দরিয়ায় কবি ডুবে যায়

লেখক:

মুহম্মদ নূরুল হুদা

কবি মূর্খ থেকে গেলে কী ক্ষতি তোমার?
তুমি তো শিখছো সব শব্দকলা, ভাষিক ছলনা,
মাতৃভাষা রপ্ত করে লুটে নিচ্ছো মৃত-বা-জীবিত সব ভাষার গহনা,
জগতের তাবৎ দর্শনশাস্ত্র, অর্থনীতি, আইনি ও বেআইনি বাহাস,
তুমিও কি হতে চাও স্বর্গ-ও-নরকত্যাগী
জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ জেদি ফসটাস?

কবি যদি মূর্খ থাকে কী ক্ষতি তোমার?
তুমি তো রেখেছো খুলে জগতের আদি-অন্ত, জ্যোতির্ময় অধিবিদ্যা,
লিখিত সংসারনামা, ইতিহাস, ধর্মগ্রন্থ, বিজ্ঞানের মনস্তত্ত্ব, শ্রুতির পুরাণ…
যা কিছু মুদ্রিত আছে কাগজে, মগজে কিংবা আলোর পাতায়,
যুক্তিতর্কে সিদ্ধ-অতি বিচারক দিয়েছেন রায়;
তোমার অধীত বিদ্যা শেষতক তোমাকে শেখায়
পাঠের বিচিত্র রীতি; ঘরে চরে নদীতে সাগরে,
তোমার দৃষ্টির নিচে ত্রিভুবন মেলে ধরে
শর্মিন্দা শরীর;
তুমি কি অধীর?
করো, পাঠ করো;
দুয়ে দুয়ে চার আর শূন্য শূন্যে শূন্যে…
যত পারো, করো যোগ করো…
অকাট্য হিসাব কষে গণিতের পৃষ্ঠা মেলে ধরো।

কবি তো হিসেবহীন, কী ক্ষতি তোমার?
কবি তো দেখতে গিয়ে কিছুই দেখে না,
কবি তো শিখতে গিয়ে কিছুই শেখে না,

কবি তো পড়তে গিয়ে কিছুই পড়ে না…
এক পথে যেতে গিয়ে অন্য পথে যায়
যেতে যেতে দশ দিকে হারায় দাঁড়ায়
দিনেরাতে বারো-ভূতে ঘাড় মটকায়,
উপরন্তু, উদাস কবিকে দেখে জগতের
বস্ত্ত-ও-অবস্ত্ত সব নিজের আকার
মুহূর্তে বদলে ফেলে ভিন্নরূপ ধরে…
পাখি হয় সরীসৃপ, অন্ধ হয় ত্রিকালদর্শক…
চরাচরে
সৃষ্টিবিশ্ব অঙ্গবদলের খেলা শুরু করে।

বাঁশবাগানের মাথার উপরে
ভাক্কুম ফলের মতো লাল চাঁদ দেখতে দেখতে
কবি সুতো কাটে অমাবস্যায় বুড়ি চরকায়,
কবিকে সৃজন্ত দেখে ঝোপে-ঝাড়ে জোনাকি তড়পায়,
দিগন্ত সাবাড় করে ততক্ষণে ঘূর্ণিদৌড় শুরু হয়ে যায়…

কিছুই দেখে না কবি, কিছুই শেখে না,
কিছুই পড়ে না কবি, কিছুই লেখে না,
ধরতে ধরতে হাত থেকে পিছলে যায় অধরা অমরা…
সোনাদিয়া পার হয়ে দরিয়ায় কবি ডুবে যায়
সামনে তার চোরাস্রোতে সাঁতরানো শেওলা দাঁড়ায়

মজা পায় ছুটন্ত ঘুরন্ত আর উড়ন্ত কবিও
সুফি মাস্তানের মতো টুকরো টুকরো ছিঁড়ে ফেলে আপন ছবিও,
প্রবল স্রোতের টানে ভেসে যায় তার ঘরবাড়ি,
ততক্ষণে মাৎস্যন্যায়ে জাগে এক জলরং মৎস্যকুমারী

তার ডাকে সাড়া দিয়ে কবি জগতের সঙ্গে দেয় আড়ি।