দ্য ট্রায়াল

লেখক:

কাজী রাফি
জবুথবু গাছগুলোতে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো টলটল করছে। সংরক্ষিত এলাকার নির্জন গলিগুলোতে কেউ নেই। বিকেলের ম্লান আলোর সঙ্গে মেঘ-বৃষ্টির এই আধো-আঁধারি লগ্ন আরো মগ্নতায় প্রাচীন এক পৃথিবীর সঙ্গে ফিসফিস কথোপকথনে ব্যস্ত। কর্নেল নাদিম বিকেলের অবসরে দূর-আকাশের কোনো এক অসীম প্রান্তরে তাকিয়ে আছেন। তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আজ তাকে অনন্য এক বাণী শুনিয়েছেন – ‘ছোট ছোট ভুল জীবনে বড় সর্বনাশ ডেকে আনে।’ বারান্দায় তার পাশে দাঁড়িয়ে তার দশ বছরের কন্যা সায়রা আফ্রা। কোনো অসীম-অনন্ত থেকে বৃষ্টিফোঁটারা ঝরে পড়ছে তাই যেন হৃদয়ঙ্গমে ব্যস্ত তার কৌতূহলী শিশু দুই চোখ। বাংলোর ঘরগুলোর চেয়ে বড় আর সুপরিসর বারান্দার ফুল আর লতাগুচ্ছের একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনিন্দ্যলোক তার সরল অভিব্যক্তিতে
বিস্তৃত করে রেখেছে প্রভূত প্রভাব। মেঘ-বৃষ্টির এমন দিনে, বিকেলের কনে দেখা আলোয় অথবা ঝিম মেরে থাকা অলস আর খাঁ-খাঁ দুপুরের নিসঙ্গ প্রহরে তার শিশুহৃদয় এখানেই কী যেন খুঁজে বেড়ায়। হাত বাড়িয়ে আজ সে বাইরের বৃষ্টিফোঁটা ধরতে চাইছে।
বড় হতে চাইলে তাই তোমাকে ‘সাফকাত’ খেলাটি ভালোভাবে সম্পন্ন করতে হবে। তার জন্য বানানো প্লটে ছোট্ট কোনো ভুল তোমাকেই শেষ করে দেবে। নাদিম অস্থির হয়ে শৈশবে মা-হারানো মেয়ের চোখে তাকালেন এবং ধমকের স্বরে বললেন, ছোট ছোট ভুল জীবনে বড় সর্বনাশ ডেকে আনে। এদিকে সরে এসো। বাবার অমন স্বরে কথা বলা শুনে আফ্রা বলল, বাবা আমি তো কোনো ভুল করছি না। আমি শুধু বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁতে চাইছি।
বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁতে গিয়ে তুমি পা পিছলে পড়ে যেতে পারো এবং ‘শেষ’ হয়ে যেতে পারো।
গত ষাট বছর নাদিম এই বৃষ্টিফোঁটার সঙ্গে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে ঝরেই চলেছেন ঝরঝর। তার পরীর মতো মেয়ের ত্বকে এখনো তিনি কলকলে রঙের লাবণ্য খুঁজে ফিরলেও আফ্রার কুঁচকে যাওয়া আর ভাঁজ-পড়া ত্বকের দিকে তাকিয়ে নাদিমের মন খারাপ হয়ে যায়। যেদিন তার বুলেটবিদ্ধ শরীর থেকে গলগল রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল সেদিনও তার নিজের ত্বক আজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ের ত্বকের চেয়েও তরুণ ছিল। আহা, সময়! তুমি কেমন করে সবকিছু ওলটপালট করে দাও। নাদিমের বুলেটবিদ্ধ নিস্তেজ শরীরটা যেদিন কফিনে ভরানো হলো, তারপর প্রতি বর্ষায় এই বাসার জবুথবু গাছগুলোর ফাঁক-ফোকর থেকে আফ্রাকে তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। নাহ্, গত ষাট বছরে আর কোনোদিনই সে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টিফোঁটা ধরতে চায়নি। ছোট্টবেলায় শোনা বাবার মুখের বাক্যটা হয়তো তার কানে রাগিণীর সুর তুলে এক ধ্র“ব সত্যতে পরিণত হয়েছে – ‘ছোট ছোট ভুল জীবনে বড় সর্বনাশ ডেকে আনে।’

দুই
নাদিম ছোট ভুল করলেন। বৈষয়িক প্রাপ্তিকে বড় মনে করে তিনি জীবনপ্রবাহের মহৎ উদ্দেশ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেন। প্রচলিত আইনের চেয়ে বরং তিনি ঊর্ধ্বতনদের প্রতি শ্রদ্ধাবনত হলেন। তার স্কন্ধে নতুন নতুন তারকা সংযুক্ত হলো এবং এক রাতে তিনি তার সাজানো প্লটটা তার অধীনদের বুঝিয়ে বললেন – অপারেশন ‘রেড স্ট্রাইকে’র অধীনে মি. শাফকাতকে প্রথমেই একজন অবৈধ অস্ত্রধারী এবং খুনি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। সবার আগে তার বিরুদ্ধে মিডিয়া ক্যাম্পেইন…
তরুণ এক অফিসার নাদিমকে থামাল, কিন্তু স্যার, তাকে আমরা একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই জানি…
নাদিমের রক্তচক্ষুর রোষানলে তরুণ অফিসারটি খেই হারিয়ে, ভীতুস্বরে বলল, ইউ আর রাইট স্যার।
পরিকল্পনা সম্পন্নের সেই রাতেও বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টি হচ্ছে আজো। ষাট বছর ধরে বর্ষা-শীত-বসন্ত ঘুরে ঘুরে নবীন রং ধারণ করে ফিরে ফিরে এসেছে ষাটবার। কিন্তু তার আফ্রা প্রতিদিন যেন ক্ষয়ে গেছে আরো একটু। নাহ্, নাদিম আজ মৃত্যুপারের কোনো আইন মানবেন না। আফ্রার পাশে গিয়ে তার আজ বসতে বড় ইচ্ছা করছে। এবং একসময় স্রষ্টার সব আদেশ লঙ্ঘন করে তিনি মেয়ের পাশে গিয়ে বসলেন। বাহাত্তর বয়সী মেয়ের ভাটাপড়া লাবণ্যের হাতদুটো আলতো করে তুলে নিলেন নিজের হাতে। আপ্লুত মায়ায় প্রশ্ন করলেন – তোমার আর বৃষ্টিফোঁটা ধরতে ইচ্ছা করে না মা?
পাছে আবার ছোট্ট কোনো ভুল হয়। ছোট্ট সেই ভুলের ভয়ে সেই ইচ্ছা আমার কবে মরে গেছে বাবা?
তোমার মাথার চুলগুলো এলোমেলো, আমি চিরুনি দিয়ে বেণি বানিয়ে দিই!
না বাবা, প্রয়োজন নেই। তোমার মতো পরিপাট্য, সুশৃঙ্খল এবং আদর্শের বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করা মানুষ যখন পদবির প্রয়োজনে মানুষের জীবন নিয়ে ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠতে পারে তখন আমার সামান্য চুলগুলোকে বিন্যস্ত বিন্যাসে দেখার ইচ্ছাটা মরে যায়।
জীবনকে উদ্যাপন করতে হয়, বিয়ে না করে তুমি জীবনে বড় ভুল করলে মা। বাবার এমন আবেগী কণ্ঠের প্রত্যুত্তরে আফ্রা নির্মোহ স্বরেই জবাব দেয় – আমার এই ভুল তোমার ভুলগুলোর চেয়ে ছোট না বড় বাবা? তোমার সামান্য বৈষয়িক প্রাপ্তি, যে-প্রাপ্তি নিয়ে এই পৃথিবীর এবং পৃথিবীর মানুষের মোটেও মাথাব্যথা নেই; সেই প্রাপ্তিই কি জীবন উদ্যাপনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ?
মেয়ের কথায় মাথা নিচু করলেন নাদিম। তার আনত দৃষ্টির সামনে মেয়ের ডান পায়ে তিনি অস্বাভাবিক পরিবর্তন খেয়াল করলেন। আফ্রার ডান পায়ের সঙ্গে বাঁ পাটা ফুলে টইটম্বুর। বারো বছর বয়সে ভেঙে দুই টুকরা হয়ে যাওয়া পাটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুলে গেছে আফ্রার বাঁ পাও! ছলছল জলভরা দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে হতভম্ব হয়ে তিনি তাকালেন।
সত্যি আমি দুষ্টুমি করে এসব সাজিয়েছি। বিশ্বাস করো মা, ওদের আমি মেরে ফেলার জন্য ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে দিইনি। আমি বুঝতে চাইছিলাম তুমি আমাকে কত ভালোবাস! যদি জানতাম এই খেলার জন্য আমাকে এত চড়া মূল্য দিতে হবে!
নাদিম দেখলেন সায়রা আফ্রা ডানপাশে মাথা ঘুরিয়ে অদৃশ্য কিছুর দিকে তাকিয়ে কী যেন বলার চেষ্টা করছে। কৃষ্ণচূড়ার ডাল কাঁপিয়ে দ্রুত তিনি আফ্রার কাছে গিয়ে কান পেতে তার কথা শুনলেন – এই স্মৃতি ছেড়ে কোথাও আমি যেতে পারলাম না। আমার মন শৈশবেই পড়ে আছে বাবা। তুমি নেই, মা নেই; আমিও না থাকলে দান হিসেবে প্রাপ্ত এ-বাড়ি ওরা নিয়ে নেবে। আমি এই সংরক্ষিত এলাকার বাইরের সমাজে মুখ দেখাতে চাই না। সমাজ তোমাকে খুনি হিসেবে জানলেও আমি তো তোমাকে জানি, ছোট এক ভুল তোমার-আমার জীবনে… । সেই ভুলটার নাম কী জানো বাবা? তার নাম মোহ; এই মোহ ছেড়ে কেউ বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ দেখো বাবা, আমি কেমন করে সব মোহ ছেড়ে দিয়ে এ-বাড়িকেই আমার জীবনশিকড় বানিয়েছি। আমি যেন এক প্রাচীন বৃক্ষ…
নাদিম মগ্ন হয়ে মেয়ের অনুধাবন করা অনুভব শুনে ব্যথিত হয়ে উঠলেন। আফ্রার জীবনশিকড় এই বাড়িটা; আর মৃত্যুপারের তার আত্মার শিকড় আফ্রা আর আফ্রার চারপাশের নিভৃত এই প্রকৃতি। অথচ জীবন এবং আত্মার শিকড় ছেড়ে তিনি মেতে উঠেছিলেন কাঁধে ঝোলানো ক্ষমতার প্রতীক নিয়ে! ভাবনা থামিয়ে দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি স্বগতোক্তির স্বরে বললেন, আমি দুঃখিত মা, আবার জন্ম নিলে শুধরে নেব, জীবনের সব ভুল। তোমাকে তখন আমার জীবন থেকে নেওয়া শিক্ষাটা শিখিয়ে দেবো – ‘স্রষ্টার এ-পৃথিবীর এক কোনাও কোনো মানুষের সম্পত্তি হয় না। সম্পত্তির মায়া ধোঁকামাত্র। এই বাড়ির মায়া ছেড়ে বের হয়ে পড়ো। তোমার চারপাশে থাকা রক্ত-মাংসের যে মানুষ তার চোখে চোখ রাখো। ধনী-দরিদ্র, কুলি-মেথর, শিক্ষিত-মূর্খ, পদবিধারী-পদবিহীন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে মানুষটি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, মনে করবে তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একজন মানুষ। পূর্ণ মনোযোগে তুমি তার প্রতিটি শব্দ শুনবে। তুমি জানো না, স্রষ্টা পরম মমতায় প্রতিটি মানুষের মাঝে কী যেন এক ‘মহান ব্যাপার’ লুকিয়ে রেখেছেন – তার অজান্তেই। মা রে! মানুষের এই ‘মহান ব্যাপার’টি তুমি খুঁজে ফিরবে সারাজীবন।’
নাদিমের কণ্ঠনালিতে বৃষ্টিকণার কুলকুল প্রবাহ। কৃষ্ণচূড়ার পাতাগুলোর মতো জল টলটল তার কণ্ঠ হতে একটাও শব্দ নিঃসৃত হলো না। আফ্রার কানে কোনো দুল নেই দেখে আজ তার প্রথম মনে পড়ল, মাহীন কন্যাটিকে তিনি তার পেশার চেয়ে কম গুরুত্ব দিয়েছেন। গহনা পরার জন্য আফ্রার কান ছিদ্র করিয়ে দিতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন।
আফ্রার কানের পাশে তার রেশম-কালো চুলের মাঝে দিন দিন সাদা সাদা চুলের বিস্তৃতি ঘটছে।

তিন
শাফকাতের পরিবর্তে ভুল ব্যক্তি অপারেশন ‘রেড স্ট্রাইকের’ কবলে পড়ল। এই নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠল ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে নাদিমের দল শহরময় ‘শাফকাত’ শব্দের ভূত খুঁজতে গিয়ে বাড়ি বাড়ি হানা দিলো। হাজার হাজার তরুণকে তুলে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হলো। দলীয় ক্যাডাররাও তাদের সহায়তার নামে দিন দিন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আরম্ভ করল। তারা ক্রমশ হয়ে উঠল সামাজিক ভীতির প্রতীক। একসময় আইন রক্ষাকারী বাহিনীগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদেরই শরণাপন্ন হলো! এরই ফলে দেশময় ভয়াল এক সংস্কৃতি গড়ে উঠল। বছর দুয়েকের মধ্যে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ সবাই একে অন্যকে ঘায়েলের পদ্ধতি হিসেবে নাদিম-নীতি অনুসরণ করে নিজেরাই নাদিম বাহিনীর কাঁধে দোষ চাপিয়ে দিলো। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় এবং ভয়কাতরতায়, এমনকি তাদের সন্তানদের মিথ্যা বলার কৌশল রপ্ত করার তালিম দিলেন। বাবারা তাদের যুবক সন্তানদের শিখিয়ে দিলেন, ‘কখনোই তোমরা আমাদের কাউকেও ভুলেও নিজের সঠিক অবস্থান বলে যেও না। বাহিনীর লোকজন যে-কোনো সময় তোমার খোঁজে বাসায় এলে বিপদ।’ একটা জাতি খুব দ্রুত মিথ্যা আর প্রতারণার বিদ্যা শিখে গেল। তাদের সংস্কৃতি হয়ে উঠল মরণোন্মুখ।
এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল প্রশ্ন তোলায় ক্ষিপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং শাসকশ্রেণির নির্দেশে নাদিম তার অধীনদের কাঁধে সব অপকর্মের দোষ চাপিয়ে তাদের বিচারের সম্মুখীন করালেন। কৌশল হিসেবে নাদিমকে কর্তৃপক্ষ এই ট্রায়ালের বাইরে রাখলেন এই শর্তে, তিনি জাতিকে জানিয়ে দেবেন যে, অপারেশন রেড স্ট্রাইকের অধীনে নাদিম তাদের বাড়াবাড়িতে অসন্তুষ্ট এবং বিব্রত। সুতরাং অপকর্মের হোতা হিসেবে অধীনদেরই দোষী-সাব্যস্ত করে নাদিমকে বিবৃতি দিতে হলো এবং দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করার অপরাধে ট্রায়ালে নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের দোষীসাব্যস্ত করে শাস্তি হিসেবে তাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ নির্ধারণ করা হলো।
ফাঁকা মাঠ। শূন্য নির্জন প্রান্তর। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সব অফিসারকে পেছন দিকে দাঁড় করিয়ে তাদের চোখ কালো কাপড়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সারিবদ্ধ করে পাঁচজন কর্মকর্তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে আনা হয়েছে।

চার
নীল-সোনালি রঙের একটা ফড়িঙের পেছনে ছুটতে ছুটতে আফ্রাও ততক্ষণে ঢুকে পড়েছে সেই মাঠের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে।
কিন্তু এসবের কিছুই মেনে নিতে পারছিলেন একজন দেশপ্রেমিক যুবক। গুপ্তচরবৃত্তি করতে গিয়ে তার মাতৃভূমিকে নিয়ে জটিল খেলায় মেতে ওঠা এসব নরককীটদের শায়েস্তা করা শফিকের সাধ্যের বাইরে। তবু আজ সে আফ্রাকে ব্যবহার করে এই নষ্ট সময়ের প্রতিবাদ করতে চাইল। কৃষকের বেশ ধরা শফিক নামের গুপ্তচর যুবক ফড়িংটি ধরে এনে আফ্রার সামনে দাঁড়াল। হাসিমুখে আফ্রার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে নীল-সোনালি ফড়িংটা তার দিকে এগিয়ে ধরে মিষ্টি হেসে সে বলল, তুমি সুন্দর এই ফড়িংটা খুঁজছিলে, তাই না আম্মু?
ওহ, থ্যাঙ্কু আঙ্কেল। কখন থেকে ওর পেছনে দৌড়াচ্ছি।
দ্যাখো আম্মু, ছোট্ট এই ফড়িংটার নীল রঙের পাশে কী সুন্দর সোনালি রং!
হ্যাঁ, খুব সুন্দর।
এইটুকু সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য স্রষ্টাকে কী অফুরান মনোযোগ দিতে হয়েছে, তাই না মা?
ঠিক বলেছ আঙ্কেল। তুমি অনেক ভালো।
স্রষ্টার এই মনোযোগে ‘ত্যাগ’ ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। তার ত্যাগে যে সূক্ষ্মতার শিল্প লুকানো, তা তোমার সামান্য খেলায় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে ।
তুমি কী বলতে চাইছ? তোমার কথাগুলো আমি বুঝতে পারছি না।
তুমি শক্ত করে ধরলে ওর পাখাটা ভেঙে যেতে পারে। তুমি কি চাও সুন্দর এই ফড়িংটা মরে যাক?
না, তা চাই না। বলেই আফ্রা শফিকের হাত থেকে সন্তর্পণে ফড়িংটা নিয়ে মুক্ত করে দিলো অবারিত বাতাসে। শফিক এবার উদ্বিগ্নকণ্ঠে বলল, মা, এবার তোমার একজন প্রিয় মানুষকে বাঁচাতে হবে। এবং তুমি ছাড়া তাকে বাঁচানো হয়তো পৃথিবীর আর কারো পক্ষে সম্ভব নয় ।
কাকে বাঁচাতে হবে?
তোমার বাবাকে।
বাবাকে! আমার বাবাকে কে মারতে চাইছে? প্লিজ আঙ্কেল আমাকে এক্ষুনি সেখানে নিয়ে চলো…
পাঁচ
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সকল কর্মকর্তার মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য দেশের সবচেয়ে চৌকস শুটার শুটিংস্পটে অস্ত্র-হাতে প্রস্তুত। মৃত্যুদণ্ডের আদেশে স্পষ্টত বলা হয়েছে, ‘একজনকে একবারের বেশি শুট করা যাবে না। গুলি করার পর কেউ বেঁচে গেলে তাকে বিনা শর্তে মুক্তি দিতে হবে।’ নৈয়ায়িক কর্তৃপক্ষ আইনের ব্যত্যয় করবেন না বলে প্রতিশ্র“ত। তাদের এই প্রতিশ্র“তির মহানুভবতা নিয়ে মিডিয়া আপ্লুত হয়ে দেশে একটা সুস্থ পরিবেশ ফিরছে বলে প্রচারণা চালাচ্ছে।
নাদিম চৌকস শুটারকে শুটিংস্পটে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং নিজে বায়নোকুলার হাতে অপরাধীদের মৃত্যু নিরীক্ষণের নিমিত্তে আদেশ-মঞ্চে দাঁড়িয়ে গেলেন।
শফিক আফ্রার লাল-গোলাপি আভামিশ্রিত গালে মায়াভরে হাত বুলিয়ে বলল, মা রে! স্রষ্টা কী অনন্য মহিমায় আর অপার যতেœ প্রতিটি প্রাণকে জীবন্ময় করে তোলেন। ভোগলোভী মানুষগুলো যদি তা বুঝত!
পাগড়ি থেকে গামছা খুলে শফিক মুখের ঘাম আর চোখের অশ্র“ মুছিয়ে নিল যেন মিথ্যা বলার জন্য আফ্রার কাছে সে ক্ষমা চেয়ে নিল, তোমার বাবাকে আজ গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে!
আফ্রা আর্তনাদ করে উঠতেই সে তার মুখ চেপে ধরে বলল, বাবাকে বাঁচাতে চাইলে আমার সঙ্গে এসো।
আফ্রা সন্তর্পণে শফিককে অনুসরণ করল। মাঠের মাঝের উঁচু উঁচু ঢিবি আর গাছের আড়াল নিয়ে শফিক লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের দেখিয়ে বলল, পাঁচজনের মধ্যে কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে রাখা ঠিক মাঝখানের জন তোমার বাবা। এক দৌড়ে বাবাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরো। যিনি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছেন, আমি জানি; তোমার মতো তার পরীর মতো এক মেয়ে আছে। মজার ব্যাপার হলো, যে শুটার তারও এক কন্যাসন্তান আছে। তোমার দিকে গুলি ছুড়তে তার হাত কাঁপবে। আর প্রতিটি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য মাত্র এক রাউন্ড বুলেট বরাদ্দ। যাও মা, দ্রুত যাও। বাবাকে বাঁচাও।
চৌকস শুটার ততক্ষণে ওয়্যারলেসে, প্রমোশনের কারণে স্কন্ধে নতুন নতুন তারকা চিহ্ন-পরিহিত নাদিম সাহেবকে রিপোর্ট দিচ্ছে, অ্যামুনিশন ইজ লোডেড স্যার। আই’ম রেডি টু শুট।
নাদিম ‘ফায়ার’ বলে আদেশ দেওয়ার আগে বায়নোকুলার চোখে ধরে শেষবার মানুষ ‘টার্গেট’গুলো দেখতে গিয়ে হতভম্ব হয়ে লক্ষ করলেন, ঠিক আফ্রার মতো একটা মেয়ে কেন যেন এক পা টেনে খোঁড়াতে খোঁড়াতে দৌড়ে যাচ্ছে দণ্ডপ্রাপ্ত সারিবদ্ধ মানুষগুলোর দিকে। তিনি আঁতকে উঠলেন। এখানে কোনোভাবেই আফ্রার আসার কথা নয়। তার আফ্রা নিশ্চয়ই খোঁড়াও নয়!
তিনি মনোযোগ সহকারে নিজের কানকে উন্মুখ করলেন এই এলোমেলো বয়ে যাওয়া হাওয়ার তানে। কিন্তু তাকে অবাক করে ক্রমশ আফ্রার কণ্ঠস্বরই ভেসে এলো, প্লিজ আঙ্কেল, ডোন্ট কিল মাই ফাদার। হি’জ মাই মম ঠু!
আফ্রা কোনোরকমে মাঝখানের ব্যক্তিটির কাছে পৌঁছাল এবং তাকে আকুল হয়ে জড়িয়ে ধরল। কান্নাজড়ানো কণ্ঠে আফ্রা বলেই চলল, প্লিজ গড, লিসন মি, সেভ মাই ফাদার! আই লাভ ইউ বাবা…
বাবা? আফ্রা তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বাবা বলছে কেন? কিন্তু কোনো প্রশ্নের চেয়ে এই মুহূর্তে নাদিমের মনে হলো, আফ্রা যাকে আকুল হয়ে জড়িয়ে ধরেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি সে যেন নিজেই। পদবির চেয়ে মেয়ের ছোট্ট আদুরে বাহুর মাঝে অমন ভালোবাসা পেয়ে মৃত্যুও শ্রেয় – এমন অনুভূতিতে আক্রান্ত নাদিম শুটারের উদ্দেশে হুঙ্কার ছাড়লেন – স্টপ, স্টপ! আনলোড ইওর উওপন। নাদিমের গগনবিদারী চিৎকারে শুটার মাথার ‘লাল হেলমেট’ খুলে ফেলল। পাশের অফিসারকে নাদিম নির্দেশ দিলেন, লিভ দেম অল। বলেই তিনি স্থান-কাল-পাত্র ভুলে দৌড়ে গেলেন আফ্রার কাছে। নিজেই দণ্ডপ্রাপ্তদের ‘কালো মুখোশ’ খুলে দিলেন। তারপর মেয়েকে জড়িয়ে বললেন, আজ বুঝলাম, ভালোবাসা মৃত্যুকে হার মানায়। তোমার এমন ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মরে যাওয়া আমার জন্য কোনো সমস্যা নয়। চলো মা, আমরা ঘরে ফিরে যাই।
আফ্রা অবিশ্বাসী চোখে বাবার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, সত্যি আমি দুষ্টুমি করে এসব সাজিয়েছি। বিশ্বাস করো মা, ওদের আমি মেরে ফেলার জন্য ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে দিইনি। আমি বুঝতে চাইছিলাম তুমি আমাকে কত ভালোবাস!
বাড়ি ফিরে যাওয়ার সামর্থ্য আফ্রার ছিল না। দৌড়ানোর সময় গর্তে পা পড়ে তার ডান পাটি কখন ভেঙে গেছে! সেই ভাঙা পায়ে বাবাকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে দৌড়াতে গিয়ে অপরিণত পাটি কয়েক অংশে ভেঙে গেছে। মেয়েকে জড়িয়ে কান্নাজড়ানো স্বরে নাদিম বললেন, হায়! যদি জানতাম এই খেলার জন্য আমাকে এত চড়া মূল্য দিতে হবে।
হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স ছুটে এলো। ফড়িং হাতে দেওয়া মানুষটি কিছুক্ষণেই তার বড় আপন আর প্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই বয়সেও সে যেন তার কৃষক আঙ্কেলের মিথ্যা বলার যথার্থ কারণ খুঁজে পেল। আফ্রার মনে পড়ল, আঙ্কেল তাকে বলেছিল – ‘তুমি শক্ত করে ধরলে ওর পাখনাটা ভেঙে যেতে পারে। তুমি কি চাও সুন্দর এই ফড়িংটা মরে যাক?’
আফ্রার মনে হলো, বাবা তার জন্য শক্ত একটা খেলা বেছে নিয়েছে। ভাঙা পাটা স্ট্রেচারে সোজা করে দিয়ে ব্যথাকাতর কণ্ঠে সে তার বাবাকে বলল, ‘বাবা, ছোট ছোট ভুল জীবনে বড় সর্বনাশ ডেকে আনে।’ মেয়ের কথায় থমকে দাঁড়ালেন নাদিম। মেয়ে যেন তাকে বুঝিয়ে দিলো, ‘তোমার ভুলস্থানের উপদেশটি আমি সঠিক স্থানে ব্যবহার করলাম।’ মেয়ের কথা নির্জন প্রান্তরের চতুর্দিক থেকে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে তাকে বলেই চলল – ‘বাবা, আমাকে খুশি করার জন্য তোমার বলা মিথ্যাটাও একটা ভুল।’
ব্যথিত হৃদয়ে নাদিম স্কন্ধের মিথ্যা তারকাগুলোয় লুকানো ‘প্রবঞ্চনা’ শব্দটিকে আজ জীবনে প্রথম হৃদয়ঙ্গম বিধায় অনুধাবন করলেন।
প্রবঞ্চনা নাদিমকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলল যেন। তার কাঁধের তারকাগুলো উল্কাপিণ্ড হয়ে তারই ওপর ঝরে পড়ল। হাসপাতালে পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে শুয়ে থাকা আফ্রা ঘুণাক্ষরেও জানল না, সামাজিক শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার জন্য তার বাবাকে ট্রায়ালে দোষীসাব্যস্ত করা হয়েছে। বিকেলের ম্লান আলোয় তাকে চোখ-মুখ আজ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে শুটারের মুখ বরাবর দাঁড় করানো হয়েছে সেই স্থানে, যেখানে আফ্রা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অফিসারকে বাবা ভেবে ভাঙা পায়েই তাকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল বুলেটের সামনে।
ভুল তথ্য পেয়ে আফ্রা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যে-ব্যক্তিকে তার ‘বাবা’ ভেবে তাকে বাঁচিয়েছিল সেই অফিসারের স্কন্ধে আজ শোভা পাচ্ছে ‘অসীম অন্ধকারে একমাত্র আলোর প্রতীক’ তারকাগুলো! তিনি কালবিলম্ব না করে তার কাঁধের তারকাগুলোকে জীবনের চরম প্রাপ্তি ভেবে তা রক্ষার্থে শুটারকে নির্মোহকণ্ঠে আদেশ করলেন –
শুট অন হিস ফোরহেড। ফায়ার…
আজ ‘এক গুলিতে একজন আসামি’ নয় বরং ‘যত গুলির প্রয়োজন তত গুলিতে একজন আসামি’-নীতি অনুসৃত হবে। লাল হেলমেট-পরিহিত পিশাচ হৃদয়ের শুটারের হাত কী এক আবেগে আজ বারবার কেঁপে গেল!
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ –
কালো কাপড়ে চোখ বাঁধা থাকলেও পূর্ণনেত্রমেলা নাদিম দেখলেন একটা বুলেট এগিয়ে আসছে তার কপাল বরাবর…
এগিয়েই আসছে দীর্ঘ ষাটটি বছর!

১ thought on “দ্য ট্রায়াল

  1. অবশেষে গল্পটা পুরাপুরি পড়ার সুযোগ পেলাম। এক কথায় চমতকার হয়েছে। আপনার লেখা আমাকে সব সময়ই অভিভূত করে। একটা মানুষ যে কতটা হৃদয় দিয়ে লেখে সেটা আপনার লেখা পড়ে আমি অনুভব করতে পারি। এই যুগে খুব কম লেখক-ই আছে যারা এমন সুন্দর করে হৃদয় দিয়ে লেখে।