বাংলাভাষীদের ভ্রমণ-পিপাসা বিশ্বখ্যাত তো নয়ই, এমনকি এদেশে ইউরোপীয়রা পা দেওয়ার আগে তাদের একটি পরিচিতি ছিল ‘ঘরকুনো’। এমন একটা সময় ছিল যখন সন্তানেরা পাশের গাঁয়ে গেলেও নাকি মায়েদের চোখ থেকে জল ঝরতো। আবার এর বিপরীতে বলা যায়, তাম্রলিপ্তির কথা, যেখান থেকে দেশ-বিদেশের বাণিজ্য জাহাজ গমনাগমনে ব্যস্ত থাকতো সারাবছর। কোনো বাংলাভাষীই কি সেসব অর্ণবপোতে দূরে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে যাননি? কিন্তু বর্ণনার অভাবে তাঁদের বিদেশযাত্রা লিপিবদ্ধ হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়নি। মহাজ্ঞানী অতীশ দীপঙ্করের ঘরের পাশের তিব্বতযাত্রা ইতিহাসই বটে, কিন্তু ভ্রমণকাহিনি আমরা পাইনি।

আর সেজন্যেই হয়তোবা বাংলার ইতিহাসে ভ্রমণকাহিনির উদ্ভব অন্য অনেক কিছুর মতোই ইউরোপীয়দের আসার পরে থেকে। রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তীর অনেক কবিতায় এবং বিদেশ থেকে লেখা চিঠিতে, মুজতবা আলী প্রমুখ ভ্রমণকাহিনি লিখতে গিয়ে সাহিত্য-রচনার দিকেই ঝুঁকেছেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ পাঁচ মহাদেশের গোটা তিরিশেক দেশে গেছেন এবং প্রতিটি নিয়েই লিখেছেন। মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে এবং জলে ডাঙায় অননুকরণীয় গদ্যভঙ্গি সময়-কাটানোর অতুলনীয় মাধ্যমই বটে। এদেশের হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের রমানাথ বিশ্বাস সাইকেলে চড়েই দুনিয়ার এক বৃহদাংশ ঘুরেছেন এবং লিখে গেছেন।  শিক্ষায় এবং জীবনযাপনে অতুলনীয় একজন ছিলেন মন্মথচন্দ্র মল্লিক, ব্যারিস্টার; আত্মীয়তায় কবি সুধীন্দ্রনাথের মায়ের  পিতৃব্য : ফরাসি নারীর স্বামী এবং বিলাতপ্রবাসী। তাঁর Impressions of a Wanderer বাংলাভাষীদের ইংরেজিতে লেখা ভ্রমণকাহিনির মধ্যে অন্যতম। পূর্ব ও পশ্চিমের ভাবাদর্শের ফারাক নিয়ে লেখা বইও তাঁর আছে। সুধীন দত্ত ভ্রমণ কাহিনি লেখেননি, কিন্তু তাঁর একশ পঙ্ক্তির কবিতা ‘প্রত্যাবর্তন’কে পদ্যোছন্দে এক অর্থে ভ্রমণকাহিনিই বলা যায়; অনেক কিছু দেখে তা শেষ হয় একথাগুলো দিয়ে ‘বাঁচে মাঝি, চেনা ঘাটের কাদায় নৌকা ঠেকে’। আরেক দিকে জীবনানন্দ দাশের জনপ্রিয় কবিতা ‘বনলতা সেন’ এক পরাবাস্তব মননের ভ্রমণ, যাতে পাই অন্ধকার বিদিশা, শ্রাবস্তী, দারুচিনি দ্বীপ, সিংহল সমুদ্র, মালয় সাগর এবং ঘরের মধ্যের নাটোর। তাঁর মনে যাই থাক, এ এক ভূগোলসমৃদ্ধ কবিতা।

এসবের বিপরীতে সেক্ষেত্রে রিজওয়ানুল ইসলাম একশ তেষট্টি পৃষ্ঠার এক বইতে তিন মহাদেশের একশ বাষট্টিটি বিষয় আটিয়ে তৃপ্তিদায়ক, সময়-বাঁচানো, যুগোপযোগী কাজ করেছেন। বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের এই বইটির (তিন মহাদেশে) নয়টি অধ্যায়ে ১৬২টি উপ-অধ্যায় জুড়ে আছে লেখকের জীবনব্যাপী বিশ্ব পরিব্রাজনের সারসংক্ষেপ। এক কথায় বলতে গেলে এ-ধরনের সুসংহত গদ্যভঙ্গি, অল্পকথায় অনেক বলা, এবং শুধু চোখের দেখা নয়, মন দিয়ে বিভিন্ন নরগোষ্ঠী ও সমাজের অন্তর্নিহিত সারাৎসার ও সমস্যার বয়ান খুব কম ভ্রমণগাঁথায় মিলবে। অর্থনীতির এই বিরল প্রতিভাধর ছাত্রের চোখ থেকে কিছুই বাদ পড়েনি : না দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত প্রাণ, না প্রকৃতির বিচিত্র সব ঐশ্বর্য, না মানুষের শিল্পকৃতির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অর্জন ও অর্ঘ্যময় সব মিউজিয়াম।

বইটি সাহিত্য তো বটেই, তবে আমার বিবেচনায় তাঁর ভাষা অনেক বেশি আধুনিক এবং মানুষের কাজে লাগবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্পকালীন শিক্ষকতার পরে তিনি চলে যান জাতিসংঘের শ্রম সংস্থায়; বিভিন্ন দেশে কাজ করে চূড়ান্তভাবে জেনেভাতে থাকেন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার পদ পর্যন্ত। কর্মজীবন ও অবসরোত্তর কালে, তাঁর বিশ্বভ্রমণ অব্যাহতই থেকেছে, হয় কাজের প্রয়োজনে বা নিজের শখে। জেনেভা এবং ঢাকার মধ্যে তাঁর বর্তমান বছরগুলি ভাগ-করা; আবার সন্তানদের টানে তিনি আটলান্টিকও পাড়ি দেন হর-হামেশা। সঙ্গে প্রায় সারাক্ষণই থাকেন স্ত্রী গীতশ্রী। যাঁরা তাঁর মতো দুনিয়া ঘুরে বেড়াননি, তাঁরা বইটিতে অজানা অনেক কিছুই পাবেন, যথা – নিউইয়র্র্কের গুগেনহাইম থেকে হারলেম, ‘সভ্যতার সূতিকাগার গ্রীস’ থেকে ‘ভালো-লাগা’ স্পেনের মালাগা, ‘রোমের সজ্জন বাঙালি’ থেকে ‘ফিরে দেখা থাইল্যাণ্ড’, লন্ডনের পিকাসো মিউজিয়াম থেকে কম্বোডিয়ার আন্কর ওয়াৎ, যা শুরুতে হিন্দু উপাসনালয় হলেও পরে রাজধর্ম পরিবর্তনের হাওয়া লেগে হয়েছে বৌদ্ধ মন্দির; থাইল্যান্ডের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সমুদ্রভ্রমণ থেকে নিজের অর্ধদেশ সুইজারল্যান্ডের ক্যালেন্ডারের মতো সব ছবি এবং তার থেকে কেরালার সুগঠিত সমাজ যেখানে, মন্দির, মসজিদ, গির্জার বিস্ময়কর পাশাপাশি বা নিকটবর্তী অবস্থান।

এক কথায় বলা যেতে পারে, এই বইটি এই গোত্রের প্রকাশনায় বিরল সৃষ্টি। বইটির ইনার কভারের দুটি অনুচ্ছেদের কথাগুলি পড়লেই বইতে কী আছে, সে-সম্পর্কে সারসংক্ষেপ পেয়ে যাই অতি সহজেই : ‘ঘরের বাইরের অনেক কিছুই মানুষকে ডাকে। পর্বত, সমুদ্র, অরণ্য, বড় শহর, মিউজিয়াম, ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা স্থাপনা বা তার ভগ্নাবশেষ, এমনকি পুরানো শহরের অলিগলি, অনেক কিছুই। … কোথাও গল্প মূর্ত হয়ে ওঠে চোখের সামনে, আবার কোথাও কোনো কঠিন বাস্তব। কত রকমের মানুষ! জীবনের জন্য, উন্নত জীবনের লক্ষ্যে মানুষ কীভাবে সংগ্রাম করে  যায় প্রতিনিয়ত।’ এই সংগ্রামের প্রতিটি দিক লক্ষ করেছেন তিনি যেখানেই গেছেন, তা সে নিউইয়র্কের হারলেম হোক, বা কেরালার ‘মরা জলে’র নৌবিহার। একই জায়গায় আরো পাই লেখকের শিল্পানুরাগের কথা : ‘মিউজিয়ামে গিয়ে এই লেখক উপভোগ করেন শিল্পকর্ম। … সমাজের বৈষম্য তাঁকে করে ব্যথিত আর মানুষের সংগ্রামকে তিনি জানান অভিবাদন।’ তাই বইটি মূলত ভ্রমণকাহিনি হলেও সে-সীমানা পেরিয়ে আরো অনেক কিছু।

 ‘নিউইয়র্কের সাতকাহন’ বইটির এক-চতুর্থাংশের বেশি জায়গা নিয়ে আছে। বিশ্বের এই সবচেয়ে কর্মচঞ্চল শহরটিতে যাঁরা যাননি, তাঁরা এই অধ্যায়টি পড়লেই জেনে যাবেন কেমন এই বিশ্বনগরী। এই মহৎ শহরটিতে যে বাঙালির পদার্পণ ঘটেছিল শতবর্ষ আগে, তার উল্লেখ পাই হারলেম অংশে। এক বাঙালি দোকান ও ব্যক্তিকে তাঁর মনে হয়েছে এরূপ : ‘হারলেমের বাঙালির ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অংশ বর্তমান হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন অল্পক্ষণের জন্য হলেও।’ নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের মাটিতে ঘাসের ওপরে এক অনন্য স্মৃতিফলক, ‘অ্যাণ্ডির জন্য – যাকে আমি অনেক ভালোবাসতাম’, পাঠককে আকর্ষণ না করে  পারে না।

মালাগার রোদেলা সৈকত, শিল্পকলা এবং ইতিহাস তিনি সবিস্তারে এনেছেন অধ্যায় চারে। পিকাসোর জন্মস্থান এবং মালাগার ইতিহাসে আরবদের সংশ্লেষ অনেককেই আকৃষ্ট করবে। বিশেষ করে, আলকাজাবাতে ইতিহাসের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ পান এবং বিষয়টি এদেশীয়দের অনেককেই আকৃষ্ট করবে সন্দেহ নেই, আলোচনায় ঠেলবে।

লেখকের দুটি বৈশিষ্ট্য যে-কোনো পাঠককে টানবে। প্রথমত চিত্রকলা, ও তার ধারক মিউজিয়ামের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এবং দ্বিতীয়ত নতুন দেশের খাদ্যাভ্যাস বলতে গিয়ে তার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের সুবোধ্য বয়ান। নয়টি অধ্যায়ের আটটিতেই আছে মিউজিয়াম ও চিত্রকলার অন্তর্ভুক্তি। যেখানে তা নেই মনে হবে, যেমন সুইজারল্যান্ড-সম্পর্কিত ‘পর্বত আর লেকের দেশ সুইজারল্যাণ্ড’ শীর্ষক ছয় নম্বর অধ্যায়ে, সেখানে আছে চলচ্চিত্র-বিষয়ক আলোচনা। এমনকি যদিও নিজে বলতে চেয়েছেন, তিনি নিজে এসব ব্যাপারে খুব একটা বোঝেন না, কিন্তু পড়লে দেখা যায় কিউবিজম,  ইমপ্রেশনিজম, পোস্ট-ইমপ্রেশনিজম নিয়ে তাঁর অভিনিবেশ সাধারণ পাঠককে বিমোহত করবে, করবে তাঁর চলচ্চিত্র বিষয়ে ধ্যান-ধারণা।

রিজওয়ানুল ইসলামের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি সুইজারল্যান্ডের পর্বত আর লেক-ভরা প্রকৃতির অন্তহীন বৈভব; আবার অন্যদিকে ঘরের কাছের কেরালার মরা জলে নৌকা ভ্রমণ, কথাকলি নৃত্য ও সামাজিক অঙ্গীকারের কথা। ব্যাকওয়াটার শব্দটির ‘মরা জল’ ভাষান্তর অতীব গ্রহণযোগ্য লাগলো। এই প্রয়োগ আমি আগে কখনো দেখিনি। সুইজারল্যান্ডে তিনি তিচিনো কাউন্টিতে বেড়াতে গিয়ে ‘ক্যালেন্ডারের ছবির মতো সব দৃশ্য’ খুঁজেছেন, দেখেছেন।

বইটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শিল্পকর্মের প্রতি লেখকের তীক্ষè, সুচারু ও অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। তিনি অর্থনীতির নিরেট তত্ত্ব নিয়ে যেমন অন্যত্র লিখেছেন, তেমনি ছড়ার বইও লিখেছেন (রবীন্দ্রনাথের সুপরিণত বয়সের ছড়া-চর্চার কথা মনে পড়তে পারে), কিন্তু ভ্রমণকাহিনি লিখতে গিয়ে মিউজিয়াম আর কলাকারদের প্রতি পক্ষপাত অনিবার্যভাবেই চোখে পড়বে। প্রথম অধ্যায়েই গুগেনহামের প্রতি যে-টান দেখি, লন্ডনে গিয়েও পিকাসোর নারীরা তেমনি তাঁর মনের বিরাট অংশ নিয়ে আছে। আবার মালাগায় গিয়ে ওই পিকাসোর জন্মস্থানের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য তাঁর কলাপ্রিয়তাকেই সামনে নিয়ে আসে। উপরন্তু প্রায় প্রতিটি অধ্যায়েই আছে মিউজিয়াম-বিষয়ক আলোচনা।

সুসংহত, সুগঠিত ও বক্তব্যভরা সুখপাঠ্য গদ্য রিজওয়ানুল ইসলামের বৈশিষ্ট্য। এবং তাঁর আরেক সদগুণ অল্প কথায় অনেক জানানো। তিনি জানেন বর্তমান যুগ রবীন্দ্রনাথের যুগ থেকে ভিন্ন। সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিভিশন ইত্যাদি মানুষের মূল্যবান সময় অনেকটাই নিয়ে নেয়। তাই অল্পে বেশি জানানো তাঁর বৈশিষ্ট্য। এক বইয়ের কভারে তিন মহাদেশের দশটি দেশের বর্ণনা একশ তেষট্টি পৃষ্ঠার বইতে আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভাবতেই পারতেন না। কিন্তু আকারে ছোট হলেও ভাবে ও বয়ানে এই বইটি অতুলনীয়। বর্তমান কালের ব্যস্ততার মধ্যে ঢাউস বই পড়ার চেয়ে এ-ধরনের সংহত সংক্ষিপ্ত বই অনেক বেশি সুখপ্রদ ও ফলদায়ক।

কেরালার মরা জলে পাঁচতারা মানের হাউস বোটে দিনযাপনের বর্ণনা যাঁরা ওখানে যাননি, তাঁদের নিঃসন্দেহে ওদিকে টানবে। যে-খাদ্য বর্ণনা সেখান থেকে আসে তা ক্ষুধাবর্ধক ও সরস; যে-কোনো সক্ষম মানুষকে তাঁর বয়ান অনুপ্রাণিত করবে ঘরের বাইরে যেতে।  এবং অবশ্যই আছে ডাচবিহীন ডাচ প্যালেস, যেখানেও মিউজিয়ামের উল্লেখ অনুপস্থিত নয়।

আসলে রিজওয়ানুল ইসলামের সব বর্ণনাই এই ধরনের সুখপাঠ্য। এক সুখপ্রদ সময়ের টান মেলে তা থেকে। সব জায়গাতেই যাওয়ার ইচ্ছা জাগে। আর ভাষার মানে, বীক্ষণের তীক্ষèতায়, উপসংহারের সর্বগ্রাহ্যতায় বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের এই বইটি ভ্রমণ সাহিত্যে এক নতুন ও অভিনব সংযোজন।

বাংলাভাষীরা দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছেন। কেউ কায়িক শ্রমের কাজে; কেউবা আমাদের বর্তমান লেখকের মতো বিদেশি বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সুউচ্চ বা সর্বোচ্চ পদে। শেষের ক্ষেত্রে সুবিধা অসীম : চাকরির প্রয়োজনে বা অবসরকে উপভোগ করার ছলে দুনিয়া ইচ্ছামতো দেখা ‘দুই পা ফেলিয়া’। রিজওয়ানুল ইসলাম আমাদের কৃতার্থ করেছেন তাঁর পরিব্রাজক জীবনের খুঁটিনাটি জানিয়ে। বাংলা ভাষার ভ্রমণসাহিত্যে বইটি নতুন ধারার সংযোজন। বেঙ্গল পাবলিকেশন্সও একটি অতীব মানসম্মত কাজের জন্য ধন্যবাদের ভাগীদার।

Leave a Reply