বাংলাদেশের সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং সংস্কৃতিজগতের প্রাতিস্বিক এক সাধকের নাম তোফাজ্জল হোসেন (১৯৩৫-২০১৫)। ভাষাসংগ্রামী হিসেবে তাঁর পরিচয় সমধিক উজ্জ্বল। কবি, গদ্যনির্মাতা এবং গীতিকার হিসেবে তিনি রেখেছেন স্বকীয় প্রতিভার স্বাক্ষর। তাঁর শিল্পীসত্তায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চেতনা সর্বদা সক্রিয় থেকেছে। এ-কারণে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্মৃতি-অনুষঙ্গ এবং অবিনাশী চেতনা পৌনঃপুনিক শিল্পিতা পেয়েছে তাঁর লেখালেখিতে। অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী চেতনায় সন্দীপিত ছিলেন তোফাজ্জল হোসেন। প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশে তিনি পালন করেছেন এক ঐতিহাসিক ভূমিকা। অথচ নিজেকে তিনি সর্বদা আড়াল করে রাখতেন – সর্বদা নিমগ্ন থাকতেন অধ্যয়ন, লেখালেখি আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। তোফাজ্জল হোসেন প্রকৃত অর্থেই ছিলেন পরম নিভৃতচারী এক সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধক। 

সাহিত্যসাধক তোফাজ্জল হোসেন বেঁচেছিলেন আশি বছর – এর মধ্যে ষাট বছরেরও বেশি সময় তিনি ব্যস্ত ছিলেন সৃষ্টিশীল কাজে, নিয়োজিত ছিলেন প্রগতিশীল সংস্কৃতি বিকাশের সংগ্রামে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, ক্রীড়া, শিশু-সংগঠনসহ নানা ক্ষেত্রে দীর্ঘ পঁয়ষট্টি বছর ধরে তিনি নিষ্ঠভাবে কাজ করে গেছেন। বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে তিনি গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, মুকুল ফৌজ, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, শিশু কল্যাণ পরিষদ, জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট, সাংবাদিক ইউনিয়ন – এসব   সংগঠনের কর্মকাণ্ডে তোফাজ্জল হোসেন সবিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি, অজিত গুহ স্মৃতি পরিষদ, মোহাম্মদ মোদাব্বের-হোসনে আরা স্মৃতি পরিষদ এবং আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন তোফাজ্জল হোসেন। তিনি ছিলেন জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড, চলচ্চিত্রবিষয়ক জাতীয় জুরি বোর্ড ও চিত্রনাট্য কমিটির সক্রিয় সদস্য।

বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থায় নানা ধরনের কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তোফাজ্জল হোসেন। মালয়েশিয়ায় এআইবিডিরও একাধিক প্রশিক্ষণ কোর্সে শিক্ষক হিসেবে তিনি কাজ করেন। তিনি ছিলেন বিশ^ব্যাংক ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট এবং বিআইডিএসের সম্মানিত ফেলো।

সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অনন্যসাধারণ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি তাঁকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ দিয়ে সম্মানিত করে। সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনায় অবদানের জন্য তোফাজ্জল হোসেন নানা পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হন। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য – সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ভাষাসৈনিক সম্মাননা, ঋষিজ পদক, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ও গ্রিন ইউনিভার্সিটি প্রদত্ত সম্মাননা, কুমিল্লা সংস্কৃতি উৎসব কর্তৃক সম্মাননা, সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর কর্তৃক প্রদত্ত সম্মাননা এবং রাষ্ট্রীয় একুশে পদক (২০১৩)।

বাংলাদেশে স্বাধীন গণমাধ্যম বিকাশে তোফাজ্জল হোসেনের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদফতরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সদর্থক ভূমিকা পালন করেছেন। সরকার এবং গণমাধ্যমের মধ্যে সেতুবন্ধনকারীর দায়িত্ব পালন করেছেন তোফাজ্জল হোসেন। নিজের বিবেক ও বিবেচনাকে সব সময় প্রাধান্য দিতেন তিনি, প্রকৃত তথ্য জানাতে কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করতেন না। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর এই নিষ্ঠা ও সৎসাহসের কারণে তোফাজ্জল হোসেন সকলের কাছেই হয়ে উঠেছিলেন শ্রদ্ধেয় মানুষ। কেবল নিজে নয়, তরুণ সাংবাদিকদেরও তিনি আপন জীবনাদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে সদা সচেষ্ট ছিলেন।

 তোফাজ্জল হোসেন ছিলেন বন্ধুবৎসল সজ্জন মানুষ। কৌতুক আর রসবোধ ছিল তাঁর স্বভাবের বিশিষ্ট এক দিক। তোফাজ্জল হোসেনের মানসচারিত্র্যের পরিচয় দিতে গিয়ে আনিসুজ্জামান লিখেছেন – ‘তোফাজ্জল হোসেন নিভৃতচারী ছিলেন, স্বল্পবাক ছিলেন কিন্তু তাঁর একটা প্রবল রসবোধ ছিল। তিনি নানা বিষয়ে অনেক কৌতুক করতেন, গল্প করতেন এবং নিজেকে নিয়েও কৌতুক করতে পারতেন।’১ তোফাজ্জল হোসেনের কথা বলতে গিয়ে সাংবাদিক আব্দুর রহিম লিখেছেন – ‘তোফাজ্জল হোসেন একজন নিভৃতচারী, একজন লেখক, সাংবাদিক। আত্মপরিচয় নিয়ে তিনি কখনো কারো কাছে যাননি।’২ গুণী এই মানুষকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সংস্কৃতিজন ও নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার লিখেছেন – ‘আমাদের সমাজে নিভৃতচারী মানুষ একেবারেই বিরল। আমরা যে যা কাজ করি তা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দশগুণ বাড়িয়ে বলার একটা প্রবণতা আছে। সেই ক্ষেত্রে  তোফাজ্জল হোসেন সাহেব একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। … তাঁর প্রধান পরিচয় একজন ভাষাসংগ্রামী হিসেবে। কিন্তু আমরা যারা তাঁর পরের প্রজন্মের মানুষ তারা অনেক দিনই জানতাম না, তিনি ভাষাসংগ্রামী। যখন জেনেছি তখন মুগ্ধ ও বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়েছি।’৩ তোফাজ্জল হোসেনের মানসচারিত্র্যের পরিচয় দিতে গিয়ে শাহরিয়ার কবির লিখেছেন : ‘ভাষা আন্দোলনের ফসল বলতে যে শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের গণ্য করা হয়, নিঃসন্দেহে কবি, লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তোফাজ্জল হোসেন তাঁদের অন্যতম, যিনি ছিলেন কিছুটা নিভৃতচারী। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সব প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত থাকলেও কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না প্রচারবিমুখ স্বল্পবাক এই মানুষটি।’৪

দুই

কবিতাই তোফাজ্জল হোসেনের সৃষ্টিশীলতার প্রধান মাধ্যম। পঞ্চাশের দশক থেকে আরম্ভ করে জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তিনি কবিতা লিখেছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চেতনা, দেশপ্রেম আর মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী স্মৃতি তোফাজ্জল হোসেনের কবিসত্তার কেন্দ্রীয় প্রেরণাউৎস। তোফাজ্জল হোসেনের প্রতিটি কাব্যগ্রন্থেই আছে একুশকেন্দ্রিক কবিতা। তাঁর একুশ ভুবনময় (২০০৫) শীর্ষক কাব্যগ্রন্থটি তো শুধু একুশকেন্দ্রিক কবিতার সমাহারেই বিন্যস্ত। একুশের স্মৃতির প্রতি কবির গভীর ভালোবাসা অনেক কবিতায় শিল্পিতা পেয়েছে। ‘একুশ অনন্ত এক’ কবিতায় কবি লিখেছেন – ‘একুশে ফেব্রুয়ারি,/ এক অন্তে অশ্রুসিক্ত অন্য প্রান্তে আগ্নেয় বলয়,/ তিমির হননে দীপ্ত, মুক্তির সনদ/ অতীত ও বর্তমানে সতত সিঞ্চিত,/ স্পন্দমান একুশে ফেব্রুয়ারি,/ জনতার সারিবদ্ধ অফুরন্ত কাতারে মিছিলে,/ একাত্ম সতীর্থ হয়ে একুশকে শ্রদ্ধাঞ্জলি ভরে,/ ভক্তি-প্লুত হৃদয় শোণিতে,/ জানাই অন্তরঢালা হাজারো সালাম।’৫ উনিশশো বায়ান্ন সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ধারণ করে দেশজুড়ে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য শহিদ মিনার। একুশের স্মৃতিবহ শহিদ মিনার বিশ^-মানবেরই অনন্য উত্তরাধিকার। তোফাজ্জল হোসেনের একাধিক কবিতায় ভাষা-আন্দোলনের গৌরববহ শহিদ মিনারের উপস্থিতি লক্ষণীয়। প্রসঙ্গত স্মরণ করতে পারি ‘শহিদ মিনার’ শীর্ষক কবিতার নিম্নোক্ত চরণগুচ্ছ :

বায়ান্ন, একাত্তর, ঊনআশি, নব্বই জ্বলন্ত স্বাক্ষর,

বেয়নট বুলেট বা অস্ত্রের ঝঙ্কার,

সবকিছু পুড়ে ছাই জনতার রোষ-বজ্রানলে,

কেঁপে ওঠে দুঃশাসন, পাল্টে যায় সমস্ত তল্লাট,

বাংলার জনতার আগুয়ান অগ্রযাত্রায়,

দামাল ছেলের দল রচে চলে নয়া ইতিহাস,

যুগে যুগে রক্ত লেখনীতে,

অনন্য দ্যুতিতে দীপ্ত;

এর মাঝে আছে একদিন,

একুশে ফেব্রুয়ারি,

সংগ্রামের সাধনায় বেদনার হৃদয়স্পন্দন,

শহিদ মিনার,

সেইখানে পুঞ্জীভূত হৃদয় নিংড়ানো প্রেম

অনাবিল শ্রদ্ধার্ঘ্য পুষ্পের পাহাড়।

 (‘শহিদ মিনার’)

বাংলা ভাষার প্রতি কবি তোফাজ্জল হোসেনের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা অপরিসীম – বাংলা ভাষা কবির সত্তার অবিচ্ছেদ্য সম্পদ। বাংলা ভাষা কবিকে শোনায় জেগে ওঠার অবিনাশী মন্ত্র, বাংলা ভাষা কবির চেতনায় জাগ্রত করে আশা, আশ^াস আর ভরসার অমলিন সুরমূর্ছনা। ‘বাংলাভাষা’ শীর্ষক কবিতায় শব্দরূপ পেয়েছে কবির মাতৃভাষাপ্রীতির গভীর অনুরাগ : ‘আমার আত্মার ধ্বনি যেই মন্ত্রে উচ্চকিত/ যেই স্বরে উচ্চারিত সদাবাক্সময়;/ সে আমার মাতৃভাষা বাংলাভাষা মাতৃস্বরূপিণী,/ আমার বেদনাগাথা উন্মথিত অনুভূতি/ সেই শব্দে চিরন্তন হয়/ সে আমার মাতৃভাষা বাংলাভাষা আশা মূর্তিময়ী,/ আমার সাধনাসিক্ত কাব্যকথা সুরধন্য সংগীত মূর্ছনা,/ যেই তন্ত্রে মূর্ছিত উদ্বেলিত হয়, সে আমার মাতৃভাষা বাংলাভাষা চিরসত্তাময়।’ তোফাজ্জল হোসেনের একাধিক কবিতায় শিল্পরূপ পেয়েছে স্বদেশের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের কথা। বাংলার অবারিত প্রকৃতি আর সংগ্রামশীল জীবন কবির হাতে লাভ করে একাত্মসত্তা :

আমার বাংলার গান হৃদয়ের মথিত নির্যাস,

নিজস্ব ভুবন এক – যেখানে আকাশ

শ্যামল মাটিতে মিশে রচিয়াছে বিশ^চরাচর.

যা এক আপন বিশ^ শুধু আমাদের

শতপুরুষের অস্থিমজ্জা দিয়ে গড়া,

শতসাধকের পুণ্য পলিমাটি বয়ে,

আমার দেহের মাটি এদেশের হয়ে

রচিয়াছে আমার স্বদেশ,

শতসাধনার ধন অনন্ত অশেষ,

দুঃখ প্রেম বেদনা বীরত্বগাথায়

জাগ্রত স্বদেশ জাগে

কোটি কোটি জাগ্রত আত্মায়।

(‘স্বদেশ ভুবনে আমি’)

স্মৃতিমুগ্ধতা কবি তোফাজ্জল হোসেনের কবিতার একটি বিশিষ্ট প্রবণতা। যেসব মানুষ তাঁকে সন্দীপিত করেছে, করেছে আলোড়িত – যাঁদের সাধনা ও ত্যাগে গড়ে উঠেছে আমাদের এই স্বপ্নের স্বদেশ, কবি পৌনঃপুনিক তাঁদের কথা স্মরণ করেছেন কবিতায়। বন্ধুদের নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন তোফাজ্জল হোসেন। এসব কবিতার মধ্যে ‘স্মৃতিতে অমøান’, ‘খেলার সাথিরা’, ‘বিদায় বন্ধুগণ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হৃদয় রক্তরাগে (২০০২), একুশ ভুবনময় (২০০৫) এসব কাব্যের উৎসর্গপত্রেও আছে বন্ধু-স্মৃতির অনুষঙ্গ। স্মৃতির সরণি বেয়ে কবি পৌঁছাতে চেয়েছেন আলোকিত স্বদেশভূমিতে। তাই যেসব স্মৃতি জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, কবি সেসব স্মৃতিকেই করে তুলেছেন তাঁর কবিতার উপাদান। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণীয় ‘স্মৃতিতে অমøান’ কবিতা। সন্দীপিত স্মৃতি কবির হাতে পায় নতুন ব্যঞ্জনা :

অনেক মুখের ভিড়ে যে মুখ হারিয়ে গেছে

তারে আমি খুঁজে খুঁজে ফিরি,

শিমুল পলাশ বনে শাল শিরীষের ভিড়ে

কিংবা হাটে মাঠে বৈশাখী মেলায়,

…       …       …

সেখানে বরকত আছে

সেখানে সালাম আছে

রয়েছে আসাদ,

সিরাজউদ্দিন হোসেন আর নিজামউদ্দিন,

আলতাফ মাহমুদ কিংবা জহির রায়হান,

শহীদুল্লা কায়সার ও গুহঠাকুরতা

মুনীর চৌধুরী আর মোফাজ্জল হায়দার;

দুর্দম সাহসী বীর সার্জেন্ট জহুর, মতিউর,

শামসুজ্জোহা, ডাক্তার মিলন,

গিয়াসউদ্দিন, নাজমুল ও শহীদ সাবের

নাম-জানা-অজানা ও অফুরন্ত অশ্রুত জনেরা।

(‘স্মৃতিতে অমøান’)

ইতিহাসচেতনা কবি তোফাজ্জল হোসেনের কবিতার বিশিষ্ট এক লক্ষণ। ইতিহাসের বিশাল প্রেক্ষাপটে তিনি উপলব্ধি করতে চেয়েছেন জগৎ ও জীবনকে। বিরূপ সময়কে অতিক্রমের জন্য কবি তোফাজ্জল হোসেনকে অন্তহীন প্রেরণা দিয়েছে সভ্যতার  প্রবহমানতাবোধ ও ইতিহাসজ্ঞান। ইতিহাসের প্রবহমানতায় তিনি খুঁজে পেয়েছেন ‘অন্তহীন বলদৃপ্ত উতরোল অগ্রাভিযানে’র আহ্বান – ইতিহাসের বিশাল ডানায় ভর করেছেন বলে মাইক্রো চেতনা তাঁকে কখনো গ্রাস করেনি, বরং ম্যাক্রো-ভাবনায় জীবনকে পৌঁছে দিয়েছেন মহাজীবনের স্রোতে। সমকালীন অন্য কবিদের মতো কবি তোফাজ্জল হোসেনকে কখনো হতাশা, নির্বেদ ও নিঃসঙ্গতা গ্রাস করতে পারেনি। ইতিহাসই তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে তিমিরবিনাশী উৎস – ইতিহাসই তাঁর কাছে কালিক বিপন্নতা অতিক্রমণের অফুরান শুশ্রƒষাপ্রলেপ – এই বিশ্বাসেই তিনি উচ্চারণ করেন অসামান্য এই বাণী, মনে হয় যেন বেদমন্ত্র :

ইতিহাস আবর্তিত চলমান সভ্যতার চাকা,

অনাদি অতীত থেকে বর্তমান চৌহদ্দি পেরিয়ে

অবিরাম অনাগত আগামীর পানে,

শ্রম ধ্যান কল্পনার সুমহান সাক্ষ্য বুকে নিয়ে

ইতিহাস চলমান মহাকাল স্রোত,

শাশ^ত সৌন্দর্যদীপ্ত পুরাকীর্তি স্থাপত্য মহান

মাটির গহিন বুকে নীরবে ঘুমায়,

কভু বা প্রাণের স্পর্শে কথা কয়ে ওঠে,

ময়নামতির স্তূপে,

শালবন বিহারের ছায়ে,

মহেঞ্জোদারোর কালে,

হরপ্পা কি মহাস্থানগড়ে,

নীল, সিন্ধু, সুমেরু কি টাইগ্রিস, ইউফ্রেটিস তীরে,

গান্ধারা বা অজন্তার পর্বত কন্দরে,

সভ্যতার কত চিহ্ন অক্ষত অমর,

অনির্বাণ শিখা জ্বেলে জ্বলন্ত ভাস্বর।

                   (‘সময়ের সিঁড়ি বেয়ে’)

তোফাজ্জল হোসেন মানবতাবাদী কবি, – মানুষের সামূহিক মুক্তিই তাঁর পরম অন্বিষ্ট। সাম্রাজ্যবাদ আর উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার কবি স্বপ্ন দেখেন সকল শৃঙ্খল ছিন্ন করে মানুষ সংঘবদ্ধভাবে এগিয়ে চলেছে মুক্তির মিছিলে। এই সূত্রেই তাঁর কবিতায় শোনা যায় সংঘচেতনার গান। মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে কবি তোফাজ্জল হোসেন সম্মুখসারির শব্দযোদ্ধা।

পৃথিবীটাকে মানুষের বাসযোগ্য করার মানসে তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন মানবাধিকারের কথা। এই সূত্রে তাঁর কবিতায় ধ্বনিত হয় বিশ্বাত্মবোধের স্বরগ্রাম। বিশ^াত্মচেতনায় কবি তোফাজ্জল হোসেন ঘোষণা করেন মানবাধিকারের এই শাশ^ত ইশতেহার : ‘এ পৃথিবী মানুষের বাসযোগ্য হতে হলে,/ চাই সব মানুষের সম অধিকার,/ সাদা-কালো, নারী-পুরুষ, ছেলেশিশু-মেয়েশিশু,/ আদিবাসী, পঙ্গু খঞ্জ নির্বিশেষে/ চাই সম অধিকার,/ শুভবুদ্ধি মানুষের সমস্বরে আজ এই বজ্রকণ্ঠ দাবি :/ চাই সম অধিকার,/ চাই মানবাধিকার/ চাই সম অধিকার/ সবার সবার সবার জন্যে/ সম অধিকার/ সম অধিকার/ সম অধিকার।’ (‘মানবাধিকার’)

তিন

কবিতার মতো সংগীতকেও তোফাজ্জল হোসেন বেছে নিয়েছেন তাঁর সৃষ্টিশীল চেতনা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে। আমাদের দেশে যেসব কবি কবিতার পাশাপাশি গানও রচনা করেছেন, তোফাজ্জল হোসেন তাঁদের অন্যতম। সংগীতে তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর অন্তর্লোকের নানা ভাবনা – যে-ভাবনার কেন্দ্রীয় ভরকেন্দ্রে আছে একুশের চেতনা ও স্বদেশানুরাগ। প্রসঙ্গত স্মরণযোগ্য, ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান-সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী গ্রন্থে গ্রথিত হয়েছিল আঠারো বছরের তরুণ গীতিকার তোফাজ্জল হোসেনের উদ্দীপনাধর্মী ঐতিহাসিক এক গান। ওই গানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকচক্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে কবি উচ্চারণ করেছেন বাঙালির সমুত্থিত জাগরণের বিজয়গাথা। কবি চিরজ্যোতি অমøান একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করেছেন এভাবে :

রক্তশপথে আমরা আজিকে তোমারে স্মরণ করি

                                একুশে ফেব্রুয়ারি

দৃঢ় দুই হাতে রক্তপতাকা ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরি

                            একুশে ফেব্রুয়ারি

                       তোমারে স্মরণ করি ॥

…                   …                  …

আজো ভুলি নাই সেদিনের সেই সংগ্রামী অভিযান

আজো ভুলি নাই সেদিনের সেই অমর শহীদ প্রাণ

আজো অলক্ষ্যে তাহারা জানায় উদাত্ত আহ্বান

তাইতো আমরা সেই একই পথে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ি ॥

একুশে ফেব্রুয়ারিকে কবি তোফাজ্জল হোসেন বাঙালির আত্মজাগরণের শক্তি-উৎস হিসেবে শনাক্ত করেছেন – শনাক্ত করেছেন সম্মুখযাত্রার সংগ্রামী পাথেয় হিসেবে। কবির পঙ্ক্তিমালায় তাই ধ্বনিত হয় শক্তি-জাগানিয়া এই বাণী : ‘একুশ মানেই মাথানত করা নয়/ একুশ মানে না জানে না তো সংশয়/ একুশ পরম বিজয়ের হাতিয়ার/ পথের পাথেয় সম্মুখ যাত্রার।’ কবির ভাবনায় ধরা দেয় অতুল এই প্রত্যয় – বাঙালির সব শুভ কাজের সূচনায় অলক্ষে এসে হাত মেলায় একুশে ফেব্রুয়ারি। বাঙালির চেতনায়, বাঙালির স্বপ্নে ও জাগরণে বাঙালির প্রতিদিনের জীবনযাপনে অবিরাম প্রেরণা দিয়ে যায় একুশে ফেব্রুয়ারি। এই ভাবনারই সাংগীতিক উচ্চারণ তোফাজ্জল হোসেন নির্মাণ করেন এভাবে :

একুশে চেতনা প্রাণের পরতে অবিরাম বয়ে যায়

সারাটি বছর ফল্গুধারায় গুন গুন গান গায়।

শয়নে স্বপনে নিশি জাগরণে

একুশের গানে একুশের ধ্যানে

আমরা বাঁচি ও মরি,

একুশ সতত স্পন্দিত সব শুভ কাজ সূচনায়।

একুশে ফেব্রুয়ারির মতো একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধও গীতিকবি তোফাজ্জল হোসেনের সাংগীতিক প্রতিভাকে সতত প্রাণিত করে। তাঁর বহু গানে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আছে একাত্তরের স্মৃতি-অনুষঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী শহিদদের কবি স্মরণ করেছেন গানের পঙ্ক্তিমালায়, গানের চরণগুচ্ছে ধ্বনিত হয়েছে বাঙালির শৌর্য, বীর্য আর পুরুষকারের কথা। শহিদের বুকের লাল রক্তই মিশে আছে বাংলাদেশের পতাকায়। এমন প্রত্যয় থেকেই কবি নির্মাণ করেন অসামান্য এই পঙ্ক্তিগুচ্ছ : ‘শত শহীদের রক্তে রাঙানো/ লাল সূর্যটা এসে/ আমার দেশের ঘন সবুজের পতাকায় গেল মিশে।/ চিরদিন তাহা রবে উড্ডীন/ রবে উন্নত রবে অমলিন/ আমার স্বদেশ বিশ্বসমাজে/ নতুন এক দেশ জুড়ল।’ স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পঁচাত্তরে ঘাতকচক্রের হাতে শহিদ হলে কবি তোফাজ্জল হোসেন গভীরভাবে মর্মাহত হন। স্বৈরাচারী শাসকদের হাতে স্বদেশ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, কবি তখন সাংগীতিক ব্যঞ্জনায় সামূহিক মুক্তির বাসনায় বঙ্গবন্ধুকে আবার ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন, উচ্চারণ করেছেন এই আকাক্সক্ষা :

হে মহানায়ক একবার আসো একবার আসো ফিরে

দিক্ভ্রান্ত এ কোটি জনতার গড্ডলিকার ভিড়ে ॥

…                  …                    …

দেশমাতৃকা দিনক্ষণ জপে তোমার প্রতীক্ষায়

হাতছানি দেয় দুলাল আমার ফিরে আয় ফিরে আয়

তুমি ফিরে এসে সান্ত্বনা দাও স্বদেশমাতৃকারে ॥

কবি তোফাজ্জল হোসেন একুশে ফেব্রুয়ারি, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা চেতনার পাশাপাশি আরো অনেক বিষয় নিয়ে গান রচনা করেছেন। ব্যক্ত হয়েছে যে, মানবতাবাদী চেতনা ছিল কবি তোফাজ্জল হোসেনের শিল্পীপ্রতিভার প্রধান প্রেরণা। মানুষের সামূহিক কল্যাণচিন্তাই তাঁর সৃষ্টিশীলতার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য। এই কল্যাণচিন্তা থেকে তিনি পরিবেশ নিয়ে গান  বেঁধেছেন – মানববান্ধব পরিবেশ রক্ষার জন্য সকলের প্রতি জানিয়েছেন আকুল আহ্বান। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় নিচের স্তবকগুচ্ছ :

ক.  সুন্দর এক পৃথিবী কাম্য শুভ্র সুনির্মল

শান্তস্নিগ্ধ সুষমাধন্য আলোয় সমুজ্জ্বল ॥

…           …            …

কালো হাত যত মহালোভাতুর

সংযত করো দানব অসুর

প্রাণ প্রয়োজনে গড়তেই হবে

            নিবিড় ধরণীতল ॥

খ.  বিশ^বিনাশী সর্বগ্রাসী মানুষের বাভিচার

বিনাশ করিয়া চলিয়াছে শুধু সম্পদ সমাহার।

        আজ তার রাশ টানতেই হবে

        এ পৃথিবী শুধু বেঁচে যাবে তবে

               না হয় সর্বনাশ

চারদিকে শুধু ধ্বংসযজ্ঞ উদ্যত নাগফণা ॥

           সাবধান সব হও হুঁশিয়ার

           নতুবা আসবে নিয়তির মার

                     পরম সত্য এই

পৃথিবী বাঁচাতে নিজেরা বাঁচতে হও সব একমনা ॥

ভবিষ্যতের সুন্দর পৃথিবী গড়ার প্রত্যাশায় কবি তোফাজ্জল হোসেন সংযুক্ত হয়েছিলেন শিশু-সংগঠনে, সংযুক্ত হয়েছিলেন জাতিসংঘ সমিতিতে। জাতিসংঘ বিষয়ে তিনি গান লিখেছেন, গান রচনা করেছেন শিশু-অধিকার বিষয়ে। পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টে নিহত শিশু শেখ রাসেলকে নিয়েও গান লিখেছেন তোফাজ্জল হোসেন। রাসেল হত্যার বিচার চেয়ে তিনি লিখেছেন এই পঙ্ক্তিমালা : ‘মায়ের কোলের শিশুটি আজ মাটির কোলে ঘুমায় (রে)/ রাসেল নামের সেই ছেলেটি কেমনে ভুলা যায় ॥/ আমরা আছি আছে সারা বিশ্ব মানবকুল/ ঘাতকদেরে চিনে নিতে করবে না কেউ ভুল/ মানবতার কাঠগড়াতে তাদের বিচার হবে/ ইতিহাসের কাছে তাদের শুধতেই হবে দায় (রে) ॥’

মৌলিক কবিতা রচনার পাশাপাশি বিদেশি কবিতার অনুবাদও করেছেন কবি তোফাজ্জল হোসেন। তিনি প্রধানত অনুবাদ করেছেন রুশ এবং প্রাচীন উর্দু কবিতা। যেসব কবির লেখা তোফাজ্জল হোসেন অনুবাদ করেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন স্টিফেন শিপাচেভ, রাসুল গামজাতভ, কাইসিন কলিয়েভ, মার্গারিতা আলিঘ, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, আল্লামা ইকবাল, শাহীর লুধিয়ানভি, হাবিব জালিব, আহমদ ফারাজ, মখদুম মহিউদ্দিন, আহমদ রাহি, ভিকার আম্বালাভি প্রমুখ। লক্ষণীয়, কবি তোফাজ্জল হোসেন রুশ এবং উর্দুভাষী কবিদের সেইসব কবিতাই অনুবাদ করেছেন, সেখানে শিল্পিতা পেয়েছে মানুষের সংগ্রামী চেতনা, যেখানে রূপায়িত হয়েছে নানা প্রকার শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মানুষের মুক্তির কথা। স্পষ্টত বোঝা যায়, কবি তোফাজ্জল হোসেন এইসব কবিতা অনুবাদের মাধ্যমে তাঁর অন্তর্গত মানবমুক্তির আকাক্সক্ষার কথাই উচ্চারণ করেছেন। নিজের মৌলিক কবিতায় যেমন প্রেম প্রসঙ্গ নেই, তেমনি অনুবাদের সময়ও তিনি এড়িয়ে গেছেন এ-প্রসঙ্গটি। জীবনভর তিনি প্রতাশা করেছেন মানুষের মুক্তি, কবি তাঁর সেই প্রত্যাশার উচ্চারণই খুঁজে পেয়েছেন প্রাচীন উর্দু কবি ভিকার আম্বালাভির পঙ্ক্তিমালায় :

মৃত্যুর মতো যন্ত্রণা নিয়ে আমি আর

কতদিন বাঁচব, কালবদলের পালা

শুরু হয়েছে, আমার রক্ত টগবগ করছে।

আমার ভুরু ঘেমে উঠছে, আমার শিরা হচ্ছে

যন্ত্রণাকাতর, আমার বুকে জ্বলছে আগুন,

বিপ্লব তুমি গর্জে ওঠো,

জেনো, আমি প্রস্তুত।

বিপ্লবের জন্য এই প্রস্তুতির মানসেই কবিতা ও গান লিখেছেন কবি তোফাজ্জল হোসেন। তিনি মানবতাবাদী কবি – মানুষের সার্বিক মুক্তিই তাঁর একান্ত কামনা। তোফাজ্জল হোসেনের কবিতা ও গান ওই মানবমুক্তিরই শিল্পিত ইশতেহার। নিজের অন্তর্গত আকাক্সক্ষায় তিনি কামনা করেছেন নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তি, প্রত্যাশা করেছেন নারী-পুরুষের সমানাধিকার – তাঁর কবিতা ও গান অনাগত কালের পাঠকের কাছে ধরা দেবে এই সত্যে :

আমি তোমাদের সকলের তরে

              রেখে যাব শুধু গান

যে গান আমার হৃদয়ের রঙে

              রাঙানো জ্যোতিষ্মান।

চার

কবিতা এবং সংগীতের পাশাপাশি গদ্য-রচনাতেও তোফাজ্জল হোসেন রেখেছেন প্রাতিস্বিক প্রতিভার স্বাক্ষর। গদ্য-রচনাতেও তাঁর প্রগতিশীল সমাজচিন্তা ও মানবতাবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। মানুষের জন্য বাসযোগ্য আগামী পৃথিবীর স্বপ্নই তোফাজ্জল হোসেনের গদ্য-রচনার প্রধান উপজীব্য। গদ্য-রচনায় তোফাজ্জল হোসেনের গবেষকসত্তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এ প্রসঙ্গে তাঁর জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ও আগামী পৃথিবী (২০০৩), বিপন্ন পৃথিবী বিপন্ন জনপদ (২০০৩), কাশ্মীর : ইতিহাস কথা কয় (২০০৩), শিশু : বিশ^ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট (২০০৩), জাতিসংঘ (২০০৭) প্রভৃতি গ্রন্থের কথা বলা যায়। জনসংখ্যার চাপে আগামী পৃথিবী কী ভয়াবহভাবে বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে, তা জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ও আগামী পৃথিবী গ্রন্থে তথ্য-উপাত্তের আলোকে উপস্থাপন করেছেন তোফাজ্জল হোসেন। জনসংখ্যা ও উন্নয়ন, জনসংখ্যা ও বিশ^-নিরাপত্তা, মানববান্ধব পরিবেশ ও জনসংখ্যা – এসব বিষয় এই গ্রন্থে বিশেষভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। একজন মানবপ্রেমিক সমাজবিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণে রচিত হয়েছে বিপন্ন পৃথিবী বিপন্ন জনপদ শীর্ষক গ্রন্থ। মানুষের সীমাহীন লোভ আর স্বার্থের কারণেই ক্রমশ বিপন্ন হয়ে উঠেছে মানুষের পৃথিবী। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে প্রাণ ও পরিবেশ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি : প্রতিক্রিয়া প্রেক্ষাপট, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ও ক্ষয়িষ্ণু বিশ^-সম্পদ, জনসংখ্যা-পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন, ভাবী পৃথিবীর নিরাপত্তা, পরিবেশ সংকট : কিছু কৌশলগত ভাবনা ইত্যাদি প্রসঙ্গ। এই বিষয়সূচি দেখেই অনুধাবন করা সম্ভব গ্রন্থটির মৌল-চারিত্র্য। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে : ‘প্রধানত মনুষ্য প্রজাতির কাণ্ডজ্ঞানহীন ক্রিয়াকর্মের অবধারিত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অনুপম সৌন্দর্যমণ্ডিত স্নিগ্ধ-শ্যাম পৃথিবী আজ ক্রমশ রুগ্ন্ন হয়ে পড়েছে – অনুপযোগী হয়ে পড়ছে নিরাপদ ও নিঃশঙ্ক জীবনধারণের। … তাই পৃথিবীর শুভবুদ্ধিকে প্রমাদ গুনতে হচ্ছে খোদ পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে – যার সঙ্গে সমস্ত বিত্তবৈভব, সমাজসভ্যতা, সর্বোপরি প্রাণ ও পরিবেশ পরিবৃত ‘ক্ষুদ্র বিশ্ব গ্রাস’ ধরিত্রী গ্রহের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের প্রশ্ন সন্দেহাতীতভাবে সম্পৃক্ত। ‘বিপন্ন পৃথিবী বিপন্ন জনপদ’ তারই বাস্তবচিত্র সংবলিত অজস্র তথ্যসমৃদ্ধ ও বাস্তব পরিস্থিতির সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি – সত্যিকার অর্থেই একটি পূর্ণাঙ্গ ‘পরিবেশনামা’।’৬

ভূস্বর্গ কাশ্মিরের বহুমাত্রিক ইতিহাস নিয়ে গবেষক তোফাজ্জল হোসেন রচনা করেছেন কাশ্মীর : ইতিহাস কথা কয় শীর্ষক গ্রন্থ। কাশ্মিরের সমাজ-রাজনীতি ও প্রাকৃতিক ইতিহাস জানতে এ-বই পাঠকচিত্তে সঞ্চার করবে অনেকান্ত সহযোগ।

 তোফাজ্জল হোসেনের শিশু : বিশ^ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণাগ্রন্থ। আগামী পৃথিবীর ভবিষ্যৎ শিশুদের নিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আর রচিত হয়নি। গ্রন্থটির পরিচয় দিতে গিয়ে প্রকাশক যথার্থই লিখেছেন : ‘মানব জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বিশ^ শিশু ও শিশু বিশে^র সার্বিক পটভূমি এবং বিদ্যমান বিস্ত্রস্ত নিষ্করুণ অবস্থার তথ্যপঞ্জি সংবলিত নিরীক্ষাধর্মী বস্তুনিষ্ঠ আলেখ্য ‘শিশু : বিশ^ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট’ নিঃসন্দেহে একটি বিদগ্ধ ও বিশেষ তাৎপর্যবহ গ্রন্থ – বলতে গেলে বাংলা ভাষায় রচিত এ-সংক্রান্ত গ্রন্থরাজির মধ্যে একক ও অনন্য।’৭ বিশ^ প্রেক্ষাপট, দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট – এই ত্রিমাত্রিক ধারায় শিশু বিষয়ে নানামাত্রিক ভাবনা আলোচ্য গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এ-বই লিখতে শিশুসংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে লেখকের অভিজ্ঞতা ক্রিয়াশীল থেকেছে। প্রসঙ্গত লেখক জানাচ্ছেন এই ভাষ্য :

শিশুবিষয়ে আমার আন্তরিক মমত্ববোধ প্রায় কৈশোরকাল থেকে। বিভাগোত্তর কালে –  অর্থাৎ ৫০-এর দশকের শুরুর দিকে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিশোর আন্দোলন ‘মুকুলফৌজ’-এর একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে আমি তখনকার শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক মোহাম্মদ মোদাব্বের ও শিল্পাচার্য কামরুল হাসানের সাহচর্যে আসার সুযোগ লাভ করি। কালক্রমে আমি মুকুলফৌজের সেক্রেটারি জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত হয়ে ৫০-এর দশকের বেশ কিছুকাল ধরে এই ঐতিহাসিক সংগঠনটির পরিচালনায় দায়িত্বশীল ছিলাম। … এই সংগঠনটির সাথে গভীর সংশ্লিষ্টতা সমাজের সব স্তরের, বিশেষ করে নীচুতলার শিশুদের

সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা এবং বঞ্চনার করুণ আলেখ্য সম্পর্কে গভীর অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে আমার পক্ষে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল।’৮

তোফাজ্জল হোসেনের ব্যতিক্রমী এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণাগ্রন্থ জাতিসংঘ। বাংলাদেশ থেকে বাংলা ভাষায় জাতিসংঘ বিষয়ে এটিই প্রথম গবেষণা-গ্রন্থ।

লেখক, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গণমাধ্যমকর্মী এবং জাতিসংঘ বিষয়ে কৌতূহলী পাঠকের কাছে আলোচ্য গ্রন্থ সঞ্চার করবে অনেকান্ত সহযোগ। জাতিসংঘের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ, সাংগঠনিক কাঠামো, উদ্দেশ্য, বিশ^শান্তি রক্ষায় ভূমিকা, মানবাধিকার, জনসংখ্যা ও উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয় এ-গ্রন্থে বিশদভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। বিশ^শান্তি ও মানব-উন্নয়নে জাতিসংঘ উত্তরোত্তর সাফল্য লাভ করুক – এমন প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করে লেখক জ্ঞাপন করেছেন এই আশার বাণী : ‘জাতিসংঘের ব্যর্থতা মানবিক ব্যর্থতারই পরিচায়ক, যেমন জাতিসংঘের সাফল্য মানবিক সাফল্যের সাক্ষ্যবহ। সেই সাফল্যের দিকে জাতিসংঘের অগ্রযাত্রা অপ্রতিরোধ্য – এর চলার পক্ষে যতই বাধার পাহাড় রচনা করা হোক না কেন – মানুষ মানুষের মুক্তিকে অবশ্য অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে।

পাঁচ

তোফাজ্জল হোসেন বহুমাত্রিক লেখক, নিষ্ঠ সংস্কৃতিসাধক। এদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে তিনি নিবিড়-গভীরভাবে একাত্ম। নিজের কর্মকাণ্ডকে তিনি কখনো বিজ্ঞাপনের বিষয় করে তোলেননি। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের এক মহান চিন্তক, নিষ্ঠ রূপকার। তোফাজ্জল হোসেনের সাধনা ও সৃষ্টি মূল্যায়ন করতে গিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের মন্তব্য উদ্ধৃত করেই শেষ করি এই লেখা : ‘আমরা তাঁকে (তোফাজ্জল হোসেন)

ভাষা-সৈনিক বললেও তিনি ছিলেন এদেশের স্বাধিকার, স্বাধীনতার পক্ষের এক মহান চিন্তক। নীরবে-নিভৃতে তিনি কাজ করেছেন। প্রথমেই সম্মুখে আসেননি; বিজ্ঞাপনে নিজেকে তুলে ধরেননি। সব সময় তাঁর ভেতরে লক্ষ করেছি এক নিবিড় নিবিষ্ট মননশীল মানুষকে যিনি এখন আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন।’৯

তথ্যনির্দেশ

১.         আনিসুজ্জামান, সময়ের সিঁড়ি বেয়ে, তোফাজ্জল হোসেন স্মরণ সুভ্যেনির, প্রকাশকাল ২০১৬, ঢাকা, পৃ ১১।

২.         আব্দুর রহিম, সময়ের সিঁড়ি বেয়ে, পূর্বোক্ত, পৃ ১১।

৩.         রামেন্দু মজুমদার, সময়ের সিঁড়ি বেয়ে, পূর্বোক্ত, পৃ ১৩।

৪.         শাহরিয়ার কবির, ‘তোফাজ্জল হোসেন : আবৃত আলোর অভিযাত্রী’, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ঢাকা।

৫.         বর্তমান আলোচনায় উদ্ধৃত তোফাজ্জল হোসেনের কবিতা ও গানের জন্য দেখুন – তোফাজ্জল হোসেন : কবিতাসমগ্র গ্রন্থটি (ঢাকা : আগামী প্রকাশনী, ২০০৯)।

৬.        দ্রষ্টব্য : তোফাজ্জল হোসেন : বিপন্ন পৃথিবী : বিপন্ন জনপদ (ঢাকা : জার্নিম্যান, ২০১৬) গ্রন্থের ফ্ল্যাপের লেখা।

৭.         দ্রষ্টব্য : তোফাজ্জল হোসেন : শিশু : বিশ^ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট (ঢাকা : জার্নিম্যান, ২০১৬) গ্রন্থের ফ্ল্যাপের লেখা।

৮.         তোফাজ্জল হোসেন, শিশু : বিশ^ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট, পূর্বোক্ত, পৃ ১০-১১।

৯.         সৈয়দ শামসুল হক, সময়ের সিঁড়ি বেয়ে, পূর্বোক্ত, পৃ ১০।

Leave a Reply