ডিসেম্বরগুলো

লেখক: মার্সেলো মউচিনিও

অনুবাদ : আলম খোরশেদ

আমার বয়স দশ, আর আমি দাদাজানকে খুব ভালোবাসি।

দাদাই আমাকে স্কুলে নিয়ে আসেন, কারণ বাবা কাজ করেন আর এমিলিয়ার দেখভাল করতে হয় মাকে। ত্রাবেসা দো লিসোতে অবস্থিত আমাদের বাড়ি থেকে ভোর সাড়ে ছয়টায় বেরিয়ে আমরা রুয়া সাকাদুরা কাব্রাল ধরে এগোই, যেখানে একটা চমৎকার নাস্তাপাতির দোকান রয়েছে। আমি একটা হ্যাম অ্যান্ড চিজ রোল আর আখের জুস নিই। আমার দাদা মাখন-রুটি ও একটা ছোট গস্নাসে করে বস্ন্যাক কফি নেন। বরাবরই গস্নাসে করে। বেয়ারা যদি কখনো কাপে কফি দেয় তিনি অভিযোগ করেন। কোনো কথা না বলেই, স্রেফ মাথা নাড়িয়ে তিনি অভিযোগ করেন। কেননা, দাদা কথা বলেন না। আমি আসব পরে এ-বিষয়ে।

জুসের সঙ্গে রোল খাওয়াটা আমার এই পদযাত্রার একটি প্রিয় অনুষঙ্গ। আর দ্বিতীয় ভালো লাগা হচ্ছে, আমাদের স্কুলের রাস্তার ঠিক আগে পার্কিং লটের গাড়িগুলো দেখা। সেই গাড়িগুলোর একটার চেয়ে আরেকটা সুন্দর; কিন্তু দাদার সেগুলো পছন্দ নয়। তিনি ভুরু কুঁচকে তাকান। বাবা বলেন, এর কারণ দাদাদের আমলের গাড়িগুলো ছিল এদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তপোক্ত, সহজে এদের শরীর দেবে যেত না। বাড়িতে কখনো দাদা আমাকে নীলরঙা পুরনো দিনের একটি গাড়ির ছবি দেখাতেন। এর নাম ছিল ‘উইলিস আয়েরো’। বাবা জানান, সেটা খুব চটকদার একটা গাড়ি ছিল।

এবারে আমি খোলাসা করে বলব দাদা কেন কথা বলেন না। মায়ের কাছে শুনেছি যে, তিনি একসময় কথা বলতেন ঠিকই, কিন্তু একদিন দুম করে বলা বন্ধ করে দেন। আমি কখনো তাঁকে কথা বলতে শুনিনি, সেটা তাহলে নিশ্চয়ই আমার জন্মের আগের ঘটনা। তবে তিনি কিন্তু বোবা নন। তিনি গান করেন, স্রেফ কথা বলেন না। তাঁর গলায় স্বর রয়েছে ঠিকই।

কিছু কিছু গান এরই মধ্যে আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল – সেগুলো সবই পুরনো দিনের গান। মা জানান, এগুলো রাদিয়ো নাসিঅনালের গান। সেসব খুব জনপ্রিয় হয়েছিল, তাই সবারই জানা। আর রাদিয়ো নাসিঅনাল ছিল আমাদের বাড়ির পরপরই। আমার মনে হয় দাদা একজন গায়ক ছিলেন।

আমি দাদাকে একদিন রাদিও নাসিঅনাল যে-দালানটায় অবস্থিত ছিল তার ভেতরে নিয়ে যেতে বলি আমাকে, কিন্তু তিনি তা কিছুতেই করবেন না।

দাদা যে-কথা বলেন না, সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। তিনি আমাকে কীভাবে গোলে বল ঢোকাতে হয় সেটা শিখিয়েছেন, শিখিয়েছেন কাগজের পেস্নন বানাতে, যেগুলো সত্যি সত্যি উড়তে পারে, সেই-সঙ্গে এও শিখিয়েছেন যে, রাবারের জুতো পায়ে ছাড়া কখনো কোনো বৈদ্যুতিক সকেটে হাত না দিতে। কোনো কোনো দিন তিনি খেলতে চান না, সারাটা বিকেল পুরনো রেকর্ড শুনে কাটান। আমিও তাঁর সঙ্গে ঘরেই থাকি। তিনি গান করেন আর আমি রঙিন পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকি। পরে, সেগুলো তাঁকে দেখাই আমি। একমাত্র ওঁকেই দেখাই।

আমার জন্মদিনে, দাদা আমাকে আবেনিদা রিও ব্রাংকোতে অবস্থিত ম্যাকডোনাল্ডসে নিয়ে যান। আমার খুব খুশি লাগে। ক্রিসমাসের সপ্তাহে আমার জন্ম বলে, গাছগুলো তখন সব আলো ঝলমলে আর রাস্তা জুড়ে অনেক লোকের আনাগোনা। বছরের শেষ দিনটিতে আমরা রিও ব্রাংকোর একেবারে শেষ মাথায় অবস্থিত সিনেলান্দিয়ায় যাই, দালানের ছাদ থেকে তুষারপাতের মতোন শাদা কাগজের টুকরো পড়ার দৃশ্য দেখতে।

আমরা টিভি দেখতেও পছন্দ করি। ওই যে গেম শোগুলো, যেগুলোতে লোকেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। হ্যাঁ, সেগুলোই আমাদের ভালো লাগে বেশি। আমি একজন প্রতিযোগীর জন্য চেঁচাই, দাদা অপর একজনের জন্য। এই খেলাটাই খেলি আমরা। দাদার সমর্থিত প্রতিযোগীটি হেরে গেলে তিনি রেগে পাগল হয়ে যান।

সত্যি বলতে কি, আমি, বাবা-মায়ের চেয়েও বেশি সময় কাটাই দাদাজানের সঙ্গে। আর আমরা কখনো তর্ক করি না। জানি না সেটা তিনি কথা বলেন না বলেই কি না, তবে আমরা তর্ক করি না। আমার তাই মনে হয়, দাদা সত্যি দারুণ একজন মানুষ।

 

দুই

আমার এখন সতেরো এবং আমি দাদাকে ঘেন্না করি।

ছোটবেলায় লেখা আমার একটি রচনা পড়ে আমি বিশ^াস করতে পারি না, এতটা বোকা ছিলাম আমি। তখন আমি বিসেমেত্ম লিসিনিও কার্দোসো স্কুলের ছাত্র ছিলাম, যে-স্কুলটি এখনো বহাল তবিয়তে বর্তমান। মিস তানিয়া ছিলেন আমার শিক্ষক। তিনি আমার ভুলগুলো লাল রঙে দাগিয়ে দিতেন, বাক্যগুলোর বিন্যাস আগাগোড়া পালটে দিয়ে পুনর্লিখন করতেন। আমি যদি এভাবে লিখি তবে সাতের বদলে দশ পাবো। মিস তানিয়া একবার ক্লাসের সবাইকে তাদের দাদামশাইকে নিয়ে একটি রচনা লিখতে বললেন। যাদের দাদা ছিল না, তারা কোনো বুড়ো চাচা কিংবা দাদার মতো কাউকে বেছে নিতে পারবে।

আমার দাদা ছিলেন এবং আমি তাঁকে দারুণ কিছু ভাবতাম। আমি বুঝতে পারি না কেন, কেননা তিনি একটি চলন্ত বিব্রতকর ব্যাপার। তিনি গানে গানে কথা বলেন, তাঁকে কেউ তেমন পাত্তা দেয় না। লোকেরা তাঁকে নিয়ে জনসমক্ষে হাসি-তামাশা করে। আমার তাঁর সঙ্গে বাইরে বেরোতে লজ্জা করে।

আমার দাদাজানের ছিল যত অদ্ভুত সব অভ্যাস। তিনি মিউজিক ডাউনলোড না করে রেকর্ড বাজিয়ে শোনেন। তাও আবার পুরনো দিনের গান। সেসব গানের গায়কদের কান্নাভরা কণ্ঠ শুনে মনে হয় দুঃখের চোটে মারা যাবেন। আমার দাদাও তাঁদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে কাঁদেন, তিনি নিশ্চয়ই নিজেকে তখনো একজন গায়ক ভাবতেন, আর তাঁর ঘরখানাকে মনে করতেন রাদিও নাসিঅনাল।

স্কুল পালটানোর পর আমি তাঁকে সকালে আমার সঙ্গে আর না আসতে বলি। তিনি তারপরও দুয়েক সপ্তাহ সেটা চালিয়ে যান। আমরা গেটের কাছে পৌঁছানো মাত্র সবাই আমাকে টিটকারি মারতে শুরু করত, কারণ তখন তো আমার একা আসার মতো বয়স হয়ে গেছে। আরো বিচ্ছিরি ব্যাপার, আমার দাদা জানেন না কীভাবে রং মিলিয়ে কাপড় পরতে হয়। তিনি হাফ প্যান্টের সঙ্গে জুতা-মোজা পরেন। আর তাঁর শার্টকে সেই হাফ প্যান্টের মধ্যে গুঁজে দেন। হাস্যকর কা-।

ফলে তিনি এমিলিয়াকে নিয়ে যেতে শুরু করেন, সেই একই স্কুলে, যেটিতে আমি পড়তাম।

আমার দাদা এটা বুঝতে চান না যে, আমি আর বাচ্চা নই। দেয়ালে বল ছুড়ে মারতে আমার আর ইচ্ছে করে না, আর একথা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত যে, রাবারের জুতো না পরে সকেটে আঙুল দিলে এটা হবে, সেটা হবে।

আমি যখন বাইরে যাই তখন তিনি যেন আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেন। এক রাতে তিনি আমাকে কালেসা ক্যাবারেতে খুঁজতে আসেন। আমি এমনকি তার ভেতরেও যাচ্ছিলাম না, কেননা এর জন্য বয়স আঠারো হতে হয়। আমি ও আমার বন্ধুরা দরজার সামনে আড্ডা দেওয়ার ছলে কোন খ্যাপাগুলো সেখানে যায় সেটা পরখ করতে চাইছিলাম। আর তখনই দাদা এসে আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলেন। এই ব্যাপারটা ভুলতে দেবে না কেউই আমাকে। এখন পর্যন্ত তারা আমাকে দাদার ছানা বলে খ্যাপায়।

মাঝেমধ্যে তাঁর জন্য খুব খারাপ লাগে আমার, তখন ওঁর কোনো কাজ করে দিতে রাজি হই আমি। যেমন ধরুন, রিও ব্রাংকোর ম্যাকডোনাল্ডসে যাওয়া। তবে আমি স্বীকার করি এটা খুবই বিরক্তিকর। তিনি কিছু বলেন না, আমারও বলার নেই কিছু তাঁকে, দুজনের চুপচাপ বসে থাকা ও জুস পান আর বার্গার চিবিয়ে যাওয়া ছাড়া।

পেরিমেট্রালের ওপারে যদি বন্ধুদের সঙ্গে মাছ ধরতে চাই আমি, তাহলে সেটা গোপনে করতে হয়। কেননা দাদা সেটা জানতে পারলে বাবার কানে লাগাবেন আর তিনি আমাকে ডেকে এই বলে জ্ঞান দিতে থাকবেন যে, সেতুটা খুবই বিপজ্জনক, সেখান থেকে পড়ে যেতে পারি আমি, আর দূষিত পানির মাছ খাওয়া খুব খারাপ।

পাড়ার নাইটক্লাবগুলোও ঠিক যেমন পচা। খুব সাবধান, এই জায়গাগুলো বিপদের আখড়া, বাবা বলেন। তোমার দাদারা যখন তরুণ ছিলেন, তখন সেগুলো এমন ছিল না। সবই এখন রসাতলে গেছে।

বাবা জানান,  আমাদের এই পাড়ায় থাকার কারণ দাদাজানের চাকরি। তাঁকে রেডিও স্টেশন থেকে অনেক রাতে বেরুতে হতো বলে তাঁর জন্য কাছাকাছি কোথাও থাকাটাই ভালো ছিল। বেশ কয়েক বছর ভাড়া গোনার পর, একবার যখন বাড়ির দাম পড়ে গেল তখন তিনি ক্রেডিট ইউনিয়নের মাধ্যমে বাড়িটা কিনে নিয়েছিলেন। ত্রিশ বছর ধরে তাঁর কিসিত্ম দেওয়ার কথাটা বাবা এই প্রসঙ্গ উঠলেই আমাকে মনে করিয়ে দিতেন।

গায়ক আর শিল্পীতে ভরা এই পাড়াটা আসলেই খুব আলাদা ছিল। অরলান্দো সিলবা, ফ্রান্সিস্কো আলবেজ, মার্লেন, লিন্দা বাতিস্তা। আমরা তোমার বোনের নাম রাখি দাদাজানের খুব প্রিয় শিল্পী এমিলিনিয়ার নাম থেকেই।

আমি এই গায়কদের নাম জানতাম না। আমার বন্ধুদেরও কেউ না। আমি শুধু জানি তাঁরা কেউ আর এখানে থাকেন না। আমার মনে হয় দাদাই একমাত্র এখানে পড়ে রয়েছেন।

 

তিন

আমার বয়স পঁচিশ এবং দাদা বেঁচে নেই আর।

তিনি যে-ঘরে থাকতেন সেটি এখন আমার। আমি তাঁর রেকর্ডগুলো প্রাসা কিন্সের পুরনো জিনিসের বাজারে বিক্রি করে দিই, ঘরের আসবাব পালটে ফেলি এবং দেয়ালগুলোতে নতুন রং করি। আমি মেঝেটাও নতুন করে করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু টাকার টান পড়ে। শুধু আমার আঁকা ছবিগুলো রেখে দিয়েছিলাম। দাদা গান গাইবার সময় রঙিন পেন্সিলে আঁকা আমার সেই ছবিগুলো, যা তিনি নিজের কাছে রেখে দিতেন।

দাদার এই ব্যাপারটা ছিল একটা আবিষ্কারের মতোন। গেস্নাবো টিভিতে মিনি সিরিজ দালবা ও হ্যারিবেল্তো দেখার সময় আমি এরকম আরো কিছু জিনিস আবিষ্কার করি। আমার বাবার গল্প-করা শিল্পীদের মতো, দালবা দে অলিবেইরা ও হ্যারিবেল্তো মার্তিনসরাও ছিলেন রাদিও নাসিঅনালের সাফল্য গল্পের নায়ক।

মিনি সিরিজটা দেখতে গিয়েই আমি কয়েকটা গান চিনতে পারি যেগুলো আমার দাদাজান গাইতেন।

লেটস্ ওয়াক অ্যাওয়ে, যেটাকে আমি বলতাম ‘না, তোমাকে ভালোবাসার কথা আমি মনে করতে পারি না।’ আবে মারিয়া গানখানি, যেটি আমাকে সর্বদাই সাও বেমেত্মা আশ্রমের কথা মনে পড়াতো। গভীর জালে আটকেপড়া মাছের সেই গানটিও; এই ছবিটিকে বরাবরই আমার কাছে মজাদার মনে হতো। এবং পাকা চুল, যে-গানটি তিনি তাঁর নিজের পাকা চুলের দিকে ইঙ্গিত করে গাইতেন। তিনি যতবারই এটা গাইতেন ততবারই আমি হেসে উঠতাম।

এই মিনি সিরিজ আমাকে দাদাজান রাদিও নাসিঅনালে কাজ করার সময় কোন অনুষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেটা জানতে আগ্রহী করে তোলে। প্রথমবারের মতো, আমি এই স্টেশনটি যে-দালানে অবস্থিত ছিল তার ভেতরে যাই। এটি আমাদের বাড়ির ঠিক পেছনটাতেই ছিল। এখন অবশ্য পুরো দালানটাই প্রায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রপার্টি নামক একটি প্রতিষ্ঠানের দখলে। রেডিও স্টেশনটি আছে, তবে অল্প জায়গাজুড়ে। আমি অভ্যর্থনাকারীর কাছ থেকে জানতে পারি যে, এটি ১৯২৯ সালে একজন ফরাসি স্থপতির নকশা অনুযায়ী আর্ট ডেকো কায়দায় তৈরি, যাকে বর্তমানে একটি বিশিষ্ট স্থাপত্যস্মারকের মর্যাদা দেওয়া হয়। আমার দাদার বিষয়ে তিনি কিছুই জানাতে পারেননি।

ব্যাপারটা একটি ঘোরের মতো হয়ে দাঁড়ায় আমার কাছে। আমি প্রত্যেকদিন বিকাল চারটা নাগাদ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বন্দি করে রাখি নিজেকে, ১৯৪০-৫০ সালের প্রকাশনাগুলো পড়ার জন্য। আমি নানা বই, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন এমনকি রেবিস্তা দো রাদিওর বিভিন্ন সংখ্যাও তন্নতন্ন করে খুঁজি। কিন্তু কোথাও দাদার নাম খুঁজে পাই না।

আমার বাবা-মাও বেশি কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁরা শুধু বলতেন, হ্যাঁ, তিনি রাদিও নাসিঅনালে কাজ করতেন এবং সেজন্যেই আমরা ত্রাবেসা দো লিসোতে থাকি।

যে-অল্পকিছু ব্যক্তিগত কাগজপত্র তিনি রেখে যান, সেসবও কোনো কাজে আসে না। এলদোরাদোর একটি নাচের কার্ড। পুরনো আইডি কার্ড। পেনশনের রসিদ। কোথাও কোনো উলেস্নখ নেই রেডিও স্টেশনের।

আমাদের প্রতিবেশীদের প্রায় সবাই জানেন যে তিনি সেখানে কাজ করতেন, কিন্তু ঠিক কী কাজ করতেন সে-বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণা ছিল না। তোমার দাদাজান খুব চুপচাপ স্বভাবের ছিলেন, তাঁরা বলতেন, আর তারপর তো তিনি নিজের মধ্যে গুটিয়ে গেলেন, কথা বলাই বন্ধ করে দিলেন একেবারে।

বার্ষিক বোনাসের টাকাটা দিয়ে প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তে আমি ঘরের মেঝেতে পোরসেলিন বসানোর কাজটা শুরু করতে পারি। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের এক শনিবার বিকেল ছিল সেদিন। আমি টেবিল থেকে দুপুরের খাবারের অবশিষ্টাংশ সরাচ্ছিলাম, এমন সময় টাইল মিস্ত্রি, কাঠের মেঝে তুলতে তুলতে হঠাৎ আমাকে ডাকে। কাঠের পাটাতনের নিচে সে পস্নাস্টিকে মোড়ানো একটা কাগজ খুঁজে পেয়েছে। সেটা সে আমার হাতে তুলে দেয়।

শ্রমিক নম্বর : ৫৭৬

দোমিঙ্গোস সামত্মানা দা সিলবা

রান্নাঘরের কর্মচারী

এটা ছিল আমার দাদাজানের রাদিও নাসিঅনাল ব্যাজ।

আমি সেটা ফের পস্নাস্টিকের মোড়কে ভরি। শোবার ঘরে কাজ হচ্ছিল বলে সেটাকে আমি হলঘরের আলমারিতে রেখে দিই।

আমি বাইরে যাচ্ছি, টাইল মিস্ত্রিকে বলি আমি। এক্ষুনি আসছি আমি, এই বলে, আমি ম্যাকডোনাল্ডসের দিকে রওনা হই।

রুয়া দো আক্রে অতিক্রম করে আমি ম্যাকডোনাল্ডসে ঢুকি এবং একটা মিল্কশেকের ফরমাশ করি। খুচরো গুনে রাখি।

কোনার কাছে গিয়ে আমি ডানদিকে ঘুরি। রিয়ো ব্রাংকোকে তখন দীর্ঘ, হালকা রঙের একটা কার্পেট বলে মনে হচ্ছিল।

কাপখানি হাতে ধরে, দালানসমূহের ওপর থেকে ঝরা কাগজের কুঁচিগুলো, মাটিতে পড়ার আগে, আমার কাঁধ ছুঁয়ে যাওয়ার স্পর্শটুকু অনুভব করতে করতে আমি সিনেলান্দিয়ার দিকে হাঁটতে থাকি।

 

(লেখক-পরিচিতি :  ব্রাজিলের তরুণ প্রতিভাবান লেখক, সমালোচক ও সাংবাদিক মার্সেলো মউচিনিওর জন্ম রিও ডি জেনিরোতে
১৯৭২ সালে। মূলত ছোটগল্প লেখক মার্সেলোর উলেস্নখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে : Memories of Boats (২০০১), Tonight We are All the Same (২০০৬), The Absent Word (২০১১) ইত্যাদি। লেখালেখি ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি নানাবিধ সাহিত্য উৎসব ও অনুষ্ঠান অয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত মার্সেলো মউচিনিও।)

Leave a Reply

%d bloggers like this: