নদী কারো নয়

লেখক:

সৈয়দ শামসুল হক

 

\ ৩৪ \

 

দাড়িতে মেহেদির রং লাগিয়ে, আয়নায় নিজের মুখখানা পরিপাটি দেখে নিয়ে, হাকিম নেয়ামতউল্লাহ নিচে নামেন। নেমে দেখেন মন্মথ দারোগা অস্থির হয়ে পায়চারি করছে বারান্দায়। বারান্দার নিচেই চমৎকার ঘাসের মাঠ। ভোরের আলোয় ঘাসের সবুজ পাতা ঝকঝক করছে। দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবার কথা, কিন্তু না! নেয়ামতউল্লাহ্র চোখ পড়ে দারোগার ঘোড়াটি মচমচ করে মাঠের ঘাস সাবাড় করছে। রুষ্ট হয়ে তিনি মন্মথ দারোগার দিকে তাকান। – কী করছে আপনার ঘোড়া! সামলান! কিন্তু সে-কথার দিকে মোটে না কান দিয়ে

দারোগা বলে, স্যার, শুনেছেন? – কী? কী শুনবো? আপনি চোখে দেখছেন না ঘোড়া ঘাস ছিঁড়ছে! – স্যার, ঘাসের কথা ছাড়েন! দেশের কথা ভাবেন। – তার মানে? নেয়ামতউল্লাহ্ শংকিত হয়ে পড়েন। তবে বোধহয় শহরে দাঙ্গাটা লেগেই গেছে। কংগ্রেসের নেতারা জিন্নাহ ফান্ডে টাকা তোলা নিয়ে আজ কদিন থেকে যে রকম হুজ্জত বাধিয়ে দিয়েছে, হয়তো মুসলিম লীগের ছেলেরা কংগ্রেসের রাজেন্দ্রবাবুর বাড়িতে চড়াও হয়ে পড়েছে। রাতেই সংবাদ পেয়েছিলেন নেয়ামতউল্লাহ্ যে, এশার নামাজের পর বাজার মসজিদে একটা জমায়েত হয়, গরম গরম বক্তৃতা হয়, গভীর রাতে উত্তেজিত মানুষজনের চলাচলের সংবাদও তাঁর কানে আসে। দাঙ্গাটা শুধু লাগবার অপেক্ষা! হাকিম সাহেব দুঃসংবাদটি শোনবার অপেক্ষায় অধীর হয়ে তাকিয়ে থাকেন দারোগার দিকে।

ওদিকে বশির আর্দালি বাংলোর পাহারাদার সিপাহিকে বলে, দেখিছো না হাকিম সায়েব বেজার! ঘাস খায়া সাফ করিচ্ছে ঘোড়া। উয়াকে হঠাও। সিপাহিটি নির্লিপ্ত চোখে ঘোড়ার কান্ড দ্যাখে। আবার চোখ ফিরিয়ে হাকিম সাহেবকেও একপলক দেখে নেয়। হাঁ হাঁ হুজুর গুস্সা হ্যায়। তখন সে বশিরকে বলে, আও, তুম হাথ লাগাও। – হাম? – আরে ডরো মাৎ, তুম তো হুজুরকা খাছ আদমি হ্যায়। লাগাও হাথ। পাকড়ো! ঘোড়া বলে ঘোড়া, নাম তার অশ্বিনী, রোখও তার তেমনি। কিন্তু হাকিমের খাস আর্দালি বলে কথা! থানার সামান্য সিপাহির কাছে তার খাটো হওয়া কোনো কাজের কথা নয়। হাঁক দিয়ে সে সিপাহিকে বলে, তুম কেয়া খাড়া হোকে তামাশা দেখেগা! আও! আর্দালি বশিরকে দেখে ঘোড়াটি লাথি মারবার জন্যে পা তুলছিলো বটে, সিপাহিটি কাছে আসতেই পা নামিয়ে নেয়। কিন্তু নাকে-মুখে ফোঁসফোঁস করতে থাকে। নিঃশ্বাসের গরম ভাপ এসে গায়ে লাগে। কিন্তু সিপাহিটির কাছে রোখ তার খাটে না। ভোজপুরি সিপাহিটি এ-ঘোড়াকে ভালোই চেনে। থানায় এ ঘোড়ার গা দলাইমলাই করে বেশ জানাশোনা হয়েছে তার। সিপাহি লাগাম ধরে ঘোড়াকে যখন টানতে থাকে, আর ঘোড়াটিও বেশ চলতে থাকে, তখন হাকিমের আর্দালি বশির সাহস পায় লাগামটি ছুঁতে। রাস্তার মানুষ অন্তত দেখুক, দারোগার ডাকাতিয়া ঘোড়াও হাকিমের আর্দালির কাছে কেমন বশীভূত! রাস্তার বাতির খুঁটিতে ঘোড়ার লাগাম বেঁধে রাখতে রাখতে বশির বলে, ও সিপাই, তোমার দারোগা যে হাকিমের দরোজায় এত ফজরে আসিলো, গতিক তো মোর সুবিধার বলিয়া মনোতে না খায়! সিপাহি বলে, মুঝকো ক্যা মালুম! পাকিস্তান যো হুয়া, আব তুম জানো! বড় বিরস গলায় কথাটা বলে, গালে খৈনির দলা এপাশ থেকে ওপাশে নিয়ে, সিপাহিটি লম্বা লম্বা পায়ে বশিরকে পাশ কাটিয়ে বারান্দার নিচে বন্দুক বাগিয়ে হাকিমের পাহারায় ফিরে যায়।

বারান্দায় তখনো সটান খাড়া মন্মথ দারোগা। হাকিম তাকে বসবার অনুমতি না দিলে বসে কী করে! বশির এসে কাঁধের ঝাড়ন দিয়ে হাকিমের চেয়ার ঝেড়ে দেয়। নেয়ামতউল্লাহ্ বসেন না। তাঁর জানা আছে বেতের ছাউনি দেওয়া এ চেয়ারের মাহাত্ম্য। ছারপোকায় ভরা! তিনিও দাঁড়িয়ে থেকেই প্রশ্ন করেন, কী ব্যাপার? এত ভোরে? তখন তড়বড় করে উত্তেজিত গলায় দারোগা বলে, ক্যান! ওয়াহেদ ডাক্তারের কথা আপনার কানে আসে নাই? – কোন ডাক্তার? কোথাকার ডাক্তার? – হরিষালের! – কীসের ডাক্তার? – হোমাপ্যাথির। – তার কথা কেন? – আর কেন! সে নিজেকে রাজা ডিক্লেয়ার দিয়েছে! পাকিস্তান সে মানে না! চিন্তা করেন, স্যার! এই মুহূর্তে ব্যবস্থা না নিলে কী হতে কী হয়া যায়!

নেয়ামতউল্লাহ্ চোখ সরু করে মন্মথ দারোগার দিকে তাকান। তাঁর মনের মধ্যে এই কথাটা ওঠে যে, দারোগাটি হিন্দু, আর সেই হিন্দুর কেন এত মায়া পাকিস্তানের ওপর? এতটাই যে সাতসকালে ঘোড়া দাবড়িয়ে চলে এসেছে হাকিমের বাংলোয়? – এখন কী হুকুম বলেন? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নেয়ামতউল্লাহ্ বলেন, উন্মাদ! পাগল! পাগলের কথা ছাড়েন। শহরের পরিস্থিতি বলেন। – পরিস্থিতি শান্ত, স্যার। নেয়ামতউল্লাহ্ ভুলে যান ছারপোকার কথা, বসে পড়েন চেয়ারে, সঙ্গে সঙ্গেই কুট করে কামড়, পাজামার পাতলা কাপড় ঠেলে একেবারে পেছনের ফুটো বরাবর ছারপোকার কুট কুটুস। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াবেন কী, দারোগার সাক্ষাতে সেটা শোভন হবে না, তিনি ছারপোকার কামড় হজম করে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলেন, জিন্নাহ ফান্ডের কথা তো শুনেছেন।             ধনী-গরিব সবার এখন উচিত জিন্নাহ ফান্ডে চাঁদা দেওয়া। পাকিস্তান হলেই তো হবে না, পাকিস্তান চালাবার জন্যে সরকারের টাকা চাই। হিন্দুস্থান কবে পাকিস্তানের পাওনা টাকা পাকিস্তানকে দেবে তার কোনো ঠিক নাই। এমত অবস্থায় প্রাইম মিনিস্টার নাজিমুদ্দিন সাহেবের আহবান – জিন্নাহ্ ফান্ড! – হ্যাঁ, স্যার, শুনেছি। – শুনেছেন যদি তবে এটা শোনেন নাই যে টাউনের কংগ্রেস নেতারা বলছে কায়েদে আজমের নামে চাঁদা যে তোলা হচ্ছে এ-টাকা আসলে যাবে মুসলিম লীগের নজির মিয়ার পেটে! – না, স্যার শুনি নাই। নেয়ামতউল্লাহ্ বিরক্ত হয়ে বলেন, তা শুনবেন কেন? চোখ বন্ধ করে থাকেন? ঘোড়া যে লনের ঘাস খেয়ে নাশ করলো তাও আপনার চোখে পড়লো না। তারপর গলা নরোম করে বলেন, যাক! টাউনে এ নিয়ে দুই দলের মধ্যে চেঁচামেচি হয়েছে শুনেছি, এমনকি একটা দাঙ্গাও বেধে যেতে পারে আভাস পেয়েছি, তার কী?

না, এ-বিষয়ে কোনো কথাই কানে আসে নাই মন্মথ দারোগার। সে আতান্তরে পড়ে যায়। দারোগা হয়ে টাউনের এতবড় একটা খবর সে রাখে নাই, এটা তার পক্ষে হজম করা মুশকিল হয়ে পড়ে। সে বলে, সব শান্ত, স্যার। মুখের কথা মুখেই মিলায়ে গেছে। তাছাড়া, আমি যতদূর জানি, জলেশ্বরীতে হিন্দু মুসলমানে কোনো বিবাদ কখনো হয় নাই। বিবাদের কোনো ইতিহাস নাই। থানাতেও এর কোনো রিপোর্ট নাই। চিরকালের সম্প্রীতির এলাকা হেথায়। তখন নেয়ামতউল্লাহ্ দার্শনিক হয়ে ওঠেন। বলেন, চিরকাল! চিরকাল বলে কিছু আছে নাকি! এই যে ব্রিটিশ – সূর্য অস্ত যায় না তার সাম্রাজ্যে – চিরকাল তাদের রাজত্ব বলে তারা মনে করতো! কী হলো! পাকিস্তান হলো তো! সূর্য অস্ত গেলো তো! মনে রাখবেন মন্মথবাবু, চিরকালেরও শেষ আছে, তারও ওলোট-পালোট আছে। জলেশ্বরী টাউনে সম্প্রীতি আছে, ভালো কথা। কিন্তু নষ্ট হতে কতক্ষণ। বিশেষ করে উন্মাদের এই সময়ে! নেয়ামতউল্লাহ্র মনে পলকের জন্যে এই ভাবনাটাও জেগে ওঠে যে, কাদিয়ানিদের নিয়ে জলেশ্বরীতেই বা কবে কার দুশ্চিন্তা ছিলো? কিন্তু হাই ইশকুলের ওই হেড মৌলভি! সে কি এই বিভেদের বিষ মুসলিম লীগের স্থানীয় নেতাদের কানে ঢালে নাই? হ্যাঁ, বশির আর্দালির কাছেই খবরটা তিনি পান। বশির আর্দালি মাত্র গত রাতেই খানার টেবিলে খানা পরিবেশন করতে করতে কাচুমাচু হয়ে প্রশ্ন করে, হুজুর, আপনে মোছলমান নাকি নন? সবায় যে সেই কথাটা বলিচ্ছে। – আর কী বলছে? – বলে আপনে নাকি নবীজিকে আখেরি নবী বলিয়া মানেন না? – আর কী বলেছে? – বলে পাকিস্তানের হাকিম যদি নবীকে আখেরি নবী বলিয়াই না মানে, তবে তো তাঁই কাফের। – আর কী? – আর এই শুনিলোম যে তারা কয় কাফেরের হাতেই যদি জলেশ্বরী তবে তো তাঁই সময় বুঝিয়া হিন্দুস্থানের হাতে জলেশ্বরী এলাকা তুলি দিবার পারে!

নেয়ামতউল্লাহ্র মনে পড়ে যায়, হাঁ, মুসলিম লীগের নজির মিয়া এসে জরুরি সাক্ষাৎ করেন তাঁর সঙ্গে। বড় উত্তেজিত হয়ে তিনি জানতে চান, হাকিম সাহেব, আপনি যদি কাদিয়ানি, বিশেষ কী রসুলুল্লাহকে আপনারা আখেরি নবী মানেন না, এর সত্যতা যদি কিছু থাকে তো হামার কাছে গোপন না করেন! তারপর নজির মিয়া এটাও বলেন যে, পাকিস্তানের ফরেন মিনিস্টার যে নিয়োগ করা হয় বলিয়া শুনিছি, সেই জাফরুল্লাহ খানও বোলে কাদিয়ানি! হয় কি নয়? নেয়ামতউল্লাহ্কে স্বীকার করতেই হয়, হাঁ, জাফরুল্লাহ সাহেব কাদিয়ানি। তবে তিনি খুব জোরের সঙ্গেই বলেন, আমরা তো মুসলমানের বাইরে নই, মিস্টার নজির! আমরা আপনাদেরই মতো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ বলি। অনেক আন্দোলনের পর, অনেক ত্যাগ স্বীকারের পর পাকিস্তান হাসেল করা গেছে, আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া, কায়েদে আজমকে লাখো সালাম, এখন বারো ঘণ্টাও পার হয় নাই পাকিস্তানের, এর মধ্যে এ সকল কথা নিয়ে আপনি এসেছেন যে আমি পাকা মুসলমান কিনা, এটা কী উচিত হয়? – নজির মিয়া কথাটা নিয়ে আর কিছু অগ্রসর হলে, নেয়ামতউল্লাহ্ ভাবছিলেন তিনি বলে বসবেন কিনা – এই যে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, তিনিও তো সেই অর্থে মুসলমান নন, তিনি খোজা ইসমাইলি সম্প্রদায়ের, আর এই সম্প্রদায়ের লোকেরা আল্লাহর পাশাপাশি ব্রহ্মা-বিষ্ণুকেও মানে! না, এতটা ফাঁস করা বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। জিন্নাহ সাহেবের নামে এমন কথা বললে হয়তো তাকে কতল করাও ফরজ হয়ে যাবে মুসলিম লীগের এই লোকাল লিডারের!

হাকিম নেয়ামতউল্লাহ্ চিন্তিত হয়ে বসে থাকেন। তাঁর মুখে বাক্য নাই দেখে মন্মথ দারোগা সিদ্ধান্ত করে, ওয়াহেদ ডাক্তারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে এখন সেটাই তিনি ভাবছেন। অধীর হয়ে দারোগা একসময় বলে ওঠে, তবে কি ফোর্স নিয়ে হরিষাল রওনা হয়ে যাবো? আপনার হুকুমের অপেক্ষায় আছি। নেয়ামতউল্লাহ্ ভুলেই গিয়েছিলেন ওয়াহেদ ডাক্তারের কথা। তিনি ডুবে ছিলেন কাদিয়ানি নিয়ে দুর্ভাবনায়, আর মুর্শিদাবাদে ফেলে আসা তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের চিন্তায়। বোধহয় তিনি ভালোই করেছেন ওদের ওখানে রেখে এসে। বিদ্যুচ্চমকের মতো চকিতে এমন কথাও তার মনে খেলে যায় যে, মুর্শিদাবাদেই তিনি ফিরে যাবেন কিনা, আর সেখানে গিয়ে পাকিস্তানে নয় হিন্দুস্থানেই থেকে যাবার অপশন তিনি গ্রহণ করবেন কিনা। হাঁ, এমন খবর তাঁর কাছে পৌঁছেছে যে, সদ্য স্বাধীন পাকিস্তান আর হিন্দুস্থানে যে যেখানে ব্রিটিশ আমলের চাকরিরত, কি হিন্দু কি মুসলমান, তাদের সুযোগ দেওয়া হবে দুই দেশের মধ্যে একটি দেশকে বেছে নেবার। মুসলমান বলেই যে পাকিস্তানে থাকতে হবে আর হিন্দু বলেই যে হিন্দুস্থানে, তার কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। স্বাধীন দেশ, স্বাধীন ইচ্ছা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত। কিন্তু নেয়ামতউল্লাহ্ জানেন স্বাধীন সিদ্ধান্তও স্বাধীন ঠিক নয়, বাস্তবতার শর্ত সাপেক্ষেই সিদ্ধান্ত, আর বাস্তবতা হচ্ছে কায়েদে আজম জিন্নাহ ধর্মের নামে দেশভাগ করিয়েছেন ব্রিটিশকে দিয়ে – এ ক্ষেত্রে তিনি মুসলমান হয়ে পাকিস্তানের জলেশ্বরীতে কর্মরত থেকে হিন্দুস্থানে যাবার অপশন দিলে ব্যাপারটা কি লন্ডভন্ড হয়ে যায় না। বিশ্বাস কী – হিন্দুস্থানের অপশন নিয়ে হিন্দুস্থানে গেলে যদি সেখানকার হিন্দুরা তাঁকে মনে করে যে, আসলে তুমি গুপ্তচর, তাই মুসলমান হয়েও তুমি হিন্দুস্থানে চাকরি করতে এসেছো!

স্যার! মন্মথ দারোগার ডাকে চমক ভাঙে নেয়ামতউল্লাহ্র। – স্যার, আপনার হুকুমের জন্যে বসে আছি। পাকিস্তানের বয়স এখনো মাসও পোরে নাই, এর মধ্যে একজন স্বাধীন ডিক্লেয়ার যদি দেয়, যদি একটা এলাকা তার নিজের রাজ্য বলিয়া ঘোষণা দেয়, তবে আর শাসন কোথায় থাকে? করাচিতে খবর পৌঁছাইলে তো সবেবানাশ! করাচির নামে হুঁশ হয় নেয়ামতউল্লাহ্র। হাঁর, করাচি। পাকিস্তানের রাজধানী। তদুপরি করাচির আরো কত সম্মান – জিন্নাহর জন্মস্থান! ব্যস্ত হয়ে নেয়ামতউল্লাহ্ বিশদ বিবরণ জানতে চান মন্মথ দারোগার কাছে। – হরিষালে তার রাজত্ব ঘোষণা করিয়া ওয়াহেদ ডাক্তার এক মানুষকে ফাঁসি দিয়াছে! – বলেন কী! – জমি নিয়া দাঙ্গা। দাঙ্গায় এক মানুষ খুন হয়। খুনিকে ধরে এনে বিচার করিয়া ওয়াহেদ ডাক্তার ফাঁসির হুকুম দেয়। ওথাকার ইশকুলে তার দরবার। ইশকুলের বেঞ্চির উপর দাঁড় করেয়া কুয়ার জল তোলার রশিতে লোকটাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। পাকিস্তানে থাকিয়া পাকিস্তানের বুকে এতবড় একটা কার্য করা, বসি বসি তো তামাশা দেখিবার নয়! এ তো পাকিস্তানের বুকে কুড়ালের কোপ!

কুড়ালের কোপ! কথাটা জলেশ্বরীর হাকিম নেয়ামতউল্লাহ্ সরকারিভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। তাঁর মনে সন্দেহ চলকে ওঠে। তিনি যদি হিন্দুস্থানে যাবার অপশন দিয়ে সত্যি সত্যি যান, আর সেখানে যদি তাঁকে পাকিস্তানের গুপ্তচর সন্দেহ করা হয়, তবে সমুখের এই লোকটি, এই মন্মথ দারোগাকে হিন্দুস্থানের চর মনে করা যেতেই পারে। হাঁ, লোকটা হিন্দু, পাকিস্তানের জন্য এত দরদ তার! ভেতরে কোনো কথা নাই কি? হয়তো, ওয়াহেদ ডাক্তারের কথাটাই ভুয়া। একটা অজুহাত তুলে নবীন রাষ্ট্র পাকিস্তানের নিশ্চয় কোনো ক্ষতি করতে চাইছে এ দারোগা। বাজে একটা হাঙ্গামা বাধিয়ে এলাকায় ধুন্দুমার কান্ড করতে চাইছে। নেয়ামতউল্লাহ্র কানে এসেছে, নেহেরু নাকি বিশ্বাসই করেন না যে পাকিস্তান দুমাসের অধিক টিকবে। আর এই ধারণার কারণেই নেহেরু বরাবর পাকিস্তানের বিরোধিতা করে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে যে হোক পাকিস্তান! দেখা যাক কতদিন টেকে! আবার সব ঘুরে আসবে হিন্দুস্থানে। মালাউন আর কাকে বলে! নেহেরু থেকে শুরু করে ছোটবড় বহু মালাউন দেখা আছে নেয়ামতউল্লাহ্র। মন্মথ দারোগার কথাকে তিনি শেষ পর্যন্ত আমলেই আনেন না। বলেন, উন্মাদ! – কথাটা কি আমাকে বললেন, স্যার? – না, আপনাকে নয়! চোখ সরু করে মন্মথ দারোগাকে নিরিখ করেন নেয়ামতউল্লাহ্। না, তোমাকে উন্মাদ আমি ভাবি নাই। তুমি চতুরের চতুর। তোমার মতলব নেহেরুর সাধ পূরণ করা যে পাকিস্তান বানচাল হয়ে যাবে!

ছারপোকার কামড় অসহ্য হয়ে ওঠে হঠাৎ। এতক্ষণ কথার তোড়ে নেয়ামতউল্লাহ্ দিব্যি ভুলে ছিলেন কামড়ের জ্বলুনিটা, চেয়ার থেকে তিনি এখন লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ান। কিন্তু তাঁবেদার কর্মচারীর সমুখে নিজের পেছন চুলকানো কোনো কর্মকর্তার পক্ষে শোভনীয় নয়, অতএব চুলকোবার হাতটা সামলে রাখতে হচ্ছে, ওদিকে কামড়ের জ্বলুনিটাও তীব্র হয়ে উঠছে. নেয়ামতউল্লাহ্ প্রায় ক্ষিপ্ত স্বরে চেঁচিয়ে ওঠেন, যান! বাড়ি যান। থানায় যান। ডিউটি করেন। রাজেন্দ্রবাবু আর নজির মিয়ার ওপর নজর রাখেন। পাকিস্তান হলেও এখনো হিন্দু-মুসলমানের মীমাংসা হয় নাই। এখনো কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের ঝগড়া মেটে নাই। যান, যান! দারোগা বিদায় নেবার অপেক্ষা না করে নেয়ামতউল্লাহ্ দ্রুত ভেতরে যান, প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠেন, একটানে খুলে ফেলেন পাজামা, পশ্চাৎদেশ চুলকোতে থাকেন উন্মাদের মতো।

উন্মাদ! আমরা ভুলি নাই যে দারোগার মুখে ওয়াহেদ ডাক্তারের কথা শুনে  নেয়ামতউল্লাহ্ উন্মাদ শব্দটি উচ্চারণ করে উঠেছিলেন। আমরা এর আগে আমাদের এই কথনে কয়েকবারই উন্মাদ শব্দটি পেয়েছি। শুধু মানুষের জন্যে নয়, নদীর পক্ষেও শব্দটি একাধিকবার উচ্চারিত হয়েছে। আধকোশা নদী! জলেশ্বরীতে জন্ম নেয়া, জন্মের পর জলেশ্বরী থেকে চলে গিয়ে আবার বহু-বহু দিন পরে বাবার মৃত্যুর ইতিহাস সন্ধানে ফিরে আসা আমাদের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক মকবুল হোসেন নানা মানুষের কাছে শোনে যে, এই নদীটির কথা উঠলেই তাঁর বাবা মইনুল হোসেন মোক্তার তার ভূতগ্রস্ত লাল টকটকে চোখে দেখে উঠতেন নদীর সেই ছবি – বর্ষায় ঘোর তার জলরাশি যেন উন্মাদের হা-হা হাসি আর রুখু চুলের তোড়।

আমাদের আরো মনে পড়বে আধকোশার পাড়ে বাংলাবাড়ির বারান্দায় বসে সাইদুর রহমান কন্ট্রাক্টর মকবুলকে বলছিলেন, – আপনার বাবা পাপ পুণ্যের কথা কইতেন। তাঁর জীবনের শেষকালে। সেই ভারত পার্টিশনের কালে। আমি তখন সদ্য যুবক। সদ্য কন্ট্রাক্টরি ধরিছি। এদিকে সদ্য পাকিস্তান হইছে। দালানকোঠা রাস্তাঘাট নতুন নতুন চাই। ধুন্ধুমার লাগি গেইছে। হেথা হতে হোথা রাস্তা বানান, সরকারি অফিসের দালান তোলেন, আর দুই হাতে পয়সা তোলেন ঘরে। আপনার বাবা একদিন হামার বাড়ির দরোজায় আসি কয়, সাইদুর রে, তুইও পাপের আগুনে হাত দিলি রে! চিন্তা করি, কাজকাম ধরিতে যে ঘুষ দিচ্ছি, হাঁ, সেকালেও ঘুষ ছিলো, পাকিস্তান হইছে বলিয়া তো আর সব পাকসাফ হয়া যায় নাই, মোর তখন চিন্তা হইলো আপনার বাপ বুঝি সেই ঘুষের কথা ধরি হামাকে শাসন করিলো! অবিলম্বে হামার ভুল ভাঙিলো। আপনার বাপজান তখন কয়, এই যে দেশটা ভাঙ্গি পাকিস্তান করা হইলো, ইয়ার থেকি বড় পাপ আর জীবনে দেখি নাই। পানির বদলে আগুন জ্বলিলো। পানি হামাকে শীতল করিবে কী আগুনে হামার সর্বস্ব পুড়িলো। তারবাদে আপনার বাবা মোক্তারসাব কয়, সাইদুর রে, এলা টের পাইস নাই, সময় আসিবে, সকলই প্রকাশ পাইবে। পাপ! পাপ! মকবুল সাব, আপনাকে বলিতে বাধা নাই, মুঁই স্পষ্টয় আইজ স্বীকার করি আপনার সাক্ষাতে, আপনার বাপজানকে তখন হামার উন্মাদ বলি মনে হয়। উন্মাদেই এমন কথা কয়! আল্লার নামে রসুলের নামে মোছলমান একটা দ্যাশ সৃষ্টি করিলো দুনিয়ার বুকে, পাকিস্তান তার নাম, আর তাকে তাঁই কয় কিনা – পাপ! উন্মাদ ছাড়া আর কি!

উন্মাদ! আমরা এ-কথনে দেখেছি সাইদুর রহমান কন্ট্রাক্টর শব্দটা উচ্চারণ করে আড়চোখে একবার দেখে নেবেন মকবুল হোসেনকে। ছেলের কাছে বাবাকে উন্মাদ ঘোষণা করা সহজ নয়, ভদ্রতাও নয়, যদিওবা সত্যি সত্যিই উন্মাদ হয়। সুস্থই বা কে? আর উন্মাদ কাকে বলে? কে শনাক্ত করে? কীসে বোঝা যায় সুস্থতা থেকে পিছলে পড়েছে মানুষটা। মকবুলের স্মরণ হয় গফুরের কথা। চাকরির খোঁজে ঢাকা এসে সাইদুর রহমানের এই জামাইটিই তো তাকে প্রথম বলেছিলো, আপনার বাবার মৃত্যু হয় নদীতে ডুবে। মকবুল তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে গফুরের সঙ্গে সেই সন্ধ্যাটির কথা প্রতি বিন্দুবিসর্গ সমেত মনে করতে চায়। গফুর তো বলে নাই মইনুল হোসেন মোক্তার উন্মাদ ছিলেন। সব কথা মুখে বলা যায় না। বলা হয়ে ওঠে না। চোখের ঝিলিকে মানুষ অনেক কথা প্রকাশ করে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও মকবুল হোসেন এখন গফুরের সেদিনের সেই মুখখানা, সেই তার সমুখে টুলের ওপর জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা গফুরকে কিছুতেই স্পষ্ট করে ফেরত পায় না। মকবুল চেষ্টা করে। মকবুল পূর্বসিদ্ধান্ত পর্যন্ত করে যে, উন্মাদ বলেই তার বাবা নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। নাকি গফুর বলেছিলো তিনি নৌকোয় করে কোথাও যাচ্ছিলেন, নৌকাডুবি হয়? ঝড় ওঠে? ঝড়েই তিনি নদীর বুকে তলিয়ে যান? উপন্যাসের লেখক মকবুল হোসেন তলিয়ে যায় তার কাহিনি নির্মাণের কারখানায়। তবে, আচম্বিতে তার চেতনাও ফিরে আসে। সে কাহিনিই বানিয়ে চলেছে যে তার বাবার মৃত্যু হয় আকস্মিক নৌকাডুবিতে। আর এটিও সে দেখতে পায়, এই কাহিনি নির্মাণের পেছনে তার যে-মনোভাব কাজ করছে তা হচ্ছে – তার বাবা যে উন্মাদ, এই কথাটি সে খারিজ করতে চাইছে। কিন্তু না। কোনো কোনো শব্দের আত্যন্তিক শক্তি অত্যন্ত প্রবল। মানুষের ভেতরে যেমন দুর্বল ও সবল থাকে, ক্ষীণ শীর্ণ এবং পালোয়ানও থাকে, শব্দেরও এমত থাকে। কোনো শব্দ মৃদু, কোনো শব্দ তাড়স আনা। কোনো শব্দ উত্তাল, কোনোটি বা শান্ত। সাইদুর রহমান কন্ট্রাক্টর নিজেও কি জানতেন উন্মাদ শব্দটি কতখানি ভীতিকর? ওই কথাটা শোনার পর কতটাই না স্তম্ভিত বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে মকবুল, তার ধারণা ছিলো?

বাংলাবাড়ির বাইরে রাতের নিবিড়ঘন সোঁ-সোঁ শব্দ, নদীর জলে জননীর হাত যেন পাড়ের ঘুমন্ত মাটিতে চাপড় দিয়ে চলেছে, ওরে ঘুমা, দূর থেকে ভেসে আসা ভাওয়াইয়া গানের কলি, এত রাতে কার প্রাণে সংগীত, কেমন বা সে নিঃসঙ্গ কিংবা হৃদয়-কাতর, এ-সকলের ওপর দিয়ে তীক্ষ্ণ নখরের অতিকায় কোনো পাখির ডানার মতো ঝটপট করে উড়ে যায়, যেতে থাকে, শব্দটা। উন্মাদ! উন্মাদ! মকবুল হোসেনের অন্তর চিরে যায়। সে ভাবে নাই তার বাবাকে কেউ উন্মাদ সাব্যস্ত করতে পারে। না, সে রকম তথ্য তার স্মৃতিতে নাই। স্মৃতিও এমন যে সতত প্রস্ত্তত থাকে নবীন সংবাদ গ্রহণ করে নিপাট সেসব তুলে রাখতে, ঘুম পাড়িয়ে রাখতে, যেন প্রয়োজনকালে তাকে জাগানো যায় বা নিজেই সে জেগে যায়। কিন্তু মকবুল এমত দেখতে পায়, তার স্মৃতিকক্ষও মোটে তৈরি ছিলো না এমন একটি সংবাদের জন্যে। উন্মাদ! সাইদুর রহমান কন্ট্রাক্টর স্খলিত হেসে বলেন, মাইন্ড করিলেন কি? হামার কথা নয়। তখনকার সময়ে মানুষজনে বলাবলি করিতো। তবে, মোর ধারণা অন্য। সেই অন্য ধারণাটি শোনবার জন্যে মকবুল সাগ্রহে কন্ট্রাক্টর সাহেবের দিকে তাকায়। অন্যরকম ধারণাটাই বা কি? মকবুল এটিও লক্ষ করে যে একটু আগেই তিনি তাঁর নিজের ধারণা হিসেবে মইনুল হোসেন মোক্তারকে উন্মাদ বলেছেন। আবার এই এখনই বলছেন, লোকের ধারণা, তাঁর ধারণা ভিন্ন প্রকার।

এসবই কয়েক মুহূর্তের জন্যে। আবার ফিরে আসে সেই শব্দ – উন্মাদ! কানের কাছে ঠা-ঠা করে বাজতে থাকে – উন্মাদ! তার বাবা তবে উন্মাদ বলে সাব্যস্ত হয়েছিলেন জলেশ্বরীতে? চারদিক থেকে নিস্তব্ধতা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। একে নিস্তব্ধতা বলা ভুল। কোনো কোনো স্তব্ধতা করতালের কান-ঝাঁঝানো শব্দেরও অধিক ও লোহার চেয়েও গুরুভার। পাখির উড়ে যাবার শব্দ হয় কোথাও। তক্ষক ডেকে ওঠে। এমনকি নক্ষত্র পুড়ে যাবার সিঁ সিঁ শব্দ মহাকাশকে মথিত করতে থাকে। মকবুল হোসেনের সকল সমতলে এ-সকলের অাঁচড় পড়ে। সাইদুর রহমান বিদায় নেন ত্রস্ত পায়ে। যেন আগুনলাগা বাড়ি থেকে তিনি দ্রুতপায়ে নিষ্ক্রান্ত হন। গেলাশের তলানিটুকু এক ঢোকে গিলে নিয়ে মকবুল মাথা ঝাঁকিয়ে ওঠে পাকস্থলীতে তরল আগুন বহে যাওয়ায়। সে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।

ছোটবেলার কথা মনে পড়ে মকবুলের। তার মা বিষাদ সিন্ধু পাঠ করে শোনাতেন তাকে। চোখের সমুখে স্পষ্ট সে দেখে উঠতো নদীটিকে। ফোরাতের তীরে সেই সৈন্য সমাবেশ। সেই খর দুপুর। সেই উত্তপ্ত বালুরাশি। সেই তৃষ্ণা। সেই যুদ্ধ। হোসেন কি উন্মাদ ছিলেন যে সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সহস্র বলীয়ান শত্রুর দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন? অথবা তিনি যে বিশ্বাস করেছিলেন কুফায় পৌঁছুলে তাঁকে শ্রদ্ধা ও সমাদরে গ্রহণ করা হবে, সেই সরলতা কি এক উন্মাদেরই ছিলো? আহ, সরলতা। কে নির্ণয় করতে পারে মানুষের সরলতা। মানুষকে তো আমরা আমাদেরই পরকলা পরা চোখের ভেতর দিয়ে দেখি। আমরা যদি উন্মাদ তো জগৎ উন্মাদ দেখি। আমরা যদি তস্কর, তবে জগতের সকলেই তস্কর। সাধু তো সাধু। কে পারে নিরপেক্ষ হতে? এবং সেই নিরপেক্ষতা থেকে জরিপ করতে? এই সকল কথা এখন মকবুলের মনে হয় কি হয় না, মকবুলের ভেতরে উন্মাদ শব্দটি উথাল-পাথাল হয়ে ওঠে। নদীর বুকে ভাঙা জল ভেসে যায়। r (চলবে)