ত্রিশজন শিল্পীর যৌথ প্রদর্শনী পেছন ফিরে দেখা

লেখক: ইব্রাহিম ফাত্তাহ

আ টত্রিশ বছর আগে একই শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে চারুশিল্পে পাঠ নেওয়া  ত্রিশজন শিল্পীর সম্মিলিত এক প্রদর্শনী সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে। প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘ফিরে দেখা’।

১৯৭৯ সালে দেশের নানাপ্রান্ত থেকে ঢাকার তৎকালীন বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে আমরা অর্ধশতাধিক নবীন পাঠ নিতে এসেছিলাম। প্রাকডিগ্রি পর্যায়ে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম মাহমুদুল হক, মাহবুবুল আমিন, শহীদ কবির, মতলুব আলী, শাকুর শাহ, ইংরেজি সাহিত্যের দিল আফরোজ কাদের এবং ইতিহাসের নাজমা খান মজলিসকে।

শ্রেণিকক্ষের চারদেয়ালের বাইরে আমাদের প্রথমবারের মতো বের করে আনলেন শিক্ষক শহীদ কবির। রমনা পার্কে আমরা অনেক স্কেচ করি তাঁর নির্দেশনায়। সে-সময় ফকির লালন শাহর দর্শনে আকৃষ্ট শিল্পী ‘অচিনপাখি’ শিরোনামে জয়নুল গ্যালারিতে একটি প্রদর্শনী করে বেশ সাড়া ফেলেছিলেন। এরপর অকস্মাৎ স্পেন পাড়ি জমালেন তিনি! দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার পর মনোবসু বৃত্তি পেয়ে জাপান চলে গেলেন আমাদের প্রাকডিগ্রির প্রধান শিল্পী মাহমুদুল হক। যাওয়ার আগে বলে গেলেন – তোমাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে গ্যালারিতে। মাহমুদ স্যার চলে যাওয়ায় মাহবুব স্যার প্রিডিগ্রি প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে আমাদের চারুপাঠকে এগিয়ে নেন।

স্নাতক পর্যায়ে নানা বিভাগে ভাগ হয়ে গেছি আমরা। সবার দেখা হয় তত্ত্বীয় ক্লাসে। সেখানে শিল্পের সমাজতত্ত্ব পড়াতেন সুলেখক বুলবন ওসমান, শিল্পের ইতিহাস পড়াতেন আবদুল মতিন সরকার।

আমাদের পরম সৌভাগ্য, বাংলাদেশের আধুনিক চারুশিল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের গুণী শিল্পীদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। তখন অধ্যক্ষ ছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম। নানা বিভাগের গুণী শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন – পেইন্টিংয়ে কাজী আবদুল বাসেত, রফিকুন নবী, মাহবুবুল আমিন ও ফরিদা জামান, ছাপচিত্রে সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আবুল বারক আলভী এবং জাপান থেকে ফিরে এ-বিভাগে যোগ দেওয়া অধ্যাপক মাহমুদুল হক, ভাস্কর্যে আবদুর রাজ্জাক ও হামিদুজ্জামান খান, গ্রাফিক ডিজাইনে কাইয়ুম চৌধুরী ও সমরজিৎ রায় চৌধুরী, প্রাচ্যকলায় হাশেম খান ও আবদুস সাত্তার, কারুকলায় জুনাবুল ইসলাম ও আবদুল জববার এবং মৃৎশিল্পে মীর মোস্তফা আলী, শামসুল ইসলাম নিজামী ও মরণচাঁদ পাল। এই নামি শিক্ষকদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই।

১৯৮২ সালে আমরা চারুকলা কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি ইনস্টিটিউটে রূপান্তরের আন্দোলনে নামি এবং আন্দোলনের মুখে সরকার আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেয়। ১৯৮৪ সালে আমরা স্নাতক করি। পরে ১৯৮৮ সালের শেষদিকে আমরা প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তরে ভর্তি হই।

ভাবতে ভালো লাগে, আমাদের সহপাঠীদের মধ্যে আজ অনেকেই শিল্পী ও পেশাজীবী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

ভাস্কর লালা রুখ সেলিম ও মৃৎশিল্পী স্বপন সিকদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সম্মিলিত প্রদর্শনীতে লালা রুখ ব্রোঞ্জ কাস্টিংয়ে ‘বৃক্ষমানব’ শিরোনামে একটি ভাস্কর্য দিয়েছেন। মানবদেহ গড়নের মধ্য থেকে উত্থিত হয়েছে গাছের পাতা। স্বপন সিকদার টেরাকোটা মাধ্যমে গড়েছেন তিনটি ফিগারের এক নন্দিত গড়ন। দশম এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী স্বর্ণপদক পেয়েছেন মোখলেসুর রহমান। আমাদের নিসর্গের রূপ ফুটে ওঠা তাঁর দুটি চমৎকার উডকাট ছাপচিত্র এ-প্রদর্শনীর উলেস্নখপ্রদ কাজ।

শিল্পী অশোক কর্মকার ১৯৮৯ সালের ডাকসুর নির্বাচিত সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক; এখন প্রথম আলোর প্রধান শিল্প-নির্দেশক, পুরস্কৃত প্রচ্ছদশিল্পী। তাঁর একটি মাত্র কোলাজ চিত্রকর্মে তিনি আমাদের তিন যুগ আগের অবয়ব নিয়ে নন্দিত এক কম্পোজিশন রচনা করে শিরোনাম দিয়েছেন – ‘রিপ্রিন্ট অব রিমেমবার’। একই কাগজে আমাদের আরো দুই সহপাঠী শিল্পী আছেন – প্রচ্ছদ-ইলাস্ট্রেশনে খ্যাত মাসুক হেলাল ও মুদ্রণবিশেষজ্ঞ মাহবুবুর রশিদ মজনু। মাসুক জলরঙে দুটি প্রতিকৃতি এঁকেছেন, মজনু ক্যানভাসে বিমূর্ত দুটি গড়ন এঁকেছেন।

ভাস্কর মাহাবুব জামাল শামীম যশোর চারুপীঠের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্গাতা। তিনি মানবদেহের গড়নকে অনুভূমিকভাবে তুলে ধরে ভাস্কর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। সেলিম আহমেদ এখন সুপরিচিত অভিনেতা, নাট্যকার, মডেল ও প্রচ্ছদশিল্পী। তিনি রাজধানীর ট্রাফিক সিগন্যালে  বোরখাপরা এক নারীর ছবি এঁকেছেন। রুবিনা মডেল ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। সম্প্রতি তাঁর একটি একক প্রদর্শনী হয়েছে। প্রাচ্যদেশের অঙ্কন পদ্ধতিতে তিনি এঁকেছেন দুটি নারী-অবয়ব।

আফরোজা জামিল কংকা একটি চিত্রশালা পরিচালনা করেন, তিনি পাখিসহ নারী-অবয়ব এঁকেছেন ক্যানভাসে জলরঙে। দিলরুবা লতিফ এঁকেছেন বিক্ষুব্ধ পরিবেশে চিন্তিত এক নারী। সাবিনা জাহান কচি ও আলী আকতার শাহীন বিসিকের নকশাবিদ। তাঁরা দুজনেই নিসর্গকেন্দ্রিক ছবি এঁকেছেন। ঢাকার মঞ্চনাটকের নাট্যকর্মী হাবিবুর রহমান একজন ভাস্কর। তিনি মেটালে নারী-অবয়বের ভাস্কর্য গড়েছেন। রেজাউজ্জামান কাজ করছেন সিআরপিতে। তিনি সিমেন্ট মাধ্যমে এক দম্পতির ভাস্কর্য গড়েছেন। আরিফ আহমেদ শাহীন ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে সবুজের আবহে ঝরনার ছবি এঁকেছেন। মিজানুর রহমান পিন্টু ও আলতাফ হোসেন শরীফ সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তা। পিন্টু একটি আয়নাকে কেন্দ্র করে শিল্পিত এক ফ্রেম নির্মাণ করেছেন। শরীফ এঁকেছেন নন্দিত নিসর্গের নজরকাড়া ছবি। হিরণ্ময় চন্দ যশোর চারুকলার শিক্ষক। সাদাকালোয় তিনি এঁকেছেন অঙ্কনপ্রধান এক ছবি, যেটি ফরাসি রিয়ালিজমের শিল্পী গুস্তাভ কোর্বের কাজের ধরনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আমি সরেজমিন দেখে এসেছি, ফরিদপুরে আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সাজেদুর রহমান তাতা ওই শহরে চারুশিল্প প্রসারে ভূমিকা রাখছেন। তিনিও নিসর্গচিত্র এঁকেছেন। ইতালির রোমে আমাদের সহপাঠী উত্তম পেশাদার শিল্পী হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। প্রশস্ত এক ফিগারের ছায়া এঁকেছেন তিনি। মিনি করিম ছবি অাঁকার পাশাপাশি দেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনের সংগঠক হিসেবে সুপরিচিত, তিনি ভারী বর্ণে নিসর্গরূপ এঁকেছেন।

কম্পিউটার গ্রাফিক্সে এদেশে প্রথম যুগের শিল্পী মুনিরুল ইসলাম। হংসমিথুনের ছবি এঁকেছেন তিনি। সাইফুর রহমান লালবর্ণের নানা টোনে দৃষ্টিনন্দন গঠন রচনা করেছেন। ধনঞ্জয় ম-ল একটি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের অঙ্কন শিক্ষক। তিনি আমাদের নিসর্গরূপকে নিজের মতো করে নন্দিতভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন।  শাহীন আকতার ঢাকার একটি নামজাদা একাডেমিতে চারুকলার শিক্ষক। তিনিও নিসর্গের ছবি এঁকেছেন।  মৃৎশিল্পী রুস্তম এক সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠ নকশাবিদ। তিনি টাইলস পেইন্টিং করেছেন। মনোজ পাল নীলবর্ণের প্রাধান্যে কয়েকটি নারী ফিগার নিয়ে কম্পোজিশন করেছেন। প্রদর্শনীর খবর পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চলে এসেছেন সায়মা আকতার, তিনি গ্রামীণ আবহে দুটি নারী অবয়ব নিয়ে টাইলস পেইন্টিং করেছেন। আমি  জলরং ও রেখায় গায়েন ও এক বধূর ছবি এঁকেছি।

দীর্ঘ এ-সময়ে আমরা হারিয়েছি প্রিয় কয়েকজন সহপাঠীকে। তাঁরা হলেন – নজরুল ইসলাম অনু, জামিল এহসানুল হক শুভ্র, মুরাদুজ্জামান মুরাদ, সুভাষকুমার রায়, মনিরুল আলম ও জন এলবার্ট রায়। এ প্রদর্শনী আমরা তাঁদের স্মৃতির প্রতি সশ্রদ্ধায় উৎসর্গ করেছি। মুরাদ ও শুভ্রর অাঁকা দুটি চিত্রকর্ম এ-প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল।

আমাদের ব্যাচের ছয়জন শিল্পী – মোখলেসুর রহমান, মাহাবুব জামাল শামীম, লালা রুখ সেলিম, অশোক কর্মকার, উত্তমকুমার কর্মকার ও আমি বিশ্বশিল্পের সুপ্রাচীন ও খ্যাতনামা দ্বিবার্ষিক ভেনিস বিয়েনালের ৫৫তম আসরে অংশগ্রহণ করেছি। ভারত, নেপাল, যুক্তরাজ্য, ইতালি, রাশিয়ায় আয়োজিত প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন আমাদের সহপাঠীরা। আমাদের কয়েকজন বন্ধু লেখালেখি ও গবেষণা, স্থাপনা নির্মাণ ও শিল্পনির্দেশনায় আজ দেশখ্যাত। আটত্রিশ বছর পর সহপাঠী যাঁদের পেয়েছি, তাঁদের নিয়ে আবার আমরা সংঘবদ্ধ হয়েছি ৭৯ ব্যাচের এক যৌথ প্রদর্শনীতে।

নানা মাধ্যমের কাজ নিয়ে এ-আয়োজন চলেছে গত ২১ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: