এক

খুব সন্তর্পণে একটা মাকড়সা ঘুরে বেড়াচ্ছে ভেতরে। অস্থির ভঙ্গিতে এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত দৌড়াচ্ছে কখনো; কখনো মেপে মেপে পা ফেলছে ঢিমেতালে, আবার কখনো একদম স্থির বসে থাকছে ঘাপটি মেরে। তখন আর তার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না বেশ কিছুক্ষণ। এই অবস্থাটাই নাসিরের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর। আচমকা কোন দিক থেকে ঝাঁপ দেবে সেদিকে সতর্ক নজর রাখতে হচ্ছে তাকে। হাঁসফাঁস লাগতে থাকে তার। গলার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটানে বের করে আনতে পারলে একটু আরাম লাগত যেন। কিংবা এক বালতি পানিতে চুবিয়ে মারতে পারলে পোকাটাকে। নাসির ঢকঢক করে পানি খায়। তার হাত কাঁপছে বলে জগের অনেকটা পানি কাঁচাপাকা দাড়ি ভাসিয়ে চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নিচে। পানি শেষ, কিন্তু তার তৃষ্ণা যেন কিছুতেই শেষ হতে চাইছে না।

নাসির মাকড়সাটার আকৃতি কল্পনা করার চেষ্টা করে। ছয়টা লোমশ পা, কুতকুতে চোখ আর এক টাকার চাকতির সমান কালচে ধূসর  পেট।  তার  নিচে  অফ  হোয়াইট  কালারের  তোবড়ানো ডিমের থলি। অফ হোয়াইট কালারের কথা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাকড়সাটা হুট করে বড় হতে শুরু করে দেয়। নাসির চোখ বন্ধ করে ফেলে ভয়ে। নইলে মাকড়সাটার ফুলে-ওঠা আটকানো যাবে না কিছুতেই। তার বন্ধ চোখের ভেতরে অফ হোয়াইট কালারের একটা আধভাঙা ধারালো টাইলসের টুকরো ব্লটিং পেপারের মতো গাঢ় রক্তে ভিজে উঠতে থাকে ক্রমশ।

ইয়াসমিন অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করছে নাসিরকে। নাসিরের অন্যমনস্ক ভাব, থেমে থেমে কেঁপে ওঠা, ভাতের নলা মুখে নিয়ে এদিক-ওদিক বিহ্বল তাকানো – সবকিছুর মধ্যে একটা ফাঁদে-পড়া ইঁদুরের চেহারা ফুটে ওঠে ইয়াসমিনের সামনে। নাসিরের মনের গতিবিধি আন্দাজ করা তার জন্য ডালভাত বলেই নাসিরের আজকের অবস্থায় একটু বিচলিত হয় সে। নাসিরের তো এমন করার কথা নয়। মারাত্মক কিছু একটা ঘটেছে নিশ্চয়ই! ইয়াসমিন নিজেকে শান্ত রাখে। জানে, এই মুহূর্তে নাসির কিছু বলতে চাইবে না; পারবেও না গুছিয়ে বলতে। অল্পতেই নাসির তোতলাতে থাকে, পচা পাউরুটির মতো ফুলে ওঠে তার জিহ্বা।

এমন নয় যে ইয়াসমিনও বেশ পাকা খেলোয়াড়, কিংবা কৌতূহল দমিয়ে রাখার কঠিন বিদ্যাটুকু তার জানা। ভেতরে ভেতরে ইয়াসমিনের কলিজার মধ্যেও ধুক্পুক্ শুরু হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ঘটনাটা না জানলে তারও গলা দিয়ে ভাত নামবে না মনে হয়; কিন্তু পরিস্থিতির ব্যাপকতা আন্দাজ করেই নিজেকে গুটিয়ে রাখে সে। রাতে বিছানায় এক ছোবলে ঘায়েল করতে হবে নাসিরকে। তার যা স্বভাব, ইয়াসমিন একটু আহ্লাদ করলেই হড়বড়িয়ে সব বলে দেবে। নাসিরের এই সরল বুদ্ধিহীনতাই ইয়াসমিনের আস্থার জায়গা।

দুই

লোকটাকে এলাকার প্রায় সবাই চেনে। নাম ঠিক খেয়াল নেই, কিন্তু চেহারায় চেনে। তার খাসলতই তাকে পরিচিত করে তুলেছে সবার কাছে। এলাকাবাসী নিজেরা একটা নামও ঠিক করে নিয়েছিল তার। কে কখন নামটা দিয়েছিল তা এখন আর গুরুত্বপূর্ণ না হলেও সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নেবে নামটার যাথার্থ্য। কী নাম তার?

থুতু-সম্রাট। আজব হলেও একেবারে লাগসই। যদিও অনেকে আপত্তি তুলতে চায়। থুতু-সম্রাট হবে কেন! বরং তার নাম হওয়া উচিত থুতু-বন্ধ-সম্রাট। আবার

বন্ধ-এর সঙ্গে সম্রাট যায় না। জিহ্বার ভেতর জট পাকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বন্ধ হোক আর খোলাই হোক, কিংবা শুধু থুতুই হলেও তা নিয়ে আজকের ঘটনাটার আগ পর্যন্ত কারো বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। অবশ্য কারো কারো মধ্যে এক-আধটু দুঃখ ভর করলেও নাসির ছাড়া এখনো খুব একটা পেরেশানি নেই অন্যদের। বরং, ধরা যায়, ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠে লোকটা আবার সবার হাসিঠাট্টার বিষয় হয়ে উঠতে শুরু করবে দু-একদিনের মধ্যেই। তবে ঘটনাটা এমন ভয়াবহ না হলে হাসিটা আরেকটু নির্মল হতে পারত, হয়তো।

নাসির তার পরিবার নিয়ে এই জায়গায় আসার আগেই, বহুদিন ধরে – প্রায় দশ-পনেরো বছর কিংবা তারও বেশি হতে পারে – লোকটা একটা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিল এলাকায়। অদ্ভুত তার দাবি। রাস্তাঘাটে নাকি থুতু ফেলা যাবে না। কাউকে থুতু ফেলতে দেখলেই লোকটা তেড়ে যাওয়া শুরু করেছিল শেষদিকে। এর আগে বিশাল লেকচার, তারও আগে অনুরোধ-উপরোধ – কেউ যেন থুতু না ফেলে রাস্তায়। থুতু যেন গিলে ফেলে। না, গিলে ফেলার কথা সরাসরি বলেনি লোকটা। কিন্তু মুখে থুতু জমলে যদি ফেলা না যায়, তবে তো গিলেই ফেলতে হবে সেটা। দেয়ালে দেয়ালে সে চিকাও মেরেছে নিজের টাকা খরচ করে। প্রথমদিকে সবাই অবাক হতো লোকটার অদ্ভুত আবদার শুনে। কেউ কেউ হয়তো সেই মুহূর্ত কিংবা সেই দিন পর্যন্ত লোকটার সম্মানে মেনেও চলেছে এই নিষেধ। কিন্তু কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়! থুতু তো মুখে জমবেই। সেগুলো ফেলতেও হবে। বিশেষত রোজার দিনে দলা-দলা থুতু গিলে রোজা তো আর মাকরুহ করা যায় না!

ধীরে ধীরে লোকটার কাণ্ডকারখানা হাসির খোরাক জোগাতে থাকে সবার কাছে। কেউ কেউ তো তামাশা করে চিলমচি চায় তার কাছে। নতুবা থুতু ফেলবে কই! এই পর্যায়ে এসে লোকটা লেকচার রেডি করে। থুতু থেকে কীভাবে রোগজীবাণু ছড়ায়, কীভাবে আক্রান্ত করে মানুষকে, কীভাবে অসুস্থ হয়ে মানুষ মরেও যেতে পারে, উন্নত দেশে কেউ রাস্তায় থুতু ফেলে না – এসব ইতং-বিতং হাজার কেচ্ছা। আরে ব্যাটা উন্নত দেশের কাহিনি এখানে গাওয়া ক্যান! এইটা বাংলাদেশ। থুতু ফেলা আমাদের ঐতিহ্যের মধ্যে পড়ে। হাজার বছর ধরে আমাদের বাপ-দাদারা যত্রতত্র থুতু ফেলে আসছে দাপিয়ে। শুধু কি বাপ-দাদা! মা-খালারাও মনের সুখে থুতু ফেলেছে এখানে-সেখানে। পান খেয়ে পিক ফেলে রাঙিয়ে দিয়েছে ঘর-বাড়ি-উঠোন। আর তিনি আসছেন জাতিকে ছবক শেখাতে! এই পর্যায়ে এসে লোকটা ক্ষেপে ওঠে। গালাগাল শুরু করে। লোকজন মজা পায় তার আচরণে, বিশেষত দুষ্টু ছেলের দল। ইচ্ছা করেই তাকে দেখিয়ে থুতু ফেলে এদিক-সেদিক। লোকটা তেড়ে আসে এবার। তার আগেই সবাই দূরে সরে যায়। আরেক দলা থুতু ফেলে। লোকটা আবার তাড়া করে। শয়তানগুলো আবারো থুতু ফেলে। বদ কিসিমের ছেলেগুলা তাকে লক্ষ্য করেই থুতু ছুড়ে দেয়। প্রায়ই সেগুলো ব্যর্থ হলেও মাঝেমধ্যে লোকটার জামাকাপড়ে লেপটে যায় তাদের থুতু। থুতু-সম্রাট তখন থুতুমাখা গায়ে তাদের ধাওয়া করে; সে এক দেখার মতো দৃশ্য বটে! আজকের ব্যাপারটা না ঘটলে এই আনন্দ এলাকার লোকজন আরো অনেকদিন উপভোগ করতে পারত। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে যায় সেই অঘটন।

তিন

বাজার পেরিয়ে সারবাঁধা আট-দশটা টাইলসের দোকান। এর একটা নাসিরের। তামিম স্যানিটারি অ্যান্ড টাইলস। নাসিরের বলতে নাসির এই দোকানে চাকরি করে। মালিকের নানান ব্যবসা। তামিম মালিকের

 ছেলের নাম। মালিক তার ওপরে এই দোকানের ভার ছেড়ে দিয়ে অন্য বড়-বড় ব্যবসায় মজে আছেন। নাসিরও মালিকের বিশ্বাসের দাম দিতে জান কোরবান করতে রাজি। অথচ সেই নাসিরের ওপরই এতো বড় ঠাডা পড়ল! বড় কোনো চুরি-চামারি করে নাই কখনো সে। ছোটখাটো যা করে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয় প্রতিনিয়ত। কিন্তু খোদা বোধহয় ক্ষমা করেনি তাকে। নইলে এমন আজাইরা বিপদ তার ঘাড়েই কেন ফেলবে!

যতগুলো টাইলসের দোকান এখানে আছে সবাই তাদের ভাঙা টাইলসগুলো দোকানের সামনের ফুটপাতে জড়ো করে রাখে। করপোরেশনের মর্জি হলে তুলে নিয়ে যায়। নতুবা জমতে থাকে দিনের পর দিন। এটা নিয়ে কেউ কখনো আপত্তি তোলেনি। আজকের আগে কোনো বিপদও আসেনি কখনো। কিন্তু বিপদেরও তো ধরন আছে। এমন বিপদ কে কখন কল্পনা করেছে এর আগে! আর আসতেই যদি হয়, সবার একসঙ্গে আসা উচিত। কেন নাসিরের দোকানের ওপরই ভাগ্যের এমন বদনজর পড়বে, গজব নাজেল হবে? ইয়া মাবুদ! ইয়া পরওয়ারদেগার!

গজব নয় তো কী? নইলে তার দোকানের ভাঙা টাইলসের টুকরো দিয়ে একজন মানুষের গলা ফুটো করে দিতে পারে কেউ? কিন্তু তাই-ই ঘটেছে এখানে। হ্যাঁ, সত্যি তাই!

বিকেলের দিকে আকাশ ঠান্ডা হয়ে আসতে দেখে সবাই খুব স্বস্তি পেয়েছিল। গরমে গায়ের ছাল উঠে যাওয়ার দশা হচ্ছিল নতুবা। তার দোকানে চা খেতে খেতে এই নিয়েই আলাপ করছিল জমির চাচার সঙ্গে। চাচা পাশের টাইলস দোকানের কর্মচারী। কাস্টমার নেই দেখে নাসিরের সঙ্গে খেজুরে আলাপ পাড়তে এসেছিল। সোমত্ত মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য পয়সাওয়ালা পাত্র পাওয়া ছিল তাদের আলোচনার বিষয়। সেখান থেকে দমবদ্ধ গুমোট আবহাওয়ায় এসে ঠেকেছিল আলাপটা। না ঠেকার কারণও অবশ্য নেই; যে-গরম পড়েছে তাতে আলাপে আলাপে গরমের বশ্যতা স্বীকার করা ছাড়া কোনো গতি ছিল না কারো। এমন সময় ফুটপাতের হুড়োহুড়িতে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে দুজনেই। বের হয়ে দেখে থুতু-সম্রাট তার হাতের লাঠি নিয়ে দৌড়াচ্ছে কতগুলো বাচ্চা ছেলের পেছন-পেছন। বাচ্চা বলতে শুধু শরীরের বাড়ন্ত কাঠামোটুকুই, নতুবা জাহিল শয়তানও হার মানবে এদের কাছে। বিড়ি-সিগারেট-গাঁজা, চুরি-চামারি – সব এদের নখের আগায়। বড়রাও ঘাঁটায় না এসব বেজন্মার দলকে। কে কার ইজ্জতের ফালুদা বানাতে চায় এদের ঘাঁটাতে গিয়ে!

থুতু-সম্রাটও অবশ্য সে-পথে হাঁটেনি। বলা যায়, পথই আটকে দিয়েছে তাকে। এটা নিয়তি ছাড়া আর কী হতে পারে? কিংবা আরেকটু বাড়িয়ে, স্বভাব বলা যেতে পারে। ব্যাটা, তুই রাস্তায় থুতু ফেলিস না, সেটা তোর নিজের খায়েশ। অন্যদের জ্ঞান দেওয়ার দরকার কী! এই বদভ্যাসের জন্য প্রথমে সবার কাছে পাগল বলে সাব্যস্ত হলি, শেষমেশ খুন। অবশ্য অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুকে কাটানোর চেষ্টা যে লোকটা করেনি এমনও নয়। ছেলেগুলোকে না দেখার ভান করে এড়িয়ে গিয়েছিল সে শুরুতে। বিচ্ছু ছেলের দল যখন তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ইচ্ছা করে থুতু দিয়ে ফুটপাত ভিজিয়ে দিচ্ছিল, তখনো তা না দেখার ভানই করেছিল লোকটা। বয়সটাই ধ্বংসপ্রবণ। অভিজ্ঞতা থেকে লোকটা জানত নিশ্চয়ই। তাই দাঁতে দাঁত চেপে পার হয়ে যেতে চেয়েছিল রাস্তাটা। কিন্তু সে কীভাবে জানবে মৃত্যুর বীজ আগেই পোঁতা হয়ে গেছে তার।

ছেলেগুলোর বয়স আর কত! সবচেয়ে বড়টা পনেরো-ষোলোর বেশি নয়। ছোটটা দশ-এগারো। বোঝাই যাচ্ছিল বেশ ঠাট্টা-তামাশার মুডে ছিল তারা। রসদ যখন নিজেই সামনে এসে পড়েছে তাদের আর পায় কে! লোকটার চারদিকে সমানে থুতু ছিটাতে শুরু করে দেয় সবাই মিলে। লোকটা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়; দ্রুত পার হয়ে যেতে চায় জায়গাটা। পার হতে চাইলেই তো আর পার পাওয়া যায় না সবসময়। ছেলেগুলোও পিছু নেয় তার। এদিক-সেদিক থুতু ছড়াতে ছড়াতে এগোতে থাকে লোকটার সঙ্গে সঙ্গে। এ-ওর ওপর হেসে গড়িয়ে পড়ে থুতু ফেলতে ফেলতে। এবার লোকটা থামে।

সম্ভবত তাদের অনুরোধ করে এমন না করতে, নিজেদের কাজে যেতে। সেই মুহূর্তে লোকটা হয়তো ভুলে বসেছিল, আপাতত অন্যকে বিরক্ত করা ছাড়া এদের কোনো কাজ নেই ইহজগতে। এগুলো এমন বদের বদ অন্য কিছু না পেলে মজা নেওয়ার জন্য তারা নিজেদের মধ্যেই সবচেয়ে দুর্বল ছেলেটাকে বেছে নিয়ে চড়াও হয়। এটাই তাদের কৈশোরের আস্ফালন। আর টিটকারির বস্তু সামনে পেলে তারা ছেড়ে কথা বলবে! লোকটার উচিত হয়নি থামা, এদের সঙ্গে কথা বলা। নাচুনে বুড়ি ঢোলের বাড়ি পেয়েছে, তাকে আর পায় কে! ছেলেগুলো এবার সরাসরি তার গায়ে থুতু মারতে শুরু করে। লোকটা বিচলিত না হলেও পারত। এমন না যে এই-ই প্রথম কেউ তার গায়ে থুতু মেরেছে। এর আগে বড়রাও থুতু ছিটিয়েছে, তরুণেরা, যুবকেরা – এমনকি আরো বয়স্কদের কাছ থেকেও এমনতর তামাশার শিকার হয়েছে সে।

ইট ছুড়লে পাটকেল তো পড়বেই গায়ে। তার উচিত ছিল পরিস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। কথা না বলে দ্রুত হেঁটে জায়গাটা পেরিয়ে যাওয়া; প্রয়োজনে দৌড় লাগানো। অথচ লোকটা উল্টো কাণ্ড করে বসে হুট করে; সম্ভবত ধৈর্যের বাঁধ হারিয়ে, কিংবা কে জানে, কোন ভূতে যে পেয়েছিল তখন তাকে! লোকটা ধাওয়া করে শয়তানগুলাকে। নাগালে থাকা একটার গায়ে সপাটে লাঠি বসিয়ে দেয় হঠাৎ। তারপর দৌড়ঝাঁপ, চেঁচামেচি, অতঃপর ভাঙা টাইলসের কোনা লোকটার গলায় বসিয়ে দেওয়া।

চার

নাসির দ্রুত দোকান গুটিয়ে বাসায় চলে এসেছে। শুধু সে নয়, অর্ধেক বাজার বন্ধ হয়ে গেছে এরপর। টাইলসের দোকানগুলো সবার আগে বন্ধ হয়েছে। বাড়তি সতর্কতা হিসেবে টাইলসের ভাঙা টুকরোগুলো সব দোকানের ভেতরে ঢুকিয়ে এসেছে নাসির। যেন কোনো কালেই সেখানে কোনো ভাঙা টাইলস জমিয়ে রাখেনি সে। বাকিরাও যার যার দোকানের বাইরে ছড়ানো ফুটপাতে এলোমেলো করে রাখা সব টুটাফুটা টাইলস দোকানের ভেতরে লুকিয়ে ফেলেছে। জানে, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা।

টাইলসের টুকরোগুলো তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় নাসিরের নজর পড়েছিল সেই টুকরোটার দিকে। তখনো ফুটপাতের কিনারায় পড়ে ছিল ধারালো টুকরোটা। অফ হোয়াইট কালারের ওপর লাল টকটকে রক্তের মিশেলে নতুন ডিজাইন তৈরি হয়েছে সেটার গায়ে। সম্মোহিত হয়ে যাওয়ার মতো নকশা। বহু সাধনার পরে এমন আরাধ্য নকশা পায় ডিজাইনাররা। অন্য সময় হলে নাসিরের ভাবনা আরো বিস্তৃত হতে পারত নকশাটাকে ঘিরে। কিন্তু তার আগেই পুলিশ পৌঁছে যায় ঘটনাস্থলে।

প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আরো বেশ কয়েকজনের সঙ্গে নাসিরেরও জবানবন্দি নেয় তারা। বলে, চূড়ান্ত সাক্ষ্য দিতে কোর্টে যেতে হতে পারে তাদের। যাওয়ার সময় টুকরোটা তুলে নিয়ে যায় জিপ-পলিব্যাগে ভরে। ছেলের দলের টিকিটারও খোঁজ নেই। এলাকা একেবারে ভোঁ-ভোঁ। নাসিরের তখন ভয় হচ্ছিল ভীষণ! যদি জিজ্ঞেস করে, কার দোকানের টাইলস এটা? কেন ফুটপাতে সে ভাঙা টাইলস ফেলে রেখেছিল? একই ধরনের টাইলস অবশ্য সব কয়টা দোকানেই আছে – দেশীয় একটা কোম্পানির ক্লাসিক ডিজাইনের টাইলস। যদিও এক্সপোর্ট হয় না, তারপরও এর সৌন্দর্যে একে এক্সপোর্ট কোয়ালিটি বললে দোষ হয় না। এক্সপোর্ট হবে কি করে, চাইনিজ প্রোডাক্টে মার্কেট সয়লাব, দাম কম, চাকচিক্য বেশি; তাই এদের কাটতিও বেশি। অন্যগুলোর সঙ্গে সেই টাইলসের ভাঙা টুকরোগুলোও দোকানিরা ফুটপাতে ফেলে রেখেছে এতোদিন। তবে সবাই দেখেছে অসভ্য ছেলেটা তার দোকানের সামনের ফুটপাত থেকেই তুলে নিয়েছিল টুকরোটা। ঘ্যাচাং করে বসিয়ে দিয়েছে লোকটার গলায়।

অথচ সে আর রমিজ চাচা যখন হল্লা শুনে দোকান থেকে বের হয়, গ্যাঞ্জামটা তখনো বেশ খানিকটা দূরে ছিল। ছেলেটার পিঠে লাঠি দিয়ে বাড়ি দেওয়ার পর বাকিরা তাড়া করে লোকটাকে। লোকটাও কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো তার দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। একেই বোধহয় নিয়তি বলে। নতুবা পালানোর সুযোগ থাকতেও অস্ত্রের সামনে শিকার আত্মসমর্পণ করবে? তাছাড়া টাইলসের ভাঙা টুকরো যে খুন করার মোক্ষম অস্ত্র হতে পারে তাই বা কে জানত! নাসিরের বহুবার হাত কেটেছে টাইলস নাড়াচাড়া করতে গিয়ে। কিন্তু কখনো তার কল্পনায়ও আসেনি এটা দিয়ে জ্যান্ত মানুষ মেরে ফেলা যায়। ছেলেগুলোও হয়তো জানত না। তারা আঘাতের উত্তরে প্রত্যাঘাত করতে চেয়েছিল হয়তো।

নাসির এই প্রথম কাউকে চোখের সামনে খুন হতে দেখেছে। এই খুনের পেছনে পরোক্ষভাবে তারও হাত রয়েছে, এমন মনে হয় তার। সে যদি টুকরোগুলো না রাখত তবে এমনটা ঘটত না। কয়েকদিন আগেও রাজেশকে সে-জায়গাটা পরিষ্কার করতে বলেছিল। রাজেশ দোকানের জুনিয়র কর্মচারী। বয়স ওই ছেলেগুলোর মতোই। ওর আলসেমির কারণেই এমন ঘটেছে। বয়সটাই কেমন ছন্নছাড়া। সে নিজেই যদি ব্যাপারটার তদারক করত, তাহলে বেহুদা এমন ভ্যাজালে পড়তে হতো না।

পুলিশের সামনে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল তার। ভয়ংকর মাকড়সাটা খাবলে ধরেছিল হৃৎপিণ্ড। ভয় হচ্ছিল কেউ যদি বলে দেয় হত্যার মূল অস্ত্র তার দোকান থেকেই জোগান দেওয়া হয়েছে; তারই অসতর্কতার ফলাফল এই মৃত্যু। কিন্তু কেউ কিছু বলেনি; পুলিশও এখনো কিছু জিজ্ঞেস করেনি ভাঙা টাইলসের উৎস নিয়ে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল হত্যার কারণ জানা। এমন আজব কারণ শুনে তারা কিন্তু অবাক হয়নি। যেন এমন আকছারই ঘটে দুনিয়ায়, এমন ভাব নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। ভাঙা টাইলস প্রসঙ্গ আজ না হলেও কাল আসতে পারে, এই আশঙ্কায় কেমন নেতিয়ে পড়ে নাসির। এখানে সবাই দোকানের সামনে এটা-সেটা ফেলে রাখে। পানির খালি বোতল, ঝালমুড়ির ঠোঙা, ঝাড়ু দিয়ে ফেলা দোকানের ময়লার সঙ্গে টাইলসের টুকরোগুলোও এতোদিন মিলেমিশে থাকত এই ফুটপাতে। ঠিক যেন একেকটা পরিবার। এটাই এখানে স্বাভাবিক। স্বাভাবিকতা অপরাধ হয় না কখনো। তবুও অস্বস্তির কাঁটাটা গলায় বিঁধে থাকে নাসিরের। ভাতের নলা কিছুতেই গলা দিয়ে নামতে চায় না। 

পাঁচ

এ কেমন লোক! দুঃখ আর অবাক হওয়ার মিথস্ক্রিয়ার অনুরণন জাগে ইয়াসমিনের মনে। মানুষ খুন হয় জায়গাজমির জন্য, শত্রুতার কারণে। খেলার মাঠের হারজিত নিয়েও মারামারি থেকে খুনোখুনি হতে দেখেছে সে ছেলেবেলায়। কিন্তু ‘থুতু ফেলা নিষেধ করা নিয়ে খুন হয়ে যাওয়া – বেকুব না হলে আর কী! এমনে না মরলেও এর কপালে এর চেয়ে ভালা কোনো মরণ লেখা ছিল, এইটা তো মানাই যাবে না।’ ব্যাপারটায় বরং ইয়াসমিনের হাসিই পাচ্ছে খানিক। এদিকে লোকটার দুঃখে নাসির বমি করে ভাসিয়ে দিয়েছে থালা। তারপর কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে হাউমাউ করে। ভাগ্যিস তাদের নয় বছরের ছেলেটা এর মাঝেই ত্যাড়াবেঁকা হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে বসার ঘরের খাটে। নয়তো পিতার এমন কারবারে ভয়ানক ভড়কে যেত সে। ইয়াসমিনও বিষয়টা জানত না বলে বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল শুরুতে। পরে যখন পুরো ব্যাপারটা জানতে পারে, তখন দুঃখের মধ্যেও হাসি পেয়ে যায় তার। তার হাসি দেখে হতবিহ্বল হয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল নাসির।

ইয়াসমিনও বুঝতে পারেনি কেন হঠাৎ হাসির এমন দমক ঠেলে উঠেছে ভেতর থেকে। পরে অবশ্য ভাবনাটার কিনারা পেয়েছিল সে। এই হাসির কিছুটা

থুতু-সম্রাটের জন্য; বাকিটার জন্য দায়ী নাসিরের এমন নাজেহাল অবস্থা। এই প্রথম নাসিরকে এভাবে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে দেখেছে সে। নিজের মায়ের লাশের সামনেও এভাবে কেঁপে কেঁপে কাঁদেনি লোকটা। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সামলে নিয়েছে ইয়াসমিন। নাসিরকে সান্ত্বনা দিয়েছে;

হাত-মুখ মুছিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে, হাত বুলিয়ে দিয়েছে মাথায়। বেহুদা ভয় না পাওয়ার জন্য সাহসও জুগিয়েছে। নাসির অনেকটাই শান্ত হয়ে এসেছে এখন। যদিও থম মেরে আছে; তবু উঠে বসেছে বিছানায়। বানিয়ে আনা পানটা হাত ফসকে পড়ে গেল বিছানার চাদরে। অন্য সময় হলে এর জন্য স্বামীকে মুখঝামটা দিত সে। এখন অবশ্য পরিস্থিতি ভিন্ন।

বিছানা থেকে আলগোছে পানটা তুলে নেয় ইয়াসমিন। একটাই পান ছিল ঘরে। সকালে দোকানে যাওয়ার সময় বলে দেওয়ার পরেও নাসির পান আনেনি। অবশ্য স্ত্রীর আর্জিমতো পান কিনে ঘরে ফেরাটা অস্বাভাবিকই হতো আজ। আসলেই, যা একখান কাণ্ড ঘটল না! একমাত্র পানটার বেশিরভাগই স্বামীকে দিয়ে দিয়েছিল সে, নিজের জন্য রেখেছে সামান্য একটু। নাসিরের অবশ্য পানের নেশা নেই খুব একটা। স্ত্রীকে সঙ্গ দিতে মাঝেমধ্যে খায় এক-আধটু। আজকে নাসিরের কাজে লাগতে পারে বলে তাকেই বেশ অর্ধেকটা দিয়েছিল ইয়াসমিন। কিন্তু লোকটাকে যেন জিনে ধরেছে, জিন্দা লাশ হয়ে আছে একেবারে। এদিকে তার নিজের পানের নেশা যায়নি। এইটুকু পানে কী হয়! ভালোমতো মুখও ভিজল না। তুলে নেওয়া পান হাতে জানালার কাছে যায় ইয়াসমিন। আগের পানের রসটা ফেলে দিতে হবে। পুরনোটার সঙ্গে নতুনটা মিশলে নেশাটা কষে যেতে পারে নয়তো। ইয়াসমিন জানালার গ্রিলে চিবুক ঠেকিয়ে ঠোঁট সরু করে পিকটা ছুড়ে মারে রাস্তায়। কী যে হয় হঠাৎ! ইয়াসমিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিদ্যুৎগতিতে ছিটকে আসে নাসির। মুহূর্তের মধ্যে সাঁড়াশির মতো পাঁচ আঙুল দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে ইয়াসমিনের গলা, চোখ দুটো তার ভাটার মতো জ্বলছে।

Leave a Reply