তখন আলো নিভিয়ে দেওয়া হবে

লেখক:

আফসার আমেদ

Tokhon Alo Nivea Daoa Hobeআলমের মৃত্যুর পর লালিকে বাপের বাড়িতে আনল তারা গত সন্ধ্যায়। শীত ফুরিয়ে এসেছিল, গাছে-গাছে পাতায় বাতাসের উচ্ছলতা। তারা বলতে লালির মা-বাবা ও তার নানা খাদিম বকস। নানার বয়স বেড়েছে, কিন্তু ডাঁটো মানুষ। বয়স এখনো তার শরীর ও মনকে আক্রামত্ম করেনি। কত আর বয়স, এই পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন। পাটের ব্যবসা আছে তার। নানি অযত্ন করে শরীরের জৌলুস সামান্য হলেও কমিয়েছে। নানা-নানি, ভাইবোন, ভাবি, খালা, ফুপু এরা নিজের পৃথক-পৃথক অবস্থানে থেকে লালির জন্য ভেবেছে, নানা কিছু ভাবছে। নিভে-যাওয়া লণ্ঠনের মতো অপ্রয়োজনীয় মনে করেনি। আসলে লালিকে কিছু ভাবতে হয়নি। উদ্যোগ নিতে হয়নি। তারা যেভাবে তাকে রাখতে চায়, সেভাবে থাকে সে। এমন থাকা যেন তার উদ্ধার। এমন বিছানায় বসে নুয়ে পড়ে থাকা যেন তার কর্তব্য। কারো সঙ্গে সে কথোপকথনে যাবে না।

বাড়ি জুড়ে লোকজনে ভরতি হয়ে আছে। একটা সরবতার উৎসব যেন। সবাই যেন লালিকে সরবতার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে চায়। বছর তিন পূর্ণ হয়নি, তাদের বিয়ে হয়েছে। বাইশ দিন হলো আলম মারা গেছে পথ-দুর্ঘটনায়। মৃত্যু এসেছিল, মৃত্যু চলে গেছে। ব্যস। আর কী থাকতে পারে! কেউ-কেউ এই কদিন কেঁদে-কেঁদে সময় ফুরিয়েছে। সে একরকম থাকা। থেকে ছিল সে। কীভাবে থাকল? কান্নার আবহে থাকতে-থাকতে, সেও কেন যে ছোঁয়াচে রোগের মতো আক্রামত্ম হয়েছিল! সারা শরীরটাই কান্না হয়ে গিয়েছিল। ভাসুর-দেওরও,  ননদ-শ্বশুর-শাশুড়িও। লালির কেঁদে-যাওয়া একমাত্র অবলম্বন হয়েছিল। বাপের বাড়িতে এসে সেই কান্না অতটা নেই। ফুরিয়ে যেতে-যেতে, ফুরিয়ে এসেছে।

কিন্তু শোকপাথর নীরবতা বা নিঃশব্দে থাকা সে এখন তারই আশ্রয়ে যে। কেউ এসে খাওয়ায়। কেউ এসে চুল আঁচড়ে দিয়ে যায়। চুলের জট ছাড়ায়। চুলে তেল দিয়ে যায়। কেউ তাকে শাড়ি বদলে দিয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশী এসে করায়। নিজেকে যত্ন দেওয়ার উপরোধ-অনুরোধ করতে হয় না। কেউ না থাকলে মা ও ভাবি এসব সারে। সবার আগে ভাত তাকে খেতে দেওয়া হয়। গোসল করানো হয়। সে যে অন্য কারো সঙ্গে এই শোকের কথা বাদ দিয়ে অন্য কথায়, অন্য কথোপকথনে যাবে, সে-আচরণে কেউই এগিয়ে আসে না। শোক তো অনেক পালন করেছে, যা হওয়ার তা তো হয়েছে। এখন তার সুস্থির হওয়া সে চাইছে। কেউই কিন্তু এই মৃত্যু-আবহকে সরিয়ে দিয়ে নতুন কথায় আসছে না। কখন মারা গেল? কীভাবে। কোন হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। মরার সময় কেউ কি মুখে জল দিতে পেরেছিল? দর্শনার্থীকে এখন সেই কথার উত্তর দেয় মা, নানি আর ভাবি। লালি সেই সময় গুনগুনিয়ে কাঁদে। দর্শনার্থীরা হা-হুতাশ ফেলে। বারবার এরকম দৃশ্যে যেতে হয় তাকে। যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না তার। তেমন ঘিরে থাকে যখন, তখন আর কান্নার কিছু থাকে না, এক নৈঃশব্দ্য বেশ কিছুক্ষণ থাকবে বুঝতে পেরে লালি বসে-বসে খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়। দর্শনার্থীরা সেইমতো নীরবতা দিয়ে লালির নীরবতাকে দীর্ঘ করে তোলে। বাইরে তখন কোনো বালক চেঁচাচ্ছে পস্নুতস্বরে ‘মা… মা…? কাছে-ভিতে কেউ গরম্নর সঙ্গে কথা বলছে। দূরের কোনো দুধেল গাই ‘হাম্বা’ করে ডেকে ওঠে মনিবের উদ্দেশে। ভেবে দেখে লালি, তারা নিশ্চুপ হলে বাইরের কর্মচাঞ্চল্যময় শব্দ পাওয়া যাবে। সেসব শব্দে থাকা কি কম ভালো? লালি ঘুমিয়ে নেবে কি।’ আপনা-আপনি চোখের পাতা নেমে এসেছে তার। তার চারপাশে ভিড় করে আছে যেরকম মেয়েরা, তারাও চুপ করে যায়। নীরবতার মধ্যে এমন আরাম আর বাঙ্ময়তা থাকে। সময়মতো সুযোগ সে চায়, পেয়েও যায়। ঘুমের ভান করে চোখ বুজে ছিল লালি। কাছে সবাই নিশ্চুপ, দূরের শব্দও মুছে গেল। যেন এসব ঘটনায় যাবার সে কেউ নয়। সে যেন সেই লালি, তার স্বামী আনারম্নল পথ-দুর্ঘটনায় মারা যায়নি। সে কোথায় একটা ঘরে ঘুমিয়ে আছে। শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়লে মনের ওপর কোনো জাঁক থাকে না। বেশ আরাম।

আগের রাতে একটু-আধটু পা ব্যথা করছিল। তার মানে কি পিরিয়ডের সময় এগিয়ে এলো? ঘুমের মধ্যে পা ও কোমরে ব্যথা-বোধ। ঘুম ভাঙতে শুরম্ন করল। এ এক বিড়ম্বনা। দর্শনার্থীরা নিজেদের মধ্যে কথা আরম্ভ করে দিয়েছে। এখনো কেন আছো। সব মেয়েই। কাউকেই বলা যাচ্ছে না, এবার চলে যাও। মা ও ভাবি বিরক্ত হয়ে পড়েছে। লালি নিজের ঘুম নিজে ভাঙাল আর তৎক্ষণাৎ তার পিরিয়ড হয়ে গেল। খরখর করে কেঁপে ওঠে, ‘মা, মাগো’। চিৎকার করে উঠল নিদ্রা ও জাগরণের মাঝখান থেকে।

ভাবি কাছে পৌঁছল সঙ্গে-সঙ্গে। ‘কি হয়েছে ছোট বুবু।’

‘আমি আমি আমি ভালোতে নেই?’

‘কী হয়েছে?’

‘কিছু নয়, কিছু একটা হয়েছে।’

‘বাথরুমে যাবে?’

মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।

সমব্যথী দর্শনার্থীরা বুঝল, তারা সরে গেল, কেউ চলেও গেল।

মা রান্নাঘরে ফিরে গেল।

ভাবি এসে লালিকে জড়িয়ে ধরে তুলে ধরল, ভিড়ের উদ্দেশ্যে বলল, ‘এখন তোমরা যাও, বিকেলে এসো।’

মুহূর্তের মধ্যে ভিড়টা ফাঁকা হলো।

তখন লালি ও ভাবি ফিরোজা কাছাকাছি। ধরে-ধরে তাকে বাথরম্নমে নিয়ে যাচ্ছে। পিরিয়ড আজকেই হতে হবে এই দুর্ভাগ্য মেয়েটার। দু-চারদিন পরে না হয় হতো। স্বামী হারানোয় বেদনা নিয়েছে যে, তাকেই আর-এক বিড়ম্বনা-বেদনা আলস্না না দিলেই পারত। দুর্ভাগ্য যার, তার বেদনা কতভাবেই না আসে। চার-পাঁচদিন তো কষ্টেই থাকবে। অস্বস্তিকর ঝামেলা।

বাথরম্নমে গিয়ে ফিরোজা লালিকে ধোয়ায়-মোছায় প্যাড পরায় আর শাড়ি-বস্নাউজ পরিয়ে দেয়। এই সমসত্ম কাজে ফিরোজা ভাবির উদ্যোগের সময় জুড়ে লালির

গুনগুনিয়ে কান্না জুড়ে থাকে। সে-কান্না সত্যিকারের। এই শরীরের দখলদার যে ছিল, সে তো নেই, তাহলে এরকমটা হয় কেন? তার মতো করে শোক নিয়েছে। এটা তারই। যারা আসছে, তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি রকম সমবেদনা জানাচ্ছে। তিতিবিরক্ত হয়ে পড়ছে। তাকে একটা ঘরে যদি চাবি-তালা দিয়ে রাখত, তাহলে ভালো হতো। যে আসছে, সে-ই এসে কাঁদবে, তাতে তাকেও কাঁদতে হবে। আর ঘরের মেঝে নোংরা হবে বলে বারান্দায় তক্তপোশের বিছানায় তাকে বসতে দেওয়া হয়। এখন ভাবি তাকে স্নান করিয়ে দিয়েছে। তার পর খাওয়াবে। এখন আরাম পায় লালি বড়ভাবির পরিচর্চায়। সারা শরীরে সাবান-মাখানো। চুল ভিজিয়ে স্নান করানো। তোয়ালে ঘষে-ঘষে চুলের ভিজে ভাব কমাল। ‘ফিরোজা ভাবি গো’ পরিচর্যার আরামে মনে-মনে এই কথাটা আওড়াল। এবার তাকে খাওয়াবে। রোজই তো তাকে কেউ না কেউ খাইয়ে দেয়। মায়ের খাওয়ানোটা পছন্দ করছে লালি। ‘মা গো’ – আর্তস্বরে বলে উঠল তাই। মা ভাত বেড়ে এসেছিল এই ঘরের ভেতরে।

‘কি রে, আমি খাইয়ে দেব?’

‘হ্যাঁ।’ কথাটা বলল লালি।

মা বুঝে নিয়েছে। আদুরে মেয়েটি তার হাতের খাওয়া বেশি পছন্দ করছে।

লালি বলল, ‘আমি খেয়েই ঘুমুতে যাব মা। সবাইকে বলে দেবে মা’;

‘সকলকে কি আসতে বারণ করা যায় নাকি। একটু মুখ বাড়িয়ে দেখে যাবে।’

একগ্রাস মুখে ভাত নিয়ে বলল লালি, ‘আমার যা হবার তা হয়ে গেছে। আমাকে একা থাকতে দাও। আমাকে আমার ভালো বুঝতে হবে। তোমরা আমাকে নানা জালে জড়াচ্ছ। আমাকে দত্তক পর্যমত্ম নেওয়ালে? কেন?’

‘তুই একা থাকবি না বলেই তো -’

‘আমি কোথায় থাকব সেটা আমিই ঠিক করব। তোমাদের এসব কথা না ভাবলেই চলবে।’

‘তাই করবি। আমি তোর ভাবনাই তোকে করতে দেব।’

মায়ের খাওয়ানো হয়ে গেল। অনেকক্ষণ খাওয়ানো হলো; কথোপকথন বন্ধ ছিল। মা ভাবল, আজকালকার মেয়েরা কীসে তার ভালোমন্দ সেসব বেশি করে ভাবে। তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ভদ্র ও ভালো কুটুম। ছেলের মৃত্যুর সাত দিন পর একা হয়ে-যাওয়া পুত্রবধূ লালির জন্য দূরের গাঁ থেকে একজন শিশুপুত্র দত্তক নিয়ে এসেছিল। গতকাল সন্ধ্যার সময় রওনা দেওয়া হয়েছিল বলে সে আসতে পারেনি। মা-হারা শিশু। ওকে প্রসব করেই মা মারা যায়। শিশুটির নাম তাজ। তাকে আজ এখানে এনে দিয়ে যাবে লালির দেওর। শিশুটি লালির কাছে নির্যাতন ছাড়া কিছু নয়। প্রথম-প্রথম শিশুকে কোলে নিয়ে শামিত্ম পেয়েছিল। এখন তাজকে সে আর চায় না। শ্বশুরবাড়ি, তাজ, এসব সংস্রব ত্যাগ করতে চায় লালি। নগ্নতার মতো একা থাকতে চায়। মেয়েরা কেন সবকিছুতে জড়ায়? তার স্বাধীনতা নেই? মা হয়তো মেয়ের মনের কথাটা বোঝে। সে কিছুতেই চায় না ওই শিশুটিকে। বেশ কিছু সময় ঘুমিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা সে চায়। নিজের মতো করে ভাবনা ভাবতে সে চায়। দত্তক নেওয়ার মতো উদ্ভাবন কে ঘটাল তার জন্য? বিয়ের তিন বছরের মধ্যে গর্ভাধান হয়নি, তাতে কি প্রমাণ হয় সে বন্ধ্যা? কার তরফ থেকে সেই বাধা ছিল, তা তো পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। তার তো স্বপ্ন ছিল, একটা দোলনায় এমন এক শিশু শুয়ে আছে। ঠেলা দিয়ে দোলনাকে জ্যামত্ম রাখছে।

সে তো নিজের সমত্মানের জন্য। দত্তক-নেওয়া সমত্মানের জন্য নয়। কে বলে দেবে সে বাঁজা? এখনই শেষ করে দেওয়া তার জীবদ্দশা? তার তো মোটে ছাবিবশ বছর বয়স। অনেকে তো আছে, অনেকে তার বয়েসে আত্মীয় প্রতিবেশী আছে, যাদের বিয়েই হয়নি। তাহলে তার জীবন এখনই রম্নখে দেওয়া কেন? সে স্বীকার করে, এই সময় তার অসহায়-দুর্দিনে একটা এই রকম শিশু থাকুক, কিছু থাকার মতো। একটু দোলাবে, একটু কোলে নেবে। কোলে নিয়ে চোখে কাজল পরাবে। হাঁটতে দেবে কোমরে ঘুঙুর বেঁধে দিয়ে। টলোমলো পায়ে উঠোনে ঘুরে বেড়াবে। এ শিশু নয়, অন্য একটা এই রকম শিশু। যখন তার বুকে দুধ থাকবে। কোলে নিয়ে দুধ খাওয়াবে। দুধ খেতে-খেতে ঘুমিয়ে পড়বে। সকলে তাকে কোলে নেওয়ার আবেগ জানাবে। ইচ্ছে করে মুঘ ভাঙাবে। তার কোলে পেছাপ করে ফেলবে। তাকে শিশুসোহাগী নারীটি কোনো ব্যাপারে হা-পিত্যেশ করবে। এমন রকম একটা শিশু তার শ্বশুরবাড়িতে আছে নাকি, যে-শিশুটি একটু পরে আসবে? সেই শিশুটিকে লালি ভালোবাসে নাকি? কিছু ভালোবাসা আছে তো, কিন্তু নিজের মতো নয়।

সে-ভালোবাসার মধ্যে সত্যিকারের কোনো আবেগ আছে। অন্যের শিশুকে ভালোবাসার মতো। দোলনায় ঘুমিয়ে আছে, বিছানায় ঘুমিয়ে আছে, কেউ পাড়া বেড়াতে নিয়ে গেছে। আর মিথ্যে মায়ের উচাটন মন হঠাৎ করে চমকে ওঠে, ‘পাড়া বেড়াতে-বেড়াতে খোকা ঘুমিয়ে যায়নি তো, অথবা অন্য কাউকে কোলে তুলে দিয়ে পরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে ভুলে যায়নি তো? মা সবসময় শিশুর অমঙ্গল দেখতে পায়। দত্তক শিশু হলেও। এটা কি সেই বন্ধন নয়, যার ভেতর লালি নিজের কামনা-বাসনা উজ্জীবন হারিয়ে ফেলবে।’

এখন সে বিছানায় শুয়ে ভাবতে-ভাবতে ঘুমোচ্ছিল। ঘোর অন্ধকার-সন্ধ্যায় জোনাকিদের মতো মনের ভাবনাগুলো তাকে বাধা দিচ্ছিল। মন স্থিরচৈতন্যে থাকছিল না। সবসময় মনে নানা ভাঙচুর ঘটছিল। তার জন্য কেউ সদর্থক কিছু ভাবছে না। সে তো ভাবতে পারে নিজের ভালো কিছু? তাতেও তার নিশ্চেষ্ট দশা। তার জন্য কোনো উদ্ধার নেইও। মাথার মধ্যে এত গোলমাল? নিজের বিষয়ে নিজেই ক্লামত্ম হয়ে পড়ছিল। একটা দোলনা আর একটি শিশু ঘুরেফিরে আসে তার মনের মধ্যে। সে আবর্জনার মতো গুরম্নত্বহীন হয়ে উঠছে?

এখন সে নিজের কথা ভাবে। তার মধ্যে যদিও এসে পড়ে শিশুটি ও দোলনা। ঘুমের মধ্যে আত্মতুষ্টি খুঁজছিল সে। তার ঋতুস্রাবের যে নিজস্ব শারীরিক বাসনার অনুভূতি তাকে খুঁজে দেয় আর একটা কিছু, যা তাকে আমোদিত রাখছে।

ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠে বিছানায় বসল লালি।

মা ঘরে এসে নিঃশব্দে দেখছিল মেয়েকে, প্রশ্ন করল, ‘কী হচ্ছে মা তোর?’

‘কিছু নয়।’

‘তবে উঠে বসলি?’

‘কিছু ভালো লাগছে না?’

‘ভালো লাগাতে হবে মা! এই যে ঘুমোচ্ছিলি’ –

‘ঘুমোইনি, একটুও ঘুমোইনি। জানা কথা মনের মধ্যে গজগজ করছে। মা, তোমরা আর আমার ভালো কিছু ভেবো না। আমি সেজন্য কষ্ট পাচ্ছি বেশি। তোমাদের ওসব কথা ফিরিয়ে নাও। তাদের কথা, শ্বশুরবাড়িতে সম্পত্তির ভাগ নিয়ে থাকা, এসব নিয়ে আর ভেবো না।’

‘ঠিক আছে ভাববো না। তুই আমার মেয়ে হয়ে থাক। তুই যদি তাতে ভালো থাকিস, থাকবি।’ ‘আহ্-উহ্’ শব্দ করে লালি ঋতুস্রাবের জন্য। এটা কোনো মনের কষ্ট নয়, সে একরকম শারীরিক কষ্ট। তাতে তার বিরম্নদ্ধ কিছু নয়। তাতে শরীর যে ঠিকঠাক আছে, সেই সত্যিকে সায় দেয়। শরীরের মধ্যে এক ভালোলাগাও তৈরি হয়। শরীরের মধ্যে যৌনতা স্বতই আমোদিত হয়। শরীরের এই রসায়ন এত বড়ো-বড়ো সব বাধাকে ঠেলেঠুলে শরীরের অনুকূলতা চায়। সেখানে লালি যেন স্বার্থপর ব্যক্তি, যার শরীরের চাওয়াই নিতে যাচ্ছে, মনকে দূরে রেখে। শরীর এতই স্বার্থকামী। মন হেরে যাচ্ছে। মনকে বাধা দিতে পারে না।

মা বলল, ‘উঠে পড়লি যে।’

লালি বলল, ‘উঠে পড়লাম।’

‘কেন?’

লালি মৃদুস্বরে বলল, ‘বাথরুম যাব।’

‘চল, আমি দিয়ে আসছি।’

‘না, ভাবিকে ডাকো।’

বড়ভাবি এসে তাকে বিছানা থেকে নামাল। নিয়ে গেল বাথরুমে। তার গা ধরে, মিশিয়ে পরিচর্যার ভঙ্গিতে নিয়ে গেল। বড়ভাবি নূরজাহান তারই বয়সী। যেন তারা বন্ধু। বাপের বাড়ি এলে নূরজাহান লালির সঙ্গে মেতে ওঠে। তেমনি করে জড়িয়ে ধরে বাথরুমের দরজার কাছে এসে। এটা খুনসুটির মতো। এক রকম গায়ে গা দিয়ে থাকা। নূরজাহান গায়ের সঙ্গে গা মিশিয়ে দিয়ে একরকম ভালোবাসা জানাল। বাথরুমে ঢুকে লালি দরজা বন্ধ করে লুকিয়ে একটু ভালোবাসা নিল। ভাবল এই ধরনের স্বাধীনতা তার চাই। দত্তক শিশুতে সে-স্বাধীনতা নেই। শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তির অধিকারে তা নেই। তার ভালোলাগার দিকটাই মূল। তাজকে নিয়ে তার থাকা হবে এক দাসত্ব। মন তাতে সায় দেয় না। নূরজাহান-ভাবির মধ্যে যা পায়, তেমনভাবে এখন থাকতে চায়। শরীর আর মন যে আরাম নিয়ে শামত্ম-স্নিগ্ধ হতে পারে। হ্যাঁ, ঠিকই তো, নূরজাহান-ভাবির সঙ্গে এক বিছানায় শুয়েছে। নিজেরা জড়িয়ে-মড়িয়ে শুয়েছে। তাদের ভালো লেগেছে। দুটি মেয়েমানুষ পাশে থাকলে এমনটা হয়ই। তবে সবাই নয়। এসব সখ্য নিজেরাই জানে; বোঝে। কারো কাছে প্রকাশ করে না, এই যা?

ফিরে এসেছে লালি বাথরুম থেকে বারান্দার বিছানায়। ভাবি তাকে ফিরিয়ে দিয়ে যায়। আর ফিরে এসে ভাবিকে লালি একটা হাসি দেয়। এই হাসিটা দুর্লভ। কতদিন এ-হাসিটা হাসেনি। কারণ সদ্য সে বিধবা হয়েছে। তার এখন শোকে থাকার সময়। বিকেল হতে দু-তিনজন উঁকি মেরে দেখে গেল তাকে। মুচকি হাসিটা দেখতে পায়নি তারা।

কোন গাড়ির সঙ্গে কোন গাড়ির অ্যাকসিডেন্ট হয়, এই বিবরণ পুনর্বার বলার জন্য বাধ্য নয় সে। কোনো কথা আর বলবে না। তার দত্তক-নেওয়া ছেলে কখন আসছে, এ-কথাও। না বলতে পারে তার খিদে আছে কিনা। তাকে দেখবার জন্য কোনো যুবক এলে তাকে কতটা আনন্দ দিচ্ছে, তাকে বলতে পারে সে। বলবে না। বাধ্য নয়। মিথ্যের প্রদর্শনী তার এটা। সেখানে নেই, কিছুতে নেই। তার ক্ষুধা-তৃষ্ণা, প্রেম-অপ্রেম, সুখ-অসুখ সবকিছুতেই সে সাড়া দেয়। সেরকম কোনো যন্ত্র থাকলে সে ধরা পড়ে যেত। অমত্মর্যামী বোধহয় সব দেখে, সব বোঝে। আলস্নাহর ওপর তার অগাধ বিশ্বাস, সবকিছু তিনি জেনে তার দোষটুকু ক্ষমা করে দেবেন। আজ পিরিয়ড হওয়ার জন্য সে এতই অস্বস্তিতে পড়েছিল যে, অব্যবহিত নিকটসময়ে তার এক ভালো একটা অনুভূতি শরীর আর মনে উশখুশিয়ে উঠছিল। সঠিক সময়ে তার সমাদর করতে পারেনি। ঘুম থেকে উঠে নূরজহাজান-ভাবির ছোঁয়া পেয়ে তাকে যত্ন করে উপভোগ করতে পারছে। যেন ব্যান্ডপার্টি ব্যান্ড বাজাচ্ছে। মনে-মনে নেচে উঠছে। মনে পড়ছে স্কুলে-কলেজে পড়া সহপাঠীদের। সুনীতি, রাত্রি, রফিক, পথিক, বনলতা, সুবীরদের কথা মনে পড়ে যায়। সবাই তারা বিয়ে করে না এখনো। তাদের মধ্যে অনেকেই আনন্দ-কাতরতা জানে না, জানে না স্বামী-সংসার, শ্বশুর-শাশুড়ি ও তাদের আত্মীয়-স্বজন। সে সবকিছু মেনে নিয়ে নিজের করে নিলে তার যে এই পিরিয়ডের যন্ত্রণা আর আনন্দ জেগে উঠত। এর আনন্দ অন্যরকম। তাকে নারী হতে হয়ই। পুতুলের সংসার তারা করেছে শৈশবে, সেই চর্চারই এই বাসত্মব রূপ সংসার।

লালির ছোটভাই রাজু এসে তাজকে তার কোলে বসিয়ে দেয়। তখন লালি চোখ বুজে ছিল। তখনো চোখ খোলেনি। লালি ভাবল, সে চোখ না খুলে রাখতে নাই-বা পারল। চোখ খুললে তাজ ছাড়া অন্য কেউ হতে যাবে না। সেই শিশু, সেই শিশুই। সবাই জেনে নিয়েছে, এই শিশু তার কোলে বড়ো হবে। রাজু, তার দেওর, হায়ার সেকেন্ডারি পড়ছে। সে তাজকে একটু নিচু হয়ে কোলে দিয়েছিল। আর তার গায়ের গন্ধটা পেয়েছিল।

আয়েশার মা, গিন্নি, চাচি এসে দেখছিল লালিকে। বলল, ‘এই তোমার ছেলে।’

‘হ্যাঁ, তবে নিজের নয়।’

‘এখন তোমারই।’

‘তা হতে যাবে কেন, এখন তোমারই।’

লালি তর্কবিতর্ক করতে বাধা পেল। আর পেল আনন্দ-কাতরতা।

চোখ বুজিয়ে নিয়ে সেই আনন্দ-কাতরতাকে একটু খুঁজেই খুঁজে পেল। দেওরের সেই গায়ের গন্ধ আর নেই – মনে-মনে ডাকল, ‘রাজুভাই রাজুভাই।’ কোনো সাড়া পেল না। অমন লাজুক ছেলেটি। আর-একটু ভাত নেবে কিনা বললে ‘না না’ করে, ঢেলে দিলে আপত্তি করবে না। ঠিক খেয়ে নেবে। সন্ধ্যা নামার আগে কি রাজু ফিরে গেল পাইকপাড়ি তার শ্বশুরবাড়িতে। শ্বশুর আর ভাসুর সন্ধ্যার আগে ফিরে এসেছে ঘরে। দেখতে-আসা গুটিগুটি বেশ কয়েকজন এসে জমা হয়েছে। হ্যারিকেন জ্বালানো হয়েছে। তখনো তাজ লালির কোলে। সবাই মাগরিবের নামাজের জন্য তৈরি হচ্ছে। আজান এখনই শুরম্ন হবে। বলতে-বলতে শুরম্ন হয়ে গেল।

ছ-মাসের শিশুটি তার কোলের ভেতর ঘুমোচ্ছে। কোলে তুলে নিয়ে দেখল, বেশ ভারী। একে তার কোলে-পিঠে নিয়ে লালন করতে হবে।

মুড়ি আর গরম পেঁয়াজি দিয়ে গেল লালিকে লালির মা। নামাজ তাদের পড়া হয়ে গেছে। ভাবি একটু সময় নিয়ে পড়ে, ভাসুর ও শ্বশুরের বেশ দেরি হয়। মসজিদে কিনা।

লালির চারপাশে প্রতিবেশীদের কয়েকটা বাচ্চা জড়ো হয়েছে। কারো ফ্রক ছেঁড়া, কারো শার্টের বোতাম নেই। পায়ে জুতো নেই। এদের মধ্যে অনেকেই লালির বন্ধু। বাপের বাড়ি এলে এদের জন্য মিষ্টি এনে খাওয়ায়। এদেরকে পয়সা দিলে পাড়ার দোকান থেকে কিছু ছোটদের খাবার এনে দেয় লালিকে। লালি সকলকে দিয়ে খায়। সে এখন তাদের সঙ্গে কথা বলে না। বাচ্চারাও কথা না বলে থাকে। কেননা, লালিবুবু এখন কষ্টে আছে, দুঃখে আছে। সকাল-সন্ধে তাকে দেখে যাওয়া আছে। জামাইবাবু আকাশে তারা হয়ে গেছে। ওরা কিছুটা সময় দেখে তারপর ফিরে যায়।

তাজ এখন ঘুমোচ্ছে। তাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে শোয়ানো দরকার। পা আর কোমরের যন্ত্রণায় ছটফট করছে সে। কেউ এসে নিয়ে যাক, চাই না, চাই না একে। এসব ঝামেলা সে চায়নি। হ্যারিকেনের আলোর আভায় সে আয়ত হয়ে উঠছিল। মুখে যন্ত্রণার ছাপ এঁটে এসেছে। হয়তো চা খেতে চায়, নয়তো জল খাবে সে। তার এই ঝঞ্ঝাট ভালো লাগে না। তার কী হয়েছে? তার তো কিছু হয়নি। সে ভালোই আছে। পায়ে-কোমরে যন্ত্রণা এখন তার। এতটা বিপদাপন্ন হয়েও তার সজ্জায় সে যথাস্থিত।

বড়ভাবি রান্নাঘর থেকে লালির সংকটাপন্ন মুখ দেখে ফিরে এলো বারান্দায়। কিছু না বলে তাজকে নিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেল। শোয়াতে।

ঘর থেকে নূরজাহান বলল, ‘তাজকে রাতে খাওয়াতে হবে।’ লালি বলল, ‘হ্যাঁ’। তারপর বলল, ‘কে খাওয়াবে জানি না।’

‘সে না হলে আমরা কেউ করে দেবো, কিন্তু শোবে কার কাছে?

‘মায়ের বিছানায়?’

‘তুমি আমি এক বিছানায় শোব।’

‘তোর ভাসুর কি মেনে নেবে?

‘থাকো না ভাবি।’

‘না।’

‘আমার শোকের কথা না ভেবেই।’ –

গলাটা নামিয়ে বড়ভাবি বলল, ‘তোর শোক, ছিঃ ছিঃ।’

‘বড়ভাবি, তোমার কাছে আমার কয়েকটা চুমো কর্জ আছে।’

‘মরে যাই, মরে যাই, মরে যাই – দূর হ ছুঁড়ি। আমি তোর কথা জানি।’

‘জানো তো বলো।’

‘বলব না।’

‘তোমাকে আলস্নাহর কসম, বলো।’

‘এখন ধৈর্য ধরে চুপ করে থাকো।’

‘তারপর?’

‘তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‘এখন আজ রাতে আমার সঙ্গে শোবে তো? আশ্বাস দাও।’

‘হ্যাঁ, ঠিক আছে।’ ভাবি হেসে ওঠে।

উঠোনে হ্যারিকেনের আলো জ্বলছে, লালি বড়ভাবিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলে কেউ না কেউ দেখে ফেললে চলবে না। ‘আমার তো এখনই ইচ্ছে করছে। রাতেই ঠিক। তখন আলো নিভিয়ে দেওয়া হবে।’