তারা ঝিলমিল

লেখক: অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়

আট বছরের ঈশান স্কুলে পড়াশোনায় মন বসাতে পারে না; কিন্তু আঁকা, খেলা এসবে তার আগ্রহ বেশি। বাবা ও মা দুজনেই তার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তাগ্রস্ত। প্রতিযোগিতার দুনিয়ায় লেখাপড়া না করলে সব ব্যাপারে পিছিয়ে পড়বে। ক্লাসে পড়া পড়তে বা লিখতে পারে না। স্কুলের পরীক্ষায় তাই পাশ করতেও পারে না। অক্ষরগুলো সে চেনে; কিন্তু পড়তে বা লিখতে গেলে সব উলটোপালটা হয়ে যায়, অর্থপূর্ণ শব্দ তৈরি হয় না। অক্ষরগুলো মনে হয় যেন আকাশে ঝিলমিল করা তারাদের মতো ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে, ধরতে গেলেই যেটা চায় সেটাকে পায় না। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে বারবার উপহাসের পাত্র হয়ে ঈশান আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, কারো সঙ্গে মেশে না। হতাশাগ্রস্ত বাবা ঈশানকে দূরে এক বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে দেয়। সেখানেও সে ভীতি ও অবসাদে ভুগতে থাকে এবং একদিন আত্মহত্যার চেষ্টাও করে। এমন সময়ে রামশঙ্কর নিকুম্ভ নামে এক আঁকার টিচার স্কুলে আসে। সে ঈশানকে দেখে তার সমস্যা বুঝতে পারে এবং ঈশানের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাকে তার ভালোলাগা কাজগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে সে-বিষয়ে উপযুক্ত করে তোলে। ঈশানের অন্য স্বাভাবিক বিকাশকে তুলে ধরে তার নিবন্ত আত্মবিশ্বাসকে জাগিয়ে তোলে। সঠিক অক্ষর বাছতে না পারা বা পড়তে না পারা একধরনের মানসিক সমস্যা, যাকে বলে ডিসলেক্সিয়া। ভারতে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এ-ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ছবি তারে জমিন পর প্রথম এবং আমির খানের পরিচালনায় ও অভিনয়গুণে সমস্যাটাকে খুব সুন্দর তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটা ভালো এবং সমাজে একটা বার্তা দেয়, বিশেষ করে শিক্ষকদের।

এক ‘চলমান ছবি’ তৈরির তীব্র বাসনা জন্ম দিলো ভারতে প্রথম চলচ্চিত্র রাজা হরিশ্চন্দ্র ১৯১৩ সালের ৩ মে। নিজের বাড়িতে শুটিং করে চলিস্নশ মিনিটের এক সাদা-কালো নির্বাক চলমান ছবি নির্মাণ করলেন ইন্দরাজ গোবিন্দ ফালকে। স্থির ছবি চলতে শিখল। মুগ্ধ হলো মুম্বাইসহ সারা ভারতের দর্শক। সেই থেকে শুরু ভারতে চলচিচত্রের জয়যাত্রা। জয়যাত্রা অচিরেই হলো জয়গাথা। নির্বাক ছবি ক্রমে কথা বলতে শিখল, ঠিক যেমন একটা শিশু ক্রমে বড় হয়ে কথা বলে। কথা বলা ছবি সবার মন জয় করল। স্বপ্নজগতের নাটকীয়তা,
নাচ-গান, হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, বিচ্ছেদ, নায়ক-নায়িকাদের গস্ন্যামার ভিলেন মারপিট লঘু ও মোটা দাগের রসিকতা সব মিলিয়ে মুম্বাইয়ে হিন্দি ও বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক ভাষায় চলচ্চিত্র একদিকে যেমন মনোরঞ্জনের এক অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো, অন্যদিকে বাণিজ্যে অনেক কলাকুশলীর ব্যক্তিগত ও দেশের আয়ের পথ তৈরি করল। বিদেশি ছবিও আসতে বেশি সময় লাগল না। রসিক ব্যক্তিরা বিভিন্ন দেশ ও হলিউডের খ্যাতনামা পরিচালকের বিখ্যাত সব ছবি দেখে অনুপ্রাণিত হলেন ভালো ছবি তৈরি করতে। দর্শকদেরও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি শিক্ষিত করল, ভালো ছবির স্বাদ জানতে পারল। জানল, ছবি শুধু মনোরঞ্জনের জন্যই নয়, সামাজিক সঠিক চিত্র তুলে ধরাটাও একটা আর্ট। লেনিন বলেছিলেন, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা প্রচার ও প্রসার সবচেয়ে ভালো উপায়।

বাংলা চলচ্চিত্র গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকেই অন্য ধরনের ফিল্ম তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা নেয়, যার সূত্রপাত ঘটে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে পথের পাঁচালীর মাধ্যমে। ‘মশালা’ বাদ দিয়ে কঠিন বাস্তবকে দর্শকের সামনে হাজির করা হলো। সাহিত্যের মতোই সমাজকে একটা বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা করতে লাগল চলচ্চিত্র।

বিগত শতকের চলিস্নশ-পঞ্চাশের দশকে হলিউডে কিছু ছবিতে দেখা গেল মানসিক অসুস্থ চরিত্র নিয়ে গল্প। হলিউড ছবিকে নকল করতে গিয়ে এবং সমস্যার গভীরে অনুসন্ধান না করেই অথবা বাণিজ্যের খাতিরে বাংলায় কিছু ছবি তৈরি হলো, যেখানে তৎকালীন প্রধান নায়ক বা নায়িকারা মানসিক অসুস্থ বা মানসিক প্রতিবন্ধীর চরিত্রে অভিনয় করছেন। ফ্রয়েডের কিছু তত্ত্বের বিকৃত ব্যাখ্যা করে তৈরি হয়েছে এমন কিছু ছবি, যেখানে অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে কোনো দুর্ঘটনায় এক চরিত্র মানসিক ভারসাম্য বা স্মৃতি হারায় আবার ছবির শেষে আরেক দুর্ঘটনায় ম্যাজিকের মতো স্মৃতি ফিরে আসে এবং সুস্থ হয়ে ওঠে। অভিনয়গুণে রোমান্টিক চলচ্চিত্রের ফর্মুলায় আবদ্ধ ছবি উতরে গেলেও এবং বাণিজ্যিক সাফল্য পেলেও সমস্যাটা জনজাগরণের কাজে লাগেনি, বরং এ-বিষয়ে এক বিকৃত ধারণার জন্ম নেয় সাধারণ দর্শকের মনে। এই ফর্মুলা থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম দীপ জ্বেলে যাই, কারণ এই ছবিতে মানবজীবন-কর্তব্য ও মানব-মন নিয়ে কিছুটা বিশেস্নষণ আছে।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে এদেশে ভালো চলচ্চিত্র দেখার দর্শক তৈরি হলো। সেই সময়ে পশ্চিমি সভ্যতার কিছু মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এদেশে আসতে শুরু করে নানা শিল্পের মাধ্যমে। এর মধ্যে ছিল সমাজের সেই দশ শতাংশ, যারা বাকি নববই শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের থেকে কোনোভাবে শারীরিক বা মানসিক অবস্থানে ভিন্ন, তাদের নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে তা নিয়ে কিছু ভাবনা, কিছু কাজ। শিক্ষিত মহলে যাদের সংসারে এ-ধরনের শিশু বা বয়স্ক ব্যক্তি আছে এবং কিছু মানবিক ব্যক্তি, তখন থেকে সমস্যাটা অন্যভাবে ভাবতে শুরু করল। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা অথবা সমমনস্ক কিছু ব্যক্তি মিলে গড়ে তুলল প্রতিষ্ঠান, সমাজে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং তাদের অভিভাবকদের শিক্ষ, দিশা ও পুনর্বাসনের প্রকল্প নিয়ে। সমাজ কিন্তু তখন এই শারীরিক ও মানসিক বিকাশে অপূর্ণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের মূল নামের আগে একটা করে বিশেষণ যুক্ত করত, যেমন – ল্যাংড়া, খোঁড়া, কানা, অন্ধ, বোবা, কালা, পাগল ইত্যাদি। আর সমষ্টিগতভাবে এদের বলা হতো বিকলাঙ্গ, পরে প্রতিবন্ধী নামটা আসে। সরকার থেকেও এই নামকরণ স্বীকার করে নানা আইন ও কার্যকরী নির্দেশনামা জারি হলো; কিন্তু কেন এরা প্রতিবন্ধী নামে ভূষিত হলো তা নিয়ে সেমিনার বা আলোচনা হলো না। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, মানবসভ্যতা বেড়ে ওঠার সঙ্গে মানুষ তার প্রয়োজনমাফিক যে সামাজিক কাঠামোগত স্থাপত্য তৈরি করেছে এবং মানসিক বিকাশের জন্য যে-পাঠক্রম চালু করেছে তা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের কথা ভেবেই, এই দশ শতাংশ ব্যক্তির জন্য নয়। প্রতিযোগিতার দৌড়ে তারা তাই সবসময় পিছিয়ে পড়েছে। বস্ত্তত সামাজিক প্রতিবন্ধকতার জন্যই তাদের বিকাশ ব্যাহত হয়েছে – শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই। সমাজের অশ্রদ্ধা, টিটকিরি, উপহাস, অসম্মান, অবহেলা, অত্যাচার ইত্যাদি তাদের নিত্যসঙ্গী, যুগে যুগে। এরই প্রতিফলন দেখা যায় চলচ্চিত্রে, বিভিন্ন অকারণ চরিত্রে।

একসময় বা এখনো মনোরঞ্জনের জন্য চলচ্চিত্রের চরিত্রায়নে একজন শারীরিক বা মানসিক অপূর্ণ ব্যক্তির চরিত্র তৈরি করা
প্রথায় দাঁড়িয়ে গেছে। স্রেফ লোক হাসানোর জন্য। হাসির পাত্র  হয়ে সমাজে বাস করা আবার চলচ্চিত্রেও এর প্রতিফলন – এই দুয়ে মিলে সমস্যাটা ক্রমে জটিল হলো। তোতলামো বাক্শক্তির একরকম প্রতিবন্ধকতা এবং নায়ক বা খলনায়কদেরও ভাঁড়ামির জন্য এই অভিনয় করতে হয়। সামান্য মানবিকতা পর্যন্ত অভিনেতাদের বিসর্জন দিতে হয় উপার্জনের খাতিরে। এ-ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে এমন অনেকেই চলচ্চিত্রে যান এবং এসব চরিত্র যখন দেখেন তখন মনে হতেই পারে, তাকে প্রহসন করা হচ্ছে। দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি কম ব্যক্তির অভিনয় বা ক্যারিকেচার তামাশার কারণ হয়। নববইয়ের দশক থেকে জনজাগরণের ফলে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়। প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আবার অন্যরকম পরীক্ষামূলক গল্পও দেখা যেতে লাগল সেলুলয়েডে। আসলে চলচ্চিত্রে প্রতিবন্ধকতাকে ঘিরে দুটো প্রাস্তিক দৃশ্য দেখা যায় – একদিকে করুণা, মজা, সমবেদনা, ভ্রষ্টামি, ক্যারিকেচার এবং দুর্দান্ত হিরোইজম, অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতা, মেনে নেওয়া, দোদুল্যমান মনের ভাব এবং মানবাত্মার অভিলাষ। একদিকে তাদের অবস্থা নিয়ে বিদ্রূপ আর একদিকে প্রকৃত সমস্যাকে তুলে ধরা।

চলচ্চিত্র মনোরঞ্জনের এক সফল ও জোরালো মাধ্যম। লেনিন প্রথমে একে প্রচারমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার কথা চিন্তা করেন সোভিয়েত রাশিয়ার গণবিপস্নবের পর। চার্লি চ্যাপলিন কমেডি ছবির অন্তরালে সমাজ ও মানুষের সঙ্গে সভ্যতা, আধুনিকতা ও শিল্পের সম্পর্ক নিয়ে মানবিক আবেদন খুব সফলতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। চ্যাপলিন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সবরকম অপশাসন ও অপকর্মের বিরুদ্ধে নির্বাক থেকে সবাক চলচ্চিত্রের যুগ পর্যন্ত ছবির মাধ্যমে নানাবিধ মানবিক আবেদন প্রচার করেছেন। এসব প্রচারের জন্য চলচ্চিত্রকে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহারও করা হয়েছে। মানুষসৃষ্ট নানারকম সামাজিক দুর্যোগের আখ্যান যেমন – যুদ্ধ, খরা, মন্বন্তর ইত্যাদি যথেষ্ট প্রচার পেয়েছে। প্রচার পেয়েছে দেশভাগ ও শরণার্থী সমস্যা। কিন্তু প্রতিবন্ধিতা নিয়ে যারা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে বেঁচে আছে, তাদের সমস্যা ও পুনর্বাসনের গল্প নিয়ে ছবি হয়েছে খুবই কম। সুখের বিষয়, গত দু-দশক ধরে অবস্থার কিছু পরিবর্তন হয়েছে এবং হলিউড পথ দেখানোর পর কিছু সাহসী হিন্দি ও আঞ্চলিক পরিচালক এ-বিষয়ে কয়েকটা দিক নিয়ে রুপালি পর্দার মাধ্যমে সমাজকে সচেতন করে চলেছেন, যদিও অনভিজ্ঞতার জন্য এঁদের কাজ সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি।

সাম্প্রতিককালে কিছু চলচ্চিত্রে গল্পের মুখ্য চরিত্র প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে মূল সমস্যা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকায় চিত্রায়ণ নেগেটিভ হয়ে যায়। মুঝসে শাদি করোগে ছবিতে কাদের খান নতুন নতুন প্রতিবন্ধিতা নিয়ে রকমারি চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের আনন্দ দিলেও চলচ্চিত্রটা বিকৃত মনের পরিচয় দেয়। কোয়লা ছবিতে শাহরুখ খানের লুপ্ত বাক্শক্তি ফিরে পাওয়াটা অতিনাটকীয়তা ও অসত্য প্রচার। শাহরুখ আবার অন্য অনেক ছবিতে অভিনয়ের সঙ্গে তোতলামো করাটা প্রায় অভ্যেসে পরিণত করেছেন। পারিবারিক ও সামাজিক বোঝা, করুণার পাত্র হিসেবে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে নামের সঙ্গে প্রতিবন্ধিতা – বিশেষ বিশেষণ ব্যবহারে সব ভাষার চলচ্চিত্রই সিদ্ধহস্ত। এই সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে হিটলারের কুখ্যাত উক্তি ‘অপ্রয়োজনীয় খাদক’ যেমন রুপালি পর্দা কাঁপায়, তেমনি ‘নিষ্ফলা’ বা ‘সমাজের জঞ্জাল’ বলেই উল্লেখ করা হয়ে থাকে। অলৌকিকভাবে বা বহির্বিশ্বের কারোর দ্বারা প্রতিবন্ধিতা দূর হয়ে যাচ্ছে বাস্তবিক অকল্পনীয় হওয়া সত্ত্বেও কোই মিল গয়া ছবিতে মানসিক গঠনে অপূর্ণ ঋত্বিক রোশনের চরিত্রের প্রতিবন্ধিতা এভাবেই দূর হয়। সমাজে দেবতার জলপড়া, চরণামৃত, ফুল ইত্যাদি সেবনে বা স্পর্শে রোগ নির্মূলের মতোই এই অসত্য সংস্কার এরকম শক্তিশালী মাধ্যমের দ্বারা সমাজে ভুল বার্তা দেয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সেন্সর বোর্ড এ নিয়ে নীরব থাকে। এ-বিষয়ে সত্যজিতের বিদেশি সাহিত্য অবলম্বনে তৈরি গণশত্রম্ন চলচ্চিত্রায়ণ সমাজের দুর্বল দিকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। গাইডে দৃষ্টিশক্তিহীন ও হুইলচেয়ারে বসা চরিত্র দুটো অতিরিক্ত বলেই মনে হয় যেন জোর করে সমবেদনা আদায়ের জন্য করা হয়েছে। মানসিক প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ ব্যক্তিদের দিয়ে নিখুঁত গান গাওয়ানো (শান, পারমিতার একদিন) বা দৃষ্টিশক্তিহীন ব্যক্তিদের দিয়ে ব্যাংক লুট করানো (আঁখে) অতিনাটকীয়তারই কথা বলে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে অনেক ছবিতেই নায়কের হিরোইজম দেখাতে গিয়ে জোর করেই নায়কের অতি কাছের কাউকে প্রতিবন্ধী বানানো হয় যেমন, গ্রেট গ্যাম্বলারঅমানুষে রাখি প্রেমিকা বা স্ত্রী হিসেবে অথবা ওমর আকবার অ্যান্টনিতে নিরূপা রায় মায়ের চরিত্রে অমিতাভ বচ্চনের ইমেজ বাড়িয়েছেন। সুযোগ পেলেই একটা এরকম চরিত্র চলচ্চিত্রে ঢুকিয়ে দেওয়া একসময় চালু ছিল। যেমন সাচ্চা ঝুটায় রাজেশ খান্নার বোন। অনেকটা অয়দিপাউস নাটকের মতো, যদিও কার্যকারণ একেবারেই ভিন্ন। দিদার ছবিতে দিলীপকুমার প্রেমিকাকে অন্যের বাহুবেষ্টনে দেখার চেয়ে নিজের চোখদুটো নষ্ট করে অন্ধত্ব বরণ করেন। এভাবে দৃষ্টিহীন নায়কের অভিনয় ছবিকে হিট করে। বাণিজ্য ও লাভের অংক শুভবুদ্ধিকে অনেক সময় আড়াল করে রাখে।

বাক্ ও শ্রবণশক্তি-রহিত এমন দুজন নায়ক ও নায়িকাকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ছবি করার সাহস সেই সত্তরে দশকেই দেখিয়েছেন গুলজার কোশিশে। দম্পতি সংসার রচনায় নিজের নিজের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে সামাজিক প্রতিবন্ধিতাকেও অতিক্রম করেছে এবং প্রতিবন্ধী মা-বাবার সন্তানও প্রতিবন্ধী হবে সে-সময়ের সমাজের এই ট্যাবুকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মূক-বধিরহীন পরবর্তী প্রজন্ম সৃষ্টি ও পালন করার প্রতীকী প্রচেষ্টার দ্বারা সসম্মানে সমাজের মূলস্রোতে অন্তর্লীন হওয়ার পথ খুব সুন্দর করে বলেছেন। সঞ্জীব কুমার ও জয়া ভাদুড়ির নিখুঁত অভিনয় সে-সময় বক্স-অফিস হিট করার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে ইতিবাচক মনোভাবের চলচ্চিত্রের সূচনা হলো বলা যায়। কারণ এরপর বেশকিছু ছবি তৈরি হলো, যা দর্শককে সমাজ সম্পর্কে পজিটিভ বার্তা দিতে পেরেছে।

আশির দশকে মুক্তি পায় বেশ কয়েকটি সুস্থ মানসিকতার ছবি। এগুলোতে মুখ্য চরিত্র কোনো-না-কোনোভাবে বিশেষভাবে সমর্থ। এর মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় তামিল ও পরে হিন্দি ভাষার ছবি অঞ্জলির নাম। সন্তান জন্মের পর যখন প্রথম প্রকাশ পায় যে শিশুটির মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা আছে, তখন মা-বাবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো মানসিক অবস্থা এবং অসহায়তা ছবিতে সুন্দর করে বোঝানো হয়েছে। অসহায় কারণ সে-সময় সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসকদের বিষয়জনিত সঠিক জ্ঞানের অভাবের জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সময়োচিত দিশা দেখানোর অভাব। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় সমাজচ্যুত সেই পরিবারের ভয়াবহ পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে
যুক্তি-তর্কসহ আবার সমাজে সন্তানসহ নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তোলার অবিরাম সংগ্রাম চিত্রনাট্যের মুন্শিয়ানা। সেইসঙ্গে মানসিক যন্ত্রণার ছবি ক্যামেরায় তুলে ধরা প্রশংসার দাবি রাখে। ব্যক্তির প্রতিবন্ধিতা ও তার পরিবারকে সমাজের অর্থপূর্ণ অংশ বলে মেনে নেওয়া যদি ছবিতে ঠিকভাবে দেখানো যায় তবে সচেতনতা বাড়বে। এখানেই চলচ্চিত্রের সার্থকতা। পারিবারিক ও সামাজিক স্বীকৃতি এবং অন্তর্ভুক্তি প্রতিবন্ধিতা দূরীকরণে অনেক সাহায্য করে। সন্তানের অপূর্ণতা ধরা পড়ার পর অভিভাবকরাও প্রথমে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং সঠিক দিশার জন্য ছোটাছুটি করেন। দুর্বল মন সহজেই অলৌকিক বিশ্বাসের দিকে ধাবিত হয়, সেইসঙ্গে থাকে পরিবারের কুসংস্কারে ভরা উপদেশ। অনেক সময় গঞ্জনার শিকার হতে হয়। আর সমাজও প্রতিবন্ধী-বন্ধু হয়ে ওঠেনি এখনো। অভিভাবকদেরই সত্যটাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বীকার করে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। দেরি হয়ে গেলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি আরো পিছিয়ে যাবে।

প্রতিবন্ধিতা এক ধরনের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, যা সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে প্রশিক্ষকের সহায়তায় অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অন্য কোনো পার্শ্বিক অসুস্থতা না থাকলে এটা কোনো রোগ নয়, তাই এর কোনো ওষুধ নেই। বিভিন্ন কারণে কিছু মস্তিষ্ককোষ নিষ্প্রাণ হয়ে গিয়ে এ-সমস্যা তৈরি হয়। তবে মানসিক অসুস্থতা এক ধরনের মনের রোগ, যা ওষুধ প্রয়োগে সারে। এ নিয়ে দুটো ছবির কথা উল্লেখ করা যায়। প্রথমটা তপন সিংহের হুইলচেয়ার। দুর্ঘটনাজনিত কারণে হুইলচেয়ারবন্দি ডাক্তার আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্রচেষ্টার দ্বারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অন্য এক শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীর ফিজিওথেরাপির সঙ্গে মানসিকশক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টার প্রতিফলন রুপালি পর্দায় এক অভিনবত্ব। ডাক্তার প্রদীপকুমার মলিস্নকের বাস্তব জীবনের ছায়ায় তৈরি গল্পে ডাক্তারের জীবনই সংগ্রামের এক জীবন্ত উদাহরণ। ছবিতে ফিজিওথেরাপিস্টের সঙ্গে ওই নারীর চিকিৎসা চলাকালে প্রেম গড়ে ওঠা সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে চোখে বুড়ো আঙুল দেখানোর মতো। তবে সমাজে এবং চলচ্চিত্রেও প্রতিবন্ধী নারী বা পুরুষের বিয়ের সঙ্গে অনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকে, যেমন সারাজীবনের জন্য দেখাশোনার লোক বা ভরণপোষণের দায়িত্ব। এটা অসম আর্থিক ও শিক্ষিত পরিবারের মধ্যে হয়ে থাকে, যদিও ব্যতিক্রম থাকেই, যেখানে ভালোবাসাই মূলমন্ত্র।

দ্বিতীয় ছবি অপর্ণা সেনের পারমিতার একদিন। মধ্যবিত্ত পরিবারে বিয়ে হয়ে এসে পারমিতা দেখল তার ননদের অস্বাভাবিক ব্যবহার। সেই পারমিতারই ছেলে জন্মাল স্প্যাসটিকে আক্রান্ত। একই পরিবারে দু-ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পরিচালক খুব দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবের মিল রেখে ফুটিয়ে তুলেছেন এমন সংসারের নানাবিধ খুঁটিনাটি সমস্যা, টানাপড়েন ও তার সমাধান। প্রাথমিক অবস্থায় পারমিতা ও তার স্বামীর সন্তানের অবস্থার কথা জেনে ভেঙেপড়া ও পারস্পরিক দোষারোপ এবং এরই সঙ্গে চিকিৎসকের অবহেলার দৃশ্য ভীষণভাবে বাস্তব। অবশেষে পারমিতাকেই দায়িত্ব নিতে হয় সন্তানের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার। এটাও বাস্তব যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবারা দায়িত্ব এড়িয়ে যায় কাজের অসিলায়। এরকম অবস্থায় মায়েরা সন্তানের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে নিজেকে যদি অন্য কাজে ব্যস্ত রাখে তাহলে মানসিক চাপ কমে, এটাও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পারমিতা সাহায্য পেয়েছে শাশুড়ি সনকার কাছে থেকে। সনকার জীবনে সেটা হয়নি বলে তার ফ্রাসটেশন খুব সুন্দর করে তুলে ধরা হয়েছে। একসঙ্গে অনেক পারিবারিক সমস্যা নিয়ে সফলতার সঙ্গে কাজ করেছেন পরিচালক। ইতিবাচক পথে সমস্যা থেকে মুক্তির দিশা রয়েছে এই ছবিতে।

ভেঙেপড়া যৌথ পরিবারে শারীরিক বা মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির লালন-পালনের সমস্যা খুব গভীর। অভিভাবকদের সংগঠনের ভূমিকা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার বা ব্যক্তিগত সহযোগিতা প্রতিবন্ধকতাজনিত সমস্যা হ্রাস করতে সাহায্য করে। দোস্তি ছবির মতো দুটো চরিত্র দৃষ্টিহীন ও চলৎশক্তিহীনের পারস্পরিক সহযোগিতায় হাত বাড়ানো সমাজের চেতনা বাড়ায়। একইভাবে পারমিতার ননদ যখন তার ছেলেকে খাওয়ায়, সেখানে মানবিক দিকটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়া ব্যক্তিদের অর্থপূর্ণ কাজে ব্যস্ত রাখলেও বিকাশ উন্নত হয়। অনুরাগ ছবিতে দৃষ্টিহীন নায়িকার সঙ্গে সুদর্শন নায়কের প্রেম এবং ছবির শেষে নায়িকার একটা ছোট্ট বন্ধু তার চোখদান করে নায়িকার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়। প্রায় একই গল্পের ছবি গুড্ডু। এই দুটো চলচ্চিত্রেই চক্ষুদানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। চলাফেরায় অসুবিধা এমন অনেক চরিত্র নিয়ে একাধিক ছবিতে তাদের অসুবিধা নানাভাবে দেখানো হয়েছে। তবে কিছু ছবিতে অনেকটা পজিটিভভাবে অসামর্থ্যের ঊর্ধ্বে ওঠার রাস্তা বলা হয়েছে। হাম দোনো, অবতার, শোলো বা মান  ছবিগুলোতে এরকম অভিনয় দেখা যায়। শ্রম, ধৈর্য ও অনুশীলনের দ্বারা প্রতিবন্ধকতা জয় করা যায়, তবু ছবিতে অলৌকিক প্রভাব থাকে। সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে বুকে সাহস লাগে।

আশির দশকে সাই পরঞ্জপাইয়ের স্পর্শ ছবিতে শিক্ষকজীবনে সফল এক দৃষ্টিহীন কলেজের অধ্যক্ষ অনিরুদ্ধ তার প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারলেও সে নিজে এক হীনমন্যতার শিকার হয়। যে-ব্যক্তির জীবন-আঁধারে অনিরুদ্ধ চরিত্র গড়া হয়েছে, সেই লাল আদবানি দৃষ্টিহীন হওয়া সত্ত্বেও তার সামর্থ্যকে সর্বদাই প্রতিবন্ধকতাকে জয় করার কাজে লাগিয়েছেন। চলচ্চিত্রে এ-চরিত্রটাকেই পরিচালক একটু মোচড় দিয়েছেন নায়কের বাস্তব-সম্ভাব্য এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিশেস্নষণে। অনিরুদ্ধকে কেউ সহযোগিতা বা সাহায্য করলেই তার মনে হয় তাকে যেন দয়া বা করুণা করা হচ্ছে। স্বরচিত গল্পের চিত্রায়ণ পরঞ্জপাই প্রথম করেন দূরদর্শনে রইনা বীতি যায় নামে এক টেলিনাটকে। এটি দর্শকরা তখনই সাদরে গ্রহণ করে। চলচ্চিত্রে অনিরুদ্ধ কবিতা নামে এক বিধবা মহিলার প্রেমে পড়ে। প্রেম যখন পরিণয়ের দিকে এগোয়, হঠাৎ অনিরুদ্ধের মনে হতে লাগল কবিতা যেন তাকে করুণা করে বিয়ে করছে। এই জটিল মানসিকতা থেকে অনিরুদ্ধ বেরোতে পারে না। নাসিরুদ্দিন শাহ ও শাবানার অসামান্য অভিনয় চলচ্চিত্রটাকে এক বাস্তব রূপ দিয়েছে। তবে বাস্তবিক জগতেও এটা স্বাভাবিক বলে মনে করেন মনস্তত্ত্ববিদরা। একমাত্র ভালোবাসা দিয়েই এ-ধরনের মানসিক দ্বন্দ্ব দূর করা ও মনোবল ফেরানো সম্ভব। তবু বলতেই হয়, গল্প-উপন্যাস বা চলচ্চিত্রের মতো বাস্তব জগতেও সামাজিক বা আর্থিক দুরবস্থায় থাকা নারীরাই অতিসহজে কবিতার মতো এগিয়ে আসতে পারে, ব্যতিক্রমীদের সংখ্যা নগণ্য।

সেরেঙ্গেটি ছবির একটা দৃশ্য খুব মনে পড়ে। একদল জেব্রা তাদের মৌসুমি জায়গা বদলের সময় পুরনো এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পথে এক জেব্রা সন্তান প্রসব করে। নবজাতক জেব্রাটি সময়মতো স্বাভাবিকভাবে উঠে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়। মা জেব্রা ও অন্য সঙ্গীদের সহযোগিতা যখন ব্যর্থ, তখন অন্যরা এগিয়ে যায় আর তাদের সঙ্গে মাকেও সন্তানকে ফেলে এগিয়ে যেতে হয়। সে-সময় সন্তানের দিকে তাকিয়ে মায়ের চোখের জল পড়ার দৃশ্য আর ফেলে যাওয়া নবজাতকের মাথার ওপর ঘুরপাক খাওয়া শকুনির দৃষ্টি মানব ভাবাবেগে আঘাত করে। কিন্তু মানুষও কি তাই করে না? সমানতালে চলতে না পারা ব্যক্তিকে ফেলে পরিবার ও সমাজ আজো এগিয়ে যায়। দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে যদিও খুবই ধীরলয়ে।

বধির এক জার্মান দম্পতির কন্যা ছেলেবেলা থেকে তার মা-বাবার সমস্যাটা বুঝতে পেরে তাদের সঙ্গে স্ব-উদ্ভূত প্রণালি প্রয়োগ করে যোগাযোগ বজায় রাখে। সেইসঙ্গে বাইরের জগতের সঙ্গেও সম্পর্ক রেখে চলে। মেয়ে যত বড় হয়, মা-বাবাও তত মেয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং সেইসঙ্গে তাকে হারানোর ভয় চেপে বসে। মেয়েটি প্রাথমিক স্কুল গ্রামেই করে এবং উচচশিক্ষর জন্য বার্লিনে চলে যায়। এদিকে তার মধ্যে এক অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করে এই ভেবে যে, সে তার মা-বাবাকে অবহেলা করছে। ইতোমধ্যে তার মায়ের মৃত্যু হলে বাবা তাকেই দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে দোষারোপ করে। বিয়ন্ড সাইলেন্স এমনই এক সংবেদনশীল জটিল বিষয় নিয়ে ছবি, যা দেখে সঞ্জয় লীলা বনশালি খামোশি ছবিটা করেন; কিন্তু জার্মান ছবির সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো বনশালির ছবিতে প্রকাশ পায় না।

শ্যামলী ছবিতে নাম ভূমিকায় কাবেরী বসু মূক মহিলার চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেন এবং ছবিটা বাণিজ্যিকভাবে সফল। শঙ্কর ভট্টাচার্যের দৌড় (১৯৭৯) এক অসীম আত্মবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করা নারীর ছবি, যে তার সমস্ত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়িয়ে স্বাভাবিক জীবনের গল্প বলে। বাণিজ্যিক অসফল এই ছবিটা কিন্তু সে-সময় প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে এমন অনেকের মানসিক বল জুগিয়েছে। নব্যেন্দু ঘোষের ছোটদের জন্য তৈরি ছবি নেত্রহীন সাক্ষতে রাম নামে এক দৃষ্টিহীন কিশোরের সাধারণ স্কুলে পড়ার গল্পের মধ্যে রহস্যের মশলাও আছে। রাম বুদ্ধিমান; কবিতা লেখে। গলার স্বর ও পদধ্বনি শুনে সে চিনতে পারে লোক। আর এই পায়ের আওয়াজ শুনেই সে চিনতে পেরেছিল তার প্রতিবেশী গোপালের খুনিকে। পুলিশ প্রথমে তার কথা বিশ্বাস না করলেও সে প্রমাণ করতে সফল হয় এবং খুনিদের ধরিয়ে দেয়। প্রতিবন্ধকতা ছাপিয়ে ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধি দিয়েও অনেক সামাজিক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

আশির দশকের শেষে সতী ছবিতে অপর্ণা সেন সমাজে প্রচলিত একটা সকরুণ ঐতিহাসিক কুসংস্কারের চিত্র তুলে ধরেছেন। মূক মেয়ের বিয়ে দিতে সফল না হওয়ায় তাকে একটা গাছের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সমাজে সে বিবাহিত বলে স্বীকৃতি পায় এবং তার ভাইবোনদের বিয়েতে কোনো সমস্যা না হয়। মেয়েটাও ক্রমে অভ্যাসবশত গাছটাকেই স্বামী মানতে লাগল এবং একদিন প্রবল ঝড়ে সেই গাছ ভেঙে পড়ে ও মেয়েটির গাছ-স্বামীর সঙ্গে সহমরণ হয়। এর জন্য সমাজে সে সতী আখ্যা পায়। সমাজে নারী হয়ে জন্মানোটা আজো যেখানে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা, সেখানে শারীরিক বা মানসিক অপূর্ণতা নিয়ে জন্মানো নারীর কী করুণ অবস্থা তারই চমৎকার শৈল্পিক বিবরণ। অপর্ণা সেনের আর একটা ছবি ১৫ পার্ক এভিন্যু যেখানে শারীরিক অত্যাচারে ধর্ষিত মানবিকতা একটি যুবতীকে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী করে দেয়। সমাজে এহেন ঘটনা রোজ ঘটে চলেছে। তবু প্রেম, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা তাকে আস্তে আস্তে স্বাভাবিকের পথে আসতে সাহায্য করে। সত্যজিৎ রায়ের শাখা প্রশাখায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং রেইন ম্যান ছবিতে ডাস্টিন হফম্যানের চরিত্রদুটি লক্ষণীয় এবং তুলনীয়। উভয়েরই মনোজগৎ তথাকথিত স্বাভাবিক নয়; কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক ন্যায়-অন্যায় বোঝার এবং প্রতিবাদ করার প্রবণতা আছে, যদিও প্রতিবাদের ভাষা আলাদা। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় প্রতিবন্ধকতা নিয়ে অনেক ডকুমেন্টারি ছবি হয়েছে, যেখানে সমস্যার পাশে মুক্তির উপায় নিয়েও কথা আছে। অভিভাবকদের সমস্যা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের দিকটাও তুলে ধরা হয়েছে। এ-বিষয়ে গবেষণা এত কম হয় যে, প্রকৃত সমস্যাটা প্রকাশ পায় না, তাই পূর্ণদৈর্ঘ্যের ফিল্ম ভাবাবেগসর্বস্ব হয়ে যায়, জনজাগরণ হয় না যেটা লেনিন চেয়েছিলেন রাজনীতির স্বার্থে। আসলে সাহিত্যেই এ-বিষয়টাকে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

দেখা ছবিতে গৌতম ঘোষ গস্নুকোমায় আক্রান্ত এক শিক্ষকের কাহিনি বলেছেন। আলোর জগৎ থেকে তিনি ক্রমে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করেছেন বটে; কিন্তু একদা সাম্যবাদী কবি-শিক্ষকের কামুক চরিত্রটা তার মধ্যে থেকেই যায়। অর্থাৎ প্রতিবন্ধকতা প্রথম রিপুর আগ্রাসী মনোভাবকে দমাতে পারে না। ছবিতে আরো একটা ‘জন্মান্ধ’ গগনের চরিত্র দেখা যায়, যাকে পুনর্বাসনের নামে গান গাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে গ্রাম থেকে শহরে এনে করুণার পাত্র করেই রাখা হলো। তাকে প্রেমবহির্ভূত কামের আবেগে তাড়িত করে ধর্ষণও করা হলো। এরকম ছবি সহজ-সরল মনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কাছে ভুল বার্তা দেয়, যা কাম্য নয়।

হেলেন কেলারের জীবন নিয়ে বাংলা নাটক জন্মদিন দেখে যতটা অনুপ্রাণিত হওয়া যায়, একই বিষয় নিয়ে হিন্দি ছবি বস্ন্যাক কিন্তু গস্ন্যামারসর্বস্ব। মূক, বধির ও দৃষ্টিহীন রানি মুখার্জির শিক্ষক অমিতাভ বচ্চনের মেলোড্রামাটিক অভিনয় বিষয়কে খাটো করে বাণিজ্যের কথা মাথায় রেখে চলচ্চিত্রে তুলে ধরে। ছবির শেষে অমিতাভ আলঝেইমারের শিকার হলে ছবির গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু পরিচালক বনশালি দু-ধরনের প্রতিবন্ধী চরিত্র সামলাতে পারেন না। আলঝেইমার মানসিক প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক চ্যালেঞ্জও বটে। সচেতনতা বাড়ানোর একটা সুবর্ণসুযোগ নষ্ট হলো। তবে একটা ভালো দিক দেখানো হয়েছে। আলঝেইমারে আক্রান্ত অমিতাভকে চিকিৎসক যখন চেন দিয়ে বেঁধে রেখেছে, সে-সময় রানি এসে তাকে মুক্ত করে। এর আগে ছবির শুরুতে একইভাবে রানিকে কোমরে বাঁধা ঘণ্টা লাগানো দড়ি কেটে বন্ধনমুক্ত করে অমিতাভ।

নায়ক প্রতিবন্ধী এরকম চরিত্র নিয়ে হলিউডে বেশকিছু ভালো চলচ্চিত্র হয়েছে, যেমন আ বিউটিফুল মাইন্ড, রেইন ম্যান, আই অ্যাম স্যাম, অ্যাজ গুড অ্যাজ ইট গেটস, ইট’জ আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ, চার্লি, কামিং হোম ইত্যাদি, যেখানে নায়কই কোনো-না-কোনো প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত। কিছু ছবি আবার ক্ল্যাসিকের পর্যায়ের। অন্যদিকে অনেক ছবিতে প্রতিবন্ধী খল-চরিত্র হয়ে উঠেছে বিকৃত দুষ্ট দানব যেমন ওয়াইল্ড, ওয়াইল্ড ওয়েস্ট

বলিউডে নায়কের হিরোইজম প্রকাশ না পেলে ছবি ফ্লপ করে। বস্ন্যাক ছবিতে অমিতাভের আলঝেইমার হওয়ার পর দর্শক ঝিমিয়ে পড়ে, কোই মিল গয়াতে ঋত্বিক ভালো অভিনয় করলেও ছবি হিট করেনি। অন্যদিকে আমির খান-অভিনীত তারে জমিন পর হিট, কারণ সেখানে নায়কের হিরোইজম প্রকাশ পেয়েছে। পড়াশোনা বলতে আমরা স্কুলের মূলধারায় রুটিন ধরে পড়াটাই বুঝি। শিক্ষর উদ্দেশ্য একটা চাকরি। অবশ্যই। কিন্তু ভিন্নধারার শিক্ষও শিক্ষ, সেটাতে সন্তানদের আমরা উৎসাহ দিই না, কারণ তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার কোনো দিশা নেই। এটা সরকারের ব্যর্থতা। নানা রকমের শিল্প, গান, খেলা, ছবি আঁকা কত রকমের কাজ আছে। সবাই চার দেয়ালের মধ্যে রুটিন মেনে পড়তে পারে না। এ-ও এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা। তাই কি? প্রতিবন্ধকতা কি আমরাই সৃষ্টি করছি না? লোকসংখ্যার নববই শতাংশে জন্য সমাজ, তাহলে বাকি দশ শতাংশ কী করবে? কোথায় যাবে? তারা কি পিছিয়েই থাকবে?

ক্রিস্টোফার রিভ তাঁর শেষ ছবি অ্যাবোভ সাসপিশনে এক প্রতিবন্ধী চরিত্রে অভিনয় করার আগে নিজেকে প্রস্ত্তত করতে প্রতিবন্ধীদের এক সংস্থায় নিয়মিত যেতেন। সে-সময় তিনি রোজ মনে মনে বলতেন, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি ওদের মতো নই। এই ছবির পর এক দুর্ঘটনায় তিনি নিজে পঙ্গু হয়ে যান। সে-সময় তিনি বলেন, আমরা যেন কখনো হুইলচেয়ারে বসে থাকা ব্যক্তির দিক থেকে দৃষ্টি না ফেরাই, তাকে ভয় না পাই অথবা তাকে অনাহূত মনে না করি। কারণ আমরা যে কেউ যখন-তখন এদের একজন হয়ে যেতে পারি। এই সুন্দর পৃথিবী সবার। সবাইকে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো উপযুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হবে। বিচ্ছিন্নতা নয়, সম্পৃক্ত সমাজ, সবাইকে নিয়ে চলার সমাজ। চলচ্চিত্র তার নিজস্ব ভাষায় চেষ্টা করছে জনজাগরণের; কিন্তু সেইসঙ্গে আমাদের ঘুমও ভাঙতে হবে। সবার হৃদয় প্রকাশ হোক।

Leave a Reply

%d bloggers like this: