টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার

লেখক: সিরাজুল ইসলাম

তোর মুখটা ফটোজেনিক। ক্যামেরায় তোর চেহারাটা ভালো আসে; কিন্তু আর কিছু নেই তোর।

এতদিন পর এই কথার মানে কী?
রেজানুর বলল, তুই শর্ট, বেশ খাটো, মোটা ধাঁচের ফিগার। ক্যামেরায় গোলগাল লাগে।
হিমি বলল, তো?

তোর গলাটা হাস্কি, কথার শব্দগুলো ভেঙে ভেঙে যায়, হার্ড লাগে। ইমোশন দানা বাঁধতে পারে না।

তুমি তো বলতে, আমার চেহারায় একটা অ্যাপিল আছে।

সেটা আছে। তুই কিছু মনে করিস না, সেটা সেক্স অ্যাপিল। এই বাজারে নাটকের নায়িকা, বিজ্ঞাপনের মুখে সেক্স অ্যাপিল যায় না। সেখানে খোঁজে ইনোসেন্স, নিষ্পাপ, মায়া, মমতা।

তোমার ওসব চালাকি-কথায় চলবে না রেজানুর। আমি থেমে থাকার বা আটকে যাওয়ার মেয়ে না।

আমি তোকে তাই বলেছি? বলেছি এসব খামতির কথা ভুলে আমাদের পথ খুঁজে বের করতে হবে, একটা নতুন কোনো লাইনে ভাবতে হবে। আছে কোনো সুযোগ, রাসত্মা, আমি খুঁজে পাচ্ছি না। লেগে থাকতে হবে, পরিশ্রম করতে হবে। আমাকে, তোকে দুজনকেই।
হিমি বলল, ফারুক রায়হানের সঙ্গে তুমি এত ভালো কাজ করতে। সিঙ্গেল নাটক, ফাটাফাটি খ-নাটক। কয়েকটা বিজ্ঞাপন। আমাদের ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েদের কয়েকজন কয়েকটা প্রোডাকশন হাউজের সঙ্গে জড়িত ছিল। আমিও আসা-যাওয়া করতাম। শুনতাম ফারুক রায়হান বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনের ধরনটাই বদলে দিচ্ছে। কেউ ভাবতে পারত না এভাবেও হয়! কীভাবে কীভাবে তোমার নামটাও আসতো। বলতো, ফারুকের সঙ্গে একটা ছেলে আছে। রেজানুর। এই বয়সেই সাহিত্য, সিনেমা, নাটক গুলে খেয়েছে। ভাসা-ভাসা জ্ঞানের আঁতেল – রিভিউ, বইয়ের ফ্ল্যাপ পড়ে নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, ঘুরেফিরে একই জিনিস দেখে। ওইসব পুরনো জিনিস থেকে কীসব বের করে। একই কাজ দেখা, সে নতুনভাবে দেখে। রেজানুরের ওই চোখটা, দেখাটা, জ্ঞানটা ফারুক ভালোভাবে ব্যবহার করতো।
রেজানুর অবাক হয়ে দেখছিল হিমিকে।

আমার তো রেজুমি বানিয়ে ফেলছিস!

আমি যা শুনতাম তাই বলছি। তুমি একটা জিনিয়াস। শুনি তো তোমার ব্যাপারে এ-কথাটা সবাই বলে।

কিন্তু কাজে নেয় না।

ফারুক রায়হান থাকলে তোমার এখনকার পজিশন অন্যরকম হতো।

হয়তো হতো। কে জানে জিনিয়াস বলে ফেলেও দিতে পারতো।

ফারুক রায়হান ছেড়ে গেল কেন এসব কিছু?

কে জানে? আমেরিকা চলে গেল। আমেরিকার কোনো একটা বাঙালি মেয়ে টেনে তুলে নিয়ে গেল। বাবা, বিয়ে করবি এখানকার কোনো নায়িকা-টায়িকা বিয়ে কর। তোর জীবনটা বুঝবে। আমেরিকায় থাকা মেয়ে, বাংলাদেশে তার ভালো লাগবে নাকি! ফারুক রায়হান ভাই আমাকে বলল, যাই দুনিয়ার নাম্বার ওয়ান দেশটা একটু দেখি, থাকি। তোমার কাছ থেকে দেখেছি রেজানুর কীভাবে নতুন জিনিস শিখতে হয়। আমিও দেখবো, শিখবো। সব আর্ট মিডিয়াতেও আমেরিকা তো এক নম্বর। কত কিছু শেখার আছে। শিখে সঙ্গে নিয়ে আসবো। তারপর তুমি আর আমি দুজনে মিলে আগুন লাগিয়ে দেবো। ততদিনে আমার আমেরিকান পাসপোর্টটা হয়ে যাবে। ওই আমেরিকান পাসপোর্ট থাকলে সুবিধা। তোমার সব ক্রিটিক বলো, দুনিয়ার সব দেশের এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন, তোমাকে উঁচু চোখে দেখবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখ কোথায় কী, খোঁজ নেই এখন। গ্যাস স্টেশনে গাড়িতে তেল দেয় বা ট্যাক্সি চালায়। আমি তখনই ফারুকভাইকে বলেছিলাম, তোমার লাইফ স্ক্রিপ্টটা আমি লিখে দিতে পারি। আমেরিকার নিমা নামের মেয়েটার কথা প্রথমে আমাকে যখন বলল, তখন বলেছি। আমার সঙ্গে সব ব্যাপার নিয়েই ফারুকভাই কথা বলতো তো। নিমার সঙ্গে বিয়ে হলো, তখন বলেছি। ভিসা পেয়ে, টিকিট করে ফারুকভাই আমেরিকা যাবে, তখন বলেছি; কিন্তু মানেনি। বলেছে, সবাই একরকম না। স্টক চরিত্র তোমার মাথায় খেলে সব সময়। এত সিনেমা, নাটক দেখেছো, উপন্যাস পড়েছো তার একটা কুফল রয়েছে না! নিজের ব্যাপার বলে মানলো না ফারুকভাই। অন্য সময় বলতো, তোমার চরিত্র বিল্ডআপ নিয়ে খেলা, গল্প সাজানো তুলনাহীন। পারলে তুমিও চলো, এখানে কেউ বুঝবে না তোমাকে।
হিমি বলল, কফি খাও। গুম হয়ে বসে থাকলে কেন?

ফারুকভাইয়ের পেছনে ঘুরে তিনটা বছর মনে হয় নষ্ট করলাম।

নষ্ট হবে কেন? কত কিছু শিখেছো। ভালো সুনাম হয়েছিল তোমার।
রেজানুর বলল, তোমার সুনামের খ্যাতাপুরি। এখন আমাকে কেউ কাজ করবার জন্য সঙ্গে নিতে চায় না। আমি বুঝি তো। ওদের মাপটা আমি বুঝতে পারি। আমাকেও বুঝতে পারে ওরা, কোথায় কতদূর আমি যেতে পারি। আমাকে চাপা দিয়ে রাখতে চায়, দমিয়ে রাখতে চায়।
হিমি রেজানুরের পেছনে ঘোরে, সময় দেয়। সকালবেলার এ-সময়টায় মিডিয়ার লোকেরা সব থাকে ঘুমে। তাদের দিন শুরু হয় দুপুরের পর, তখন থেকে শেষরাত পর্যন্ত। অন্য ছেলেপেলে ইউনিভার্সিটির ক্লাসে, লাইব্রেরিতে, কেউ কেউ নতুন অফিসে। হার্ড টাইম। কাজ ছাড়া অন্য কিছু বোঝার সময় নেই। আড্ডা দূর-অস্ত! এই সময়টা ফ্রি টাইম রেজানুরের। হিমি একলা পায় তাকে।
ইউনিভার্সিটিতে নাম লেখানো আছে। ক্লাস করে কয়টা? সেমিস্টার টেনে টেনে চলছে। নিয়মিত ক্লাস করে না। তবে রেজানুরকে দেওয়া সময়টা ছাড়া ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসেই থাকে। লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া। এ-বারান্দা ও-বারান্দা। কত রকমের কানেকশন রাখতে হয়। রেজানুর তার প্রধান ভরসার জায়গা। কিন্তু রেজানুর যদি না পারে? হিমির তো থামার উপায় নেই। রাসত্মা পরিবর্তন করার উপায় নেই। সে ডিটারমাইন্ড। যেখানে সে যেতে চায় সে যাবে। মডেল হিসেবে হোক, কি নায়িকা – টিভিতে, বড় পর্দায়। তার হবে, তার শেষ জায়গাটা সে দেখতে পায়। বড় ফ্যাশন শোর র‌্যাম্পের ওপর সে হাঁটছে। পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। তার মুভির প্রিমিয়ার শো। সে সেখানে যাচ্ছে, ক্যামেরার ফ্লাশ চলছে একটানা। সে দেশে কোনো শপিং করতে পারে না। সে সেখানে গেছে শুনে রাসত্মা জুড়ে ভিড়, পুরো শপিংমলের বেচাকেনা বন্ধ; তাকে, হিমিকে দেখবে। বড় পর্দার জন্য নতুন কোনো নাম নিতে হবে হয়তো। কী নাম হবে তার মাথায় কুলোবে না। প্রযোজকরাই ঠিক করে দেবে। শুনেছে, প্রযোজকরা একটা সিন্ডিকেট। তাদের ভেতরে ভেতরে খাতির। তারা মিলে ঠিক করে, একজনকে ওঠায়, একজনকে নামায়, সে নায়ক হোক বা নায়িকা।
রেজানুর বলল, তুইও এখন বেশ সিরিয়াস হয়ে গেলি। চুপচাপ থাকা তোকে মানায় না।
হিমি বলল, তুমি তো এখন বেশ সিনিয়র। তোমার আর কাউকে লাগবে কেন? তুমি নিজে করো, নিজের প্রোডাকশন হাউজ বানাও।

অনেক টাকা-পয়সা লাগে। অনেক বড়লোকের ছেলেমেয়ে চলে এসেছে এই লাইনে। ওদের টাকার হিসাব নেই। টাকার গস্ন্যামার বড় গস্ন্যামার।

তুমি চেষ্টা করো, তোমারও বড় একটা কিছু হবে। আর তুমি আমাকে বাড়িয়ে বলছো। এর-ওর সঙ্গে অনেক কাজই তো করছো, আমি শুনতে পাই।

ওগুলো করে মন ভরে না। বড় কিছু করতে চাই। আগে যেমন ফারুক রায়হান ভাইয়ের সঙ্গে করতাম।

তোমার ওই ট্যাক্সি-ড্রাইভার ফিরবে না। আর ফিরলেও পাত্তা পাবে না। দেখবে তার জায়গা দখল হয়ে গেছে। আমেরিকান চাল বাংলাদেশের ভাতের হাঁড়িতে তেমন বলকায় না।

তুই ভাত রাঁধতেও জানিস নাকি?

বুয়া না এলে নিজেকেই ভাত রেঁধে ডিম ভেজে খেতে হয়। না হলে পেটে চড়া পড়ে যাবে তো।

তোরা তোরা মেয়েরা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে থাকিস!

হ্যাঁ।

আমাদের কয়েকটা ছেলেকে এরকম একসঙ্গে ভাড়া দিতে চায় না।

তোমরা ছেলেরা যে খারাপ! ওরকম স্বাধীন অ্যাপার্টমেন্ট পেলে মেয়ে নিয়ে আসো।

ছেলে খারাপ, আর যে মেয়ে ছেলেটার সঙ্গে আসে সে ভালো না খারাপ?

তারটা আমি বলব কী করে?
রেজানুর বলল, তোর ফটোজেনিক ফেস ছাড়া আর কিছু নেই বলেছি, রাগ করেছিস?

তাতে তোমার কিছু আসে-যায়? আমি বেজার থাকি বা খুশি থাকি? তারপরও তোমাকে আমি ছাড়বো না। আমাকে কাজ জোগাড় করে দাও। তুমি পারবে। আমাকে দুয়েকটা ব্রেক দাও। আমার জায়গাটা আমি জানি। আমি পারবো।

সেটাই তোকে বললাম। তুই তোর চেহারাটা নিয়ে পড়ে আছিস। তুই তোর মুখটা খুব সুন্দর করে সাজাতে পারিস। মেকওভার বলে না, সেটা তুই ভালো পারিস। তোর চোখের দৃষ্টি, ঠোঁটের কুঞ্চন, কপালের ওপর কানের পেছনে চুল ফেলে রাখা। আগে তো কত মেকআপ আর্টিস্ট লাগতো, এখন লাগে না। ড্রেস ডিজাইনার থেকে শুরু করে নিজেরাই সবকিছু। নায়িকার পছন্দের পোশাক পরিচালক, প্রযোজক বলেকয়েও বদলাতে পারে না। আর ঘুমের শট, মৃত্যুর দৃশ্য হলেও নায়িকা তার গালের ঠোঁটের রং মুছবে না।

ক্যামেরায় ভালো আসে, সেটা ছাড়বে কেন?

সেজন্য বললাম তোকে। শুধু চেহারা নিয়ে পড়ে থাকিস না। তোর ফিগারটা ঠিক কর। দোকানের ব্রেসিয়ারের সাপোর্টে কতটুকু কী আর ঠিক হবে। চরিত্র বোঝা শেখ। সেজন্য গল্প-উপন্যাস পড়। সংলাপ বলা শেখ। রোজ দুই ঘণ্টা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপ বলা প্র্যাকটিস কর। জিভের জড়তা কাটুক। আসলে কাজগুলো কঠিন। এক রাতে ফুল ফুটে ঝরে গেলে চলবে? এই যে নতুন মেয়েগুলো আসে, বেলুন অর্ধেক ফুলাতেই ফুটুস।

তুমি যেভাবে গাইড করবে আমি সেভাবে এগোবো। তোমাকে আমি মেন্টর মানি, তুমি জানো।

আমি সেরকম কিছু না, চেষ্টায় থাকি, তোমাকে একটা ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবো।

ইস এরকম যদি হয়, আমার অনেক নাম হলো, টাকা হলো, আমি তোমাকে একটা প্রোডাকশন হাউজ করে দিলাম। তুমি পূর্ণ স্বাধীন, তোমার মতো তুমি কাজ করবে। শুরুতে আমার সব টাকা তোমাকে দিয়ে দেবো। নেবে না?

নেবো।

খন পুরো আকাশে আমরা দুজন বড় বড় স্টার, তারকা।

রেজানুর কাজ আছে বলে চলে গেল। সে যাবে পত্রিকা অফিসে, পত্রিকার বিনোদন পাতাগুলো যারা দেখাশোনা করে তারা অনেকেই পরিচিত তার। সে তাবৎ দুনিয়ার খোঁজখবর রাখে, জানাশোনা বেশি। ইন্টারনেট হয়ে সুবিধা হয়েছে, সে বিশ মিনিট, আধা ঘণ্টা সময় ফাঁকা পেলে হয়, ফোনে ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখে। জিনিসটা মাথায় রেখে দেয়। বিনোদন পাতার জন্য পার্সোনাল টাচ দিয়ে সুন্দর একটা কিছু তৈরি করে দেয়, খবরটা আর খবর থাকে না। সে কাজটা করে বিনোদন সাংবাদিক হওয়ার বাসনায় নয়। পাতাগুলো যারা দেখে তারা সত্যি তাকে নিয়ে বড় কিছু ভাবে, সুযোগ পেলে আলোচনায়, অন্য লেখায় রেজানুরের নামটা টেনে আনে।
হিমি রেজানুরের চলাফেরা, ভাবনাচিন্তার কথাগুলো খুঁটিয়ে শোনে। এটা না যে, রেজানুরের প্রতি অতিরিক্ত ব্যক্তিগত আগ্রহে তার সবকিছু জানতে চায়। হিমি চায় সে রেজানুরের গুড বুকে থাকুক। রেজানুরের সময়টা ভালো যাচ্ছে না। তেমন কিছু একটা করে উঠতে পারছে না। এই দুর্বল সময়টায় কাছে থাকাটা, সঙ্গ দেওয়াটা দরকার।
রেজানুর টিভি চ্যানেল অফিসগুলোতে যায়। প্রায় সব টিভি চ্যানেল অফিসে হিমিও গেছে, তবে মনে পড়ে না রেজানুরের সঙ্গে কি না! কয়েকটা প্রোডাকশন হাউজের অফিসের মানুষজনও মুখচেনা – বিজ্ঞাপন তৈরি করে, টিভি নাটক, সরকারি, এনজিওর প্রচারণা। ভিডিও দেখিয়ে অনেক বেশি কথা অল্প সময়ে বলে দেওয়া যায়। ভাষাও তেমন বাধা হয়ে ওঠে না। ভিজুয়াল মার্কেটটা বড় হয়ে উঠছে। তাই হিমি ভয় পায় না। তার কী হবে, ভবিষ্যতে কী হবে – এসব নিয়ে সত্যি সত্যি সে ভয় পায় না। পুরো জগৎটা না হোক, সে ঘোরাফেরা করে, মানুষজনের সঙ্গে মিশে খোঁজখবর রেখে বোঝে তো এত বড় জায়গা, জায়গাটা দিনদিন প্রসারিত হচ্ছে, তার একটা জায়গা হয়ে যাবেই। আর সে তো তার বুঝ বয়স থেকে এই স্বপ্নটাই দেখে এসেছে। মাঝে মাঝে ভাবে, রেজানুর মনে হয় হিমির কথা হিমির থেকে বেশি জানে।
হিমির ভরসার জায়গা মনে হয় রেজানুরকে। হা হা হি হি করা হালকা ছেলে না রেজানুর। সেজন্য হিমি দেখেছে রেজানুর সব সার্কেলে যায় না। আজ বলছিল যাবে গুলশানে কার অফিসে, না মিডিয়ার কোনো লোক না। রেজানুর বলছিল, করপোরেট লোকজন আজকাল ঢুকছে এ-জগতে। বড় কোম্পানির সিইও, গ্রম্নপ অফ কোম্পানিজের মালিকরা। তারা আগে ছিল। কিন্তু এত টাকা-পয়সা নিয়ে না। আবার আগে তাদের নাম কেউ জানতো না, এখন তারা সামনে আসতে চায়। এমন না যে হিমি ঢাকায় নতুন এসেছে, ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হচ্ছে বা এই জগৎটার আশেপাশে ঘুরছে শুক্রবার শুক্রবার সাতদিন। সে নিজেও অনেক খবর রাখে, বুঝতে পারে, জানে। আর রেজানুর তো হিমির ওয়ার্কিং ফ্রেন্ড। তার জানাটা সে লুকাবে কেন? হিমি বলে, সুন্দর অল্পবয়সী মেয়েদের ছড়াছড়ি এখানে, তাদের নাড়াচাড়া করবে, বিছানায় নিয়ে শোবে, টাকাওয়ালা মানুষদের আগ্রহ তো থাকবেই। আমি জানি রেজানুর, মেয়েদের ওপরে উঠতে কত কিছু লাগে।
রেজানুর বলেছিল, সবার প্রয়োজন, চাহিদা একরকম না। রাজনৈতিক, সামাজিক আরো কত দিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার ব্যাপার আছে। কেউ আবার শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা পছন্দ করতেও পারে।
হিমি বলেছিল, আমাকে বুঝিয়ো না। তুমি সুন্দর একটা ইংরেজি কথা বলতে না, অল রোডস লিড টু রোম। আমি রোমে যেতে রাজি।

এখন হয়েছে কি, হিমিকে বসুন্ধরা এলাকার ভেতরের দিকে চলে আসতে হয়েছে। শুরুতে যখন এলো, ছিল ইউনিভার্সিটি এলাকার কাছাকাছি। হেঁটে আসা-যাওয়া করা যায়। পয়সা বাঁচে। তার ওপর একলা মেয়ে, ভয় ভয়ও করতো। মেয়েদের আবার ভয় কি! শরীর নিয়েই ভয়। সেই যে বাবা-মা ছোটবেলা থেকে শরীর নিয়ে কী ভয় পেতে শেখালো। জামার তলায় বোমা। বোমা ফাটলে পাশের মানুষের কী হাল তার হদিসে দরকার নেই, তুমি ফিনিস। এই ভয় আর গেল না। বাসা হিমিকে কয়েকবারই বদলাতে হয়েছে। হয় অ্যাপার্টমেন্ট মেয়েদের মেস বানিয়ে থাকতে দেবে না, বা, না অন্য অ্যাপার্টমেন্টের পরিবারগুলোর অসুবিধা। ভাবটা এই, পরিবারের পুরুষগুলো রাতে বাথরুমে যাওয়ার নাম করে মেয়েদের মেসের ঘরে ঢুকে যাবে। মেয়েরা কাপড়ের তলায় মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আছে, এসো এসো হে। বাড়ির নাকি বদনাম হয় মেয়েদের ভাড়া দিলে, এ-ছুতোয় দফায় দফায় বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়ায়। হিমির তো শুধু রুম ভাড়ার আর খাওয়ার খরচা না। তার কাপড়চোপড়, সাজগোজ, মেকআপের জিনিসপত্র কেনায় ম্যালা খরচ হয়ে যায়। আর সে তো ঢাকায় ইউনিভার্সিটিতে শুধু ক্লাস করবে আর রুমে এসে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ধুমসি হবে সেজন্য আসেনি। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিশতে হয়। খাবার দোকান ছাড়া তেমন আর বসার জায়গা কই। চা, কফি, ফাস্টফুড ছাড়া এখন আড্ডাও জমে না। খরচ কম? ইচ্ছে করলেই এসব খরচ কাট করা যায় না, তাই বাসা বদলাও। প্রথম বাসাটা নেওয়ার সময় বাবা রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছিল। পরে বাসা বদলানোর কথা বাবা-মা মনে হয় পুরোটা জানে না।
সকাল আটটার ভেতর হলে ঠিক আছে, রোদটা কাঁচা থাকে। সে-কারণে তার ভোর-ভোর ওঠার অভ্যাস। ইউনিভার্সিটিতে যায় আটটার ভেতরে। ক্লাস থাকুক বা না থাকুক। ক্লাস থাকলেই বা সে অ্যাটেন্ড করে কয়টায়? করলেও লেকচারারের বকবকানি শোনার জন্য না, হলঘরে এসির ভেতর অত নীরবতার মধ্যে গ্রম্নপ বেঁধে যে আড্ডাটা হয়, দেখা যায় আড্ডার কথাবার্তা হয় সিরিয়াস, বেশ ক্রিয়েটিভ
কথাবার্তা বেরিয়ে আসে। স্যার বা ম্যাডাম দেখলো কি, কি ঠিসারা মারলো তাতে কিছু আসে-যায় না। তারা ক্লাসে গল্প করে অতি ভদ্রভাবে। তাতে পড়ানোর মানুষটির আর যারা শুনতে চায় তাদের অসুবিধা হয় না। পড়াশোনা শুনতে ও শিখতে চাওয়ার মানুষেরও দুনিয়াতে দরকার আছে।
রোদের ভেতর হয় কী, যতই রিকশার ঘেরাটোপ বা ছায়ার ভেতর থাকো, গায়ের রং তো ময়লা হতে শুরু করে, লাবণ্যভাবটাও কমতে থাকে, চামড়ার খরতা বেড়ে যায়। চোখে-মুখে অত যত্ন করে দামি জিনিসপত্র ব্যবহার করে মেকওভারের এত তাপ সহ্য করার কথা না। এদেশের আউটডোর আবহাওয়া ভয়াবহ, যেহেতু দুটা কাল – গরম আর শীত – গরমে দরদর করে ঘাম, সব প্রসাধনী গলে গলে যায় আর শীতে ফটফট করে চামড়া ফাটবে। ডিসগাস্টিং। তবে হিমি তার মুখের ত্বকটা বোঝে, গলার নিচে, ঘাড়ের পেছনে, দুই হাতের খোলা জায়গাটা। এদের চরিত্র, চাহিদা বোঝা হয়ে গেছে। হিমি পড়ে না বা পড়ায় মন নেই – এ-কথা মোটে সত্য নয়। ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি তো বটেই, ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি ঘেঁটেঘেঁটে সে রূপচর্চা, ত্বকের যত্ন, চোখের যত্ন, মুখম-লের গড়নের ওপর পড়াশোনা করেছে। ঢাকা শহরের অনেক বিউটিশিয়ানই তার সঙ্গে জ্ঞানে ফেল মারবে। তার এই খোঁজখবর, পড়াশোনা নিয়ে তার বন্ধুরা যতই খোঁটা দিক, তার বিউটি পার্লারে কাজ করার বা বিউটি পার্লার খোলার আগ্রহ নেই। হিমি দেখে তো, তার মতো অনেকেই কেবল ভার্সিটির ছাত্রী না। কত কিছু করে যে মেয়েদের টিকে থাকতে হয়, ছাত্রীত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। ছেলেদের কথা বলতে পারবে না। কারণ সব ছেলে মিথ্যা কথা বলে চলে।
হিমির সঙ্গে থাকে রুলি মেয়েটা, বলে সে একটা জব করে, পার্টটাইম জব। খুলে বলে না কোন জব। তবে ছেলেরা এটুকুও বলবে না, তাদের ভাব, তারা একেকজন জমিদারপুত্র। রুলি মনে হয় কোনো বাসায় বাচ্চা দেখার কাজ করে কয়েক ঘণ্টা। রুলি কয়দিন বলেছিল হিমিকে, তোমার আঁকার হাত ভালো, কী সুন্দর দেখি দুই-চার টানে সুন্দর দৃশ্য, মানুষের মুখ এঁকে ফেলো, আমাকে শেখাও না! জীবজন্তু, ফুলগাছের ছবি আঁকা শিখিয়ে দিলেও হবে। হিমি ঠাট্টা করে বলেছে, কীসব খটমটে সাবজেক্টে পড়ো তুমি, মোটামোটা থিসিস লেখো, এখন আবার ওগুলোতে জীবজন্তুর ছবি ঢোকাতে হবে নাকি! বলেছে, আমার সময় নেই, আর ফালতু কাজ আমি করি না, রং-তুলি কিনে আনো, অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং হলে আমি শেখাতে পারবো। পরে দেখেছে, ইউটিউব খুলে ইংলিশ রাইমস মুখস্থ করে রুলি। কত বছরের বাচ্চা কে জানে! হয়তো বাচ্চার পায়খানা-প্রস্রাবও পরিষ্কার করতে হয়, নোংরা কাপড়চোপড়ও ধুয়ে দিতে হয়। হিমি শুনেছে, আশপাশের বড়লোক বাড়িগুলোতে বেবিসিটার রাখে। বিদেশি কালচার। সব বিদেশি কিছুতেই ভালো কিছু রাখা হয়। বেবিসিটারদের ভালো টাকা দেয়। হঠাৎ করে হিমির টাকা-পয়সা আটকে যায়। রুলিকে বলে রাখবে নাকি, তখন তাকে একটা কাজ যাতে জুটিয়ে দেয়?
যেরকম হয়, রুলি, জেবা, কাজল আর সে থাকে তেরোশো এসএফটির একটা অ্যাপার্টমেন্টে। তিনটা বেডরুম। ড্রইংরুমটাকেও বেডরুম বানিয়ে দিয়েছে, থাই গস্নাসের দেয়াল সামনে। বাড়িওয়ালাকে বলে থাই গস্নাসের দরজায় লক লাগিয়ে নিয়েছে। কাজল যখন ভেতরে থাকে, ভেতর থেকে পর্দা টেনে দেয়। ড্রয়িংরুমে যে-থাকে তাকে মাসে এক হাজার টাকা কম দিতে হয়। এ-বাসায়ও দেখল, আগেও মেয়েদের সঙ্গে যেখানে যেখানে থাকতো সে দেখতো, একসঙ্গে থাকা মেয়েগুলো তাকে আলাদা খাতির করে। সে যেভাবে থাকতে চায়, যা করতে চায় তারা তা মেনে নেয়। সে এ-কথাটা খুব শোনে, হিমি তুমি দেখতে খুব সুন্দর। কথাটা শুনলে তার ভেতর থেকে একটা খুশি ছমছমিয়ে ওঠে। হিমি তার ছোট বয়স থেকে শুনে এসেছে, সে দেখতে সুন্দর। কেউ কেউ বলতো, একেবারে বাঙালি মেয়ের মতো না। কেন বাঙালি মেয়েরা বুঝি সুন্দর হয় না! তাহলে কাদের মতো সে? শুনতো কাশ্মিরি মেয়েদের মতো, ইরানি মেয়েদের মতো। পরে দেখেছে কাশ্মিরি, ইরানি মেয়েদের বোকা বোকা ছবি। বোকা সুন্দরী হতে চায় না সে। তবে এখনো নতুন পরিচয় হওয়া কেউ তাকে সুন্দর না বললে মনে হয় অল্প সময়ের জন্য মনটা খারাপ লাগে।
কাজল কয়দিন ফেরেনি বাসায়। মেয়ে বলেই রাতে আরেক মেয়ে বাসায় না এলে ভাবনা হয়। মেয়েদের কত রকমের অসুবিধায় পড়তে হয়। তাই নিজেদের ভেতর নিয়ম হয়ে গেছে, কেউ দু-চারদিনের জন্য বাইরে গেলে জানিয়ে যায়। হিমি দুদিন পর টের পেয়েছে, কাজলের সঙ্গে একবারও দেখা হয়নি। রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার করার খালাও দেখেনি কাজলকে। জেবা পরে বলেছে, আগের দিন ফোনে মেসেজ পেয়েছে একটা কাজলের, সে আর ফিরবে না। তালা-চাবি মেরামতওয়ালা কাউকে ডেকে তার ঘরের দরজা খুলে তার ঘরের জিনিসপত্র, কাপড়চোপড়, বইপত্রগুলো বিক্রি করে যা পাওয়া যাবে তা দিয়ে রুম ভাড়া, মেসের খরচ এগুলো মিটিয়ে নিতে বলেছে। শেষে লিখেছে, তাকে আর পাওয়া যাবে না। ফোনের সিম ফেলে দিচ্ছি আমি।
হিমি পরে দুবার কাজলের ফোনে ফোন করেছে, ফোন বন্ধ। আশ্চর্য তো! সিম ফেলে দিলেই একটা মানুষ নিখোঁজ হয়ে যেতে পারবে, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না? হিমি নিজে নিজে বলল, আমিও একটা সিম। সিম নেই, হিমিও নেই।
না না। কেউ তাকে ভুলে যাবে, তা হিমি হতে দেবে না, পুরুষের চোখে আর মনে থেকে যাবে হিমি। কী জানি বলে না মক্ষীরানি হয়ে! মক্ষীরানি মানেটা যেন কি? আরে, সে একটা বাংলা শব্দের অর্থ ভুলে গেল, এসএসসিতে বাংলায় নববই পাওয়া মেয়েটি?

Leave a Reply

%d bloggers like this: