নহ মাতা নহ কন্যা

লেখক:

রফিকুর রশীদ

কার্তিকের কুয়াশা এবার যেন আশ্বিনের গোড়াতেই ঘিরে ধরেছে চারিদিক। সন্ধ্যা ঘনিয়ে নামতে না নামতেই মিহি বরফকুচির মতো কুয়াশা পড়তে শুরু করে। সেই কুয়াশায় ভিজে ভিজে গ্রামের বউ-ঝিয়েরা আসে পূজামন্ডপে ঠাকুর দেখতে। প্রতিমা-দর্শনকে তারা বলে ঠাকুর দেখা। তাদের কৌতূহলের অন্ত নেই। সারাদিনের ঘর-গেরস্থালি সামলানোর পর স্নানটান সেরে বেশ একটা স্নিগ্ধ পবিত্রতা অন্তরে ধারণ করে তারা আসে মন্ডপে। বাইরের রেলিং ধরে দাঁড়ায়। কী যে দেখতে চায়, আর বাস্তবে কী দেখতে পায়, তার নেই ঠিকঠিকানা। বাঁশ-খড়-কাদা-মাটিতে প্রতিমার মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর পূজা কমিটির লোকজন পর্দা টেনে দিয়ে যায়। মাথার ওপরে এনার্জি সেভিং বাল্ব আলো ছড়ায় ফকফকা, পর্দার ভেতরে রবি পাল তার সঙ্গী-সাগরেদদের নিয়ে কাজ চালিয়ে যায়; পর্দার আড়াল ঠেলে যেটুকু আলো বাইরে বেরিয়ে আসে তাতে গা-ছমছমে অন্ধকার আরো ভুতুড়ে পরিবেশ রচনা করে কুয়াশার সঙ্গে মেশে। তবু তাদের আসা চাই। কুয়াশার চাদরের আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি দেওয়া চাই। একটুখানি ফাঁক-ফোকর গলে যদিবা সামান্যতম দেবীদর্শনও ঘটে যায়, তাতেই জীবন ধন্য। রবি পাল সহসা একদিন এদের মধ্যেই আবিষ্কার করে বসে তার হারানো কন্যা সাবিত্রীকে। ঠিক সেই নাকমুখের গড়ন, থুতনির নিচে কাটা দাগ, চোখদুটো টানাটানা – চমকে ওঠে রবি পাল। হৃৎপিন্ড লাফিয়ে ওঠে। রেলিংয়ের দিকে দুপা এগিয়ে যায় আর ভাবে, এ হতভাগী এখানে এলো কেমন করে! এ্যাঁ, ওইটুকুন মেয়ের মাথায় সিঁদুর! না না, সাবিত্রী সিঁদুর কোথায় পাবে! বিয়ের কোনো কথাই নেই, কেশবপুর হাই ইশ্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্রী; সেখান থেকে কলেজে যাবে, আইএ-বিএ পাশ করবে, তারপর মাথায় সিঁদুর। মাস্টারি করার শখ ছিল তার। কোথায় উড়ে গেল সেসব শখস্বপ্ন! গেলবার ভোটের মৌসুমে দুটো বদরাগী মোটরসাইকেল গাঁ-গাঁ করে ছুটে এসে হেডলাইটের তীব্র আলোয় প্রথমে সবার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, তারপর বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায় তাকে। কোথায় যায়, কতদূরে, অনেক তত্ত্বতালাশ করেও সে-কথা জানা যায়নি, অথচ এতদিন পরে এই এতদূরে প্রতিমা গড়তে এসে সেই সাবিত্রীকে এভাবে হাতের মুঠোয় পাওয়া যাবে – এ কি ভাবা যায়!

রবি পালকে এগিয়ে আসতে দেখে অল্পবয়সী বউটি মাথায় ঘোমটা তুলে দিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। রবি পাল তখন উদ্ধার করতে সমর্থ হয় সাবিত্রীর চেয়ে এই মেয়েটির গায়ের রং বেশ খানিক চাপা। গ্রামের মানুষ কালোই বলবে। না, না, এ মেয়ে তার সাবিত্রী নয়। এ-ব্যাপারে নিঃসংশয় হওয়ার পর সৃষ্টি হয়েছে আরেক জ্বালা। সাবিত্রীর অন্তর্ধান সেই কবেকার কথা! সহসা তার মুখ মনেই পড়ে না। অথচ এই ঘোমটা-টানা বউটি কেমন করে যেন রবি পালের  অন্তরের খুব নিভৃত এক কোণে নিজের জন্যে আসন পেতে নেয়। দেবীমূর্তির আদল ফোটাতে গিয়ে ভারি সংকট দেখা দেয়, কালোপনা সেই বউটি এসে তার কাঁধে ভর করে, কিছুতেই নামতে চায় না। রবি পাল তখন কী করে! হাতের কাজ ফেলে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে নিজ-হাতে গড়া খড়মাটির মূর্তির দিকে। চোখের পলক পড়ে না। তাকিয়েই থাকে নির্নিমেষ। দেবীর তখনো চক্ষুদান সম্পন্ন হয়নি। ফলে চোখে চোখে কোনো কথা হয় না। তবু অন্তরে অন্তরে আকুল হয়ে শুধায়,

সত্যিই তুই কৈলাস থেকে নেমে এয়েচিস মা?

দেবী নিরুত্তর। ভেতরে ভেতরে দগ্ধায় রবি পাল। আবার প্রশ্ন করে, কিসে চড়ে এলি এবার? গজে, না রথে?

উত্তর আসে না কিছুই। কিন্তু রবি পালের কানের দরজায় আছড়ে পড়ে সেই কবেকার কাল-সন্ধ্যায় শোনা দুর্বৃত্ত মোটরবাইকের গোঁয়ার গর্জন। তখনই কানে আঙুল গুঁজে বিভ্রমটা সে শুধরে নেয় – না, সে তো আগমনী ছিল না, ছিল প্রতিমা বিসর্জনের পালা। নৌকায় নয়, দেবী চলে যায় মোটরবাইকে চেপে; ওরা দুজনের মাঝখানে চেপে বসায়, মুখে রুমাল গুঁজে দেয়; তারপর ভটভটানো শব্দ তুলে হাওয়া। রবি পাল অস্ফুটে বিড়বিড় করে – সেই তোর যাওয়া, আর এই অ্যাদ্দিন পরে এলি মা?

সেবার সেই অঘটনের পর বছর দুই-তিন প্রতিমা গড়ার কাজে মনোযোগই দিতে পারেনি রবি পাল। বর্ষা গিয়ে শরতের কাশফুল পাখনা মেলতে না মেলতেই বিভিন্ন জায়গা থেকে কাজের বায়না আসে। না বললে তো চলে না। বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে বেশ কয়েক গ্রামের পূজামন্ডপে তাদের বাঁধা-কাজ; ফেরাবে কী করে? কৃষ্ণনগরের মালাকারদের যে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি, তাদের সঙ্গে টেক্কা দিয়েছে সত্য পাল। একমাত্র পুত্র নিত্য পালকে হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছে। নিত্য একবার বর্ডার টপকে ইন্ডিয়ায় গিয়ে দেখে আসে বিভিন্নরকম ঠাকুর। রবি তখন সবে কৈশোরে। নিত্য পাল পরম আগ্রহে কিশোরপুত্রকে শোনায় তার অভিজ্ঞতার বিবরণ, কাদামাটি তৈরি থেকে খড় বাঁশ বাঁধা-ছাঁদা সবই শেখে রবি পাল পরম নিষ্ঠার সঙ্গে। অল্পবয়সেই তার হাতযশ ছড়িয়ে পড়ে। ভারি নামডাক। নিত্য পাল গর্ব করে বলে – আমার খোকার হাতে প্রাণ পায় প্রতিমা, মূর্ত হয়ে ওঠে।

বাবার এসব ভারি কথা কানে যায় ঠিকই, সবটুকু বুঝতে পারে না রবি। বাবার কাছে জানতে চায়, মূর্ত হওয়া মানে কী বাবা?

নিত্যপাল একগাল হাসি ছড়িয়ে বলে, মূর্ত মানে প্রকাশ। এই যেমন – তোমার মাঝে মূর্ত আমি, আমার আর মরতে দ্বিধা নাই।

নিত্য পালের স্বভাবটাই ওই রকম। পেটে খানিক বিদ্যে থাকায় যখন-তখন ভারি ভারি কথা উগরে ওঠে। নিজের দোষে লেখাপড়া হয়নি রবি পালের। এজন্যে সে ভয়ানক দীনতা বোধ করে। শেষ পর্যন্ত নিজের মেয়ে সাবিত্রীকে ইশ্কুলে পাঠিয়ে সে-দীনতা থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছে রবি। কিন্তু সে-সাধই-বা পূর্ণ হলো কই! মা-উমা চলে গেল কৈলাসধামে। তখন কী করে রবি পাল?

এদিকে রবি পালের শিষ্য অনন্তের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। দীর্ঘক্ষণ গুরুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবান্তর ধরতে পারে না। বেশ কদিন থেকেই দেখছে এই আনমনা ভাব। এখন হলো কাজের সময়, এখান থেকে যেতে হবে আরেক জায়গায়, সেখানেও তাড়া আছে, এ-সময় আনমনা হলে চলে! মিহি করে মাখানো কাদার লেই হাত থেকে নামিয়ে রেখে কাছে এগিয়ে এসে সে জিগ্যেস করে – আজো কি কাজ…

খপ করে মুখের কথা কেড়ে নেয় রবি পাল, এতক্ষণ পর যেন দম নেওয়ার ফুরসত পায়, হ্যাঁ হ্যাঁ, আজো বন্ধ থাক।

সময় কিন্তু ফুরিয়ে যাচ্ছে। অনন্ত খুঁচিয়ে দেয় – কত তারিখ গেল মনে আছে তো!

বেদি থেকে নেমে এসে রবি পাল বলে, আরে যা যা! রবি পাল হাত লাগালে কদিন?

তা বটে, মন খোলসা থাকলে সে দুহাতে একাই পারে দশ হাতের কাজ গুটাতে। সে-কথা সবাই জানে। তার প্রবল বিশ্বাস, এ হচ্ছে দশভুজা দুর্গারই আশীর্বাদ। কাজে মন বসালে মা দুর্গা তখন করিয়ে নেয়। এই জায়গায় এসে রবি পাল অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস করে। গভীরভাবে বিশ্বাস করে –  এ-সময়ে নির্ঘাৎ তার গর্ভধারিণী মা স্বর্গ থেকে নেমে আসে, খুব নিভৃতে তার বুকের কবাট হাট করে খুলে নিশ্চিন্তে আশ্রয় নেয় এবং তাকে শত-সহস্রবার প্ররোচিত করে – খোকা তুই হাত চালা দেখি, আমি তো আছি!

রবি পাল দ্রুত হাত চালায়। খড় বাঁশ পাটসুতলি বাঁধে। কাদামাটি লাগিয়ে ভরাট করে। রাত জেগে জেগে নিপুণ হাতে চিকন মসৃণ কাজ করে। রংতুলিতে মনপ্রাণ ঢেলে দেয়। খুব ছোটবেলা থেকেই তো সে দেখেছে তার মা-জননী একা হাতে কেমন করে ঘরসংসার গুছিয়ে আলো করে রাখে! দশভুজা না হলে তাই কিছুতে সম্ভব! প্রতিমার গায়ে পোশাক-পরিচ্ছদ গয়নাগাটি পরানো সারা হলে দিব্যি সেই দশভুজা জগজ্জননী। চোখের কোণে সন্তানের জন্যে অবাধ প্রশ্রয়। তখন রবি পাল নির্মোহ এবং নির্লিপ্ত শিল্পীর মতো আর নির্বাক বসে থাকতে পারে না। প্রতিমার চোখে চোখ রেখে স্ফুট কণ্ঠে ডেকে ওঠে – মা! দয়াময়ী মা আমার! রাতের বৃন্ত থেকে ফুটে ওঠে ভোরের কুসুম। পাখিদের কলকাকলিতে জেগে ওঠে পৃথিবী। রবি পাল আকুল হয়ে ডুকরে ওঠে – মা ধরণি, এই যে এখানে আমি তোর অধম সন্তান। অকৃতি অধম।

স্থানীয় খবরের কাগজের শারদীয় সংখ্যায় একবার রবি পালের শিল্প-সংসার নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। সেখানে লেখা হয়, ‘রবি পালের হাতে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে প্রতিমা।’ এই ‘বাঙ্ময়’ শব্দটি নিয়ে সে পড়ে মহা আতান্তরে। কী অর্থ এই শব্দের? কাকে শুধাবে? তার খুব মনে হয়, বাবা বেঁচে থাকলে নিশ্চয় একগাল হাসি ছড়িয়ে অনায়াসে বুঝিয়ে দিত এই শব্দের মানে। প্রতিবেদক লিখেছে বেশ – রবি পালের ঐকান্তিক ইচ্ছা একটি মাতৃমূর্তি গড়ার। দুর্গাপ্রতিমা গড়তে গিয়ে তিনি নিমগ্ন চোখে মাকে দেখেন। তাঁর ইচ্ছে – গর্ভধারিণী মায়ের মূর্তিটি এমনভাবে গড়বেন, যেন সেদিকে তাকালেই দুর্গাপ্রতিমাকে দেখা যায়, যেন এই বাংলাদেশকে অনুভব করা যায়। রবি পাল অবাক হয় – এসব কথাও লিখতে হয় কাগজে!

না, সেই মেয়েটিকে আর কোনোদিনই দেখতে পায়নি রবি পাল। প্রথম দেখায় সাবিত্রীর চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্যের দিকগুলো যেমন একঝটকায় এসে তার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করেছিল, তারপর দিনে দিনে ঘোর কেটে যায়; দর্শনার্থীদের ভিড়ে তাকে খুঁজে না পেয়ে সে দুই চেহারার মধ্যে বৈসাদৃশ্যগুলো আবিষ্কারে তৎপর হয় সেই তেমন করেই। কিন্তু কোথায় সাবিত্রী! বৈসাদৃশ্যই বড় হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। তবু সেই ঘোমটা-টানা অল্পবয়সী বউটিকে

.অন্ততপক্ষে আর একবার দেখার খুবই ইচ্ছে জাগে। নাকে নথ, মাথায় ঘোমটা, পরনে ডোরা শাড়ি সেই মেয়েটির কোনো পরিচয় তো তার জানা নেই, কাকে কী শুধাবে? হাতের কাজ ফেলে অনন্তের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে সে প্রতিদিনই একাধিকবার এসে খোঁজ নিয়ে যায় – সে কি এলো?

না, সে আর আসে না।

সে যে সাবিত্রী নয় এ-কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পরও রবি পাল তাহলে কাকে খোঁজে? কেন খোঁজে? কাজের অবকাশে এ-প্রশ্ন সে নিজের কাছেই উত্থাপন করেছে। সত্যিই তো, সে কাকে খোঁজে? বুকের মধ্যে কিসের এত হাহাকার গুমরে ওঠে? কিসের এত শূন্যতা? প্রতিদিন পর্দা ঠেলে বেরিয়ে এসে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা কৌতূহলী মানুষগুলোর ভক্তিনম্র দৃষ্টির আয়নায় এতদিন পরে কী খোঁজে সে? কাকে খোঁজে? এমন তো ছিল না আগে! তবে কি ঘোমটাপরা অল্পবয়সী গ্রাম্যবধূটি অলক্ষ্যে কোথাও সর্বনাশের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে! আর দৃশ্যমানতার আড়াল থেকে সে বুঝি মজা দেখছে!

আবার একদিন দর্শনার্থীদের ভিড়ে এক মাতৃমূর্তিতে দৃষ্টি আটকে যায় রবি পালের। হ্যাঁ, মাতৃমূর্তিই তো! অল্পবয়সী এক যুবতীমাতা কেমন অবলীলায় তার জামার বোতাম খুলে দুগ্ধভারানত স্তনবৃন্ত গুঁজে দিচ্ছে অবুঝ সন্তানের মুখে। আর বাচ্চাটিও কেমন নচ্ছার – ডান হাতটা বাড়িয়ে সন্ধান করছে মায়ের বুকের অপর স্তনবৃন্তটি। হয়তো-বা প্রথম পোয়াতি মা, তবু তার চোখেমুখে এতটুকু দ্বিধা নেই, শরম নেই। রবি পাল নিজেই সরে আসে সামনে থেকে। পর্দার আড়ালে সরিয়ে আনে নিজেকে। আর তখনই দৃষ্টিজুড়ে নেমে আসে সাবিত্রীর মায়ের স্মৃতি। আকাশভাঙা লজ্জা ছিল তার চোখে। প্রথম সন্তান কন্যা হওয়ায় কত না কুণ্ঠিত সে! যেন-বা সমস্ত দায় তার। বুকের উষ্ণতায় লুকিয়ে রাখে কন্যাকে। একা একাই আদুরে গীত গায় – ও আমার সতীসাবিত্রীরে! তোকে কোথায় রাখি! এভাবেই নামকরণ ঘটে সাবিত্রীর। তার মা সদাসন্ত্রস্ত, মেয়েকে সর্বদা লুকিয়ে রাখে বুকের মধ্যে। শাড়ির অাঁচলের আড়াল তৈরি করে শৈল্পিক কায়দায়। তারপর শিল্পিত সেই ছায়াতলে সাবিত্রীর কচিমুখে তুলে দেয় স্তনবৃন্ত। একদিন কী এক অসাবধানতায় তার বুকের শৈল্পিক পর্দা খসে পড়তেই রবি পালের দুচোখ ভরে যায় কানায় কানায় মাতৃত্বের ছবির উদ্ভাসে। এসব সেই কবেকার কথা। চোখের পর্দা থেকে এখনো মোছেনি সেই দৃশ্য। রবি পাল কি তাহলে এতদিন পরে পুরনো সেই ছবি খুঁজে ফিরছে? সাবিত্রীর অন্তর্ধানের মাত্র মাসখানেকের মাথায় সর্পদংশনে বিদায় নেয় তার মা। কে জানে এতদিনে সে তার সতীসাবিত্রীকে খুঁজে পেয়েছে কিনা! না হোক দুগ্ধপোষ্য শিশু, তবু সাবিত্রীকে দেখে মাতৃবক্ষের দুগ্ধভান্ডার উথলে উঠতেও তো পারে! অসময়ে জোয়ার আসতে কি পারে না?

রবি পাল পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে দেবীপ্রতিমার কাছে। ষষ্ঠী এসে গেছে, বোধনের আর বিশেষ বিলম্ব নেই। পর্দা উঠে যাবে। দেবী উন্মোচিত হবে, সর্বসমক্ষে। তার আগে আপন সৃষ্টির সামনে এসে কুণ্ঠাহীন দৃঢ়তায় দাঁড়ায় রবি পাল। দেবীপ্রতিমার মাথার চেলি থেকে পায়ের আলতা পর্যন্ত ঘোরলাগা চোখে পর্যবেক্ষণ করে। পর্দা উন্মোচনের আগে শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নেওয়া – কোথাও কোনো সংশোধনী যদি লাগে! কোথাও! কোথাও! রবি পালের দৃষ্টি এসে দাঁড়িয়ে পড়ে প্রতিমার সুউন্নত বক্ষদেশের উপত্যকায়। কী চমৎকার সুডৌল গড়ন। যেন-বা স্বর্গ থেকে গড়িয়ে পড়া দুটি বাতাবিলেবু এইখানে এসে স্থির হয়েছে। এইখানে? রবি পাল তাকিয়ে দেখতে পায়, তার ডান হাত এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে প্রতিমা বক্ষের উপত্যকায়। কিন্তু এ কী উত্তাপ তার হাতের তালুতে! আশ্চর্য! অতি দ্রুত সে-উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। চমকে ওঠে রবি পাল। চোখ রগড়ে ভালো করে তাকায় – কে দাঁড়িয়ে তার সামনে – দেবীদুর্গা, নাকি সাবিত্রীর মা? স্বচ্ছ আলো ঠিকরে পড়ছে চোখেমুখে, তবু কেন যে এই অধ্যাস! কেন এ-বিভ্রম, কে বলবে?

প্রতিমাবক্ষ থেকে নিজের ডানহাত ক্ষীপ্রভঙ্গিতে টেনে নেয় রবি পাল। নিজেকেই সে ধিক্কার দিয়ে ওঠে – এসব কী হচ্ছে? কী মানে হয় এইসব কান্ডকীর্তির? সহসা রাগ চড়ে যায় মাথায়। সেই রাগ ঝাড়ে অনন্তের ওপরে –

হাঁ করে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস, এ্যাঁ?

অনন্ত কোনো রকমে উত্তর করে,

আপনার হাতের কাজ দেখছি কর্তা!

হাতের কাজ!

রবি পাল নিজের ডান হাতের দিকে একবার তাকায়। তারপর নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে অনন্তকে আদেশ দেয়,

একতাল কাদা নিয়ে আয় দেখি!

কাদা! সব কাজ গুটানোর পর আবার কাদা কী হবে?

বক্বক্ করিসনি তো! যা বলছি, তাই কর। কাদা আন।

রংচং হয়ে গেছে। এখন কাদা কোথায় লাগবে?

তুই কাদা আন। আমি অসুরের গায়ে কাদা দেবো। মুখে কাদা দেবো।