নজরুল-সাহিত্য : প্রান্তজনকথা

লেখক: বিশ্বজিৎ ঘোষ

ঘ. পুরুষতান্ত্রিকতার দাপটে ক্ষতবিক্ষত অধস্তন নারীগোষ্ঠী।

লক্ষ করলেই দেখা যাবে, নজরুলসাহিত্যে অধস্তন বঞ্চিতদলিত ও প্রান্তবাসী চতুর্মাত্রিক এই জনগোষ্ঠীর কথাই তীব্রভাবে উচ্চারিত হয়েছে। নিম্নবর্গ হিসেবে, প্রান্তজন হিসেবে নজরুল কখনো বিস্মৃত হননি নিজের অবস্থান এবং কখনো পরিত্যাগ করেননি সে-জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতা। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের শ্রদ্ধা ও প্রীতির সম্পর্কের কথা মনে রেখেও আমরা ভুলতে পারি না ‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ’ রচনার কথা, যেখানে কবি নজরুল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন তাঁর প্রান্তজনপ্রীতির কথা, নিম্নবর্গের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের কথা :

কী ভীষণ দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে অনশনে অর্ধাশনে দিন কাটিয়ে আমাদের নতুন লেখকদের বেঁচে থাকতে হয় – লক্ষ্মীর কৃপায় কবিগুরুর তা জানা নেই। ভগবান করুন তাঁকে যেন জানতে না হয়। তিনি যদি আমাদের মত সাহিত্যিকের কুটিরে প্রবেশ করতেন, তাহলে দেখতে পেতেন – আমাদের জীবনযাত্রার দৈন্য কত ভীষণ।

(‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ’)

সমকালে, কেবল নিম্নতলে অবস্থানের কারণে, নজরুলকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল অ-কবির দলে। ‘আমার কৈফিয়ত’ পাঠ করলে অনুধাবন করা সম্ভব একজন অন্ত্যেবাসী কবির প্রতি সমকালের তাচ্ছিল্যের মাত্রা। উচ্চবর্গের দৃষ্টিকোণ থেকে ওই কবিতায় কবি নজরুল নিজেকে তুলে ধরেছেন এভাবে :

কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা পড়ে শ্বাস ফেলে! বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে।

পড়ে না ক’ বই, বয়ে গেছে ওটা!

কেহ বলে বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা!

…     …     …

ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নন। বেলা বয়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন!

…     …     …

প্রার্থনা ক’রো – যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!

(‘আমার কৈফিয়ত’)

– উদ্ধৃতাংশ থেকে এ-কথা সুস্পষ্টভাবেই বলা যায়, নজরুল নিজেকে নিম্নবর্গের অন্ত্যেবাসী মানুষের দলভুক্ত করেছেন – তাত্ত্বিকভাবে নয়, আত্মিকভাবেই।

‘গণবাণী’র সঙ্গে ‘লাঙল’-এর একীভূত হওয়ার সূত্রে ‘শ্রীযুক্ত তারারা’র কটাক্ষের জবাব দিতে গিয়ে নজরুল যা লিখেছেন, তাতেই ধরা পড়ে রাজনৈতিক নিম্নতলের প্রতি তাঁর সমর্থনের কথা। নজরুল লিখেছেন : ‘এই কৃষক-শ্রমিক দলটা (বঙ্গীয় কৃষক শ্রমিক দল) তুলসীবাবু নলিনীবাবুর মত ধনিক শ্রেণির নেতার দ্বারা গঠিত নয়। গঠন করলে কারা? না, যতসব বিভিন্ন জেলার সত্যিকারের মজুর, ক্ষয়কেশো হাড়-চামড়া বের করা, আধ-ল্যাংটা বেগুন-সিদ্ধ মত মুখওয়ালা চাষা-মজুর। আর তাদের নেতাগুলোও তদ্রƒপ – না আছে চাল, না আছে চুলো। তাতে বলশেভিক ষড়যন্ত্রের আসামি সব।’ কবির বন্ধু ও সহযোদ্ধা মুজফ্ফর আহমদ গণবাণী বের করতে কী কঠিন সমস্যায় পড়েছিলেন, তাও এ-প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়। নজরুল লিখেছেন : ‘আমি হলফ করে বলতে পারি, মুজফ্ফরকে বাংলার সামাজিক স্তরবিন্যাসে কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) অবস্থান ছিল ‘তলের তলে’ (bottom of the bottom)। সৈয়দ বংশোদ্ভূত নজরুলের পূর্বপুরুষ যে-পেশা হিসেবে কাজী-বৃত্তি গ্রহণ করেছিল এবং পরবর্তীকালে কাজী বংশ নিয়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিল, তার প্রেক্ষাপটেও আছে ওই ‘তলের তলে’র আভাস। কাজী নজরুলের পরিবার আর্থিকভাবে যে সচ্ছল ছিল না, সে-কথা আমাদের অবিদিত নয়। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় মুজফ্ফর আহমদের এই ভাষ্য : ‘কেউ কেউ … লিখেছেন যে নজরুল

স্কুল-পালানো ছেলে ছিল। এটা … সত্য হতে পারে না। কারণ, যে ছেলের বাপ-মার পয়সা আছে সে ছেলেই স্কুল পালাতে পারে। নজরুলের বাপ-মার পয়সা ছিল না। পড়ার আগ্রহ নিয়ে নিজেই সে স্কুল খুঁজে বেড়াচ্ছিল, পয়সা নেই বলে স্কুলগুলিই তার নিকট হতে পালিয়ে যাচ্ছিল’ (মুজফ্ফর আহমদ ১৯৮১ : ৪১)। কাজী নজরুল ইসলাম যে শৈশবে মসজিদে ইমামতি করেছিলেন বা মক্তব খুলেছিলেন, তারও প্রধান কারণ ছিল আর্থিক অসহায়তা। বেতন দিতে না পারাই ছিল তাঁর ঘন ঘন স্কুল পরিবর্তনের প্রধান কারণ। স্কুল থেকে প্রাপ্ত জলপানির অর্থের একটা অংশ যে সংসার খরচের জন্য অনুজের হাতে তুলে দিতেন নজরুল, সে-কথাও আমাদের অজ্ঞাত নয়।

কাজী নজরুল ইসলামের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা যে কতটা খারাপ ছিল, তা ভিন্ন একটা অনুষঙ্গ থেকেও বোঝা যায়। ১৩৪৭ বঙ্গাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ঈদ সম্মেলনে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণে নজরুল জানান, তিনি ছিলেন  ‘ক্লাসের ফার্স্ট বয়’। হেডমাস্টারের বড় আশা ছিল – ‘আমি স্কুলের গৌরব বাড়াব’। কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষা না দিয়ে তিনি যোগ দিলেন প্রথম মহাযুদ্ধে। যুদ্ধে যোগদান নজরুলের প্রগতিবাদী সামাজিক চেতনার অন্তঃপ্রেরণা হলেও এর পেছনে যে অর্থোপার্জন ও নিজ পরিবারের দারিদ্র্য দূরীকরণের ভাবনা কাজ করেছে, তাও অনুমান করা সম্ভব।

 

অতএব, বোঝা যায়, বাংলার সামাজিক স্তরবিন্যাসে নজরুল ছিলেন প্রান্তবাসী, তাঁর অবস্থান ছিল নিম্নবর্গে। লেখা বাহুল্য, নিম্নবর্গ প্রত্যয়টিকে আমরা ভারতীয় জাতি-বর্ণ (caste-system) ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করিনি; আমাদের দৃষ্টিকোণে

আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনাই মুখ্য বিষয়। আন্তোনিও গ্রামশির ÔSelections from the Prison NotebooksÕ (1971) (১৯৭১) থেকে নিম্নবর্গ বা প্রান্তজন সম্পর্কে আমরা যে-ধারণা লাভ করি, যে-ধারণা পাই রণজিৎ গুহ কিংবা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের লেখায়, তা থেকে বলা যায়, নানামাত্রিক ক্ষমতা ও মর্যাদা ও শক্তির বিপ্রতীপ প্রান্তে যাদের অবস্থান, তারাই নিম্নবর্গ বা প্রান্তজন। যারা কেন্দ্রচ্যুত, চর্যাপদকর্তার ভাষায় যারা নগর-বাহিরের ডোম্বী, যারা প্রভুত্ব, কর্তৃত্ব, শাসন ও প্রতাপের বিপরীতে অধীন দলিত, শোষিত ও নিপীড়িত – তারাই নিম্নবর্গ, তারাই প্রান্তজন। এই দৃষ্টিকোণে প্রান্তজন হিসেবে আমরা শনাক্ত করতে পারি নিম্নোক্ত জনগোষ্ঠীকে :

ক. সামাজিক পদমর্যাদায় নিচু বা সাধারণ স্তরের জনগণ;

খ. পেশা, পদ, পদবিগত দিক থেকে অধস্তন জনগোষ্ঠী;

গ. কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার দিক থেকে গৌণ জনগোষ্ঠী; এবং

দেখলে লোকের শুষ্ক চক্ষু ফেটেও জল আসবে। … এমন অনেক মুসলমান নেতা আজ এই সাম্প্রদায়িক হুড়োহুড়ির ও যুগের হুজুগের সুযোগ নিয়ে গুছিয়ে নিলে, শুধু মুজফ্ফর দিনের পর দিন অর্ধাশনে অনশনে ক্লিষ্ট হয়ে শুকিয়ে মরছে। আমি জানি, এই গণবাণী বের করতে তাকে দুটো দিন কাঠে কাঠ অনশনে কাটাতে হয়েছে।’

নিম্নবর্গের প্রতি ভালোবাসা, প্রান্তজনের প্রতি দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার থেকে নজরুল কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ। চৌরিচোরার ঘটনার প্রেক্ষাপটে মহাত্মা গান্ধী যখন অসহযোগ আন্দোলন থেকে প্রত্যাহার করে নেন নিজের সমর্থন, তখন ব্যথিত হন নিম্নবর্গের কবি নজরুল। উচ্চবর্গের প্রতি গান্ধীর সমর্থনের বিপ্রতীপে নজরুল স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দেন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, তাঁর প্রান্তজনপ্রীতির কথা – বস্তুত যা তাঁর সাহিত্যেরই প্রধান সুর। গান্ধীর ভূমিকা কটাক্ষ করে নজরুল লেখেন :

কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,

স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!

…   …    …

আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!

কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস

এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!

টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।

(‘আমার কৈফিয়ত’)

‘বিদ্রোহী’ কবিতায়ে দেখা যায়, উৎপীড়িত বা প্রান্তজনের জন্যই কবির বিদ্রোহ। পালাবদলকারী এই কবিতায় নজরুল স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করেন : ‘আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর।/ আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,/ আমি অবমানিতের মরমবেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের’ (‘বিদ্রোহী’)। অগ্নিবীণা কাব্যের রোমান্টিক আমি, বিষের বাঁশী-সাম্যবাদী-সর্বহারা কাব্যে প্রান্তজনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ‘আমরা’র ভুবনে। বিশ্ব-প্রান্তজনের অকৃত্রিম বন্ধু নেলসন ম্যান্ডেলা যেমন বলেন : ÔA person is a person through other personsÕ কিংবা ÔI am because we are.Õ – তেমনি নজরুলও প্রান্তিক মানুষের সান্নিধ্যে এসে আমিময়তার ভুবন ছেড়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ‘আমরা’র ভুবনে। এ কারণেই কাব্যের নাম রাখেন তিনি সাম্যবাদী কিংবা সর্বহারা – এ কারণেই তিনি কবিতার নাম রাখেন ‘কুলি-মজুর’, ‘রাজা-প্রজা’, ‘নারী’, ‘বারাঙ্গনা’, ‘মানুষ’, ‘কৃষাণের গান’, ‘শ্রমিকের গান’, ‘ছাত্রদলের গান’, ‘ধীবরদের গান’, ‘জাতের বজ্জাতি’, ‘চরকার গান’, ‘অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত’, ‘দুঃশাসনের রক্ত-পান’ ইত্যাদি। এসব নাম নির্বাচনের অন্তঃপ্রেরণা যে নজরুলের প্রান্তজনপ্রীতি – তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। নিষ্ঠ প্রান্তজনপ্রীতির কারণেই নজরুল উচ্চারণ করেন প্রত্যয়দীপ্র এসব পঙ্ক্তি :

ক.          প্রজা হয় শুধু রাজ-বিদ্রোহী, কিন্তু কাহারে কহি,

অন্যায় ক’রে কেন হয় না ক’ রাজাও প্রজাদ্রোহী।’

…   …   …

কালের চরকা ঘোর,

দেড়শত কোটি মানুষের ঘাড়ে – চড়ে দেড়শত চোর।

এ আশা মোদের দুরাশাও নয়, সেদিন সুদূরও নয় –

সমবেত রাজ-কণ্ঠে যেদিন শুনিব প্রজার জয়।

(‘রাজা-প্রজা’)

খ.           আসিতেছে শুভদিন,

দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, সুধিতে হইবে ঋণ।

হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,

পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,

তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,

তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;

তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,

তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!

(‘কুলি-মজুর’)

প্রান্তজনের নব-উত্থান বাসনায় নজরুল গভীরভাবে বিশ্বাস রেখেছেন কৃষকের ওপর, শ্রমিকের ওপর, খেটে-খাওয়া শোষিত-বঞ্চিত লোকসমাজের ওপর। অন্ত্যেবাসীর উত্থানের জন্য শ্রমিকদের ডাক দিয়ে নজরুল উচ্চারণ করেন এই দীপিত চরণগুচ্ছ :

যত   শ্রমিক শু’ষে নিঙ্ড়ে প্রজা

রাজা-উজির মারছে মজা,

আমরা মরি বয়ে তাদের বোঝা রে।

এবার জুজুর দল ঐ হুজুর দলে

দলবি রে আয় মজুর দল!

র্ধ হাতুড়ি, তোল্ কাঁধে শাবল ॥

(‘শ্রমিকের গান’)

 

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায়, প্রকৃত প্রস্তাবেই, নারী হচ্ছে তলের তল। তার অর্থ এই – নারীর অবস্থান কেন্দ্রে নয়, প্রান্তে। নজরুল তাঁর সাহিত্যে প্রান্তিক নারীকে নিয়ে আসতে চেয়েছেন কেন্দ্রের ভূগোলে। নজরুল নারীকে প্রাকৃতিক লৈঙ্গিক পরিচয়ে না দেখে, দেখেছেন সামাজিক জেন্ডার দৃষ্টিকোণে। সন্দেহ নেই, এই দৃষ্টিভঙ্গি অন্ত্যেবাসী নিম্নবর্গের প্রতি নজরুলের অঙ্গীকারের স্বকীয় এক মাত্রা। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, ‘বারাঙ্গনা’ কিংবা ‘নারী’ কবিতার কথা। এই কবিতাদ্বয়ে প্রান্তিক নারীর প্রতি নজরুলের সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি এং সামূহিক জাগরণ-বাসনা ব্যক্ত হয়েছে :

ক. ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মত আয় না পাতাল ফুড়ি,

আঁধারে তোমার পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি।

পুরুষ যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে

লুটায়ে পড়িবে ও চরণ তলে দলিত যমের সাথে!

এতদিন শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে

যে হাতে পিয়ালে অমৃত, সে হাতে কূটবিষ দিতে হবে।

(‘নারী’)

 

খ.           কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে?

হয়ত তোমার স্তন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে।

নাই হ’লে সতী তবু ত তোমরা মাতা-ভগিনীরই জাতি;

তোমাদের ছেলে আমাদেরই মত, তারা আমাদের জ্ঞাতি।

(‘বারাঙ্গনা’)

 

দুই

কবিতার মতো প্রবন্ধেও কাজী নজরুল ইসলাম প্রকাশ করেছেন তাঁর প্রান্তজনপ্রীতির কথা। ‘লাঞ্ছিত’ প্রবন্ধে নজরুল লিখেছেন : ‘লক্ষ লোকের অন্নসংস্থানের সর্বনাশ করিয়া চারিশত লোক ধনী হইলেন এবং বিলাসব্যসনে অর্থব্যয় করিলেন। … উকিল দেখিতেছে মক্কেলের কত খাওয়া যায়। মহাজন দেখিতেছে দেনাদারের ভিটেমাটিকে কি করিয়া নেওয়া যাইতে পারে, ভদ্রলোক ভাবিতেছে ঢং দেখাইয়া কত বোকা ঠকানো যাইতে পারা যায়। কেউবা বুদ্ধি বিক্রয় করিতেছেন, কেউবা দেশনীতির মেলা খুলিয়া বসিয়া আছেন। সবাই কে কার মাথা খাইবেন ভাবিয়া অস্থির। পরের ভাবনা ভাবিবার তিলমাত্র সময় নাই। এই যে সারাদিন এত ব্যস্ততা সে শুধু কি করিয়া দুর্বলকে পেষণ করিয়া আর একটু বড় সঞ্চয় করা যায় তাহার চেষ্টায় নিমিত্ত।’

নজরুলের চোখে ধরা পড়ে প্রান্তজনের প্রতি উচ্চবর্গের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও বি-মানবিক আচরণ। প্রান্তজনের প্রতি উচ্চবর্গের আচরণে ক্ষুব্ধ নজরুল উচ্চারণ করেন এ-কথা : ‘এদিকে উচ্চজাতি মৃত্যুকালেও নিম্নজাতিকে একধাপ উপরে উঠিতে দিবে না। জমিদারের জমি নিলামে, তবু সে প্রজার হাত ধরিবে না’ (‘লাঞ্ছিত’)। একটি রূপক রচনার খসড়া থেকেও প্রান্তজনের প্রতি নজরুলের অঙ্গীকারের কথা অনুধাবন করা যায়। ওই খসড়া রচনায় নজরুল জনককে শস্য-উৎপাদক, রামকে কৃষক এবং সীতাকে শস্য হিসেবে কল্পনা করেছেন। রাম-সীতার দুই পুত্র লব ও কুশকে ভেবেছেন শস্যের দুই ভাগ হিসেবে। কৃষক-প্রতিনিধি হয়েও রাম যথার্থ ভূমিকা পালন না করায় সীতা অর্থাৎ শস্য যেমন রাবণের অধিকারে চলে যায়, তেমনি নিম্নবর্গের সবকিছু চলে যায় রাবণরূপী উচ্চবর্গের গোলায়। রাবণকে নজরুল দেখেছেন উচ্চবর্গভুক্ত ব্রাহ্মণ ও লুণ্ঠনকারী রাক্ষসের যুগ্মরূপ হিসেবে। শূদ্র তথা নিম্নবর্গকে অবহেলা করার জন্যই রামের করুণ পরিণতি ঘটে – ভেবেছেন নজরুল; তাই তিনি প্রত্যাশা করেছেন নিম্নবর্গ তথা শূদ্র কিংবা বলি প্রান্তজনের উত্থান।

 

তিন

কবিতা এবং প্রবন্ধের মতো নজরুলের কথাসাহিত্যেও পাওয়া যাবে প্রান্তজনের নানামাত্রিক ছবি। বাংলা কথাসাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব, এবং একই সঙ্গে তিরোভাবও বটে, দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে। যুদ্ধপীড়িত এই সময়খ-ে বাংলা কথাসাহিত্যের কেন্দ্রীয় প্রবণতা ধস আর বিনষ্টি, মধ্যবিত্ত-জীবনের প্রতারণা আর অসংগতি, প্রেম আর অ-প্রেমের লীলালাস্য। নজরুলের কথাসাহিত্য এ-ধারায় এক দীপ্র ব্যতিক্রম। কখনো কখনো প্রেমের হাত ধরে সেখানে

মান-অভিমানের অতিকথনের স্রোত বয়ে গেছে বটে, তবে কেন্দ্রীয় প্রবণতাতে ঠিকই প্রবাহিত হয়েছে প্রান্তজনের জীবনস্রোত।

কথাসাহিত্যে নজরুল সেসব চরিত্রকেই মহিমান্বিত করে তুলেছেন, যারা কেন্দ্রচ্যুত, যারা কোনো-না-কোনো সূত্রে দলিত-পীড়িত-নির্যাতিত। তাঁর প্রিয় চরিত্রগুলোর শরীরে স্পষ্ট ফুটে ওঠে দারিদ্র্যের ছাপ, সংস্কারের দগদগে দাগ, ঔপনিবেশিক শোষণের চিহ্ন; তাঁর নারীর অবয়বে জ্বলে পুরুষরাক্ষসের লকলকে লোভ – আবার সেখানেই জেগে উঠে দাঁড়িয়ে যায় এসব অপচিহ্ন দূরীকরণে প্রত্যয়দীপ্ত কোনো-এক মুখের আভাস, কোনো-এক শক্তির উল্লাস, কোনো-এক বিদ্রোহীর হুঙ্কার। নজরুলের গল্প-উপন্যাসে প্রেম আছে, আছে প্রেমিক-প্রেমিকাও, কখনো কখনো মান-অভিমান আর আবেগের স্রোতে তাঁর প্রিয় নর-নারীর চিত্তলোক প্লাবিতও; তবু নজরুলসৃষ্ট সেসব চরিত্রই পাঠকের স্মৃতিপটে জীবন্ত হয়ে থাকে যাদের শরীরে ও সত্তায় আছে শ্রম আর সংগ্রামের স্পর্শ, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে যারা ক্লান্ত, পীড়িত ও পর্যুদস্ত তারাই তাঁর সাহিত্যে হয়ে ওঠে দীপ্র ও দীপিত।

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক নিম্নবর্গ তথা প্রান্তজনের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন – ÔCan the Subaltern speak?Õ (Gayatri 1983 : 66-111)। গায়ত্রীর এই জিজ্ঞাসায় আছে পশ্চিমবিরোধী নারীবাদী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। তবে বিষয়টিকে বিস্তৃত করে গোটা প্রান্তজন প্রসঙ্গেই কথাটি বিবেচনা করা যায়। ক্ষমতাবানের দাপটে, শোষকের হুঙ্কারে, ধর্মজীবীর প্রতারণায় এবং পুরুষরাক্ষসের বাসনায় নিম্নবর্গের নারী-পুরুষের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়, হারিয়ে ফেলে তারা কথা বলার শক্তি। বাংলা সাহিত্যে এই দলিত শ্রেণির কথা সরাসরি বলাটাও অপরাধ বা দুষ্কর্ম বলে বিবেচিত হতো। তাই সমাজের শোষণ আর উচ্চবর্গের নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে মুকুন্দরামকে হাজির হতে হয় বনের পশুদের কাছে, কখনো-বা ইতিহাস-রূপকথা ও মিথকথার আশ্রয় নিতে হয় কবিকে। মূক জনগোষ্ঠীর মুখে ভাষা দেবেন কোন কবি, কোন কোবিদ? তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয় নজরুলের আবির্ভাব পর্যন্ত। নজরুলের কবিতা ও কথাসাহিত্য, নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যাবে, নিম্নবর্গের কথায় সোচ্চার। ‘ব্যথার দান’ গল্পের গুলশান, ‘রাক্ষুসী’ গল্পের বিন্দি, ‘পদ্মগোখরো’ গল্পের জোহরা, কুহেলিকা উপন্যাসের জাহাঙ্গীরের মা, কিংবা জয়তী ও চম্পা, বাধনহারার আয়েশা, মৃত্যুক্ষুধার প্যাঁকালের মা কিংবা মেজ বৌ নিম্নবর্গ তথা প্রান্তজনের লক্ষণরেখা ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে আলোকিত পৃথিবীতে। জাহাঙ্গীর কিংবা আনসারের মুখেও আমরা শুনি ওই প্রান্তজনের গলা-ফাটানো উত্থানকথা। অতএব, সমসাময়িক সাহিত্যের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে, নজরুলের

কথাসাহিত্যের এই মর্ম উপলব্ধি করে গায়ত্রীর জিজ্ঞাসার উত্তরে আমরা বলতে পারি ÔYes, the Subaltern can also speak.Õ

কাজী নজরুল ইসলাম নিম্নবর্গ তথা প্রান্তজনের যে নতুন ডিসকোর্স বা সন্দর্ভ নির্মাণ করেন, তাদের উত্থানের যে রক্তাক্ত ছবি সৃষ্টি করেন, সেখানে প্রায়শই ভাবনাগুলো বেরিয়ে আসে নারীর বয়ানে। কেন? উত্তরটা এই – নারীরাই হচ্ছে তলেরও তল; কখনো তারা ছিদামের বউ চন্দরা, কখনো পাঁচুর বাপের বউ বিন্দি, কখনো-বা প্যাঁকালের মা কিংবা মেজ বৌ। রবীন্দ্রনাথের চন্দরা আপাত মেনে নিয়েছে ছিদামের খেলা, কিন্তু একদম মানেনি বিন্দি। তাই পাঁচুর বাপের পরকীয়া বিন্দিকে বুঝিয়ে দেয় পুরুষরাক্ষসের অতল ক্ষুধা এবং একসময় হত্যা করে পাঁচুর বাপকে – স্বামীকে। বিন্দির এই আচরণ আইনের চোখে কীভাবে বিবেচ্য সে ভিন্ন প্রসঙ্গ, কিন্তু এই আচরণের মধ্যে নজরুলমানসের যে গোপন আকাক্সক্ষা অভিব্যক্ত, সে-কথাই আমাদের অন্বিষ্ট। বিন্দিকে যে রাক্ষুসী হতে হলো, তাকে যে বিকৃতির পঙ্কে হতে হলো নিমজ্জিত, সেখানে পাই প্রান্তিক নারীর স্বপ্ন ও সংগ্রাম, ভালোবাসা ও প্রতিহিংসার অবিমিশ্র রূপ। নিম্নবর্গের প্রান্তিক নারী কীভাবে খুঁজে পায় আপন ঠিকানা, কীভাবে জ্বলে ওঠে তার স্বাধিকার-প্রমত্ত সত্তা, কীভাবে প্রান্তিকতার সীমানা পেরিয়ে প্রান্তজন গ্রহণ করে আপন সিদ্ধান্ত, বিন্দির নিম্নোক্ত বয়ান তার অভ্রান্ত উদাহরণ :

আমার সোয়ামী একা ঐ অবাগীদের বাড়ির পেছনের তেঁতুল গাছটার তলায় বসে … চারিদিকে তাকিয়ে দেখলুম কেউ কোথাও নেই। … আমি আঁচলে দা’টা লুকিয়ে দৌড়ে বাঘিনীর মত গিয়ে ওঃ সে কি জোরে তার বুকে চেপে বসলুম। সে হাজার জোর করেও আমায় উলটিয়ে ফেলতে পারলে না। তার ঘাড়ে মস্ত একটা কোপ বসিয়ে দিতেই আমার হাতটা অবশ হয়ে এল। তখন সে দৌড়ে পাশের পাটক্ষেতটায় গিয়ে চিৎকার করে পড়ল! আমি তখন রক্তমুখো হয়ে উঠেছি। আমি আবার গিয়ে দুটো কোপ বসাতেই তার ঘাড় হতেই মাথাটা আলাদা হয়ে গেল! তারপর খালি লাল আর লাল! আমার চারিদিকে শুধু রক্ত নেচে বেড়াতে লাগল!

(‘রাক্ষুসী’)

কুহেলিকার জয়তী চরিত্র নিম্নবর্গের হলেও বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে সে উঠে এসেছে কেন্দ্রের শীর্ষে। নজরুলের আকাক্সক্ষাই ছিল কুলি-মজুর, শ্রমিক-কৃষক আর ‘তুচ্ছ’জনের উত্থান। জাহাঙ্গীরের দৃষ্টিকোণে জয়তীর যে-ছবি অঙ্কিত হয়, সেখানে পাই প্রান্তজনের উত্থানের কথা, নিম্নবর্গের সমুত্থিত জাগরণের কথা – ‘মহিলার বয়স ছত্রিশ-সাঁইত্রিশের বেশি হইবে না। পরনে শুধু একখানি পরিষ্কার সাদা ধুতি, যেন গায়ের রঙের সাথে মিশিয়া গিয়াছে। ঘাড় পর্যন্ত ছোট করিয়া কাটা চুল – অনেকটা বাবরি চুলের মতো। তাহারি কতকগুলো ললাটে ও মুখের আশেপাশে আসিয়া পড়িয়াছে। বড় বড় চক্ষু কিন্তু তাহা যেন একটু অতিরিক্ত প্রখর, সহজে চোখের দিকে চাওয়া যায় না। চোখ যেন ঝলসিয়ে যায়। মুখ পুরুষের মতো তৃপ্ত, মহিমোজ্জ্বল। জাহাঙ্গীর মনে মনে বলিল – ‘নারী যদি নাগিনী হয়, তুমি নাগেশ্বরী’ (কুহেলিকা)।’ জাহাঙ্গীরের এই ভাবনায় ধরা পড়ে প্রান্তজনের উত্থানের আভাস।

মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসে কৃষ্ণনগরের চাঁদ সড়কের নিম্নবর্গের মুসলমান ও রোমান ক্যাথলিক পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব ও সহযোগ এবং জীবনসংগ্রাম রূপলাভ করেছে। মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাস যে শিক্ষিত নগরবাসীর প্রেম-প্যাঁচাল নয়, উপন্যাসের শুরুতেই নজরুল তা স্পষ্ট করেন এভাবে : ‘জাতিধর্ম নির্বিশেষে এদের পুরুষেরা জনমজুর খাটে – অর্থাৎ রাজমিস্ত্রী, খানসামা, বাবুর্চিগিরি বা ঐ রকমের কোনো-একটা কিছু করে। আর, মেয়েরা ধান ভানে, ঘর-গেরস্থালির কাজকর্ম করে, রাঁধে, কাঁদে এবং নানান দুঃখ-ধান্দা করে পুরুষদের দুঃখ লাঘব করবার চেষ্টা করে। বিধাতা যেন দয়া করেই এদের জীবনের দুঃখকে বড় করে দেখবার অবকাশ দেননি। তাহলে হয়ত মস্ত বড় একটা অঘটন ঘটত’ (মৃত্যুক্ষুধা)। আলোচ্য প্রতিবেদনের এই প্রতিপাদ্য শেষ পর্যন্ত অক্ষুণœ ছিল – প্যাঁকালের মা আর মেজবৌর জীবনসংগ্রাম উপন্যাসে সঞ্চার করেছে ভিন্নমাত্রা। সমষ্টিগত প্রান্তজন ক্রমে ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়নি – কেতুপুর গ্রামের ধীবর গোষ্ঠী কুবের-কপিলার প্রেমখেলায় পথহারা হয়নি, সধপৎড়-জীবন পতিত হয়নি সরপৎড়-গহ্বরে। এখানেই নজরুলের ঔপন্যাসিক প্রতিবেদনের স্বকীয়তা। নজরুল চেয়েছিলেন প্রান্তজন উঠে আসুক কেন্দ্রের ভূগোলে – এমন ভাবনটা রূপায়িত হয় মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের পনেরো অধ্যায়ে আবির্ভূত আনসারের বর্ণনায়। পাঠক, লক্ষ করুন নিচের বাক্যস্রোত :

চাঁদ সড়কে সেদিন বেশ একটু চাঞ্চল্যের সাড়া পড়ে গেল। লক্ষ্মীছাড়া-মত চেহারা লম্বা-চওড়া একজন মুসলমান যুবক কোত্থেকে এসে সোজা নাজির সাহেবের বাসায় উঠল। … যুবকের গায়ে খেলাফতি ভলান্টিয়ারের পোশাক। কিন্তু এত ময়লা যে চিমটি কাটলে ময়লা ওঠে। খদ্দরেরই জামা-কাপড় – কিন্তু এত মোটা যে, বস্তা বলে ভ্রম হয়। মাথায় সৈনিকের ফেটিগ-ক্যাপের মত টুপি, তাতে কিন্তু অর্ধচন্দ্রের বদলে পিতলের ক্ষুদ্র তরবারি ক্রস।

তরবারি-ক্রসের মধ্যে হিন্দু-মুসলমানের মিলনাত্মক একটা লোহার ছোট্ট ত্রিশূল। হাতে দরবেশি ধরনের অষ্ঠবক্রীর দীর্ঘ ষষ্টি। সৈনিকদের ইউনিফর্মের মত কোট-প্যান্ট। পায়ে নৌকার মত একজোড়া বিরাট বুট, চড়ে অনায়াসে নদী পার হওয়া যায়। পিঠে একটা বোম্বাই ফিটব্যাগ। শরীরের রং যেমন ফরসা তেমনি নাক-চোখের গড়ন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত মাপ করে তৈরি গ্রিক ভাস্কর্যের অ্যাপোলোর মূর্তির মত নিখুঁত সুন্দর।

(মৃত্যুক্ষুধা)

উপর্যুক্ত বর্ণনায় নিম্নবর্গের মানুষের প্রতি, প্রান্তজনের প্রতি নজরুলের মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, বিবেচনা করি।

 

চার

কাজী নজরুল ইসলাম মানুষের মুক্তি কামনা করেছেন, দূর করতে চেয়েছেন সামাজিক আসাম্য, প্রত্যাশা করেছেন ঔপনিবেশিক শক্তির পরাভব। কিন্তু, বিবেচনা করি, তাঁর সাহিত্যের কেন্দ্রীয় সুর প্রান্তজনের উত্থান, শূদ্রের জাগরণ, কেন্দ্র-লাঞ্ছিত প্রান্তের মানুষদের কেন্দ্র-দখলের আহ্বান। প্রসঙ্গত, নজরুল-রচিত ‘সত্যবাণী’ প্রবন্ধের কথা আমাদের মনে পড়ে। ওই প্রবন্ধে নজরুল লিখেছেন : ‘তুমি যদি সর্বস্বহারা হও, কোথাও তোমার মাথা গুঁজিবার ঠাঁই না থাকে, কুছ পরোয়া নেই, তোমার মাথা নত করিও না।’ অভিন্ন প্রবন্ধের উপসংহারে নজরুল যা বলেছেন, বস্তুত সে-কথাই নজরুলসাহিত্যে প্রান্তজনের প্রতি তাঁর পরম আহ্বান : ‘তুমি অমর হও! তুমি স্বাধীন হও! তোমার জয় হউক।’

(‘সত্যবাণী’)

‘সৃজনের গান’ প্রবন্ধে নজরুল লিখেছেন : ‘ব্রাহ্মণ-পাদরির রাজত্ব গিয়াছে। গুরু-পুরোহিত, খলিফা, পোপ নির্বংশ-প্রায়। শত সম্রাট ও সাম্রাজ্য সব ধসে পড়েছে। রাজা আছেন নামে মাত্র। আমেরিকা, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে এখন বৈশ্যের রাজত্ব। এবার শূদ্রের পালা। এবার সমাজের প্রয়োজনে শূদ্র নয় – শূদ্রের প্রয়োজনে সমাজ চলবে। হিন্দু-মুসলমান সমস্যা, ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ সমস্যা সব লাঙলের ফালের মুখে লোপ পাবে।’ এই মানস-আকাক্সক্ষাই আমাদের বিবেচনায়, নজরুলের কথাসাহিত্য-কবিতা-প্রবন্ধে রূপলাভ করেছে। তাঁর সংগীতগুলো পর্যালোচনা করলেও অভিন্ন বিবেচনা উপস্থাপনের সুযোগ আছে। সর্বত্রই নজরুল প্রত্যাশা করেছেন নিম্নবর্গের প্রতিরোধ, দলিতজনের বিদ্রোহ, কামনা করেছেন প্রান্তজনের উত্থান।*

 

নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি

কাজী নজরুল ইসলাম, ১৯৯৬। নজরুল রচনাবলী, আবদুল কাদির-সম্পাদিত, ১-৪ খ-, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

মুজফ্ফর আহমদ, ১৯৮১। কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা।

Gayatri Chakravarty Spivak, 1983, Can the Subaltern speak?, reprinted with abridgemens in Williams and Chrismad (eds.) Colonial Discourse and Post-colonial Theory, Harvester Wheatsheaf, London.

Nelson Mandela, 2014, Long Walk to Freedom, Routledge, New York.

* বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন রচনারউদ্ধৃতি আবদুল কাদির-সম্পাদিত নজরুল রচনাবলী (১-৪ খ-) থেকে গৃহীত হয়েছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: