নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ অনুবাদকদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন

লেখক: সুমিতা চক্রবর্তী

অনুবাদের প্রয়োজন, পদ্ধতি ও সমস্যা নিয়ে অনেক কথা বলা  হয়েছে অনেকদিন ধরে। সেসব তত্ত্বকথায় এ-মুহূর্তে প্রবেশ করছি না। পাঠকদের কাছে কেবল তুলে ধরতে চাই কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অনুবাদ নিয়ে কয়েকটি দৃষ্টান্ত ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা।

প্রথম মহাযুদ্ধ থেকে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে ফিরে এসে নজরুল ইসলাম যখন সহজপ্রাপ্য সরকারি চাকরির কথা না ভেবে লেখালেখিতে মন দিলেন তখনই এক আশ্চর্য রাত্রিশেষে লেখা হয়ে গেল ‘বিদ্রোহী’। তারিখ একেবারে নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও ১৯২১-এর ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে। কবিতাটির প্রথম প্রকাশ নিয়ে একটি কৌতুককর ঘটনা আছে। অধিকাংশ পাঠকই জানেন হয়তো, তবু সংক্ষেপে উল্লেখ করা গেল।

ছাপার হরফের সাক্ষ্য ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রথমে প্রকাশিত হয়েছে মোসলেম ভারতে কার্তিক ১৩২৮ বঙ্গাব্দে (অক্টোবর-নভেম্বর ১৯২১); তার পরে প্রকাশিত হয়েছে বিজলীতে ২২ পৌষ, ১৩২৮ বঙ্গাব্দে (৬ জানুয়ারি ১৯২২)। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা হলো উলটো। মোসলেম ভারতের প্রকাশ ছিল অনিয়মিত। কার্তিক সংখ্যাটি প্রকাশ পেতে পেতে হয়ে গেল ফাল্গুন মাস (ফেব্রম্নয়ারি-মার্চ ১৯২২)। তার আগেই পাঠকের কাছে বিজলী-বাহিত হয়ে পৌঁছে গেছে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’। তাই নিয়ে অবশ্য মোসলেম ভারতের সম্পাদক কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায় না। আরো মজার কথা, বিজলীতে বলা হলো যে, কবিতাটি মোসলেম ভারত থেকে পুনর্মুদ্রিত। অথচ মোসলেম ভারত তখনো প্রকাশিতই হয়নি। সেটা বোধহয় ঠিক জানতেন না বিজলীর কর্তৃপক্ষ। নিজেদের প্রতিশ্রম্নতি অনুযায়ী সততার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন তাঁরা। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির পুনর্মুদ্রণ হলো আরো অনেক পত্রিকায় – প্রবাসী, মাঘ, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ (জানুয়ারি-ফেব্রম্নয়ারি ১৯২২); সাধনা, বৈশাখ ১৩২৯ বঙ্গাব্দ (এপ্রিল-মে, ১৯২২); ধূমকেতু (২২ আগস্ট ১৯২২)। কাজী নজরুল ইসলামের নামই হয়ে গেল ‘বিদ্রোহী কবি’।

‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়ার পর দিনে দিনে বর্ধিত হয়েছে কবিতাটির খ্যাতি। সেই জনপ্রিয়তা প্রসারিত হয়েছে বাংলা ভাষার পরিধি ছাপিয়ে অন্য ভারতীয় ভাষাভাষীদের কাছে।

বর্তমানে ভারতের বাইরেও। সেই পরিচিতির প্রধান বাহক হলো অনুবাদ। এই কবিতাটির অনেকগুলো অনুবাদ হয়েছে বিগত চার দশকে। নির্বাচন করে নিয়েছি ছয়টি নিদর্শন। মূল কবিতা এবং অনুবাদগুলোর অংশবিশেষ পাশাপাশি রেখে কয়েকটি প্রশ্ন তুলতে চাই। আগেই বলেছি – কবিতা অনুবাদের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা এই নিবন্ধে থাকছে না। থাকছে কেবল কয়েকটি দৃষ্টান্ত, কয়েকটি প্রশ্ন এবং সম্ভাব্য উত্তরসন্ধান।

\ এক \

মূল কবিতার অংশ :

বল  মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’

চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’

ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া

খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া

উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!

আমাদের প্রথম প্রশ্ন : কবি কি ‘বিশ্ব-বিধাত্রীর’ লিখেছিলেন? অথবা লিখেছিলেন ‘বিশ্ব-বিধাতৃর’? ‘বিধাত্রী’ শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ, ‘বিধাতৃ’ শব্দ পুংলিঙ্গ। বিশ্ববিধাতার নারীমূর্তি কবির সামনে ছিল, অথবা পুরুষমূর্তি! ঈশ্বর নিরাকার মেনে নিলেও ভাষার ব্যাকরণ মেনে শব্দ প্রয়োগ করতে হবে। বস্ত্তত শিল্প সৃষ্টির সমগ্র প্রক্রিয়াটিই হলো অনুবাদ। মনের ভাব-ভাবনা-উপলব্ধিকে অনুবাদ করতে হবে একটি রূপাবয়বে। শিল্পী প্রায়ই স্বকৃত সেই অনুবাদে অতৃপ্ত থাকেন। তাই এত পাঠান্তর দেখা দেয় ভাষা-শিল্পে; চিত্রশিল্পী সেজান (১৮৩৯-১৯০৬) ‘সেন্ট ভিক্টোয়ার’ পর্বতশীর্ষের ছবি আঁকেন – একটি-দুটি নয়, একশটির বেশি। নজরুল ইসলাম সম্ভবত ‘বিধাত্রী’ই লিখেছিলেন। বিজলী বা মোসলেম ভারত পত্রিকার সেই প্রথম সংখ্যা এখনকার গবেষকরা দেখতে পাননি। অগ্নি-বীণা কবিতা-সংকলনের অন্তর্গত হয়েছিল ‘বিদ্রোহী’। অগ্নি-বীণার প্রথম সংস্করণও দুষ্প্রাপ্য। পাওয়া গেছে দ্বিতীয় সংস্করণের (২৫ অক্টোবর ১৯২২) পাঠ। তাতে আছে ‘বিশ্ব-বিধাত্রী’। পরবর্তীকালে নজরুল ইসলামের যত রচনাবলি ও কবিতা-সংকলনে ‘বিদ্রোহী’ স্থান পেয়েছে তার সবগুলোতেই আছে ‘বিশ্ব-বিধাত্রী’। একটি ব্যতিক্রম। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে প্রকাশিত রচনাবলিতে সংকলিত অগ্নি-বীণার অন্তর্গত ‘বিদ্রোহী’তে আছে ‘বিধাতৃ’। তবু মূল প্রশ্নটি থাকে। কবির সামনে বিশ্বস্রষ্টা কি নারীরূপে দেখা দিয়েছিলেন, অথবা পুরুষরূপে? ভারতীয় হিন্দু দর্শনে এ নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। বিশ্বস্রষ্টা হলেন পুরুষ, আর ধরিত্রী হলেন  নারী। নিরাকার ঈশ্বরের কল্পনা আছে যে-সব ধর্মে তাঁরা একটু গোলমালে পড়ে যান মাঝে মাঝে। ইহুদি, খ্রিষ্টীয় ও ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বস্রষ্টা তবু পুরুষরূপেই বর্ণিত। ইসলাম ধর্মেও প্রধানত তা-ই। সেসব ভেবেই সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সংস্করণে ‘বিধাতৃ’ লেখা হয়েছে। কিন্তু নজরুল ইসলাম সম্ভবত লেখার সময়ে এই লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে ভাবিত হননি। স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দের ঝোঁকে যে-শব্দটি কলমে (মুজফ্ফর আহমদ লিখেছেন – পেন্সিলে) এসেছিল, সেটিই ব্যবহার করেছেন।

অনুবাদকরা কী লিখেছেন দেখা যাক :

\ ক \

পোয়েট্রি অব কাজী নজরুল ইসলাম ইন ইংলিশ ট্র্যান্সেস্নশন

ভল্যুম ওয়ান

এডিটেড বাই মোহম্মদ নুরুল হুদা

নজরুল ইনস্টিটিউট ফোর্থ রিভাইজড প্রিন্ট, মার্চ ২০১৪

ঢাকা।

অনুবাদক : কবীর চৌধুরী

The Rebel

Piercing the earth and the heavens,

Pushing through Almighty’s sacred seat

Have I risen,

I, The perennial wonder of mother-earth!

‘বিশ্ব-বিধাত্রী’ শব্দটিকে অনুবাদক করেছেন ‘মাদার আর্থ’ – যার অর্থ হলো ‘জননী ধরিত্রী’। ‘বিশ্ব’ শব্দে কিন্তু ‘ধরিত্রী’র চেয়ে ব্যাপ্ততর ব্যঞ্জনা সূচিত হয়। ‘জননী’ বা ‘মাতা’ শব্দটি মূল কবিতায় নেই। ‘বিধাত্রী’ বললে ‘জন্মদাত্রী’ বা ‘মাতা’ ঠিক বোঝায় না।

\ খ \

পূর্ব-উলিস্নখিত অনুবাদগ্রন্থ থেকে একই অংশের অনুবাদের আর একটি দৃষ্টান্ত।

অনুবাদক : আবদুল হাকিম

এই অনুবাদ পাঠ করতে গিয়ে প্রথমেই বিস্মিত হবেন পাঠক। প্রথম পঙ্ক্তির ‘বল বীর’কে ‘সে হিরো’ (Say Hero) বলে ভাষান্তর করার পরেই দ্বিতীয় পঙ্ক্তির ‘বল উন্নত মম শির’-এর ‘মম’ সর্বনামকে অনুবাদক করেছেন ‘দাই’ (thy) অর্থাৎ ‘তোমার’ বা ‘তব’। তারপর দেখি আগাগোড়া সমস্ত কবিতাটিতেই উত্তম পুরুষের সর্বনামকে অনুবাদক মধ্যম পুরুষের সর্বনাম ‘দাও’ (thou)-তে রূপান্তরিত করেছেন। সর্বত্রই ‘আমি’ হয়েছে ‘তুমি’। বিষয়টি যথেষ্টই ভাবায়। নজরুল ইসলাম কবিতা শুরু করেছেন মধ্যম পুরুষের সম্বোধনে – ‘বল’। তৃতীয় পঙ্ক্তি থেকে সরে এসেছেন ‘আমি’ সর্বনামে। তারপর কবিতাটি শেষ পর্যন্ত উত্তম পুরুষের বাচনেই লিখিত। প্রথম দুই পঙ্ক্তির উদ্দিষ্ট ‘তুমি’ প্রকৃতপক্ষে নিজের সত্তাকেই সম্বোধন – এমন ধরে নেওয়াই স্বাভাবিক। কবির লক্ষ্য নিজের বিদ্রোহী স্বরূপকেই প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু অনুবাদক আবদুল হাকিম পুরো কবিতায় ওই ‘তুমি’ সম্বোধনই বজায় রেখেছেন। আগাগোড়াই কবিতার কথকরূপে তিনি কি নজরুল ইসলাম ছাড়া আর কাউকেই ভাবতে পারেননি? আর কী হতে পারে এই মূলানুগতা থেকে সরে আসার কারণ?

Across the Great Throne of Eternal God,

Thou dost stand, a wonder of the whole                                                                   creation!

‘বিশ্ব-বিধাত্রী’ শব্দটিকে আবদুল হাকিম করেছেন ‘হোল ক্রিয়েশন’ (whole creation)। ‘নর’ অথবা ‘নারী’ বলে চিহ্নিত করা যায় এমন শব্দ ব্যবহার করেননি। তবে ‘বিশ্ব-বিধাতা’ অথবা ‘বিশ্ব-বিধাত্রী বললে বিশ্ব-স্রষ্টা তথা বিশ্বের ‘নিয়ন্ত্রক’ অর্থটি প্রাধান্য পায়। ‘সম্পূর্ণ বিশ্ব’ বা ‘হোল ক্রিয়েশন’ বোঝায় না।

\ গ \

কাজী নজরুল ইসলাম : সিলেক্টেড ওয়র্কস

এডিটর : সাজেদ কামাল

নজরুল ইন্স্টিটিউট

কবি ভবন ২০০০

ঢাকা।

অনুবাদক : সাজেদ কামাল

The Rebel

Have I risen – I, the eternal wonder

Of the creator of the universe.

উদ্দিষ্ট পঙ্ক্তি – ‘উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর’। অনুবাদক দুটি পঙ্ক্তিতে ভেঙে লিখেছেন। ‘চির-বিস্ময়’ হয়েছে ‘ইটারন্যাল ওয়ান্ডার’; ‘বিশ্ব-বিধাত্রী’ হয়েছে ‘ক্রিয়েটর অব দি ইউনিভার্স’। ইংরেজি ভাষায় উভলিঙ্গ ব্যক্তিবাচক শব্দের পরিমাণ প্রচুর। সংস্কৃত ও সাধু বাংলায় ব্যক্তিবাচক শব্দকে লিঙ্গসূচক অবয়বে নির্মাণ করার প্রবণতা বেশি। সাজেদ কামালের শব্দ নির্বাচনে ‘ক্রিয়েটর’ শব্দটির দ্বারা সমস্যার সমাধান হয়েছে।

\ ঘ \

দ্য রিবেল অ্যান্ড আদার পোয়েমস্

কাজী নজরুল ইসলাম

সাহিত্য অকাদেমি, নিউ দিলিস্ন

এডিশন : ১৯৯৮

অনুবাদক : বসুধা চক্রবর্তী

‘উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর’ পঙ্ক্তিকে করা হয়েছে –

The Rebel

And rise ever higher

To the eternal surprise of the Ruler of the                                                                       Universe.

‘রুলার অব্ দি ইউনিভার্স’ বলাতে এখানেও লিঙ্গভেদের প্রশ্ন দেখা দেয়নি। ইংরেজি ভাষায় উভলিঙ্গ শব্দের শক্তি ও সুবিধার দিকটি আবারো লক্ষিত হয়।

বিশ্ব-বিধায়ক অর্থে ‘রুলার’ শব্দটি ‘ক্রিয়েটর’ শব্দের চেয়ে মূল শব্দার্থের বেশি কাছাকাছি – এমনও মনে হয়।

\ ঙ \

নজরুল ইসলামের কবিতার প্রথম নির্বাচিত সংকলন সঞ্চিতা ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের সরকারি মহলে সংকলনটির অন্তর্গত একাধিক কবিতা ‘রাজদ্রোহমূলক’ – এই অভিযোগ ওঠে ১৯৩৫-এ। এ-বিষয়ে অনেক চিঠি-চালাচালি হয়েছিল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বিরুদ্ধেই ছিল প্রধান অভিযোগ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উচ্চতর আধিকারিকবর্গ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, বহু পুরাণ-অনুষঙ্গের প্রতীক ও চিত্রকল্পের সমন্বয়ে রচিত এই কবিতায় প্রত্যক্ষভাবে সরকারবিরোধী কোনো মন্তব্য নেই। সেজন্য অগ্নি-বীণাসঞ্চিতা – কোনোটিই বাজেয়াপ্ত হয়নি। সেই সময়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বিষয়বস্ত্ত ইংরেজিভাষী শ্বেতাঙ্গ প্রশাসকদের জ্ঞাত করার জন্য কবিতাটির একটি ইংরেজি সারসংক্ষেপ সরকারি ফাইলে পাওয়া যায়। গদ্যে লিখিত এই সারসংক্ষেপ কে করেছিলেন তার কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু এই লিখনটিকে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ইংরেজি গদ্যানুবাদ বলে গ্রহণ করতে পারি। এই নাম-না-জানা, বঙ্গভাষী সরকারি কর্মী তথা কবিতা পাঠকের অনুবাদটি এখানে তুলে ধরা হলো। এই লিখনটি সংকলিত হয়েছে ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বই নামক বহুমূল্য এক গবেষণাগ্রন্থে (আনন্দ, প্রথম সংস্করণ ১৯৮৮; তৃতীয় মুদ্রণ-২০০৯)। লেখক শিশির কর।

ইন রিভোল্ট

প্রথম স্তবকের গদ্য ভাষান্তর :

In Revolt

Say hero – Say my head is held high! looking at my head, (even) the peaks of the Himalayas hang down their heads. Say hero – say that bursting open the great firmament of the immense universe, leaving behind the moon, the sun, the planets and the stars, piercing through the earth, the celestial region and the golak (abode of Vishnu) cut through the throne of God I appear as the object of eternal wonder on the part of the creator of the universe! On my brow lights the divine Rudra the mark of exalted royalty of radiant victory. Say hero – I stay with my head always held aloft.

এখানে ‘বিশ্ব-বিধাত্রী’কে ‘ক্রিয়েটর অব্ দি ইউনিভার্স’ করা হয়েছে।

\ চ \

সবশেষে একটি হিন্দি অনুবাদ প্রদত্ত হলো।

নজরুল : বিবিধ প্রসঙ্গ

অনুবাদ, সংগ্রহ অওর সম্পাদনা

ড. জলজ ভাদুড়ী

প্রকাশক : দুপ্তে দুপ্তে প্রা. লি.

প্রথম সংস্করণ : জানুয়ারি ২০০২

‘হম উভর আত্র হ্যাঁয় বিশ্ব প্রসবিনী

কো কর চকিত বিস্মিত।’

এখানে অনুবাদক স্পষ্টতই ‘বিধাত্রী’ শব্দটিকে ‘জন্মদায়িনী’ নারীরূপেই গ্রহণ করেছেন।

যে-ছয়টি অনুবাদের সাহায্যে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার একটি পঙ্ক্তির অনুবাদের বিভিন্নতা দেখানো হলো, এই ছয়টি অনুবাদের সাহায্যেই এই কবিতার আরেকটি অংশের অনুবাদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি।

মূল কবিতায় আছে –

তাজি    বোর্রাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার

                          হিম্মৎ-হ্রেষা হেঁকে চলে।

প্রথমে পঙ্ক্তি-উদ্ধৃত চারটি শব্দ ও শব্দবন্ধের অর্থ স্পষ্ট করা যেতে পারে। যদিও অনেকেই জানেন, তবু।

তাজি : আরবি শব্দ। অর্থ উৎকৃষ্ট, বেগবান, তেজস্বী অশ্ব। কবি স্বয়ং কবিতাটি মুদ্রিত হওয়ার সময়ে কবিতাটির শেষে শব্দার্থ লিখে দিয়েছিলেন ‘ঘোড়া’। আবার ‘তাজ’ শব্দের অর্থ মুকুট, শিরোভূষণ। ‘তাজি’ শব্দের আরো একটি অর্থ হতে পারে মুকুট পরিহিত। নজরুল ইসলাম দুটি অর্থেই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন মনে করার কারণ আছে। ভারতীয় কাব্যশৈলীর ভাষায় এই শব্দালংকারের নাম ‘শেস্নষ’।

বোর্রাক : ‘তাজি’ শব্দের পরই ‘বোর্রাক’ শব্দটি প্রযুক্ত। বোর্রাক হলো কোরান-বর্ণিত দিব্য যান। কোথাও কোথাও একে দিব্য অশ্ব হিসেবেও কল্পনা করা হয়েছে যার তার দেহ অশ্বের, কিন্তু মুখম-ল মানুষের। অত্যন্ত কমনীয়, প্রায় নারীর মতো। উপরন্তু বোর্রাকের মাথায় মুকুট।

নজরুল ইসলাম ‘তাজি’ শব্দে একই সঙ্গে ‘তেজস্বী অশ্ব’ এবং ‘তাজ পরিহিত’ – দুটি অর্থই বুঝিয়েছিলেন – এমন অনুমান অসংগত নয়।

উচ্চৈঃশ্রবা : পুরাণে কথিত আছে ঋষি দুর্বাসা একবার একটি পুষ্পমাল্য হাতে পথে চলার সময়ে সামনে হসত্মীপৃষ্ঠে দেবরাজ ইন্দ্রকে দেখতে পান। হাতের মালাটি তিনি ইন্দ্রের দিকে ছুড়ে দিলে ইন্দ্র সেটি লুফে নিয়ে হাতির মাথায় পরিয়ে দেন। ঋষি-প্রদত্ত মালা নিজে ধারণ না করে হাতিকে পরিয়ে দিলে দুর্বাসা অপমানিতবোধ করেন এবং অভিশাপ দেন – স্বর্গ শ্রী-ভ্রষ্ট হবে। ‘শ্রী’ অর্থাৎ দেবীলক্ষ্মী সেই অভিশাপে স্বর্গ ছেড়ে চলে যান সমুদ্রের তলায়। তাঁকে ফিরিয়ে আনার প্রয়াসেই সমুদ্র-মন্থনের আয়োজন করা হয়। সেই মন্থনের ফলে সমুদ্রতল থেকে লক্ষ্মীর সঙ্গেই অমৃতসহ দেব-চিকিৎসক ধন্বন্তরী এবং অন্য বস্ত্ত ও প্রাণীসমূহের সঙ্গে আবির্ভূত হয় শ্বেতবর্ণের অশ্ব উচ্চৈঃশ্রবা। ইন্দ্র তাকে নিজের বাহনরূপে গ্রহণ করেন।

হিম্মৎ হ্রেষা : ‘হিম্মৎ’ আরবি শব্দ। অর্থ শক্তি, সাহস, মনোবল। ‘হ্রেষা’ সংস্কৃত শব্দ। অর্থ ঘোড়ার ডাক। আরবি ও সংস্কৃত শব্দের মিশ্রণে এই অনুপ্রাস-ঝংকৃত সমাসবদ্ধ পদটি নজরুল ইসলামের একটি সুন্দর সৃষ্টি।

উলিস্নখিত পঙ্ক্তিটির অনুবাদ এই ছয়জন অনুবাদক কীভাবে করেছেন তা আমরা দেখব। পূর্ব-লিখিত উৎস-সংকলনগুলো একই থাকছে। পূর্ব-বিন্যস্ত ক্রমও অনুসৃত হলো। কেবল অনুবাদকের নাম ও অনূদিত পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে আমাদের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য পেশ করব।

\ ক \

Traversing the earth and the sky.

The mighty borrak is the horse I ride.

It neighs impatiently, drunk with delight!

অনুবাদক : কবীর চৌধুরী

প্রথমত, উচ্চৈঃশ্রবার নাম বা প্রসঙ্গ অনুবাদে নেই। দ্বিতীয়ত, ‘তাজি বোর্রাক’ অংশের অনুবাদ করা হয়েছে ‘মাইটি বোর্রাক’। ‘বোর্রাক’ যে ঘোড়া তা ‘হর্স’ শব্দে বোঝানো হয়েছে কিন্তু ‘মাইটি’ বা শক্তিমান অর্থ নজরুল ইসলাম নির্দেশ করেননি। ‘তাজ পরিহিত অশ্ব’ – মূল কবিতায় এমন ব্যঞ্জনাই আছে। বোর্রাক যে শক্তিমান বা শক্তিমতী তা ধরে নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু ‘তাজি’ অর্থে শক্তিমান বা ‘মাইটি’ বোঝায় না। অনুবাদক কি ‘তাজি’ শব্দের অর্থ ‘তেজি’ অর্থাৎ তেজবিশিষ্ট ধরে নিয়েছিলেন? তৃতীয়ত, ‘হিম্মৎ-হ্রেষা’র অনুবাদে ‘ইমপেশেন্টলি’ এবং ‘ডিলাইট’ অর্থাৎ ‘অধৈর্যভাবে’ এবং ‘উল্লাস’ শব্দ দুটি সংযোজন করেছেন অনুবাদক। কিন্তু মূল কবিতায় এই ব্যঞ্জনা নেই। তবে ‘হিম্মৎ’-এর অর্থটি ‘মাইটি’ শব্দে সঞ্চারিত হয়েছে।

\ খ \

No less than the prophet’s heavenly Borrak, and

                                                          Indra’s

                    winged Uchbhaisrava, is thy

                    matchless steed embodied in thine                                                                   own self.

অনুবাদক : আবদুল হাকিম

‘তাজি’ অর্থে ঘোড়া – এই উল্লেখ নেই আবদুল হাকিমের অনুবাদে। পরিবর্তে তিনি ‘বোর্রাক’ শব্দের আগে যুক্ত করেছেন ‘প্রফেট্-স’ এবং ‘হেভেনলি’ শব্দ দুটি। ‘নবি-র’ এবং ‘স্বর্গীয়’ – এই বলে ‘বোর্রাকে’র পরিচয় দেননি নজরুল ইসলাম, কিন্তু অনুবাদক তা জরুরি মনে করেছেন। উচ্চৈঃশ্রবার ক্ষেত্রেও অনুবাদক জানিয়ে দিয়েছেন যে সে ইন্দ্রের সম্পত্তি এবং ডানাযুক্ত – ‘উইঙ্গ্-এড্’। বোর্রাক আর উচ্চৈঃশ্রবা – দুজনেই যে ঘোড়া – যা মূল কবিতায় ‘তাজি’ শব্দে বলে দেওয়া হয়েছে তার অনুবাদ আছে ‘স্টিড’ (steed) শব্দে। ‘হিম্মৎ-হ্রেষা’র অনুবাদ নেই। ‘বাহন আমার’ অংশেরও ঠিক অনুবাদ করা হয়নি। ‘এমবডিড্ ইন দাইন ওন সেলফ’কে বাহন বলা যায় না।

\ গ \

Like a tempest

I traverse the haven and earth

riding Uchchaishraba and the mighty Borrak.

অনুবাদক : সাজেদ কামাল

সাজেদ কামালের অনুবাদ সরল ও সংক্ষিপ্ত। ‘বোর্রাক’ ও ‘উচ্চৈঃশ্রবা’ যে ঘোড়া তা বোঝানো হয়েছে ‘রাইডিং’ ক্রিয়াপদের সাহায্যে। এখানেও অনুবাদক ‘তাজি’ শব্দের অনুবাদে ‘মাইটি’ – ‘শক্তিমান’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। ‘হিম্মৎ-হ্রেষা’র অনুবাদ নেই। হয়তো ‘মাইটি’ শব্দে ‘হিম্মৎ’-এর কিছুটা ব্যঞ্জনা আছে। কিন্তু ‘হিম্মৎ’ শব্দের অর্থ গায়ের জোর নয়। প্রধানত এই শব্দে ‘সাহস’ বোঝায়, এখানে সাহস ও শৌর্যের সমন্বয়।

\ ঘ \

I rush, fleet as storm, clapping my hands that                                                                           hold heaven

        and earth –

My carriers, the spirited Borrak and                                                                  Uchchaisrava,

       sprint with challenging neighs!

অনুবাদক : বসুধা চক্রবর্তী

‘তাজি’র অর্থ এই অনুবাদে করা হয়েছে ‘স্পিরিটেড’। ‘হিম্মৎ-হ্রেষা’র নিকটবর্তী অনুবাদ বসুধা চক্রবর্তীই করেছেন – ‘চ্যালেঞ্জিং নেইজ’, বাহন অর্থও ‘ক্যারিয়ার’ শব্দে পরিস্ফুট।

\ ঙ \

I rush like a storm clapping hands; the heaven                                              and the earth as hands.

The Arab Burraq and Uccahaisrava are my             mounts, neighing with courage they speed on!

সরকারি নথির গদ্য-লিখনের অনুবাদ

অনুবাদক : অজ্ঞাত

‘তাজি’ শব্দের স্বতন্ত্র অনুবাদ এখানেও নেই। তবে ‘তাজি’ যে ঘোড়া তার ইঙ্গিত আছে ‘মাউন্ট’ ক্রিয়াপদে। ‘নেইং উইথ্ কারেজ’ ‘হিম্মৎ-হ্রেষা’র চমৎকার অনুবাদ। ‘হিম্মৎ’ শব্দের অর্থ ‘কারেজ’ শব্দে যথাযথ ফুটে ওঠে। এই অনুবাদক ‘বোর্রাক’ শব্দের আগে ‘আরব’ শব্দটি যোগ করেছেন – সম্ভবত সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংযোগ বোঝাবার জন্য। কিন্তু উচ্চৈঃশ্রবার ক্ষেত্রে তেমন কিছু করা দরকার মনে করেননি। ঔপনিবেশিক প্রভুরা ইসলামি সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ সম্পর্কে হিন্দু সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের চেয়ে কিছু কম জানতেন কি?

\ চ \

ম্যয় অপনা বাহন বোর্রাক অওর উচ্চৈঃশ্রবা কো পিছে ছোড়/ হিম্মৎ ভরে পুকারসে আগে বঢ়তা জাতা হুঁ।

অনুবাদক : জলজ ভাদুড়ী

‘তাজি’ শব্দের অনুবাদ নেই। ‘বোর্রাক’ আর ‘উচ্চেঃশ্রবা’ যে ঘোড়া তা বোঝার উপায় নেই। অবশ্য ‘বাহন’ শব্দটি আছে। কিন্তু মূল কবিতার পঙ্ক্তির যথাযথ অর্থ অনুবাদে আসেনি। অনুবাদক যা লিখেছেন তার যথার্থ বঙ্গানুবাদ হবে – ‘আমি নিজের বাহন বোর্রাক  আর উচ্চৈঃশ্রবাকে পিছনে ফেলে হিম্মৎভরা ডাক দিয়ে আগে এগিয়ে চলি।’ কিন্তু নজরুল ইসলাম এরকম বাক্য লেখেননি। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আরো কয়েকটি অনুবাদ দেখেছি। বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য সব অনুবাদেই আছে। তবে ‘তাজি’ শব্দের ‘তাজ-শোভিত’ অর্থ কেউই করেননি। ‘ঘোড়া’ অর্থটিই করেছেন। আমি কিন্তু তাজ-পরিহিত ‘বোর্রাকে’র ছবি ভুলতে পারি না। উলিস্নখিত ছয়টি দৃষ্টামেত্ম এসব পার্থক্যের কিছুটা বোঝা যাবে। এই নিবন্ধের পাঠকেরাও হয়তো বিভিন্ন অভিমত লালন করবেন। একালের সাহিত্য-বিশেস্নষণে ‘পাঠক প্রতিক্রিয়া’ একটি সবিশেষ গৃহীত পদ্ধতি। এই পদ্ধতির উদাহরণরূপে অনুবাদ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: