তৃণাদপি

লেখক: জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

এই গল্পটি আগে একবার বলা হয়েছিল। তবুও আরো একবার শোনা যায়।

এক

পিতামহ যেদিন গৃহত্যাগ করেছিলেন সেদিন বৃষ্টি ছিল। আমার পিতা আমাকে এই কথা বলেছিলেন। প্রচ- বর্ষণে সেদিন ভেসে যাওয়া মাঠ ও শস্যক্ষিত কেবল সমুদ্রের আভাস দিচ্ছিল। অবশ্য গর্জন ও ঢেউ ছিল না। বৃক্ষরাজিও অমনি ভেসেছিল, জনপদের মতোই এবং বড়ঘরের চালায় বসে কদিন কাটানো যায় এই ভেবে একদিন বিরক্ত হয়ে পিতামহ চালা থেকে নেমে চলে যান। তাঁর চলে যাওয়া পথের দিকে পিতামহী অনেককাল তাকিয়ে ছিলেন, ধুলো-ওড়া সড়ক পর্যন্ত এবং সেটি পার হয়ে দূর-বন্দরের আবছা সীমানা যেখানে, সেদিকেও।

সাতদিনের প্রচ- বর্ষণের পরে তাঁর মনে হয়েছিল, যদি এই প্রপাত না-থামে। শিহরিত তিনি দেখেছিলেন, ক্রমে পুকুরের মাছ দিব্যি হেঁটে নদীর দিকে চলে যাচ্ছে আর পুকুর ও নদীর মধ্যবর্তী সবুজ রং পালটানোর জন্য প্রস্ত্তত। ‘যদি বৃষ্টি না-থামে’ এই কথা ভাববার পরেই আকাশ আরো অন্ধকার হয়েছিল। তখন তিন সুখী শৃগাল ও সর্পরাজ ভিন্ন ডাঙার দিকে চলে গেলে তিনি তালগাছের শীর্ষে কোনো বাবুই দেখেননি। যদি বৃষ্টি না-থামে এই কথা ভাববার পরে গৃহতক্ষক তিনবার শব্দও করেনি। তখন তাঁর চলে না গিয়ে কী উপায় ছিল।

কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পরদিনই নাকি সূর্য উঠেছিল। তখন সকলে কীভাবে তিনি চলে গেলেন একথা নিয়ে অনেক বলাবলি করে।

পিতামহী বলেছিলেন, পস্নাবনভূমির ওপর দিয়ে হেঁটেই তিনি চলে যান। জলপৃষ্ঠে পদযাত্রা কী সম্ভব – এ-প্রশ্ন কেউ কখনো করেনি, বরং তিনি যেদিকে চলে যান সেই দিকে, ঠিক মাঝখানে, দুপাশ  থেকে মাপলে ঠিক মাঝখানে, বিশাল অগ্নিগোলক সকলেই দেখেছিল – বুঝি তাঁর চলে যাওয়ার পরেই।

কেন তিনি চলে যান সে-কথা অনেকেই জানে না। সুজানগর থেকে তিন পালের তিন নৌকায় তাঁর জিনিস এসেছিল এ-কথাই সকলে জানে, এবং সেই সব মহাপস্নাবনে ভেসে গেলে তাঁর আর কী করার ছিল? সাতটি বিশাল কাঠের সিন্দুকের কথাও অনেকে শুনেছিল; কিন্তু চোখে দেখেছিল কেবল একটি কালো তোরঙ্গ মাত্র। অবশ্য অনেকে বলেন, সুজানগর নয় বেলকুচি থেকে মাত্র একটি কাঠের সিন্দুকই এসেছিল তাঁর, লেপ-তোশক এবং কাঁসা-পিতলের হাঁড়িকুড়িতে বোঝাই। কাঁসা-পিতল ছিল নিঃসন্দেহে, না-হলে মফস্বল শহরের ভাড়া করা বাসা থেকে চটের থলিটিতে কী নিয়ে যেতেন পিতা বাসনের দোকানে? তাঁর ভগিনীদ্বয় ‘‘ভাত খাওনের একটা থালও পাইলাম না’’ বলে ক্ষীণ বিলাপ করলেও পিতা কখনো রাগী ছিলেন না। সর্বদা কেবল ওই কালো তোরঙ্গটিকেই দেখাতেন তিনি। যদিও সেটিতে কী আছে জানতো না কেউ।

 

দুই

‘‘যদি বৃষ্টি না-থামে’’ এই চিমন্তা পিতামহের মাথায়ই প্রথম এসেছিল বলে শোনা গেলেও আমার বিশ্বাস পিতাই প্রথম স্তব্ধ, গম্ভীর হয়ে বৃষ্টির সামনে বসে থাকতে থাকতে অমন চিমন্তা করেছিলেন। অনুমান করি, ওই চিমন্তার সময়ে তিনি বারান্দায়ই তাঁর কাষ্ঠাসনে বসা। আসনের অশক্ত পশ্চাদ্ভাগ টিনের বেড়ার সঙ্গে ঠেকানো। সদর রাস্তা দেখা যেতো ওই বারান্দায় বসলে। সদর রাস্তা থেকে নৌকাটি মোড় নিয়ে আমাদের পাড়ার রাস্তায় এসেছিল এবং পরে আমাদের উঠানে। ছোট ছোট ঢেউ ছলাৎ ছলাৎ করে বারান্দার ওপরেই উঠে আসে বুঝি-বা। বন্দরও তখন জলপ্রপাতাক্রান্ত এবং স্বয়ং চিকিৎসকই চিকিৎসাকাঙ্ক্ষী – এই খবর দিয়ে নৌকারোহী দূত চলে যায়। তখন আবার বড় বড় ঢেউ নৌকাপৃষ্ঠে আঘাত করে এবং জলপ্রপাতের বড় বড় ফোঁটা দূতপ্রবরের সর্বাঙ্গে, তার নৌকার গলুইয়ে এবং তার পাশের একরকম মেটেনীল তরল জাজিমে দ্রম্নত পড়তে থাকে। স্ত্রী-পুত্র-কন্যার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না-পারায় তখনই বুঝি তাঁর মনে এসেছিল ‘‘যদি বৃষ্টি না-থামে?’’ এর জন্যে তাঁকে খেসারত দিতে হয়েছিল। তাঁকেও গৃহত্যাগ করতে হয়েছিল।

একটি মাত্র নৌকাতেই সব তুলেছিলেন পিতা। অনুমিত কাঁসা-পিতল ইত্যাদিতে ভরা সিন্দুকটিসহ তোরঙ্গটিও। কী ছিল ওই তোরঙ্গে, কি কাঠের সিন্দুকে – কেউ দেখেনি। অবশ্য বিপত্নীক প্রৌঢ় যে বিপুল স্বর্ণসম্ভার সঙ্গে নিয়ে চলেছিলেন এমন কেউ মনে করেনি। তবুও সকলের চোখের সামনে না-দেখা কাঠের সিন্দুক কতিপয় কি এক কালো তোরঙ্গ তাঁর নৌকায় তোলা উচিত হয়নি। উচিত ছিল তাঁরও ওই পস্নাবনকালেই যাত্রা শুরু করা। জলপৃষ্ঠে পদযাত্রা সম্ভব না হলেও জলপৃষ্ঠে নৌযাত্রা অনেক সহজ ছিল। কিন্তু হেমমেত্মর ধানকাটা প্রান্তর ধুধু করবে তরণীর দুপাশে বুঝে উঠতে পারেননি কেরায়া জোগাড় করতে সময় কেটেছিল বলেই। আর তাই খানপুরের মোহনায় বড়ো গাঙ ছেড়ে নদীতে উঠবার মুখে নৌকাটি আটকে যায়। খরায় এই চরার দুপাশে নদীর ধারা শীর্ণ – যারা জানতো তারা আদৌ বিস্মিত হয়নি। অমনই হওয়ার কথা। নৌকা ঠেলে অগভীর ধারা পার করাবার জন্য কাঠের সিন্দুকটি তীরে নামাতে হয়েছিল। তোরঙ্গটিকেও।

মফস্বল শহরের দুই ঘরের ভাড়া বাসায় সবকটি সিন্দুক রাখবার জায়গাও হয়তো ছিল না। এজন্যে সিন্দুককটির মালামাল আমি কখনো চোখে দেখিনি। কিছু তো ছিল নিশ্চয়ই। কালো তোরঙ্গটিতে। সেটি তো চোখে দেখেছি। এমন তো ভাবাই চলে যে খুলে না-দেখলেও অজ্ঞাত বস্ত্ত ঠিকই ছিল। তাছাড়া মফস্বল শহরের এ-বাসা থেকে ও-বাসা বদল করার সময়ে সবকটি সিন্দুক কি তোরঙ্গ যে সঙ্গে যাবেই এমন না-ও হতে পারে। আর দু-ঘরের বাসা যখন একঘরে নেমে আসে পুত্রদুটিকেও যখন কাছে রাখা যায় না, অন্যের আশ্রয়ে দিয়ে দিতে হয়, তখন সিন্দুক কি তোরঙ্গের খবর কে রাখে।

নৌকাযাত্রায় ভিন্ন শহরে আসবার পরেই দুটি ঘটনা তাঁকে বিভ্রান্ত করে। তাঁর দ্বিতীয় দ্বার পরিগ্রহণ এবং উপার্জনহীন জীবন। কাঠের সিন্দুক যে-কটাই থাকুক তাদের অন্তর্গত মালামাল জীবনকে অনেক দূর নিয়ে যায় না।

 

তিন

একটু আগে তিনি ঘুম থেকে উঠেছেন। উঠে, মাথার বালিশের নিচে হাত দিয়ে একটা লাল রঙের চ্যাপটা কৌটো আর দেশলাই বের করেছেন। তারপর বিড়ির ধোঁয়ায় যখন ঘরের মধ্যেকার ভোরের আলো আবছা হয়ে আসে তখন বিছানা ছেড়ে ওঠেন। ঘরে ভোরের আলো একেই তো কম আসে, তার ওপর বিড়ির ধোঁয়া, পাশে শোয়া  সঙ্গিনী এতোক্ষণ নাক-মুখ ঢেকে শুয়ে থাকলেও আর পারে না। উঠে বিছানা থেকে নেমে দ্রম্নত হাতে জানালা খুলে দেয়।

‘‘খুলো না, খুলো না’’ বলতে বলতেই জানালা দিয়ে আসা আলো দিনকে স্পষ্ট করে। প্রায় আতংকিত তিনি দ্রম্নত প্রাতকৃত্য সমাপনের জন্যে দরজা খুলে বাইরে যান, ফিরে আসেন এবং রাতের খুলে রাখা পোশাক আবার পরে নেন। সামান্য আহার্য কিছু আছে কিনা জিজ্ঞাসা না-করেই সদর দরজা খুলে বাইরে পা রাখেন এবং সামান্য এগোলেই যার মুখোমুখি হন তাকে এড়ানোর জন্যেই প্রাতঃভ্রমণের আয়োজন।

‘‘এই যে, এতো সকালে, কোথায় চললেন?’’

প্রশ্নকর্তার মুখের দিকে তাকাতেই হয় এবং সামান্য হাসির সঙ্গে ‘‘এই একটু হাঁটাহাঁটি আর কী।’’ কথা শেষ হবার আগেই ‘‘তা হাঁটুন, আমার কথা মনে আছে তো?’’ বলে অপরজন তাকে থামিয়ে দেয়।

রাস্তার মাঝখানে বসে পড়াই হয়তো উচিত ছিল তাঁর; কিন্তু এমন করা যায় না ভেবে মহাজনের হাত দুটি ধরতে একটু এগিয়ে যান, ‘‘আর দুটি দিন -।’’

‘‘অনেক হয়েছে, আর নয় – যা করার করুন।’’

চোখ বন্ধ করে ঘরের চারপাশ দেখেন তিনি। না-দেখা কাঠের সিন্দুকটি এবং কালো তোরঙ্গটিতে চোখ পড়ে তার। তখন আর কিছুই করার থাকে না।

 

চার

বাসা থেকে কোমরে দড়ি বেঁধেই নাকি পুলিশ থানায় নিয়ে গিয়েছিল তাঁকে। ছাড়পত্রের দরখাসেত্ম ভুল ঠিকানা ব্যবহার করা এতো বড় অপরাধ, জানা ছিল না তাঁর। তাই পাড়ার শেষে ঘাসের জাজিমপাতা মাঠটুকুও পার হতে অনেক সময় লেগেছিল তাঁর। কেননা পায়ের নিচে চাপা পড়া ঘাস কোনোমতে মাথা নিচু করতে চাইছিল না।

শুনেছিলাম থানা থেকে বেরিয়ে সোজা ঘরে আসেন তিনি। কারো সঙ্গে দেখা না-করেই। পরদিনই বড় শহরে এবং সেখান থেকে ভিন্ন ছাড়পত্র সংগ্রহ করেই নদীর ওপারে চলে যান। আমাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, কালো তোরঙ্গটি বড় শহরের এক পরিচিতের কাছে রইলো, যদি মনে হয় নিয়ে যাই যেন। কৈশোরে পরাশ্রয়ী, যৌবনে অনিকেত আমার ওই তোরঙ্গর কোনো প্রয়োজন ছিল না। রাখবার কোনো স্থান ছিল না এজন্যেই হয়তো।

 

পাঁচ

‘‘বৃষ্টি যদি আর না-থামে’’ এই কথা কয়েকবার অস্ফুটে বলেছিলাম। রিকশার পাদানি মাঝে মাঝে ডুবে যাচ্ছিল, এই জুতোজোড়া নিয়ে যাওয়া যাবে না জানতাম তবুও পা দুটো উঁচু করে সিটের ঠিক নিচে ঠেকিয়ে রেখেছিলাম। এতে বরং বিপদ আরো বেড়েছিল। চোরাগর্তে চাকা বসে গেলে সদ্যকৃত পোশাকটি জলপৃষ্ঠে নেবে যাবার ব্যবস্থা হয়েছিল কয়েকবারই। আর তখনই আরো একবার ‘যদি বৃষ্টি না-থামে’ অস্ফুটে বলেছিলাম।

ঘরে পৌঁছে সে-কথা আবার বললে আশপাশের কেউ চিন্তিতস্বরে বলে, ‘‘না মুশকিল হবে মনে হচ্ছে।’’ আর কিছুক্ষণ বৃষ্টি হলে তো গাড়িও যেতে পারবে না। আর গেলেই-বা কি, স্রোত যদি এ-পাশ দিয়ে এসে ও-পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় ইঞ্জিনের ওপর দিয়ে, তাহলে কী করা যাবে। ইঞ্জিনে জল ঢুকলে গাড়ি তো এক পাও নড়বে না। যে-বন্ধুর বদান্যে যানটির ব্যবস্থা হয়েছিল সে নিজেই যদি ঘর থেকে বেরুতে না-পারে, পাঁচ-মাথার মোড়ের সাগর যদি ঢেউয়ে উন্মাতাল হয়, তখন কী করা?

তিনদিন আগেই ভুলটি করেছিলাম। সমুদ্রযাত্রার কারণেই সম্ভবত বড়ো ঘরের চালা থেকে নেমে জলপৃষ্ঠে পদযাত্রার কথা মনে পড়েছিল এবং প্রথমে শব্দ করে নয়, নিঃশব্দেই বলেছিলাম, ‘‘যদি বৃষ্টি না-থামে’’। সে-কথাও নিশ্চয়ই কেউ শুনেছিল, তাই পরমুহূর্তেই গাছপালার মাথা কাঁপিয়ে ধোঁয়াটে চাদরে তাদের ঢেকে নিয়ে আরো জোরে এসে জানালায় আঘাত করেছিল বারিধারা, ঝড়ো বাতাসকে সঙ্গে নিয়ে।

‘‘তুমি গিয়েই বাসা ঠিক করবে কিন্তু’’, সমন্তানটির হাত ধরে তার মা আমাকে বলেছিল। জানালার ফাঁক দিয়ে গলে আসা বৃষ্টির ছাঁট হাতে ধরার চেষ্টায় ছিল শিশুটি। আমি তার দিকে তাকিয়ে ‘‘একসাথে গেলেই ভালো করতাম, জানো’’ বলি।

‘‘না, আত্মীয়ের গলগ্রহ হবো না।’’ একই কথা। সে-ও বলে, আমিও বলি। অথচ এমন করে থাকা যায় না। সে-ও জানে, আমিও জানি।

‘‘কিন্তু একা কী করে গোছাবে সব?’’

‘‘যা পারি নেব। আর কিই-বা আছে নেবার। কিছু বিক্রি করতে না-পারলে বাড়িওয়ালা নেবে।’’

যাত্রার এখনো কয়েক ঘণ্টা বাকি, গলির মুখ থেকে তোড়ে ছুটে আসছে স্রোত – ঢেউ নিয়ে। একটির ওপরে আর-একটি। হাঁটু ডুবেছিল অনেক আগেই। এখন কি ডুববে কোমর?

বাক্স দুটি গোছানো প্রায়। শেষ মুহূর্তে যদি কিছু ঢোকাতে হয়, এজন্যে তালা লাগানো হয়নি। এখনো শুভার্থী যাঁরা বিদায় জানাতে এসেছিলেন প্রফুলস্নতার মাঝেও তাঁদের মুখে উদ্বেগ দেখা যায়। ঘরে তো ফিরতে হবে সবাইকেই। এখন যা মনে হচ্ছে, ফেরার পথে রিকশাও পাওয়া যাবে না। সিএনজি তো নয়ই। এই গলির স্রোত ঠেলে বড় রাস্তায় গিয়ে সেটি ধরাও খুব সহজ নয়। সদা আমুদে বন্ধুটি জানালার শার্সির প্রায় ভেঙে পড়ার আওয়াজকেও হাসিতে উড়িয়ে দিতে চায়, ‘‘আজ না-হয় কাল বৃষ্টি তো থামবেই। এত ভাবনা কিসের?’’

বর্ষাতি গায়ে ছাতা মাথায় গাড়ির মালিক সুহৃদ দরজা দিয়ে ঢোকে। ‘‘ওঃ কি বৃষ্টি! তোমাদের রাস্তায় ঢোকাই যায় না প্রায়।’’

আমি বিভ্রামেত্মর মতো তাকাই। এবারে স্পষ্ট করে বলি, ‘‘যদি বৃষ্টি না-থামে।’’ আর তখনই, ঠিক তখনই কালো তোরঙ্গটির কথা মনে হয়। এই শহরে হয়তো আমার অনেককাল আসা হবে না। হয়তো কখনোই নয়। তাহলে তোরঙ্গটি?

বন্ধুকে বলি, শেষ কাজটি করে দাও ভাই। আমার কালো তোরঙ্গটি এনে দাও। নিয়ে যাই।

পরম বিস্ময়ে কারো মুখে কথা আসে-না যেন। যদিও কালো তোরঙ্গটির কথা সবাই জানতো। ‘‘কী আছে ওর মধ্যে? এই বৃষ্টিতে, ঝড়ে কোনোমতে সেটি আনা যাবে না।’’

স্ত্রীও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। যদিও সে জানে আমি আর ফিরবো না। একাই যেতে হবে তাকে আমার কাছে।

এতোকাল পরেও দেখি, কিছুই মোছেনি, কিছুই ঝাপসা নয়। জলপৃষ্ঠে পদযাত্রার সব দৃশ্যই যেন দেখতে পাই আমি।

‘‘জানি ওতে কিছুই হয়তো নেই। তবুও ওটিকে নিয়ে যাই।’’

যাত্রার তখনো বেশ দেরি আছে। গন্তব্যও বেশি দূরে নয় ভেবে বন্ধুর সঙ্গে বেরোই। ডোবা রাস্তায় অস্বসিত্মর আওয়াজ তুলে গাড়িটি যেতে থাকে।

গন্তব্যে পৌঁছে দেখি বাড়ির সামনের ঘাসের লন বৃষ্টিতে ডোবা। সেটি পার হয়েই ঘরে ঢুকতে হয়। পায়ে চলার রাস্তাটি কোনোমতে নজরে পড়ে না।

জলে ডোবা ঘাসের জাজিম মাড়িয়েই না-হয় গাড়িতে উঠবো ভেবে তোরঙ্গটিকে নিয়ে বারান্দা থেকে নামি। অতি মহার্ঘ্য কি অতি তুচ্ছ কিছুরই ওজন থাকে না – এটিরও ছিল না। তাই সহজেই বারান্দা থেকে নামি। আর ঠিক তখন, জলে-ডোবা-ঘাসে পা রাখার মুহূর্তে পিতার কথা মনে পড়ে – একটি তৃণশীর্ষও তাঁর পায়ের নিচে চাপা পড়েনি বলে তিনি তোরঙ্গটিকে সঙ্গে নিতে পারেননি।

তবুও ঘাসে পা রাখি। চোখ বুঁজি – যেন না-দেখি একটি পা তুলে আর-একটি পা পাতার মুহূর্তে তৃণশীর্ষ মাথা নোয়ায় কি-না। নাকি ধমক দিয়ে বলে, ‘‘অমন করে কে যায়? কে যায়? কে?’’

Leave a Reply

%d bloggers like this: