজের বাড়িতে ঠাঁই দেন তিনি।

রাতটা রসময় ঘোষের বাড়িতে কাটিয়ে পরের দিন সকালে আবার বাসস্ট্যান্ডে চলে আসে শিবকুমার। দিনভর বাসে চড়ে আসা তাবৎ যাত্রীদের জনে জনে শুধোয়, কাছাকাছি কোনো গাঁয়ে কিংবা গঞ্জে কোনো জাদুর দল এসেছে কিনা। কেউই কোনো খবর দিতে পারেনি। আর, তখনি শিবকুমার নিঃসন্দেহ হয়, ওকে ফাঁকি দেবার জন্যই হৃদয়নাথ মিছিমিছি লালমনিরহাটের কথা বলেছিল। সে আসলে গিয়েছে অন্যত্র।

কিন্তু উপস্থিত শিবকুমার যে পড়ে গেল ঘোর বিপদে। এখন তো তার মুখ কালো করে বাড়ি ফিরে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। অথচ ততদিনে জাদু তাকে অদৃশ্য হাতে টানছে।

বেশ কদিন ধরে গোটা এলাকাটা ঢুঁড়ে দেখবার পর শিবকুমার একসময় বুঝতে পারে, ওকে পুরোপুরি ধোঁকা দিয়েছে হৃদয়নাথ। স্রেফ ওকে ফাঁকি দেবার জন্যই সেদিন উলটো জায়গার কথা বলেছিল লোকটা। কিন্তু তারও তখন জমিদারি রোখ চেপে গিয়েছে মগজে। তার চেয়েও ঢের বেশি লজ্জা। এতদূর এসে শেষ অবধি কোন মুখে খালিহাতে গড়ে ফিরে যাবে সে। আর, সামান্য একটা জাদুকর, মঞ্চে যত বড় শাহেনশাই হোক না কেন, মঞ্চের বাইরে শিবকুমারের দৃষ্টিতে একটি বড়সড় চামচিকের তুল্য প্রাণী সে, পাঁচবিবির জমিদারপুত্রকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে যাবে?  অতখানি এলেম ওর? ভাবতে ভাবতে দুর্জয় জেদ চেপে বসে শিবকুমারের বুকে। কাজেই, তৎক্ষণাৎ বাড়ি ফিরে না গিয়ে হৃদয়নাথকে দুনিয়াময় চষে বেড়াবার সিদ্ধান্তই নিয়ে বসে সে।

কিন্তু না, চারপাশের গাঁয়েগঞ্জে তন্নতন্ন করে খুঁজেও হৃদয়নাথের কোনোই সন্ধান পায় না সে। লোকটা যেন শিবকুমারের চৌহদ্দি থেকে একেবারে পাক্কা ভোজবাজের মতো হারিয়ে গেল।

বাধ্য হয়ে হয়তো বা শেষ অবধি পাঁচবিবির গড়েই ফিরে যেত শিবকুমার। ওখান থেকে রাজশাহীর হোস্টেলে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ল্যাংটেশ্বর জুটে গেল ওর জীবনে। ল্যাংটেশ্বরের সঙ্গে শিবকুমারের গাঁটছড়া বাঁধার কাহিনিটাও বেশ মজার।

হৃদয়নাথের দেখা না পাওয়ার পর শিবকুমার তখন এলোমেলো ঘুরছে যেখানে খুশি। খাওয়া-দাওয়া জুটছে কি জুটছে না। তেমনই একদিন লালমনিরহাট গঞ্জের ওপর রাস্তার ধারে অনেক লোকের জমায়েত দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিল সে। ল্যাংটেশ্বর তখন জমায়েতের মধ্যে জাদুর খেলা দেখাচ্ছিল। সামনে সাজানো ছিল একগাদা কবচ-মাদুলি।

শিবকুমার জমায়েতের মধ্যে দাঁড়িয়ে একমনে দেখতে থাকে ওর খেলা। খুবই মামুলি খেলা সব। তাসের খেলা, যদু-মধুর খেলা, মুখ দিয়ে জল খেয়ে কান দিয়ে বের করা, এইসব।

কিন্তু লোকটার হাতের কাজটি ভারি চৌকস। সেই কারণেই অতি সাধারণ খেলাগুলোও দেখতে মন্দ লাগছিল না শিবকুমারের।

জাদুর খেলা শেষ হলে পর একসময় বক্তৃতা শুরু করে ল্যাংটেশ্বর। জমায়েতের উদ্দেশে বলে, আমার নাম ল্যাংটেশ্বর সাধু। গুরুর দেওয়া নাম। এতক্ষণ আমি আপনাদের সামনে যেসব জাদু দেখালাম, এগুলো শেখার জন্য আমাকে দস্ত্তরমতো গুরুর পায়ের তলায় বসে সাধনা করতে হয়েছে। আমার গুরু ছিলেন ত্রিকালজ্ঞ পন্ডিত। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন সিদ্ধ মানুষ। তিনি কারোর দিকে একটিবার চোখ তুলে তাকালেই তার চৌষট্টি রোগ ভালো হয়ে যেত। তিনি একটিবার কারো গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে কুষ্ঠরোগীও সুস্থ হয়ে উঠত। গৃহী জীবনের নামটি আমি গুরুদেবের পায়ের তলাতেই ত্যাগ করে এসেছি। যেদিন আমার সাধনা সম্পূর্ণ হলো, গুরুদেব আমায় বললেন, এবার থেকে তোর নতুন নাম হলো ল্যাংটেশ্বর। তুই সারাজীবনে কোনো বসন চড়াতে পারবিনে শরীরে।  আমি বললাম, তা কী করে হয় প্রভু? সমাজে থাকতে হলে তো সমাজের নিয়মকানুন আমাকে মানতেই হবে। সেখানে একেবারে উলঙ্গ থাকলে গৃহী মানুষের সমাজ তো আমাকে ঠাঁই দেবে না। গুরুদেব বললেন, ওরে, শরীরে নয় রে। শরীরে তুই যা খুশি পরিস, মনটাকে আজীবন ল্যাংটো রাখিস। মনটাকে ল্যাংটো রাখাই তো গৃহী মানুষের সাধনা রে। মনটাকে ল্যাংটো রাখতে পারলে রাজ-রাজেশ্বরও ফকিরের জীবন কাটাতে পারে। সব মানুষ তো ল্যাংটো হয়ে এই দুনিয়ায় আসে, ল্যাংটো হয়েই ফিরে যায়। যতক্ষণ ইহলোকে থাকে, নিজের নশ্বর শরীরটাকে বসনে, ভূষণে, অলংকারে, প্রসাধনে সাজায়। তা তো সে সাজাবেই। সেটাই তো মায়া। সেই মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়তেই তো আসা। কাজেই, শরীরে যত বসন-ভূষণ চড়ায়, মনে চড়ায় তার চেয়ে ঢের বেশি। শরীরের বসন তো নেহায়েতই মায়া, মনের মধ্যে বসন-ভূষণহীন উলঙ্গ থাকাটা উচ্চমার্গের সাধকের লক্ষণ। তুই সেই মার্গে উঠেছিস বলেই তোর নাম দিলাম ল্যাংটেশ্বর। তুই বাকি জীবনটা মনের মধ্যে কোনো বসন-ভূষণের বালাই রাখিসনে। সেখানে তুই যেন আজীবনকাল ভূমিষ্ঠকালের মতোই উলঙ্গ থাকতে পারিস। মনের শরীরে একগাদা বসন-ভূষণ চড়িয়ে প্রভুর কাছে গেলে, প্রভু তোর দিকে মুখ তুলে তাকাবেনই না।

কিন্তু গৃহী মানুষের মতো সারাটা জীবন শরীরে-মনে অজস্র বসন-ভূষণ। তাহলে তাদের প্রভুসঙ্গ হবে কী করে? বাবুমশাইরা, আমার গুরুদেব বলতেন, প্রত্যেক গৃহী মানুষেরই উচিত তাদের উপার্জনের একটা ক্ষুদ্র অংশ হলেও ভগবানের কাছে পাঠিয়ে দেয়া। সেটাই তার পারানির কড়ি। কেন কি, গৃহী মানুষ তো আর সংসারধর্ম ছেড়ে হিমালয়ের গুহায় গিয়ে সাধনা করতে পারে না। তবে কি তার দেহান্তে মোক্ষলাভ হবে না? হবে বইকি। সে যদি রোজ তার উপার্জনের থেকে কণামাত্র ভগবানের কাছে পাঠিয়ে দেয়, তবেই দেহান্তে তার মুক্তি হবেই। কিন্তু গৃহী মানুষ তা কেমন করে পাঠাবে? পুরুতদের মাধ্যমে পাঠালে তা যে পৌঁছয় না সে তো বোঝাই যায়। আপনি পুরুতের মাধ্যমে মিঠাই নিবেদন করলেন ঠাকুরকে। একটু পরে পুরুত বলে দিলো যে, ঠাকুর খেয়ে নিয়েছে। অথচ মিষ্টির একটি কণাও কমল না। আপনি দিব্যি প্রসাদ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। আমি ওসব জালজোচ্চুরিতে নেই। ঠাকুরের উদ্দেশে উৎসর্গ করা পয়সা আমি আপনাদের সামনেই ঠাকুরের কাছে পাঠিয়ে দেব। সেটা আপনারা স্বচক্ষে দেখতে পাবেন। কেউ কি পাঠাতে চান ভগবানের কাছে আপনার উপার্জিত অর্থের একটা ক্ষুদ্র অংশ? আপনাদের মধ্যে কারোর কি পরপারের কড়ি ভগবানের কাছে গচ্ছিত রাখবার ইচ্ছে রয়েছে? তাহলে আমার হাতে দিন এক পয়সা, দু-পয়সা, সিকি আধুলি, যা আপনার ক্ষমতা। আর দেখুন, আপনার চোখের সামনেই আমি তা ভগবানের কাছে পাঠিয়ে দেবো। আর আমরা এটা কেই বা না জানি যে, ঠাকুরকে এক কণা দিলে তা দশ কণা হয়ে ফিরে আসে। তার শয়ে শয়ে প্রমাণ রয়েছে।

বলতে বলতে দর্শকদের মধ্যে এলোমেলো চোখ চারাতে থাকে ল্যাংটেশ্বর, এখানে কুলঘাট গাঁয়ের কেউ আছেন? আছে কেউ? নেই তো? থাকলে হাতে হাতে সাক্ষী পেতেন, এই তো হপ্তাটাক আগে, কুলঘাট চৌমাথায় আমার হাত দিয়ে ঠাকুরের কাছে একলপতে দু-টাকা পাঠাল একজন স্যাঁকরা। বাড়ি ফিরে সেই রাতেই স্বপ্ন দেখল, কিনা, তোর বাস্ত্তভিটার ঈশেন কোণে মোহরের ঘড়া পোঁতা রয়েছে। খবর নিয়ে দেখুন, দিনতিনেক আগে স্যাঁকরার-পো ঘড়াটিকে মাটির তলা থেকে তুলে এখন লাখপতি।

আরে, খোঁজ নিয়ে দেখব কি…? সঙ্গে সঙ্গে কলকলিয়ে ওঠে জনতার একাংশ, ওই মোহরের ঘড়ার কথাটা তো গোটা রাজশাহী জেলা জেনে গিয়েছে। কেবল সেটা যে ল্যাংটেশ্বরের মাধ্যমে ভগবানের কাছে মাত্র দু-টাকা পাঠাবার হাতেনাতে ফল, সেটাই জানা ছিল না কারোর।

– মাত্র দু-টাকায় লাখ টাকা। এরই নাম ঠাকুরের কৃপা।

জমায়েতের মধ্যে একজন দ্বিধাভরে একটা এক আনি এগিয়ে দেয় ল্যাংটেশ্বরের দিকে। ল্যাংটেশ্বর ওটা হাতের মুঠোয় রেখে বিড়বিড় করে বলে, আপনার নাম কী ভাই? লোকটি নাম বলে। ল্যাংটেশ্বর বলে, ভগবান, অমুক গঞ্জের তমুক তোমায় এক আনা পাঠাচ্ছে। মেহেরবানি করে লিয়ে লাও। গরিব আদমি, এর চেয়ে বেশি দিতে পারবে না। ওর বালবাচ্চাকে ভালো রেখো। ওর আয় আরো বাড়িয়ে দাও। বলতে বলতে একসময় মুঠো খোলে ল্যাংটেশ্বর। সবাই অবাক হয়ে দ্যাখে, মুঠোর মধ্যে পয়সাটা নেই।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভগবানের কাছে পয়সা পাঠানোর হিড়িক পড়ে যায়। ল্যাংটেশ্বর প্রত্যেক দাতার নাম শুধিয়ে ওই নামে পয়সা পাঠিয়ে দিতে থাকে ভগবানের কাছে।

দেখতে দেখতে জমায়েত শ্রদ্ধায়, বিস্ময়ে একেবারে হতবাক হয়ে যায়। সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নেয়, নাহ্, লোকটি সত্যিসত্যি ভগবানের বড় প্যায়ারা আদমি।

এরপর কবচ-মাদুলি কেনার ধুম পড়ে যায়। একেবারে ভরসন্ধে অবধি চলে সেই পর্ব। একসময় অবিক্রীত কবচ-তাবিজগুলোকে পুনরায় ঝুলিতে ভরে সেদিনের মতো ভগবানের দরজা বন্ধ করে দেয় ল্যাংটেশ্বর। জমায়েত একটু একটু করে ভেঙে যায়।

শিবকুমার এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল সবকিছু। শুনছিল ল্যাংটেশ্বরের প্রতিটি কথা। প্রায় সবাই চলে গেলে পর একসময় মুখ খোলে সে। বলে, তুমি যে বললে, প্রত্যেকে মানুষেরই তার আয়ের এক কণা হলেও ভগবানের কাছে পাঠানো উচিত, তা তুমিও তো অনেক আয় করলে, ভগবানের কাছে কিছু পাঠাও।

জমায়েতের দু-চারজন যারা সবে রওনা দিচ্ছিল যে যার বাড়ির দিকে, ওইটুকুন বাচ্চা ছেলের কথা শুনে থমকে দাঁড়ায়।

ল্যাংটেশ্বর ঝাঁ করে তাকায় শিবকুমারের দিকে। একটা বাচ্চা ছেলের মুখ থেকে এমনতরো কথা শুনে প্রথমে বিস্ময়ে, পরে রোষে, এবং সর্বশেষে তাচ্ছিল্যে ভেঙে যেতে থাকে ওর মুখখানি। চোখদুটোকে জ্বলন্ত অঙ্গার বানিয়ে, গলায় যারপরনাই অবজ্ঞা ফুটিয়ে বলে, পাঠাব বইকি। আমার যা পাঠাবার ঠিক সময় পাঠিয়ে দিব। তাই নিয়ে তোকে পাকামো করতে হবে না।

– এখুনি পাঠাও না, আমরা স্বচক্ষে দেখি। অকম্পিত গলায় বলে শিবকুমার, – বলো তো, আমি পাঠিয়ে দিই।

– তুই? ল্যাংটেশ্বর উদ্গত রোষটাকে বহুকষ্টে গিলে ফেলে হো-হো করে হেসে ওঠে। বলে, শোন খোকাবাবু, যার-তার হাত দিয়ে পাঠালে ভগবান সেই পয়সা নেবেন না। পয়সা পাঠাতে হলে প্রথমে ভগবানের সঙ্গে দোস্তি করতে হবে।

– ভগবানের সঙ্গে আমারও দোস্তি আছে।

ল্যাংটেশ্বর উপস্থিত মানুষগুলোর দিকে আড়চোখে একপ্রস্থ তাকিয়ে নেয়। সবাই যে মনোযোগ সহকারে তামাশাটা দেখছে, সেটা ওর দৃষ্টি এড়ায় না বুঝি। গলায় দ্বিগুণ রোষ ফুটিয়ে বলে, বটে! বড় আস্পর্ধা তো তোর! তো, পাঠা দিখি। কেমন ভগবান তোর পাঠানো পয়সা কবুল করেন, এই মানুষগুলোও দেখে যাক। বলেই ল্যাংটেশ্বর একটা সিকি এগিয়ে দেয় শিবকুমারের দিকে।

– একটা মাত্তর সিকি? শিবকুমার মুচকি হেসে বলে, অন্তত একটা টাকা পাঠাও। অনেক তো কামালে।

একটা জোর তামাশা ঘটতে চলেছে এমন বিবেচনায় ল্যাংটেশ্বর একটা গোটা টাকাই ধরে দেয় শিবকুমারের সামনে। বলে, নে, এবার পাঠিয়ে দে ভগবানের কাছে।

শিবকুমার মুঠোর মধ্যে টাকাটা নিয়ে মনে মনে একবার হৃদয়নাথকে স্মরণ করে। তারপর বলে, নাম বল।

– ল্যাংটেশ্বর।

শিবকুমার বিড়বিড় করে বলে, ভগবান, ল্যাংটেশ্বর তোমার কাছে এক টাকা পাঠাচ্ছে। টাকাটা তুমি নাও ঠাকুর।

বলতে বলতে ল্যাংটেশ্বরের চোখের সমুখে হাতের মুঠোটা মেলে ধরে। এবং ল্যাংটেশ্বর দেখতে পায়, মুঠোর মধ্যে টাকাটা নেই।

ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে ল্যাংটেশ্বর। প্রবল বিস্ময়ে বুঝি চোখের পাতনি ফেলতেও ভুলে যায়।

জমায়েতও ততক্ষণে তাজ্জব হয়ে গিয়েছে।

ল্যাংটেশ্বর থিরপলকে তাকিয়ে থাকে শিবকুমারের দিকে। চোখদুটো অজান্তে জ্বলতে থাকে।

একসময় মুখের ভাবটাকে নরম করে আনে সে। বলে, তুই কে রে? তুই তো সামান্য ছোকরা নোস। এই বয়েসেও ভগবানের সাধনায় অনেকখানি এগিয়ে গেছিস! তারপর জমায়েতের দিকে তাকিয়ে বলে, কে যে ভগবানের দিকে ভেতরে ভেতরে কতখানি এগিয়ে  গিয়েছে, প্রভু যে কাকে কখন করুণা করেন…!

শিবকুমার ততক্ষণে হাঁটা দিয়েছে। টাকাটা হাতে পাওয়া মাত্তর বাসস্ট্যান্ডের লাগোয়া রসময় ঘোষের খাবার দোকানে গিয়ে থামে সে। সকাল থেকে পেটে একটা দানাও পড়েনি। দু-আনা দিয়ে পুরি তরকারি কিনে গ্রোগ্রাসে খায়। বাকিটা রেখে দেয় পকেটে। একপেট জল খেয়ে রসময়ের বাড়ির দিকেই রওনা দেয় সে।

 

 

নয়

পরের দিন বিকেলে আচমকা লালমনিরহাট বাসস্ট্যান্ডে মুখোমুখি ল্যাংটেশ্বরের সঙ্গে দেখা। শিবকুমার চলে যাচ্ছিল। ল্যাংটেশ্বরকে দেখতেই পায়নি সে। সে মরছিল নিজের জ্বালায়।

গতকাল ল্যাংটেশ্বরের থেকে যে একটা টাকা বাগিয়েছিল, ওই দিয়ে আজ অবধি খাওয়া-দাওয়াটা চলেছে। পকেটে এখনো রয়েছে দুআনা  মতো। ওই দিয়ে আজ রাতটুকুও হয়ে যাবে। রসময়ের দোকান থেকে কম দামে ঠান্ডা কচুরি কিনে চালিয়ে নেবে রাতটা। কালকের কথা রাত পোহালে ভাববে।

কিন্তু উপস্থিত সমস্যা হলো, রাতটা পোহাবে কোথায়? রসময় ঘোষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আজ রাত্তিরে ওর বাড়িতে ঠাঁই দেবে না শিবকুমারের। বাকি রইল বাসস্ট্যান্ডেরই কোনো চালা। কিংবা আশেপাশে এমন কোনো জায়গা, কোনো ইশ্কুল কিংবা মন্দিরের বারান্দা, যেখানে রাত কাটালে আপত্তি করবার কেউ থাকবে না। উপস্থিত সেই সন্ধানেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল শিবকুমার। আচমকা ল্যাংটেশ্বরই ওকে পেছন থেকে খামচে ধরে থামায়।

মনটা বেশ উচাটন ছিল শিবকুমারের। একটা জুতসই ডেরার জন্য মগজের মধ্যে দুশ্চিন্তাও ছিল খুব। এমন পরিস্থিতিতে আচমকা ল্যাংটেশ্বরের মুখোমুখি হতেই সামান্য প্রমাদ গোনে সে।

কোনোরূপ ভনিতা না করে সরাসরি প্রসঙ্গে চলে আসে ল্যাংটেশ্বর। খটখটে গলায় বলে, পয়সাটা কুথা লুকাইলি কাল?

আকস্মিক হকতচকিত ভাবটা কেটে গেছে ততক্ষণে। নিজেকে সামলে নিয়েছে শিবকুমার। মুচকি হেসে বলে, বলব কেন?

– বইলতে লাগব না। ল্যাংটেশ্বর ডানহাতের তর্জনীটা সমানে নাচাতে থাকে শিবকুমারের সামনে, জলদি বের কর টাকাটা।

সে-কথায় শিবকুমারের সারামুখ জুড়ে কান-এঁটো করা হাসি। তাতেই মুখখানি একেবারে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। সহসা গায়ের জামাটাকে পেটের ওপর অবধি তুলে ধরে বলে, ওইখানে  আছে, নিয়ে নাও।

ইঙ্গিতটা তৎক্ষণাৎ বুঝে ফেলে ল্যাংটেশ্বর। অর্থাৎ কিনা, কালকের গেঁড়িয়ে নেওয়া টাকাটা, পেটায় নমঃ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তার জন্য ল্যাংটেশ্বরের চোখেমুখে তিলমাত্র হাহাকার ফোটে না। টাকাটার পরিণতির কথাটা যেন আগাম জানত সে।

একটুক্ষণ গুম মেরে থাকে ল্যাংটেশ্বর। একসময় গম্ভীর গলায় শুধোয়, কার কাছে শিক্ষা? গুরুটি কে?

– হৃদয়নাথ।

নামটা শুনেই ল্যাংটেশ্বরের দুচোখে গাঢ় অবিশ্বাস ছলকে ওঠে, তুই হৃদয়নাথকে চিনিস?

শিবকুমার মাথা দোলায়। গলায় যৎপরোনাস্তি শ্লেষ ঢেলে বলে, না চিনলে গুরু হয়? কেমন জানি দ্বিধাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল ল্যাংটেশ্বরকে। শিবকুমারের মুখের ওপর সরাসরি চোখ রেখে শুধোয়, আর কী কী জানিস?

– বেশি কিছু নয়, কাগজ ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে আবার জোড়া লাগানো, দড়ি কেটে দুটুকরো করে আবার জুড়ে দেওয়া, লেবু কেটে রক্ত বের করা, রুমাল দিয়ে দুধ আনা, এইসব জানি।

ল্যাংটেশ্বরের চোখদুটি কয়েক পলক শিবকুমারের  মুখের ওপর স্থির হয়ে থাকে। একসময় সরাসরি শুধোয় সে, আমার  সঙ্গে থাকবি?

শিবকুমার জবাব দেয় না। আচমকা প্রস্তাবটা শুনে সামান্য দ্বিধায় পড়ে যায় বেচারা।

– খাইতে পাবি, হাতখচ্চা পাবি। লোভ দেখানোর ভঙ্গিতে বলতে থাকে ল্যাংটেশ্বর, সামনে হপ্তায় ধুবরিতে মেলা বসব। আমি পুরা দল লইয়া যামু ওখানে। তুইও যেতে পারিস আমার সঙ্গে।

– ধুবরি কোথায়?

– আসামে। এখান থেকে বেশি দূরে নয়। ফকিরগঞ্জের কাছে ব্রহ্মপুত্র পার হইলে উলটা দিকেই তো ধুবরি। সাকল্যে একদিনের পথ। যাবি?

শিবকুমার একটুক্ষণ ভাবে। একসময় বলে ওঠে, তোমার সঙ্গে গিয়ে আমার লাভ কী? তোমার তো ওই শেকড়বাকড়,                  মাদুলি-তাবিজ বেচা, আর ভগবানের কাছে পয়সা পাঠানোর ধান্ধা। আমি তো জাদুটা শিখতে চাই, বিদ্যেটার ভেতরের গুপ্তরহস্যটাকে বুঝতে চাই।

– দূর পাগলা। ল্যাংটেশ্বর ঠোঁট উলটে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, ধুবরির মেলায় আমি কি ওইসব করুম নাকি? কত বড় মেলা,              কত-কত লোকের জমায়েত সেখানে! গোটা দলটাকে লইয়া আমি দস্ত্তরমতো জাদুর খেলা দেখামু সেখানে।

– তোমার জাদুর দল রয়েছে বুঝি?

– রয়েছে বইকি, কিন্তু এই ছোট্ট গঞ্জের বাসস্ট্যান্ডে গোটা দলের খরচ-খরচা উঠব না। তাই একা-একা এখানে বসে দু-চার পয়সা ধান্ধা করছিলাম। মেলায় যাইব আমার পুরা দলটাই। তুইও থাকবি সেই দলে। দুচারটা হাতসাফাইয়ের খেলা দেখাবি।

শিবকুমার ভারি দোটানায় পড়ে যায়।

ততক্ষণে ল্যাংটেশ্বর নামের লোকটাকে সে বুঝে ফেলেছে। লোকটা যে একনম্বরের ধড়িবাজ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই তার। হাতসাফাইয়ের খেলাগুলো বেশ ভালোই জানে বটে, তবে তার সবকিছুই তো শেকড়-বাকড়, মাদুলি-কবচ বেচা, আর ভগবানের কাছে পয়সা পাঠানোর ধান্ধা। জাদু দিয়ে লোকটা বাজে ধান্ধা করছে। জাদুর গায়ে কালি দিচ্ছে। জাদুবিদ্যাকে লোক ঠকানোর কাজে ব্যবহার করছে। এতবড় পাষন্ড।

তবু ওর দেওয়া প্রস্তাবটাকে মগজ থেকে এক্কেবারে হটিয়ে দিতে পারে না শিবকুমার। ল্যাংটেশ্বরের দলে ভিড়ে গেলে তার খাদ্য আর আশ্রয়ের সংকটটা যে আপাতত দূর হয়। ওই সুযোগে একটুখানি সময় নিয়ে হৃদয়নাথকে খুঁজে বেড়ানোও যায় তাহলে। কিন্তু ভয়ও রয়েছে অন্যত্র। ল্যাংটেশ্বরের দলে থাকতে গিয়ে হৃদয়নাথকে খোঁজার তাগিদটা যদি কমে যায় শিবকুমারের, তখন? তখন তো আমও যাবে, ছালাও যাবে। অর্থাৎ কিনা জাদুটা যাবে, পাঁচবিবির গড়টাও। অথচ শিবকুমার তো শুদ্ধ জাদুটাকেই ভালোবেসেই ঘর ছেড়েছে। ওই কারণেই তো সুরক্ষিত, সুনিশ্চিত, বিলাস-বৈভবে ভরা গোটা জীবনটাকেই দাঁওতে লাগিয়ে দিয়েছে। এই সবকিছুর বিনিময়ে বিদ্যাটার গভীরে পৌঁছতে চাইছে সে। সে তো আগাম স্থির করেই ফেলেছে, যদি কখনো হৃদয়নাথের সঙ্গে দেখা হয়, যদি ওর চেলাগিরি করে বিদ্যাটি রপ্ত করতে পারে সে, তবে হৃদয়নাথের মতো শো অবশ্যই করবে, তার জন্য টাকাও নেবে, কিন্তু জাদুবিদ্যাকে কখনোই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা উপার্জনের জন্য ব্যবহার করবে না। কেন কি, জাদুর মাধ্যমে যে-কোনো উপায়ে প্রচুর টাকা কামানোটাই উদ্দেশ্য হলে, পাঁচবিবির জমিদারিটা কী দোষ করেছিল? জ্যোতিকুমারের পাঁচ মেয়ের পর একমাত্র পুত্রসন্তান শিবকুমার। এখনো অবধি জমিদারির  একমাত্র উত্তরাধিকারী। ওই জমিদারি থেকে যা আয়, জাদু দেখিয়ে তার হাজার ভাগের এক ভাগও মিলবে না। তবু জাদুর টানে সে এমন পাগলের মতো ভেসেছে। শহরের ইংরেজি স্কুলের পড়াশোনা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে, নিজের ইহকাল পরকাল একেবারে ভুলে গিয়ে উন্মাদের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে হৃদয়নাথকে। কারণ, হৃদয়নাথের কাছে জাদুটা রয়েছে। লোকটা যত কাঠখোট্টাই হোক না কেন, জাদুটাকে ঠিকঠাক বুঝেছে। বয়েও বেড়াচ্ছে বিদ্যেটাকে। ল্যাংটেশ্বরের মতো জাদুকে দিয়ে নোংরা কাজ করাচ্ছে না।

যে-জাদুকে এমন সর্বস্ব পণ করে খুঁজতে বেরিয়েছে শিবকুমার, অন্তত ল্যাংটেশ্বরের সঙ্গ ধরলে যে তা কোনো দিনও পাবে না সে, এখনই তা মালুম হচ্ছে। অথচ হৃদয়নাথকে খুব জলদি পেয়ে যাবারও আশা নেই। খুব সম্ভব স্রেফ প্রাণটা বাঁচাতেই শিবকুমারকে ধোঁকা দিয়ে অন্য কোনো দিকে পালিয়েছে সে। কাজেই, যতদিন না ওর দেখা পাচ্ছে শিবকুমার, ততদিন কোনো একটি ঠাঁই ধরে বেঁচে থাকতেই হবে ওকে। পথেঘাটে বেশিদিন এই অনিশ্চিত জীবন সইবে না ওর।

এছাড়াও কথা আছে। হৃদয়নাথকে কতদিন বাদে খুঁজে পাবে, আদৌ পাবে কিনা, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু সময় তো বয়ে যাচ্ছে। সময় হলো তরল সোনার নদী। রাজশাহী হাইস্কুলের হেডমাস্টার মণিশঙ্কর স্যার প্রায়ই বলেন কথাটা। প্রকৃতির বুকে বয়ে যাওয়া নদীর চেয়ে ঢের বেশি মূল্যবান হলো সময়-নদী। আর বয়ে যাচ্ছে কিনা তোমার-আমার সবাইয়ের জীবনের ওপর দিয়ে। খুব ভারি ভারি কথা খুব সুন্দরভাবে বলতে পারেন হেডস্যার। স্কুলের কথা, হেডস্যারের কথা মনে হতেই শিবকুমারের খেয়াল হয়, আর মাত্র কদিন বাদেই ছুটি ফুরোবে, স্কুল খুলবে। সেই স্কুলে শিবকুমারের সম্ভবত আর যাওয়া হবে না। কারণ হৃদয়নাথের জাদু দেখবার পর, মেজোকাকার ঘরটার মধ্যে ঢুকবার পর, তাঁর ডায়েরিটা পড়বার পর, জাদুপত্রিকা ও জাদুর সরঞ্জামগুলো দেখবার পর, জাদুটা এতটাই প্রবলভাবে টানছে, শিবকুমারের সাধ্য নেই সেই টানকে অগ্রাহ্য করে। নইলে, কেউ কি কোনোদিন স্বপ্নেও ভেবেছিল, পাঁচবিবির জমিদারবাড়ির ছেলে মিঠাইয়ের দোকানের বারান্দায় শুয়ে রাত কাটাচ্ছে! দৃশ্যটা দেখতে লাগবে না, কেবল অন্যের মুখ থেকে শুনলেই বুক চাপড়াবে বাবা। তৎক্ষণাৎ মূর্ছা যাবে  মা। সেই মূর্ছা আর ভাঙবে না।

শিবকুমার ভাবতে থাকে। ভাবতেই থাকে। যে-উদ্দেশ্যে সে এতখানি ঝুঁকি নিল জীবনে, এতখানি হারাবার জন্য প্রস্ত্তত হয়েছে মনে মনে, ল্যাংটেশ্বরের সঙ্গ ধরলে কি তার সেই আসল উদ্দেশ্যটা সাধন হবে, নাকি পন্ড হবে?

ভাবতে ভাবতে একটা সম্ভাবনা উঁকিঝুঁকি মারে শিবকুমারের মনে। ধুবরির মতো বিশাল মেলায়, বলা যায় না, হৃদয়নাথের দলের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যেতেও পারে। এত বড় মেলায় সেও কি তার দল নিয়ে হাজির হবে না?

শেষ অবধি সাত-পাঁচ ভেবে ল্যাংটেশ্বরের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় শিবকুমার। একটা কোনো পাকাপোক্ত ঠাঁই না ধরলে সে হৃদয়নাথকে খুঁজে বের করবে কী করে? পথেঘাটে তো আর দিনের পর দিন বাস করা চলে না। রসময় ঘোষের মতো মানুষেরা তো আর বিনে পয়সায় দিনের পর দিন খাবারও দেবে না, রাতের বেলায় বাড়িতেও ঠাঁই দেবে না। এই বেলা একটা পাকাপোক্ত ঠাঁই না ধরতে পারলে অগত্যা ওকে পাঁচবিবিরগড়েই ফিরে যেতে হবে। সেখান থেকে রাজশাহী ইংরেজি স্কুলে। সেখান থেকে পাশ দিয়ে তাকে একদিন ফিরে আসতে হবে পাঁচবিবির গড়ে। কালেকালে জমিদারির দায়িত্ব নিতে হবে কিন্তু জাদুটা তার জীবন থেকে একটু একটু করে হারিয়ে যাবেই। সেই ক্ষতিটা কতখানি সইতে পারবে শিবকুমার সে ব্যাপারে তার মনে ঘোরতর সন্দেহ জেগেছে এখনই। কাজেই, যতদিন না হৃদয়নাথের দেখা মিলছে, এলোমেলো ঘুরে বেড়িয়ে সময় নষ্ট না করে ল্যাংটেশ্বরের কাছ থেকে কিছু পাঠ তো নেওয়া যেতেই পারে। হাজার হোক, হাতসাফাইতে লোকটা তো ওস্তাদ। শিবকুমারের স্কুলের হেডস্যার বলেন, মানুষের জীবনের সময় হলো একটা তরল সোনার নদী। সেই অমূল্য সময়কে                     এমনি-এমনি বয়ে যেতে দেওয়া কি ঠিক?

অনেক ভেবেচিন্তে শেষ অবধি ল্যাংটেশ্বরের প্রস্তাবেই রাজি হয়ে যায় শিবকুমার। সন্ধে নামলে পর ওর সঙ্গেই চলে যায় ওর ডেরায়।

গঞ্জের একপ্রান্তে একটি কুঠুরিঘর ভাড়া নিয়ে একাই থাকে ল্যাংটেশ্বর। সেদিন রাতের খাওয়া শেষ হলে পর ল্যাংটেশ্বরের সঙ্গে অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা চলে অনেক রাত অবধি। ল্যাংটেশ্বর তার জীবনের গল্প শোনায় শিবকুমারকে। তার ঘরসংসারের কথা শোনায়। পঞ্চগড় পেরিয়ে তেঁতুলিয়া গাঁয়ে বাড়ি ল্যাংটেশ্বরের। সেখানে তার বউ, ছেলেমেয়ে সবাই রয়েছে। তারা সবাই ল্যাংটেশ্বরের ওপরই নির্ভর করে রয়েছে।

শিবকুমার কর্কশ গলায় শুধোয়, কিন্তু তাই বলে জাদুবিদ্যা দিয়ে মানুষ ঠকাচ্ছ কেন?, জাদুকে জাদু হিসেবে দেখালেই তো পার।

ল্যাংটেশ্বর ক্ষণিকের তরে বুঝি অন্যমনস্ক হয়ে যায়। একসময় বলে, তাই তো দেখাইতাম রে। তাতে আমার যা আয় হইত, তাতে কইরা পেট ভরত না অধিকাংশ দিন। মানুষ বড় আজব প্রাণী, বুঝলি। সোজা আঙুলে তাদের থেকে ঘিয়ের কণামাত্রও আদায় করা সম্ভব নয়। বাঁকা আঙুলেই সিধা হয় তারা। ধর্, এই পামিংয়ের খেলাটা যদি জাদু হিসাবে দেখাইতাম, খেলার পর ভিখিরির মতো হাত পাইত্যা বলতে হতো, যদি আমার খেলা দেখে আপনাদের ভালো লাগে তো এই গরিব জাদুকরকে দু-চার পয়সা দিয়ে যাবেন। দু-চারজন দু-চার পয়সা, ঠিক ভিখিরিকে ভিক্ষা দেবার মতো কইরা ছুইড়া দিত চটের ওপর। কিন্তু তাই বা কজনা। অধিকাংশ মানুষই, যারা গতকাল এতক্ষণ বুঁদ হইয়া খেলা দেখসিল, ভগবানের কাছে পয়সা পাঠিয়ে দশগুণ ফেরত পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল, কেবল পামিংয়ের খেলাটা দেখালে তারা কী করত বল্ দেখি? অকস্মাৎ সম্বিত ফিরত অদের। অকস্মাৎ যেন তার হুঁশ হইত, কিনা, এই ফালতু তামাশা দেখতে গিয়ে তাদের ফালতু নষ্ট হয়ে গিয়েছে অনেকখানি সময়। এবং এক্ষুনি রওনা দিতে না পারলে বাড়ি পৌঁছতে রাত হয়্যা যাবে। কাজেই, তারা আর তিলেক সময় না দাঁড়িয়ে এমনভাবে হনহনিয়ে হাঁটা দিত, যেন ল্যাংটেশ্বরের আবেদনটা ওদের কানে যায় নাই। অথচ, দেখলি তো, দু-টাকা দিয়ে লাখ টাকা পাওয়ার গল্পটা শোনামাত্তর কেমন ঠাকুরের কাছে পয়সা পাঠাবার হিড়িক পইরা গেল!

শিবকুমার মন দিয়ে শুনছিল  ল্যাংটেশ্বরের কথাগুলো। একসময় বলে, তবে তোমার হাতটি খাসা। মামুলি খেলাগুলোও বেশ দেখালে।

সে-কথায় ল্যাংটেশ্বরের সারামুখে শ্লাঘা জমে। দুচোখ কপালে তুলে দিয়ে বলে, আমি কার শিষ্য জানিস? খোদ আত্মারামের চতুর্থ পুরুষ সে।

আত্মারামের কথাটা মেজোকাকা শ্রুতিকুমারের ডায়েরিতেও লেখা রয়েছে। ওইসঙ্গে তার সংক্ষিপ্ত জীবনীও।

ল্যাংটেশ্বরের কথা শুনে সেই কারণেই চোখ আকাশে উঠে যায় শিবকুমারের। বলে, বলো কী। তুমি তো তবে বেশ বড় ঘাটে নাওটি বেঁধেছিলে। লেগে থাকলে জাদুকর হিসেবে নাম হতো তোমার। দেশজুড়ে খ্যাতি হতো।

– তাতে করে কোন কাঁচকলাটি হইত আমার? বলতে বলতে চরম ঘৃণায় ঠোঁটজোড়া বেঁকে যায় ল্যাংটেশ্বরের, এদেশে জাদুর কদর করে কে? এদেশে জাদুকর মানেই ভেলকিওয়ালা।

বলতে বলতে লম্বা করে হাই তোলে ল্যাংটেশ্বর। বলে, জাদু নিয়া অধিক তত্ত্বকথা কপচিয়া লাভ নাই বাপ। যার ললাটে যা-দিয়া অন্ন জোগাড়ের কথা লেখা রইসে, সে হেই উপায়েই তা করব। ইয়ার কোনো অন্যথা হওয়ার উপায় নাই বাপ। আর, অন্নসংস্থানের জন্য যে-কোনো ধরনের কাজই শাস্ত্রসিদ্ধ। কাজেই, রাত হয়েসে, শুয়্যা পর। বড্ড ঘুম পাস্সে আমার।

এই মাঝরাতে ল্যাংটেশ্বরের ঘুম পেতেই পারে, কিন্তু ওর শেষ উক্তিটিতে শিবকুমারের রাতের ঘুমটি যে উবে গেল। বলে কিনা, যার ললাটে অন্নগ্রহণের যে-উপায় লেখা রয়েছে, সেই উপায়েই অন্নের জোগাড় করতে হবে তাকে! তবে কি জাদুকে ভালোবেসে, বিদ্যেটার চর্চা করে, বিদ্যেটাকে আরো দুকদম এগিয়ে দিতে দিতে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া নয়, জাদুটাকে কেবল অন্নসংস্থানের জন্যই ব্যবহার করতে হবে শিবকুমারকে। সেই কারণেই সে কিনা ছেড়ে এলো বাবা-মা-আত্মীয়কুলকে। ছিন্ন পাদুকার মতো পরিত্যাগ করতে চলেছে পাঁচবিবির গড়ের অতুল সম্পদ!

ততক্ষণে ভোঁসভোঁসিয়ে নাক ডাকছে ল্যাংটেশ্বরের।

পাশটিতে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে শিবকুমার। কিছুতেই ঘুম আসে না চোখে।

 

দশ

শেষ রাতে লালমনিরহাট ছেড়েছিল গোটা দলটা। শুরু হয়েছিল ভ্রাম্যমাণ জীবনে আরেক যাত্রা। আবছা অাঁধারে মাথা-ঘাড়ে জাদুসামগ্রীর বোঝাগুলো চাপিয়ে নিয়ে পথ হাঁটছিল সাকল্যে সাতটি প্রাণী। মাথার ওপর ওদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছিল শেষরাতের ক্ষয়া চাঁদটা। আর, লাখ লাখ মিটিমিটি চোখ আকাশ থেকে দেখছিল দৃশ্যটা।

ব্রহ্মপুত্রর পাড়ে এসে যখন পৌঁছল দলটা, ততক্ষণে ডালেপালায় বেলা। গাছগাছালির শাখায় শাখায় মিঠে রোদ্দুরের মাখামাখি। ধুবরি যাবার খেয়াঘাটটি জমে উঠেছে।

খেয়াঘাটের কাছাকাছি পৌঁছে ল্যাংটেশ্বর বলে ওঠে, মালপত্তর সামালকে। ফেরিঘাট বড়ই খতরনক ঠাঁই। এখানে নুইয়া পড়লেই অন্ডকোষটি খোয়া যাবার ভয়।

ল্যাংটেশ্বরের দলে রয়েছে পাঁচটি চেলা। পাঠান, অর্জুন, নগেন, ভোলা আর কার্তিক। শিবকুমারকে নিয়ে ছয়। ছোকরাগুলোর চেহারা, মতিগতি ও হাঁটন-চলন দেখতে দেখতে দমে যায় শিবকুমার। ওদের মধ্যে পাঠান নামের ছোকরাটিই বেশি চোখেমুখে। ল্যাংটেশ্বরও বেশি পাত্তা দিচ্ছিল ওকেই। ছোকরার গায়ের রং কালো। বেশ পেটাই চেহারা। মাথায় বালিবর্ণের ঝাঁকড়া চুল ঘাড় অবধি লতিয়ে নেমেছে। বেশ রাগি রাগি চোখ। দাগি দাগি চেহারা। সারাক্ষণ চোখেমুখে এক ধরনের চোয়াড়ে ভাব। অর্জুন নামের ছোকরাটি বেশ লম্বা, ছিপছিপে, ঘোড়ার মতো লম্বাটে মুখ, দেখলেই বোঝা যায়, বদের ডিপো। নগেন আর কার্তিক খানিকটে ছিঁচকে গোছের। সারাক্ষণ খিস্তিখেউড় করে, আর চাপা গলায় হরেক প্যাঁচ কষে। ওদের মধ্যে কেবল ভোলাটাই যা অন্যরকম। অতি সাধারণ চেহারা। বোকা বোকা চাউনি। সবার বকুনি খেয়েও চুপ মেরে থাকে। দলের অন্যরা সারাক্ষণই খাটায় ওকে। ভোলাও মুখ বুজে সবার সব জুলুম মেনে নেয়।

ছোকরাগুলোকে দেখতে দেখতে শিবকুমার বুঝতে পারে, একেবারে বস্তির ছেলে সবকটা। একেবারে যাকে বলে হাভাতে। শিক্ষাদীক্ষার বালাই নেই। আচারে-আচরণে সর্বদা নিম্নরুচির ছাপ। সারাক্ষণ ঠোঁটের তলায় খইনি চেপে রেখেছে। পুকপুক করে বিড়ি টানছে আর গলগলিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে। আর, নিজেদের মধ্যে যখন কথাবার্তা বলে, এতটাই অমার্জিত তা, শিবকুমারের গা ঘিনঘিন করে ওঠে।

শিবকুমারকে দেখতে দেখতে ওদেরও ভুরুতে ভাঁজ পড়ে। ল্যাংটেশ্বরকে একান্তে শুধোয়, এ কাকে আমদানি করলে ওস্তাদ? দেখে তো মনে হচ্ছে একেবারে অন্য ডালের পাখি।

ল্যাংটেশ্বর ওদের ধমক দিয়ে থামায়। বলে, থাম্, মেলা চিল্লাসনি। শুনতে পাবে গা।

একটুখানি থামে ল্যাংটেশ্বর। তারপর শিবকুমারের কান বাঁচিয়ে চাপা গলায় বলে, ওর পরিচয়টা আমিও ঠিক জানি নাই। নিজেকে লিয়া একটা গল্প অবশ্য ছারছে বাজারে, তবে আমি জানি, হেটা ঠিক নয়। মনে হস্যে, কোনো রইস বাড়ির পোলা, কোনো কারণে বাড়ি থেকে সট্কাইসে। সম্ভবত জাদুর টানেই সট্কাইসে। জাদুর হাতটা  অবশ্য দারুণ। পয়সার খেলাগুলো দেখাইয়া আমাকেও তাক লাগাইয়া দিসে। তো, ভেসে বেড়াচ্ছে দেখে ভাবলাম, সঙ্গে থাক্, কামে লাগব।

– কামে লাগব? এতক্ষণে ওস্তাদের ওপরই তেড়েফুঁড়ে ওঠে পাঠান। বলে, এই কাঁচা কাত্তিকটি কুন কামে লাগব শুনি?

পাঠানোর কথায় গুম মেরে যায় ল্যাংটেশ্বর। গম্ভীর গলায় বলে, কামে লাগা মানে, কইলাম যে, জাদুর হাতটি তুখোড়। তো ভাবলাম, ভালো ঘরের বাড়ি-পালানো পোলা, সঙ্গে রাখিয়া দিলে ভবিষ্যতে কামে দিব তা। আরে, বুঝিস নাই ক্যান? পাঠানের দিকে তাকিয়ে একচোখ টিপে হাসে ল্যাংটেশ্বর, পোলাটারে খুঁইজা খুঁইজা আলা  হয়্যা ওর বড়লোক বাপ যদি শ্যাষম্যাশ আমাদের আশ্রয়ে পায় অরে তবে তো পাথরে পাঁচ কিল। মনে হস্যে, পোলাডার বাপের অগাধ টাকা! সহসা ঠোঁটের ডগায় ঝুলে থাকা হাসিটাকে সুরুৎ করে টেনে নিয়ে বলে, ধর্, তেমনটা যদি নাও ঘটে, তাইলেই বা ক্ষতি কী আমার? মাইনেপাতির বালাই নাই, কেবল দুবেলা চাড্ডি খাবে, আর দলের হাজারো ফ্যাক খাটবে। চাই কি দু-চারডা পামিংয়ের খেলা দেখাইয়া তাক লাগাইয়া দিবে পাবলিকরে। বলতে বলতে পুনরায় চোখ মটকায় ল্যাংটেশ্বর, কী বুছস্?

ল্যাংটেশ্বরের কথায় একেবারেই খুশি হয় না পাঠান। বলে, কার ছেলে, কেন ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিছুই জানা নাই, শেষমেশ না ফ্যাসাদে পড়তে হয়।

– সে ভয় নাই। ডান হাতে বরাভয় মুদ্রা বানিয়ে ল্যাংটেশ্বর অভয় দেয় চেলাকে, নিজের ইচ্ছায় ঢুকেছে দলে, আমি তেমন করিয়া ডাকি নাই। তেমন বোধ করলে পাছায় ক্যাঁৎ কইরা একটা লাথি কষাইয়া ভাগাইটা দিমু। বলতে বলতে সবার দিকে তাকায় ল্যাংটেশ্বর, তবে ওরে বেশি চমকাস না তুয়ারা।

একসময় মালপত্তর নিয়ে স্টিমারে ব্রহ্মপুত্র পেরোয় ওরা। ততক্ষণে শিবকুমার বুঝতে পেরেছে, ল্যাংটেশ্বর ওদের ওস্তাদ হলেও গোটা দলটার দেখভাল পাঠানই করে। দলে অন্য ছোকরারা ওকে ভয়ও পায়, সমীহও করে। ওর একটি ধমকে সবাই কেঁচো হয়ে যায়।

মেলাচত্বরে ঢুকে প্রথমেই কর্মকর্তাদের কাছে মেলা ফি বাবদ টাকা জমা দেয় ল্যাংটেশ্বর। তারপর মেলার একপ্রান্তে একটা ঝাঁকড়া গাছের তলায় চটপট একটা মাঝারি আকারের তাঁবু টাঙিয়ে ফেলে। যাবতীয় মালপত্তর সাজিয়ে রাখে তাঁবুর মধ্যে।

শিবকুমারের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে ল্যাংটেশ্বর, কী দ্যাখস্? হেটাই আমাগো রাত্রিবাসের আস্তানা হইব।

তাই শুনে শিবকুমারের তো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। বলে, ওইটুকু তাঁবুর মধ্যে সাত-সাতটা মানুষ থাকবে কী করে? শোবে কোথায়?

সে-কথায় খ্যাকখ্যাক করে হাসে পাঠান। বলে, আমরা তো শুবো বাইরে। তাঁবুর মধ্যে তুই একাই শুবি। তর লগে পালঙ্কের অর্ডার দেওয়া হয়েসে। সেটা আইল বলিয়া।

হাত তুলে পাঠানকে থামায় ল্যাংটেশ্বর। শিবকুমারের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের ফাঁকে হাসে। বলে, তোরে দেইখাই আমার মনে হয়েসিল, এলেবেলে ঘরের পোলা তুই নোস। এখন তোর কথা শুনে প্রত্যয় হইল মনে। খাট-পালঙ্কে শোবার অভ্যেস তোর। তাই এমনটা মনে হস্যে। শোন, তবে, আমরা এভাবেই থাকি। রাতের বেলায় দেখতে পাবি, তাঁবুর মধ্যে কেমন কইরা শুই আমরা।

কোনো কিছুর গোড়াপত্তনের মুহূর্তে কতকিছু মাথায় রাখতে হয় ল্যাংটেশ্বরকে। কত প্রারম্ভিক কাজকর্ম সেরে রাখতে হয়! নচেৎ আখেরে ভুগতে হয়। ল্যাংটেশ্বর, কাজেই, ঘনঘন পরামর্শ-নির্দেশ দিচ্ছিল সাগরেদদের। একসময় পাঠানের দিকে তাকায় সে। বলে, আমি একটুখান বারাইত্যাসি। কামগুলা সারিয়া রাখিস।

দ্রুত পায়ে চলে যায় ল্যাংটেশ্বর। লালমনিরহাট থেকে ধুবরি অবধি মালপত্তরসহ পৌঁছানোর ধকল কাটতে না কাটতেই আবার কেন বেরোল ওদের ওস্তাদ, সেটা বুঝতে বিলম্ব হলো না সাগরেদদের। বাস্তবিক ল্যাংটেশ্বরের এই সফরের উদ্দেশ্য বহুবিধ। প্রথমত, দেখেশুনে আসর পাতবার একটি উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করা দরকার। বাস্তবিক, একটা মেলাতে প্রত্যেক ধরনের দোকানের সাফল্য নির্ভর করে মেলার মধ্যে তার অবস্থানের ওপর। মিঠাই- তেলেভাজা থেকে আচার, পুঁতির মালা থেকে চুড়ি-দুল, বাসনকোসন থেকে কাপ-ডিশ, নাগরদোলা, চিড়িয়াখানা, জোড়ামুন্ডওয়ালা শিশু অথবা জাদু-বাজির আসর, উপযুক্ত জায়গাটিতে না বসলেই মার খেয়ে যাবে। কোন দোকানের ক্ষেত্রে উপযুক্ত জায়গাটি কেমন হবে, তার কিছু মাপকাঠি রয়েছে। নাগরদোলার আশেপাশেই বসবে বাসনকোসন, চুড়ি-দুলের দোকানগুলো। তাতে করে বাচ্চারা নাগরদোলায় চড়ে স্ফূর্তি করবে, ওই ফাঁকে বাসনকোসন, চুড়ি-দুলের দোকানগুলোতে কেনাকাটা সেরে নেবে মায়েরা। মিঠাই, তেলেভাজা, চা ও পান-বিড়ির দোকান বসবে কাছাকাছি। আবার পুলিশ-গুমটির ত্রিসীমানায় মদ-গাঁজার দোকান অথবা লোক ঠকানোর ব্যবসা, ঝুন্ডি, বেলুন-ফাটানো, হরেক মালের ওপর রিং ফেলা, হাতগোনা, খাঁচার টিয়ে, নৈব নৈবচ। কাজেই আসর পাতবার জায়গাটা সবার আগে স্থির করে ফেলতে হবে ল্যাংটেশ্বরকে। তাবাদে, কেবল আসর পেতে মাল কামালেই তো হলো না, মাল কামানোর উৎসাহটি পেতে গেলে যা-যা দরকার সেসবের খোঁজও আগাম সেরে রাখতে হবে তাকে। কাজেই, মেলার মধ্যে মালের ঠেকগুলি কোনদিকে বসছে, আর রেন্ডিদের ডেরাটাই বা কোনদিকে, সেসবেরও হালহদিস নিয়ে আসবে ল্যাংটেশ্বর। সবশেষে, ফিরতি পথে দু-পাত্তর চড়িয়ে ফিরবে। আর, যখন ফিরবে ল্যাংটেশ্বর, চেলারা দেখবে,  লালমনিরহাট থেকে বেরোনোর পরে পদেপদে ব্যাজার হচ্ছিল যে ল্যাংটেশ্বর, এখন বেশ ফুরফুরেটি লাগছে ওকে। কিংবা এতক্ষণ দুর্ভাবনায় মুখমন্ডলে জমেছিল যে-কালো মেঘগুলো, ওগুলো উড়ে গিয়েছে কখন। তার বদলে বেশ মাখোমাখো লাগছে ল্যাংটেশ্বরকে। চোখদুটি ঈষৎ ঢুলঢুল, পাদুটি  ঈষৎ টলোমলো, আর সারা মুখমন্ডলে দইয়ের ওপরের মালাইয়ের মতো খুশি জমেছে পুরু করে। চাইকি, স্ফূর্তির বহরটা অধিক হলে, ঠোঁটের ডগায় একটা রসের গানও গুনগুনাতে পারে। আর তাতে করে সাগরেদরা মুহূর্তেই বুঝে ফেলে, সর্বকর্ম সিদ্ধি অন্তে, সবকিছুই জয় করে, ফিরছে ওদের ওস্তাদ। সেই কারণেই স্ফূর্তির প্রাণ অমন ডবল-গড়ের মাঠ।

ততক্ষণে অাঁচের উনুন জ্বালিয়ে রান্না চাপিয়ে দিয়েছে সাগরেদরা। খিঁচুড়ি আর আলুভাজা। শিবকুমার পাঠানদের আশেপাশে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে থাকে। আর, একেলা হাওয়ামাত্র অকস্মাৎ তার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে মা কাত্যায়নী ও বাবা জ্যোতিপ্রকাশসহ গোটা পাঁচবিবির গড়টা। একসময় হৃদয়নাথের মুখখানাও মনের আয়নায় ভাসতে থাকে। আর তৎক্ষণাৎ অভিমানে ভারি হয়ে আসে শিবকুমারের বুক। এমনই চালবাজ সে, নিপাট ভালোমানুষটি সেজে শিবকুমারকে পুরোপুরি ধোঁকা দিয়েছে। একদিকে যাবে বলে নিঃশব্দে চলে গিয়েছে অন্যদিকে। আর, এমনই পাকা অভিনয়, শিবকুমার  তিলমাত্র মালুম পায়নি তা।

হৃদয়নাথের চেয়েও শিবকুমারের ঢের বেশি কৌতূহল ওর ওই সিন্দুকটাকে নিয়ে। সিন্দুকের মধ্যে বন্দি বীরটাকে নিয়ে। হৃদয়নাথ কথা দিয়েছিল, শিবকুমারের শরীরটাকে সুরক্ষিত করে নেবার পর বীরটাকে দেখাবে। সেটাও কি পুরোপুরি ধোঁকা ছিল? ভেবে পায় না শিবকুমার। ওই একদিন সন্ধের আলো-অাঁধারিতে সদরদিঘির উত্তরপাড়ে ছায়া ছায়া হয়ে হাজির হয়েছিল বীরটা, আর দ্বিতীয়বার সিন্দুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে মঞ্চজুড়ে তান্ডব বাধিয়েছিল। ব্যস, আর কোনোদিন ওকে চর্মচক্ষে দেখেনি শিবকুমার। একটা অলৌকিক প্রাণী, কখনো সূক্ষ্ণ শরীরের বিচরণ করে, মানুষজন চর্মচক্ষে দেখতেই পায় না ওকে, আবার কখনো সে দানবের আকার ধরে জাদুমঞ্চজুড়ে তান্ডব চালায়। এমন আশ্চর্য প্রাণীটাকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখবার বড় সাধ ছিল শিবকুমারের। সম্ভবত সেটা অাঁচ করেই হৃদয়নাথ ওকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়েছে।

বেশ দেরি করে ফেরে ল্যাংটেশ্বর। এক্কেবারে ঠায় দুপুরে। ততক্ষণে রান্নাবান্না শেষ করে পাঠানের দলটা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ওস্তাদের ফেরার আশায়। একসময় ওরা দেখতে পায়, খানিক তফাতে টলোমলো পায়ে আসছে বটে ওস্তাদ, তবে তার হাঁটার মধ্যে খুশির সেই চেনা ছন্দটি একেবারেই নেই।

কাছে আসতেই মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে, মুখমন্ডল জুড়ে দইয়ের ভাঁড়ে মালাইয়ের মতো যে সুখটুকু দেখতে অভ্যস্ত ছিল পাঠানরা, ওস্তাদের মুখমন্ডল থেকে এই মুহূর্তে তা বিলকুল উধাও। তার বদলে কে যেন একপোঁচ কালি লেপে দিয়েছে ওর সারামুখে।

ডেরায় পৌঁছেই তাঁবুর সামনেটিতে ধপ্ করে বসে পড়ে ল্যাংটেশ্বর। একটা বিড়ি ধরিয়ে ভোঁসভোঁস করে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে। অথচ পাঠানরা বিলক্ষণ জানে, এটা ওস্তাদের বিড়ি খাওয়ার সময়ই নয়। এক্ষেত্রে চিরকালই যেটা ঘটতে দেখেছে পাঠানরা, তা হলো, সারা মুখমন্ডল থেকে খুশি ছলকাতে ছলকাতে ডেরায় পৌঁছেই ওস্তাদ উদার গলায় বলে উঠবে, কি রে তোরা খাইসনি এখনতক্কো? খাইয়া নিলেই তো পারতিস। আমার তো হাজার-গন্ডা কাম সারিয়া ফিরতে দেরি হইবই। জানিসই তো সেটা। বলতে বলতে সাজিয়ে রাখা পাতটির গায়ে ধপ্ করে বসে পড়বার কথা ওস্তাদের। কিন্তু আজ যখন ফিরল ল্যাংটেশ্বর, যেন এক দুঃখের পুঁটলিটি। এসে আবার বিড়ি ধরাল। বিড়ি টানবার ধরনেই একজন নেশাখোর মানুষের মনোজগতের বারো আনা হালহদিস বুঝে ফেলা সম্ভব। কেবল বিড়িতে টান মারা আর ধোঁয়া ছাড়ার ধরনেই নির্ভুলভাবে বোঝা যায় তা। কাজেই, পাঠানরা সববাই বুঝে ফেলে, কোনো একটা মুসিবতে পড়েছে ল্যাংটেশ্বর, অর্থাৎ কিনা গোটা দলটা।

একসময় পাঠান সাহস করে বলে ওঠে, এত দেরি হইল যে? খাবার ঠান্ডা হয়্যা গেল।

– খাবার? সহসা একেবারে হেদিয়ে পড়ে ল্যাংটেশ্বর, খাবার খাওয়া বোধ করি ঘুঁইচ্যা গেল রে পাঠান…।

– কেন? কী হইসে? সন্ত্রস্ত মুখে বলে ওঠে পাঠান।

– আমাগো কপালটা পুরসে রে পাঠান। এতক্ষণে একেবারে হাহাকার করে ওঠে ল্যাংটেশ্বর, শালা, পাক্কা তিন বছর বাদ ধুবরির মেলায় আসগর আইসা হাজির।

– অ্যাঁ? বলো কি ওস্তাদ? ততক্ষণে কেবল পাঠানই নয় শুকিয়ে গেছে দলের সবগুলো মুখ। কেবল শিবকুমারই বুঝতে পারছে না কিছুই। সে কেবল ফ্যালফ্যাল করে এর-ওর মুখের পানে তাকাতে থাকে।

পাঠান ভয়ার্ত গলায় বলে ওঠে, এ তো সর্বনাশের সাতকাহন।

অর্জুন বলে ওঠে, চলো, মেলা-কমিটির থিকে টাকা ফেরত লিয়া এই বেলা ফিরিয়া যাই। কুনো গঞ্জে গিয়া আসর পাতি।

নগেন বলে, গৌরীপুর বাজারটা মন্দ নয় ওস্তাদ। বাজারের মধ্যেই বাস-ডিপো। পাশেই রেলের ইস্টেশন। পড়তি বিকালে বেশ জইম্যা যায়। তখন সক্কলের ঘরে ফেরার তারা। এক্কেবারে কাছাখোলা অবস্থা…। জইম্যা যাইব গা।

– থাম। সহসা নগেনের ওপর বাঘের ঝাপট নেয় ল্যাংটেশ্বর, ওই বেজম্মা আসগরটার লাইগ্যা লেজ তুইল্যা দৌড় লাগামু আমি! ল্যাংটেশ্বররে এতদিনে এই চিনলি তোরা? বলতে বলতে ভোলার দিকে তাকায় ল্যাংটেশ্বর, ভোলা খাবার দে।

তাঁবুর সামনে খোলা আকাশের তলায় খেতে বসে সবকটি প্রাণী। আর সেই মুহূর্তে শিবকুমার লক্ষ করে স্ফূর্তিবাজ দলটার মুখে কে যেন ছোপ ছোপ কালি লেপে দিয়েছে। যেন শোকে মুহ্যমান সবগুলো প্রাণী। কিন্তু এমন ভাবান্তরের কারণটা কিছুতেই বোধগম্য হয় না তার। কে এই আসগর, এইটুকু সময়ের মধ্যে সে কী এমন ঘটিয়ে বসেছে যে, দলের সবগুলো তরতাজা ছোকরা এমন মুষড়ে পড়ল মুহূর্তের মধ্যে?

 

এগারো

মেলা বসবে সেই বিকেলে, কাজেই খাওয়া-দাওয়া সেরে তাঁবুর মধ্যে ঠেসাঠেসি শুয়ে পড়ে সবাই। আর তখন ভোলার পাশটিতে শুয়ে ওর মুখ থেকে শিবকুমার জেনে যায় গোটা দলের শোকের আসল কারণটা।

আসগর নামের লোকটি আধা জাদুকর, আধা ঝুন্ডিবাজ। লম্বায় প্রায় ছ-ফুট লোকটার দাপটে প্রতিবারেই মার খায় ল্যাংটেশ্বরের দল। লোকটার পূর্বপুরুষ নাকি কোনোকালে এসেছিল ইরান মুলুক থেকে। এখনো তার শরীরে অবয়বে তার ছাপ রয়েছে। তীক্ষ্ণ খাড়াই নাক, কাটা-কাটা চোখমুখ আর  ভাসাভাসা চোখ। টকটকে গৌরবর্ণ গায়ের রংটি ইতোমধ্যে তামাটে হয়ে গিয়েছে বটে, কিন্তু আকার-অবয়বটি দেখলেই মালুম হয়, এখনো লোকটার শরীরে বিজাতীয় রক্ত টগবগ করে বইছে। ভারি মস্তান টাইপের লোক আসগর। সঙ্গীগুলোকেও দেখলে খুনি-খুনি লাগে।

কাপস অ্যান্ড বলের খেলায় একেবারে চৌকস লোকটা। তবে, জাদু হিসেবে নয়, ওই জাদুটা দিয়ে মেলার মধ্যে সাট্টা খেলে আসগর। পাঁচটা প্রমাণ সাইজের নারকোলের মালা নিয়ে খেলাটা শুরু করে।

প্রতিটি মালার গায়ে নম্বর লেখা থাকে। একই নম্বরযুক্ত পাঁচটি কৌটোও মজুত থাকে পাশেই। হাতে থাকে একটিমাত্র বল। একটি টাকাভর্তি থলি নিয়ে পাশটিতেই বসে থাকে গুন্ডামতো একটা সাগরেদ।

খেলাটা এইভাবে শুরু করে আসগর। প্রথমেই মালাগুলোকে উলটে রাখে সামনে। হাতের মুঠোয় রাখে একটা ছোট্ট বল। তারপর নারকোলের মালাগুলিকে উপুড় করে দেবার ফাঁকে কোনো একটা কাপের তলায় রেখে দেয় বলটি। জাদুর খেলাটি এবার ঝুন্ডিখেলায় পরিণত হয়, কেন কি, এতক্ষণে পাবলিকের আন্দাজ করবার পালা, কোন মালার তলায় বলটি রয়েছে। মানুষজন যে মালাটির তলায় বলটি রয়েছে বলে আন্দাজ করবে, সেই নম্বরযুক্ত কৌটোয় নিজের নামসহ টাকা রেখে দেবে। এইভাবে প্রত্যেক কৌটোয় জমবে টাকা। একসময় আসগর এক-একটি কাপ উলটে দেখাবে তার তলায় বলটি রয়েছে কিনা। যে কাপগুলোর তলায় বলটা নেই, সেই নম্বরযুক্ত কৌটোর টাকাগুলি তৎক্ষণাৎ নিয়ে নেবে ওর সাগরেদ। অবশেষে যে -কাপের তলায় বলটি পাওয়া যাবে, সেই নম্বরযুক্ত কৌটোয় যাদের নামযুক্ত টাকা রয়েছে, তারা পাবে গচ্ছিত টাকার কুড়িগুণ অর্থ। গুন্ডামতো সাগরেদটা তৎক্ষণাৎ পাবলিককে তাদের প্রাপ্য অর্থ দিয়ে দেবে। তারপর শুরু হবে সেকেন্ড রাউন্ডের খেলা। তবে ভোলার  মতে, এমনই হাতসাফাই আসগরের, এমনই নিখুঁত তার অভিনয়, পাবলিক স্পষ্ট দেখবে, একটা বিশেষ মালার তলায় বলটা রাখল আসগর, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যাবে, বলটি রয়েছে অন্য মালার তলায়। তাও প্রতি রাউন্ডেই দু-চারজন ভাগ্যবান পেয়ে যাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

ভোলা চাপা গলায় বলে, জিতব না ক্যান? আসলে, যারা ঠিকঠাক বলে দিয়ে টাকা জিতছে, তাদের প্রায় চৌদ্দ আনাই আসগরের নিজের লোক। তারা আগে থেকেই জানে, কোন রাউন্ডে কোন মালার তলায় বলটা রাখা হবে। সেই অনুসারে তারা বাজি ধরত্যাসে আর পটাপট জিতত্যাসে। এর ফলে পাবলিকের লোভ এবং আশাও বাড়ত্যাসে। তারা খেলায় যোগ দিস্যে।

ল্যাংটেশ্বরের ভয়টা ওকে নিয়েই। মেলার মধ্যে সাধারণত ভ্রাম্যমাণ সার্কাস, মিনি-চিড়িয়াখানা, দু-মুন্ডুওয়ালা বাচ্চা, বন্দুক ছুড়ে বেলুন ফাটানো, সাপের খেলা, জাদু, সবই বসে একটি বিশেষ দিকে। এই জাতের বিনোদনের খদ্দেররাই কেবল জোটে সেখানে। আসগরও জাদুওয়ালা হিসেবে ঠাঁই করে নেয় ওখানেই, কিন্তু একটুবাদেই তার জাদুর আসরটি পরিণত হয় ঝুন্ডিখেলার আসরে। মেলা কমিটির সঙ্গে নির্ঘাত আগাম বন্দোবস্ত করাই থাকে আসগরের। তারাও তাই চোখ মুদে থাকে। মাঝের থেকে ল্যাংটেশ্বরের জাদুর আসরটি বেজায় মার খায়।

আসগরের কথা বলতে বলতে একসময় ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে ভোলা। শিবকুমারের ঘুম আসে না চোখে। দিনের বেলায় ঘুমোনোর অভ্যেসই নেই তার। তার বদলে সারাটা দুপুর সে হৃদয়নাথের বীরটাকে নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকে।

বিকেল না হতেই জাদুর সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ে গোটা দলটা। ইতিমধ্যে নিজের ভোলটি একেবারে বদলে ফেলেছে ল্যাংটেশ্বর। মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলোকে আরো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ফেলেছে। মাথায় বেঁধেছে একটা লাল কাপড়ের ফেট্টি। কপালে গাঢ় করে রক্তবর্ণের তিলক কেটেছে। সব মিলিয়ে বেশ কাপালিক গোছের লাগছে লোকটাকে।

ল্যাংটেশ্বর আগেই স্থান-নির্বাচনটা সেরে রেখেছিল, সেই মোতাবেক মেলার মাঝামাঝি জায়গায়, আসগরের থেকে বেশ খানিক দূরত্ব রেখে আসরটা পাতে ওরা। আসর বলতে কোনো তাঁবু নয়, একটা গাছের তলায় একেবারে খোলা আকাশের নিচে জাদুর আসর।

গাছের গুঁড়িটাকে পেছনে রেখে একচিলতে জমিকেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আসর বানিয়ে নেয় ওরা। পাঠান-অর্জুনরা মিলে মাথার খুলি অাঁকা একটা কালো পর্দা টাঙিয়ে দেয় পেছনে। পর্দার আড়ালে, গাছটার গুঁড়ি ঘেঁষে, সাজিয়ে রাখে জাদুর যাবতীয় মালপত্তর। তারপর একে একে কোথায় যেন চলে যায় ওরা। ল্যাংটেশ্বরের কাছে কেবল শিবকুমার, নগেন আর ভোলাই থেকে যায়।

প্রথমেই জমির ওপর একটা কালো রঙের চাদর পাতে নগেন আর ভোলা। চাদরের ওপর শেকড়-বাকড়, জড়ি-বুটি, কবচ-তাবিজ, ধনেশ পাখির তেল, কস্ত্তরি-মৃগনাভিগুলো পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখে। পাশটিতে আরো একটি চাদর পেতে তার ওপর চটপট সাজিয়ে ফেলে জাদুর যাবতীয় সরঞ্জাম।

তখনো অবধি একটি লোক আসেনি ওদের আসরের আশেপাশে। বরং চোখ চরিয়ে ভোলা দেখতে পায়, দূরে, আসগরের জুয়াখেলার আসরটিকে বেষ্টন করে ইতোমধ্যেই মানুষের ঠাসবুনোট জমায়েত।

বসে বসে একমনে বিড়ি টানছিল ল্যাংটেশ্বর। আড়চোখে দেখছিল আসগরের জুয়ার জমায়েতটাকে।

একসময় উঠে দাঁড়ায় সে। হাতে তুলে নেয় একটা ডম্বরু। জোরে জোরে বাজাতে থাকে ওটা। তাতেই আকৃষ্ট হয়ে দু-চারজন করে জড়ো হতে থাকে ল্যাংটেশ্বরের চারপাশে। মাঝে মাঝে হাতের ডম্বরু থামিয়ে চেঁচাচ্ছিল ল্যাংটেশ্বর, অ্যা-ই ভানুমতীর খেল্… ভেলকি, ভোঁজবাজি – চোখের সামনে মানুষ ভেনিসের জাদু – ছুরি দিয়ে গলা কাটার জাদু – জিভ কেটে আবার জুড়ে দেবার জাদু – দেখুন দাদা – এমন জাদু আর ভূভারতেও পাবেন না অ্যা…ই… কাঁউর-কামাখ্যা-মায়াং-জরাং…স্বরগ-মর্ত্য-পাতাল…। অ্যা…ই… মহীরাবণ-অহীরাবণ… সুরপ্নখা… কালনেমি… যন্তর-ফন্তর… ছু-মন্তর…। অ্যা…ই…। ততক্ষণে ল্যাংটেশ্বর ঝোলার ভেতর থেকে বের করেছে একটি আড়বাঁশি। বাঁশিটাকে ডানহাতে ধরে সুর করে বাজাতে থাকে সে। বাঁহাতে বাজাতে থাকে ডম্বরু। দুহাত সমান দক্ষতায় চলতে থাকে। দেখতে দেখতে ল্যাংটেশ্বরের চারপাশে ভিড় জমে যায়।

– আজ একটা নতুন খেলা দেখাব বাবুমশায়। একসময় বক্তৃতা শুরু করে ল্যাংটেশ্বর, আপনাদের চোখের সামনে একটা মানুষের গলা কেটে মুন্ডুটা ধরিয়ে দেব ওরই হাতে। নিজের হাতে কাটা মুন্ডটাকে ধরে সে আপনাদের সামনে লাচ দেখাবে বাবুমশায়। কাঁউর-কামাখ্যাসিদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছ থেকে বহু সাধনায় শেখা সেই আশ্চর্য জাদু আজ এইখানে, আপনাদের চোখের সামনে দেখাব আজ। গলাটাকা কবন্ধ তার নিজের মুন্ডুটা হাতে ধরে নাচতে থাকবে আপনাদের চোখের সামনে।

ল্যাংটেশ্বরের শেষ কথাগুলোয় নিমেষের মধ্যে বোধ করি ভোজবাজি ঘটে যায়। চারপাশ থেকে পিলপিলিয়ে ছুটে আসে লোক। ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে যায় ল্যাংটেশ্বরের তিনদিকে।

একসময় খেলা শুরু করে ল্যাংটেশ্বর। ভোলা নামের ছোকরাটিকে ডেকে নেয় কাছে। ওকেই মিডিয়ম বানায়। ল্যাংটেশ্বরের ডানহাতের মুদ্রার তালে তালে সম্মোহিত হতে হতে একসময় নেতিয়ে পড়ে ভোলা। ওকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে ল্যাংটেশ্বর অসাড় শরীরটাকে একটা চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়। তারপর শুরু করে থট-রিডিংয়ের খেলা। চাদরের তলা থেকে ভোলা একের পর এক বলতে থাকে জমায়েতের কোন লোকটার মাথায় টাক, কোন লোকটা কী রঙের জামা পরেছে, কার হাতে ছাতা রয়েছে…। দেখতে দেখতে জমে যায় খেলা।

এরপর একের পর এক খেলা দেখাতে থাকে ল্যাংটেশ্বর। ওর সামনে জমায়েতটা একটু একটু করে কলেবরে বাড়তে থাকে। একসময় ভিড়ের চাপে গোটা আসরজুড়ে ঠেলাঠেলি ধস্তাধস্তি শুরু হয়। আর, মাঝে মাঝেই ভিড়ের ভেতর থেকে মৃদু আওয়াজ উঠতে থাকে, কিনা, ওই খেলাটা কখন শুরু হবে হে?

ল্যাংটেশ্বর যেন শুনেও শোনে না ওদের কথা। বড়জোর, হবে হবে বাবুমশাই, সময় হলেই হবে। সবুরে মেওয়া ফলে বাবুমশাই। সবুর ধরেন। অসময়ে ফলে না বৃক্ষ, সময়েতে ফলে। এইমতে দর্শকদের অনুরোধকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত অন্য খেলায় চলে যায়।

দেখতে দেখতে রাত বাড়ে, একসময় খেলা গোটানোর সময় এগিয়ে আসে। ল্যাংটেশ্বর খেয়াল করে, ভিড়টা অনেক পাতলা হয়ে এলেও কিছু মানুষও তাও চিনে জোঁকের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওই গলা কাটার খেলাটা দেখেই বাড়ি ফিরবে ওরা।

সহসা অল্প দূরে ভেসে আসে অর্জুন আর পাঠানের বাজখাঁই গলা।

– কে এখানে এত রাত অবধি খেলা দেখাচ্ছে র‌্যা? বলতে বলতে দু-হাতে ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে ওরা ল্যাংটেশ্বরের দিকে। একেবারের কাছটিতে এসে গর্জন তোলে, কটা  টাকা মেলা-ফি দিয়ে কমিটিকে কিনে নিয়েছিস নাকি রে? রাতভর খেলা দেখাবি নাকি?

তার জবাবে নিদারুণ থতমত খেয়ে ল্যাংটেশ্বর কাঁচুমাঁচু গলায় বলে ওঠে, এই যাচ্ছি হুজুর। বাবুমশাইদের কথা দিয়েছি, একটা বিশেষ খেলা দেখাব। ওটা দেখিয়েই আসর গুটিয়ে ফেলব হুজুর। জবান।

– বিশেষ খেলা? মামদোবাজি? ল্যাংটেশ্বরের দিকে ক্রূর দৃষ্টিতে তাকায় পাঠান, শোন, আর একটা খেলাও দেখাস যদি, বাড়তি একশো টাকা দিতে হবে। মেলা কমিটির হুকুম।

– একশ … টা…কা? পাঠানের সামনে প্রায় কেঁদে ফেলে ল্যাংটেশ্বর, একশ টাকা তো সারা সন্ধেয় আয় করিনি হুজুর। আসরে ছুড়ে মারা পয়সায় সাকল্যে কত হয়, আপনিই বলুন। তাও, জড়িবুটিগুলোও যদি খানিক বিক্রি হতো…।

পাঠান মুহূর্তকাল কী যেন ভাবে। একসময় বলে, ঠিক আছে, মেলা কমিটির পক্ষে একটুখানি সময় মঞ্জুর করছি তোকে। জড়িবুটি যা বেচবার বেচে ফ্যাল জলদি। কিন্তু খেলা যদি আর একটাও দেখাস, পাঁচশো টাকা ফাইন হবে তোর।

চটপট জড়িবুটি কেনার ধুম পড়ে যায়। ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে ল্যাংটেশ্বর খালি বলতে থাকে, জলদি, জলদি করুন বাবুমশায়রা। চন্ডালটা যদি আবার আসে!

ততক্ষণে জাদুর সামগ্রীগুলোকে চটপট ঝোলায় ভরতে লেগেছে ভোলা।

বিকিকিনি সারতে সারতে ল্যাংটেশ্বর কেবলই হা-হুতাশ করতে থাকে, বাবুমশায়দের কথা দিয়েছিলাম, গলাকাটার খেলাটা দেখাব। কিন্তু চন্ডালটা সব ভন্ডুল করে দিলো। ইস্, জবান দিয়েও রাখতে পারলাম না। কিন্তু কথা দিলাম বাবুমশাইরা, কাল একেবারে প্রথমদিকেই খেলাটা দেখিয়ে তবে অন্য খেলাতে যাব আমি। ছিঃ, ছিঃ, কেবল জন্মের ঠিক নাই যাদের, তারাই জবাব ফেল করে। ছিঃ ছিঃ!

খেলাটা আজ হচ্ছে না, এটা জানবার পর জমায়েত দ্রুত সরে পড়ে। অকস্মাৎ জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যায়। ততক্ষণে ল্যাংটেশ্বরের গোটা দলটাই হাজির হয়েছে ফের। একসময় ঝোলাগুলোকে কাঁধে তুলে নিয়ে রাতের ডেরার দিকে দ্রুতপায়ে রওনা দেয় ওরা।

তখনই শিবকুমারের মনে ভাবনাটা কিলবিল করতে থাকে। ভোলা ছাড়া দলের অন্যরা এতক্ষণ ছিল কোথায়? কোথায়, কী করছিল ওরা? ল্যাংটেশ্বরের খেলাগুলো শেষ হওয়ার ঠিক পরপর কোত্থেকে উদয় হলো এরা?

ফিরতি পথে ভাবনাটা কেবলই চাবলাতে থাকে শিবকুমারকে।

 

 

বারো

দু-একদিনের মধ্যে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায় শিবকুমারের কাছে। ল্যাংটেশ্বর জাদু দেখাবার কালে কেবল ভোলা আর নগেন ছাড়া বাকিরা কোথায় হাওয়া হয়ে যায়, ধীরে ধীরে সেই রহস্যও পরিষ্কার হয় শিবকুমারের কাছে। ধুবরির মেলাতে ল্যাংটেশ্বরের আরো একটি রূপ আবিষ্কার করে সে।

শিবকুমার লক্ষ করে, ল্যাংটেশ্বর যখন খেলা দেখাতে থাকে, ওর তিন শাগরেদ তখন জমায়েতের মধ্যেই ঘুরঘুর করতে থাকে। জমায়েতের মধ্যে তারা যে ঠিক কী করে, প্রথম দিনে সেটা ঠিক মালুম  করতে পারেনি শিবকুমার। দ্বিতীয় দিনেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয় ওর কাছে। সে অাঁচ করে, কেবল জাদু দেখিয়ে লোক জড়ো করা নয়, ভগবানের কাছে পয়সা পাঠানোই নয়, শেকড়-মাদুলি বেচাই নয়, আরো একটা পথে কামাই করে ল্যাংটেশ্বর। সে যখন জাদুর খেলা দিয়ে চারপাশের জমায়েতকে একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলেছে, একেবারে বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে মানুষগুলো, ততক্ষণে কার্তিক নামের চেলাটা ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গিয়ে নিশ্চিন্তে সাফ করছে বেছে বেছে রইস আদমিদের পকেট। দিনের শেষে ডেরায় ফিরে সবকিছু জমা দিচ্ছে ল্যাংটেশ্বরের  হাতে। তার থেকে নিজেদের পাওনা বখরা বুঝে নিচ্ছে। ওদের আলোচনা থেকেই মালুম হয়, ভগবানের কাছে পয়সা পাঠানো এবং শেকড়-মাদুলি বেচে রোজ যত আয় হয় ল্যাংটেশ্বরের, শাগরেদদের মাধ্যমে আয় হয় তার চেয়ে ঢেরগুণ বেশি। আসলে, জাদু দেখানো বা মাদুলি বেচা নয়, ওটাই ল্যাংটেশ্বরের আসল ধান্ধা।

দেখতে দেখতে শিবকুমারের মনটা ক্রমশ তেতো হতে থাকে। শেষ অবধি একটা পকেটমারের দলের সঙ্গে শামিল হয়েছে সে! এইসবের জন্য তো সে বাড়ি ছাড়েনি। সে বেরিয়েছে বিদ্যেটার খোঁজে। এই পকেটমারদের দলে বেশিদিন থাকলে সে তো পচেই যাবে।

ল্যাংটেশ্বরের কারিগরদের দলে কার্তিকই কারিগরিতে ছিল ওদের মধ্যে সবচেয়ে ওস্তাদ ব্যক্তি।

কার্তিকের হাতটা নাকি সোনা দিয়ে বাঁধানো। ওদের আলোচনা থেকেই সেটা জেনেছে শিবকুমার। তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো চোখদুটি। এমন নিরীহ ভোলেভালা দৃষ্টি সেই চোখদুটোতে, এমন মায়াভরা, মানুষ তার মধ্যে খারাপ কিছু কল্পনা করে না। এমনকি, কেউ যদি তাকে কারো পকেটে হাত ঢোকাতে দেখেও, বিশ্বাস করে না তা। ভাবে, চোখের ভুল।

পাঠান আর অর্জুন হলো কার্তিকের পার্শ্বরক্ষক। কার্তিক যখন অন্যদের পকেট সাফ করে, ওরা দুটিতে তখন ওর দুপাশে দাঁড়িয়ে গিয়ে একটা আড়াল তৈরি করে।

একদিন পাঠানই একান্তে চোপে ধরে শিবকুমারকে। চাপা গলায় বলে, একটা কথা শুধোব, ঠিক ঠিক জবাব দিবি?

– কী কথা?

– তুই তো যে-সে বাড়ির ছেলে নোস। নির্ঘাত কোনো বড় বাড়ির ছেলে দুই। ঠিক কিনা?

– কী করে জানলে? তুমি গুনতে জান বুঝি?

– গুনতে  লাগে না। তোর সারা অঙ্গে, চোখেমুখে, ব্যাভারে লেপ্টে রয়েছে তা। সত্যি করে বল্ দিকিন, এই চোরের দলে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন?

– আমি জাদুবিদ্যা শিখতে চাই। একজন সেরা জাদুকর হতে চাই।

– জাদুকর হতে চাস তো ল্যাংটেশ্বরের দলে কেন?  তুই কাঁউর-কামাখ্যায় যা, মায়াংয়ে যা। সেসব হলো জাদুর পীঠ। এই চোরের দলে ঘুরে ঘুরে তুই জাদুকর হবি?

কাঁউর-কামাখ্যার নাম সেই ছেলেবেলা থেকেই শুনে আসছে শিবকুমার। বলে, কাঁউর-কামাখ্যায় কীভাবে যেতে হয়?

– স্টিমারে ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে চলে যা গোয়ালপাড়া। সেখান থেকে পলাশবাড়ী। পলাশবাড়ী থেকে গৌহাটি। গৌহাটির থেকে অল্প দূরেই কামাখ্যা-মায়ের থান।

– কিন্তু ল্যাংটেশ্বর আমাকে ছাড়তে রাজি হবে কেন? তাবাদে আমি যাব কেমন করে  অদ্দূরে, খাব কি? আমার পকেটে তো একটিও পয়সা নেই।

একটুক্ষণ ভাবে পাঠান। একসময় বলে, দাঁড়া, দেখছি আমি।

সেই সন্ধেয় পাঠানের সঙ্গে ল্যাংটেশ্বরের অনেকক্ষণ কথা চলে একান্তে। শিবকুমার তার বিন্দুবিসর্গও শুনতে পায় না।

পরের দিন সকালেই শিবকুমারের সামনে কথাটা পাড়ে ল্যাংটেশ্বর। বলে, শিবু, তোর আর আমাদের দলে থাইক্যা কাম নাই। আমার থেকে তেমন কিছু জাদু তুই পাবিনে আর। তার চাইতে এক কাম কর্। তুই বাড়ি ফিরে যা।

ল্যাংটেশ্বরের কাছে থাকতে শিবকুমারেরও মন চাইছিল না একেবারেই। এটা কোনো জাদুকরের দলই নয়। এটা বাস্তবিক একটা পকেটমারের দল। জাদুকে ওই হীন কাজে লাগিয়েছে, এই যা।

আর একটা আশা নিয়ে ল্যাংটেশ্বরের সঙ্গ নিয়েছিল শিবকুমার। ধুবরির মতো বিশাল মেলায় হৃদয়নাথের দেখা মিলতেও পারে। কিন্তু পাক্কা চার-পাঁচদিন গোটা মেলাটাতে ঘুরে ঘুরে শিবকুমার বুঝতে পারে, হৃদয়নাথ এই মেলায় আসেনি।

ল্যাংটেশ্বরকে দেখতে দেখতে কদিন যাবৎ হৃদয়নাথের কথা আরো বেশি বেশি করে মনে পড়ছিল শিবকুমারের। লোকটার মধ্যে কিঞ্চিৎ ছিঁচকেপনা ছিল বটে, তবে তার হাতে জাদু, পায়ে জাদু, চোখে জাদু, মুখমন্ডলে, জিভের ডগায়, কণ্ঠস্বরে, একেবারে সর্বাঙ্গে লুকিয়ে রয়েছে জাদু। লোকটা জাদুটাকে একেবারে মিশিয়ে নিয়েছে রক্তে। বেশ কদিন ছিল তো শিবকুমারদের গড়ে, শিবকুমার দেখেছে, প্রায় সারাদিন, সারাক্ষণ, কেবল জাদুই তার শয়নে-স্বপনে-নিশিজাগরণে। একেবারে সর্বাঙ্গ দিয়ে জাপটে ধরেছে জাদুকে। সবমিলিয়ে একেবারে জাদুঅন্তপ্রাণ।

সকালেই শিবকুমারের সামনে কথাটা পাড়ল ল্যাংটেশ্বর, তুই এবার বাড়ি ফিরে যা শিবু। আমাদের দলটা তোর উপযুক্ত নয়। বড় বাড়ির ছেলে তুই। এই লাইনে বেশিদিন থাকলে একেবারে নষ্ট হয়ে যাবি।

কিন্তু বাড়ি ফিরে যাবে বলে তো বেরোয়নি শিবকুমার। সে-কথা ল্যাংটেশ্বরকে বলায় সে অগাধ ভাবনায় পড়ে যায়। একসময় বলে, তাহলে তুই কামাখ্যার দিকটাতে চলে যা। পারলে মায়াং গাঁয়ে গিয়ে থাকিস। সেখানে গাঁভর্তি জাদুকর। তারা দিনকে রাত করতে পারে। মানুষকে গরু-ছাগল বানিয়ে দিতে পারে। বিশাল গাছে চড়ে পাড়ি দিতে পারে দেশে-দেশান্তরে। গাছটা উড়তে উড়তে হাজার যোজন পথ একরাতেই পার হয়ে যায়। চাইলে সেখানেই চলে যা। এটা তোর ঠিক জায়গা নয়। রাজি থাকলে তোকে এই কদিন মাইনে জলপানি মিটিয়ে দিচ্ছি এক্ষুনি। চাপা গলায় বলে, তুই এখানে বেশিদিন থাকলে তোরও ক্ষতি, আমাদেরও বিপদ।

– ক্ষতি? বিপদ?

– ক্ষতি বইকি। এসব কাজে আয়ও যেমন, ঝুঁকিও তেমন। চোরের সাতদিন, গেরস্থের একদিন। যদি কোনোগতিকে ধরা পড়ে যাই, আমাদের সঙ্গে তোরও হেনস্থার অন্ত থাকবে না। তাবাদে পুলিশের রুলের দু-গুঁতো খেলেই তো তুই ওলাওঠার ভেদবমির মতো সবকিছু উগরে দিবি। তাতে করে আমাদের বিপদটা বেড়ে যাবে।

কাল সারা সন্ধে তবে ল্যাংটেশ্বরকে এইসব বুঝিয়েছে পাঠান। মনে মনে লোকটার প্রতি কৃতজ্ঞতার অন্ত থাকে না শিবকুমারের।

ল্যাংটেশ্বরের সঙ্গ করতে একেবারেই ইচ্ছে করছিল না শিবকুমারের। পাঠানের কাছ থেকে শোনার পর কাঁউর-কামাখ্যা যেন টানছিল ওকে। কাজেই, রাজি হয়ে যায় শিবকুমার।

মাইনে-জলপানি ছাড়াও পথের রাহাখরচ বাবদ কিছু বাড়তি অর্থ দিয়েছিল ল্যাংটেশ্বর। ওই নিয়ে আবার অনিশ্চিতের পথে পা বাড়ায় শিবকুমার।

তাবলে আর বাড়ি ফিরে যায়নি সে। বরং জাদুর টানে ভেসে গিয়েছে কোথা থেকে কোথা। পাঠানের পরামর্শটা মনের মধ্যে উবুর-ডুবুর খেলছিল। তুই কামাখ্যার দিকটাতে চলে যা।

সাত-পাঁচ ভেবে অবশেষে কামাখ্যার উদ্দেশেই পা বাড়ায় শিবকুমার।

 

 

তেরো

কামাখ্যাপ্রসাদের সঙ্গে শিবকুমারের দেখা হওয়াটা যেমন অলৌকিক, তেমনই মজাদার।

তখন ল্যাংটেশ্বরের দলের সঙ্গে সমস্ত ছিন্ন করে আবার বেরিয়ে পড়েছে শিবকুমার, অনির্দিষ্টের উদ্দেশে।

ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে কামরূপ-কামাখ্যায়।

একদিন কামাখ্যা মন্দিরের সামনে বসে থাকতে থাকতে কামাখ্যাপ্রসাদকে দেখতে পায় শিবকুমার।

মন্দিরের আশেপাশে অনেক ভিড়। দর্শনার্থী যত, পান্ডা-পুরোহিতও তত। আর, সারা চৌহদ্দিটায় ছোট ছোট গুমটি দোকান। দোকানগুলোতে বিকোচ্ছে ফুল, বাতাসা, লাল ঘুন্সি, ফাঁপা মাদুলি, কবচ, কালো সুতো, কামাখ্যা-মায়ের বাঁধানো ছবি…।

দোকানগুলোর গা-ঘেঁষে একটা গাছের ছায়ায় বসে কামাখ্যা মায়ের ছবি বেচছিল কামাখ্যাপ্রসাদ। কিন্তু শিবকুমার লক্ষ করে, অন্য দোকানগুলোর তুলনায় ওর সামনেই ভিড়টা বেশি।

লোকটির পরনে রক্তাম্বর, মাথায় বেশ পুরোনো জটা। বয়েস প্রায় ষাট পেরিয়ে গেলেও বেশ ঋজু দীর্ঘকায় ছিপছিপে মেদহীন শরীর। বাজপাখির ঠোঁটের মতো খাড়াই নাক। প্রশস্ত ললাট বরাবর সারবন্দি বলিরেখা। কপালের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত অবধি রক্তচন্দনের দীর্ঘ তিলক। তবে তার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য বুঝি ছিল তার চোখদুটোতে। কেবল অস্বাভাবিক উজ্জ্বলই নয়, চোখদুটোতে এমন কিছু ছিল, যাতে করে ওই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা মুশকিল। সবমিলিয়ে লোকটি আর পাঁচটি সাধারণ মানুষের চেয়ে কোথাও যেন স্বতন্ত্র। কেমন যেন একটুখানি ভয় করতে হয় লোকটাকে। আবার এমনই এক আকর্ষণীয় শক্তি আছে ওর সারামুখমন্ডলে, বেশিক্ষণ মুখ ফিরিয়ে থাকা যায় না। তবে শারীরিক বৈশিষ্ট্য নয়, ওর ছবি বেচবার ধরনটাই শিবকুমারকে টেনে নিয়ে যায় কামাখ্যাপ্রসাদের পানে। গাছের তলায় গিয়ে, ওর থেকে সামান্য দূরে বসে পড়ে সে। নিবিষ্ট মনে দেখতে থাকে ওর কর্মকান্ড।

গাছের তলায় ঢুলুঢুলু নেত্রে বসে ছিল কামাখ্যাপ্রসাদ। ওর বাঁদিকে মা-কামাখ্যার একটি প্রমাণ-সাইজের বাঁধানো ছবি, একখন্ড পাথর ঠেকনা দিয়ে দাঁড় করানো। ডানদিকে একটি মাঝারি আকারের ঝোলা, তার মধ্যে স্তূপীকৃত রাখা ছিল মা-কামাখ্যার ক্ষুদে আকারের বাঁধানো ছবি।

ওর সামনে মানুষজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকলেও ছবি বিক্রিতে তিলমাত্র চাড় ছিল না কামাখ্যাপ্রসাদের। সে বসে বসে খুব নিচু গলায়, প্রায় বিড়বিড় করে, বলে চলেছিল মা-কামাখ্যাসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত চন্ডীরূপিণীদের অশেষ মাহাত্ম্য নিয়ে ছড়িয়ে থাকা গল্পগাথাগুলো। কেউ মায়ের ছবি কিনতে চাইলে গল্প বলতে বলতেই, ঝোলা থেকে একটি ছবি বের করছিল কামাখ্যাপ্রসাদ। ছবিটির ওপর ক্রেতার নাম-ধাম ও তৎসহ মা-কামাখ্যার মন্ত্র-টন্ত্র পড়ে ওটাকে ছুড়ে মারছিল বাঁ পাশে রাখা মা-কামাখ্যার বড় ছবিটির দিকে। কিন্তু অবাক কান্ড, ছবিটি মা-কামাখ্যার বড় ছবির ওপর আছড়েও পড়ছিল না, আবার কামাখ্যাপ্রসাদের হাতেও থাকছিল না। দৃশ্যটা দেখে উপস্থিত মানুষজন যখন বিস্ময়ে বাক্যহারা, কামাখ্যাপ্রসাদ গল্প থামিয়ে মধুর স্বরে বলছিল, চিন্তা করিসনি, ছবিটাকে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। মায়ের প্রসাদী হয়ে ফিরে এলেই পেয়ে যাবি। বলেই আবার গল্পে ফিরে যাচ্ছিল কামাখ্যাপ্রসাদ। ওর থেকে বিঘৎটাক দূরে মা-কামাখ্যার বাঁধানো ছবিটি। ওইটুকু দূরত্ব অতিক্রম করে ক্ষুদে ছবিটার ফিরে আসতে এত সময় নিচ্ছে কেন, উপস্থিত  মানুষজনের মনে এমন প্রশ্নের উদয় হলে, তার জবাবে কামাখ্যাপ্রসাদ মধুর হাসি হেসে বলছিল, দূর বোকা, এই বাঁধানো ছবিটা মা নাকি? মা তো ও…ই মন্দিরের মধ্যে। ওখানেই তো হেড অপিস। এটা  তো সাব ব্রাঞ্চ অপিস। হেড অপিসে যেতে-আসতে সময় লাগবে না?

কিছুক্ষণ বাদে, গল্প বলতে বলতেই অতি নিরাসক্ত ভঙ্গিতে ডান হাতখানা পাশের বাঁধানো ছবিটির দিকে ঠিক চিলের ছোঁ মেরে শিকার ধরবার ভঙ্গিতে, চালিয়ে দিচ্ছিল কামাখ্যাপ্রাসাদ। পরমুহূর্তে ওর হাতে চলে আসত, মধ্যিখানে সিন্দুরের টিকা লাগানো ক্ষুদে ছবিটি। গল্প বলতে বলতেই ওটা নির্দিষ্ট খদ্দেরের হাতে তুলে দিচ্ছিল কামাখ্যাপ্রসাদ। গল্প বলতে বলতে মূল্য বুঝে নিচ্ছিল। মূল্য বলতে ক্ষুদে ছবির দামটুকুই কেবল। পাশাপাশি অন্য দোকানগুলোতে যা দাম, কামাখ্যাপ্রসাদের কাছেও তাই। ছবিপিছু এক পয়সা। তার চেয়ে এক কড়িও বেশি নয়। ক্ষুদে ছবিটাকে খদ্দেরের হাতে তুলে দিতে দিতে কামাখ্যাপ্রসাদ বিড়বিড় করে বলছিল, যা, মায়ের ছবিটিকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া মাত্র বাড়ির থেকে সব অশুভ, সব দুঃখ, সব অনটন পালাবে। তোর বাড়িতে মা-কামাখ্যার অধিষ্ঠান হবে। ছবিটিকে বাড়ির কোনো কুলুঙ্গিতে কামাখ্যা-মন্দিরের দিকে মুখ করে রেখে দিস।

কোনো খদ্দের যদি কৌতূহলবশত শুধোত, আর, তুমি যে ছবিটাকে মায়ের কাছে পাঠিয়ে প্রসাদী করে আনলে, ওই বাবদ কিছু নেবে না? তার জবাবে কামাখ্যাপ্রসাদ খুব নরম গলায় তিরস্কার করত প্রশ্নকারীকে, কিনা, দূর বোকা, মায়ের কাজ কচ্ছি, তারও মূল্য নেব?

পরমুহূর্তে, গল্প বলতে বলতেই, পরবর্তী খদ্দেরের জন্য একটি ক্ষুদে ছবি বের করে ওই একই কৌশলে বাঁধানো ছবির দিকে ছুড়ে দিচ্ছিল কামাখ্যাপ্রসাদ।

সারাটা দুপুর, বিকেল ধরে পুরো প্রক্রিয়াটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল শিবকুমার। তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে যায় ল্যাংটেশ্বরের কথা। পাবলিকের পয়সা ভগবানের কাছে পাঠাত সে। কিন্তু তার সঙ্গে এই মানুষটির তফাৎ হলো, ল্যাংটেশ্বর টাকাটা হাপিস করে দিত, টাকাটা মেরে দিত, কামাখ্যাপ্রাসাদ কিন্তু কেনা ছবিটাকে হাপিস করে দিয়ে পাবলিক ঠাকায় না।

একসময় সন্ধে নেমে আসে। প্রায় সবাই চলে যায় বাড়ি। শিবকুমারের তো চলে যাবার মতো জায়গা নেই। সে বসে থাকে কামাখ্যাপ্রসাদের থেকে অল্প দূরে।

ছবি-টবি গুটিয়ে ডেরায় ফেরার মুখে এতক্ষণে শিবকুমারের দিকে ভালো করে তাকায় কামাখ্যাপ্রসাদ। এতক্ষণে বুঝি তার খেয়াল হয়, ছেলেটা সারাক্ষণ বসে বসে কামাখ্যাপ্রসাদের দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। সেই দৃষ্টিতে কেবল সীমাহীন বিস্ময়।

এই দৃষ্টিটাকে কামাখ্যাপ্রসাদ বুঝি দীর্ঘদিন চেনে। কামাখ্যা-মায়ের মন্দিরে যারাই আসে, তারাই কামাখ্যাপ্রসাদের এই অলৌকিক শক্তিটাকে সবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে। কাজেই, বড় একটা অবাক হয় না কামাখ্যাপ্রসাদ। তবে, ছেলেটাকে দেখে মনে বড় মায়া জাগে তার। কেমন জানি মনে হয়, ছেলেটার মধ্যে এমন কিছু রয়েছে, যা আর পাঁচটা এই বয়েসি বাচ্চার মধ্যে দেখা যায় না।

একসময় শিবকুমারকে কাছে ডাকে কামাখ্যাপ্রসাদ। খুব নরম গলায় শুধোয়, তখন থেকে এখানে বসে আছিস কেন রে? সবাই যে যার বাড়ি ফিরে গেল, তুই যাবিনে? তোর বাড়ি কোথায়?

নিজের বাড়িঘরের খবরাখবর দেবার দায়টা সুকৌশলে এড়িয়ে যায় শিবকুমার। বলে, বসে বসে দেখছিলাম আপনার কাজকর্ম।

তার জবাবে মৃদু হাসে কামাখ্যাপ্রসাদ। বলে, আমার কাজকর্ম কী রে? সবই তো মায়ের ইচ্ছেয়। তিনি না চাইলে আমার সাধ্য কী…।

শিবকুমার একথার কোনো জবাব দেয় না। তার বদলে আচমকা কামাখ্যাপ্রসাদের ঝুলি থেকে একটা ছবি তুলে নেয় হাতে। হাতটা একবার ঘোরাতেই মুহূর্তের মধ্যে ছবিটা অদৃশ্য হয়ে যায় হাত থেকে। ততক্ষণে ভুরুজোড়ায় গভীর ভাঁজ পড়েছে কামাখ্যাপ্রসাদের।

ঠোঁটের  কোনায় আলতো হাসি ফুটিয়ে শিবকুমার বলে, মায়ের প্রসাদী করতে পাঠালাম। বলতে বলতে শিবকুমারের হাতে আবার ছবিটা দৃশ্যমান হয়। কামাখ্যাপ্রসাদ পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে শিবকুমারের দিকে। একসময় মৃদু গলায় বলে, এটা কোথায় শিখলি তুই?

– একজন জাদুকরের থেকে।

– নাম কী তার?

– হৃদয়নাথ।

– কোথায় থাকে?

– জানি না। তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছি আজ দুবছর।

শিবকুমারের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে কামাখ্যাপ্রসাদ। একসময় ধীরগলায় বলে, এখন কোথায় যাবি? রাতে থাকবি কোথায়?

– জানি না। চাপাগলায় জবাব দেয় শিবকুমার।

শিবকুমারের মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কামাখ্যাপ্রসাদ। খুব ভাবনায় ডুবে যায় সে। একসময় বলে, তুই আমার কাছে যাবি? আমার কাছে রাতটা থাকবি?

কোনো জবাব দেয় না শিবকুমার। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। একসময় পায়ে পায়ে হাঁটতে থাকে কামাখ্যাপ্রসাদের পিছু পিছু।

কামাখ্যা-মন্দিরের থেকে প্রায় মাইলটাক হাঁটাপথে একেবারে পাহাড়টার কাছাকাছি একটা ছোট্ট চালাঘরের সামনে এসে দাঁড়ায় কামাখ্যাপ্রসাদ। কোমরের ঘুনসিতে বাঁধা চাবি দিয়ে ঘরের দরজার চাবিটা খোলে। তারপর নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে। শিবকুমার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে পাথরের মতো।

একটুবাদে ঘরের ভেতর থেকে আলো রেখা ভেসে আসে। দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে কামাখ্যাপ্রসাদ বলে, আয়, ভেতরে আয়।

শিবকুমার পায়ে পায়ে ভেতরে ঢোকে। একটিমাত্র মাঝারি আকারের ঘর। একটা সাধারণ চৌকিতে ময়লা বিছানা পাতা। ঘরের কোণে জলের কুঁজো। তার পাশটিতে মাটির হাঁড়ি, লোহার কড়াই, ঢাকা দেওয়া।

ঘরের এককোণ থেকে বালতি নিয়ে বাইরে আসে কামাখ্যাপ্রসাদ। পায়ে পায়ে হাঁটতে থাকে। উঠোন পেরিয়ে একটা ছোট্ট কুয়োর থেকে জল তুলতে থাকে। শিবকুমার পায়ে পায়ে কুয়োর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

কুয়োর জলে মুখ-হাত-পা ধুয়ে ফিরে আসে দুজনে। হাঁড়ি-কড়াইতে ঢাকা দেওয়া খাবার দুজনে ভাগ করে খায়। তারপর বাইরে দাওয়ায় বসে কল্কেতে তামাক খেতে  থাকে কামাখ্যাপ্রসাদ। শিবকুমার পাশটিতে বসে থাকে।

– হাতসাফাই করে মায়ের ফটো বেচি কেন, জিজ্ঞেস করলি নে যে বড়?

– কেন?

– তোর জানতে ইচ্ছে করে না।

– নাহ্। খুবই নিরাসক্ত জবাব দেয় শিবকুমার।

– কেন রে?

– আমি জাদু শেখার জন্য ঘর ছেড়েছি, জাদু খুঁজে খুঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছি, হৃদয়নাথকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, আমার আর কোনো বিষয়েই কোনো কৌতূহল নেই।

বলতে বলতে শিবকুমার দেখতে পায়, কামাখ্যাপ্রসাদের হাতের কল্কেটা হাত থেকে বেশ কিছুটা দূরে শূন্যে ভাসছে। বিস্ময়ে একেবারে হতবাক হয়ে যায় শিবকুমার। বেশ খানিকক্ষণ কল্কেটার দিকে তাকিয়ে থেকে একসময় মুখ ফেরায় কামাখ্যাপ্রসাদের মুখের দিকে। বলে, তুমি তো বিশাল জাদুকর, হৃদয়নাথের চেয়েও বড়!

– কেন? জাদুর কী দেখলি? খুবই নির্বিকার গলা কামাখ্যাপ্রসাদের।

– কল্কেটা অত ওপরে ভেসে রয়েছে কী করে?

– কোথায়? কত উঁচুতে?

কল্কেটাকে আবার মুখ তুলে দেখতে গিয়ে বেজায় চমকে ওঠে শিবকুমার। কল্কেটা আগের মতোই কামাখ্যাপ্রসাদের হাতেই রয়েছে।

ততক্ষণে উঠে  দাঁড়িয়েছে কামাখ্যাপ্রসাদ। বলেন, চল, রাত হলো, শুয়ে পড়ি।

চৌকিতে শোয় কামাখ্যাপ্রসাদ।  মেঝেতে একটা মাদুর বিছিয়ে দিয়ে বলে, তুই ওখানেই শুয়ে পড়।

সে-রাতে আর একটি কথাও বলে না কামাখ্যাপ্রসাদ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর নাক ডাকতে শুরু করে।

শিবকুমারের চোখে ঘুম আসে না। সে কেবল কামাখ্যাপ্রসাদের কথাই ভাবতে থাকে। লোকটিকে কেমন জানি খুব রহস্যময় লাগে তার। তার অবয়ব, চোখের দৃষ্টি, জীবনযাপনের ধরন, সবকিছুর মধ্যেই যেন রহস্যময়তার ছোঁয়া। যেভাবে সে কামাখ্যা-মায়ের ছবি বেচে, যেভাবে নির্জন জায়গায় নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করে, সে যখন কল্কেয় তামাক খায়, কল্কেটি শূন্যে ভাসতে থাকে। এ কি জাদু, নাকি কোনো অলৌকিক ক্ষমতা? যদি কোনো অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ হয়, তার অলৌকিকতার সীমা কদ্দুর? শিবকুমারকে নিজের বাড়িতে ডেকে এনে আশ্রয়ই বা দিলো কেন? এর পেছনে কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য নেই তো? ভাবতে ভাবতে বুকের মধ্যে অচেনা ভয়।

সহসা ওই নিশুতি রাতে বাড়ির কথা মনে পড়ে শিবকুমারের। নিরেট অন্ধকারের মধ্যে মায়ের মুখখানা ভাসতে থাকে।

 

 

চোদ্দো

পরের দিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল শিবকুমারের, ঘরের মধ্যে কামাখ্যাপ্রসাদ নেই। চৌকির ওপর বিছানাটা পরিপাটি করে গোছানো।

মাদুরের ওপর উঠে বসে শিবকুমার। পায়ে পায়ে বাইরে আসে। দেখে উঠোনের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা জবাগাছ ফুলে ফুলে লাল। কামাখ্যাপ্রসাদ একমনে ফুল তুলছে। কোনো দিকেই তাকাচ্ছে না কামাখ্যাপ্রসাদ। ফুল তোলার ধরন দেখে শিবকুমারের মনে হয়, ওই কাজেই একেবারে বুঁদ হয়ে রয়েছে। একেবারে বাহ্যজ্ঞান লোপ পেয়েছে যেন।

পায়ে পায়ে কামাখ্যাপ্রসাদের কাছটিতে গিয়ে দাঁড়ায় শিবকুমার। এই সাতসকালে স্নান সেরে নিয়েছে কামাখ্যাপ্রসাদ। ঘাড় অবধি নেমে আসা কাঁচাপাকা জটা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছে জল।

শিবকুমার বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে পাশটিতে। কিন্তু কামাখ্যপ্রসাদের যেন হুঁশই নেই। অনেকক্ষণ বাদে, যখন ফুল তোলা শেষ হলো, ধীরে ধীরে গাছ থেকে চোখ সরায় কামাখ্যাপ্রসাদ। এবং তখনই দেখতে পায় শিবকুমারকে। স্মিত হেসে বলে, ঘুম ভাঙল?

ফুলের সাজিটি নিয়ে ঘরের দিকে হাঁটা দেয় কামাখ্যা। সটান ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। ঘরের এককোণে কামাখ্যা-মায়ের একটি বাঁধানো ছবি। ছবির গায়ে অসংখ্য সিঁদুরের ফোঁটা। ধুলো-ময়লায় মলিন ফ্রেম। ছবির সামনে বসে অনেকক্ষণ ধরে পুজো করে কামাখ্যাপ্রসাদ। শিবকুমার কুয়োতলায় গিয়ে মুখ-হাত ধুয়ে নেয়।

পুজোর পর কপালে লম্বা করে সিঁদুরের তিলক অাঁকে কামাখ্যাপ্রসাদ। তারপর একটি রেকাবিতে করে প্রসাদী বাতাসা নিয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে। শিবকুমারকে দুটি বাতাসা দেয়। নিজেও দুটো খায়। তারপর দাওয়ার ওপর বসে। শিবকুমারের দিকে তাকিয়ে বলে, আয়, বোস পাশটিতে।

শিবকুমার নিঃশব্দে গিয়ে বসে পাশটিতে।

কামাখ্যাপ্রসাদ বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে শিবকুমারের দিকে। শুধোয়, বুঝতে পারছি, বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিস। এবার বল্ দেখি কোথায় তোর বাড়ি?

একটুক্ষণ চুপ করে থাকে শিবকুমার। একসময় মিথ্যে করে বলে, গঙ্গাচড়া। জেলা রংপুর।

– কোনো এক জাদুকরকে খুঁজে বেড়াচ্ছিস বললি কাল, খুঁজছিস কেন ওকে?

– ও আমাকে জাদু শেখাবে বলেছিল।

– জাদু শেখার খুব শখ তোর?

নিঃশব্দে মাথা দোলায় শিবকুমার।

– জাদু শিখে কী করবি?

শিবকুমার চুপ করে থাকে।

– তুই তো বেশ বড় বাড়ির ছেলে। জাদু শিখে তুই করবিটা কী?

শিবকুমার সে-কথার জবাব দেয় না।

সহসা ভেতরে চলে যায় কামাখ্যা। একটুবাদে আবার ফিরে আসে। তখন তার হাতে একটা লাল রঙের বল। শিবকুমারের চোখের সামনেই একটা বলকে দুটো বানিয়ে দেয় সে। পরমুহূর্তে তিনটে বল। তারপর চারটে। আবার একটি একটি করে সবগুলোকে ভ্যানিশ করে দেয়। শিবকুমার অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকে। হৃদয়নাথের কাছে এমন আশ্চর্য খেলা কোনোদিনও দেখেনি সে।

মিটিমিটি হাসছিল কামাখ্যা। বলগুলোকে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

শিবকুমারের বিস্ময়ের ঘোরটা বুঝি কাটেনি তখনো। আচমকা সে শুনতে পায় পেছন থেকে কামাখ্যাপ্রসাদের গলা। – আমাকে দেখতে পাচ্ছিস?

পেছন ফিরে শিবকুমার কাউকেই দেখতে পায় না। আচমকা উঠোনের ও-প্রান্তের অশ্বত্থ গাছটার থেকে ভেসে আসে কামাখ্যাপ্রসাদের গলা, ওখানে নয় রে, আমি রয়েছি গাছের মগডালে। কিন্তু গাছের মগডালেও কাউকেই দেখতে পায় না শিবকুমার। সহসা কুয়োরপাড় থেকে ভেসে আসে কামাখ্যাপ্রসাদের গলা। আমি এখানে রে।

কুয়োর দিকে তাকিয়ে থাকে শিবকুমার। আর তখনই ঘরের ভেতর থেকে কামাখ্যাপ্রসাদ বলে ওঠে, একটুখানি বোস, আমি আসছি।

একটুবাদে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে কামাখ্যাপ্রসাদ। শিবকুমার ওকে অতুল বিস্ময়ে দেখতে থাকে। কামাখ্যাপ্রসাদের হাতে দুটো এনামেলের বাটি। তার একটা শিবকুমারের সামনে নামিয়ে দিয়ে অন্যটা নিয়ে বসে পাশটিতে। বলে, চিঁড়ে আর পাটালি। খা।

খাবে কী, শিবকুমারের বিস্ময়টাই তো কাটছিল না। সে নিষ্পলক দেখতে থাকে কামাখ্যাপ্রসাদকে। ভয়ে ভয়ে শুধোয়, তুমি কি এতক্ষণ ভ্যানিশ হয়ে ঘুরে বেড়ালে কুয়োর ধারে, গাছের ডালে? মিটিমিটি হাসছিল কামাখ্যাপ্রসাদ। বলে, কেন, তোর কোনো সন্দেহ আছে?

ধীরে ধীরে মাথা নাড়াতে থাকে শিবকুমার, কেমন করে পারলে?

– কেমন করে আবার, মা-কামাখ্যার কৃপায় আমি যা করতে চাই, তাই পারি। ওঁর কাছে যা চাই, তাই পাই।

– কেমন করে চাও? মন্দিরে গিয়ে হত্যে দাও?

– হত্যে দিয়ে চাইবার কথাটা মনে হলো কেন তোর?

– আমাদের ওদিকে ঠাকুরের কাছে কিছু চাইতে হলে সবাই হত্যে দেয়।

মৃদু হাসে কামাখ্যা। বলে, আমাকে কিছু চাইবার জন্য মায়ের কাছে হত্যে দিতে হয় না। যখন মায়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়, সরাসরি চেয়ে নিই।

– মায়ের সঙ্গে তোমার দেখা হয় বুঝি?

– হয় বইকি। নইলে আমার আবদার আর কার কাছে পেশ করব?

– রোজ দেখা হয়?

– আমি রোজ দেখি মাকে, কিন্তু রোজ ওঁর সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয় না। যখন আমার কিছু চাইবার থাকে, মাকে কাছে ডেকে নিই, মা এলে পর আবদারটা জানাই।

– মা যখন আসে, তুমি মাকে দেখতে পাও?

– পাই বইকি।

শিবকুমার অবাক নয়নে শুনছিল কামাখ্যাপ্রসাদের কথাগুলো। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলছিল ওর কচি মন।

সেটা বুঝি কামাখ্যাপ্রসাদ বুঝতে পারে। বলে, তুই মাকে দেখতে চাস?

– আমি তাঁকে দেখতে পাব?

– কেন পাবিনে? প্রাণমন দিয়ে ডাকলে তুইও দেখতে পাবি।

– কবে দেখাবে মাকে?

কামাখ্যাপ্রসাদ একটুখানি ভেবে নেয়। একসময় বলে, আজ রাতেই দেখাব। আজ মহাঅমাবস্যা। এমনিতেই মা আসবেন আমার কাছে। তখন চাইলে, তুইও দেখতে পাবি।

উত্তেজনায় সারা শরীর অল্প অল্প কাঁপছিল শিবকুমারের। কামাখ্যাপ্রসাদ ঠিক বলছে কিনা তাই নিয়ে একটা গাঢ় ধন্ধ জাগে তার মনে। বলে, এক্কেবারে আমার সামনেটিতে এসে দাঁড়াবেন তিনি?

– দাঁড়াবেন বইকি।

কামাখ্যাপ্রসাদের কথা শুনে ভয়ে, বিস্ময়ে শিবকুমারের শরীরটা অজান্তে কেঁপে ওঠে।

 

 

পনেরো

দিনভর কামাখ্যা দেবীর মন্দির-চত্বরে কাটিয়ে রাতের বেলায় মন্দির থেকে ফিরে আসে দুজনে।

কামাখ্যাপ্রসাদ বলে, চল স্নান সেরে নিই। তারপর মায়ের পুজোয় বসব।

স্নান সেরে দুজনে ঢোকে ঘরে। চৌকির ওপর থেকে বিছানাটা সরিয়ে দেয় কামাখ্যাপ্রসাদ। তারপর ঘটির জল দিয়ে পুরো চৌকিটা ভালো  করে মুছে দেয়। মা-কামাখ্যার বিবর্ণ ছবিটাকে এনে বসিয়ে দেয় চৌকির একপ্রান্তে। তার একপ্রান্ত ঠেকনা খায় দেয়ালে।

চৌকির ওপর ফুল, বাতাসা, ধূপ ইত্যাদি গুছিয়ে রাখে কামাখ্যাপ্রসাদ। দুটো ধুনচিতে নারকোলের ছোবড়া ভরে দেয়। তারপর পুজোয় বসে।

প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পুজো করে কামাখ্যাপ্রসাদ। একসময় পুজো শেষ হলে পর ধুনচি দুটো জ্বালিয়ে দেয়। এক মুঠো করে ধুনো ফেলে দেয় জ্বলন্ত আগুনের ওপর। ধুনচি দুটোকে বসিয়ে দেয় চৌকির ওপর। তারপর চৌকির তিন কিনার জুড়ে মেঝের ওপর বড় বড় মোমবাতি জ্বেলে দেয়। কেবল মায়ের ছবি যেদিকটায় রয়েছে, সেই দেয়ালের দিকটাই খালি থাকে।

এরপর কামাখ্যাপ্রসাদ চলে আসে দরজার মুখে। শিবকুমারকে বলে, তুই দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়া। ওখানে থেকেই মাকে দেখতে পাবি। মন দিয়ে কেবল মাকে ডাকতে থাক। মা ছাড়া কারো কথা, কোনো কিছুর কথাই ভাববিনে।

সারাঘর ধুনোর ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছে। মেঝেতে মোমবাতিগুলো জ্বলছে। সেই আলোয় সারাঘরে আলো। কিন্তু সেই আলো চৌকির শেষপ্রান্ত  অর্থাৎ দেয়াল অবধি পৌঁছায়নি। ফলে ওইদিকটায় আবছা অাঁধার। তবে, ধুনোর ধোঁয়া কমে আসার পর ওই আলো-অাঁধারিতে মায়ের ছবিখানাকে খুব অস্পষ্ট হলেও দেখা যাচ্ছিল।

শিবকুমার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ছবিখানার দিকে। এবং একসময় তার মনে হয় ছবির মধ্যে মা বুঝি মুখ টিপে টিপে হাসছে।

দরজার মুখে দাঁড়িয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় মন্ত্র পড়ে চলেছে কামাখ্যাপ্রসাদ। মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে বলে উঠছে, আয়… আয়। সারা ঘরজুড়ে একধরনের অশরীরী পরিবেশ।

একসময় শিবকুমার স্পষ্ট দেখতে পায়, চৌকির ওপর মায়ের ছবিখানা অল্প নড়ে উঠল। পরমুহূর্তে ছবি ভেদ করে এক বিশাল কালীমূর্তি ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে লাগল চৌকির আড়াল থেকে। ক্রমশ একটু একটু করে ছাদের দিকে উঠতে থাকল সেই মূর্তি। শিবকুমার বিস্ফারিত চোখে দেখতে থাকে সেই দৃশ্য। ধুনচি থেকে তখনো অবধি  অল্প অল্প ধোঁয়া উঠছিল। চৌকির থেকে হাতখানেক উঁচু অবধি গাঢ় ধোঁয়ায় ভরে রয়েছে। তার ওপরে পাতলা ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ার আড়ালে, শিবকুমার নিষ্পলক চোখে দেখতে থাকে, মা-কালীর বিশাল মূর্তিটা অল্প অল্প দুলছে। এবং শিবকুমার স্পষ্ট দেখতে পায়, মা ওর দিকে তাকিয়ে মৃদুমৃদু হাসছেন।

সহসা উচ্চৈঃস্বরে ‘মা… মা’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে কামাখ্যাপ্রসাদ। তারপর ফিসফিস করে। শিবকুমারকে বলে, আমি এখন মায়ের গুপ্ত পূজা করব। তাঁর থেকে কিছু চাইব। যতক্ষণ না দরজা খুলছি, চুপচাপ বসে থাক দাওয়ায়। একেবারে শব্দ করিসনে।

বলেই দড়াম করে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয় কামাখ্যাপ্রসাদ। বাইরে শিবকুমার হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

প্রায় আধঘণ্টা ঘরের দরজার খুলল না। ভেতর থেকে ভেসে আসছিল কামাখ্যার গলায় দুর্বোধ্য ভাষায় একনাগাড়ে মন্ত্রপাঠ।

একসময় সবকিছু সুনসান হয়ে যায়। এবং তার খানিকবাদে কামাখ্যাপ্রসাদ দরজা খুলে বেরিয়ে আসে বাইরে।

খুব গম্ভীর গলায় বলে, যা, ঘরে গিয়ে মাকে ভক্তিভরে প্রণাম কর।

ভয়ে-আশঙ্কায় ঘরে ঢোকে শিবকুমার। ততক্ষণে মোমের বাতি নিভে গিয়েছে। ধুনচির থেকেও বেরোচ্ছে না ধোঁয়া ধোঁয়া। দেখে, চৌকির ওপর মায়ের সাবেক ছবিটি দেয়ালের ওপর হেলানো রয়েছে। সারাঘর ধূপ-ধুনোর গন্ধে ভরে রয়েছে।

ঘোরের মাথায় কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে শিবকুমার। একসময় প্রণাম করে মাকে। তারপর ধীরপায়ে বেরিয়ে আসে। তার সারা চোখমুখে তখন নিদারুণ ঘোর।

কামাখ্যাপ্রসাদ সেদিন অনেক রাত অবধি শিবকুমারকে শুনিয়েছিল তার জীবন নিয়ে অনেক কথা। বলেছিল, আমার মুলুক হলো মায়াং। মায়াংয়ের নাম শুনেছিস? সেখানে সবাই জাদুকর, সবকিছুই জাদু।

ওই রাতে কামাখ্যাপ্রসাদ শিবকুমারকে শুনিয়েছিল মায়াং নামক এক অলৌকিক দেশের কথা।

শুনতে শুনতে বিস্ময়াহত শিবকুমার বলে ওঠে, আমি এতকাল হৃদয়নাথের কাছে যেসব জাদু শিখেছি, সবই হাতসাফাইয়ের খেলা। এমনকি, মেজোকাকার ডায়েরিতে যা সব লেখা রয়েছে, ওগুলোও কিছু কৌশল বই নয়, কিন্তু এই দুদিনে তুমি যা-সব দেখালে, শূন্যে ভাসতে থাকা কল্কে, গাছের ডাল থেকে কথা বলা,  মা-কামাখ্যার জ্যান্ত হয়ে ওঠা, এসব তো জাদু নয়, সবই অলৌকিক। তুমি তো জাদুকর নও, তুমি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী।

এতক্ষণে শিবকুমারের মুখের ওপর সরাসরি চোখ রাখে কামাখ্যাপ্রসাদ। খুব নরম গলায় বলে, একটা কথা মনে রাখিস। মনে কুসংস্কার থাকলে জাদুকর হওয়া যায় না। জাদুকররা এই দুনিয়ায় সাধারণ মানুষদের চেয়ে অনেক বেশি যুক্তিবাদী, বৈজ্ঞানিক মনের অধিকারী। সবচেয়ে অন্ধবিশ্বাসমুক্ত। কারণ সাধারণ মানুষ যেগুলোকে অন্ধবিশ্বাসে অলৌকিক বলে ভাবে, জাদুকররা সেগুলোই করে দেখায়। আর, সেই কারণেই তারা জানে, ওইসব অলৌকিক ব্যাপার-স্যাপারের অন্তর্নিহিত কারণ। সবকিছুকে অলৌকিক বলে ভাবলে তুই জাদু শিখবি কী করে? কথায় কথায় কেবল অবাক হয় সাধারণ মানুষেরা। জাদুকরের চাই সব বিষয়ে অসীম কৌতূহল।

খুব ব্যাকুল গলায় শিবকুমার বলে ওঠে, তুমি আমাকে জাদু শেখাবে?

সে-কথায় মৃদু হাসে কামাখ্যাপ্রসাদ। বলে, দ্যাখ, জাদু শেখানো যায় না। বলতে বলতে শিবকুমারের মুখের দিকে একঝলক তাকায় কামাখ্যাপ্রসাদ। ওর হতাশায় ম্লান হয়ে আসা মুখখানি দেখে বুঝি মায়া জাগে মনে। বলেন, আমি তোকে কিছু জাদুর খেলা অবশ্যই শিখিয়ে দিতে পারি। কিন্তু কেবল বানানো খেলা রপ্ত করে দেখালেই তাকে জাদুকর বলে না। জাদুকর প্রতি মুহূর্তে জাদু তৈরি করবে। তার মগজ থাকবে একটি চালু জাদুর কারখানা। আর, তার জন্য তার চাই একটি যুক্তিবাদী মন। চলতি বিজ্ঞানের নিয়মগুলোকে কাজে লাগিয়ে জাদুকর মাথা খাটিয়ে জাদু বানায়। কিন্তু সে নিজেই যদি সারাক্ষণ সবকিছুর মধ্যে অলৌকিক ব্যাপার খুঁজে বেড়ায়, তবে আর তাকে জাদু বানাতে হবে না।

– যেমন  ধর, পামিংয়ের মাধ্যমে আঙুলের ডগায় রাখা জিনিসকে তালুবন্দি করা, হাতের পেছন দিকে নিয়ে যাওয়া, ডান হাতের জিনিস  বাঁ হাতে নিয়ে যাওয়া, বাঁ হাতের জিনিস ডান হাতে, কানের ডগায় রাখা জিনিস হাতে, আবার হাতে রাখা জিনিস কানের ডগায়…, মোট কথা জিনিসটাকে সারাক্ষণ হাত বদলাবদলি করা…। কৌশল বলতে তো এই। এবার কৌশলটাকে কাজে লাগিয়ে তুই হাজার রকমের খেলা তৈরি করবি। যেমন আমি তৈরি করেছি মায়ের ছবিকে প্রসাদী করে আনার খেলা, তুই করেছিস একটা লাড্ডুর পয়সা দিয়ে দুটো লাড্ডু তুলে নেওয়ার খেলা।

শিবকুমার ভয়ানক চমকে ওঠে। সত্যিই তো, গতকাল খোলা ভ্যানে হরেক কিসিমের মিঠাই বোঝাই করে বেচছিল মিঠাইওয়ালা। কামাখ্যাপ্রসাদ যখন মা-কামাখ্যার মন্ত্রপূত ছবি বেচছিল, সেই ফাঁকে সামনের ভ্যানওয়ালার থেকে একটা লাড্ডু কিনেছিল শিবকুমার। কিনেছিল একটা, কিন্তু হাতিয়েছিল আরো একটা। মিঠাইওয়ালা টেরই পায়নি। শিবকুমারের ধারণা, দুনিয়ার কেউই ওই অপকর্মটি টের পায়নি। আর কামাখ্যাপ্রসাদ তো সারাক্ষণ ক্রেতাবেষ্টিত অবস্থায় ঘোরলাগা চোখে মা-কামাখ্যার ছবিকে প্রসাদী করবার কাজেই ব্যস্ত ছিল। তার তো অন্যদিকে তাকানোর ফুরসতই ছিল না। আশ্চর্য!

মিটিমিটি হাসছিল কামাখ্যাপ্রসাদ। মাথাটিকে মৃদুমৃদু দোলাচ্ছিল। বলে, তুই ভেবেছিলি আমার চোখকে ফাঁকি  দিবি! ওরে, চোখদুটোকে এমনতরো বানাতে না পারলে কি আর এই দুনিয়ার হাজারো খুঁটিনাটির ওপর সারাক্ষণ নজরদারি করা চলে? আর, দুটি চর্মচক্ষু দিয়ে দুনিয়ার যাবতীয় খুঁটিনাটিগুলিকে ভরে নিতে না পারলে তোর জ্ঞানচক্ষু খুলবে কী করে? একটু থেমে বলে, এর নাম হলো অবজারভেশন। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি ছাড়া দিব্যদৃষ্টি পাওয়া যায় না। বলতে বলতে একটুক্ষণ শিবকুমারের  মুখের ওপর চোখদুটোকে বিঁধিয়ে রাখে কামাখ্যাপ্রসাদ। একসময় বিড়বিড় করে বলতে থাকে, এমন কন্দর্পকান্তি চেহারা তোর, এমন নিষ্পাপ মুখের গড়ন, সারা শরীরে এমন কমনীয় লাবণ্য, দেখলেই বোঝা যায়, তুই বড়ঘরের ছেলে। সম্ভবত কোনো জমিদারের ব্যাটা তুই। তাবাদে, তোকে দেখে কেউ বিশ্বেসই করবে না যে, তুই মানুষকে ঠকাতে পারিস। তোর ক্ষেত্রে এটাই একটা বড় সুবিধে। যাগ্গে, তা, জাদুর সাহায্যে এই চোট্টামো কদ্দিন ধরে করছিস?

এমন কথায় লজ্জায় ঘেন্নায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে সাধ হয় শিবকুমারের। পাঁচবিবির জমিদার বংশের ছেলে হয়ে সে কিনা হাতসাফাইয়ের মাধ্যমে লাড্ডু চুরি করে! নিদারুণ ঘেন্নায় নিজেকে থুৎকার দিতে দিতে তার মধ্যে একধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে। কামাখ্যাপ্রসাদের দিকে তাকিয়ে বলে, জাদু তো একধরনের চোট্টামোই। তুমিও তো মায়ের নামে দিনের পর দিন চোট্টামো করে চলেছ।

সে-কথায় কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকে কামাখ্যাপ্রসাদ। আকাশের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে কয়েক দন্ড। কিছু যেন খুঁজছে। একসময় খুব ভরাট গলায় বলে, তোর মনে হয়, চোট্টামো করি আমি?

– তা নয় তো কি! ছবিগুলোকে সত্যি সত্যি মায়ের কাছে পাঠাও তুমি?

– পাঠাই কিনা তুই তো তা ভালো করেই জানিস। তুইও তো করে দেখালি। কিন্তু এটাকে চোট্টামো বলছিস কেন?

– বা রে, কৌশলে কাউকে ঠকিয়ে ওই বাবদ পয়সা নিলে তাকে চোট্টামো বলে না? লোকঠকানো বলে না?

– আমি লোক ঠকাই? একচোখ ছোট করে কামাখ্যাপ্রসাদ তাকিয়ে থাকে শিবকুমারের দিকে, তুই ষোল আনা নিশ্চিত?

– ঠকানো ছাড়া  কী? লোকগুলো তো ভাবে, সত্যি সত্যি বুঝি ছবিটা মায়ের পায়ের ছোঁয়া নিয়ে ফিরে এলো।

– তা ভাবে বইকি, কিন্তু তাতে করে তারা ঠকে, না জেতে? আর, তার জন্য আমি কি কোনো বাড়তি পয়সা নিই? মন্দিরের চারপাশে অন্য যারা ছবি বেচে, তাদের থেকে এক ছ্যাদামও কি বেশি নিই আমি?

এতক্ষণে বুঝি কিঞ্চিৎ ধন্ধে পড়ে যায় শিবকুমার। বাস্তবিক, মায়ের পায়ের ছোঁয়া পাওয়া ছবি বেচে কামাখ্যাপ্রসাদ বাড়তি পয়সা তো নেয় না।

একটুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে কামাখ্যাপ্রসাদ। একসময় বিড়বিড় করে বলতে থাকে, আমি কাউকে ঠকাই নে রে। ঠকাতে চাইলে, আমার হাতে যা খেলা রয়েছে, সারাবিশ্বকে এক হাটে কিনে পরের হাটে বেচে দিতে পারতাম। বলতে বলতে দুদিকে লম্বা করে মাথা নাড়াতে থাকে কামাখ্যাপ্রসাদ, আমার থেকে যারা কেনে, তারা ন্যায্য দামেই ছবি পায়। বরং আমি ওদের মধ্যে এই বিশ্বাসটা ভরে দিই যে, তারা মায়ের একটা প্রসাদী ছবি নিয়ে বাড়ি গেল। ওই ছবিটা ওদের মতো দুর্বল মানুষের মনে কতখানি শক্তি জোগাবে, তুই তার কতটুকু জানিস! মানুষের মনের শক্তিটাই তো আসল রে, মনের শক্তিতেই মানুষ পাহাড় ডিঙোয়, সমুদ্রটা সাঁতরে পার হয়ে যায়। সংসারের হাজারো ঝড়ঝঞ্ঝায় অসহায় ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে মনের ওই শক্তিটুকুই তো তাদের বাঁচিয়ে রাখে। আর, তুই বলছিস কিনা আমি চোট্টামো করছি!

শিবকুমার অবাক হয়ে শুনছিল। যেন কামাখ্যাপ্রাসাদ নয়, তার সামনে বসে রয়েছে কোনো সর্বদ্রষ্টা মানুষ, একজন ত্রিকালজ্ঞ সাধক। একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দার্শনিক।

বিস্ময়ে থ হয়ে যেতে যেতে শিবকুমার বলে, এত বড় জাদুকর তুমি, তাঁবু খাটিয়ে কিংবা হল ভাড়া নিয়ে শো করলে তো অনেক জাদুকরেরই ভাত মারা যাবে। সেসব না করে, মন্দিরের সামনে বসে বসে ছবি বেচো কেন?

শিবকুমারের কথায় নিঃশব্দে হাসে কামাখ্যাপ্রসাদ। বলে, আমি বিরাট জাদুকর? বলতে বলতে মাথাটাকে অল্প অল্প দোলাতে থাকেন। একসময় বলে, দুনিয়ার সেরা জাদুকর হলেন ঈশ্বর। আমরা তাঁকে খুব অমর্থভাবে নকল করি মাত্র।

বলতে বলতে সহসা অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে যায় কামাখ্যাপ্রসাদ।

তখন দিনভর কামাখ্যা-মন্দিরের পাশে বসে বসে দর্শনার্থী মানুষদের কাছে মায়ের মন্ত্রপূত ছবি বেচে কামাখ্যাপ্রসাদ, আর, রাতের বেলায় ডেরায় ফিরে এসে তন্ত্রসাধনা করে। মাঝে মাঝেই তার তন্ত্রার্জিত ক্ষমতা দেখিয়ে অবাক করে দেয় শিবকুমারকে। কোনোদিন হুঁকোয় তামাক খেতে খেতে কল্কেটা হুঁকোর মাথা থেকে অনেকখানি ওপরে উঠে ভাসতে থাকে শূন্যে। কোনোদিন বা উঠোন থেকে দূরের পেয়ারা গাছটার দিকে হাত বাড়িয়েই লোকটা হস্তগত করে ফেলে একটা ডাঁসা পেয়ারা। কোনোদিন বা শিবকুমারের সামনেই মা-কামাখ্যার সঙ্গে কথোপকথন করতে থাকে। লোকটার কান্ডকারখানা দেখতে দেখতে শিবকুমারের কখনো মনে হয়, নিপাট জাদু, কখনো-বা অলৌকিক তন্ত্রবিদ্যা। লোকটাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না শিবকুমার। কেমন জানি মনে হয়, লোকটার তন্ত্রসাধনার মধ্যে কোথায় যেন বড়সড় ফাঁকি রয়েছে। সেই কারণেই কিছুদিন যাবৎ ওকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবার কথাই ভাবছিল শিবকুমার।

কামাখ্যাপ্রসাদের মুখে বারংবার মায়াংয়ের কথা শুনতে শুনতে তখন মায়াং যাবার ইচ্ছেটা চেপে বসেছে শিবকুমারের মনে। ওটা নাকি পুরোপুরি জাদুর গ্রাম। ওই গ্রামের বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাই নাকি এক-একটি মায়াধর। ওরা নাকি জাদুবলে মানুষকে চোখের সমুখেই ভেড়া বানিয়ে দেয়। খোঁজখবর নিয়ে জেনেছে শিবকুমার, কামরূপ-কামাখ্যা থেকে পাক্কা দুদিনের পথ। প্রথমে পায়ে হেঁটে মালিগাঁও। সেখান থেকে রেলে চড়ে গৌহাটি। গৌহাটি থেকে মায়াংয়ের দিকে নাকি বাস যায়।

অনেক ভেবেচিন্তে যখন মায়াংয়ের উদ্দেশে রওনা দেবার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা প্রায় নিয়ে ফেলেছে শিবকুমার, ঠিক তখনই আচম্বিতে এমন একটি ঘটনা ঘটে গেল, শিবকুমারের জীবনের মোড়টাই ঘুরে গেল পুরোপুরি।

 

 

ষোলো

যখন কামাখ্যার মন্দিরের পাশে বসে বসে মায়ের ছবি বেচে কামাখ্যাপ্রসাদ, ওই সময়টা শিবকুমার ঘুরে বেড়ায় মন্দিরের আশেপাশে। সেদিনও ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ততক্ষণে মন্দির চত্বরে বেশ ভিড় জমেছে। আশেপাশের দোকানগুলোতেও বিকিকিনির জোয়ার বইছে।

আচমকা ভিড়ের ভেতর পথ করে করে একটা লোককে এগোতে দেখে শিবকুমারের সারা শরীরের রোম বুঝি অজান্তে খাড়া হয়ে ওঠে। ভিড়ের দৈত্যাকার ওই লোকটাই তো সেদিন পাঁচবিবির গড়ের সামনে সদরদিঘির লাগোয়া ফলের বাগানে সন্তর্পণে দেখা দিয়েছিল হৃদয়নাথকে। যতই না কেন আসন্ন সন্ধ্যার অস্পষ্টতা থাকুক, লোকটাকে তো ওই সন্ধ্যায় চোখের মণিতে বেঁধে ফেলেছিল শিবকুমার। পরের দিন ওই লোকটাই তো মঞ্চে নররাক্ষস হয়ে একটা জ্যান্ত মুরগিকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল!

নিজের চোখদুটোকেই বুঝি বিশ্বাস হচ্ছিল না শিবকুমারের। হৃদয়নাথের জাদুসিন্দুকের মধ্যে বন্দি ‘বীর’টা কামাখ্যা-মন্দিরের সামনে সশরীরে ঘোরাফেরা করে কেমন করে? এ কী রহস্য!

চোখদুটোকে বার-দুই রগড়ে নিয়ে লোকটাকে পুনরায় ভালো করে নিরীক্ষণ করে শিবকুমার। এবং একসময় নিশ্চিত হয়, ভিড়ের মধ্যে চলমান লোকটি হৃদয়নাথের ওই পোষা ‘বীর’টা ছাড়া আর কেউ নয়।

দুহাতে দুটো পুরি-তরকারিভর্তি ঠোঙা নিয়ে ভিড় ঠেলে ঠেলে এগোচ্ছিল লোকটা। দেখতে দেখতে শিউরে ওঠে শিবকুমার। কী এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে নিঃশব্দে লোকটার পিছু নেয় সে। লোকটার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ভিড় ঠেলে ঠেলে অতি সন্তর্পণে এগোতে থাকে।

একসময় ভিড়ের বাইরে চলে আসে লোকটা। দ্রুতপায়ে হাঁটতে থাকে দূরের ঝাঁকড়া বটগাছটার দিকে। শিবকুমারও দূর থেকে লোকটাকে অনুসরণ করে।

একসময় বটতলায় পৌঁছে যায় লোকটা। শিবকুমার ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছে পার্শ্ববর্তী একটা ঝোপের আড়ালে।

ওই বটের তলায় আরো এক মহাবিস্ময় বুঝি অপেক্ষা করছিল শিবকুমারের জন্য। ঝোপের আড়াল থেকে চোখ চারিয়ে ওই মুহূর্তে সে দেখতে পায়, বটতলায় বসে রয়েছে, আর কেউ নয়, স্বয়ং হৃদয়নাথ! ওকে দেখতে দেখতে শিবকুমারের সারা শরীর উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে ওঠে।

বটের তলায় পাথরের মতো স্থির হয়ে বসেছিল হৃদয়নাথ। পাশটিতে বসে রয়েছে বছর তেরো-চোদ্দোর এক কিশোরী, যাকে হৃদয়নাথের দলে এর আগে দেখেনি শিবকুমার।

একসময় হৃদয়নাথের কাছটিতে পৌঁছে যায় লোকটা। ঠোঙাদুটো ওদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খুব মিহি গলায় বলে ওঠে, এই ল্যান কত্তা। আশালোতা তুমিও লাও। গরম আসে।

সামনের দিঘিটার দিকে দৃষ্টি বিঁধিয়ে বসেছিল আশালতা নামের মেয়েটি। লোকটার কথায় ধাঁ করে তাকায় ওর দিকে। দুচোখে ঠিকরে পড়ে সীমাহীন রোষ, আর লালচে ঠোঁটের কষ বেয়ে উপচে পড়ে লোকটির প্রতি ততোধিক তাচ্ছিল্য। পরক্ষণেই পুনরায় দিঘির জলে স্থির হয়ে যায় ওর দৃষ্টি। কিন্তু ওইটুকু সময়ের মধ্যেই শিবকুমার দেখে ফেলতে পারে কিশোরীর মুখখানি।

উজ্জ্বল শ্যামলা রঙের, ছিপছিপে শরীর মেয়েটার। একেবারে চাবুকের মতো টানটান। তিলমাত্র নমনীয়তা নেই তাতে। এতক্ষণে ওর মুখখানাও দেখতে পায় শিবকুমার। পানপাতা মুখখানির ওপর শানিত ছোরার মতো একজোড়া ধারাল চোখ। ছোট্ট চিবুকে একটি বড়মাপের তিল। সবমিলিয়ে মুখের শোভায় একটা দৃপ্ত ভাব। প্রথম দর্শনে বড়ই দেমাকি লাগে আশালতাকে। কিন্তু পাশাপাশি শিবকুমারের মনে হয়, ওই দেমাকটুকু মেয়েটার রূপটিকে যেন বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি।

হাত বাড়িয়ে ঠোঙাটা সাগ্রহে নেয় হৃদয়নাথ। লোকটার দিকে তাকিয়ে খুব আলগোছে শুধোয়, তুমি খাইস, সিদ্ধেশ্বর?

দৈত্যাকার লোকটার নাম তবে সিদ্ধেশ্বর! এতক্ষণে বুঝতে পারে শিবকুমার। আর, হৃদয়নাথের সঙ্গের মেয়েটার নাম আশালতা।

আশালতা ফিরেও তাকাচ্ছিল না সিদ্ধেশ্বরের দিকে। সামনের দিঘির দিকে চোখদুটি স্থির রেখে গুম মেরে বসেছিল সে। আর, খাবারের ঠোঙাটি তখনো অবধি ধরা ছিল সিদ্ধেশ্বরের হাতে।

একসময় সিদ্ধেশ্বর পুনরায় মিনমিনে গলায় বলে ওঠে, আশালোতা, ঠোঙাটা ধর। গরম রইসে। খায়া লাও। আমি জল আনতেছি।

সিদ্ধেশ্বরের কথায় ওর দিকে একঝলক অগ্নিদৃষ্টি ফেলে তাকায় আশা। পরমুহূর্তে দুচোখে তীব্র বিতৃষ্ণা ফুটিয়ে ফিরিয়ে নেয় মুখ।

মেয়ের দিকে তাকিয়ে হৃদয়নাথ বলে ওঠে, জলদি জলদি খায়্যা লে আশা। এবার আমাদের রওনা দিতে হইব। আইজ রাইতের মইধ্যেই শোয়ের জা’গায় পৌঁছনো লাগব। ভুজঙ্গরা এতক্ষণে তাঁবু-টাবু খাটাইল কিনা কে জানে।

এতক্ষণে বাপের ওপর একপ্রস্থ জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আশালতা। ঝাঁঝাল গলায় বলে ওঠে, আমি কিছু খাব না বাবা, আমাগো ক্ষিদা নাই।

বেশ কদিন পাঁচবিবির গড়ে থিতু হলেও হৃদয়নাথের ঘর-সংসার সম্পর্কে কিছুই জানে না শিবকুমার। এতক্ষণে বুঝল, ওই সুন্দরী মেয়েটা হৃদয়নাথেরই মেয়ে।

ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আরো গুটিকয় ব্যাপার একটু একটু করে স্পষ্ট হচ্ছিল শিবকুমারের কাছে। প্রথমত, ওই সিদ্ধেশ্বর নামের লোকটা কোনো পোষা বীর-টীর নয়, রক্তমাংসের একটা আস্ত মানুষ। আর যা-ই হোক, ওই রহস্যময় সিন্দুকটায় বন্দি থাকে না লোকটা। বরং হাবেভাবে মনে হলো, হৃদয়নাথের সঙ্গে ওর এক্কেবারে মনিব-ভৃত্যের সম্পর্ক। কিন্তু যেটা কিছুতেই বোঝা যাচ্ছিল না, তা হলো, সিন্দুকটার মধ্যে তবে কী থাকে? কেন ওটা খোলা ও বন্ধ করবার ব্যাপারে হৃদয়নাথের এত সতর্কতা? সিদ্ধেশ্বর নামের লোকটা ফি-শোতে ওই সিন্দুকটার ভেতর থেকেই বা বেরোয় কেন? গোটা মঞ্চজুড়ে এমন দানবীয় আচরণ করে কীভাবে? দুদিকে দশ-দশ কুড়িটা লোককে কেমন করে অবলীলায় টেনে বেড়ায় মঞ্চময়? জ্যান্ত মুরগিটাকেই বা কী করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়? তবে কি সত্যি সত্যি ওই সময়টায় ওর ওপর কিছু ভর করে? তবে কি ওই সময়টায় হৃদয়নাথ লোকটাকে কিছু সময়ের জন্য রাক্ষস বানিয়ে দেয়? নাকি নিজের পোষা বীরটাকেই সেঁধিয়ে দেয় সিদ্ধেশ্বরের শরীরে? তেমন মন্ত্র কি রয়েছে এই দুনিয়ায়? সেই মন্ত্র কি বাস্তবিক জানে হৃদয়নাথ?

একসঙ্গে এমনতরো হাজারো প্রশ্ন ততক্ষণে ঘাই মারতে লেগেছে শিবকুমারের কিশোর-মনে। তারই মধ্যে, ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে অকস্মাৎ হৃদয়নাথের সামনে হাজির হওয়ার কথাটা বারেকের তরে মনে উদয় হলেও শেষ অবধি নিজেকে সামলে নেয় শিবকুমার। সামলে নেয় এই কারণে যে, একবার তো হৃদয়নাথ ওঁকে ফাঁকি দিয়ে অন্যত্র পালিয়েছিল। পালাতে পালাতে এতদূর অবধি এসে পৌঁছেছে সে। এবারো যদি ওকে দেখামাত্র পুনরায় কোনো উপায়ে সটকে পড়ে। কাজেই, সাতপাঁচ ভেবে ঝোপের আড়ালেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর ওপর কড়া নজর রাখে শিবকুমার।

কিন্তু এতখানি উত্তেজনার মুহূর্তেও শিবকুমারের চোখদুটি বারবার বিঁধে যাচ্ছিল মেয়েটির শরীরে।

শিবকুমার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করছিল ওকে। আশালতার সারা শরীরজুড়ে যৌবনের ঢল সবে নামছে। শরীরের সেই ঢলটিকেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিল শিবকুমার।

কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, এই এলাকাতেই কোথাও জাদু দেখাতে এসেছে হৃদয়নাথের দল। সবে এসেছে। সবে তাঁবু-টাবু টাঙানো চলছে। ওই ফাঁকে সিদ্ধেশ্বরকে সঙ্গে নিয়ে বাপ-বেটিতে কামাখ্যায় কেন এসেছে কে জানে।

কিন্তু এবার জাদুর দল নিয়ে কোথায় থিতু হতে চলেছে হৃদয়নাথ? এত কথার মধ্যেও জায়গার নামটি কিন্তু বলেনি একটিবারের তরেও। কাজেই, শিবকুমারও স্থির করে ফেলে, যতক্ষণ না জায়গাটার নাম জানতে পারছে সে, ততক্ষণ অবধি এক মুহূর্তের তরেও হৃদয়নাথকে দৃষ্টির আড়াল হতে দেবে না।

একসময় ওরা উঠে দাঁড়ায়।

সিদ্ধেশ্বরের দিকে তাকিয়ে হৃদয়নাথ শুধোয়, মালিগাঁও যাবার বাস যেন কয়টায়?

– বেলা এগারোটায়। ওখানেই রেল। পৌঁছতে রাইত হইয়া যাইব গা। সিদ্ধেশ্বর জবাব দেয়।

– ইস। বলতে বলতে সহসা বেজায় অস্থির হয়ে ওঠে হৃদয়নাথ। হনহনিয়ে হাঁটতে শুরু করে। দেমাকি পা ফেলে ফেলে আশালতাও হাঁটতে থাকে বাপের কিছু পিছু। ওদের পাশেই রাখা ছিল একটা মাঝারি আকারের বোঝা। সিদ্ধেশ্বর চকিতে বোঝাটিকে মাথার ওপর চাপিয়ে প্রায় দৌড়তে থাকে।

ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শিবকুমার নির্নিমেষ নয়নে দেখতে থাকে ওদের।

ঠিক কোথায় চলেছে ওরা, কিছুই বুঝতে পারছিল না শিবকুমার। কিন্তু ততক্ষণে সে মনস্থির করেই ফেলেছে, যেখানেই যাক ওরা, অনুসরণ করতে করতে শিবকুমার এবার ঠিক হৃদয়নাথের ডেরায় গিয়ে পৌঁছবে। এবং যতক্ষণ না হৃদয়নাথের ডেরার হদিসটা পুরোপুরি পাচ্ছে, ততক্ষণ ওদের কিছুতেই জানতে দেবে না ওর কথা। মোট কথা, এবারে আর কিছুতেই হৃদয়নাথকে পিছলে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না শিবকুমার।

কাজেই, মায়াং যাওয়া মাথায় ওঠে শিবকুমারের। একসময় সে হাঁটতে থাকে হৃদয়নাথদের পিছু পিছু। এমনকি, কামাখ্যাপ্রসাদকে বলে আসারও সময় পায় না।

 

 

সতেরো

তখন সবে সন্ধে নামছে, তাঁবুর সামনে সহসা শিবকুমারকে দেখে বুঝি ভূত দেখে হৃদয়নাথ। তড়াক করে উঠে দাঁড়ায়। পা ফেলে ফেলে চলে আসে তাঁবুর বাইরে। দুচোখে তাবৎ বিস্ময় ফুটিয়ে শুধোয়, খোকাবাবু, আপনি।

শিবকুমারের তখন একেবারে ধূলিধূসরিত অবস্থা। গতকাল থেকে ওদের পিছু নিতে গিয়ে একেবারে কাহিল সে।

মালিগাঁওতে পৌঁছে কোনো ট্রেন পাওয়া গেল না দেখে রাতটা মালিগাঁও স্টেশনেই কাটিয়েছে হৃদয়নাথরা। অগত্যা প্ল্যাটফর্মের অন্যপ্রান্তে শিবকুমারও কাটিয়েছে রাতটা। সকালের ট্রেনে চড়ে বসেছে ওরা। দেখাদেখি শিবকুমারও অন্য একটা কামরায়। মাঝে মাঝে এসে আড়াল থেকে দেখে যাচ্ছিল, হৃদয়নাথরা রয়েছে, নাকি ভাগলবা।

শেষ বিকেলে নারেঙ্গা স্টেশনে নেমেছিল হৃদয়নাথের দলটা। দেখাদেখি শিবকুমারও। তবে ওই মুহূর্তেও ওদের সামনে হাজির হয়নি। বেজায় চতুর এই হৃদয়নাথ লোকটা, তার ওপর স্টেশন থেকে শোয়ের জায়গাটা কতদূরে, কিছুই জানে না শিবকুমার। কাছাকাছি কোথাও, নাকি আবার বাসে-টাসে চড়ে বসবে এরা, খোদায় মালুম। কাজেই, এক্ষুনি ওদের সামনে হাজির হলে, যে পরিমাণ ধূর্ত লোকটা, কেমন করে যে চোখে ধুলো দিয়ে কোনদিকে পালাবে, শিবকুমার হয়তো-বা বুঝতেই পারবে না। যাই ঘটুক না কেন, হৃদয়নাথকে দ্বিতীয়বারের জন্য হারাতে রাজি নয় শিবকুমার। কাজেই, নারেঙ্গা স্টেশনে নেমে হাঁটতে থাকে হৃদয়নাথের দল, শিবকুমারও পিছু পিছু অনুসরণ করে ওদের।

প্রায় আধ ঘণ্টাটাক হেঁটে একেবারে গন্তব্যে পৌঁছয় হৃদয়নাথের দল। দূর থেকে শিবকুমার দেখতে পায়, মাঠের মধ্যে তাঁবু খাটানোর কাজ চলছে। এতক্ষণে নিশ্চিত হয় শিবকুমার, এখানেই ওদের পরবর্তী শো। এবার আর চাইলেও শিবকুমারের চোখে ধুলো দিয়ে চট করে কোথাও পালাতে পারবে না হৃদয়নাথ।

শিবকুমারের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল হৃদয়নাথ। ধীরে ধীরে সেই দৃষ্টিতে ফুটে উঠছিল যারপরনাই ত্রাস। একসময় স্পষ্টতই তোতলাতে থাকে সে।

এতদিন যাবৎ আঘাটায়-বেঘাটায় ঘুরে বেড়ানোর যাবতীয় ক্লেশ ও দুর্দশার অন্তে অকস্মাৎ হৃদয়নাথের মুখোমুখি হয়ে ততক্ষণে শিবকুমারের দুচোখ দিয়ে ফুটে বেরোচ্ছে জমিদারি রোষ। এতদিনের পুঞ্জীভূত তাবৎ উষ্মা বুঝি হুড়মুড়িয়ে একলপতে বেরোতে চায়। খরখরে গলায় বলে ওঠে, তার আগে তুমি জবাব দাও, কেন আমার সঙ্গে চালিয়াতিটা করলে?

শিবকুমারের রুদ্রমূর্তি দেখে ততক্ষণে ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছে হৃদয়নাথ। চারপাশে অকারণ দৃষ্টি চালিয়ে বুঝি পরিত্রাণের পথ খুঁজছে। তাও অল্পক্ষণের মধ্যে অশেষ দক্ষতায় কোনোগতিকে সামলে নেয় নিজেকে। মিঠে গলায় বলে, সব বলত্যাছি। আগে তো থিতু হোন, জিরোন, আইসয়াই যখন পরস্যান, সবকিছু খুইলা বলুম বইকি। তার আগে মুখে-হাতে জল দিন তো। বলতে বলতে বুঝি যারপরনাই ব্যস্ত হয়ে ওঠে হৃদয়নাথ, ওরে আশা, কোথা গেলি? দ্যাখ, কে আইসেন!

বাপের ডাকে তাঁবুর ভেতর থেকে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে আশালতা। আসন্ন সন্ধ্যার আলো-অাঁধারিতে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শিবকুমারের দিকে।

ওর দৃষ্টির সামনে সহসা কী যেন হয়ে যায় শিবকুমারের। শরীরের অন্তর্গত যত রোষ, উষ্মা, কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়।

শিবকুমার পলকহীন দেখতে থাকে আশালতাকে।

ব্যাপারটা বুঝি দৃষ্টি এড়ায় না চতুর হৃদয়নাথের। চোখের যাবতীয় আর্তদৃষ্টি মুছে যেতে থাকে দ্রুত। সহসা প্রগলভ হয়ে ওঠে সে, আরে দেখতিছু কী, পাঁচবিবির রাজকুমার আইসে আমাদ্যার ছেঁড়া তাঁবুতে। কী সৌভাইগ্য আমার।

বাপের কথায় শিবকুমারের মুখের ওপর পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে ধরে আশালতা। তবে তা মাত্র কয়েক লহমার জন্য। পরমুহূর্তে ঠোঁটের কোণে একজাতের রহস্যময় হাসি ফোটায় চকিতে। শিবকুমারের সারাশরীর শিরশির করে ওঠে।

ততক্ষণে হৃদয়নাথ পুরোপুরি গুছিয়ে ফেলেছে নিজেকে। সহসা গলা ছেড়ে ডাক পাড়ে সে, নন্দু, অ্যাই নন্দু, কোথা গেলি?

কোত্থেকে যেন দৌড়তে দৌড়তে এলো নন্দু নামের বছর সতেরো-আঠারোর ছোকরাটি।

ওর দিকে তাকিয়ে হুকুমের সুরে বলে ওঠে হৃদয়নাথ, খোকাবাবুরে কলতলায় লিয়া যা। কলটা টিপিয়া দে। বলতে বলতে শিবকুমারের দিকে তাকায় হৃদয়নাথ, যান খোকাবাবু। হাতমুখ ধুইয়া সুস্থির হোন। কিছু মুখেটুখে দ্যান। কথাবার্তা যা হবার পরে হইব গা।

নন্দু নামের ছোকরাটি পায়ে পায়ে এগোতে থাকে কলতলার দিকে। পিছু পিছু হাঁটা দেয় শিবকুমার। আশালতার দিকে তাকিয়ে হৃদয়নাথ নরম গলায় বলেন, যা তো মা, একটা গামছা লিয়া কলতলায় যা। খোকাবাবুর মুখহাত ধোয়ার ব্যবস্থা কইরা দে। উয়ারে জলখাবার দে। বলতে বলতে একটুক্ষণ আরো কী যেন ভাবে হৃদয়নাথ। পুনরায় বলে, উয়াদ্যার গরখান তো দেখস নাই। কী পেল্লায় গর।

তাঁবুর সামনেটিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেছন থেকে শিবকুমারকে স্থিরপলকে দেখছিল আশালতা। সহসা উদ্যত চাবুকের মতো পিছু ফিরে তাঁবুর মধ্যে ঢুকে পড়ে সে। পরক্ষণে একটা গামছা নিয়ে হাঁটা দেয় কলতলার দিকে।

পেছন থেকে দৃশ্যটা দেখতে দেখতে হৃদয়নাথের ঠোঁটের কোণে চকিতের তরে উঁকি মারে এক রহস্যময় চতুর হাসি।

নন্দু কলটা টিপতে শুরু করতেই শিবকুমার পাদুটো নামিয়ে দেয় জলের ধারায়। হাঁটু অবধি ঘসে ঘসে ধুলো তুলতে থাকে। মুখহাত ভালো করে ধোয়। আর, সেই মুহূর্তে দেখতে পায়, আধো অন্ধকারে আশালতা এসে দাঁড়িয়েছে পাশটিতে। আধো-অন্ধকারেও তার চোখের মধ্যিখানে শানিত ছোরাদুটি যেন চকচক করছে। আর, সান্ধ্য হাওয়ায় ভেসে আসছে এক জাতের মিষ্টি গন্ধ, যাকে আশার শরীরের গন্ধ বলেই ভেবে নেয় শিবকুমার।

একসময় হাত-পা ধোয়া শেষ হয়। সঙ্গে সঙ্গে আশালতা, মুখে কিছু বলে না সে, কেবল নিঃশব্দে এগিয়ে দেয় গামছাটি। তাতে করেই বুঝি শিবকুমার বুঝে ফেলে তাঁর করণীয় কর্তব্য। গামছাটা ওর হাত থেকে নিয়ে হাত-পা-মুখ পরিপাটি করে মোছে সে। তারপর গামছাটা পুনরায় এগিয়ে দেয় আশালতার দিকে।

গামছাটা ফেরত পেয়েই আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না আশালতা। দেমাকি পা ফেলে ফেলে হাঁটা দেয় তাঁবুর দিকে।

তাঁবুর মধ্যে ঢুকে একটা কাঁসার সানকিতে পরিপাটি করে চিঁড়ে মাখে আশালতা। পাশের একটা রেকাবিতে মর্তমান কলা খোসা ছাড়িয়ে রাখে। আধখানা পাটালিও রেখে দেয় পাশটিতে। তারপর তাঁবুর ভেতর থেকেই চড়া গলায় ডাক পাড়ে, বাবা, তোমার রাজপুত্তুরকে আসতে বল। ফলার তৈরি।

আশালতার মুখে রাজপুত্তুর কথাটা খট করে কানে বাজে শিবকুমারের। হৃদয়নাথের দিকে তাকিয়ে দেখে, তারও অপ্রস্ত্তত অবস্থা। মিনমিনে গলায় বলে, আশাটা ওইর’ম। কথাবার্তার ছিরিছাঁদ নাই। যান, মুখে কিছু দ্যান এবার।

তাঁবুর ভেতরের আলো-অাঁধারিতে খেতে বসে শিবকুমার। আশালতা দাঁড়িয়ে থাকে সামান্য তফাতে। স্থিরপলকে দেখতে থাকে শিবকুমারের খাওয়া।

ওই সন্ধ্যায় মূলত আশালতার তত্ত্বাবধানে শিবকুমারকে হাত-পা ধোয়া থেকে শুরু করে গামছা দিয়ে পা-হাত মোছা, পাটালি দিয়ে চিঁড়ে খাওয়া, সবকিছুই সম্পন্ন করতে হয। এমনকি, এক গ্রাসের জন্য সাধারণত কতটুকু পাটালি বরাদ্দ করা উচিত, সেটাও প্রথমপাতেই শিখে নিতে হয় শিবকুমারকে।

জলখাবার খেয়ে যখন বাইরে আসে শিবকুমার, হৃদয়নাথ ততক্ষণে তাঁবু খাটানোর তদারকিতে একেবারে ডুবে রয়েছে।

শোয়ের জন্য বরাদ্দ বড় তাঁবুটা খাটানোর কাজ তখনো অবধি চলছে। ভুজঙ্গরা সবাই মিলে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করছে সেজন্য। কারণ, যত জলদি ব্যবস্থাদি শেষ করা যাবে, তত জলদি শো শুরু করা যাবে। রাত পোহালে না-হোক সাত-আটটা পেটের জন্য তিনবেলা খাদ্যখাবার জোগানো, জলদি জলদি শো না শুরু করলে মুশকিল।

হৃদয়নাথদের কথাবার্তা শুনে শিবকুমার বুঝতে পারে, পরের দিনটাও লেগে যাবে।

 

 

আঠারো

হৃদয়নাথ আর আশালতার জন্য বরাদ্দ তাঁবুটার ভেতর একলাটি পাওয়ামাত্র হৃদয়নাথের ওপর একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে শিবকুমার, এবার বল তো ঠিক ঠিক, আমার সঙ্গে এই চালবাজিটা কীজন্যে করলে?

শিবকুমারের এমন চাঁছাছোলা প্রশ্নে যারপরনাই অস্বস্তি বোধ করতে থাকে হৃদয়নাথ।

অল্প তফাতে খাটিয়ার ওপর বসে ছিল আশালতা। ওর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে অস্বস্তিটা আরো বেড়ে যায় বুঝি।

মিনমিনে গলায় বলে ওঠে, কীসের চালবাজি খোকাবাবু?

– চালবাজি নয়? শিবকুমারের গলার স্বর আরো মারমুখী হয়ে ওঠে, সেবার গড় থেকে যাবার বেলায় বললে লালমনিরহাটে যাচ্ছ। অথচ লালমনিরহাটে গিয়ে তোমাদের পেলাম না কেন? মাত্র দিন-পাঁচেকের মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেলে তোমরা? একেবারে কপ্পুরের মতো কোথায় উবে গেলে?

– কপ্পুর। হৃদয়নাথের ঠোঁটের কোণে উঁকি মারে তিক্ত হাসি, তখন তো পারলে গোটা দলটারে লইয়া এসকেপের খেলা খেলতে সাধ যাচ্ছিল আমাগো। আর, জানেনই তো, যে নিজের থেকেই হারায়ে যায়, তাকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। আমি তো তখন প্রাণপণে আপনার কাছ থেকে হারায়ে যেতে চাইছি। কাজেই, একেবারে উলটোদিকের নাম বলসিলাম। কিনা, উত্তুরে লালমনিরহাট। আর, গেলাম কিনা জয়পুরহাট পারায়ে সে-ই আক্কেলপুর। খাড়া দক্ষিণে।

– সেটাই তো বলছি। আরো তেরিয়া হয়ে ওঠে শিবকুমার, কেন আমায় মিছে বলেছিলে সেদিন? কেন বলেছিলে, লালমনিরহাটে বায়না রয়েছে তোমাদের? প্রবল রোষে জ্বলে ওঠে শিবকুমারের চোখদুটি।

বেশ কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকে হৃদয়নাথ। শিবকুমারের উপর্যুপরি প্রশ্নে একেবারে বেসামাল হয়ে পড়ে বুঝি। একসময় গলায় যারপরনাই অপরাধ ফুটিয়ে বলে, স্রেফ আপনাগো ধোঁকা দিবার জন্য খোকাবাবু। আমি তো বুঝতে পারসিলাম, আমার সঙ্গে গড় ছাড়বার লেগে আপনে মনে মনে পা বাড়াইয়া বইস্যা আছেন।

একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায় শিবকুমার। বলে, তাই বলে এভাবে ধোঁকা দিলে? শরীরের তাবৎ রোষ মুখমন্ডলে এনে জমায় শিবকুমার।

– প্রাণের দায়ে খোকাবাবু। প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে হৃদয়নাথ, প্রাণের দায়, বড় দায়। আপনারে সঙ্গে নিলে কত্তাবাবু আমারে জ্যান্ত পুঁইত্যা ফেলতেন।

একটুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকে শিবকুমার। হৃদয়নাথের যুক্তিটাকে পরিপাক করতে থাকে নিঃশব্দে। একসময় বলে, তা না হয় হলো, কিন্তু তাই বলে চারপাশে খুঁজে খুঁজে কোথাও তোমাদের পেলাম না কেন? একেবারে কপ্পুরের মতো উবে গেলে কী করে?

ততক্ষণে শিবকুমারের মেজাজের একটা আন্দাজ পেয়ে গেছে হৃদয়নাথ। বুকের ভেতরে ভয়টাও কিঞ্চিৎ পাতলা হয়েছে তাই। বলে, কপ্পুরের পারা উইরা যাই নাই খোকাবাবু। জলজ্যান্তই গেসি। তবে আপনে গেসেন লালমনিরহাট থিকে পাটিগ্রাম, ধুবরি হয়্যা কামাখ্যার দিকে, আর আমরা এগিয়েসি গাইবান্ধা, সুন্দরগঞ্জ, কুড়গ্রাম হইয়া -।

একটুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে শিবকুমার। একসময় ভেজা গলায় বলে, তাই বলে আমাকে এভাবে ধোঁকা দিলে তুমি? বলতে বলতে তীব্র অভিমানে ধরে আসে গলা, তুমি জানো, তোমার থেকে ধোঁকা খেয়ে এই কটা মাস আমার কী করে কেটেছে!

সে-কথায় কিছুক্ষণ গুম মেরে থাকে হৃদয়নাথ। আড়চোখে দেখে নেয় শিবকুমারের ভাবগতিক। একসময় নিজের কণ্ঠস্বরটিকে বেমালুম বদলে ফেলে সে। গলায় ঈষৎ রুক্ষতা ফুটিয়ে বলে ওঠে, ধোঁকা দিমু না তো কি আপনাকে ওই গু-খাওয়া বিদ্যা শিখায়ে চোদ্দ পুরুষরে নরকে পাঠামু? জমিদারের পোলা হইয়া চোট্টামি আর ধাপ্পাবাজি কইরা ভাতের জোগাড় করবেন আপনি? তাবাদে আপনাগো লইয়া গর ছাড়লে আপনার বাপ আমারে বাঁচতে দিত?

সহসা ওই কথার কোনো জবাব দেয় না শিবকুমার। একসময় প্রায় স্বগতোক্তির ঢঙে বলে ওঠে, ঘর তো আমি ছাড়ছিই। আজ ছ-মাস আমি গড়ছাড়া।

এমন কথায় হৃদয়নাথ ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে শিবকুমারের দিকে। বছর চৌদ্দর একটা বালকমাত্র, এই বয়েসে একটা বিদ্যার জন্য ঘর ছেড়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে! বিদ্যার প্রতি এই নিখাদ টান কি তারও ছিল ওই বয়েসে? কোনো কালে? কিন্তু পরমুহূর্তেই খিঁচিয়ে ওঠে সে, গর ছাড়সেন, সেটা আপনার নিজস্ব বেপার, কিন্তু আমার লগে ঘুইরা বেড়াইছেন ক্যান? দুনিয়ায় আমি ছাড়া আর জাদুকর নাই? আপনার বাপ জানতে পারলে আমারে বাঁচতে দিব?

শেষের দিকে কেমন বিপন্ন দেখাচ্ছিল হৃদয়নাথকে। খুব মিনতি মাখানো গলায় বলে, খোকাবাবু, নিতান্তই ছাপোষা মানুষ আমি। পাকেচক্রে একটা গু-খাওয়া বিদ্যা দিয়া প্যাটের ভাত জুগাই। ঘরে আমার তিন-তিনডা আইবুড়া মাইয়া। আমারে আর দোষের ভাগি কইরা বিপদে ফেলেন না। জাদু শিখাটা আপনার মতোন মনিষ্যির কাছে একডা খেয়াল, কিন্তু আমি এই চুরি-চোট্টামি কইরা জীবাত্মাকে অন্নপ্রাণ জুগাই, আপনি সেটায় বাদ সাইধলে, আমি গেসি।

হৃদয়নাথ জাদুকে বারবার গু-খাওয়া বিদ্যা, চুরি-চোট্টামি বলায় মনে মনে খুব দাগা পাচ্ছিল শিবকুমার। তাও বলে, তুমি আমাকে বিদ্যাটা দাও, তারপর আমি আর একদিনের তরেও তোমার মুখদর্শনও করব না।

ভারি অসহায় চোখে শিবকুমারের দিকে তাকিয়ে থাকে হৃদয়নাথ। একসময় চেঁচিয়ে ডাকে দলের ম্যানেজার ভুজঙ্গকে, ভুজঙ্গ – ও ভুজঙ্গ -। বলতে বলতে ঘনঘন মাথায় হাত চাপড়াতে থাকে হৃদয়নাথ, হা আমার কপাল, আমি কোথা যামু রে -, কী কুক্ষণে ওই গরে পা রাখসিলাম আমি -। বিনাশকালে কী দুর্বুদ্ধি জাগসিল আমার মনে -!

ভুজঙ্গ এসে সামনেটিতে দাঁড়াতেই হৃদয়নাথ বলে ওঠে, শোন, গুদাম-তাম্বুতে তো তুমি একলাই থাক। অটাতেই খোকাবাবুর থাকবার বেবস্তা কইরা দাও।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খানিক দোনোমনো করছিল ভুজঙ্গ। একসময় বাধো বাধো গলায় বলে, কিন্তু ওই তাঁবু তো দলের মালপত্তরে বোঝাই। তাবাদে পারুল থাকে ওই তাঁবুতে।

ভুজঙ্গর মেয়ে পারুল। কিছুদিন যাবৎ ভর্তি হয়েছে দলে। কথাটা খেয়ালই ছিল না হৃদয়নাথের।

– তা হইলে তো ভারি মুশকিল হইল -। সমানে বিড়বিড় করতে থাকে হৃদয়নাথ। একসময় বলে, আচ্ছা, তুমি যাও।

শেষ অবধি ভুজঙ্গর তাঁবুতেই ঠাঁই  হলো শিবকুমারের। পারুল চলে এলো হৃদয়নাথের তাঁবুতে, ভুজঙ্গ আর শিবকুমার থাকল দলের ওই গুদামঘরেই।

গুদাম-তাঁবুর একপ্রান্তে ওই সিন্দুকটাকে দেখামাত্র অনেকদিন বাদে বুকের মধ্যেটা যেন কেমন করে ওঠে শিবকুমারের। যদিও সম্প্রতি সে বুঝে ফেলেছে, ওটার মধ্যে আর যেই হোক, সিদ্ধেশ্বর থাকে না। তাও পয়লা চটকায় সিন্দুকটাকে একেবারে নির্দোষ বলেও মনে হয় না তার। যেভাবে সিন্দুকটাকে সারাক্ষণ আগলে আগলে রাখে ভুজঙ্গ, যেভাবে সন্তর্পণে খোলে-বন্ধ করে, কিছু একটা রহস্য রয়েছে ওটার মধ্যে।

ভুজঙ্গ বলে, আপনি অই সিন্দুকটার ওপর শো’ন খোকাবাবু। গরে আপনার লগে দামি খাটপালঙ্কের বেবস্তা, সেসব ছাড়িয়া-ছুড়িয়া দিয়া, এই তেপান্তরে – দাঁড়ান আপনার লগে বিসনা পাতিয়া দেই। বলতে বলতে এক ঝটকায় সিন্দুকটা খুলে ফেলে ভুজঙ্গ। আর সেই মুহূর্তে শিবকুমার দেখতে পায়, সিন্দুকটার মধ্যেটা রাজ্যের বিছানা-বালিশ, লেপ-তোষক, চাদরে ঠাসবোঝাই।

রাতের বেলায় সিন্দুকটার ওপর শুয়ে খুব অস্বস্তি হচ্ছিল শিবকুমারের। সবকিছু শুনেবুঝেও অবুঝ অস্বস্তি। ঘুম আসতে চাইছিল না কিছুতেই। তার ওপর মাঝে মাঝে অন্ধকার তাঁবুর ভেতরে কোথায় যেন খুটখাট আওয়াজ হচ্ছিল।

অন্ধকারের মধ্যে কান খাড়া করে শব্দটার উৎসটাকে চিনতে চাইছিল শিবকুমার। একসময় তার মনে হয়, সিন্দুকের মধ্যে থেকেই আওয়াজটা আসছে।

সহসা শিবকুমারের বুকের মধ্যে অস্বস্তিটা বেড়ে যায়।

একসময় চাপা গলায় ভুজঙ্গকে ডাক পাড়ে, ভুজঙ্গদা ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?

ভুজঙ্গ বুঝি ঘুমিয়েই পড়েছিল। শিবকুমারের ডাকে ঘুমটা ভেঙে যায়। ঘুমজড়ানো গলায় বলে, খোকাবাবু কিছু বলসিলেন?

– তাঁবুর ভেতর কোথায় যেন খুটখাট আওয়াজ হচ্ছে।

– ইঁদুর। ভুজঙ্গ ঘুমজড়ানো গলায় জবাব দেয়।

– তাঁবুর মধ্যে এত ইঁদুর কেন?

– হতেই পারে। আলতো হাই তোলে ভুজঙ্গ, তাঁবুর মধ্যে চাল-ডাল, খাবারদাবার, ইঁদুর তো থাকবেই।

– কিন্তু আমি সিন্দুকের মধ্যে থেকেই আওয়াজটা পাচ্ছি যেন।

– সেটাও সম্ভব। লেপকাঁথাগুলা কাটছে সুমুন্দির পো’রা। কথায় বলে, উই আর ইঁদুরের দ্যাখো ব্যবহার/ ভালো ভালো দর্ব কেটে করে ছারেখার। কাল রাত পোহালেই সিন্দুকে আচ্ছা কইরা গেমাকসিন দিতে হবে।

এতক্ষণে খানিক নিশ্চিন্ত বোধ করে শিবকুমার। নিদ্রাদেবীর আরাধনায় মন দেয় এতক্ষণে। কিন্তু চোখদুটি বোঁজামাত্তর নিদ্রাদেবীর বদলে শিবকুমারের সামনে এসে দাঁড়ায় আশালতা।

ততক্ষণে শিবকুমার ভালোমতো মালুম পেয়েছে, জাদুর পাশাপাশি আশালতাও ওকে প্রবল বেগে টানছে।

 

 

উনিশ

ইদানীং আশালতার মুখে বোল ফুটেছে খুব। বিশেষ করে শিবকুমারের সামনে যেন সেটা বেড়ে যায় আরো। শোয়ের পর বেশ কিছুক্ষণ ভুজঙ্গদের সঙ্গে জাদুসংক্রান্ত হিসেব-নিকেশ ও অন্য কথাবার্তায় ডুবে থাকে হৃদয়নাথ। খেতে বসতে দেরি হয়ে যায়। আর, তখনই ক্ষেপে যায় আশালতা। প্রায় হুকুম করবার ভঙ্গিতে বলে ওঠে, এক্ষুনি খেতে আসবা তোমরা। রাতভর হাঁড়ি জাগিয়া বসিয়া রইতে পারব না আমি। এবং কথাটা আশালতা বলে মূলত শিবকুমারের দিকে তাকিয়েই।

কোনো কোনো দিন একা একাই রাতের খাওয়া সেরে নেয় শিবকুমার।

সেদিন খাওয়া যখন মাঝপথে, তখনই আশালতা আচমকা দুচোখে সীমাহীন কৌতুক ফুটিয়ে শুধোয়, তুমি আমাদের হদিস পাইলা কী কইরা?

খাওয়াতে মশগুল ছিল শিবকুমার, আশালতার আচমকা প্রশ্নে খানিক হকচকিয়ে যায়। একসময় মৃদু গলায় জবাব দেয়, কামাখ্যার মন্দিরের থেকে খানিক দূরে ওই বটগাছটার তলায় আচমকা তোমাদের দেখতে পেলাম যে। শিবকুমার সেদিনের পুরো ঘটনাটা বিতাং করে বলতে থাকে আশালতাকে।

– তা’পর আমাদ্যার সাথ একই রেলগাড়িতেই চইলা আইলা?

– হুঁ।

– সারাক্ষণ ওই রেলগাড়ির কামরায় আমাগো পাশে পাশে ছিলা তুমি? দুচোখে বিজুরি জ্বেলে শিবকুমারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আশালতা।

নিঃশব্দে মাথা দোলায় শিবকুমার।

– কই, আমি তো তোমারে দেখতে পাই নাই। কোথায় ছিলা? শিটের তলায়? ফিকফিক করে হাসতে থাকে আশালতা।

সে-কথায় মর্যাদায় লাগে শিবকুমারের। ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, শিটের তলায় থাকতে যাব কেন? বলতে বলতে শিবকুমারও ফিক করে হেসে ফেলে, আমি ভ্যানিশ হয়ে থাকতে পারি।

– ইস, ভ্যানিশ হওয়া অত সোজা নয়। ঠোঁট উলটে এক অনির্বচনীয় ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলে আশালতা, সে পারে আমার বাপু। কাল সইন্ধায় দেইখো, ক্যামন কইরা শতজনের চখের সুমুখ দিয়া ভ্যানিশ হয়্যা যায়।

– আসলে, আমি ছিলাম পাশের খোপটায়। এতক্ষণে স্বীকার করে নেয় শিবকুমার।

সে-কথায় ভারি ভাবনায় পড়ে যায় আশালতা। ভুরুজোড়ায় আলতো ভাঁজ ফেলে বলে, পাশের খোপে? তাইলে তো আমার নজরে পড়তোই। আমার নজর এড়াইয়া এতক্ষণ থাকলা কী কইরা?

বলেই পুনরায় ফিক করে হাসে আশালতা, আমার নজররে তো চিনো নাই তুমি। মা কয়, চিলের নজর। বলতে বলতে হি-হি করে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়তে চায় আশালতা। হাসি থামিয়ে বলে, বাস্তবিক, আমার বড় খুঁটিনাটিতে নজর। একবার হইসিল কী -। আশালতা সোজা হয়ে বসে, একটা চোর ঢুকসিল আমাদ্যার ঘরে। লুকাইয়া আছিল চালের বস্তার আড়ালে। সারা সইন্ধা, মা, দিদিরা, নিতাইদা, কতবার ওই চালের চস্তার পাশ দিয়া আনাগুনা করসে, কিন্তু কেউই দ্যাখতে পায় নাই অরে। রাইতের ব্যালায় খাইয়া-দাইয়া যখন শুতে যাচ্ছে সবাই, সদর দরজায় খিল দিয়া দিসে, তখনই, এক্কেরে শেষ মুহূর্তে চোরডাকে দেইখ্যা ফেললাম আমি।

– তারপর? বালক শিবকুমারের কৌতূহল জাগে এতক্ষণে।

– তারপর আর কি! ছিঁচকা চোর। নিতাইদা আর বড়দি মিলিয়া দিলো উত্তম-মধ্যম। তারপর ছাইড়া দিলো।

– নিতাইদা কে?

– নিতাইদা? সে আমাদের এক দূরসম্পর্কের দাদা। বাবা অরে বাড়িতে আইন্যা রাখসে, বড়দির সাথ অর বিয়া দিবার লেগে। বলতে বলতে কেমন জানি মিইয়ে আসে আশালতার মুখখানি। মৃদু গলায় বলে ওঠে, যেমন সিদ্ধেশ্বরিয়াকে রাখসে আমার লেগে।

কথাটা শোনামাত্র অাঁতকে ওঠে শিবকুমার। যেন সাপ হেঁটে যায় গা দিয়ে। সিদ্ধেশ্বরকে আশালতার বর হিসেবে স্থির করে রেখেছে হৃদয়নাথ! এমনই পাষন্ড সে।

সহসা মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় শিবকুমারের। থালার খাদ্যগুলিকে বিস্বাদ লাগে। আশালতার দিকে একঝলক তাকায় সে। একসময় কথা ঘোরায়। মৃদু গলায় বলে, তুমি খাবে না? তুমার খিদা লাগেনি? তুমিও তো সেই দুপুরে খেয়েছিলে।

চোর ধরা থেকে আচমকা ওর খাওয়ার প্রসঙ্গে চলে যাওয়ায় কেমন অস্বস্তি বোধ করে আশালতা। পরমুহূর্তে আশ্চর্য দক্ষতায় সামলে নেয়। বলে, আমি খামু গিয়া। বাবা ফিরবে, অরে খাবার দিমু। তারপর -। একটুখানি যেন উদাস দেখায় আশালতাকে। পরমুহূর্তে পুনরায় চাঙ্গা হয় সে। চড়বড়িয়ে বলতে থাকে, তাবাদে আমি হইলাম মেয়ামানুষ, আমার কথায় কথায় ছেলেদের মতোন খিদা পাইলে চলে না। মা কয়, মেয়ামাইনষের হইল কইমাছের প্রাণ, তেলের কড়াইতে ছাড়িয়া দিলেও লাফাইতে থাকে। বলেই হি-হি করে হেসে ওঠে আশালতা, এই, তুমি নাকি জমিদারের পোলা? মস্ত বড়ো জমিদারি তোমাদের?

– আমি জানি না। শিবকুমার সংকোচে মাথা নামায়।

– জানো না মানে? বাবা তো সাতকাহন কইরা কয় সেডা। আচ্ছা, আমিই মালুম কইরা লিচ্ছি। তুমাদের গরে হাতি আছে?

– না। মাথা নাড়ায় শিবকুমার।

– ঘোড়া?

– তা আছে।

– তুমারে দেইখ্যা অবশ্য জমিদারের পোলা বইলা মনে লাগে।

– কীভাবে? আশালতার দিকে অবাক হয়ে তাকায় শিবকুমার।

সে-কথায় শিবকুমারকে একপ্রস্থ খুঁটিয়ে দেখে আশালতা। একসময় ফিক করে হেসে ওঠে, এমন কাঁচা সোনার মতো রং, টিকোলো নাক, মাথাভর্তি চুল…, তোমারে কৃষ্ণলীলায় কেষ্টঠাকুর যা মানাবে না! আমাদের গাঁয়ের পোলা হইলে জনার্দনকাকা তোমারে নির্ঘাত কেষ্টঠাকুরের পার্টটাই করাত। মানভঞ্জন পালায় তুমি আমার চারপাশে ঘুইরা ঘুইরা গাইতে,

রাধে আমায় ক্ষমা কর,

অপরাধ করেছি বড়

রাধে, আমায় ক্ষমা কর।

আমি তখন গাইয়া উঠতাম,

চলে যাও, চলে যাও,

চন্দ্রাবলীর কুঞ্জমাঝে, চলে যাও চলে যাও …।

বলতে বলতে আবারো হি-হি করে হাসতে থাকে আশালতা।

শিবকুমার অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে আশালতার দিকে। শুধোয়, তোমার চারপাশে কেন?

– ও মা, আমিই তো জনার্দনকাকার দলে রাধা সাজতাম। অ্যাই, তুমি ছ-মাসকাল ঘরের বাইরে ঘুরিয়া বেড়াইতেছ?

মাথা দুলিয়ে সায় দেয় শিবকুমার।

– জাদুর টানে?

আবার মাথা দোলায় শিবকুমার।

– ইস, তোমার মা নির্ঘাত কাঁইদা গোকুল ভাসাইতেছে। তারপর শিবকুমারের মুখের ওপর পরিপূর্ণ দৃষ্টি বিঁধিয়ে বলে, একখান বদ্ধপাগল।

এতক্ষণে শিবকুমারও কিঞ্চিৎ প্রগলভ হয়ে ওঠে। মুচকি হেসে বলে, হৃদয়নাথের সমুখে তো বোবা মাইরা থাক। এখন তো মুখে বেশ খই ফুটছে!

বাস্তবিক, ওদের কথাবার্তার মধ্যে সারাক্ষণ আশালতা বাপের পাশটিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাওয়ায় লাউফুলের মতো আলতো দোল খেতে থাকে। আর, আজ, শিবকুমারকে একলাটি পেয়ে সহসা কী কারণে যেন বড়ই প্রগলভ হয়ে উঠেছে।

আশালতাকে অপলক দেখতে থাকে শিবকুমার। তেরো-চোদ্দো বছরের বালিকা সে, কিন্তু তার সামনেই কেমন জানি অস্বস্তি বোধ করছিল সে।

শিবকুমারের কথার জবাবে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে আশালতা।

 

 

বিশ

সিদ্ধেশ্বর লোকটা বেশ শান্তশিষ্ট, গোবেচারা। বড়ই নিরীহ আচরণ তার। খুব মুখচোরাও বটে। লোকটাকে কাছে থেকে দেখতে দেখতে এই কদিন বুঝেছে শিবকুমার।

যেদিন পৌঁছল ওরা তিনজন। রাতটা সে ছিল সবার সঙ্গে। ভোরের আগেই হাওয়া। তারপর থেকে কেউই আর দিনভর ওর টিকির দেখা পায় না। কোথায় কোথায় যে ঘুরে বেড়ায় লোকটা, লুকিয়ে বেড়ায়, দলের অন্যরাও সে খোঁজ পায় না তত। কেবল যেদিন ওই নররাক্ষসের খেলাটা থাকে না, ওইদিন একটু বেশি রাতে চোরের মতো আসে হৃদয়নাথের তাঁবুতে। ওই রাতে হৃদয়নাথ ওকে আশালতার হাতের রান্না খাইয়ে তবে ছাড়ে। খেতে খেতে, শিবকুমার লক্ষ করেছে, সারাক্ষণ আশালতার মুখের দিকে হ্যাংলার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে লোকটা।

সন্ধের মুখে শো শুরু হয়ে যায় রোজ। হৃদয়নাথ আচমকা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সারাক্ষণ শিবকুমারের সামনে ছিঁচকাঁদুনে লোকটা রংচং মেখে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একেবারে অচেনা হয়ে যায়।

শো চলাকালীন ওই সময়টা শিবকুমারের তেমনকিছু করার থাকে না। সন্ধের মুখে তাই হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় নারেঙ্গা স্টেশনের দিকটাতে। ওদের শোয়ের জায়গা থেকে নারেঙ্গা স্টেশনটা আন্দাজ মাইল-দুয়েকের পথ। হেঁটেই যায় শিবকুমার, হেঁটেই ফেরে।

তেমনই একদিন নারেঙ্গা স্টেশনে আচমকা সিদ্ধেশ্বরের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। সেদিন নররাক্ষসের খেলাটা বোধ করি নেই। রোজদিন খেলাটা থাকে না। হৃদয়নাথ রোজদিন বদলে বদলে দেয় খেলার আইটেমগুলো। কোনো দিন নররাক্ষস, কোনোদিন মাটির তলায় সমাধি, কোনোদিন ব্রহ্মসূতিকা…।

শিবকুমারকে আচমকা দেখতে পেয়েই কেমন জানি সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে সিদ্ধেশ্বর। পালাতে চাইছিল। শিবকুমারই ধমক দিয়ে থামায়।

থতমত খেয়ে পিছু ফেরে সিদ্ধেশ্বর। চোখেমুখে ভয়টা আরো বেড়ে যায়। পায়ে পায়ে শিবকুমারের পাশটিতে এসে দাঁড়ায়।

ফিসফিসে গলায় বলে, খোকাবাবু! আপনি এমন টেইমে এখানে!

সিদ্ধেশ্বরের গলায় যারপরনাই সমীহ ছিল। শিবকুমার বুঝতে পারে, তার পারিবারিক আভিজাত্যের খোঁজ রাখে সিদ্ধেশ্বর।

সিদ্ধেশ্বরকে প্লাটফরমের এক্কেবারে শেষপ্রান্তে নিয়ে যায় শিবকুমার। একটা বেঞ্চিতে নিজে বসে, পাশটিতে সিদ্ধেশ্বরকেও বসায়।

ভয়ে সংকোচে কেমন জানি সিঁটিয়ে ছিল সিদ্ধেশ্বর। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে হরেক প্রশ্ন করে শিবকুমার। তাতে করে বেআব্রু হয়ে পড়ে অনেক রহস্য।

– এমন বীভৎস খেলা তুমি দেখাও কেন? একসময় শিবকুমার সরাসরি শুধোয় সিদ্ধেশ্বরকে।

খানিকক্ষণ চুপ মেরে বসে থাকে সিদ্ধেশ্বর। একসময় মিনমিনে গলায় জবাব দেয়, পেটের দায়ে খোকাবাবু।

– খেলাটা কোথায় শিখলে?

– আমার এক গুরু ছিল। সুরেন্দ্র। জটাধরের দলে খেলাটা দেখাত সে। একদিন শেখাল আমায়।

– তুমি কাঁচা মুরগিগুলোকে খাও কী করে?

– পেটের জ্বালায় খেতে বাধ্য হই খোকাবাবু। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা।

– তাবলে একটা জ্যান্ত মুরগিকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাওয়া -।

এতক্ষণে শিবকুমারের মুখের দিকে সরাসরি তাকায় সিদ্ধেশ্বর। ফিক করে হাসে। চাপা গলায় বলে, পুরোপুরি কি আর খাই?

– তবে?

– ওই, ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাওয়ার ভান করি। তার মধ্যেও হয়তো-বা দু-একটা দাঁতের কামড় বসল এখানে ওখানে, এক আধফোঁটা রক্ত বাড়াল। বাকিটা তো রঙের খেলা।

– কিন্তু মুরগিটা তো মরে যায়।

– না মরলেও আধমরা হয়ে যায়। ওটাকে পরের দিন জাদুকর ছাড়িয়ে খেয়ে ফেলে। আমিও রাতের বেলায় এলে তার ভাগ পাই।

– কিন্তু ওইসময়টায় তুমি এতগুলো লোককে টেনেহিঁচড়ে জেরবার কর কী করে?

– তখন আমার শরীরে স্বয়ং কুম্ভকর্ণ ভর করে যে।

– বাজে কথা বলো না। মৃদু ধমক দেয় শিবকুমার, সত্যি করে বল তো, কী করে দুদলের বিশটা জোয়ানকে এমন নাস্তানাবুদ কর একাই?

সে কথায় আবারো সরলপনা হাসে সিদ্ধেশ্বর। বলে, আমি টানতে যাব কেন? টানাটানি তো করে ওই লোকগুলো। ওরাই দুদিক থেকে টানাটানি জুইড়া দেয়।  আমি কেবল মাঝে মাঝে একদিকে টান মারি। তাতেই উলটোদিকের লোকগুলা হুড়মুড়াইয়া পড়ে। আমি যেদিকে টান মারি, সেদিকটায় ওই মুহূর্তে এগারোজন। বলেই ফিক করে হেসে ফেলে সিদ্ধেশ্বর।

কিন্তু বাক্সোর ভেতর থেকে পালাও কেমন করে? ওইটুকু সময়ের মধ্যে এই মুহূর্তে উত্তরের গাছে পরমুহূর্তে দক্ষিণের গাছে যাও কেমন করে?

সে-কথায় আবারো আলতো হাসে সিদ্ধেশ্বর। বলে, জাদু শিখতেই তো আইসেন। জাদুকর আপনাগো ঠিক সময়েই শিখাবে এসব। রহস্যটা জানতে পারবেন তখনই।

জেনেছিল শিবকুমার। পরবর্তীকালে পুরোপুরি জেনেছিল খেলাটার অনুপুঙ্খ রহস্য। কেবল বাক্সের ভেতর থেকেই পালানো নয়, শিখেছিল এসকেপের আরো জটিল-সব পলায়ন-কৌশল। ততদিনে হ্যারি হুডিনির সঙ্গে গভীর প্রেমের সম্পর্কে বাঁধা পড়েছে সে।

পরবর্তীকালে সে নিজেও ওই নররাক্ষসের খেলাটা দেখিয়েছে মঞ্চে। আর, যেদিন খেলাটা দেখায়, আগে থেকে হাওয়া হয়ে যায় মধুময়, পরেশ, কার্তিক, মানিক…, শিবকুমারের বর্তমানের সহকারীরা। তারা দিনের বেলায় গোটা এলাকায় ঘুরে ঘুরে স্থির করে রাখে, রাতের বেলায় নির্দিষ্ট সময়ে কে কোন গাছের মগডালে চড়বে। যখন নররাক্ষসকে খুঁজতে সদলবলে বেরিয়েছে শিবকুমার, তার আগে থেকে ওরা এক-একটি গাছের মগডালে চড়ে রয়েছে। প্রথমে কে চেঁচাবে, তারপর কে, সব ঠিক করা রয়েছে। সেইমতো একের পর এক চেঁচিয়ে চলেছে পরেশ, মানিক, কার্তিকরা। ওই সময়টাকে কাজে লাগায় নররাক্ষসরূপী ধনঞ্জয়। তিন-চারটি গাছের তলা ঘুরে আসার জন্য শিবকুমারদের যে-সময়টা লাগল, ওই ফাঁকে নির্দিষ্ট একটি গাছের তলায় পৌঁছে যায় সে। নির্বিঘ্নে চড়ে বসে মগডালে।

সারাটা সন্ধে নারেঙ্গা স্টেশনের প্লাটফরমে বসে সিদ্ধেশ্বরের সঙ্গে অনেক কথা হয়। কিন্তু আশালতাকে অধিকার করবার প্রশ্নে ততদিনে ওই শান্তশিষ্ট, বোকা বোকা লোকটাকেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে ফেলেছে শিবকুমার।

 

 

একুশ

নিজের তাঁবুর সামনে বসে একটা হিসেবের মধ্যে ডুবেছিল হৃদয়নাথ। দলের আয়ব্যয় সংক্রান্ত, কিংবা নিজের জমাখরচ সংক্রান্ত কী যেন একটা হিসেব কিছুতেই মিলছিল না বলে স্পষ্টতই অস্থির হয়ে উঠছিল সে। ঠিক সেই মুহূর্তে ওর সামনেটিতে গিয়ে দাঁড়ায় শিবকুমার। হাতদুটিকে কোমরে স্থাপন করে খুব কাঠ-কাঠ গলায় বলে ওঠে, তুমি নাকি সিদ্ধেশ্বরের সঙ্গে আশালতার বিয়ে দিতে চাইছ?

শিবকুমারের কথাটা শোনামাত্র যেন সাপের মাথায় পা দিয়ে ফেলে হৃদয়নাথ। জমাখরচের হিসেব মাথায় ওঠে তার। বেজায় চমকে উঠে সরাসরি চোখ রাখে শিবকুমারের চোখে। এক্কেবারে ওর চোখের মণির মধ্যে সেঁধিয়ে যায় হৃদয়নাথের দৃষ্টি।

কিন্তু পরমুহূর্তে অপরিসীম দক্ষতায় নিজেকে সামলে নেয় হৃদয়নাথ। শিবকুমারের প্রশ্নটাকে অতিশয় সতর্কতায় পাশ কাটিয়ে যেতে চায়, আপনারে রুমাল কাইট্যা জোরা দিবার খেলাটা অইভ্যাস করবার লেগে বললাম না খোকাবাবু?

– ওটা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। দেখতে চাও?

খেলাটা করে দেখাবার জন্য পীড়াপীড়ি করে না হৃদয়নাথ। কেন কি, সে ভালোমতোই জানে, জাদুটা এতটাই রক্তে রয়েছে পাঁচবিবির গড়ের এই খোকাবাবুটির, একেবারে জটিলতম খেলাটিও মাত্র একবার দেখিয়ে দিলেই, অবিশ্বাস্য দক্ষতায় অল্প সময়ের মধ্যেই তুলে ফেলবেন হাতে, এবং এতটাই নিখুঁত হবে তা, হৃদয়নাথের মনে হবে, খেলাটা পাশাপাশি দুজনে দেখালে হৃদয়নাথের চেয়ে শিবকুমারই হাততালি পাবেন বেশি। কেমন যেন ক্লান্ত লাগছিল হৃদয়নাথের। শিবকুমারের অকস্মাৎ প্রশ্নটা তাকে ভেতরে ভেতরে একেবারেই পেড়ে ফেলেছে বুঝি।

– কই, বললে না তো? ততক্ষণে শিবকুমারের ভুরুর ভাঁজগুলো আরো গভীর হয়েছে, আশালতার বিয়ে দিতে চাইছ সিদ্ধেশ্বরের সঙ্গে?

মনে মনে নিদারুণ প্রমাদ গুনছিল হৃদয়নাথ। বিড়বিড় করে শুধোয়, আপনি কী কইরা জানলেন?

– আমাকে আশালতাই বলেছে। শিবকুমার কটমট করে তাকিয়ে থাকে হৃদয়নাথের দিকে। তাতে করে বুঝি হৃদয়নাথের অস্বস্তিটা শতগুণ বেড়ে যায়। মাটির দিকে ধীরলয়ে নামিয়ে নেয় মুখ। মিনমিনে গলায় জবাব দেয়, তেমনটাই তো ভাবসি, অখন ওপরওয়ালার মনে কী রইসে…।

– তুমি কেমন লোক হে? সহসা রেগে কাঁই হয়ে ওঠে শিবকুমার, এমন একটা লোকের সঙ্গে কিনা আশালতার বিয়ে!

শিবকুমারের কথাটা শোনামাত্র হৃদয়নাথ ঝাঁ করে তাকায় ওঁর মুখের পানে। সামান্যক্ষণ তাকিয়েই থাকে মুখের দিকে। একসময় পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। মুখমন্ডলের যাবতীয় বিপন্নতার অভিব্যক্তিগুলো একটু একটু করে মুছে যেতে থাকে। একেবারে নির্বিকার হয়ে ওঠে মুখখানি। শিবকুমারের আক্রমণাত্মক প্রশ্নের জবাবে খুব আলগোছে জবাব দেয়, ক্যান? সিদ্ধেশ্বর কী এমন খারাপ ছোকরা? শরীর-স্বাইস্থ্য ভালো, অধিক নেশাভাঙ করে না, আমার খুব বাইধ্য, আর আশার তরে তো ছোকরা সারাক্ষণ মইরা রইসে।

– তাই বলে সিদ্ধেশ্বরের মতো একটা লোকের সঙ্গে আশালতার বিয়ে! রাগে প্রায় তোতলাতে থাকে শিবকুমার।

শিবকুমারের মুখের দিকে অপাঙ্গে তাকায় হৃদয়নাথ। পরমুহূর্তে অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয় মুখ। সম্ভবত এই প্রথম পাঁচবিবির গড়ের খোকাবাবুর রাগটাকে বড় একটা পাত্তা দেয় না সে। গলাটাকে হাওয়ায় খুব ভাসিয়ে দিয়ে বলে ওঠে, সিদ্ধেশ্বর মন্দ কী? তাবাদে, আশার লগে কুন রাজপুত্তুর আর ঘোড়ায় জিন দিয়া বইসা রইসে!

বলতে বলতে গলাটা সহসা বেজায় খাটো হয়ে আসে হৃদয়নাথের। প্রায় স্বগতোক্তির ঢংয়ে বলতে থাকে, অর মাথার উপর আরো একটা মাইয়া রইসে। অর পরেও আরো একটা। আমার তো দিন পেরায় শেষ হইয়া আইল।

বলতে বলতে কেমন অসহায় হয়ে ওঠে হৃদয়নাথের চোখদুটি।

কিন্তু এমন একটা সর্বার্থে হাত-পা-বাঁধা লোককেও বুঝি খোঁচা মারতে দ্বিধা হয় না শিবকুমারের। দাঁতে দাঁত ঘষতে ঘষতে বলে ওঠে, তুমি একটি পাষন্ড।

শিবকুমারের গলায় এমনকিছু ছিল, হৃদয়নাথ ধাঁ করে তাকায় ওর মুখের পানে। দৃষ্টিখানি কয়েক মুহূর্ত থিতু হয় শিবকুমারের মুখমন্ডলে। একসময় অসহায় মুখখানি পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। বিনয়ের অবতারটি সেজে হৃদয়নাথ বলে ওঠে, চটসেন ক্যান, খোকাবাবু? ঠিক কইরা রাখি নাই, ক্যাবল ভাবতিসি। তার অধিক লয়। নিছক ভাবনার কী দাম আসে বলেন? না অাঁচালে তো বিশ্বাস নাই। কথায় বলে, জন্ম-মৃত্যু-বিয়া/ তিন বিধাতা লিয়া। বিধাতাই যেখানে খোদ ভাবতেসেন অর বিয়ার লেগে, তখন আমার সাধ্য কি উই মেয়ার লগে একটা বর আগাম ঠিক কইরা রাখি। আমি কী বিধাতার চাইতেও ক্ষমতা ধরি খোকাবাবু? তাইলে তো আমার আশার বিয়াটা শেষ অবধি…।

কথাটা আর শেষ করে না হৃদয়নাথ। কিন্তু কেন জানি ওর গোটা মুখমন্ডলজুড়ে মৃদু আত্মতুষ্টির রেখাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে।

– মুখে তো খুব অদৃষ্ট-নিয়তি-বিধাতা, এসব মানো দেখছি। শিবকুমার তেরিয়া হয়ে ওঠে, অথচ বাস্তবে ঠিক তো করেই রেখেছ, না কি? তাও ওই কিম্ভুত লোকটার সঙ্গে!

শিবকুমারের ভৎর্সনায় বুঝি মরমে মরে যায় হৃদয়নাথ। মিনমিনে গলায় বলে, ওই যে কইলাম, জন্ম-মৃত্যু-বিয়া…। তবে ছোকরাটা ওই টানেই রয়েছে দলে, বড়ই বাধ্য, যা বলি, মানে। আর, আশার তরে জান দিতেও রাজি।

বলতে বলতে কেমন যেন অসহায় হয়ে ওঠে হৃদয়নাথের মুখখানি, নইলে আজকের দিনে ওই সামান্যমাত্র মাইনের তরে কে অমন কাজ করতে রাজি হয় বলেন দিকি? রোজদিন একটা জ্যান্ত মুরগিকে পালকশুদ্ধ চিবানো… কেউ রাজি হইত না।

বলতে বলতে হৃদয়নাথ নিজের মুন্ডুটিকে খুব জলদ-লয়ে চলতে থাকা মাকুর মতো এদিক-ওদিক নাড়াতে থাকে দুদিকে,.. .অথচ, গাঁয়েগঞ্জে স্রেফ ওই খেলাটার জন্যই দশটা দর্শক বেশি পাই। আইজকার দিনে একটা দল চালানো যে কত ঝকমারি! রাইতটি পুহালেই কতগুলা প্যাটের কতা আমারে ভাবতে হয় বলুন দিকি।

হৃদয়নাথের কথাগুলো শুনতে শুনতে বুঝি চোখের পলক পড়ছিল না শিবকুমারের। লোকটাকে যতই দেখে, ততই বিস্ময়ে পাথর হয়ে যায় সে। সিদ্ধেশ্বরকে দিয়ে স্রেফ একটা বিদঘুটে খেলা দেখিয়ে নেবার জন্য লোকটা আশালতার মতো একটি মোক্ষম চুষিকাঠি আবিষ্কার করে ফেলেছে মগজ খাটিয়ে।

বাস্তবিক, হৃদয়নাথ নামক লোকটার মগজের ভেতরটা খুলে দেখতে সাধ যায় শিবকুমারের।

সেদিন হৃদয়নাথ ও শিবকুমারের মধ্যেকার গোটা সওয়াল-জবাবটাই যে তাঁবুর ভেতর থেকে অনুপুঙ্খ শুনেছিল আশালতা, বেশ কদিন বাদে সেটা আশালতার মুখ থেকেই জেনেছিল শিবকুমার।

চোখ দুটোকে ডাগর বানিয়ে, ভুরুজোড়াকে আকাশের দিকে তুলে দিয়ে আশালতা বলেছিল, বাপ রে, সেদিন বাবুর কী রা… গ!

বলতে বলতে ফিক করে হেসে ফেলে আশালতা। চোখ দুটোকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে বলে, আমি ওইদিন তোমার ত্যাজটাই দ্যাখছিলাম ক্যাবল।

 

বাইশ

মনটা ভালো থাকলে হৃদয়নাথ বেশ বুক খুলে কথা বলে। কিন্তু কোনো এক রহস্যময় কারণে অধিকাংশ সময়েই মনটা বিগড়ে থাকত ওর। এই বয়েসেও শিবকুমারের মনে হয়, দলের সঙ্গে ঘুরতে থাকলেও হৃদয়নাথের মনটা কাছেপিঠে নেই। সারাক্ষণ যেন ঘুড়ির মতো পাক খেতে খেতে উড়ছে আকাশে, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে এক ধরনের টান অনুভব করছে অন্যদিক থেকে। হৃদয়নাথের টানের সেই উৎসটিকে ওই বয়েসে চিনতে পারেনি শিবকুমার।

পরবর্তীকালে আশালতার মুখ থেকেই কিস্তিতে কিস্তিতে যা-যেটুকু শুনেছে, সেটাও বোধ করি হৃদয়নাথের পূর্ণাঙ্গ জীবনকথা নয়। তারও অন্তরালে, খাঁজেভাঁজে, আরো কিছু অব্যক্ত জীবন বুঝি-বা থেকে গিয়েছে হৃদয়নাথের। সেগুলো বুঝি কোনোকালেই জানতে পারেনি, এমনকি ওর আত্মজারাও। মরবার পর সেই জীবনবৃত্তান্তের বাড়তি ছাঁটগুলো বুঝি চিতায় ছাই হয়ে গিয়েছে। তা আর কোনোকালেও জানা হলো না শিবকুমারের।

কিস্তিতে কিস্তিতে আশালতার বয়ান অনুসারে, হৃদয়নাথকে নিয়ে আশালতাদের গোটা পরিবারটারই কেটেছে চরম ভোগান্তিতে। জাদুর সামগ্রী নিয়ে আজীবনকাল আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াবার কারণে হৃদয়নাথের বুকের মধ্যে সংসারটা তেমন করে জমাটই বাঁধেনি। স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি তার ছিল আলগা-আলগা টান। তার ওপর, সতত বিচরণশীল জীবনে দেহের ক্ষুধা মেটানোর জন্য সে অন্য নারীতেও আসক্ত হয়েছে বারংবার। তার পথের বাঁকে বাঁকে বহু যুবতী রমণী শয্যা রচনা করে অপেক্ষা করেছে সারাটা জীবন। আর, শেষজীবনে তো কোথায় যেন আরো পাকাপাকি একটা সংসার পেতেছিল হৃদয়নাথ। নানাভাবে তা বুঝতে পারতেন আশালতার মা। কেবল সংসারের প্রতি চরম উদাসীনতাই নয়, ওইসঙ্গে হৃদয়নাথের উপার্জনটাও যে একটু-একটু করে দুভাগ হয়ে যাচ্ছিল শেষদিকে, সেটাও বিলক্ষণ বুঝতে পারছিলেন তিনি। সারাক্ষণ সেজন্য ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতেন, কিনা, কোনোদিন স্বামীর উপার্জনের পুরোটাই না নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে, না-দেখা ওই সতীনের সংসারে। প্রায় মরিয়া হয়ে, নিজের বশংবদ লোকজনদের লাগিয়েছিলেন চতুর্দিকে, কিন্তু জীবনের শেষদিন অবধি স্বামীর দ্বিতীয় সংসারটির খোঁজ পাননি কিছুতেই।

আশালতার মুখ থেকে ওইসব শুনতে শুনতে শিবকুমারের মনে হয়েছে, হৃদয়নাথ তাঁর সংসারটাকে একদিনের তরেও ভালোবাসতে পারেনি, জাদুটাকেও না।

যখন দিনের পর দিন হৃদয়নাথের দলে ভর্তি থেকে ওর কাছ থেকে শিবকুমার নিচ্ছিল জাদুবিদ্যার জটিল পাঠগুলি, সারাক্ষণ একটা কথাই মনে হতো তার। কিনা, সারাজীবন জাদু দেখিয়ে পেটের ভাত জুটিয়েছে বটে হৃদয়নাথ, ওই দিয়ে সম্ভবত দু-দুটো সংসার চালিয়েছে, কিন্তু একদিনের তরেও ভালোবাসতে পারেনি বিদ্যেটাকে। পুরো ব্যাপারটাকে চোট্টামো ভাবত, লোক ঠকানো। কথায় কথায় আক্ষেপ করত, কি না, ‘লোক ঠকিয়ে খাই মশাই’ অথবা ‘মাইন্সের চোখে ধুলা দিয়া পেটের ভাত জোটানোর বিদ্যা আমার’ গোছের কথাগুলো একেবারে স্বাভাবিক গলায় উচ্চারণ করত সে, ‘একেবারে সূর্য পুবদিকে ওঠে’র অনিবার্যতায়। আর শুনতে শুনতে শিবকুমারের মনে তিলতিল বিশ্বাস জন্মেছে, কেবল ভালোবাসতেই পারেনি নয়, বিদ্যাটাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করত লোকটা। প্রায়-সময়ই আক্ষেপে ভরিয়ে ফেলত চতুর্দিক, কিনা, সাতজন্মের পাপের ফল, নইলে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে পেটের ভাত জোটাতে হয়! ওই নিয়ে হৃদয়নাথের সঙ্গে প্রায়ই তর্ক বেধে যেত শিবকুমারের। শিবকুমার যতই বিদ্যেটার গুণগান গাইত, হৃদয়নাথ ততই ক্ষেপে যেত। বলত, এটা একটা ধোঁকাবাজি বিদ্যা খোকাবাবু। একের পর এক উদাহরণ দিয়ে সেটা বোঝাতে চাইত শিবকুমারকে।

– তবে নিজেই বেছে নিলে কেন এমন পেশা?

তার জবাবে ওর গুরুকেই গালি পাড়ত হৃদয়নাথ। সে ছিল ওর জন্মদাতা পিতা। এক্কেবারে ছোটমাপের জাদুকর ছিল সে। সে-ই হৃদয়নাথকে নিয়ে এসেছিল এই লাইনে।

আশালতা। শিবকুমারকে সে তখন একটু একটু করে পাকে পাকে বাঁধছে। শিবকুমারের পছন্দের পদগুলি পরিপাটি করে রাঁধা, পাশটিতে বসে যত্ন করে খাওয়ানো, ওর পোশাক-আশাক কেচেধুয়ে দেওয়া গোছের বাহ্যিক প্রক্রিয়াগুলোর অন্তরালেও তার চোখ দুটি একটু করে একজোড়া মৌচাক হয়ে উঠছে। আর, শিবকুমার সামনে এলেই সেই জোড়া-মৌচাক থেকে কেবলই চুইয়ে মধু ঝরতে থাকে। বাস্তবিক, আশালতার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া তখন আর শিবকুমারের কিছুই করণীয় ছিল না।

কিন্তু আশালতাও যে জাদুকে ভেতরে ভেতরে এতখানি ঘৃণা করে, সেটা বাস্তবিক, শিবকুমারের একেবারেই জানা ছিল না। এ-কথা ঠিক যে, আশালতা দলের সঙ্গে থাকলেও সহকারীর ভূমিকায় একটা দিনের তরেও ওকে মঞ্চে তুলতে পারেনি হৃদয়নাথ। ওই নিয়ে বাপবেটিতে মাঝে মাঝে চলেছে তুমুল বিসংবাদ, কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও আশালতাকে তিলমাত্র টলাতে পারেনি হৃদয়নাথ। তার নাকি শতজনের সমুখে মঞ্চে কাজ করতে লজ্জা করে। বাধ্য হয়ে ভুজঙ্গর মেয়ে পারুলকেই পাকাপাকি রেখে দিতে বাধ্য হয়েছিল হৃদয়নাথ।

আশালতা ও শিবকুমারের মধ্যেকার গড়ে-ওঠা সম্পর্কটাকে হৃদয়নাথ সারাক্ষণ নিঃশব্দে দেখে যেত। কোনো পক্ষকেই কিছু বলতো না সে। আর, তাতে করেই, পরিণত বয়সে পৌঁছে শিবকুমারের মনে হতো, কী পরিমাণ চতুর আর দূরদর্শী ছিল মানুষটা!

আর, জাদুর মঞ্চে দাঁড়িয়ে যেমন, খেলিয়ে খেলিয়ে পাকারুই ধরবার কৌশলে, একটু একটু করে মজিয়ে দিত তাঁবুভর্তি মানুষকে, তাদের বোধবুদ্ধিকে একেবারে অসাড় করে দিত, তাদের অশেষ প্রকারে নাস্তানাবুদ করে তুলত, ঠিক তেমনই কৌশলে শিবকুমার আর আশালতাকে নিয়েও খেলতে শুরু করে সে।

একদিন রাতের বেলায় তাঁবুর মধ্যে পাশাপাশি খেতে খেতে একসময় ঝাঁ করে বলে বসে কথাটা, কিনা, যা-কিছু শেখার, সবই তো শিখলে খোকাবাবু, আর এখানে থাইক্যা তোমার লাভ কি? কত বড়ো বংশের পোলা তুমি, এমন আঘাটায় বেঘাটায় ঘুইরা বেরানো কি তোমার সাজে? কত্তাবাবু চোখ দুটি বুঁজলে পর তোমারেই তো জমিদারির হাল ধরতে হইব। এবার বাড়ি ফিরিয়া যাও তুমি।

এমন কথায় শিবকুমারের প্রতিক্রিয়া যা হওয়ার তা তো হয়েছিলই, কিন্তু ওই মুহূর্তে আড়চোখে আশালতার মুখের ওপর দৃষ্টি ফেলামাত্রই শিবকুমার বুঝেছিল, বাপের কথাগুলো শুনতে শুনতে ওর সারামুখের থেকে তাবৎ রক্ত কে যেন শুষে নিয়েছে নিঃশেষে।

সে-রাতে একদানা খাদ্যও দাঁতে কাটেনি আশালতা। এবং শিবকুমার নিশ্চিতভাবে বুঝেছিল, হৃদয়নাথের কাছেও চাপা থাকেনি তা। কিন্তু ওই নিয়ে একটা কথাও উচ্চারণ করেনি সে। এমনকি, সে যে আশালতার এমনতরো কৃচ্ছ্রসাধনের কথাটা জানে, সেটাও প্রকাশ করেনি বাইরের হাবেভাবে।

শিবকুমার বাড়ি ফিরে যাক, এটা যে হৃদয়নাথের মনের কথা নয়, সে যে এতদ্বারা পালটা চাল দিয়ে শিবকুমারের স্নায়ুর ওপর খানিকটা চাপ তৈরি করতে চাইছে, সেটা ওই বয়সেই ঠিকই বুঝতে পেরেছিল শিবকুমার। তিন-তিনটি অনূঢ়া কন্যা যার মাথার ওপর, শিবকুমারের মতো ছেলেকে সে নাগালের মধ্যে পেয়েও হেলায় হারাতে চাইবে না কখনোই। বিশেষ করে ধুরন্ধর মানুষটা যখন বুঝেই ফেলেছে যে, আশালতার জন্য মনে মনে একেবারে হেদিয়ে রয়েছে শিবকুমার।

কিন্তু শিবকুমারের তখন মনের যা অবস্থা, আশালতাকে পাওয়ার জন্য তখন এতটাই মরিয়া যে, হৃদয়নাথের ওই ধুরন্ধরী চালের জবাবে পালটা চাল দেবার ধৈর্য দেখাতে পারেনি সে। বরং স্নায়ুর ওই খেলায় একেবারে হেরে ভূত হয়ে গিয়েছিল। হৃদয়নাথের ওই আপাত নির্লিপ্ততায় যারপরনাই বিপন্ন বোধ করেছিল সেদিন। কাজেই, পরের দিনই সরাসরি প্রস্তাবটা পেশ করেছিল, কিনা, আমি তোমাদের দলেই থেকে যেতে চাইছি জাদুকর। বাড়ি ফিরে যাবার ইচ্ছে আর তিলমাত্র নেই আমার।

– ক্যান? ঠোঁটের আড়ালে চতুর হাসিটিকে সাবধানে লুকিয়ে রেখে হৃদয়নাথ অবোধের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শিবকুমারের দিকে, জমিদারি ছাইড়া জাদুর দলে থাইক্যা কী করবেন আপনি?

– আমি তোমার দলে জাদু দেখাব। বলতে বলতে একসময় ঝাঁ করে বলে বসে শিবকুমার, তোমার অমত না হলে আশালতাকে বিয়ে করতেও রাজি।

আশালতার বড়ই আড়ি পেতে কথা শোনার অভ্যেস, কাজেই, শিবকুমারের মনে হয়েছিল, ওদের সেদিনের কথাবার্তা আড়াল থেকে অবশ্যই শুনেছে সে। আর, শিবকুমারের এও বিশ্বাস, ওর প্রস্তাবটা শোনার পর থেকে রঙিন ঘুড়ির মতো নীল আকাশে উড়তে লেগেছে আশালতা।

কিন্তু পরের দিনই শিবকুমারকে একান্তে পেয়ে যে-বাক্যটি উচ্চারণ করে আশালতা, তাতে করে শিবকুমারের মাথায় বুঝি গোটা আকাশটাই ভেঙে পড়ে। ওকে যারপরনাই চমকে দিয়ে আশালতা খুব স্থিরকণ্ঠে উচ্চারণ করে, একটা কথা সাফ বলে দিতে চাই তোমায়। আমারে পেতে হলে জাদুকে ছাড়তে হবে তোমার।

কথাটা শোনামাত্র চমকে উঠেছিল শিবকুমার। ফ্যালফ্যাল করে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়েছিল আশালতার মুখের দিকে। হৃদয়নাথের মতো আশালতার মধ্যেও যে জাদুর প্রতি হৃদয়নাথের চেয়েও ঢের বেশি ঘৃণা-বিতৃষ্ণা জমে রয়েছে, সেটা বুঝতে পেরে বুকের ভেতরটা একেবারে খাঁ-খাঁ হয়ে গিয়েছিল নিমেষে। কিন্তু এর পেছনের অন্তর্নিহিত কারণটা ওই মুহূর্তে বুঝতে পারেনি শিবকুমার।

কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য সেই কারণটা বোধগম্য হয়েছিল শিবকুমারের। বিস্ময়টাকে কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল সেই কারণেই।

শিবকুমার স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল, আজীবনকাল হৃদয়নাথের আচার-আচরণের কারণেই একধরনের নিরাপত্তার অভাব ও অনিশ্চয়তার বোধ তিলতিল গ্রাস করেছিল আশালতার মাকে। সেই সর্বনাশা বোধটাই কবে কবে নিঃশব্দে চালিয়ে গিয়েছে আশালতার মধ্যেও। কিন্তু এতদ্বারা শিবকুমার যে একটি অতলান্ত খাদের প্রান্তদেশে এসে দাঁড়িয়েছে। যে-বিদ্যাটার টানে সবকিছু ছেড়ে চলে এসেছে সে, আশালতাকে পাওয়ার জন্য যদি সেটাকেই ছাড়তে হয়, তবে তো শিবকুমারের একুল ওকুল দুই-ই যাবে।

শিবকুমার স্থির করেছিল, বিয়েটা হয়ে গেলে পর, আশালতাকে যে-কোনো উপায়ে ধীরে ধীরে বুঝিয়ে রাজি করাবে, কিন্তু তার আগেই তার জীবনের মোড়টি অকস্মাৎ দিক বদল করল।

 

তেইশ

তখন শিবকুমারের সঙ্গে সবে ছ-মাসটাক বিয়ে হয়েছে আশালতার। পাঁচবিবির গড়ের সন্তানের বিয়েতে কোনো সানাই বাজেনি, জ্বলেনি কোনো আলোর রোশনাই।

তখন পানখাইতিতে খেলা দেখাচ্ছিল হৃদয়নাথ। ওখান থেকে একদিন রেলে চড়িয়ে বর-বধূকে নিয়ে গেল কামাখ্যার মন্দিরে। সঙ্গে গেল ভুজঙ্গ, নন্দু, প্রাণতোষ, ভৃগুরামরা। মায়ের সামনে মালাবদল করে বিয়ে হলো। বিয়ের পর পার্শ্ববর্তী লাইন-হোটেলে বিয়ের ভোজ দিলো হৃদয়নাথ। তারপর সন্ধেনাগাদ মালিগাঁও স্টেশনে এসে রাতের ট্রেন ধরে পরের দিন পৌঁছে গেল পানখাইতিতে। সন্ধেবেলায় আবার যথাসময়ে শো।

ওই শুভযাত্রার সঙ্গী হয়নি একমাত্র সিদ্ধেশ্বর। কেবল সঙ্গী হয়নি তাই নয়, তারপর থেকে চোখেমুখে একেবারেই বদলে যেতে লাগল লোকটা। রাতের বেলায় সবার নজর এড়িয়ে এলেও কদাপি ঢুকত না হৃদয়নাথের তাঁবুতে। হৃদয়নাথ অবশ্য আশালতার সঙ্গে শিবকুমারের বিয়ের পরপরই নিজের তাঁবুখানা ছেড়ে দিয়েছিল নবদম্পতির জন্য। তার বদলে গুদাম-তাঁবুটারই দখল নিয়েছিল সে। ভুজঙ্গ চলে গিয়েছিল জাদু দেখাবার বড় তাঁবুটাতেই। রাতের বেলায় বিছানা পেতে অন্যদের সঙ্গে ওখানেই শুচ্ছিল সে। সকালবেলায় বিছানাপত্তর নিয়ে ফিরে আসছিল গুদাম-তাঁবুতে। ঢুকিয়ে রাখছিল বিছানা রাখবার ওই সিন্দুকে।

এমনিতে আগের ব্যবস্থায়, রোজ দিনমানে, বিশেষত বিকেল থেকে শো শেষ হওয়া অবধি সময়টা সিদ্ধেশ্বর হেথা-হোথা লুকিয়ে কাটাত, শো শেষ হলেই, মানুষজন চলে গেলেই সন্তর্পণে ফিরে আসত। স্যাঁৎ করে ঢুকে পড়ত হৃদয়নাথের বাস-তাঁবুতে। একধরনের গদগদ কৃতার্থ ভাব লেগে থাকত ওর চোখেমুখে। যতক্ষণ থাকত, বারংবার গদগদ মুখে তাকাত আশালতার দিকে। তাকাতে তাকাতে একেবারে ধন্য বোধ করতো নিজেকে। একসময় রাতের খাওয়া খেয়ে অথবা না খেয়ে নিঃশব্দে চলে যেত শোয়ের বড় তাঁবুতে। ওখানেই নন্দুদের সঙ্গে রাতের বেলায় ঘুমোত। আশালতার সঙ্গে শিবকুমারের বিয়েটা হয়ে যাবার পর তাঁবুর নয়া বিলিবণ্টনে সে আর হৃদয়নাথের সাবেক তাঁবুর ধারেকাছেও আসেনি। রাতের বেলায় শো শেষ হলে পর, জায়গাটা নিঝ্ঝুম হয়ে যেত, ঠিক তখনই সে নিঃশব্দে ঢুকে পড়ত ভাঁড়ার-তাঁবুর মধ্যে। হৃদয়নাথের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে একসময় চলে যেত বড় তাঁবুতে। তখন সারাক্ষণ ম্রিয়মাণ দেখাত সিদ্ধেশ্বরকে। অধিক শোকে পাথর-পাথর অবস্থা। কথাবার্তা সে চিরকালই কম বলত, এই ঘটনার পর কে যেন তার মুখ থেকে বাক্যি কেড়ে নিল একেবারেই। সারাক্ষণ থম মেরে থাকত। হাজার প্রশ্নেও রা কাড়ত না। যেন এক জগদ্দল পাথর কেউ অকস্মাৎ চাপিয়ে দিয়েছে ওর বুকের ওপর।

তারপরই তো এলো আশালতার ওই বুকভাঙা রোদনের অভিশপ্ত সকাল। তখন চন্দ্রপুরায় খেলা দেখাচ্ছে হৃদয়নাথের দল।

সেদিন রাত পোহালেই নন্দুকে সঙ্গে নিয়ে পাশের গঞ্জে বাজার করতে যাবার কথা ছিল ভুজঙ্গর। দলের চাল-ডাল-মশলার মজুদ একেবারেই শেষ। আগের রাতে কথাবার্তা পাকা করা ছিল, সেই অনুসারে কেনাকাটা বাবদ টাকা নেবার জন্য হৃদয়নাথের তাঁবুতে ঢুকে একটুখানি অবাকই হয়েছিল ভুজঙ্গ। তাঁবুর পর্দায় বাইরে থেকে রশি বাঁধা। তার মানে জাদুকর প্রাতঃকৃত্য সেরে ফেরেনি তখনো।

সেটাই ছিল ভুজঙ্গর প্রথম খটকা। এতদিন দলে কাজ করছে সে, হৃদয়নাথ লোকটাকে দেখছে এতকাল, ডালেপাতায় ছড়িয়ে পড়ল রোদ্দুর অথচ হৃদয়নাথ ফিরল না, এমনটা বারেকের তরেও ঘটেনি এযাবৎ। বাস্তবিক, যত রাতেই ঘুমোতে যাক হৃদয়নাথ, ব্রাহ্মমুহূর্তে বিছানা সে ছাড়বেই। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়বে। প্রাতঃভ্রমণ ও প্রাতঃকৃত্য সেরে সূর্যোদয়ের আগেভাগে ফিরে এসেই চটপট কয়েকটি খেলা ঝালিয়ে নেবে তাঁবুর মধ্যে, তারপর জলগ্রহণ করবে সে। এ তার বহুদিনের অভ্যেস। কেবল ওইদিনই ব্যত্যয় ঘটল তার। রোদ্দুর ছড়িয়ে পড়ল গাছগাছালির ডালেপালায়, অথচ হৃদয়নাথ ফিরল না।

একসময় তাঁবুর রশি খুলে ভুজঙ্গ ঢোকে ভাঁড়ার-তাঁবুতে। বসে বসে অপেক্ষা করতে থাকে হৃদয়নাথের জন্য। কিন্তু ক্রমশ চড়া হতে থাকে রোদ্দুর, অথচ হৃদয়নাথের পাত্তাই নেই।

দুশ্চিন্তাটা ততক্ষণে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে ভুজঙ্গর বুকের মধ্যে। কিন্তু সেটা কাউকে জানতে না দিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে বাইরে। আশেপাশে একা-একা খুঁজে বেড়াতে থাকে হৃদয়নাথকে। চারপাশের মাঠঘাট, দিঘির পাড়ের গাছগাছাল, ঝোপঝাড় এলাকা, সব জায়গায় তন্নতন্ন করে খুঁজে সে যখন পুনরায় ফিরে আসে তাঁবুতে, ততক্ষণে নন্দু, প্রাণতোষ, ভৃগুরামরা দস্ত্তরমতো খোঁজাখুঁজি জুড়ে দিয়েছে ভুজঙ্গকে।

বাধ্য হয়ে ভুজঙ্গ একসময় কথাটা সবার সমুখে ভাঙে, কিনা, জাদুকরকে সকাল থেকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ততক্ষণে খবরটা পৌঁছে গিয়েছে শিবকুমারদের তাঁবুতেও। শোনামাত্র নিজেদের তাঁবু থেকে দৌড়ে আসে শিবকুমার, পিছু পিছু আশালতাও। সব শুনেটুনে সকলেই দ্বিতীয় প্রস্থ খোঁজাখুঁজি চালায় আরো অনেকক্ষণ। এবার খোঁজাখুঁজির এলাকাটাকে বাড়িয়ে দেওয়া হয় অনেকখানি। এদিকে নারেঙ্গার গঞ্জ, ওদিকে নারেঙ্গা রেলস্টেশন…। কিন্তু প্রায় দুপুর অবধি খোঁজাখুঁজি চালিয়েও কোনো ফল হয় না।

ভাঁড়ার-তাঁবুটাই দলের সবচেয়ে মূল্যবান জায়গা, সমস্ত জাদুসামগ্রী, তৈজসপত্র থেকে শুরু করে দলের যাবতীয় রসদ রাখা রয়েছে ওই তাঁবুতে। কাজেই, হৃদয়নাথের অনুপস্থিতিতে তাকে খুঁজতে বেরোবার কালে ভুজঙ্গ ভাঁড়ার-তাঁবুর পর্দা শক্ত করে বেঁধে দিয়ে গেছে বাইরে থেকে। ফলে, দুপুর অবধি বড় তাঁবুর থেকে ওদের ব্যবহৃত বিছানাগুলো ঢোকানো যায়নি ভাঁড়ার-তাঁবুতে।

অবশেষে, দুপুরনাগাদ, ওই কম্মোটি করতে গিয়েই রহস্যের প্রথম যবনিকাটি উঠল।

বিছানাগুলো রাখবার জন্য সিন্দুকের ডালাটা খুলেই ‘অ মা গো’ বলে ভয়েই তিন-পা পিছিয়ে গেল নন্দু।

সিন্দুকের মধ্যে নেতিয়ে শুয়ে রয়েছে হৃদয়নাথ। তার তখন অচৈতন্য অবস্থা।

চটজলদি হৃদয়নাথকে সিন্দুকের ভেতর থেকে বের করে আনে সবাই মিলে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।

দেখতে দেখতে ভুজঙ্গর দুচোখে জমেছে নিদারুণ বিস্ময়। ভুরুজোড়ায় অজস্র ভাঁজ পড়েছে ততক্ষণে।

চটজলদি খালি সিন্দুকের তলায় নেমে পড়ে সে। বিশেষভাবে তৈরি একদিকের দেয়ালটিকে ঠেলে সরাবার চেষ্টা চালায় বারংবার। পরমুহূর্তে বেরিয়ে আসে বাইরে। সিন্দুকের বাইরের দিকের দেয়ালটিকে পরীক্ষা করতে থাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। একসময় বেজায় থমথমে হয়ে ওঠে ওর মুখ। সহসা একেবারে গুম মেরে যায় মানুষটি। একটি কথাও উচ্চারণ করে না।

ততদিনে অবশ্য শিবকুমার জেনে গিয়েছে, ওই সিন্দুকটা কেবল বিছানাপত্র রাখবার জন্যই নয়, নররাক্ষসের খেলাটা দেখাবার বেলায় ওটা সিদ্ধেশ্বরের পলায়নের মতো করে বিশেষভাবে তৈরি একটি জাদুসিন্দুক। সিন্দুকটা এমনভাবে তৈরি, যাতে করে সিন্দুকের মধ্যে বন্দি মানুষটি প্রয়োজনে ভেতর থেকে একদিকের দেয়ালকে ঠেলে সরিয়ে দিতে পারে, অথচ দর্শকদের কেউই হাজার চেষ্টাতেও সেটা বুঝতে পারবে না।

সেদিন প্রায় সারাটা দিন গুম মেরে থাকে ভুজঙ্গ। গভীর ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকে সারাক্ষণ।

অবশেষে একসময় মুখ খোলে সে। বিড়বিড় করে জানায়, সিন্দুকের বাইরের দেয়ালে কে যেন একাধিক পেরেক পুঁতে দিয়ে ওইদিকের পাল্লাটিকে ঠেলে সরাবার ব্যবস্থাটাকেই বন্ধ করে দিয়েছে। নইলে জাদুকর নির্ঘাত বিশেষভাবে তৈরি ওই দেয়াল ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারত।

কিন্তু বেরিয়ে আসার সওয়াল তো পরে, তার চেয়েও বড় কথা, জাদুকর রাতের বেলায় ওই সিন্দুকের মধ্যে ঢুকেছিল কেন? এর জবাব কে দেবে! বাস্তবিক, হাজার চেষ্টা করেও সেটা বুঝতে পারেনি দলের কেউই।

সেই মুহূর্তে সবাই সহসা সচেতনভাবে খেয়াল করে, সকাল থেকে সিদ্ধেশ্বরকে কোথাও দেখা যায়নি একদন্ডের তরেও। এটা ঠিক যে, দিনের আলো ফোটার ঢের আগেই সিদ্ধেশ্বর শোয়ের এলাকা ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যায়। দিনভর বাইরে বাইরে লুকিয়ে কাটিয়ে দেয়, রাতের বেলায় নিঃশব্দে ফিরে আসে। হৃদয়নাথের পোষা ‘বীর’টাকে নিয়ে মানুষজনের মধ্যে গভীর রহস্যটাকে অটুট রাখতেই এমন একটা ব্যবস্থা হৃদয়নাথই চালু করেছিল। ফলও পাওয়া যাচ্ছিল তাতে। রাতের বেলায় শোয়ের সময় সিদ্ধেশ্বর যখন নররাক্ষস সেজে বাক্সের ভেতর থেকে বেরোত, তাঁবুভর্তি দর্শকের বুক ঢিপঢিপ করত ভয়ে। তার আগে অবশ্য হৃদয়নাথ বক্তৃতার ছলে শুনিয়ে দিত ‘জেলে আর বোতলবন্দি দৈত্যে’র সেই পুরনো গল্পটা। তাতে করে সিদ্ধেশ্বরের আবির্ভাবটা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠত।

সেই রাতে সিদ্ধেশ্বর আর ফিরলই না। একদিকে, সিন্দুকের গুপ্ত দেয়ালে একাধিক পেরেক পুঁতে দেয়ালটিকে ঠেলে সরানোর ব্যবস্থাটাকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া, অন্যদিকে, সিদ্ধেশ্বরের অকস্মাৎ অন্তর্ধান, – দুটো ঘটনাকে একসঙ্গে মেলাতে গিয়ে ভুজঙ্গর ভুরুতে আরো গভীর ভাঁজ পড়েছিল সেদিন।

অনেক ভেবেচিন্তে পুলিশের হাঙ্গামায় আর যায়নি ওরা। এমনিতে শিবকুমারের তখন বয়েস অল্প। হৃদয়নাথের অবর্তমানে মূলত ভুজঙ্গই ছিল সিদ্ধান্ত নেবার মালিক। বেশ বিবেচক মানুষ ছিল সে। ‘আজ আর শো হবে না, জাদুকর আচমকা মারা গেছে’ – এমন সংবাদ, যারা ভিড় করেছিল তাঁবুর চতুর্দিকে, ভুজঙ্গ তাদের অকম্পিত গলায় জানিয়ে দিয়েছিল, কিছুটা বয়েসের কারণে এবং কিছুটা অত্যধিক মদ্যপানের দরুন হার্টফেল করে মারা গেছে জাদুকর। আজকের দিনকাল হলে কী হতো, বলা কঠিন, কিন্তু এত বছর আগে, চন্দ্রপুরার মতো একটা অগম্য জায়গায়, একদিকে ব্রহ্মপুত্র বিপুল খাতে বইছে, আশেপাশে গুটিকয় চা-বাগান, থানাও অনেক দূরে, সবমিলিয়ে ভুজঙ্গর পক্ষে ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়া সহজ হয়েছিল। সন্ধেটা একটু গড়াতেই কৌতূহলী শত মানুষের নজর এড়িয়ে ব্রহ্মপুত্রর পাড়েই হৃদয়নাথের সৎকার হয়েছিল সেদিন।

কিন্তু সিদ্ধেশ্বরও আর ফিরে আসেনি দলে। এসকেপের খেলার পাক্কা জাদুকরের মতো সে বুঝি হাওয়ার সঙ্গে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল সেদিন। এমনকি, এই এত বছরের এত পরিক্রমায় ওকে এই মুলুকের কোনো প্রান্তে একদন্ডের জন্যও নজরে পড়েনি দলের কারোর।

কিন্তু আজ আর শিবকুমারের মনে তিলমাত্র সন্দেহ নেই, সিন্দুকের দেয়ালে পেরেক পোঁতার কাজটা সিদ্ধেশ্বরই কোনো ফাঁকে সেরে রেখেছিল। এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই অঙ্গ ছিল তা। আজ শিবকুমার এ-ও বোঝে, আশালতাকে না পাওয়ার রোষে হৃদয়নাথকে খুন করেছিল সিদ্ধেশ্বরই। রাতের বেলায় মদে চুর হৃদয়নাথকে ও-ই জবরদস্তি সিন্দুকের মধ্যে ভরে দিয়েছিল। বেরোবার গুপ্ত দরজাটি আগে থেকে বন্ধ করে দেওয়ায় সিন্দুকের ভেতর থেকে বেরোতে না পেরে দমবন্ধ হয়েই মারা গিয়েছে হৃদয়নাথ।

এমনিতে বাপকে যে খুব একটা ভালোবাসত আশালতা, তেমনটা কোনোকালেই মনে হয়নি শিবকুমারের। বরং তার প্রতি আশালতার ছিল অনন্ত অভিযোগ। তার জীবনভর লাম্পট্য, অন্য কোথাও দ্বিতীয় সংসার রচনা করে আশালতাদের সাবেক সংসারটিকে বিপন্ন করে তোলা, – এই সবকিছুর কারণে জীয়ন্তে বুঝি ওর সংসারের একটি প্রাণীও ক্ষমা করতে পারেনি হৃদয়নাথকে। কিন্তু তাও হৃদয়নাথের এমন আকস্মিক ও কষ্টকর মৃত্যু বুঝি চায়নি ওদের কেউই। আশালতাকে দেখেই সেটা বুঝতে পেরেছিল শিবকুমার।

হৃদয়নাথের মৃত্যুতে একেবারে ভূলুণ্ঠিতা হয়ে বুক ফাটিয়ে কেঁদেছিল আশালতা। পরপর দুদিন কিছু দাঁতে কাটেনি। শিবকুমাররা হাজারো প্রবোধ দিয়েও তাকে তিলমাত্র নিরস্ত করতে পারেনি।

বুকফাটা কান্নাটা অবশ্য একসময় থেমে গিয়েছিল, কিন্তু তারপরও বেশ কিছুদিন গুমরে গুমরে কেঁদেছিল আশালতা।

কতকাল আগের ঘটনা এসব, তাও এখন অবধি একেলাটি হলেই শিবকুমারের চোখের সামনে ভাসতে থাকে ভূলুণ্ঠিতা আশালতার উন্মাদিনীপ্রায় মূর্তিটি। কানের কাছে বাজতে থাকে বুকের কোন গভীর থেকে ঝলকে ঝলকে উঠে আসা ওই অন্তহীন রোদনের শব্দ।

ওইদিন, জীবনে সেই প্রথমবার আশালতাকে তাঁবুর মেঝেতে ভূলুণ্ঠিত হয়ে কাঁদতে দেখেছিল শিবকুমার।

আশালতার সেদিনের ওই ভূলুণ্ঠিত রোদন দেখতে দেখতে শিবকুমারের মনে হয়েছিল, যতই ঘেন্না করুক, মনে মনে বাপটাকে বুঝি ভালোবাসত আশালতা। বাপের প্রতি যত অভিযোগই থাকুক, বাপ-মেয়ের মধ্যেকার রক্তের সম্পর্ক যথাসময়ে যথাযথভাবেই কাজ করেছিল।

আশালতার ওই প্রথম ভূলুণ্ঠিতা রূপটিকে হয়তো বা মাঝে মাঝে বিস্মরণ হয় শিবকুমার, কিন্তু তার দ্বিতীয়বারের রোদন-পর্বটিকে আজ অবধি মুহূর্তের তরেও ভুলতে পারেনি। বাস্তবিক, প্রথমবার সেটা ছিল আশালতার বাপকে হারানোর দুঃখ, দ্বিতীয়বারেরটা ছিল সর্বস্ব হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার গভীর শোক। গাঢ়ত্বে দুটো রোদনের মধ্যে কোনো তুলনাই চলে না বুঝি।

ভুজঙ্গ ছিল চিরকালই অতিশয় বিবেচক ব্যক্তি। ওই নিদারুণ দুঃসময়ের মুহূর্তেও মাথাটাকে বরফের মতো ঠান্ডা রেখেছিল সে। হৃদয়নাথের অকস্মাৎ মৃত্যুতে কেবল হৃদয়নাথের পরিবারটাই নয়, ওইসঙ্গে না-হোক পাঁচ-ছটা পরিবার যে একেবারে খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে, এটা বুঝি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছিল তৎক্ষণাৎ। কাজেই, আশালতাকে সামান্য দু-একটি দানাও মুখে দেওয়ানোর প্রক্রিয়াটি যখন চলছিল, যখন আশালতাকে প্রায় জোর করেই খাওয়াবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল ভুজঙ্গর মেয়ে পারুল, ঠিক সেই মুহূর্তে শিবকুমারকে একান্তে ডেকে নিয়ে গিয়ে গোটা পরিস্থিতিটিকে বিশ্লেষণ করেছিল অতি নিপুণভাবে, এবং উপসংহার টেনেছিল এইভাবে যে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রায় ছ-সাতটি পরিবারের টিকে থাকবার স্বার্থে শিবকুমারকেই অবতীর্ণ হতে হবে জাদুকরের ভূমিকায়।

শিবকুমারকে বোঝানোর জন্য অবশ্য অধিক শব্দ ব্যবহার করতে হয়নি ভুজঙ্গকে। বুদ্ধিমান সে, অল্পেতেই গোটা পরিস্থিতিটা তার সামনে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাবাদে, এটা তো তারও এক দীর্ঘলালিত স্বপ্ন, কিনা, একদিন উত্তীর্ণ অপরাহ্ণে তাঁবুর বাইরে অবিরাম চোঙা ফুঁকতে থাকবে ভুজঙ্গ, নন্দু, ভৃগুরাম, প্রাণতোষরা, আসুন – আসুন দাদা-দিদি, মা-ভগিনীরা – দেখে যান দেশের শ্রেষ্ঠ সিদ্ধ জাদুকর এস কুমারের আশ্চর্য জাদু… আর, তার কিছুক্ষণ বাদেই একেবারে ছত্রপতি শিবাজীর বেশে মঞ্চে আবির্ভূত হবে শিবকুমার! তৎক্ষণাৎ শত শত করতালিতে গোটা তাঁবুটাই উদ্বেল হয়ে উঠবে।

কিন্তু যত সমস্যা তো আশালতাকে নিয়ে। এমন চরম বিপদের মুহূর্তেও ওই একটি বিষয়ে সে যে শিশুর মতোই অবুঝ।

আশালতার শোকটা খানিক স্তিমিত হয়েছিল হপ্তাটাক বাদে। ততদিনে গোটা দলের সাকল্যে সাত-আটটি পেট ধীরে ধীরে বিদ্রোহ শুরু করেছে। ভাঁড়ারে যা-কিছু রসদ সঞ্চিত ছিল, ফুরিয়ে গিয়েছে ওই কদিনে। ভাঁড়ারে এককণাও রসদ নেই, পকেটে একটা পয়সাও নেই। তার ওপর, যে-যার মুলুকে ওদের পরিবারগুলোর ততদিনে যে কী অবর্ণনীয় অবস্থা, তা তো সহজেই অনুমেয়। এমন পরিস্থিতিতে শত শোক ভুলেও শোটা অবিলম্বে চালু না করলে যে গোটা দলটাই না খেয়ে মরবে, সেটা শিবকুমারও বুঝতে পারছিল ততদিনে। কিন্তু তখন তার তো হাত-পা বাঁধা। কেন কি, আশালতার সামনে সে দিব্যি কেটে শপথ করেছে, এ জীবনে জাদুকে কখনোই পেশা হিসেবে নেবে না। বিয়ের পর অন্য কাজকর্মের চেষ্টা করবে, জাদুটা কেবল বেঁচে থাকবে একটা শখ হিসেবে, তার বেশি কিছু নয়।

বাধ্য হয়ে ভুজঙ্গর নেতৃত্বে গোটা দলটাই হামলে পড়ে আশালতার সমুখে, কিনা, দিদিভাই, এখন তোমার ওপরই নির্ভর করছে এতগুলো মানুষের বাঁচা-মরা। তুমি রাজি না হলে, এতগুলি মানুষের ঘরসংসারগুলি খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে।

পাক্কা দুদিন ধরে জনে জনে বোঝাবার ফলে অবশেষে বরফটা গলেছিল। একসময় ঠারেঠোরে সায় দিতে হয়েছিল আশালতাকে। কেন কি, কেবল এতগুলি মানুষের বাঁচামরা, ঘরসংসার নয়, এতদ্বারা মা ও দুই অবিবাহিত বোনসহ তাদেরও গোটা সংসারটা যে মুখ থুবড়ে পড়বার মুখে।

সেই বিকেলে ভুজঙ্গরা হাতে হাত মিলিয়ে নেমে পড়েছিল কাজে। শোয়ের তাঁবুটিকে সাফসুতরো করে ফেলেছিল চক্ষের পলকে। বিকেল না হতেই চোঙা ফুঁকতে বসে গিয়েছিল, কিনা, আসুন – আসুন দাদা-দিদি, মা-ভগিনীরা -, দেখে যান, – আজ সন্ধ্যায় – ভারতের সেরা জাদুকর এস কুমারের জাদু প্রদর্শনী -।

শেষ বিকেলে ঝোপড়িমতো টিকিট কাউন্টারে বসে গিয়েছিল ভুজঙ্গ। এবং শিবকুমার জীবনের সেই প্রথম তাঁবুর মেঝেতে আসন পেতে মুখে রং মাখতে শুরু করেছিল।

প্রসাধন শেষ হলে পর শ্বশুরের পোশাকগুলোকেই একে একে চড়িয়ে নিয়েছিল শিবকুমার। তারপর আশালতার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল।

পলকহীন চোখে শিবকুমারের দিকে তাকিয়েছিল আশালতাও। সেই দৃষ্টিতে বিস্ময় ছিল না, শোক ছিল না, কোনো অভিব্যক্তিই ছিল না। স্বামী নয়, যেন এক্কেবারে অচেনা একজন মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে ওর সামনে।

একসময় ধীরপায়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল শিবকুমার। নন্দু, প্রাণতোষরা ততক্ষণে মঞ্চের পেছনে সমস্ত সামগ্রী ঠিকঠাক সাজিয়ে ফেলেছে। নির্দিষ্ট পোশাকটি পরে ভুজঙ্গর মেয়ে পারুলও তৈরি।

প্রায় তিন ঘণ্টা বাদে যখন নিজের তাঁবুতে ফিরে এলো শিবকুমার, আশালতা তখন তাঁবুর রুক্ষ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে হুহু করে কেঁদে চলেছে।

এতদিন বাদে মিছামারি গঞ্জের প্রান্তদেশে জীর্ণ তাঁবুর পাশটিতে বসে একজোড়া বেনেবউকে দেখতে দেখতে যে আকুল রোদনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন শিবকুমার, সেটা যে আশালতারই ভূলুণ্ঠিত রোদনের ধ্বনি, এ-বিষয়ে কোনো সংশয় নেই শিবকুমারের মনে।

এবং শিবকুমারের দৃঢ় বিশ্বাস, অকস্মাৎ পিতৃবিয়োগের কারণে নয়, শিবকুমারকে স্বহস্তে জাদুমঞ্চের দিকে ঠেলে দেবার দরুন, ওইদিন এক নিদারুণ স্বপ্নভঙ্গের হাহাকার ছিল ওটা!