প্রস্তাব এলেও কামাল প্রথম প্রথম ভোটযুদ্ধে নামতে রাজি হয়নি। তখনো সে ভিন্ন মানসিকতার। রোজগারের উৎস বলতে তো একটাই মাত্র ছোট্ট দোকান। সেটার ওপর তাদের সংসার সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। নির্বাচনে দাঁড়িয়ে স্থানীয় খরিদ্দারকে পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ করে দিয়ে লাভ কী? যারা বিরুদ্ধে থাকবে, তারা নিশ্চয় ভোটের পরে তার দোকানে আসবে না। গ্রামীণ চক্ষুলজ্জার এ অশুভ বিভাজন-সংস্কৃতি আদিকাল থেকে সুন্দরবনের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে। আজো তা চলছে। প্রস্তাব পাওয়ার পর সেই লজ্জা কমবেশি কামালকেও গ্রাস করতে

থাকল। রাতে খেতে বসে বউকে শুনিয়ে বলল, জানো, রাজি হইনি, এককথায় না বলে দিয়েছি।

রুবির চোখে হাসি, দুষ্টু দু-চোখ নিবদ্ধ কামালের দিকে। বিড়বিড় করে স্বগতোক্তি, এতো নিবিড় সংসারী বলেই তো তোমাকে …। আমার  তৈরি চাটনি কেমন হয়েছে বললে না তো? আরেকটু দেব?

সম্রাজ্ঞীর ইচ্ছা।

ভালো লাগার কথায় এতো মারপ্যাঁচ?

কামাল নিরুত্তর, চাটনির স্বাদ নিত ব্যস্ত। চেটে চেটে নিজেকে আরো বেশি তৃপ্ত করে তুলতে তৎপর।

এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই সেই কামাল মর্মে মর্মে বুঝল, ভোট বড় বালাই, তা দলের পক্ষে যেমন, প্রার্থীর পক্ষেও তেমনি। বাস্তবিক অর্থে তার ওপর চাপের খেলা শুরু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দলীয় সমর্থকদের চাপে এবং স্থানীয় নেতৃত্বের উস্কানিতে কামাল মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধ্য হলো। দোকানের সুফল বনাম ভোটে দাঁড়ানোরকুফল বেশ কয়েকটা দিন তার মনের কোণে কোণে একটা দ্বন্দ্বের আঁকিবুঁকি এঁকে চলল। কামাল সেই প্রথম বুঝল, পাবলিকের সমর্থনে যে জাদু রয়েছে তা বেশ উপভোগ করা যায়। অন্তত দোকানদারিতে তা মেলে না।

তারপর থেকে প্রতিদিন নতুন নতুন অনুভূতি কামালকে গ্রাস করতে থাকল। অনিচ্ছার বাষ্প কেটে গিয়ে তার মধ্যে কীভাবে যে ইচ্ছার আলো জ্বলে উঠল, কামাল নিজেই তা ভেবে পেল না। চারদিকের উত্তেজনায় যে-কোনো মূল্যে জেতার প্রত্যাশা তার মধ্যে মৃদু বাতাসে বাবুইয়ের বাসার মতো দুলতে শুরু করেছে।

কামাল বেশ বুঝতে পারল, এতোদিন ক্ষুদ্র ব্যবসার অন্ধগলিতে ডুবে থাকার কারণে তার পক্ষে নির্বাচনের তাপ-উত্তাপ ঠিকমতো বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি।

রবিবার সকালে দলীয় জেলা-নেতা সুবোধ ঘোষ এসে বললেন, এতোদিন ব্যবসার সঙ্গে জুড়ে থেকে অনেক পয়সাকড়ি করেছো, এখন ভোটে জিতে নিজের সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়িয়ে নাও। তুমি পারবে কামাল।

পারা না পারার অর্থ ঠিকমতো বুঝতে না পেরে কামাল ভাল্লুক চোখে চেয়ে থাকল সুবোধ ঘোষের দিকে।

কী, বুঝলে না? এ বুথের যা অবস্থা, দু-এক ভোটে হারজিত হবে। দু-চারজন দোদুল্যমান ভোটার প্রার্থীদের ভাগ্য ঠিক করে দেবে। তাদের যে-কোনো মূল্যে নিজের জালে জড়িয়ে নাও। একটু গাঁটি খসাতে পারলেই হলো। টাকা দিয়ে হোক, যুক্তি দিয়ে হোক, ভালোবাসা দিয়ে হোক কিংবা সুযোগ থাকলে ভয়ভীতি দেখিয়ে হোক – ওইসব হাতেগোনা কয়েকজনকে নিজের পক্ষে আনতেই হবে। কী, পারবে তো? খেলতে নেমে আর তো পেছনে সরে আসা যায় না।

কামালের জ্বলজ্বলে দু-চোখ তখনো স্থির নিবদ্ধ সুবোধ ঘোষের দিকে। সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা।

বক্তৃতা দেওয়ার সময় সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতাকে তুলোধোনা করে কীভাবে আম-মানুষের কাছে নিজেকে নয়নের মণি করে তুলতে হয়, তা ভালো করেই জানেন। অবশ্য নির্বাচনের সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। মুখে চার্লি চ্যাপলিনের হাসি আর হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে রাখেন দলের সাফল্যের জন্য সমস্ত রকম নিষ্ঠুরতার জলছবি। যে-কোনো মূল্যে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়াই তাঁর শেষতম অভিপ্রায়। কঠোর বাস্তবে সেই প্রতিফলনও ঘটাতে পেরেছেন বারবার। এদেশে সামনাসামনি মানবিক মমত্বের আড়ালে দল আর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে গণশক্তিকে ভঙ্গুর করে তোলাই রাজনীতির শ্রেষ্ঠতম বৈশিষ্ট্য। জেলার নেতা সুবোধ ঘোষ তা ভালোমতোই বোঝেন, সেই মতো অন্যদেরও যথেষ্ট প্রভাবিত করতে পেরেছেন। প্রচারলিপিতে সমাজতন্ত্রী হয়েও কীভাবে কর্মক্ষেত্রের স্তরে স্তরে চরম সামন্ততন্ত্রী হয়ে উঠতে হয়, সুবোধ ঘোষের চেয়ে তা বেশি কেউ জানেন না।

এসব কথা কামাল নিজের দোকানে বসে খরিদ্দারদের মুখে অনেকবার শুনেছিল। সেদিন চোখের সামনে তার প্রথম প্রমাণ পেল। বৈপরীত্যের হিসাবটুকু কামালের দু-চোখের সামনে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে অনুভবের অভিনব উত্তেজনা। একটিমাত্র প্রশ্নের গোলকধাঁধায় সবকিছু কেমন যেন গোলমেলে অবস্থায়, নির্বাচনের উত্তাপ ব্যক্তিজীবনকে এতো বেশি নাড়া দিতে পারে? সুবোধ ঘোষ সেই সত্য ও সূত্রটুকু তার মধ্যে কথার উত্তম প্রহারে বেশ জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন। কম্পিত শরীর নিয়ে কামালের চাপা প্রশ্ন, আজ সন্ধেয় জেলা পার্টি অফিসে বসে একটু কথা বলার অনুমতি দেবেন? আপনার কথায় খুব উদ্বেলিত হয়ে পড়েছি। তারপর যেমন যেমন বলবেন, বাড়িতে ফিরে এসে তা করার চেষ্টা করব।

সুবোধ ঘোষ কামালের পিঠে ডান হাতের তালুর কোমল স্পর্শ দিলেন, মুখে রহস্যময় হাসি। তাতেই কামালের সবকিছু জানা হয়ে গেল। তার শরীরে যে নতুন উত্তেজনা তা শুধু পলকা অনুভূতির নয়, নতুন বোধের, অভিনব উপলব্ধির, দ্রুততম রূপায়ণের।

নির্বাচনী লড়াইয়ে কামালের প্রথম পর্বের অভিজ্ঞতা এমনিই।

অভিজ্ঞান মানুষকে ক্রমে আরো পরিণত, আরো পরিপক্ব করে তোলে। সেটাই ঘটল কামালের জীবনে, বিন্দু থেকে সিন্ধুতে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার মতোই। অনুধ্যান পূর্ণতার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। সেই সূত্র অনুসরণের ফলে কামাল দ্বিতীয় পর্বে একেবারে ভিন্ন একটা অবস্থায় পৌঁছে গেল। জয়ের আগাম চিন্তা মাথার ভেতর চরকির মতো ঘুরছে। সুবোধ ঘোষ তো ঠিক কথাই বলেছেন। ব্যবসায় অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকলেও সম্মানপ্রাপ্তিতে ঘাটতি থেকে যায়। ওতে বাকি-খাওয়া খরিদ্দারদের চাটুকারিতা ছাড়া কিছুই নেই।

মজার মজার অভিজ্ঞতায় কামাল রোজ-রোজ আরো বেশি করে দুলতে বাধ্য হচ্ছে। ইতিমধ্যে বয়সে সিনিয়রদের অনেকেই তাকে কামালদা বলে ডাকতে শুরু করেছিল। জয়লাভের আগে এরকম আগাম সম্মানপ্রাপ্তিতে ভীষণ অভিভূত সে। নতুন নতুন ভাবনা তাকে বেশ পুলকিত করে তুলছে, যদিও ওই পুলক নিয়ে সে কাউকে কিছু বলতে পারল না। মনে মনে কত বেশি মরিয়া, সেই গাঢ় অনুভূতিতে ডুবে থাকতে বেশ লাগছিল। নির্বাচনী খেলা তার জীবনে যেন মেলা-দেখা আনন্দের সুখানুভব হয়ে উঠছে। কামালের শরীর চালিত হতে থাকল মনের অন্ধ গতিবেগের দ্বারা।

শনিবার দুপুরে খেতে বসলে বউ রোজি বলল, ভোটের বাড়তি খরচ নিয়ে শুধু শুধু ভাবছ না তো? দেখো, জেতার পরে এসব চিন্তা মাথায় আসবে না। গোগল, ক-বছরের পঞ্চায়েত সদস্য, ঘরদোর কী সুন্দর করে নিয়েছে দ্যাখো। এতোসব খরচের বহর ওর গায়েই লাগেনি। আজকাল কেমন সাজপোশাক পরে বাইরে বের হয় দেখেছো? সময় ফিরলে এসব সহজে সম্ভব। তাহলে আমরা পারব না কেন? রোজি আরো জানালো যে, স্নানের ঘাটে গেলে অনেকেই এখন তার দিকে ট্যারা চোখে তাকিয়ে থাকে। কামাল বুঝল, রোজির মধ্যেও রঙিন নির্বাচনী খেলা শুরু হয়েছে। সেও সেজে উঠেছে আসন্ন ভোটযুদ্ধে উপযুক্ত রসদ জোগাতে। অর্ধাঙ্গিনী বলে কথা, সেই ছোঁয়াটুকু রোজির মধ্যে জেগে ওঠাই স্বাভাবিক।

মনের পুলকে কামাল মানসিক খুশির বন্যায় ক্ষণেকের জন্যে ভাসল। রোজির মন্তব্য, সত্যি বলছি গো। আমিও এখন কেমন যেন তোমার মতো –

তুমি আমার সার্থক অর্ধাঙ্গিনী।

ভোটের দিন পাঁচেক আগে কামাল মনে মনে হিসাব করে বুঝল, তার বুথে মাত্র গোটা চারেক ভোটার তখনো মনস্থির করতে না পেরে পেন্ডুলামের মতো দুলছে। বাগে আনতে পারলেই তার কপালে হীরের আলো জ্বলবে। আরো ভাবতে পারল, ব্যবসায় রোজগারের প্রচুর সুযোগ থাকলেও প্রকৃত জৌলুস নেই। নিজেকে নিয়ে নিজের মধ্যে আবদ্ধ থাকাই শেষতম অবস্থান, অন্যের সামনে মেলে ধরার সুযোগ কই? কিন্তু ভোটযুদ্ধ জিতে গেলে দিব্যি সব ক্যারিশমা হাতের মুঠোয় চলে আসতে পারে।

এতোদিন অস্তগামী সূর্য সাতরং ছড়িয়ে রোজ সন্ধেয় আঁধারের কোলে ঢলে পড়েছে। কামাল তার মধ্যে বিশেষ কোনো জৌলুস অনুভব করতে পারেনি। সময় এলে দখিনা বাতাস বসন্তের বুক চিরে বয়ে গেছে। কামাল ভোটপর্বের গরমে সেদিন প্রথম সেই বাতাসের সুরে আগাম জয়ের গন্ধ পেল যেন। সন্ধের আগে রক্তিম সূর্য যেন তার জয়ের অগ্রিম ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসন্ন যুদ্ধে সে যেন একমাত্র সেনানায়ক। তাকেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে অন্য সকলকে ছাপিয়ে। মনে মনে আরো মরিয়া হয়ে উঠল কামাল। বিড়বিড় করে বলল, অর্থ ঢালতে হলে ঢালতে হবে। যদি কোনোভাবে পেন্ডুলামগুলিকে পক্ষে আনা সম্ভব হয়, তাতেও সে রাজি। প্রবল উত্তেজনায় মুষ্টিবদ্ধ ডান হাতটা ঘুসি মারার ভঙ্গিতে বাতাসে ভাসিয়ে দিলো, অস্ফুটে ‘ইয়া’ শব্দের তালে নিজের শরীরটাকে একবার দুলিয়ে নিল।

পরদিন সন্ধেয় সুবোধ ঘোষ পাশে বসিয়ে বললেন, ওরে, এতো ভাবনার কী আছে? কমলেশ ব্যানার্জির মতো মালখোর তোর বুথে রয়েছে, ওকে পক্ষে টানতে পারলেই ব্যস। কিছু অর্থ আর রঙিন জল দিতে পারলেই হলো। অবশ্য দেওয়ার পরে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কটা দিন ফেভিকলের মতো সঙ্গে লেগে থাকতে হবে। কমলেশের বাড়িতে দু-দুটো ভোট, পারলে নির্বাচনের আগে ওর বউকে একটা ভালো শাড়ি কিনে দিতে পারিস।

ইতোমধ্যে সৌরভ পাত্রের ভোটটা কামাল কিনে নিতে পেরেছিল, অবশ্য খুব বেশি দিতে হয়নি। মাত্র কুড়ি হাজার। প্রকাশ্যে ভোট দেবে বলে কথা দিয়েছে সৌরভ। এখন আর অর্থ ব্যয় নিয়ে খুব বেশি ভাবতে রাজি নয় সে। জিততে পারলে পাঁচ বছরে গণ্ডা গণ্ডা স্কিম আসবে হাতে। ঘুরপথে একটু ভাবতে পারলেই পুষে যাবে। এও ভাবল, জয়ী হয়ে জনসমর্থন বাড়লে দোকানের মালপত্তর বিক্রিবাটাতেও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। নির্বাচনী উত্তাপে সম্পূর্ণ নতুন ব্যবসায়ী ফিকির। মনে মনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, কমলেশকে যে-কোনো মূল্যে নিজের পক্ষে নিতেই হবে। সুবোধদা তো ঠিক কথাই বলেছেন, খেলায় জিততে গেলে ভালোমতো ঘুঁটি সাজানো খুব প্রয়োজন।

অবশ্য কমলেশকে নিয়ে অভিনব বিপত্তিও রয়েছে। সারাদিন রঙিন জল খেয়ে রাস্তার পাশে যত্রতত্র শুয়ে থাকে। মাত্র কয়েকটা বাড়তি টাকার লোভে অন্যদিকে ঘুরেও যেতে পারে। কামাল কিছুতেই চায় না, আসন্ন ভোটযুদ্ধে কমলেশ দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলাম হয়ে থাকুক।

শনিবার সন্ধেয় কামাল গিয়ে বসল কমলেশের ছোট্ট বারান্দায়। একটু আগে বাড়িতে ফিরেছে কমলেশ, রঙিন জল বেশি টেনে চুর হয়ে এক চিলতে বারান্দার দক্ষিণ প্রান্তে চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছে। প্রায় বেহুঁশ, দেখলে মনে হবে মরা মানুষ। কামাল ডাকল, শুনছ কমলেশ, আমি কামাল, তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।

কে? কামালদা? তুমি? কমলেশ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে।

কমলেশ, তোমার কাছে এসেছি।

কেন, বলো শুনি।

কাল তো ভোট।

আমাকে কী করতে হবে বলো?

তোমার ভোটটা আমার চাই।

বেশ তো দেব।

সত্যি বলছ?

তোমার শরীর ছুঁয়ে দিব্যি করছি, এবার বিশ্বাস হলো তো? আগে বলো, কী কী অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছ?

সকালে ক্যাম্পে গেলে টিফিন আর কোল্ড-ড্রিঙ্কস, দুপুরে মাংস-ভাত।

আরে, এ তো কমন, সকলের জন্য। আমার জন্যে কী কী স্পেশাল লাগবে, শুনে নাও। মাইরি বলছি, তোমার শরীরের দিব্যি, কদিন ধরে কেবল ভাবছি গিন্নিকে একটা ভালো শাড়ি কিনে দেব; কিন্তু তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। আজো কিছুতেই মোট টাকাটা এক করতে পারলুম না। তাই একটা ভাবনা মাথায় ঘুরছে। ভোট এসেছে যখন …।

হাসিমুখে কামালের প্রশ্ন, কত লাগবে বলো?

মাইরি বলছি, বেশি বলব না, হাজারখানেক হলেই চলবে।

বেশ তো দেব, আরো কিছু?

না মানে দুটো দিন আমার গ্লাসের খরচটুকু …। বিশ্বাস করো কামালদা, ভোট তোমাকে দেবই। তাহলে সকালে টিফিনের সঙ্গে ড্রিঙ্কসের ব্যবস্থা থাকছে তো?

সেভাবেই অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছি।

থ্যাংকু কামালদা, থ্যাংকু, ঠান্ডা খেতে আমার খুব ভালো লাগে, যা টেস্টফুল।

কামাল ডান হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল কমলেশের সঙ্গে। মুখে ঝাঁঝালো হাসি, বিড়বিড় কথায় বুঝিয়ে দিলো, যত খুশি খেতে পারো।

কমলেশ খুশিতে ডগমগ, উঠে দাঁড়িয়ে আবার কামালের শরীর স্পর্শ করে বলল, এই তোমার গা ছুঁয়ে কথা দিলুম। কমলেশ কখনো কথার নড়চড় করে না। আমার কথায় বিশ্বাস রেখে ফিরে যেতে পারো।

কামাল সন্তুষ্ট চিত্তে বাড়ির পথে পা বাড়ালো। টার্গেট পূরণ হলে যে কেউ যেমন খুশিতে ভাসে, কামালের অভ্যন্তরীণ অবস্থা তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দের।

কমলেশের নেশার মত্ততা তখন অনেকটা কমে এসেছে। সাফল্যের খুশিতে ভাসছে। যশোদাকে সামনে পেয়ে বলল, এ্যাই শুনলে তো, জরুরি সময়ে তোমার জন্যে পুরনো দাবিটুকু কেমন করে আদায় করে নিতে পারলুম। জানো যশোদা, আমার মাস্টারপ্ল্যান সহজে মিস হয় না।

সলজ্জ হাসি যশোদার মুখে।

আজকাল দুটো দিন তোমাকে আর আমার জন্যে কষ্ট করে রাঁধতে হবে না। কামালকে খেয়েই চালিয়ে দেব। এ্যাই দ্যাখো, আমার হাতের মুঠোয় আজ রাতে রঙিন জল খাবার খরচটুকুও দিয়ে গেল।

যশোধার তীব্র ঝংকার, অন্যের পয়সায় এভাবে নিজের শরীরটা নষ্ট করবে?

এ্যাই, এ্যাই, একটাও কথা বাড়াবে না, হিসাব বোঝে না মেয়েমানুষ। তোমার সব কথা শুনব ভোটযুদ্ধ শেষ হলে।

এভাবেই শুধু কমলেশের মন নয়, সমগ্র শরীরটা সম্পূর্ণ ভোটের আসরে নেমে পড়ল।

পরদিন রবিবার। সকাল থেকেই নির্বাচনের উত্তাপ ঘরে ঘরে। নতুন সূর্য সাতরং মেলে দিয়েছে ঘটখালিপুর গ্রামে। মূলত দুই যুযুধান পক্ষের মধ্যে সাজ সাজ অবস্থান। ভালো করে ভোটক্যাম্প সাজানো, রাস্তার দু-পাশে ফ্ল্যাগ-ফেস্টুন টাঙানো, দলীয় পতাকায় বুথের চারপাশ মুড়ে দেওয়া, ভোটারদের টোটোতে আনার ব্যবস্থা করা – এমনি টুকিটাকি বহরের শেষ নেই। মন-জোগানোর শেষ শরশয্যা।

কামালের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী শ্যামল রায় খুব সকালে উঠে কমলেশের কাছে গিয়েছিল শেষ অনুরোধ জানাতে; কিন্তু তার সাফ কথা, বেইমানি করতে পারব না শ্যামলদা। গতরাত থেকে কামালকে খেয়ে আছি, এই রঙিন বোতল ছুঁয়ে কথা দিয়েছি।

পুবের আকাশে সকালের সূর্য একবাঁশ ওপরে উঠতেই কমলেশ বারান্দা থেকে উঠোনে নামল। দু-পা টলছে। বেশি টানার কুফল। হেলে-দুলে হেঁটে চলেছে সামনে। বকবক করছে আপনমনে। কবিতার ছন্দে ভোটপ্রার্থী কামালের উচ্চ প্রশংসা – ‘ওই ক্ষেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামালভাই।’ তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে থপ্ করে পড়ে গেল, আবার উঠেও দাঁড়ালো। ফাইনাল খেলায় কামালকে জেতানোর জন্যে সে-ই তো মূল নায়ক। প্রিয় প্রার্থী কামালকে সামনে পেয়ে বলল, এসে গিয়েছি ফ্রেন্ডো, ড্রিঙ্কস কই?

মুহূর্তে একটা জলি সাহস দুর্জয় হয়ে উঠল কামালের বুকের গভীরে। কমলেশ সত্যি সত্যি কথা রেখেছে। বিশ্বাসঘাতক জগৎ শেঠের বাংলায় মীরমদনও রয়েছেন। কমলেশ যেন ইতিহাসখ্যাত মীরমদনের আধুনিক সংস্করণ। খুশি হয়ে পচাকে বলল, কমলেশকে ড্রিঙ্কস দাও।

পচা চাবিতে চাপ দিলো। ফস্‌ শব্দের অদ্ভুত মাদকতায় চমকে উঠল কমলেশ। মনে মনে ভীষণ পুলকিত। ক্যাম্পের সামনে আরেকজন দাঁড়িয়ে। পচা আবার চাবিতে চাপ দিলো, আবার ফস্ শব্দের উচ্ছ্বাস। কমলেশ কম্পিত, মিষ্টি ঘ্রাণে অভিভূত, ফস্ শব্দের রোমাঞ্চ তার শরীর-মনে। মত্ততার উদ্গীরণ দেহের কানায় কানায়। পরিবেশের যাপিত অনুষঙ্গ তো এমনিই হয়।

সময়ের টানে সূর্য আরো ওপরে উঠল। আরো তেজ ছড়ালো। মাটির পৃথিবীতে উষ্ণতা বাড়ছে তিরতির করে। কমলেশের বারবার মনে হতে থাকল, শেষ পর্যন্ত কামালদাই জিতবে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বী শ্যামল অনেকটাই পিছিয়ে।

রান্নার ম-ম গন্ধ কমলেশের নাকে বারবার ধাক্কা মারছে। টলতে টলতে সাজানো-গোছানো টেন্টে বসে মাংস-ভাত খেয়ে নিল। বিড়বিড় করে বলল, সামান্য ভোটের জন্যে কত কী আয়োজন করেছে দ্যাখো। যেন বিয়েবাড়িতে খাওয়া-দাওয়া চলছে। বড় মন আছে বলে এমনি করেই সম্ভব। ভারি মিশুক কামাল, ভোটে জিতলে মনটা যে আরো খুলবে, তা নিয়ে কমলেশের মধ্যে কোনো সংশয় নেই।

ভাবল, আর দেরি করা চলে না। টলতে টলতে বুথঘরের দিকে এগিয়ে চলল। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী শ্যামলকে উদ্দেশ করে বলতে বলতে চলল, তোমার মনটা খাঁটি খানাডোবার মতো। কামালকে দেখে শেখো। তুমি শ্লালা কাজে-কম্মে কিস্সু নও, কেবল ভোট দাও। নিয়ে কী করবে শুনি? স্রেফ বাজে ফাজলামি। আগে কামালের মতো হও।

বুথঘরের সামনে প্রিয় প্রার্থীকে দেখে ফিক করে হেসে ফেলল কমলেশ। –  কিস্সু ভেব না ফ্রেন্ডো, তুমিই জিতবে। তাহলে আর দেরি করি কেন, ভেতরে ঢুকে ফট করে ছাপটা মেরে দিয়ে আসি। ফিরে এসে একটা ফস্ খাবো, ব্যস, আমার কাজ শেষ।

মুখ থেকে বোটকা গন্ধ ছড়িয়ে কমলেশ টলতে টলতে বুথঘরের ভেতরে ঢুকল। বিরক্তি লাগলেও প্রিসাইডিং অফিসার কোনো আপত্তি জানাতে পারলেন না। এদেশে মাতালেরও পূর্ণ ভোটাধিকার রয়েছে।

স্বস্তিকা স্ট্যাম্পটা সজোরে মেরে দিয়ে কমলেশ টলায়মান পায়ে বুথ থেকে বেরিয়ে এলো। তখনো আপনমনে বকবক‌ করছে, মাইরি বলছি কামালদা, তোমাকেই মেরেছি।

নেশার ঘোরে একবার পড়ে গেল মাটিতে। উপস্থিত সকলের মুখে তির্যক হাসি। জড়ানো স্বরে কমলেশের জোর তড়পানি, কোন শ্যালা আমাকে পেছন থেকে ঠেলে ফেলে দিলো রে? কামালদা সঙ্গে রয়েছে, একেবারে ঠান্ডা করে দেব। জানি তো, কামালদা জিতলে আমাকে নাচতে বলবে। অবশ্যি, তালরক্ষার জন্যে তখন আরেকটা বোতল চাই চাই।

অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালো কমলেশ। তখনো রঙিন জলের ছন্দে শরীরটা দুলছে। দু-চোখের কোণে মত্ততার আগুন। ঠোঁটের ফাঁকে রহস্যময় হাসি। ছন্দহীন পায়ে এগিয়ে চলেছে। দূরের মাঠে বিকেলের শেষ সূর্য ফিকে হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে, সন্ধের প্রাক সন্ধিক্ষণ। কমলেশ কামালের ক্যাম্পের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো। একটু হেসে, একবার কেশে, শরীরটা মৃদু দুলিয়ে বেশ কমান্ড নিয়ে বলল, এ্যাই পচা, আমার জন্যে আরেকবার ফস্‌ করো তো।

ভোটক্যাম্পের ভেতর কামাল তখন গম্ভীরমুখে বসে। হিসাবের চোরাপথে জয়লাভের আগাম সূত্র মিলিয়ে দেখতে ব্যস্ত। কে দিলো, কে দেয়নি – সেই ছায়াচিত্র মনের মুকুরে ভাসছে। ভেতরের হৃদয়সমুদ্রে দমকা হাওয়ায় সজোরে ছুটছে পালতোলা নৌকো। চাপা স্বরে কামালের মন্তব্য, কেবল ভোটের আগেই ফস্‌ করে কমলেশ।

তখনো কমলেশ নেশার ঘোরে টলছে। দু-হাতের তালুতে দু-চোখ কচলে শরীরটা একটু ঝাড়া দিয়ে বলল, আমি গো কামালদা, তোমার কমলেশ।

বললাম তো ফস্‌ পর্ব শেষ হয়ে গেছে।

কমলেশ টলতে টলতে এগিয়ে চলল আবছা অন্ধকারে ঢাকা গ্রামীণ মেঠোপথ ধরে। ক্যাম্পের ভেতর কামালের দু-চোখ তখন আড়াআড়ি দিগন্তহীন নীল আকাশের দিকে। মনের ইজেলে সুবোধ ঘোষের উজ্জ্বল মুখচ্ছবি। মাথা নাড়ার তালে তালে হুঁ শব্দের অস্ফুট উচ্চারণ। জ্বলজ্বলে দু-চোখ সদ্য জমে ওঠা থিকথিকে আঁধার ফালা ফালা করে দিতে থাকল।

Leave a Reply