নিদ্রালু সুন্দরী এবং অ্যারোপ্লেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

অনুবাদ : সম্পদ বড়ুয়া

মহিলা সত্যিই সুন্দরী, নমনীয়। গায়ের ত্বক কোমল – অনেকটা পাউরুটির রঙের মতো। চোখদুটো যেন সবুজ বাদামের শাঁস। মাথার কালো চুল সোজা কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে। এনডিনের মতো ইন্দোনেশীয় প্রাচীনত্বের আলোকিত আভা সেখানে ফুটে আছে। পোশাক-পরিচ্ছদে তার রয়েছে সূক্ষ্ণ অন্তর্নিহিত রুচি। গায়ে পিঙ্গল জ্যাকেট, নরোম ফুলের কারুকাজখচিত কাঁচা রেশমের ব্লাউজ, স্বাভাবিক লিনেনের লম্বা পাজামা। বোগেনভেলিয়া ফুলের রঙে ঘন দাগের জুতো তার পায়ে। নিউইয়র্ক যাওয়ার জন্য প্যারিসের চার্লস দ্য গল বিমানবন্দরে চেক-ইন লাইনে আমি যখন অপেক্ষা করছিলাম, ঠিক সে-সময়ে সিংহীর মতো সচেতন কৌশলী লম্বা লম্বা পা ফেলে তাকে আমার সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে দেখি। সঙ্গে সঙ্গে ভাবলাম, আমার দেখার মধ্যে এ-মহিলাই সবচেয়ে সুন্দরী। সে হচ্ছে একজন অতিপ্রাকৃত প্রতিচ্ছায়া, ক্ষণকালের জন্য যার অস্তিত্ব পাওয়া যায়; পরক্ষণেই সে টার্মিনালের ভিড়ে হারিয়ে গেছে।

সকাল নয়টা বাজে। সারারাত তুষারপাত হয়েছে; শহরের রাস্তায় স্বাভাবিকতার চেয়ে বেশি যানবাহন। হাইওয়েতে গাড়ির চলাচল একটু মন্থর, যেখানে ট্রাকগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে আর মোটরগাড়িগুলো বরফের মধ্যে ধোঁয়া ছেড়ে যাচ্ছে। তবে বিমানবন্দরের র্টামিনালের ভেতরে তখনো বসন্তের আমেজ।

আমি একজন বৃদ্ধা ডাচ মহিলার পেছনে দাঁড়িয়েছিলাম। সে তার এগারোটি স্যুটকেসের ওজন নিয়ে প্রায় একঘণ্টা তর্ক জুড়ে দিলো। আমি একঘেয়েমি বোধ করতে থাকি। ঠিক তখনই আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো সেই ক্ষণস্থায়ী প্রতিচ্ছায়ার প্রতি, যা আমাকে বাকরুদ্ধ করে চলে গেল। এজন্যে বৃদ্ধার স্যুটকেসের ওজনের বিবাদটির শেষ কীভাবে হলো তা জানা হলো না। আমার বিক্ষিপ্ত মনের চিত্ত-চাঞ্চল্যের কারণে মহিলা টিকিট ক্লার্ক আমাকে দাঁত খিঁচিয়ে ভৎর্সনা করার ফলে আমি একেবারে পাহাড় থেকে খাদে পড়ে গেলাম। কৈফিয়তের ছলে তাকে জিজ্ঞেস করি, প্রথম দর্শনেই ভালোবাসাকে সে বিশ্বাস করে কিনা।

‘অবশ্যই’, সে উত্তর দিলো, ‘এছাড়া অন্য কোনো কিছু তো অসম্ভব।’ মহিলা ক্লার্ক তার কম্পিউটার-পর্দার ওপর চোখ নিবদ্ধ রেখে জানতে চাইল, ধূমপায়ী নাকি অধূমপায়ী কোন ধরনের আসন আমি পেতে চাই।

‘এটা কোনো ব্যাপার নয়’, অনেকটা ইচ্ছাকৃত বিরক্তি নিয়ে বলি, ‘অন্তত যতক্ষণ এগারোটি স্যুটকেসের পাশে থাকব না।’

মহিলা এবার একটি বাণিজ্যিক হাসি দিয়ে ধন্যবাদ জানাল। তবে কম্পিউটারের উজ্জ্বল পর্দা থেকে চোখ সরাল না।

‘একটা সংখ্যা বেছে নিন’ ক্লার্ক মহিলা বলে, ‘তিন, চার বা সাত।’

‘চার’।

খুশিতে তার হাসি উজ্জ্বলতর হলো।

‘গত পনেরো বছর আমি এখানে কাজ করছি’ মহিলা বলে, আপনাকে প্রথম দেখলাম যিনি সাত পছন্দ করেননি।’

সে আমার বোডিং পাসে আসনসংখ্যাটি লিখে অন্যান্য কাগজসহ পাসটি আমার দিকে এগিয়ে দিলো। আঙুর-রঞ্জিত চোখে সে প্রথমবারের মতো আমার দিকে চোখ রাখল, যা সেই সুন্দরী মহিলাকে না দেখা পর্যন্ত আমার জন্য অনেকটা সান্ত্বনাই মনে হলো। ঠিক সে-সময়ে মহিলা জানাল, এয়ারপোর্ট বন্ধ হয়ে গেছে। সকল প্লেন ছাড়তে দেরি হবে।

‘কতক্ষণ দেরি হবে?’

‘বিধাতা জানে’, মহিলা ক্লার্ক হেসে বলে, ‘রেডিওতে সকালে বলেছে, এটা এ-বছরে সবচেয়ে বড় বরফঝড় হবে।’

মহিলা ঠিক বলেনি। এটা এ-শতাব্দীতে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ছিল। তবে প্রথম শ্রেণির ওয়েটিংরুমে ফুলদানিতে টাটকা গোলাপ দেখে মনে হলো, এখানে পরিপূর্ণভাবে বসন্ত বিরাজ করছে। রুম থেকে ভেসে আসছে শান্ত উচ্চমার্গের সংগীত, যা তাদের স্রষ্টা ওভাবেই তৈরি করেছিল। তাৎক্ষণিক আমার মনে হলো ওই সুন্দরী মহিলার এটাই উপযুক্ত আশ্রয়। আমি নিজের দৃঢ়তার মধ্যেই অনেকটা বিচলিত হয়ে অন্যান্য ওয়েটিং রুমে তাকে খুঁজতে থাকি। কিন্তু রুমগুলোর বেশিরভাগেই ছা-পোষা সাধারণ পুরুষ লোকজন বসে আছে যারা ইংরেজি পত্রিকা পড়ছে। তাদের স্ত্রীরা হয়তো অন্য কারো কথা ভেবে ভেবে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায় এমন জানালার দিকে তাকিয়ে বরফে ঢাকা মৃত চ্যাপ্টা পাতাযুক্ত গাছের সারিতে চোখ নিবদ্ধ রাখছে, কিংবা দেখছে তুষারে জমাটবাঁধা মিল-কারখানা অথবা হিংস্র সিংহের দ্বারা ছারখার করা রইসির বিস্তীর্ণ মাঠ। বিকেল হয়ে এলে ওয়েটিংরুমে আর কোনো সিট খালি দেখা গেল না। উষ্ণতা অসহ্যের পর্যায়ে পরিণত হলে আমি একটু মুক্ত হাওয়ার আশায় বেরিয়ে আসি।

বাইরে এসে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে। নানা ধরনের লোক ওয়েটিংরুমগুলোতে এসে ভিড় জমিয়েছে। ভিড় করছে শ্বাসরুদ্ধ করিডোরে, এমনকি সিঁড়ির ধাপগুলোতেও মানুষ গিজগিজ করছে, তাদের প্রাণি, বাচ্চাকাচ্চারা ভ্রমণের সরঞ্জামাদি নিয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। শহরের সঙ্গে যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাইরে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের প্রাসাদকে মনে হচ্ছে ঝড়ের মধ্যে বৃহদাকার একটা মহাকাশ ক্যাপসুল আটকে পড়ে আছে। সেই সুন্দরী মহিলা এসব নিস্তেজ শ্রীহীন মানুষের মধ্যে কোথায় পড়ে আছে চিন্তাটা আমি বাদ দিতে পারছি না। আমার খেয়ালি মন আমাকে অপেক্ষা করার সাহস জোগাচ্ছে।

দুপুরের খাওয়ার সময়েই বুঝে গেছি, আমাদের অবস্থা করুণ। বাইরে সাত-সাতটা রেস্তোরাঁ ক্যাফেটেরিয়া; গিজগিজ করা বারগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টা তিনেকও হয়নি – এরই মধ্যে সবগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কারণ একটিতেও খাবার পানীয় কিছু অবশিষ্ট নেই। পৃথিবীর সকল শিশুর মতোই ছোট ছেলেমেয়েরা কাঁদতে শুরু করেছে। গাদাগাদি করা মানুষের মধ্য থেকে বিশ্রী ভ্যাপসা গন্ধ বেরিয়ে আসছে। এটা এখন একটা সময়, যখন মনের মধ্যে ধাক্কা লাগে। এতসব হুড়োহুড়ির মধ্যে কিছু মুখে দেওয়ার জন্য আমি পেলাম শিশুদের দোকানে থাকা শেষ দুকাপ ভেনিলা আইসক্রিম।

দোকান পরিচালনায় যারা আছে তারা চলে গেলে ওয়েটাররা টেবিলের ওপর চেয়ার গুটিয়ে রেখে দিচ্ছে। আমি কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে আইসক্রিম খাচ্ছি; আয়নায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছি হাতে শেষ ছোট কাপ আর ছোট চামচ। আমি তখনো ভাবছি সেই সুন্দরী মহিলার কথা।

নিউইয়র্কে যাওয়ার জন্য যে-ফ্লাইটটার সময় সকাল এগারোটা নির্ধারিত ছিল সেটা রাত আটটায় ছাড়বে। ইতোমধ্যে আমি প্লেনে উঠে এসেছি, প্রথম শ্রেণির টিকিট কাটা অন্য যাত্রীরাও তাদের আসনে বসে গেছে। একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট আমাকে আমার সিটটা দেখিয়ে দিলেন। কিন্তু এ কী, আমার হৃদযন্ত্র বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমার পাশে জানালার ধারে সেই সুন্দরী মহিলা একজন পারঙ্গম ভ্রমণকারীর মতো সিট দখল করে বসে আছে। ভাবি, আমি এ-কথাগুলো লিখলে কেউ তা বিশ্বাস করবে না। আমি তো… তো… করে দ্বিধাপূর্ণ সম্ভাষণ জানালাম তাকে। সম্ভবত সে তা শুনতে পায়নি। নিজের আসনে মহিলা এমনভাবে বসেছে, যেন সে অনেক বছর ওখানে থাকবে। সবকিছু পরিপাটি করে যথাস্থানে গুছিয়ে রেখেছে। তার আসনটাও একটা আদর্শ ঘরের মতো করে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে যে, সবকিছু তার নাগালের মধ্যে আছে। এরই মধ্যে স্টুয়ার্ড আমাদের জন্য অভ্যর্থনাসূচক শ্যাম্প্যান নিয়ে এলো। আমি তাকে অনুরোধ জানিয়ে একটা গ্লাস হাতে নিলাম। পরে ভাবলাম, থাক – এখন না, সময়মতো এর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কারণ মহিলা এর মধ্যে শুধু এক গ্লাস জল চাইল। দুর্বোধ্য ফরাসি ভাষায় এবং পরে অনেকটা সাবলীল ইংরেজিতে স্টুয়ার্ডকে বলল, ফ্লাইট চলাকালে তাকে যেন কোনোভাবে জাগানো না হয়। তার উষ্ণ সিরিয়াস কণ্ঠস্বরে প্রাচ্যের বিষণ্ণতা।

স্টুয়ার্ড যখন পানি নিয়ে এলো, সুন্দরী মহিলা প্রসাধন-বাক্সটি তার কোলে তুলে নিল। ওটার কোনাগুলো তামার গিল্টি করা। বাক্সের একটা খোপ থেকে দুটো সোনালি পিল বের করে আনল। ওখানে ওরকম বিভিন্ন রঙের আরো পিল আছে। মহিলা সবকিছু এমন সুশৃঙ্খল আর গাম্ভীর্যের সঙ্গে সম্পন্ন করছে, যেন মনে হবে জন্মের পর থেকে অচিন্ত্যনীয় কোনো কিছু তার জীবনে ঘটেনি। সবশেষে সে জানালার শাটার টেনে নামিয়ে দিলো। সিটের পেছনের অংশ যতদূর নামানো যায় নামাল। জুতা না খুলেই কম্বলটা কোমর পর্যন্ত টেনে দিলো। এরপর আমার দিকটা পেছনে রেখে কোনো বিরতি না দিয়ে, কোনোরূপ হাই না তুলে, এমনকি নিজের অবস্থানও বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না ঘটিয়ে দীর্ঘ আট ঘণ্টা বারো মিনিটের নিউইয়র্কগামী এ-প্লেনে সে ঘুমিয়ে পড়ল।

এটা ছিল একটা উদ্দীপ্ত ভ্রমণ। আমি সবসময় বিশ্বাস করি যে, একজন সুন্দরী মহিলার চেয়ে অধিক সৌন্দর্য প্রকৃতিতে থাকতে পারে না। গল্পের বই থেকে উঠে আসা আমার পাশে নিদ্রাচ্ছন্ন মহিলার প্রভাব থেকে এক মুহূর্তের জন্য দূরে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। প্লেন ছাড়ার পরপরই স্টুয়ার্ড অদৃশ্য হয়ে গেল। তার পরিবর্তে একজন কার্টেসিয়ান পরিচারক এলো। সে মহিলাকে প্রসাধন সামগ্রী আর গান শোনার অ্যায়ারফোন দেওয়ার জন্য তাকে ঘুম থেকে জাগানোর চেষ্টা করছিল। সুন্দরী মহিলা স্টুয়ার্ডকে যে-নির্দেশনা দিয়েছিল আমি বারবার তা পরিচারককে বললাম। কিন্তু সে-মহিলার কাছ থেকে নিজের কানে শুনতে চায় যে, সে রাতের খাবারও খাবে না। তার নির্দেশনার বিষয়গুলো স্টুয়ার্ডের নিশ্চিত করার কথা। উলটো পরিচারক আমাকে ভৎর্সনা করল কারণ মহিলা তার গলায় ‘বিরক্ত করবেন না’ এ ছোট্ট কার্ডবোর্ডটা ঝুলিয়ে রাখেনি।

আমি একা একা রাতের খাবার খেলাম। খেতে খেতে নিজেকে নীরবে সব কথাই শুনালাম, যা মহিলা জেগে থাকলে তাকেই বলতাম। তার ঘুম এমন নিঃশব্দ গভীর যে, এক পর্যায়ে মনে হলো সে যে-পিল খেয়েছে তা ঘুম নয়, মৃত্যুর জন্য হয়তোবা। প্রতি চুমুকে আমি আমার গ্লাসটা ওপরে তুলে ধরি আর তার স্বাস্থ্য কামনা করি। সুন্দরী, তোমার স্বাস্থ্য কামনা করছি।

রাতের খাবারের পর্ব শেষ হলে আলো ঈষৎ অনুজ্জ্বল হয়ে আসে। ছোট পর্দায় কোনো ছবি বা সিনেমা দেখানো হচ্ছে। পৃথিবীর অন্ধকারে আমরা পাশাপাশি দুজন একবারে একা। শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঝড় থেমে গেছে। রাতের আটলান্টিক সুবিস্তৃত আর স্বচ্ছ। তারাদের মাঝে আমাদের প্লেনটা যেন গতিহীন স্থবির। এবার আমি কয়েক ঘণ্টার জন্য মহিলার বিষয়টি একটু একটু করে মনোযোগের সঙ্গে বিবেচনা করতে শুরু করি। তার জীবনের একমাত্র  চিহ্ন যা আমি খুঁজে পাই তা হলো আলতো ছুঁয়ে যাওয়া কপাল। ঘাড়ের চারপাশে সে সুন্দর একটা চেইন পরেছে যা সোনালি গায়ের রঙের কারণে চোখেই পড়ে না। নিটোল কান দুটিতে কোনো ছিদ্র নেই, নখগুলো গোলাপি উজ্জ্বল, স্বাস্থ্যসম্মত। তার বাঁ-হাতের ওপর একটা সাধারণ ব্যান্ড। তাকে দেখে মনে হলো, বয়স বিশের বেশি হবে না। আমি নিজেকে  সান্ত্বনা দিই এই ধারণা নিয়ে যে, সেক্ষেত্রে ওটা তার বিয়ের আংটি নয়। ওটা ক্ষণস্থায়ী কোনো এনগেজমেন্টের লক্ষণ হতে পারে।

‘জানি, তুমি ঘুমিয়েছ, নিরাপত্তায় নিশ্চিত, অস্বীকৃতির বিশ্বাসী পথে আছো, মুখে অকলঙ্ক রেখা; আমার হাতকড়া লাগানো বাহুর এত কাছে।’ শ্যাম্প্যানের ফেনায়িত চূড়ার দিকে তাকিয়ে জেরার্ডো দেজোর কর্তৃত্বময় সনেটের লাইনগুলো বারবার আউড়াচ্ছি। এবার আমি আমার আসনের পেছনের অংশ তার সমান করে নিচু করলাম। আমরা একসঙ্গে শুয়ে আছি, বিয়ের শয্যায় শোবার চেয়েও বেশি কাছাকাছি। তার কণ্ঠস্বরের মতোই মসৃণ ত্বক থেকে যেন নরম শ্বাস বেরোচ্ছে যা তার সৌন্দর্যেরই সৌরভ। এটা অবিশ্বাস্য মনে হবে। গত বসন্তকালে আমি কিয়োটোর প্রাচীন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষগুলোর ওপর ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার একটি চমৎকার উপন্যাস পড়েছি, যেখানে তারা শহরের সবচেয়ে সুন্দরী, নগ্ন পানাসক্ত মেয়েদের সঙ্গে রাত কাটানোর জন্য ভালো অঙ্কের টাকা দিয়েছিল। তারা একই বিছানায় ভালোবাসার যন্ত্রণায় কাতর ছিল। এসব সুন্দরী মেয়েকে তারা জাগাতে পারেনি, স্পর্শ করতে পারেনি। সত্যি বলতে কী, তারা চেষ্টাও করেনি কারণ তাদের আনন্দের মূল নির্যাস ছিল তাদের ঘুমের মধ্যে চেয়ে থাকা। সেই রাতে সুন্দরী মহিলার ঘুম দেখে আমার বার্ধক্যজনিত শিষ্টাচারের বিষয়টি যে শুধু টের পেয়েছি তা নয়, আমি পরিপূর্ণভাবে তা উপভোগও করেছি।

আমার মনে হলো, কয়েক ঘণ্টা আমি ঘুমিয়েছি। শ্যাম্প্যান আর সিনেমার নীরব মুখরতা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আমি ঘুম থেকে উঠে টের পাই, আমার মাথা বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আমি বাথরুমে ঢুকে পড়লাম। আমার দুটি আসন পরে সেই বৃদ্ধ মহিলা যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্মৃত মৃতের মতো তার এগারোটি স্যুটকেস রেখে এক বিব্রতকর অবস্থায় আছে। রঙিন মালার গুটিকার সঙ্গে আবদ্ধ তার পড়ার চশমাটা মেঝের মাঝখানে অলিন্দে পড়ে আছে। মুহূর্তের জন্য সেটা তুলে না দেওয়ার কারণে অনেকটা বিদ্বেষপ্রসূত আনন্দ আমি উপভোগ করলাম।

বেশি শ্যাম্প্যান পান থেকে মুক্ত হওয়ার পর আমি নিজের দিকে তাকালাম। মনের আয়নায় নিজেকে অপাঙ্ক্তেয় আর কুৎসিত মনে হলো। ভালোবাসার লুণ্ঠন প্রক্রিয়া এত ভয়ানক হতে পারে, ভেবে সত্যিই অবাক হলাম। এ-সময় কোনো রকম সংকেত না দিয়েই প্লেনটি উচ্চতা হারাল, তারপর সোজাপথে গতি বাড়িয়ে দিলো। ‘নিজ আসনে ফিরে যান’ লেখা সংকেত তখনো জ্বলছে। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি এ-আশায় যে, বিধাতার সৃষ্ট এ অশান্ত পরিবেশ সুন্দরীকে অবশ্যই ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলবে আর ভয় এড়ানোর জন্য সে আমার দু-বাহুতে আশ্রয় খুঁজবে। আমার তাড়াহুড়োর কারণে সেই ডাচ মহিলার চশমার ওপর আমার পা প্রায় মাড়িয়েই যাচ্ছিল; গেলে খুশিই হতাম। তবে আমি পা যথাস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আসি, চশমাটা তুলে নিয়ে মহিলার কোলে রেখে দিই। আগে এসে চার নম্বর সিটটা পছন্দ না-করার জন্য তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

সুন্দরী মহিলার ঘুম অজেয়। প্লেন যখন সুস্থিত হলো, কোনো এক ছলে তাকে ঝাঁকি দিয়ে জাগানোর ইচ্ছা আমার দমন করতে হলো, কারণ আমি চেয়েছিলাম প্লেনের যাত্রার শেষ সময়ে আমি তাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখব। এতে সে যদি রেগেও যায় যাক। আমি আমার সাহস ফিরে পাব, হয়তো আমার তারুণ্যও। কিন্তু আমি তা করতে পারলাম না। ‘জঘন্য’ প্রবল ঘৃণাভরে আমি নিজেকে বলি, ‘আমি কেন বৃষ রাশির ষাঁড় হয়ে জন্মালাম না।’

প্লেনের অবতরণের আলো জ্বলে উঠলে সুন্দরী নিজে নিজেই জেগে উঠল। সে এত সতেজ আর কমনীয় যেন এতক্ষণ গোলাপের বাগানে সে ঘুমিয়েছে। প্লেনে পাশাপাশি বসা বিবাহিত বৃদ্ধ দম্পতি যাত্রী ঘুম থেকে জেগে উঠে যেমন পরস্পরকে সুপ্রভাত সম্বোধন করে না, তেমনি সুন্দরী মহিলাও কোনো সম্ভাষণ করল না। তার মুখ থেকে মুখোশটা খুলে নিল, উজ্জ্বল চোখদুটো মেলে তাকাল, সিটের পেছনের অংশ সোজা করল, কম্বলটা একপাশে সরিয়ে রাখল। চুলগুলো এদিক-ওদিক ঝাঁকনি দিলো, সেগুলো আগের মতো বিন্যস্ত আছে। হাঁটুর ওপর প্রসাধন-বাক্সটি রেখে দ্রুততার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিল। এ-কাজে সে বেশ সময় ক্ষেপণ করল আর এজন্যে প্লেনের দরজা না খোলা পর্যন্ত আমার দিকে তার তাকাতে হলো না। এবার সে তার লিনক্স জ্যাকেটটা পরে নিল, খাঁটি ল্যাটিন আমেরিকান স্পানিশ ভাষায় একটা প্রথাগত কৈফিরত দেখিয়ে আমার সামনের পথ মাড়িয়ে গেল।

আমাদের রাত্রিযাপনকে আনন্দময় করে রাখতে আমার এত প্রচেষ্টার জন্য ন্যূনতম কোনো ধন্যবাদ বা বিদায় না জানিয়ে নিউইয়র্কের রৌদ্রময় এ-দিনে সে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।

 

[বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রতিভাধর লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের জন্ম ১৯২৭ সালের ৬ মার্চ কলম্বিয়ার আরাকাটাকায়। একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, চলচ্চিত্রকার, সাংবাদিক হিসেবে খ্যাত মার্কেজ ছোটকালে দাদা-দাদির স্নেহে বড় হয়েছেন। ছাত্রাবস্থায় আইন বিষয়ে পড়ার সময়ে মার্কেজ সাংবাদিক হিসেবে জীবন শুরু করেন। তাঁর প্রথম রচনা  Leaf Storm প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস One Hundred Years of Solitude তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে আসে। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা হচ্ছে –  The Autumn of the Patriarch (1975) Love in the Time of Cholera (1985)। ১৯৮২ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর রচনায় লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে জাদুবাস্তবতা, যাতে সাধারণ এবং বাস্তব পরিবেশে জাদুভিত্তিক উপাদান আর ঘটনাপ্রবাহ এসে যুক্ত হয়। জীবনের শেষ বাইশটি বছর তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকলেও লেখালেখি বন্ধ থাকেনি। ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল মার্কেজ মেক্সিকোতে মৃত্যুবরণ করেন। ‘নিদ্রালু সুন্দরী এবং অ্যারোপ্লেন’ গল্পটি মার্কেজের  গল্পগ্রন্থ Strange Pilgrims  (মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে Edith Grossman-কৃত ইংরেজি অনুবাদ)-এর Sleeping Beauty and the Airplane গল্পের অনুবাদ।]

%d bloggers like this: