দুর্বিনীত কথাসাহিত্যিক ভি এস নাইপল

লেখক: আন্দালিব রাশদী

৮৬তম জন্মদিনের এক সপ্তাহ আগে প্রয়াত হলেন ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে দাপুটে লেখক, নোবেল বিজয়ী ভি এস নাইপল।

স্বদেশবিদ্বেষী, পরদেশবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী, স্ত্রীবিদ্বেষী (অন্তত স্ত্রী প্যাট্রিসিয়ার মৃত্যু তাঁর নির্মমতার প্রমাণ দেয়), কালো মানুষবিদ্বেষী, সাদা মানুষবিদ্বেষী, নিজ আমলের এবং আগের আমলের লেখকবিদ্বেষী, ইসলামবিদ্বেষী, খ্রিষ্টানবিদ্বেষী, হিন্দুবিদ্বেষী, এমন কোনো অঙ্গন নেই, যেখানে নাইপলের বিদ্বেষের বাষ্প লাগেনি।

তারপরও তিনি প্রিয় লেখক। নাইপল ঢাকা এসেছিলেন সাহিত্য-উৎসবে, মাতিয়ে গেছেন। তিনি নিজের পরিচিতি-সংকটের কথা বলেছেন : ‘ইংল্যান্ডে আমি ইংরেজ নই, ভারতে ভারতীয় নই।’ তিনি অবিরাম বৈরিতা সৃষ্টি করে গেছেন, বন্ধুকে শত্রুতে পরিণত করেছেন।

আমি মুগ্ধ হয়ে একসময় ভি এস নাইপল পড়েছি। ১৯৭৬-এ আমার অনুবাদে নাইপলের মিগুয়েল স্ট্রিটের একটি অনুচ্ছেদ ‘ম্যানম্যান’ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে এবং বাংলা ভাষায় সম্ভবত এটিই প্রথম প্রকাশিত নাইপল।

নাইপলের অনেক সমালোচনা করা হলেও প্রয়াত এই লেখককে শ্রদ্ধা জানাতেই এই নিবন্ধ।

 

ভি এস নাইপল কে?

ভি এস নাইপল কে তা বোঝার জন্য তাঁর নিজের কিছু কথা উদ্ধৃত করছি :

‘আমি সবসময়ই জানতাম আমি কে। কোথা থেকে এসেছি। আমি নিজের জন্য কখনো অন্যের জমির খোঁজ করিনি।’

‘লেখক হতে হলে তোমাকে পৃথিবীর পথে বেরোতে হবে, পৃথিবীতে ঝুঁকি নিতে হবে, পৃথিবীতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে হবে, পৃথিবীর খোঁজে বেরোতে হবে। বয়স বেড়ে গেলে কাজটা কঠিন হয়ে পড়ে। বয়স্ক মানুষের বেলায় মানুষের দিনগুলো ছোট, তখন বাইরে যাওয়া ও বাইরের পৃথিবীতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।’

‘পৃথিবীর ব্যাপারে বিষাদময় বিষয়টি হচ্ছে এটি শুধু আহাম্মকে পরিপূর্ণ। আর আহাম্মকজন ও সাধারণজনের লাভের জন্য পৃথিবী পরিচালিত হয়ে থাকে।’

পাঠক-পছন্দ লেখক হলেও ঔদ্ধত্য, দুর্বিনীত আচরণ এবং কখনো কখনো একপেশে মন্তব্যের জন্য সমালোচকের অনুগ্রহ তিনি তেমন পাননি। মূলত ফিকশন লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এবং প্রতিষ্ঠিত। বুকার ও নোবেল পুরস্কার লাভ করলেও বেশি আলোচিত হয়েছে তাঁর নন-ফিকশন।

বিভিন্ন রূঢ় মন্তব্যের কারণে বরাবরই আলোচনায় ছিলেন। এমনকি মৃত্যুর পরও লেখা হয়েছে ‘নাইপল কাউকেই ছাড় দেননি – ঔপনিবেশিক শাসককেও না, উপনিবেশে শাসিত প্রজাদেরও না।’

নয়/এগারো-পরবর্তী রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা নোবেল কমিটিকে সম্ভবত খুব স্পর্শ করেনি। নতুবা ফিলিপ হেনশার যা বলেছেন তার মানে, ইসলাম-নিন্দার অ্যামাং দ্য বিলিভার্সের লেখকের ব্যাপারে তাঁদের সতর্ক হওয়ারই কথা ছিল। ২০০১ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী বিদিয়াধর সুরজপ্রসাদ নাইপল ১৭ আগস্ট, ১৯৩২ গ্রামীণ ত্রিনিদাদের চাগুয়ানাস গ্রামে একটি দরিদ্র হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা পেরসাদ নাইপল, মা দ্রোয়াপতি; পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। ১৮৮০-র দশকে তাঁর পিতামহ-পিতামহী ভারত থেকে ত্রিনিদাদের আখক্ষেতের ঠিকা শ্রমিক হিসেবে দেশান্তরি হন; তখন দাসপ্রথা অবলুপ্ত হতে চলেছে; আখচাষের জন্য

সস্তা শ্রমিক আনা সে-সময় অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। নাইপলের বাবা পেরসাদ সাংবাদিকতা করতেন, তাঁর খানিকটা সাহিত্যের উচ্চাশাও ছিল। ১৯২৯-এ তিনি ত্রিনিদাদ গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করতে শুরু করেন। তিনি চাগুয়ানাস প্রতিনিধির দায়িত্বও পান। নাইপলের পিতামহ, তাঁর দাবি অনুযায়ী, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবারে ধর্মানুরাগ অন্তর্হিত হয়, এমনকি তাঁরা ধীরে ধীরে ভারতীয় ভাষা থেকেও সরে যান। শেষদিকে নাইপলের মায়ের ব্যবহৃত একমাত্র ভারতীয় শব্দ ছিল ‘বেটা’। সবাই স্থানীয় ইংরেজিতে ধাতস্থ হয়ে ওঠেন। নাইপল যখন সাত, পরিবারটি চাগুয়ানাসের গ্রাম ছেড়ে ত্রিনিদাদের রাজধানী পোর্ট অব স্পেনে চলে আসে, নাইপল সেখানকার ব্রিটিশ মডেলে স্থাপিত কুইন্স রয়াল কলেজ থেকে পাশ করেন এবং তিনি ঔপনিবেশিক এই স্বপ্নহীন পরিবেশ থেকে মুক্তির জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন এবং সরকারি বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে চলে যান।

১৯৫৫ সালের গ্রীষ্মের এক অপরাহ্ণে নাইপল লিখে ফেললেন ‘বোগার্ট’ – মিগুয়েল স্ট্রিটের প্রথম এপিসোড। সতেরোটি এপিসোডের সমন্বয়ে মিগুয়েল স্ট্রিট। তখনই প্রকাশ করতে সম্মত হলেন না প্রকাশক। তাঁর আশংকা – অপরিচিত ক্যারিবিয়ান লেখকের বই যদি বিক্রি না হয়। প্রকাশক তাঁকে উপন্যাস লিখতে বললেন। ১৯৫৫-র শরতে তিনি লিখলেন দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর – এর মানে হতে পারে অতীন্দ্রিয় অঙ্গমর্দনকারী। ৮ ডিসেম্বর, ১৯৫৫ প্রকাশক উপন্যাস প্রকাশের জন্য গ্রহণ করলেন, নাইপল পেলেন একশ পঁচিশ পাউন্ড। নাইপল দশ-এগারো বছর বয়স থেকেই জানতেন তিনি লেখকই হবেন।

তিনি লেখকই হয়েছেন। উপনিবেশ থেকে শাসকের রাজ্যে উঠে এসে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করেছেন, নোবেল প্রাইজ জিতেছেন, নাইটহুড পেয়েছেন; বহু মানুষের অপছন্দের লেখক হওয়ার পরও ঈর্ষণীয় পাঠক-ভাগ্য তাঁর।

কিন্তু তিনি বলেছেন, ‘আমার বই কে পড়বে আর কে পড়বে না এই সমস্যা নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি। যদি ভাবতাম তাহলে সম্ভবত  লেখালেখি ছেড়ে দিতাম। আমি ব্যাপারটাকে এভাবে কখনো দেখিনি, আমি সাহিত্যের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করেছি। আমি বিশ্বাস করেছি কেউ যদি লেখেন এবং তা যদি ভালো লেখা হয় তাহলে তার পাঠক থাকবেই।’

 

লেখকদের চোখে নাইপল

ভি এস নাইপল কেমন লেখক?

একদা প্রিয় বন্ধু পল থুরো নাইপলের সঙ্গে বন্ধুত্বে চিড় ধরার আগে লিখেছেন : তিনিই সম্ভবত একমাত্র লেখক যার ওপর প্রভাবের কোনো প্রতিধ্বনি নেই।

এ-সম্পর্কে নাইপলের নিজের কথা, ‘আমি একটি ছোট সমাজ থেকে এসেছি; আমি সচেতন ছিলাম যে, আমার ওপর এই পৃথিবীতে কোনো প্রভাব নেই। আমি প্রভাব থেকে দূরে। আর আমার অবস্থান একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে, আমি সেখান থেকে সরে যাই, হয়ে যাই বিদেশি, লেখক হয়ে যাই – সরাসরি সম্পর্কিত থাকা থেকে আমি কতটা প্রত্যাহৃত দেখতেই পাচ্ছেন।’

এডওয়ার্ড সায়ীদ নাইপলকে অভিযুক্ত করেছেন কারণ তিনি অযৌক্তিক ব্যাখ্যায় প্রাচ্যের সংস্কৃতিকে আদিম, বর্বর এবং অশিক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; আফ্রিকা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জেনে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করার ভান করেছেন, প্রাচ্যের মূল্যায়ন করেছেন।

এভলিন ওয়াফ একবার বলেছিলেন, ‘নাইপলের গদ্য তাঁর সমকালীন ব্রিটিশদের লজ্জা দেয়।’ এভলিনের মতো কাঠখোট্টা লেখক-সমালোচকের মুখে এটি একটি অসাধারণ প্রশংসা।

ভারতীয় খুশবন্ত সিং লিখেছেন, ‘নাইপল তাঁর অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস গ্রন্থে সুরুজকু-ের মনোহরণ দৃশ্য মাত্র চারটি শব্দে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ময়লার আস্তরণে ঢাকা শিশুদের নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি কাশ্মিরের জাফরান জমিন নিয়ে একই কাজ করেছেন। শরতে প্রস্ফুটিত ফুলের একটু কেবল উল্লেখ করে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন কাশ্মির-নারীরা কেমন করে তাদের পিরহান উঠিয়ে মলত্যাগ করতে বসে। মনে হয় নাইপল নোংরা-আবর্জনা ঘাঁটাঘাঁটির বাতিকগ্রস্ত।’ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি ডেরেক ওয়ালকট যতটা না ক্রোধে তার চেয়ে বেশি দুঃখে নাইপলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।

সালমান রুশদি মনে করেন, সাহিত্য বা রাজনীতি কোনো বিষয়ে তিনি ভি এস নাইপলের সঙ্গে একমত হতে পারেননি।

এদিকে এডওয়ার্ড সায়ীদ যতটা না দুঃখে তার চেয়ে বেশি ক্রোধে তাঁকে নব্য বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশবাদ প্রচারের দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।

ডেরেক ওয়ালকট বলেছেন, ‘নাইপল নিগ্রোদের পছন্দ করেন না।’ এই রেশ ধরে এডওয়ার্ড সায়ীদ নাইপলের উৎস ও

পিতৃপুরুষের সীমাবদ্ধতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে শ্রমিক হিসেবেই নব্য দাস্যবৃত্তিতে সেখানকার অনেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নাটাল থেকে ফিজি, কেনিয়া, গায়ানা, মালয় এবং ত্রিনিদাদে চলে এসেছে। ত্রিনিদাদে ভারতীয় এবং আফ্রিকানদের মধ্যে সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব ও ঘৃণা বর্ষণের প্রতিযোগিতা লেগেই ছিল। একপক্ষ গালি দিত ‘নিগার’ অন্যপক্ষ বলত ‘কুলি’ – পিতৃপুরুষের এই ঔপনিবেশিক ব্যাধিতে সংক্রমিত হয়েছেন এবং বেড়ে উঠেছেন নাইপল, লেখকজীবনেও তা ছাড়তে পারেননি।

 

নাইপলের ত্রিনিদাদ

ব্রিটিশরা ওয়েস্ট ইন্ডিজের গায়ানা ও ত্রিনিদাদ দেড়শো বছরের অধিককাল উপনিবেশ হিসেবে শাসন করেছে। বর্ণবাদের বিভিন্ন ধরনের প্রকাশ ঘটেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। যারা ‘নন-হোয়াইট’ তারা যে সাদাদের চেয়ে নিম্নমানের তা স্পষ্ট করে তুলতে তারা কোন স্কুলে পড়বে, কোন ধরনের চাকরি পাবে, তাদের ওপর কোন ধরনের শাস্তি বলবৎ হবে ‘হোয়াইট মাস্টারগণ’ তা নির্ধারণ করে দিত। এই দাস্যবৃত্তি তাদের অনুকরণপ্রিয়ও করে তোলে। সাদা প্রভুরা যা করে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল, অ-সাদারা স্বজাতির অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের ওপর তা-ই প্রয়োগ করতে থাকে। তাদের নির্যাতনের শিকার হয় নারী ও শিশু। শিশুর অপরাধের জন্য শিশুর বাবা-মাও নির্যাতনের শিকার হয়।

অ-সাদাদের দুটি ভাগ : ইন্ডিয়ান এবং আফ্রিকান। ইন্ডিয়ান পরিবারগুলো দেশ ছেড়ে ব্রিটিশ গায়ানা ও ত্রিনিদাদে আসার সময় তাদের প্রথা, সংস্কার, সংস্কৃতি ও ধর্মাচার সঙ্গে নিয়ে আসে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রাধান্য পরম্পরাও অটুট রাখে। এখানে সবাই আসে কৃষিশ্রমিক হিসেবে আখক্ষেতের মজুর হয়ে। এরকম একটি পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষিত উত্তরসূরি আর্নল্ড গিরিধারী ভিএস নাইপলের হাতে চিত্রিত মূলোৎপাটিত ভারতীয় ত্রিনিদাদবাসীর জীবনাচরণের একটি বর্ণনা দেন : ‘শুক্রবার সন্ধ্যায় মজুরি পাওয়ার পর শ্রমিকদের কেউ কেউ নিকটস্থ শুঁড়িখানা ‘রামশপে’ গিয়ে অত্যধিক পান করে চুর হয়ে কাটিয়ে দেয় সপ্তাহান্ত। কঠোর পরিশ্রমের কামাই এভাবেই ফতুর করে দেয়। স্বামীরা স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের গালাগাল দেয়। আশ মিটিয়ে পেটায়। জিন্দেগির এই ফাঁদে পড়ে এভাবেই জীবন কাটিয়ে দেয়। গায়ানা ও ত্রিনিদাদের বিনোদন বাজারে ঢোকে ব্রিটেন ও আমেরিকার সিনেমা। চল্লিশ ও পঞ্চাশের  দশকের সিনেমার পুরুষ আধিপত্য শ্রমজীবী এই মানুষগুলোকেও প্রভাবিত করে। প্রায় একই ধারার ভারতীয় সিনেমাও মুক্তি পায় এখানকার সিনেমা হলে। নিজের পিতৃপুরুষের সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন বাস্তবতাবর্জিত এক সাংস্কৃতিক রুচি তাদের গড়ে উঠতে থাকে।’

ত্রিনিদাদের ভারতীয় সমাজের ফাঁপা অবয়বটি নাইপলকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট ও বিচলিত করে।

ত্রিনিদাদ, নিজের মাতৃভূমি সম্পর্কে বলেছেন : ‘আনইম্পর্ট্যান্ট, আনক্রিয়েটিভ, সিনিক্যাল, এ ডট অন দ্য ম্যাপ।’ দেশবাসী সম্পর্কে আপত্তিকর ভাষায় বলেছেন : ‘একটি বানরও দেখতে পাইনি যে আমার বই পড়ে। কেবল শারীরিক যে জীবন সেই জীবনই তারা যাপন করে; আমার কাছে তা ঘৃণ্যজীবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী বর্বরদের সম্পর্কে পড়াশোনা করছে ত্রিনিদাদের লোক তাদের জন্য কৌতূহলের বিষয় হতে পারে।’

রিচার্ড সুডান লিখছেন : ‘ক্যারিবিয়ান দ্বীপ ত্রিনিদাদে জন্ম বিশিষ্ট ব্যক্তির ঘাটতি নেই – বিশিষ্ট চিন্তাবিদ এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী এরিক উইলিয়ামস, সমাজতাত্ত্বিক সিএলআর জেমস, পৌরাণিক খ্যাতির ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব অলিম্পিক স্বর্ণপদক বিজয়ী হ্যাজলি ক্রফোর্ড, ক্রিকেটার ব্রায়ান লারা, স্প্রিন্টার অটো বোলডোন। এখানকার বিচিত্র সাংস্কৃতিক অবয়ব উঠে এসেছে ঔপনিবেশিক অতীত থেকে, সেখানকার অধিকাংশ মানুষ ইন্ডিয়ান ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ত্রিনিদাদের সন্তান নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী লেখক ভি এস নাইপল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর শ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ লেখকদের অন্যতম প্রধান তিনি। ১৯৮৯ সালে তিনি নাইটহুড লাভ করেন, ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কার। ত্রিনিদাদে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে তাঁর উপন্যাস। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর আধিপত্য, পড়তে বাধ্য করা গদ্য ও বিবরণের জোর সাফাই গেয়েছেন শ্বেতত্বক ইংলিশ লেখকরাই – কিন্তু তাঁর গদ্যের গভীরে অন্ধকার গুপ্তস্রোতে লুকিয়ে আছে বর্ণবাদ – তাঁর নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে এবং তা খোলামেলাভাবেই।’

নাইপল যেভাবে বর্ণনা করেছেন বাস্তবের ত্রিনিদাদ তার চেয়ে বেশ খানিকটা ভিন্ন, তাঁর বিবরণীর চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ। নাইপল যেসব মানুষের স্থবিরতা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন তারাই পুরনো রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভেঙে পিপলস ন্যাশনাল মুভমেন্টকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক মডেলে ভোট দিয়ে পিপলস পার্টিসিপেশনকে জয়ী করেছেন এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী কমলা পেরসাদ বিশ্বেশ্বরকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। নাইপলের কথা সত্য হলে এত বড় পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হতো না। তারপরও বর্ণবাদী যে-রেশ রয়ে গেছে তা দাসত্বের কাল এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালের। হীনমন্যতার বীজ তো জন্মের পরপরই ড্রাম পিটিয়ে শিশুর কানে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় – নাইপলের উপন্যাস মিগুয়েল স্ট্রিট এবং অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস এ কাজটি করেছে। নাইপল উপনিবেশবাদী সংস্কৃতি নিয়ে জীবনযাপনের তিক্ত চিত্র তুলে ধরেছেন, উপনিবেশ স্থাপনকারীদের সম্মান নাইটহুড সানন্দে গ্রহণ করেছেন। নব্য উপনিবেশবাদের পক্ষেই প্রকারান্তরে লিখে গেছেন।

রিচার্ড সুডান মনে করেন, ‘ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার যে উৎসব, যে কার্নিভাল ভিএস নাইপল উদযাপনকারী ত্রিনিদাদবাসীর নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারেননি। তিনি ত্রিনিদাদিয়ান যে-অহংকার তা অনুধাবন করেননি।’

ত্রিনিদাদ সম্পর্কে ভিএস নাইপলের নিজের কী মূল্যায়ন? তিনি লিখেছেন : ‘ত্রিনিদাদকে জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু যাঁরা ত্রিনিদাদকে জানেন তাঁরা বেশ ভালোই জানেন এই সরল, ঔপনিবেশিক একটি অসভ্য সমাজ।’

ত্রিনিদাদ নিয়ে তাঁর আরো কথা : ‘আমি এক ক্ষুদ্র জায়গায় বেড়ে উঠি এবং যখন তরুণ তখনই সেই জায়গাটা ছেড়ে যাই এবং বৃহত্তর পৃথিবীতে প্রবেশ করি।’

তিনি আরো লিখেছেন, ‘ত্রিনিদাদে কিছুই তৈরি হয়নি।’ এখানে এটাও বলা আবশ্যক, নাইপলের ইংল্যান্ড স্তুতিও নিষ্কলুষ নয়। তিনি বলেছেন, ‘ইংল্যান্ডের মানুষ নিজেদের আহাম্মক হওয়া নিয়ে বেশ গর্ব করে থাকে।’

 

নাইপলের ভারত

২০০১ সালে চেলটেনহাম সাহিত্য-উৎসবে তাঁর সূচনা-বক্তব্যে নাইপল বলেন, ‘আমার মতো মানুষ যদি সমাজ নিয়ে লিখে যে-সমাজের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন নেই, মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। তারা যদি বইটা পড়ে – অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা বই পড়ে না – কিন্তু তারা অনুমোদন চায়। … এখন ভারতের উন্নতি হয়েছে, বইগুলো গৃহীত হয়েছে (বইগুলো মানে তিনটি ভারতবিষয়ক বই : অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস, এ ওন্ডেড সিভিলাইজেশন এবং ইন্ডিয়া : এ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ)।

‘চল্লিশ বছর আগে ভারতের মানুষ ধর্মীয় প্রথাবৃত্তে বন্দি ছিল, অন্যান্য দিকের মধ্যে এদিক দিয়েও আমি ভারতকে সাহায্য করেছি।’

ভারত নিয়ে লেখা অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস-এ তাঁর হতাশা প্রতিফলিত কি না এক কথোপকথনে খুশবন্ত সিং তাঁকে জিজ্ঞেস করলে নাইপল জবাব দেন : ‘এটা হতাশা নয়, আমি আহত হয়েছিলাম। এটা আমার জন্য বড় ধরনের ক্ষত। আপনাকে মনে রাখতে হবে আমরা ত্রিনিদাদের খুব হতাশ একটি সম্প্রদায়। ভারত নিয়ে আমাদের কাছে কোনো গল্প ছিল না। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ত্রিনিদাদে আসার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা ভয়ানক কোনো জায়গা ছেড়ে এসেছেন। আমাদের ভারত-ধারণা বড় নির্মম। এদেশটা আসলে কেমন, আমাদের কাছে কখনো বর্ণনা করা হয়নি। কাজেই ভারত কখনো আমাদের কাছে সত্য হয়ে ওঠেনি, আমি যখন প্রথম এখানে আসি ভারত নিয়ে লেখার পূর্ণ প্রস্তুতি আমার ছিল না।’

তিনি মনে করেন, ‘বাবর যে ভারতে বাবরি মসজিদ তৈরি করেছিলেন তা ছিল ঘৃণার ফসল। তিনি মোটেও ভারতপ্রেমিক ছিলেন না। … খ্রিষ্টবাদী ও ইসলামপন্থি উভয়ই পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণু। তাদের ইতিহাস অসহিষ্ণুতার ইতিহাস। অন্ধকার ইতিহাস খ্রিষ্টানদেরও। ‘কালো বুদ্ধিবৃত্তি’ দিয়ে ভারতে নির্মমভাবে খ্রিষ্টধর্মের প্রবেশ ঘটেছে।’

নাইপল আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে এলেন। রাজীব গান্ধী তখন প্রধানমন্ত্রী। ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জ্যেষ্ঠ কোনো রাজনীতিবিদের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেন। খুশবন্ত সিং মনে করলেন, মন্ত্রিসভার দু-একজন ছাড়া অন্যরা হয়তো নাইপলের নামই শোনেননি। এমন কারোর সঙ্গে সাক্ষাৎ দুপক্ষের জন্য বিব্রতকর হবে। তিনি রামনিবাস মির্ধার সঙ্গে সাক্ষাৎ করালেন। নাইপল বিস্মিত হলেন যে, এই মন্ত্রী তাঁর সব লেখাই পড়েছেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘অতুলনীয়’, ‘সভ্য’ – এ-মানুষটি এখানে (রাজনীতিতে) কী করেন?

নাইপল লেখেন : ‘আমার পিতৃপুরুষের দেশের প্রতি আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা থেকে প্রথম ভারতে আসি। ভারত সম্পর্কে আমি যাই লিখি তার জন্য আমার প্রকাশক কিছু আগাম টাকাও দিলেন। টাকার অংক ছোট কিন্তু পেয়ে আমি স্বস্তিবোধ করি। কেমন করে ভারতে এগোব আমার জানা ছিল না। শেষ পর্যন্ত আমাকে পথ খুঁজে নিতে হয়েছে। আমি ভারতে গিয়েছিলাম। গেরিলা কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা – ফাঁপা এবং বোকা। তাদের মধ্যে কোনো বিপ্লবী মহিমা ছিল না, একেবারেই না।’ এটি তাঁর পরবর্তী অনুধাবন। তিনি দেখেছেন, বিপ্লবও সাময়িক স্বার্থের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

 

নাইপলের আফ্রিকা

‘আফ্রিকা কোনো মজার জায়গা নয়। মজার জায়গা হয় সেটি, যা আত্মাকে উদ্বুদ্ধ করে, অনুভূতিকে সস্নেহে লালন করে। আমি

যে-আফ্রিকা সফর করেছি তার সম্পর্কে এ-কথা বলা যায় না।’ ভয়ংকর বর্ণবাদী তাঁর উচ্চারণ : ‘আফ্রিকানরা লাথি চায়, এটাই একমাত্র জিনিস, যা তারা বোঝে।’

কালো মানুষ নিজের কথা লিখতে পারার শিক্ষা ও সাহস পেয়েছে অনেক পরে। সাদা মানুষ তাদের দেখেছে নিজেদের বোঝা হিসেবে – ‘হোয়াইট ম্যান’স বার্ডেন’। নাইপল আফ্রিকার যে-দিকটাতে আলোকসম্পাত করেছেন, সাদা মানুষ সে-পথে কখনো এগোয়নি। অরবিন্দ আদিগা বলেছেন, ‘নাইপলের আফ্রিকানরা ‘মিমিক ম্যান’ (১৯৬৭-তে প্রকাশিত নাইপলের উপন্যাস মিমিক ম্যান থেকে নামটি নেওয়া) তারা পশ্চিমের প্রতিষ্ঠানসমূহ – সরকার, আইন, পুলিশ ইত্যাদি তাদের জন্য কতটা লাগসই তা না ভেবেই অনুকরণ করে বলেছে, অসংগতিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তাদের সমাজ ভেঙে খানখান করে দিচ্ছে এবং কৃষ্ণ মহাদেশ – ডার্ক কন্টিনেন্টের যে বহুল চর্চিত ধারণা তাকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে।

নাইপলের ব্যক্তিত্ব ও রুচি তাঁর দ্য মাস্ক অব আফ্রিকার সারাৎসার অপহরণ করে নিয়েছে। তিনি যখন জানলেন আইভরি কোস্টের মানুষ জীবন্ত বিড়াল সেদ্ধ করে খায় (নাইপল নিজে ক্যাট পারসন – বিড়ালপ্রিয় মানুষ), তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন যে, গোটা দেশটাই বাজে, অপদার্থ। রান্নাঘরে বিড়াল নিয়ে এই নির্মমতার কারণে আইভরি কোস্টের সবই তাঁর কাছে গুরুত্বহীন হয়ে উঠল। অরবিন্দ আদিগা আরো লিখেছেন : ‘পরবর্তী সময়ে তিনি জেনেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় ধর্মাচার ও জাদুটোনার জন্য বিভিন্ন জন্তুর নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলা হয়; এতে তাঁর কাছে পুরো অঞ্চলটিই অমানুষের অঞ্চল হয়ে উঠল।’ নাইপল লিখলেন, ‘আমি মনে করেছি এটা ভয়ংকর ব্যাপার, এটা ভীষণ হতাশার ব্যাপার। দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষকে অনেক বড় সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমি আশা করেছিলাম বড় সংগ্রাম তাদের বড় মানুষে পরিণত করবে।’

আফ্রিকা তাঁর কাছে বিড়াল সেদ্ধ করার আর গরুর নাড়িভুঁড়ি বের করার মহাদেশ হয়ে রইল।  ‘আমার শৈশবে আমার মনে আছে ‘কালো’ – ব্ল্যাক ছিল একটি অপমানজনক শব্দ। বরং লোকজন কালোর বদলে ‘কালার্ড’ শুনতে পছন্দ করত; ‘আফ্রিকান’ বলাটা ছিল অপমানজনক : পরিস্থিতি গায়ানাতে একটু ভিন্ন ছিল, সেখানে ‘আফ্রিকান’ ব্যবহৃত হতো, কিন্তু নিগ্রো ছিল অপমানজনক শব্দ। আর এখন কালো খুব জনপ্রিয় এবং কবুল করে নেওয়া শব্দ।’

কিন্তু সেই কালো আফ্রিকার ভবিষ্যৎ কি?

নাইপল চাঁছা জবাব দিলেন, ‘আফ্রিকার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’

 

আর্জেন্টাইন টেরর : নির্জনতার আতংক

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নাইপলের দৃষ্টি এড়ায়নি। ১৯৭৭-এ বুয়েনেস আইরেস ঘুরে এসে লিখলেন :

আর্জেন্টিনায় ঘাতক গাড়ি – যে-গাড়িতে দাফতরিক বন্দুকধারীরা তাদের কাজে বেরোয় তার নাম ফোর্ড ফ্যালকনস। আর্জেন্টিনাতেই তৈরি হয় ফ্যালকন, শক্ত ছোট গাড়ি, গাড়ির চেহারার তেমন কোনো বৈশিষ্ট্য নেই – হাজার হাজার গাড়ি রাস্তায়। কিন্তু ঘাতক ফ্যালকন দেখলেই চেনা যায়। এসব গাড়িতে কোনো লাইসেন্স প্লেট থাকে না। এসব গাড়ি সাদাসিধে কাপড়ে পরা মানুষ পরিবহন করে – এ গাড়ির উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে হয়, মানুষ কখনো কখনো দাঁড়ায় দেখে। কয়েক সপ্তাহ আগে তারা টুকুম্যান উত্তরাঞ্চল শহরের প্রধান চত্বরে দাঁড়িয়েছিল এবং দেখছিল সরকারি সদর দফতরের সামনে অর্ধবৃত্তাকার ড্রাইভওয়েতে ফ্যালকনগুলো পার্ক করা; ভবনটি উনিশ শতকের ইউরোপিয়ান কান্ট্রি হাউজের মতো সাজানো পাথরে গড়, বারান্দায় এবং সযতেœ লালিত অনেকটা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বাগানে মেশিনগান হাতে ইন্ডিয়ান সৈন্য – সেখান থেকে একঝলক ইউনিফর্ম, হ্যান্ডশেক, স্যালুট দেখা যায় – যতক্ষণ না সাদা পোশাকের মানুষগুলো অভিজাত শিকারদলের সদস্যের মতো নেমে এসে লুকোনো মেশিন নিয়ে প্রশস্ত পদক্ষেপে ছোট ফ্যালকনে আরোহণ করে, গতি না বাড়িয়ে, সাইরেন না বাজিয়ে গাড়ি চলতে থাকে। এই নীরবতার কী নাটকীয় পরিণতি কর্তৃপক্ষ তা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে – এটা সন্ত্রাসের একটি অংশ, যে-সন্ত্রাসের অনুভব সর্বত্র।

… আগের দিনগুলোতে যুদ্ধটা ছিল গেরিলা বনাম একদিকে সেনাবাহিনীর একাংশ, অন্যদিকে পুলিশ। এখন যুদ্ধ সবাইকে স্পর্শ করেছে। গণমঞ্চে এখন গণসন্ত্রাস।

নাইপল যে-চিত্র এঁকেছেন তা কেবল আর্জেন্টিনার নয়, আমাদেরও।

 

হেনরি জেমস : পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে লেখক!

লেখক যদি বৈরিতা সৃষ্টি করতে না পারেন তিনি মৃত – এটি নাইপলের কথা। এ-কারণেই তিনি ক্রমাগত বৈরিতা সৃষ্টি করে চলেছেন। তিনি হেনরি জেমসকে বলেছেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে লেখক।’

হেনরি জেমসের দ্য পোর্ট্রটে অব অ্যা লেডি, দ্য উইংস অব দ্য ডাভ, দ্য অ্যাম্বাসাডর্স বিখ্যাত উপন্যাস।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো বিশ্ববরেণ্য কথাশিল্পী সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি জানতেন না কোথায় আছেন, তিনি আমেরিকান হওয়া নিয়েই বড় ব্যস্ত ছিলেন।’ তাঁর এই মন্তব্য বিপুলসংখ্যক সাহিত্যামোদীকে ক্ষুব্ধ করেছে।

১৯৮৬-র নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী ওলে সোয়েঙ্কা সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি কিছু লিখেছেন নাকি?’ তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়াটা নোবেল কমিটির ‘অনেক উঁচু স্থান থেকে সাহিত্যের ওপর মূত্রপাত করার মতো ব্যাপার।’

ই এম ফস্টারকে যৌন-দানব বানিয়েছেন। বলেছেন, ‘ভারতে অবশ্যই ফস্টারের নিজের ধান্ধা ছিল। তিনি ছিলেন সমকামী আর ভারতে তাঁর হাতে সময়ও ছিল। তিনি চিনতেন রাজভবন, কিছু মধ্যবিত্ত, আর মোহিত করবেন এমন কিছু বাগানবালক।’

নাইপল টমাস হার্ডি সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি একজন অসহ্য লেখক, তিনি লিখতে জানেন না, একটা প্যারাগ্রাফ কীভাবে তৈরি করতে হয়, তাও জানেন না। তাঁর লেখা রোমান্টিক মেয়েলি কাহিনির মতো।’

 

এমনকি জেইন অস্টিনও নয়

বিতর্ক সৃষ্টিতে ভি এস নাইপলের সমকক্ষ কোনো লেখকের দেখা গত তিন দশকে মেলেনি।

রয়াল জিওগ্রাফিক সোসাইটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, নারী লেখকদের মধ্যে কেউই তাঁর সমকক্ষ নন। জেইন অস্টিন তো ননই। তিনি জেইন অস্টিনের ‘আবেগময় উচ্চাকাক্সক্ষা’ এবং ‘পৃথিবী সম্পর্কে আবেগময় অনুভূতি’র অংশীদার হতে রাজি নন। তিনি মনে করেন, নারী লেখকরা ভিন্ন ধরনের – ‘আমি যখন কোনো লেখা পড়ি – এক দুই অনুচ্ছেদ পড়ার পরই আমি বুঝতে পারি তা নারীর লেখা না পুরুষের।’

তিনি মনে করেন, নারীর আবেগময় সংকীর্ণ দৃষ্টি তাঁকে গৃহের প্রভুতে পরিণত করতে পারে না – সেটা তাঁর লেখাতেও প্রতিভাত হয়। ‘আমার প্রকাশক ভদ্রমহিলা চমৎকার রুচিশীল সম্পাদক ছিলেন কিন্তু তিনি যখন লেখক হলেন দেখুন মেয়েলি কী সব যাচ্ছেতাই লিখছেন।’ ভারতীয় মহিলা লেখকদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তাঁরা মামুলি বিষয় নিয়ে লিখে থাকেন।’

ব্রিটেনের লেখক সাংবাদিক অ্যালেক্স ক্লার্ক বললেন, ‘তিনি কি এটাই বলতে চান যে, হিলারি ম্যানটেল, এ এস বাইয়াত, আইরিস মারডক আবেগপ্রবণ মেয়েলি লেখা লিখছেন?’

সাহিত্য-সমালোচক হেলেন ব্রাউন তাঁকে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, এসব তাঁর ‘উদ্ধত দৃষ্টি আকর্ষণী’ আচরণ।

 

নাইপলের ইসলামফোবিয়া

নাইপল বলছেন, ‘উৎস বিবেচনায় ইসলাম একটি আরব ধর্ম। যারা আরব নন, এমন মুসলমানরা সবাই ধর্মান্তরিত মুসলমান। ইসলাম ধর্মের চাহিদাটা বেশি। ধর্মান্তরিত একজন মুসলমানকে পৃথিবী সম্পর্কে তার ধারণা পালটে ফেলতে হয়। তার পবিত্র স্থানগুলো অন্য দেশে, তার পবিত্র ভাষা আরবি। তাকে তার নিজের ইতিহাস প্রত্যাখ্যান করতে হয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিতে হয়। গভীরভাবে দেখতে গেলে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের ঔপনিবেশিক মানুষ মনে হবে।’

খুশবন্ত সিং তাঁর কাছে ইসলাম নিয়ে মোহভঙ্গের ব্যাখ্যা শুনতে চাইলে নাইপল বললেন : ‘আমাকে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটা মোহভঙ্গের বিষয় নয়। আমি বস্তুনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করেছি। আমি ভেতরে ঢুকে ইসলামকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। অমুসলমান পূর্বকালের (মুসলমান হওয়ার আগের সময়কার) স্মৃতি থেকে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মৌলবাদীরা মুক্তি চায়। ইরানের বেলাতেও এ-কথা সত্য। পারস্য বিশাল দেশ ছিল। রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। ইরান ধ্রুপদ গ্রিসকেও চ্যালেঞ্জ করেছে। এখন তারা বলছে ইসলাম কবুল করার আগের সময়টা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আয়াতুল্লাহ খোমেনির সময়ের বিচারক আয়াতুল্লাহ খালখালি পার্সেপোলিসের ধ্বংসাবশেষ এবং আড়াই হাজার বছর আগেকার সাইরাস প্রাসাদের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করে ফেলতে চেয়েছেন। এটা পাগলামি। কিন্তু ধর্মান্ধতার এ নির্দেশনা জনসাধারণ গ্রহণ করবে।’

হিন্দু মৌলবাদ নিয়ে নাইপল বলছেন – ‘শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের কথা বলা যায়। তিনি হিন্দু দেবদেবীর নগ্ন ছবি এঁকেছিলেন। তারা তাঁর ছবি নষ্ট করেছে, ঘরবাড়ি তছনছ করেছে। আমি খুব নিশ্চিত, তিনি যদি হিন্দু হতেন তাহলে এ নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হতো না।’ নাইপল মনে করেন, কাজের মধ্য দিয়ে হিন্দু ও মুসলমান মৌলবাদীরা পরস্পরকে শক্তি জোগায়। ‘আমি ইসলামিক প্রশ্নাবলি নিয়ে খুব কৌতূহলী হয়েছিলাম এবং ভেবেছিলাম মূল থেকে তা বুঝতে চেষ্টা করব। সহজ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব এবং সে আবিষ্কারের একটি বর্ণনামূলক লেখা লিখব।’ কিন্তু জার্নি অ্যামাং দ্য বিলিভার্স গ্রন্থে ধর্মভিত্তিক সমাজের অসারতার কথাই বলেছেন।

সাধারণভাবে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতদের কথা বলেছেন, ‘ধর্মান্তরিত মানুষের ওপর ধর্মান্তকরণের ভয়ংকর প্রভাব পড়ে। এই ধর্মে ধর্মান্তরিত হলে তোমাকে তোমার অতীত ধ্বংস করতে হবে, ইতিহাস ধ্বংস করতে হবে। এই খত সই করে তোমাকে বলতে হবে, আমার পিতৃপুরুষের সংস্কৃতি বিরাজ করে না, আর তাতে কিছুই আসে-যায় না।’ নাইপল মনে করেন, অখণ্ড ভারত রাষ্ট্রের ভেতর একটি মুসলিম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটাতে গিয়ে লাখ লাখ মানুষকে নিহত হতে হয়েছে, লাখ লাখ মানুষকে মূলোৎপাটিত হতে হয়েছে। রাষ্ট্র নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও ধর্মের অবস্থান সুরক্ষিত ও শক্তিশালীই রয়েছে। রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে তার মানে এই নয়, রাষ্ট্রের জন্য যে-স্বপ্ন তাতে ভেজাল ছিল কিংবা ধর্মের যে-বিশ্বাস তা দূষিত ছিল। এটা ঘটার কারণ মানুষই ধর্মের বিশ্বাসকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। নাইপল মনে করেন, পাকিস্তান লাভ ধর্মীয় অর্জন না হয়ে রাজনৈতিক অর্জন হওয়াটাই গৌরবের বিষয় হতো।

ডোয়াইট গার্নার ইসলাম সম্পর্কে নাইপলের জ্ঞানকে দেখছেন পর্বত-প্রমাণ অজ্ঞতা হিসেবে, আর এই অজ্ঞতাকে যৌক্তিকীকরণ করেছেন এই বলে : ‘আমি  সারাজীবন ধরে মুসলমানদের চিনে আসছি কিন্তু তাদের ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান সামান্যই। ইসলামের ডকট্রিন (আমি একে ডকট্রিন হিসেবেই দেখি) আমাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। এটা গবেষণার উপযুক্ত কোনো বিষয় বলে আমার মনে হয়নি। বছরের পর বছর ধরে সফরের পরও ত্রিনিদাদে বালক বয়সে ইসলাম সম্পর্কে যে জ্ঞান ছিল তার সঙ্গে তেমন কিছু যোগ করতে পারিনি। ধর্মের গৌরব অতীতের ব্যাপার। এটা রেনেসাঁসের মতো কিছু সৃষ্টি করতে পারেনি। মুসলিম দেশগুলো তো উপনিবেশ ছিল না। সেখানে ছিল স্বৈরাচার আর তেল পাওয়ার আগে তাদের সব দেশই ছিল দরিদ্র।’ (অ্যামাং দ্য বিলিভার্স থেকে উদ্ধৃত) নাইপল ইসলামকে বরাবরই বৈশ্বিক হুমকি মনে করে এসেছেন।

 

লেখালেখি নিয়ে নাইপল

* আপনি যদি কেবল উপন্যাসই লেখেন, আপনি লিখতে বসে কিছু বর্ণনাও বয়ন করেন। এটা ঠিকই আছে কিন্তু এর কোনো গুরুত্ব নেই।

* আপনি যদি সিরিয়াস বই লিখতে চান, আপনাকে ফর্ম ভাঙার জন্য তৈরি থাকতে হবে; ফর্ম ভাঙতে হবে।

* মনে করা হয় আমি একজন কঠিন লেখক, কিন্তু আমি সত্যিই কোমল।

* আমি হচ্ছি সে ধরনের লেখক, যার সম্পর্কে ভাবে অন্যরা আমার লেখা পড়ছে।

* আমি অনেক কিছু পড়ি। পৃথিবী সম্পর্কে আমার জ্ঞানের অসম্পূর্ণতা পূরণ করতে আমি পড়ি।

* আমি যখন আমার নিজের লেখা একটি বাক্য পড়ি এবং দেখি এটার টিকে থাকার গুণাগুণ আছে, আমি ভাবি এটা বিস্ময়কর।

* লেখকের জীবনী এবং এমনকি আত্মজীবনী সবসময়ই অসম্পূর্ণতার দোষে দুষ্ট। তবে আমার সম্পর্কে মূল্যবান যা কিছু সব আমার বইগুলোতেই আছে।

* তুমি কী কাজটি করেছ তা দেখার জন্য একজন মানুষ দরকার, সে এটা পড়বে, বুঝবে এবং এর ভেতর কী আছে তার মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করবে।

* পরিস্থিতিগত সত্যটা অবশ্য বুঝতে চেষ্টা করতে হবে – এতেই বিষয়টি বৈশ্বিক হয়ে উঠতে পারে।

* সাহিত্য নিয়ে কথা বলার মতো আমার কোনো ছাত্রবন্ধু ছিল না। কিন্তু আমার শিক্ষক ছিলেন চমৎকার মানুষ, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, কিন্তু তাঁর কোনো সাহিত্য বিচার-ক্ষমতা ছিল না।

* জীবনী ইতিহাস এবং শিল্পকলা নিয়ে মহৎ গ্রন্থ রচনা করা যায়।

* লেখক যদি বসে বসে কেবল শোষণ আর নিপীড়নের কথাই বলেন তাদের পক্ষে বেশি কিছু লেখা হয়ে ওঠে না। লেখকদের উচিত ‘অসম্মতি’কে প্ররোচিত করা।

* আত্মজীবনী কাহিনিকে বিকৃত করতে পারে, ঘটনাকে নতুন করে বিন্যাস করতে পারে, কিন্তু ফিকশন কখনো মিথ্যে বলে না, লেখককে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরে।

* আমি যখন কোনো লেখা পড়ি, দু-এক প্যারাগ্রাফের মধ্যেই বুঝতে পারি এটা নারীর লেখা না পুরুষের।

* শিশু হিসেবে বলতে গেলে আমি কিছুই জানতাম না, আমার দিদিমার বাড়ি থেকে যা কিছু তুলে এনেছি তার বাইরে কিছুই নয়। আমি মনে করি, সব শিশু এভাবেই পৃথিবীতে এসেছে, তারা কে তা না জেনেই।

* কথা বলার দুটি ধরন রয়েছে – একটি সহজ ধরন, যেখানে হালকাভাবে কথা বলা হয় আর একটি হচ্ছে বিবেচিত ধরন। বিবেচিত ধরনের পাশেই আমি আমার নামটি লিখেছি।

* একজন লেখক বরাবরই নিঃসঙ্গ।

* বদরাগী মানুষের যে-খ্যাতি আমার খ্যাতির ধরনটা সে-রকম। (প্রায় বাইশ বছর উপন্যাস প্রকাশিত না হওয়ার পর) আমি কখনো উপন্যাস পরিত্যাগ করিনি।

* যখনই আমি ফিকশন লিখতে গিয়েছি, আমাকে সবসময়ই একটি চরিত্র আবিষ্কার করতে হয়েছে, যার প্রেক্ষাপট অনেকটা আমারই মতো।

* জীবনের সমস্ত কিছুর বিস্তারিত বর্ণনা, অভ্যাস, বন্ধুত্ব সব আমাদের জন্য বিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে কিন্তু লেখালেখির রহস্য রয়েই যাবে। যত চিত্তাকর্ষকই হোক কোনো দলিল-দস্তাবেজ আমাদের সেখানে নিয়ে যেতে পারবে না।

* আমার দুঃখ হচ্ছে প্রকাশনার জগৎ আর বই লেখার জগৎটা ভয়ংকর বাজে, নোংরা এবং রদ্দি।

* একজন নাস্তিকের আবার কেমন করে ভাবাদর্শ থাকে? নাস্তিক হওয়ার মানেই তো বিশ্বাসের কিছু অঞ্চল থেকে মুক্ত হয়ে আসা। সেটা কেমন করে ভাবাদর্শ হয়, আমি তার কারণ খুঁজে পাই না।

* আমার বয়স যতই বাড়ছে আমি ততই নিজেকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছি মানুষকে যে সর্বোত্তম স্বীকৃতি আমরা দিতে পারি তা হচ্ছে তারা কেবল অস্তিত্বে বিরাজমানই নন, তারা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিরাজ করছেন এবং তাদের নির্দিষ্ট বাস্তবতা রয়েছে।

* কিছু লেখক কেবল শৈশবের অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখালেখি করেন, কারণ সে-অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ। অন্য ধরনের লেখকের বেলায় জীবন বয়ে যায় এবং তিনি সেই জীবনকে প্রক্রিয়াকরণ করে লিখে থাকেন।

* আপনি যদি অন্য একটি দেশে অভিবাসন নিয়ে সে-দেশের আইন মেনে বসবাস শুরু করেন, তাতে আপনি সেই সংস্কৃতির আত্মার প্রতি অসম্মান জ্ঞাপন করেন না। এটা এক ধরনের আগ্রাসন।

* একজন মানুষ যখন তিরিশ বছর বয়সে লিখতে শুরু করেন, তার বয়স যখন পঞ্চাশ বা ষাট হয় তখন তার অধিকাংশ লেখা হয়েই যায়। আশি হতে হতে তার আর তেমন কিছুই থাকে না।

* আমি যখন অক্সফোর্ড (বিশ্ববিদ্যালয়) ছেড়ে যাই আমি সত্যিই লেখালেখির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তারপর আমি লিখতে বসি। শিল্পের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান আমার বরাবরই ছিল। আমি সবসময় অনুভব করেছি লেখালেখি একটা কাজ।

* অনেক লেখক জীবনের শেষপর্যায়ে এসে তাঁর বইগুলোর সারাংশ লিখতে শুরু করেন।

* চলচ্চিত্রের প্রথম পঞ্চাশ বছর ছিল সত্যিকারের মহান কীর্তির সময়। মৌলিক মানস তখন গল্প বলার একটি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেছে। আর এখন যা ঘটছে তা হচ্ছে অনুকরণ, মহৎ সৃষ্টিকারীরা যা করেছেন কেবল তারই নকল।

* আমি সবসময়ই আমার প্রজ্ঞা দিয়ে চালিত হয়েছি। সাহিত্যের হোক কিংবা রাজনীতির – আমার কোনো পদ্ধতি নেই। আমাকে পরিচালিত করার কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শও নেই।

* যে-সভ্যতা বিশ্বকে ভয়ে করে নিয়েছে তাকে মরণাপন্ন বলার কারণ নেই।

* স্কুলে আমার গুণমুগ্ধ ছিল, আমার কোনো বন্ধু ছিল না।

 

নতুন লেখকের জন্য নাইপলের সাত টিপস

১. লম্বা বাক্য লিখবেন না।

(একটি বাক্যে দশ-বারোটির বেশি শব্দ থাকবে না)

২. প্রতিটি বাক্যে স্পষ্ট বিবৃতি থাকতে হবে।

(আগের বাক্যের বিবৃতির সঙ্গে এটি যুক্ত হবে এবং সংগতিপূর্ণ হবে। একটি ভালো অনুচ্ছেদ হচ্ছে কতগুলো স্পষ্ট ও সম্পর্কিত বাক্য।)

৩. বড় শব্দ লিখবেন না।

(কম্পিউটার যদি বলে গড়পড়তা শব্দে পাঁচটির বেশি অক্ষর রয়েছে তাহলে বুঝতে হবে কোথাও সমস্যা রয়েছে। ছোট শব্দের ব্যবহার লেখককে চিন্তা করতে বাধ্য করে তিনি কী লিখছেন। এমনকি কঠিন ভাবনাকেও ছোট শব্দে ভেঙে নেওয়া যায়।)

৪. যে-শব্দের মানে সম্পর্কে আপনি নিশ্চিত নন, তা লিখবেন না।

(এই আইন যদি ভঙ্গ করেন তাহলে লেখালেখি ছেড়ে অন্য কাজ দেখুন)

৫. রং, আকার, সংখ্যা – এসব ছাড়া নতুন লেখককে বিশেষণ ব্যবহার এড়াতে হবে।

(বিশেষণের বিশেষণ অ্যাডভার্বও যত কম সম্ভব ব্যবহার করবেন)

৬. বিমূর্ত বর্ণনা এড়িয়ে যাবেন।

(সবসময় সঠিক বস্তুটি লেখায় উঠিয়ে আনবেন, বিমূর্ত কিছু নয়)

৭. প্রতিদিন অন্তত ছয় মাস এভাবে লেখালেখির চর্চা করুন।

(আপনি কেবল তখনই এই লেখালেখির বিধান ভাঙবেন যখন এগুলো পুরোপুরি আপনার রপ্ত হয়েছে এবং দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছেন)।

 

নাইপল : টাইমলাইন

১৯৩২ : ১৭ আগস্ট জন্ম, ত্রিনিদাদের চাগুয়ানাস গ্রামে। বিদিয়াধর সূরজপ্রসাদ নাইপল (বাংলায় সম্ভবত বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল। নাম অনূদিত না হওয়াই ভালো। লেখক যেভাবে সংবর্ধিত হতে চান সেটাই উৎস। আমরা ঢাকায় তাঁর স্ত্রীকে শুনেছি বিদিয়া বলে ডাকতে) তাঁর পিতা সি প্রসাদ নাইপল, মা দ্রোয়াপাতি নাইপল।

১৯৩৯ : পরিবার ত্রিনিদাদের রাজধানী পোর্ট অব স্পেনে স্থানান্তর।

১৯৪০ : ত্রিনিদাদের সবচেয়ে আধুনিক ব্রিটিশ স্টাইল স্কুল কুইন্’স রয়াল কলেজে ভর্তি।

১৯৫০ : পড়াশোনার জন্য অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজে বৃত্তিলাভ।

১৯৫২ : খেলার মাঠে পরবর্তীকালের প্রণয়িনী ও স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া হেইলের সঙ্গে সাক্ষাৎ।

স্পেন ভ্রমণ এবং বেপরোয়া ব্যয়।

১৯৫৩ : নাইপল এবং প্যাট্রিসিয়া অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট হলেন।

নাইপলের পিতার মৃত্যু।

১৯৫৪ : টুকরো কাজ, প্যাট্রিসিয়ার অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বিবিসি রেডিওর ক্যারিবিয়ান ভয়েসে উপস্থাপকের চাকরি (তিন মাস পরপর নবায়নযোগ্য) পান।

১৯৫৫ : দুপক্ষের পরিবারের অজান্তে নাইপল ও প্যাট্রিসিয়া বিয়ে করেন। প্যাট্রিসিয়ার কর্মস্থল বার্মিংহাম, লন্ডনে উইকএন্ড কাটান নাইপলের সঙ্গে। পুরনো ল্যাঙ্গহাম হোটেলে বিবিসির ফ্রি ল্যান্সারদের রুমে গ্রীষ্মের এক অপরাহ্ণে মিগুয়েল স্ট্রিটের প্রথম গল্প ‘বোগার্ট’ লেখেন।

প্রকাশক প্রথম উপন্যাস দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর গ্রহণ করেন।

১৯৫৭ : প্রথম উপন্যাস প্রকাশ এবং পুরস্কার লাভ।

১৯৫৮ : দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য সাফ্রেজ অব এলভিরা প্রকাশিত।

১৯৫৯ : প্রথম লেখা বই মিগুয়েল স্ট্রিট গ্রন্থাকারে প্রকাশ। প্রথম নন-ইউরোপিয়ান লেখক হিসেবে সমারসেট মম অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন এই বইটির জন্য এবং লেখক সমারসেট মম নিজে তা অনুমোদন করেন।

১৯৬১ : নাইপলের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস-প্রকাশিত।

১৯৬২ : দ্য মিডল প্যাসেজ নন-ফিকশনপ্রকাশিত।

১৯৬৩ : ব্রিটেনের প্রেক্ষাপটে প্রথম উপন্যাস মিস্টার স্টোন অ্যান্ড দ্য নাইটস কোম্প্যানিয়ন-প্রকাশিত।

১৯৬৪ : অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস : অ্যান এক্সপেরিয়েন্স অব ইন্ডিয়া-প্রকাশিত।

১৯৬৬ : রাইটার-ইন-রেসিডেন্স হিসেবে উগান্ডার কাম্পালায় ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর অবস্থান।

১৯৬৬ : দ্য মিমিক ম্যান প্রকাশিত, ডব্লিউএইচ স্মিথ পুরস্কার লাভ।

১৯৭১ : ইন অ্যা ফ্রি স্টেট প্রকাশিত, বুকার প্রাইজ লাভ।

১৯৮১ : অ্যামাং দ্য বিলিভার্স : অ্যান ইসলামিক জার্নি প্রকাশিত।

১৯৯১ : নাইটহুড প্রাপ্তি।

১৯৯৬ : স্ত্রী প্যাট্রিসিয়ার মৃত্যু।

পাকিস্তানি সাংবাদিক নাদিরা খানম আলভিকে বিয়ে করেন।

২০০১ : নোবেল সাহিত্য পুরস্কার লাভ।

২০১৬ : বাংলাদেশে ঢাকা লিট ফেস্টে আগমন।

২০১৮ : ১২ আগস্ট লন্ডনে মৃত্যুবরণ।

 

নাইপলের সাহিত্যকর্ম

ফিকশন

*             দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর (১৯৫৭)

*             দ্য সাফ্রেজ অব এলভিরা (১৯৫৮)

*             মিগুয়েল স্ট্রিট (১৯৫৯)

*             অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস (১৯৬১)

*             মিস্টার স্টোন অ্যান্ড দ্য নাইটস কোম্প্যানিয়ন (১৯৬৩)

*             দ্য মিমিক ম্যান (১৯৬৭)

*             অ্যা ফ্ল্যাগ অব দ্য আইল্যান্ড ((১৯৬৭)

*             ইন অ্যা ফ্রি স্টেট (১৯৭১)

*             গেরিলাস (১৯৭৫)

*             অ্যা বেন্ড ইন দ্য রিভার (১৯৭৯)

*             দ্য এনিগমা অব অ্যারাইভাল (১৯৮৭)

*             অ্যা ওয়ে ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (১৯৯৪)

*             হাফ অ্যা লাইফ (২০০১)

* দ্য নাইটওয়াচম্যানস অকারেন্স বুক : অ্যান্ড আদার কমিক ইনভেনশন্স (২০০২)

*             ম্যাজিক সিডস (২০০৪)

 

নন-ফিকশন

*             দ্য মিডল প্যাসেজ : ইমপ্রেশনস অব ফাইভ সোসাইটিজ-ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, অ্যান্ড ডাচ ইন দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ অ্যান্ড সাউথ আমেরিকা (১৯৬২)

*             অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস (১৯৬৪)

*             দ্য লস অব এলডোরাডো (১৯৬৯)

*             দ্য ওভারক্রাউডেড বারাকুন অ্যান্ড আদার আর্টিকেলস (১৯৭২)

*             ইন্ডিয়া : অ্যা ওন্ডেড সিভিলাইজেশন (১৯৭৭)

*             অ্যা কঙ্গো ডায়েরি (১৯৮০)

*             দ্য রিটার্ন অব এভা পেরন অ্যান্ড কিলিংস ইন ত্রিনিদাদ (১৯৮০)

*             অ্যামাং দ্য বিলিভার্স : অ্যান ইসলামিক জার্নি (১৯৮১)

*             ফাইন্ডিং দ্য সেন্টার : টু ন্যারেটিভস (১৯৮৪)

*             অ্যা টার্ন অব দ্য সাউথ (১৯৮৯)

*             ইন্ডিয়া : অ্যা মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ (১৯৯০)

*             বেয়ন্ড বিলিফ : ইসলামিক এক্সকার্সনস অ্যামাং দ্য কনভার্টেড পিপলস (১৯৯৮)

*             বিটউইন ফাদার অ্যান্ড সান : ফ্যামিলি লেটার্স (১৯৯৯, গিলন অ্যাটকেন-সম্পাদিত)

*             দ্য মাস্ক অব আফ্রিকা (২০১০)

Leave a Reply

%d bloggers like this: