ঢাকায় প্রাচ্য ঘরানার চিত্রকলার এক বড় প্রদর্শনী

লেখক:

ইব্রাহিম ফাত্তাহ্

 

অনেক কাল আগে থেকে প্রাচ্যের দেশগুলোতে চিত্রকলার যে-ঐতিহ্য বহমান সেটি প্রাচ্যকলা নামে সুবিদিত। প্রাচ্যকলা হৃদয়বৃত্তিক ও কল্পনাপ্রবণ। চিত্রপটে শিল্পী প্রথমে বিষয়বস্ত্ত অংকন করেন, তারপর অংকিত স্থানটুকু জল দিয়ে ভিজিয়ে জলরং প্রয়োগ করে বাড়তি বর্ণ ধুয়ে প্রয়োজনে বারবার বর্ণপ্রয়োগ করে সম্পন্ন করেন।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, উনিশ শতকের শেষদিকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুপ্রেরণায় শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ই. বি. হ্যাভেলের নেতৃত্বে প্রাচ্যকলার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয় – অজন্তা-ইলোরা, মুঘল, পারস্য, চীন, জাপানের ঐতিহ্যকে সমন্বিত করে নব্যবেঙ্গল ধারার চিত্রকলার আবির্ভাবের মাধ্যমে। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে কলকাতায় ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচ্যকলাচর্চার সূত্রপাত ঘটে ১৯৫৫ সালে। ওই বছর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ঢাকার আর্ট ইনস্টিটিউটে প্রাচ্যকলা বিভাগ চালু করেন। সে-সময় থেকে এ পর্যন্ত অসংখ্য শিল্পী প্রাচ্যকলা বিভাগ থেকে বের হয়েছেন। আবদুস সাত্তার, শওকাতুজ্জামান, নাসরীন বেগম, রফিক আহমেদ, আবদুল আজিজ, মিজানুর রহমান, গুপু ত্রিবেদীসহ কেউ-কেউ এই ঘরানার অংকনে ধারাবাহিকভাবে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। প্রাচ্যকলাকে আরো বিকশিত করতে, আরো ছড়িয়ে দিতে শিল্পী মলয় বালা ও সতীর্থদের উদ্যোগে ২০১১ সালে গড়ে ওঠে ওরিয়েন্টাল পেইন্টিং স্টাডি গ্রম্নপ। গত ছয় বছরে তারা ছয়টি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।

সাধারণত প্রাচ্যকলার বিষয় ও উপস্থাপনা হয় আলংকারিক, ছান্দিক, সুললিত – শিল্পের কল্পনাবিলাসী  মনোভাব ও আদর্শ রূপময়তা নিয়ে। তবে সমকালীন প্রাচ্যশিল্পের কাজে কিছু পরিবর্তন আমাদের দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে এ-ঘরানার কতিপয় শিল্পীর কাজ এবং কয়েক বছর ধরে ওরিয়েন্টাল পেইন্টিং স্টাডি গ্রম্নপের ধারাবাহিক ওয়ার্কশপ আয়োজনসহ তাদের প্রদর্শনীতে। এবারো প্রাচ্যকলার জলরংবিদ্যায় শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য পাশের দেশ ভারতের দুজন শিল্পী সমীর রায় ও স্বপন রায়ের তত্ত্বাবধানে পাঁচদিনের একটি ওয়ার্কশপ পরিচালিত হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের ৭৮ জন শিল্পীর জলরং চিত্র নিয়ে সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত হয় ষষ্ঠ প্রাচ্যকলা প্রদর্শনী। বাংলাদেশের ৩৬ জন, ভারতের ১৪ জন বিশিষ্ট শিল্পীসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের ১৭ জন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলার ১১ জন শিক্ষার্থী এ-প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে ৮৪টি চিত্রকর্ম এ-প্রদর্শনীতে স্থান পায়। গত ৮ নভেম্বর প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ. আ. ম. স আরেফিন সিদ্দিক। বিশেষ অতিথি ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের, শিল্প-সমালোচক মঈনুদ্দীন খালেদ, শিল্প-সংগ্রাহক মিখাইল আই ইসলাম ও চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন।

রেনেসাঁসের পর পাশ্চাত্যের বাস্তববাদী শিল্প ও প্রাচ্যের কল্পনাবাদী শিল্প আলাদা হয়ে গেছে। প্রাচ্যে মায়া বা হৃদয়জাত অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। পাশ্চাত্য বাস্তব ও বিজ্ঞাননির্ভর। আবার উভয় ক্ষেত্রেই শিল্পীদের সৃজনে মায়াময় পরিধি রচনার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। যুগে-যুগে শিল্পীরা ভালোবেসে নিসর্গের নানা অনুষঙ্গে অতুল সুন্দরীর অবয়ব, তার প্রসাধন, ছন্দিত দেহবলস্নরী এঁকেছেন। এই আঁকায় আমাদের নারীরা মায়াবী-মায়াময়, পশ্চিমে ওরা যেন তীব্র, তীক্ষন, ধারালো। এই প্রাচ্যকলা প্রদর্শনীতে সেই মায়াবী সৌন্দর্যময়ীরা শিল্পীদের হাত ধরে চিত্রপট হয়ে গ্যালারিতে শোভাবর্ধন করেছেন। সুন্দরের বারতায় নিসর্গের অতুল সৌন্দর্য নিয়ে প্রেম, স্নেহ শুচিতা ধারণ করে এখানে আছেন শকুন্তলাসহ কল্যাণীয় নারী প্রতিমারা।

ষষ্ঠ প্রাচ্যকলা প্রদর্শনীতে ভারতীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ এ- আয়োজনের সৌন্দর্য ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। ভারতের অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেন – অনুরাধা গায়েন, অর্ঘ দীপ্তকর, দিলীপ ব্যানার্জি, গোপাল ঘোষ, হরেন দাস, ইন্দ্র দুগার, মণীন্দ্রভূষণ গুপ্ত, মানিকলাল ব্যানার্জি, মৃণালকান্তি দাস, মিন্টু নাইয়া, রিনা রায়, সমীর রায়, সুমিতা সেন ও স্বপন দাস। এ শিল্পীদলের কারো-কারো কাজে সেই বিশ শতকের প্রথম যুগের প্রাচ্যকলার ছাপ দেখা গেল। ভারতীয় সংস্কৃতি ও তাঁদের প্রাচ্যকলার অংকন-ঘরানা তাঁদের কাজে বিদ্যমান। উজ্জ্বল বর্ণাভার পরিবর্তে একধরনের অনুচ্চ আলোর আলিম্পন যেন এসব কাজকে বিশেষায়িত করেছে।

বাংলাদেশে জলরং ও প্রাচ্যকলার চর্চা করেন এমন শিল্পীদের মধ্যে এ-প্রদর্শনীতে চিত্রকর্ম দিয়েছেন – আবদুস সাত্তার, আফরোজা জামিল কংকা, অমিত নন্দী, আরিফ মাহমুদ অনিক, আজাদী পারভীন, বিকাশ আনন্দ সেতু, দিলরুবা লতিফ, দীপ্ত হক, এলহাম হক, ফাহমিদা খাতুন, জাঁ-নেসার ওসমান, কান্তিদেব অধিকারী, লক্ষ্মণ কুমার সূত্রধর, লুৎফুননাহার, মলয় বালা, মাতুরাম চৌধুরী, মহসিন কবির, মমতাজ পারভীন, নার্গিস পারভীন, নাসিমা খানম কুইনি, নাজমা আকতার, নাজনীন আকতার, রাবেয়া বেগম লিপি, রশীদ আমিন, রিয়াজুল ইসলাম সোহেল, রফিক আহমেদ, শওকাতুজ্জামান, শাহনাজ শাহিন, শংকর মজুমদার, সুমন কুমার বৈদ্য, সুশান্ত কুমার অধিকারী,  সুস্মিতা সাহা, সুমন সরকার, সুমিত কুমার, তাজুল ইসলাম, জাহিদ মুস্তাফা ও জাহাঙ্গীর আলম।

তাঁদের অনেকের কাজই প্রাচ্যধারার প্রতিনিধিত্ব করে। তবে সবাই জলরঙে আঁকেননি, যেমন – শিল্পী তাজুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার, আফরোজা কামিল কংকা, সুশান্ত অধিকারী, শংকর মজুমদার, নাজমা আকতার, মমতাজ পারভীন প্রমুখ। সাত্তারের আঁকা পদ্ম উডকাট ছাপচিত্র হলেও প্রাচ্যরীতির। কংকা কাজ করেছেন তেলরঙে। রশীদ আমিন জলরঙে নিসর্গের নানা বর্ণিল আবহ তুলে ধরেছেন। নাসিমা কুইনি জলরঙে বৃক্ষপাতাশোভিত মায়াবী পরিবেশ রচনা করেছেন। মলয় বালা আমাদের কিংবদন্তির শেকড়ের এক চরিত্র শকুন্তলাকে তুলে ধরেছেন।

প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী শিল্পীদের মধ্যে পুরস্কৃত হয়েছেন – নিপা রানী সরকার, রায়হান আহমেদ, সামিনা জামান, আবু হোসাইন ও হাসুরা আকতার। এতে শিক্ষার্থী-শিল্পীরা বেশ উৎসাহিত হয়েছেন।

আলোচিত এ-প্রদর্শনী শেষ হয়েছে গত ১৩ নভেম্বর। r