দড়ি

লেখক: মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

 রানু হাঁটছে। সবার নজর তার সরু সরু দুটো পায়ে জড়িয়ে থাকা সাদা টাইটসের দিকে। তার হাঁটায় যেমন অনায়াস আছে, তেমনি সতর্কতাও আছে – বোঝা যায়, অনেকদিন ধরে এর অভ্যাস করেছে সে। যেখানে এক পা পড়ে, অন্য পা-টি সেই বরাবর সামনে পড়ে, একটুও ডানে বা বাঁয়ে পড়ে না, কোমর দুলতে গিয়েও দোলে না। ও হেঁটে কুড়ি পা গেলে, লোকজন কুড়ি মিনিট স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে সে-দৃশ্য দেখে, হাঁ-করে তাকিয়ে থাকে। ঝন্টু যখন সরু আলের ওপর দিয়ে লুঙ্গির এক কোনা তুলে ধরে হাঁটে, তখন কুড়ি পা কি, আধা মাইল একটানা হেঁটেও ওর হাঁটা শেষ হয় না – ওকে বিলের মধ্যিখানে যেতে হয় – ডানে পিছলালে কাদা-করা ধানক্ষিতের এক হাঁটু কাদায় পড়বে, বাঁয়ে পিছলালে কণ্টিকারী-কাঁটা বেগুনের ঝোপে; যেখানে বাঁ-পা ফেলবে তার থেকে বরাবর সামনে ডান পা ফেলে হাঁটতে হয় – কেউ তাকিয়েও দেখে না। রানু মেয়ে বলে? – না, তা বোধহয় না। কৈশোরেই রানুর নারীত্ব প্রকাশের সব অঙ্গই কর্তন করে রাখা হয়েছে – ওকে সামনে থেকে দেখতেও যেমন, পেছন থেকে দেখতেও তেমন, কোনো দিকেই বাড়তি কিছু নেই। তারপরও সবাই ওকেই দেখে, ঝন্টুকে দেখে না। এমনকি তারাবু যখন আলের ওপরে তার নগ্ন পা-দুটো ফেলে ফেলে হামেদ দাদার পুরনো বাড়ির পরিত্যক্ত ভিটেয় বাছুর বাঁধতে যায়, কেউ দেখলেও তাকায় না। সবাই তাকায় রানুর দিকে। চোখ কপালে তুলে হাঁ-করে তাকিয়ে থাকে। কারণ রানু হাঁটে তেরো-চোদ্দো হাত উঁচুতে টানটান-করে-বাঁধা দড়ির ওপরে পা ফেলে ফেলে। রানু হাঁটছে।

গাংনালীয়ার হাটে যখন গুপীনাথপুর, চন্দনপ্রতাপ, খামারপাড়া, কাজলি থেকে হাটুরেরা আসে, তখন হাটের মধ্যিখানে বিশ-পঁচিশ হাত দূরত্বে দুটো বাঁশ পুঁতে তাদের আগায় বিশ-বাইশ হাত উচ্চতায় দড়ি বেঁধে দেওয়া হয়। রানু হাতের চেটোয় থুতু ছিটিয়ে দুপায়ে বাঁশ পেঁচিয়ে ধরে বেয়ে উঠে যায়। উৎসুক হাটুরেরা তাকিয়ে দেখে, পাটের বিছাপোকার মতো শরীরটা একবার সংকুচিত, একবার প্রসারিত করে বাঁশ বেয়ে উঠে যাচ্ছে ছিপছিপে একটা মেয়ে – তেরো-চোদ্দো হাত উঁচুতে। অত উঁচুতে না উঠলে হাটভরা লোকজন দেখবে কী করে? ঝন্টু কি বেচাবিক্রি ফেলে ওর বেগুন-পটোল রেখে উঠে আসবে, নাকি ওগুলো লুঙ্গির কোঁচে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রানুর কসরত দেখবে? ঝন্টুকে বেগুন-পটোল বিক্রি করতে হবে। ওর টাকার দরকার। অনেক টাকা। তাই জায়গায় বসে ও দাঁড়িপাল্লার টিকি ধরে তুলে আড়চোখে দেখে নেয়, রানু এক-পা
দু-পা করে কীভাবে দড়ির মাঝবরাবর চলে এসেছে, মাজা না দুললেও কাঁপছে। ঝন্টু রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে, কখন ও দড়ির ও-মাথায় গিয়ে পৌঁছাবে; তারপর আবার রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে, কখন ও-মাথা থেকে আবার এক-পা দু-পা করে দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে ফিরে আসবে।

গাংনালীয়া গ্রামের বেগুন-বিক্রেতা ঝন্টুর ইচ্ছে করে পুরো টাকাটাই রানুকে দিয়ে দেয়; কিন্তু দেয় না। দশ টাকা দেয়। এ-হাটে সবচেয়ে বেশি ও দেয়। রানু তা জানে। জানে বলেই ঝন্টুর সঙ্গে ওর চোখাচোখি হলে রানু চোখ ফিরিয়ে নেয়। ঝন্টু তাকিয়ে আছে টের পেলে ও অন্যদিকে ফিরে আশপাশের লোকজনের সঙ্গে অদরকারি আলাপ শুরু করে। ঝন্টু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শোনে। লোকে বলে, রানুর কণ্ঠ পুরুষদের কণ্ঠের মতো। এমনিতে রানু কথা কম বলে। ঝন্টু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে, ‘বেটাছেলেগের মতো কই, মিয়া মাইনষির মতোই তো ওর গলা।’ আবার ভাবে, ‘নাহ্, মিয়া মাইনষির মতো না, বেটাছেলেগের মতোই।’ ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কোনটা ঠিক। রানুর কণ্ঠ তাদের গ্রামের তারাবুর মতো আদুরে, আবার হামেদ দাদার মতো দরাজ। ঝন্টুর বিশ্বাস, রানুর গেঞ্জি খুললে ওর বুকে হামেদ দাদার মতোই কোঁকড়ানো পশম পাওয়া যাবে। হামেদ দাদা বুকের পশম চুলকে বলে, ‘ঝন্টু রে, তোর চারাগুলো বাইড়তেছে না, তোর মতো বাট্টু হইয়ে যাচ্ছে। সার-ফার দে।’ ঝন্টুর গরু নেই, তাই গোবর নেই, তাই সারও নেই। ও দাদার দিকে তাকায় না, চারার দিকে তাকিয়ে ছোট করে বলে, ‘দিবানে।’ দাদা ওর দিকে তাকিয়ে বুকের পশম চুলকাতে চুলকাতে শসালতার আঁকশির মতো পেঁচিয়ে ফেলে। ঝন্টু এক হাতে লুঙ্গির কোনা তুলে নিয়ে পতপত করে হাঁটা শুরু করে। মাঠের ভেতরে হয়তো তারাবুর সঙ্গে দেখা হয়। তারাবু জানতে চায়, ‘দুপুরি কী খাইছির্?’ রানুর সঙ্গে দেখা হয় না। রানু কোন গ্রামে থাকে, ও জানে না। কালাপাহাড় ওকে আগলে রাখে। কাছে তেমন ঘেঁষতে দেয় না। ঘেঁষতে দিলেই কী – রানু কি ওর সঙ্গে কথা বলবে? সন্ধে ঘনানোর আগে আগেই কালাপাহাড় বাঁশখুঁটি তুলে, দড়িদড়া গুছিয়ে, কোমরে টাকা গুঁজে রানুকে নিয়ে ভ্যানে চেপে বসে। ঝন্টু জানে, ভ্যান খামারপাড়ার দিকে যায়। ওদিকে পুরনো আম-কাঁঠাল গাছের নিচে কত গ্রাম – শ্রীকোল, মিনগ্রাম, আবাইপুর, কৃপালপুর। কোন গ্রামে রানুদের ডেরা, কে জানে।

তিন-তিনটা বর্গাভুঁইয়ের চারা দেখে ঝন্টু বাড়ির দিকে রওনা দেয়। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখে, কে যেন কানাচে দুই ঝুড়ি গোবর ফেলে গেছে। ঝন্টু হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে। মনে মনে বলে, ‘সার তো ভালোই হইছে।’ ঝন্টুর একটা ঘর – শনের দোচালা। ওর বাবা খুন হলে ওর মা যখন আলম জোয়ার্দারের সঙ্গে বিয়ে বসে মিনগ্রাম চলে গেল, এই ঘর ফেলে গেছে। দুধ ছাড়ানোর পর চাচি ওকে বলেছিল, ‘এইডে তোর বাপের পুতা। তোর ঘর।’ ঘর থেকে বেরোলে উঠোন – উঠোন মেজচাচির; উঠোন পেরোলে পালান – পালান সেজোচাচার; পালানের পরেই গোরসত্মান, আমবাগান, কণ্টিকারী-কাঁটা বেগুনের জঙ্গল – ওগুলো ছোটফুপুর। ওর শুধু ঘর, আর কানাচ; আর কানাচের একটা নারকেল গাছ, একটা গিঁটঅলা সজনে গাছ, আর কয়েকটা মানকচু গাছ। সকালে আর রাতে বড়চাচির রান্নাঘরে বসে খেয়ে আসে, দুপুরে কোঁচের ভেতর চিড়েমুড়ি নিয়ে কুটকুট করে চাবায়; গাছে ডাব থাকলে ডাব পেড়ে নেয়, না থাকলে কল চিপে পানি বের করে ঢকঢক করে গিলে খায়। হাটবার হলে দিয়াড়ের বর্গাভুঁই থেকে বেগুন-পটোল তুলে বিকেলে দাঁড়িপাল্লা হাতে নিয়ে পাটি বিছিয়ে হাটে বসে, আড়চোখে দেখে, রানু দুপাশে দুহাত ছড়িয়ে শূন্যের ওপর হেঁটে বেড়াচ্ছে। ওর পেছনে নীল আকাশ, সাদা মেঘ সরে সরে যাচ্ছে। হাটের মাঝখানে, বিপিনের সেলুনের সামনে, আঠারো-বিশ হাত লম্বা দুটো বাঁশ, মাঝখানে বিশ-পঁচিশ হাত ব্যবধান রেখে শূন্যে উঠে গেছে। বাঁশের আগায় খানিকটা ছেড়ে দিয়ে দড়ি বাঁধা – খড়াজালের কথা মনে পড়ে। ছিপছিপে রানুকে দেখে ওর মনে হয়, ও একটা শোল মাছ। সারাদিনের অপেক্ষায় অতিষ্ঠ কোনো জেলের জালে ধরা পড়েছে ও। জাল তুলে সে সবাইকে দেখাচ্ছে। চারপাশে উৎসুক গ্রাহকের ভিড়। ঝন্টুও তাদের একজন। রানুকে সে কিনে নিতে চায়। কিনে নিয়ে আবার নদীতে ছেড়ে দেবে।

দি নিউ সোনার তরি সার্কাস যখন ভেঙে যাচ্ছে, সার্কাসকর্মীদের তখন পনেরো মাসের বেতন বকেয়া পড়েছে। সে-সময় নিজের মনে করে, কেউ হাতি নিয়ে বেরিয়ে এসেছে, কেউ ঘোড়া। আর মালিক কেরুর বোতল হাতে করে নিরুদ্দেশ। তা দেখে, কালাপাহাড় একদিন রানুকে ডেনা ধরে নিয়ে বেরিয়ে এলো। হাটে হাটে ঘুরে ঘুরে ওরা খেলা দেখিয়ে বেড়ায়। পাঁচটা ধারালো তরবারি জাহাজের নোঙরের মতো করে আগা ছড়িয়ে গোড়ায় বাঁধা। কালাপাহাড় পাঁচ বাহুর নোঙরটাকে একটুকরো বাঁশের আগায় রেখে শূন্যে তুলে ঘোরাতে থাকে, তরবারির তীক্ষন ফলাগুলো তার চোখমুখের ওপরে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে, তারপর হঠাৎ বাঁশের টুকরোটি সরিয়ে দিয়ে দুপাশে হাত-পা ছড়িয়ে বুক পেতে দিয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়ে, পাঁচটা তরবারির সেই নোঙরসদৃশ বস্ত্তটি তার বুকের ওপর ধপ করে এসে পড়ে, দুইটা ফলা যায় দুই বোগলের নিচ দিয়ে, দুইটা পেটের দুই পাশ দিয়ে, আর পঞ্চমটি দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে। লোকজন হাততালি দেয়। কেউ কেউ টাকা-পয়সা দেয়। ওরা একে বর্শা খেলা বলে। রানু তেরো-চোদ্দো হাত উঁচুতে দড়ি টানিয়ে ওর ওপর দিয়ে হাঁটে। ওপরে ও এক-পা এক-পা করে হাঁটছে, নিচে হাটুরেরা হাততালি দিচ্ছে। নিচে শুকনো মাটি। এক গাছ ঘাসও নেই। কতশত বছর ধরে হাটুরেদের পাড়ায় মাটি এঁটে বসে গেছে, কে জানে। রানু হাঁটে, আর নিচে কালাপাহাড় হামা দিয়ে একবার এদিকে যায়, একবার ওদিকে – লোকজনের ছুড়ে দেওয়া টাকা কুড়োতে থাকে। এক হাটে ওদের সাড়ে চারশো-পাঁচশো টাকা ওঠে। কোনো কোনো হাটে সাতশো টাকাও উঠে যায়।

টাকা যা ওঠে, তার প্রায় পুরোটাই রানুর জন্য। কালাপাহাড়ের বয়স হয়েছে। গাংনালীয়ার হাটে একবার খেলা দেখাতে গিয়ে একটা ছুরির ফলা ঘটাং করে কালাপাহাড়ের বুকের ওপর এসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে চিৎকার, চেঁচামেচি, ‘শালা, জোচ্চোর! মার, হারামিরে মার!’ ছুরির ফলার আঘাতে ওর জামার বুক কেটে হাঁ-হয়ে গেলে, ভেতরের টিনের বর্ম বেরিয়ে এসেছিল। তারপর থেকে ওর কামাই-রোজগার নাই বললেই চলে। রানুই ওর একমাত্র অবলম্বন। রানুকে ও কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। কিন্তু ঝন্টু ওকে কিনবেই। তাই বেগুনবেচা সব টাকা ও রানুকে দেয় না, প্রতি হাটে দশ টাকা করে দেয়। বাকি টাকা ও জমা করে রাখে।

কালাপাহাড় রানুর দাম বলেনি। রহস্যময় হাসি দিয়েছে। কিন্তু ঝন্টু মনে মনে ওর একটা দাম ঠিক করে ফেলেছে। কালাপাহাড়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ও বুঝেছে, সে কত টাকায় বশ হবে। হিসাব করে বের করেছে, কয় হাট বেগুন বেচলে সে টাকা জোগাড় করতে পারবে। হাট থেকে ফিরে ও বড়চাচির কাছে টাকা রেখে আসে। মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করে, কত হলো?

রোজ রাতে শুতে গেলে ঝন্টু হিসাব কষে বের করে, আর কত হাট বাকি আছে। একদিন রাতে, অনেক রাতে, মেঘের ফাঁক দিয়ে যখন চাঁদ উঠেছে, জানালার কঞ্চির ফাঁক দিয়ে ওই চাঁদ যখন ওর বিছানার ওপরে তার আলো পাঠিয়ে দিয়েছে, ওই আলোর সঙ্গে ওর শুয়ে শুয়ে কথা হলো। আলোর সঙ্গে কথা বলে ও বুঝল, অতগুলো হাটে হেঁটে হেঁটে ওর কাম সারা হয়ে যাবে – ন্যুব্জ-কুঁব্জো তো হবেই, পটোল তুলতেও পারে। একদিন হামেদ দাদার সঙ্গে ও সে-কথা পাড়ল, ‘ও পলায় না ক্যান্? ও তো মরবি!’ দাদা বলল, ‘তোর অত চিন্তা করতি হবি নে – যার চিন্তা সেই কইরবেনে।’

‘ওর কি বাঁচার ইচ্ছে নেই?’

‘আছে।’

‘তাহলি পলায় না ক্যান্?’

‘কনে পলাবি?’

‘য্যানে খুশি স্যানে।’

‘য্যানেই পলাক, ধরা খাবি।’

ঝন্টু ঘাড় তেড়া করে দাদার দিকে তাকাল, ‘ক্যান্ – ধরা খাবি ক্যান্?’

‘এইডেই পিথিবির নিয়োম।’

‘যে বিটা ওর মারার জন্যি রোজ শূন্যি তোলে, সে বিটা ধরা খাবি নে?’

‘না, খাবি নে। যে ধোইরতি জানে, সে ধরা খায় না।’ হামেদ দাদা বুকের পশম চুলকাতে থাকে।

কালাপাহাড় ধরতে জানে। ঝন্টু তা বোঝে। ঝন্টু ওর সাদা সাদা দাঁত দেখেছে – বুঝেছে, ও কামড়াতে জানে। ঝন্টু ওর কড়াপড়া মোটা মোটা আঙুল দেখেছে – বুঝেছে, ও খাবলে ধরতে জানে।

‘ওই মাইয়ের সাথে তুই কি ভালোবাসা করিছির্, ভাই?’ হামেদ দাদা হাসে। ঝন্টু বুঝতে পারে না, আসলে ভালোবাসে কি না। সেদিন শাড়ির আঁচলটা চাদরের মতো বুকের ওপরে বিছিয়ে দিয়ে, একজোড়া স্যান্ডেল পরে, তারাবু হাটে এসেছিল। ঝন্টুর কাছ থেকে বেগুন কিনেছিল। ঝন্টু বেগুন মেপে দিয়ে, টাকা গুনে নিয়ে, ব্যাগটা ওর কাছে রেখে দিলো, বলল, ‘তুমি যাও, আসার সুমায় নিয়ে আসবানে।’ তারাবু মুখ টিপে হাসল, ‘দ্যাখাবিনে?’ ঝন্টু আঙুল তুলে দেখাল, ‘ওই যে।’ তারাবু আঁতকে উঠল, বিড়বিড় করে বলল, ‘মরবি তো মাইয়েডা।’ রানু তখন ফিরতি পথে দড়ির মাঝখানে চলে এসেছে – মাজা কাঁপছে, কিন্তু দুলতে দিচ্ছে না। সেদিন ফেরার পথে অন্ধকারে তারাবু ওকে বলেছিল, ‘রানুর কপালের দিকটা তোর কপালের মোতোন।’ মনের ভেতরে তারাবুর সেই কথা আজ বারবার বেজে উঠল। হামেদ দাদাকে ঝন্টু কিছু বলল না। হামেদ দাদাই বলল, ‘ভালোবাসা করা ভালো। ভালোবাসা কইরলি, আইজ তোর এই দশা হইতো না।’

ঝন্টু জানে হামেদ দাদা কোন কথা বলতে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ওর বাবার ভিনগ্রামে ডাক পড়ত। তিন-চারদিন উধাও থাকত। তারপর যখন ফিরত, কাঁথা মুড়ি দিয়ে কাত হয়ে পড়ে থাকত তিনদিন। ফাঁকে ফাঁকে উঠে কল চিপে পানি বের করে ঢকঢক করে গিলত। গ্রামে খবর আসত, বরইচরার মাঠের ভেতরে কার ধড় যেন পাওয়া গেছে। বিলের রাসত্মার ধারে মাথা পাওয়া গেলে, জানা যেত, মিনগ্রামের আলম জোয়ার্দারের বড়ভাই, না হয় ভাতিজা, না হয় বুড়ো চাচা খুন হয়েছে। একদিন ঝন্টুর বাবাকেই দেখা গেল ক্যানালের দুইপাড়ে দুই ভাগ হয়ে পড়ে আছে – মিনগ্রামের ক্যানালের দুই পাড়ে। ঝন্টুর মা আলম জোয়ার্দারের ঘরেই ভরসা খুঁজে পেল।

সেদিন ঝন্টু দুপুরে খেতে বসে, হঠাৎ পাত থেকে মাথা তুলে বড়চাচিকে বলে বসল, ‘বড়মা, আমার ভিটেটা বন্ধক রাখবা?’

‘কেন রে?’

‘শহরে যাব। চাকরি খোঁজব।’

‘ক্যান্, বিয়ে করবি?’ বড়চাচির সব কথা বিয়ের কথায় এসে ঠেকে। ঝন্টু হাসল। ঝন্টুর এই হাসি বড়চাচির বড় পছন্দ। বড়চাচি হাসল, ‘আচ্ছা, রাখবানে।’ ঝন্টু থালা ধুয়ে উঠে পড়ল, মাঠের দিকে হনহন করে হাঁটতে শুরু করল।

রানু আজ ফুরফুরে মেজাজে আছে। চপল গতিতে সে দড়ির ওপরে পা ফেলে ফেলে ও-মাথায় চলে গেল। মনে হলো, একটা কাচপোকা যেন মার্চাবনের ওপর দিয়ে বিকেলের রংমাখা রোদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চোখের পলকে আবার ফিরেও এলো। একবার যেতেই যে-সময় লাগে, আজ সে-সময়ে ও গিয়ে আবার ফিরেও এসেছে। এপাশে এসে বাঁশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে – বুক ওঠানামা করছে। বাঁশ বেয়ে ও নিচে নেমে আসছে না। কালাপাহাড় হামা দিয়ে, টাকা কুড়োচ্ছে। হঠাৎ হাটুরেরা সিটি দিয়ে উঠল। রানু দুই হাত দুই পাশে মেলেছে। দড়ির ওপরে আবার টিপে টিপে পা ফেলছে। কালাপাহাড়ের হাঁ-করা মুখের ভেতরে শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে। মানুষের অবিশ্রান্ত উল্লাস। কালাপাহাড় কেবল হামা দিয়ে টাকা কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আজ বোধহয় সাতশো টাকাও ছাড়িয়ে যাবে, হাজার টাকাও উঠে যেতে পারে, কে জানে। কে যেন একদলা টাকা ফেলেছে। কালাপাহাড় তুলতে গিয়েও তুলতে পারল না – কে যেন পায়ের বুড়ো আঙুল ফেলে টাকার দলাটা ঠেসে ধরল। মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে, ঝন্টু। সবাই তাকিয়ে আছে রানুর সাদা টাইটস পরা লিকলিকে দুটো পায়ের দিকে। রানু দড়ির মাঝ বরাবর চলে এসেছে। নিচে ঝন্টু তাকিয়ে আছে কালাপাহাড়ের দিকে। কালাপাহাড়ের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করছে। ওপরে রানু। রানু দুলছে। শুকনো মাটির ওপরে যেন ওর ঘাম ঝরে পড়ল। এ-সময়ে নিচে তাকানো নিষেধ। নাক সোজা রাখতে হবে। দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে রাখতে হবে। রানু সব মানছে। কিন্তু পা সরছে না। পা না-সরা বিপদের লক্ষণ। শরীরে দুলুনি উঠলে, পা সরিয়ে দুলুনি বের করে দিতে হবে, না হলে শরীরে দুলুনি জমা হতে থাকবে। তখন নিজেকে আছাড় মারলেই কেবল সে দুলুনি শরীর থেকে বেরোবে। ওর শরীরে ইতোমধ্যেই তিনটা দুলুনি জমা পড়েছে। পা সরছে না, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে থরথর করে কাঁপছে। ও নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলল, বাড়তি দুলুনি যেন না ওঠে।

লোকজন আর টাকা ফেলছে না। কালাপাহাড় নাই। হট্টগোলের ভেতরে কখন যেন বেরিয়ে গেছে। ঝন্টুকেও আর দেখা যাচ্ছে না।

সকালে কাকের ডাকে গাংনালীয়া গ্রামের সবার ঘুম ভাঙল। হাজার হাজার কাক। সব হাটের দিকে উড়ে যাচ্ছে। হাটের শেষ
মাথায় যে পুরনো বটগাছটা, কুমারগাঙের একদম পাড়ে শেকড়বাকড় ঝুরি ফেলে অনাদিকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছে, তার ডালে ডালে ঝাঁকে ঝাঁকে কাক এসে বসছে। পুলিশ রাইফেল তাক করলে কাকরা কা-কা করে ডেকে উঠছে, চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে, খানিকক্ষণ পর আবার এসে বসছে। গাঁয়ের ছেলেবুড়োরা গাছ থেকে একটু দূরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের ঘুম ভেঙেছে, কিন্তু চটকা কাটেনি। পুলিশ কাউকেই গাছ অবধি যেতে দিচ্ছে না। ওদিকে সত্তর-আশি হাত খাড়া খাত। বটগাছটা যেন কুমারগাঙটাকে তার পায়ের গোড়ালি থেকে উলটোদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে, এদিকে আর এগোতে দেয়নি – ওর নিচে নিরাপদে হাট বসেছে, হাটের তিনদিকে ত্রিশ-চলিস্নশ ঘর লোকের নিরিবিলি বসতি হয়েছে। তাই যেন নদীর সঙ্গে বটগাছটির অনাদিকালের বিরোধ। বর্ষায় কুমারগাঙ বুক ভরে পানি নিয়ে এসে গাছের গোড়ায় আছড়ে পড়ে, গাছকে উপড়াতে পারে না, গোড়ার মাটি সরিয়ে চলে যায়। শত শত বছর ধরে মাটি সরিয়ে তৈরি করেছে খাড়া খাত – সত্তর-আশি হাত গভীর। পুলিশ খাতের ভেতরে দড়ি নামিয়েছে। পাড় থেকে নিচে তাকালে মাথা ঘুরে যায়। সার্কাসের লোকদের এতো সহজে মাথা ঘোরার কথা নয়। কিন্তু সেই খাতের ভেতরে শেকড়বাকড়ের সঙ্গে পেঁচিয়ে ঝুলে আছে কালাপাহাড়ের লাশ – মাথা থেঁতলে গেছে। ওর হাতের মুঠোয় ধরা আছে একটা জামার ছেঁড়া অংশ – ঝন্টুর জামা। ঝন্টুর লাশ ঝুলছে আর হাতদশেক নিচে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: