জীবন

লেখক: স্বকৃত নোমান

বুধবার সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে থুতু ফেলতে গিয়ে তারিক টের পেল, তার মুখটা বেঁকে গেছে। দ্রুত সে ওয়াশরুমে ঢুকে বেসিনের আয়নার সামনে দাঁড়াল। হাসল। একি! বাঁয়ের ঠোঁটটা বেঁকে কিনা নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে! কল ছেড়ে কুলি করার জন্য যেই না মুখে পানি নিল, অমনি ঠোঁটের ফাঁকে গড়িয়ে পড়তে লাগল পানি। আয়নায় ভালো করে মুখটা দেখে আবিষ্কার করল, ডানের চোখটি বড় ও মৃত মানুষের চোখের মতো স্থির। সহসা তার মনে পড়ে গেল গ্রেগর সামসার কথা। ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা রূপান্তরিত হয়েছিল তেলাপোকায়, আর তার বেঁকে গেছে মুখ।
দাঁত ব্রাশ না করেই সে বেরিয়ে এলো। মেহরিন তখনো ঘুমে। রাত দুটা পর্যন্ত সিনেমা দেখেছে। সুজিত ম-ল-পরিচালিত ভারতীয় বাংলা সিনেমা অরুন্ধতী। ভয়ংকর এক পিশাচের কাহিনি। হয়ত সিনেমাটির প্রভাবে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে দুবার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। দশটার আগে জাগবে বলে মনে হয় না। তারিকের ডাকে ঘুমচোখে উঠে বসল মেহরিন। হাই-টাই তুলে ধাতস্থ হতে কয়েক মিনিট লাগল। তারিক ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মুখটা দেখছিল। মেহরিনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, দেখো তো আমার মুখটা সত্যি বেঁকে গেল কিনা?
ভালো করে দেখল মেহরিন। কিছুই বুঝতে পারল না। তারিক যখন হাসল, অমনি বিস্মিত মেহরিন বলে উঠল, একি! কী হয়েছে তোমার?
কিছুই তো বুঝতে পারছি না।
মানে কী! স্ট্রোক নয় তো?
কেঁপে উঠল তারিক। স্ট্রোকে তার বাবার মৃত্যু হয়েছিল, প্রতিদিন সে এক প্যাকেট বেনসন ফোঁকে, তার স্ট্রোক হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। মনে পড়ে গেল অফিসের সাবেক কলিগ সানজিদার কথা। তারও এরকম মুখ বেঁকে গিয়েছিল। চিকিৎসা নিয়েছিল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে। তিন মাস আগে যখন দেখা হয়, তখনো সে ওষুধ খাচ্ছিল। তারও কি স্ট্রোক হয়েছিল? জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিল। নিশ্চয়ই স্ট্রোক। নইলে নিউরোসার্জনের চিকিৎসা নেবে কেন? সানজিদার মতো তারও কি ঘুমের ভেতর স্ট্রোক হলো!
মনকে সে প্রবোধ দিলো, না, তা হবে কেন? স্ট্রোক হলে কেবল মুখ বাঁকা হতো না, শরীরের একটা অঙ্গও অবশ হয়ে যেত। আবার মনে হলো, প্যারালাইসিস না তো? প্যারালাইসিস রোগীদেরও তো এমন মুখ বেঁকে যায়।
সানজিদা বলল, তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে যাও।
তারিক হাসল। সেই হাসির অর্থ, আমি ডাক্তারের কাছে যাব? পাগল!
সে ভেবে রেখেছে, বুড়ো বয়সে রোগ-ব্যারামে পড়লে টাকা থাকলে বিদেশে চিকিৎসা নেবে, টাকা না থাকলে সহজে মরার জন্য রেললাইনের ওপর সটান শুয়ে পড়বে, তবু সে দেশের কোনো ডাক্তারের শরণাপন্ন হবে না।
ডাক্তারদের প্রতি তার অনাস্থার অনেক কারণ। কয়েক মাস আগে তার এক চাচার বুকে ব্যথা উঠেছিল। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে এনজিওগ্রামের পর ডাক্তার বলল, হার্টে তিনটা ব্লক, রিং পরাতে হবে। দেরি না করে সে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে রিং বসাল। পাঁচ দিন ভালো থাকার পর আবার ব্যথা। উন্নত চিকিৎসার জন্য গেল ভেলোরে। এনজিওগ্রাম করিয়ে ডাক্তার বলল, আপনার হার্টে ব্লক-রিং কিছুই নাই।
তারিক ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার প্রথমেই সিটিস্ক্যান করাতে বলবে। লেগে যাবে দশ-বারো হাজার টাকা। তারপর দেবে ব্লাড ও সুগার টেস্ট। লেগে যাবে আরো দু-তিন হাজার। ডাক্তারের ভিজিটসহ একদিনেই খসে যাবে অন্তত কুড়ি হাজার। প্রয়োজনে একটা কেন, দশটা টেস্ট দেবে ডাক্তার – এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অধিকাংশ ডাক্তার অপ্রয়োজনেই টেস্ট দেয়। না দিলে তো ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো থেকে কমিশন আসবে না। যত রোগী তত কমিশন। মেহরিনের একবার পেটে ব্যথা হয়েছিল। দুদিন ধরে প্রচ- ব্যথা। তৃতীয় দিন তাকে সে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক গ্যাস্ট্রো লিভার বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেল। প্রথমেই আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে বলল ডাক্তার। ভিজিট নিল এক হাজার। চেম্বার থেকে বেরিয়ে তারিক বলল, আমার মনে হচ্ছে না আলট্রাসনোগ্রাফির কোনো দরকার আছে। অহেতুক টেস্টটা দিয়েছে।
মেহরিন বলল, আলট্রাসনোগ্রাফি না করালে ডাক্তার রোগটা বুঝবে কী করে?
ডাক্তার না বুঝলেও আমি বুঝেছি।
তুমি বুঝেছ?
হ্যাঁ।
তুমি ডাক্তার হলে কবে?
আমি ডাক্তার না হলেও আমার কমনসেন্স আছে। তুমি তো রোজ রাতে ঘুমানোর আগে দুধ খাও।
হ্যাঁ খাই। তো?
আজ থেকে খাবে না।
মেহরিন মেনে নিল। না নিয়ে উপায় কী? আলট্রাসনোগ্রাফির টাকা তো আর সে দেবে না। যে-টাকা দেবে তার কথাই মানতে হবে। তারিকের কথামতো রাতে সে দুধ খেল না। পরদিন সকালে টের পেল পেটের ব্যথা আগের চেয়ে কম। দ্বিতীয় রাতেও খেল না। তৃতীয় দিন সকালে ব্যথা পুরোপুরি উধাও। এরপর রাতে কখনো দুধ খায়নি, পেটেও ব্যথা হয়নি। তার মানে রোগটা ছিল গ্যাস্ট্রিক। ডাক্তার চাইলেই ওষুধ দিতে পারত, অথচ দিলো কিনা টেস্ট। না দিয়ে তার উপায়ও নেই। টেস্টই যদি না দেয়, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক তাকে রেখেছে কেন? রোগীরা টেস্ট না করালে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাজটা কী?
যা হবার হবে, তবু ডাক্তারের কাছে যাবে না তারিক। অফিসে গিয়ে চুপচাপ বসে রইল। কারো সঙ্গে কথা বলে না, কেউ এসে কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় সংক্ষেপে। বস বাইরে গিয়েছিল। এলো সাড়ে বারোটায়। বসকে সে মুখ বেঁকে যাওয়ার কথা জানালে বস তাকে আশ্বস্ত করল, রোগটা আজকাল অনেকেরই হয়। আমার এক বন্ধুর হয়েছিল, পনেরো দিনেই সেরে গেছে। ভয়ের কোনো কারণ নাই।
কিছুটা আশ^স্ত হলো তারিক। ভয়টা ঝেড়ে ফেলল মাথা থেকে।
লাঞ্চের সময় আবার উসকে উঠল ভয়টা। ভাত ঠিকমতো চিবুতে পারছে না। মনে হচ্ছে এই বুঝি ঠোঁটের ফাঁকে পড়ে যাবে। ঠোঁটটা রাবারের মতো বেঁকে যাচ্ছে। পানি খাওয়ার সময়ও একই অবস্থা, ঠোঁটের ফাঁকে গড়িয়ে পড়ছে। ভয়ে দু-প্লেটের স্থলে এক প্লেট ভাত খেয়ে দ্রুত ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে এলো।
বিকেলে বাসায় ফিরে ডরভয় ঝেড়ে একটা টেলিফিল্ম দেখতে বসল। গোলাম হাবীব লিটু-পরিচালিত ঘাস। মায়ের চরিত্রে নাজনীন হাসান চুমকির দুর্দান্ত অভিনয়। অনেক আদর-যতেœ সে ছেলেকে বড় করে। বিয়ে করায়। ভেবেছিল সুন্দরী পুত্রবধূ তার দেখভাল করবে। ক’দিন না যেতেই পুত্রবধূর চরম অবহেলার শিকার হয়। এক পর্যায়ে আক্রান্ত হয় প্যারালাইসিসে। বিছানায় পড়ে থাকে সারাক্ষণ। খাওয়া-দাওয়া,
পায়খানা-পেশাব সবই বিছানায়। পুত্রবধূ ঠিকমতো খেতে দেয় না বলে একদিন খিদার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে শরীরটাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় পুকুরপাড়ে। খেতে শুরু করে ঘাস। অনেকদিন ঘাস খেয়ে কাটানোর পর একদিন মরে পড়ে থাকে বিছানায়। মুখে আটকে থাকে কিছু ঘাস।
ফিল্মটা দেখে ভয়টা আবার চেপে বসল তারিকের মাথায়। মনের ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল, আমার স্ট্রোক হয়নি তো? প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হলাম না তো?
মেহরিন ক্ষোভ ঝাড়ল, ডাক্তার দেখাবে না এটা কেমন কথা? রোগ হলে কি মানুষ ডাক্তারের কাছে যায় না? দেশের সব ডাক্তার কি খারাপ? নিশ্চয়ই ভালো ডাক্তারও আছে। বিএসএমএমইউতে তো তোমার পরিচিত এক ডাক্তার আছে। তার সঙ্গে দেখা করছ না কেন?
ভালো কথা বলেছ। বলল তারিক।
বদরুল হাসান বিএসএমএমইউর ডার্মাটোলজির অধ্যাপক। কলিগ জাফরের সুবাদে তার সঙ্গে পরিচয়। নিপাট ভদ্রলোক। তার মোবাইল নম্বরে ফোন দিলো তারিক। সব শুনে হাসান সাহেব বললেন, কাল সকাল ঠিক নয়টায় আমার অফিসে চলে আসেন। নিউরোলজিস্ট দেখাতে হবে। চিন্তার কোনো কারণ নাই, ঠিক হয়ে যাবে।
নিউরোলজিস্ট দেখাতে হবে! আঁতকে উঠল তারিক। তার মানে স্ট্রোক! ভয়টা দ্বিগুণ ভারি হয়ে চেপে বসল মাথায়। রাতে সাতটির জায়গায় সিগারেট খেল মাত্র দুটি। ধূমপান স্ট্রোকের কারণ। ভয়ে রাতে ঠিকমতো খেতে পারল না; ঘুমও হলো না ঠিকমতো। বালিশে মাথা রাখার পর কেবলই মনে হয়েছে ঘুমের মধ্যেই বুঝি আবার স্ট্রোক হবে! আর বুঝি দেখবে না কোলাহল মুখরিত ভোর। নিজের মৃত্যু এবং মৃত্যুপরবর্তী দৃশ্যগুলো ভেসে উঠেছে চোখের সামনে : সে মরে গেছে, বিছানায় চিৎ হয়ে পড়ে আছে, মেহরিন তাকে জাগাতে চাইছে, চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিচ্ছে, কোনোভাবেই জাগাতে পারছে না। মেহরিন চিৎকার করে ওঠে। বারো বছরের টিপলু বাবার শিথানে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। মেহরিন তার ভাইকে ফোন দিয়ে স্বামীর মৃত্যুসংবাদ জানায়। অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন দেয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে। বিকেল নাগাদ লাশ পৌঁছে যায় গ্রামের বাড়ি। গোসল দিয়ে কাফন পরিয়ে নেওয়া হয় মসজিদের মাঠে। ইমাম সাহেব মুসল্লিদের উদ্দেশে বলে, লোকটা বড় ভালো ছিল। তার কাছে কোনো দাবি-দাওয়া থাকলে বলুন, তার আত্মীয়রা শোধ করে দেবে। মুসল্লিরা জোর গলায় বলে, আমাদের কোনো দাবি-দাওয়া নাই। জানাজা শেষে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় গোরস্তানে। দোয়া-কালাম পড়তে পড়তে কবরে নামিয়ে শোয়ানো হয়। কবরের ছাদে যেই না বাঁশের ফালি বিছানো শুরু হয়, অমনি নড়ে ওঠে তারিক। টের পায়, কবরে নয়, সে বিছানায় শুয়ে। হাত-পা কাঁপতে লাগল ভয়ে। মোবাইলের সুইচ অন করে দেখল রাত দেড়টা।

দুই
বৃহস্পতিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াল তারিক। মুখের অবস্থা অপরিবর্তিত। ওয়াশরুমে ঢুকে ব্রাশ করার সময় মনে হলো মুখটা আরো খানিকটা বেঁকে গেছে।
দ্রুত গোসল সেরে নাশতা করল। জামা-কাপড় পরে আলমিরার ড্রয়ার থেকে পনেরো হাজার টাকা নিয়ে রওনা হলো বিএসএমএমইউর উদ্দেশে। ধানমন্ডি থেকে জাফরকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছল ঠিক নয়টায়। হাসান সাহেব তাকে নিয়ে গেলেন নিউরোলজি বিভাগের ডাক্তার সুভাষ দে-র রুমে। সব শুনে সুভাষ চেয়ারে হেলান দিয়ে জানতে চাইলেন, কিছুদিনের মধ্যে কি আপনার ঠান্ডা লেগেছিল? তারিক মনে করার চেষ্টা করল। ছয়দিন আগে, শুক্রবারে, বন্ধুদের সঙ্গে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ হাওরে গিয়েছিল। ট্রলার ভাড়া করে সারা রাত হাওরে কাটিয়েছিল। মনে আছে, শেষরাতে হিমেল বাতাসে তার খুব শীত লাগছিল। সকালে ট্রলার মিঠামইন ঘাটে ভেড়ে। রাষ্ট্রপতির গ্রামের বাড়ি দেখতে সবার সঙ্গে সেও নামে। মিঠামইন বাজারের এক দোকান থেকে ফ্রিজের এক বোতল ঠান্ডা পানি কিনে ছিপিটা খুলে ঢকঢক করে খায়। ঠান্ডাটা মনে হয় তখনই লেগেছে। ঘটনাটা সে সুভাষকে জানাল।
আচ্ছা, কয়েকদিনের মধ্যে কি কানের নিচে ব্যথা করেছিল?
হ্যাঁ হ্যাঁ, প্রচ- ব্যথা করেছে। এই জায়গাটায়, ডান কানের ঠিক নিচে। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে এক কলিগের কাছ থেকে পেইনকিলার স্প্রে দিই। তাতে ব্যথাটা কমে।
জিবের স্বাদ কমে গিয়েছিল তাই না?
হ্যাঁ হ্যাঁ। তিন-চার দিন ধরেখাবার-দাবার কেমন যেন লেগেছে। ঠিক স্বাদ পাচ্ছিলাম না।
হুম, বেলস পালসি।
স্ট্রোক?
না না। ঠিক হয়ে যাবে।
এটা কেন হয়?
নানা কারণে হতে পারে। ভাইরাল ইনফেকশন, মধ্যকর্ণে ইনফেকশন, ঠান্ডা, আঘাত বা মস্তিষ্কে স্ট্রোকজনিত কারণ, ফেসিয়াল টিউমার বা কানের অপারেশন পরবর্তী ফেসিয়াল নার্ভ ইনজুরি … নানা কারণ।
আমার কি ঠান্ডার কারণে হলো?
মনে হয়। সকালবেলায় এত ঠান্ডা পানি খাওয়া ঠিক হয়নি। ফ্রিজের পানির সঙ্গে সবসময় নরমাল পানি মিশিয়ে খাবেন। বয়স কত?
ছত্রিশ।
ঔষুধ দিলেন সুভাষ। দিনে তিনটা করে কর্টন পাঁচদিন, দুটি করে মেক্সপ্রো সাতদিন, পাঁচটা করে ভিরক্স সাতদিন এবং ডানচোখের জন্য একটা ড্রপ। এছাড়া দিলেন মুখের কয়েকটা ব্যায়াম। প্রেসক্রিপশনটা তারিকের হাতে দিয়ে বললেন, হালকা গরম পানিতে রুমাল ভিজিয়ে ডান গালে সেঁক দেবেন, আর মুখের ব্যায়ামের জন্য বেশি বেশি চুইংগাম খাবেন।
তারিক হেসে বলল, বাঁচালেন। অনেক ধন্যবাদ।
আশা করি সাতদিনেই সুস্থ হয়ে যাবেন।
ডাক্তারের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল তারিক। যাক, ডাক্তার টেস্ট দেননি, দেখেই রোগটা ধরেতে পেরেছেন।

তিন
শুক্র ও শনি সাপ্তাহিক ছুটি। এ দুদিন সাধারণত বাসা থেকে বের হয় না তারিক। সারাক্ষণ টিভি দেখে। বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে স্যামসাং কোম্পানির বিশেষ অফারে একটা স্মার্ট টিভি কিনেছে। ইউটিউব দেখা যায়। রোজ দু-তিনটা নাটক বা সিনেমা দেখে। শুক্রবার সকালে দেখল দুটি সিনেমা। লাঞ্চের পর দেখল আরো একটি। বিকেল পাঁচটার দিকে টিপলু গেল কোচিংয়ে। মেহরিন বলল, চলো, আমরা হেঁটে আসি।
কোথায় যাবে?
বত্রিশ নম্বর পার্কে অনেকদিন যাই না।
টিপলুর কোচিং শেষ হবে সাতটায়। দুই ঘণ্টা ঘোরা যাবে। রওনা হলো দুজন। কাঁঠালবাগান থেকে হাঁটতে হাঁটতে বত্রিশ নম্বরে পৌঁছে লেকের ব্রিজটা পার হয়ে পার্কে ঢুকল। অসংখ্য মানুষ। তরুণ-তরুণীরা বসে গল্প করছে, কেউ হাঁটছে, কেউ খেলছে, কেউ ব্যায়াম করছে, রাস্তার পাশে ব্লাড গ্লুকোজ মিটার নিয়ে বসে থাকা লোকটির কাছে কেউ সুগার মাপাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে লোকটির সামনে দাঁড়াল দুজন।
তারিক বলল, সুগার টেস্ট কত করে?
তিরিশ টাকা।
দেন তো দেখি আমারটা মেপে।
তারিকের ডান হাতের মধ্যমা ফুটো করে রক্ত নিয়ে মিটারের স্টিকে রাখল লোকটি। সুগারের মাত্রা দেখাল ১২.৪। ঘাবড়ে গেল তারিক। মাসদুয়েক আগে একবার মাপিয়েছিল। খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর। তখন ছিল ৫.৮। দুই মাসের ব্যবধানে এতটা বেড়ে গেল! আতঙ্কের ছাপ ভেসে উঠল তার চোখেমুখে। নিশ্চয়ই মিটারে ভুল দেখাচ্ছে। অন্য কোথাও মাপানো দরকার। লেকের উল্টোদিকে আরেকটা লোক মিটার নিয়ে বসা। হাঁটতে হাঁটতে দুজন তার কাছে গিয়ে আবার মাপাল। এবার দেখাল ১১.৩।
মেহরিন বলল, ওখান থেকে এখানে হেঁটে আসতে সাত মিনিট লেগেছে। এ-কারণে হয়ত কিছুটা কমেছে।
কিন্তু আমার তো এত বেশি হওয়ার কথা না!
মেহরিন কিছু বলল না। সে এসব কম বোঝে। ডায়াবেটিস সম্পর্কে তার খুব একটা ধারণা নেই। বয়স মাত্র তিরিশ। জ্ঞাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ডায়াবেটিস রোগী নেই। জেনেটিক্যালি তারও হওয়ার সম্ভাবনা কম। আবার হওয়াটাও অসম্ভব নয়। সারাক্ষণ তো বাসাতেই থাকে। হাঁটাচলা বা পরিশ্রম তেমন করে না। এখন নেই, হতে কতক্ষণ? তবু ওসব নিয়ে তার ভাবনা নেই।
তারিক ভাবল, অ্যালকোহলে কি সুগার বাড়ে? গত রাতে ডিপিএল বারে এক বন্ধুর সঙ্গে ছয় পেগ ভদকা খেয়েছিল। সেভেনআপ মিশিয়ে। হার্ড ড্রিংকের সঙ্গে সফট ড্রিংক মিশিয়ে খেলে নাকি সুগার বাড়ে। সে ফোন দিলো বন্ধু তপন রায়কে। সপ্তাহে চার দিন মদ খায় তপন। ডায়াবেটিস ধরা পড়েছিল। কলকাতায় গিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছে। এখন নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছে। ভালো আছে। মদ ছাড়েনি।
হ্যালো তপন।
হ্যাঁ বল।
আমার সুগার লেভেল তো এগারো দেখাচ্ছে। কী করি বল তো?
আজকাল এগারো এমন কিছু নয়। কাল বারডেমে গিয়ে টেস্ট করা। আমার তো কুড়ি হয়েছিল, এখন সাতের ওপরে ওঠে না।
তপনের কথায় আশ্বস্ত হতে পারল না তারিক। মাথায় দুশ্চিন্তার বিরাট একটা বোঝা নিয়ে বাসায় ফিরে ফোন দিলো বন্ধু হানিফকে। মোবাইল অপারেটর কোম্পানিতে চাকরি নেওয়ার আগে বড়ভাইয়ের ফার্মেসিতে নিয়মিত বসত হানিফ। সেই সুবাদে ওষুধ তো চেনেই, ছোটখাটো চিকিৎসাও দিতে পারে। হানিফ বলল, ১২.৪! সর্বনাশ। তুই এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে যা। স্কয়ারে আমার পরিচিত একজন ভালো ডাক্তার আছে। এইচবিএ১সি টেস্টটা করা। গত তিন মাসে যদি ৮.০০-এর বেশি দেখায়, তাহলে তোর ডায়াবেটিস অনেক আগ থেকেই।
আজই করাতে হবে?
এক্ষুনি। নইলে তুই শেষ। হার্ট, কিডনি সব যাবে। ডায়াবেটিস খুব খারাপ রোগ। তোর তো টাইপ-২ ডায়াবেটিস। খুবই বাজে অবস্থা। তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে যা বন্ধু। দেরি করিস না।
আচ্ছা রাখলাম। পরে কথা হবে।
লাইন কেটে দিলো তারিক। হানিফের কথা শুনতে তার অস্বস্তি লাগছিল। সব ব্যাপারেই হানিফ সিরিয়াস। কথা বলাটাও যে একটা আর্ট, সেটা বোঝে না। অকারণে মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়। টাইপ-২ ডায়াবেটিস ভয় পাওয়ার মতো ব্যাপার বটে। তাই বলে এভাবে ভয় পাইয়ে দিতে হবে?
রাতে ভাত না খেয়ে কয়েক টুকরো শসা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল তারিক। ভাত না খাওয়ার কারণ ভয়। মাসতিনেক আগে একদিন হাসান সাহেবের সঙ্গে আড্ডা হচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, যত রোগের কারণ ভাত। বেশি ভাত খেলে ডায়াবেটিস হয়। আর ডায়াবেটিস হলে শরীরে দুনিয়ার রোগ বাসা বাঁধে।

চার
শনিবার সকাল নটার দিকে নাশতা করে তারিক বাজার করতে বের হলো দশটায়। পাড়ার এক ফার্মেসি থেকে ডায়াবেটিস মাপাল। সুগারের মাত্রা ৭.৯। ফার্মেসিওয়ালা বলল, ও কিছু না। নাশতা করেছেন না? খাবারের পর সাত-আট কোনো ব্যাপার না।
কিন্তু কাল যে ১২.৪ দেখাল?
হতেই পারে। দুপুরে হয়ত বেশি খেয়েছিলেন।
কিছুটা আশ্বস্ত হলো তারিক। হতে পারে। হয়ত পরশু রাতের ভদকার রিঅ্যাকশন। মনটা আনন্দে নেচে উঠল। যাক, ডায়াবেটিস তবে হয়নি। হওয়ার
কথাও নয়। শরীরটা তো তার। হলে সে নিশ্চয়ই টের পেত। ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলোর একটিও তার নেই। তার ডায়াবেটিস হবে কেন?
দুপুরে মুলা দিয়ে ইলিশ আর আলু দিয়ে ইলিশের ডিম রান্না করল মেহরিন। পেট ভরে ভাত খেল তারিক। খিদাও লেগেছিল খুব। লাগবে না? ভাত খেয়েছে সেই কাল দুপুরে। সকালে দুটো রুটি ও একটু ডাল ছাড়া আর কিছু খায়নি। ভাত খেয়ে শুয়ে শুয়ে একটা সিনেমা দেখল। উত্তরের সুর। শফিকুল ইসলাম রাজা ও শরীফ শাহ-পরিচালিত। কাহিনিটা ব্যতিক্রম। চানমিয়া ও তার মেয়ে আয়শা হাটে-বাজারে গান গেয়ে পেট চালায়। বাবার স্বপ্ন মেয়ে একদিন বড় গায়িকা হবে। আয়শার মা আম্বিয়া চায় মেয়ে লেখাপড়া করুক। মায়ের আগ্রহে স্কুলে যায় আয়শা। কিন্তু লেখাপড়ার চেয়ে বাবার সঙ্গে গান গাইতেই বেশি পছন্দ করে সে। একদিন বাইরের কিছু লোক তাদের গ্রামে আসে। আয়শা ও তার বাবার গান শুনে মুগ্ধ হয়। বাপ-বেটি গ্রামে আগের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়। হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে আয়শা। ধরা পড়ে কঠিন রোগ। অপারেশন ছাড়া সারবে না। বিদেশি
সংস্কৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারে না চানমিয়া। কমতে থাকে তার জনপ্রিয়তা। টাকার অভাবে মেয়ের অপারেশন করাতে পারে না। একদিন মারা যায় আয়শা।
আয়শার মৃতুদৃশ্য দেখে তারিকের মনে পড়ে গেল সেদিন স্বপ্নে দেখা নিজের মৃত্যুদৃশ্য। আর তখনি ফোন দিলো বন্ধু জাকির। চলমান ছাত্র-আন্দোলন দেখতে সে ফার্মগেট যেতে চায়। নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথে কদিন ধরে আন্দোলন করছে। সড়ক দুর্ঘটনায় রাজধানীর উত্তরার শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূত্রপাত। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বিমানবন্দর সড়কে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল তারা। একটি বাস থামলে সেটিতে ওঠার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাস প্রতিযোগিতা করতে করতে অতিরিক্ত গতিতে এগিয়ে আসে। একটি বাস বেপরোয়াভাবে প্রথম বাসের পাশে ফুটপাথে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে যায়। নিহত হয় দুজন এবং গুরুতর আহত হয় বারোজন। সহপাঠীদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে কলেজটির শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে এবং বাস ভাংচুর করে। এই ঘটনায় সাংবাদিকেরা নৌপরিবহনমন্ত্রী ও সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী সভাপতির প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি হাসিমুখে বলেন, ‘ভারতের মহারাষ্ট্রে গাড়ি দুর্ঘটনায় তেত্রিশজন মারা গেছে। আমরা যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কথা বলি ভারতে কি এভাবে বলে?’ তার এই বক্তব্য দেশব্যাপী সমালোচিত হয় এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভের সৃষ্টি করে। তার ক্ষমাপ্রার্থনা ও পদত্যাগের দাবিতে তুঙ্গে ওঠে আন্দোলন।
জাকির বলল, তুই যাবি?
তারিক বলল, যাব। আমার ডায়াবেটিস ধরা পড়েছ। হাঁটা দরকার। তুই বাসায় থাক। রেডি হতে দশ মিনিট লাগবে। হেঁটে আসতে আধা ঘণ্টা। এই ধর ছয়টার মধ্যে তোর বাসায় পৌঁছে যাব।
বাসা থেকে বের হয়ে পাড়ার এক ফার্মেসিতে গেল তারিক। ভাত খেয়েছে প্রায় তিন ঘণ্টা আগে। এখন সুগারটা মাপিয়ে দেখতে চায়। চল্লিশ টাকা চাইল ফার্মেসিওয়ালা। তারিকুল বলল, সকালে তো ওই দোকানে তিরিশ টাকায় মাপালাম।
সব মিটার তো এক না ভাই।
তারিক ভাবল, এটা নিশ্চয়ই ভালো মিটার। তার ভালো মিটার চাই। ভালো মিটার হলে চল্লিশ কেন, একশ টাকা দিতেও আপত্তি নেই। সে মাপাল। সুগারের মাত্রা দেখাল ১৬.৮। তারিকের বাঁয়ের চোখটাও বড় হয়ে গেল। এও কি সম্ভব! ডায়াবেটিসের কোনো লক্ষণ নেই, অথচ সুগারের মাত্রা কিনা এত হাই! হতেই পারে না। নিশ্চয়ই নষ্ট মিটার। ছুটে গেল আরেক ফার্মেসিতে। এখানে তিরিশ টাকা। মাপাল। এবার দেখাল ১৬.৬। এবার রীতিমতো ভড়কে গেল সে। দুটো মিটার তো আর নষ্ট হতে পারে না। নিশ্চয়ই তার ডায়াবেটিস। ভয়ে হাতে-পায়ে কাঁপুনি ধরে গেল।
হাঁটলে সুগার কমে। তাই সে হাঁটা ধরল। কুড়ি মিনিটে পৌঁছে গেল জাকিরের বাসায়। চা খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুজন ফার্মগেট গেল। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কম। ভয়ে কেউ গাড়ি বের করছে না। বের করলেই তো শিক্ষার্থীদের হাতে নাজেহাল হতে হবে। শিক্ষার্থীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ির লাইসেন্স চেক করছে। তা ছাড়া পরিবহন মালিক সমিতিও ডেকেছে অঘোষিত ধর্মঘট।
তারিকের কিছুই ভালো লাগে না। মনটা বড় অস্থির। মৃত্যুচিন্তায় কাবু। এত হাই লেভেলের ডায়াবেটিস। ভাবা যায়! মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার কথা কখনো সে ভাবতেই পারেনি। তার বাবার ডায়াবেটিস ছিল না। মায়েরও নেই। জেনেটিক্যালি তারও হওয়ার কথা নয়। তবু হলো। ধীরে ধীরে এখন হার্ট ব্লক হবে, কিডনি ডেমেজ হবে। আরো কত রোগ যে শরীরে বাসা বাঁধবে!
রাত আটটার দিকে এক রেস্তোরাঁয় পরোটা আর গরুর চাপ খেল দুজন। ফার্মগেট থেকে হেঁটেই বাসায় ফিরল তারিক। হাসান সাহেবকে ফোন দেওয়ার কথা ভাবল একবার; কিন্তু রাত হয়ে গেছে। ডাক্তার মানুষ, কত ব্যস্ত থাকেন সারাদিন, অসময়ে ফোন দিলে কী মনে করেন! তা ছাড়া ফোন দিয়েই বা কী লাভ? তিনি কি আর সুগারের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারবেন?
না খেয়েই শুয়ে পড়ল তারিক। একটা নাটক দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল।

পাঁচ
রোববার সকালে তারিক ঘুম থেকে উঠে বসকে ফোন করে জানাল অফিসে যেতে তার একটু দেরি হবে। বস বলল, ওকে, কাজ সেরে আসুন।
ওষুধ চলছে। একই সঙ্গে ব্যায়ামও। চুইংগাম খেতে খেতে চাপায় ব্যথা ধরে গেছে। মুখের অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। অবনতিও না। টিপলু স্কুলে গেছে। উবার কল করল তারিক। মেহরিনকে নিয়ে মিরপুর পোস্টঅফিসে যাবে। তিন বছর আগে ওই পোস্টঅফিসে দশ লাখ টাকা রেখেছিল। তিন বছর মেয়াদি ডিপোজিট। এতদিনে হয়ত বারো-সাড়ে বারো লাখ হয়েছে। সে কখন মরে যায় তার তো কোনো ঠিক নেই। মরে গেলে মেহরিনের পক্ষে টাকা তুলতে যদি ঝামেলা হয়! তাই আগেভাগে তুলে তার নামে রেখে দিতে চায়। তবে মনের কথা মেহরিনকে জানাল না। জানিয়ে কী লাভ? দুশ্চিন্তায় ভুগবে। মেহরিন বলল, মেয়াদ পূর্তির আগে টাকা তোলার কী দরকার বুঝলাম না।
তারিক বলল, মেয়াদ পূর্তি হতে আরো দুই বছর। আমরা থাকি কলাবাগান, টাকা রাখা মিরপুর। তুলে এনে ঝিগাতলা পোস্টঅফিসে রাখব। কত আর লস হবে।
মিরপুর পৌঁছল দশটায়। পোস্টঅফিসে দীর্ঘ লাইন। আবেদনটা করেই বেরিয়ে এলো তারা। টাকা আজ দেবে না। মেয়াদ পূর্তির আগে টাকা তুলতে চাইলে দশ-পনেরো দিন লাগে। লাগুক। পনেরো দিনে তো আর মরে যাবে না তারিক। এক মাস লাগলেও আপত্তি নেই।
মেহরিনকে বাসায় রেখে অফিসে পৌঁছতে পৌঁছতে একটা বেজে গেল।
কী খবর তারিক সাহেব? জানতে চাইলেন বস।
ভালো না স্যার। মনে হয় বেশিদিন বাঁচব না। কাল বিকেলে সুগার লেভেল ছিল ১৬.৬।
বলেন কী!
জি স্যার। খুবই বাজে অবস্থা।
টেস্ট করিয়েছেন কোথায়?
পাড়ার এক ফার্মেসিতে।
আপনি বরং বারডেমে যান। কাল ভোর পাঁচটায় খালি পেটে যাবেন। ডায়াবেটিসের জন্য বারডেম সবচেয়ে বেটার। দু-হাজার টাকার মতো লাগবে।
কী লাভ স্যার?
মানে কী? অসুখ হয়েছে, ডাক্তারের কাছে যাবেন না?
ডাক্তারের কাছে যেতে ভয় লাগে। একেকটা কসাই। মানবতা বলতে কিচ্ছু নাই। ইচ্ছেমতো রোগীদের জবাই করে।
তাই বলে শরীরে রোগ নিয়ে বসে থাকবেন? যান যান, কালই যান। মানুষের জীবনে বিপদ আসে। বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বীরের মতো মোকাবিলা করতে হয়। ডায়াবেটিস এমন কোনো রোগ নয়। আমারও তো আছে। আগে সুগার লেভেল ১১ পর্যন্ত উঠত। ডাক্তার দেখিয়ে নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছি। এখন ৮ ক্রস করে না।
আচ্ছা দেখি, কাল যাব একবার। দেখি ডাক্তার কী বলে।
নিশ্চয়ই। দরকার হলে একদিন ছুটি নেন।
না স্যার, ছুটি লাগবে না। যাব তো ভোরে। ন’টার মধ্যেই অফিসে চলে আসতে পারব।
আরেকটা কথা। রেগুলার হাঁটছেন তো?
আজ থেকে শুরু করব ভাবছি। রোজ হেঁটে বাসায় যাব।
গুড ডিসিশন। আপনার বাসা তো কাঁঠালবাগান। পল্টন থেকে হেঁটে যেতে ৪৫ মিনিটের বেশি লাগবে না। হাঁটা কন্টিনিউ করলে ডায়াবেটিস আপনার ধারেকাছেও ঘেঁষবে না।
ওকে স্যার।
ওকে। ভালো থাকুন।
বসের রুম থেকে বেরিয়ে ক্যান্টিনে গেল তারিক। এক টুকরো রুই মাছ দিয়ে আজও এক প্লেট ভাত খেল। আজ থেকে এক প্লেটই খাবে। কারণ ভাতে শর্করার মাত্রা বেশি। ভাত খেয়ে খেয়ে ভুঁড়িটা ঢোলের মতো হয়ে গেছে। এখন থেকে হিসাব করে ভাত খাবে। সম্ভব হলে রাতে খাবে না। সকালে দুটো রুটি, দুপুরে এক প্লেট ভাত, ব্যস।
পাঁচটায় অফিস থেকে বেরিয়ে হাঁটা ধরল তারিক। বাসায় পৌঁছল ঠিক পাঁচটা পঞ্চাশ মিনিটে। ডায়াবেটিসের রোগীদের রোজ টানা তিরিশ মিনিট হাঁটলেই হয়। সে হাঁটল পঞ্চাশ মিনিট। ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ল শরীরটা। হবে না? গত দশ বছরে তো এত লম্বা সময় হাঁটেনি।
রাতে শুধু চিনি ছাড়া এক কাপ দুধচা আর দুটি টোস্ট খেল।

ছয়
সোমবার সকালে তারিকের মনে হলো নামাজটা শুরু করা দরকার। নামাজ সে পড়ে। তবে দুই ঈদে দুই রাকাত করে চার রাকাত। গত বারো বছরে এক ওয়াক্ত পাঞ্জেগানা বা জুমার নামাজ পড়েনি। ধর্মেকর্মে উদাসীন। সে তো আর বেশিদিন বাঁচবে না, নামাজ-রোজা শুরু করাই উত্তম।
জোহরের অক্তে তাকে মসজিদে দেখে নামাজি কলিগরা তো অবাক। নামাজশেষে ইমাম সাহেব তার সঙ্গে মুসাবা করে বলল, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ মেহেরবান আপনাকে হেদায়েতের পথে এনেছেন। শুকরিয়া।
তারিক শুধু হাসল। মসজিদ থেকে বেরিয়ে ক্যান্টিনে গেল। লাঞ্চ করে রুমে ফিরে ইলেকট্রিক কেতলিতে পানি গরম করে এক কাপ চা বানাল। সিরামিকের বড় মগে ঢেলে মগটা ডান গালে ঠেকিয়ে সেঁক দিলো। চা শেষ করে বারান্দায় গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেটও বিস্বাদ লাগছে। প্রতি টানে মনে হচ্ছে মাথার রগটগ সব ছিঁড়ে যাবে। সিগারেটের প্রতি বিরক্তি ধরে গেল তার। বদ অভ্যাসটা ছেড়ে দেওয়ার কথা কতবার ভেবেছে। একবার টানা ছাব্বিশ দিন না খেয়ে ছিল। এখন আর চেষ্টা করে না। ছেড়ে দিয়ে কী লাভ? তার বাড়িওয়ালা জীবনে কোনোদিন সিগারেট স্পর্শ করেনি, অথচ মাত্র বায়ান্ন বছর বয়সে ক্যান্সারে মারা গেল। আবার তার গ্রামের বাড়ির ফজল মিয়া, যার বয়স প্রায় পঁচানব্বই, এখনো রোজ দিব্যি এক প্যাকেট বিড়ি উড়িয়ে দিচ্ছে। বিড়ি-সিগারেট যদি মৃত্যুর কারণ হয়, ফজল মিয়া মরল না কেন? এসব ভেবে সিগারেট ছাড়া হয় না তার। তবে মুখের অসুখটার কারণে এখন দিনে বারোটার বেশি খায় না।
অফিসশেষে যথারীতি বাসার উদ্দেশে হাঁটা ধরল তারিক। বাংলামোটরে দেখা হলো জাকিরের সঙ্গে। খুব গরম পড়ছে। দরদর করে ঘামছে তারিক। জাকির তাকে ডাব খাওয়াতে চাইল। সে খেল না। ডাব খেলে যদি সুগার বেড়ে যায়!

সাত
কর্টন ট্যাবলেটটা শেষ হয়ে গেছে। রাতে ভেবেছিল ওষুধের বাক্সে বুঝি আরো আছে। মঙ্গলবার সকালে দেখল একটাও নেই। ফার্মেসিতে ওষুধটা পেল না। খানিকটা দূরে বড় ফার্মেসিটায় গিয়ে পেল; কিন্তু ফার্মেসিওয়ালা ছয়টা বিক্রি করবে না। নিলে এক পাতা নিতে হবে। দশটা। একেকটা ট্যাবলেট বাইশ টাকা। ছয়টা বিক্রি করতে না চাওয়ার পেছনে কোনো যুক্তি খুঁজে পেল না তারিক। সকালবেলায় ফ্যাসাদ করার ইচ্ছে হলো না বলে এক পাতা নিয়েই বাসায় ফিরল। নাশতা করে ওষুধ খেল। তারপর গেল ওয়াশরুমে। ব্রাশ করার সময় টের পেল মুখের অবস্থা কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কেউ দেখলে বুঝতে পারবে না সে বেলস পালসি রোগে আক্রান্ত। কিছুটা আশ্বস্ত হলো। সাতদিনে ভালো হয়ে যাবে, ডাক্তার ঠিকই বলেছেন। আজ তো বরাবর সাতদিন। ওষুধ খাচ্ছে ছয়দিন ধরে। আরো একদিন খেলে নিশ্চয়ই কাল-পরশু নাগাদ পুরোপুরি সেরে যাবে।
কিন্তু ডায়াবেটিস? সহসা আবার খারাপ হয়ে গেল মনটা। মনকে সে প্রবোধ দিলো, ওটাও সেরে যাবে। প্রতিদিন পঞ্চাশ মিনিট করে হাঁটলে রক্তে সুগারের মাত্রা নিশ্চয়ই কমে যাবে। কালকের দিনটা যাক, পরশু হাসপাতালে গিয়ে খালি পেটে টেস্ট করাবে।
সারাদিন অফিসে মন বসাতে পারল না। মনটা কেমন উড়–উড়–। সারাক্ষণ কেবল মৃত্যুচিন্তা। সে মরে গেলে মেহরিন আর টিপলুর কী হবে? মেহরিনকে সে বড্ড ভালোবাসে। তাকে ছাড়া বেঁচে থাকাটা কল্পনা করতে পারে না। যত দিন যাচ্ছে তার প্রতি ততই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। মাঝেমধ্যে জগড়াঝাটি হয়। মেহরিনের কিছু কিছু ব্যাপার তার অপছন্দ। তবে তার প্রতি ভালোবাসার তুলনায় সেগুলো খুবই তুচ্ছ। সে মরে গেলে মেহরিন কি আবার বিয়ে করবে? নাহ্, তেমন মেয়ে নয় সে। ছেলেকে নিয়ে বাকি জীবন পার করে দেবে। আর বিয়ে করলেই কী? মৃত্যুর পর তার স্ত্রী কী করল তাতে তার কী যায়-আসে। সে তো তখন সব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ঊর্ধ্বে চলে যাবে।
বিকেলে কাওরানবাজার হয়ে বাসায় ফিরল। স্টার কাবাব থেকে স্ত্রী-পুত্রের জন্য শিককাবাব আর পরোটা এনেছে। শিককাবাব মেহরিনের প্রিয়। পাড়ার গলির মুখে এক মাছওয়ালার কাছ থেকে আড়াই হাজার টাকায় চারটা ইলিশও কিনেছে। রাতে শসা দিয়ে ইলিশ আর ইলিশের মাথা দিয়ে লতি রান্না করল মেহরিন। একটুকরো ইলিশ দিয়ে একমুঠো ভাত খেল তারিক।
মেহরিন বলল, এভাবে খাওয়া কমিয়ে দিলে তো সুগার ফল্ট করে অক্কা যাবে।
করবে না। বাকি জীবন এভাবেই খেয়ে যাব। জীবনে অনেক খেয়েছি। আর কত? এবার সংযমের পালা।
ছত্রিশেই সংযম? হা হা হা।
আজ হোক কাল হোক সংযম তো করতেই হবে। একটু আগেভাগেই না হয় শুরু করলাম।
রাতে মেহরিনসহ ভারতের খ্যাতিমান নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপ-পরিচালিত নেটফ্লিক্স ওয়েব সিরিজ সিক্রেট গেমসের তিনটি পর্ব দেখল। নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী ও রাজশ্রী দেশপা-ের বেশ কয়েকটি রগরগে সেক্স সিন। অন্য সময় হলে তারিকের উত্তেজনা তুঙ্গে উঠত। মেহরিন তখন উত্তেজিত, অথচ তারিক নিস্তেজ। ভেতর থেকে কোনো সাড়া পায় না। মাথার ভেতর মৃত্যুচিন্তা ঘুরপাক খেলে সাড়া পাবে কী করে। মেহরিনকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

আট
বুধবার সকাল থেকেই তারিকের মনটা বেশ প্রফুল্ল। মুখের অবস্থা আরো উন্নতি হয়েছে। কুলি করার সময় ঠোঁটের ফাঁকে পানি আর আগের মতো পড়ছে না। মুখটা দেখে কেউ বলবে না তার বেলস পালসি রোগ হয়েছিল। দুই ঠোঁট পুরোপুরি আগের রূপে ফিরেছে। দুদিন পর কুলি করার সময় পানিও পড়বে না। হাসপাতালে গিয়ে সুভাষ দে-র সঙ্গে দেখা করে একটা ধন্যবাদ দিয়ে আসতে ইচ্ছে হলো। চাইলে ফোন করতে পারে। করে না। ফোনে ধন্যবাদ দেওয়ার চেয়ে দেখা করে দেওয়া ভালো। কাল তো ডায়াবেটিস টেস্ট করাতে হাসপাতালে যাবেই। ফোন দিলো হাসান সাহেবের নম্বরে।
কী অবস্থা তারিক সাহেব?
রোগ তো সেরে গেছে হাসানভাই।
আপনার খোঁজখবর নাই। ভাবলাম দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন কিনা।
হা হা হা। না না ভাই, সুভাষদা খুব ভালো ডাক্তার। আমি এখন সুস্থ। কিন্তু অন্য একটা রোগ ধরা পড়েছে।
কী?
ডায়াবেটিস।
মাপিয়েছিলেন?
শনিবার বিকেলে মাপিয়েছিলাম।
কত ছিল?
১৬.৬।
বলেন কী!
হ্যাঁ ভাই।
আমাকে জানালেন না কেন?
জানিয়ে কী হবে? ভাবছি কাল সকালে খালি পেটে আপনার কাছে যাব। ডায়াবেটিসটা টেস্ট করাব।
আসুন আসুন। আটটার দিকে আসবেন। অবশ্যই খালি পেটে।
ওকে। কাল দেখা হচ্ছে।
অফিসে পৌঁছেই সুখবরটা পেল তারিক। প্রমোশন হয়েছে। অফিসার থেকে এ.ডি। অনেকদিন ধরে প্রমোশনটা হবে হবে করেও হচ্ছিল না। তার সঙ্গে আরো দুজনের হয়েছে। কলিগরা মিষ্টি খেতে চাইল। পিয়নকে ডেকে সে চার কেজি মিষ্টির টাকা দিলো। মিষ্টি আনল পিয়ন। সবাই খেল। সে ছুঁয়েও দেখল না। কেননা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য মিষ্টি ক্ষতিকর।
এত বড় একটা সুসংবাদও তাকে নাড়া দিতে পারল না। এসব প্রমোশন-টমোশন দিয়ে কী হবে? আর কদিন? বড়জোর এক বছর। এমন উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস নিয়ে এর বেশি তো বাঁচার কথা নয়। তবু বাসায় ফেরার সময় বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে মিষ্টি নিলো। খবরটা শুনে মন খারাপ করে মেহরিন বলল, সারাদিন গেল, অথচ এত বড় সুসংবাটা একটিবার ফোন করে আমাকে জানালে না?
তারিক বলল, ফোনে বলার চেয়ে সরাসরি বলে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছি। মন খারাপের কী আছে? খাও, মিষ্টি খাও।
স্বামীর প্রমোশনের আনন্দে রাতে কবুতরের মাংস আর পোলাও রান্না করল মেহরিন। তারিক শুধু কবুতরের একটা ঠ্যাং আর এক বাটি সবজি খেল। মেহরিনের মন খারাপ হলো খুব। এত কষ্ট করে রান্না করেছে তবে কার জন্য? তারিক বলল, ফ্রিজে রেখে দাও। শুক্রবার দুপুরে খাব।

নয়
বৃহস্পতিবার সকাল ঠিক আটটায় হাসান সাহেবের রুমে হাজির তারিক। হাসান অফিসে আসেন সাধারণত নটায়, তারিকের জন্য আজ এলেন আটটায়। তারিককে নিয়ে চলে গেলেন ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগের ডাক্তার ফরিদ উদ্দিনের কাছে। প্রথমে খালি পেটে রক্ত নিলেন ফরিদ। সুগারের মাত্রা দেখাল ৪.১। তারপর গ্লুকোজ খাইয়ে আবার নিলেন। এবার দেখাল ৬.৮।
তারিকের ঠিক বিশ^াস হয় না। কীভাবে হবে? মাত্র পাঁচ দিন আগেও তো ১৬.৬ ছিল! তবে কি কর্টন খাওয়ার কারণে সুগার লেভেল বেড়ে গিয়েছিল? ফরিদ সাহেব বললেন, কর্টনে বাড়ে। কিন্তু প্রি-ডায়াবেটিক না হলে তো বাড়ে না। আপনি তো প্রি-ডায়াবেটিকও নন।
আশ্চর্য তো!
ফরিদ সাহেব কতক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, মানবশরীর, আশ্চর্যই বটে।

দশ
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে অফিসের উদ্দেশে বাসে চড়ল তারিক। জ্যাম ঠেলে পৌঁছতে লেগে গেল পাক্কা এক ঘণ্টা। হাতমুখ ধুয়ে যেই না চেয়ারে বসল, অমনি বেজে উঠল মোবাইল ফোন। মেহরিনের কল।
হ্যাঁ মেহরিন।
চিৎকার করে কেঁদে উঠল মেহরিন।
কী হলো!
আমার টিপুলু! আমার টিপলু! বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ল মেহরিন। আতঙ্কিত তারিক চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। হালকা ধমকের সুরে বলল, টিপলুর কী হয়েছে বলবে তো!
কারেন্টে শক্ড করেছে। অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে আমার টিপলু।
দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্যের মতো ছুট দিলো তারিক। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে রাস্তায় এলো। চড়ে বসল একটা অটোরিকশায়। শাহবাগ পার হতেই মেহরিনের ফোন। টিপলু আর বেঁচে নেই।

Leave a Reply

%d bloggers like this: