দীঘলার চরের হাহাকার

এম্নে চাইয়া রইছোস ক্যান?

দেখতাছি তোমারে।

আমারে দেহনের কিছু আছে?

হ, আছে। তুমি য্যামনে ধোঁয়া ছাড়ো সোন্দর লাগে।

টানবি?

না।

আরে টাইন্যা দ্যাখ। মনে হইবো সাম্পানে ভাসতেছোস।

কী কও?

রেজিয়া বেগম মিছা কতা কয় না বুজলি?

আসমানের কালা মেঘরে জাদু কইরা এইটার ভেতর ভরছি। না টানলে বুজবি কেমতে কইলজার ভিত্রে মেঘের ধুমা কেমন কইরা ধাক্কা মারে?

কী কও দাদি?

হরে, হাচাই কইতাছি। টানলে দেখবি, ধোঁয়ার স্বাদ কইলজার ভিত্রে কেমনে ঠোক্কর মারে, শইল্যের থাইকা বাতের বেতা আলগা কইরা ছাড়ে।

দাদি! তোমার এমন সোন্দর ছড়া হুনলে কি না টাইন্যা পারি? দ্যাও, টান মারি।

নদীর হাতে ধোঁয়াসমেত চুরুট তুলে দেয় রেজিয়া বেগম।  এরপর আবার ছড়া কাটে,

টান মাইরা দ্যাখলো নাতিন বিড়িত ধইরে টান

এমুন টানে আইস্যা পড়বো সাত আসমানের চাঁন।

নদী চুরুট হাতে নেয়। তারপর নরম ঠোঁটে চেপে ধরে।  কয়েক টানে খুকখুক কাশে। ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় চোখে জল এসে যায়। দাদিকে বলে, মাগো মা! জ্বালাপোড়া আছে এটায়। তোমারে ধরে না দাদি?

তোরে ধরছে? খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে রেজিয়া বেগম। আমারেও ধরছেগো নাতিন! আমারেও ধরছে। তয় চুরুটের আগুন না। ওইটা মালসার আগুন। মালসার আগুন চিনোস? মাটির থালায় তুষ ভইরা আগুন দিলে যেমুন কইরা ধিকিধিকি জ্বলে তেমুন কইরা এই বুকের খানাখন্দডার ভিত্রে কে য্যান আগুন ধরাইয়া দিছে। হেই যে দিছে আইজ পর্যন্ত এই আগুন নিভে নাই গো বুবু! আগুনের থালাডা লইয়া ঘুরি, ফিরি, কাম-কাইজ করি। বেবাগের লগে হাসিফুর্তি করি।  আগুন তো নিভে নালো বইন! রেজিয়া বেগম বলতে বলতে হাঁসফাঁস করে আর অনবরত চুরুট টানতে থাকে।

এজন্যই তুমি কথায় কথায় ছড়া কাটো? গান গাও?

চাঁদের দিকে উদাস চোখ রেখে রেজিয়া বেগম কী যেন ভাবে আর দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বলে, নারে বইন, এইজন্য গাই না। পরানডাতে কে যেন বইসা আমারে নিয়া উড়াল মারে। উড়তে উড়তে ভিত্রের মালসার তুষে দাউদাউ আগুন বাইর অয়। ওই দাউদাউ থেইকা কতাগুলান কই। তোরা হুইন্যা কছ ছড়া করি, গান গাই। আমার কী যে অয় ভিতরটায়! এতটুকু বলে রেজিয়া বেগম থামে। দুটি সুন্দর চোখ অনেক দূরে ঠেলে হঠাৎ গান ধরে …

এই পরানে বইসা তুমি দূরে সইরা যাও

আমি যখন আড়াল হইগো কাছে টানতে চাও

পইড়া আছি তোমার সামনে

ক্যান যে এই পরান কান্দে

চক্ষু খুইলা রাখো তবু দেকতে নাহি পাও

এই পরানে বইসা তুমি দূরে সইরা যাও।

আপন মনে গেয়ে যায় রেজিয়া বেগম। নদী মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে। দাদির গানগুলি যেন কেমন। একদম বুকে ঠেকে।  আপনা-আপনি কান্না চলে আসে। সুরের ভেতর কী বিষণ্ন কাতরতা!

গান থেমে এলে প্রশ্ন করে, আইচ্ছা দাদি একখান কথা কইবা?

কী কতা বইন?

দাদা কই? আইজ পর্যন্ত একদিনও তারে দেহি নাই। হে কি মইরা গেছে? হের জন্য কি এইরকম কইরা গান বান্দো?

‘হে কী মইরা গেছে?’ – এই কথা শুনে রেজিয়া বেগমের বুকের মাঝে খামচি মারে কে যেন। কোনো রকমে নিজেকে সামলায়। তারপর হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। আহ! যা হোক কিছু বলার জন্য তাকে আর ভাবতে হলো না। প্রশ্ন থেকেই উত্তর দৌড়ে এসেছে কাছে।

হরে বইন মইরা গেছে।

কত বছর হইছে?

এই যেমুন ধর আমাগো জনাল আবদীন যে বছর হইছে হেই বছরেই ওর বাপ মরছে।

তখন তুমি কই ছিলা?

ছিলাম আমগো বাড়িত।

এই বাড়িত আইছো কবে?

জনালের বাপ মরার পর তোমার দাদা আমারে নিয়া আসছে।

আমার দাদা?

হ, জনাল আওনের আগে আমি তোমাগো বাড়িত কামে আছিলাম।

হের পর তোমার বিয়া হইছে? কার লগে?

রেজিয়া বেগমের বুক ধক্ করে ওঠে।  চাঁদের আলোর নিচে ওর ফর্সা ধবধবে মুখ পাণ্ডুর হয়ে যায়। অগ্রহায়ণের শীতে শরীর থেকে চিকন ঘাম বের হয়। এই পুঁচকে মেয়েটি তো কলিজা ধরে টান মেরেছে। কী জবাব দেবে রেজিয়া বেগম দিশা করতে পারে না। তুমি এট্টু এইদিকে বহো, আমি ওইদিককার কাম দেইখা আইতে আছি – বলেই দিলো ছুট।

নদী বসে থাকে। চাতালের চারদিকে অনিদ্রিত অসংখ্য লোক কাজ করছে। সে এসব দেখতে এসেছে। ওর ভালো লাগে। জমিদার জয়েনউদ্দিন খাঁর বড় নাতনি সে। ডিঙ্গাতলা হোসেনপুর গ্রামের বড় জমিদার আয়েতউদ্দিন খাঁর একমাত্র ছেলে জয়েনউদ্দিন খাঁ। পিতার মৃত্যুর আগে জমিদারি প্রথা শেষ হলেও বাপ-দাদার ঐতিহ্যগত জমিদারি ঠাঁটবাট জমি-জিরেত টিকিয়ে রেখেছেন। এখনো নবাবদের পাওয়া উপাধি নিয়ে ডিঙ্গাতলা হোসেনপুর গ্রামে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করে যাচ্ছেন। জয়েনউদ্দিন খাঁ বাবার একমাত্র ছেলে হলে কী হবে নিজে আট ছেলে তিন মেয়ে জন্ম দিয়ে বংশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। নদী বড় ছেলে সুলতান রোকনউদ্দীন খাঁর মেয়ে।  তিন ছেলে ও তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাকি আছে আরো পাঁচ ছেলে। ওরা কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। জয়েনউদ্দিন খাঁ বুদ্ধিভাবনায় বৈষয়িক। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় জমিদারি প্রথা বিলোপ হলেও দক্ষতা ও ক্ষমতাবলে নিজ জমিদারি প্রথা টিকিয়ে রেখেছেন।

অগ্রহায়ণ মাস। চারদিকে শীতের গুঞ্জন। বিশাল জমিদারির চাতাল জুড়ে এসেছে নবান্ন। মিষ্টি মধুর শীত বাতাসে ভর করে কুয়াশা নিয়ে আসে। এইসময় বড় ছেলে সুলতান রোকনউদ্দীন খাঁ পরিবারসহ গ্রামের বাড়ি বেড়াতে আসেন। পিঠা-পায়েস খাবেন। বউ-বাচ্চাদের গ্রাম ঘুরিয়ে দেখান আর পূর্বপুরুষের নানারকম কীর্তিগাথা গল্পের মতো বলতে থাকেন। নদী এসব হাঁ হয়ে শোনে। সুলতান রোকনউদ্দীন খাঁ চা-বাগানের মালিক।  সিলেটে পরিবার নিয়ে থাকেন। নদীরা দুই বোন, এক ভাই। ভাইটি বড়। ভাইয়ের জন্মের বারো বছর পর নদীর জন্ম এবং ওর ছোট বোন হৃদি নদীর চার বছরের ছোট। নদী বাড়ি এলে রেজিয়া বেগমের পেছনে পড়ে থাকে। জন্মের পর যতবার বাড়িতে এসেছে রেজিয়া বেগমকে এই বাড়িতে কাজ করতে দেখেছে। কত কাজের লোক এই বাড়িতে। নারী-পুরুষে গিজগিজ করে এই বাড়ি। এত কাজের লোকের ভিড়ে রেজিয়া বেগমের দাপট আলাদা। নদীর দাদি লুৎফুন্নেসা খানম এই বাড়িতে যখন বউ হয়ে আসেন এর আট বছর পর নাকি রেজিয়া বেগম এই বাড়িতে আসে। সেই যে এলো আর কোথাও যায়নি। মাঝখানে জয়নাল আবেদীন কাকা জন্মের সময় এক বছর উধাও হয়ে গিয়েছিল। জয়নাল আবেদীন রেজিয়া বেগমের ছেলে। নদীরা জয়নাল আবেদীনকে কাকা ডাকে। রেজিয়া বেগম এই বাড়িতে কাজ করে বেতন ছাড়া। দাদা সরদার জয়েনউদ্দিন খাঁর কাছে আর্জি ছিল, এখানে সে আজীবন কাজ করবে, বিনিময়ে ছেলেটাকে রেখে দিতে হবে আর পড়ালেখা শেখাতে হবে। সব শুনে দাদি লুৎফুন্নেসা খানম রাজি হলেন। রেখে দিলেন রেজিয়া বেগমকে। তৃতীয় সন্তান জন্ম দিয়ে লুৎফুন্নেসা খানম পঙ্গু হলেন। রেজিয়া বেগমের হাতেই লুৎফুন্নেসা খানম হেঁসেল এবং বাহির বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে শয্যা নিলেন। সেই থেকে রেজিয়া বেগম এই পরিবারের কর্ত্রীর মতো হয়ে গেলেন। বিছানায় শুয়েই একের পর এক বাকি সন্তান জন্ম দিয়ে লুৎফুন্নেসা খানম শীর্ণ পাণ্ডুর হলেন। এত বড় বাড়ি। এগুলি সামাল দেওয়া কি চাট্টিখানি কথা? ঘরে-বাইরে এমনভাবে সব সামাল দিলো যে, রেজিয়া বেগমকে কেউ আর এই বাড়ির কাজের লোক ভাবে না। সবাই ওর ভেতর লুৎফুন্নেসা খানমের ছায়া দেখে। নদী দাদি বলতেই অজ্ঞান। হবে না? রূপবতী আর মায়াবতী এই নারী জমিদার জয়েনউদ্দিন খাঁর পরিবারের সবাইকে আগলে রেখেছে অপত্য স্নেহে। কথায় কথায় ছড়া কাটতে জানা, গান বাঁধা ও সুর দিতে জানা এই নারী দিগি¦জয়ী বীরের মতো সবাইকে দখল করে আছে। মিহি সুরেলা কণ্ঠ তার। মাঝে মাঝে জয়েনউদ্দিন খাঁর মতি-মর্জি এদিক-সেদিক হলে রেজিয়া বেগমের ডাক পড়ে। রেজিয়া বেগমের ভেতর তখন সূক্ষ্ম চঞ্চলতা দেখা দেয়। চুলে তেল মেখে সিঁথি কাটে। কলাপাতায় সরিষার তেল ঢেলে আগুনের তাপে পুড়িয়ে কালি তোলে। সেই কালি চোখে লাগায়। এরপর থানকাপড়ের ভাঁজ ভেঙে গায়ে চাপায়। চুলে আলগা টার্সেল দিয়ে খোপা বাঁধে। এরপর মুখে পান গুঁজে ঠোঁট রাঙিয়ে মাথায় ঘোমটা চাপিয়ে জয়েনউদ্দিন খাঁর সামনে দাঁড়ায়। যখন দাঁড়ায় রেজিয়া বেগম তার রূপের জৌলুসে জয়েনউদ্দিন খাঁর চোখ ঝলসে যায়। লাল টকটকে ঠোঁট ঠেলে সালাম ঠুকে বলে, হুজুর আমাকে স্মরণ করেছেন। আদেশ দ্যান, কী করিবো?

গান শোনাও রেজিয়া। গান শোনাইয়া আইজ আমারে সুখ দ্যাও। মন বড়ই বিচলিত হইয়া আছে।

জে হুজুর, আপনার যেমুন ইচ্ছা। রেজিয়া বেগম তৎক্ষণাৎ গান বেঁধে সুর তোলে।

আহারে আসমানের চাঁন,

এমন পোড়া কপাল তোর

রূপের বাত্তি জ্বালাইয়া মনু

একলা পুইড়া হইলি খান,

আহারে আসমানের চাঁন।

জয়েনউদ্দিন খাঁর পাশে লুৎফুন্নেসাকে কয়েকজন কাজের মহিলা ধরাধরি করে এনে বসায়।

অচল জমিদারনি ফ্যালফ্যাল চোখে সুরেলা মিহি কণ্ঠের রেজিয়া বেগমকে দেখে ভেতরে ভেতরে পোড়ে। কে যেন কুঠার দিয়ে তাকে কাটে। অসহায় লুৎফুন্নেসার চোখ লকলক করে ওঠে। হিংসা, ঈর্ষায় মৃত পাগুলি জাগাতে চেষ্টা করে রেজিয়া বেগমকে কষে লাথি মারার জন্য। কিন্তু পা জাগে না, তার চেয়ে জেগে ওঠে ভেতরের ক্রূরতা। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, হারামজাদি, নটি, মাগি। রং মাখিয়া ঢং দেখাইতেছোস! তহন যদি জানতাম তরে এই বাড়িত রাহি? ঢং দেখাইয়া রং মাখিয়া আমার খাইয়া-পইরা আমার সোয়ামির সামনে কুদস! হারামজাদি, মাগি! লুৎফুন্নেসার এই রোষ অমূলক নয়। শক্ত সামর্থ্যবান সুপুরুষ জয়েনউদ্দিন খাঁ। এইরকম পুরুষের জন্য কেমন জীবনসঙ্গী দরকার তা লুৎফুন্নেসা জানে। নিজের অপারগতা অক্ষমতা দিনরাত কুপিয়েছে তাকে। স্বামীর সামনে হেসে-খেলে-দৌড়ে খলবল না করলে কী পুরুষের মন ভরে? মন ভরাতে রূপই সব নয়। লুৎফুন্নেসা অসাধারণ রূপসী। কিন্তু অচল।  পা না থাকলে রূপে কী হয়? রূপের সঙ্গে গান, নাচ, ছড়া কেটে যদি স্বামীর মনোরঞ্জন করা না যায় তাহলে সংসারে ওই নারীর কোনো মূল্য আছে? সেইদিক থেকে রেজিয়া বেগম পরমা নারী। কী নেই ওর? রূপ, ছড়া, গান, সুরের ছলাকলায় জয়েনউদ্দিন খাঁ যে রেজিয়া বেগমে আসক্ত তা কি লুৎফুন্নেসা জানে না? পা অচল হতে পারে চোখের আলো তো মরে নাই। তিনি সব বোঝেন। কিন্তু কিছু করতে পারেন না। মনে মনে বিষ হজম করেন আর রেজিয়াকে কুৎসিত হওয়ার অভিশাপ দেন।  নিরুপায়ের অভিশাপ ছাড়া আর যে কোনো অস্ত্র নেই।

জয়েনউদ্দিন খাঁর চোখে রেজিয়ার ঝলক। উড়ে যায় জমিদারের চন্দন তৃষা রেজিয়ার চরণে। তামাকের পাইপ টানতে টানতে বলেন, রেজিয়া কী গান বানাইলা কও! যেমন করে  সুর বানছো আমার ঘাটার দিঘিতে ঢেউ উঠছে। রেজিয়া গাও আরো গাও, তোমার গানের সুরে আসমানের চাঁন ফকফকাইয়া উড়ুক। আইজ চাঁনরে ঘরে যাইতা দিবা না। এইরকম ভাবনা বানাইয়া একখান গান বান্ধো তো দিকি? আমি হুনি। ইনাম পাইবা।

রেজিয়া বেগম আরেক খিলি পান মুখে পোরে। সুগন্ধি জর্দার ঘ্রাণ জয়েনউদ্দিন খাঁর কলিজাতে সুবাস ধরায়। জমিদার এক হাতে পাইপ মুখে ধরে আরেক হাতে বুক ডলে।

ওপর-নিচে হাত বোলাতে বোলাতে চোখ বোঁজে। রেজিয়া বেগম সব বোঝে। জানে আজকের এই প্রহর দামি। আজকের এই রাত নীল গুলাবের সুশোভন মিনার। আজ গানের আড়ালে-আবডালে একজন আরেকজনের মন ছোঁবে। আজ রেজিয়া বেগম রেজিয়া বাঈ। সুগোপন সিঁড়ি ভেঙে সুরের জোনাকিরা মিটমিট আলো জ্বেলে উড়িয়ে নেবে সরদার জয়েনউদ্দিন খাঁকে ওর বেয়াড়া বাস্তুভিটেতে। রেজিয়া বেগম জানে, আজকের এই রাতের মর্ম। জমিদার জয়েনউদ্দিন খাঁর বুকের কোথায় ব্যথা, কেন এই ব্যথা তা দ্রাক্ষামতী রেজিয়া বেগম ছাড়া আর কে খোঁজ রাখে? জয়েনউদ্দিন খাঁর আদেশ চাঁদকে ঘরে না পাঠানোর গান বেঁধে  শোনাতে হবে। রেজিয়া বেগম অনাস্বাদিত স্বাদে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সামনে ল্যাংচা এক রমণী ওর পাশে বলিষ্ঠ সুঠাম পাহাড়ের মতো শক্ত সামর্থ্য এক পুরুষ বসা। এমন পুরুষের সঙ্গে কী ওরকম রমণী মানায়? যে পুরুষ পাশের রমণীকে পাশেই রেখে বুকে তুলে নেয় দূরাগত ওষ্ঠের ঘ্রাণ। যে-ঘ্রাণ  সুগন্ধি জর্দায় ম-ম করে তুলছে বেদেনী প্রহর। রেজিয়া বেগম একপলক তাকায় জয়েনউদ্দিন খাঁর দিকে। পুলকিত দৃষ্টি গোপন বাসনা অতিক্রম করে চলে যায় দেবতা সভায়। এই দৃষ্টি বড়ই পবিত্র ও নির্মল। ওখানে গানের দেবী সুরের ফল্গুধারায় বয়ে আনে কথার ভার।  রেজিয়া বেগম গান শুরু করে …

ওরে নয়া চাঁন কী পিরিত শিখাইলি

বহুদেশ ঘুইরা তুই আসমানে নোঙর দিলি

আমি অকালের কোলে বইসা তোরে যত দেখি

মন পারি না বান্ধিতেরে আমার হইলো কী!

তোর কাছে লুকাইতে চাইরে মনের যত ব্যথা

যাইসনারে আমারে ছাড়িয়া চাঁন দিয়ে যা কথা

ওরে আসমানের চাঁন কোথায় বাতাসের ডাল

পাইতাম যদি ধইরা তারে ভাঙতাম খোয়াবের কাল।

রেজিয়া বেগমের গান শেষ হয় আর জয়েনউদ্দিন খাঁর নেশা বেড়ে যায় আরো শোনার জন্য। 

অতল হ্রদের আঙিনা কেটে মনডুবুরি সাঁতরে চলে রেজিয়া বেগমের হৃদবাঁওড়ে। রেজিয়া বেগমের উদ্যানজুড়ে কথার রেণু দুলতে থাকে। সুরের খেয়া প্রজাপতির মতো উড়তে থাকে। ওপরে চাঁদের আলো নিচে রেজিয়া বেগমের আলো – দুই আলোয় ভেসে যায় চারপাশ। চাঁদের তো একতরফা আলো। কিন্তু রেজিয়া বেগমের সর্বাঙ্গময় জোছনা, মুকুলিত কথার শোভামালা, সুরের সুনীল সুষমা পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যকে মøান করে দিচ্ছে। গলায় অভুক্ত যৌবন কিলবিল করে ওঠে। গান বাঁধে রেজিয়া বেগম আরো,

ও আমার নিধুয়া পরানপাখিরে

কেন এত জ্বালা লাগেরে

এই মন থাকিতে কেন আমি

দরিয়ায় মিছে সাঁতার কাটিরে …

সুরের মোহনায় কথারা আরো হুড়মুড়িয়ে ছুটে আসে রেজিয়া বেগমের জবানে …

আমায় বাসিলিরে বন্ধু ভালো

তবে কেন তোর হৃদয় কালো

এই কথা বল কাহারে জিগাই

যারে জিগাই সেও যায় দূরে

চোখ খুইলা দেখি আমার কেহ নাই।

গান চলতে থাকে। কত রাত হয় কেউ জানে না। গানের মোহন সুরে জমিদারবাড়ির পাইক, পেয়াদা, নায়েব, গোমস্তা সবাই চাটাই নিয়ে উঠানে বসে যায়। কে কোথায় কীভাবে বসেছে কারো হুঁশ নেই। গান শুনতে শুনতে অনেকের চোখ শিথিল হয়ে আসে। বিশেষ করে অন্দরবাড়ির মহিলাদের। যারা দূর থেকে খড়ের স্তূপে বসে গান শুনছিল। গানের সুমধুর সুর ওদের চোখে ঘুম তুলে দেয়। ক্লান্তিময় শরীর সুরের মোহন জাদুতে এলিয়ে পড়ে ওখানেই। সন্ধ্যারাত নাকি মধ্যরাত নাকি শেষরাত কেউ ঠাহর করতে পারে না। গান থামাতে হয় লুৎফুন্নেসার ডাকে। অবশ শরীর নিয়ে হেলান দেওয়া চেয়ারে কতক্ষণ বসে থাকা যায়? আরো আগেই চলে যেতেন। কিন্তু মনের গহিন অলিন্দে ঈর্ষার বিতৃষ্ণা কোথায় রাখবেন? এই গোপন প্রেমিক যুগল তার শান্তি নষ্ট করে দিয়েছে সেটা তো কাউকে বলতে পারেন না। তাহলে করবেনটা কী? পুড়ে মরা ছাড়া গতি আছে?

লুৎফুন্নেসা বিহ্বলিত হয়ে পড়েন। অস্থির লাগে সব। শারীরিক অসুস্থতার জন্য জলসা ছেড়েও যেতে পারেন না, আবার রেজিয়া বেগমকে জয়েনউদ্দিন খাঁর সামনেও রেখে যেতে দ্বিধা। মনে আডাক-কুডাক সতর্ক করে। শেষে নিজ থেকেই বিরক্ত হয়ে বলেন, শুনছেন?

জয়েনউদ্দিন খাঁ ঘোরে ডুবে আছেন। লুৎফুন্নেসার ডাকে চকিতে ফিরে বললেন, কিছু কইবা?

হ।

কও, কী কইবা?

মেলা রাত অইছে। ক্ষ্যান্ত দেন এবার। চলেন, ওঠেন।

জয়েনউদ্দিন খাঁ সামিয়ানার নিচে বসে গান শুনছেন।  বাইরে ধবধবে চাঁদের আলো রাতের ভেতরটাকে একদম গিলে নিয়েছে। বুঝতে পারেন রাত অনেক হয়েছে। গভীর আলোর সাম্পান ভাসিয়ে চাঁদ হেঁটে যায় বহুদূর। জমিদার জয়েনউদ্দিন খাঁ ওঠেন। পূর্ণিমার ঢুলু ঢুলু আলো রেজিয়া বেগমের চোখে-মুখে। সারারাত গান শুনিয়ে তৃপ্ত করা জমিদারের খুশিমুখ দেখে ওর ঘুঘুর বুকে বিন্নিধানের ঘ্রাণ ফোটে। জমিদারের সম্মুখে অক্লান্ত রেজিয়া বেগম মহাআনন্দে সেলাম ঠুকে বিদায় নেয়। পূর্ণিমা রাতে সুরের দীপ জ্বালিয়ে যে উজ্জ্বল উৎসবকে রেজিয়া বেগম ডেকে এনেছে তার সরল প্রশান্তি শুধু দুজনই জানে। উৎসবমুখী এই নারী আলোকে করেছে আলো দিয়ে জয়। ব্যথাকে করেছে মন দিয়ে ক্ষয়।

নদীরা যখন বাড়ি আসে তখন চারদিকে অগ্রহায়ণ এসেছে।  কুয়াশা শীতের দরজায় দাঁড়িয়ে। তাকে ভেদ করে চাঁদের জ্যোৎস্নারা হুড়মুড়িয়ে জমিদারবাড়িতে গমগম করছে। বিশাল চাতালে জায়গায় জায়গায় গরু দিয়ে ধান মাড়াই চলছে। মাড়াই থেকে উল্টেপাল্টে ধান, খড় আলাদা করা হচ্ছে। ক্ষেত থেকে শুকিয়ে আনা ধানের স্তূপে উঠান দেখা যায় না। এত ধান চাতালে জায়গা হয় না। বাড়ি থেকে দূরে পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে একটি ক্ষেত আছে। সেখানে ঘাস তুলে মাটি চেঁছে সমান করে গোবর দিয়ে লেপে খলা করা হয়েছে। সেখানে রেজিয়া বেগম কাজের তদারকি করে। সারারাত পার হয়ে যায়, কাজ শেষ হয় না। কখনো কখনো ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে খড়ের গাদায় শুয়ে পড়ে। পাশে ছোট্ট কুঁড়েঘর তোলা আছে। কাজের মহিলারা নামাজের সময় হলে ওখানে নামাজ সেরে আসে। তখন একটু অবসর মেলে।  এই সুযোগে কেউ কেউ চাটাইয়ে গড়াগড়ি খায়। সুযোগটা  হাতছাড়া করতে চায় না কেউ। নদী এসব চোখ আর মন দিয়ে দেখে। গরু ঘুরছে বাঁশের চারদিকে। তাদের পায়ের নিচে খড়। ওদের পায়ের চাপে খড় থেকে ধান আলাদা হয়ে যায়। কতক্ষণ এভাবে চললে কাজের মুনীষরা খড় উল্টেপাল্টে দেয়। এভাবে চলতে চলতে একসময় খড় থেকে ধান আলাদা হয়ে এলে রেজিয়া বেগম মুনীষদের তাড়া দেয় ধান তুলে নিয়ে আসতে। মুনীষরা খলার আরেক পাশে খালি জায়গায় ধান জমা করে। চাঁদের আলোয় চিকচিক করে সোনামুখী ধান। হলুদ টকটকে সোনালি বিচিগুলি জ্যোৎস্নার সরল ছায়ায় হাসতে থাকে। কী অপূর্ব মায়া ঝরে পড়ে চারদিকে। রাত গভীর হয়। উঠানে গরুগুলি অলস ঘুরতে থাকে। একসময় গলা বাঁধা দড়ি আলগা হয়ে যায়। বাঁশের গোড়ালি দড়ির টানে ক্যাঁচড় ক্যাঁচড় করে। মাটি ঝুরঝুরে হয়ে আসে। এই শব্দ অগ্রহায়ণের বুক জুড়ে করুণ সেতারের মতো মনে হয়। অবিশ্রান্তভাবে বোবা প্রাণীর ছুটে চলা নদীর বুকে এসে লাগে। ওর কাছে এটা অন্যায় মনে হয়। মানুষের পেটের ক্ষুধা মেটাতে এই অসহায় বোবাপ্রাণীর শরীরের যন্ত্রণা কারো চোখে পড়ে না। মোটা দড়ি গলা জুড়ে থাকায় দড়ির টানে ওদের ঘাড়ের চামড়া ছিলে যায়। রক্তাক্ত ঘাড় চিড়ে সাদা চামড়ার থলথলে ক্ষত দেখে নদীর বুক দুঃখে ফেটে যায়। ছোট নদীর বুক ছোট হতে পারে। কিন্তু অনুভূত বেদনা তাকে অগ্রহায়ণের টুপটাপ ঝরে পড়া কুয়াশার ভেতর জাগিয়ে রাখে।  রেজিয়া বেগম কাজের কথা বলে ওইদিকে যে গেছে এইদিকে আর ফেরার নাম নেই। নদী তখনো খড়ের গাদায় যেমন বসেছিল তেমন বসে থাকে আর আনমনে ভাবে। কতবার সে দাদিকে জয়নাল আবেদীন কাকার বাবার কথা জিজ্ঞেস করেছে। দাদি এটা-সেটা বলে এড়িয়ে যায় কেন? মরে গেছে, নাকি বেঁচে আছে, তাও বলে না। চোখেমুখে কেমন রহস্য রেখে হাওয়া হয়ে যায়। নদী ওঠে। ধান মাড়াইয়ের ক্যাঁচড় ক্যাঁচড় শব্দ কমে আসে। বুঝতে পারে গরুগুলি বল হারিয়ে ফেলে। বল হারিয়ে ফেলে মুনীষরাও। তবু তাদের জেগে থাকতে হয়। পেটের ক্ষুধার চেয়ে ঘুম বড় হতে নেই। ঘুম হচ্ছে গরিবের বিলাসিতা। বিলাসী বস্তুর জন্য জন্মও বিলাসী হতে হয়। গরিবের পেটে ক্ষুধা ছাড়া আর কোনো সঞ্চয় থাকে না। গরিব আর গরু – ওরা বোবাজাত। তবে ওদের চোখ তীক্ষ্ম হয়। সেখানে করুণ দৃষ্টিরা বেদনার সঙ্গে লড়ে।

দেখতে দেখতে অগ্রহায়ণের শেষ বিকেল আসে। পৌষের পাকস্থলি ভরে থাকে কুয়াশায়। ধোঁয়াটে তামাশায় পৃথিবীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে হিম। কিছুই দেখা যায় না চারদিকে।  অগ্রহায়ণের শেষ কদিন সূর্য দেখেনি কেউ।  হাড়কাঁপানো শীতে সবার জর্জর অবস্থা। বুকেপিঠে শীত বেঁধে ধান মাড়াইয়ের কাজ শেষ করে কামলা মুনীষরা। এখন চালের ব্যবস্থা করতে হবে।  সেজন্য ধান সিদ্ধ করার যজ্ঞ চলছে। চাতাল থেকে দূরে বুয়ারা বড় বড় গামলায় ধান ভরে সারি সারি চুলায় সিদ্ধ করছে। আগুনের কাছে বসে থাকে নদী। সে আগুনের উৎস দেখে। যে খড় সোনালি ধানের শীষ জন্ম দেয় সেই খড়েই সিদ্ধ হয় ধান। মায়ের উত্তাপে সন্তানের আহূতি। হলুদ ধান, হলুদ খড়, হলুদ আগুনে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইটা দমকে ওঠে। রেজিয়া বেগম কতক্ষণ পর এসে ধানের বুক দেখেন। আগুন আঁচে ফেটে এলে বোঝেন ধান সিদ্ধ হয়ে গেছে। বুয়াদের তাড়া দেন ধান নামাতে। নদী খেয়াল করে কদিন থেকে রেজিয়া বেগমের মুখ ভার। চুপচাপ থাকে। কথা নেই। হাসি উধাও। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করেও উত্তর পায়নি নদী। সামনে আগুন পেছনে স্তূপীকৃত সেদ্ধ ধানের ভাপে শীত কই যে পালায়! নদী গলার মাফলার আলগা করে। হাঁ করা মুখ থেকে ধোঁয়া বের হয়। নিজের মুখের ধোঁয়া নিয়ে খেলে কিছুক্ষণ। হঠাৎ  বিড়ি খেতে ইচ্ছে জাগে। একমাত্র রেজিয়া বেগম ছাড়া এখানে কোনো নারী বিড়ি খায় না। পুরুষ মুনিরা খায় আকিজ বিড়ি। রেজিয়া বেগম এগুলো পছন্দ করে না। সে নিজের বিড়ি নিজে বানায়। পাশের বাড়ির হাশেম মিয়ার মেয়েরা মামুন কোম্পানির বিড়ি বানানোর কাজ করে। বিড়ির কাগজগুলি পাতলা রসুনের চামড়ার মতো। ওখান থেকে কাগজ এনে রেজিয়া বেগম বিড়ি বানায়। একদিন নদীকে গোপনে ওই বাড়িতে নিয়ে যায়। জমিদারের নাতনিকে দেখে হাশেম মিয়ার বউ-বাচ্চারা ভয়ে কাঁপে।

ওহ খোদা! বুবু তুমি ইডা কিতা করলা? আমগো ভাত মারোনের বুদ্ধি করছো? জমিদারের নাতিনরে নিয়া আইছো গরিবের বাড়িত! জমিদার জানতে পারলে গোসা করবো।  আমগোরে কাম দিবো না। এইডা কিতা করলা? রেজিয়া বেগমকে উদ্দেশ করে হাশেম মিয়ার বউ চেঁচায়।

কিছু অইবো না। চিন্তা কইরো না হাশেম মিয়ার বউ। নদীর ভিত্রে অহংকার নাই। মাইয়াডা এক্কেরে সরলসিধা। মায়ের মতোন অইছে। দেহো না বাড়িত আইলে আমার কোঁছ ছাড়ে না। বউডাও আমার লগে থাকতি দ্যায়। মাইয়াডা বড় বালাগো!

হাশেম মিয়ার বউ ব্যস্ত হয়ে যায় কোথায় বসাবে নদীকে? গরিবের ঘর। পিঁড়ি ছাড়া কিছু নেই। নদীর ওদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। উঠান জুড়ে সাদা কাগজের ঠোঙা সারি সারি বিছিয়ে আছে। ঠোঙাগুলি চিকন ও সরু পাইপের মতো, তবে মুখখোলা।  শক্ত কাগজের বেল্টের ভেতর আটকে আছে। এরকম সারিবদ্ধ সরুনালির মতো কাগজ বেল্টে আটকানো দেখে নদী অবাক হয়। উঠানে নেমে আসে। মধু শেষ হয়ে গেলে মৌচাক দেখতে যেমন লাগে ঠিক তেমন লাগছে সারিসারি বেল্টা। অসাধারণ! নদী ছুঁয়ে দেখে। এরপর প্রশ্ন করে, এগুলি কী?

নদীর মুগ্ধতা দেখে হাশেম মিয়ার বউ বিনয়ে গদগদ হয়ে বলে, বুবুজানগো এগুলান বিড়ি।

বিড়ি?

হ, বুবুজান। এগুলান মামুন কোম্পানির বিড়ি। হেগোরে আমরা বানাইয়া দিলে টেকা দেয়।

কত টাকা দেয়?

পত্তি বেল্ট দুই টেকা।

মাত্র? একেক বেল্টে কতটি বিড়ি আছে?

এক হাজার কইরে।

ওহহ গড! এক হাজার বিড়ির জন্য দুই টাকা? বলেন কী? তো সারাদিনে কত হাজার বিড়ি বানান?

এই ধরেন দশ হাজার।

এগুলি কখন বানান?

দিন-রাতে মিলাইয়া বানাইয়া শেষ অইলে বেয়ান রাইতে নিয়া যায় শাহিনের বাপ।

ভোররাতে? কেন?

ওমাগো বুবু, হেই সময়ত্থন হাঁটা না ধরলে যে আটটার মইদ্যে পৌঁচান যাইবো না।

এত কষ্ট করতে হয় আপনাদের! দেখি তো কীভাবে বানান বিড়ি?

হাশেম মিয়ার বড় মেয়ে শাহীন খুশিতে বিড়ির ডালা নিয়ে আসে। একটি সরু কাঠির মধ্যে পাতলা রসুনের কাগজটা প্যাঁচায়। কাঠির ওপরের দিকটা সরু। ওখানে কিছু কাগজ রেখে এর ভেতর শক্ত ওয়ানটাইম ব্যান্ডেজের মতো একটি কাগজ পেঁচিয়ে আঠা দিয়ে মুখ আটকে দেয়। ওই শক্ত কাগজের অংশটাই মুখে নিয়ে বিড়িখোররা বিড়ি টানে। শাহীন ওই কাগজ দেখিয়ে বলে, এইটারে কেরেপ কয়।

কেরেপ? কী অদ্ভুত নাম! দেখি কাঠিটা দেন তো, আমিও বিড়ি বানাবো।

হাশেম মিয়ার বউ ভয়ে লাফিয়ে ওঠে। না না বইন, এরুম কইরেন না। আপনের বাবা জানতে পারলে বিপদ অইবো।

কিছু হবে না, দেন তো?

নদী ডালা থেকে কাঠি নিয়ে বিড়ি বানাতে বসে যায়। অবাক কাণ্ড! জমিদারের নাতিন বিড়ি বানায় কোনো এক হতদরিদ্রের ঘরে। কথাটা আশেপাশে ছড়িয়ে যায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, পাড়ার মহিলার দল জড়ো হয়ে সবাই নদীর বিড়ি বানানো দেখে। সেই শুরু নদীর বিড়ি বানানো। বাড়িতে এলেই রেজিয়া বেগমের সঙ্গে শাহীনদের বাড়ি চলে আসে। ঘণ্টা ঘণ্টা বসে ওদের বিড়ি বানিয়ে দেয়। অবস্থা এমন যে, নদীর সঙ্গে কেউ কুলিয়ে উঠতে পারে না। মেয়েটার সরলতা সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। নদীর একটা ভালোবাসার জায়গা তৈরি হয়ে যায় এসব হতদরিদ্রের মাঝে। রেজিয়া বেগম জমিদারের হেঁসেল থেকে উচ্ছিষ্ট মাছ, মাংসের তরকারি, ভাত দিয়ে এই বিড়ির কিছু কাগজ, কেরেপ আর আঠা নিয়ে আসে। তারপর নিজে বানিয়ে পানের জর্দা ভেতরে ভরে আঠা দিয়ে বিড়ির মুখ বুঁজে দেয়। তিনশো থেকে চারশো কাগজে মাস সেরে যায়। নদী বাড়ি এলে রেজিয়া বেগমের বিড়ি সে বানিয়ে দেয়। আজ এই কুয়াশাভরা রাতে ওর বিড়ি টানতে মন চাইছে। আশেপাশে রেজিয়া বেগমকে খোঁজে। না পেয়ে চাতালের উত্তরপ্রান্তে হাঁটা ধরে। সেখানে ছোট্ট ঘরটা। সামনে এগোয়। কিছু দেখা যায় না। এত কুয়াশা।

হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়ায়। একটু দূরে মৃদু ধমকের শব্দ শুনতে পায়। ধমক খেয়ে একটি নারী কাঁদছে। আরে এ যে রেজিয়া বেগম! নদী সামনে এগিয়ে যাবে ভাবছে। কেন কাঁদছে জিজ্ঞেস করবে। এর আগেই ওকে থেমে যেতে হয়।

জয়েনউদ্দিন খাঁ! দাদা? কী করছে এখানে? রেজিয়া বেগমের সঙ্গে তার কী কাজ?

নদী আড়ি পাতে। জয়েনউদ্দিন খাঁ বলছে, মুখ সামলাও রেজিয়া! তোমারে যে এইহানে থান দিছি ওইটা শোগর করো। আর কী ছাও?

আমি কী আপ্নের কাছে কিছু ছাইছি? শুধু আপ্নের পোলা জয়নাল আবেদীনের একটা বিহিত করেন। পোলাডা সেয়ানা অইছে। বিয়া-শাদি দিলে কই থাকবো? আপ্নের এত জাগাজমি। কিছু ওর নামে দিয়া দেন। আমি সারাজীবন আপনার এখানে কামের বেডির মতো আছিলাম। পুরা জীবন শেষ করছি। আপনের লগেও থাকতে অইছে। আমি কিছু চাইবার পারি না?

না, তুই চাইতে পারোস না! আমার আটটা পোলা আছে। হেগোরে কী জবাব দিমু?

জয়নাল আবদীন আপনারও পোলা।

থাম কইলাম রেজিয়া!

ক্যান, ক্যান থাম্মু, লোকের ডরে? লোক ডরাইলে আমি বাঁচুম? আমি তো বেশি কিছু চাই নাই। জয়নাল আবদীনের একটা হিল্লা চাইছি। আমি মইরা গেলে এই পোলার কী অইবো? পোলা জন্মের পর আমারে নিয়া আইছেন। বলছেন আপ্নে ভরসা অইবেন। আমার কুনো ডর নাই। এহন এইডা ভরসা অইলো? আমারে এই চাতালটা দিয়া দ্যান। আপনে মইরে গেলে এইহানে আমারে কেউ থাকবার দিবো না। দোহাই আপনের, আমার একটা বিহিত করেন। রেজিয়া বেগম জয়েনউদ্দিন খাঁর পায়ের ওপর হুড়মুড়িয়ে পড়ে।

 সর রেজিয়া! জয়েনউদ্দিন খাঁ হ্যাঁচকা টানে পা সরিয়ে নিলে আহত পাখির মতো ভাঙাগলায় বলে, থামেন! আপনার ছেলে আলতাফ খাঁ এই ব্যাপারটা জানে। তড়িতাহতে স্পৃষ্ট হলে যেমন হয় তেমন করে জয়েনউদ্দিন খাঁর পা আটকে যায়। একটি মুহূর্ত মাত্র। ফণা তোলা সাপের মতো ফোঁস করতে  গিয়েও থেমে যান জয়েনউদ্দিন খাঁ। পাশ ফিরে কোনোমতে বলেন, কী বললি?

আলতাফ বেটা জানে।

তুই ক্যামনে বুজলি?

আমারে জিগাইছে।

হে ক্যামনে জানছে?

গত হপ্তা আপ্নে আমার লগে ওই আমগাছটার নিচে কথা কইছিলেন। আমি যে আপ্নের কাছে জমি চাইছি এগুলা সে সব হুনছে। আমারে লতিফা বু জিগাইছে।

মুহূর্তে জয়েনউদ্দিন খাঁর পায়ের তলার মাটি সরে যায়। যেকথা দিনের পর দিন গোপন রেখেছেন তা কীভাবে বের হলো ভেবে তাজ্জব হয়ে যান। ভাগ্যের নির্মম প্রতারণা কাকে বলে! তাঁকে বিস্ময়ে বিমূঢ় হতে দেখে রেজিয়া বেগম বলে, আরো আছে।

কী আছে আরো, ভয়ে জিজ্ঞেস করেন জয়েনউদ্দিন খাঁ।

নদী জিগায় আমার জামাই কেডা? জয়নালের বাপ কই? কতবার জিগাইছে আমারে।

তুই কী কইছোস?

আমি উত্তর না দিয়া কামে চইলা গেছি। কিছুই কই নাই।

হোন, বিবি মরিয়মের ঘরে ঈশা নবী পয়দা হইছে। বাপ ছাড়া। বাপ ছাড়া হইয়াও নবী। আল্লাহর কারিশমা বুজন দায়। ও পোলাপাইন মানুষ। কইয়া দিস, ঈশা নবীও বাপছাড়া হইছে। জয়নালেরও বাপ নাই।

আমি এইডা কইতাম? ঈশা নবী আর জনাল কী এক? এইডা কিতা কইলেন আপ্নে?

হ, এইডা কইবি। জয়েনউদ্দিন খাঁ আর দাঁড়ান না। গাঢ় কুয়াশা ঠেলে হনহন করে চলে যান।

নদীর দাঁতমুখ খিঁচে আসে। শীতে শরীর কাঁপতে থাকে। অগ্রহায়ণের সমস্ত হিম ওকে কামড়ে ধরে। খিঁচুনি চলে আসে। সে আগুনের দিকে দৌড়ায়। যেতে পারে না। পায়ে কে যেন বরফের শিকল পরিয়ে দিয়েছে। সমস্ত শরীর কে যেন বেঁধে রেখেছে। নড়তে পারে না। ওখানেই ধড়াম করে পড়ে যায়। এই ঘন কুয়াশার মাঝে কাজের বুয়া, কামলা খাটা লোকেরা শব্দ পেয়ে দৌড়ে আসে। রেজিয়া বেগম থেকে একটু দূরে শব্দ হওয়ায় সে আগে দৌড়ায়। দেখে হতভম্ব। নদী পড়ে আছে।

হায় আল্লাহ, কে কোথায় আছো? আমাগো নদী পইড়া গেছে। আসো তাড়াতাড়ি। ওর শরীল বরপ অই গেছে। রেজিয়া বেগমের চিৎকারে জয়েনউদ্দিন খাঁ ছুটে আসেন। তিনিও বেশিদূর যেতে পারেননি। নদীর বাবা সব দেখে নদীর মাকে আচ্ছামতো বকলেন। এই শীতে মেয়েকে ছেড়ে দিয়েছে।  কোনো খোঁজখবর রাখেনি। মেয়ে ঠান্ডায় অজ্ঞান হয়ে আছে। কীসের পিঠা কীসের পায়েস! পরদিনই তারা চলে গেলেন সিলেট। নদীর অবস্থা ভালো নয়। ডাক্তার দেখাতে হবে।

ছয় মাস পর। নদীরা আবার বাড়ি আসে। এসে দেখে রেজিয়া বেগম নেই। নদী দাদি দাদি করে ঘর মাথায় তোলে। লুৎফুন্নেসা ঈষৎ ভর্ৎসনা করেন, এত উতলা হইছো ক্যান? রেজিয়া বেগম দেশে চলে গেছে। ঘর মাথায় তোলনের কী কাম? ওর দেশে যাওন লাগে না?

দেশে গেছে শুনে নদী অবাক। দাদি লুৎফুন্নেসাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে যায়। কিছুই বলে না। যতদূর জানে, রেজিয়া বেগমের নিজের বাড়ি নেই। বানভাঙা মানুষ এই জায়গা সেই জায়গায় ঘুরে শেষে জমিদারবাড়িতে আশ্রয় পেয়েছে। সারাজীবন এখানে শেষ করে এখন মাঝবয়সে কোথায় যাবে সে? নদীর বুক ধক্ করে ওঠে। কোথাও কিছু ভুল হয়ে যায়নি তো? সে কী দাদারে জিজ্ঞেস করবে? মন সায় দেয় না। দাদা ভীষণ রাগী। লুৎফুন্নেসা তো ফোঁস করে উঠেছে। তাহলে আর রইলো সেজো কাকা আলতাফ খাঁ। কাকাকেই জিজ্ঞেস করা যায়। নদী ভাবে, রেজিয়া বেগমের ক্ষতি কে করেছে? দাদা, দাদি, নাকি কাকা আলতাফ খাঁ? জয়নাল আবেদীন কাকা কই? দাদির সঙ্গে তাকেও কী …! নদী আর ভাবতে পারে না। জয়নাল আবেদীন কাকা কলেজে লেখাপড়া করতো। খুব মেধাবী হিসেবে নামডাক আছে। বাড়িতে এসে তাকে খুঁজে পেল না। নদী ছোটে আলতাফ খাঁর কাছে। আলতাফ খাঁ নদীকে দেখে বলেন, কীরে কিছু কইবি?

হ কাকা?

ক, কী কইবি?

দাদি কই?

ঘরেই তো দেখলাম।

তুমি যারে দেখছো আমিও তারে দেখে আসছি। আমি রেজিয়া বেগমের কথা জিগাইতাছি।

আলতাফ খাঁ চমকে ওঠে। মা-নে, মা-নে, ই-য়ে, ই-য়ে – তোতলাতে থাকে আলতাফ খাঁ।

আমারে জিগাইতেছোস ক্যান? ওরা বাড়িত গেছেগা। বলে নাই মা?

কোন বাড়ির কথা কইতেছো কাকা? ওগো বাড়ি আছে? ওগোরে কই রাখছো কও, আমি সব জানি।

কী জানস তুই, গলা কাঁপে আলতাফের।

তুমি যা করছো।

আমি কী করছি?

ওগোরে লুকাইয়া কই রাখছো কও? তুমি, দাদি আর দাদা মিইল্যা কই রাখছো ওগোরে? নদী ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। কাকা কও, কই রাখছো ওগোরে?

আলতাফ খাঁ জোরে একটা ধমক দিয়ে নদীকে ঘর থেকে বের করে দেয়। বের করার সময় বলে, আমি সব বড়ভাইকে জানাচ্ছি। তুই এসব কী বলছিস?

নদী কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যায়।

আলতাফ খাঁ হতভম্ব। এই মেয়ে কী বলছে? কোথা থেকে জানলো সে এসব? ওর চোখে এখনো জয়নাল আবেদীনের ভয়ার্ত চোখমুখ ভেসে উঠছে। কিছুতেই ভুলতে পারছে না ওদের আহাজারি। কত অনুনয়-বিনয় করেছে জয়নাল।

ভাইজান, ও ভাইজান, ওদের মারতে নিষেদ করেন। আমার অপরাধ কী বলেন? আমি কী করছি?

আলতাফ খাঁ এলোপাতাড়ি লাথি মেরে মাটিতে শুইয়ে দেয় জয়নালকে। তারপর বলে, তুই কিছুই করোস নাই। তোর মায়ে করছে। তোর মা জেনা করছে, জেনা।

জেনা?

হ, তোর মা একটা নষ্ট মাইয়া মানুষ।

কী কইতেছেন ভাইজান? আমার মা কই?

হে আইতেছে। একটু পর দেখবি।

অগ্রহায়ণের শেষ রাতে রেজিয়া বেগমের সঙ্গে কথা বলে আসার পর জয়েনউদ্দিন খাঁ সারারাত একফোঁটা ঘুমাতে পারেনি। দ্বিধা, সংকোচ, সামাজিক ভয় এবং লজ্জা তাঁকে ঘিরে ধরে। জীবনের এত বছর পর রেজিয়া বেগম এবং তার ছেলে জয়নাল আবেদিন সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। 

হাঁসফাঁস করে দিনরাত কাটে জয়েনউদ্দিন খাঁর। না পারছেন সইতে, না পারছেন কইতে – এমনতরো অবস্থায় তিনি লুৎফুন্নেসার ঘনিষ্ঠ হলেন।  লুৎফুন্নেসার প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করেন। লুৎফুন্নেসাকে নিরুত্তাপ দেখে জয়েনউদ্দিন খাঁ হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। যাহোক জমিদারপত্নী বিষয়টাকে হালকাভাবে দেখেছেন। বা এমনও হতে পারে, রেজিয়া বেগম তাকে ভয় দেখিয়েছে লুৎফুন্নেসা আর আলতাফ খাঁর নাম করে। সামান্য একটা কাজের ঝিকে নিয়ে কেলেঙ্কারি হলে সমাজে তার মান থাকে? না থাকবে ইজ্জত? সব ঠিক ছিল। মাঝখানে জয়নাল আবেদিনকে কী পরিচয় দেবেন? জয়নাল ওর অবৈধ সন্তান – এটা তিনি জানেন ঠিক আছে, কিন্তু সমাজ? যে অন্যায় তিনি করেছেন তার প্রায়শ্চিত্ত করার সময় পার হয়ে গেছে বহু আগেই। এসব ভেবে ভেবে গত তিন মাস তিনি ঘুমাতে পারেননি। কাউকে বুঝতে দেননি ভেতরের অবস্থা। আলতাফ খাঁ আর লুৎফুন্নেসাকে চুপচাপ দেখে তিনি ভেবে নিয়েছেন রেজিয়া বেগম তাকে ভয় দেখিয়েছে। ভয় নিয়ে তো বেশিদিন থাকা যায় না। জীবনের এই সময়ে এসে সত্য যে ডালঘুঁটনির মতো কঠিন ঘুঁটুনি দিয়ে নাড়া দেবে কে ভেবেছে? রেজিয়া বেগমের রূপ, লাবণ্য, গানে ও সুরে মুগ্ধ জয়েনউদ্দিন খাঁ বিভোর ছিলেন এতবছর। এখনো আছেন। রেজিয়া বেগমের জন্য পুরো বুক খালি রেখেছেন আজীবন। অভাগী এই নারীকে বুকে স্থান দিলেও সমাজে স্থান দিতে পারেননি। এই আক্ষেপও তাঁকে অপরাধী করেছে। সেদিনের কথার পর ভেবেছেন রেজিয়া বেগম ঠিকই বলেছেম – ছেলেটা যাবে কই? তাঁর এত জমিজিরেত আট ছেলে পেলে জয়নাল কী অপরাধ করেছে? ওর তো কোনো দোষ নেই। মায়ের মতো ভুবন-ভোলানো রূপ নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে জয়নাল। কাজের বেটির ছেলে বলে না কেউ তাকে। সবাই বলে রাজপুত্র। রাজপুত্রই তো! জমিদারের রক্ত বইছে ওর শরীরে। জয়েনউদ্দিন খাঁর বুক খাঁ খাঁ করে। কোনোদিন তিনি ছেলেটাকে আদর করেননি। কাছেও ডাকেননি। নিজের ছেলে হয়েও দূরে ঠেলে দিয়েছেন। ছেলেটাও জমিদারের ত্রিসীমানায় ঘেঁষেনি কোনোদিন। সমীহ করে গেছে আজীবন। 

আজ রেজিয়ার কথাগুলি বুকে বাজছে। রেজিয়া ওর প্রেমিকা।  বড় ভালো প্রেমিকা।  কোনোদিন সে জয়েনউদ্দিন খাঁর কাছে কিছু চায়নি।  বরং জমিদারের এতকিছু থাকার পরও সে রেজিয়াকে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেছে। রেজিয়ার কিছু নেই।  তারপরও সে তার সব উজাড় করে দিয়েছে। রেজিয়ার মন কত ধনী! আর আমি? কত নিকৃষ্ট আর অপরাধী! জয়েনউদ্দিন খাঁ অনুশোচনায় পুড়তে থাকেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, জয়নালের নামে খলার ক্ষেতটা লিখে দেবেন। এটা রেজিয়ার চাওয়া। প্রেমিকার জন্য এই সামান্যটুকু করতে না পারলে কীসের প্রেমিক হয়েছেন? পরদিন সব গোছগাছ করে সদরে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে সাফকবলা দলিল করে দিলেন জয়নাল আবেদীনের নামে। খুশির খবর দিতে এসে শোনেন রেজিয়া বেগম নেই। লুৎফুন্নেসা জানান, সে আর এখানে থাকবে না। চোখ যেদিকে যায় সেদিকে চলে যাবে। অবাক জয়েনউদ্দিন খাঁ বিশ্বাস করতে পারেন না। সহায়-সম্বলহীন রেজিয়া বেগম কোথায় যাবে? এই বয়সে এসে? তাছাড়া ওকে মেরে ফেললেও সে জয়েনউদ্দিন খাঁকে ছেড়ে কোথাও যাবে না – এই বিশ্বাস রাখেন। কোথাও কোনো ভুল হয়েছে। জয়েনউদ্দিন খাঁ ভেতরে ভেতরে ছটফট করেন। মনের ভেতর সংশয়। কই যেতে পারে রেজিয়া বেগম? তিনি গোপনে খোঁজেন আর হয়রান হন। এভাবে কয়েকদিন চলে যায়। রেজিয়া বেগমকে চোখের সামনে না পেয়ে শোকে বিছানা নিলেন। রেজিয়া বেগমের অনুপস্থিতি কী রকম প্রভাব ফেলেছে জীবনে এই প্রথম তিনি টের পেলেন।

জয়নাল আবেদিন কাঁদছে। কত আহাজারি, ভাইজান আমার হাত-পা বানছেন ক্যান? আমি কী অন্যায় করছি? আমারে কলেজ থেকে তুইল্যা আনছেন ক্যান এই নিঝুম চরে?

তোরে ক্যান আনছি এহনো বুঝতে পারোস নাই? ক্রুশে বিদ্ধ করুম তোরে। তুই হবি যিশু। এই চরের যিশু। তোর জন্মপরিচয় নাই। তোর বাপ ক্যাগা জানিস? জানস না। শোন, যাদের বাপ নাই এরা হইলো গিয়া যিশু। এদের ক্রুশে বিদ্ধ কইরে মারতে হয়।  যা মরগে!

আমার অপরাধ কী?

তোর মা আমাগো সম্পদে নজর দিছে। তোর লাগি সম্পদ চায়। তাই তোরে কতল করণের আদেশ দিছি। তুই না থাকলে সম্পদে কী কাম? আলতাফ খাঁ ভাড়াটে খুনিদের আদেশ করেন, ওরে পুঁইতা ফেল এইহানে। পারলে জীবিত পুঁতবি।

বুড়িডাও আসতাছে। দুইডারে একসাথে পোঁতা হইলে খবর দিবি। আমি নায়ে আছি।

জয়নাল আবেদীন প্রভুকে ডাকে। ও খোদা তুমি কই আছো? এই বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করো। খোদাগো আমি  তো কিছু করি নাই, ওরা আমারে মেরে ফেলতেছে। জয়নাল আবেদীনের চিৎকার নিঝুম চরে ঘুরপাক খায়। ওর চিৎকার শুনবে কে? আশেপাশে জল আর এই একটুকরো দ্বীপ ছাড়া কিছু থাকলে তো! একজন খুনি বলে, ডাক, তোর খোদারে যত পারোস ডাক। সে কী আসমান থেইকা নাইম্যা আইবো? তোর কান্দন হে হুনবো? ডাকাত-খুনিরা ওরে চাবুক দিয়ে আঘাত করে আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

দীঘলার চর। বহুদূর সাগরের বুক ফেটে জেগে উঠেছে। এটার পত্তন এখনো কেউ নেয়নি। নতুন চর। চারদিকে সুনসান নীরবতা। যেদিকে নজর যায় পানি আর পানি। একদিন লুৎফুন্নেসা ডেকে নেন আলতাফ খাঁকে। বলেন, একটা চর পাইছি। কয়েকটা দিন লাগছে খোঁজ কইরা বাইর করতে। লোক ঠিক কর। দুইডারে নিয়া পুঁইতা দে। বাকিডা আমি সামলামু।

জোয়ার আসে। জলের উচ্ছ্বাসে চারদিক থইথই করে। উজানের তোড়ে জল কেওড়া গাছের ডালে আছড়ে পড়ে। যতদূর কান যায় সাগরের দুরন্ত গর্জন ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। এই গর্জন বহু বছর জমে থাকা কোনো দুঃখীর দীর্ঘশ্বাসের, কোনো অভিশাপের। এখানে হু-হু করে গান গায় জল। বড্ড বিরহ, বড্ড আকুলতা ছাড়া এই গানের আর কোনো সুর নেই।