না

লেখক: নাগিব মাহফুজ

নুবাদ : কামরুল হাসান

 

নতুন হেডমাস্টারের আগমনের খবরটি পুরো স্কুলে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না। মহিলা শিক্ষকদের কমনরুমে বসে সেদিনের পাঠে শেষ দৃষ্টি বোলানোর সময়ই খবরটি তার কানে এসেছিল। এখন অন্যান্য শিক্ষকের সঙ্গে যোগ দিয়ে নতুন হেডমাস্টারকে স্বাগত জানাতে হবে, আবার হ্যান্ডশেকও করতে হবে। ভয়ে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল; কিন্তু এটা এড়ানোর কোনো উপায় নেই।

‘সবাই তার দক্ষতার প্রশংসা করে।’ একজন সহকর্মী বলল, ‘আবার তার কঠোরতার কথাও বলে।’

এরকম হতে পারে, সে-সম্ভাবনা সব সময়ই ছিল আর শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। তার সুশ্রী মুখম-ল বিবর্ণ হয়ে গেল, টানা কালো চোখে নেমে এলো স্থবির ভাব।

যখন সময় হলো শিক্ষকরা কেতাদুরস্ত হয়ে সারবেঁধে হেডমাস্টারের খোলা রুমে প্রবেশ করল। ডেস্কের পেছনে উঠে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষ সবাইকে তিনি সাদরে গ্রহণ করলেন। তাঁর উচ্চতা মাঝারি, শরীর কিছুটা হৃষ্টপুষ্ট, মুখ গোলগাল, নাক বাঁকানো আর চোখ ফোলা। প্রথম দেখায় তাঁর যে-জিনিসটা চোখে পড়ে তা হলো ফুলে ওঠা ঘন গোঁফ, দেখলে মনে হয় ধনুকের মতো বাঁকানো ফেনাযুক্ত ঢেউ। তাঁর বুকের দিকে দৃষ্টি সমান্তরাল রেখে সে এগিয়ে গেল। চোখের দিকে না তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। কিছু কি বলার আছে? অন্যরা যা বলেছে তাই কি বলবে? যা-হোক, সে চুপ করে থাকল, একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। শুধু হেডমাস্টারের চোখ কী বলছে তা দেখতে ইচ্ছা হলো। খসখসে হাতে হেডমাস্টার করমর্দন করলেন আর বিষণœ কণ্ঠে বললেন, ‘ধন্যবাদ’। মার্জিতভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে চলে এলো।

সারাদিনের কাজের ভিড়ে সব উদ্বেগ ভুলে থাকলেও তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে ভালো নেই। কয়েকজন ছাত্রী তো বলেই ফেলল, ‘মিসের মেজাজ ভালো নেই।’ এরপর কাজ শেষে পিরামিড রোডের শুরুতেই তাদের বাড়িতে ফিরে কাপড় ছেড়ে মায়ের সঙ্গে খেতে বসল। মা মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘সব ঠিক আছে তো?’

‘বদরান বাদাউইকে তোমার মনে আছে? আমাদের হেডমাস্টার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি।’ সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিলো সে।

‘সত্যি!’

এরপর একমুহূর্ত চুপ থেকে সে বলল, ‘তেমন কোনো ব্যাপার না। সেই কত আগের কথা, প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।’

 

খাওয়ার পর কিছু পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসার আগে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য পড়ার ঘরে গিয়ে ঢুকল সে। লোকটাকে তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে। না, ঠিক পুরোপুরি না। কীভাবে এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়া যায়? যখন বাদাউই প্রথম তাকে গণিত প্রাইভেট পড়ানোর জন্য এসেছিল, তার নিজের বয়স ছিল মাত্র চোদ্দো। আসলে পুরোপুরি চোদ্দো নয়। বাদাউইর বয়স ছিল পঁচিশ, ঠিক তার বাবার সমান। ‘দেখতে অগোছালো হলেও পড়া বোঝাতে পারে ভালোই’, তার মাকে সে বলেছিল। মা বলেছিল, ‘দেখতে যেমনি হোক, কেমন পড়ায় সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

বাদাউই ছিল চমৎকার একজন মানুষ আর জ্ঞান বিতরণের সঙ্গে তাল রেখে তাদের সম্পর্কও ধীরে ধীরে ভালো হলো। তাহলে ব্যাপারটা ঘটল কীভাবে? তার নিজের সরলতার জন্য বাদাউইর আচরণের পরিবর্তনেও সে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। তারপর একদিন তার বাবাকে ক্লিনিকে যেতে হয়েছিল কোনো এক কারণে আর বাড়িতে তার সঙ্গে ছিল কেবল বাদাউই। বাদাউইর ব্যাপারে তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না, কারণ তাকে সে চাচার সমতুল্য মনে করত। তাহলে কীভাবে ঘটল সেটা? তার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার প্রেম বা আকাক্সক্ষা ছাড়াই ব্যাপারটা ঘটে গেল। ঘটনার পর আতঙ্কের সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করেছিল আসলে কী হয়ে গেল আর বাদাউই উত্তর দিয়েছিল, ‘ভয় বা দুঃখের কোনো কারণ নেই। ব্যাপারটা নিজের ভেতর রেখো। তোমার যখন বয়স হবে আমি নিজেই প্রস্তাব নিয়ে আসব।’

বাদাউই তার কথা রেখেছিল এবং তাকে বিয়ে করার প্রস্তাবও নিয়ে এসেছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে তার ভেতরে এক ধরনের পরিপূর্ণতা এসেছিল, যার ফলে নিজের করুণ অবস্থা অনুধাবন করতে তার বেগ পেতে হয়নি। সে দেখতে পেল বাদাউইর জন্য সম্মান বা ভালোবাসা কোনোটাই তার নেই আর একজন আদর্শ ও নীতিবান ব্যক্তি সম্পর্কে যে ধারণা বা স্বপ্ন তার মনে ছিল বাদাউইর অবস্থান তার থেকে অনেক দূরে। তাহলে কী করার ছিল তার? দুবছর আগেই তার বাবা মারা গিয়েছিলেন আর তার মাও বাদাউইর ওরকম সরাসরি প্রস্তাবে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। যা-হোক, তারপরও মেয়েকে তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি তোমার ঝোঁকের কথা আমি জানি, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তোমার ওপরই ছেড়ে দিলাম।’

নিজের এই জটিল পরিস্থিতি সম্পর্কে সেও সচেতন ছিল। হয় তার প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে নয়তো দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। পরিস্থিতি এমন যে, তাকে হয়তো নিজের অপছন্দের কিছু একটা বাধ্য হয়ে করতে হবে। সে নিজে যেমন সুন্দরী আর সম্পদশালী, তেমনি চারিত্রিক উৎকর্ষের জন্যও তার একটা খ্যাতি আছে; কিন্তু তাকেই এখন এক শক্ত ফাঁদে আটকা পড়ে অসহায়ের মতো লড়াই করতে হচ্ছে, তাও আবার একজনের লোলুপদৃষ্টির সামনে পড়ে। পবিত্রতা নষ্ট হওয়া এক জিনিস আর নিজের সামর্থ্যরে ওপর নির্ভর করে তাকে টেক্কা দেওয়া আর এক জিনিস। বাদাউই বলল, ‘তোমাকে ভালোবাসি বলেই আমার দেওয়া কথার সম্মান করতে আমি এসেছি। আমি জানি তুমি শিক্ষকতা পছন্দ করো আর সেজন্য বিজ্ঞান কলেজে তোমার পড়াশোনাও তুমি শেষ করতে পারবে।’

এমন রাগ হলো তার যা আগে কখনো হয়নি। কদর্যতার মতো নিগ্রহকেও সে সব সময় প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। তাই নিজের বিয়ের চিন্তাকে বিসর্জন দেওয়াটা তার কাছে আসলে কিছুই না। আত্মনির্ভরশীলতাকেই সে সব সময় স্বাগত জানিয়েছে। মূলত একাকিত্ব এবং আত্মসম্মান যখন এক হয় তখন আর সেটা নিঃসঙ্গতার পর্যায়ে থাকে না। তার আরো সন্দেহ হলো যে, বাদাউই তার অর্থসম্পদের  জন্যই বিয়েটা করতে চাচ্ছে। পরে মাকে একদম সরাসরিই না বলে দিলো সে। উত্তরে মা বললেন, ‘আমার অবাক লাগছে তুমি প্রথম থেকে কেন এ সিদ্ধান্ত নাওনি।’

 

বাইরে বাদাউই তার পথ রোধ করে জিজ্ঞেস করল, ‘কী করে প্রত্যাখ্যান করলে তুমি? এর পরিণতি কী, তুমি জানো না?’ রুক্ষস্বরে সে উত্তর দিলো, ‘আপনাকে বিয়ে করার চেয়ে যে-কোনো পরিণতি মেনে নেওয়া ভালো।’ তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বাদাউইর কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।

পড়াশোনা শেষ করার পর বাড়তি সময় কাটানোর জন্য সে চাইল কিছু একটা করতে। এজন্যই শিক্ষকতা শুরু। এরপর বহুবার তার বিয়ের সুযোগ এসেছে, কিন্তু সবগুলোকেই সে ফিরিয়ে দিয়েছে।

‘কাউকেই কি তোমার ভালো লাগে না?’ মা ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করেছিল।

‘আমি কী করছি তা আমি ভালো করেই জানি’, সেও নম্রভাবে উত্তর দিয়েছিল।

‘কিন্তু সময় যে বয়ে যাচ্ছে।’

‘যদি যায় তবে যেতে দাও, আমার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’

ধীরে ধীরে তার বয়স বাড়ল। প্রেম-ভালোবাসাকে সে এড়িয়ে চলে, কারণ তার ভয় হয়। সব শক্তি দিয়ে সে প্রত্যাশা করে জীবনটা সুখের না হলেও, ধীরেসুস্থে পার হয়ে যাবে। সুখ-ভালোবাসা বা  মাতৃত্বে সীমাবদ্ধ নয়, নিজেকে এই বলে সে সান্ত¡না দেয়। নিজের শক্ত মনোভাবের জন্য কখনো তার দুঃখবোধ হয়নি। কে জানে সামনে কী হবে? তার সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হলো এই ভেবে যে, সেই একই ব্যক্তি আবার তার জীবনে ফিরে এসেছে। তার সঙ্গেই এখন দিনের পর দিন কাটাতে হবে আর তার মাধ্যমেই অতীত হবে জীবন্ত আর বর্তমান হবে বেদনাদায়ক।

এরপর দুজন যখন একা কথা বলার সুযোগ পেল বাদাউইই প্রথম জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছো?’

‘ভালো’, শীতলভাবে উত্তর দিলো সে।

কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বাদাউই প্রশ্ন করল, ‘এখনো তুমি … মানে … বিয়ে করেছ?’

আলোচনা অতিদ্রুত শেষ করতে ইচ্ছুক এরকম স্বরে সে উত্তর দিলো, ‘আপনাকে তো আগেই বলেছি আমি ঠিক আছি।’

শেয়ার করুন

Leave a Reply