টোবা

সাধন চট্টোপাধ্যায়

মরার কাজটা মানুষ একা সারে – ডেডবডি হয়ে গেলে পাঁচজন জ্যান্তর দরকার। শবের পক্ষে শ্মশানে চুপচাপ হাজির হওয়া একাকী অসম্ভব।

অ্যাডভোকেট নিত্যগোপাল দাঁ-এর মা গত হলেন! রাত দশটাতে শ্মশানে হাজির জনাবিশ। বড় ছেলের সংসারে অন্ন মাপা থাকলে কী হবে, বুড়ির আরো তিন-তিনটি সন্তান, তাদের ছেলেপুলের শাখা, প্রত্যেকের কিছু কাছের জন – এখন নানা ঠিকানায় ছড়িয়ে থাকলেও, যে-যার খবর পেয়ে শ্মশানে।

দাঁ-পরিবারের ৮৩ বছরের প্রভাদেবী, গত সাত-আট মাস স্ট্রোকে চলচ্ছক্তিহীন, নিঃসঙ্গ। দোতলার কুঠুরিতে একা একা, সংসারের কোনো উপেক্ষাই গায়ে মাখতেন না, নানা ব্যাকুল মুহূর্তে প্রার্থনা জানাতেন নিঃসঙ্গ বিদায়ের।

এখন ৮৩ বছরের ডেডবডিটি ‘বৈতরণী’ কাচের বিছানায় একা শুয়ে থাকলেও – ড্রাইভার অথবা পাশের সিটে নিত্যগোপালের বড় ছেলে শানু। পৌরসভায় বৈতরণীকে জ্যান্তরাই দেখভাল করে সচল রাখে, তেল ভরে, সামান্য চার্জ নিয়ে বিল কেটে দেয়। হ্যাঁ, চেম্বারে এখন প্রভাদেবী লাশ হয়ে একা শুয়ে আছেন, রজনীর গুচ্ছগুলো বাঁধা আছে একা একা, ধূপকাঠি ধোঁয়া এবং গন্ধের জাল ছড়াচ্ছে একা একা – সবকিছুর আয়োজনে ছিল কারা? নইলে ডেডবডির কী সাধ্য সেজেগুজে শ্মশানমুখো চলবার?

বাড়ির বউরা কেউই অনুগামিনী হলো না। বহুকালের পারিবারিক  সংস্কার। কেবল এ-যাত্রা, ছোট নাতবউ তূর্ণার অনুরোধটি নিত্যগোপাল ফেলেস্নন না। ইন্দোর শহরের মেয়ে, বছরখানেক বিয়ে হয়েছে, চিরপ্রবাসী, কলকাতার মহাশ্মশান দেখেনি বলে মুখ ফুটে ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল। রক্ষণশীল পরিবার, কর্তার হুকুম ছাড়া নিয়ম বদলায় না; তাই নিত্যগোপালের কাছে স্ত্রী সর্বমঙ্গলার দৌত্ম মকুব হয়েছিল।

বে-শ! যাবে সঙ্গে আমার!

সর্বমঙ্গলা বলেছিল, তাছাড়া তোমার তো চান, ধরাচুড়ো পরা… সঙ্গে একজন থাকলে সুবিধে! তূর্ণার দায়িত্বে এসব। দিদিশাশুড়ি সবকিছু নাতবউকে বুঝিয়ে, হঠাৎ নিত্যগোপালের চোখে বুড়ো বয়সের নিঃশব্দ শোকাশ্রম্ন দেখে, ধিকিয়ে কেঁদে উঠল। তূর্ণা কী করে আর, আঁচলে শুকনো চোখদুটো নিজের, মুছে নিল। এখনো বোধহয়, শোক-শ্মশান-জ্বলন্তচিতার পরিবেশে মানুষ ক্ষণিকের জন্য সকল কিছু ম্যানেজের বুদ্ধিটুকু জলাঞ্জলি দেয়।

গাড়ি চল্ল। ড্রাইভার, নিত্যগোপাল দাঁ এবং নাতবউ তূর্ণা। অ্যাডভোকেট নিত্যগোপালের যা বয়স ও পেশা – বিচিত্র ও কূটসম্পন্ন কট্টর বাস্তববাদী অপরাধীদের পক্ষে-বিপক্ষে আইনের ধারা সাজাতে সাজাতে দুঁদে একজন ভদ্দর মানুষ। সেই মানুষটির মায়ের মৃত্যু একটা খবর বটে।

চলতে চলতে তূর্ণা একবার মনে করিয়ে দিল, দাদু, প্রেসারের ওষুধটা তোমার… বাক্যটি ফুরোবার আগেই হাত তুলে দিয়ে ইয়েস বোঝালেন! সব দিকেই তার তুখোড় খেয়াল। বয়সটা একাত্তর – শরীরের কলকব্জা বিগড়োনোর পক্ষে যথাযথ। মায়ের পরিণত মৃত্যু হলেও, যার সঙ্গে অচেতন দশমাস নাড়ির প্যাঁচে গর্ভে ঝুলে ছিলেন, ছিন্ন করে তবে না ট্যাঁ-ট্যাঁ ট্রমার চিৎকার, বুকের দুধপান করে বড়টি হয়েই আজ নিত্যগোপাল – স্মৃতি তো সামান্য কাঁদাবেই, যদিও এ-বয়সে বাস্তবের জীবনটায় স্ত্রী সর্বমঙ্গলাই সব। গত কয়টি যুগ তিনি ঘণ্টা-মিনিটের হিসাবে খোকা নিতু হয়ে মায়ের আদর খেয়েছেন? মনে পড়ে না। তবু নাড়ির ছেদন সন্তানের বুড়ো বয়সেও কখনো বিধুর করে তোলে।

আগামী পরশু সওয়ালের একটা ডেট ছিল। মার্ডার কেসে অভিযুক্ত কোনো আসামির পক্ষে লড়ছেন। কেসটা জটিল। গুরুদশায় ডেট বদলাতে হবে। ইদানীংকার ব্যস্তজীবনে অনেক সংস্কার উঠিয়ে দিতে হয়েছে। তা বলে, গুরুদশায় বেরোনো আজো দাঁ-পরিবার ঐতিহ্য মেনে নেবে না। তিনি তো করপোরেটের শেকলবাঁধা উঠতি কেউকেটা নন – অ্যাডভোকেট, স্বাধীন জীবিকা।

আবার মোবাইল। ইতোমধ্যে ঘনঘন বেজেছে, নিত্যগোপাল অভাগা মাতৃহীনতার সহানুভূতিতে ও-প্রান্তকে প্রতিবার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। বিনয়ে, ভাষায়, দার্শনিকতায়।

নজর চারদিকেই নিত্যগোপালের। শ্মশানগুরুত্ব নিয়ে যখনই ড্রাইভার শ্যাম ওভারটেক বা গতি বাড়িয়েছে, ‘আঃ!’ বিরক্তিতেই সামলে গেছে। তবু, স্মৃতিতে মাঝেমধ্যেই খোকা নিতুর চুপচাপ লম্বা শ্বাস ঝরা।

আড়াআড়ি বেল্ট বাঁধা বুকে। কর্তব্যের ভাবনাগুলো সাজাতে-সাজাতে হঠাৎ পেছনে হাত বাড়িয়ে তূর্ণাকে কিছু রাখতে দিলেন। হাজার বিশের নতুন দু-হাজার টাকার নোটের গোছা। বাকিটা রেখে দিলেন নিজের জিম্মায়। ভাই, ভাইপোরা আজ ভেন্ন, যার যার হলেও, শ্মশানে দাঁ-পরিবারের মূল কর্তা নিত্যগোপাল। কর্তব্য, সিদ্ধান্ত, মূল খরচ ও পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানের শেষ নিদান তিনিই। ভাই, ভাইয়ের ছেলেরা অনেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সফল ব্যবসায়ী হলে কী হবে!

 

রাত দশটা দশে পৌঁছে, প্রবাসী তূর্ণার মধ্যে মহাশ্মশানের কল্পছবিটি ধাক্কা খেল। এটা ইন্দোর নয়। এখানে লোকজন, কর্তব্যে, আলোয় আলোয়, ব্যস্ততায়, মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপের, ছবি তোলায়, খবরের আদান-প্রদান নিয়ে কেবল শ্বেতপাথরের পবিত্রতা। অভ্যস্ত চোখের চিতা, কাঠ, আগুন নেই। নির্জনতা, নদী, বটবৃক্ষ, অন্ধকার, গম্ভীর রামনাম সৎ হ্যায়ধ্বনি – কিছুই তূর্ণা তুলনায় মেলাতে পারে না।

অথচ সিঁদুরলেপা পাথর, দেবদেবীর মূর্তি, পুরুত, পি-, ঘি মাখানো, ফুল, খাট, বালিশ – সবই আছে। নিয়মকানুন, লেনদেন, দাবিদাওয়া – জ্যান্তজীবনের নিয়মে যা যা প্রয়োজন। কুকুর, ভিখিরি, ষাঁড়, জটা ও কপালে লম্বা সিঁদুর তিলকের সাধু, ত্রিশূল, জিন্স ও গেঞ্জিপরা ডোম – সবই। এমনকি খুনি, অপরাধী, ডাকাতও। খুন, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা – যাই হোক না কেন, লাশটাকে তো এখানে পোড়াতে আসতেই হবে। শ্মশান তো শুধু অনেস্ট মৃত্যুর জন্য নয়।

প্রভাদেবীকে ছেড়ে দিয়ে ‘বৈতরণী’ ফিরে গেছে। নিত্যগোপাল পৌঁছবার আগেই। শানু এল বাপের কাছে। নিত্যগোপাল শুনলেন, মেঝ-ন-ছোট – তিন কাকা, তুতো ভাই এবং নাতি-নাতনি মিলে মোট বাইশজন। শ্যামকে ধরে দু-দুটো গাড়ি, বাকিরা বাস-ট্যাক্সি করে এসছে। গোপীনাথ দিলিস্নতে, শানু ফাঁকে ছেলের বউ তূর্ণাকে আড়ালে ডেকে কিছু উপদেশ দিল। কলকাতার হালচাল রপ্ত হয়নি।

তখনই তূর্ণার চেতন ফিরল, গাড়িতে দাদু রাখতে দিয়েছিল, যা বস্নাউজ গলিয়ে ভেতরস্থ করে, শাড়ি ঠিক করেছিল – এখনো তেমন আছে। এটা নিয়ে একা একা ছিটকে থাকা ঠিক হবে না। একবার সিঁড়ি ভেঙে চুপচাপ পবিত্র গঙ্গার জল মাথায় ছিটিয়েছে। তখন বস্নাউজটা খেয়াল ছিল না।

ইন্দোরে গঙ্গা কোথায়! অথচ বিয়ের প্রস্তাব থেকেই ‘গঙ্গাপানি’ শব্দ তূর্ণার কাছে কল্পপবিত্র! দাঁ-পরিবারে এসে, গোপী নতুন বউকে গোপনে ড্রিংক করা ও পর্নো দেখবার নেশা ধরালেও, গঙ্গাতীরের কলকাতায় নদী দেখার সুপ্ত বাসনা পূরণ করেনি। আজ হঠাৎ কে যেন ঠেলে নিয়ে গেছল একত্রিশ মাথায় জল ছিটোতে।

কিছুটা অবাক তূর্ণা। মোটা, গোবদা-গোবদা অন্য দাদুরা – কৃত্যগোপাল, চিত্তগোপাল, তীর্থগোপালরা মাতৃশোকের ফুলো গালগুলো ঝুলিয়ে, দাদার কাছে অনুগত হিসেবে শেষকার্য সমাধানের পরামর্শ শুনছে। সকলেই খরচটা একা বহনের প্রস্তাব রাখলেও দাদুর নিষেধের হাত উঠানো, ফের মোটা দাদুদের চোখের জল মোছা – তূর্ণার কাছে মুহূর্তে যৌথ দাঁ-পরিবার যেন লেচিবিচ্ছিন্নের পূর্বমুহূর্তের ময়দার তালটি!

সুলগ্না ইউনিভার্সিটির ছাত্রী, সম্পর্কে তূর্ণার শাখা-প্রশাখায় ননদ। বউভাতের পর আজ শ্মশানে চার চোখের মিলন। খুবই মিশুকে ও ছটফটে স্বভাবের। যেন বহুদিনের আলাপ। ফিসফিসিয়ে খবর দিলো, চত্বরের ওপাশটায় নাকি পুলিশ এসছে!… ডেডবডি পোড়ানো হচ্ছে না… পয়জন সাসপেক্ট করছে শ্মশান রেজিস্ট্রার!

দেখবার গোপন আকর্ষণ, আবার অল্পবয়সী বউ কিনা। কিন্তু তূর্ণার বস্নাউজের ভেতরের চাপটুকু সচেতন। দেখতে পায়, আপন শ্বশুর শানু গম্ভীর মুখে দাদুকে ডেকে বলছে, বাবা শোনো! এবং মোটা মোটা দাদুরাও চুপচাপ গম্ভীর মুখে। আলোচনায় সক্কলে মাথা নাড়ায়। দেখা গেল নিত্যগোপাল চশমাটা খুলে ঘনঘন কাচ মুছছেন। উকিলি তৎপরতায় নীলকণ্ঠ শিবের মত সমস্যার গুরুত্ব গলায় ধারণ করছেন।

তূর্ণার কাছে থেকেই শোনা গেল দাদুর কথা, অফিসিয়াল কাজ শেষ? শ্বশুর শানু জানায়, হ্যাঁ বাবু!… আমাদের আগে পাঁচটা বডি!

পাঁ-চ-টা! নিত্যগোপালের ভুরুতে ভাঁজ।

শ্মশান বলে তো আইনকানুন জাগতিক নিয়মের বাইরে নয়। ফার্স্ট কাম, ফার্স্ট সার্ভ। মুচি, ম্যাথর, পলিটিশিয়ান বা লাটের বাট, যাই হও না কেন। র‌্যাশন, ইলেকট্রিক বিল জমা, জ্যামে গাড়ি আটকে থাকা, আটার কার্ডের ছবি তোলার লাইন – সংসারে অজস্র জীবমেত্মর যা যা নিয়ম! মড়াদের দেশেও নাই। চুলিস্নতে কেবল ডেডবডি ঢুকলেও, নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় ও সব আয়োজন তো জ্যান্তদের কবলে।

চার, পাঁচ বা ছয়, নম্বর তো পড়তেই পারে। শানু ও তার পারিবারিক কাকারা তেমন মাথা ঘামায় না। সময়ের গ্যাপটুকু কোথায় কে কীভাবে কাটাবে, বারে-বারে যার-যার রিংটোনে পুছতাছে। বনেদি বলে যা হয়!

নিত্যগোপাল নীরবে চিন্তার তালুটি মাথার পেছনে বোলাচ্ছেন। পাঁচটা ডেডবডি মানে গড়ে অন্ততপক্ষে পঞ্চাশ মিনিট ধরলে, চার ঘণ্টার ওপর। ঘড়িতে দশটা বাহান্ন, সারতে সারতে রাত আড়াইটে। সঙ্গে দু-খানামাত্র গাড়ি। সকলে ফিরবে কীভাবে? গভীর রাতের কলকাতা বাস-ট্যাক্সি-অটো লোপাট! সঙ্গে মেয়েরা। যা পরিস্থিতি, রিস্ক হয়ে যাবে!

ইদানীং যদিও ওলা, উবের সরকারি বন্দোবসেত্মর নানা সুযোগ বেড়েছে – রাত দুটোয় সব চালকরা তো রামচন্দর থাকে না। এক্ষুনি খানচারেক গাড়ি বুক করে রাখলে কেমন হয়! যা-ই লাগুক ওয়েটিং চার্জ!

 

সুলগ্না এসে ফের ফিসফিসিয়ে তূর্ণাকে, স্মেল পাচ্ছ না? আমার তো পেট গোলাচ্ছে! চুলিস্নতে মাংস, হাড়খুলিস্নর ভস্মিত হবার ধোঁয়া ও গন্ধ।

যারা এ পরিবেশের আশ্রয়ী – গা-সওয়া তাদের। সাধু, চোর, প্রশাসক, চা-বিস্কুট কারবারি, খাট, তোশক-বালিশের আন্ডারহ্যান্ডের ব্যবসা, ডোমদের, কোয়ার্টার, কুকুর, কাক, ষাঁড়, ভবঘুরে, ছদ্মবেশী ক্রিমিনাল ইত্যাদি ইত্যাদি।

তূর্ণার ভারি পছন্দ এ-মেয়েটাকে। কথায়, হাসিতে চাঙ্গা করতে পারে। তূর্ণা সামান্য ভারাক্রান্ত ছিল। যদিও বিয়ের পর, দাঁ-পরিবারে এসে, বিছনায় শোয়াই দেখেছে, তবু দিদিশাশুড়ি বলে কথা! দু-একবার শোয়ানো মৃতদেহ প্রদক্ষিণ সেরে, আর কিছু ভালো লাগে না।

চলো!

সুলগ্নার ছোট্ট প্রস্তাবে তূর্ণা, কোথায় গো?

জলের দিকে চলো!

ফের একবার সিঁড়ি ধাপ কাটিয়ে মা গঙ্গার কাছে। মস্ত একটা হ্যালোজেনে এ-দিকটা দিনের মত ঝকঝকে। মোটা, ধূসর হলদে রঙের একটা শ্মশানকুকুর থুতনি ঠেকিয়ে, দুটো হাত মেলে ধাপে শুয়েছিল। ওরা পাশ কাটিয়ে যায়। কিন্তু চাপা গড়গড় কোনো হিংস্র হিসহিসানি তূর্ণাকে ভয় দেখায়।

তক্ষুনি শুনতে পেল ঘাটলগ্ন নদীর পাকাপাকি টালিতে একটা ঝুপড়ির ছাউনি থেকে, টো-বা! টো-বা!

জট, গুঞ্জারমালা আর টকটকে লাল কাপড়ের সাধুজি প্রিয় চ্যালাটিকে ডাকছে। আশ্চর্য! টোবার দাঁত ঝলকানো গর্জনটুকু স্টপ। এরে, আঃ! আঃ! শুনে গুরুর কাছে ছুটল না। অলস শুয়েই রইল।

টোবা গাঁজা টেনে ধুম অবস্থায়। কেউ কেউ জানে, টোবা এ-যাবত শ্মশানযাত্রীদের ছজনকে কামড়ে দিয়েছে।

এসব বিপদের ফাঁড়া সম্পর্কে সুলগ্নারা ওয়াকিবহাল ছিল না। কী করে টের পাবে, অ-মানুষকুল এখানে গাঁজা খায়? ইউনিভার্সিটির দু-একজন মেয়েবন্ধু সিগারেটে ভরে টানে বটে, পশু লেভেলে চল আছে, জানা ছিল না।

ফ্রেশ হওয়ায়, জলের ধারে, ওদের রহস্যবিষয় ছিল, মরা, পুনর্জন্ম, আত্মা, জন্মালেও কী হবে – প্রভাদেবীকে নিয়ে জল্পনা। আলোচনা চলতে-চলতে, একদিন এ-দুজনাও মরবে প্রসঙ্গে এসে, তূর্ণার তো মন খারাপ। বস্নাউজের আড়ালের বস্ত্তটি বেখেয়াল হয়ে গেছে।  প্রসঙ্গর পর প্রসঙ্গে, অবশেষে ব্রণের সমস্যা।

সুলগ্না বলেস্ন, তোমার গালে এত পিম্পল্ কেন গো বউদি?

বছর ঘোরার মধ্যেই কলকাতার জল খেয়ে ইন্দোরের মেয়ে বেশ চালাক-চতুর। হেসে বলে, ই-স্ আমার রায়বাসিনী ননদ রে!… বউদি শুনলে বুড়ো-বুড়ি লাগে, নাম ধরে তুমি ডাকবে কেমন?

কী মাখো তুমি?

আমি?

প্রসাধনের নামটি বলতেই, সুলগ্না অনাধুনিকতার প্রতিবাদে, এ-ম্যা! বলে। তারপর সর্বাধুনিক মাল্টিন্যাশনাল প্রোডাক্টটির নাম করতে, তূর্ণা বলল, তাই! ভ্যানিশ হয়ে যাবে?

সাতদিন মেখে দেখো!

সুলগ্নার কথায় মনে মনে আস্থা জমতে থাকে।

 

টোবা উঠে ডন-বৈঠক ও পুরো শরীরটা ঝাড়া দিয়ে সরে পল্ল। দূরে গিয়ে, খানিকটা ইতস্ততর পর, ছ-নম্বর ডেডবডিটার খানিক তফাতে কু-লী অবস্থায় নেশার চোখ উচনো থাকে। সেয়ানা বলতে হবে; ও-পাশটায় যেখানে পুলিশ ও সাসপেক্টেড বধূ মৃত্যুর জন্য পোড়ানো আপাতত বাতিল, দু-চারটে পাতি সাংবাদিক হাজির – গেলই না সে-মুখো।

টোবার সম্ভবত গাঁজার ডোজটা বেশি বাড়ন্ত হয়ে গেছে। শ্মশান রাজ্যে, পশু-পাখিদের কোনো বিধিনিষেধ নেই। বড়-বড় ঘাড়কালো কাক – দাড় বলে যাদের – আবর্জনায়, গাছের মাথায়, ঝকঝকে দালানের খোঁজে বসে চতুর চাউনিতে সব দেখে, রীতিমতো সব চুলস্নুখোড়। চঞ্চুতে পাউচ ঠুকরে সুবিধেমতো ফুটো করে নেয়। কোনো শোক-তাপ বা মৃতের শেষ পরিণতিতে কোনো দার্শনিক ইঙ্গিত নেই। চুলস্নু বেশি টেনে ফেলেস্ন, মাঝেমধ্যে খ্খা – খ্খা – দু-চারটে গম্ভীর ডাক দেয়। যেন বহুদিনের গুরুতর কোনো মামলার রায় বেরোল।

আর শ্মশান ও আঞ্চলিক ষাঁড়গুলো রীতিমতো এলএসডি সেবনিয়া। সম্প্রতি উন্নয়নের ঠ্যালায় চারধারে রেলিং ও চুলিস্নগুলো দৃষ্টিশোভন করে দেওয়ায়, ডেডবডির কাপড়, বিছানা ষাঁড়গুলো চিবোতে পারে না। এমনকি, মস্ত চাতালে খোলকর্তালের কোনো পার্টি বসে পড়লে, পুরনোকালের মতো ছ্যাড়ছ্যাড়িয়ে নোংরা করা সম্ভব হচ্ছে না। বৃষকুল ডোম কোয়ার্টারের দিকটায়, খাট-বালিশ-বিছানার সুপার মলের ধারে অলস চেয়ে থাকে আর কল্পনার তুরীয়মার্গে নিদয় শঙ্করের ডমরুধ্বনি শোনে আর ফোঁসফোঁস ত্রিশূলটা শুঁকতে চায়।

টোবা গাঁজার ধুনকিতে, প্রভাদেবীর ডেডবডির দিকে কিছুক্ষণ স্থির চাউনিতে বেলার তালগোল পাকায়। দেখে, এখন সকালবেলা। প্রভাদেবীর মৃতদেহটা সবে ঢুকল। সঙ্গের লোকজন ভেতরে চলে গেল। রেজিস্ট্রার কালো মোটা রইস আদমিটি, জিন্স ও গেঞ্জিপরা ডোমসন্তান গিরিকে সাক্ষী রেখে সন্দেহে মাথা নাড়ছেন।

এ-ডেডবডি পোড়ানো চলবে না।… সন্দেহজনক!… পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে সার্টিফিকেট চাই!… খাঁটি, স্বাভাবিক মৃত্যু লেখা থাকতে হবে।

ইদানীং এসব হামেশাই হচ্ছে কিনা। জাল ডেড সার্টিফিকেট, মর্গের কেস ইত্যাদি। নানা ক্যাচাইন দেখতে দেখতে টোবা অভ্যস্ত। এই বুড়িটা? হতে পারে না। পরক্ষণেই টোবার আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। হতেও পারে! আজকাল কি নিরীহ প্রবীণ-প্রবীণারা সম্পত্তির দায়ে ছেলেপুলে-নাতিদের আদরে খুন হচ্ছে না?

হঠাৎ টোবার নিজের কুকুরজীবনটির জন্য শস্নাঘা ও নিরাপদবোধ।  আপন গোষ্ঠীর হাতে খুন হবার নো ভয়। শুধু মানুষ পিটিয়ে না মারলে। গাঁজার ধুনকি সামান্য ঢিলে হতেই টোবা ফের বর্তমান প্রহরে চলে এলো। রাত হচ্ছে। লাইনের দু-নম্বরটির এবার পুরুতের ডাক উঠেছে।

শ্মশান পরিবেশে নিজেকে সইয়ে নিতে-নিতে, আবার সর্বব্যাপারে দৃষ্টির জন্য নিত্যগোপাল যেন রোদমাখানো মাখনের অবস্থায়। নিজের শরীর-স্বাস্থ্যটা বাইরে থেকে ধরা না গেলেও সুবিধের যাচ্ছে না। সবকিছুর শূন্য পরিণতি ভেবে, অচিন ভয় জাগে। জেদ, অহং, সম্মান-সাফল্য – ছালছাড়ানো শব্দগুলো হাওয়ায় ভাসতে থাকে। মুহূর্তের জন্য নিত্যগোপাল বুকের বাঁ-দিকে কিছুটা অজানা পরিসর খুঁজে পান। সেখানে সকলের সঙ্গে মতবিনিময়ের ভাবধারা জাগে।

তক্ষুনি, কৃত্যগোপাল এসে বল্ল, লিমকা খাবে দাদা?

কেন? না, না!

খাও না!

বরাদ্দ বোতলটি নিত্যগোপাল গ্রহণ কলেস্নন না। সংস্কারে বাধল। শ্মশান ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধনে সামান্য শান্তি। সংসারের সকল আইন অচল এখানে।

নিত্যগোপাল জরুরি ভঙ্গিতে বলেস্নন, যা দেখছি, রাত দুটো হয়ে যাবে, কতু!

তা তো হবেই দাদা!

সামান্য বিরক্তিতে নিত্যগোপাল, হবে তো দেখতেই পাচ্ছি!… সঙ্গে দুটো গাড়ি সাকল্যে… অত রাতে কিছু পাওয়া যাবে না – মেয়েরা… মেয়েরা সঙ্গে…!

আশঙ্কার বাতাস উঠল।

দাদার চাউনিও অসমাপ্ত বাক্যটির মধ্যে কৃত্যগোপালের সম্বিত হয়। মানুষটা ক্রিমিনাল জগৎটাকে একটু বেশি চেনে। চারপাশের যা বাস্তব পরিস্থিতি! কৃত্যগোপালের এবার টনক নড়ল। এতক্ষণ ব্যাপারটা খেয়াল হয়নি।

কিছু করা যায়? বলেই ইতস্তত নিত্যগোপাল বিবেক কামড়ালেন। ছিঃ! এসব কী চিন্তা করছেন? পবিত্র অগ্নির কাছেও ম্যানেজ?

 

কৃত্যগোপাল সরকারি হাসপাতালের যথেষ্ট প্রভাবশালী ডাক্তার। ডাক্তারদের সংগঠনেরও কেউকেটা একজন। গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কমিটির মাথায়। ওদেরই উদ্যোগে সরকারি খরচে কলকাতা শহরের কাকদের নেশামুক্ত করার ক্লিনিক খোলা হয়েছিল। কয়েক কোটি গলে যাওয়ার মাঝপথে স্কিম আটকে যায়। পাখিপ্রেমিক সংগঠন কাকদের অবর্ণনীয় ক্লেশের কথা ভেবে, জনস্বার্থ মামলায় জিতে যায়।

উদ্বৃত্ত লিমকাটি শানুকে দিয়ে, কৃত্যগোপাল দামি মোবাইলের বোতাম টিপে টিপে, শ্মশানের ওয়ার্ড নম্বর, কাউন্সিলর, বোরো কমিটির সুলুকসন্ধান নিয়ে, গিরির প্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করল।

গিরি চালাকচতুর। বোরো কমিটি থেকে, লোকাল থানা – এমন কি লালবাজারে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে সামান্য যোগাযোগ। বড় কর্তাদেরও চাকরির খাতিরে চুনোপুঁটিদের দরকার। সেবার কলকাতায় ডেঙ্গুর মশা বৃদ্ধিতে, শুয়োর ধরার সরাসরি স্কিমে যখন পুলিশ কমিশনার অবধি হিমশিম – সংবাদমাধ্যম ও পলিটিক্যাল বসদের গুঁতোয় – ডোমপট্টির আখড়াগুলোর শুয়োর পাকড়াওতে গিরির খুবই, খুবই…! তাই তো, লোকাল থানার ওসিকে একবার চড়িয়ে দিয়েও, কমিশনারের কৃপায় ধামাচাপা।

বনেদি পরিবার ও একজন অ্যাডভোকেট জেনেও, রেজিস্ট্রার সামান্য হিলে বসল না। তবে সঙ্গে গিরি থাকায়, কেসটায় নজর দিলো। ইনিয়ে-বিনিয়ে নিত্যগোপাল ৬ নম্বর ডেডবডির দাহ সমাপ্তির পর রাত দুটোর সিকিউরিটি, সঙ্গে মেয়েদের প্রসঙ্গ – কিছু সমস্যার আবহ তৈরি করে যাচ্ছিলেন।

বলুন কী চান? পেশাদারি ভঙ্গিতে রেজিস্ট্রার জানতে চাইলে, নিত্যগোপাল বোঝালেন – যদি ৩, ৪, ৫-কে টপকে ৬-কে চুলিস্নতে এর পরই ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভবপর হয়! এখনো যা রাত্তির হয়েছে, নাভি-ভস্ম বিসর্জন সেরে, শেষ বাস-মিনি অথবা বাড়তির লোভ দেখিয়ে ট্যাক্সি, ওলা মিলতে পারে। শেষ চেষ্টার অনুরোধটুকু! বিবেকে কামড় খেয়েও পরিস্থিতিতে নিত্যগোপালের নৈতিকতার বিপরীতেই যেতে হলো।

স-ম্ভ-ব! ব্যস্ততা এবং বলা, একই সঙ্গে রেজিস্ট্রার। জবাবে কী বলতে হবে, নিত্যগোপাল বোঝার আগেই, হাতের নিবিটায় রেজিস্ট্রার পাঁচ আঙুল মেলে দিলো।

পাঁ-চ-শ!

কিছু কমটম যদি…

ক-ত?

যদি চারশ…!

বে-শ! …ওর সঙ্গে যান!

গিরি নিত্যগোপালকে নিয়ে পাশের ঘরে। চুক্তি সেরে ফেলে, বাইরে এসে নিত্যগোপাল লেনদেনে বিশেষ চমকালেন না – ধন্ধে রইলেন কীভাবে ম্যানেজ হবে। নাকি, এগুলো নতুন ফাঁদ – চুপচাপ হজম ছাড়া উপায় কী? চ্যাঁচালে পার্টিরাই ছিঃ ছিঃ করবে।

 

মিনিটপাঁচেক। রেজিস্ট্রার এলো। হন্তদন্ত, ব্যস্তসমস্ত ছ-নম্বর মৃতদেহটার কাছে দাঁড়াল। খাটিয়ার চারপাশে ঘুরপাক খায় এবং কারো উদ্দেশে নাম ধরে চ্যাঁচাতে, কালো খ্যাংড়াকাঠির মতো পুরুতটা ছুটে আসতে, ডেডবডির যা যা নিয়মকৃত্য দ্রম্নত সারবার হুকুম। চুলিস্নতে ঢুকবে।

পাশেই তিন, চার, পাঁচের পার্টিদের নজর এড়ায় না। ভুল শুধরে দিয়ে, সামান্য হইচই প্রতিবাদ ওঠায়, রেজিস্ট্রারের ঠান্ডা মাথার হাত তোলা!

এটা মহাশ্মশান!… আপনারা তিন, চার এবং পাঁচ, তাই তো? … এটা ছয়, আপনাদের পরে। সব ঠিক, কিন্তু এ-ডেডবডিটা সকালে এসেছিল… সন্দেহজনক ছিল বলে পোড়াতে দিইনি… ফিরে গেছল… পুলিশ-প্রশাসন সেরে, সারাদিন ঘুরে সার্টিফিকেট জুটেছে… তাই এ-কেসটা সেরে দিয়ে আপনাদেরগুলো যাবে।… উত্তেজনায় লাভ নেই… আইন এখানে ভাই আইনই!

সন্দেহজনক ডেডবডি ছিল! সামান্য বাতাসে মৃত প্রভাদেবীর পাকাচুল, চশমা এবং ফুলো ফর্সা গালের অংশ সাদা চাদরের ফাঁকে।

এই বডিটার সঙ্গের পার্টিদের অনেকেই লিমকা খেতে দেখেছে। সঙ্গে মেয়ে-বউ আছে। তিন-চার ইত্যাদির পার্টিরা আর কিছু বল্ল না। অনৈতিক মনোজগতের জটিলতা নিয়ে লক্ষ করতে থাকল, সন্দেহজনক ডেডবডিটা চুলিস্নর মহাআগুনে ঢুকবার আগে, বুড়ো বুড়ো ছেলেদের কাঁধে চেপে শেষকৃত্যের জন্য চলে গেল। অচেনা চোখগুলো মনুষ্য চরিত্রের লোভমেশানো অন্ধকারের  প্রসঙ্গ ভাবছে।

নিত্যগোপাল রেজিস্ট্রারের কথা ভাবছিলেন। দুঁদে অ্যাডভোকেটের আজ জীবিকার বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকেও, গোহারা হয়ে, চমকে যাচ্ছিলেন।

 

যথারীতি, বিনা ঝুঁকিতে বিশ-বাইশজন পারিবারিক শ্মশানযাত্রী  যার যার সংসারে নির্বিঘ্নে ফিরে গেল সে-রাতে।

গ্যাসের গাড়ি গেট দিয়ে ঢুকল ভেতরে। আজ ঝট করে ঘরে ঢুকে পড়া নেই। সর্বমঙ্গলার নির্দেশে একে একে পরিশুদ্ধ হয়ে যে-যার ঘরে চলে গেল। নিত্যগোপাল হালকা কিছু মুখে দিয়ে, বউয়ের অনুমতি নিয়েই মায়ের ফাঁকা ঘরটার পাশে, ড্রয়িংরুমটার গদির চেয়ারে শরীর এলালেন।

ও-ঘরে মিটমিটে শূন্য বাল্বটা রাতভর জ্বালানো। সন্দেহজনক ডেডবডির অভিনয়ে মৃত মায়ের উদ্দেশে শতসহস্র্র ক্ষমা চেয়ে, নিত্যগোপাল নিঃশব্দে চোখের জল ফেললেন বটে, গভীর নিরাশায় টের পান, কর্তা হয়েও ম্যানেজের খেলায় আজ তিনি কৃত্যগোপালের কাছে হেরো। পরাজিত।

শুধু ছোট ভাই বলেই নয়, পরাজয়টি আরো বড় বোধ হলো। r

Leave a Reply

%d bloggers like this: