জয়নুল আবেদিন

লেখক:

জালালউদ্দীন আহমেদ

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : সুব্রত বড়ুয়া

‘রিয়েলিস্ট’ গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন ৪৫ বছর বয়স্ক জয়নুল আবেদিন, যিনি তুলনামূলকভাবে কম বয়সেই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন – যখন তাঁর বয়স মাত্র ২৬ বছর। সময়টা ১৯৪৩ সাল, যা ছিল বাংলার মহাদুর্ভিক্ষের বছর। এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩০ লাখ নর-নারী ও শিশু অনাহারে, রোগে ভুগে ও মহামারিতে মৃত্যুবরণ করেছিল। খাদ্যের সন্ধানে গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে হাজির হয়েছিল রাজধানী কলকাতায়। পথেই মারা গিয়েছিল অনেকে, অন্যরা প্রাণ হারিয়েছিল কলকাতার রাজপথে ডাস্টবিনে আবর্জনার মধ্যে খাবার খোঁজার যুদ্ধে চিৎকার করতে-থাকা কুকুর ও কাকদের সঙ্গে যুঝতে গিয়ে।

জয়নুল আবেদিন তখন তরুণ শিল্পী-শিক্ষক। রোমান্টিক ল্যান্ডস্কেপের শিল্পী হওয়ার জন্যে বালক বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিলেন তিনি। বন্ধের সময় আঁকতেন সাঁওতাল রমণীদের বর্ণাঢ্য ছবি। একদিন দেখলেন, এক মা ও শিশুকে, যারা ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড’ সিরিজের যে-ধ্রুপদী ছবিগুলো নকল করতেন তিনি, ছবি আঁকা শেখার জন্যে তার থেকে একেবারে আলাদা। তিনি তাঁর ছবি আঁকার ক্লাসগুলোর কথা ভুলে গেলেন, ফিরে গেলেন তাঁর নিজের ছোট ঘরটিতে। সে-সন্ধ্যায় তিনি আঁকলেন তাঁর ‘ম্যাডোনা ১৯৪৩’ – অসাধারণ এক ড্রইং, অল্প কয়েকটি মাত্র তুলির আঁচড়ে। এক শিশু কঙ্কালসার মায়ের শুকিয়ে যাওয়া বুকে খুঁজছে স্তন। ভীতি জাগানোর মতো ছবি। শিশুর নিষ্পাপ সরল মুখ ও মাতৃস্তন্য খোঁজার আর্ত অন্বেষণে ফুটে উঠেছে এক করুণ প্রেক্ষাপট, যা ছবির দর্শকের মনে জাগিয়ে তুলছে এমন এক চ্যালেঞ্জ, যে-চ্যালেঞ্জের উত্তর কারো জানা নেই।

এটিই ছিল সাধারণ ভারতীয় কালিতে সাধারণ মানের র‌্যাপিং কাগজে বা স্ট্রবোর্ডে আঁকা অনেক স্কেচের প্রথমটি। রাতারাতি শিল্পীমহলে ছড়িয়ে পড়ল জয়নুল আবেদিনের নাম। শিল্প-সমালোচকরা যখন রেখার কাজে তাঁর অনতিক্রম্য কুশলতা ও একাগ্র পরাদৃষ্টির বিস্ময়কর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন জয়নুল মাসের পর মাস ধরে নীরবে একের পর এক ছবি এঁকে যাচ্ছিলেন।

এই ঘটনার কথা উল্লেখ করে কয়েক বছর পর তাঁর ছবির সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম স্টুয়ার্ট গ্রিফিন লিখেছিলেন, ‘আঘাত ও যুদ্ধের কারণে যন্ত্রণাহত একজন ক্রুদ্ধ গইয়ার মতোই জয়নুল ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং সেই স্পেনীয়র মতোই ক্রুদ্ধভাবে ছবি এঁকে গিয়েছিলেন। দিনের পর দিন দিবারাত্র চল্লিশ ঘণ্টা তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল সেই ভয়ংকর দৃশ্যগুলোর মধ্যে এবং শেষ পর্যন্ত দুর্ভিক্ষের যখন সমাপ্তি ঘটল, তখন তিনি ২০০০ স্কেচ এঁকে শেষ করেছেন। এই স্কেচগুলোতে মূর্ত হয়ে উঠেছিল ভারতের ইতিহাসের সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা, যার মধ্যে সংকটের গভীরতা আঁকা হয়ে গিয়েছিল আগামীদিনের মানুষের জন্য। একজন  তরুণ, সাধারণভাবে অপরিচিত একজন শিল্পী, অবিলম্বে তাঁর স্বীকৃতিলাভ করলেন।’

সেই সলজ্জ অনুভূতিশীল দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী জয়নুল আবেদিন আজ ঢাকা আর্ট গ্রুপের প্রধান ও নেতৃত্বদানকারী শিল্পী। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় অবস্থিত সরকারি চারুকলা ইনস্টিটিউটেরও অধ্যক্ষ। ইউনেস্কো ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক আয়োজিত প্রদর্শনী এবং যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, তুরস্ক, জাপান, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত একক প্রদর্শনীগুলোতে তাঁর ছবি ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হয়েছে এবং সেগুলো শিল্পরসিক দর্শকদের প্রশংসাও অর্জন করেছে।

জাপানের চিত্র-সমালোচক এলিসে গ্রিলি লিখেছেন, ‘নকশা, মনোভঙ্গি ও টেকনিক বা অঙ্কন-কৌশলের ক্ষেত্রে এই শিল্পী অতি প্রাচীন শিল্পকলার ঐতিহ্য এবং বর্তমানে দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে-পড়া নতুন ভাবধারাসমূহের সমন্বয় সাধন করেন। তিনি ছবির স্পেসের জটিলতা, ফর্মের বিভাজন এবং কিউবিস্ট চিত্রকরদের দ্বারা তুলে-ধরা প্রকৃতির জ্যামিতিকায়ন সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন, কিন্তু তিনি এই নতুন চিত্ররীতি থেকে কেবল সেটুকুই গ্রহণ করেন যা সুষমভাবে মেশাতে পারেন তাঁর দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে।’

এর আগে লন্ডনের বার্কলে গ্যালারিতে ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত জয়নুল আবেদিনের ছবির এক প্রদর্শনী নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এরিক নিউটন মন্তব্য করেছিলেন : ‘এখানে দেখতে পাওয়া যাবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পকলার সমন্বয় যা পূর্বে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হতো। তাঁর রয়েছে একই সঙ্গে পর্যবেক্ষণের ও মনোনিবেশ করার ক্ষমতা এবং তাঁর তুলির লয় যার মধ্যে কখনো কখনো কোনো দ্বিধা থাকে না কিংবা কখনো তালগোল পাকিয়ে ফেলে না, তা এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একেবারে যথাযথ। এ যেন প্রাচ্যের একটি হাত, তুলিও ধরেছে সেই ঐতিহ্যবাহী প্রাচ্য পদ্ধতিতে এবং শোষক কাগজে ব্যবহার করছে কেবল অনর্গল ধারায় নিষ্ক্রান্ত হওয়া কালো কালি ও জল, কিন্তু নির্দেশিত হচ্ছে একটি ইউরোপীয় চোখ দ্বারা।’

পূর্ব পাকিস্তানের ভূপ্রকৃতি ও ধানক্ষেতের সমারোহপূর্ণ ময়মনসিংহ জেলায় ১৯১৪ সালে জয়নুল আবেদিনের জন্ম। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন সে-অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ধীরশান্ত ব্রহ্মপুত্র নদের সজীবতায় প্রাণোচ্ছল পল্লি-প্রকৃতির আবহের মধ্যে। ব্রহ্মপুত্রের তীরে রয়েছে দীর্ঘদেহী খেজুরগাছ ও নারকেলগাছের সুদৃশ্য সারির মধ্যে জেলেদের ছোট ছোট কুঁড়েঘর। সেই সমাহিত পল্লি-প্রকৃতি হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে সবল পেশিওয়ালা নৌকার মাঝিদের দাঁড়ের শব্দে। এদিকে গ্রামীণ মহিলারা তখন ক্ষেতে-খামারে। তাঁদের ঈষৎ বাঁকানো প্রায় নিরাভরণ দেহশ্রী উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বিষুবীয় রৌদ্র ও বৃষ্টির ছোঁয়ায়। এ এক সরল সৌন্দর্য, যার সঙ্গে রয়েছে বিষণ্ণতার পরতে জড়ানো অন্তর্দর্শন। এই বিষাদের সুরই মূর্ত হয়েছে তাঁর তুলির স্পর্শে আঁকা ছোট, মোটা ও সবল রেখাগুলোতে এবং তাঁর নরম ও উজ্জ্বল জলরঙে।

জয়নুল আবেদিন আক্ষরিক অর্থেই দুঃখ-কষ্টের মাঝ দিয়ে পরিবারের সঙ্গে বিদ্রোহ করে একজন চিত্রকর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর পরিবারের আশা ও ইচ্ছা ছিল – পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে তিনিও হয়ে উঠবেন একজন পুলিশ অফিসার। এর পরিবর্তে নিজের অসাধারণ অধ্যবসায় ও দৃঢ়সংকল্পের জোরে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন ক্যালকাটা স্কুল অব আর্টে এবং ডিস্টিংশনসহ ফাইন আর্টসে ছয় বছরের ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করেছিলেন। অবিলম্বে তিনি সে-স্কুলের শিক্ষক পদেও নিযুক্ত হয়েছিলেন।

১৯৪৭ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর জয়নুল আবেদিন ঢাকায় একটি আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। সেটিই এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে উন্নতমানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে এবং ফাইন আর্টস গ্রাফিক আর্টসে পাঁচ বছরের কোর্স পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষাদান করছে। জয়নুল আবেদিন এ-প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ এবং আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রধান হিসেবে তাঁর পূর্ণকাল চাকরির প্রশাসনিক দায়িত্বের ব্যস্ততা সত্ত্বেও সময় খুঁজে বের করেন স্পেনের এল-গ্রেকোতে শিল্পীর শ্রদ্ধা নিবেদন, মেক্সিকোর পথিপার্শ্বের স্কেচ দেখার জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটানো, জাপানি প্রিন্ট-মেকিং ও উডকাটের কৌশল শেখার জন্য। অথবা নিজের মতো করে অদৃশ্য হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপজাতীয় পার্বত্যাঞ্চলের আকর্ষণীয় বনাঞ্চলে এবং ফিরে আসেন কয়েক মাস সেখানে আধা-আদিম জীবন কাটানোর পর, সঙ্গে নিয়ে এলেন যত্নের সঙ্গে সংগ্রহ-করা উপজাতীয় ও লোক চিত্রকলার নমুনা এবং হাজার হাজার স্কেচ ও শক্তিশালী ড্রইংয়ে পরিপূর্ণ স্ক্র্যাপ বুক।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও প্রশংসা পাওয়া প্রথম দিককার পেইন্টিং ও স্কেচসমূহের পর জয়নুল আবেদিন বছরের পর বছর ধরে নিরলসভাবে সম্পূর্ণরূপে বস্ত্তধর্মী ও প্রায়-আলোকচিত্রমূলক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম বিমূর্ত ও আধাবিমূর্ত বহু ছবি এঁকেছেন। তাঁর প্রিয় জলরং এবং ব্রাশ ও কালি দিয়ে আঁকা ছবি ছাড়াও তিনি সাঁওতাল রমণীদের দেহকাঠামোগত স্টাডিমূলক কিছু ছবিসহ তেলরঙেও বেশ কিছু ছবি এঁকেছেন। তাঁর মিশ্রমাধ্যম ছবিগুলোর মধ্যে দুটি ছবি অসাধারণ – কলসি কাঁখে রমণী ও স্নানরতা।

দুর্ভিক্ষের ছবিগুলোর পর আঁকা তাঁর পরিণত শিল্পকাজের মধ্যে ‘ওয়ার টু কায়েদস গ্রেভ’ এবং ‘সাঁওতাল রমণী’ ছবিগুলো বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর জলরং ও তেলরঙের ছবিগুলো সম্পর্কে এরিক নিউটন বলেছেন : ‘এখানে জরুরির প্রয়োজন অন্তর্হিত হয়েছে। তুলির গতি জোরালো করার প্রয়োজন আর নেই। পানিতে জন্মানো সবজির বাজার একটি সুন্দর রঙিন দৃশ্য – এর সঙ্গে রয়েছে নৌকার ছন্দময় আনাগোনার বিস্তারিত কাজ। এখানে ব্যবহৃত হয়েছে শিল্পীর কম্পোজিশন বা বিন্যাসগুণ এবং সেইসঙ্গে আবার পাশ্চাত্যের রীতির সঙ্গে মিলেছে প্রাচ্যরীতি। মূল বস্ত্তগুলোর বিন্যাসগত অবস্থান প্রাচ্যদেশীয়; পর্যবসিত বিষয় পাশ্চাত্যধর্মী। প্রতিটি ভঙ্গির মধ্যে বারবার এসেছে এশীয় ধারার ধারণার শেষ, তবে ডিটেলের কাজগুলো হয়েছে একজন ইংরেজ জলরং আঁকিয়ের মতো।’ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য রীতির এই মিশ্রণই চিত্রশিল্পের একজন ছাত্রকে উল্লেখযোগ্য আশাবাদ নিয়ে আবেদিনের চিত্রকর্ম দেখতে প্রেরণা জোগায়।

প্রথম প্রকাশ :